আমি ব্লগ লেখার খুব বেশি সমর্থক কোনওদিনও ছিলাম না, সত্যি কথা বলতে কি এখনও যে আছি তা নয় । তার একটা প্রধান কারণ আমার ধারণা ব্লগ লেখার থেকেও পড়া অনেক বেশি ক্লান্তিকর । অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অনেক সময়ই পড়তে শুরু করে শেষ করা হয়ে ওঠে না । নিজের ধৈর্য এবং/অথবা আগ্রহের অভাবকে 'ঠিক আছে, বাকিটা পরে পড়ব' জাতীয় অজুহাত দিয়ে ঢেকে দিই - আর আমরা সবাই জানি সেই 'পরে' টা আর কখনওই আসে না । তো, এই কারণে আমি ঠিক করেছি আমার ব্লগকে কখনওই অন্যের ক্লান্তির কারণ ঘটাব না, আমার ব্লগের বিষয় হবে প্রধানতঃ ভ্রমণ । আমার মতো যেসব বাঙালিরা ঘুরতে ভালোবাসে, তাদের জন্য আমার ব্লগ হবে তথ্যের একটা source । আমার নিজের একটা অভ্যেস আছে, কোনও জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার আগে সেই জায়গাটা সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, আর internet ঘাঁটতে গিয়ে আমার বরাবরই মনে হয়েছে যে internet এ লেখালেখি করার ব্যাপারে বাঙালিদের থেকে কুঁড়ে খুব কম শিক্ষিত জাতই আছে । আমার মতো যেসব বাঙালিরা আছে, যারা internet এ কোনো একটা ইংরিজীতে লেখা দেখলেই না পড়ার চেষ্টা করে, তাদের জন্য আমার ব্লগ helpful হবে, এই বিশ্বাস নিয়ে শুরু করছি আমার ভ্রমণকাহিনী । আগেই বলে রাখি, আমি Statistics এর ছাত্র ছিলাম, তাই আমার ব্লগে তত্ত্বের থেকে তথ্যের দেখাই মিলবে বেশি ।

Tuesday, April 15, 2014

সাতকোশিয়া ভ্রমণ

মার ধারণা আমার ব্লগে যেসব জায়গায় ভ্রমণ সম্পর্কে পোস্ট করেছি, তাদের মধ্যে সাতকোশিয়ার নাম সবচেয়ে কম লোক শুনেছে । আমি নিজেও জায়গাটার নাম জেনেছি যাওয়ার মাসতিনেক আগে - 'সানন্দা' থেকে (এটা শুনে "এবাবা, তুই/তুমি/আপনি সানন্দা পড়িস/পড়ো/পড়েন !" বলে হ্যাটা করার কোনও কারণ নেই, কারণ আমি নিয়মিত পড়ি না, মাঝে মাঝে ওখানকার 'বেড়ানো' বিভাগটা ওল্টাই) । সাতকোশিয়া জায়গাটা উড়িষ্যায় । মহানদীর প্রবাহপথের এই সাত ক্রোশ বা চোদ্দ মাইল পথের এলাকাকে বলা হয় 'সাতকোশিয়া' । পুরো জায়গাটাই পাহাড়ে ঘেরা বলে একে বলা হয় 'সাতকোশিয়া গর্জ' ।

১২ই এপ্রিল, ২০১৪ - শনিবার রাত ৮:৫৫ য় হাওড়া থেকে সম্বলপুর এক্সপ্রেসে আমাদের যাত্রা শুরু । আমাদের এবারের দল ছ'জনের - সেই ছ'জন যারা দার্জিলিঙ গিয়েছিলাম অর্থাৎ আমি, আমার স্ত্রী অমৃতা, নন্দিনীদি, দীপঙ্করদা আর ওদের যমজ ছেলে সায়ক ও সৌনক । সাতকোশিয়া যাওয়ার জন্য অঙ্গুলে নামতে হয় আর হাওড়া থেকে অঙ্গুল যাওয়ার একটিই ট্রেন আছে, সম্বলপুর এক্সপ্রেস যা আবার সাপ্তাহিক - শুক্রবার ওদিক থেকে এদিকে আর শনিবার এদিক থেকে ওদিকে । কাজেই যদি শনিবার ছাড়া অন্য কোনওদিন বেরোনোর পরিকল্পনা থাকে তাহলে হাওড়া থেকে কটক গিয়ে সেখান থেকে বাসে বা গাড়িতে অঙ্গুল যেতে হবে ।

সম্বলপুর এক্সপ্রেস অঙ্গুল পৌঁছয় ভোর পাঁচটায় এবং আমাদের ক্ষেত্রে একেবারেই লেট করল না । আমরা যখন অঙ্গুলে নামলাম তখন চারদিক ফর্সা হয়ে গেলেও সূর্য্য ওঠেনি । এখানে একটা কথা বলে রাখি সাতকোশিয়া কিন্তু কোনও বিশেষ জায়গা নয়, এটা একটা বড় এলাকা । সাতকোশিয়া প্রধানতঃ পাহাড় এবং জঙ্গলপ্রধান একটা জায়গা আর পুরোটাই উড়িষ্যা বনদপ্তরের এলাকা । এখানে থাকার জায়গাগুলো হল - টিকরপাড়া, পুরুনাকোটে, ছোটকেই, লবঙ্গী প্রভৃতি । এই সব জায়গাতেই থাকার জন্য উড়িষ্যা বনদপ্তরের কাছে বুকিং করতে হয় যার অফিস অঙ্গুলে । আমাদের প্রায় দু'মাস আগে থেকে অগ্রিমবুকিং করা ছিল ।

অঙ্গুল থেকে আমাদের গাড়ি ঠিক করা ছিল । সাতকোশিয়া ভ্রমণের জন্য নিজস্ব গাড়ি থাকা বিশেষ প্রয়োজনীয়, না হলে ঘোরাঘুরি করা সহজ হবে না । আমাদের প্রথম গন্তব্য টিকরপাড়া - সেখানে আমরা একদিন থাকব । অঙ্গুল থেকে টিকরপাড়ার দূরত্ব ৪০ কিলোমিটারের মতো । টিকরপাড়া একটা ছোট্ট গ্রাম, দোকানপাটও প্রায় নেই বললেই চলে । আমাদের ড্রাইভার বলল - যেতে ঘন্টাখানেক লাগবে এবং ওখানে গিয়ে ব্রেকফাস্ট পাওয়া যাবে না, কাজেই আমাদের যাওয়ার পথে ব্রেকফাস্ট সেরে নেওয়াই ভালো । সেইমতো একটা পাঞ্জাবি ধাবা থেকে আমরা পরোটা আর পনীরবাটার মশালা দিয়ে ব্রেকফাস্ট করলাম । এটা যে আমাদের পক্ষে কতটা ভালো হল সেটা বুঝলাম আরও মিনিট পনেরো চলার পরে । বড় রাস্তা ছেড়ে আমাদের গাড়ি যখন দু'দিকে পাহাড় আর জঙ্গল ঘেরা সম্পূর্ণ জনবসতিবিহীন রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলল তখন বুঝলাম এখানে ব্রেকফাস্ট পাওয়ার থেকে নিজেরা বন্যজন্তুদের হাতে ব্রেকফাস্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি !

আরও কিছুক্ষণ চলার পরে পড়ল 'পম্পাসার চেক পয়েন্ট' । এখানে বুকিং এর কাগজ দেখালে এরা ভেতরে যাওয়ার অনুমতিপত্র দেয় । মাথাপিছু ২০ টাকা এবং গাড়ির জন্য ৫ টাকা (প্রতিদিন) হিসেবে এখানে প্রবেশমূল্য দিতে হয় (বাঃ, জন্তুজানোয়ার দেখতে গেলে প্রবেশমূল্য দিতে হবে না ?) । পম্পাসার থেকে টিকরপাড়া যেতে আরও আধঘন্টা লাগল - আমরা পৌঁছলাম সাড়ে আটটার সময়ে ।

টিকরপাড়ায় পৌঁছে আমরা কিছুটা সমস্যায় পড়লাম ।  টিকরপাড়ায় থাকার জায়গা নেচার ক্যাম্পের টেন্ট - পৌঁছে দেখলাম তার গেট বন্ধ আর আশেপাশে কাউকে দেখা যাচ্ছে না । সেইসঙ্গে আমাদের কারুর মোবাইলও কাজ করছে না । অর্থাৎ আমাদের বুকিং-এর কাগজপত্রে দেওয়া ফোন নম্বরে যোগাযোগ করার কোনও উপায় নেই । কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর একজনের দেখা পাওয়া গেল, সেই হল এখানকার কেয়ারটেকার । তার কাছ থেকে জানলাম অঙ্গুলের অফিস থেকে আমাদের আসার খবর তাকে পাঠানো হয়নি । এটা নাকি সিজ্‌ন নয়, ওর কাজের ছেলেরাও এখন প্রায় কেউই নেই কাজেই আমাদের থাকার মতো কোনও বন্দোবস্তই করা নেই । অগত্যা আমাদের একটু অপেক্ষা করতে হবে ।

টিকরপাড়া নেচার ক্যাম্প
আমরা বসে রইলাম । জায়গাটায় টেন্ট ছাড়াও গাছের ছায়ায় ছোট ছোট বসার জায়গা আছে আর একটা খড়ের চাল দেওয়া খাওয়ার জায়গা আছে । জায়গাটা মহানদীর একেবারে ধারে, বসে বসে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে ভালোই লাগছিল । এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় - প্রচন্ড গরম হওয়া উচিৎ কিন্তু জায়গাটা গাছপালা ঘেরা হওয়ায় আর আগেরদিন রাতে বৃষ্টি হওয়ায় গরম তো লাগছিলই না, বরং কিছুটা ঠান্ডার দিকেই । ইতিমধ্যে আরেকটা ট্যুরিস্ট দল এসে হাজির হয়েছে - বলা বাহুল্য বাঙালি দল । এদেরও আমাদের মতোই অবস্থা অর্থাৎ এদের আসার খবরও কেয়ারটেকারের কাছে পৌঁছয়নি । সাড়ে দশটার কিছু আগে আমাদের টেন্ট রেডি হল ।

আমরা নিয়েছিলাম ডিলাক্স টেন্ট যার ভাড়া ২,০০০ টাকা (খাওয়াসুদ্ধ) । টেন্টগুলো বেশ সুন্দর, ভেতরে একটা খাট, দু'টো চেয়ার আর একটা টেবিল আছে । প্রত্যেকটা টেন্টের পেছনে বাইরে একটা বাথরুম । প্রত্যেকটা টেন্টের চারপাশে বাঁশের বেড়া দেওয়া আছে যদিও তার মানে এই নয় যে একটা থেকে অন্যটায় যেতে গেলে খুব বেগ পেতে হবে ।

(এখানে না বলে পারছি না যে টিকরপাড়ার মানুষের জীবনযাত্রা খুব বাঁশের ওপর নির্ভরশীল । আমাদের নেচার ক্যাম্পে গাছের গা থেকে ঝোলানো একটা দোলনা আছে যেটা দড়ির বদলে বাঁশ দিয়ে আটকানো । এরা জামাকাপড় শুকোতে দেওয়ার সময়েও দড়ির বদলে বাঁশের ওপর টাঙায় । কাজেই এখানে বেড়াতে গেলে 'বাঁশ হইতে সাবধান' !)

টেন্টের ভেতরে কোনও পাখার ব্যবস্থা নেই, সাধারণতঃ কোনও টেন্টেই থাকে না । গরমকালে এইসব
মহানদী - কুমীর প্রকল্পে যাওয়ার পথে
জায়গায় কেউ যায়ও না কাজেই পাখার ব্যবস্থা করার দরকার পড়ে না । যত বেলা বাড়তে লাগল তত তাপমাত্রাও বাড়তে থাকল আর আমরা অনুভব করলাম টেন্টের ভেতরে থাকা যাচ্ছে না । তবে তাতে সমস্যা নেই কারণ টেন্টের সামনে নদীর ধারে গাছের তলায় বেঞ্চির ওপর বসে/শুয়ে থাকতে ভালোই লাগছিল ।





কুমীর প্রকল্পে ঘড়িয়াল
একটু পরে আমরা গেলাম কাছেই 'কুমীর প্রকল্প' দেখতে । যদিও আমরা গাড়ি নিয়ে গেলাম তবে এই পথটুকু হেঁটেই যাওয়া যায় । একেবারে নদীর ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যেতে হয় এই জায়গায় । দেখার মধ্যে কিছু কুমীর আর ঘড়িয়াল আছে । তাছাড়া আছে একটা কচ্ছপ । এই জায়গাটাও গাছপালায় ঘেরা - ফুরফুরে হাওয়ায় ঘুরঘুর করতে বেশ লাগে ।



ফিরে এসে আমরা গেলাম মহানদীতে চান করতে । মহানদীতে প্রচুর কুমীর আর ঘড়িয়াল আছে (ভয়
মহানদীতে চান
দেখানোর জন্য বাড়িয়ে বলছি না) কাজেই চান করা বিপজ্জনক । বিভিন্ন জায়গায় সাইনবোর্ডে লেখাও আছে জলে না নামার কথা । যদিও এদের স্থানীয় লোকেরা নদীতে চান করে, কাপড় কাচে কিন্তু এরাও নদীর ধারেই থাকে, বেশিদূর এগোয় না । তাই চান করতে ইচ্ছে হলে আরও লোকজন যেখানে আছে, সেরকম জায়গায় যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ । আমরা কিছুক্ষণ চানটান করে ফিরে এলাম (Performed by experts. Do not try this) ।

দুপুরে ভাত-ডাল-আলুভাজা-তরকারি আর চিকেন । রান্না এককথায় বেশ বাজে । কেয়ারটেকার নিজেই রান্না করেছে - আমাদেরও আর কোনও উপায় নেই, তাই ঐ খাবারই খেতে হল । দুপুরে টেন্টের ভেতরটা অগ্নিকুন্ড হয়ে আছে, তাই বাইরেই বসে রইলাম ।

টিকরপাড়ায় ঝড়ের তান্ডব
বিকেল হতে দেখা গেল আকাশটা ক্রমশঃ কালো হয়ে আসছে । চারটের একটু পরে আকাশ একেবারে কালো হয়ে প্রচন্ড ঝড় শুরু হল । এই ঝড়ে টেন্টে থাকা নিরাপদ নয়, তাই আমরা সবাই মিলে খড়ের চালে ঢাকা খাওয়া জায়গাটায় আশ্রয় নিলাম । সেখান থেকে দেখলাম মহানদী আর সাতকোশিয়া গর্জে ঝড় আর বৃষ্টির তান্ডব । প্রচন্ড ঝড় আর সেইসঙ্গে বৃষ্টি - চারদিক একেবারে সাদা হয়ে গেছে । আমাদের টেন্টের ক্যানভাসগুলো অসহায়ের মতো এদিকওদিক ঝাপটাচ্ছে । খাওয়ার জায়গাটার শুধু মাথাটাই ঢাকা - চারপাশটা খোলা । সেখান দিয়ে অনবরত বৃষ্টির ছাট গায়ে লাগছিল । আমরা কোনওমতে বৃষ্টি বাঁচিয়ে (খুব যে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলাম এমন নয়, দুপুরের ওই গরমের পর বৃষ্টিটা ভালোই লাগছিল) দাঁড়িয়ে রইলাম । আমাদের মাথার ওপরে খড়ের চালের কিছুটা উড়ে গিয়ে সেখান দিয়ে জল পড়তে লাগল । সবমিলিয়ে যাকে বলে বেশ থ্রিলিং ব্যাপার !
সূর্য্যাস্তের ঠিক আগে

বৃষ্টি থামল ঘন্টাখানেক পরে । আমি আমাদের নেচার ক্যাম্প থেকে নদীর একেবারে ধারে চলে গেলাম । প্রচন্ড জোরে হাওয়া সেখানে তখনও অল্প অল্প বৃষ্টির আমেজ অনুভব করছিলাম । অত ঝড়ের পর নদীর জলের অস্থিরতা তখনও কমেনি । সেখানে দাঁড়িয়ে দেখলাম দু'টো পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে সূর্য্য অস্ত চলে গেল । পরিবেশটার মধ্যে একটা ভীষণ ভালোলাগা কাজ করছিল যা শুধু অনুভবই করা যায়, ব্যাখ্যা করা যায় না ।

রাতের আলোয় টিকরপাড়া নেচার ক্যাম্প
সন্ধ্যেবেলা আর কিছু করার নেই । গরম একেবারেই লাগছিল না, চাঁদের আলোয় টেন্টের বাইরে বসে বসে সবাই মিলে আড্ডা দিলাম । দুপুরে চিকেনের শোচনীয় অবস্থা দেখে নন্দিনীদি আগেই বলে রেখেছিলেন যে রাতের চিকেনটা উনি রান্না করবেন । এতে কেয়ারটেকার খুশিই হল কারণ রান্নাটা ওর নিজের সামর্থ্যের মধ্যের জিনিস নয় । রাতে নন্দিনীদির রান্না করা চিকেন দিয়ে (অসাধারণ হয়েছিল, নন্দিনীদি !) রুটি খেয়ে শুয়ে পড়লাম ।
মহানদীতে নৌভ্রমণ

পরেরদিন সকালে উঠে চা খেয়ে রেডি হয়ে নিলাম । আগে থেকেই পরিকল্পনা ছিল আমরা মহানদীতে নৌভ্রমণে বেরোব । দলে আমরা ছ'জন ছাড়াও আরও সাতজন (যারা গতকাল এখানে এসেছিল) । নৌকো বলতে আসলে একটা ডিঙিই বলা চলে । নদীর ধার দিয়ে মাঝে মাঝে দাঁড় বেয়ে মাঝে মাঝে লগি ঠেলে আমাদের নৌকা চলল । অভিজ্ঞতাটা আমার কাছে নতুন না হলেও অনেকদিন পরে - কাজেই বেশ মজা লাগছিল । যেতে যেতে মাঝে দূর থেকে জলের মধ্যে একটা কুমীর দেখা গেল (বলা বাহুল্য তাতে দলের সবার মধ্যেই বেশ চাঞ্চল্য দেখা গেল - লোকজন ছবিটবিও তুলল) ।

পাথরে ঢাকা নৌ-হল্ট্‌
প্রায় ঘন্টাখানেক চলার পর নৌকো একজায়গায় ভিড়ল । জায়গাটা পাথর দিয়ে ঢাকা - ছোটো ছোটো পাথরের স্তুপ । আমরা সেখানে কিছু ঘোরাঘুরি করে আবার ফেরার পথ ধরলাম । ফেরার সময়ে নৌকো কিছুটা মাঝখান দিয়ে ফিরল আর স্রোতের অনুকূলে হওয়ার দরুণ ফিরতে কম সময় লাগল । নৌকোর ভাড়া নিল ৮০০ টাকা ।

এরপর আমরা লুচি তরকারি দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়লাম । আমাদের পরের গন্তব্য পুরুনাকোটে ।

যে রাস্তা দিয়ে আমরা কাল থেকে টিকরপাড়া গেছিলাম, পুরুনাকোটে যেতে গেলে সেই রাস্তা দিয়েই কিছুটা
পুরুনাকোটের কটেজের ঘর
ফিরে আসতে হয় । টিকরপাড়া থেকে পুরুনাকোটের দুরত্ব ১০ - ১৫ কিলোমিটারের মতো । পুরুনাকোটে টিকরপাড়ার মতো রিমোট নয়, এখানে কিছু দোকান টোকান আছে । এখানে উড়িষ্যা বনদপ্তরের 'ফরেস্ট রেস্ট হাউস' আছে - পুরুনাকোটের থাকার জায়গাটাও সেখানেই । এখানে পৌঁছেও আমরা একই সমস্যার সম্মুখিন হলাম - অঙ্গুল থেকে এখানে কোনও খবর আসেনি । পুরুনাকোটের থাকার জায়গাটা কটেজ, সেখানে আবার বিদ্যুতের সমস্যা । এখানে মাত্র দু'টোই ঘর আছে - সেগুলো পরিষ্কার হতে কিছুক্ষণ সময় লাগল । পুরুনাকোটের ঘরভাড়া ১,০০০ টাকা করে আর সেটা খাওয়াসুদ্ধ নয় । এখানে প্রতি দু'জনের জন্য ৫০০ টাকা করে খাবার নেওয়া যেতে পারে । আমরা সেরকম ব্যবস্থাই করলাম ।

দুপুরে ডিমের ডালনা দিয়ে ভাত খেয়ে আমরা গাড়ি নিয়ে ঘুরতে বেরোলাম । এখান থেকে পম্পাসার চেক পয়েন্টের দিকে আরও কিছুটা এগোলে লবঙ্গীর দিকে যাওয়া যায় । আমাদের কেয়ারটেকার বলল - লবঙ্গীর ওয়াচ্‌ টাওয়ার থেকে কিছু জন্তু জানোয়ারের দেখা মিলতে পারে ।

লবঙ্গী যাওয়ার পথ
সেইমতো আমরা লবঙ্গীর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম । এই যাওয়ার পথটাই বিশেষ উল্লেখযোগ্য । দু'দিকের জঙ্গলের মধ্যের কাঁচা রাস্তার মধ্যে দিয়ে উঁচুনিচু পথে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলল । মাঝে একজায়গায় আমরা গাড়ি থামিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম । জঙ্গলের ভেতরে নিস্তব্ধতার মধ্যে সে এক অদ্ভুত গা-ছমছমানি পরিবেশ । প্রতিমূহুর্তে বন্য জন্তুদের দেখতে পাওয়ার এক অনাবিল আকর্ষণ (আমি এই ভাষায় লিখি না, এই দু'টো লাইন সানন্দার প্রতিবেদকের প্রতি একটা ছোট্ট শ্রদ্ধার্ঘ্য) ।

যাওয়ার পথে একজায়গায় চোখে পড়ল উড়ন্ত কাঠবিড়ালী । লবঙ্গীতে পৌঁছে জানা গেল এখন উড়িষ্যা ভোটের জন্য অনেক কিছু বন্ধ - ওয়াচ্‌টাওয়ারেও যাওয়া যাবে না । আমরা লবঙ্গীর ফরেস্ট রেস্ট হাউস পর্যন্ত পৌঁছলাম । এখানেও আর কোনও ট্যুরিস্ট নেই । আমরা কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে আবার ফেরার পথ ধরলাম । জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়ি পথে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ফেরার সময়ে থেকে থেকেই কেন জানি না গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিল ! (আদৌ উঠছিল না, এটাও ওই - শ্রদ্ধার্ঘ্য !)

কটেজে ফিরে দেখলাম লোডশেডিং । কেয়ারটেকার জানালো কোথায় একজায়গায় হাতি ইলেকট্রিকের
পুরুনাকোটেতে চাঁদের আলোয় আড্ডা
তার ছিঁড়ে দিয়েছে - রাতের মধ্যে কারেন্ট আসার সম্ভাবনা কম । আমরা কটেজের সামনের লনে বসে রইলাম । আকাশে পূর্ণচন্দ্র - আর খুব হাল্কা হাল্কা হাওয়া দিচ্ছিল বলে গরম লাগছিল না ।

রাতে রুটি আর চিকেন । এখানেও নন্দিনীদিই রান্না করলেন । আলো না থাকায় আমরা লনেই খোলা আকাশের নিচে বসে যাকে বলে 'মুনলাইট ডিনার' করলাম । পুরুনাকোটেতে আমাদের রাত্রিযাপন এভাবেই শেষ হল ।

কটক স্টেশন
পরেরদিন ১৫ই এপ্রিল, ২০১৪ । বাংলা নববর্ষ । আমাদের ফেরার দিন । সকালে লুচি আর আলুর তরকারি দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়লাম । আগেই বলেছি অঙ্গুল থেকে আমাদের ফেরার কোনও উপায় নেই তাই আমাদের কটক যেতে হবে । কটক থেকে দুপুরে ধৌলি এক্সপ্রেস ধরে হাওড়া ।

আমাদের গাড়ি আমাদের কটক স্টেশনে ছেড়ে দিল । পুরুনাকোটে থেকে কটক আসতে ঘন্টাতিনেক লাগে । কটকে এসে আমরা স্টেশন থেকে দুপুরের খাওয়া সেরে নিলাম । তারপর ট্রেনে চড়ে হাওড়া ! খতম্‌ !

সারসংক্ষেপঃ

১. উড়িষ্যার কটকের কাছে পাহাড় আর জঙ্গল ঘেরা একটা জায়গা সাতকোশিয়া । এখানকার সিজ্‌ন্‌ নভেম্বর থেকে মার্চ - এই সময়সীমার বাইরে সাতকোশিয়ায় যাওয়ার মানে হয় না, কারণ তাতে এখানে যাওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য চরিতার্থ নাও হতে পারে ।
২. সাতকোশিয়ার সবচেয়ে কাছের রেলস্টেশন অঙ্গুল - এখান থেকে গাড়িতে যেতে ঘন্টাখানেক লাগে । হাওড়া থেকে অঙ্গুল যাওয়ার ট্রেন সপ্তাহে একটাই ছাড়ে - শনিবার রাতে । এছাড়া কটক পর্যন্ত্য ট্রেনে গিয়ে তিনঘন্টার গাড়ির জার্নি করেও সাতকোশিয়া যাওয়া যেতে পারে ।
৩. সাতকোশিয়ায় থাকার বা ঘোরার জায়গা প্রধানতঃ চারটে - টিকরপাড়া, ছোটকেই, পুরুনাকোটে আর লবঙ্গী । এদের মধ্যে টিকরপাড়াতে একদিন অবশ্যই থাকা উচিৎ ।
৪. যদিও এখানে বিভিন্ন রুটে সরকারি বাস চলে, কিন্তু সাতকোশিয়ায় ঘোরার জন্য নিজস্ব গাড়ি থাকাই শ্রেয় । অঙ্গুল বা কটক থেকে অল্প খরচে ২ - ৩ দিনের জন্য গাড়ি ভাড়া করে নেওয়া যেতে পারে ।
৫. সাতকোশিয়ার সবজায়গাতেই উড়িষ্যার বনদপ্তরের থাকার জায়গা রয়েছে । বুকিং এর জন্য এদের ওয়েবসাইট http://www.satkosia.org/ দেখা যেতে পারে অথবা ইমেল বা ফোনে যোগাযোগ করা যেতে পারে । ইমেল : dfosatkosiawl@yahoo.co.in, ফোন : 08763102681.
৬. সাতকোশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় একটা বড় সমস্যা হল এখানে মোবাইলের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না বা পাওয়া গেলেও তা খুবই ক্ষীণ । কাজেই বাইরের কারুর সঙ্গে দরকার পড়লেও যোগাযোগ করা যাবে না এটা ধরে নিয়েই সাতকোশিয়ায় যাওয়া উচিৎ ।
৭. এখানে দোকানপাট নেই বললেই চলে - খাওয়াদাওয়ার জন্যও রিসর্টের ওপরেই নির্ভর করতে হয় । নিজের ইচ্ছেমতো খাদ্যসামগ্রীও পাওয়ারও সম্ভাবনা নেই ।

উপসংহারঃ

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে সাতকোশিয়ার পরিবেশ বেড়ানোর পক্ষে যথেষ্ট অনুকূল নয় । হ্যাঁ, এটা ঠিক
সাতকোশিয়া 
নাগরিক পরিষেবা বলতে যে জিনিসগুলো আমরা প্রতিমূহুর্তেই পেতে অভ্যস্ত, তার অনেককিছুই এখানে পাওয়া যায় না, পয়সা ফেললেও না । কিন্তু এটাই হয়তো এই জায়গার ইউ এস পি । প্রতিকূল অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটাও জীবনের একটা শিক্ষা । বিশেষ করে তার পরিবর্তে যদি অসামান্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য দেখার সু্যোগ পাওয়া যায় । প্রকৃতির মধ্যে থাকা, প্রকৃতিকে দেখা - এগুলোই সাতকোশিয়ার মূল আকর্ষণ । আমরা এর আগেও প্রকৃতির মধ্যে থেকেছি, কিন্তু এভাবে একেবারে কেন্দ্রস্থলে গিয়ে কখনও পড়িনি । এর একটা আলাদা স্বাদ আছে - অনুভূতি আছে - গন্ধ আছে । আর এগুলোর কোনওটাই যদি টের না পাওয়া যায়, তাহলে নিজের ফুসফুসটাকে চাঙ্গা করতে অন্তত বিশুদ্ধ অক্সিজেন তো আছেই । এইসবকিছুকে পেতে হলে কলকাতা থেকে মাত্র ঘন্টা ৯ ঘন্টার দুরত্বে সাতকোশিয়ায় একবার ঘুরে আসতেই হবে !
বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ - অফ্‌ সিজ্‌নে সাতকোশিয়ায় নৈব নৈব চ ।

সাতকোশিয়ার আরও ছবি দেখতে হলে click here.

3 comments:

  1. Lekha ta satti khub sundar hoiche..Ar potibar ber ar moto atao khub e informatics.. tobe contain sombonthe 2-1 ti kotha bolar ache..MAHANADI ai jaiga r main attraction but 1 st er tike ar khub akta kotha nei.Ar ata mainly MAHANATI r gorge ar ati asia one of bigest gorge. Ar Akaner hill ar akta name ache."Pabantula"...Arekta kotha Nodi te chan korte hole Expert hober darkar nei ata khub e common baber okane.But lhekti satkosia jete jara icchuk tader jonne akebare perfect.

    ReplyDelete
  2. লেখাটা খুব ভাল হয়েছে, কিন্তু জায়গাটার সম্পর্কে আমার খুব একটা উৎসাহ জাগল না । হয়তো তোমরা যদি শীতকালে যেতে তাহলে অন্যরকম অভিজ্ঞতা হত, তার ছাপ লেখায় পড়ত, আর পাঠকদেরও আকর্ষণ জাগত...

    ReplyDelete
  3. Tamalda, lekha ta as usual bhalo, kintu ami ekhane Arindam Sengupta babur sathe ak mot...!! jai hok, tomar ashadharon photography r kotha mention na kore thakte parchhi na, chhobi gulo khub e sundor hoyechhe, keep it up :)

    ReplyDelete