আমি ব্লগ লেখার খুব বেশি সমর্থক কোনওদিনও ছিলাম না, সত্যি কথা বলতে কি এখনও যে আছি তা নয় । তার একটা প্রধান কারণ আমার ধারণা ব্লগ লেখার থেকেও পড়া অনেক বেশি ক্লান্তিকর । অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অনেক সময়ই পড়তে শুরু করে শেষ করা হয়ে ওঠে না । নিজের ধৈর্য এবং/অথবা আগ্রহের অভাবকে 'ঠিক আছে, বাকিটা পরে পড়ব' জাতীয় অজুহাত দিয়ে ঢেকে দিই - আর আমরা সবাই জানি সেই 'পরে' টা আর কখনওই আসে না । তো, এই কারণে আমি ঠিক করেছি আমার ব্লগকে কখনওই অন্যের ক্লান্তির কারণ ঘটাব না, আমার ব্লগের বিষয় হবে প্রধানতঃ ভ্রমণ । আমার মতো যেসব বাঙালিরা ঘুরতে ভালোবাসে, তাদের জন্য আমার ব্লগ হবে তথ্যের একটা উৎস । আমার নিজের একটা অভ্যেস আছে, কোনও জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার আগে সেই জায়গাটা সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, আর ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে আমার বরাবরই মনে হয়েছে যে ইন্টারনেটে লেখালেখি করার ব্যাপারে বাঙালিদের থেকে কুঁড়ে খুব কম শিক্ষিত জাতই আছে । আমার মতো যেসব বাঙালিরা আছে, যারা ইন্টারনেটে কোনো একটা ইংরিজীতে লেখা দেখলেই না পড়ার চেষ্টা করে, তাদের জন্য আমার ব্লগ সহায়ক হবে, এই বিশ্বাস নিয়ে শুরু করছি আমার ভ্রমণকাহিনী । আগেই বলে রাখি, আমি স্ট্যাটিসটিক্সের ছাত্র ছিলাম, তাই আমার ব্লগে তত্ত্বের থেকে তথ্যের দেখাই মিলবে বেশি ।

Thursday, January 29, 2026

দার্জিলিঙ ভ্রমণ (দ্বিতীয়বার)

গেরবার যখন দার্জিলিঙ গিয়েছিলাম, তখনও লিখেছিলাম, দী-পু-দা (দীঘা-পুরী-দার্জিলিঙ) সম্পর্কে আমার ব্লগে কোনও পোস্ট করব না - কারণ এই তিনটে জায়গা সম্পর্কে বাঙালির আর নতুন করে কিছু জানার নেই। সেই কারণে এইজায়গাগুলোর ভ্রমণবৃত্তান্ত বিস্তারিতভাবে না লিখে আমি অতি সংক্ষিপ্তাকারে লিখে রাখি প্রধানতঃ এই কারণে যে হয়তো ভবিষ্যতে এগুলো অন্য কারোর বা আমারই কাজে লাগতে পারে। তাই অন্যান্যবারের মতো এবারের দার্জিলিঙ ভ্রমণেও থাকছে শুধুমাত্র ভ্রমণপথ, সারসংক্ষেপ আর উপসংহার।

ভ্রমণপথ ঃ

শনিবার ২৪শে জানুয়ারী, ২০২৬ ঃ শিয়ালদহ থেকে রাত্রি ১০ঃ১৫ মিনিটে দার্জিলিঙ মেল।

রবিবার ২৫শে জানুয়ারী, ২০২৬ ঃ সকাল ৮ঃ১০ মিনিটে - নিউ জলপাইগুড়ি - সকাল ১০ঃ৩০ মিনিটে নিউ জলপাইগুড়ি দার্জিলিঙ প্যাসেঞ্জার - সন্ধ্যে ৭ঃ১৫ মিনিটে - দার্জিলিঙ। দার্জিলিঙে রাত্রিবাস।

সোমবার ২৬শে জানুয়ারী, ২০২৬ ঃ দার্জিলিঙে হেঁটে লোক্যাল সাইটসিয়িং - দার্জিলিঙে রাত্রিবাস।

মঙ্গলবার ২৭শে জানুয়ারী, ২০২৬ ঃ দার্জিলিঙ থেকে টাইগার হিল - লোক্যাল সাইটসিয়িং - দার্জিলিঙে রাত্রিবাস।

বুধবার ২৮শে জানুয়ারী ২০২৬ ঃ বেলা ১১টায় চেক্‌ আউট - নিউ জলপাইগুড়ি - সন্ধ্যে ৭ঃ৩০ মিনিটে দার্জিলিঙ মেল।

বৃহস্পতিবার ২৯শে জানুয়ারী ২০২৬ ঃ সকাল ৫ঃ৪০ মিনিটে শিয়ালদহ।

সারসংক্ষেপ ঃ

১. এর আগেরবার জানুয়ারী মাসের ২৩ - ২৬ এর সময়ে দার্জিলিঙ গিয়ে খুব কম ট্যুরিস্ট দেখেছিলাম বলেই এবারে আবার একই সময়ে আবার যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম। কিন্তু এবারে গিয়ে দেখলাম, বিশেষ করে ২৬শে জানুয়ারী, ট্যুরিস্ট একেবারে গিজগজ করছে।

২. দার্জিলিঙে এখন অফ্‌সিজন বলে কিছু নেই। সারাবছরই কমবেশি ভিড়, তবে বিশেষ কয়েকটা সময়ে যেমন এপ্রিল-মে, সেপ্টেম্বর-অক্টোবর, আর ডিসেম্বর-জানুয়ারীতে ভিড় বেশ বেশিই থাকে।

৩. আমরা নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিঙ 'নিউ জলপাইগুড়ি দার্জিলিঙ প্যাসেঞ্জার' বা সংক্ষেপে দার্জিলিঙ টয়ট্রেনে গিয়েছিলাম। গাড়ির তুলনায় টয়ট্রেনের ভাড়া তিনগুণ বেশি, সময়ও তিনগুণ বেশি কিন্তু সেইসঙ্গে মজা বহুগুণ বেশি।

৪. দার্জিলিঙে আমরা ছিলাম 'হোটেল পাইনরিজ'-এ। এদের ওয়েবসাইট https://pineridgehotel.com/ থেকে বুকিং করা গেলেও আমরা করেছিলাম https://www.makemytrip.com/ এর মাধ্যমে।

৫. পাইনরিজ হোটেলের অবস্থান দূর্দান্ত - দার্জিলিঙ ম্যালের একেবারে পাশে কিন্তু এই কারণে হোটেলের একেবারে সামনে পর্যন্ত গাড়ি যায় না। হয় কেভেনটার'স থেকে (৩০০ মিটার হাল্কা চড়াই) নতুবা ভানুভবন থেকে (৫০০ মিটার প্রায় সমতল) হোটেল পর্যন্ত হেঁটে হোটেলে পৌঁছতে হয়। তবে আগে থেকে জানানো থাকলে এরা হোটেল থেকে মালবাহক পাঠানোর ব্যবস্থা করে দেয়।

৬. দার্জিলিঙ-এর আশেপাশে ঘোরার জন্য অনেকগুলো জায়গা থাকলেও মূলতঃ দেখার জায়গা টাইগার হিল, বাতাসিয়া লুপ, চিড়িয়াখানা, হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট আর রোপওয়ে । কোনও কারণেই এরমধ্যে কোনওটা বাদ দেওয়ার মানে হয় না।

৭. সাইটসিয়িংগুলোর মধ্যে সবথেকে বেশি সময় লাগে রোপওয়ে চড়তে। রোপওয়ের টিকিট কাটার পরে প্রায় ঘন্টা দুয়েক লাইন দেওয়া আর তারপর রোপওয়েতে যাতায়াত - সবমিলিয়ে হাতে সাড়ে তিন থেকে চার ঘন্টা সময় রাখা দরকার।

৮. আমার মতে দার্জিলিঙ-এর সবথেকে বড় আকর্ষণ দু'টো - টয়ট্রেন (দার্জিলিঙ-হিমালয়ান রেলওয়ে) আর ম্যাল। (কাঞ্চনজঙ্ঘা লিখলাম না, কারণ কাঞ্চনজঙ্ঘা দার্জিলিঙ ছাড়াও অন্য জায়গা থেকে দেখা যায়) এদের মধ্যে ম্যালে সবসময়েই যাওয়া যায়, কিন্তু সবসময়ে পাওয়া যায় না টয়ট্রেনের দেখা। আমরা সৌভাগ্যবান - আমরা ১৪৪ বছরের প্রাচীন এই ঐতিহ্যে সামিল হতে পেরেছি।

৯. ম্যাল থেকে মিনিটসাতেকের হাঁটা পথে দার্জিলিঙ-এর এক বিখ্যাত রেস্ট্যুরেন্ট কেভেন্টার্স। এখানকার খাবার যে খুব বৈশিষ্ট্যপূর্ণ তা নয় - কেভেন্টার্সে পাওয়া যায় এরকম সব খাবারই অন্যান্য জায়গায় লভ্য। এখানকার মূল আকর্ষণ হল এর ছাদে বসে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে দেখতে খাবার খাওয়া। কেভেন্টার্স ১০০ বছরের পুরোনো দোকান এবং সত্যজিৎ রায়ের একাধিক লেখায় এর উল্লেখ পাওয়া যায়। 'কাঞ্চনজঙ্ঘা' ছবির শ্যুটিং-এর সময়ে এখানে সত্যজিৎ রায় এসেছিলেন - সেই ছবি কেভেন্টার্সের দেওয়ালে টাঙানো রয়েছে।

১০. দার্জিলিঙ-এ দুপুরের বা রাতের খাওয়ার জন্য অনেক ছোটোখাটো হোটেল আছে, কিন্তু সবথেকে ভালো রেস্ট্যুরেন্ট হল - গ্লেনারিজ । ম্যাল থেকে মিনিট পাঁচেকের হাঁটা দূরত্বে এই রেস্ট্যুরেন্টের খাবার নিঃসন্দেহে খুব ভালো।

উপসংহার ঃ

দার্জিলিঙ
বহু বাঙালির মতোই দার্জিলিঙ আমার খুব প্রিয় একটা বেড়ানোর জায়গা। বৃটিশ আমলে তৈরি এই শৈলশহরে আজও কিছু কিছু জিনিস সেই বৃটিশদের মতোই রয়ে গেছে। এত মানুষের উপস্থিতি, এত গাড়ি, এত পর্যটক, এত হোটেল থাকা সত্ত্বেও শহরটা আজও আশ্চর্যরকমের পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। শহরটা পাহাড়ের নিজস্ব নিয়মকানুনও পুরোপুরিভাবে মেনে চলে। ঠিক ১২ বছর পরে দার্জিলিঙ গিয়ে আমার এইগুলোই মনে হয়েছে। কিন্তু সেইসঙ্গে যেটা ভালো লাগেনি সেটা হল অতিরিক্ত পরিমাণে মানুষের উপস্থিতি। দীঘা বা পুরীর সঙ্গে দার্জিলিঙের এটাই ছিল একটা বড় পার্থক্য - এখানে বছরের কিছু নির্দিষ্ট সময়ে ভীড় হলেও অনেক সময়েই ফাঁকা থাকত। এখন আর সেটা থাকছে না। আর সেইসঙ্গে যোগ হয়েছে ফুল গিয়ার পরে সুপারবাইক নিয়ে অ্যাডভেঞ্চার করতে আসা কিছু লোকজনের উৎপাত। এদের মধ্যে অনেকেই বাইক চালাতে চলাতেই মোবাইলে ভিডিও রেকর্ডিং করে, যেটা শুধু এদের নিজেদের জন্য বিপজ্জনক তাই নয়, বাকিদের জন্যও অসুবিধেজনক। যেকোনও দর্শনীয় জায়গাতেই লোকজন সবসময়ে গিজ্‌গিজ্‌ করছে। ব্যক্তিগতভাবে আমার এই ভীড় পছন্দ নয় - এই ভীড়ের দার্জিলিঙ আমার চেনা দার্জিলিঙ নয়। এরপরেও বলব যারা এই ভীড়টা উপেক্ষা করতে রাজী থাকে, তাদের জন্য দার্জিলিঙ একটা অনবদ্য ঘোরার জায়গা। এ'কথা জোর দিয়ে বলতে পারি এত মানুষজনের ভীড় সত্ত্বেও দার্জিলিঙের তুলনীয় ভ্রমণপীঠ পশ্চিমবঙ্গে তো বটেই, সারা দেশে খুব কমই আছে !

দার্জিলিঙ ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Sunday, January 25, 2026

দার্জিলিঙ হিমালয়ান রেলওয়ে ভ্রমণ

মার ব্লগে আজ পর্যন্ত যত পোস্ট করেছি, তার সবগুলোই কোনও না কোনও জায়গায় ভ্রমণ নিয়ে। সেখানে গিয়েছি, থেকেছি, সাইটসিয়িং করেছি, ফিরে এসেছি। এই পোস্টটা ব্যতিক্রম। এই প্রথম কোনও পোস্ট করছি শুধুমাত্র একটা জার্ণি নিয়ে - একটা ভ্রমণ পথ নিয়ে। আর এই ভ্রমণ পথের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে অন্য কারুর বা আমার কাজে লাগতে পারে, এটা মাথায় রেখেও এই পোস্টটা করছি না। এটা শুধুমাত্র একটা যাত্রাপথের অভিজ্ঞতার পোস্ট - যে অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে এবারে দার্জিলিঙ যাওয়ার সময়ে। মূলতঃ সেই অভিজ্ঞতা আমার ব্লগের পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্যই আলাদা করে এই পোস্টটা করছি।

কিছুটা অতীতের কথা দিয়েই শুরু করা যাক। আমি জীবনে প্রথম দার্জিলিঙ গিয়েছিলাম ১৯৯২ সালে - অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ৩৪ বছর আগে। তখন আমার বয়স ছিল ৯ বছর। তখন শুধু শুনেছিলাম দার্জিলিঙে টয়ট্রেন নামক একটা ট্রেন চলে। সেবার দার্জিলিঙের রাস্তায় ঘোরার সময়ে টয়ট্রেনের লাইন দেখেছিলাম আর একদিন হঠাৎই দেখতে পেয়ে গিয়েছিলাম টয়ট্রেন - আমাদের থেকে অনেক দূরে পাহাড়ের বেশ কিছুটা নিচের দিকে। ছোটাছুটি করে কোনওমতে একটা ছবিও তুলেছিলাম (এখনকার দিনের মতো ডিজিট্যাল ক্যামেরা নয়, তখনকার দিনের ফিল্ম ক্যামেরা যাতে এক-একটা ছবি হিসেব করে তুলতে হত)। সেবারের মতো এইটুকুই। এবারের আগে ২০১৪ সালে যখন দার্জিলিঙ গিয়েছি, তখন এই টয়ট্রেন শুধু দেখার নয়, চড়ার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। দার্জিলিঙ - ঘুম - দার্জিলিঙের চক্রাকার ভ্রমণ, নাম জয় রাইড। অভিজ্ঞতা হিসেবে ভালোই, কিন্তু বড্ড কম। তারপর ২০১৬ সালে যখন তাকদা ভ্রমণের পরিকল্পনা করা হল, তখন ঠিক করেছিলাম নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ঘুম পর্যন্ত টয়ট্রেনে এসে বাকিটা গাড়িতে যাওয়া হবে। সেইমতো টয়ট্রেনের টিকিটও কাটা হয়, কিন্তু শেষ মূহুর্তে রেল কর্তৃপক্ষ ট্রেনটা ক্যানসেল করে দেয়। এই লাইনে এই ঘটনা আকছার ঘটে, তাই সঙ্গে কনফার্ম টিকিট থাকলেও যতক্ষণ না ট্রেনে উঠে বসছি, ততক্ষণ নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না।

ওভারব্রীজ থেকে নামার সময়ে
এবারে দার্জিলিঙ যাওয়ার পরিকল্পনা করেইছিলাম প্রধানতঃ এই টয়ট্রেনের জন্য। এবারে শুধুই আমরা ৬ জন - আমি অমৃতা বাবা মা কথা কলি। ২৪শে জানুয়ারী ২০২৬ শনিবার রাতে শিয়ালদহ থেকে দার্জিলিঙ মেল ধরে ২৫শে জানুয়ারী ২০২৬ রবিবার সকালে নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছলাম। প্রত্যেকবার নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে যখন ওভারব্রীজটা হেঁটে পার হতাম, নিচের টয়ট্রেনের লাইনটা দেখে মনে হত "কোনও একবার ওভারব্রীজটা পার হব না, ওভারব্রীজ থেকে টয়ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে নেমে টয়ট্রেনে চড়ে যাব।" এবারে ঠিক সেটাই ঘটল - ওভারব্রীজ থেকে বাইরে না বেরিয়ে টয়ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে নামলাম।

টয়ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে
টয়ট্রেনের প্ল্যাটফর্মটা ছোট, নিচু আর সেইসঙ্গে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। একটা ফার্স্টক্লাস টয়লেটও আছে, সেটাও যাকে বলে ঝাঁ চক্‌চকে। ট্রেন ছাড়ার নির্দিষ্ট সময় সকাল ১০টা অর্থাৎ আমাদের হাতে এখনও ঘন্টাখানেক সময় আছে। এই সময়টার মধ্যে আমরা সঙ্গে থাকা স্যান্ডউইচ্‌ ইত্যাদির সদ্ব্যবহার করে ফেললাম।

আমাদের ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ
ট্রেনটা চলে এল সাড়ে নটার কিছু পরেই। কিন্তু এসে সে প্ল্যাটফর্মে না ঢুকে প্ল্যাটফর্মের কাছে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বুঝলাম সেখানে দাঁড় করিয়ে ট্রেনের যন্ত্রপাতি নিয়ে কিছু কাজকর্ম হচ্ছে। খুট্‌খাট, ঠক্‌ঠক্‌, ঠংঠং ইত্যাদি শব্দ চলতে থাকল। এইভাবে আমাদের প্রায় ৪৫ মিনিট দাঁড় করিয়ে রেখে শেষপর্যন্ত ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢুকল তখন সাড়ে দশটা - অর্থাৎ শুরুতেই আধঘন্টা লেট ! কিন্তু টয়ট্রেনে যেতে হলে সময়ের কথা ভাবলে চলবে না, গাড়ির থেকে অনেক বেশি সময় লাগবে জেনেই আমরা এতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের ট্রেনের দুটো বগি, একটা এ সি চেয়ারকার আর অন্যটা ফার্স্ট ক্লাস। আমাদের ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট কাটা ছিল। কামরার সামনের দিকে একটা ফাঁকা জায়গা আছে, যাত্রীদের মালপত্র সেখানে ডাঁই করে রাখা হয়। আমরা আমাদেরগুলো রেখে নিজেদের সিটে বসে পড়লাম। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই টিটিই আমাদের টিকিট চেকিং করল। আর মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে আমাদের নিয়ে দার্জিলিঙের উদ্দেশ্যে রওনা দিল ৫২৫৪১ নিউ জলপাইগুড়ি - দার্জিলিঙ প্যাসেঞ্জার।

যাওয়ার পথটা আমার অনেকটাই চেনা। এর আগে বিভিন্ন সময়ে পাহাড়ে যাওয়ার জন্য শিলিগুড়ি শহরের বিভিন্ন রাস্তা ও রেলপথ দিয়ে গিয়েছি, তারমধ্যে অনেক সময়েই রাস্তার ধারে টয়ট্রেনের লাইন দেখতে পেয়েছি। কিন্তু এবারের দৃষ্টিভঙ্গিটা আলাদা - সেই টয়ট্রেনের লাইনের উপরে টয়ট্রেনে বসে শহরের রাস্তা, রেলপথগুলো দেখা। পুরোপুরি শহরের মধ্যে প্রায় পঁয়ত্রিশ মিনিট চলার পরে আমাদের ট্রেন পৌঁছলো তার প্রথম স্টপেজ - শিলিগুড়ি জাংশন-এ। এর আগে ডুয়ার্স ভ্রমণের সময়ে আমি অমৃতা কথা কলি এই স্টেশন থেকে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস ধরেছিলাম, তখন এখানকার টয়ট্রেনের স্টেশনটাও দেখেছিলাম। এবারেও দেখলাম তবে টয়ট্রেনের ভিতরে বসে। শিলিগুড়িতে ট্রেন থামল মিনিট পাঁচেক - কেউ ওঠানামা করল না, শুধু রেলের কিছু লোকজন ছাড়া। এখানে জানিয়ে রাখি এই টয়ট্রেনের টিকিট শুধুমাত্র নিউ জলপাইগুড়ি থেক দার্জিলিঙ অথবা দার্জিলিঙ থেকে নিউ জলপাইগুড়িরই কাটা যায়, অন্য কোনও স্টেশন থেকে নামা বা ওঠার টিকিট কাটা যায় না। চাইলে অন্য কোনও স্টেশন থেকে ওঠা যায় বা নামাও যায়, কিন্তু টিকিট পুরো জার্ণিটারই কাটতে হবে।

রেলপথের দুধারে জঙ্গল
শিলিগুড়ি স্টেশন থেকে ট্রেন আরও এগিয়ে চলল। ট্রেনের রাস্তা পুরোটাই হিলকার্ট রোডের উপরে - একেবারে দার্জিলিঙ পর্যন্ত। শিলিগুড়ি থেকে ছেড়ে ট্রেন সমতলের মধ্যে দিয়েই চলেছে, তবে দুদিকে শহর-শহর ব্যাপারটা ক্রমশঃ কমে আসছে। তার বদলে বেশ গাছপালা-ঝোপঝাড় দেখা যাচ্ছে। পরিবেশ মনোরম তবে তাপমাত্রা বেশ চড়া। আমরা কেউই গরম জামা পরিনি আর তাতেই আরাম লাগছিল। শিলিগুড়ি থেকে আরও আধঘন্টা চলার পরে স্টেশন শুক্‌না। ট্রেন এখানে মিনিটখানেক দাঁড়ালো, স্টেশনের রেলের লোকের সঙ্গে কথাবার্তা বলে আমাদের ট্রেন আবার এগিয়ে চলল। আর এবারে যতই এগোতে থাকল, রাস্তার দুদিকে জঙ্গল শুরু হল - এখানে আর কোনও বাড়িঘর নেই। আর এই পথে চলতে চলতেই দেখতে পেলাম আমরা ক্রমশঃ পাহাড়ের উপরে উঠে যাচ্ছি !

রাস্তার সঙ্গে চলেছে টয়ট্রেন
পাহাড়ের পথে ট্রেনে করে ওঠার এই দৃশ্যের বর্ণনা দেওয়ার সাধ্য আমার নেই - কোনও সাহিত্যিক বা নিদেনপক্ষে কবি হলে হয়তো পারতেন। আমি শুধু এটুকুই বলব এই জার্ণির জন্য বহু বছর অপেক্ষা করা সার্থক, দীর্ঘ সময় ধরে এই জার্ণিটা করা সার্থক, বেশি টাকা খরচ করা সার্থক, খাবার জায়গা না পেলে না খেয়ে থাকা সার্থক, টয়লেট পেলে চেপে বসে থাকা সার্থক (না, এটা বোধহয় বাস্তবে বেশিক্ষণ সম্ভব নয় !) - এককথায় এই জার্ণির জন্য অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতিই সহ্য করে নেওয়া যেতে পারে। হিল কার্ট রোড পাহাড়ের গা দিয়ে উপরে উঠছে আর সেইসঙ্গে উঠছে আমাদের টয়ট্রেনের লাইন। কখনও রাস্তার ডানদিকে, কখনও বাঁদিকে, কখনও রাস্তা ছেড়ে কিছুটা নিচে চলে যাচ্ছে আবার কখনও রাস্তা থেকে কিছুটা উপরে উঠে যাচ্ছে। এইভাবে চলতে চলতে পেরিয়ে গেলাম রংটং স্টেশন। এখানে ট্রেন দাঁড়ালোই না।

রেলের Z-রিভার্স পথ (চিত্রঋণ ঃ গুগ্‌ল্‌ ম্যাপ)
আমরা ক্রমশঃ উপরের দিকে উঠছি। পাহাড়ী পথ ধরে ওঠার দৃশ্য নতুন নয়, কিন্তু টয়ট্রেন থেকে সেই দৃশ্য দেখাটা নতুন। আর অসাধারণ। রংটং পেরিয়ে কিছুদূর গিয়ে ট্রেনটা একজায়গায় থেমে গিয়ে পিছন দিকে চলা শুরু করল। কিছুটা পিছন দিকে গিয়ে একটা অন্য লাইন ধরে কিছুটা উপরে উঠে গেল। তারপর আবার একটা অন্য লাইন ধরে সামনের দিকে চলতে শুরু করল। এই জায়গায় লাইনটা একটা Z অক্ষরের মতো। এটাই হল দার্জিলিঙ হিমালয়ান রেলওয়েজের বিখ্যাত 'Z-রিভার্স কৌশল' - এটা থাকার জন্য অল্প দূরত্বের মধ্যে ট্রেনটা বেশ কিছুটা উপরে উঠে যায়। এটার সম্পর্কে একটা গল্প প্রচলিত আছে, সেটা এখানে লিখে রাখি।

দার্জিলিঙ পৌঁছনোর জন্য যখন টয়ট্রেনের পথ তৈরি হচ্ছে, তখন একজন ইঞ্জিনিয়ার পাহাড়ের পথে এই রেলপথ তৈরির ডিজাইন করছিলেন। রংটং-এর এই জায়গায় অল্প দূরত্বের মধ্যে ট্রেনটাকে বেশ কিছুটা খাড়াই পথে উপরে ওঠানোর প্রয়োজন হচ্ছিল। কিন্তু সেটা তিনি কোনওভাবেই পেরে উঠছিলেন না আর এই নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত ছিলেন। একদিন তাঁর স্ত্রী চা দিতে এসে স্বামীকে জিজ্ঞেস করলেন - তুমি কী নিয়ে এত চিন্তা করছ ?

মাথার মধ্যে কাজ সংক্রান্ত চিন্তার মাঝে স্ত্রীর এই প্রশ্নে ইঞ্জিনিয়ারমশাই কিছুটা বিরক্তই হলেন। বললেন - তোমাকে কী বলব, তুমি এর কিছুই বুঝবে না।

- তা হয়তো বুঝবো না, তবে কদিন ধরেই দেখছি তুমি কিছু একটা নিয়ে খুব চিন্তা করছ, তাই ...

টেবিলে রাখা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সামনের ড্রইং-এর দিকে তাকিয়ে গভীরভাবে নিবিষ্ট অবস্থায় ইঞ্জিনিয়ারমশাই কিছুটা অন্যমনস্কভাবেই স্ত্রী-র কথার উত্তরে বললেন - একটা জায়গায় গিয়ে আটকে গেছি, কিছুতেই এগোতে পারছি না।

ইঞ্জিনিয়ার স্বামীর ঘরোয়া স্ত্রী। ইঞ্জিনিয়ারিং বুদ্ধি নেই - সাধারণ বুদ্ধি থেকে একটা হাল্কা কথা বলে হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

- এগোতে না পারো, পিছিয়ে যাও !

কথাটা স্বামীর মাথায় রেখাপাত করল। আবিষ্কার করে ফেললেন অল্প উচ্চতায় ট্রেনকে খাড়াই পথে বেশ কিছুটা উপরে তোলার 'Z-রিভার্স কৌশল'। শুধু রংটং-এ নয়, দার্জিলিং-হিমালয়ান রেলওয়েতে এই কৌশল ব্যবহার করে ট্রেনকে উপরে তোলা হল আরও পাঁচ জায়গায়। সফলভাবে ট্রেন চলা শুরু হল - ইতিহাস সৃষ্টি করে চলতে থাকল প্রায় ১৫০ বছর ধরে !

- এগোতে না পারো, পিছিয়ে যাও !

তিনধারিয়া স্টেশন
রংটং-এর পরের স্টেশন তিনধারিয়া। এখানকার উচ্চতা ২,৮২০ ফুট। এখানে ট্রেন পৌঁছল দুপুর ১ঃ৩০ নাগাদ। তিনধারিয়ায় ট্রেন বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়ায়। স্টেশনটাও তুলনামূলকভাবে একটু বড়, এখানকার টয়লেট ব্যবহার করা যেতে পারে। স্টেশনে কোনও খাবার ব্যবস্থা নেই, তবে স্টেশনের বাইরেই একটা দোকান আছে যেখানে মোমো, জল, কোল্ড ড্রিঙ্কস্‌ ইত্যাদি পাওয়া যায়। তিনধারিয়ায় বেশিক্ষণ দাঁড়ানোর একটা কারণ হল এখানে ফিরতি ট্রেনটা পাস করে। দার্জিলিঙ হিমালয়ান রেলওয়ে সিঙ্গল লাইন, তাই এখানে দুটো ট্রেনের মধ্যে ক্রসিং হয়। আমরা একসঙ্গে দুটো টয়ট্রেন দেখলাম এটাও একটা বড় পাওনা - সচরাচর দেখার সুযোগ পাওয়া যায় না। ফিরতি ট্রেনটা প্ল্যাটফর্মে ঢোকার পরে আমাদের ট্রেন আবার রওনা দিল।

কার্সিয়ং ছেড়ে এগিয়ে চলা
আমরা আরও উপরের দিকে উঠে চলেছি। যত উপরে ওঠা যায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ততই বাড়তে থাকে। তিনধারিয়ার পরে আমরা পরপর দুটো স্টেশন যথাক্রমে গয়াবাড়ি আর মহানদী পেরিয়ে গেলাম - এর কোনওটাতেই ট্রেন থামল না। মহানদীর পরের স্টেশন কার্সিয়ং। আমরা পৌঁছলাম বিকেল ৩ঃ৪৫ নাগাদ। এর আগে কার্সিয়ং ও সিটং ভ্রমণের সময়ে আমরা কার্সিয়ং স্টেশনে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়েছি, জায়গাটা বেশ ভালোরকম চেনা। কার্সিয়ং-এর উচ্চতা ৪,৮৬৪ ফুট। এখানেও ট্রেন আধঘন্টা দাঁড়ায়। আমাদের ট্রেনের গার্ডের কাছ থেকে জানলাম এখান থেকে আরেকটা বগি আমাদের ট্রেনের সঙ্গে জোড়া হবে, সেটা দার্জিলিঙ পর্যন্ত যাবে। কার্সিয়ং স্টেশনের পাশে অনেক দোকানপাট আছে, খাবারের দোকানও অনেক আছে। সেখান থেকে চা-কেক ইত্যাদি খেয়ে নেওয়া হল। ৪ঃ১৫ নাগাদ তিনটে বগি নিয়ে কার্সিয়ং থেকে ট্রেন ছাড়ল। সূর্যাস্ত না হয়ে গিয়ে থাকলেও শীতকালে বিকেল চারটের পরে পাহাড়ে আলো কমতে শুরু করে, তাই দূরের পাহাড়ের সৌন্দর্য আর বেশিক্ষণ উপভোগ করা সম্ভব নয়।

টুং স্টেশন
দেখতে দেখতে আরও দুটো স্টেশন যথাক্রমে টুং আর সোনাদা পেরিয়ে গেল। এগুলোতেও ট্রেন থামল না। কার্সিয়ং স্টেশনের পরে বাকি রাস্তাটার বেশিরভাগটাই লোকবসতিপূর্ণ আর এই বসতির মধ্যে দিয়ে টয়ট্রেনের যাত্রাটা সবসময়েই উপভোগ্য।



সন্ধ্যে ৬ঃ৪০ নাগাদ ট্রেন পৌঁছল ঘুম স্টেশনে। ঘুম হল ভারতবর্ষের উচ্চতম রেল স্টেশন - এর উচ্চতা ৭,৪০৭ ফুট। পৃথিবীতে এর স্থান ১৪ নম্বর। ২০১৪ সালে যখন দার্জিলিঙ এসেছিলাম, তখন টয়ট্রেনের জয় রাইডে দার্জিলিঙ-ঘুম-দার্জিলিঙ রাউন্ড ট্রিপে আমরা ঘুম-এ এসেছিলাম। ট্রেনে করে দেশের উচ্চতম রেল স্টেশনে পৌঁছনোটাও একটা অভিজ্ঞতা !

ঘুম-এর পর থেকে রেলপথ নিচের দিকে নামতে থাকে কারণ দার্জিলিঙের উচ্চতা ঘুমের থেকে কম - ৬,৮০১ ফুট। ঘুম থেকে দার্জিলিঙ পৌঁছতে মিনিট কুড়ি লাগে। রাতের অন্ধকারে ট্রেন যত দার্জিলিঙের দিকে এগোয়, অন্ধকার পাহাড়ের গায়ে দার্জিলিঙ শহরের বিন্দু বিন্দু আলোগুলো ক্রমশঃ স্পষ্ট হয়। আমরা পাহাড়ের কোনও জায়গায় পৌঁছলে সাধারণতঃ দিনের আলোর মধ্যেই পৌঁছই, রাতের অন্ধকারে পাহাড়ের গায়ে আলো দেখার সুযোগ বড় একটা হয় না। এবারে হল আর টয়ট্রেন থেকে হল। এই অভিজ্ঞতা গাড়ি চড়ে দেখার অভিজ্ঞতার থেকে আলাদা কারণ দৃশ্যপট পরিবর্তনের গতি খুব কম।

এরপর আমাদের পথে পড়ল 'বাতাসিয়া লুপ'। এটাও দার্জিলিঙ হিমালয়ান রেলওয়েজের একটা খুবই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ জায়গা। যেহেতু ঘুম থেকে দার্জিলিঙ যাওয়ার সময় ট্রেনকে নিচের দিকে নামতে হয় তাই এই বাতাসিয়া লুপে এসে ট্রেন একটা পাক ঘুরে অনেকটা নিচের দিকে নেমে যেতে পারে। দার্জিলিঙ থেকে জয় রাইডে ঘুম যাওয়ার সময় ট্রেন এই বাতাসিয়া লুপে মিনিট দশেক দাঁড়িয়ে থাকে।

সন্ধ্যে ৭ঃ১০ মিনিটে আমাদের ট্রেন পৌঁছে দিল আমাদের গন্তব্য - ক্যুইন অফ্‌ হিলস্‌ - দার্জিলিঙ-এ। দার্জিলিঙ-হিমালয়ান রেলওয়ের এটাই টার্মিনাল স্টেশন। স্টেশনটা বেশ বড় - এখানে অনেকগুলো লাইন আছে আর সেইসব লাইনে অনেকগুলো ইঞ্জিন আর বগি দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের ট্রেনযাত্রার এখানেই শেষ, আমরা মালপত্র নিয়ে ট্রেন থেকে নেমে পড়লাম। বাইরে বেশ ভালোই ঠান্ডা, ট্রেনের মধ্যে থেকে যেটা এতক্ষণ সেভাবে অনুভব করা যায়নি। স্টেশন চত্বরে কিছু গাড়ি আছে, এরা ট্রেনের যাত্রীদের হোটেলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ডাকাডাকি করছে। আমাদের হোটেল স্টেশন থেকে ৮০০ মিটার দূরে, তাই আমরা হেঁটেই যাব ঠিক ছিল।

টয়ট্রেন আর দার্জিলিঙ স্টেশনকে পিছনে ফেলে রেখে আমরা হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। মনে থেকে গেল শুধু একরাশ ভালোলাগা !

সারসংক্ষেপ ঃ

১. নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিঙ পর্যন্ত (এবং ফিরতি পথে) চলে ৫২৫৪১ নিউ জলপাইগুড়ি - দার্জিলিঙ প্যাসেঞ্জার। এই রেলপথ দার্জিলিঙ-হিমালয়ান রেলওয়েজ (ডি এইচ আর) নামে পরিচিত এবং ১৯৯৯ সাল থেকে এটি ইউনেসকো ওয়র্ল্ড হেরিটেজ প্রপার্টির মধ্যে পড়ে।

২. টয়ট্রেনের টিকিট https://www.irctc.co.in/nget/train-search থেকেই কাটা যায়। টিকিট শুধুমাত্র নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিঙেরই (অথবা দার্জিলিঙ থেকে নিউ জলপাইগুড়ির) কাটা সম্ভব যদিও ট্রেনে ওঠানামা যেকোনও স্টেশন থেকে করা যায়।

৩. টয়ট্রেনের লাইন ২ ফুটের ন্যারো গেজ। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে টয়ট্রেনের আলাদা প্ল্যাটফর্ম আছে, ওভারব্রীজের সাহায্যে এই প্ল্যাটফর্মে পৌঁছনো যায়।

৪. দার্জিলিঙ টয়ট্রেনে সাধারণতঃ দুটো বগি থাকে - একটা এ সি চেয়ারকার আর অন্যটা ফার্স্টক্লাস। এ সি চেয়ারকারের ভাড়া ফার্স্টক্লাসের থেকে বেশি।

৫. ট্রেনের ভিতরে মালপত্র রাখার বিশেষ কোনও জায়গা নেই। বগির সামনের দিকে একটা ফাঁকা জায়গায় বড় ব্যাগ, ট্রলি, স্যুটকেস ইত্যাদি রাখতে হয় আর ছোট ব্যাগগুলো নিজেদের কাছেই রাখতে হয়।

৬. টয়ট্রেনে যাওয়ার সময়ে সঙ্গে খাবারদাবার নিয়ে নিতে হবে কারণ পথে কোনও খাবারের দোকান বা ব্যবস্থা নেই। চাইলে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনের ক্যান্টিন থেকে লাঞ্চ প্যাক করে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে।

৭. যাওয়ার সময়ে কিছু গরম জামাকাপড় সঙ্গে রাখা ভালো কারণ নিউ জলপাইগুড়িতে গরম থাকলেও যত পাহাড়ে ওঠা হবে তত ঠান্ডা লাগবে। আর গরম জামাকাপড় স্যুটকেসে ঢোকানো থাকলে দার্জিলিঙ পৌঁছনোর আগে সেগুলো বের করার সুযোগ নেই।

৮. নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিঙ পৌঁছনোর সময়সীমা সাড়ে সাত ঘন্টা হলেও ট্রেনের পৌঁছতে সাড়ে আট থেকে নয় ঘন্টা প্রায় প্রতিদিনই লেগে যায়। পুরো পথটাই ট্রেন একটা নির্দিষ্ট গতিতে চলে আর সেটা কখনোই ঘন্টায় ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটারের বেশি নয়। 

৯. দার্জিলিঙ যাওয়া বা ফেরার পথে টয়ট্রেন চড়ার ইচ্ছে থাকলে সেটা যাওয়ার সময় করাই ভালো। টয়ট্রেন প্রায়শই অনেক দেরি করে, কাজেই নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছে যদি ওই দিনই ফেরার ট্রেন ধরার পরিকল্পনা থাকে তাহলে ট্রেন মিস হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকবে।

১০. দার্জিলিঙ স্টেশন থেকে হোটেল যদি হাঁটা দূরত্বে না হয় তাহলে গাড়ি আগে থেকেই বুক করা ভালো। স্টেশনের গাড়ি বুক করতে গেলে তারা অনেক বেশি ভাড়া চাইতে পারে।

উপসংহার ঃ

দার্জিলিঙ হিমালয়ান রেলওয়ে
ভারতবর্ষে বর্তমানে পাঁচ জায়গায় টয়ট্রেন চলে। পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিঙ হিমালয়ান রেলওয়ে ছাড়াও এই তালিকায় রয়েছে হিমাচল প্রদেশের কালকা সিমলা রেলওয়ে ও কাঙ্গরা ভ্যালি রেলওয়ে, তামিলনাড়ুর নীলগিরি মাউন্টেন রেলওয়ে আর মহারাষ্ট্রের মাথেরান হিল রেলওয়ে। এদের মধ্যে সবচেয়ে পুরনো ও সবচেয়ে বিখ্যাত হল দার্জিলিঙ হিমালয়ান রেলওয়ে বা দার্জিলিঙ টয়ট্রেন। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিঙের ৮৮ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে এই ট্রেন ৭,৪০০ ফুট উচ্চতায় উঠে আবার ৬,৮০০ ফুট উচ্চতায় নামে। এত অল্প দূরত্বের মধ্যে ট্রেনের এতটা উপরে ওঠার নজির ভারতবর্ষে তো নেইই পৃথিবীর অন্য কোথাও আছে কিনা সন্দেহ। আর দার্জিলিঙ টয়ট্রেন এই কাজটাই করে চলেছে বিগত ১৪৫ বছর ধরে। তাই এই টয়ট্রেনে করে নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিঙ যাওয়াটা একটা বিরল অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়ে থাকা। যাত্রাপথে প্রতিকূলতা আছে অনেক - ধৈর্য্যের অভাব তার মধ্যে অন্যতম প্রধান। কিন্তু সেইসব প্রতিকূলতাকে যদি উপেক্ষা করা যায় তাহলে নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিঙ পর্যন্ত দার্জিলিঙ হিমালয়ান রেলওয়ের এই ভ্রমণ আক্ষরিক অর্থেই লাইফটাইম এক্সপেরিয়েন্স !

দার্জিলিঙ হিমালয়ান রেলওয়ে ভ্রমণের আরো ছবি দেখতে হলে click here.

Thursday, January 1, 2026

মুরগুমা ভ্রমণ

ভ্রমণপথ ঃ

সোমবার ২৯শে ডিসেম্বর, ২০২৫ঃ সকাল ৭ঃ৪৫ মিনিটে কলকাতা থেকে গাড়িতে যাত্রা করে সন্ধ্যে ৬ টায় মুরগুমা - মুরগুমায় রাত্রিবাস।

মঙ্গলবার ৩০শে ডিসেম্বর, ২০২৫ঃ দুপুর ১২ টায় গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে সাইট সিয়িং - মুরগুমায় রাত্রিবাস।

বুধবার ৩১শে ডিসেম্বর, ২০২৫ঃ সকাল ১০ঃ৩০ মিনিটে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে সাইট সিয়িং - মুরগুমায় রাত্রিবাস ।

বৃহস্পতিবার ১লা জানুয়ারী, ২০২৬ঃ সকাল ১১ টায় মুরগুমা থেকে বেরিয়ে রাত্রি ৯টায় কলকাতা।

মুরগুমা জায়গাটার নাম আমি প্রথম শুনেছিলাম ২০০৮ সালে - আমার কয়েকজন কলিগ্‌ ওখানে বেড়াতে গিয়েছিল। তারপর এত বছর পরেও জায়গাটা সেরকম কিছু বিখ্যাত নয়, অনেকেই এখনও মুরগুমার নাম জানে না। যারা জানে না তাদের জন্য বলছি মুরগুমা আমাদের পশ্চিমবঙ্গের প্রান্তিক জেলা পুরুলিয়ায় অবস্থিত একটা গ্রাম। পুরুলিয়া জায়গাটা আমাদের খুবই ভালো লাগে - এর আগে দু'বার এসে বরন্তি আর গড় পঞ্চকোট ঘুরে গিয়েছি। তাই ডিসেম্বরের শেষে, যে সময়ে যেকোনও ট্যুরিস্ট স্পটেই লোকজন গিজগিজ করে, সেই সময়ে বেড়ানোর জন্য অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত এই জায়গাটার নামই মাথায় এল। কলকাতা থেকে ৩৫০ কিলোমিটার দূরে এই মুরগুমায় তিনদিনের ভ্রমণ নিয়েই আমার ব্লগের এবারের পোস্ট।

আমাদের এবারের দলের সদস্যরা হল আমি অমৃতা বাবা মা কথা কলি লালমাসি মেসোমশাই দিদিভাই রাজীবদা মাসিমা আর মেসোমশাই। এছাড়া জয়ন্তদা আর মানসীদি (মোমের শ্বশুরমশাই আর শ্বাশুড়ি মা) ভ্রমণের মাঝে আমাদের সঙ্গে একটা দিন কাটিয়ে গিয়েছিলেন। সেই হিসেবে আমাদের দলের সদস্যসংখ্যা ১২ + ২ = ১৪। সোমবার ২৯শে ডিসেম্বর, ২০২৫ সকাল ৭ঃ৪৫ নাগাদ আমরা আমাদের গাড়ি নিয়ে কলকাতা থেকে রওনা দিলাম। আমাদের প্রথম মীটিং পয়েন্ট ১৬ নং জাতীয় সড়কের উপর অঙ্কুরহাটি। এখানে আমরা দিদিভাইদের গাড়ির সঙ্গে মীট করলাম আর তারপর আরও এগিয়ে চললাম। এরপর আমরা লালমাসি আর মেসোমশাইকে মীট করলাম কোলাঘাটের কাছে।

এখানে জানিয়ে রাখি কলকাতা থেকে মুরগুমা যাওয়ার বেশ কয়েকটা রাস্তা আছে যার মধ্যে কলকাতা - ডানকুনি - ১৯ নং জাতীয় সড়ক - রানীগঞ্জ - মুরগুমা এই পথে গেলে ন্যূনতম সময় লাগে। কিন্তু যেহেতু লালমাসিরা আমাদের সঙ্গে যাওয়ার ছিল, তাই আমরা কলকাতা - কোনা এক্সপ্রেসওয়ে - ১৬ নং জাতীয় সড়ক - মেদিনীপুর - ৫ নং রাজ্য সড়ক - মুরগুমা এই পথে গিয়েছিলাম। এই পথে গেলে দূরত্ব প্রায় একই, তবে সময় কিছুটা বেশি লাগে।

লালমাসিরা গাড়িতে ওঠার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই আমরা দেউলিয়া বাজারের কাছে থামলাম ব্রেকফাস্ট করার জন্য। রেস্ট্যুরেন্টের নাম সন্দীপা। এখানে আলুর পরোটা আর ধোসা দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে নেওয়া হল। খাবারের মান বেশ ভালো। সবমিলিয়ে আমাদের খরচ পড়ল ১,১০০/- টাকা।

চলার পথে - একটু থেমে
এরপর আবার এগিয়ে চলা। ১৬ নং জাতীয় সড়ক দিয়ে মেদিনীপুর পর্যন্ত যাওয়ার পরে আমরা ঢুকলাম মেদিনীপুর শহরের ভিতরে - এখানে স্বভাবতই গাড়ির গতি অনেক কমাতে হল। প্রকৃতপক্ষে বাকি রাস্তায় আর কোথাওই আমরা খুব বেশি জোরে চালাতে পারিনি কারণ রাজ্যসড়ক সাধারণতঃ অপেক্ষাকৃত কম চওড়া এবং পথ-বিভাজক বিহীন হয় আর সেইসঙ্গে রাস্তায় খানাখন্দ থাকে। যাই হোক, গাড়ির দূর্দান্ত গতি উপভোগ করতে না পারলেও রাস্তার দুপাশের ক্রমপরিবর্তনশীল প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী আমরা যথেষ্টভাবে উপভোগ করেছি। সকালে হেভি ব্রেকফাস্ট করে সবারই পেট অল্পবিস্তর ভর্তি ছিল আর গাড়িতে কেক, বিস্কুট ইত্যাদি খাবারও বিপুল পরিমাণে ছিল যার সদ্ব্যবহার আমরা মাঝে মাঝে করছিলাম। তাই লাঞ্চের জন্য আর কোথাও না দাঁড়িয়ে আমরা এগিয়ে চললাম আমাদের গন্তব্যের দিকে।

মুরগুমায় আমাদের বুকিং ছিল পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের 'মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টি'-তে। এখানে পৌঁছনোর পথের একেবারে শেষ অংশটার সম্পর্কে একটু বিস্তারিত লেখা দরকার। বেগুনকোদর থেকে ৩.৮ কিলোমিটার যাওয়ার পরে গুগ্‌ল্‌ ম্যাপ একটা জায়গায় ডানদিকে যেতে বলছিল (এখানে মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টি-র একটা তীরচিহ্নযুক্ত সাইনবোর্ডও আছে) কিন্তু এখানকার সাধারণ মানুষ আমাদের জানালেন এই পথটা একমুখী, অর্থাৎ ট্যুরিজম প্রপার্টি থেকে বেরোনোর সময়ে এই পথ ব্যবহার করা যায়, কিন্তু ঢোকার সময়ে করা যায় না। আমাদের আরও এগিয়ে 'বাঁধের রাস্তা' ধরতে হবে। সন্ধ্যে হয়ে গেছে, রাস্তায় কোনও আলো নেই, গাড়ির হেড্‌লাইটই সম্বল। রাস্তাটাও সরু। এই পথে ১ কিলোমিটার মতো চলার পরে ডানদিকে একটা হেয়ারপিন বেন্ড টার্ণ নিয়ে আমরা উঠে পড়লাম বাঁধের উপরে। এই বাঁধের উপরের রাস্তাটা রাতের অন্ধকারে রীতিমতো রোমাঞ্চকর কারণ আমাদের বাঁদিকে সুবিশাল মুরগুমা লেক আর ডানদিকের পাড় ঢালু হয়ে নেমে গেছে। রাস্তাটা বাঁধানোও নয়, সুরকির। সেইসঙ্গে বেশ সরু - এখানে পাশাপাশি দুটো গাড়ি চলতে পারে না। রাস্তায় কোনও আলোও নেই। এই পথে গাড়ি চালানোর সময়ে চালককে খুব সতর্কভাবে চালাতে হবে কারণ একটু অসাবধান হলেই হয় বাঁদিকে জলের মধ্যে ঝপাং আর নাহয় ডানদিকে ঢালুপথে গড়াম !

বাঁধের এই রোমাঞ্চকর পথে ১.৭ কিলোমিটার চলার পরে সন্ধ্যে ৬ টা নাগাদ আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের গন্তব্যে। জায়গাটা খুব সুন্দর আর বেশ বড়। গাড়ি পার্কিং-এর একটা আলাদা ছাউনি দেওয়া জায়গা আছে। রিসর্টের ঘরগুলোও বেশ বড় - ঘরের লাগোয়া একটা ছোট ব্যালকনি। আমরা আমাদের ঘরে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নিয়ে চা-টা খেয়ে নিলাম।

রাত সাড়ে নটা নাগাদ আমরা ডিনার করতে ডাইনিং এরিয়ায় গেলাম। রিসর্টটা দেখে এমনিতে ফাঁকা ফাঁকা লাগলেও আসলে এখানে সব ঘরেই গেস্ট রয়েছে - শুধুমাত্র প্রচন্ড ঠান্ডার কারণে সবাই ঘরের ভিতরেই রয়েছে। এটা আরও বেশি করে বুঝতে পারলাম ডাইনিং এরিয়ায় গিয়ে কারণ ভিতরটা পুরো ভর্তি। কিছুক্ষণ পরে জায়গা ফাঁকা হলে আমরা ডিনার করে নিলাম। ভাত-রুটি-ডাল-তরকারি-ডিম-চিকেন দিয়ে ডিনার করতে খরচ হল ২,৩৭৩/- টাকা।

পুরুলিয়ার তাপমাত্রা কলকাতার থেকে বেশ কিছুটা কম। রাতে সাড়ে দশটার সময়ে আমরা যখন ডাইনিং এরিয়া থেকে নিজেদের ঘরে ফিরছি, তখন রীতিমতো ঠান্ডা। এখানে মোবাইলের নেটওয়ার্ক সেভাবে কাজ করে না (কোনও সার্ভিস প্রোভাইডারেরই না), তাই যখন একটু আধটু নেটওয়ার্ক পাওয়া গেল, তখন দেখা গেল তাপমাত্রা ৭ - ৮ ডিগ্রির মতো।

মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টির ভিতরে
পরেরদিন মঙ্গলবার ৩০ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ - আমরা সকালে উঠে ব্রেকফাস্ট সেরে নিলাম। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের প্রায় সবকটা প্রপার্টিতেই ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টারি আর এরা খাবার দেয়ও অনেকটা পরিমাণে। ব্রেকফাস্টে দুরকম অপশন - পুরী সব্জি অথবা ব্রেড বাটার / জ্যাম। এরসঙ্গে একটা কলা, দুটো ডিম (সিদ্ধ / ওমলেট / পোচ) আর চা অথবা কফি। সবমিলিয়ে পেট বেশ ভালোরকম ভরে যায়।

ওয়াচ্‌টাওয়ারের উপর থেকে
ব্রেকফাস্ট করার পরে আমরা অপেক্ষা করছিলাম জয়ন্তদা আর মানসীদির জন্য, তাই এই সময়ে রিসর্টের ভিতরটা একটু ঘুরে দেখলাম। এখানে একটা ওয়াচ্‌ টাওয়ার আছে যার উপরে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গিয়ে বেশ অনেকটা দেখতে পাওয়া যায়। আমাদের রিসর্টের সামনেই মুরগুমা লেক কিন্তু কুয়াশার জন্য খুব একটা স্পষ্টভাবে দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল না। আমরা ওয়াচ্‌ টাওয়ারের উপরে কিছু ছবিটবি তুলে নিচে নেমে এলাম।

জয়ন্তদা আর মানসীদি পৌঁছলেন সাড়ে এগারোটা নাগাদ। ওনারা বেরোনোর জন্য তৈরিই ছিলেন, তাই ওনাদের মালপত্র ঘরে রাখা হয়ে গেলে আমরা সবাই একসঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম সাইটসিয়িং করতে।

পিটিডিরি ঝর্ণা - মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টি থেকে পিটিডিরি ঝর্ণার দূরত্ব মাত্র ১০ কিলোমিটার কিন্তু রাস্তাটা তেমন সুবিধের নয়। পাহাড়ী পথে জঙ্গল ও গাছপালার মধ্যে দিয়ে একটা সিঙ্গল লেন প্রচন্ডভাবে এঁকেবেঁকে এগিয়ে চলেছে - হঠাৎ করে উল্টোদিক থেকে গাড়ি এলে বেশ মুশকিলে পড়তে হয়। রাস্তাটা মোটামুটি ভদ্রস্থ হলেও জায়গায় জায়গায় বেশ ভাঙাচোরা আছে। গুগ্‌ল্‌ ম্যাপ দেখে ঝর্ণার কাছে পৌঁছতে আমাদের প্রায় ৩০ মিনিট লেগে গেল।

গাড়ি রাখার জায়গা থেকে ঝর্ণাটা আরও কিছুটা হেঁটে যেতে হয় আর সেই পথটা বেশ কিছুটা উঁচুনিচু। দু'একজায়গায় কিছুটা কসরৎও করতে হয়। পায়ের সমস্যা যাদের আছে, তাদের এই ঝর্ণা দেখতে না যাওয়াই ভালো।

পিটিডিরি ঝর্ণা
ঝর্ণাটা বেশ সুন্দর। আর এই শীতকালেও জলের বেশ স্রোত আছে। ঝর্ণাটা এখানে একটা বড় পাথরের উপর থেকে নিচে একটা জলাশয়ের মধ্যে পড়ছে। ঝর্ণার বিপরীত দিকে পাথরের উপর দাঁড়িয়ে বসে ঝর্ণার দৃশ্য উপভোগ করা যায়। আমরা এখানে বসে দাঁড়িয়ে বেশ কিছু ছবি তুলে নিলাম। তারপর আবার সেই চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ফিরে এলাম গাড়ি রাখার জায়গায়।

মাচকান্দা ঝর্ণা
মাচকান্দা ঝর্ণা - এরপর আমাদের গন্তব্য মাচকান্দা ঝর্ণা। পিটিডিরি থেকে মাচকান্দার দূরত্ব ২.৫ কিলোমিটার কিন্তু রাস্তা সেই একইরকম অপ্রশস্ত। এখানে গাড়ি রাখারও আলাদা কোনও জায়গা নেই, রাস্তার মধ্যেই একটা অপেক্ষাকৃত চওড়া জায়গায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে আমরা ঝর্ণার পথে হাঁটতে শুরু করলাম। মাচকান্দার পথটা পিটিডিরির মতো দুর্গম নয়, একটা ঢালু পথ নিচের দিকে নেমে গেছে। সেই পথে কয়েক জায়গায় গাছের শিকড় আর পাথর দিয়ে সিঁড়ির ধাপের মতো হয়ে গেছে। এই পথ দিয়ে নিচে নেমে গেলে একটা ভিউ পয়েন্ট পড়ে আর সেখান থেকে ঝর্ণাটা দেখা যায়। এখান থেকে ঝর্ণাটা অনেকটাই দূরে কিন্তু এটাই মাচকান্দা ঝর্ণা দেখার জায়গা। আমরা ঝর্ণা দেখে রওনা দিলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের দিকে।



মাচকান্দা ঝর্ণা থেকে আমাদের গন্তব্য ছিল খয়রাবেড়া ড্যাম। মাচকান্দা থেকে খয়রাবেড়া যাওয়ার দুটো রাস্তা আছে, একটা আমরা যে পথে পিটিডিরি থেকে এসেছি আর অন্যটা আমরা যেদিকে যাচ্ছি। এই সরু রাস্তায় গাড়ি উল্টোদিকে ঘোরানো প্রায় অসম্ভব ব্যাপার, তাই আমরা আরও এগোনোই ঠিক করলাম। রাস্তা দুদিক দিয়ে গেলেই প্রায় ২০ কিলোমিটারের মতো।

গ্রামের বাড়ির নক্সা করা দেওয়াল
আমরা আরও এগিয়ে চললাম সেই সরু রাস্তা ধরে। সরু রাস্তা মাঝে মাঝে চওড়া হচ্ছে আর সেখানে কিছু লোকবসতি। এখানকার মানুষ মাটির বাড়ির গায়ে রঙ দিয়ে সুন্দর নক্সা বা আলপনা করে রাখে। এটা প্রায় সব গ্রামের সব বাড়িতেই দেখা যায়। দেখতে খুব সুন্দর লাগে।

আবার সরু পাহাড়ী রাস্তা ধরে আমরা এগিয়ে চলেছি। দুধারে জঙ্গল। রাস্তা সারাক্ষণ ডানদিক বাঁদিকে ঘুরছে। রাস্তায় আমাদের তিনটে গাড়ি পরপর চলছে আর আমি শুধু গুগ্‌ল্‌ ম্যাপের উপর নির্ভর করে এগিয়ে চলেছি। রাস্তায় আর অন্য কোনও গাড়িও দেখা যাচ্ছে না। এইভাবে প্রায় একঘন্টা ধরে ১৬ কিলোমিটার চলার পরেও আমরা খয়রাবেড়া ড্যাম পেলাম না তবে একটা বেশ উঁচু ওয়াচ্‌ টাওয়ার দেখতে পেলাম।

খয়রাবেড়া ওয়াচ্‌ টাওয়ার
খয়রাবেড়া ওয়াচ্‌ টাওয়ার - চলার পথে উঁচু ওয়াচ্‌ টাওয়ারটা দেখে গাড়ি দাঁড় করালাম। এখানে রাস্তার পাশে কিছুটা জায়গা আছে যেখানে আমাদের তিনটে গাড়ি দাঁড়ানোর জায়গা হয়ে গেল। একটা বাঁধানো সমতল জায়গাকে লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা রয়েছে আর তার মাঝখানে রয়েছে টাওয়ারটা। লোহার রেলিং-এর মাঝে একটা গেট, সেটা খোলাই আছে। আমরা সেই গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। এখানে আর কোনও মানুষও নেই, কাজেই উপরে ওঠা চলবে কিনা জানারও কোনও উপায় নেই। অনুমতি নেওয়ার যখন কোনও উপায় নেই (আর 'ট্রেসপাসারস উইল বি প্রসিকিউটেড'-ও যখন কোথাও লেখা নেই), তাই উপরে ওঠাই ভালো ! টাওয়ারটা তিনতলা, আর গায়ে ঘোরানো সিঁড়ি। আমরা উপরে উঠে দেখলাম চমৎকার দৃশ্য। সামনে পাহাড়, বড় বড় গাছের জঙ্গল আর সেই গাছপালার মধ্যে দিয়ে দেখা যাচ্ছে একটা বেশ বড় জলাশয় - বুঝলাম ওটাই খয়রাবেড়া ড্যাম আর তার মানে আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেটা খয়রাবেড়া ওয়াচ্‌ টাওয়ার। আমাদের কারুর ফোনের অনেকক্ষণ ধরে নেটওয়ার্ক ছিল না, এই ওয়াচ্‌ টাওয়ারে উঠতেই পটাপট নেটওয়ার্ক চলে এল। আমরা কিছুক্ষণ এখানে থেকে নেমে এলাম।

এখানে জানিয়ে রাখি এইসব ভিতরের দিকের রাস্তায় বেশিরভাগ জায়গাতেই ফোনের নেটওয়ার্ক থাকে না বা থাকলেও ইন্টারনেট পাওয়া যায় না। তাই যদি গুগ্‌ল্‌ ম্যাপ দেখে ঘোরাঘুরি করার পরিকল্পনা থাকে, তাহলে একবার জিপিএস চালু করে আর কিন্তু ভুলেও সেটা বন্ধ করা যাবে না, তাহলে এই গোলকধাঁধায় পথ হারানোর সম্ভাবনা প্রবল। আর এখানে মানুষের যাতায়াত এতই কম, যে রাস্তা হারিয়ে ফেললে সঠিক রাস্তা বাৎলে দেওয়ার মতো কাউকে পেতে হলেও দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হতে পারে।

দুপুর প্রায় সাড়ে তিনটে বাজে, সবারই খিদে পেয়েছে কিন্তু এই পাহাড়-জঙ্গলের মধ্যে খাবার পাওয়া অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছিল। আর খাবার পাওয়ার মতো জায়গা এখান থেকে কতদূরে, সেটাও সঠিকভাবে জানার কোনও উপায় নেই। কিন্তু গাড়ি নিয়ে সামান্য দুতিন মিনিট এগোতেই আমাদের সামনে একটা জায়গা এসে পড়ল যেখানে কয়েকটা হোটেল রয়েছে। দেখে বুঝলাম এখান থেকে ডানদিকে খরয়াবেড়া ড্যাম যাওয়ার রাস্তা আর তাই এখানে এরা হোটেল খুলে বসেছে। খোঁজ নিয়ে জানলাম ভেজ থালি, এগ্‌ থালি, ফিশ থালি, চিকেন থালি সবই পাওয়া যাবে। ব্যাস, গাড়ি দাঁড় করিয়ে 'আক্রমণ !!!' বলে আমরা নেমে পড়লাম।

ডাইনিং এরিয়া
খাবারের অর্ডার দিয়ে বসে রইলাম। সব রান্না রেডি থাকে না আর তারপর ১৪ জনের মতো রান্না এইসব হোটেলে চট্‌ করে গিয়ে চাইলেই পাওয়া যায় না। খাওয়ার জায়গাটা হোটেলের লাগোয়া খোলা মাঠের মধ্যে। শীতের বিকেলের পড়ন্ত আলোয় এখানে বসে থাকতে খুব ভালো লাগছিল। পিছনে দেখা যাচ্ছে একটা বেশ বড় পাহাড়। এটা ছোটনাগপুর মালভূমির বিখ্যাত পাহাড় চামতাবুরু। আর তার নামেই হোটেলের নাম 'চামতাবুরু হোটেল অ্যান্ড রিসর্ট'। মিনিট পনেরো পরে খাবার এল। আমি সাধারণতঃ এরকম পথচলতি খাওয়ার হোটেলের নাম ব্লগে উল্লেখ করি না, কিন্তু এটা করলাম। এদের খাবারের মান অসাধারণ ! শুধু খিদের মুখে খেয়েছি বলে নয়, হোটেলের রান্না সত্যিই খুব ভালো। আর সবমিলিয়ে আমাদের খরচ পড়ল ১,৭০০/- টাকা। আমি আমার ব্লগের পাঠকদের বলছি যদি কখনও খয়রাবেড়া ড্যাম দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকে, তাহলে চামতাবুরু হোটেল অ্যান্ড রিসর্টের খাবার একবার খেয়ে দেখতেই হবে।

এবার খয়রাবেড়া ড্যাম। খাওয়ার জায়গা থেকে ড্যামটা খুবই কাছে, গাড়ি চালিয়ে আমাদের মিনিট পাঁচেক লাগল। আর ড্যামের কাছে পৌঁছে দেখলাম যেন মেলা বসেছে ! এতক্ষণ রাস্তায় লোকজন দেখতে পাইনি, এখন মনে হল সব পর্যটকরা যেন এখানেই জড়ো হয়েছে। এরমধ্যে পুরুলিয়ার স্থানীয় বাসিন্দাও আছে। এমনই ভীড় যে গাড়ি পার্কিং-এর জন্য অনেকটা ভিতরে ঢুকতে হল। গাড়ি পার্কিং করে আমরা ড্যামটা দেখতে গেলাম।

খয়রাবেড়া ড্যাম
খয়রাবেড়া ড্যাম - খয়রাবেড়া ড্যামটা বেশ বড়। ড্যামের একপাশে একটা বড় দেওয়াল তুলে একটা রিসার্ভার বা জলাধার তৈরি করা হয়েছে। এই দেওয়ালের মধ্যে একজায়গায় আছে লক্‌গেট যার ফাঁক দিয়ে সরু জলের ধারা ড্যাম থেকে জলাধারে ঢুকছে। সেই জল আবার জলাধার থেকে একটা সরু খালের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। ড্যামের উপরের এই রাস্তাটা দিয়েই হেঁটে হেঁটে ঘুরতে হয়। রাস্তাটা খুব চওড়া নয়, তবে বাইক চলাচল করে। এই রাস্তার উপরেই বেশি ভীড়, বিশেষ করে সূর্যাস্তের সময়ে লাল সূর্যের সামনে ছবি তোলার একটা হিড়িক অনেকের মধ্যেই থাকে। অনেক ফেরিওয়ালা এখানে জিনিসপত্র বিক্রি করছে। আমরা এই রাস্তাটা দিয়ে হেঁটে হেঁটে একেবারে শেষপর্যন্ত গিয়ে লক্‌গেটটা দেখে এলাম। বিকেলের আলো পড়ে গেছে, দূরে ড্যামের জলের উপরে কুয়াশা। বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছিল। আমরা এখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে আবার গাড়িতে এসে উঠলাম।

এবার ফেরার পালা। খয়রাবেড়া থেকে যখন রওনা দিলাম তখন বিকেল সাড়ে পাঁচটা। বিকেল বলছি যদিও কিন্তু ডিসেম্বরের শেষে এই সময়টাকে বিকেল বলা চলেনা মোটেই, প্রায় অন্ধকার হয়ে গেছে। খয়রাবেড়া ড্যাম এলাকায় মোবাইলের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়, তাই আবার ম্যাপে জিপিএস ঠিক করে নিলাম। ম্যাপ যদিও বলছে এখান থেকে আমাদের রিসর্টের দূরত্ব ২৪ কিলোমিটার আর যেতে ঘন্টাখানেক লাগবে, কিন্তু সেই ২৪ কিলোমিটারের রাস্তাটা সকালের মতো অর্থাৎ পাহাড়ী আঁকাবাঁকা পথ, জনমানবহীন, জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এবং ফোনের নেটওয়ার্কবিহীন। এই রাস্তা দিয়ে রাত্রিবেলা ফেরাটা খুব বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তাই আমরা গুগ্‌লের নির্দেশিত পথে না গিয়ে কিছুটা অনুমানের উপর নির্ভর করে বুরদা বলে একটা জায়গায় পৌঁছলাম। সেখান থেকে করেং হয়ে ঝালদা-বাঘমুন্ডি রোড ধরে ঝালদা। সেখান থেকে বেগুনকোদর হয়ে মুরগুমা। সবমিলিয়ে রিসর্টে পৌঁছতে লাগল প্রায় দুঘন্টা আর ২৪ এর জায়গায় ৫০ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করতে হল। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে রাতের অন্ধকারে ঝালদা-বাঘমুন্ডি রোডের সৌন্দর্য মনমুগ্ধকর। আকাশে চাঁদের হাল্কা আলো, মাখনের মতো রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলেছে আর গাড়িতে চলছে হাল্কা মেলোডি। এককথায় অনবদ্য !

সন্ধ্যেবেলা রিসর্টে ফিরে একটু চা / কফি আর চিকেন পকোড়া খাওয়া হল। খরচ পড়ল ১,৮৭৪/- টাকা। রাতের ডিনারটা একটু স্পেশাল করা হল - ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন। সেই সঙ্গে পনীর বাটার মশালা ইত্যাদিও নেওয়া হল। সবমিলিয়ে খরচ হল ৩,১০৪/- টাকা। খাওয়ার পরে যে-যার কটেজে ফিরে এলাম।

বুধবার ৩১শে ডিসেম্বর, ২০২৫ আমাদের সাইটসিয়িং-এর দ্বিতীয় দিন। সকালে উঠে যথারীতি ব্রেকফাস্ট করতে গেলাম এবং যথারীতি পেট ঠেসে খেয়ে ফেললাম। সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ আমরা সবাই একসঙ্গে হোটেল থেকে বেরোলাম। জয়ন্তদা আর মানসীদি বাড়ির পথে রওনা হলেন আর আমরা সাইটসিয়িং-এর পথে।

গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে সেই জায়গাটায় এলাম যেখান থেকে হেয়ারপিন বেন্ড টার্ণ নিয়ে মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টিতে পৌঁছতে হয়। আজ সেখান থেকে টার্ণ না নিয়ে সোজা এগিয়ে একটা পাহাড়ী পথে উঠতে শুরু করলাম। মিনিট দশেক চলার পরে দাঁড়ালাম আমাদের প্রথম গন্তব্যে।

ভিউ পয়েন্ট থেকে মুরগুমা ড্যাম
মুরগুমা ড্যাম ভিউ পয়েন্ট - আমাদের রিসর্ট থেকে এখানে পোঁছতে লাগল পনেরো মিনিট। এখানেও গাড়ির ভীড়। পাহাড়ী পথের ধারে একটা জায়গামতো গাড়িগুলো রেখে আমরা ভিউ পয়েন্টের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। রাস্তা থেকে ভিউ পয়েন্টটা হেঁটে দশমিনিট মতো লাগে। প্রায় পুরো রাস্তাটাই সমতল তবে শেষের কিছুটা যাওয়ার জন্য পাহাড়ের ধাপে ধাপে সিঁড়ির মতো উঠতে হয়। তারপর আবার একটা সমতল চত্বর - এটাই ভিউ পয়েন্ট। এখানকার দৃশ্য দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। এখান থেকে সম্পূর্ণ মুরগুমা ড্যাম বা মুরগুমা লেকটা দেখা যায়। লেকটা সুবিশাল। আর দেখার জায়গাটা বেশ অনেকটা উঁচু হওয়ায় দেখতে খুব সুন্দর লাগে। শীতকাল বলে হাল্কা কুয়াশা হয়ে আছে তাই দৃশ্যটা পরিষ্কার নয়, কিন্তু তাতেও যা দেখলাম তা অপূর্ব ! আমরা এখানে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আবার গাড়ির কাছে ফিরে এলাম।

আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছলছলিয়া ঝর্ণা। মুরগুমা ভিউ পয়েন্ট থেকে গাড়িতে কুড়ি-পঁচিশ মিনিট চলার পরে এখানে পৌঁছনো যায়। ম্যাপ দেখে আমরা ঠিকই যাচ্ছিলাম, কিন্তু যেখানে পৌঁছলাম সেখানে একজন স্থানীয় লোককে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম ছলছলিয়া ঝর্ণা বর্তমানে আর দেখা যায় না, সেখানে দেখার মতো আর কিছু নেই। তাই এই জায়গাটা আমাদের ঘোরার লিস্ট থেকে বাদ দিতে হল। আমরা গাড়ি ঘুরিয়ে এগোতে শুরু করলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যে। এই যাওয়ার রাস্তাটা একেক জায়গায় বেশ খারাপ, পিচের রাস্তা ভেঙে গিয়ে রীতিমতো মাটির রাস্তা দিয়ে চলতে হয়। এখন শীতকাল বলে মাটি শক্ত, কিন্তু বর্ষাকালে এই রাস্তা দিয়ে আদৌ যাতায়াত করা সম্ভব কিনা জানিনা। কিন্তু এটাই একমাত্র রাস্তা, এছাড়া অন্য কোনও রাস্তাও নেই।

মার্বেল লেকের সামনে আমাদের কয়েকজন
মার্বেল লেক - ছলছলিয়া ঝর্ণা থেকে প্রায় পঁয়ত্রিশ মিনিট গাড়ি চালিয়ে পৌঁছলাম মার্বেল লেকে। এখানেও বেশ ভীড়। রাস্তার পাশে গাড়ি থামিয়ে আমরা মার্বেল লেক দেখতে গেলাম। রাস্তা থেকে সামান্য হেঁটে গেলেই গভীর লেকটা চোখে পড়ে। লেকের পাড়টা বেশ উঁচু, আর লেকের অনেক নিচে জল। চাইলে ধাপে ধাপে নেমে একেবারে নিচে জলের কাছেও যাওয়া যায়, তবে অনেকটা সময় লাগবে বলে আমরা আর নিচে নামিনি। মার্বেল লেক কিন্তু সত্যিকারের মার্বেল বা শ্বেতপাথরের নয় (প্রকৃতপক্ষে মার্বেলের খনি পশ্চিমবঙ্গে কোথাও নেই) আর এই লেকটা প্রাকৃতিক লেকও নয়। আশেপাশের বিভিন্ন জলাধার নির্মাণের জন্য এখান থেকে মাটি কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আর তার ফলে এখানে গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এই গর্তের দেওয়ালের পাথরের রঙ সাদা এবং ধূসর বলে এর নাম মার্বেল লেক হয়ে গেছে।

ময়ূর পাহাড়ের উপরে
ময়ূর পাহাড় - মার্বেল লেক থেকে মিনিট কুড়ি চলার পরে পৌঁছলাম ময়ূর পাহাড়ে। এই এলাকায় একসময়ে প্রচুর সংখ্যক ময়ূর পাওয়া যেত, সেই থেকে পাহাড়ের এই নাম। অনেকের ধারণা পাহাড়ের আকার ময়ূরের মতো বলে এই নাম, কিন্তু সেটা ঠিক নয় (এরকম ধারণা কার আমি জানিও না, মনে হল কারুর এরকম ধারণা থাকলেও থাকতে পারে, তাই লিখলাম)। ময়ূর পাহাড়ের নিচে গাড়ি পার্কিং-এর জায়গায় গাড়ি রেখে আমরা উপরে উঠতে শুরু করলাম। প্রথমে পাথরের ধাপে ধাপে সিঁড়ির মতো কিছুটা উঠে একটা বেশ বড় সমতল জায়গা। তারপর সেখান থেকে আবার বাঁধানো সিঁড়ি দিয়ে পাহাড়ের একেবারে মাথায় ওঠা যায়। এই সিঁড়িগুলো খুব সুন্দর, এগুলোর উচ্চতা এতই কম যে উঠতে গেলে একেবারেই কষ্ট হয় না। পাহাড়ের মাথায় উঠে চারদিকটা দেখতে খুবই ভালো লাগে। এখানে যাকে বলে ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ। এর আশেপাশে আর কোনও উঁচু পাহাড় নেই, চারপাশে শুধুই জঙ্গল।

দুপুর আড়াইটে বাজে অর্থাৎ লাঞ্চ টাইম। এই জায়গাটা বেশ লোকবসতিপূর্ণ, কয়েকটা হোটেল বা রেস্ট্যুরেন্টও আছে। সেরকমই একটা জায়গা থেকে এগ থালি, ফিশ থালি আর চিকেন থালি দিয়ে লাঞ্চ করা হল। খরচ হল ১,৩৬০/- টাকা। এই হোটেল থেকেই জানলাম এখান থেকে খুব কাছেই একটা দেখার জায়গা আছে যেটা আমাদের লিস্টে নেই। জায়গাটার সম্পর্কেও কিছু তথ্য জানতে পারলাম। খাওয়ার পরে গাড়ি নিয়ে মিনিট পাঁচ-সাতেক চলার পরে পৌঁছলাম সেই দেখার জায়গায়।

সীতা কুন্ড
সীতা কুন্ড - গাড়ি থামিয়ে পাহাড়ের ধাপে অল্প কিছুটা নামার পর সীতাকুন্ড। এটা একটা পাথরের কুয়ো। এর বৈশিষ্ট্য হল এর জলস্তরের গভীরতা সবসময়ে একই থাকে। পুরাণমতে বনবাসের সময়ে এই জায়গায় এসে সীতাদেবীর খুব জলতেষ্টা পেয়েছিল। তখন লক্ষ্মণ তীর মেরে এখানে এই কুয়ো নির্মাণ করেন। আর সেই থেকে এর জল কখনও কমে না। জলের ভিতরে তাকালে দেখা যায় যে এর গভীরতা খুব বেশি নয়, বড়জোর কোমরজল হবে। কুয়োর ভিতরের মেঝেতে কয়েকটা জায়গায় সারাক্ষণ বুদ্বুদ হচ্ছে। এখানকার স্থানীয় লোকেরা বলে কুয়োয় পয়সা ফেলতে, তাতে কুয়োর ভিতরের এই বুদ্বুদ কখনও বন্ধ হবে না বা জল কখনও শেষ হয়ে যাবে না। বলা বাহুল্য, এটা সম্পূর্ণই গাঁজা ! পয়সা ফেলার সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই। এরকম জায়গা পৃথিবীতে অনেক জায়গাতেই আছে। এই জায়গার সঙ্গে ভূপৃষ্ঠের অনেক নিচের সরাসরি যোগাযোগ আছে আর সেখান থেকে প্রধানতঃ গরম হাওয়া সারাক্ষণ এখানকার কয়েকটা ফুটো দিয়ে বেরোতে থাকে। একইভাবে ভূপৃষ্ঠের নিচের জলস্তরের সঙ্গে এর সরাসরি যোগাযোগ থাকায় কুয়োর জলস্তর কখনও বাড়ে বা কমে না।

আমাদের পরবর্তী গন্তব্য অযোধ্যা পাহাড়ের আপার ড্যাম। গুগ্‌ল্‌ ম্যাপ দেখে ৬ কিলোমিটার পথ কুড়ি মিনিটে অতিক্রম করে আপার ড্যামের কাছে পৌঁছলাম, কিন্তু পুলিশ এখান দিয়ে আমাদের ঢুকতে দিল না। জানলাম ড্যামে গাড়ির ভীড় খুব বেশি হওয়ার কারণে এখন এই রাস্তায় একমুখী যানচলাচল করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের ড্যামে যেতে গেলে পাহাড়ের নিচের দিকের রাস্তাটা দিয়ে ঢুকতে হবে। ম্যাপ দেখে বুঝলাম এ'জন্য আমাদের আরও ১৭ কিলোমিটার ঘুরতে হবে অর্থাৎ এখান থেকে ৭০০ মিটার দূরে যাওয়ার জন্য ১৭ কিলোমিটার বেশি ঘুরতে হবে। অগত্যা !

সীতা কুন্ড থেকে এখানে আসার সময়ে একটা মোড় পড়েছিল, তার নাম আপার ড্যাম মোড়। এখান থেকে আমরা এবার বাঁদিকের রাস্তা ধরলাম। এই রাস্তা একেবারে পাহাড়ী রাস্তার মতো অর্থাৎ প্রচন্ড ডানদিক বাঁদিকে ঘুরছে তবে রাস্তা যথেষ্ট চওড়া আর সেইসঙ্গে খুবই মসৃণ। আমরা কিছুটা উঠে কিছুটা নেমে পৌঁছে গেলাম অযোধ্যা পাহাড়ের লোয়ার ড্যামের কাছে। তারপর আবার পাহাড় বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করলাম। এই রাস্তা আমাদের চেনা, এর আগেরবার বরন্তি ও গড়পঞ্চকোট ভ্রমণের সময়ে এখান দিয়েই আপার ড্যামে পৌঁছেছিলাম।

আপার ড্যাম থেকে বছরের শেষ সূর্যাস্ত
অযোধ্যা পাহাড় আপার ড্যাম - পাহাড়ী পথে উপরে উঠে দেখলাম আপার ড্যামের রাস্তায় যেন গাড়ির মেলা বসেছে ! আগেরবার যখন এসেছিলাম তখন এই জায়গাটা ছিল প্রায় ফাঁকা, আমরা ছাড়া প্রায় কোনও গাড়িই ছিল না। আর এবারে এত বেশি গাড়ি যে যদি একমুখী যানচলাচলের ব্যবস্থা না করা হত, তাহলে সত্যিই সাংঘাতিক যানজট হয়ে যেত। কোনওমতে একটা জায়গায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে গাড়ি থেকে নেমে একটু দাঁড়ালাম। বিকেল প্রায় পাঁচটা বাজে, সূর্যাস্ত হচ্ছে। ২০২৫ সালের শেষ সূর্যের শেষ কয়েকটা মূহুর্তকে ক্যামেরাবন্দী করছে কয়েকশো মানুষ। দেখতে দেখতে সূর্যাস্ত হয়ে গেল। শেষ হয়ে গেল ২০২৫ সালের শেষ দিবস - নিয়ে চলে গেল এ'বছরের যত ব্যর্থতা, নিরাশা, হতাশা, দুঃখ।

আমরা গাড়িতে উঠে এগিয়ে চললাম। আবার সেই জায়গাটা দিয়েই যেতে হল যেখান থেকে কিছুক্ষণ আগে ফিরে গেছি। আবার আপার ড্যাম মোড় থেকে আগের রাস্তাটা দিয়েই এগিয়ে চললাম। এইপথে মিনিট কুড়ি চলার পর পৌঁছলাম বামনি ঝর্ণার কাছে। একটু আগেই এখান দিয়ে গিয়েছি আর ভীড় দেখে গাড়ি থামাইনি। এবারেও পৌঁছে দেখলাম ভীড় বিশেষ কমেনি তাই গাড়ি থামালাম না, ফলে বামনি ঝর্ণা আমাদের সাইটসিয়িং-এর লিস্ট থেকে বাদ চলে গেল। আমরা আরও এগিয়ে চললাম।

তুর্গা ঝর্ণা
তুর্গা ঝর্ণা - বামনি থেকে মিনিট পাঁচেক চলার পরে পৌঁছলাম তুর্গা ঝর্ণার কাছে। এখান দিয়েও একটু আগে গিয়েছি। এখন দিনের আলো একটু কমলেও ভীড় কমেনি। গাড়ি রাস্তার ধারে দাঁড় করিয়ে তুর্গা ঝর্ণা দেখতে গেলাম। এখানে পাহাড়ের ধাপে ধাপে বেশ খাড়াই কিছুটা নামতে হয়। আমি কথা কলি নিচে নামলাম। ঝর্ণাটা বেশ সুন্দর। আর এখন শীতকালেও ভালোই জল আছে। জলটা বেশ কিছুটা উপর থেকে পড়ছে বলে জলের স্রোতও বেশ ভালোই। আমরা এখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে আবার উপরে উঠে এলাম।





তুর্গা ড্যাম - তুর্গা ঝর্ণা থেকে মিনিট পনেরো দূরে তুর্গা ড্যাম। কিন্তু সন্ধ্যে হয়ে আসছে, তাই আর গিয়ে খুব বেশি কিছু দেখা যাবে না বলে সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করলাম। কিন্তু আমরা যেখান দিয়ে রাস্তা থেকে তুর্গা ঝর্ণা দেখতে নেমেছি, সেখান থেকেই দূরে তুর্গা ড্যাম আবছা দেখা যাচ্ছিল। তাই এখান থেকেই যতটা সম্ভব দেখে নিলাম।

দোকানে নানান মুখোশের সমাহার
চরিদা মুখোশগ্রাম - মিনিট কুড়ি চলার পরে আমাদের পরবর্তী তথা শেষ গন্তব্য - চরিদা মুখোশগ্রাম। পুরুলিয়ার বৈচিত্র্যময় মুখোশের কথা সর্বজনবিদিত আর সেই মুখোশের একটা বড় অংশ তৈরি হয় এই চরিদা গ্রামে। এখানে এটা একটা কুটিরশিল্পের পর্যায়ে পড়ে, হাজার হাজার মানুষ এখানে আসেন আর মুখোশ কিনে নিয়ে যান। এই মুখোশ প্রধানতঃ ঘর সাজানোর কাজেই ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া বিভিন্ন নাটক বা যাত্রাপালাতেও এর ব্যবহার হয়। এই মুখোশের বৈশিষ্ট্য হল এগুলো সম্পূর্ণই কাগজ দিয়ে তৈরি। অনেকগুলো কাগজকে একসঙ্গে জলে ভিজিয়ে শুকনো করে একটা শক্ত পিচ্‌বোর্ডের মতো তৈরি করা হয়। তারপর প্রয়োজনমতো কেটে নিয়ে বিভিন্ন আকার দিয়ে এর উপর রঙ চাপানো হয়। এই রঙও প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি করা হয়, এর মধ্যে কোনও কৃত্রিম রাসায়নিক নেই। আগেরবার অযোধ্যা পাহাড়ের উপরে এই মুখোশ বিক্রি হচ্ছিল, মাসিমা আমাদের কিনে উপহার দিয়েছিলেন। আর এবারে আমরা নিজেরাই পৌঁছে গেছি এর উৎপাদনস্থলে।

সৃষ্টিরত শ্রষ্টা
এখানে একটা বেশ বড় ফাঁকা জায়গায় এরা পরপর মুখোশের দোকান করেছে আর সেখানে শিল্পী নিজেই বসে একটার পর একটা মুখোশ তৈরি করে চলেছেন, সাহায্য করছেন তাঁর বাড়ির মানুষেরা। তাঁরা নিজেরাই বিক্রেতা। বাঁশের কাঠামোর উপর ত্রিপল আর ভিতরে পলিথিন শিট লাগানো ছোট ছোট দোকান - সব দোকানে মোটামুটি একই জিনিস পাওয়া যায়। মুখোশের মুখ বেশিরভাগই ঠাকুরের, সেইসঙ্গে সাঁওতাল রমণী, পুরুষের মুখোশও আছে। আমরা ঘুরে ঘুরে দরদাম করে বেশ কয়েকটা মুখোশ কিনলাম।





সন্ধ্যে সাতটা বাজে, এবার ফিরতে হবে। ম্যাপ বলছে এখান থেকে আমাদের রিসর্টের দূরত্ব ৩৪ কিলোমিটার আর রাস্তাটা অযোধ্যা পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে, অর্থাৎ যে পথে এখানে এসেছি। কিন্তু দিদিভাই এই রাতের অন্ধকারে পাহাড়ী পথ দিয়ে যেতে কিছুতেই রাজী নয়, অগত্যা উল্টোদিকের পথ ধরতে হল। সেই পথে রিসর্টের দূরত্ব ৫০ কিলোমিটার। সেই গতকালের পথই - করেং - ঝালদা - বেগুনকোদর হয়ে মুরগুমা। রাস্তাটা আজও আগেরদিনের মতোই ভালো লাগছিল। তবে আমি গাড়ি চালাতে চালাতে খেয়াল করলাম ঝালদা পেরনোর একটু পরে একটা রাস্তা ডানদিকে ঢুকে গেছে, সেটা দিয়ে গেলে বেগুনকোদর হয়ে যেতে হবে না আর ২ কিলোমিটার মতো কম হবে। কমটা বড় কথা নয়, একটা নতুন রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে, সেটাই বড় কথা। ঝালদা পেরিয়ে ঢুকে পড়লাম ডানদিকে - আমাদের গাড়ির পিছনে রাজীবদার গাড়ি।

রাস্তাটা অপেক্ষাকৃত সরু আর পিচেরও নয়, কংক্রিটের। রাস্তার দুধারে জঙ্গল। তবে রাস্তাটা পাহাড়ী নয়, সমতল। কিন্তু বেশ ভালোই আঁকাবাঁকা। কোথাও কোনও আলো নেই, বাড়িঘর নেই, মানুষজন নেই। হেডলাইটের আলোয় যা দেখা যায় সেই হিসেবেই গাড়ি চলছে কিন্তু ক্ষণে ক্ষণে রাস্তা বাঁক নেওয়ায় বেশি দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। মোবাইলের নেটওয়ার্ক না থাকলেও জিপিএস চালু রয়েছে। ম্যাপ বলছে এখান থেকে রিসর্টের দূরত্ব ৮.২ কিলোমিটার। রাস্তাটা এতই সরু যে এখান দিয়ে কেবলমাত্র একটা গাড়িই চলতে পারে। রাস্তার দুধারে মানুষ সমান উঁচু গাছ, ঘাস কিন্তু সেগুলো সমতল নাকি ঢালু হয়ে নিচে নেমে গেছে, সে'সম্পর্কে আমার কোনও ধারণা নেই। আমাদের পরপর দুটো গাড়ি চলেছে। মাঝে মাঝে ভাবছি যদি কোথাও পৌঁছে দেখি গাড়ি আর এগোনোর জায়গা নেই, তাহলে কী করব। এই রাস্তায় গাড়ি ঘোরানো যাবে না আর এই অন্ধকারে গাড়িকে পিছন দিকে চালানোও অত্যন্ত বিপজ্জনক।

এইভাবেই চলতে থাকলাম। গাড়ির ভিতরে গান চলছে না, কারণ এই রাস্তায় চালানোর সময়ে গভীর মনঃসংযোগের প্রয়োজন, গান চললে সেটা করা কঠিন। আমাদের গাড়ির বাকি যাত্রীদের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে গতকাল আমরা এই রাস্তা দিয়ে ফিরেছি নাকি ফিরিনি - এই বিষয় নিয়ে। যারা বলছে 'গিয়েছি' তারা খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে রাস্তার নানারকম গাছপালা ইত্যাদি দেখিয়ে বলছে "এই তো, গতকাল তো এটা এখানেই ছিল" আর অন্যরা ততটাই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলছে "এগুলো গতকালকের রাস্তায় ছিল না।" মজার ব্যাপার আলোচনাটা বাকিরা নিজেদের মধ্যেই করছে, আমাকে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করছে না, তাই আমি কোনও মন্তব্য করছি না। আমি একমনে গাড়ি চালিয়ে চলেছি। এইভাবে চলতে চলতে রাস্তা একসময়ে চওড়া হল আর আমরা একটা গ্রামের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। ঢুকেই আবার বেরিয়েও পড়লাম কারণ গ্রামটা খুবই ছোট - বাড়ির সংখ্যা বড়জোর ১০। আবার জঙ্গলের সরু রাস্তা শুরু হল। সবমিলিয়ে রাস্তাটা যে কিছুটা হলেও ভীতিপ্রদর্শক সেটা অস্বীকার করব না। একে রাতের অন্ধকার, তার উপর সরু রাস্তা, তার উপর রাস্তার দুপাশে কী আছে জানি না, তার উপর রাস্তার দৈর্ঘ্য খুব কম নয়, তার উপর রাস্তায় কোনও আলো নেই, তার উপর আমাদের ভরসা শুধুমাত্র গুগ্‌ল্‌ ম্যাপ যে অনেক সময়ে ভুল রাস্তাও দেখায় আর সবার উপরে আমাদের কারুর ফোনে কোনও নেটওয়ার্ক নেই।

যাই হোক, পথ দীর্ঘ হলেও পথের বর্ণনাও দীর্ঘ হতে হবে এমন কোনও কথা নেই। আরও কিছুটা এগোতে আবার লোকালয় দেখা গেল আর রাস্তাও চওড়া হল। এবার আমাদের গাড়ির লোকেরাও বুঝে গেল এই রাস্তা দিয়ে কাল ফেরা হয়নি। আর অল্প কিছুক্ষণ চলার পরেই আমাদের সামনে এসে পড়ল মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টির মেইন গেট। সবমিলিয়ে একটা চরম রোমাঞ্চকর জার্ণির সাক্ষী হয়ে রইলাম আমরা সবাই।

রাতে প্রথমদিনের মতো ভাত-রুটি-ডাল-তরকারি-ডিম-চিকেন দিয়ে ডিনার করলাম। খরচ হল ১,৩৬৫/- টাকা।

বৃহস্পতিবার ১লা জানুয়ারী, ২০২৬ - আমার ব্লগের সমস্ত পাঠকদের জানাই হ্যাপি নিউ ইয়ার ! সকালে উঠে ব্রেকফাস্ট করে চেক্‌আউট করে বেলা এগারোটা নাগাদ মুরগুমা থেকে রওনা দিলাম। সঙ্গে কিছু খাবারদাবার ছিল, গাড়ি চলতে চলতে সেইসবই খাওয়া হচ্ছিল। সেই কারণে দুপুরে অনেকেই আর লাঞ্চ করতে চাইল না। আমার আবার ওইসবে হয় না, ট্যাঙ্কে পেট্রোল কম থাকলে গাড়ি চলতে চায় না ! তাই আমি আর বাকিদের মধ্যে কয়েকজন একটা পথচলতি হোটেল থেকে লাঞ্চ করে নিলাম। খরচ হল ১,৩২০/- টাকা।

লাঞ্চের পরে আবার চলতে শুরু করলাম। যাওয়ার সময়ে যে পথে গিয়েছিলাম, সেই পথেই ফিরলাম। কোলাঘাটের কাছে মেসোমশাই আর লালমাসি নেমে গেল। অঙ্কুরহাটি থেকে দিদিভাইরা আলাদা হয়ে গেল। আমরা বাড়ি পৌঁছলাম রাত নটা নাগাদ।

সারসংক্ষেপ ঃ

১. কলকাতা থেকে দুতিনদিনের ঘোরার জন্য পুরুলিয়ার মুরগুমা একটা দূর্দান্ত ঘোরার জায়গা। বছরের যেকোনও ঋতুতেই এখানে যাওয়া যেতে পারে, তবে গরমকালে গেলে ঘোরাঘুরি করাটা কষ্ঠকর হবে।

২. কলকাতা থেকে মুরগুমা গাড়িতে যাওয়ার একাধিক রাস্তা আছে, তার মধ্যে ডানকুনি - দুর্গাপুর - রানীগঞ্জ হয়ে গেলে দূরত্ব ৩৪০ কিলোমিটার আর সময় সবথেকে কম লাগে। এছাড়া ডানকুনি - আরামবাগ - বিষ্ণুপুর অথবা কোলাঘাট - মেদিনীপুর - ঝাড়গ্রাম হয়েও যাওয়া যেতে পারে।

৩. ট্রেনে মুরগুমা যেতে হলে ঝালদা স্টেশন হয়ে যাওয়া যেতে পারে। তবে ঝালদা যাওয়ার ট্রেন খুব কম আছে বলে সবথেকে সুবিধেজনক হল মুরি স্টেশনে নেমে যাওয়া।

৪. মুরগুমায় থাকার অনেক হোটেল আছে, তার মধ্যে অবস্থানগত দিক থেকে সবচেয়ে ভালো পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের 'মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টি'। আমরা এদের ওয়েবসাইট https://wbtdcl.wbtourismgov.in/home থেকে বুকিং করেছিলাম।

৫. পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের অন্যান্য হোটেলের মতো মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টিতেও কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট দেয়। এখানে যা খাবার দেয় তা খেয়ে রীতিমতো পেট ভরে যায়। এখানকার রান্নার মান বেশ ভালো।

৬. মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টির কাছাকাছি আরও কিছু হোটেল আছে। এগুলো হাঁটাদূরত্বে তাই চাইলে সেখান থেকেও গিয়ে খাবার খাওয়া যেতে পারে। 

৭. মুরগুমা থেকে সাইটসিয়িং করার মতো যে জায়গাগুলো আছে তার বেশিরভাগগুলোই অযোধ্যা পাহাড়ের এলাকায়। সাইটসিয়িং এর মধ্যে পিটিডিরি ঝর্ণা, খয়রাবেড়া ড্যাম, মুরগুমা ড্যাম, ময়ূর পাহাড় আর অযোধ্যা পাহাড়ের লোয়ার ও আপার ড্যাম অবশ্য দ্রষ্টব্য।

৮. শীতকালে পুরুলিয়ায় বেশ ঠান্ডা পড়ে। রাতের দিকে তাপমাত্রা ৪ - ৫ ডিগ্রিতেও নেমে যায়, তাই পর্যাপ্ত শীতপোষাক সঙ্গে রাখা দরকার।

৯. মুরগুমার বেশিরভাগ জায়গাতেই মোবাইলের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। তাই এটা মাথায় রেখে বাকি সব পরিকল্পনা করতে হবে।

১০. মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টির কাছাকাছি কোনও পেট্রোল পাম্প নেই, সবথেকে কাছেরটাও এখান থেকে ১১ কিলোমিটার। তাই গাড়ি নিয়ে গেলে এখানে ঘোরার সময়ে সুযোগমতো গাড়ির পেট্রোল ভরে নেওয়া ভালো।

উপসংহার ঃ

মুরগুমা ড্যাম

ডেভেলপ্‌মেন্ট বা উন্নয়নের মানে যদি সভ্যতার বিকাশ মনে করা হয়, তাহলে তার অভাবটা পশ্চিমবঙ্গের জেলাগুলোর মধ্যে পুরুলিয়ায় সবথেকে বেশি। এর আগেও আমরা পুরুলিয়ায় গিয়েছি আর এই অভাবটা তখনও একইরকমভাবে চোখে পড়েছে। কিন্তু এটাকে আমি যে খুব নেতিবাচকভাবে দেখেছি, তা নয়। বিকাশের অভাব মানে যদি উঁচু উঁচু বাড়ি তৈরি না করা হয়, তাহলে বিকাশের অভাবই ভালো। বিকাশের অভাব মানে যদি গাছপালা কেটে শহর তৈরি না করা হয়, তাহলে বিকাশের অভাবই ভালো। বিকাশের অভাব মানে যদি পুকুর-জলাশয় বুজিয়ে না ফেলা হয়, তাহলে বিকাশের অভাবই ভালো। মানুষের যে প্রয়োজনগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে সভ্যতার বিকাশ ঘটে, এখানে এলে মনে হয় সেই প্রয়োজনগুলোই তেমন প্রকট নয়। আর তাই পুরুলিয়া আছে পুরুলিয়াতেই। মুরগুমাতেও এই ছবিটা আলাদা নয়। সেই কারণেই এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ আমার এত প্রিয়। মুরগুমা থেকে সাইটসিয়িং-এর কিছু কিছু জায়গায় গিয়ে মনে হয় যেন অতীত কালে চলে গিয়েছি কারণ আজ থেকে একশ' দুশ বছর আগেও এই জায়গাগুলো এইরকমই ছিল। আর এগুলোই আমার ভালো লাগে। আমার মতো এই অপরিবর্তনশীল সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ যাদের ভাল লাগে, তাদের একবার মুরগুমা ভ্রমণ অবশ্য কর্তব্য !

মুরগুমা ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.