আমি ব্লগ লেখার খুব বেশি সমর্থক কোনওদিনও ছিলাম না, সত্যি কথা বলতে কি এখনও যে আছি তা নয় । তার একটা প্রধান কারণ আমার ধারণা ব্লগ লেখার থেকেও পড়া অনেক বেশি ক্লান্তিকর । অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অনেক সময়ই পড়তে শুরু করে শেষ করা হয়ে ওঠে না । নিজের ধৈর্য এবং/অথবা আগ্রহের অভাবকে 'ঠিক আছে, বাকিটা পরে পড়ব' জাতীয় অজুহাত দিয়ে ঢেকে দিই - আর আমরা সবাই জানি সেই 'পরে' টা আর কখনওই আসে না । তো, এই কারণে আমি ঠিক করেছি আমার ব্লগকে কখনওই অন্যের ক্লান্তির কারণ ঘটাব না, আমার ব্লগের বিষয় হবে প্রধানতঃ ভ্রমণ । আমার মতো যেসব বাঙালিরা ঘুরতে ভালোবাসে, তাদের জন্য আমার ব্লগ হবে তথ্যের একটা source । আমার নিজের একটা অভ্যেস আছে, কোনও জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার আগে সেই জায়গাটা সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, আর internet ঘাঁটতে গিয়ে আমার বরাবরই মনে হয়েছে যে internet এ লেখালেখি করার ব্যাপারে বাঙালিদের থেকে কুঁড়ে খুব কম শিক্ষিত জাতই আছে । আমার মতো যেসব বাঙালিরা আছে, যারা internet এ কোনো একটা ইংরিজীতে লেখা দেখলেই না পড়ার চেষ্টা করে, তাদের জন্য আমার ব্লগ helpful হবে, এই বিশ্বাস নিয়ে শুরু করছি আমার ভ্রমণকাহিনী । আগেই বলে রাখি, আমি Statistics এর ছাত্র ছিলাম, তাই আমার ব্লগে তত্ত্বের থেকে তথ্যের দেখাই মিলবে বেশি ।

Sunday, January 1, 2017

রাজগীর ভ্রমণ

ভ্রমণপথঃ

বুধবার ২৮শে ডিসেম্বর, ২০১৬ঃ হাওড়া - রাত ৮ঃ৩৫ মিনিটে দানাপুর এক্সপ্রেস
বৃহস্পতিবার ২৯শে ডিসেম্বর, ২০১৬ঃ সকাল ৭ঃ৪৫ মিনিট - বখ্‌তিয়ারপুর - সকাল ১০ টায় প্যাসেঞ্জার ট্রেন - দুপুর ১২ টা - রাজগীর । রাজগীরে রাত্রিবাস ।
শুক্রবার ৩০শে ডিসেম্বর, ২০১৬ঃ রাজগীর - নালন্দা - রাজগীরে রাত্রিবাস ।
শনিবার ৩১শে ডিসেম্বর, ২০১৬ঃ রাজগীরে লোক্যাল সাইট সিয়িং - গাড়িতে বখ্‌তিয়ারপুর - রাত ১০ঃ০৯ মিনিটে রাজেন্দ্রনগর হাওড়া এক্সপ্রেস
রবিবার ১লা জানুয়ারী, ২০১৭ঃ সকাল ১০ টা - হাওড়া

মাধ্যমিকে যখন ইতিহাস পড়েছি, তখন বইয়ের প্রথমদিকে যেসব সাম্রাজ্য বা রাজবংশের কথা লেখা থাকত তার বেশিরভাগগুলোরই সময়কাল BC অর্থাৎ যীশুখৃষ্টের জন্মের আগেকার । এইসময়কার বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শনের কিছু আমাদের চারপাশে এখনও দেখা যায় - এখনও ভারতবর্ষে এরকম অনেক জায়গা রয়েছে যেগুলো সেইসময়কার ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে । সেইরকমই একটা আদ্যন্ত ঐতিহাসিক জায়গা হল - বিহারের 'রাজগীর' । রাজগীর শব্দটা আসলে 'রাজগৃহ' শব্দ থেকে এসেছে যার অর্থ রাজার গৃহ । ইতিহাসের বিভিন্ন রাজারা এখানে বিভিন্ন সময়ে রাজধানী স্থাপন করেছেন । মৌর্য্য বংশ, সম্রাট অশোক, হর্যঙ্ক বংশ, বিম্বিসার, অজাতশত্রু ইতিহাসের এইসব নাম এই রাজগীরের সঙ্গে যুক্ত । গত ইংরিজী বছরের শেষ ক'টা দিন এখানে ঘোরাঘুরির অভিজ্ঞতাই আমার এবারের লেখার বিষয়বস্তু ।

আমরা প্রত্যেকবারই যেখানে বেড়াতে যাই, আগে থেকে সেই জায়গাটার সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, এটা আগেও বলেছি । কিন্তু রাজগীরের ক্ষেত্রে সেটা করতে গিয়ে যে বিশেষ অসুবিধের মধ্যে পড়তে হয়েছে সেটা হল ইন্টারনেটে রাজগীর সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না । তার মানে এই নয় যে এখানে লোকজন বেড়াতে যায় না, তবে ট্যুরিজমের ব্যাপারে বিহার যে ভারতের বেশিরভাগ রাজ্যের থেকে এখনও অনেকটা পিছিয়ে আছে, সেটা বলতেই হবে । হোটেল বুকিং-এর ক্ষেত্রেও আমাদের বিস্তর খোঁজাখুঁজি করতে হয়েছে আর শেষ পর্যন্ত আমরা যা পেয়েছিলাম ... থাক সেটার ব্যাপারে বিস্তারিত যথাসময়ে লিখব । আপাতত বেড়ানো শুরু করা যাক !

এবারে আমাদের দল তিনজন শিশুসমেত বারোজনের । কে কে ছিল সেটা আর আলাদা করে লিখছি না, এটা আমাদের দেওঘর ভ্রমণের অপরিবর্তিত দল । ২৮শে ডিসেম্বর, ২০১৬ বুধবার হাওড়া স্টেশন থেকে রাত ৮ঃ৩৫ মিনিটে দানাপুর এক্সপ্রেসে আমরা রওনা দিলাম । রাজগীরে স্টেশন থাকলেও এটা মেইন লাইনের মধ্যে পড়ে না, অনেকটা দেওঘরের মতোই । দেওঘর যেতে গেলে যেমন জসিডি-তে নেমে ট্রেন বা গাড়ি করে যাওয়া যায়, সেরকমই রাজগীর যেতে গেলে নামতে হয় বখ্তি‌য়ারপুরে (এটা শুনেই বখ্তি‌য়ার খিলজীর কথা মনে পড়ছে তো ? সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবেই জিজ্ঞেস করছি, ওনার
বখ্‌তিয়ারপুর স্টেশনে কুয়াশা
পুরো নাম মনে আছে ? যাদের মনে নেই তাদের জন্য উত্তরটা হল 'ইখতিয়ার-উদ্দীন মহম্মদ বিন বখ্তি‌য়ার খিলজী') । তবে দেওঘরের সঙ্গে পার্থক্য হল বখ্‌তিয়ারপুর থেকে রাজগীর পৌঁছতে দু'ঘন্টা সময় লাগে । দানাপুর এক্সপ্রেসের বখ্তি‌য়ারপুর পৌঁছনোর কথা ভোর ৪ঃ৫৩ মিনিটে । আমরা ঠিক করে রেখেছিলাম বখ্‌তিয়ারপুর থেকে সকাল ৬ঃ১০ এর প্যাসেঞ্জার ট্রেনে রাজগীর যাব । কিন্তু কুয়াশার জন্য দানাপুর এক্সপ্রেস প্রায় তিনঘন্টা লেট করে বখ্‌তিয়ারপুর পৌঁছল । স্বভাবতই আমাদের প্যাসেঞ্জার ট্রেন আর ধরা হল না এবং আমরা পরের ট্রেন ধরলাম । এই পরের ট্রেনটা সকাল ৮ঃ০৫ - এ বখ্‌তিয়ারপুর থেকে ছাড়ার কথা হলেও সেটা ছাড়ল প্রায় ১০ টা । যাইহোক, নানারকম বিভ্রাটের মধ্যে দিয়ে আমরা রাজগীর পৌঁছলাম দুপুর বারোটা ।

রাজগীর স্টেশন থেকে আমাদের হোটেলের দূরত্ব খুব বেশি না, আমরা একটা টাঙ্গা আর দু'টো রিক্সা করে পৌঁছে গেলাম 'হোটেল মমতা'-য় । হোটেলটার সম্পর্কে খুব বিস্তারিত লিখছি না তবে এটা বলতে পারি আমরা আজ পর্যন্ত্য বেড়াতে গিয়ে যত হোটেলে থেকেছি, হোটেল মমতা তার সবথেকে খারাপগুলোর একটা । আমাদের যেরকম ঘর দেওয়ার কথা ছিল, যে তলায় দেওয়ার কথা ছিল, সেসব তো এরা কিছু দিতে পারলই না, উপরন্তু হোটেলের রিসেপশনে যারা বসে তাদের ব্যবহারও সাংঘাতিক রকমের খারাপ । আমি ইতিমধ্যেই হলিডে-আই-কিউ এ এই হোটেলের পেজে আমার রিভিউ লিখে ফেলেছি । জানতে চাইলে এখানে ক্লিক করতে হবে ।

দুপুরে আমরা এখান থেকেই খেয়ে নিলাম । মমতা হোটেলের খাবারের মান তুলনামূলকভাবে খারাপ নয়, ভাত মাছ ডিম চিকেন নিয়ে খরচ পড়ল ১,৬১৪/- টাকা । খাওয়া শেষ করে ঘরে এলাম তখন বিকেল সাড়ে তিনটে বেজে গেছে । আমাদের ট্রেন দেরি না করলে প্রথমদিনটা হয়তো আমরা কিছুটা ঘুরতে পারতাম, কিন্তু এখন আর সেই প্রশ্ন ওঠে না । তাই যে যার ঘরে বিশ্রাম নিয়ে আর আড্ডা মেরে সন্ধ্যেটা কাটিয়ে দিলাম । রাতে ফ্রাইড রাইস, রুটি, চিকেন কারি ইত্যাদি খাওয়া হল । খরচ হল ১,০৬৯/- টাকা ।

হোটেল আনন্দলোকের ঘর
পরেরদিন ৩০শে ডিসেম্বর, ২০১৬ শুক্রবার । সকালে উঠে আমাদের প্রথম কাজ হল মালপত্র গুছিয়ে হোটেল থেকে চেক্‌ আউট করা । হ্যাঁ, আমরা এটাই করেছি । এদের কাছে আমাদের যা অগ্রিম দেওয়া ছিল তার থেকে একদিনের ভাড়া বাদ দিয়ে বাকিটা ফেরৎ নিয়ে সকাল ন'টা নাগাদ মমতা হোটেলের বিরক্তিকর পরিষেবা থেকে বেরিয়ে আমরা চলে গেলাম 'হোটেল আনন্দলোক'-এ । এই হোটেলটা আগেরদিন সন্ধ্যেবেলাই ঠিক করা হয়েছিল । এটা দারুণ কিছু না হলেও মমতা-র থেকে ভালো । একটা সমস্যা হল এখানে খাওয়ার ব্যবস্থা নেই । তবে বাজারের কাছে হওয়ায় কাছাকাছির মধ্যে খাওয়ার জায়গার অভাব নেই ।

এবার আমাদের ঘুরতে বেরোনো । রাজগীরে এসে ইতিমধ্যেই অনেক সময় নষ্ট হয়েছে । হোটেলের কাছে একটা দোকান থেকে কচুরি-জিলিপি দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে একটা টাটাসুমো নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম আমাদের প্রথমদিনের গন্তব্য 'নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়'-এর ধ্বংসস্তূপ দেখতে ।

রাজগীরের কাছাকাছি যেসব দেখার জায়গা আছে, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় তারমধ্যে সবথেকে বেশি ঘ্যাম । রাজগীর থেকে নালন্দা যেতে গাড়িতে আধঘন্টা মতো লাগে । এখানে গিয়ে দেখলাম প্রচন্ড ভীড় - ৩০শে ডিসেম্বরের ছুটিতে শুধু দূরের পর্যটকরা নয়, স্থানীয় লোকজন এমনকি কয়েকটা স্কুলের বাচ্চারাও হাজির হয়েছে ।

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় 'আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া' রক্ষণাবেক্ষণ করে । এবং এটা 'ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ প্রপার্টি' । ঢোকার টিকিট মাথাপিছু ১৫/- টাকা এবং পনেরো বছরের নিচে ফ্রি । মূল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে একটা বড় চৌহদ্দী আছে, গেট দিয়ে ঢোকার পর সেটা দেখতে পাওয়া যায় । এখানে বেশ সুন্দর করে ছাঁটা ঘাস, ফুলের বাগান ইত্যাদি রয়েছে ।

এরপর আমরা মূল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ঢুকলাম । এই জাতীয় ঐতিহাসিক জায়গায় একজন গাইড নিলে ভালো দেখা যায় এটা আগেও দেখেছি, (মুর্শিদাবাদের সেই গাইডের কথা আমি কখনও ভুলব না "জানলে ইতিহাস আর না জানলে মাটির দেওয়াল") তাই আমরা ২০০/- টাকা দিয়ে একজন গাইড ভাড়া করলাম । সেই গাইড আমাদের পুরো জায়গাটা ঘুরে দেখাল । আমি এখানে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিস্তারিত লিখব না, এই সম্পর্কে ইন্টারনেটে অনেক লেখা পাওয়া যায় । আমি শুধু সেটাই লিখছি যেটা আমরা নিজের চোখে দেখেছি আর নিজের কানে শুনেছি ।

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় আনুমানিক পঞ্চম ও ষষ্ঠ খ্রীষ্টাব্দ থেকে তৈরি শুরু হয় । গুপ্ত বংশের আমলে এর খ্যাতি খুব বেশি হয় । এরপর বিভিন্ন রাজবংশের আমলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গঠনগত নির্মাণের কিছু পরিবর্তন করা হয় । আমাদের গাইড আমাদের একটা বিশাল চত্বরে নিয়ে গেল যেটাকে আধুনিককালের একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ হোস্টেল বা ছাত্রাবাস বলা যেতে পারে । এখানে ছাত্রদের জন্য থাকার ঘর, জলের জন্য কুয়ো, রান্নার ব্যবস্থা ইত্যাদি তো রয়েইছে, সেইসঙ্গে আছে পড়াশোনা এবং অধ্যাপকের থাকার ব্যবস্থা । নালন্দায় সাহিত্য, দর্শন, ধর্ম প্রভৃতি বিষয়ে পড়ানো হত । এখানে বলে রাখি নালন্দার ধ্বংসস্তূপ মাটির নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিল, ভারতীয় পুরাতত্ত্ববিভাগ এই নিয়ে কাজ করছে । এখনও এর বেশ কিছু অংশ মাটির নিচেই আছে বলে অনুমান করা হয় । যতটা উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে তার মধ্যে আমাদের দেখা ছাত্রাবাসের মতো মোট ন'টা ছাত্রাবাস আছে । প্রত্যেকটা ছাত্রাবাসের বাইরে একটা করে বৌদ্ধমন্দির রয়েছে । প্রত্যেকদিন অধ্যায়নের শুরু এবং শেষে ছাত্রদের এখানে একবার করে পুজো করতে হত ।

ছাত্রাবাস
ছাত্রাবাসে প্রত্যেক ছাত্র এবং শিক্ষকের নিজস্ব ঘরের ব্যবস্থা ছিল, অর্থাৎ এখনকার দিনের হোস্টেলের মতো একই ঘরে একের বেশি ছাত্রকে থাকতে হত না । রান্নাবান্না ছাত্রদেরই করতে হত এবং নিজেদের অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজকর্ম্মও নিজেদেরই করতে হত । নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় সেইযুগে শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম ছিল, সারা দেশ থেকে ছাত্ররা এখানে পড়তে আসত । কিন্তু চাইলেই এখানে পড়াশোনার সুযোগ মিলত না, নালন্দার প্রবেশিকা পরীক্ষা ছিল রীতিমতো কঠিন । বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রবেশদ্বারে যে দ্বারপাল থাকত, বাইরে থেকে আসা ছাত্রদের প্রথমে তার কাছে পরীক্ষা দিতে হত । সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তবেই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের অনুমতি মিলত, না হলে সেখান থেকেই ফিরে যেতে হত । এইভাবে প্রত্যেক বছর মাত্র ৩০% ছাত্র নালন্দায় প্রবেশ করতে পারত । আমাদের গাইড হিন্দীতে বলল "তাহলেই বুঝে দেখুন, যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারপালই এত পন্ডিত, সেখানকার অধ্যাপকরা কিরকম হত !"

নালন্দার সেই স্তূপ
ছাত্রাবাসের বাইরে মাঠের মধ্যে অনেক ছোট ছোট বৌদ্ধস্তূপ ছড়িয়ে রয়েছে । এসব ছাড়া যেটা বেশি করে চোখে পড়ে সেটা হল নালন্দার সেই বিখ্যাত স্তূপ - যেটা আমরা ইতিহাস বইয়ের পাতায় সবসময়ে দেখতে পাই । মজার ব্যাপার হল এটা নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাগোয়া হলেও এর সঙ্গে কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও সম্পর্ক নেই - এটা সম্রাট অশোকের সময়ে তৈরি । আমরা এই চত্বরে আরও কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে বেরিয়ে পড়লাম ।

পাওয়াপুরী
আমাদের পরবর্তী গন্তব্য 'পাওয়াপুরী' । এখানে একটা জৈনমন্দির আছে । নালন্দা থেকে পাওয়াপুরী যেতে কুড়ি মিনিট মতো লাগে । পাওয়াপুরীর মন্দিরের বৈশিষ্ট্য হল এটা একটা হ্রদের মাঝখানে । হ্রদের পাড় থেকে একটা রাস্তা চলে গেছে মন্দির পর্যন্ত্য । এখান দিয়ে যাওয়ার সময়ে জলের মধ্যে মাছ, হাঁস প্রভৃতি দেখা যায় ।  মন্দিরটা সম্পূর্ণ শ্বেতপাথরের তৈরি । চত্বরটা খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন । আমরা এখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে ফেরার পথ ধরলাম ।

বিকেল প্রায় চারটে বাজে এবং এখনও পর্যন্ত্য আমাদের দুপুরের খাওয়া হয়নি । পাওয়াপুরী থেকে অল্প কিছুটা আসার পর এক জায়গায় আমাদের গাড়ি লাঞ্চের জন্য দাঁড়াল । এখানে ভাত-ডিম-চিকেন নিয়ে আমাদের খরচ পড়ল ১,৪৪০/- টাকা । এরপর আমরা রাজগীর ফিরে এলাম । সারাদিনের ঘোরার জন্য গাড়ি নিল ১,০০০/- টাকা ।

আমরা হোটেলে ফিরেছি সন্ধ্যেবেলা । ঘরে বসে কিছু করার নেই, তাই আমরা আবার বেরিয়ে পড়লাম - এবার পদব্রজে । আমাদের হোটেলটা একেবারেই শহরের প্রাণকেন্দ্রে - দোকানপাট থেকে শুরু করে খাবার জায়গা সবই এখানে । আমরা কয়েকটা দোকান ঘোরাঘুরি করে কিছু জিনিসপত্র কেনাকাটা করলাম । বলা বাহুল্য, এমন কোনও জিনিস নেই যা কলকাতায় পাওয়া যায় না, তবে বেড়াতে গিয়ে সেই জায়গা থেকে কিছু কেনাকাটা করা কিছু মানুষের অভ্যেস আর সেরকম মানুষ আমাদের দলেও আছে !

রাত্রি সাড়ে আটটা নাগাদ আমরা হোটেলে ফিরে এলাম । রাজগীরে রাত্রের দিকে বেশ ভালোই ঠান্ডা পড়ে আর এর মধ্যে কেউই বাইরে বেরিয়ে খেতে যেতে চাইলাম না । কাছাকাছি একটা হোটেল থেকে ডিনার আনিয়ে খাওয়া হল । ভাত-রুটি-চিকেন নিয়ে খরচ পড়ল ৯৫০/- টাকা ।

টাঙ্গা
৩১শে ডিসেম্বর, ২০১৬ শনিবার । সকালে উঠে ব্রেকফাস্ট করলাম আগেরদিনের দোকান থেকেই - কচুরি-তরকারী দিয়ে । রাজগীরে একটা বড় সমস্যা হল লোক্যাল সাইট সিয়িং-এর জন্য কোনও গাড়ি পাওয়া যায় না, শুধুমাত্র টাঙ্গাই ভরসা । এটাই নাকি এখানে গাড়িওয়ালাদের সঙ্গে টাঙ্গাওয়ালাদের চুক্তি । কোনও গাড়ি লোক্যাল ঘোরাঘুরির জন্য পাওয়া যাবে না । টাঙ্গার রেটও বেশ বেশি, টাঙ্গাপিছু ১,২৫০/- টাকা । একটা টাঙ্গায় সবচেয়ে বেশি পাঁচজন যাত্রী বসতে পারে, কিন্তু তার থেকে কম লোক হলেও ওই টাকাই দিতে হবে । টাঙ্গাদের ইউনিয়ন বেশ শক্তিশালী আর কিছুক্ষণ দরাদরি করেও যখন এরা কিছু কম করল না, তখন বাধ্য হয়ে আমরা এই টাকাতেই যেতে রাজী হলাম ।

মনিয়ার মঠ
টাঙ্গাতে চড়ে আমাদের প্রথম গন্তব্য হল 'মনিয়ার মঠ' । এখানে একটা বৌদ্ধ স্তূপের মত আছে । তবে অন্য স্তূপের সঙ্গে এর পার্থক্য হল এর ভেতরটা ফাঁপা । এর দেওয়ালে বুদ্ধের কিছু ছবি আছে । এছাড়া এখানে হিন্দু নাগদেবীরও অবস্থান আছে বলে মনে করা হয় । জায়গাটায় দেখার সেরকম কিছু নেই আর সবটা দেখতে মিনিট পনেরোর বেশি লাগে না ।

সোনা ভান্ডার

দ্বিতীয় গন্তব্য হল 'সোনা ভান্ডার' । টাঙ্গাকে একই জায়গায় দাঁড় করিয়ে রেখে মনিয়ার মঠ থেকে ভেতরের দিকের রাস্তা দিয়ে আরও ৬৫০ মিটার হেঁটে গেলে দেখতে পাওয়া যায় একটা অনতিউচ্চ পাহাড় । এই পাহাড়ের নামই 'সোনা ভান্ডার' । এর ভূ-তাত্বিক বৈশিষ্ট্য হল এর মধ্যে দু'টো বেশ বড় ফাঁকা ঘরের মতো আছে আর এই পুরো ব্যাপারটাই একটামাত্র বড় পাথর কেটে তৈরি । মনে করার হয় এটা আসলে রাজা বিম্বিসারের স্বর্ণভান্ডারের প্রবেশপথ । এর দেওয়ালে শঙ্খলিপিতে কিছু লেখা আছে যেটা আসলে সেই স্বর্ণভান্ডারে প্রবেশ করার সংকেত । তবে আজ পর্যন্ত্য সেই লিপির পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়নি আর তাই বিম্বিসারের স্বর্ণভান্ডারও অধরাই থেকে গেছে ! (তবে সবার জন্য অধরা নয়, অচেনা লিপির পাঠোদ্ধার করে ব্যাগে যতটা ধরে ততটা সোনা আমি নিজে নিয়ে এসেছি, কাউকে দেব না !) পাথরের ওপর পা দিয়ে এই পাহাড়ের মাথায় ওঠা যায়, আমরা উঠে ছবিটবি তুলে নেমে এলাম ।

বিশ্বশান্তি স্তূপের তোরণদ্বার
তৃতীয় গন্তব্য হল 'বিশ্ব শান্তি স্তূপ' - রাজগীরের লোক্যাল সাইট সিয়িং-এর সবথেকে উল্লেখযোগ্য জায়গা । শান্তিস্তূপটা গৃধকূট পাহাড়ের ওপরে আর পাহাড়ে ওঠার জন্য রোপ-ওয়ে চলে । এই রোপ-ওয়ে সম্পর্কে একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে এটা নাকি চারদিক খোলা । এটা একটা ভুল তথ্য - এগুলো বলতে গেলে চারদিকটাই ঘেরা । তবে এর একটা বৈশিষ্ট্য হল এর একটায় একজনই উঠতে পারে আর এগুলো চলার পথে কখনও থামে না । অর্থাৎ চলন্ত রোপ-ওয়েতে উঠতে হয় যদিও সেটার গতি এতটাই কম যে উঠতে কোনও অসুবিধে হয় না । এই রোপওয়েতে ওঠার টিকিট ১০০/- টাকা করে যদিও আমরা এতে উঠিনি । সামনে প্রায় ২০০ - ২৫০ জন লোকের লাইন, উঠতে গেলে ঘন্টা দু'য়েক এখানেই কেটে যাবে, তাই আমরা শান্তিস্তূপ দেখার ইচ্ছে ত্যাগ করলাম ।

বিম্বিসার জেল
এতক্ষণ আমরা আমাদের শুরুর জায়গা থেকে ক্রমশই দূরে যাচ্ছিলাম, এবার ফেরার পথ ধরলাম । ফেরার পথে দেখার জায়গা 'বিম্বিসার জেল' । এখানে রাজা বিম্বিসারকে তাঁর ছেলে অজাতশত্রু বন্দী করে রেখেছিল । এই জায়গাটা বিম্বিসার নিজেই পছন্দ করেছিলেন বন্দী থাকার জন্য । এখান থেকে গৃধকূট পাহাড় সরাসরি দেখা যায়, তাই বিম্বিসার এখানে থেকে ভগবান বুদ্ধকে প্রতক্ষ্য করতে চেয়েছিলেন । বিম্বিসার জেল এখন সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রায় । এখন একটা জেলের পাঁচিলের শুধুমাত্র নিচের অংশটা রয়েছে । এখানে মিনিট দশেক কাটিয়ে আমরা আবার ফেরার পথে চলতে শুরু করলাম ।

দুপুর প্রায় আড়াইটে বাজে, তাই এবার একটা জায়গায় লাঞ্চ সেরে নেওয়া হল । খাবারের মান খুব একটা ভালো নয়, মোটামুটি যতটা সম্ভব গর্তবোঝাই করা হল । খরচ হল ১,০৫৫/- টাকা ।


উষ্ণপ্রস্রবণ
খাবারের জায়গা থেকে সামান্য হেঁটে পৌছলাম আমাদের পঞ্চম গন্তব্য 'শতধারা কুন্ড' বা উষ্ণপ্রস্রবণ । মাটির অনেকটা নিচ থেকে সরাসরি উঠে আসে বলে এই জল বেশ গরম হয় এটা প্রচলিত মত হলেও আসলে বেশিরভাগ উষ্ণপ্রস্রবণের জলই কৃত্রিম উপায়ে গরম করা হয় । এখানে চান করার যে কুন্ডটা রয়েছে একটা পাঁচিলের উপর দিয়ে সেটা দেখা যায় । দেখলাম জলের বেগ খুবই কম যদিও তার মধ্যেই প্রচুর সংখ্যক মানুষ চান করছে । উষ্ণপ্রস্রবণে চান করাটা একটা আধ্যাত্মিক ব্যাপার, এটা করলে পুণ্য অর্জন করা যায়, এই বিশ্বাস থেকেই ঠান্ডাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে লোকজন চান করছে - করে ।

জৈন মিউজিয়াম
এবার মেইন রাস্তাটা ছেড়ে আমরা অন্য আরেকটা রাস্তা ধরলাম । এই রাস্তার পাশে নবনির্মিয়মান নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেল দেখা গেল । কিছুদূর চলার পরে পড়ল একটা মিউজিয়াম - এটা একটা জৈন মিউজিয়াম । বিহারের ইতিহাস গৌতম বুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গে মহাবীরের জন্যও বিখ্যাত, এখানে মহাবীরেরও নানারকম সৌধ আছে । এই জৈন মিউজিয়ামে টিকিট কেটে ঢুকতে হয়, মূল্য ২০/- টাকা । এখানে মিউজিয়ামের ভিতরে ক্যামেরার ব্যবহার নিষিদ্ধ । মিউজিয়ামটা খুবই সুন্দর - মহাবীরের এবং আরও কিছু জৈন বিখ্যাত লোকেদের জীবনের নানারকম বিখ্যাত ঘটনাকে মডেলের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে । আমাদের হাতে সময় বেশি নেই, তাই মডেলগুলো আর সেইসঙ্গে তার ওপরের লেখাগুলো একবার করে চোখ বুলিয়ে বেরিয়ে বেরিয়ে এলাম । জৈন ইতিহাস ভালো করে জানার ইচ্ছে থাকুক আর না থাকুক, এই মিউজিয়ামটা সময় নিয়ে দেখা অবশ্যই উচিৎ । দেখতে ভালোও লাগবে বলে আমার বিশ্বাস ।

জাপানী মন্দিরে বুদ্ধমূর্তি
এবার আবার ফেরার পথ ধরলাম । একটু এগোতেই পড়ল আমাদের সপ্তম তথা শেষ গন্তব্য 'জাপানী মন্দির' । এটা আর পাঁচটা জাপানী মন্দিরের মতোই (যদিও জাপানী মন্দির জিনিসটা শিবমন্দিরের মতো কমন্‌ নয়, পাড়ায় পাড়ায় একটা করে থাকে না !) এবং এখানে একটা বিরাট বুদ্ধমূর্তি আছে । এখানে ভেতরে উপাসনা (অথবা ওই জাতীয় কিছু) চলছিল আর সেইসঙ্গে গমগম শব্দে দামামা বাজছিল । আর সেইসঙ্গে বাজছিল কোনও একটা জাপানী সুর । আমরা এখানে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে হোটেলে ফেরার পথ ধরলাম । সায়োনারা !

টাঙ্গা আমাদের যেখান থেকে তুলেছিল, সেখানেই নামিয়ে দিল । বিকেল পাঁচটা বাজে, আমরা বাড়ি ফেরার পথে রওনা হব সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ । আমাদের ফেরার ট্রেন আর রাজগীর থেকে ধরা যাবে না, আমাদের যেতে হবে বখ্‌তিয়ারপুর আর সেটা যেতে হবে গাড়িতে । রাত ১০ঃ০৯ মিনিটের রাজেন্দ্রনগর হাওড়া এক্সপ্রেসে আমাদের ফেরার কথা । রাজগীর থেকে বখ্‌তিয়ারপুরের দূরত্ব ৫৪ কিলোমিটার আর গাড়িতে ঘন্টা দেড়েকের বেশি লাগার কথা নয়, কিন্তু এখানে রাতের দিকে প্রচন্ড কুয়াশা হয় আর তখন গাড়ি খুব সাবধানে ধীরে ধীরে চালাতে হয় । তাই ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না । আমরা আগেরদিন যে দোকান থেকে ডিনার আনিয়েছিলাম, সেই দোকানেই ডিনারের অর্ডার দিয়ে দিলাম । আমাদের গাড়ি ছাড়ার আগে আমরা এখান থেকে প্যাক করা খাবার নিয়ে নেব ।

হোটেলে ফিরে মালপত্র গুছিয়ে চেক্‌আউট করতে করতে কিছুটা দেরি হয়েই গেল । খাবার নিয়ে আমরা যখন রাজগীর ছেড়ে বখ্‌তিয়ারপুরের দিকে রওনা হলাম, তখন প্রায় সাড়ে সাতটা ।

আমাদের ড্রাইভার ঠিকই বলেছিল । রাস্তায় জায়গায় জায়গায় কুয়াশার ঘনত্ব এতটাই বেশি যে সামনের গাড়িটাও ভালো করে দেখা যাচ্ছে না । এই অবস্থাটা হবে জানাই ছিল আর আমাদের হাতে সে'জন্য বেশি সময় নেওয়াও ছিল । আমরা যখন স্টেশনে পৌঁছলাম তখন প্রায় রাত ন'টা ।

রাজগীর অঞ্চলে রাতে কিরকম ঠান্ডা পড়ে সেটা আজ ভালোভাবে টের পেলাম । আগের দু'দিন এই সময়ে হোটেলে ছিলাম বলে ঠান্ডাটা সেভাবে গায়ে অনুভব করিনি । বখ্‌তিয়ারপুর স্টেশনে কোনও ওয়েটিং রুম নেই, তাই খোলা স্টেশনের মধ্যেই একটা ছাদওয়ালা জায়গায় বসে থাকতে হল । প্রচন্ড ঠান্ডা আর সেইসঙ্গে ঘন কুয়াশা । আমি ঠান্ডার জায়গায় এর আগেও গেছি, এর থেকে অনেক বেশি ঠান্ডায় থেকেছি । কিন্তু রাজগীরের মতো এরকম জমাট বাঁধা ঠান্ডা এর আগে সেভাবে কোথাও পাইনি । এই ঠান্ডাটা যেন ভীষণ বেশি করে গায়ের ওপর চেপে বসে । সেইসঙ্গে কুয়াশার জন্য আবহাওয়াটা খুব বেশি আর্দ্র । সবমিলিয়ে আমি এটা জোর দিয়ে বলতে পারি রাজগীরের এই ঠান্ডা এমনকি যারা ঠান্ডা বা শীত ভালোবাসে, তাদেরও খারাপ লাগতে বাধ্য ।

ট্রেন এল নির্ধারিত সময়ের প্রায় চল্লিশ মিনিট দেরিতে । আমাদের অপেক্ষার শেষের দিকটা আরও ভয়ঙ্কর - ট্রেন আসছে ঘোষণা করার পর আমরা উঠে গিয়ে আমাদের কামরা সম্ভাব্য যেখানে পড়তে পারে সেখানে গিয়ে দাঁড়ালাম । সেখানে কোনও ছাউনিও নেই । নাক আর কান দিয়ে গলগল করে ধোঁয়া বেরোচ্ছে - বড়দের থেকেও বেশি কষ্ট হচ্ছে বাচ্চাদের । ট্রেনে উঠে একটু গরম হওয়ার সুযোগ পেয়ে নিজেদের ধন্য মনে হল ।

চারবছর আগে কালুক থেকে ফেরার সময়ে ট্রেনে ইংরিজী নববর্ষ উদ্‌যাপন করেছিলাম, এবারে আবার সেটা হল । আমাদের দলের সবাই সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে শুয়ে পড়লাম । পরেরদিন সকালে ট্রেনের হাওড়া পৌঁছনোর নির্ধারিত সময় সকাল ৬ঃ৩৫ মিনিট হলেও ট্রেন পৌঁছল প্রায় সাড়ে তিনঘন্টা দেরিতে । স্টেশন থেকে বাড়ি !

সারসংক্ষেপঃ

১. কলকাতা থেকে দু'তিনদিনের জন্য বেড়াতে যাওয়ার জন্য কলকাতা থেকে বেশি দূরে নয় এরকম একটা জায়গা হল আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য বিহারের রাজগীর । জায়গাটা প্রধানতঃ ঐতিহাসিক দর্শনীয় জায়গা হিসেবে বিখ্যাত ।
২. হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে রাজগীরে সরাসরি কোনও এক্সপ্রেস ট্রেন যায় না, এর নিকটবর্তী বড় স্টেশন হল বখ্‌তিয়ারপুর । বখ্‌তিয়ারপুর থেকে চাইলে লোক্যাল ট্রেনে অথবা গাড়িতে রাজগীর যাওয়া যায় ।
৩. রাজগীর ঐতিহাসিক জায়গা হিসেবে সুবিখ্যাত হলেও ট্যুরিজমের দিক থেকে বিহার অনেকটাই পিছিয়ে । তাই ইন্টারনেট বা অন্যান্য বৈদ্যুতিন পরিষেবার মাধ্যমে এখানে ভালো হোটেল পাওয়া বেশ কঠিন ।
৪. রাজগীরে আমরা যে হোটেলে প্রথমে উঠেছিলাম, 'হোটেল মমতা' সেখানে না থাকার জন্যই সবাইকে বলব । আর আমরা যে দ্বিতীয় হোটেলটায় উঠেছিলাম, 'হোটেল আনন্দলোক' সেটা আগেরটার থেকে ভালো হলেও সেরকম কিছুও নয় । তাই এখানে কোনও হোটেলের যোগাযোগের নম্বরই দিলাম না । রাজগীরের হোটেল নিজের ঝুঁকিতেই বুক করা ভাল !
৫. রাজগীরের কাছাকাছি সবথেকে ঘ্যাম জায়গা হল 'নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়'-এর ধ্বংসাবশেষ । যদি ইতিহাস সম্পর্কে আগ্রহ থাকে, তাহলে নালন্দা সম্পর্কে আগে থেকে একটু জেনে গেলে ভালো লাগবে ।
৬. নালন্দায় ঘোরার জন্য কমপক্ষে হাতে ঘন্টাতিনেক সময় নিয়ে যাওয়া দরকার । এবং একজন গাইড সঙ্গে থাকলে ভালোই লাগবে ।
৭. এখান থেকে কাছেই হল পাওয়াপুরীতে জৈনমন্দির । লেকের মাঝখানে তৈরি মন্দিরটা দেখতে ভাল লাগবে ।
৮. রাজগীরের লোক্যাল সাইটসিয়িং-এর মধ্যে বিশ্বশান্তি স্তূপ, বিম্বিসার জেল আর জৈন মিউজিয়ামটাই দেখার মতো - বাকিগুলোতে যাওয়া সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছু নয় । লোক্যাল সাইটসিয়িং-এর জন্য এখানে গাড়ি পাওয়া যায় না, টাঙ্গাই ভরসা ।
৯. প্রচন্ড শীতে রাজগীরে না যাওয়াই ভালো - কারণ এখানকার ঠান্ডা খুব খারাপ, শরীর রীতিমতো খারাপ হয়ে যায় ।
১০. কিছুটা মালভূমি ধরণের জায়গা হওয়া সত্ত্বেও রাজগীরের জল খুব একটা ভালো না, বিশেষ করে 'এখানকার জলে খুব ভালো হজম হয়' এই কথাটা রাজগীরের সম্পর্কে একেবারেই খাটে না ।

উপসংহারঃ


রাজগীর !
ভারতবর্ষের প্রাচীণ যুগের ইতিহাস নিয়ে আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য বিহারে রাজগীর একটা দর্শনীয় জায়গা । প্রধানতঃ বৌদ্ধ ও কিছুটা জৈনধর্মের জন্য বিখ্যাত এই জায়গা এখনও ইতিহাসের বেশ কিছু সাক্ষ্য বহন করে । এছাড়া পরবর্তীকালেরও কিছু কিছু রাজবংশের কীর্তিকলাপের নিদর্শন দেখা যায় এই রাজগীরে । তবে সুদীর্ঘকাল ধরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব বেশিরভাগ নির্মাণগুলোকেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে । রাজগীরের খুব কাছেই ইতিহাসপ্রসিদ্ধ নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে । নালন্দা শুধু ভারতবর্ষের নয়, ততকালীন বিশ্বের অন্যতম প্রধান শিক্ষার পীঠস্থান বলে মনে করা হয় । এই নালন্দা রাজগীর ভ্রমণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দেখার জায়গা । এছাড়া কাছাকাছির মধ্যে আরও কিছু দেখার জায়গাও আছে । তবে এ'কথা বলতেই হবে যে প্রধানতঃ বেড়ানোর জায়গা হিসেবে বিখ্যাত হলেও এখানকার মানুষের মধ্যে অতিথিবৎসলতার কিছুটা অভাব রয়েছে - এখানকার মানুষ এখনও ট্যুরিজমের দিক থেকে সেভাবে উন্নত নয় । জায়গাটা বেশ অপরিষ্কার - 'বিহার' বলতেই যা যা মনে পড়ে তার সবই এখানে রয়েছে । তবে এইসব প্রতিকূলতাগুলো কিছুটা মানিয়ে নিতে পারলে দেখার জায়গা হিসেবে রাজগীর-নালন্দা বেশ ভালো । অল্পখরচ আর দিনতিনেকের ছুটি পুঁজি থাকলে অনায়াসেই বেরিয়ে পড়া যেতে পারে !

রাজগীর ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

4 comments:

  1. পড়ে খুব ভালো লাগল,সুন্দর বর্ণনা।

    ReplyDelete