ভ্রমণপথ ঃ
রবিবার ২৪শে মে, ২০২৬ঃ হাওড়া থেকে রাত্রি ১১ঃ৪০ মিনিটে হাওড়া মুম্বই মেল ভায়া গয়া।
সোমবার ২৫শে মে, ২০২৬ঃ সন্ধ্যে ৭ঃ৫০ মিনিটে - জব্বলপুর - রাত্রি ১০ঃ৩০ মিনিটে নর্মদা এক্সপ্রেস।
মঙ্গলবার ২৬শে মে, ২০২৬ঃ সকাল ৯ঃ৪৫ মিনিটে - উজ্জয়িনী - লোক্যাল সাইট সিয়িং - উজ্জয়িনীতে রাত্রিবাস ।
বুধবার ২৭শে মে, ২০২৬ঃ উজ্জয়িনীতে লোক্যাল সাইট সিয়িং - বিকেল ৫ঃ৫৫ মিনিটে নর্মদা এক্সপ্রেস।
বৃহস্পতিবার ২৮শে মে, ২০২৬ঃ সকাল ৮ঃ৩০ মিনিটে উমারিয়া - বান্ধবগড় - বান্ধবগড় টাইগার সাফারি - বান্ধবগড়ে রাত্রিবাস।
শুক্রবার ২৯শে মে, ২০২৬ঃ সকাল ৭টায় চেক্ আউট - উমারিয়া - সকাল ৮ঃ৪০ মিনিটে নর্মদা এক্সপ্রেস - দুপুর ১২ঃ৩০ মিনিটে পেন্ড্রা রোড - অমরকন্টক - অমরকন্টকে রাত্রিবাস।
শনিবার ৩০শে মে, ২০২৬ঃ সকাল ৯টায় চেক্ আউট - অমরকন্টকে লোক্যাল সাইট সিয়িং - পেন্ড্রা রোড - রাত ৮ঃ১০ মিনিটে উদয়পুর শালিমার সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস।
রবিবার ৩১শে মে, ২০২৬ঃ দুপুর ১ঃ৩০ মিনিটে সাঁত্রাগাছি।
"বান্ধবগড় যাব, বাঘ দেখব আর চলে আসব !" - আমার স্ত্রী অমৃতার এহেন আবদারের পরিপ্রেক্ষিতেই বেশ কয়েকমাস আগে থেকে বান্ধবগড় যাওয়ার পরিকল্পনা শুরু করেছিলাম। করতে গিয়ে দেখলাম জায়গাটা দুর্গম আর কলকাতা / হাওড়া থেকে সরাসরি রেল যোগাযোগ নেই। সেইসঙ্গে দেখলাম ওখান থেকে অমরকন্টক জায়গাটা খুব একটা দূরে নয়। তো, বান্ধবগড়ের সঙ্গে যোগ হল অমরকন্টক। এই পর্যন্তই ঠিক ছিল কিন্তু তারপর আনন্দদা উজ্জয়িনীর মহাকালেশ্বর মন্দির দর্শনের ইচ্ছে প্রকাশ করল। তখন বান্ধবগড়, অমরকন্টকের সঙ্গে যোগ হল উজ্জয়িনী। গরমের ছুটিতে মধ্যপ্রদেশের এই তিনটে জায়গা ভ্রমণ নিয়েই আমার ব্লগের এবারের পোস্ট।
আগেরবার যখন গিয়েছিলাম তখনও দেখেছি, মধ্যপ্রদেশের একটা বড় সমস্যা হল এখানকার রেল যোগাযোগের ক্ষীণতা। হাওড়া থেকে সরাসরি উজ্জয়িনী যাওয়ার একটাই ট্রেন শিপ্রা এক্সপ্রেস কিন্তু সে ছাড়ে সপ্তাহে মাত্র তিনদিন আর উজ্জয়িনী পৌঁছয় রাত ৯ঃ৫৫ মিনিটে যেটা একটা নতুন শহরে পৌঁছনোর পক্ষে কখনওই সুবিধেজনক সময় নয়। অগত্যা ব্রেকজার্ণি। হাওড়া থেকে জব্বলপুর আর জব্বলপুর থেকে উজ্জয়িনী।
উজ্জয়িনী ভ্রমণ ঃ
রবিবার ২৪শে মে, ২০২৬ রাত ১১ঃ৪০ মিনিটে হাওড়া থেকে ছাড়ল আমাদের ট্রেন মুম্বই মেল ভায়া গয়া। আমাদের এবারের দল দশজনের - আমি অমৃতা বাবা মা কথা কলি আনন্দ দা দিদি পটাই আর নন্দিনীদি। অনেক রাতের ট্রেন বলে বাড়ি থেকে ডিনার করেই বেরিয়েছিলাম, ট্রেন ছাড়লে যে যার বার্থ-এ শুয়ে পড়লাম।
![]() |
| ট্রেনে যাওয়ার পথে |
![]() |
| উজ্জয়িনী স্টেশনে আমরা |
স্টেশনের বাইরেই একাধিক খাবার দোকান আছে সেখানে সিঙাড়া পুরী তরকারি রুটি পোহা এইসব পাওয়া যায়। খাবারের মান খুব উন্নত না হলেও পেট ভরানোর পক্ষে ঠিকঠাক। ব্রেকফাস্ট শেষ আমরা ঘরে এসে চানটান সেরে নিলাম। দুপুরে লাঞ্চের জন্য স্টেশনের ফুড প্লাজায় গেলাম। মুশকিল হল স্টেশনে কোনও আমিষ খাবার পাওয়া যায় না। তারপর খোঁজ নিয়ে জানলাম শুধু স্টেশনে নয়, স্টেশনের ত্রিসীমানার মধ্যে এবং অনেক দূর পর্যন্ত কোন আমিষ খাবারের দোকান নেই। উজ্জয়িনী মহাকালেশ্বর মন্দিরের জন্য বিখ্যাত এবং ধর্মীয় কারণে এখানে আমিষ খাবার বিক্রি হয় না (আমি ব্যক্তিগতভাবে বুঝিনা ঠাকুর, পুজো, ধর্ম ইত্যাদির সঙ্গে আমিষ বা নিরামিষের কী সম্পর্ক)। অগত্যা ফুড প্লাজা থেকে নিরামিষ থালিই নিতে হলো। ভাত ডাল তরকারি ডাল আচার ডাল ইত্যাদি নিয়ে একটা থালির দাম ১৫০/- টাকা।
লাঞ্চের পরে আমরা ঘুরতে বেরোলাম। আমাদের প্রথম দিনের দুটি গন্তব্য - যন্তর মন্তর এবং মহাকালেশ্বর মন্দির।
যন্তর মন্তর -
টিকিটঃ মাথাপিছু ১০/- টাকা
তারামন্ডলের টিকিটঃ মাথাপিছু ২০/- টাকা
অষ্টাদশ শতাব্দীতে জয়পুরের মহারাজা সোয়াই জয় সিং (দ্বিতীয়) ভারতবর্ষের পাঁচ জায়গায় পাঁচটি মানমন্দির তৈরি করেন। এগুলোরই নাম যন্তর মন্তর। উজ্জয়নী ছাড়া অন্য চারটি জায়গা হল - জয়পুর, দিল্লী, বারাণসী এবং মথুরা। এর মধ্যে জয়পুরের মানমন্দিরটাই সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে বিখ্যাত। আমরা জয়পুর ভ্রমণের সময়ে এই মানমন্দিরটা দেখেছিলাম। উজ্জয়িনীর মানমন্দিরটা তুলনামূলকভাবে ছোট যদিও 'যন্তর' এখানেও অনেক আছে। মানমন্দিরের সঙ্গে লাগোয়া একটা তারামণ্ডল আছে সেখানে মহাকাশের সম্পর্কে শো হয়। আমরা তারামণ্ডলে বিকেল ৪টে থেকে আধঘন্টার শো দেখে নিলাম। শো-এর মান মোটের উপর মন্দ নয় তবে এদের যন্ত্রপাতি বেশ পুরনো হওয়ায় ছবির মান খুব একটা উন্নত নয়। বিশেষ করে যারা কলকাতার বিড়লা তারামণ্ডলের শো দেখেছে, তাদের এই শো না দেখলেও চলবে !
![]() |
| যন্তর মন্তর |
![]() |
| হরিসিদ্ধি মন্দিরের সামনে |
![]() |
| প্রদীপস্তম্ভ প্রজ্জ্বলন |
![]() |
| বিক্রমাদিত্যের মূর্তি |
আমাদের উজ্জয়িনী ভ্রমণের পরিকল্পনা করার আগে পর্যন্ত আমার ধারণা ছিল উজ্জয়নীর খ্যাতি রাজা বিক্রমাদিত্যের জন্যই। কিন্তু পরিকল্পনা করতে গিয়ে জানলাম এখানকার প্রধান আকর্ষণ মহাকালেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির। বিক্রমাদিত্যের রাজধানী হিসেবে এর কোনও ঐতিহাসিক খ্যাতি বর্তমানে আর নেই। প্রকৃতপক্ষে এখানে বিক্রমাদিত্যের কোনও কিছুই নেই।
সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা বাজে, দিনের আলো কমে এসেছে। এই সময়ে দ্বীপটায় দাঁড়িয়ে থাকতে খুব ভালো লাগছিল, বিশেষ করে এখান থেকে মহাকালেশ্বর মন্দিরের সমস্ত জ্বলন্ত আলো এবং রুদ্রসাগরের জলে তার প্রতিফলনের দৃশ্য খুবই মনোরম লাগছিল।
![]() |
| মন্দির চত্বরে বিভিন্ন মূর্তি |
রাত সাড়ে নটা বাজে, যদিও মন্দিরে মানুষের ঢল দেখে সেটা বোঝার উপায় নেই। সন্ধ্যে থেকে সুদীর্ঘ সময় ধরে হাঁটা হয়েছে বলে আমরা এবার বেরোনোর সিদ্ধান্ত নিলাম। যেদিক দিয়ে ঢুকেছি, সেদিক দিয়ে বেরোলাম না আর বেরোনোর সময়ও অনেকটা রাস্তা হাঁটতে হল।
মন্দিরের গেটের ঠিক বাইরেই বেশ কয়েকটা রেস্ট্যুরেন্ট আছে। এরকম একটা রেস্ট্যুরেন্ট থেকে রুটি, আলুগোবি, মিক্সড ভেজ, চাউমিন ইত্যাদি দিয়ে সবাই ডিনার করে নিলাম। খরচ পড়ল ১,১০০/- টাকা। খাওয়ার পরে দুটো টোটো ধরে আমরা স্টেশনে ফিরে এলাম।
পরেরদিন বুধবার ২৭শে মে, ২০২৬ - আমাদের উজ্জয়িনীর সাইটসিয়িং-এর দিন। এখানে জানিয়ে রাখি উজ্জয়িনীর সাইটসিয়িং এর দুটো ভাগ - একটা শহরের ভিতরে, অন্যটা বাইরে। এখানকার সমস্ত অটোরিক্সাওয়ালা, টোটোওয়ালা, গাড়িওয়ালাদের কাছে এই সাইটসিয়িং-এর লিস্টের ছাপানো কার্ড থাকে, আর এরা বারবার সেটা দেখায়। দুটো ভাগেই ছটা করে দেখার জায়গা। শহরের ভিতরে জায়গাগুলো সবই মহাকালেশ্বর মন্দিরের আশেপাশে, অটোরিক্সা ওখানে নিয়ে গিয়ে নামিয়ে দেবে আর তারপর বাকিটা হেঁটে ঘুরতে হবে। তাই শহরের ভিতরের সাইটসিয়িংটা আলাদা করে নেওয়ার কোনও মানেই হয় না, অটোরিক্সা করে মহাকালেশ্বর মন্দিরে চলে যাওয়াই ভালো। শহরের বাইরের সাইটসিয়িংটার জন্য গাড়ি করতেই হবে। তবে উজ্জয়িনীতে প্রাইভেট ট্যাক্সির চলন খুব একটা নেই, অটোরিক্সাই প্রধান যানবাহন।
শহরের ভিতরের দেখার জায়গাগুলো সবই আমাদের গতকাল দেখা হয়ে গেছে, তাই আমাদের গন্তব্য শহরের বাইরের সাইটসিয়িং। সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ স্টেশন থেকে একটা বড়ো অটোরিক্সা নিয়ে আমরা সবাই বেরিয়ে পড়লাম। একটা অটোতে দশজন বেশ চাপাচাপি হয়, কিন্তু যেহেতু জায়গাগুলোর দূরত্ব খুব বেশি নয়, তাই কোনওমতে মানিয়ে নেওয়া হল। আর আমাদের দলের সবাই-ই 'সুজন', কাজেই ...। উজ্জয়িনী বেশ কিছুটা পশ্চিমে হওয়ার কারণে এখানে যেমন সূর্যাস্ত হয় দেরিতে, তেমনি সূর্যোদয়ও হয় দেরিতে আর তার ফলে স্বাভাবিক জনজীবন শুরুও হয় দেরিতে। অটোয় করে আমরা যখন উজ্জয়িনী শহরের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি দেখলাম রাস্তায় লোকজন খুব কম, গাড়িঘোড়া কম, দোকানপাট প্রায় সবই বন্ধ। আধঘন্টা চলার পর শহর থেকে একটু বাইরে আমরা পৌঁছলাম আমাদের প্রথম গন্তব্যে।
![]() |
| গুহার রাস্তার পাশে শিপ্রা নদী |
![]() |
| ভর্তৃহরি গুহার ভিতরে |
![]() |
| গড়কালিকা মন্দিরের সামনে |
কালভৈরব মন্দির - প্রায় দশমিনিট চলার পরে পৌঁছলাম কালভৈরব মন্দিরে। এখানে আমাদের অটো যেখানে নামিয়ে দিল, সেখান থেকে মন্দিরে ঢোকার রাস্তাটা বেশ কিছুটা দূরে। মূল মন্দিরে ঢুকতে গেলে যে পথটা দিয়ে হেঁটে ঢুকতে হয়, সেটাকে ব্যারিকেড করে একটা সর্পিলাকার পথে পরিণত করা হয়েছে যাতে লাইন সুষ্ঠুভাবে এগোতে পারে। এরকম আমরা আগেও অনেক মন্দিরে দেখেছি। কিন্তু এই পথে কিছুদূর গিয়ে দেখলাম লাইনে যে পরিমাণ লোক দাঁড়িয়ে আছে, তাতে এই মন্দির দেখতে গেলে এখানেই দুঘন্টা সময় কেটে যাবে। আর সত্যি বলতে কী, আমাদের সেরকম ভক্তিও নেই যে এটা দেখলাম না বলে খুব আফসোস হবে। সুখের চেয়ে সোয়াস্তি ভাল - ভীড়ের চেয়ে না দেখা ভাল !
মন্দির না-দেখে বেরিয়ে এসে আবার অটোয় উঠলাম। বেলা সাড়ে দশটা বাজে তাই কাছেই একটা রেস্ট্যুরেন্টে ব্রেকফাস্টের জন্য দাঁড়ানো হল। এখানে আমরা আলুর পরোটা দিয়ে ব্রেকফাস্ট সারলাম। সবমিলিয়ে খরচ পড়ল ৭৫০/- টাকা।
সিদ্ধবত ঘাট - মিনিট পাঁচেক অটোয় চলার পরে আমরা পৌঁছলাম সিদ্ধবত ঘাটে। এটা শিপ্রা নদীর ধারে একটা ঘাট। জায়গাটায় দেখার মতো সেরকম কিছুই নেই শুধু একটা মন্দির ছাড়া। মন্দিরটাও সেরকম দারুণ কিছু নয়, তাই আমরা শিপ্রা নদীর ঘাটটা দেখে ফিরে এলাম।
![]() |
| মঙ্গলনাথ মন্দির |
![]() |
| সন্দীপনি আশ্রমের ভিতরে |
![]() |
| পুকুরের চারপাশে সিঁড়ির ধাপ |
আমাদের নির্ধারিত সাইটসিয়িং শেষ। কিন্তু আমরা আগে থেকেই অটোওয়ালাকে বলে রেখেছিলাম আরেকটা জায়গায় আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য। সেটা হল বিক্রমাদিত্য মিউজিয়াম। এর নাম কোনও সাইটসিয়িং-এর লিস্টে নেই, এটা আমরা নিজেরা ইন্টারনেট থেকে দেখেছিলাম। মজার ব্যাপার জায়গাটা উজ্জয়িনী শহরের মধ্যে হওয়া সত্ত্বেও আমাদের ড্রাইভার জায়গাটার সঠিক অবস্থান জানে না। ইন্টারনেট দেখে জায়গাটার নাম বলেও সুবিধে হল না। শেষ পর্যন্ত আমার মোবাইলের গুগ্ল্ ম্যাপ দেখে ড্রাইভার সেখানে আমাদের নিয়ে গেল।
![]() |
| বিক্রমাদিত্যের বন্ধ মিউজিয়াম |
আমরা দুপুর দুটো নাগাদ স্টেশনে ফিরে এলাম। সারাদিনের ঘোরার জন্য অটো নিল ১,৩০০/- টাকা (ছ'টা সাইটসিয়িং-এর জন্য ১,২০০/- টাকা আর বিক্রমাদিত্য মিউজিয়ামের জন্য ১০০/- টাকা) সকালে ব্রেকফাস্টটা ভারী হওয়ার কারণে কেউই দুপুরে লাঞ্চ করতে রাজী হল না, অল্প করে টুক্টাক খেয়ে নেওয়া হল। আমাদের ট্রেন নর্মদা এক্সপ্রেসের সময় বিকেল ৫ঃ৫৫। সেইমতো আমরা প্ল্যাটফর্মে এসে বসলাম আর নির্ধারিত সময় ট্রেন এলে তাতে চড়ে বসলাম। উজ্জয়িনী ভ্রমণ এখানে শেষ - আমরা এগিয়ে চললাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের দিকে।
সারসংক্ষেপ ঃ
১. হাওড়া থেকে উজ্জয়িনী যাওয়ার সরাসরি ট্রেন একটাই আছে - শিপ্রা এক্সপ্রেস, তাও আবার সেটা সপ্তাহে তিনদিন ছাড়ে। তাই উজ্জয়িনী যাওয়ার জন্য জব্বলপুর থেকে ব্রেকজার্ণি করাই ভালো, তাতে কয়েকটা বিকল্প পাওয়া যায়।
২. উজ্জয়িনীতে স্টেশনের কাছেই অনেক হোটেল আছে। স্টেশনে রিটায়ারিং রুমও আছে, যদিও তার ভাড়া বেশ বেশি এবং ভাড়ার তুলনায় ঘরগুলো যথেষ্ট হাই-ফাই নয়।
৩. উজ্জয়িনী আদ্যোপান্ত ধর্মীয় জায়গা হওয়ায় স্টেশন বা স্টেশনের ত্রিসীমানার মধ্যে আমিষ খাবার পাওয়া যায় না। নিরামিষ খাবারের মান ঠিকঠাক।
৪. উজ্জয়িনীর প্রধাণ আকর্ষণ মহাকালেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির। এটা ভারতের দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দিরগুলো মধ্যে অন্যতম।
৫. উজ্জয়িনীর মহাকালেশ্বর মন্দিরের আশেপাশে আরও অনেকগুলো মন্দির আছে। সবমিলিয়ে চত্বরটা সুবিশাল - আর পুরোটাই হেঁটে ঘুরতে হয়। গরমকালে গেলে সন্ধ্যের পরে যাওয়াই ভালো।
৬. অন্যান্য সাইটসিয়িংগুলোর মধ্যে যন্তর মন্তর, ভর্তৃহরি গুহা আর সন্দীপনি আশ্রম অবশ্য দ্রষ্টব্য। এগুলোর প্রত্যেকটা দেখতেই সময় লাগে, তাই হাতে সময় নিয়ে দেখা দরকার।
৭. উজ্জয়িনীতে মহারাজা বিক্রমাদিত্যের রাজধানী থাকা সত্ত্বেও মহাকালেশ্বর মন্দিরের কাছে একটা মূর্তি ছাড়া এখানে বিক্রমাদিত্যের কোনওকিছুই নেই। একটা মিউজিয়াম আছে কিন্তু সেটাও বর্তমানে বন্ধ।
৮. সাইটসিয়িং করার জন্য এখানে প্রাইভেট ট্যাক্সির প্রচলন খুব বেশি নেই, অটোরিক্সাই ভরসা। অটোওয়ালাদের সঙ্গে দরাদরি করতে পারলে ভাড়া বেশ কিছুটা কমানো যায়।
৯. উজ্জয়িনীতে গরম বেশ বেশি হওয়া সত্ত্বেও আবহাওয়া শুকনো হওয়ার কারণে ঘাম কম হয় আর ক্লান্তিও কম লাগে। আর কলকাতার গরমের তুলনায় গরম কমই লাগে বলা যেতে পারে।
বান্ধবগড় ভ্রমণ ঃ
উজ্জয়িনীর নিরামিষ ভূত যে ট্রেনে ওঠার পরেও আমাদের পিছু ছাড়েনি, সেটা জানতে পারলাম প্যান্ট্রী থেকে আমাদের ডিনার অর্ডার করার সময়ে। প্যান্ট্রীকারের ছেলেটা স্পষ্টভাষায় জানালো যেহেতু এই ট্রেন উজ্জয়িনীর উপর দিয়ে যায়, তাই ওরা ট্রেনের প্যান্ট্রীতে কোনও আমিষ খাবার রাখে না। অগত্যা নিরামিষ বিরিয়ানী আর নিরামিষ থালি নেওয়া হল আর সঙ্গে যা খাবারদাবার ছিল তাই দিয়ে চালিয়ে নেওয়া হল। খাওয়ার পর সবাই যে-যার বার্থে শুয়ে পড়লাম।
![]() |
| উমারিয়া স্টেশনে আমরা |
বান্ধবগড় পৌঁছতে লাগল প্রায় একঘন্টা। রাস্তার দুধারে প্রচুর গাছপালা আর পৌঁছনোর শেষের পথের দুপাশে জঙ্গল। জঙ্গল খুব ঘন না হওয়ায় ভিতরে বেশ কিছুদূর দেখা যায়। আমরা যাওয়ার পথে কিছু হরিণ দেখতে পেলাম তবে রাজার দেখা পাইনি। স্টেশন থেকে হোটেল পর্যন্ত একেকটা গাড়ির ভাড়া ২,০০০/- টাকা।
বান্ধবগড়ে আমাদের হোটেলের নাম ফ্লাইক্যাচার ইন্। হোটেলটা খুব বড় নয়, আর পুরোটাই একতলা। আমাদের চারটে ঘর বুক করা ছিল। এখানে যিনি আমাদের আপ্যায়ন করলেন তিনি একাধারে ম্যানেজার কেয়ারটেকার রিসেপশনিস্ট হেড কুক - সবই। হোটেলে আমরা ছাড়া আর কোনও গেস্ট নেই, তাই আমরা যা খেতে চাইব ওনারা তাইই তৈরি করে দেবেন। আমরা ব্রেকফাস্টের জন্য পুরী সবজি তৈরি করতে বললাম আর লাঞ্চে চিকেন থালি (ফাইন্যালি !)।
হোটেলের ঘরগুলো খুব বড় না হলেও ঘরের মান বেশ উন্নত। আমরা চেক্ইন করে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। বেলা সাড়ে এগারোটার সময়ে আমাদের ব্রেকফাস্ট দিল। রান্না বেশ ভালো। খিদেও পেয়েছিল, সবাই ভালভাবে খাওয়াদাওয়া সেরে নিলাম। খাবার ভালো হলেও এখানে খাবারের দাম বেশ বেশি - একেক প্লেট পুরী সবজির দাম ২২০/- টাকা। বান্ধবগড়ে আমাদের দেখার জায়গায় একটাই - বান্ধবগড় টাইগার রিজার্ভ। সাফারির বুকিং https://forest.mponline.gov.in/ থেকে আগেই করা ছিল। আমাদের সাফারির সময় বিকেল ৪টে থেকে সন্ধ্যে ৭টা, তাই আমাদের হাতে ঢের সময় আছে।
উপরের দেওয়া ওয়েবসাইট ছাড়াও সাফারি বুকিং-এর আরও কয়েকটা সাইট আছে। কিন্তু একমাত্র এটাই সরকারী - বাকিগুলো বেসরকারী। আর আমার মতে এইসব বুকিং বেসরকারী ওয়েবসাইট থেকে না করাই ভালো।
আমাদের সাফারির বুকিং টালা গেট থেকে করা ছিল, আমাদের হোটেল থেকে এই গেটের দূরত্ব ঠিক ১ কিলোমিটার। সাফারি বুকিং আগে থেকে করা থাকলেও জিপ আর গাইডের বুকিং এখানকার গেটের অফিস থেকে করতে হয়। আমাদের হোটেলের ম্যানেজার কাম ইত্যাদি ভদ্রলোক বললেন এই বুকিং-এর কাজটা উনিই আমাদের হয়ে করে দেবেন (অর্থাৎ উনি ট্রাভেল ডেস্কও চালান !)। এর জন্য উনি আমাদের থেকে মোট ৯০০/- নিলেন। টাকাটা একটু বেশি হলেও আমাদের কোনও ঝক্কি পোহাতে হল না আর সেইসঙ্গে এটাও ঠিক আমরা বাইরের লোক তাই আমাদের পক্ষে ব্যাপারটা এত সহজে করে ফেলা সম্ভব নয়।
দুপুরে চিকেন থালি দিয়ে লাঞ্চটা ভালোই হল। চিকেন থালির দাম ৪৬০/- টাকা, এটাও বেশ বেশি। লাঞ্চ করে একটু বিশ্রাম নিয়ে আমরা চারটের সময়ে বেরিয়ে পড়লাম। সাফারির জিপ আমাদের হোটেল থেকেই আমাদের তুলে নিল। বলা বাহুল্য, জিপগুলো হুড খোলা। এখানকার নিয়ম হচ্ছে একেকটা জিপে ছজন করে বসতে পারবে। আমাদের যেহেতু দশজন তাই একটা জিপ পুরো আমাদের আর অন্য জিপে আমাদের চারজনের সঙ্গে বাইরের দুজন। জিপ আর গাইডের ভাড়াটাও এই অনুপাতেই ভাগ হবে।
বান্ধবগড় টাইগার রিসার্ভ -
সাফারি জোন ঃ মাগধি
সাফারি চার্জ ঃ মাথাপিছু ৪৫০/- টাকা (ছোটদের মাথাপিছু ২৩০/- টাকা) (সার্ভিস ফি সহ)
সাফারি জিপের চার্জঃ ৩,৮০০/- টাকা (ছজনের জন্য)
গাইডের চার্জঃ ১,০০০/- টাকা (ছজনের জন্য)
![]() |
| রেডি ফর দ্য সাফারি ! |
![]() |
| জঙ্গলের ভিতর হরিণের পাল |
হ্যাঁ, এখান থেকে বাঘ দেখা যাচ্ছে। আমাদের গাইড দেখালো, জলাশয়ের পাড়ের উপরে একটা ঝোপঝাড়ের মধ্যে বাঘ শুয়ে ঘুমোচ্ছে। আমরা মোবাইলের ক্যামেরার সর্বাধিক জুম ব্যবহার করেও যেটা দেখতে পেলাম তাতে সেটাকে বাঘ বলে বোঝা মুস্কিল। আমাদের গাইড জানালো বাঘের নাম জামহোল। এই মাগধি এলাকায় সে-ই একমাত্র বাঘ আর তার সঙ্গে আছে ৩-৪ টে বাঘিনী। জঙ্গলের মধ্যে বাঘেদের এলাকা ভাগ করা থাকে। একটা বাঘ তার বাঘিনীদের নিয়ে যেখানে থাকে তার ৬০ - ৬৫ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের পুরোটাই তার এলাকা। সেখানে সে ৩-৪ জন বাঘিনী নিয়ে বসবাস করে। সেখানে অন্য বাঘের প্রবেশ নিষেধ। বাঘ বিভিন্ন গাছের গুঁড়িতে নখ দিয়ে আঁচড় কেটে নিজের এলাকা চিহ্নিত করে রাখে। যদি অন্য কোনও বাঘ তার এলাকায় প্রবেশ করে, তাহলে দুজনের মধ্যে মুখোমুখি ডুয়েল হয়। সেই ডুয়েলে যে জেতে সে ওই এলাকার রাজা হয়ে যায়। বলা বাহুল্য, অন্যজন বীরগতিপ্রাপ্ত হয়। স্ট্রাগ্ল ফর এক্সিস্টেন্স - সারভাইভ্যাল অফ্ দ্য ফিটেস্ট !
আমাদের গাইড বলল বাঘ কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুম থেকে উঠবে আর তারপর জল খাওয়ার জন্য জলাশয়ে নামবে। তখন তাকে ভালোভাবে দেখা যাবে। কিন্তু এই কিছুক্ষণটা কতক্ষণ? উত্তরে সে বলল - টাইগার যো হ্যায়, ও জঙ্গলকা রাজা হ্যায় ! তো ও কব উঠেগা, ও তো কিসিকো ভি পতা নেহি। ও আপনে মর্জি কা মালিক হ্যায়। আগার আপলোগ উসকো দেখনা চাহ্তে হ্যায়, তো ওয়েট করনা পড়েগা !
![]() |
| ঝোপঝাড়ের আড়ালে বাঘ |
বসে থাকতে থাকতে আমি গাইডকে জিজ্ঞেস করলাম এখানে বাঘকে বনদপ্তর থেকে খাবার দেওয়া হয় কিনা। উত্তরে সে বলল শুধু বাঘ নয়, এখানকার কোনও প্রাণীকেই খাবার দেওয়া হয় না, নিজেদের খাবার এদের নিজেদের সংগ্রহ করে নিতে হয়। বাঘ এখানে হরিণ বা অন্য জানোয়ার শিকার করে খায়। অর্থাৎ এখানে সবকিছুই আদিম - কোনওকিছুই কৃত্রিম নয়।
ইতিমধ্যে আমাদের আশেপাশে মাথার উপরের গাছের বাঁদরগুলো বাঁদরামি শুরু করল। উপর থেকে মাঝে মাঝেই গাড়িগুলোর উপরে তারা বিষ্ঠাবর্ষণ করতে শুরু করল। সৌভাগ্যক্রমে আমাদের গাড়ির উপরে করেনি ! আমাদের গাইড বলল বাঁদরগুলো জলাশয় থেকে জল খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। অপেক্ষা করছে কেন, খেলেই তো পারে ! গাইড বলল জঙ্গলের নিয়ম হল বাঘ আগে জল খাবে, তারপরে বাকিরা। তাই ওরা বাঘের জল খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। প্রকৃতির ভিতর এই নিয়মানুবর্তিতা আমাকে বেশ অবাক করল !
নড়ল ! নড়ল ! একবার, দুবার। আবার শুয়ে পড়ল। ঝোপের মধ্যে জামহোলকে যেটুকু দেখতে পেলাম তাতেই দারুণ লাগল। কিন্তু আবার অপেক্ষা। দর্শক রেডি। ক্যামেরা রেডি। জঙ্গলও যেন তৈরি হয়ে রয়েছে তাদের রাজার বৈকালিক ক্রিয়াকলাপের জন্য।
![]() |
| জলের মধ্যে জামহোল |
এই না হলে রাজদর্শন !
![]() |
| ময়ূর - পেখম না তোলা |
![]() |
| জঙ্গলের মধ্যে সূর্যাস্ত |
এখানে জিপটাকে ছেড়ে দিয়ে একটু চা-টা খেয়ে নেওয়া হল। তারপর কয়েকজন কেনাকাটার জন্য ওখানে থেকে গেল আর বাকিরা হোটেলের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। বান্ধবগড় একটা খুব ছোট্ট শহর আর এখানকার অর্থনীতি ওই টাইগার রিসার্ভের উপর নির্ভরশীল, তার বাইরে এখানে কিছু নেই। সন্ধ্যের পরে এখানে রাস্তায় লোকজন প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে। আমরা হোটেলে ফিরে এসে কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে গল্প করে কাটিয়ে দিলাম।
রাত নটা নাগাদ আমরা বেরিয়ে একটা হোটেল থেকে ডিনার সেরে নিলাম (হোটেলের খাবারের দাম খুব বেশি হওয়ার কারণেই বাইরে খেতে হল)। রুটি, চিকেন, আলুর দম ইত্যাদি মিলিয়ে খরচ হল ৯৯০/- টাকা। ডিনারের পর হোটেলে ফিরে এসে শুয়ে পড়লাম।
![]() |
| ফ্লাইক্যাচার ইন্-এর সামনে আমরা |
বান্ধবগড়ের খুব বিখ্যাত বাঘ ছিল পূজারী - এর এলাকা ছিল খিতাউলি আর পানপাতা জোন। পূজারী খুব পর্যটকবান্ধব বাঘ ছিল, পর্যটকদের সে ভালো ভালো পোজ দিয়ে ছবি দিত। পূজারী দিনে তিনচারবার জলে নেমে চান করত বলে তার ঐ নাম। প্রায় ১০ বছর বয়সে আরেকটা অন্য বাঘের সঙ্গে ডুয়েলে গত ১১ই মে ২০২৬ সে নিহত হয়। এই ডুয়েলের প্রসঙ্গে আমাদের ড্রাইভার বলল যখন একটা বাঘ বড় হয়, তখন তার একটা নিজের এলাকা দরকার হয়। কিন্তু এলাকার পরিমাণ তো সীমিত, তাই সে তখন অন্য কোনও একটা বাঘের এলাকায় ঢুকে পড়ে তার সঙ্গে লড়াই করে। যদি তাকে হারাতে পারে তাহলে সেই বাঘ ঐ এলাকার অধীশ্বর হয়ে বসে। আর প্রথমেই সে করে কী, আগের বাঘের বাচ্চাগুলোকে মেরে ফেলে কারণ সেই বাচ্চারা তার সম্ভাব্য বিপদের কারণ। আমি শুনতে শুনতে বিস্মিত হয়ে গেলাম। জঙ্গলের ভিতরেও তাহলে এই জীবনসংগ্রাম চলে। শুধুমাত্র জন্ম, খাদ্যগ্রহণ, বংশবৃদ্ধি, আর মৃত্যু - এতেই জীবন সীমাবদ্ধ নয়। এদের সমাজ মানুষের থেকে খুব বেশি কিছু আলাদা নয় !
চলতে চলতে একজায়গায় দেখা গেল রাস্তার উপরে একপাল বাঁদর কিসব খুঁটে খাচ্ছে। আমাদের ড্রাইভার বলল পর্যটকরা খেতে দেয় বলেই এই খাবারের লোভে এরা একেবারে রাস্তার উপরে চলে আসে।এই খাবার দেওয়াটা একেবারে ঠিক নয়। এতে এদের লোভ বেড়ে যায়, এরা মনে করে মানুষের কাছে গেলেই খাবার পাওয়া যাবে। জঙ্গলের মধ্যে যেসব গ্রাম আছে সেখানকার মানুষদের এদের এই উপদ্রব সহ্য করতে হয়। একদিন সকালবেলা গ্রামের একজন লোক হয়তো বাড়ির দরজা খুলল, বাইরে একপাল বাঁদর দাঁড়িয়ে। দরজা খোলামাত্র তারা ক্ষিপ্রভাবে ভিতরে ঢুকে নানারকম অপাট করে, জিনিসপত্র খাবার তুলে নিয়ে চলে যায়।
গ্রামের প্রসঙ্গে আলোচনাটা আবার বাঘের দিকে ফিরে গেল। যেহেতু জঙ্গলের ভিতরেই গ্রাম, তাই অনেক সময়েই বাঘ গ্রামের ভিতরে এসে গরু, ছাগল এমনকি মানুষও তুলে নিয়ে যায়। কিছুদিন আগে একদিন রাতে খুব গরম পড়েছিল, তাই একটা বাড়ির লোকেরা ঘরের দরজা খোলা রেখে ঘুমোচ্ছিল। রাতে বাঘ এসে একটা পরিবারের চারজনকেই ঘুমের মধ্যে মেরে রেখে চলে গেছে। মর্মান্তিক কিন্তু প্রাকৃতিক। দুঃখজনক কিন্তু স্বাভাবিক। জীবন এইভাবেই চলে। চলে আসছে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে।
আমরা সকাল আটটা নাগাদ উমারিয়া স্টেশনে পৌঁছলাম। আসার সময়েও গাড়িপিছু ২,০০০/- টাকা লাগল। স্টেশনে এসে আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম নর্মদা এক্সপ্রেসের জন্য। ট্রেন ছাড়ল ৮ঃ৪০ মিনিটে। আমরা এগিয়ে চললাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের দিকে।
সারসংক্ষেপ ঃ
১. বান্ধবগড় টাইগার রিসার্ভ ভারতবর্ষের ৫৮টা টাইগার রিসার্ভের মধ্যে অন্যতম। এখানে গেলে বাঘ দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ১০০%।
২. বান্ধবগড়ে কোনও রেল যোগাযোগ নেই, সবথেকে কাছের রেলস্টেশন উমারিয়া। হাওড়া থেকে উমারিয়া যেতে হলে জব্বলপুরে গাড়িবদল করতে হবে।
৩. উমারিয়া স্টেশনচত্বরটা একেবারেই ফাঁকা, এখানে কোনও টোটো, অটো, গাড়ির স্ট্যান্ড নেই। তাই উমারিয়া থেকে বান্ধবগড় যেতে হলে আগে থেকে গাড়ি বুক করে যাওয়াই ভালো। উমারিয়া থেকে বান্ধবগড় পৌঁছতে এক ঘন্টা মতো লাগে।
৪. বান্ধবগড়ে অনেক হোটেল আছে, তার মধ্যে আমাদের হোটেল 'ফ্লাইক্যাচার ইন' বেশ ভালো। এখানকার খাবারের দাম বেশ বেশি তবে হোটেলের স্টাফদের ব্যবহার খুব ভালো। আমরা MakeMyTrip থেকে এদের বুকিং করেছিলাম। বুকিং-এর ফোন নম্বর 6266403332, 6266663476.
৫. হোটেলে খেতে না চাইলে এখানে মেইন রোডে গেলে বেশ কিছু খাবার হোটেল - রেস্ট্যুরেন্ট আছে। এখানে খাবারের মান ভালো আর দামও সস্তা।
৬. বান্ধবগড়ের এক ও একমাত্র আকর্ষণ টাইগার সাফারি। এই সাফারির বুকিং https://forest.mponline.gov.in/ থেকে আগে থেকে করতে হয় কারণ ওখানে পৌঁছে যাওয়ার পরে বুকিং নাও পাওয়া যেতে পারে।
৭. বান্ধবগড়ের সাফারি সময় সকালে ও বিকালে। বিকালের সাফারিতে বাঘ দেখার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
৮. ১লা জুলাই থেকে ৩০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনমাস বান্ধবগড় ন্যাশনাল পার্ক বন্ধ থাকে। এই সময়ের মধ্যে এখানে যাওয়ার পরিকল্পনা করে লাভ হবে না।
৯. সাফারির বুকিং অনলাইনে করা হলেও সাফারি জিপ আর গাইডের বুকিং বান্ধবগড়ের গেট থেকেই করতে হয়। কোন গেট আর কোন জোন সেটা অনলাইন বুকিং-এর সময়ে নিজেকে ঠিক করে নিতে হবে।
১০. বান্ধবগড় জঙ্গলের প্রধান আকর্ষণ বাঘ হলেও এখানে হরিণ, বাঁদর, ময়ূর ইত্যাদি নানারকম প্রাণীও আছে। আর জঙ্গল ঘন না হওয়ায় ভিতরে অনেকটা দূর পর্যন্ত দেখা যায়।
১১. বান্ধবগড় জঙ্গলের অনেকগুলো জোন আছে, আর প্রত্যেকটার অধীশ্বরই কোনও না কোনও বাঘ। একটা বাঘ একটা ৬০ - ৬৫ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকায় তার বউবাচ্চা নিয়ে বসবাস করে।
১২. জঙ্গলে গেলে কখনওই উজ্জ্বল রঙের পোষাক পরে যাওয়া উচিৎ নয় আর সেইসঙ্গে জিপে চলাকালীন উচ্চৈস্বরে কথা বলা বা জোরে জোরে হাসাহাসি করা ঠিক নয়। জঙ্গলে জঙ্গলের নিয়ম চলে, সভ্য সমাজের নয়।
১৩. বান্ধবগড়ে গরম থাকলেও জঙ্গল এলাকা হওয়ায় আর প্রচুর গাছপালা থাকায় ততটা গরম লাগে না। রাতের দিকে আবহাওয়া যাকে বলে মনোরম।
অমরকন্টক ভ্রমণ ঃ
অমরকন্টকে কোনও রেলযোগাযোগ নেই, সবথেকে কাছাকাছি স্টেশন পেন্ড্রা রোড। উমারিয়া স্টেশনটা মধ্যপ্রদেশে কিন্তু পেন্ড্রা রোড ছত্তিশগড়ে। আমাদের ট্রেনের পেন্ড্রা রোড পৌঁছনোর নির্ধারিত সময় ছিল সকাল ১১ঃ২০ আর ট্রেন পৌঁছলো দুপুর ১২ঃ৩০। স্টেশন থেকে বাইরে এসে আমরা আগে থেকে বুক করে রাখা দুটো গাড়িতে উঠে পড়লাম। পেন্ড্রা রোড অবশ্য উমারিয়ার মতো নয়, এখানে স্টেশনের বাইরে রীতিমতো জমজমাট শহর আছে। আর স্টেশনের বাইরে চাইলে গাড়ির ব্যবস্থাও হয়তো করা যেতে পারে। তবে আমরা হোটেল থেকেই গাড়ি বুকিং করেছিলাম।
পেন্ড্রা রোড থেকে অমরকন্টকের দূরত্ব ৩০ কিলোমিটার, যেতে সময় লাগে একঘন্টা মতো। যাওয়ার রাস্তাটার নামও পেন্ড্রা রোড। অমরকন্টক জায়গাটা আবার মধ্যপ্রদেশে তাই পেন্ড্রা রোড থেকে পেন্ড্রা রোড দিয়ে চলতে চলতে আমরা একসময়ে আবার ছত্তিশগড় থেকে মধ্যেপ্রদেশে ঢুকে পড়লাম। এই গাড়ির রাস্তাটা খুব সুন্দর। কিছুক্ষণ সমতলপথে চলার পরে গাড়ি পাহাড়ী পথ ধরল। মধ্যপ্রদেশে এইরকম পাহাড়ী পথ আশা করিনি, তাই বেশ ভালো লাগছিল। আমরা যারা উত্তরবঙ্গ বা সিকিমে গিয়েছি তাদের কাছে পাহাড়ী পথ নতুন নয়, তবে আমার মনে হয় প্রত্যেক জায়গার পাহাড়ের একটা নিজস্ব সৌন্দর্য আছে, তার সঙ্গে বাকিদের তূলনা হয় না। এই পাহাড়ী পথ দিয়ে আমরা ক্রমশই উপরে উঠছিলাম। একসময়ে পৌঁছে গেলাম অমরকন্টকে।
অমরকন্টক শহরটা পাহাড়ের উপরে একটা সমতল জায়গায়। এখানকার প্রধান আকর্ষণ নর্মদা মন্দির আর তার গেট থেকে ২০০ মিটার দূরে আমাদের হোটেল জে পি প্যালেস। আমাদের গাড়ি হোটেলে পৌঁছে দিল এবং গাড়িপিছু ১,৭০০/- টাকা লাগল। দুপুর দেড়টা বেজে গেছে। এই হোটেলে রান্নার ব্যবস্থা নেই তবে এদের অর্ডার দিলে এরা বাইরে থেকে খাবার আনিয়ে দিতে পারে। হোটেলে রান্নার ব্যবস্থা না থাকলেও খাওয়ার ব্যবস্থা আছে অর্থাৎ চেয়ার-টেবিল, থালা-বাটি-চামচ সবই আছে। আমরা চেক্ইন করে খাবারের অর্ডার দিয়ে দিলাম। এবং এখানেও নিরামিষ। আমিষ পাওয়া যায় কিনা জিজ্ঞেস করাতে রিসেপশনের ছেলেটি বলল - ইঁহা দূর দূর তক্ আপকো ননভেজ নেহি মিলেগা। বুঝলাম সেই একই ধর্মীয় কারণ। (পরে জেনেছিলাম ধর্মীয়স্থান হওয়ার কারণে অমরকন্টককে মধ্যপ্রদেশ সরকার অনেকবছর আগেই নিরামিষ শহরে হলে ঘোষণা করেছে) দুপুর আড়াইটে নাগাদ খাবার এসে গেল আর আমরা হোটেলের তিনতলার ডাইনিং হলে গিয়ে খেয়ে নিলাম। রান্না ভালো। ভাত, ডাল, আলুভাজা, পনীর, মিক্স ভেজ, মাসরুম ইত্যাদি নিয়ে মোট খরচ পড়ল ২,৭৭৫/- টাকা।
দুপুরে খাওয়ার পর ঘরে গিয়ে একটু বিশ্রাম নেওয়া হল। ঘরগুলো বেশ ভালো এবং এদের পরিষেবাও বেশ ভালো। বিকেল ছটার একটু পরে হোটেল থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে প্রথমে গেলাম নর্মদা মন্দিরে।
![]() |
| নর্মদা উদ্গম স্থান |
![]() |
| নর্মদা মন্দির |
![]() |
| জলের মধ্যে মন্দির |
মন্দিরের পাঁচিলের বাইরে এসে দাঁড়িয়ে আছি এমন সময়ে একজন ভদ্রলোক একটা ধামা ভর্তি প্রসাদ বিতরণ করতে শুরু করলেন। প্রসাদ হল ঘিয়ে ভাজা রসে চপচপে গরম মিহিদানা। যে যতটা পারে খেতে পারে তবে নেওয়ার কোনও পাত্র নেই। অগত্যা দুহাত জোড়া করে আঁজলায় যতটা সম্ভব নিলাম। স্বাদ? অ-পূ-র্ব ! আমার ঈশ্বরবিশ্বাসের স্তর যেমনই হোক, এইজাতীয় প্রসাদ খেতে আমি সবসময়েই ভীষণ ভালোবাসি, বিশেষতঃ সেটা যদি বিনামূল্যে পাওয়া যায় ! আমাদের মহারাষ্ট্র ভ্রমণের সময়ে সির্ডির সাঁইবাবার মন্দিরে গিয়ে অনেকটা এইরকমভাবেই সুস্বাদু ঘিয়ের লাড্ডু পেয়েছিলাম।
আমাদের আর বিশেষ কিছু দেখার নেই কারণ অমরকন্টকের সাইটসিয়িংটা পরেরদিনের জন্য রাখা আছে। আমরা মন্দির থেকে বেরিয়ে পাশেই একটা রেলিং দিয়ে ঘেরা বেশ বড় প্রায় গোলাকার দীঘির পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। এর নামে ইন্দ্রদমন লেক। পুরাণমতে এর জল নর্মদা নদীর জলের একটা অন্যতম উৎস। আমরা ইন্দ্রদমন লেকটাকে ঘিরে গোলাকার পথে হাঁটতে শুরু করলাম। অমরকন্টকের উচ্চতা প্রায় ৩,৫০০ ফুট, তাই এখানে সন্ধ্যেবেলা গরম খুব একটা লাগছিল না। ঠান্ডা বলা চলে না বরং আরামদায়ক আবহাওয়া বললে ঠিক বলা হয়।
লেকের অন্যদিকে নর্মদা নদীর পাড়। এখানে নদীটা হঠাৎ করে অনেকটা চওড়া হয়ে গেছে। নদীর পাড় সুন্দরভাবে বাঁধানো আর ধাপে ধাপে জলে নেমে যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। নদীর পাড়ে ছোট ছোট ঘুমটি ঘর। বুঝলাম নর্মদা নদীতে চান করার পরে জামাকাপড় বদলানোর জন্য এই ঘরগুলো তৈরি করা হয়েছে। নদীর উল্টোপারে কিছু দোকানপাট রয়েছে আর কয়েকজন লোক প্রদীপজাতীয় কিছু জ্বালিয়ে নদীতে ভাসিয়ে দিচ্ছে। এখানে বসে থাকতে বেশ ভালোই লাগছিল।
আধঘন্টা পরে আমরা উঠে নদীর উপরের ব্রীজটা পেরিয়ে ওপারে গেলাম। এখানে অনেক দোকানপাট আছে, বেশিরভাগই নামারকম উপহারসামগ্রীর। এখানে কিছু কেনাকাটা করে আমরা হোটেলে ফিরে এলাম।
হোটেলে এসে ডিনারের অর্ডার দেওয়া হল। ভাত, ডাল, রুটি, তরকারী ইত্যাদি নিয়ে খরচ পড়ল ৭৪৫/- টাকা।
আমরা যখন বসে বসে খাচ্ছি, একটা বেশ মজার ব্যাপার ঘটল। আমাদের খাবার জায়গার পাশেই হোটেলের রান্নাঘর, সেখানে গ্যাস ফ্রিজ বাসন এইসব রাখা আছে। সেখান থেকে হঠাৎ ডিমভাজার গন্ধ আমাদের নাকে ভেসে এল। প্রথমে ব্যাপারটাকে অত গুরুত্ব দিইনি, কিন্তু তারপর খেয়াল করলাম এখানে তো ওই গন্ধ থাকার কথা নয়। বুঝলাম যতই নিরামিষ শহর হোক, এরা দিব্যি লুকিয়ে লুকিয়ে ডিম খায় ! দেখে শুঁকে মজা লাগল, খারাপও লাগল। জোর করে নিয়ম করে কি মানুষের খাদ্যাভ্যাস বদলানো যায়, না যাওয়া উচিৎ? "আর কবে, আর কবে চিত্ত স্বাধীন হবে?"
![]() |
| হোটেলের খাওয়ার জায়গা থেকে বাইরের দৃশ্য |
সকাল নটা নাগাদ হোটেল থেকে চেক্আউট করে মালপত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। কালকের দুটো গাড়িই এসেছিল। আমরা প্রথমে অমরকন্টকের সাইটসিয়িং করব আর তারপর গাড়ি আমাদের পেন্ড্রা রোড স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে আসবে। এর জন্য গাড়িপিছু খরচ ৪,০০০/- টাকা।
মাই কী বাগিয়া - তিন-চার মিনিট চলার পর আমাদের গাড়ি থামল আমাদের প্রথম গন্তব্য - মাই কী বাগিয়া-তে। এটা নর্মদা মাতার বাগান। এখানে গুল্বকৌলি ফুল ফোটে যা নর্মদা মন্দিরে পুজোর কাজে ব্যবহৃত হয়। এই গুল্বকৌলি ফুল চোখের ওষুধ তৈরিতেও ব্যবহার করা হয়।
![]() |
| মাই কী বাগিয়ার ভিতরে |
![]() |
| সোনমূড়ায় সোনাক্ষি শক্তিপীঠ মন্দির |
![]() |
| সোনমূড়ার ভিউ পয়েন্ট |
এখানে কয়েকটা খাবারের দোকান আছে। সেখান থেকে বঢ়া, ম্যাগী ইত্যাদি অল্প করে খেয়ে নেওয়া হল। তারপর গাড়িতে উঠে এগিয়ে চললাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের দিকে।
![]() |
| শ্রী যন্ত্র মন্দিরের গেট |
![]() |
| কলাচুরীর মন্দির |
টিকিট ঃ মাথাপিছু ২০/- টাকা (ছোটদের লাগে না)
শ্রী যন্ত্র মন্দির থেকে মিনিট পাঁচেক গাড়ি চলার পর এসে পোঁছলাম কলাচুরী মন্দিরের সামনে। প্রকৃতপক্ষে আমরা একটা চক্রাকার পথে ঘুরে আবার আমাদের হোটেলের কাছেই পৌঁছে গেলাম কারণ এই কলাচুরী মন্দিরের গেটটা একেবারে নর্মদা মন্দিরের গেটের বিপরীত দিকে। কলাচুরী মন্দিরের রক্ষনাবেক্ষণের দায়িত্ব ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের। এখানে ঢোকার টিকিট শুধুমাত্র QR Code স্ক্যান করে UPI-এর সাহায্যেই কাটা যায়, কোনও নগদ লেনদেনের সুযোগ নেই। যাই হোক, টিকিট কেটে আমরা ভিতরে ঢুকলাম। কাউন্টারের ভদ্রলোক বলেই দিলেন এখানে কোনও মন্দিরে কোনও পুজো হয় না তাই জুতো খোলার কোনও ব্যাপার নেই। আমার এই জাতীয় মন্দিরই সবথেকে বেশি প্রিয়, এখানে ভক্তির বাড়াবাড়িটা থাকে না আর সেই কারণে মন্দির নিয়ে যে ব্যাবসা চলে, সেটাও এখানে নেই।
![]() |
| কর্ণ মন্দির |
এরপর লাঞ্চ। আমাদের সকালে ব্রেকফাস্টে সেরকম কিছু খাওয়া হয়নি, তাই একটু তাড়াতাড়িই লাঞ্চ করে নেওয়া হল। গতকাল সন্ধ্যেবেলা যেখানে কেনাকাটা করতে গিয়েছিলাম, আজ সেই এলাকাতেই লাঞ্চ করার জন্য ড্রাইভার নিয়ে গেল। অমরকন্টক শহরটা যে কত ছোট, সেটা বুঝতে পারলাম। এখানকার বাজার, দোকান, হোটেল - সবই এই একটা জায়গাতেই। অথচ শহরটা যে নতুন তা কিন্তু নয়, অনেক পুরনো। তবে এতদিনেও এখানে খুব বেশি মানুষ থাকে না, তা সে যে কারণেই হোক।
লাঞ্চে নিরামিষ থালি আর ধোসা খাওয়া হল। সবমিলিয়ে খরচ পড়ল ১,১১০/- টাকা। লাঞ্চের পরে আমরা আমাদের সাইটসিয়িং-এ এগিয়ে চললাম। অনেকক্ষণ ধরেই মেঘ করে ছিল, এবার একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেল। পরের জায়গাটা আগেরগুলোর মতো এত কাছাকাছি নয়। গাড়ি করে প্রায় মিনিট কুড়ি চলার পরে পৌঁছলাম আমাদের গন্তব্যে।
![]() |
| কপিলধারা ফল্স্ যাওয়ার ব্রীজ |
![]() |
| কপিলধারা ফল্স্ |
![]() |
| দুধধারা ফল্স্ যাওয়ার পথে |
দুধধারা ফল্স্ যাওয়ার রাস্তাটা অপূর্ব। আমরা ছাড়া আমাদের কাছাকাছি আর কোনও দর্শনার্থী নেই, আর আমরা নিজেরাও ইচ্ছাকৃতভাবেই চুপচাপ হাঁটছি। আমাদের বাঁদিক দিয়ে পাথরের উপর দিয়ে কুলকুল শব্দে বয়ে চলেছে নর্মদা নদী, অনেকটা উপর থেকে নেমে এখানে তার গতি কিছুটা বেশি। সেইসঙ্গে নাম-না-জানা পাখির ডাক। আর গাছপালার মধ্যে ঝিঁঝির ডাক। সবমিলিয়ে এক অপার্থিব সৌন্দর্য।
![]() |
| দুধধারা ফল্স্ |
![]() |
| জলধারার মাঝে |
উপরে উঠে হাঁটতে হাঁটতে আবার বৃষ্টি শুরু হল। বৃষ্টির স্থায়িত্ব বেশিক্ষণ নয়, একজায়গায় মিনিট পাঁচেক অপেক্ষা করতে হল। তারপর গাড়িতে এসে উঠলাম।
![]() |
| অরন্ডী মন্দিরের পাশে মাধব সরোবর |
![]() |
| মন্দিরের একতলায় বা ভূগর্ভে |
আমরা গাড়িতে উঠলাম আর বেশ জোরে বৃষ্টি শুরু হল। এরপরের গন্তব্য অমরেশ্বর মন্দির। জায়গাটা বেশ কিছুটা দূরে, পৌঁছতে প্রায় আধঘন্টা লাগল। কিন্তু শেষের কিছুটা রাস্তায় কাজ হচ্ছে বলে রাস্তা বন্ধ। কাজের পাশের সঙ্কীর্ণ পথটা ইঁট-সুরকির আর এই বৃষ্টির মধ্যে সেই রাস্তা দিয়ে গাড়ি নিয়ে যাওয়া নিরাপদ নয়, তাই এই পয়েন্টটা দেখার আশা ত্যাগ করতে হল। আমরা যে পথে গিয়েছিলাম আবার সেই পথেই আবার ফিরতে শুরু করলাম।
ফেরার সময়ে বৃষ্টি আরও বাড়ল। এবারে একেবারে সাদা হয়ে পড়ছে, সামনে ৩০-৪০ মিটারের বেশি দেখা যাচ্ছে না। পাহাড়ী পথে ফাঁকা রাস্তায় বৃষ্টি এমনিতেই বেশি বলে মনে হয়। এইভাবে মিনিট কুড়ি চলার পর আমরা পৌঁছলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যে।
![]() |
| জৈন মন্দির |
আমরা মন্দির দেখে যখন বেরোচ্ছি তখন আবার ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হল। আমরা যতটা সম্ভব দ্রুত ফেরার চেষ্টা করলেও শেষরক্ষা হল না, গাড়িতে ওঠার আগেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল। বাধ্য হয়ে একটা চায়ের দোকানে আশ্রয় নিলাম। বৃষ্টি থামলে গাড়িতে গিয়ে উঠলাম।
![]() |
| দুর্গাধারা ফল্স্ |
এরপর ঘরে ফেরার পালা। এবার পেন্ড্রা রোড দিয়ে পেন্ড্রা রোডে পৌঁছলাম। রাস্তায় বৃষ্টিটা থেকে গেলেও স্টেশনে যখন পৌঁছলাম তখন আবার ঝিরঝির করে শুরু হয়েছে। আমরা কোনওমতে গাড়ি থেকে নেমে মালপত্র নিয়ে স্টেশনে ঢুকে পড়লাম। স্টেশনে কিছু বিস্কুট - চিপসের দোকান থাকলেও এখানে ডিনার কেনার মতো কোনও দোকান নেই অর্থাৎ ডিনারের খাবার ট্রেন থেকেই কিনতে হবে। স্টেশনে যখন বসে আছি, তখন আবার একদফা মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল। স্টেশনের শেডের নিচে বসে বা দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। সন্ধ্যে সাড়ে ছটা বাজে, আকাশ মেঘে ঢাকা তাই আর দিনের আলো নেই। গরম একেবারেই লাগছিল না, স্টেশনের পরিবেশটা খুব ভালো লাগছিল।
আমাদের ফেরার ট্রেন উদয়পুর সিটি - শালিমার সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস আসার কথা সন্ধ্যে ৭ঃ৪০ মিনিটে, সে এল আধঘন্টা দেরিতে। আমরা ট্রেনে উঠলাম। ট্রেনে ডিনারে আমিষের একমাত্র অপশন এগ থালি, তাইই নিয়ে নেওয়া হল। দুটো করে ডিম দিয়ে এগথালির দাম ১৪০/- টাকা।
পরেরদিন রবিবার ৩১শে মে, ২০২৬ - আমাদের ট্রেনের সাঁত্রাগাছি পৌঁছনোর নির্ধারিত সময় সকাল ৯টা হলেও ট্রেন পৌঁছল দুপুর ১ঃ৩০ মিনিটে (দক্ষিণ-পূর্ব রেলওয়ের এই বিপুল দেরিটা নিয়ে বোধহয় এখন আর বোধহয় কেউই মাথা ঘামায় না !)। ভ্রমণ শেষ !
সারসংক্ষেপ ঃ
১. অমরকন্টকের কোনও রেলযোগাযোগ নেই, সবথেকে কাছের স্টেশন পেন্ড্রা রোড। শালিমার থেকে সপ্তাহে দুদিন পেন্ড্রা রোড যাওয়ার ট্রেন চলে। এছাড়া বিলাসপুর বা রায়পুর থেকে ব্রেকজার্ণি করেও পেন্ড্রা রোড পৌঁছনো যায়।
২. পেন্ড্রা রোড স্টেশন এলাকাটা জনবহুল আর এখানে গাড়ির স্ট্যান্ডও আছে। আগে থেকে বুক করা না থাকলেও এখান থেকে অমরকন্টক যাওয়ার গাড়ি পাওয়া যায়। পেন্ড্রা রোড থেকে অমরকন্টক গাড়িতে এক ঘন্টা মতো লাগে।
৩. অমরকন্টকে খুব বেশি হোটেল নেই, তবে যা আছে তার মধ্যে জে পি প্যালেস বেশ ভালো একটা হোটেল। আমরা MakeMyTrip থেকে এদের বুকিং করেছিলাম। যোগাযোগের নম্বর - 7000363614.
৪. অমরকন্টক সরকারীভাবে নিরামিষ শহর হিসেবে ঘোষিত। এখানে কোথাও কোনও আমিষ খাবার পাওয়া যায় না।
৫. অমরকন্টকের প্রধান আকর্ষণ নর্মদা নদীর উৎস নর্মদা কুন্ড এবং তৎসংলগ্ন নর্মদা মন্দির। এই মন্দিরটা খুব সুন্দর এবং এর মধ্যে একটা জলাশয় আছে যেটাকে নর্মদার উৎস ধরা হয়। এই মন্দির অবশ্য দ্রষ্টব্য।
৬. অমরকন্টকের অন্যান্য সাইটসিয়িং-এর মধ্যে সোনমূড়া, কলাচুরীর মন্দির, কপিলধারা ও দুধধারা ফল্স্ অবশ্য দ্রষ্টব্য। কপিলধারা ও দুধধারা যাওয়ার জন্য একটু কষ্ট করতে হবে, কিন্তু করাটা ফলপ্রসু।
৭. অমরকন্টকে কোনও পাবলিক ট্রান্সপোর্ট চলে না। সাইটসিয়িং-এর জায়গাগুলোর বেশিরভাগই খুব বেশি দূরে না হওয়া সত্ত্বেও ঘোরার জন্য শুধুমাত্র প্রাইভেট গাড়িই ভরসা।
৮. অমরকন্টক জায়গাটা পাহাড়ের উপরে হওয়ায় এখানে গরম তুলনামূলকভাবে কম। গরমকালেও সন্ধ্যের পরে দিব্যি আরামদায়ক তাপমাত্রা।
উপসংহার ঃ
আগেরবার মধ্যপ্রদেশ ঘুরে এসে লিখেছিলাম "শুধুমাত্র আটদিনের পরিসরে একটা রাজ্যের পুরোটা দেখা যায় না, বিশেষ করে সে'রাজ্য যদি হয় মধ্যপ্রদেশ"। এবারে আরও ছ'দিন ঘোরার পরও এটাই বলব আট + ছয় = চোদ্দ দিনেও একটা রাজ্যের পুরোটা দেখা যায় না, বিশেষ করে সে'রাজ্য যদি হয় মধ্যপ্রদেশ। কিন্তু তাও এবারে যা ঘুরেছি আর যে যে জায়গাগুলোতে ঘুরেছি সেগুলো এতটাই নিজস্বতায় ভরা যে আমাদের বেড়ানোটা হয়ে উঠেছে খুবই বৈচিত্রপূর্ণ। উজ্জয়িনী আর অমরকন্টক দুটোই ধর্মীয় স্থান হওয়ায় এদের মধ্যে কিছু কিছু মিল থাকলেও উজ্জয়িনী সমতলে আর অমরকন্টক পাহাড়ী এলাকায়, তাই তাদের মধ্যে অমিলটাই বেশি। উজ্জয়িনীতে মানুষ গিজগিজ করছে আর অমরকন্টক ফাঁকা। দুটো জায়গারই নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। আর বান্ধবগড় তো এদের থেকে একেবারেই আলাদা। বান্ধবগড়ের বাঘ যে শুধু বনের রাজা তাইই নয়, সে এখানকার অর্থনীতির প্রধান নিয়ামক। মধ্যপ্রদেশ যাওয়ার একটা প্রধান অন্তরায় অবশ্যই এর রেলযোগাযোগের সীমাবদ্ধতা কিন্তু আগেরবার যেটা বলেছিলাম, এবারেও সেটাই বলব "সঠিকভাবে পরিকল্পনা করতে পারলে সেটাকেও নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসা সম্ভব"। উজ্জয়িনী, বান্ধবগড় আর অমরকন্টক এই তিনটে জায়গাতেই গিয়ে বুঝেছি এখানে বাঙালি পর্যটক আসে খুব কম। এটাও একটা কারণ এই জায়গাগুলোকে ভালোভাবে দেখার। তাই যদি উজ্জয়িনী-বান্ধবগড়-অমরকন্টককে দেখার ইচ্ছে থাকে, তাহলে একটা পাঁচদিনের ছুটির সঙ্গে দুটো উইক-এন্ড, অল্প কিছু টাকা আর মনে নতুন জায়গা দেখার অনেকটা আগ্রহ নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে এই ভ্রমণের উদ্দেশ্যে !
মধ্যপ্রদেশ ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.









































