আমি ব্লগ লেখার খুব বেশি সমর্থক কোনওদিনও ছিলাম না, সত্যি কথা বলতে কি এখনও যে আছি তা নয় । তার একটা প্রধান কারণ আমার ধারণা ব্লগ লেখার থেকেও পড়া অনেক বেশি ক্লান্তিকর । অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অনেক সময়ই পড়তে শুরু করে শেষ করা হয়ে ওঠে না । নিজের ধৈর্য এবং/অথবা আগ্রহের অভাবকে 'ঠিক আছে, বাকিটা পরে পড়ব' জাতীয় অজুহাত দিয়ে ঢেকে দিই - আর আমরা সবাই জানি সেই 'পরে' টা আর কখনওই আসে না । তো, এই কারণে আমি ঠিক করেছি আমার ব্লগকে কখনওই অন্যের ক্লান্তির কারণ ঘটাব না, আমার ব্লগের বিষয় হবে প্রধানতঃ ভ্রমণ । আমার মতো যেসব বাঙালিরা ঘুরতে ভালোবাসে, তাদের জন্য আমার ব্লগ হবে তথ্যের একটা source । আমার নিজের একটা অভ্যেস আছে, কোনও জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার আগে সেই জায়গাটা সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, আর internet ঘাঁটতে গিয়ে আমার বরাবরই মনে হয়েছে যে internet এ লেখালেখি করার ব্যাপারে বাঙালিদের থেকে কুঁড়ে খুব কম শিক্ষিত জাতই আছে । আমার মতো যেসব বাঙালিরা আছে, যারা internet এ কোনো একটা ইংরিজীতে লেখা দেখলেই না পড়ার চেষ্টা করে, তাদের জন্য আমার ব্লগ helpful হবে, এই বিশ্বাস নিয়ে শুরু করছি আমার ভ্রমণকাহিনী । আগেই বলে রাখি, আমি Statistics এর ছাত্র ছিলাম, তাই আমার ব্লগে তত্ত্বের থেকে তথ্যের দেখাই মিলবে বেশি ।

Sunday, December 31, 2017

সুন্দরবন ভ্রমণ

ভ্রমণপথঃ

শুক্রবার ২৯শে ডিসেম্বর, ২০১৭ঃ কলকাতা - সকাল ৭ঃ৩০ মিনিটে গাড়ি - ভায়া বারুইপুর, ক্যানিং - সকাল ১১ঃ৩০ মিনিটে সোনাখালি - লঞ্চে গোসাবা হয়ে বিকেল ৫ঃ৩০ মিনিটে পাখিরালয় - পাখিরালয়ে রাত্রিবাস
শনিবার ৩০শে ডিসেম্বর, ২০১৭ঃ সকাল ৮ঃ৩০ মিনিটে লঞ্চে - সজনেখালি, সুধন্যখালি, দোবাঁকি - সন্ধ্যে ৭টায় পাখিরালয়ে ফিরে রাত্রিবাস
রবিবার ৩১শে ডিসেম্বর, ২০১৭ঃ সকাল ৯টা লঞ্চে - ঝড়খালি - সন্ধ্যে ৬ঃ৩০ মিনিটে সোনাখালি - গাড়িতে ভায়া ক্যানিং, বারুইপুর - রাত ৯ঃ৩০ মিনিটে কলকাতা

মরা সুন্দরবনে গিয়ে বাঘ দেখতে পেয়েছি (হ্যাঁ, কোনওরকম সূচনা, ভনিতা না করে শুধু এই চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েই শুরু করছি এবারের লেখা । কবে, কোথায়, কিভাবে সেসব জানতে গেলে অবশ্য পুরো লেখাটা পড়তে হবে !) । শুক্রবার ২৯শে ডিসেম্বর, ২০১৭ বছরের শেষ তিনটে দিন জলে-জঙ্গলে কাটানোর জন্য আমরা বেরিয়ে পড়েছিলাম সুন্দরবনের উদ্দ্যেশ্যে । আমাদের এ'বারের দল ৪ জন শিশুসহ মোট ৩২ জনের । আলাদা করে আর কারুর নাম উল্লেখ করছি না, তবে আমরা যারা নিয়মিত একসঙ্গে যাই, তারা সবাই ছিলাম । ৩২ জনের দল মানে একটা ছোটখাটো কন্ডাক্টেড ট্যুরই বলা যেতে পারে । এর আগে চাঁদিপুরে আমরা এরকম বড় দল নিয়ে গিয়েছিলাম, তবে সেখানে সবাই ছিল সমবয়স্ক এবং সেইহেতু কিছুটা সমমনস্ক । এবারের দলে আড়াই থেকে আশি সবাই ছিল, তাই সবটা ম্যানেজ করার কাজটা সহজ ছিল না, তবে এটা বলতে পারি সবমিলিয়ে সবকিছু ভালোভাবেই হয়েছে ।

শুক্রবার ২৯শে ডিসেম্বর, ২০১৭ সকাল ৭ টার সময়ে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল । ৩২ জনের সবাই এক জায়গায় থাকে না, তাই মোট তিনটে টাটাসুমো আর একটা উইঙ্গার কলকাতার বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজনদের তুলে নিয়ে সোনাখালির উদ্দেশ্যে রওনা হল । আমাদের বাড়ি থেকে সোনাখালির দূরত্ব ৭২ কিলোমিটারের মতো, কিন্তু তাও পৌঁছতে প্রায় ঘন্টাচারেক লেগে গেল (মাঝে আমরা একবারই চা খাওয়ার জন্য আধঘন্টা দাঁড়িয়েছিলাম) ।

গাড়ি আমাদের সোনাখালির ঘাটের কাছে নামিয়ে দিল । এই সোনাখালির ঘাট থেকে আমাদের লঞ্চ ছাড়ার কথা । সেখানে পৌঁছে দেখলাম যেন মেলা বসেছে । ডিসেম্বরের শেষের কয়েকটা দিন সুন্দরবনে প্রচুর লোক যায় এটা শুনেছিলাম, কিন্তু সেটা যে কত বেশি তার স্পষ্ট ধারণা ছিল না । জেটিতে একেকটা লঞ্চ লাগছে, হুড়মুড় করে লোক উঠছে, লঞ্চ জেটি ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে । কোনও লঞ্চের যদি লোক বা মালপত্র তুলতে একটু বেশি সময় লাগে, তাকে বাকি লঞ্চের কর্মচারীরা বকাবকি করছে । যাই হোক, এইরকম তাড়াতাড়ি করেই আমরা আমাদের লঞ্চে উঠে পড়লাম ।

লঞ্চের আপার ডেক
লঞ্চ জিনিসটায় আমি এর আগে মুম্বই থেকে এলিফ্যান্টা যাওয়ার সময়ে চড়েছি, কিন্তু এই লঞ্চগুলো ঠিক সেরকম নয় । এখানে লোয়ার ডেক আর আপার ডেক আছে - লোয়ার ডেকে পাঁচটা ডাবল্‌ বেড রয়েছে যেখানে ইচ্ছে করলে দশ-বারোজন অনায়াসে শুতে পারে । এছাড়া লোয়ার ডেকে একটা টয়লেটও আছে । আপার ডেকে চেয়ার পাতা, খাওয়ার জায়গা ইত্যাদি রয়েছে । লোয়ার ডেকটা চারদিক ঘেরা, কয়েকটা জানালা আছে । আপার ডেকটা চারদিক খোলা । ভিউ দেখার জন্য আপার ডেকটা অনেক ভালো, তাই বেশিরভাগ লোকজন আপার ডেকেই বসলাম । পৌনে বারোটা নাগাদ আমাদের লঞ্চ ছাড়ল সোনাখালির জেটি থেকে । লঞ্চের ওপরে রোদ লাগে, কিন্তু ডিসেম্বরের শেষে গরম সেরকম লাগে না, তাই ব্যাপারটা খুব উপভোগ্য । আমরা লঞ্চে ওঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই লুচি-তরকারি দিল । এখানে জানিয়ে রাখি এই সুন্দরবন ভ্রমণ আমরা 'বিশ্বাস ট্রাভেলস্‌'-এর সঙ্গে করছি ।
লঞ্চের লোয়ার ডেক
আমাদের ভ্রমণ তিনদিনের, তৃতীয়দিন সন্ধ্যেবেলা আবার সোনাখালিতে এসে আমাদের যাত্রা শেষ হবে । এই তিনদিন আমাদের লঞ্চে ঘোরা, রাত্রে হোটেলে থাকা, সারাদিনের খাওয়া - সবমিলিয়ে মাথাপিছু খরচ ৩,৮৫০/- । এটা বিশ্বাস ট্রাভেলসের প্যাকেজ ট্যুর এবং আমাদের দলে লোকসংখ্যা বেশি হওয়ায় পুরো লঞ্চটাই আমাদের ।


লঞ্চ থেকে পাড়ের দৃশ্য
লঞ্চে বসে দুদিকের দৃশ্য দেখতে দেখতে আর ছবি তুলতে তুলতেই সময় কেটে যায় আর বিশেষ করে এই ধরনের দৃশ্য যা আমি অন্ততঃ কোনওদিন দেখিনি । নদীর জলের ওপর দিয়ে লঞ্চ এগিয়ে চলেছে আর দু'পাশে কখনও লোকালয়, কখনও ফাঁকা জায়গা আর কখনও বা গাছপালা । জঙ্গল জিনিসটা তখনও সেভাবে শুরু হয়নি ।



কিছুক্ষণ পরে লঞ্চে আমাদের মাছভাজা দিল । এইভাবে প্রায় দুঘন্টা চলার পরে আমাদের লঞ্চ একটা বড় নদীতে পড়ল - নদীর নাম বিদ্যাধরী নদী (ছোটবেলায় ভূগোল বই-এ পড়া হুগলী নদীর একটা শাখানদীর নাম, মনে পড়ছে ?) । এখানেই আমাদের প্রথম ভিউ পয়েন্ট - গোসাবা । গোসাবায় জেটিতে আমাদের লঞ্চ থামার পর আমরা লঞ্চ থেকে নামলাম । এখানে দেখার জায়গা প্রথমতঃ দু'টো - হ্যামিলটন-এর বাংলো আর বেকন বাংলো ।

হ্যামিলটন বাংলো
জেটি থেকে নেমে মিনিট দশেক হেঁটে আমরা প্রথমে হ্যামিলটনের বাংলোয় পৌঁছলাম । ১৯১৬ খ্রীষ্টাব্দে স্যার ড্যানিয়েল হ্যামিলটন এখানে এসে ছিলেন এবং গোসাবার অনেক উন্নতি করেন । বাংলোর ভিতরে ঢোকা যায় না, দরজাগুলো বন্ধ থাকে । তবে জায়গাটা বেশ সুন্দর । বাংলোর সামনে একটা বড় পুকুর রয়েছে । আমরা এখানে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে এগিয়ে গেলাম আমাদের পরবর্তী দেখার জায়গা - বেকন বাংলোর দিকে ।

বেকন বাংলো
হ্যামিলটন বাংলো থেকে বেকন বাংলো হেঁটে পনেরো মিনিট মতো লাগে । এখানকার বৈশিষ্ট্য হল স্যার হ্যামিলটনের আমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৩২ সালের ৩০ ও ৩১শে ডিসেম্বর এই বাংলোয় দুদিন ছিলেন । এখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা বেশ বড় মূর্তি আছে । বাংলোর সামনে একটা বড় মাঠ আর পুরোটা একটা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা । এখানেও বাংলোর ভিতরে ঢোকা যায় না ।


বেকন বাংলো থেকে বেরিয়ে আমাদের আর আগের জেটিতে ফিরে যেতে হল না কারণ এখানে পাশেই আরেকটা জেটি আছে আর আমাদের লঞ্চ ইতিমধ্যেই এই জেটিতে এসে দাঁড়িয়েছে । আমরা লঞ্চে উঠে পড়ার পর লঞ্চ ছেড়ে দিল । দুপুর তিনটে বাজে, খিদেও পেয়েছিল আর লঞ্চে উঠেই দেখলাম লাঞ্চ রেডি । একেকবারে ১২-১৩ জন একসঙ্গে বসে লাঞ্চ করা যায় তাই মোট তিনটে ব্যাচে আমাদের লাঞ্চ করা শেষ হল । দুপুরের মেনু ছিল ভাত, ডাল, ভাজা, ভেটকি মাছের ঝোল, চাটনি ইত্যাদি । খাবার অপরিসীম অর্থাৎ যত চাইবে ততই দেওয়া হবে । এমনকি কেউ কেউ চাইলে মাছও একটার বেশি দিয়ে দেয় । কিন্তু আমরা এখানে নেমন্তন্ন খেতে আসিনি, এসেছি সুন্দরবন ঘুরতে তাই অপ্রয়োজনীয়ভাবে অতিরিক্ত ভোজন শুধু অস্বাস্থ্যকরই নয়, কিছুটা বিরক্তিকরও বটে ।

নদীর ওপরে সূর্য্যাস্ত
লাঞ্চ শেষ করতে করতে সাড়ে চারটে বেজে গেল । তারপরে আমাদের একটা করে কমলালেবু দিল । শীতকালের বিকেল তাড়াতাড়ি শেষ হয়, সাড়ে পাঁচটার পরেই সূর্য্য অস্তাচলে চলে গেল । জলের ওপর থাকা অবস্থায় এই সূর্য্যাস্তের দৃশ্য অসাধারণ লাগে বিশেষ করে এই দৃশ্য আমাদের সচরাচর দেখার সুযোগ হয় না । লঞ্চ বিদ্যাধরী নদী থেকে একটা খাঁড়ি ধরে দত্তা নদীতে এল । এই দত্তা নদীর ধারেই পাখিরালয় - আমাদের রাত্রিবাসের জায়গা । পাখিরালয়ের জেটিতে আমাদের লঞ্চ এসে পৌঁছল তখন সন্ধ্যে ছটা বেজে গেছে ।

লঞ্চ থেকে নেমে পাড়ে উঠে প্রথমেই যে লজটা সামনে পড়ে, সেটাই আমাদের । নাম চিতল লজ । এখানে মোট দশটা ঘর আছে আর সবকটাই আমরা নিয়েছি । দশটার মধ্যে ছটা চার বিছানা আর চারটে দুই বিছানা । আমরা আমাদের সুবিধেমতো ঘর ভাগ করে নিলাম । সন্ধ্যের জলখাবার ছিল মুড়ি বেগুনী, প্রত্যেকের ঘরে গিয়ে গিয়ে সেগুলো দিয়ে আসা হল । সন্ধ্যেবেলা আমাদের আর কিছু করার নেই, তাই আমরা কয়েকজন পায়ে হেঁটে একটু কাছাকাছি ঘুরতে গেলাম । পাখিরালয় জায়গাটা প্রায় গ্রামই বলা যেতে পারে, তবে সুন্দরবনে ঘুরতে এলে এখানে ট্যুরিস্টরা থাকে বলে বেশ কিছু হোটেল/রিসর্ট রয়েছে । আমরা হাঁটতে হাঁটতে পাখিরালয় বাজারে চলে গেলাম । এখানে যাওয়ার পথে একটা জায়গা আছে, সেখান থেকে দেখা যায় নদীর ওপরে অনেকগুলো লঞ্চ তাদের যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে মাঝনদীতে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । রাতের অন্ধকারে লঞ্চগুলোকে বিশেষ ভালো করে দেখা যায় না কিন্তু তাদের ভিতরের আলো দেখা যায় । আর অন্ধকারের মধ্যে এই নানারকম রঙের আলো দেখতে বেশ সুন্দর লাগে, দেখে মনে হয় নদীর ওপরে আলোর মেলা বসেছে । আমরা আমাদের লঞ্চের গাইডের থেকে জেনেছিলাম রাত্রিবেলা কোনও লঞ্চই ঘাটের কাছে থাকে না, সবাই মাঝনদীতে চলে গিয়ে নোঙর ফেলে দেয় । এটা করার কারণ হল রাত্রে যখন জোয়ার আসে তখন জেটিতে দাঁড়িয়ে থাকাটা ঝুঁকির, কারণ জলের তোড়ে লঞ্চের ধাক্কায় জেটি ভেঙ্গে যেতে পারে আবার লঞ্চের ক্ষতিও হতে পারে ।

বাজার থেকে ফিরে এসে আমরা কিছুক্ষণ ঘরে ঘরে আড্ডা মেরে কাটালাম । রাত দশটা নাগাদ আমাদের রাতের খাবার দিল । আমাদের লজের ঘরগুলোর সামনে একটা লন আছে, সেখানে একটা চাঁদোয়া টাঙানো জায়গায় খাওয়ার ব্যবস্থা । রাত্রিবেলা এখানে বেশ ভালো ঠান্ডা পড়ে, তাই গরম গরম খাবার খুব দরকার ছিল । আর সেই খাবার যদি হয় ভাত বা রুটির সঙ্গে খাসীর মাংস, তাহলে তো কথাই নেই । খাওয়ার পরে যে যার ঘরে গিয়ে আমরা শুয়ে পড়লাম ।

পাখিরালয়ে সকালের কুয়াশা
পরেরদিন শনিবার ৩০শে ডিসেম্বর । সকালে আমার ঘুম ভাঙ্গল ছ'টা নাগাদ । নতুন জায়গায় এসে সকালে ঘরে বসে থাকার মানে হয় না, তাই আমি ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম । ঘরের বাইরে এসে দেখি চারিদিক ঘন কুয়াশায় ঢাকা । আমি লজের বাইরে এসে দেখলাম জলের ওপরে কিছুই দেখা যাচ্ছে না । চারপাশটা কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে আবার লজে ফিরে এলাম ।

কিছুক্ষণ পরে আমাদের লঞ্চ পাড়ে এসে ভিড়ল আর আমাদের গাইড চা নিয়ে ঘরে ঘরে সবাইকে দিয়ে দিল । সকালে সবাইকে আটটার মধ্যে রেডি হয়ে নিতে বলা হয়েছিল, কারণ আমাদের বেরোতে হবে । এখানে বাথরুমে গিজার নেই, তবে একজন লোক আছে যে ঘরে ঘরে বালতি করে গরম জল দিয়ে যায় । চানটান করে রেডি হয়ে লঞ্চ ছাড়তে ছাড়তে প্রায় পৌনে নটা বেজে গেল ।

সজনেখালির ওয়াচ্‌টাওয়ার থেকে
পাখিরালয় থেকে বেরিয়ে আমাদের প্রথম গন্তব্য হল 'সজনেখালি' । জায়গাটা বলতে গেলে নদীর ও'পারেই, নদী পেরোতে মিনিট পনেরো লাগল । সজনেখালিতে ইকো-ট্যুরিজম কমপ্লেক্স আছে । এখানে একটা ওয়াচ্‌ টাওয়ার আছে, যদিও সেখান থেকে গাছের মাথা ছাড়া কিছুই দেখা যায় না । এখানে আমরা সুন্দরী গাছ দেখলাম । গাছটার আলাদা কোনও বৈশিষ্ট্য নেই, তবে কান্ডটা বেশ সুন্দর দেখতে । হয়তো এই কারণেই এর এই নাম । এখানে পাশে একটা জলাশয় আছে, সেখানে আমরা একটা গোসাপ আর একটা কুমীর দেখতে পেলাম । এছাড়া একটা ছোট মিউজিয়াম আছে, সেখানে কিছুক্ষণ থেকে আমরা বেরিয়ে এলাম ।

শ্বাসমূল
সুন্দরবন অঞ্চলে সুন্দরী-গরাণ-গেঁওয়া প্রভৃতি গাছ দেখা যায় । এইসব গাছ নোনামাটি থেকে যথেষ্ট পরিমাণ প্রয়োজনীয় জল এবং অক্সিজেন সংগ্রহ করতে পারে না বলে এদের মূলের একটা অংশ মাটির উপরে বেরিয়ে আসে । এগুলোকে বলে শ্বাসমূল । একজায়গায় অনেকটা জায়গা জুড়ে এরকম শ্বাসমূল রয়েছে । আমাদের গাইড বলল এগুলোর ওপর দাঁড়াতে । দেখে জিনিসগুলোকে খুব একটা শক্ত বলে মনে হয় না, কিন্তু দাঁড়িয়ে দেখলাম খুবই শক্ত । আমাদের গাইড বলল বাঘ যখন মানুষ বা অন্য কোনও প্রাণীকে ধরে, তখনও তার শরীরে প্রাণ থাকে । তারপর বাঘ এইরকম শ্বাসমূলের ওপর দিয়ে তার শরীরটা বয়ে নিয়ে যায় । এই শ্বাসমূলগুলো তখন সেই শরীরটাকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয় আর প্রচন্ড যন্ত্রণায় বেশিরভাগ সময়েই সেই প্রাণীর শরীর থেকে প্রাণ বেরিয়ে যায় ।


আমাদের পুরো দল
সজনেখালিতে যে জেটিতে লঞ্চ নামায় সেখান থেকে তোলে না । এখানে ঢোকার আর বেরোনোর গেট আলাদা আর আমাদের লঞ্চ আমাদের জন্য বেরোনোর গেটের জেটিতে অপেক্ষা করছিল । আগেই বলেছি বছরের শেষের এই কটা দিনে সুন্দরবনে প্রচন্ড ভীড় হয়, আর এই সজনেখালির জেটিতেও আগেরদিনের সোনাখালির মতোই লোক গিজগিজ করছে । আমরা আমাদের লঞ্চে ওঠার পর লঞ্চ এগিয়ে চলল পরবর্তী গন্তব্য সুধন্যখালির দিকে ।

সুধন্যখালি যাওয়ার পথে
সজনেখালি থেকে সুধন্যখালি লঞ্চে প্রায় ঘন্টাতিনেক লাগে । লঞ্চে ওঠার কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের ব্রেকফাস্ট দিয়ে দিল । মেনুতে ছিল কচুরি আর তরকারি । লঞ্চে খাওয়াদাওয়াটা ভালোই হয় আর আমাদের রাঁধুনির রান্নার হাতটাও চমৎকার, তাই খাওয়াটা বেশ মনোমতোই হয় । ব্রেকফাস্টের কিছুক্ষণ পরে আমাদের আবার চিকেন পকোড়া দিল ।


লঞ্চে করে একটা জার্ণির বৈশিষ্ট্য হল এখানে দৃশ্যপট প্রায় একইরকম - আমরা একটা সরু বা চওড়া বা খুব চওড়া নদীর একটা ধার ধরে এগিয়ে যাচ্ছি আর দুপাশে প্রধানতঃ জঙ্গল, মাঝে মাঝে লোকালয় । কিন্তু এই একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হওয়া সত্ত্বেও কখনও একঘেয়ে লাগে না । ঘন্টার পর ঘন্টা জলের ওপর লঞ্চে করে যাওয়াটা একটা দারুণ অভিজ্ঞতা আর আমরা সেই অভিজ্ঞতা পুরোমাত্রায় উপভোগ করেছি ।

প্রায় সাড়ে বারোটা নাগাদ আমরা পৌঁছলাম সুধন্যখালিতে । এখানে জঙ্গলের মধ্যে একটা ওয়াচ্‌টাওয়ার আছে যেখান থেকে বাঘ দেখার সম্ভাবনা রয়েছে । তবে বাঘ দেখতে চাইলেই তো আর বাঘ দেখা যায় না, তার জন্য বিশেষ সৌভাগ্যের প্রয়োজন হয় । একটা কথা মনে রাখতে হবে সুন্দরবনের বাঘ হল 'রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার' - এদের আকৃতি সুবিশাল না হলেও চেহারার সৌন্দর্য্যের জন্য এদের খ্যাতি পৃথিবীজোড়া । এদের চালচলনের মধ্যে যে রাজকীয় মেজাজ রয়েছে তার জন্যই এদের এই নাম । আমরা সাধারণ মানুষ, সাধারণ প্রজা - রাজসকাশে গিয়েছি । আমাদের ইচ্ছে থাকলেই যে রাজা আমাদের দেখা দেবেন এমন আশা করাও ঠিক নয়, রাজা নিজের ইচ্ছানুযায়ীই চলাফেরা করবেন ।

সুধন্যখালির ওয়াচ্‌টাওয়ার থেকে
আমরা সুধন্যখালির ওয়াচ্‌টাওয়ার থেকে কিছুক্ষণ গাছের মাথা দেখে নেমে এলাম । ফেরার পথে দেখলাম এক জায়গায় একটা বোর্ড রাখা রয়েছে, সেখানে গত দুমাসের মধ্যে সুধন্যখালিতে কে কবে কখন বাঘ দেখেছে সেগুলো লেখা আছে । এই সময়গুলোর মধ্যে একটা প্যাটার্ন রয়েছে আর সেটা হল সেগুলো সবই বিকেল চারটে থেকে সন্ধ্যে সাড়ে ছটার মধ্যে । আমাদের গাইডের থেকে জেনেছিলাম বাঘ সাধারণতঃ খুব সকাল বা বিকেলের দিকেই দেখা যায় কারণ এই সময়ে ওরা জলের ধারে আসে জল খেতে । ভরদুপুরবেলা বাঘ সাধারণতঃ খেয়েদেয়ে বিশ্রাম করে আর এইসময়ে এদের দেখার আশা করার কোনও মানে হয় না ।

সুধন্যখালিতেও একইরকম ব্যবস্থা - যেখানে লঞ্চ থেকে নামা সেখান থেকে ওঠা নয় । লঞ্চে উঠে আমরা এগিয়ে চললাম আমাদের দিনের তৃতীয় তথা শেষ গন্তব্য দোবাঁকি-র দিকে । সুধন্যখালি থেকে দোবাঁকি প্রায় ঘন্টা দেড়েক, তাই এইসময়ে আমাদের লাঞ্চ দিয়ে দিল । এদিনের মেনু ভাত, ডাল, আলুভাজা, পারশে মাছের ঝাল, চাটনি, পাঁপড় ইত্যাদি । লাঞ্চ শেষ হতে হতে তিনটের বেশি হয়ে গেল আর আমরা দোবাঁকির কাছে পৌঁছে গেলাম ।

দোবাঁকির কাছে
দত্তা নদী ধরে আরও মোহনার দিকে এগিয়ে গেলে দত্তা নদী যেখানে বিদ্যাধরী নদীর সঙ্গে মেশে, প্রায় সেই জায়গাতেই দোবাঁকি । পাড়ের একেবারে কাছে পৌঁছে একটা ঘটনা ঘটল আর সেটা আমাদের বেশ বড় বিপদের কারণ হতে পারত । আমাদের লঞ্চ চড়ায় কিছুটা আটকে গেল । আমাদের চালক ব্যাপারটা আগে থেকে আন্দাজ করতে পেরেছিল আর সেইভাবে কিছুটা তৈরিও ছিল, তাই আমরা একেবারে আটকে গেলাম না । কোনওভাবে কিছুটা আগুপিছু করে টরে (ঠিক কিভাবে সেটা আমি বলতে পারব না, কারণ আমি লঞ্চ চালাতে জানি না) বেশ মুন্সিয়ানার সঙ্গে সে চড়া থেকে লঞ্চটাকে উদ্ধার করে আনল । আমরা দেখতে পেলাম আমাদের আগে আরও কয়েকটা লঞ্চ এগিয়ে গিয়েছিল আর চড়ার মধ্যে আটকে গেছে । ব্যাপারটার মধ্যে ভয়ের কিছু নেই, কারণ কোনও লঞ্চই অনন্তকাল চড়ায় আটকে থাকে না, জোয়ার এলেই লঞ্চ চড়া থেকে ছাড়া পেয়ে যায় । কিন্তু চড়ায় একবার আটকে গেলে জোয়ার আসার আগে উদ্ধার পাওয়ার আশা কম আর সেক্ষেত্রে দোবাঁকি দেখা তো হবেই না উল্টে রাত পর্যন্ত্য অপেক্ষা করতে হতে পারে । তাই এরকম ঘটনা একেবারেই অভিপ্রেত নয় ।

আমাদের লঞ্চ একটা অন্য জলপথ দিয়ে দোবাঁকির দিকে এগিয়ে চলল । এখানে জলের গভীরতা বেশি তাই আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই । কিন্তু বেশ কিছুটা ঘুরপথ বলে আমাদের দোবাঁকি পৌঁছতে আরও আধঘন্টা দেরি হয়ে গেল । দোবাঁকিতে আমরা নামলাম তখন দুপুর সাড়ে তিনটে আর দোবাঁকি বিকেল চারটে পর্যন্ত্য খোলা থাকে ।

দোবাঁকিতে হরিণের জল খাওয়া
এ'পর্যন্ত্য যেকটা জায়গা দেখেছি, তার মধ্যে দোবাঁকি আমার সবথেকে বেশি ভালো লাগল । এখানেও একটা ওয়াচ্‌টাওয়ার আছে আর সেখান থেকেই আমরা একটা হরিণের পাল দেখতে পেলাম । বিকেল হয়ে এসেছে, এটা হল বনের জন্তুদের জল খাওয়ার সময় । আমরা সাত-আটটা হরিণকে দেখতে পেলাম জঙ্গলের মধ্যে থেকে বেরিয়ে একটা পায়ে চলা রাস্তা পেরিয়ে একটা জলাশয়ে নেমে জল খেল আবার কিছুক্ষণ পরে জঙ্গলের মধ্যে ফিরে গেল । এটা একটা দূর্দান্ত দৃশ্য আর দেখে আমাদের সত্যিই খুব ভালো লাগল । কাছাকাছির মধ্যে দুটো গোসাপও ছিল, সেটা আমাদের উপরি পাওনা (না, গোসাপ হরিণকে আক্রমণ করেনি, কারণ হরিণ গোসাপের খাদ্য নয়) । ওয়াচ্‌টাওয়ার থেকে নেমে আমরা একটা জাল দিয়ে ঘেরা পথ দিয়ে এগিয়ে চললাম । এটা আসলে একটা ব্রীজ, হেঁটে যাওয়ার জন্য । মাটি থেকে প্রায় পনেরো ফুট উঁচুতে এই পথটা তৈরি করা হয়েছে ট্যুরিস্টদের হাঁটার জন্য । ভাগ্য ভালো থাকলে এখান থেকে বাঘও দেখা যেতে পারে । আমরা অবশ্য বাঘ দেখতে পাইনি, তবে একজায়গায় বাঘের পায়ের ছাপ দেখতে পেয়েছি । ছাপটা টাটকা নয়, বেশ কিছুদিনের পুরনো । তবুও, বাঘের পায়ের ছাপ তো ! সেটাই বা কম কিসে ?

জলের ওপরে সূর্য্যাস্ত - দোবাঁকি থেকে ফেরার সময়ে
দোবাঁকি থেকে লঞ্চে উঠে আমরা ফেরার পথ ধরলাম । আমরা পাখিরালয় থেকে অনেকটা দক্ষিণদিকে চলে এসেছি, তাই ফিরতে অনেকটা সময় লাগবে । আমরা লঞ্চে উঠলাম সোয়া চারটে আর আমাদের গাইড বলল পাখিরালয়ে পৌঁছতে সাতটা বেজে যাবে । লঞ্চে করে সারাদিন ঘোরাঘুরির অভিজ্ঞতাটা নিঃসন্দেহে ভাল কিন্তু দোবাঁকি থেকে পাখিরালয়ে ফেরার এই লঞ্চযাত্রাটা একটা অসাধারণ অভিজ্ঞতা । আমরা যখন লঞ্চে উঠে কিছুটা এগোলাম, তখনই সূর্য্যাস্তের সময় হয়ে গেল । আর এই সূর্য্যাস্তটা আমরা দেখতে পেলাম একেবারে বিদ্যাধরী নদীর উপরে । বিদ্যাধরী খুব চওড়া নদী, জায়গায় জায়গায় এপার-ওপার দেখা যায় না । এইরকম জায়গায় সূর্য্যাস্ত হলে মনে হয় সূর্য্য আসলে জলের মধ্যেই অস্ত যাচ্ছে । সূর্য্যাস্ত হয়ে যাওয়ার পর কিছুক্ষণ আকাশে আলো থাকে আর তারপর একেবারে অন্ধকার । অন্ধকারের একটা নিজস্ব সৌন্দর্য্য আছে এটা আগেও দেখেছি, কিন্তু এইভাবে জলের ওপর লঞ্চে চড়ে সেই সৌন্দর্য্য কখনও উপলব্ধি করিনি । একটু পরে আকাশে চাঁদ উঠল । দুদিন পরেই পূর্ণিমা, তাই চাঁদের আলোর বেশ জোর আছে । এ'এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা । মনে হচ্ছিল পাখিরালয়ে পৌঁছতে যতটা দেরি হয় ততই ভালো, তত বেশি করে প্রকৃতির এই রূপসুধা পান করা যায়, তত ভালোভাবে এই সৌন্দর্য্যে অবগাহন করা যায় ! (অনুভূতিটা আমার, ভাষাটা ধার করা, কোথা থেকে মনে পড়ছে না, তবে যেখান থেকেই হোক আমি লেখকের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি)

সাতটা নাগাদ আমরা পাখিরালয়ে পৌঁছলাম । কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের সন্ধ্যের জলখাবার চাউমিন দিল । এই একটা জিনিস এরা একেবারেই ভালোভাবে তৈরি করতে পারেনি, জিনিসটা খেতে সেরকম ভালো হয়নি । যাই হোক, এরা বাকি রান্নাগুলোর সবকটাই ভালো করে, তাই এইটুকু মাফ করে দেওয়া হল ।

সন্ধ্যেবেলা ঘরে বসে কিছুই করার থেকে না, তাই আমরা আবারও পাখিরালয় বাজারের দিকে গেলাম । বেড়াতে গেলে কিছু জিনিস কিনতেই হয়, এখানেও বাজারে গিয়ে সেরকম কিছু জিনিস কেনা হল । লজে ফিরলাম তখন প্রায় রাত নটা । দশটা নাগাদ ডিনার দিল । মেনু ছিল ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন আর দুটো রান্নাই দূর্দান্ত হয়েছিল । খাওয়ানোর ব্যাপারে প্রথমদিন থেকেই এদের মধ্যে কোনও কার্পণ্য দেখিনি, আর সেটা এই চাইনিজ মেনুতেও বজায় রইল । খাওয়ার পরে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম ।

বছরের শেষ সূর্য্যোদয় - পাখিরালয়ে
রবিবার ৩১শে ডিসেম্বর - ২০১৭ সালের শেষ দিন আর আমাদের সুন্দরবন ঘোরারও শেষ দিন । আমরা রেডি হয়ে মালপত্র নিয়ে লঞ্চে উঠে পড়লাম । আমরা আর পাখিরালয়ে ফিরব না, লঞ্চে করে প্রথমে ঝড়খালি যাব আর সেখান থেকে সোনাখালিতে ফিরে যাব । সবকিছু গুছিয়ে লঞ্চ ছাড়ল তখন সকাল নটা । পাখিরালয় থেকে ঝড়খালি যেতে সময় লাগে প্রায় তিনঘন্টা আর এই যাত্রাপথটাও আগেরদিনের মতোই - দারুণ !

চিতল লজ
লঞ্চ ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যে জলখাবার দিল - কচুরি, ছোলার ডাল । যাত্রাপথের বিবরণ আর নতুন করে দেওয়ার কিছু নেই, আমরা ঝড়খালি পৌঁছলাম তখন দুপুর বারোটা । ঝড়খালিতে বাঘ দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা সবথেকে বেশি কারণ খবরে যে প্রায়ই শোনা যায় সুন্দরবনের বাঘ নদী পেরিয়ে গ্রামে চলে এসেছে, তার অনেকগুলোই ঝড়খালির খবর । ঝড়খালি সুন্দরবনের কোর এরিয়ার (অর্থাৎ যেখানে বাঘ বা অন্যান্য জন্তুদের বাসস্থান এবং তাদের লালনপালন করা হয়) মধ্যে না পড়লেও নদী পেরিয়ে বাঘের পক্ষে এখানে এসে পড়াটা কঠিন নয় । কিন্তু তাই বলে আমি কখনওই চাইনি যে আমরা যখন ঝড়খালির রাস্তা দিয়ে হাঁটছি, তখন সামনে একটা বাঘ এসে পড়ুক !

জেটিতে নেমে আমরা এগিয়ে গেলাম চিড়িয়াখানার দিকে । ঢোকার খরচ পাথাপিছু ৩০/- টাকা । ঝড়খালির চিড়িয়াখানায় বেশ ভালোই ভিড় হয়েছে । দেখে মনে হয় শুধু ট্যুরিস্ট নয়, এখানকার লোক্যাল লোকজনও চিড়িয়াখানা দেখতে এসেছে । আমরা এগিয়ে চললাম বাঘের খাঁচার দিকে ।

রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার
চিড়িয়াখানার মধ্যে একটা সুবিশাল জায়গা জুড়ে তৈরি হয়েছে বাঘের খাঁচা । জায়গাটা এতটাই বড় যে বাঘের হয়তো মনেই হবে না যে সে আসলে একটা খাঁচার মধ্যে রয়েছে । অনেক গাছ, হাঁটু পর্যন্ত্য উঁচু ঘাস, জলাশয় - সবমিলিয়ে বাঘের পছন্দের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে । আমরা খাঁচার ধার দিয়ে হেঁটে এগোচ্ছি বাঘমামাকে দেখার আশায় । হঠাৎ "দেখা গেছে, দেখা গেছে" আর "খুব কাছে" এইজাতীয় চিৎকার শুনে দৌড়ে সেখানে গিয়ে পৌঁছলাম আর আমাদের সুন্দরবন যাত্রাকে পুরোপুরি সার্থক করে আমাদের সামনে দেখা দিলেন - শার্দুল সম্রাট ওরফে দক্ষিণরায় ওরফে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার ! (হ্যাঁ, আমরা এইভাবেই বাঘ দেখেছি । আর আমি কখনও দাবিও করিনি যে আমরা হঠাৎ করে জলের ধারে বা অন্য কোথাও বাঘের দেখা পেয়েছি ।) আমরা খাঁচার গায়ে একরকম আটকে দাঁড়িয়ে আছি, খাঁচার ওপাশে একটা ফুটদশেক চওড়া পরিখা আর তার ওপাশেই বাঘ ।
রাজসকাশে
এত কাছ থেকে এর আগে কখনও রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার দেখিনি, দৃশ্যটা সত্যিই দেখার মতো । বাঘের যে বয়স হয়েছে সেটা তাকে দেখলে বোঝা যায় কিন্তু তার হাঁটাচলার মধ্যে রাজকীয় ভাবটা পুরোমাত্রা বর্তমান । কয়েকমূহুর্ত একজায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে বাঘ আবার হাঁটাচলা শুরু করল । বেশ খানিকক্ষণ আমাদের রাজদর্শন দিয়ে সম্মানিত করে বাঘ আমাদের বিপরীতদিকে চলে গেল । যথেষ্ট দেখা হয়েছে, ক্যামেরায় যথেষ্ট ছবি তোলা হয়েছে, তাই আমরা এবার চিড়িয়াখানা থেকে বেরোবার পথ ধরলাম । ও হ্যাঁ, বাঘের খাঁচার পরিখার মধ্যে কয়েকটা কুমীরও দেখতে পেয়েছি কিন্তু আমি সরীসৃপশ্রেণীর ব্যাপারে খুব কম আগ্রহী, তাই এদের ব্যাপারে আর কিছু উল্লেখ করছি না ।

সুন্দরবন ঘোরা শেষ, বাঘ দেখা সার্থক হয়েছে তাই এবার লঞ্চে উঠে আমরা ফেরার পথ ধরলাম । ঝড়খালি থেকে আমাদের গন্তব্য সোনাখালি যেখানে আমাদের জন্য গাড়ির অপেক্ষা করার কথা । আমরা লঞ্চে উঠলাম তখন দুপুর দেড়টা । ঝড়খালি থেকে সোনাখালিতে পৌঁছতে প্রায় ঘন্টাপাঁচেক লাগবে । কিছুক্ষণের মধ্যেই লাঞ্চ দিল । শেষদিনের মেনুটা যাকে বলে বাম্পার । ভাত, ডাল, আলুভাজা আর পোনা মাছের সঙ্গে যোগ হয়েছে বাগদা চিংড়ি মালাইকারী । চিংড়ির সাইজ বেশ বড়র দিকেই আর মালাইকারী যে ব্যাকরণসম্মত না হলেও জিহ্বাসম্মত যে হয়েইছিল, সেটা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই । শেষদিনের খাওয়াটা একটু বেশিরকমেরই ভালো হল ।

লঞ্চের ডেকে বসে বসেই সময় কেটে যায় । দুপুর থেকে বিকেল, বিকেল থেকে সন্ধ্যে । লঞ্চ সোনাখালি পোঁছল সাড়ে ছটার পরে । মালপত্র নিয়ে লঞ্চ থেকে আমরা গাড়িতে উঠে পড়লাম । গাড়ির ব্যবস্থা একইরকম । বাড়ি ঢুকলাম তখন প্রায় রাত দশটা । সুন্দরবন বেড়ানোর এখানেই শেষ ।

সারসংক্ষেপঃ

১. পশ্চিমবঙ্গে পাহাড় আর সমুদ্র বাদ দিলে বেড়ানোর জায়গার একটা বড় সুযোগ হল জঙ্গল । এখানে ঘোরার জন্য একমাত্র ব্যবস্থা হল জলপথ আর সেটা একটা বিশেষ সুযোগ ।
২. কলকাতা থেকে সুন্দরবন যাওয়ার জন্য সোনাখালি পর্যন্ত্য গাড়িতে যেতে হয় । সোনাখালি থেকে লঞ্চ ছাড়ে ।
৩. সুন্দরবনে সাধারণতঃ প্যাকেজ ট্যুরই করা হয় । ওয়েস্টবেঙ্গল ট্যুরিজমের সঙ্গেও ঘোরাঘুরি করা যায়, আবার বেসরকারী কারুর থেকেও প্যাকেজ নেওয়া যায় ।
৪. আমরা গিয়েছিলাম 'বিশ্বাস ট্রাভেলস্‌' এর সঙ্গে । এদের থাকা-খাওয়া-ঘোরানো সবই বেশ ভালো । যোগাযোগঃ সুব্রত বিশ্বাস - ৯৭৩২৫৪৫৬৬৮ ।
৫. আমাদের দলে লোকসংখ্যা বেশি থাকায় একটা পুরো লঞ্চই আমাদের হয়ে গেছিল । এছাড়া কম লোক হলেও যাওয়া যায়, তবে সেক্ষেত্রে লঞ্চে অন্যান্য লোকজনও থাকবে ।
৬. সোনাখালি থেকে লঞ্চ ছেড়ে পাখিরালয়ে নিয়ে যায় । পাখিরালয় থেকেই ঘোরাঘুরিগুলো করা হয় আর রাত্রে এখানেই থাকা হয় ।
৭. পাখিরালয় জায়গাটা বেশ সুন্দর যদিও একেবারেই গ্রাম । আমাদের লজটা ছিল জেটির একেবারে পাশেই, সেটা একটা বাড়তি সুবিধে ।
৮. জলের ওপর না থাকলেও লজে মশার উপদ্রব আছে, তাই সেইরকম মশানিরোধক জিনিস নিয়ে যাওয়া ভালো ।
৯. যেহেতু পুরো যাত্রাপথটাই মূলতঃ জলে আর যখন তখন চাইলেই কোনও লোকালয় পাওয়া সম্ভব নয়, তাই সঙ্গে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র রাখা দরকার ।
১০. সঙ্গে ছোট বাচ্চা থাকলে এখানে কোনও অসুবিধে হওয়ার কথা নয় । এরা যা খাবার দেয় সেগুলো মোটামুটি ঘরোয়া রান্না আর সেটা বাচ্চাদের অনায়াসে চলতে পারে ।

উপসংহারঃ

সুন্দরবন
সুন্দরবন । সুন্দরী গাছের জন্য বিখ্যাত । জল আর জঙ্গলের অসাধারণ সমন্বয়ের জন্য বিখ্যাত । প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্য বিখ্যাত । রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের জন্য বিখ্যাত । নদী পেরিয়ে বাঘের গ্রামে এসে হামলা চালানোর জন্য বিখ্যাত । জঙ্গলে মধু বা কাঠ আনতে গিয়ে বাঘের কবলে পড়ে মানুষের মৃত্যুর জন্য বিখ্যাত । সামান্য টাকার জন্য মানুষের চরম বিপদের ঝুঁকি নেওয়ার জন্য বিখ্যাত । প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের লড়াইয়ে মানুষের পরাজয়ের জন্য বিখ্যাত । আবার সেই পরাজয়কে পাথেয় করে জীবনসংগ্রামে মানুষের জয়ী হওয়ার জন্যও বিখ্যাত । যদিও সুন্দরবনে সারাবছরই পর্যটক যায় কিন্তু ঘোরাঘুরির জন্য শীতকালটাই সবথেকে ভালো । এইসময়ে এখানে ভিড় হয় ঠিকই কিন্তু তাতে ঘোরাঘুরির সেরকম কোনও অসুবিধে হয় না । কলকাতা থেকে খুব কাছে সুন্দরবন একটা দূর্দান্ত ঘোরার জায়গা । জল, জঙ্গল, জন্তু, প্রকৃতি এই চারটের কোনও একটাও যদি কারুর জন্য ঘোরার পক্ষে যথেষ্ট কারণ বলে মনে হয়, তাহলে তাকে একবার সুন্দরবন যেতেই হবে !

সুন্দরবন ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Sunday, October 15, 2017

মধ্যপ্রদেশ ভ্রমণ

ভ্রমণপথঃ

শুক্রবার ৬ই অক্টোবর, ২০১৭ঃ হাওড়া - রাত ১০ টায় হাওড়া মুম্বই মেল (ভায়া এলাহাবাদ)
শনিবার ৭ই অক্টোবর, ২০১৭ঃ সন্ধ্যে ৬ঃ৪৫ মিনিট - জব্বলপুর - জব্বলপুরে রাত্রিবাস
রবিবার ৮ই অক্টোবর, ২০১৭ঃ জব্বলপুর - ভেদঘাট - রাত ১১ঃ৫৫ মিনিটে জব্বলপুর ইন্দোর এক্সপ্রেস
সোমবার ৯ই অক্টোবর, ২০১৭ঃ সকাল ৫ঃ৫০ মিনিট - ভোপাল - সাঁচি - ভোপালে রাত্রিবাস
মঙ্গলবার ১০ই অক্টোবর, ২০১৭ঃ ভোপাল - ভীমবেঠকা - ভোজপুর - ভোপালে রাত্রিবাস
বুধবার ১১ই অক্টোবর, ২০১৭ঃ ভোপাল - সকাল ৮ঃ৩৫ মিনিটের সোমনাথ জব্বলপুর এক্সপ্রেস - দুপুর ১২ঃ১০ মিনিটে পিপারিয়া - পাঁচমারি - পাঁচমারিতে রাত্রিবাস
বৃহস্পতিবার ১২ই অক্টোবর, ২০১৭ঃ পাঁচমারি সাইট সিয়িং - পাঁচমারিতে রাত্রিবাস
শুক্রবার ১৩ই অক্টোবর, ২০১৭ঃ পাঁচমারি সাইট সিয়িং - পাঁচমারিতে রাত্রিবাস
শনিবার ১৪ই অক্টোবর, ২০১৭ঃ পাঁচমারি - পিপারিয়া - দুপুর ১২ঃ১৫ মিনিটের মুম্বই হাওড়া মেল (ভায়া এলাহাবাদ)
রবিবার ১৫ই অক্টোবর, ২০১৭ঃ বিকেল ৫ টা - হাওড়া

ধ্যপ্রদেশ জায়গাটা আমার খুবই প্রিয় । আগে শুধু নিজের শরীরেরটা ছিল, এবার তার সঙ্গে দেশেরটাও যোগ হল । ঠিক কিভাবে সেটা হল, সেটা আশা করি পুরো লেখাটা পড়লে জানা যাবে তবে আপাতত বলে রাখি লেখার শিরোনাম 'মধ্যপ্রদেশ ভ্রমণ' হলেও এটা স্পষ্ট যে সম্পূর্ণ রাজ্যটা ঘুরে ফেলা আমাদের এই ছোট পরিসরে সম্ভব নয় । তাই শুধুমাত্র ওপরের ভ্রমণপথে উল্লিখিত জায়গায় ঘোরাঘুরির বিস্তারিত বিবরণই আমার ব্লগের এবারের বিষয়বস্তু ।

জব্বলপুর ভ্রমণঃ

আমার ব্লগের প্রথা ভেঙে প্রথমেই একটা 'সমস্যা'র কথা লিখি । জব্বলপুর তথা মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার একটা অসুবিধে হল হাওড়া থেকে রেলযোগাযোগ খুব কম । হাওড়া থেকে জব্বলপুরে মাত্র দু'টো ট্রেন যায় আর তাদের মধ্যে মুম্বই মেল (ভায়া এলাহাবাদ) এর সময়সূচীটাই সুবিধেজনক । শুক্রবার ৬ই অক্টোবর, ২০১৭ রাত ১০ টায় এই ট্রেনে আমাদের যাত্রা শুরু হল । এবারে আমাদের দলের সদস্য আমি, অমৃতা, বাবা, মা, কথা, কলি, কঙ্কনাদি, অমিতদা, মিঙ্কা (কারোর পরিচয়ই আর আলাদা করে দিচ্ছি না, কারণ আমার ব্লগের নিয়মিত পাঠকরা এতদিনে সবাইকেই চিনে গেছে বলে আমার বিশ্বাস) । আমরা এ সি থ্রি টীয়ারের টিকিট পাইনি তাই স্লীপারে যেতেই বাধ্য হয়েছিলাম ।

যত দিন যাচ্ছে, ট্রেনের স্লীপারক্লাসে যাতায়াত করা যে কতটা দুঃসাধ্য হয়ে যাচ্ছে, সেটা যাঁরা যাতায়াত করেন তাঁরা জানেন । একটা স্লীপারক্লাসের কামরায় রিজার্ভ করা লোকের থেকে উটকো লোক থাকে বেশি । এদের কারোরই রিজার্ভ কামরায় ওঠার বৈধ টিকিট নেই, টিকিট পরীক্ষককে ঘুষ দিয়ে এরা অনায়াসে সীটে এসে বসে থাকে বা রাত্রে দু'টো লোয়ার বার্থের মাঝখানে শুয়ে থাকে । এদেরকে কিছু বলেও কোনও লাভ হয়না, টি টি কে বলে তো আরওই কিছু হয় না -কারণটা সহজেই অনুমেয় ।

পরেরদিন শনিবার ৭ই অক্টোবর, ২০১৭ - দিনের বেলাটা পুরোটাই ট্রেনে । দুপুরে রেলের খাবার নেওয়া হল । এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে রেলের খাবারের মান আগের থেকে উন্নত হয়েছে । খুব ভালো কিছু হয়েছে এটা বলব না, তবে আগে যেরকম পুরো খাবারটা খাওয়াই যেত না, এখন অন্তত সেটা হয় না । চিকেন মিল, এগ মিল মিলিয়ে আমাদের পড়ল ৫০০/- টাকা ।

ট্রেনের নাম মুম্বই মেল ভায়া এলাহাবাদ হলেও এর রুট পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে, তাই ট্রেনটা এখন আর এলাহাবাদ যায় না । এই ট্রেনটা লেট করে চলার জন্য কুখ্যাত যদিও মাত্র একঘন্টা লেট করে আমাদের জব্বলপুর পৌঁছে দিল সন্ধ্যে ৬ঃ৪৫ মিনিটে ।

জব্বলপুর স্টেশনের একটা ব্যাপার চোখে পড়ার মতো - সেটা হল এর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা । প্ল্যাটফর্মে বা স্টেশন চত্বরে কোথাও একটা কাগজ বা প্ল্যাস্টিকের টুকরোও পড়ে নেই । কেউ কোথাও পানের পিক বা সিগারেটের টুকরোও ফেলে না । 'স্টেশন নোংরা করলে জরিমানা হবে' এরকম লেখা বোর্ড কিছুদূর অন্তরই রয়েছে কিন্তু শুধুমাত্র আইন করে বা জরিমানার ভয় দেখিয়ে এসব বন্ধ করা যায় না । এগুলো আসে মানুষের নিজস্ব সচেতনতা আর মানবিকতা থেকে আর সেটা যে স্টেশন ব্যবহারকারীদের আছে, তার প্রমাণ সর্বত্র ।

জব্বলপুর স্টেশন
জব্বলপুরে আমরা কোনও হোটেল বুকিং করিনি, তার বদলে আমাদের বুকিং ছিল রেলওয়ে রিটায়ারিং রুমে । এর আগে শিলং ভ্রমণ-এর সময়ে গুয়াহাটী স্টেশনে আমরা ছিলাম রিটায়ারিং রুমে । জব্বলপুরে আমরা তিনটে ডাবল্‌ বেড ঘর বুক করেছিলাম । এখানে আমাদের মেয়াদ ঠিক একদিন আর ট্রেনের একটা পি এন আর এর জন্য সর্বোচ্চ ৪৮ ঘন্টা পর্যন্ত্য রিটায়ারিং রুম বুক করা যায় । রেলের রিটায়ারিং রুমের ভাড়া হোটেলের তুলনায় অনেক কম আর গুয়াহাটীর মতো এখানেও ঘরগুলো যথেষ্ট বড় এবং অন্যান্য ব্যবস্থাও বেশ ভালো । আমরা ঘরে চেক্‌ইন করে মালপত্র রেখে একটু ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম । পরেরদিন আমাদের জব্বলপুর ঘোরার আছে, তাই গাড়ি বুক করার দরকার ছিল । স্টেশনে থাকার অনেকগুলো সুবিধের মধ্যে একটা হল বাইরে বেরোলেই গাড়ির স্ট্যান্ড । একটা এ সি (এখানে নন এ সি গাড়ি পাওয়া যায় না) ইনোভা গাড়ি ঠিক করা হল যে আমাদের জব্বলপুরের সাইট সিয়িং করাবে । গাড়ির ভাড়া ৩,০০০/- টাকা ।

আমরা স্টেশন চত্বরটা আরেকটু ঘোরাঘুরি করে আবার ঘরে চলে এলাম । রাত সাড়ে ন'টার সময়ে খেতে বেরোলাম । জব্বলপুর স্টেশনের একটা সমস্যা হল এখানে আমিষ খাবারের দোকান খুব কম । আমরা ছিলাম ১ নং প্ল্যাটফর্মে, খুঁজেপেতে ৬ নং প্ল্যাটফর্মে একটা দোকান পাওয়া গেল । সেখানে রুটি চিকেন ডিম মিলিয়ে খাওয়া হল - খরচ হল ৩৩৯/- টাকা ।

রানি দুর্গাবতী ফোর্ট
রবিবার ৮ই অক্টোবর, ২০১৭ আমাদের জব্বলপুর ঘোরার দিন । স্টেশনের একটা দোকান থেকে আলুর পরোটা দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়লাম । আমাদের প্রথম দেখার জায়গা 'রানি দুর্গাবতী ফোর্ট' যার অন্য নাম 'মদনমহল' । এটা স্টেশন থেকে ৭.৫ কিলোমিটার দূরে । এখানে একটা পাহাড়ের ওপরে একটা ছোট দূর্গ রয়েছে । পাহাড়ে ওঠার জন্য বেশ অনেকগুলো সিঁড়ি ভাঙতে হয়, যদিও সেগুলো একটানা না হওয়ায় ব্যাপারটা খুব ক্লান্তিকর নয় । জায়গায় জায়গায় গাছের ছায়া আছে, আমরা মাঝে মাঝেই সেখানে দাঁড়িয়ে নিচ্ছিলাম । তবে পরিশ্রম করে পাহাড়ে ওঠার পরে দেখলাম সেটা করাটা খুবই সার্থক । দূর্গটা খুবই ছোট, কিন্তু বেশ সুন্দর । দূর্গের ভেতরে ঢুকে একেবারে ছাদ পর্যন্ত্য উঠে যাওয়া যায় । ছাদ থেকে জব্বলপুর শহরের অনেকটা দেখা যায় । রোদের তেজ খুব কড়া ছিল না আর একটা হাল্কা হাওয়া সারাক্ষণই বইছিল । ফলে দূর্গের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকতে ভালোই লাগছিল । আমরা আরও কিছুক্ষণ থেকে তারপর নেমে এলাম । বলা বাহুল্য - প্রথমে দূর্গ থেকে আর তারপরে পাহাড় থেকে ।

ব্যালেন্সিং রক
রানি দুর্গাবতী ফোর্টের একেবারে পাশেই যেটা রয়েছে তার নাম 'ব্যালেন্সিং রক্‌' । এটা বেশ অদ্ভুত ধরনের একটা জিনিস । একটা পাথরের ওপর আরেকটা পাথর এমনভাবে ব্যালেন্স করে রয়েছে যে দেখে মনে হয় এক্ষুণি পড়ে যাবে । দুটো পাথর একটা খুব ছোট্ট জায়গায় পরস্পরকে স্পর্শ করে আছে আর বাকিটা পুরোপুরি ব্যালেন্স করা রয়েছে - সেই থেকেই এর নাম ব্যালেন্সিং রক । পাথরদুটো দেখে একটা কথাই মনে হয় "আচ্ছা, যদি ওপরেরটাকে একটা ঠেলা দেওয়া যায়, তাহলে কি হবে ?" উত্তর হল ঠেলার জায়গায় ধাক্কা দিলেও কিছুই হবে না, কারণ ওই পাথরকে হাত দিয়ে ঠেলে সরানো মানুষের কম্ম নয় !

পিষানহরি কি মদিয়া
এরপর আমরা গেলাম 'পিষানহরি কি মদিয়া' । এটা একটা জৈন মন্দির । এখানে একটা পাহাড় আছে আর পাহাড়ের ওপরে বেশ কয়েকটা মন্দির । ওঠার কোনও অসুবিধে নেই, কারণ পুরোটা জুড়েই নিচু নিচু সিঁড়ি করা আছে । তবে সিঁড়ির সংখ্যা নেহাৎ কম নয়, প্রায় তিনশোর কাছাকাছি । তাই যারা ওপরে উঠতে চায় না তাদের জন্য নিচেও একটা মন্দির আছে আর সেটাও বেশ সুন্দর । ওপরের মন্দিরগুলোও বেশ সুন্দর আর পুরো চত্বরটা অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন । আমরা কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে ছবি তুলে ফিরে এগিয়ে গেলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ।

এরপর জব্বলপুরের প্রধান আকর্ষণ - ভেদঘাটে মার্বেল রক্‌ এবং ধুঁয়াধার ফল্‌স্‌ । পুরোটাই নর্মদা নদীর গতিপথ । এখানে একটা কথা বলে রাখি এই দুটো জায়গা মোটামুটি একই জায়গায় হলেও একটা থেকে অন্যটা এতটাও কাছে নয় যে হেঁটে যাওয়া যায় । আর দুটো জায়গাই দেখতে বেশ ভালোই সময় লাগে । তাই ভেদঘাট ভালোভাবে দেখতে গেলে হাতে অন্ততঃ ঘন্টাচারেক সময় নিয়ে যাওয়া দরকার ।

ভেদঘাটে আমাদের গাড়ি প্রথমে আমাদের নিয়ে গেল ধুঁয়াধার ফল্‌স্‌ এর কাছে । এখানে গাড়ির পার্কিং এর জায়গার পাশে অনেক ভাতের হোটেল আছে । একটা সমস্যা হল এই হোটেলগুলোর সবগুলোই নিরামিষ - এই এলাকায় কোনও আমিষ খাবার পাওয়া যায় না । এরকম একটা হোটেল থেকে লাঞ্চ করে নেওয়া হল । আগেও দেখেছি নিরামিষের সর্বোৎকৃষ্ট খাবার হল পনীর, তাই এই পনীরেরই গোটা তিনেক আলাদা আলাদা ডিশ নেওয়া হল । খাবারের মান অবশ্য মোটেই খারাপ নয়, বলতে গেলে ভালোর দিকেই (মানে নিরামিষ যতটা ভালো রান্না করা যায় আর কি !) । সবমিলিয়ে খরচ হল ১,০৩০/- টাকা ।

ধুঁয়াধার ফল্‌স্‌
এরপর আমরা জলপ্রপাতের দিকে রওনা দিলাম । পার্কিং-এর জায়গা থেকে হেঁটে পৌঁছতে মিনিট দশেক লাগে । জব্বলপুরের অন্য জায়গায় সেরকম ট্যুরিস্টের ভীড় না দেখা গেলেও এখানে দেখলাম ভালোই ভীড় রয়েছে । মূল ফল্‌সের কাছে রেলিং এর মতো করা রয়েছে, সেখানে প্রচুর লোক জমা হয়েছে । দুপুর প্রায় তিনটে বাজে আর রোদের তেজও ভালো, তাই আমরা ভীড়ের মধ্যে না গিয়ে রোপওয়ের দিকে রওনা দিলাম । মাথাপিছু ৯৫/- টাকা (তিন বৎসরের উর্ধ্বে পুরা ভাড়া লাগিবে) করে টিকিট কেটে আমরা রোপওয়েতে চড়ে বসলাম । রোপওয়ে আসলে নর্মদা নদীটাকে পার করে দেয় আর ওপর থেকে পুরোটা দেখতেও খুব সুন্দর লাগে । যাওয়া আর ফেরা মিলিয়ে বড়জোর দশমিনিট তবে ওপারে পৌঁছে চাইলে এদিক ওদিক ঘুরেও আসা যায় । আমরা ওপারে পৌঁছে হেঁটে হেঁটে জলের যতটা কাছে যাওয়া সম্ভব গেলাম । ধুঁয়াধার ফল্‌সের নাম ধুঁয়াধার হওয়ার কারণ হল এখানে মূল জলপ্রপাতের জলটা এত জোরে পড়ে যে জায়গাটা ধোঁওয়ার মতো হয়ে যায় । কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি আমরা সেরকম কিছু দেখলাম না । নর্মদার জলের তেজ খুব একটা বেশি নয়, জায়গায় জায়গায় পাথরের মধ্যে দিয়ে জল বয়ে চলেছে । এর প্রধান কারণ হল অপর্য্যাপ্ত বৃষ্টিপাত । এ'বছর মধ্যপ্রদেশে বৃষ্টি খুব কম হয়েছে, তাই নদীতে জলের পরিমাণও কম । আমরা ধুঁয়াবিহীন ধুঁয়াধার ফল্‌স্‌ দেখে আবার রোপওয়ে ধরে ফিরে এলাম ।

পার্কিং-এ পৌঁছে গাড়ি ধরে এবার আমরা গেলাম মার্বেল রক দেখতে । গাড়ি যেখানে নামাবে এখানেও সেখান থেকে হেঁটে কিছুটা নামতে হয় । মার্বেল রক্‌ দেখতে গেলে বোটিং করতেই হবে । তবে বোটিংটা সারা বছর চলে না । বর্ষার শেষে যখন নদীতে জলের পরিমাণ বাড়ে তখনই এটা চালু হয় । আমাদের সৌভাগ্য এ'বছর এটা চালু হয়েছে ১লা অক্টোবর থেকে । আধঘন্টায় মাথাপিছু ৫০/- টাকা করে টিকিট কেটে এখানে বোটিং করা যায় আর একঘন্টার জন্য ১০০/- টাকা । তবে সেক্ষেত্রে অন্য লোকের সঙ্গে বোট শেয়ার করতে হবে । আমরা ৮০০/- টাকা দিয়ে একটা বোট ভাড়া করে তাতে চড়ে বসলাম ।

মার্বেলরকে বোটিং করাকালীন
মার্বেল রক্‌- এ বোটিং-টা এখানকার সবথেকে বড় আকর্ষণ । বিভিন্ন ধরনের বিভিন্ন রঙের অনুচ্চ পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে নর্মদা নদী আর তার ওপর দিয়ে আমরা চলেছি দাঁড় টানা নৌকোয় করে । নৌকোর যিনি হালধারী তিনি আবার গাইডও, যেতে যেতে আমাদের নামারকম তথ্য দিচ্ছিলেন । প্রকৃতির নিয়মে কোনও কোনও পাহাড় বিশেষ বিশেষ আকৃতি নিয়েছে, সেগুলোও আমাদের দেখালেন । বিকেল সাড়ে চারটে বাজে, রোদের তেজ কমে এসেছে - মার্বেল রকে বোটিং-এর জন্য এটা একেবারে আদর্শ সময় । জলটা যে খুব পরিষ্কার তা নয় আর সেটা কোনও প্রাকৃতিক কারণে নয় - এর কারণ পর্যটকদের রুচি । যাইহোক, আমরা প্রায় আধঘন্টা চলার পরে একটা সরু খাঁড়ির মতো জায়গায় পৌঁছলাম । এখানে দুপাশে অনেকটা উঁচু পর্যন্ত্য মার্বেল পাথর উঠে গেছে (আমাদের গাইড জানাল 'মহেঞ্জোদারো' ছবিতে হৃতিক রোশন কর্তৃক বিশালাকার কুমীর হত্যার দৃশ্যটা এখানেই শ্যুটিং হয়েছিল) । এখান থেকে আমাদের নৌকো ফেরার পথ ধরল । যাওয়া এবং ফেরা - পুরোটাই আমাদের খুব ভালো লাগল । সবাইকে অবশ্যই বলব জব্বলপুরে গিয়ে মার্বেল রক্‌ দেখার পরিকল্পনা থাকলে অবশ্যই এরকম সময়ে যাওয়া উচিৎ যখন বোটিং চালু আছে । তা না হলে দেখার বারো আনা মজাই মাটি ! মার্বেল রকের মধ্যে দিয়ে নৌবিহার - এটা নিঃসন্দেহে একটা অসাধারণ অভিজ্ঞতা !

কচনার সিটির শিবের মূর্তি
বিকেল হয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেল, আমরা ফেরার পথ ধরলাম । এবার আমাদের নিয়ে যাওয়া হল 'কচনার সিটি' । জায়গাটা আসলে একটা রিসর্ট গোছের তবে এখানে ট্যুরিস্টদের আকর্ষণ হল এখানকার শিবের মন্দির । মন্দিরের ওপরে একটা বিশালাকার শিবের মূর্তি আছে যার উচ্চতা ৭৬ ফুট । জায়গাটা রাত ন'টা পর্যন্ত্য খোলা থাকে, আর অন্ধকার হয়ে গেলে খুব সুন্দর আলো দিয়ে সাজায় । বিশেষ করে শিবের মূর্তির দিকে কয়েকটা আলো ফোকাস করা আছে যেগুলোর রঙ প্রতিমূহুর্তে বদলায় । ব্যাপারটার মধ্যে বেশ একটা ঘ্যাম আছে । এখানে যেটা বিশেষ উল্লেখযোগ্য সেটা হল শিবের মূর্তির পারিপাট্য । শিবের মুখে একটা স্নিগ্ধভাব আর শরীরটা সেরকমই নিখুঁতভাবে তৈরি । দেখে শিবের প্রতি ভক্তি জাগে কিনা জানিনা, তবে কারিগর বা কারিগরদের প্রতি যে একটা শ্রদ্ধা তৈরি হয় সেটা স্বীকার করতেই হবে ।

কচনার সিটি থেকে জব্বলপুর রেল স্টেশন ৭.৫ কিলোমিটার, আমাদের পৌঁছতে আধঘন্টা মতো লাগল । রাত পৌনে আটটা মতো বাজে । আমরা চা-টা খেয়ে নিয়ে ঘরে এসে জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলাম । আমাদের জব্বলপুর ঘোরা শেষ, আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ভোপাল । রাত সাড়ে ন'টা নাগাদ স্টেশনের সেই একমাত্র আমিষ হোটেল থেকে ডিনার করে নেওয়া হল । মেনু সেই একই রুটি চিকেন আর ডিম । এরপর ঘরে ফিরে ট্রেনের সময় হওয়ার জন্য অপেক্ষা কারণ স্টেশন পর্যন্ত্য পৌঁছনোর ঝক্কিটা আমাদের নেই ।

সারসংক্ষেপঃ

১. হাওড়া থেকে জব্বলপুর যাওয়ার মাত্র দু'টো ট্রেন আছে, তাদের মধ্যে মুম্বই মেল (ভায়া এলাহাবাদ) ই সময়ের দিক থেকে সুবিধেজনক । এই ট্রেনের দেরি করার জন্য খ্যাতি আছে, যদিও আমরা মাত্র একঘন্টা লেটেই জব্বলপুরে পৌঁছেছিলাম ।
২. জব্বলপুরে আমরা যেহেতু রেলের রিটায়ারিং রুমে ছিলাম, তাই কোনও হোটেলের সম্পর্কে বলা সম্ভব হবে না । রিটায়ারিং রুমগুলো বেশ বড় এবং সবরকম সুবিধেসম্পন্ন ।
৩. জব্বলপুর স্টেশন চত্বরের খাবারের দোকান বেশিরভাগই নিরামিষ । ৬ নং প্ল্যাটফর্মে একটা খাবারের হোটেল আছে সেখানে আমিষ পাওয়া যায় ।
৪. জব্বলপুর ঘোরাঘুরির জন্য গাড়ি স্টেশনের বাইরের গাড়ির স্ট্যান্ডেই পাওয়া যায় । সারাদিনের জন্য এ সি গাড়ি ৩,০০০/- টাকা নেয় ।
৫. যেহেতু ঘোরাঘুরির জায়গা কোনওটাই খুব বেশি দূরে নয়, তাই চাইলে এখানে অটোরিক্সা করেও ঘোরাঘুরি করা যেতে পারে । একটা অটোয় সর্ব্বোচ্চ পাঁচজন যেতে পারে ।
৬. জব্বলপুরে ঘোরার জায়গা যা আছে তার জন্য একটা গোটা দিনই যথেষ্ট । ইন্টারনেটে সার্চ করলে এখানে ঘোরার অনেক জায়গা দেখা যায় ঠিকই, কিন্তু তার মধ্যে অনেকগুলোই খুব দারুণ কিছু নয় ।
৭. জব্বলপুরের সবথেকে বিখ্যাত এবং সুন্দর জায়গা হল ভেদঘাটে ধুঁয়াধার ফল্‌স্‌ ও মার্বেল রক্‌ । ভালোভাবে দেখার জন্য হাতে অন্ততঃ ঘন্টাচারেক সময় নিয়ে এখানে যাওয়া উচিৎ ।
৮. ভেদঘাটে মার্বেল রক্‌ দেখতে গেলে বোটিং করা অবশ্য কর্তব্য । বোটিং সারা বছর হয় না, তাই জব্বলপুর যেতে গেলে ভালোভাবে জেনে যাওয়ার দরকার কোন সময়ে বোটিং হয় ।
৯. ধুঁয়াধার ফল্‌স্‌ এখানকার অন্যতম আকর্ষণ । তবে এ'বছর বৃষ্টি কম হওয়ায় আমরা এই জলপ্রপাতের জোর সেভাবে দেখতে পাইনি ।

ভোপাল ভ্রমণঃ

জব্বলপুর থেকে ভোপালের ট্রেন রাত ১১ঃ৫৫ মিনিটে জব্বলপুর ইন্দোর এক্সপ্রেস । আমরা সাড়ে এগারোটা নাগাদ জব্বলপুরের রিটায়ারিং রুম থেকে চেক্‌আউট করে বেরিয়ে পড়লাম । ৬ নং প্ল্যাটফর্মে ট্রেন অনেকক্ষণ আগে থেকেই এসে দাঁড়িয়ে ছিল, আমরা উঠেই শুয়ে পড়লাম । ট্রেন নির্ধারিত সময়ে ছেড়ে এগিয়ে চলল গন্তব্যের দিকে । এখানে জানানো দরকার জব্বলপুর বা ভোপালের তাপমাত্রা কলকাতার মতোই হলেও রাত্রিবেলা যখন ট্রেন ভোপালের দিকে যাচ্ছিল, তখন একটু শীত শীত করছিল ।

পরেরদিন সোমবার ৯ই অক্টোবর, ২০১৭ জব্বলপুর ইন্দোর এক্সপ্রেসের ভোপালে পোঁছনোর কথা সকাল ৫ঃ৫০ মিনিটে । ট্রেন মাত্র মিনিট দশেক দেরিতে আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিল । জব্বলপুরের মতো ভোপালেও আমরা রেলের রিটায়ারিং রুমই বুক করেছিলাম । পার্থক্য হল এখানে আমরা আলাদা ঘর না নিয়ে একটা ডরমেটরি বুক করেছিলাম । ডরমেটরিটাতে সাতজনের বিছানা আছে, কিন্তু আমাদের যাত্রী ছ'জন । সেক্ষেত্রে এই সাতটা বিছানাই যাতে আমাদের থাকে অর্থাৎ এই ডরমেটরিটা যাতে শুধু আমরাই ব্যবহার করতে পারি, সেজন্য আমরা একটা দারুণ ব্যবস্থা করেছিলাম (কিভাবে করেছিলাম তার ডিটেলটা এখানে লিখব না । কারোর দরকার হলে আমাদের থেকে জেনে নিতে পারে) । কিন্তু আমাদের বুকিং সকাল ৮ টা থেকে ছিল আর খোঁজ নিয়ে জানা গেল সকাল ৮ টার আগে ডরমেটরিটা ফাঁকা হবে না । তাই মাঝখানের সময়টা স্টেশনে বসে কাটানো ছাড়া উপায় নেই । এই সময়ে আমরা যেটা করে ফেললাম সেটা হল ঘোরাঘুরির জন্য গাড়ি ঠিক করা । একটা গাড়ি ঠিক করা হল যেটা প্রথমদিন আমাদের নিয়ে যাবে 'সাঁচী' আর পরেরদিন 'ভীমবেঠকা' ও 'ভোজপুর' । এছাড়া ভোপালের অন্যান্য কাছাকাছি ঘোরার জায়গাগুলোও দেখাবে । দু'দিনের জন্য গাড়ি নেবে মোট ৪,৫০০/- টাকা ।

৮ টার সময়ে আমরা ঘরে ঢুকলাম । ডরমেটরিটা সবমিলিয়ে খারাপ নয়, একটা অসুবিধে হল ঘরে ফ্যানের সংখ্যা পর্য্যাপ্ত নয় । এছাড়া আরেকটা বড় অসুবিধে হল দুটো টয়লেটের দুটোই ভারতীয় পদ্ধতির অর্থাৎ ... । যাই হোক, রিটায়ারিং রুমের কোনওকিছু নিয়ে অভিযোগ করার মানে হয় না । একটা ভালো ব্যাপার হল এই প্রথমবার আমাদের দলের সবাই একটা ঘরে থাকার সুযোগ পেলাম ।

দুপুর একটা নাগাদ আমরা ঘর থেকে বেরিয়ে লাঞ্চ করে নিলাম । এখানে IRCTC র রেস্ট্যুরেন্ট আছে, সেখানে আমিষ-নিরামিষ দুইই পাওয়া যায় । আমরা সেখান থেকে এগ থালি, চিকেন থালি ইত্যাদি দিয়ে লাঞ্চ করে নিলাম । খরচ হল ৭০৭/- টাকা ।

কর্কটক্রান্তি রেখা
ভোপালে আমাদের গাড়ি ট্যাভেরা । সেই গাড়ি চড়ে আমরা প্রথমে গেলাম সাঁচিস্তূপ । যাওয়ার পথে একজায়গায় আমাদের গাড়ি থামল, দেখি সেখানে রাস্তার মধ্যে একটা হলুদ দাগ করা রয়েছে । রাস্তার দু'পাশে একটা করে ছোট বসার জায়গা করা রয়েছে আর সেখানেই লেখা রয়েছে ওই দাগের অর্থ । ওই দাগ হল 'কর্কটক্রান্তি রেখা', ইংরিজীতে যাকে বলে Tropic of Cancer । এটা তেমন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কিছু না হলেও মধ্যপ্রদেশ সরকারের এই নতুনত্বপূর্ণ ভাবনার প্রশংসা না করে পারলাম না । কর্কটক্রান্তি রেখা তো ভারতবর্ষের অনেক জায়গার ওপর দিয়েই গেছে, আমাদের পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়েও গেছে । কিন্তু এরকম রাস্তার ওপর দাগ কেটে সেটা উল্লেখ করার উদ্যোগ আর কোথাও দেখিনি বা শুনিনি । কিছু কিছু জিনিস খুব কম বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হয়েও শুধুমাত্র তার অভিনবত্বের জন্য প্রশংসার দাবী রাখে । ভোপাল থেকে সাঁচি যাওয়ার পথে কর্কটক্রান্তি রেখার এই দাগটা এরকমই একটা জিনিস ।

ভোপাল থেকে সাঁচির দূরত্ব প্রায় ৫০ কিলোমিটার, তবে রাস্তা খুব ভালো হওয়ায় যেতে একঘন্টা পনেরো মিনিটের মতো লাগে । সাঁচি-র টিকিট মাথাপিছু ৩০/- টাকা আর গাড়ির পার্কিং ২০/- টাকা । আমরা সাঁচিতে পোঁছনোমাত্রই হঠাৎ প্রচন্ড বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল । বৃষ্টি চলল প্রায় আধঘন্টা ধরে আর এই সময়টা আমাদের একটা ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে কাটাতে হল । বৃষ্টি থামলে আমরা এগিয়ে গেলাম স্তূপের দিকে ।

সাঁচিস্তূপ
সাঁচিস্তূপ আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ্‌ ইন্ডিয়া রক্ষণাবেক্ষণ করে । এটা আসলে একটা বৌদ্ধস্তূপ । খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে গৌতম বুদ্ধের স্মরণে সম্রাট অশোক এর নির্মাণ শুরু করেন । নিকটবর্তী বিদিশা-র বণিকের মেয়ে 'দেবী'-র সঙ্গে অশোকের বিয়ে এই সাঁচিস্তূপেই হয় । সাঁচি 'দেবী'-র জন্মস্থান হিসেবেও পরিচিত । সম্রাট অশোকের সময়ে এর নির্মাণ হলেও পরবর্তীকালে বিভিন্ন রাজাদের রাজত্বকালে এর নির্মাণে নানারকম জিনিস যোগ করা হয় ।

মূলস্তূপের ওপরে সিঁড়ি দিয়ে ওঠা যায় । এখানে স্তূপ ছাড়াও আরও বেশ কিছু নির্মাণ আছে, তার মধ্যে মন্দির, ছাত্রাবাস, অধ্যয়নের জায়গা এগুলোও দেখলাম । একেবারে সমসাময়িক না হলেও সাঁচির সঙ্গে নালন্দার নির্মাণ ও আকৃতিগত কিছু মিল আছে । এখানকার দক্ষিণদিকের গেটের কাছে একটা অশোকস্তম্ভ ছিল যার গোড়াটা এখনও রয়েছে । ওপরের অংশটা সাঁচির আর্কিওলজিক্যাল মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে ।

স্তূপ নং ২
মূলস্তূপের পশ্চিমদিকে একটা সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাওয়া যায়, এখানে একটা জলাশয় রয়েছে যদিও তাতে জল খুবই কম । এখানে আমরা তিনটে ময়ূর দেখতে পেলাম (না, পেখম তোলা অবস্থায় দেখতে পাইনি) । এই জলাশয়ের পাশ দিয়ে কিছুটা হেঁটে গেলে একটা ছাত্রাবাস দেখা যায় । সেখান থেকে পাহাড়ের ধাপে ধাপে নিচে নামা যায় । মিনিট দশেক নামলে দেখা যাবে ২ নং স্তূপ । সাঁচির মূলস্তূপের আদলে এখানে আরও দু'টো স্তূপ আছে, এটা তাদেরই একটা । পার্থক্য হল এগুলোর কোনওটাই মূলস্তূপের মতো বড় নয় আর এর চারদিকে, গেটে বা অন্যান্য জায়গায় কারুকার্যও কম । এখানে কিছুক্ষণ ঘুরে আমরা ওপরে ফিরে এলাম । স্তূপের পূর্বদিকে কিছুটা হেঁটে গেলে এখানে একটা ভিউপয়েন্ট আছে যেখান থেকে অনেকটা দূর পর্যন্ত্য দেখা যায় ।

পিপল্‌স্‌ মল
বিকেল পৌনে ছ'টা বাজে, আমরা এবার ভোপালে ফেরার জন্য গাড়িতে উঠলাম । একবার বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় আবহাওয়াটা বেশ আরামদায়ক লাগছিল । আমাদের গাড়ি আমাদের নিয়ে এল ভোপালের 'পিপল্‌স্‌ মল'-এ । আপাতভাবে মনে হচ্ছিল "মল-এ আবার যাওয়ার কি আছে, কলকাতায় তো মল-এর কোনও অভাব নেই" কিন্তু গিয়ে বুঝলাম পিপল্‌স্‌ মলের বিশেষত্ব কি । আমরা মল বলতে সাধারণতঃ যা বুঝি, এটা তার থেকে অনেকটাই আলাদা । এখানে ঢোকার পথে দুদিকে দুটো বিশাল আকারের জাহাজ রয়েছে । তার পাশ দিয়ে ঢোকার পুরো রাস্তাটাই ছোটদের জন্য নানারকম ছবি আর ছোট ছোট মডেল পুতুল দিয়ে সাজানো । চত্বরটা সুবিশাল, হেঁটে হেঁটে দেখতে দেখতে ঢুকতে সময় লাগে । ভেতরে যেখানে পৌঁছলাম, সেখানে একটা রেষ্ট্যুরেন্ট । সন্ধ্যে প্রায় সাড়ে সাতটা বাজে আর খিদেও পেয়েছিল, তাই রেষ্ট্যুরেন্টের ভেতরে ঢুকলাম । তবে ঢুকেই নিরাশ হতে হল কারণ এটা একটা নিরামিষ রেষ্ট্যুরেন্ট আর এখানে খাবারের দামও বেশ বেশি । আমরা বাইরে বেরিয়ে এসে ফুচকা আর আইসক্রিম খেয়ে গাড়িতে উঠে স্টেশনে ফিরে এলাম ।

রাত্রিবেলা ডিনার করতে যাওয়া হল দশটা নাগাদ । গিয়ে দেখি আমিষ শেষ, নিরামিষ দিয়েই খেতে হল । সবাই খেল না, আমাদের খরচ পড়ল ৩৩৬/- টাকা ।

মঙ্গলবার ১০ই অক্টোবর, ২০১৭ । আমার জীবনের একটা অন্যতম স্মরণীয় দিন । কারণ - এই দিনে আমি 'ভীমবেঠকা' দেখেছি । আর আমার বিশ্বাস যে যখনই ভীমবেঠকায় যাবে, তার তখনই সেই দিনটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে ।

সকালে আমরা ব্রেকফাস্ট করে বেরোলাম তখন দশটা । ভোপাল থেকে ভীমবেঠকার দূরত্ব ৪৬ কিলোমিটার, অর্থাৎ প্রায় সাঁচির মতোই । তবে এটা সাঁচির একেবারে বিপরীত দিকে । রাস্তাটাও ততটা ভালো নয়, তাই আমাদের যেতে ঘন্টাদেড়েকের বেশি লেগে গেল । ভীমবেঠকা জায়গাটা একটা পাহাড়ের ওপরে এবং ওপর পর্যন্ত্য গাড়ি নিয়ে যেতে হয় । এখানকার ঢোকার টিকিট মাথাপিছু ৫০/- টাকা আর গাড়ির ঢোকার জন্য ২৫০/- । টাকাটা একটু বেশি । কিন্তু ভীমবেঠকা দেখার জন্য এই খরচটা অসংগত নয় ।

ভীমবেঠকা দেখার জন্য তিনটে জিনিস থাকার দরকার - ১) ইতিহাসে আগ্রহ, ২) ঘন্টাখানেক চড়াই-উৎরাইতে হাঁটার মত শরীর ও মনের জোর, ৩) অবাক হতে পারার ক্ষমতা । ভীমবেঠকা-কে UNESCO ২০০৩ সালে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করেছে । বর্তমানে আর্কিওলিজিক্যাল সার্ভে অফ্‌ ইন্ডিয়া এখানে নানারকম পরীক্ষানিরীক্ষা করে যদিও জায়গাটা তারা রক্ষণাবেক্ষণ করে না । আমরা প্রথমেই ৪০০/- টাকা দিয়ে একজন গাইড নিলাম । কারণ ভীমবেঠকার মতো জায়গায় গাইড ছাড়া কিছুই দেখে বোঝা যাবে না বা সব জায়গাগুলো নিজেরা খুঁজে পাওয়াও সহজ হবে না ।

ভীমবেঠকায় গুহামানবদের আঁকা ছবি
গাইড আমাদের দেখাতে দেখাতে নিয়ে চলল । ভীমবেঠকার নাম ভীমবেঠকা হওয়ার কারণ হল পুরাণমতে এখানে মহাভারতের ভীম হিড়িম্বার সঙ্গে বসে বসে প্রেম করত বৈঠক করত । এটা পুরাণের কথা, ইতিহাস স্বভাবতই এটাকে স্বীকার করে না । ইতিহাসের দিক থেকে ভীমবেঠকা যে জন্য সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত সেটা হল এখানে আদিম মানুষের আঁকা ছবি পাওয়া গেছে । এবং এইসব ছবিগুলো ইতিহাসের কোনও একসময়ে আঁকা নয় । বিভিন্ন যুগের বিভিন্ন মানুষের আঁকা ছবি । এখানে সবচেয়ে পুরনো যেসব ছবি পাওয়া গেছে সেগুলো আজ থেকে ১৫,০০০ বছরেরও বেশি আগে আঁকা (আমরা জানি বর্তমানে কার্বন টেস্ট করে যেকোনও পুরনো জিনিস বয়সের সত্যতা যাচাই করা যায়) । ছবির বিষয়বস্তু কখনও মানুষের জীবনযাত্রা, কখনও তাদের দেখা যুদ্ধ, কখনও তাদের দেখা বিনোদন আবার কখনও তাদের সমবেত শিকার । এইসব ছবির রঙও আলাদা । ভীমবেঠকার ছবিতে প্রধানতঃ চাররকম রঙের ব্যবহার দেখা যায় - সাদা, লাল, হলুদ আর সবুজ । চুন, ফুলের রস, গাছের পাতার রস, মাটি, পাথরের গুঁড়ো এইগুলোই মূলতঃ রঙের উপাদান । এখানকার বৈশিষ্ট্য এটাই যে এতদিন পরেও এইসব ছবির কোনওটা ম্লান হয়নি বা নষ্ট হয়নি । আর তার একটা বড় কারণ হল এইসব ছবিগুলোর বেশিরভাগই রক্‌শেল্টার বা পাথরের ছায়ায় আঁকা । এগুলো এমন জায়গা যে এখানে দিনেরবেলা আলো সবসময়েই থাকে কিন্তু সূর্য্যের কিরণ সরাসরি কখনওই এসে পড়ে না । সেইসঙ্গে পাথরের ছায়ায় হওয়ার জন্য এখানে কখনও বৃষ্টির জলও পড়ে না । ফলে হাজার হাজার বছর ধরে এই ছবিগুলো একইরকম রয়ে গেছে । এখানে প্রায় ৭৫০ এরকম রক্‌শেল্টার আছে আর তার মধ্যে ৫০০ টাতেই কোনও না কোনও ছবি আঁকা রয়েছে ।

পাথুরে কচ্ছপ
এইসব ছবিগুলো থেকেই এখানে আদিম মানুষের বসবাসের প্রমাণ পাওয়া যায় । একেকটা জায়গা আছে যেখানে পাহাড়ের ছায়ায় অনায়াসে তিরিশ চল্লিশজন লোক বসতে পারে । কিছু কিছু জায়গা অপেক্ষাকৃত নিচু, কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে আদিম মানুষের উচ্চতা বর্তমান যুগের মানুষের থেকে কম ছিল তাই এইসব জায়গায় তারা সহজেই ঢুকে গিয়ে বসে থাকতে পারত । বৃষ্টি, শীত আর হিংস্র জন্তুর হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য ভীমবেঠকার কয়েকটা রক্‌শেল্টারের তুলনা নেই । আমাদের গাইড আমাদের একটা পাথর দেখাল - এটার নাম টরটয়েজ রক্‌ । এটা একটা বেশ বড় সাইজের পাথর এবং এর আকৃতি একটা অতিকায় কচ্ছপের মতো । এছাড়া একটা 'টাইগার জ' রক আছে, যেটা একটা বাঘের মুখের মতো দেখতে ।

অসহায় মানুষের ছবি
গাইড আমাদের কয়েকজনকে একটা বিশেষ জায়গায় নিয়ে গেল । এটা সবাইকে যেতে বারণ করল কারণ পাহাড়ি পথে মিনিটদশেক উৎরাইতে নামতে হবে আর ফেরার পথে সেটা চড়াইতে উঠতেও হবে । ব্যাপারটা কিছুটা পরিশ্রমসাধ্য সেটা অস্বীকার করব না । সেখানে নেমে গিয়ে একটা বিশেষ ছবি দেখাল যেরকম ছবি ভীমবেঠকার আর নেই । লাল রঙ দিয়ে আঁকা একটা ছবি তাতে একটা বন্য শূয়োর একজন মানুষকে মারছে । এই ছবির তাৎপর্য হল এটা যে সময়ে আঁকা, তখন মানুষ ছিল একা এবং তারা কোনও অস্ত্রের ব্যবহার জানত না । বন্য হিংস্র জানোয়ারের সামনে তারা ছিল অসহায় । এর পরবর্তীকালে মানুষ দলবেঁধে অস্ত্র দিয়ে জানোয়ারদের শিকার করেছে, অন্যান্য জায়গায় তার ছবি এঁকেছে । কিন্তু অন্য প্রাণীর হাতে মানুষের সংহারের দৃশ্য ভীমবেঠকায় এই একটাই ।

প্রাকৃতিক কলম
পুরো জায়গাটা একটা মোটামুটি বৃত্তাকার পথে হাঁটতে হয় অর্থাৎ যেখান থেকে শুরু সেখানে ফিরে আসতে হয় । একজায়গায় গাইড আমাদের একটা গাছ দেখালো যেখানে একটা গাছের ডাল থেকে অন্য একটা গাছের জন্ম হয়েছে । বাংলায় যাকে কলম বলে । পার্থক্য হল কলম মানুষের সৃষ্টি আর এখানে ব্যাপারটা প্রকৃতি নিজে থেকে করেছে ।

এরপর আমরা আরও কিছু ছবি দেখে আমাদের আগের জায়গায় ফিরে এলাম ।আমাদের গাইড এখান থেকে বিদায় নিল । আমরা আরও কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে বেরিয়ে এসে গাড়িতে উঠে পড়লাম ।

আমাদের গাড়ি পাহাড় থেকে নেমে ফেরার পথ ধরল । দুপুর পৌনে দুটো বাজে, তাই একটা হোটেলে গিয়ে লাঞ্চ করে নেওয়া হল । আবার ভেজ ! কিন্তু এখানে ত্রিসীমানার মধ্যে আর কোনও দোকান নেই, তাই অভিযোগ করেও কোনও লাভ নেই । আবার সেই পনীর, আলুর দম ইত্যাদি দিয়ে ভাত খাওয়া হল । এখানকার রান্নাও বেশ ভালো । সবমিলিয়ে খরচ হল ১,৩৬০/- টাকা ।

ভোজপুরে 'পুবের সোমনাথ' মন্দির
এবার আমাদের গন্তব্য 'ভোজপুর' (এই জায়গা থেকেই বিখ্যাত ভোজপুরী গান আর ভোজপুরী সিনেমার উৎপত্তি, এরকম ভাবার কোনও কারণ নেই) । এখানে একটা শিবের মন্দির আছে । "শিবের মন্দির বলে আর দেখার কি আছে" এরকম যদি মনে হয় (আমাদেরও যে সেটা একেবারে মনে হয়নি তা নয় !) তাহলে বলব জায়গাটা দেখা অবশ্যই উচিৎ । ভীমবেঠকা থেকে ভোজপুরের দূরত্ব ২৫ কিলোমিটারের মতো আর শেষের বেশ কিছুটা রাস্তা বেশ খারাপ । কিন্তু ভোজপুরে গিয়ে মন্দির দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল । মন্দিরের নির্মাণ ১২ থেকে ১৩ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে শুরু হয়, যদিও এর নির্মাণ কখনও সম্পূর্ণ হয়নি । একটা বিশালাকার মন্দির যার উচ্চতা ৬৬ ফুট আর তার ভেতরে একটা বিশালাকার শিবের মূর্তি শিবলিঙ্গ । শিবলিঙ্গের ওপরটা আবার চৌকো (আমি কখনও এই জিনিসটা চৌকো দেখিনি আর জানি যে বায়োলজিক্যালি এটা ভুল) । যাই হোক, এতবড় শিবলিঙ্গ সাধারণতঃ দেখা যায় না । মন্দিরের মেঝে থেকে এর যা উচ্চতা তাতে পূজারী দেখলাম শিবলিঙ্গের ওপরে চড়ার জন্য মই ব্যবহার করেন । এটাই স্বাভাবিক । ভোজপুরের শিবের নাম ভোজেশ্বর আর একে বলা হয় 'পুবের সোমনাথ' । মন্দিরের গায়ে কিছু কারুকার্য আছে । জায়গাটায় কিছু ট্যুরিস্ট ছিল, তবে ভীড় একেবারেই নেই, তাই আমরা ভালোভাবে সবকিছু দেখতে পেলাম ।

ভোপাল লেক
এবার আমরা ভোপাল ফিরে এলাম । ভোপালে আমাদের দুটো জিনিস দেখার ছিল - বিড়লা মন্দির আর ভোপাল লেক । বিড়লা মন্দির জিনিসটা সারা ভারতবর্ষে একইরকম, কলকাতাতেই দেখেছি । তাই আমরা সোজা ভোপাল লেক চলে গেলাম । পৌঁছনোর আগে মনে হচ্ছিল 'লেক আর দেখার কি আছে', বিশেষ করে আমি নিজেই যেখানে সুভাষ সরোবরের পাশে থাকি ! কিন্তু পৌঁছে লেকটা দেখে চোখ কপালে উঠে গেল । সত্যি বলতে কি, চিল্কা ছাড়া আমি এতবড় লেক কোনওদিন দেখিনি । পরে জেনেছিলাম এর আয়তন ৩১ বর্গকিলোমিটার । একাদশ সালে ভোপালের রাজা ভোজের আমলে এই লেক তৈরি হয় । তাঁর নাম থেকেই এই লেকের নাম 'ভোজতাল' আর শহরের নাম 'ভোজপাল' - পরবর্তীকালে 'ভোপাল' (বাঙালিরা অনেক সময়ে ভোপালকে ভুল করে 'ভূপাল' উচ্চারণ করে । মনে রাখতে হবে, ভোপাল নামের সঙ্গে কিন্তু ভূমির কোনও সম্পর্ক নেই, সম্পর্ক আছে রাজা ভোজের) ।

পুরো লেকটাই সুন্দরভাবে বাঁধানো । লেকে বোটিং-এর ব্যবস্থা আছে, একটা নির্দিষ্ট জায়গা থেকে এই বোটগুলো ছাড়ে । তিনধরনের বোট হয় - প্যাডেল বোট, স্পীডবোট আর মোটরচালিত বড় বোট । আমরা অবশ্য বোটে চড়িনি, লেকের পাড় ধরেই কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করলাম । বিকেল ৬ টা বাজে আর এইসময়ে এখানে ঘুরতে খুব ভালো লাগছিল । জায়গাটা বেশ মনোরম এবং খেয়াল করলাম আমাদের মতো ট্যুরিস্টরা ছাড়া ভোপালের অধিবাসীরাও এখানে ঘুরতে আসে । লেকের মাঝখানে একটা দ্বীপ আছে, নৌকো করে সেখানে যাওয়া যেতে পারে । সন্ধ্যের পর দ্বীপটায় নানারঙের আলো জ্বলে উঠল । লেকের পাড়ে একটা পুরনো কয়লার রেলইঞ্জিন রাখা রয়েছে । লেকের অন্য পাড়টা ছোট টিলার মতো আর সেখানে কিছু বাড়িঘর রয়েছে ।

ভোপালের বিদ্যাসাগর সেতু
লেকের একটা প্রান্তে একটা ব্রীজ রয়েছে যেটা অনেকটা কলকাতার বিদ্যাসাগর সেতুর মতো দেখতে, যদিও আকারে অনেক ছোট । রাতের অন্ধকারে এই ব্রীজের আলোগুলো যখন জ্বলে, তখন জলের ওপরে এর প্রতিবিম্ব দেখতে খুব সুন্দর লাগে । আমরা লেক থেকে ফেরার সময়ে এই ব্রীজের ওপর দিয়েই ফিরলাম ।




স্টেশনে পৌঁছে আমরা আমাদের ঘরে ফিরে এলাম । আমাদের ভোপাল ভ্রমণ শেষ, তাই আমরা ঘরে এসে মালপত্র গুছিয়ে নিলাম । রাতে ডিনার খাওয়া হল একই জায়গায় । খরচ হল ৩৭৫/- টাকা ।

সারসংক্ষেপঃ

১. জব্বলপুর থেকে ভোপাল যাওয়ার অনেক ট্রেন আছে, তবে তার মধ্যে জব্বলপুর ইন্দোর এক্সপ্রেস বেশ ভালো ট্রেন । রাত্রিবেলা ডিনার করে ট্রেনে উঠে পরেরদিন ভোরবেলা ভোপাল পৌঁছে যাওয়া যায় এবং এতে সময় একেবারেই নষ্ট হয়না ।
২. আমরা ভোপালে রিটায়ারিং রুমে ছিলাম, তাই এখানেও কোনও হোটেলের সম্পর্কে বলব না । আমরা ছিলাম একটা ডরমেটরিতে, যেটার ব্যবস্থা খুব ভালো না হলেও চলনসই ।
৩. ভোপাল স্টেশনে খাবারের বেশ কয়েকটা দোকান আছে । আমরা IRCTC-র দোকান থেকে খাওয়া দাওয়া করেছি, যেখানকার রান্না ভালোই আর সেইসঙ্গে আমিষও পাওয়া যায় ।
৪. ভোপালেও ঘোরাঘুরির জন্য স্টেশনের বাইরে গাড়ি পাওয়া যায় । ভোপাল ভালোভাবে ঘুরতে দু'দিন লাগে আর এই দু'দিনের জন্য গাড়ি আমাদের থেকে নিয়েছিল ৪,৫০০/- টাকা ।
৫. ভোপাল থেকে যাওয়ার জন্য বিখ্যাত জায়গা হল সাঁচি আর ভীমবেঠকা । দু'টো একদিনে ঘোরা কঠিন, কারণ ভোপাল থেকে দুটো জায়গা সম্পূর্ণ বিপরীতদিকে ।
৬. যদি এই দু'টো জায়গাই দেখার জন্য হাতে যথেষ্ট সময় না থাকে, তাহলে সেক্ষেত্রে সাঁচি বাদ দিয়ে ভীমবেঠকা দেখা উচিৎ । কারণ সাঁচিস্তূপের যেসব ছবি দেখতে পাওয়া যায়, তার থেকে এর সম্পর্কে ধারণা করা যায়, কিন্তু ভীমবেঠকা নিজের চোখে না দেখলে এর কিছুই বোঝা যায় না ।
৭. সাঁচিস্তূপ ভালোভাবে দেখার জন্য অন্ততঃ দু'ঘন্টা সময় হাতে থাকার দরকার । আর সেইসঙ্গে জায়গাটা সম্পর্কে আগে থেকে একটু জেনে নিতে পারলে আরও ভালো লাগবে ।
৮. ভীমবেঠকায় ভালোভাবে দেখতে হলে ঘন্টাখানেক সময় দরকার আর সেইসঙ্গে দরকার একজন দক্ষ অভিজ্ঞ গাইড । পড়াশোনা করা থাকলেও ভালোভাবে দেখার জন্য ভীমবেঠকায় একজন গাইড নেওয়া অবশ্য কর্তব্য ।
৯. ভীমবেঠকা থেকে ভোপাল ফেরার পথে ভোজপুরের শিবমন্দিরও একটা আকর্ষণীয় দেখার জায়গা । প্রায় হাজার বছরের পুরনো এই বিশালাকার শিবমন্দিরের শিবলিঙ্গটি খুবই চিত্তাকর্ষক ।
১০. ভোপালের বিখ্যাত লেকও একটা অত্যাবশ্যক দেখার জায়গা । ৩১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই লেকে বিকেলের দিকে গেলে এর মনোরম পরিবেশে ঘুরতে খুব ভালো লাগে ।

পাঁচমারি ভ্রমণঃ

পিপারিয়া যাওয়ার পথে
বুধবার ১১ই অক্টোবর, ২০১৭ । আমরা সকাল ৮ টার সময়ে ঘর ছেড়ে দিয়ে প্ল্যাটফর্মে চলে গেলাম । ভোপাল থেকে আমাদের গন্তব্য পাঁচমারি - মধ্যপ্রদেশের একমাত্র হিলস্টেশন । পাঁচমারিতে ট্রেন যায় না, সবচেয়ে কাছের স্টেশন হল পিপারিয়া । ভোপাল থেকে পিপারিয়া যেতে ঘন্টা তিনেক লাগে । আমরা সকাল ৮ঃ৩৫ মিনিটের সোমনাথ জব্বলপুর এক্সপ্রেসে চড়ে পিপারিয়ার জন্য রওনা হলাম । এই ট্রেনজার্ণিটা খুব সুন্দর । ভোপাল থেকে ইতার্শি পর্যন্ত রেলপথটা পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে, কয়েকটা টানেলও আছে । এই রেলপথটা আমাদের মহারাষ্ট্র ভ্রমণের রত্নগিরি যাওয়ার পথের কোঙ্কনকন্যা রেলওয়েকে মনে করিয়ে দেয় । ইতার্শিতে ট্রেনটা মিনিট কুড়ি দাঁড়ায় আর তারপর আবার বিপরীত দিকে চলা শুরু করে । আমাদের ট্রেন আধঘন্টা দেরি করে পিপারিয়া নামালো বেলা ১২ঃ১০ মিনিটে ।

পিপারিয়া স্টেশনে
এখানে জানিয়ে রাখি, জব্বলপুর থেকে ভোপাল যেতে গেলে এই পিপারিয়া-ইতার্শি হয়েই যেতে হয় । আমরা দুদিন আগে যখন জব্বলপুর থেকে ভোপাল গেছি, তখন এই পথ দিয়েই গেছি । পার্থক্য হল সেদিন পথটা গেছি মাঝরাতে । মনে হতে পারে, সেক্ষেত্রে কেন আমরা জব্বলপুর থেকে আগে ভোপাল না গিয়ে পাঁচমারি হয়ে ভোপাল গেলাম না । এর কারণ হল, ভোপাল থেকে হাওড়া ফেরার কোনও সরাসরি ট্রেন নেই, মুম্বই মেল ধরার জন্য আমাদের আবার সেই ইতার্শিতেই আসতে হত । আর সেক্ষেত্রেও সুবিধেমতো কোনও কানেক্টিং ট্রেন ছিল না, তাই আমরা এরকমই ব্যবস্থা করেছিলাম ।

পাঁচমারির সম্পর্কে বলতে গেলে যাঁর কথা উল্লেখ করতেই হবে তিনি হলেন আমাদের হোটেলের মালিক মিঃ রিজওয়ান কুরেশি । আমরা ইন্টারনেট থেকে পাঁচমারির 'হোটেল এঞ্জেল' বুকিং করেছিলাম আর প্রথমদিন থেকেই মিঃ কুরেশির কাছ থেকে আমরা নানারকম সহায়তা পেয়ে এসেছি । আমাদের পুরো পাঁচমারি ভ্রমণে এঁর এবং এঁর পরিবারের কাছে আমরা যেরকম আতিথেয়তা পেয়েছি, আমাদের এতগুলো বেড়ানোর মধ্যে সেরকম আর কোথাও পেয়েছি বলে বিশেষ মনে পড়ে না । #ভালো হোটেল, #ভালো আতিথেয়তা, #ভালো ব্যবহার, #ভালো পরিষেবা, #অসাধারণ খাবার ইত্যাদি নানারকম #ট্যাগ দিয়ে পাঁচমারির হোটেল এঞ্জেলকে বর্ণণা করা যায় ।

পিপারিয়া স্টেশনে নেমেই আমরা ভদ্রলোকের শরণাপন্ন হলাম । পনেরো মিনিটের মধ্যে ৮০০/- টাকায় আমাদের একটা বোলেরোর ব্যবস্থা করে দিলেন যেটা পিপারিয়া থেকে আমাদের পাঁচমারিতে ওনার হোটেলে নামিয়ে দেবে । আমরা স্টেশনের বাইরে এসে গাড়িতে চড়ে এগিয়ে চললাম পাঁচমারির দিকে । পোঁছতে প্রায় ঘন্টা দেড়েক লাগবে, তাই রাস্তায় একজায়গায় লাঞ্চ করে নেওয়া হল । আবার নিরামিষ - খরচ হল ১,২০০/- টাকা ।

আবার এগিয়ে চলা । পাঁচমারির উচ্চতা ৩,৫০০ ফুট । কিছুক্ষণ চলার পরেই আমরা পাহাড়ে উঠতে শুরু করলাম । রাস্তাটা বেশ সুন্দর, দু'পাশে জঙ্গল । আমাদের ড্রাইভারের থেকে জানলাম এই জঙ্গলে বেশি কিছু হিংস্র জানোয়ার আছে । মাসছয়েক আগে এখানে রাস্তায় একটা লোক্যাল মেয়ে জঙ্গলে কাঠ আনতে গিয়ে মারা গেছে বাঘের হাতে । "বা-বা-বাঘ" ! আমরা গাড়িসুদ্ধ লোক একটু চমকে উঠলাম । জানা গেল বাঘ ছাড়াও ভাল্লুক, হরিণ ইত্যাদি এখানে প্রায়ই দেখা যায় । জঙ্গলে জানোয়ার দেখতে গিয়ে জানোয়ার দেখার অভিজ্ঞতা হয়তো খারাপ নয়, কিন্তু একটা বোলেরো চড়ে মালপত্র নিয়ে গন্তব্যে যাওয়ার সময়ে রাস্তায় হঠাৎ হিংস্র জানোয়ারের দেখা পাওয়াটা অন্ততঃ আমার কাছে বাঞ্ছনীয় নয় - সৌভাগ্যের বিষয় এই অবাঞ্ছিত কাজটা আমাকে করতেও হয়নি !

আমাদের ঘরের জানালা থেকে
পাঁচমারি পৌঁছলাম দুপুর সাড়ে তিনটে । আগেই বলেছি আমাদের 'হোটেল এঞ্জেল' বেশ ভালো একটা হোটেল । ঘর বেশ পরিষ্কার, বাথরুমও বেশ বড় । আমাদের দোতলায় একটা আর চারতলায় দুটো ঘর ছিল । জায়গাটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা - আমাদের ঘরের জানালা থেকে অনেকদূর পর্যন্ত্য দেখা যায় । আমরা একটু ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম হেঁটে ঘোরাঘুরি করার জন্য ।

পাঁচমারি জায়গাটা মূলতঃ মিলিটারি এলাকা আর এখানে ঘোরাঘুরির জন্য জিপসি ছাড়া অন্য কোনও গাড়ি চলার নিয়ম নেই । পাঁচমারি ভালো করে ঘুরে দেখতে লাগে দুদিন - এদের মধ্যে একদিন আমরা ফরেস্ট এর এলাকার মধ্যে ঢুকব আর অন্যদিন অন্যান্য দেখার জায়গাগুলো দেখব । যেখানেই ঘুরি, এখানকার ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন থেকে জিপসির ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে ১,৪২৫/- টাকা । এছাড়া ফরেস্ট এলাকায় ঘুরতে হলে আরও ৯৬০/- টাকা লাগে এবং এতে একজন ফরেস্ট গাইড সঙ্গে দেওয়া হয় ।

জটাশঙ্করের পথে
আমাদের হোটেলের কাছাকাছি একটা দেখার জায়গা আছে - জটাশঙ্কর । বিকেলে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা সেদিকে এগিয়ে চললাম । জায়গাটা কাছে হলেও ততটাও কাছে নয় তাই আমাদের পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যে হয়ে গেল । পাহাড়ের ধাপে ধাপে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গিয়ে মন্দিরে পৌঁছতে হয় আর এই পথটাতে কোনও আলো নেই । তাই আমরা আপাতত জটাশঙ্করকে দেখার ইচ্ছে ত্যাগ করে আবার উলটোপথে হাঁটা শুরু করলাম ।

ফেরার পথে একটা দোকান থেকে চা-সিঙাড়া ইত্যাদি খেয়ে নেওয়া হল । সন্ধ্যেবেলা একটা হাল্কা ঠান্ডা ভাব অনুভব করছিলাম । পাঁচমারি হল হিলস্টেশন - এখানে শীতকালে ভালোই ঠান্ডা পড়ে । দুপুরে আমরা যখন এসে পৌঁছেছি, তখনও মনে হয়েছিল ঠান্ডা না লাগলেও গরমের ভাবটা একেবারেই নেই । সাতটা নাগাদ আমরা আবার ঘরে ফিরে এলাম ।

হোটেল এঞ্জেলের একটা সমস্যা হল এখানে খাবারের ব্যবস্থা নেই । মিঃ কুরেশি আমাদের বললেন উনি আমাদের জন্য ডিনারের ব্যবস্থা করে দিতে পারেন তবে সেটা পরেরদিন থেকে হবে । "আজ বাহার যাকে কাম চালা লিজিয়ে" । সেইমতো আমরা আমাদের হোটেল থেকে বেরিয়ে কাছের একটা অন্য হোটেল থেকে ডিনার করে নিলাম । আবার নিরামিষ ! খরচ হল ৬৬০/- টাকা ।

আমাদের জিপসি
বৃহস্পতিবার ১২ই অক্টোবর, ২০১৭ - আমাদের পাঁচমারি ঘোরার প্রথমদিন । সকাল ১০ টা নাগাদ আলুর পরোটা দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে (সৌজন্যে মিঃ কুরেশি) আমরা বেরোলাম । হোটেল থেকেই গাড়ি ঠিক করা ছিল । আমরা বলে রেখেছিলাম মাথাখোলা জিপসির জন্য । আমি কোনওদিন জিপসিতে চড়িনি আর মাথাখোলা গাড়ি হওয়ায় আরও মজা লাগছিল । ড্রাইভার আমাদের প্রথমে নিয়ে গেল ফরেস্ট এন্ট্রি পয়েন্টে । এখানে আমরা ফরেস্টে ঢোকার অনুমতি কিনলাম আর সেইসঙ্গে পেলাম একজন ফরেস্ট গাইড কাম ড্রাইভার । বাকি রাস্তা এই লোকই আমাদের গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাবে ।

বাইসন লজের সামনে
বাইসন লজ ও মিউজিয়ামঃ এই এন্ট্রি পয়েন্টেই দুটো মিউজিয়াম রয়েছে । পাঁচমারি জায়গাটা ব্রিটিশদের তৈরি আর এই এন্ট্রি পয়েন্টে একটা ব্রিটিশ বাংলো রয়েছে । এই বাংলোটাকেই মিউজিয়ামে পরিণত করা হয়েছে । এর মধ্যে একটার নাম বাইসন লজ । কোনও এক সাহেব এখানে একটি বাইসন মেরেছিলেন, তার মাথাটা এখানে স্টাফ করে রাখা আছে । এছাড়া আরও কিছু জন্তু পাখি সরীসৃপ ইত্যাদির মডেল করে রাখা আছে এখানে । আমরা মিউজিয়ামে কিছুক্ষণ থেকে গাড়িতে উঠে পড়লাম ।

পান্ডব গুহা
পান্ডব গুহাঃ বাইসন লজ থেকে গাড়িতে মিনিট দশেক চলার পর আমরা পোঁছলাম পান্ডব গুহায় । এখানে একটা ছোট পাহাড়ের গায়ে পাঁচটা গুহা আছে আর স্থানীয় লোকেদের ধারণা অনুযায়ী মহাভারতের পঞ্চপান্ডবরা বনবাসের সময়ে এখানে কিছুদিন ছিলেন । এই জায়গার নাম থেকেই পাঁচমারি নামের উৎপত্তি - 'পাঁচমারি' অর্থাৎ পাঁচটি গুহা বা পাঁচটি কূটীর । প্রকৃতপক্ষে এই গুহাগুলো প্রথম থেকে দশম শতকের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের তৈরি । পাঁচটা গুহার মধ্যে দুটো গুহা বর্তমানে জনগণের জন্য খোলা আছে, বাকিগুলোর ভেতরে পর্য্যাপ্ত আলো না থাকায় সেগুলোয় ঢুকতে দেওয়া হয় না । গুহাগুলো পাহাড়ের ধাপে ধাপে, সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে দেখতে হয় । পাহাড়ের মাথায়ও চাইলে ওঠা যায় । পুরো এলাকাটা খুব সুন্দরভাবে ছোট ছোট গাছ আর বাগান করা । আমরা এখানে খানিকক্ষণ ঘুরে নেমে এলাম ।

বী-ফল্‌স্‌ - ওপরে
বী-ফল্‌স্‌ঃ পরবর্তী গন্তব্য বী-ফল্‌স্‌ । পান্ডব গুহা থেকে গাড়িতে করে মিনিট পনেরো পাহাড়ী পথে চলার পরে গিয়ে পৌঁছতে হয় বী-ফল্‌স্‌ এ । যাওয়ার রাস্তাটা বেশ ভালো, পাহাড় আর জঙ্গল । আমাদের গাইড বলল এখানকার জঙ্গলের বেশিরভাগ গাছই হল পাইন আর পাইন হল চিরহরিৎ বৃক্ষ । সেই কারণ এখানকার জঙ্গল সারাবছরই সবুজ থাকে । কাঠের চালান করা হল পাঁচমারির প্রধান উপজীবিকা - এখানকার ৭০% মানুষ এই কাজ করেন ।

বী-ফল্‌স্‌ এ যেখানে গাড়ি থামে সেখান থেকে হেঁটে আরও কিছুটা সিঁড়ি দিয়ে নেমে ঝরনার সামনে পৌঁছতে হয় । এখানে ঝরনাটা কিছুটা সমতলের ওপর দিয়ে গেছে, তাই চাইলে এখানে চান করা যায় আবার জলে পা ডুবিয়ে বসেও থাকা যায় । পা-ডুবিয়ে বসে থাকলে কিছুক্ষণের মধ্যেই কিছু ছোট ছোট মাছ এসে পায়ে লেগে থাকে আর পায়ের ময়লা খেয়ে পরিষ্কার করে দেয় । ন্যাচারাল পেডিকিওর । ঝরনাটা এখানে সমতলের ওপর থেকে অনেকটা নিচে চলে গেছে । নিচে যেখানে ঝরনার জলটা পড়ছে সেখানে জলের ফোঁটা এত জোরে পড়ে যে গায়ে পড়লে মনে হয় মৌমাছি কামড়াচ্ছে । সেই থেকেই এই ঝরনার নাম বী-ফল্‌স্‌ । ওপর থেকে নিচে নামার জন্য সিঁড়ি আছে । কিন্তু জায়গাটা বেশ অনেকটা নিচে, তাই ফেরার সময়ে ওঠার ব্যাপারটা সহজ হবে না । আমাদের গাইড বলল যাদের দম আছে তারাই যেন যাই ।

বী-ফল্‌স্‌ - নিচে
দলের মধ্যে আমরা তিনজন নিচে নামলাম । সিঁড়ির সংখ্যা দুশোর মতো, নিচে নামতে বেশ কিছুটা সময় লাগে । নিচের দৃশ্য আরও সুন্দর । বেশ অনেকটা ওপর থেকে জলটা নিচের পাথরের ওপর পড়ছে, এখানে অনেকেই দাঁড়িয়ে চান করছে । আমরা পাথরের ওপর পা দিয়ে জলের একেবারে সামনে গেলাম । জলটা ঠান্ডা, তবে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে বেশ ভালো লাগে ।

ওপরে ওঠার কাজটা সত্যিই কঠিন । পাহাড়ী পথে এতগুলো সিঁড়ি বেয়ে ওঠা সহজ নয়, মাঝে মাঝেই দাঁড়িয়ে দম নিতে হচ্ছিল । একজায়গায় লেবুর জল বিক্রি হচ্ছে, দাম ২০/- টাকা । আমরা ১-২ গ্লাস করে খেয়ে শরীরে বল সংগ্রহ করে নিলাম । ওপরে এসে কিছুক্ষণ দম নিয়ে আরও ওপরে উঠে এলাম অর্থাৎ যেখানে আমাদের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে । দুপুর দুটো বাজে, তাই আমাদের ড্রাইভার আমাদের নিয়ে গেল খাবার জায়গায় । সৌভাগ্যক্রমে এখানে আমিষ খাবার পাওয়া যায় । আমরা ভাত, ডাল, আলুভাজা, চিকেন খেয়ে নিলাম । খরচ হল ১,৩৭০/- টাকা ।

এরপর আমাদের যাওয়ার পথে পড়ল প্যারাসেইলিং পয়েন্ট । জিনিসটা নতুন কিছু নয় আর পাঁচমারির স্পেশালিটি তো নয়ই । তাই আমরা এখানে কোনও সময় নষ্ট না করে এগিয়ে গেলাম ।

রিচ্‌ গড়
রিচ্‌ গড় ও একো পয়েন্টঃ এর পরে আমরা গেলাম রিচ্‌ গড় । এখানে গাড়ি থেকে নেমে কিছুটা চরাই-উৎরাই পেরিয়ে যেতে হয় । এখানকার বৈশিষ্ট্য হল এখানে দুটো পাশাপাশি পাহাড় পরস্পরকে ঠেসান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যদিও আপাতদৃষ্টিতে দেখলে মনে হয় পাথরের গায়ে ফাটল ধরেছে । একটা পাহাড়ের মধ্যে একটা গুহা আছে যেটার নাম ভালুক গুহা । আগে এখানে একটা ভাল্লুক থাকত, যদিও সে বর্তমানে গুহা ছেড়ে জঙ্গলে চলে গেছে । গুহার ভেতরটা অন্ধকার তবে এর বৈশিষ্ট্য হল একদিন দিয়ে ঢুকে অন্যদিক দিয়ে বেরোনো যায় । গুহার অন্যদিকটা যেখানে বেরোয় সেখানে রয়েছে একো পয়েন্ট । এখানে পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনি শোনা যায় । আমরা নিজেরা ব্যাপারটা পরখ করে দেখলাম (মানে জোরে চিৎকার করলাম আর আমাদের চিৎকারের প্রতিধ্বনি স্পষ্টভাবে শুনলাম) । বেশ মজার অনুভূতি সন্দেহ নেই ।

ধুপ গড় যাওয়ার পথে
ধুপ গড়ঃ গাড়ি পাহাড়ি পথে আরও এগিয়ে চলল । কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারলাম আমরা একটা উঁচু পাহাড়ের ওপরে উঠছি । রাস্তাটা যথেষ্ট খাড়াই আর এতক্ষণে বুঝতে পারলাম কেন এখানে জিপসি ব্যবহার করা হয় । ফোর হুইল ইঞ্জিন ছাড়া অন্য কোনও গাড়ির পক্ষে সাতজন লোক নিয়ে এই রাস্তা দিয়ে ওঠা সম্ভব নয় । যে পাহাড়টায় উঠছি দেখে মনে হচ্ছিল সেটাই এই এলাকার সবচেয়ে উঁচু পাহাড় । দৃশ্য খুব সুন্দর । বিকেল সাড়ে চারটে বাজে, সূর্য্য অস্ত যাওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে । গাড়িকে বলে একজায়গায় আমরা কয়েক মিনিটের জন্য থামলাম । এখানে থেকে পাহাড়শ্রেণীর একটা দূর্দান্ত দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল । দিগন্তবিস্তৃত সারি সারি পাহাড় আর তার ওপরে সূর্য্য । সূর্য্যাস্তের সময় পৌনে ছটা থেকে ছটা, কিন্তু এই সময়ের সূর্য্যও দেখতে খুব ভালো লাগে ।

সাতপুরা পর্ব্বতশ্রেণী - সানরাইজ পয়েন্ট থেকে
আমরা আরও এগিয়ে গেলাম । ধুপগড় হল পাঁচমারির সবচেয়ে উঁচু জায়গা । গন্তব্যে পৌঁছে আমাদের গাইড বলে দিল এই পাহাড়ের ওপরে দুদিকে দুটো জায়গা আছে - সানরাইজ পয়েন্ট আর সানসেট পয়েন্ট । বিকেল পাঁচটার সময়ে সানরাইজ দেখতে একমাত্র রজনীকান্তই পারে, তাই আমরা শুধু জায়গাটা দেখতে গেলাম । সমতলে হেঁটে মিনিট পাঁচেক রাস্তা আর তার পরে একজায়গা থেকে জায়গাটা দেখা যায় । এখানকার দৃশ্য অসাধারণ ! সাতপুরা পর্বতশ্রেণীর একটা সুবিশাল অংশ এখান থেকে দেখা যায় । আগেই বলেছি, আমাদের পাহাড়টা এই অঞ্চলের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় । সানরাইজ পয়েন্ট থেকে যতটা দেখা যায় দিগন্তবিস্তৃত পাহাড়ের শ্রেণী ।

সাতপুরা পর্ব্বতশ্রেণী - সানসেট পয়েন্ট থেকে
এবার পাহাড়ের বিপরীত দিকটায় গেলাম । এটা সানসেট পয়েন্ট । আকাশে মেঘ থাকায় সূর্য্যাস্ত দেখা যাবে না বুঝতে পারলাম । সূর্য্যাস্ত দেখা না গেলেও জায়গাটা খুব সুন্দর, এদিক থেকেও সাতপুরা পাহাড় শ্রেণীর অন্য একটা দিক দেখতে পাওয়া যায় । সূর্য্যাস্ত দেখা না গেলেও আমরা সূর্য্যাস্তের সময় পর্যন্ত্য অপেক্ষা করলাম আর তার মধ্যে মামা আমাদের একঝলক দেখাও দিল ।


ব্রিটিশ বাংলো
সানরাইজ আর সানসেট পয়েন্টের মাঝামাঝি পাহাড়ের ওপরে একটা বাংলো আছে - ব্রিটিশদের তৈরি । একশ বছরেরও বেশি পুরনো এই বাংলো তৈরি করার সময়ে নাকি খরচ হয়েছিল ৫,০০০/- টাকা ! আর কয়েকবছর আগে এখানে কিছু মেরামতির কাজ করা হয় সংরক্ষণের জন্য । তার জন্য খরচ হয়েছে সাত লক্ষেরও বেশি । বাংলোটা বর্তমানে একটা সংগ্রহশালা, যদিও কিসের সংগ্রহ সেটা আর শেষপর্যন্ত্য দেখা হয়ে ওঠেনি !

এবার ফেরার পথ ধরলাম । আমরা ছিলাম ৪,৫০০ ফুটের ওপরে । পাহাড়ী অঞ্চলে সূর্য্যাস্তের পর ঝপ করে ঠান্ডা পড়ে যায় । সেজন্য আমাদের সঙ্গে কিছু গরম জামাকাপড় ছিল । আমাদের গাড়ি যখন আমাদের হোটেলের সামনে নামাল সন্ধ্যে প্রায় সাতটা ।

রাতে হোটেল থেকেই আমাদের ডিনারের ব্যবস্থা করে দিল । আগেই বলেছি, হোটেল এঞ্জেলে কোনও খাবার ব্যবস্থা নেই, এটা এঁরা শুধু স্পেশাল রিকোয়েস্টে করেন । আমরা নিয়েছিলাম রুটি আর চিকেন কারি । একেবারেই ঘরোয়া রান্না - খেতেও ভালো আর খেয়ে শরীর খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা নেই । আমাদের খরচ হল ৬৬০/- টাকা ।

হোটেলের ঘর থেকে সূর্য্যোদয়
পরেরদিন শুক্রবার ১৩ই অক্টোবর, ২০১৭ - পাঁচমারিতে আমাদের ঘোরার দ্বিতীয় তথা শেষ দিন । সকালে উঠে পাহাড়ের ওপর সূর্য্যোদয় দেখলাম । এটা দেখার জন্য কোথাও যেতে হয়না - হোটেলে আমাদের ঘর থেকেই দেখা যায় । অসাধারণ দৃশ্য ! সূর্য্যোদয় জিনিসটা প্রত্যেকদিন একরকম হলেও স্থান-কাল ভেদে এর সৌন্দর্য্য একেকরকম হয় । পাঁচমারির পাহাড়ের ওপর থেকে এই সূর্য্যোদয়ের দৃশ্যও সেরকমই অনন্য ।

সকালের ব্রেকফাস্টে আবার আলুর পরোটা । এটা বলতেই হবে এঁরা আলুর পরোটাও খুব ভালো তৈরি করে । আগেরদিন মাত্র একটা করে খেয়ে আমাদের পেট বা মন কোনওটাই ভরেনি, তাই আজ দুটো করে খাওয়া হল । ব্রেকফাস্ট করে আমরা বেরোলাম সেই একই জিপসিতে । আজকের গন্তব্য পাঁচমারির অন্যান্য সাইটসিয়িং - নন ফরেস্ট এলাকা ।

হান্ডি খো
হান্ডি খোঃ হোটেল থেকে বেরিয়ে মিনিট পনেরো চলার পরে পৌঁছলাম আমাদের প্রথম দেখার জায়গা হান্ডি খো-তে । এখানে একটা ভিউ পয়েন্ট থেকে দুটো পাহাড়ের মাঝের অংশটা দেখা যায় । জায়গাটা একেবারেই একটা খাদের ধারে, যদিও ভালোভাবে রেলিং লাগানো আছে । আমাদের ড্রাইভার জানালো এটা সুইসাইডাল পয়েন্ট । "আপকো সির্ফ দেখনা হ্যায়, করনা নেহি হ্যায়" । আমরা এখানে কিছু ছবিটবি তুলে গাড়িতে চড়ে বসলাম ।

প্রিয়দর্শিনী ভিউ পয়েন্ট থেকে
প্রিয়দর্শিনীঃ হান্ডি খো থেকে গাড়িতে মিনিট পাঁচেক চলার পরে দ্বিতীয় দ্রষ্টব্য - প্রিয়দর্শিনী । এখানে গাড়ি থেকে নেমে মিনিট দশেক অল্প চড়াই-উৎরাই হাঁটার পর যেখানে পৌঁছলাম সেটাও আসলে একটা ভিউ পয়েন্ট । এখান থেকে সবুজ পাহাড়ের অনেকটা দেখতে পাওয়া যায় আর সেইসঙ্গে সামনের অনেক উঁচু পাহাড়ের ওপর একটা মন্দির দেখা যায় । এখানে আমরা কিছুক্ষণ ঘুরে ফিরে এলাম ।

মহাদেও ও গুপ্ত মহাদেওঃ প্রিয়দর্শিনী থেকে মিনিট কুড়ি গাড়িতে চলার পরে পৌঁছলাম মহাদেও ও গুপ্ত মহাদেওতে । এখানে প্রথমেই যেটার কথা বলতে হবে সেটা হল বাঁদরের উৎপাত । আমাদের গাড়ি এখানে থামতে না থামতেই তাদের বাঁদরামি শুরু হয়ে গেল । আর এই বাঁদরামির মাত্রা এতটাই বেশি যে এরা একেবারে আমাদের গাড়ির ওপর চড়ে বসল । আমাদের ড্রাইভার আমাদের কয়েকটা লাঠি দিয়ে বলল এগুলো হাতে রাখতে । বলা বাহুল্য, এগুলো বাঁদরদের ভয় দেখানোর জন্য । আমরা প্রথমে গুপ্ত মহাদেও দেখতে গেলাম । গাড়ির স্ট্যান্ড থেকে হেঁটে মিনিট পাঁচেক লাগে । এই পুরো পথটাতেই বাঁদর ঘোরাঘুরি করে, তবে আমাদের সঙ্গে একাধিক লাঠি থাকায় খুব কাছে ঘেঁষছিল না । যদিও আমাদের সঙ্গে কোনও খাবার ছিল না, কিন্তু বাঁদরকে ঠিক বিশ্বাস করা যায় না । এটা ভুলে গেলে চলবে না আমাদের পূর্বপুরুষদের বুদ্ধি আমাদের সমান আর ক্ষিপ্রতা আমাদের থেকে বেশি । এর আগে চাঁদিপুর ভ্রমণ-এর সময়ে আমাদের একটা ভয়মিশ্রিত বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তাই আবারও বলছি - বাঁদর হইতে সাবধান !

গুপ্ত মহাদেও ঢোকার পথে
গুপ্ত মহাদেও-তে পৌঁছে দেখলাম সেটা একটা পাহাড়ের গুহার ভেতরে । ভেতরে আলোর ব্যবস্থা করা থাকলেও আমাদের খুব একটা ঢোকার আগ্রহ জন্মালো না, বিশেষ করে যখন দেখলাম ঢুকতে গেলে একটা জনা কুড়ি লোকের লাইনের পিছনে দাঁড়াতে হবে । আমরা এখান থেকে বাঁদরের গুষ্টি পেরিয়ে আবার গাড়ির স্ট্যান্ডে ফিরে এলাম ।



মহাদেও মন্দিরের সামনে
গাড়ির স্ট্যান্ড থেকে উল্টোপথে মিনিট পাঁচেক হাঁটলে মহাদেও । এটাও একটা পাহাড়ের গুহার মধ্যে, তবে গুহার মুখটা বেশ বড় । গুহার ভেতরে একেবারে শেষপ্রান্তে শিবলিঙ্গ । এখানে ছবি তোলা বারণ । ভেতরে শিবের কাছে পৌঁছতে গেলে একটা জলের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে হয় । জায়গাটা একটু স্যাঁতসেঁতে, তবে খুব সুন্দর ।



এরপর লাঞ্চব্রেক । কিন্তু সেখানে যাওয়ার সময়ে হঠাৎ প্রচন্ড বৃষ্টি এসে গেল । জিপসির সবদিকই খোলা, তবে সাধারণতঃ ঢাকা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে । কিন্তু আমাদের গাড়িতে দেখা গেল শুধু মাথা ঢাকা দেওয়ারই ব্যবস্থা আছে, সাইডগুলো খোলাই রয়ে গেল । ফলে আমরা যারা ধারে বসেছিলাম, তারা কিছুটা ভিজে গেলাম । ড্রাইভারকে ভর্তসনা বা তিরষ্কার করলে ভেজা জামা শুকোবে না, তাই সেটা আর করলাম না ।

ড্রাইভার বেশ একটা ঘ্যাম রেষ্ট্যুরেন্টে নিয়ে গেল । ভেতরটা বেশ ভালো কিন্তু ... সেই নিরামিষ ! আমরা এটা-ওটা-সেটা (সেই একই জিনিস, তাই আর বিস্তারিত লিখলাম না) দিয়ে পেট ভরালাম । খরচ হল ১,৪৯০/- টাকা ।

লাঞ্চের পরেও আমরা কিছুক্ষণ আটকে গেলাম কারণ বৃষ্টি । থামার পর গেলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যে ।

রাজেন্দ্রগিরি
রাজেন্দ্রগিরিঃ ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদের নামে এই পাহাড়ের নাম । উনি মাঝে মাঝেই পাঁচমারিতে আসতেন বলে এই পাহাড়ের এই নামকরণ করা হয়েছে । জায়গাটায় একটা বাগান আছে এবং সেটা যথেষ্ট ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় । জায়গাটা একটা সানসেট পয়েন্ট, তবে আকাশে মেঘ থাকায় সানসেট দেখার কোনও সুযোগ নেই । তাই আমরা এখানে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে চলে এলাম ।

পাঁচমারি লেক
পাঁচমারি লেকঃ রাজেন্দ্রগিরি থেকে মিনিট দশেক গাড়িতে চলার পর পৌঁছলাম পাঁচমারি লেকে । লেকটা বিশাল কিছু বড় নয়, তবে এখানে বোটিং-এর ব্যবস্থা আছে । আমরা বোটিং করার কথা ভাবছিলাম কিন্তু আবার বৃষ্টি শুরু হয়ে যাওয়ায় সেই পরিকল্পনা বাতিল করতে হল । এখানে একটা মাথায় ছাউনি দেওয়া জায়গা আছে, সেখানে দাঁড়িয়ে লেকের ওপর বৃষ্টি দেখতে বেশ ভালো লাগছিল । এখানে বোটিং ছাড়াও জিপ লাইন রয়েছে । জিপ লাইনটা লেকের ওপর দিয়ে একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত পর্যন্ত্য রয়েছে । এটা করার জন্য ৫০০/- টাকা করে লাগে ।

বৃষ্টি একটু কমলে আমরা আবার গাড়িতে করে বেরিয়ে পড়লাম । গাড়ি নিয়ে চলল আমাদের পাঁচমারি তথা মধ্যেপ্রদেশ ভ্রমণের শেষ গন্তব্যে ।

জটাশঙ্করের শেষের নামার পথ
জটাশঙ্করঃ প্রথমদিন বিকেলে আরেকটু আগে পোঁছতে পারলে যেটা হত আমাদের পাঁচমারি ভ্রমণের প্রথম দ্রষ্টব্য, ঘটনাচক্রে সেটাই হয়ে গেল শেষ দ্রষ্টব্য । আমরা জটাশঙ্কর পৌঁছলাম বিকেল সোয়া চারটে নাগাদ । পাহাড়ের মধ্যে সিঁড়ি দিয়ে অনেকটা নেমে গিয়ে মূলমন্দিরে পৌঁছতে হয় । যাওয়ার পথে দুপাশে অনেক দোকান আছে, যেটা যেকোনও তীর্থস্থানেই থাকে । পাহাড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামাটা অবশ্য বেশ খানিকটা, যদিও মনে ভক্তির বাড়াবাড়ি থাকলে এটা অতিক্রম করা যে কোনও কঠিন কাজ নয় সেটা আমরা পঁচাত্তরোর্ধ দুজন ভদ্রলোককে দেখে বুঝলাম । একেবারে শেষের পথটুকুতে সিঁড়িটা বেশ খাড়া আর সরু, যদিও দুপাশে রেলিং করা আছে । নিচে নেমে জটাশঙ্করকে দর্শন করে আমরা আবার ফিরে এলাম । আমাদের গাড়ি আমাদের হোটেলে পৌঁছে দিল ।



আমাদের ভ্রমণপর্ব এখানেই শেষ, আমরা সন্ধ্যেবেলা বেরোলাম কিছু কেনাকাটা করতে । রাতে হোটেলে ফিরে এসে খাওয়া হল রুটি আর মাটন কারি । খরচ হল ৬০০/- টাকা (হ্যাঁ, এখানে চিকেন কারির থেকে মাটন কারি সস্তা !) ।

পরেরদিন ১৪ই অক্টোবর, ২০১৭ শনিবার । সকালে উঠে বেরোনোর তোড়জোড় শুরু হল । আমাদের ফেরার ট্রেন পিপারিয়া থেকে মুম্বই হাওড়া মেল সকাল ১০ঃ৩৩ মিনিটে । পাঁচমারি থেকে আমাদের বেরোতে বেরোতে সকাল নটা বেজে গেল । ট্রেন নির্ধারিত সময়ে এলে আমাদের পক্ষে একটু চাপের হত, কারণ পাঁচমারি থেকে পিপারিয়া আসতে প্রায় দেড় ঘন্টা সময় লাগে । তবে রাস্তাতেই জানতে পারলাম ট্রেন আধঘন্টা দেরি আছে (সৌজন্যে https://etrain.info/in), তাই কোনও উদ্বেগের কারণ রইল না । স্টেশনে পৌঁছে দেওয়ার জন্য গাড়ি নিল ৮০০/- টাকা ।

স্টেশনে এসে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে শুরু করলাম । ট্রেন এল দুপুর ১২ঃ১৫ নাগাদ, অর্থাৎ পৌনে দুঘন্টা লেট । এবং সারাক্ষণ ট্রেনের লেট মেকআপ করার কোনও লক্ষণ তো দেখা গেলই না, উল্টে সে আরও দেরি করল । আমরা দুপুরে চিকেন, ডিম, ভাত নিলাম - খরচ হল ৪৪০/- টাকা আর রাতে প্রায় একই মেনুতে খরচ হল ৪৩০/- টাকা । আমাদের ফেরার টিকিট ছিল এ সি থ্রী টিয়ারে, তাই ফেরার জার্ণিটা কিছুটা আরামদায়ক হল ।

রবিবার ১৫ই অক্টোবর আমাদের ট্রেনের হাওড়ায় ঢোকার নির্ধারিত সময় সকাল ১১ঃ৪৫ আর ট্রেন পৌঁছল বিকেল ৫ টা - অর্থাৎ সোয়া পাঁচঘন্টা লেট । হাওড়া স্টেশন থেকে বাড়ি এলাম আর সেইসঙ্গে শেষ হল আমাদের নয়দিন ব্যাপী দীর্ঘ ভ্রমণ !

সারসংক্ষেপঃ

১. মধ্যপ্রদেশের একমাত্র হিল স্টেশন হল পাঁচমারি । সাতপুরা পর্বতশ্রেণীর মধ্যে ৩,৫০০ ফুট উঁচুতে একটা সুন্দর মনোরম জায়গায় এটা অবস্থিত ।
২. পাঁচমারিতে কোনও ট্রেন যায় না, এর নিকটবর্তী রেলস্টেশন পিপারিয়া থেকে গাড়িতে করে পাঁচমারি যেতে হয় । ভোপাল থেকে পিপারিয়া যাওয়ার অনেক ট্রেন আছে, এর মধ্যে সোমনাথ জব্বলপুর এক্সপ্রেসে গেলে বেলা বারোটার মধ্যে পিপারিয়া পৌঁছনো যায় ।
৩. পিপারিয়া থেকে পাঁচমারি গাড়িতে যেতে লাগে ঘন্টা দেড়েকের মতো । এই পথের প্রাকৃতিক দৃশ্য অত্যন্ত সুন্দর ।
৪. পাঁচমারিতে থাকার একাধিক ভালো হোটেল নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু আমি সবাইকে অনুরোধ করব 'হোটেল এঞ্জেল' এ থাকার জন্য । ন্যায্য ভাড়া, সহায়তাপূর্ণ ম্যানেজার ও মালিক, সহযোগিতাপূর্ণ হোটেল কর্মচারী, অসাধারণ খাবার - এইসব নিয়ে এত ভালো হোটেল চট করে পাওয়া যায় না । হোটেলের যোগাযোগের নম্বর হল - 07578-252092 / 09425433745 / 08989982949 । এছাড়া নিচের লিঙ্ক থেকেও বুকিং করা যায় ।
https://www.goibibo.com/hotels/angel-hotel-in-pachmarhi-2346603597471443245/
http://www.holidayiq.com/Hotel-Angel-Pachmarhi-hotel-632078.html
https://www.makemytrip.com/hotels/hotel_angel-details-pachmarhi.html
৫. অক্টোবর মাসে পাঁচমারিতে সন্ধ্যের পর মোটামুটি ঠান্ডা পড়ে, তাই হাল্কা কিছু শীতের পোষাক সঙ্গে রাখা ভাল ।
৬. পাঁচমারিতে লোক্যাল সাইট সিইং-এর জন্য দুটো পুরো দিন হাতে রাখতে হবে । এছাড়া যদি জঙ্গল সাফারি করার ইচ্ছে থাকে তাহলে আরেকটা দিনও দরকার হবে ।
৭. পাঁচমারিতে ঘোরাঘুরির জন্য শুধুমাত্র জিপসি গাড়ি চলে । এখানে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় জিপসির জন্য টাকা জমা দিতে হয় ।
৮. ঘোরাঘুরির জায়গাকে দুভাগে ভাগ করা যায় - ফরেস্ট এরিয়া আর নন-ফরেস্ট এরিয়া । ফরেস্ট এরিয়ায় ঢুকতে গেলে একটা পার্মিশন করাতে হয় আর সেইসঙ্গে একজন ফরেস্ট গাইড সঙ্গে থাকে ।
৯. ফরেস্ট এরিয়ায় বী-ফলস্‌ আর রিচ গড় অবশ্য দ্রষ্টব্য । বাকি জায়গাগুলোও ভালো তবে এই দুটো কোনওমতেই বাদ দেওয়া চলবে না ।

উপসংহারঃ

শুধুমাত্র আটদিনের পরিসরে একটা রাজ্যের পুরোটা দেখা যায় না, বিশেষ করে সে'রাজ্য যদি হয় মধ্যপ্রদেশ । কিন্তু তাই এই অল্প সময়ের মধ্যে আমরা যা যা দেখেছি, যতটা দেখেছি তা আমাদের কাছে পরম প্রাপ্তির বিষয় । মধ্যপ্রদেশের যে'কটা জায়গা আমরা ঘুরেছি, তার মধ্যে যেটা সবচেয়ে বেশি আমাদের নজর কেড়েছে তা হল এখানকার মানুষের অতিথিবৎসলতা । রাজ্যটা বেশ অনেকটাই ট্যুরিজমের উপর নির্ভরশীল, কিন্তু সেরকম হলেই যে মানুষ সবসময়ে অতিথিবৎসল হয়, তা নয় । আরেকটা জিনিস আমাদের ভালো লেগেছে, সেটা হল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা । মধ্যপ্রদেশের যে'কটা জায়গা আমরা দেখেছি, সেগুলো প্রত্যেকটাই অত্যন্ত সুন্দর - প্রত্যেকটা জায়গাতেই গিয়ে মনটা ভরে যায় । একটা ব্যাপার আমরা আগেই লক্ষ্য করেছিলাম, সেটা হল আমাদের চারপাশে চেনাশোনা লোকজনদের মধ্যে মধ্যপ্রদেশ ঘুরেছে, এরকম লোক কমই আছে । তাই আমাদের অভিজ্ঞতা একদিক থেকে দেখতে গেলে খুবই মৌলিক । তাই যদি একটা সপ্তাহের পাঁচদিন ছুটি পাওয়া যায়, তাহলে দূটো উইকএন্ড যোগ করে ন'দিন ঘোরার জন্য মধ্যপ্রদেশ একটা ভীষণ ভালো ঘোরার জায়গা । ঘোরার খরচ ভারতবর্ষের অন্য অনেক জায়গার থেকে কম, ঘুরে ভালো লাগার কোসেন্ট (যদি সেটা আদৌ পরিমাপযোগ্য হয় !) অনেক জায়গার থেকে বেশি । মধ্যপ্রদেশের রেল সংযোগ একটু দুর্বল, কিন্তু সঠিকভাবে পরিকল্পনা করতে পারলে সেটাকেও নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসা সম্ভব । তাই যদি মার্বেল রক সাঁচি ভীমবেঠকা পাঁচমারি ভ্রমণের অসাধারণ অভিজ্ঞতাকে উপলব্ধি করার ইচ্ছে হয়, তাহলে রেডি - গেট সেট - অন্‌ ইয়োর মার্ক ...!

মধ্যপ্রদেশ ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.