আমি ব্লগ লেখার খুব বেশি সমর্থক কোনওদিনও ছিলাম না, সত্যি কথা বলতে কি এখনও যে আছি তা নয় । তার একটা প্রধান কারণ আমার ধারণা ব্লগ লেখার থেকেও পড়া অনেক বেশি ক্লান্তিকর । অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অনেক সময়ই পড়তে শুরু করে শেষ করা হয়ে ওঠে না । নিজের ধৈর্য এবং/অথবা আগ্রহের অভাবকে 'ঠিক আছে, বাকিটা পরে পড়ব' জাতীয় অজুহাত দিয়ে ঢেকে দিই - আর আমরা সবাই জানি সেই 'পরে' টা আর কখনওই আসে না । তো, এই কারণে আমি ঠিক করেছি আমার ব্লগকে কখনওই অন্যের ক্লান্তির কারণ ঘটাব না, আমার ব্লগের বিষয় হবে প্রধানতঃ ভ্রমণ । আমার মতো যেসব বাঙালিরা ঘুরতে ভালোবাসে, তাদের জন্য আমার ব্লগ হবে তথ্যের একটা উৎস । আমার নিজের একটা অভ্যেস আছে, কোনও জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার আগে সেই জায়গাটা সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, আর ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে আমার বরাবরই মনে হয়েছে যে ইন্টারনেটে লেখালেখি করার ব্যাপারে বাঙালিদের থেকে কুঁড়ে খুব কম শিক্ষিত জাতই আছে । আমার মতো যেসব বাঙালিরা আছে, যারা ইন্টারনেটে কোনো একটা ইংরিজীতে লেখা দেখলেই না পড়ার চেষ্টা করে, তাদের জন্য আমার ব্লগ সহায়ক হবে, এই বিশ্বাস নিয়ে শুরু করছি আমার ভ্রমণকাহিনী । আগেই বলে রাখি, আমি স্ট্যাটিসটিক্সের ছাত্র ছিলাম, তাই আমার ব্লগে তত্ত্বের থেকে তথ্যের দেখাই মিলবে বেশি ।

Thursday, January 29, 2026

দার্জিলিঙ ভ্রমণ (দ্বিতীয়বার)

গেরবার যখন দার্জিলিঙ গিয়েছিলাম, তখনও লিখেছিলাম, দী-পু-দা (দীঘা-পুরী-দার্জিলিঙ) সম্পর্কে আমার ব্লগে কোনও পোস্ট করব না - কারণ এই তিনটে জায়গা সম্পর্কে বাঙালির আর নতুন করে কিছু জানার নেই। সেই কারণে এইজায়গাগুলোর ভ্রমণবৃত্তান্ত বিস্তারিতভাবে না লিখে আমি অতি সংক্ষিপ্তাকারে লিখে রাখি প্রধানতঃ এই কারণে যে হয়তো ভবিষ্যতে এগুলো অন্য কারোর বা আমারই কাজে লাগতে পারে। তাই অন্যান্যবারের মতো এবারের দার্জিলিঙ ভ্রমণেও থাকছে শুধুমাত্র ভ্রমণপথ, সারসংক্ষেপ আর উপসংহার।

ভ্রমণপথ ঃ

শনিবার ২৪শে জানুয়ারী, ২০২৬ ঃ শিয়ালদহ থেকে রাত্রি ১০ঃ১৫ মিনিটে দার্জিলিঙ মেল।

রবিবার ২৫শে জানুয়ারী, ২০২৬ ঃ সকাল ৮ঃ১০ মিনিটে - নিউ জলপাইগুড়ি - সকাল ১০ঃ৩০ মিনিটে নিউ জলপাইগুড়ি দার্জিলিঙ প্যাসেঞ্জার - সন্ধ্যে ৭ঃ১৫ মিনিটে - দার্জিলিঙ। দার্জিলিঙে রাত্রিবাস।

সোমবার ২৬শে জানুয়ারী, ২০২৬ ঃ দার্জিলিঙে হেঁটে লোক্যাল সাইটসিয়িং - দার্জিলিঙে রাত্রিবাস।

মঙ্গলবার ২৭শে জানুয়ারী, ২০২৬ ঃ দার্জিলিঙ থেকে টাইগার হিল - লোক্যাল সাইটসিয়িং - দার্জিলিঙে রাত্রিবাস।

বুধবার ২৮শে জানুয়ারী ২০২৬ ঃ বেলা ১১টায় চেক্‌ আউট - নিউ জলপাইগুড়ি - সন্ধ্যে ৭ঃ৩০ মিনিটে দার্জিলিঙ মেল।

বৃহস্পতিবার ২৯শে জানুয়ারী ২০২৬ ঃ সকাল ৫ঃ৪০ মিনিটে শিয়ালদহ।

সারসংক্ষেপ ঃ

১. এর আগেরবার জানুয়ারী মাসের ২৩ - ২৬ এর সময়ে দার্জিলিঙ গিয়ে খুব কম ট্যুরিস্ট দেখেছিলাম বলেই এবারে আবার একই সময়ে আবার যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম। কিন্তু এবারে গিয়ে দেখলাম, বিশেষ করে ২৬শে জানুয়ারী, ট্যুরিস্ট একেবারে গিজগজ করছে।

২. দার্জিলিঙে এখন অফ্‌সিজন বলে কিছু নেই। সারাবছরই কমবেশি ভিড়, তবে বিশেষ কয়েকটা সময়ে যেমন এপ্রিল-মে, সেপ্টেম্বর-অক্টোবর, আর ডিসেম্বর-জানুয়ারীতে ভিড় বেশ বেশিই থাকে।

৩. আমরা নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিঙ 'নিউ জলপাইগুড়ি দার্জিলিঙ প্যাসেঞ্জার' বা সংক্ষেপে দার্জিলিঙ টয়ট্রেনে গিয়েছিলাম। গাড়ির তুলনায় টয়ট্রেনের ভাড়া তিনগুণ বেশি, সময়ও তিনগুণ বেশি কিন্তু সেইসঙ্গে মজা বহুগুণ বেশি।

৪. দার্জিলিঙে আমরা ছিলাম 'হোটেল পাইনরিজ'-এ। এদের ওয়েবসাইট https://pineridgehotel.com/ থেকে বুকিং করা গেলেও আমরা করেছিলাম https://www.makemytrip.com/ এর মাধ্যমে।

৫. পাইনরিজ হোটেলের অবস্থান দূর্দান্ত - দার্জিলিঙ ম্যালের একেবারে পাশে কিন্তু এই কারণে হোটেলের একেবারে সামনে পর্যন্ত গাড়ি যায় না। হয় কেভেনটার'স থেকে (৩০০ মিটার হাল্কা চড়াই) নতুবা ভানুভবন থেকে (৫০০ মিটার প্রায় সমতল) হোটেল পর্যন্ত হেঁটে হোটেলে পৌঁছতে হয়। তবে আগে থেকে জানানো থাকলে এরা হোটেল থেকে মালবাহক পাঠানোর ব্যবস্থা করে দেয়।

৬. দার্জিলিঙ-এর আশেপাশে ঘোরার জন্য অনেকগুলো জায়গা থাকলেও মূলতঃ দেখার জায়গা টাইগার হিল, বাতাসিয়া লুপ, চিড়িয়াখানা, হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট আর রোপওয়ে । কোনও কারণেই এরমধ্যে কোনওটা বাদ দেওয়ার মানে হয় না।

৭. সাইটসিয়িংগুলোর মধ্যে সবথেকে বেশি সময় লাগে রোপওয়ে চড়তে। রোপওয়ের টিকিট কাটার পরে প্রায় ঘন্টা দুয়েক লাইন দেওয়া আর তারপর রোপওয়েতে যাতায়াত - সবমিলিয়ে হাতে সাড়ে তিন থেকে চার ঘন্টা সময় রাখা দরকার।

৮. আমার মতে দার্জিলিঙ-এর সবথেকে বড় আকর্ষণ দু'টো - টয়ট্রেন (দার্জিলিঙ-হিমালয়ান রেলওয়ে) আর ম্যাল। (কাঞ্চনজঙ্ঘা লিখলাম না, কারণ কাঞ্চনজঙ্ঘা দার্জিলিঙ ছাড়াও অন্য জায়গা থেকে দেখা যায়) এদের মধ্যে ম্যালে সবসময়েই যাওয়া যায়, কিন্তু সবসময়ে পাওয়া যায় না টয়ট্রেনের দেখা। আমরা সৌভাগ্যবান - আমরা ১৪৪ বছরের প্রাচীন এই ঐতিহ্যে সামিল হতে পেরেছি।

৯. ম্যাল থেকে মিনিটসাতেকের হাঁটা পথে দার্জিলিঙ-এর এক বিখ্যাত রেস্ট্যুরেন্ট কেভেন্টার্স। এখানকার খাবার যে খুব বৈশিষ্ট্যপূর্ণ তা নয় - কেভেন্টার্সে পাওয়া যায় এরকম সব খাবারই অন্যান্য জায়গায় লভ্য। এখানকার মূল আকর্ষণ হল এর ছাদে বসে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে দেখতে খাবার খাওয়া। কেভেন্টার্স ১০০ বছরের পুরোনো দোকান এবং সত্যজিৎ রায়ের একাধিক লেখায় এর উল্লেখ পাওয়া যায়। 'কাঞ্চনজঙ্ঘা' ছবির শ্যুটিং-এর সময়ে এখানে সত্যজিৎ রায় এসেছিলেন - সেই ছবি কেভেন্টার্সের দেওয়ালে টাঙানো রয়েছে।

১০. দার্জিলিঙ-এ দুপুরের বা রাতের খাওয়ার জন্য অনেক ছোটোখাটো হোটেল আছে, কিন্তু সবথেকে ভালো রেস্ট্যুরেন্ট হল - গ্লেনারিজ । ম্যাল থেকে মিনিট পাঁচেকের হাঁটা দূরত্বে এই রেস্ট্যুরেন্টের খাবার নিঃসন্দেহে খুব ভালো।

উপসংহার ঃ

দার্জিলিঙ
বহু বাঙালির মতোই দার্জিলিঙ আমার খুব প্রিয় একটা বেড়ানোর জায়গা। বৃটিশ আমলে তৈরি এই শৈলশহরে আজও কিছু কিছু জিনিস সেই বৃটিশদের মতোই রয়ে গেছে। এত মানুষের উপস্থিতি, এত গাড়ি, এত পর্যটক, এত হোটেল থাকা সত্ত্বেও শহরটা আজও আশ্চর্যরকমের পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। শহরটা পাহাড়ের নিজস্ব নিয়মকানুনও পুরোপুরিভাবে মেনে চলে। ঠিক ১২ বছর পরে দার্জিলিঙ গিয়ে আমার এইগুলোই মনে হয়েছে। কিন্তু সেইসঙ্গে যেটা ভালো লাগেনি সেটা হল অতিরিক্ত পরিমাণে মানুষের উপস্থিতি। দীঘা বা পুরীর সঙ্গে দার্জিলিঙের এটাই ছিল একটা বড় পার্থক্য - এখানে বছরের কিছু নির্দিষ্ট সময়ে ভীড় হলেও অনেক সময়েই ফাঁকা থাকত। এখন আর সেটা থাকছে না। আর সেইসঙ্গে যোগ হয়েছে ফুল গিয়ার পরে সুপারবাইক নিয়ে অ্যাডভেঞ্চার করতে আসা কিছু লোকজনের উৎপাত। এদের মধ্যে অনেকেই বাইক চালাতে চলাতেই মোবাইলে ভিডিও রেকর্ডিং করে, যেটা শুধু এদের নিজেদের জন্য বিপজ্জনক তাই নয়, বাকিদের জন্যও অসুবিধেজনক। যেকোনও দর্শনীয় জায়গাতেই লোকজন সবসময়ে গিজ্‌গিজ্‌ করছে। ব্যক্তিগতভাবে আমার এই ভীড় পছন্দ নয় - এই ভীড়ের দার্জিলিঙ আমার চেনা দার্জিলিঙ নয়। এরপরেও বলব যারা এই ভীড়টা উপেক্ষা করতে রাজী থাকে, তাদের জন্য দার্জিলিঙ একটা অনবদ্য ঘোরার জায়গা। এ'কথা জোর দিয়ে বলতে পারি এত মানুষজনের ভীড় সত্ত্বেও দার্জিলিঙের তুলনীয় ভ্রমণপীঠ পশ্চিমবঙ্গে তো বটেই, সারা দেশে খুব কমই আছে !

দার্জিলিঙ ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

No comments:

Post a Comment