আমি ব্লগ লেখার খুব বেশি সমর্থক কোনওদিনও ছিলাম না, সত্যি কথা বলতে কি এখনও যে আছি তা নয় । তার একটা প্রধান কারণ আমার ধারণা ব্লগ লেখার থেকেও পড়া অনেক বেশি ক্লান্তিকর । অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অনেক সময়ই পড়তে শুরু করে শেষ করা হয়ে ওঠে না । নিজের ধৈর্য এবং/অথবা আগ্রহের অভাবকে 'ঠিক আছে, বাকিটা পরে পড়ব' জাতীয় অজুহাত দিয়ে ঢেকে দিই - আর আমরা সবাই জানি সেই 'পরে' টা আর কখনওই আসে না । তো, এই কারণে আমি ঠিক করেছি আমার ব্লগকে কখনওই অন্যের ক্লান্তির কারণ ঘটাব না, আমার ব্লগের বিষয় হবে প্রধানতঃ ভ্রমণ । আমার মতো যেসব বাঙালিরা ঘুরতে ভালোবাসে, তাদের জন্য আমার ব্লগ হবে তথ্যের একটা উৎস । আমার নিজের একটা অভ্যেস আছে, কোনও জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার আগে সেই জায়গাটা সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, আর ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে আমার বরাবরই মনে হয়েছে যে ইন্টারনেটে লেখালেখি করার ব্যাপারে বাঙালিদের থেকে কুঁড়ে খুব কম শিক্ষিত জাতই আছে । আমার মতো যেসব বাঙালিরা আছে, যারা ইন্টারনেটে কোনো একটা ইংরিজীতে লেখা দেখলেই না পড়ার চেষ্টা করে, তাদের জন্য আমার ব্লগ সহায়ক হবে, এই বিশ্বাস নিয়ে শুরু করছি আমার ভ্রমণকাহিনী । আগেই বলে রাখি, আমি স্ট্যাটিসটিক্সের ছাত্র ছিলাম, তাই আমার ব্লগে তত্ত্বের থেকে তথ্যের দেখাই মিলবে বেশি ।

Sunday, July 26, 2026

তাজপুর ভ্রমণ (দ্বিতীয়বার)

ভ্রমণপথ ঃ

শনিবার ২৫শে জুলাই, ২০২৬ঃ সকাল ৭টায় কলকাতা থেকে গাড়িতে যাত্রা করে দুপুর ১টায় তাজপুর - তাজপুরে রাত্রিবাস।

রবিবার ২৬শে জুলাই, ২০২৬ঃ বেলা ১১টায় তাজপুর থেকে যাত্রা করে বেলা সাড়ে এগারোটায় দীঘা - দীঘা থেকে দুপুর ৩টেয় যাত্রা করে রাত ৯টায় কলকাতা।

শিরোনাম তাজপুর ভ্রমণ দ্বিতীয়বার হলেও এটা আসলে আমার তৃতীয়বার তাজপুর ভ্রমণ। ২০০৯ সালে যখন প্রথমবার তাজপুর গিয়েছিলাম, তখন ব্লগ লিখতাম না। তারপর গিয়েছি ২০১৪ সালে। আর এবার আবার। আসলে কলকাতা থেকে একরাত্রির জন্য ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করলে প্রধানতঃ সমুদ্রের কথাই মনে হয় আর সমুদ্রের অন্যান্য অপ্‌শন হল - দীঘা (ভীড় বেশি আর ইদানীং জগন্নাথ মন্দির হওয়ার পর থেকে সাধারণ হোটেলের ভাড়া আকাশচুম্বী), মন্দারমনি (পরিবারের লোকজনদের নিয়ে যাওয়ার পক্ষে একেবারেই উপযোগী নয়), শঙ্করপুর বা উদয়পুর (সমুদ্রে স্নান করার সুযোগ কম), বক্‌খালি (সমুদ্রের কাছে কোনও হোটেল নেই)। তাই তাজপুর। আর সেই তাজপুর ভ্রমণ নিয়েই আমার ব্লগের এবারের পোস্ট।

আমাদের এবারের দল আটজনের। আমি, অমৃতা, বাবা, মা, কথা, কলি আর সেইসঙ্গে আমাদের প্রতিবেশী আপালদা ও টিক্‌লি বৌদি। প্রতিবেশীদের সঙ্গে যাওয়ার একটা সুবিধে হল আলাদা করে কোনও মীটিং পয়েন্ট ঠিক করতে হয় না, সবাই একজায়গা থেকে যাত্রা শুরু করা যায়। সেইমতো ২৫শে জুলাই ২০২৬ শনিবার সকাল ৭টার সময়ে আমরা আমাদের গাড়িতে রওনা দিলাম তাজপুরের উদ্দেশ্যে।

বিদ্যাসাগর সেতু পেরিয়ে কোণা এক্সপ্রেসওয়ে - ১৬ নং জাতীয় সড়ক - কোলাঘাট - ১১৬ নং জাতীয় সড়ক - নন্দকুমার - ১১৬বি নং জাতীয় সড়ক - বালিসাই - বালিসাই তাজপুর সী বিচ্‌ রোড - তাজপুর। কলকাতা থেকে তাজপুরের দূরত্ব ১৮৪ কিলোমিটার। যাওয়ার পথে কোলাঘাটে ব্রেকফাস্ট করার জন্য দাঁড়ালাম। যেটা আমাদের সবাইকেই বেশ অবাক করল সেটা হল এখানে খাওয়ার জায়গাগুলোয় মানুষের ভীড়। এটা কোনও বিশেষ সপ্তাহান্ত নয়, টানা তিনদিনের ছুটিও নেই কিন্তু তাও খাওয়ার জায়গাগুলোয় প্রচন্ড ভীড় - আর লোকজনদের দেখে বোঝা যায় এরা সবাই আমাদের মতো বেড়াতেই যাচ্ছে। অনেক খোঁজাখুঁজি করে একটা রেস্ট্যুরেন্টে বসার জায়গা পাওয়া গেল। পুরী-সব্জী আর আলুর পরোটা নিয়ে খরচ পড়ল ৬৫০/- টাকা।

নন্দকুমার পর্যন্ত রাস্তাটা বেশ চওড়া এবং মাঝে ডিভাইডার আছে। কিন্তু এরপর থেকে বাকি ৭৮ কিলোমিটার রাস্তা তুলনামূলকভাবে সরু আর মাঝে ডিভাইডার না থাকায় গাড়ি বেশি জোরে চালানো যায়না। দুপুর ১টা নাগাদ আমরা তাজপুর পৌঁছলাম।

বার্ড নেস্ট রিসর্ট
তাজপুরে আমাদের বুকিং ছিল বার্ড নেস্ট রিসর্ট-এ। হোটেলটা সমুদ্র থেকে খুবই কাছে (এখানকার একজন কর্মচারী আমাদের বললেন "হেঁটে ৩৫ সেকেন্ড")। হোটেলটা বেশ বড়। হোটেলের চৌহদ্দীর ভিতরেই গাড়ি রাখার জায়গা আছে। আমরা চেক্‌-ইন করে ঘরে ঢুকলাম। ঘরগুলো খুব বড় না হলেও বেশ সুন্দর ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। আমরা তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম সমুদ্রস্নানের উদ্দেশ্যে !

তাজপুরের সমুদ্রে - জলে নামার আগে
৩৫ সেকেন্ড না হলেও হেঁটে মিনিট তিনেকের বেশি লাগল না সমুদ্রে পৌঁছতে। একটা কংক্রিটের পথ সমুদ্রের ধারে গিয়ে শেষ হয়ে গেছে, সেখান থেকে কয়েকধাপ সিঁড়ি দিয়ে নামলে বালি। এই সিঁড়িটা মোটেই সুবিধের নয় কারণ এর শেষ ধাপটা বালি থেকে প্রায় আড়াই ফুট উঁচু। বয়স্ক মানুষদের বা যাদের পায়ের সমস্যা আছে, তাদের পক্ষে এখান দিয়ে নামা খুবই দুস্কর। এখানে সমুদ্রের ধারে বালির মধ্যে খুঁটি পুঁতে কাঠ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি পরপর খাবারের দোকান হয়েছে। এইসব দোকানে প্রধানতঃ সন্ধ্যেবেলার স্ন্যাক্সই পাওয়া যায়।

এপাং ওপাং ঝপাং !
এখন ভাঁটা চলছে, সমুদ্র কিছুটা দূরে। আমরা বালিতে নেমে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে এলাম। তারপর যা হয় - সমুদ্রের ধারে চটি খুলে ঝপাং ঝপাং ঝপাং ! এই অনুভূতির কোনও তুলনা নেই। প্রথমে পায়ের পাতা ডোবা জল, তারপর হাঁটু, তারপর কোমর, তারপর বুক আর সবশেষে মাথা ডোবা জলে প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে লাফালাফি ঝাঁপাঝাঁপি করলাম (These actions are performed by experts. Do not try these if you are not!)। তারপর জল থেকে উঠে হোটেলে ফিরে এলাম। হোটেলের ঘরে আরেকদফা স্নান।

এরপরেই যেটা পায় সেটা হল প্রচন্ড খিদে। আমাদের দুপুরের খাবারের আগেই অর্ডার দেওয়া ছিল, হোটেলের ডাইনিং রুমে গিয়ে খেয়ে নিলাম। ভাত ডাল আলুভাজা ডিম মাছ মাংস মিলিয়ে খরচ হল ১,৮১৫ টাকা। এর পরে যেটা পায় সেটা হল প্রচন্ড ঘুম। সবাই যে যার ঘরে ঢুকে কয়েকঘন্টা ঘুমিয়ে নিলাম।

সমুদ্রের ধারে খাবারের দোকানে
সন্ধ্যেবেলা যখন ঘুম ভাঙল তখন অন্ধকার হয়ে গেছে। এটা সমুদ্রে স্নান করার নয়, সমুদ্র দেখার সময়। কংক্রিটের রাস্তা ধরে সমুদ্রের কাছে গিয়ে দেখলাম নিচে নামার কোনও প্রশ্ন ওঠে না, কারণ নিচের সিঁড়িগুলো পর্যন্ত জল চলে এসেছে। অর্থাৎ এখন ভরা জোয়ার। সমুদ্র দেখার জন্য পাড়ে সেই খুঁটির উপর কাঠের তৈরি দোকানগুলো রয়েছে। আর এই কংক্রিটের রাস্তা থেকেই দোকানে যাওয়ার কাঠের সিঁড়ি উঠে গেছে। আমরা একটা দোকানে ঢুকলাম। এখানে বেশ কয়েকটা টেবিল আর তার চারদিকে চেয়ার পাতা। লোকজন ভালোই রয়েছে আর পানাহারও চলছে (কী পান চলছে সেটা আর বিশেষভাবে উল্লেখ করলাম না)। দোকানে মূলতঃ মাছভাজা, কাঁকড়াভাজা, চিংড়ি ভাজা, মুরগী ভাজা এইসব পাওয়া যায়। আমরা একপ্লেট লোটেমাছ  (বা লইট্যামাছ) আর দু'প্লেট চিংড়ি ভাজা নিলাম। একপ্লেটে দশটা। চিংড়ি বা লোটে কোনওটারই সাইজ এক আঙুলের বেশি নয়। একপ্লেট লোটের দাম ২০০/- টাকা আর একপ্লেট চিংড়ির দাম ৪০০/- টাকা ! খেতে দূর্দান্ত কিছু নয় আর সেইসঙ্গে দাম অত্যধিক বেশি।

ঘন্টাখানেক বসে আমরা আবার হোটেলে ফিরে এলাম। এখানে কিছুই করার নেই, শুধুমাত্র গল্প করেই সময় কাটাতে হয়। রাতে ডিনারে ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন খাওয়া হল। খরচ হল ১,৬৮০/- টাকা।

সকালবেলা সমুদ্রের ধারে
পরেরদিন রবিবার ২৬শে জুলাই, ২০২৬ - ভোরবেলা সূর্যোদয় দেখতে ইচ্ছে করেই যাইনি কারণ আকাশে যা মেঘ ছিল তাতে সূর্যোদয় দেখা যেত না। সকালে একবার সমুদ্রের ধারে গেলাম। আগেরদিন সন্ধ্যেবেলা যে সময়ে এসেছিলাম, তার প্রায় বারো ঘন্টা পরে এসেছি তাই এখনও সমুদ্রে জোয়ারই পেলাম এবং কংক্রিটের রাস্তার নিচে বালিতে নামা গেল না। খাবারের দোকানগুলোও এখন বন্ধ। আমরা এখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আবার হোটেলে ফিরে এলাম।

নটা নাগাদ ডাইনিং রুমে গিয়ে ব্রেকফাস্ট করলাম। লুচি-তরকারি, ব্রেড-বাটার আর অমলেট নিয়ে খরচ হল ৮০৫/- টাকা। স্নান করে বেলা ১১টায় চেক্‌ আউট করে আমরা এগিয়ে গেলাম দীঘার দিকে। তাজপুর থেকে দীঘা বালিসাই হয়ে জাতীয় সড়ক দিয়েও যাওয়া যায় তবে ভিতরের রাস্তা দিয়ে গেলে দূরত্বও কম হয় আর অসাধারণ দৃশ্যও দেখা যায়। এই পথে দীঘার দূরত্ব ১৬ কিলোমিটার আর সময় লাগল আধঘন্টা মতো। রাস্তাটার অনেকটাই সমুদ্রের ধার দিয়ে। কিছুদূর গিয়ে সমুদ্র আমাদের থেকে দূরে চলে গেল আর আমরা চম্পা নদী পেরোলাম। কিছুদূর গিয়ে এই চম্পা নদী সমুদ্রের সঙ্গে মিলিত হয়েছে, সেই জায়গাটায় অনেক মাছধরার নৌকো দেখা গেল।

কম্পাইউন্ডের বাইরে থেকে জগন্নাথ মন্দির
আমাদের দীঘা যাওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল 'জগন্নাথ মন্দির' দর্শন (মন্দির দেখা কথাটা লেখা যায় না, দর্শন লিখতে হয়)। মন্দিরটা একেবারে দীঘা রেলস্টেশনের পাশেই। কাছাকাছি একজায়গায় গাড়ি পার্কিং করে মন্দিরের পাঁচিলের বাইরে ডালা আর্কেডে চটি-জুতো খুলে আমরা হেঁটে মন্দিরে ঢুকলাম। চত্বরটা বিশাল। এবং খুব সুন্দর। বিশাল হওয়ার কারণে এখানে ভীড়টা ছড়িয়ে রয়েছে। একটা পথ দিয়ে আমরা মূলমন্দিরের দিকে এগিয়ে চললাম। পরপর আরও কয়েকটা মন্দির চোখে পড়ল। আকাশে বেশ মেঘ করে আছে, যেকোনও সময়ে বৃষ্টি আসতে পারে। বৃষ্টি এলে আশ্রয় নেওয়ার একমাত্র উপায় হল মন্দিরের ভিতরে ঢুকে পড়া। তবে আকাশে রোদ না থাকায় একটা সুবিধে হল যে মেঝেটা গরম নয়।

সম্পূর্ণ জগন্নাথ মন্দির
প্রথমে কিছুটা এগিয়ে কয়েকধাপ উঠে একটা মন্দির। তারপর আরও কিছুটা এগিয়ে আরও কয়েকধাপ উঠে আরেকটা মন্দির (কোনটা কোন ঠাকুরের মনে নেই)। একেবারে শেষে জগন্নাথের মূল মন্দির। মূলমন্দিরের বাইরের আকৃতিটা পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের আদলে তৈরি আর সেটাই এই মন্দিরের বৈশিষ্ট্য। সম্পূর্ণ মেঝেটা মার্বেলের তৈরি। পাশে কয়েকটা ছোট ছোট জলাশয়। আমরা মূল মন্দিরে ঢুকলাম। ভিতরের কারুকার্য বা মূর্তি কোনও কিছুই পুরীর মন্দিরের মতো নয়। এখানে একটা নতুন জিনিস দেখলাম - প্রণামী বাক্সের গায়ে QR Code লাগানো। ভিতরে ছবি তোলার নিয়ম নেই, তবে মোবাইল নিয়ে ঢোকার বারণ নেই আর বুঝলাম তার প্রধান কারণই হল এই QR Code. আমরা যখন ঢুকলাম তখন জগন্নাথের আরতি হচ্ছে। আর সেইসঙ্গে বাইরে শুরু হয়েছে প্রচন্ড বৃষ্টি। আমরা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরে বৃষ্টি কিছুটা কমল আর আমরা ছাতামাথায় হেঁটে বেরিয়ে এসে গাড়িতে উঠলাম।

সবমিলিয়ে দীঘার জগন্নাথ মন্দির আমার খুবই ভালো লেগেছে। এই মন্দির তৈরির পিছনে যে রাজনৈতিক তরজা আছে, সরকারী অর্থ যেভাবে ব্যয় (বা অনেকের মতে অপচয়) হয়েছে, জগন্নাথ দেবের অবস্থান পুরীতে নাকি দীঘায় নাকি দুটো জায়গাতেই - এর কোনওকিছু নিয়েই এখানে আলোচনা করতে চাই না। আমার কাছে একটা মন্দিরে দেবতার অবস্থানের থেকেও অনেক বেশি আকর্ষণীয় হল এর কারুকার্য, স্থাপত্যশৈলী। আর সেই কারণেই এই জগন্নাথ মন্দির দর্শন। প্রাসঙ্গিকভাবে 'জয়বাবা ফেলুনাথ' ছবিতে অম্বিকানাথ ঘোষালের সেই সংলাপটা এখানে উল্লেখ করছি - "শুধু সুন্দর নয়, ওয়ার্ক অফ্‌ আর্ট আর সেইটাই বড় কথা। ওসব ভাগ্য ফেরানো টেরানোর কথা আমি বিশ্বাস করি না। একটা তিন ইঞ্চি মূর্তি মানুষের ভাগ্য ফেরাতে পারে না।"

দীঘার সমুদ্রের ধারে সবাই
দুপুর একটা বেজে গেছে তাই মন্দির থেকে বেরিয়ে আমরা এবার লাঞ্চ করার জন্য গেলাম 'ভরপেট' নামক রেস্ট্যুরেন্টে। ভিতরটা বেশ বড় কিন্তু ফাঁকা টেবিল প্রায় নেই বললেই চলে। এখানে ভাত ডাল আলুভাজা ইলিশ মাছ আর কাঁকড়া খাওয়া হল। খরচ হল ২,৮৪৩/- টাকা। লাঞ্চ করে আমরা কিছুক্ষণ সমুদ্রের ধারে গিয়ে দাঁড়ালাম। সেখানে ডাব খাওয়া হল। আর তারপর দুপুর তিনটে নাগাদ বাড়ি ফেরার পথ ধরলাম।

ফেরার পথে জায়গায় জায়গায় বৃষ্টি পেলাম। আমার হাইওয়েতে বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি চালাতে খুব ভালো লাগে। সেইসঙ্গে গাড়ির ভিতরে সবাই বক্‌বক্‌ করছে - সবমিলিয়ে দূর্দান্ত অভিজ্ঞতা। রাত ন'টা নাগাদ বাড়ি পৌঁছলাম। ভ্রমণ শেষ !

সারসংক্ষেপ ঃ

১. কলকাতা থেকে সপ্তাহান্তে ঘুরতে যাওয়ার জায়গা খুব বেশি নেই, যা আছে তার মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য হল তাজপুর। পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় অবস্থিত এই সমুদ্রসৈকত এর শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশের জন্য বিখ্যাত।

২. কলকাতা থেকে তাজপুর গাড়িতে যেতে সাড়ে চার ঘন্টার মতো সময় লাগে। ট্রেনে যেতে চাইলে হাওড়া থেকে দীঘাগামী ট্রেনে গিয়ে রামনগর স্টেশনে নামতে হবে আর সেখান থেকে গাড়িভাড়া করতে হবে।

৩. তাজপুরে অনেক হোটেল আছে যার মধ্যে বার্ড নেস্ট রিসর্ট অন্যতম। এদের ওয়েবসাইট  https://www.tajpurbirdnestresort.com/থেকে বুকিং করা যায়, যদিও আমরা MakeMyTrip থেকে বুকিং করেছিলাম। যোগাযোগের নম্বর - 7319255371, 8145341227.

৪. তাজপুরের আলাদা কোনও খাবার হোটেল বা রেস্ট্যুরেন্ট নেই, প্রত্যেকটা হোটেলেরই নিজস্ব খাবার ব্যবস্থা আছে। বার্ড নেস্ট রিসর্টের খাবারের মান ভালো।

৫. তাজপুরের সমুদ্র স্নানের পক্ষে খুবই উপযোগী তবে সেটা শুধুমাত্র ভাঁটার সময়ে। জোয়ারের সময়ে সমুদ্রে নামার কোনও প্রশ্নই ওঠে না।

৬. সমুদ্রের পাড়ে খুঁটির উপরে বেশ কিছু খাবারের দোকান আছে যেগুলো প্রধানতঃ সন্ধ্যের স্ন্যাক্স পাওয়া যায়। এখানকার খাবার দাম বেশ বেশি আর পরিমাণ বেশ কম।

৭. তাজপুর বছরের যেকোনও সময়েই যাওয়া যেতে পারে। এখানকার প্রকৃতি সারাবছর বিশেষ পালটায় না।

৮. তাজপুর থেকে দীঘার দূরত্ব মাত্র ১৬ কিলোমিটার, তাই ইচ্ছে করলে দীঘায় না থেকে তাজপুর থেকে দীঘা ঘুরে চলে আসা যেতে পারে। তাজপুর থেকে দীঘা যাওয়ার রাস্তাটা খুবই চিত্তাকর্ষক।

৯. দীঘার নবতম সংযোজিত দর্শনীয় স্থান হল জগন্নাথ মন্দির। একটা বিশাল চত্বরের উপর তৈরি এই মন্দির খুবই সুন্দর এবং অবশ্য দ্রষ্টব্য।

উপসংহার ঃ

তাজপুরের সমুদ্র
২০০৯ সালে যখন প্রথমবার তাজপুর গিয়েছিলাম, তখন তাজপুর জায়গাটার নামই খুব কম লোক জানত। তখন তাজপুরে হোটেল প্রায় ছিলই না, আমরা যে হোটেলে ছিলাম তাদের কোনও ঘরও ছিল না, ছিল শুধু তাঁবু। সেখানে থাকার অভিজ্ঞতাও ছিল রোমাঞ্চকর। বিচে গিয়ে যেটা সবথেকে বেশি চোখে পড়েছিল সেটা হল লালকাঁকড়া। এরপর গিয়েছি ২০১৪ সালে, তখন হোটেল অনেক হয়ে গিয়ে থাকলেও বিচ্‌টা সুন্দর ছিল। বিচে লালকাঁকড়াও ছিল। আর তারপর এবারে - ২০২৬ সালে। হোটেলের সংখ্যা আরও বেড়েছে, অনেকগুলো সুইমিং পুল যুক্ত হোটেল হয়েছে। বিচে খুঁটির উপর সন্ধ্যেবেলা পানাহার করার দোকান হয়েছে। আর সেইসঙ্গে হারিয়ে গেছে লালকাঁকড়া। কমে গেছে ঝাউবন। তাজপুরের সুন্দর নিরিবিলি পরিবেশ আজও আছে ঠিকই কিন্তু তার অনেকটাই কৃত্রিম। এবারে গিয়ে প্রকৃতির সেই নিজস্বতাটা কম চোখে পড়ল। আগেরবার তাজপুর ভ্রমণের শেষে লিখেছিলাম "দীঘা পুরী মন্দারমণির মতো ঘ্যাম নয়, অল্প হোটেল-দোকান, সমুদ্রের লাল কাঁকড়া আর শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ নিয়ে তাজপুর থাকুক তাজপুরেই"। কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি তাজপুর আর সেই তাজপুরে নেই। হয়তো এটাই প্রগতি - হয়তো এটাই উন্নয়ন !

তাজপুর ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Sunday, May 31, 2026

মধ্যপ্রদেশ ভ্রমণ (দ্বিতীয়বার)

ভ্রমণপথ ঃ

রবিবার ২৪শে মে, ২০২৬ঃ হাওড়া থেকে রাত্রি ১১ঃ৪০ মিনিটে হাওড়া মুম্বই মেল ভায়া গয়া।

সোমবার ২৫শে মে, ২০২৬ঃ সন্ধ্যে ৭ঃ৫০ মিনিটে - জব্বলপুর - রাত্রি ১০ঃ৩০ মিনিটে নর্মদা এক্সপ্রেস।

মঙ্গলবার ২৬শে মে, ২০২৬ঃ সকাল ৯ঃ৪৫ মিনিটে - উজ্জয়িনী - লোক্যাল সাইট সিয়িং - উজ্জয়িনীতে রাত্রিবাস ।

বুধবার ২৭শে মে, ২০২৬ঃ উজ্জয়িনীতে লোক্যাল সাইট সিয়িং - বিকেল ৫ঃ৫৫ মিনিটে নর্মদা এক্সপ্রেস।

বৃহস্পতিবার ২৮শে মে, ২০২৬ঃ সকাল ৮ঃ৩০ মিনিটে উমারিয়া - বান্ধবগড় - বান্ধবগড় টাইগার সাফারি - বান্ধবগড়ে রাত্রিবাস।

শুক্রবার ২৯শে মে, ২০২৬ঃ সকাল ৭টায় চেক্‌ আউট - উমারিয়া - সকাল ৮ঃ৪০ মিনিটে নর্মদা এক্সপ্রেস - দুপুর ১২ঃ৩০ মিনিটে পেন্ড্রা রোড - অমরকন্টক - অমরকন্টকে রাত্রিবাস।

শনিবার ৩০শে মে, ২০২৬ঃ সকাল ৯টায় চেক্‌ আউট - অমরকন্টকে লোক্যাল সাইট সিয়িং - পেন্ড্রা রোড - রাত ৮ঃ১০ মিনিটে উদয়পুর শালিমার সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস।

রবিবার ৩১শে মে, ২০২৬ঃ দুপুর ১ঃ৩০ মিনিটে সাঁত্রাগাছি।

"বান্ধবগড় যাব, বাঘ দেখব আর চলে আসব !" - আমার স্ত্রী অমৃতার এহেন আবদারের পরিপ্রেক্ষিতেই বেশ কয়েকমাস আগে থেকে বান্ধবগড় যাওয়ার পরিকল্পনা শুরু করেছিলাম। করতে গিয়ে দেখলাম জায়গাটা দুর্গম আর কলকাতা / হাওড়া থেকে সরাসরি রেল যোগাযোগ নেই। সেইসঙ্গে দেখলাম ওখান থেকে অমরকন্টক জায়গাটা খুব একটা দূরে নয়। তো, বান্ধবগড়ের সঙ্গে যোগ হল অমরকন্টক। এই পর্যন্তই ঠিক ছিল কিন্তু তারপর আমার ভায়রাভাই আনন্দদা উজ্জয়িনীর মহাকালেশ্বর মন্দির দর্শনের ইচ্ছে প্রকাশ করল। তখন বান্ধবগড়, অমরকন্টকের সঙ্গে যোগ হল উজ্জয়িনী। গরমের ছুটিতে মধ্যপ্রদেশের এই তিনটে জায়গা ভ্রমণ নিয়েই আমার ব্লগের এবারের পোস্ট।

আগেরবার যখন গিয়েছিলাম তখনও দেখেছি, মধ্যপ্রদেশের একটা বড় সমস্যা হল এখানকার রেল যোগাযোগের ক্ষীণতা। হাওড়া থেকে সরাসরি উজ্জয়িনী যাওয়ার একটাই ট্রেন শিপ্রা এক্সপ্রেস কিন্তু সে ছাড়ে সপ্তাহে মাত্র তিনদিন আর উজ্জয়িনী পৌঁছয় রাত ৯ঃ৫৫ মিনিটে যেটা একটা নতুন শহরে পৌঁছনোর পক্ষে কখনওই সুবিধেজনক সময় নয়। অগত্যা ব্রেকজার্ণি। হাওড়া থেকে জব্বলপুর আর জব্বলপুর থেকে উজ্জয়িনী।

উজ্জয়িনী ভ্রমণ ঃ

রবিবার ২৪শে মে, ২০২৬ রাত ১১ঃ৪০ মিনিটে হাওড়া থেকে ছাড়ল আমাদের ট্রেন মুম্বই মেল ভায়া গয়া। আমাদের এবারের দল দশজনের - আমি অমৃতা বাবা মা কথা কলি আনন্দদা দিদি পটাই আর নন্দিনীদি। অনেক রাতের ট্রেন বলে বাড়ি থেকে ডিনার করেই বেরিয়েছিলাম, ট্রেন ছাড়লে যে যার বার্থ-এ শুয়ে পড়লাম।

ট্রেনে যাওয়ার পথে
পরেরদিন সোমবার ২৫শে মে, ২০২৬ সারাদিনটা আমাদের ট্রেনেই কাটল। যত লম্বাই হোক, ট্রেনজার্ণি জিনিসটা আমার ব্যক্তিগতভাবে কখনও বোরিং লাগে না। আর আমাদের দশজনের একই কামরায় সিট্‌ না হওয়ায় এ-কামরা থেকে ও-কামরায় যাতায়াত করেও দিব্যি সময় কেটে যায়। দুপুরের খাবার রেলের প্যান্ট্রি থেকেই নেওয়া হল। খাবারের মান বেশ ভাল। চিকেন আর এগ্‌ থালি নিয়ে আমাদের ছ'জনের খরচ হল ৮৬০/- টাকা। ৪৫ মিনিট লেট করে ট্রেন আমাদের রাত ৭ঃ৫০ মিনিট নাগাদ জব্বলপুর পৌঁছে দিল। এখান থেকে আমরা রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। জব্বলপুর থেকে উজ্জয়িনীর ট্রেন রাত ৮ঃ৪০ মিনিটের নর্মদা এক্সপ্রেস, কিন্তু সেটা প্রায় দু'ঘন্টা লেট করে এল আর ছাড়ল রাত ১০ঃ৩০ মিনিটে। এখানেও ট্রেনে উঠে আমরা যে যার বার্থ-এ শুয়ে পড়লাম।

উজ্জয়িনী স্টেশনে আমরা
মঙ্গলবার ২৬শে মে, ২০২৬ - ঘন্টাখানেক লেট করে সকাল ৯ঃ৪৫ নাগাদ আমাদের ট্রেন পৌঁছে দিল আমাদের প্রথম গন্তব্য - উজ্জয়িনীতে। আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল রেলওয়ের রিটায়ারিং রুমে। রিটায়ারিং রুমের ভাড়া সাধারণতঃ খুব একটা বেশি হয় না কিন্তু এখানকার রিটায়ারিং রুমের ভাড়া বেশ বেশি এবং ঘরগুলো প্রশস্ত হলেও ঘরের মান ভাড়ার অনুপাতে উন্নত নয়। ঘরে মালপত্র রেখে আমরা বেরিয়ে পড়লাম ব্রেকফাস্টের উদ্দেশ্যে।

স্টেশনের বাইরেই একাধিক খাওয়ার দোকান আছে সেখানে সিঙাড়া পুরী তরকারি রুটি পোহা এইসব পাওয়া যায়। খাবারের মান খুব উন্নত না হলেও পেট ভরানোর পক্ষে ঠিকঠাক। ব্রেকফাস্ট শেষ আমরা ঘরে এসে চানটান সেরে নিলাম। দুপুরে লাঞ্চের জন্য স্টেশনের ফুড প্লাজায় গেলাম। মুশকিল হল স্টেশনে কোনও আমিষ খাবার পাওয়া যায় না। তারপর খোঁজ নিয়ে জানলাম শুধু স্টেশনে নয়, স্টেশনের ত্রিসীমানার মধ্যে এবং অনেক দূর পর্যন্ত কোন আমিষ খাবারের দোকান নেই। উজ্জয়িনী মহাকালেশ্বর মন্দিরের জন্য বিখ্যাত এবং ধর্মীয় কারণে এখানে আমিষ খাবার বিক্রি হয় না (আমি ব্যক্তিগতভাবে বুঝিনা ঠাকুর, পুজো, ধর্ম ইত্যাদির সঙ্গে আমিষ বা নিরামিষের কী সম্পর্ক)। অগত্যা ফুড প্লাজা থেকে নিরামিষ থালিই নিতে হলো। ডাল ভাত ডাল তরকারি ডাল আচার ডাল ইত্যাদি নিয়ে একটা থালির দাম ১৫০/- টাকা।

লাঞ্চের পরে আমরা ঘুরতে বেরোলাম। আমাদের প্রথম দিনের দুটি গন্তব্য - যন্তর মন্তর এবং মহাকালেশ্বর মন্দির।

যন্তর মন্তর -

টিকিটঃ মাথাপিছু ১০/- টাকা

তারামন্ডলের টিকিটঃ মাথাপিছু ২০/- টাকা

অষ্টাদশ শতাব্দীতে জয়পুরের মহারাজা সোয়াই জয় সিং (দ্বিতীয়) ভারতবর্ষের পাঁচ জায়গায় পাঁচটি মানমন্দির তৈরি করেন। এগুলোরই নাম যন্তর মন্তর। উজ্জয়নী ছাড়া অন্য চারটি জায়গা হল - জয়পুর, দিল্লী, বারাণসী এবং মথুরা। এর মধ্যে জয়পুরের মানমন্দিরটাই সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে বিখ্যাত। আমরা জয়পুর ভ্রমণের সময়ে এই মানমন্দিরটা দেখেছিলাম। উজ্জয়িনীর মানমন্দিরটা তুলনামূলকভাবে ছোট যদিও 'যন্তর' এখানেও অনেক আছে। মানমন্দিরের সঙ্গে লাগোয়া একটা তারামণ্ডল আছে সেখানে মহাকাশের সম্পর্কে শো হয়। আমরা তারামণ্ডলে বিকেল ৪টে থেকে আধঘন্টার শো দেখে নিলাম। শো-এর মান মোটের উপর মন্দ নয় তবে এদের যন্ত্রপাতি বেশ পুরনো হওয়ায় ছবির মান খুব একটা উন্নত নয়। বিশেষ করে যারা কলকাতার বিড়লা তারামণ্ডলের শো দেখেছে, তাদের এই শো না দেখলেও চলবে !

যন্তর মন্তর
কলকাতার তুলনায় উজ্জয়িনী বেশ অনেকটা পশ্চিমে হওয়ার দরুণ এখানে সূর্যাস্ত হয় অনেক দেরিতে। ফলে বিকাল সাড়ে চারটের সময়ও যন্তর মন্তরের মাঠে চড়া রোদ। সপ্তাহের দিন মঙ্গলবার বিকেলে এই চড়া রোদে আর কোনও দর্শকের এখানে না আসাটা আমাদের পক্ষে লাভজনক হল - আমরা পুরো জায়গাটা ভালভাবে ঘুরে দেখে নিতে পারলাম। এখানে গেটের মুখেই কতগুলো QR Code এর ফলক রাখা আছে, সেগুলো স্ক্যান করে নিলে একেকটা ইউটিউব ভিডিওতে এখানকার যন্ত্রপাতিগুলো কিভাবে কাজ করে সেসব জানা যায়। এখানে একটা টাওয়ার মতো আছে, তার গায়ে একটা ডিজিটাল 'বৈদিক ঘড়ি' লাগানো আছে। সেই ঘড়িতে বৈদিক মতে সময়, দিন, মাস, বার, বছর ইত্যাদি জানা যায়। আমরা বিকেল ছটা নাগাদ যন্তর মন্তর থেকে বেরিয়ে রওনা দিলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। 

হরিসিদ্ধি মন্দিরের সামনে
মহাকালেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির - যন্তর মন্তর থেকে মহাকালেশ্বর মন্দির খুবই কাছে - অটোয় আমাদের লাগলো মিনিট পাঁচেক। ভারতবর্ষে যে 'দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির' আছে, উজ্জয়িনীর মহাকালেশ্বর মন্দির তাদের মধ্যে অন্যতম। মন্দিরের চত্বরটা সুবিশাল আর তার সঙ্গে মানানসই হল এখানকার ভিড়। এখানকান প্রধান মন্দিরটা মহাকালেশ্বর বা শিবের হলেও পুরো চত্বরটায় আরও অনেকগুলো মন্দির আছে। দিদি এবং আনন্দদা হরসিদ্ধি মন্দির এবং মহাকালেশ্বর মন্দিরে পুজো দিল। এখানে ভিড়টা মূলতঃ বিভিন্ন মন্দিরে পুজো দেওয়ার এবং মন্দির সংলগ্ন দোকানপাটে, কাজেই যারা পুজো দিতে চায় না তাদের পক্ষে মোটামুটি ফাঁকা জায়গা বেছে নিয়ে সেখানে ঘোরাঘুরি করার কোনও সমস্যা নেই।

প্রদীপস্তম্ভ প্রজ্জ্বলন
হরসিদ্ধি মন্দিরের বাইরে দাঁড়িয়ে আমরা একটা বেশ সুন্দর জিনিস দেখতে পেলাম। মন্দিরের পাঁচিলের ভিতরে দুটো বেশ উঁচু স্তম্ভের মতো আছে, তার গায়ে উপর থেকে নিচে চারদিক ঘুরে বহুসংখ্যক প্রদীপ লাগানো হয়েছে। দুটো ছেলে হাতে একটা করে প্রজ্জলক নিয়ে সেই স্তম্ভের উপর উঠলো আর তারপর অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সেই প্রদীপগুলো জ্বালাতে জ্বালাতে নিচে নেমে এল। যখন সবটা জ্বালানো হয়ে গেল, দেখতে খুব সুন্দর লাগছিল।






বিক্রমাদিত্যের মূর্তি
এখানে একটা বেশ বড় জলাশয় আছে যার নাম রুদ্রসাগর। এই রুদ্রসাগরের মধ্যে একটা ছোট দ্বীপ আছে আর সেখানে পৌঁছতে গেলে একটা ছোট ব্রীজ হেঁটে পেরিয়ে যেতে হয়। দ্বীপে পৌঁছে কয়েকধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠে একটা চাতাল আর সেখানে একটা বিরাট সাইজের মূর্তি রয়েছে - রাজা বিক্রমাদিত্যের। গুপ্ত সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত - যাঁর অপর নাম ছিল বিক্রমাদিত্য - তাঁর দুজায়গায় রাজধানী ছিল উজ্জয়িনী ও পাটলিপুত্র - ছোটবেলার ইতিহাস বইয়ের পড়াটা মনে পড়ছে? এখানকার মূর্তিটা সিংহাসনে বসা রাজা বিক্রমাদিত্যের আর চাতালটা প্রকৃতপক্ষে রাজসভা। সেই রাজসভায় রাজার চারপাশে বসে রয়েছেন বিখ্যাত 'নবরত্ন সভা'র ন'জন রত্ন।

আমাদের উজ্জয়িনী ভ্রমণের পরিকল্পনা করার আগে পর্যন্ত আমার ধারণা ছিল উজ্জয়নীর খ্যাতি রাজা বিক্রমাদিত্যের জন্যই। কিন্তু পরিকল্পনা করতে গিয়ে জানলাম এখানকার প্রধান আকর্ষণ মহাকালেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির। বিক্রমাদিত্যের রাজধানী হিসেবে এর কোনও ঐতিহাসিক খ্যাতি বর্তমানে আর নেই। প্রকৃতপক্ষে এখানে বিক্রমাদিত্যের কোনও কিছুই নেই।

সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা বাজে, দিনের আলো কমে এসেছে। এই সময়ে দ্বীপটায় দাঁড়িয়ে থাকতে খুব ভাল লাগছিল, বিশেষ করে এখান থেকে মহাকালেশ্বর মন্দিরের সমস্ত জ্বলন্ত আলো এবং রুদ্রসাগরের জলে তার প্রতিফলনের দৃশ্য খুবই মনোরম লাগছিল।

মন্দির চত্বরে বিভিন্ন মূর্তি
আমরা দ্বীপ থেকে আবার মূল ভূখণ্ডে ফিরে এলাম। যারা মন্দিরে পুজো দেবে, তাদের জন্য আলাদা ব্যারিকেড করে লাইনের ব্যবস্থা করা আছে, ফলে যারা পুজো দেবে না তারা অনায়াসে বাকি অংশটা হেঁটে ঘুরে দেখতে পারে। আমরা এইভাবে সুবিশাল চত্বরের বেশিরভাগ অংশই হেঁটে ঘুরে দেখে ফেললাম। জায়গায় জায়গায় মহাদেব গণেশ দুর্গা হনুমান নারায়ণ ইন্দ্রসহ আরও বিভিন্ন দেব-দেবীর বিশাল আকারের মূর্তি রয়েছে। বলাই বাহুল্য এই মূর্তিগুলোর পুজো হয় না, এগুলো সৌন্দর্যায়নের জন্য রাখা হয়েছে।

রাত সাড়ে নটা বাজে, যদিও মন্দিরে মানুষের ঢল দেখে সেটা বোঝার উপায় নেই। সন্ধ্যে থেকে সুদীর্ঘ সময় ধরে হাঁটা হয়েছে বলে আমরা এবার বেরোনোর সিদ্ধান্ত নিলাম। যেদিক দিয়ে ঢুকেছি, সেদিক দিয়ে বেরোলাম না আর বেরোনোর সময়ও অনেকটা রাস্তা হাঁটতে হল।

মন্দিরের গেটের ঠিক বাইরেই বেশ কয়েকটা রেস্ট্যুরেন্ট আছে। এরকম একটা রেস্ট্যুরেন্ট থেকে রুটি, আলুগোবি, মিক্সড ভেজ, চাউমিন ইত্যাদি দিয়ে সবাই ডিনার করে নিলাম। খরচ পড়ল ১,১০০/- টাকা। খাওয়ার পরে দুটো টোটো ধরে আমরা স্টেশনে ফিরে এলাম।

পরেরদিন বুধবার ২৭শে মে, ২০২৬ - আমাদের উজ্জয়িনীর সাইটসিয়িং-এর দিন। এখানে জানিয়ে রাখি উজ্জয়িনীর সাইটসিয়িং এর দুটো ভাগ - একটা শহরের ভিতরে, অন্যটা বাইরে। এখানকার সমস্ত অটোরিক্সাওয়ালা, টোটোওয়ালা, গাড়িওয়ালাদের কাছে এই সাইটসিয়িং-এর লিস্টের ছাপানো কার্ড থাকে, আর এরা বারবার সেটা দেখায়। দুটো ভাগেই ছটা করে দেখার জায়গা। শহরের ভিতরের জায়গাগুলো সবই মহাকালেশ্বর মন্দিরের আশেপাশে (এবং তারমধ্যে যন্তর মন্তর পড়ে না), অটোরিক্সা ওখানে নিয়ে গিয়ে নামিয়ে দেবে আর তারপর বাকিটা হেঁটে ঘুরতে হবে। তাই শহরের ভিতরের সাইটসিয়িংটা আলাদা করে নেওয়ার কোনও মানেই হয় না, অটোরিক্সা করে মহাকালেশ্বর মন্দিরে চলে যাওয়াই ভাল। শহরের বাইরের সাইটসিয়িংটার জন্য গাড়িভাড়া করতেই হবে। তবে উজ্জয়িনীতে প্রাইভেট ট্যাক্সির চলন খুব একটা নেই, অটোরিক্সাই প্রধান যানবাহন।

শহরের ভিতরের দেখার জায়গাগুলো সবই আমাদের গতকাল দেখা হয়ে গেছে, তাই আমাদের গন্তব্য শহরের বাইরের সাইটসিয়িং। সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ স্টেশন থেকে একটা বড়ো অটোরিক্সা নিয়ে আমরা সবাই বেরিয়ে পড়লাম। একটা অটোতে দশজন বেশ চাপাচাপি হয়, কিন্তু যেহেতু জায়গাগুলোর দূরত্ব খুব বেশি নয়, তাই কোনওমতে মানিয়ে নেওয়া হল। আর আমাদের দলের সবাই-ই 'সুজন', কাজেই ...। উজ্জয়িনী বেশ কিছুটা পশ্চিমে হওয়ার কারণে এখানে যেমন সূর্যাস্ত হয় দেরিতে, তেমনি সূর্যোদয়ও হয় দেরিতে আর তার ফলে স্বাভাবিক জনজীবন শুরুও হয় দেরিতে। অটোয় করে আমরা যখন উজ্জয়িনী শহরের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি দেখলাম রাস্তায় লোকজন খুব কম, গাড়ি চলাচল কম, দোকানপাট প্রায় সবই বন্ধ। আধঘন্টা চলার পর শহর থেকে একটু বাইরে আমরা পৌঁছলাম আমাদের প্রথম গন্তব্যে।

গুহার রাস্তার পাশে শিপ্রা নদী
ভর্তৃহরি গুহা - অটো আমাদের যেখানে নামিয়ে দিল সেখান থেকে ভর্তৃহরি গুহায় যাওয়ার জন্য সিঁড়ি দিয়ে বেশ কিছুটা নীচে নামতে হয়। তবে এই সিঁড়ি দিয়ে নামা বা ওঠাটা খুব একটা কষ্টকর নয় কারণ প্রত্যেকটা ধাপই বেশ চওড়া। আর যারা কেনাকাটা করতে পছন্দ করে তাদের জন্য সিঁড়ির দুধারে নানারকম জিনিসের দোকান আছে ফলে সেটাও তাদের জন্য ক্লান্তি দূরকারক ! সিঁড়ি দিয়ে একেবারে নীচে নামার পরে দেখলাম আমাদের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে শিপ্রা নদী। উজ্জয়িনীর পাশ দিয়ে বিভিন্ন জায়গা দিয়ে এই নদী বয়ে চলেছে - এই প্রাচীন শহর এই নদীর উপর নির্ভর করেই গড়ে উঠেছিল। এই নদীর ধারেই রয়েছে ভর্তৃহরি গুহার প্রবেশ পথ।

ভর্তৃহরি গুহার ভিতরে
ভর্তৃহরি গুহা পাথর কেটে তৈরি করা গুহা। ভর্তৃহরি ছিলেন উজ্জয়িনীর রাজা। ব্যক্তিগত জীবনে অসন্তোষের কারণে তিনি একসময়ে সিংহাসন ত্যাগ করেন এবং তাঁর জায়গায় রাজা হন তাঁর বৈমাত্রেয় ভাই বিক্রমাদিত্য। ভর্তৃহরি এই গুহায় এসে ধ্যান করেন এবং পরবর্তীকালে একজন কবি, দার্শনিক এবং সাধু হয়ে ওঠেন। আমরা ভিতরে ঢুকলাম। জায়গাটা বেশ সুন্দর আর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। প্রথমে একটা পাথর কেটে তৈরি করা মন্দির দেখতে পেলাম। তারপর কিছুটা এগিয়ে গিয়ে একটা মাথাখোলা প্যাসেজের পাশে পরপর দু'তিনটে দরজা, সেগুলো দিয়ে ভিতরে ঢুকে নিচে নেমে যাওয়ার সিঁড়ি আছে। ভিতরের পথ খুবই সঙ্কীর্ণ আর ছাদের উচ্চতা খুব কম বলে মাথা নিচু করে হাঁটতে হয়। তবে ভিতরে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকায় দেখতে কোনও সমস্যা হয়না। প্রতিটা গুহার ভিতরেই ঠাকুরের মূর্তি আছে তবে সেগুলো দেখে কার মূর্তি বোঝা মুস্কিল। এবং আশেপাশে পড়ে থাকা ফুল, পাতা, পুজোর সামগ্রী দেখে মনে হয় এখানে নিয়মিত পুজো হয়। বেরোনোর রাস্তায় একটা শিবের মন্দির আছে - নাম শ্রী নবনাথ মন্দির। মন্দিরের চত্বরটা বেশ বড় ও সুন্দর। আমরা এখানে কিছুক্ষণ বসে বেরিয়ে এলাম। সিঁড়ি দিয়ে ধাপে ধাপে উঠে বেশ ক্লান্ত লাগছিল, উপরে উঠে বরফ দেওয়া ঠান্ডা আখের রস খেলাম (অবশ্য ক্লান্ত না হলেও খেতাম !)। তারপর সবাই অটোতে উঠে চললাম আমাদের দ্বিতীয় গন্তব্যে।

গড়কালিকা মন্দিরের সামনে
শ্রী গড়কালিকা মন্দির - পাঁচমিনিটের মধ্যেই পৌঁছলাম গড়কালিকা মাতা মন্দিরে। এই মন্দিরের সেরকম কোনও বিশেষত্ব নেই, ছোটোখাটো একটা মন্দির। মন্দিরে বেশ ভীড় ছিল, তবে ঠাকুর দেখতে অসুবিধে হয়না কারণ লাইনটা বেশ সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে চলে। গতকালের দেখা হরসিদ্ধি মন্দিরের প্রদীপস্তম্ভের মতো একটা স্তম্ভ এখানেও রয়েছে। আমরা কিছুক্ষণ মন্দিরে কাটিয়ে এগিয়ে চললাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের দিকে।






কালভৈরব মন্দির - প্রায় দশমিনিট চলার পরে পৌঁছলাম কালভৈরব মন্দিরে। এখানে আমাদের অটো যেখানে নামিয়ে দিল, সেখান থেকে মন্দিরে ঢোকার রাস্তাটা বেশ কিছুটা দূরে। মূল মন্দিরে ঢুকতে গেলে যে পথটা দিয়ে হেঁটে ঢুকতে হয়, সেটাকে ব্যারিকেড করে একটা সর্পিলাকার পথে পরিণত করা হয়েছে যাতে লাইন সুষ্ঠুভাবে এগোতে পারে। এরকম আমরা আগেও অনেক মন্দিরে দেখেছি। কিন্তু এই পথে কিছুদূর গিয়ে দেখলাম লাইনে যে পরিমাণ লোক দাঁড়িয়ে আছে, তাতে এই মন্দির দেখতে গেলে এখানেই দুঘন্টা সময় কেটে যাবে। আর সত্যি বলতে কী, আমাদের সেরকম ভক্তিও নেই যে এটা দেখলাম না বলে খুব আফসোস হবে। সুখের চেয়ে সোয়াস্তি ভাল - ভীড়ের চেয়ে না দেখা ভাল !

মন্দির না-দেখে বেরিয়ে এসে আবার অটোয় উঠলাম। বেলা সাড়ে দশটা বাজে তাই কাছেই একটা রেস্ট্যুরেন্টে ব্রেকফাস্টের জন্য দাঁড়ানো হল। এখানে আমরা আলুর পরোটা দিয়ে ব্রেকফাস্ট সারলাম। সবমিলিয়ে খরচ পড়ল ৭৫০/- টাকা।

সিদ্ধবত ঘাট - মিনিট পাঁচেক অটোয় চলার পরে আমরা পৌঁছলাম সিদ্ধবত ঘাটে। এটা শিপ্রা নদীর ধারে একটা ঘাট। জায়গাটায় দেখার মতো সেরকম কিছুই নেই শুধু একটা মন্দির ছাড়া। মন্দিরটাও সেরকম দারুণ কিছু নয়, তাই আমরা শিপ্রা নদীর ঘাটটা দেখে ফিরে এলাম।

মঙ্গলনাথ মন্দির
মঙ্গলনাথ মন্দির - সিদ্ধবত ঘাট থেকে পাঁচ মিনিট চলার পরে পৌঁছলাম মঙ্গলনাথ মন্দিরে। এই মন্দিরটা বেশ বড় আর বেশ ভীড়। এটা একটা শিবের মন্দির এবং মৎস্যপুরাণ অনুসারে এটা মঙ্গলের জন্মস্থান। এই জায়গা মানুষের মঙ্গলদশা কাটানোর জন্য (মঙ্গলদশা বস্তুটা যে কী, সেই নিয়ে আমার যদিও কোনও ধারণা নেই আর করারও ইচ্ছে নেই !) 'ভাত পুজো' করার ব্যাপারে বিখ্যাত। আবার এই মঙ্গল মানে কিন্তু মঙ্গলগ্রহ (এটা ওখানেই লেখা আছে)। মানে এককথায় পুরাণ-জ্যোতিষশাস্ত্র-জ্যোতির্বিদ্যার একটা জগাখিচুড়ি ! মন্দিরের একটা দোতলা আছে, সেখানেও গিয়ে দেখার মতো ঠাকুর আছে। মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে শিপ্রা নদী - এখানকার ঘাটটা খুব সুন্দর। ঘাটে বিশাল গাছের ছায়া। এখানে ফুরফুর করে হাওয়া বইছিল বলে আমরা কিছুক্ষণ গাছের ছায়ায় বসলাম। তারপর ফিরে এসে আবার চড়ে বসলাম আমাদের অটোয়।

সন্দীপনি আশ্রমের ভিতরে
মহর্ষি সন্দীপনি আশ্রম - মঙ্গলনাথ মন্দির থেকে মিনিট পাঁচেক চলার পরে পৌঁছলাম মহর্ষি সন্দীপনি আশ্রমে। পুরাণমতে এই মহর্ষি সন্দীপনি হলেন শ্রীকৃষ্ণ, সুদামা ও বলরামের শিক্ষক আর এই আশ্রমেই শ্রীকৃষ্ণরা শিক্ষালাভ করেছিলেন। আশ্রমটা বেশ বড়ো আর খুব সুন্দর। প্রথমে ঢুকেই একটা গোলাকৃতি ঘর যার ভিতরের দেওয়ালে পুরাণ, জিজ্ঞাসা, তর্ক, কল্য, ধর্মশাস্ত্র, নিরুক্ত, জ্যোতিষ, ব্যাকরণ, ছন্দ শাস্ত্র, শিক্ষা, আয়ুর্বেদ, সঙ্গীত, যজ্ঞ, অগ্নি - এইসব বিষয়ে পাঠরত তিনছাত্র ও তৎসহ শিক্ষকের ছবি (অবশ্যই হাতে আঁকা !)। ঘরটা থেকে বেরিয়ে একটা মন্দির যদিও সেটার ভিতরে ঢুকিনি।

পুকুরের চারপাশে সিঁড়ির ধাপ
এর পাশে রয়েছে একটা চৌকো বাঁধানো পুকুর যার চারদিকে ধাপে ধাপে সিঁড়ি নেমে গেছে। পুকুরের পাশে একটা বিশাল লম্বা বারান্দা আর সেখানে আরও বিস্তারিতভাবে কীভাবে তখনকার দিনে চৌষট্টি কলা শিক্ষা দেওয়া হত তার ছবি। সব ছবিতেই শ্রীকৃষ্ণ, সুদামা আর বলরাম আছেন আর তাদের শিক্ষা দিচ্ছেন বিভিন্ন শিক্ষকরা। ছবিগুলো শুধুমাত্র দ্বিমাত্রিক নয়, ত্রিমাত্রিকও অর্থাৎ ছবিতে মানুষ এবং অন্যান্য কিছু কিছু জিনিস মূর্তির মতো করে তৈরি করে ছবির উপর বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। সবমিলিয়ে জায়গাটার সৌন্দর্য রীতিমতো চিত্তাকর্ষক। আমরা এখানে বেশ অনেকটা সময়ে কাটিয়ে বেরিয়ে এলাম।

আমাদের নির্ধারিত সাইটসিয়িং শেষ। কিন্তু আমরা আগে থেকেই অটোওয়ালাকে বলে রেখেছিলাম আরেকটা জায়গায় আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য। সেটা হল বিক্রমাদিত্য মিউজিয়াম। এর নাম কোনও সাইটসিয়িং-এর লিস্টে নেই, এটা আমরা নিজেরা ইন্টারনেট থেকে জেনেছিলাম। মজার ব্যাপার জায়গাটা উজ্জয়িনী শহরের মধ্যে হওয়া সত্ত্বেও আমাদের ড্রাইভার তার সঠিক অবস্থান জানে না। ইন্টারনেট দেখে জায়গাটার নাম বলেও সুবিধে হল না। শেষ পর্যন্ত আমার মোবাইলের গুগ্‌ল্‌ ম্যাপ দেখে ড্রাইভার সেখানে আমাদের নিয়ে গেল।

বিক্রমাদিত্যের বন্ধ মিউজিয়াম
গিয়ে দেখলাম মিউজিয়াম বন্ধ। এটা গত ছমাস ধরে বন্ধই আছে কারণ মিউজিয়ামের নতুন বাড়ি তৈরি ও পুরনো বাড়ি মেরামতির কাজ চলছে। কাজ শেষ হতে আরও এক-দেড় বছর সময় লাগবে। এবং এটা কবে খুলবে তার কোনও সঠিক তথ্য সিকিউরিটি গার্ডের কাছে নেই। বুঝলাম কাজ চলছে খুবই ঢিমেতালে। তাড়াতাড়ি শেষ করার বিশেষ আগ্রহ থাকারও কথা নয় কারণ অটোওয়ালার এর অস্তিত্ব সম্পর্কে অজ্ঞানতা থেকেই বোঝা যায় এখানে সাধারণতঃ কোনও দর্শনার্থী আসে না। ঠিকই আছে ! যে ইতিহাসপ্রসিদ্ধ শহরে মহারাজা বিক্রমাদিত্যের রাজধানী থাকা সত্ত্বেও প্রধান দর্শনীয় জায়গাগুলোর সবই কোনও না কোনও মন্দির, যেখানকার মানুষ ১৬০০ বছর আগেকার ইতিহাস ভুলে গেছে কিন্তু পুরাণবর্ণিত ৫২০০ বছর আগেকার সন্দীপনি আশ্রমকে মনে রেখেছে (যদি সেই সময়ে আদৌ তার কোনও অস্তিত্ব থেকে থাকে !), যেখানকার অটোওয়ালা বিক্রমাদিত্যের মিউজিয়ামটার সঠিক অবস্থানটাও জানে না, সেখানে এর থেকে বেশি আর কী আশা করা যায়?

আমরা দুপুর দুটো নাগাদ স্টেশনে ফিরে এলাম। সারাদিনের ঘোরার জন্য অটো নিল ১,৩০০/- টাকা (ছ'টা সাইটসিয়িং-এর জন্য ১,২০০/- টাকা আর বিক্রমাদিত্য মিউজিয়ামের জন্য অতিরিক্ত ১০০/- টাকা)। সকালে ব্রেকফাস্টটা ভারী হওয়ার কারণে কেউই দুপুরে লাঞ্চ করতে রাজী হল না, অল্প করে টুক্‌টাক খেয়ে নেওয়া হল। আমাদের ট্রেন নর্মদা এক্সপ্রেসের সময় বিকেল ৫ঃ৫৫। সেইমতো আমরা প্ল্যাটফর্মে এসে বসলাম আর নির্ধারিত সময়ে ট্রেন এলে তাতে উঠে পড়লাম। উজ্জয়িনী ভ্রমণ এখানেই শেষ - আমরা এগিয়ে চললাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের দিকে।

সারসংক্ষেপ ঃ

১. হাওড়া থেকে উজ্জয়িনী যাওয়ার সরাসরি ট্রেন একটাই আছে - শিপ্রা এক্সপ্রেস, তাও আবার সেটা সপ্তাহে তিনদিন ছাড়ে। তাই উজ্জয়িনী যাওয়ার জন্য জব্বলপুর থেকে ব্রেকজার্ণি করাই ভাল, তাতে কয়েকটা বিকল্প পাওয়া যায়।

২. উজ্জয়িনীতে স্টেশনের কাছেই অনেক হোটেল আছে। স্টেশনে রিটায়ারিং রুমও আছে, যদিও তার ভাড়া বেশ বেশি এবং ভাড়ার তুলনায় ঘরগুলো যথেষ্ট হাই-ফাই নয়।

৩. উজ্জয়িনী প্রধানতঃ ধর্মীয় জায়গা হওয়ার কারণে স্টেশন বা স্টেশনের ত্রিসীমানার মধ্যে আমিষ খাবার পাওয়া যায় না। নিরামিষ খাবারের মান ঠিকঠাক।

৪. উজ্জয়িনীর প্রধাণ আকর্ষণ মহাকালেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির। এটা ভারতের দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দিরগুলোর মধ্যে অন্যতম।

৫. উজ্জয়িনীর মহাকালেশ্বর মন্দিরের আশেপাশে আরও অনেকগুলো মন্দির আছে। সবমিলিয়ে চত্বরটা সুবিশাল - আর পুরোটাই হেঁটে ঘুরতে হয়। গরমকালে গেলে সন্ধ্যের পরে যাওয়াই ভাল।

৬. অন্যান্য সাইটসিয়িংগুলোর মধ্যে যন্তর মন্তর, ভর্তৃহরি গুহা আর সন্দীপনি আশ্রম অবশ্য দ্রষ্টব্য। এগুলোর প্রত্যেকটা দেখতেই সময় লাগে, তাই হাতে সময় নিয়ে দেখা দরকার।

৭. উজ্জয়িনীতে মহারাজা বিক্রমাদিত্যের রাজধানী থাকা সত্ত্বেও মহাকালেশ্বর মন্দিরের কাছে একটা মূর্তি ছাড়া এখানে বিক্রমাদিত্যের কোনওকিছুই নেই। একটা মিউজিয়াম আছে কিন্তু সেটাও বর্তমানে বন্ধ।

৮. সাইটসিয়িং করার জন্য এখানে প্রাইভেট ট্যাক্সির প্রচলন খুব বেশি নেই, অটোরিক্সাই ভরসা। অটোরিক্সা করে সাইটসিয়িং করার জন্য ৬ - ৭ ঘন্টা সময় হাতে রাখাই যথেষ্ট।

৯. উজ্জয়িনীতে গরম বেশ বেশি হওয়া সত্ত্বেও আবহাওয়া শুকনো হওয়ার কারণে ঘাম কম হয় আর ক্লান্তিও কম লাগে। আর কলকাতার গরমের তুলনায় গরম কমই লাগে বলা যেতে পারে।

বান্ধবগড় ভ্রমণ ঃ

উজ্জয়িনীর নিরামিষ ভূত যে ট্রেনে ওঠার পরেও আমাদের পিছু ছাড়েনি, সেটা জানতে পারলাম প্যান্ট্রী থেকে আমাদের ডিনার অর্ডার করার সময়ে। প্যান্ট্রীকারের ছেলেটা স্পষ্টভাষায় জানালো যেহেতু এই ট্রেন উজ্জয়িনীর উপর দিয়ে যায়, তাই ওরা ট্রেনের প্যান্ট্রীতে কোনও আমিষ খাবার রাখে না। অগত্যা নিরামিষ বিরিয়ানী আর নিরামিষ থালি নেওয়া হল আর সঙ্গে যা খাবারদাবার ছিল তাই দিয়ে চালিয়ে নেওয়া হল। খাওয়ার পর সবাই যে-যার বার্থে শুয়ে পড়লাম।

উমারিয়া স্টেশনে আমরা
বৃহস্পতিবার ২৮শে মে, ২০২৬ সকালে একেবারে নির্ধারিত সময় ৮ঃ৩০ মিনিটে আমাদের ট্রেন পৌঁছল উমারিয়া। এটাই বান্ধবগড়ের সবথেকে কাছের রেলস্টেশন, বান্ধবগড় যেতে হলে এখানেই নামতে হয়। এখান থেকে বান্ধবগড়ের দূরত্ব ৩২ কিলোমিটার। আমাদের হোটেল থেকে আগেই গাড়ি বুক করা ছিল, সেইমতো দুটো আর্টিগায় আমরা মালপত্র নিয়ে চড়ে বসলাম।

বান্ধবগড় পৌঁছতে লাগল প্রায় একঘন্টা। রাস্তার দুধারে প্রচুর গাছপালা আর শেষের কিছুটা পথের দুপাশে জঙ্গল। জঙ্গল খুব ঘন না হওয়ায় ভিতরে বেশ কিছুদূর দেখা যায়। আমরা যাওয়ার পথে কিছু হরিণ দেখতে পেলাম তবে রাজার দেখা পাইনি। স্টেশন থেকে হোটেল পর্যন্ত একেকটা গাড়ির ভাড়া নিল ২,০০০/- টাকা।

বান্ধবগড়ে আমাদের হোটেলের নাম ফ্লাইক্যাচার ইন্‌। হোটেলটা খুব বড় নয়, আর পুরোটাই একতলা। আমাদের চারটে ঘর বুক করা ছিল। এখানে যিনি আমাদের আপ্যায়ন করলেন তিনি একাধারে ম্যানেজার, কেয়ারটেকার, রিসেপশনিস্ট, হেড কুক - সবই। হোটেলে আমরা ছাড়া আর কোনও গেস্ট নেই, তাই ওনারা বললেন আমরা যা খেতে চাইব ওনারা তাইই তৈরি করে দেবেন। আমরা ব্রেকফাস্টের জন্য পুরী সবজি তৈরি করতে বললাম আর লাঞ্চে চিকেন থালি (ফাইন্যালি !)।

হোটেলের ঘরগুলো খুব বড় না হলেও ঘরের মান বেশ উন্নত। আমরা চেক্‌ইন করে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। বেলা সাড়ে এগারোটার সময়ে আমাদের ব্রেকফাস্ট দিল। রান্না বেশ ভাল। খিদেও পেয়েছিল, সবাই ভালভাবে খাওয়াদাওয়া সেরে নিলাম। খাবার ভাল হলেও এখানে খাবারের দাম বেশ বেশি - একেক প্লেট পুরী সবজির দাম ২২০/- টাকা। বান্ধবগড়ে আমাদের দেখার জায়গা একটাই - বান্ধবগড় টাইগার রিজার্ভ। সাফারির বুকিং https://forest.mponline.gov.in/ থেকে আগেই করা ছিল। আমাদের সাফারির সময় বিকেল ৪টে থেকে সন্ধ্যে ৭টা, তাই আমাদের হাতে ঢের সময় আছে।

উপরের দেওয়া ওয়েবসাইট ছাড়াও সাফারি বুকিং-এর আরও কয়েকটা সাইট আছে। কিন্তু একমাত্র এটাই সরকারী - বাকিগুলো বেসরকারী। আর আমার মতে এইসব বুকিং বেসরকারী ওয়েবসাইট থেকে না করাই ভাল।

আমাদের সাফারির বুকিং টালা গেট থেকে করা ছিল, আমাদের হোটেল থেকে এই গেটের দূরত্ব ঠিক ১ কিলোমিটার। সাফারি বুকিং আগে থেকে করা থাকলেও এখানকার গেটের অফিসে সেটা এন্ট্রি করাতে হয় আর সেইসঙ্গে জিপ আর গাইডের বুকিংও করতে হয়। আমাদের হোটেলের ম্যানেজার কাম ইত্যাদি ভদ্রলোক বললেন এই বুকিং-এর কাজটা উনিই আমাদের হয়ে করে দেবেন (অর্থাৎ উনি ট্রাভেল ডেস্কও চালান !)। এর জন্য উনি আমাদের থেকে মোট ৯০০/- নিলেন। টাকাটা একটু বেশি হলেও আমাদের কোনও ঝক্কি পোহাতে হল না আর সেইসঙ্গে এটাও ঠিক আমরা বাইরের লোক তাই আমাদের পক্ষে ব্যাপারটা এত সহজে করে ফেলা সম্ভব নয়।

দুপুরে চিকেন থালি দিয়ে লাঞ্চটা ভালই হল। চিকেন থালির দাম ৪৬০/- টাকা, এটাও বেশ বেশি। লাঞ্চ করে একটু বিশ্রাম নিয়ে আমরা চারটের সময়ে বেরিয়ে পড়লাম। সাফারির জিপ আমাদের হোটেল থেকেই আমাদের তুলে নিল। বলা বাহুল্য, জিপগুলোর হুড খোলা। এখানকার নিয়ম হচ্ছে একেকটা জিপে ঠিক ছজন করেই বসতে পারবে, "কিছু কমও হবে না, কিছু বেশিও হবে না" (এটা ওই হরেকমাল ৩০/- টাকার স্টাইলে বললাম !)। আমাদের যেহেতু দশজন তাই একটা জিপ পুরো আমাদের আর অন্য জিপে আমাদের চারজনের সঙ্গে বাইরের দুজন। জিপ আর গাইডের ভাড়াটাও এই অনুপাতেই ভাগ হবে।

বান্ধবগড় টাইগার রিসার্ভ -

সাফারি গেটঃ টালা

সাফারি জোন ঃ মাগধি

সাফারি চার্জ ঃ মাথাপিছু ৪৫০/- টাকা (ছোটদের মাথাপিছু ২৩০/- টাকা) (সার্ভিস ফি সহ)

সাফারি জিপের চার্জঃ ৩,৮০০/- টাকা (ছজনের জন্য)

গাইডের চার্জঃ ১,০০০/- টাকা (ছজনের জন্য)

রেডি ফর দ্য সাফারি !
জিপ আমাদের নিয়ে প্রথমে গেল টালা গেটে, সেখান থেকে গাইড ভদ্রলোক আমাদের গাড়িতে উঠলেন। তারপর জিপ আমাদের সকালের রাস্তা দিয়েই এগিয়ে চলল। কিছুদূর পিচের রাস্তা দিয়ে চলার পরে আমাদের গাড়ি একটা মেঠো পথে নেমে পড়ল আর আমরা ঢুকে পড়লাম জঙ্গলের মধ্যে। কিছুটা যাওয়ার পরে একটা চেক্‌পয়েন্টে আমাদের চেকিং হল। সিকিউরিটির ভদ্রমহিলা আমাদের প্রত্যেকের আধার কার্ডের ছবির সঙ্গে মুখ মিলিয়ে দেখলেন (ভাগ্যিস ভোটার কার্ডের সঙ্গে দেখার কথা বলেননি !)।

জঙ্গলের ভিতর হরিণের পাল
এরপর আমরা আরও গভীরে এগিয়ে চললাম। কিছুদূর যাওয়ার পরে জায়গায় জায়গায় প্রচুর সংখ্যক হরিণের পাল দেখা গেল। এছাড়া গাছে গাছে বাঁদরের দলকেও দেখা গেল। একটা বাইসন দেখতে পেলাম আর বেশ কিছু ময়ূর-ময়ূরী। জঙ্গলের শোভার বর্ণনা দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই, আমি সাহিত্যিক নই। শুধু এটুকু বলতে পারি জঙ্গলের মধ্যে প্রকৃতির যে আদিম রূপ দেখা যায়, সেটা আমাকে সবসময়েই মুগ্ধ করে। আজ থেকে বহুযুগ আগে যখন পৃথিবীতে মানুষ ছিল না, তখনও এখানকার সবকিছুই এরকমই ছিল। বিবর্তনের নিয়ম মেনে এখানকার অধিবাসীদের জীবনযাত্রায় হয়তো কিছু পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু মূল সুরটা একই থেকে গেছে। এই জঙ্গলের জীবন স্বয়ংসম্পূর্ণ - মানুষকে এদের জাস্ট কোনও দরকার নেই। এরা এদের এলাকায় নিজেদের মতো দিব্যি আছে। এখানকার জীব জন্তু পাখি, গাছপালা ইত্যাদির কোনওকিছুই লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বদলায়নি - শুধু মাটিতে গাড়ির চাকার দাগ ছাড়া। সেই দাগ ধরে চলতে চলতে একটা জলাশয়ের পাশে আরও অনেকগুলো জিপ দাঁড়িয়ে আছে দেখে আমাদের জিপ দাঁড়ালো।

হ্যাঁ, এখান থেকে বাঘ দেখা যাচ্ছে। আমাদের গাইড দেখালো, জলাশয়ের পাড়ের উপরে একটা ঝোপঝাড়ের মধ্যে বাঘ শুয়ে ঘুমোচ্ছে। আমার মোবাইলের ক্যামেরার সর্বাধিক জুম ব্যবহার করেও যেটা দেখতে পেলাম তাতে সেটাকে বাঘ বলে বোঝা মুস্কিল। আমাদের গাইড জানালো বাঘের নাম জামহোল। এই মাগধি এলাকায় সে-ই একমাত্র বাঘ আর তার সঙ্গে আছে ৩-৪ টে বাঘিনী। জঙ্গলের মধ্যে বাঘেদের এলাকা ভাগ করা থাকে। একটা বাঘ তার বাঘিনীদের নিয়ে যেখানে থাকে তার ৬০ - ৬৫ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের পুরোটাই তার এলাকা। সেখানে সে ৩-৪ জন বাঘিনী নিয়ে বসবাস করে। সেখানে অন্য বাঘের প্রবেশ নিষেধ। বাঘ বিভিন্ন গাছের গুঁড়িতে নখ দিয়ে আঁচড় কেটে নিজের এলাকা চিহ্নিত করে রাখে। যদি অন্য কোনও বাঘ তার এলাকায় প্রবেশ করে, তাহলে দুজনের মধ্যে মুখোমুখি ডুয়েল হয়। সেই ডুয়েলে যে জেতে সে ওই এলাকার রাজা হয়ে যায়। অন্যজন সংগত কারণেই বীরগতিপ্রাপ্ত হয়। স্ট্রাগ্‌ল ফর এক্সিস্টেন্স - সারভাইভ্যাল অফ্‌ দ্য ফিটেস্ট !

আমাদের গাইড বলল বাঘ কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুম থেকে উঠবে আর তারপর জল খাওয়ার জন্য জলাশয়ে নামবে। তখন তাকে ভালভাবে দেখা যাবে। কিন্তু এই কিছুক্ষণটা কতক্ষণ? উত্তরে সে বলল - টাইগার যো হ্যায়, ও জঙ্গলকা রাজা হ্যায় ! তো ও কব উঠেগা, ও তো কিসিকো ভি পতা নেহি। ও আপনে মর্জি কা মালিক হ্যায়। আগার আপলোগ উসকো দেখনা চাহ্তে‌ হ্যায়, তো ওয়েট করনা পড়েগা !

ঝোপঝাড়ের আড়ালে বাঘ
আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম। ঝোপঝাড়ের মধ্যে বাঘকে আবছা দেখা যাচ্ছে। আমাদের থেকে তার দূরত্ব ৫০ মিটারের মতো। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে আমাদের সঙ্গে আরও পনেরো-ষোলোটা জিপ দাঁড়িয়ে আছে। বেশ কিছু জিপে বিদেশী পর্যটকও আছে। সবার হাতেই মোবাইল ক্যামেরা রেডি করা। কারো কারো কাছে আবার বিশাল টেলিফোটো লেন্সযুক্ত ক্যামেরা। সকলেই তৈরি প্রকৃতির এই আশ্চর্য সুন্দর অথচ ভয়ালরূপকে ক্যামেরাবন্দী করার জন্য।

বসে থাকতে থাকতে আমি গাইডকে জিজ্ঞেস করলাম এখানে বাঘকে বনদপ্তর থেকে খাবার দেওয়া হয় কিনা। উত্তরে সে বলল শুধু বাঘ নয়, এখানকার কোনও প্রাণীকেই খাবার দেওয়া হয় না, নিজেদের খাবার এদের নিজেদের সংগ্রহ করে নিতে হয়। বাঘ এখানে হরিণ বা অন্য জানোয়ার শিকার করে খায়। অর্থাৎ এখানে সবকিছুই আদিম - কোনওকিছুই কৃত্রিম নয়।

ইতিমধ্যে আমাদের আশেপাশে মাথার উপরের গাছের বাঁদরগুলো বাঁদরামি শুরু করল। উপর থেকে মাঝে মাঝেই গাড়িগুলোর উপরে তারা বিষ্ঠাবর্ষণ করতে শুরু করল। সৌভাগ্যক্রমে আমাদের গাড়ির উপরে করেনি ! আমাদের গাইড বলল বাঁদরগুলো জলাশয় থেকে জল খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। অপেক্ষা করছে কেন, খেলেই তো পারে ! গাইড বলল জঙ্গলের নিয়ম হল বাঘ আগে জল খাবে, তারপরে বাকিরা। তাই ওরা বাঘের জল খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। প্রকৃতির ভিতর এই নিয়মানুবর্তিতা আমাকে বেশ অবাক করল !

নড়ল ! নড়ল ! একবার, দুবার। আবার শুয়ে পড়ল। ঝোপের মধ্যে জামহোলকে যেটুকু দেখতে পেলাম তাতেই দারুণ লাগল। কিন্তু আবার অপেক্ষা। দর্শক রেডি। ক্যামেরা রেডি। জঙ্গলও যেন তৈরি হয়ে রয়েছে তাদের রাজার বৈকালিক ক্রিয়াকলাপের জন্য।

জলের মধ্যে জামহোল
এবার জামহোল নড়াচড়া করে উঠে দাঁড়ালো। তারপর খুব অলসভাবে এক-পা, দু-পা হাঁটল। তারপর ধীরে ধীরে জলাশয়ের পাড় বেয়ে নেমে শরীরের নিচের অংশটা জলের মধ্যে ডুবিয়ে বসল। আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখছি প্রকৃতির এই স্বরূপ। জামহোল এই অবস্থায় বসেই রইল। আমাদের গাইড বলল ও এখন আর নড়বে না, আমাদের তাই আরও এগোনোই ভাল। ফেরার পথে যদি ও এখানে থাকে, তাহলে আবার দেখা যাবে। পরে হিসেব করে দেখেছিলাম আমরা ওখানে বাঘকে দেখার জন্য প্রায় পঞ্চাশ মিনিট অপেক্ষা করেছিলাম। পঞ্চাশ মিনিট।

এই না হলে রাজদর্শন !

ময়ূর - পেখম না তোলা
আমরা আরও এগিয়ে চললাম। এবারে পথে আবার ময়ূর চোখে পড়ল আর একজায়গায় শকুন। এক জায়গায় গিয়ে আমাদের জিপ দাঁড়িয়ে গেল, এখানে তার দিয়ে ঘেরা কয়েকটা ঘরের মতো রয়েছে। এটা একটা খাওয়ার জায়গা, এখানে চা-জল-ম্যাগী পাওয়া যায়। আমাদের কারোরই কিছু খাওয়ার ইচ্ছে নেই, তাই আমরা এখানে আর সময় নষ্ট না করে ফেরার পথ ধরলাম।

জঙ্গলের মধ্যে সূর্যাস্ত
ফেরার পথে জলাশয়ের মধ্যে আর জামহোলকে দেখা গেল না। সে আবার পাড়ে উঠে তার আগের জায়গায় বসেছে। দিনের আলো আগের থেকে কমে গেছে, তাই এখন আর ক্যামেরা জুম করেও তাকে দেখা গেল না। আমরা ক্রমশঃ জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসতে থাকলাম। সন্ধ্যে সাড়ে ছটা বাজে, সূর্যাস্ত হয়ে গেল। জঙ্গলের ভিতর থেকে সূর্যাস্তের অসাধারণ দৃশ্য দেখতে পেলাম। জঙ্গল থেকে বেরিয়ে যখন আবার টালা গেটের কাছে পৌঁছলাম তখন সন্ধ্যে সাতটা বেজে গেছে আর কিছুটা অন্ধকারও হয়ে গেছে।

এখানে জিপটাকে ছেড়ে দিয়ে একটু চা-টা খেয়ে নেওয়া হল। তারপর কয়েকজন কেনাকাটার জন্য ওখানে থেকে গেল আর বাকিরা হোটেলের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। বান্ধবগড় একটা খুব ছোট্ট শহর আর এখানকার অর্থনীতি ওই টাইগার রিসার্ভের উপর নির্ভরশীল, তার বাইরে এখানে কিছু নেই। সন্ধ্যের পরে এখানে রাস্তায় লোকজন প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে। আমরা হোটেলে ফিরে এসে কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে গল্প করে কাটিয়ে দিলাম।

রাত নটা নাগাদ আমরা বেরিয়ে একটা হোটেল থেকে ডিনার সেরে নিলাম (আমাদের হোটেলের খাবারের দাম খুব বেশি হওয়ার কারণেই বাইরে খেতে হল)। রুটি, চিকেন, আলুর দম ইত্যাদি মিলিয়ে খরচ হল ৯৯০/- টাকা। ডিনারের পর হোটেলে ফিরে এসে শুয়ে পড়লাম।

ফ্লাইক্যাচার ইন্‌-এর সামনে আমরা
শুক্রবার ২৯শে মে, ২০২৬ আমাদের বান্ধবগড় ছেড়ে চলে যাওয়ার দিন। সকাল সাতটা নাগাদ আমরা হোটেল থেকে চেক্‌আউট করে বেরোলাম আবার দুটো আর্টিগায় চড়ে। গাড়ি যাওয়ার পথ সেই জঙ্গলের ভিতর দিয়েই - আমাদের ড্রাইভার আমাকে জিজ্ঞেস করল আমাদের গতকালের ঘোরা কেমন হল, গাইড কে ছিল, বাঘ দেখতে পেয়েছি কিনা ইত্যাদি। ড্রাইভারের সঙ্গে গল্প করতে করতে বেশ কিছু কথা জানলাম যেগুলো ঠিক বান্ধবগড় ভ্রমণ সংক্রান্ত না হলেও খুব ইন্টারেস্টিং, তাই এখানে তুলে দিচ্ছি।

বান্ধবগড়ের খুব বিখ্যাত বাঘ ছিল পূজারী - এর এলাকা ছিল খিতাউলি আর পানপাতা জোন। পূজারী খুব পর্যটকবান্ধব বাঘ ছিল, পর্যটকদের সে ভাল ভাল পোজ দিয়ে ছবি দিত। পূজারী দিনে তিনচারবার জলে নেমে চান করত বলে তার ঐ নাম। গত ১১ই মে ২০২৬ আরেকটা অন্য বাঘের সঙ্গে ডুয়েলে সে নিহত হয়। তার বয়স হয়েছিল প্রায় ১০ বছর। এই ডুয়েলের প্রসঙ্গে আমাদের ড্রাইভার বলল যখন একটা বাঘ বড় হয়, তখন তার একটা নিজের এলাকা দরকার হয়। কিন্তু এলাকার পরিমাণ তো সীমিত, তাই সে তখন অন্য কোনও একটা বাঘের এলাকায় ঢুকে পড়ে তার সঙ্গে লড়াই করে। যদি তাকে হারাতে পারে তাহলে সেই বাঘ ঐ এলাকার অধীশ্বর হয়ে বসে। আর প্রথমেই সে করে কী, আগের বাঘের বাচ্চাগুলোকে মেরে ফেলে কারণ সেই বাচ্চারা তার ভবিষ্যতের সম্ভাব্য শত্রু। আমি শুনতে শুনতে বিস্মিত হয়ে গেলাম। জঙ্গলের ভিতরেও তাহলে এই জীবনসংগ্রাম চলে। শুধুমাত্র জন্ম, খাদ্যগ্রহণ, বংশবৃদ্ধি, আর মৃত্যু - এতেই জীবন সীমাবদ্ধ নয়। এদের সমাজ মানুষের থেকে খুব বেশি কিছু আলাদা নয় !

চলতে চলতে একজায়গায় দেখা গেল রাস্তার উপরে একপাল বাঁদর কিসব খুঁটে খাচ্ছে। আমাদের ড্রাইভার বলল পর্যটকরা খেতে দেয় বলেই এই খাবারের লোভে এরা একেবারে রাস্তার উপরে চলে আসে। এই খাবার দেওয়াটা একেবারে ঠিক নয়। এতে এদের লোভ বেড়ে যায়, এরা মনে করে মানুষের কাছে গেলেই খাবার পাওয়া যাবে। জঙ্গলের মধ্যে যেসব গ্রাম আছে সেখানকার মানুষদের এদের এই উপদ্রব সহ্য করতে হয়। একদিন সকালবেলা গ্রামের একজন লোক হয়তো বাড়ির দরজা খুলল, বাইরে একপাল বাঁদর দাঁড়িয়ে। দরজা খোলামাত্র তারা ক্ষিপ্রভাবে ভিতরে ঢুকে নানারকম অপাট করে, জিনিসপত্র খাবার তুলে নিয়ে চলে যায়।

গ্রামের প্রসঙ্গে আলোচনাটা আবার বাঘের দিকে ফিরে গেল। যেহেতু জঙ্গলের ভিতরেই গ্রাম, তাই অনেক সময়েই বাঘ গ্রামের ভিতরে এসে গরু, ছাগল এমনকি মানুষও তুলে নিয়ে যায়। কিছুদিন আগে একদিন রাতে খুব গরম পড়েছিল, তাই একটা বাড়ির লোকেরা ঘরের দরজা খোলা রেখে ঘুমোচ্ছিল। রাতে বাঘ এসে একটা পরিবারের চারজনকেই ঘুমের মধ্যে মেরে রেখে চলে গেছে। মর্মান্তিক কিন্তু প্রাকৃতিক। দুঃখজনক কিন্তু স্বাভাবিক। জীবন এইভাবেই চলে। চলে আসছে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে।

আমরা সকাল আটটা নাগাদ উমারিয়া স্টেশনে পৌঁছলাম। আসার সময়েও গাড়িপিছু ২,০০০/- টাকা লাগল। স্টেশনে এসে আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম নর্মদা এক্সপ্রেসের জন্য। ট্রেন ছাড়ল ৮ঃ৪০ মিনিটে। আমরা এগিয়ে চললাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের দিকে।

সারসংক্ষেপ ঃ

১. বান্ধবগড় টাইগার রিসার্ভ ভারতবর্ষের ৫৮টা টাইগার রিসার্ভের মধ্যে অন্যতম। এখানে গেলে বাঘ দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ১০০%।

২. বান্ধবগড়ে কোনও রেল যোগাযোগ নেই, সবথেকে কাছের রেলস্টেশন উমারিয়া। হাওড়া থেকে উমারিয়া যেতে হলে জব্বলপুরে গাড়িবদল করতে হবে।

৩. উমারিয়া স্টেশনচত্বরটা একেবারেই ফাঁকা, এখানে কোনও টোটো, অটো, গাড়ির স্ট্যান্ড নেই। তাই উমারিয়া থেকে বান্ধবগড় যেতে হলে আগে থেকে গাড়ি বুক করে যাওয়াই ভাল। উমারিয়া থেকে বান্ধবগড় পৌঁছতে এক ঘন্টা মতো লাগে।

৪. বান্ধবগড়ে অনেক হোটেল আছে, তার মধ্যে আমাদের হোটেল 'ফ্লাইক্যাচার ইন' বেশ ভাল। এখানকার খাবারের দাম বেশ বেশি তবে হোটেলের স্টাফদের ব্যবহার খুব ভাল। আমরা MakeMyTrip থেকে এদের বুকিং করেছিলাম। বুকিং-এর ফোন নম্বর 6266403332, 6266663476.

৫. হোটেলে খেতে না চাইলে এখানে মেইন রোডে গেলে বেশ কিছু খাবার হোটেল - রেস্ট্যুরেন্ট আছে। এখানে খাবারের মান ভাল আর দামও সস্তা।

৬. বান্ধবগড়ের এক ও একমাত্র আকর্ষণ টাইগার সাফারি। এই সাফারির বুকিং https://forest.mponline.gov.in/ থেকে আগে থেকে করতে হয় কারণ ওখানে পৌঁছে যাওয়ার পরে বুকিং নাও পাওয়া যেতে পারে।

৭. বান্ধবগড়ের সাফারি সময় সকালে ও বিকালে। বিকালের সাফারিতে বাঘ দেখার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

৮. ১লা জুলাই থেকে ৩০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনমাস বান্ধবগড় ন্যাশনাল পার্ক বন্ধ থাকে। এই সময়ের মধ্যে এখানে যাওয়ার পরিকল্পনা করে লাভ হবে না।

৯. সাফারির বুকিং অনলাইনে করা হলেও সাফারি জিপ আর গাইডের বুকিং বান্ধবগড়ের গেট থেকেই করতে হয়। কোন গেট আর কোন জোন সেটা অনলাইন বুকিং-এর সময়ে নিজেকে ঠিক করে নিতে হবে।

১০. বান্ধবগড় জঙ্গলের প্রধান আকর্ষণ বাঘ হলেও এখানে হরিণ, বাঁদর, ময়ূর ইত্যাদি নানারকম প্রাণীও আছে। আর জঙ্গল ঘন না হওয়ায় ভিতরে অনেকটা দূর পর্যন্ত দেখা যায়।

১১. বান্ধবগড় জঙ্গলের অনেকগুলো জোন আছে, আর প্রত্যেকটার অধীশ্বরই কোনও না কোনও বাঘ। একটা বাঘ একটা ৬০ - ৬৫ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকায় তার বউবাচ্চা নিয়ে বসবাস করে।

১২. জঙ্গলে গেলে কখনওই উজ্জ্বল রঙের পোষাক পরে যাওয়া উচিৎ নয় আর সেইসঙ্গে জিপে বসে উচ্চৈস্বরে কথা বলা বা জোরে জোরে হাসাহাসি করা ঠিক নয়। জঙ্গলে জঙ্গলের নিয়ম চলে, সভ্য সমাজের নয়।

১৩. বান্ধবগড়ে গরম থাকলেও জঙ্গল এলাকা হওয়ায় আর প্রচুর গাছপালা থাকায় ততটা গরম লাগে না। রাতের দিকে আবহাওয়া যাকে বলে মনোরম।

অমরকন্টক ভ্রমণ ঃ

অমরকন্টকে কোনও রেলযোগাযোগ নেই, সবথেকে কাছাকাছি স্টেশন পেন্ড্রা রোড। উমারিয়া স্টেশনটা মধ্যপ্রদেশে কিন্তু পেন্ড্রা রোড ছত্তিশগড়ে। আমাদের ট্রেনের পেন্ড্রা রোড পৌঁছনোর নির্ধারিত সময় ছিল সকাল ১১ঃ২০ আর ট্রেন পৌঁছলো দুপুর ১২ঃ৩০। স্টেশন থেকে বাইরে এসে আমরা আগে থেকে বুক করে রাখা দুটো গাড়িতে উঠে পড়লাম। পেন্ড্রা রোড অবশ্য উমারিয়ার মতো নয়, এখানে স্টেশনের বাইরে রীতিমতো জমজমাট শহর আছে। আর স্টেশনের বাইরে চাইলে গাড়ির ব্যবস্থাও হয়তো করা যেতে পারে। তবে আমরা হোটেল থেকেই গাড়ি বুকিং করেছিলাম।

পেন্ড্রা রোড থেকে অমরকন্টকের দূরত্ব ৩০ কিলোমিটার, যেতে সময় লাগে একঘন্টা মতো। যাওয়ার রাস্তাটার নামও পেন্ড্রা রোড। অমরকন্টক জায়গাটা আবার মধ্যপ্রদেশে তাই পেন্ড্রা রোড থেকে পেন্ড্রা রোড দিয়ে চলতে চলতে আমরা একসময়ে ছত্তিশগড় থেকে আবার মধ্যেপ্রদেশে ঢুকে পড়লাম। এই গাড়ির রাস্তাটা খুব সুন্দর। কিছুক্ষণ সমতলপথে চলার পরে গাড়ি পাহাড়ী পথ ধরল। মধ্যপ্রদেশে এইরকম পাহাড়ী পথ আশা করিনি, তাই বেশ ভাল লাগছিল। আমরা যারা উত্তরবঙ্গ বা সিকিমে গিয়েছি তাদের কাছে পাহাড়ী পথ নতুন নয়, তবে আমার মনে হয় প্রত্যেক জায়গার পাহাড়ের একটা নিজস্ব সৌন্দর্য আছে, তার সঙ্গে বাকিদের তূলনা হয় না। এই পাহাড়ী পথ দিয়ে আমরা ক্রমশই উপরে উঠছিলাম। একসময়ে পৌঁছে গেলাম অমরকন্টকে।

অমরকন্টক শহরটা পাহাড়ের উপরে একটা সমতল জায়গায়। এখানকার প্রধান আকর্ষণ নর্মদা মন্দির আর তার গেট থেকে ২০০ মিটার দূরে আমাদের হোটেল জে পি প্যালেস। আমাদের গাড়ি হোটেলে পৌঁছে দিল এবং গাড়িপিছু ১,৭০০/- টাকা লাগল। দুপুর দেড়টা বেজে গেছে। এই হোটেলে রান্নার ব্যবস্থা নেই তবে এদের অর্ডার দিলে এরা বাইরে থেকে খাবার আনিয়ে দিতে পারে। হোটেলে রান্নার ব্যবস্থা না থাকলেও খাওয়ার ব্যবস্থা আছে অর্থাৎ চেয়ার-টেবিল, থালা-বাটি-চামচ সবই আছে। আমরা চেক্‌ইন করে খাবারের অর্ডার দিয়ে দিলাম। এবং - এখানেও নিরামিষ। আমিষ পাওয়া যায় কিনা জিজ্ঞেস করাতে রিসেপশনের ছেলেটি বলল - ইঁহা দূর দূর তক্‌ আপকো ননভেজ নেহি মিলেগা। বুঝলাম সেই একই ধর্মীয় কারণ। (পরে জেনেছিলাম ধর্মীয়স্থান হওয়ার কারণে অমরকন্টককে মধ্যপ্রদেশ সরকার অনেকবছর আগেই নিরামিষ শহর বলে ঘোষণা করেছে) দুপুর আড়াইটে নাগাদ খাবার এসে গেল আর আমরা হোটেলের তিনতলার ডাইনিং হলে গিয়ে খেয়ে নিলাম। রান্না ভাল। ভাত, ডাল, আলুভাজা, পনীর, মিক্স ভেজ, মাসরুম ইত্যাদি নিয়ে মোট খরচ পড়ল ২,৭৭৫/- টাকা।

দুপুরে খাওয়ার পর ঘরে গিয়ে একটু বিশ্রাম নেওয়া হল। ঘরগুলো বেশ ভাল এবং এদের পরিষেবাও বেশ ভাল। বিকেল ছটার একটু পরে হোটেল থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে প্রথমে গেলাম নর্মদা মন্দিরে।

নর্মদা উদ্‌গম স্থান
নর্মদা মন্দির - অমরকন্টকের সবথেকে বড় আকর্ষণ হল নর্মদা মন্দির। মন্দিরের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকে একটু এগিয়ে একটা পাঁচিল ঘেরা চত্বর রয়েছে, মন্দিরগুলো সব এর ভিতরে। এই ঘেরা জায়গাটার বাইরে জুতো খুলে আমরা ভিতরে ঢুকলাম। ভিতরে ঢুকে প্রথমেই যেটা চোখে পড়ে সেটা হল একটা পাড়বাঁধানো চৌকো জলাশয়। এর নাম 'নর্মদা উদ্‌গম স্থান' বা নর্মদা কুন্ড আর পুরাণমতে এটাই নর্মদা নদীর উৎস। এই নর্মদা কুন্ডের মধ্যে দুটো মন্দির আছে যার কিছুটা জলের মধ্যে ডুবে আছে।

নর্মদা মন্দির
জলাশয়টা ঘিরে অনেকগুলো মন্দির। আমরা জায়গাটা ভাল করে ঘুরে দেখলাম। এখানে যেটা চোখে পড়ে সেটা হল এখানকার সাদা রঙের আধিক্য। মন্দির, জলাশয়ের পাড়, পুরো চত্বরের মেঝে সবই সাদা রঙের। সবমিলিয়ে দেখতে খুব সুন্দর লাগে। আর সবজায়গাটাই খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। পুরো জায়গাটা ঘিরে যে পাঁচিল আছে তার ভিতরের দেওয়ালে নানারকম পৌরাণিক ঘটনা খোদাই করে আঁকা আছে।

জলের মধ্যে মন্দির
দিদি আর আনন্দদা নর্মদা কুন্ডে পুজো দিল। এই পুজো দেওয়ার ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং - যেহেতু মন্দিরের কিছুটা জলের মধ্যে ডুবে আছে তাই পুজো দেওয়ার জন্য মন্দিরের লাগোয়া ঘাটের সিঁড়ির ধাপে বসে জলের মধ্যে পা ডুবিয়ে পুজো দিতে হয়। ঠাকুরের বিগ্রহের বেদিটা জলের মধ্যে যদিও ঠাকুর জলের উপরেই।








মন্দিরের পাঁচিলের বাইরে এসে দাঁড়িয়ে আছি এমন সময়ে একজন পূজারী গোছের লোক একটা ধামা ভর্তি প্রসাদ বিতরণ করতে শুরু করলেন। প্রসাদ হল ঘিয়ে ভাজা রসে চপচপে গরম মিহিদানা। যে যতটা পারে খেতে পারে তবে নেওয়ার কোনও পাত্র নেই। অগত্যা দুহাত জোড়া করে আঁজলায় যতটা সম্ভব নিলাম। স্বাদ? অ-পূ-র্ব ! আমার ঈশ্বরবিশ্বাসের স্তর যেমনই হোক, এইজাতীয় প্রসাদ খেতে আমি সবসময়েই ভীষণ ভালবাসি, বিশেষতঃ সেটা যদি বিনামূল্যে পাওয়া যায় ! আমাদের মহারাষ্ট্র ভ্রমণের সময়ে শিরডির সাঁইবাবার মন্দিরে গিয়ে অনেকটা এইরকমভাবেই সুস্বাদু ঘিয়ের লাড্ডু পেয়েছিলাম।

আমাদের আর বিশেষ কিছু দেখার নেই কারণ অমরকন্টকের সাইটসিয়িংটা পরেরদিনের জন্য রাখা আছে। আমরা মন্দির থেকে বেরিয়ে পাশেই একটা রেলিং দিয়ে ঘেরা বেশ বড় প্রায় গোলাকার দীঘির পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। এর নাম ইন্দ্রদমন লেক। পুরাণমতে এর জল নর্মদা নদীর জলের একটা অন্যতম উৎস। আমরা ইন্দ্রদমন লেকটাকে ঘিরে গোলাকার পথে হাঁটতে শুরু করলাম। অমরকন্টকের উচ্চতা প্রায় ৩,৫০০ ফুট, তাই এখানে সন্ধ্যেবেলা গরম খুব একটা লাগছিল না। ঠান্ডা বলা চলে না বরং আরামদায়ক আবহাওয়া বললে ঠিক বলা হয়।

লেকের অন্যদিকে নর্মদা নদীর পাড়। এখানে নদীটা হঠাৎ করে খানিকটা চওড়া হয়ে গেছে। নদীর পাড় সুন্দরভাবে বাঁধানো আর ধাপে ধাপে জলে নেমে যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। নদীর পাড়ে ছোট ছোট ঘুমটি ঘর। বুঝলাম নর্মদা নদীতে চান করার পরে জামাকাপড় বদলানোর জন্য এই ঘরগুলো তৈরি করা হয়েছে। নদীর উল্টোপাড়ে কয়েকজন লোক প্রদীপজাতীয় কিছু জ্বালিয়ে নদীতে ভাসিয়ে দিচ্ছে। আরও কিছুটা পিছনে কয়েকটা দোকান রয়েছে। এখানে বসে থাকতে বেশ ভালই লাগছিল।

আধঘন্টা পরে আমরা উঠে নদীর উপরের ব্রীজটা পেরিয়ে ওপারে গেলাম। এখানে অনেক দোকানপাট আছে, বেশিরভাগই নামারকম উপহারসামগ্রীর। এখানে কিছু কেনাকাটা করে আমরা হোটেলে ফিরে এলাম।

হোটেলে এসে ডিনারের অর্ডার দেওয়া হল। ভাত, ডাল, রুটি, তরকারী ইত্যাদি নিয়ে খরচ পড়ল ৭৪৫/- টাকা।

আমরা যখন বসে বসে খাচ্ছি, একটা বেশ মজার ব্যাপার ঘটল। আমাদের খাবার জায়গার পাশেই হোটেলের রান্নাঘর, সেখানে গ্যাস ফ্রিজ বাসন এইসব রাখা আছে। সেখান থেকে হঠাৎ ডিমভাজার গন্ধ আমাদের নাকে ভেসে এল। প্রথমে ব্যাপারটাকে অত গুরুত্ব দিইনি, কিন্তু তারপর খেয়াল করলাম এখানে তো ওই গন্ধ থাকার কথা নয়। বুঝলাম যতই নিরামিষ শহর হোক, এরা দিব্যি লুকিয়ে লুকিয়ে ডিম খায় ! দেখে শুঁকে মজা লাগল, খারাপও লাগল। জোর করে নিয়ম করে কি মানুষের খাদ্যাভ্যাস বদলানো যায়, না যাওয়া উচিৎ? "আর কবে, আর কবে চিত্ত স্বাধীন হবে?"

হোটেলের খাওয়ার জায়গা থেকে বাইরের দৃশ্য
পরেরদিন শনিবার ৩০শে মে, ২০২৬ - আমাদের অমরকন্টকের সাইটসিয়িং ও বাড়ি ফেরার দিন। সকালে বেরোনোর আগে একবার খাওয়ার জায়গাটায় গেলাম। আমাদের হোটেলটার অবস্থান খুব সুন্দর। অমরকন্টক এমনিতেই একটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা জায়গা। আমাদের হোটেলের খাবার জায়গাটার চারদিক খোলা, এখান থেকে নর্মদা মন্দির, দূরে পাহাড়ের সারি, গাছপালা সবই দেখা যায়। এই হোটেলের পরিবেশের সঙ্গে আমাদের আগেরবার মধ্যপ্রদেশ ভ্রমণের পাঁচমারির হোটেলের পরিবেশের মিল আছে। নস্টালজিয়া যাকে বলে !

সকাল নটা নাগাদ হোটেল থেকে চেক্‌আউট করে মালপত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। কালকের দুটো গাড়িই এসেছিল। আমরা প্রথমে অমরকন্টকের সাইটসিয়িং করব আর তারপর গাড়ি আমাদের পেন্ড্রা রোড স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে আসবে। এর জন্য গাড়িপিছু খরচ ৪,০০০/- টাকা।

মাই কী বাগিয়া - তিন-চার মিনিট চলার পর আমাদের গাড়ি থামল আমাদের প্রথম গন্তব্য - মাই কী বাগিয়া-তে। এটা নর্মদা মাতার বাগান। এখানে গুল্বকৌলি ফুল ফোটে যা নর্মদা মন্দিরে পুজোর কাজে ব্যবহৃত হয়। এই গুল্বকৌলি ফুল চোখের ওষুধ তৈরিতেও ব্যবহার করা হয়।

মাই কী বাগিয়ার ভিতরে
যেহেতু অমরকন্টক পাহাড়ী এলাকা, তাই এখানে কোনওকিছুই সমতলে নয়। রাস্তা থেকে কয়েকধাপ সিঁড়ি দিয়ে নেমে একটা মন্দির আছে। মন্দিরের পাশ দিয়ে একটা রাস্তা চলে গেছে। সেই রাস্তায় আবার একটা পায়ে চলার সেতু আছে। সেতু পেরিয়ে ওপারে গেলে পাহাড়ের মধ্যে আরও এগিয়ে যাওয়া যায়। এখানে বাঁদরের খুব উৎপাত আর এরা সংখ্যায়ও অনেক। এবং তার ফলে এরা অনায়াসে মোবাইল, চশমা ইত্যাদি নিয়ে পালায়। কাজেই মাই কী বাগিয়াতে 'বাঁদর হইতে সাবধান' ! আমরা এখানে কিছুক্ষণ থেকে চলে এলাম।

সোনমূড়ায় সোনাক্ষি শক্তিপীঠ মন্দির
সোনমূড়া - মাই কী বাগিয়া থেকে মিনিট পাঁচেক পাহাড়ী পথে চলার পরে পৌঁছলাম সোনমূড়ায়। সোনমূড়া হল শোন নদীর উৎসস্থল। গাড়ি আমাদের যেখানে নামিয়ে দিল সেখান থেকে সিঁড়ি দিয়ে কয়েক ধাপ নামার পর ডানদিকে একটা আলাদা রাস্তা নেমে গেছে, সেখানে একটা মন্দির। এই মন্দিরের নাম সোনাক্ষি শক্তিপীঠ মন্দির। মন্দিরের দিকে না গিয়ে প্রধান সিঁড়িটা দিয়ে অনেকগুলো ধাপ নেমে একটা ভিউ পয়েন্টে পোঁছতে হয়। নামার পথে আমাদের পাশ দিয়ে একটা সরু জলের ধারা পাহাড়ের ধাপে ধাপে নিচে নেমে যাচ্ছে, এটাই শোন নদী।

সোনমূড়ার ভিউ পয়েন্ট
ভিউ পয়েন্টে যেতে হলে আবার মাথাপিছু ১০/- টাকা লাগে। এখানে একটা গ্লাস প্ল্যাটফর্ম আছে অর্থাৎ একটা স্বচ্ছ কাচের তৈরি পাটাতন যার ভিতর দিয়ে নিচটা স্পষ্ট দেখা যায়। প্ল্যাটফর্মের রেলিংটাও কাচের। প্ল্যাটফর্মে জুতো পরে ওঠা যাবে না কারণ তাতে প্ল্যাটফর্মটা নোংরা হয়ে যাবে আর তাহলে এর আসল মজাই নষ্ট। রোদের তাপে কাচ গরম হয়ে যাচ্ছে বলে এরা মাঝেমাঝেই প্ল্যাটফর্মে বালতি করে জল ঢালছে। আমরা প্ল্যাটফর্মে গিয়ে ছবি তুললাম। এখান থেকে ভিউ অসাধারণ। সামনে তিনদিকে দিগন্তবিস্তৃত পাহাড়ের সারি আর পায়ের ঠিক নিচেই একটা সরু জলের ধারা উপর থেকে নিচে পড়ে শোন নদীর সৃষ্টি করছে। এখান দাঁড়াতে বা দাঁড়িয়ে নিচের দিকে দেখতে অনেকেরই অস্বস্তি হয় কারণ পাটাতনটা কাচের। এর উপরে দাঁড়ালে মনের মধ্যে যে একটা থ্রিলিং ব্যাপার কাজ করে সেটা অস্বীকার করব না।

একটু পরে আমরা আবার উপরে উঠে এলাম। এখানে কয়েকটা খাবারের দোকান আছে। সেখান থেকে বঢ়া, ম্যাগী ইত্যাদি অল্প করে খেয়ে নেওয়া হল। তারপর গাড়িতে উঠে এগিয়ে চললাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের দিকে।

শ্রী যন্ত্র মন্দিরের গেট
শ্রী যন্ত্র মন্দির - সোনমূড়া থেকে গাড়িতে ২-৩ মিনিট চলার পরে পৌঁছলাম শ্রী যন্ত্র মন্দিরে। গাড়িটা মন্দিরের মেইন গেটের পাশেই দাঁড়ালো। মন্দিরের ভিতরে বর্তমানে নির্মাণের কাজ চলছে বলে ভিতরে ঢোকা যাবে না, তাই আমরা বাইরে থেকে গেটটাই দেখলাম। গেটটা খুবই সুন্দর - সত্যি বলতে কী, এরকম গেট আমি আগে কখনও দেখিনি। গেটের মাথায় চারদিকে চারজন দেবীর মুখ - লক্ষ্মী, সরস্বতী, কালী আর ভুবনেশ্বরী দেবী। এদের নিচে ধাপে ধাপে গেটটা মাটিতে নেমে এসেছে আর এই ধাপের মধ্যেও চারদিকে রয়েছে ৬৪ জন যোগিনী আর কার্ত্তিক ও গণেশ মূর্তি। মন্দিরের ভিতরে না যেতে পারলেও গেটটা দেখেই মন ভরে গেল।

কলাচুরীর মন্দির
কলাচুরীর প্রাচীন মন্দির - 

টিকিট ঃ মাথাপিছু ২০/- টাকা (ছোটদের লাগে না)

শ্রী যন্ত্র মন্দির থেকে মিনিট পাঁচেক গাড়ি চলার পর এসে পোঁছলাম কলাচুরী মন্দিরের সামনে। প্রকৃতপক্ষে আমরা একটা চক্রাকার পথে ঘুরে আবার আমাদের হোটেলের কাছেই পৌঁছে গেলাম কারণ এই কলাচুরী মন্দিরের গেটটা একেবারে নর্মদা মন্দিরের গেটের বিপরীত দিকে। কলাচুরী মন্দিরের রক্ষনাবেক্ষণের দায়িত্ব ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের। এখানে ঢোকার টিকিট শুধুমাত্র QR Code স্ক্যান করে UPI-এর সাহায্যেই কাটা যায়, কোনও নগদ লেনদেনের সুযোগ নেই। যাই হোক, টিকিট কেটে আমরা ভিতরে ঢুকলাম। কাউন্টারের ভদ্রলোক বলেই দিলেন এখানে কোনও মন্দিরে কোনও পুজো হয় না তাই জুতো খোলার কোনও ব্যাপার নেই। আমার এই জাতীয় মন্দিরই সবথেকে বেশি প্রিয়, এখানে ভক্তির বাড়াবাড়িটা থাকে না আর সেই কারণে মন্দির নিয়ে যে ব্যবসা চলে, সেটাও এখানে নেই।

কর্ণ মন্দির
কলাচুরী মন্দিরের পাঁচিলের ভিতরে একাধিক মন্দির রয়েছে। এগুলো হল - পঞ্চমাতা মন্দির, জুহিলা মন্দির, শিব মন্দির, পাতালেশ্বর মন্দির ও কর্ণ মন্দির। মন্দিরগুলো কোনও একসময়ে তৈরি নয়, আলাদা আলাদা সময়ে তৈরি। এগুলোর স্থাপত্য আর কারুকার্যও আলাদা। সেওলো দেখে তার ইতিহাস বা ঐতিহাসিক গুরুত্ব বোঝার সাধ্য আমাদের নেই, তবে এইসব মন্দিরের গায়ের ভাস্কর্য দেখতে একদিকে যেমন খুব ভাল লাগে অন্যদিকে বিস্ময়ও জাগে। পঞ্চমাতা মন্দিরের ঠিক পাশেই একটা ছোট পুকুর রয়েছে যেটার আকৃতি পুরোপুরি চৌকো। পুকুরের পাড়টা বাঁধানো। সবমিলিয়ে আমরা এখানে মিনিট চল্লিশ মতো কাটালাম।

দুপুর সাড়ে বারোটা বাজে, তাই এরপর লাঞ্চ। আমাদের সকালে ব্রেকফাস্টে সেরকম কিছু খাওয়া হয়নি, তাই একটু তাড়াতাড়িই লাঞ্চ করে নেওয়া হল। গতকাল সন্ধ্যেবেলা যেখানে কেনাকাটা করতে গিয়েছিলাম, আজ সেই এলাকাতেই লাঞ্চ করার জন্য ড্রাইভার নিয়ে গেল। অমরকন্টক শহরটা যে কত ছোট, সেটা বুঝতে পারলাম। এখানকার বাজার, দোকান, হোটেল - সবই এই একটা জায়গাতেই। অথচ শহরটা যে নতুন তা কিন্তু নয়, অনেক পুরনো। তবে এতদিনেও এখানে খুব বেশি মানুষ থাকে না, তা সে যে কারণেই হোক।

লাঞ্চে নিরামিষ থালি আর ধোসা খাওয়া হল। সবমিলিয়ে খরচ পড়ল ১,১১০/- টাকা। লাঞ্চের পরে আমরা আমাদের সাইটসিয়িং-এ এগিয়ে চললাম। অনেকক্ষণ ধরেই মেঘ করে ছিল, এবার একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেল। পরের জায়গাটা আগেরগুলোর মতো এত কাছাকাছি নয়। গাড়ি করে প্রায় মিনিট কুড়ি চলার পরে পৌঁছলাম আমাদের গন্তব্যে।

কপিলধারা ফল্‌স্‌ যাওয়ার ব্রীজ
কপিলধারা ফল্‌স্‌ - আমাদের গাড়ি যেখানে নামিয়ে দিল, সেখান থেকে কপিলধারা ফল্‌স্‌ হেঁটে কুড়ি মিনিট মতো লাগে। একটা বড় গেটের ভিতর দিয়ে ঢুকে আমরা এগিয়ে চললাম। হাঁটার পথটা বেশ সুন্দর, গাছপালা ঘেরা। একপাশ দিয়ে পাথরের মধ্যে দিয়ে নর্মদা নদীর ক্ষীণ ধারা বয়ে চলেছে। এখানেও অনেক বাঁদর রয়েছে আর তাদের না ঘাঁটানোই ভাল। আমি অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি বাঁদরদের সতর্কভাবে উপেক্ষা করাটাই এদের উপদ্রব থেকে বাঁচার সবথেকে ভাল উপায়। অর্থাৎ নিজেকে সতর্ক থাকতে হবে আর এদের উপস্থিতিকে উপেক্ষা করতে হবে। চলতে চলতে আমাদের ডানদিকে নর্মদার জলধারার উপর একটা হাঁটা-ব্রীজ পড়ল, ব্রীজটা দেখতে খুব সুন্দর। এই ব্রীজ পেরিয়ে রাস্তাটা নিচে নেমে গেছে, সেখান থেকেই দেখা যায় কপিলধারা ফল্‌স্‌। তবে যারা নিচে নামতে চায় না, তাদের জন্য উপর থেকেও দেখার সুযোগ আছে - আর এখানেও রয়েছে একটা গ্লাস প্ল্যাটফর্ম।

কপিলধারা ফল্‌স্‌
নিচে নামতে শুরু করলাম। নিচে নামা মানে অনেকটা নিচে নামা। প্রথমে অনেকগুলো সিঁড়ি আর তারপর বেশ কিছুটা পাথরের উপর পা দিয়ে নামা। পাথরে পাথরে পা দিয়ে যেখানে গিয়ে পৌঁছলাম সেখান থেকে ঝর্ণাটা খুব সুন্দরভাবে দেখা যায়। বলা বাহুল্য, নদীটা নর্মদা। নদীর গতিপথে এটাই প্রথম জলপ্রপাত। নদী এখানে বেশ অনেকটা উপর থেকে খাড়া পথে একেবারে সোজাসুজি নিচে পাথরের উপর পড়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এখন গরমকাল বলে জলপ্রপাতের জোর খুব বেশি নয় কিন্তু আশেপাশের পাথর দেখেই বোঝা যায় বর্ষাকালে এই জলপ্রপাতই বড়সড় আকার ধারণ করে। যেখান দিয়ে জল পড়ছে তার ঠিক পিছনে পাথরের দেওয়ালে একটা সুবিশাল গণেশের ছবি আঁকা আছে। ছবিটা এতই সুন্দর যে দিব্যি একটা ত্রিমাত্রিক চেহারা নিয়েছে। আমরা এখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ফিরে এলাম।


দুধধারা ফল্‌স্‌ যাওয়ার পথে
দুধধারা ফল্‌স্‌ - কপিলধারা ফল্‌স্‌ থেকে পাথরের উপর পা দিয়ে ফিরে এসে যেখান থেকে সিঁড়ি শুরু সেখানে সিঁড়ি দিয়ে না উঠে বাঁদিকে গেলে দুধধারা ফল্‌স্‌। এখানে একটা সাইনবোর্ডে সেটা উল্লেখও করা আছে। আমি, কথা, কলি আর নন্দিনীদি সেদিকে হাঁটতে শুরু করলাম। রাস্তাটা পায়ে চলা পথ আর প্রায় সমতল ঢালুভাবে নিচের দিকে নেমে গেছে। কোনও কোনও জায়গায় দুতিন ধাপ পাথরের সিঁড়ি রয়েছে। উপর থেকে নিচে নেমে কপিলধারা ফল্‌স্‌-এ যাওয়ার রাস্তাটা যতটা দুর্গম, দুধধারা ফল্‌স্‌-এর রাস্তা তার থেকে অনেক বেশি সুগম। যদি কেউ কপিলধারা দেখতে নামে, তাহলে তার দুধধারা অবশ্যই দেখতে যাওয়া উচিৎ।

দুধধারা ফল্‌স্‌ যাওয়ার রাস্তাটা অপূর্ব। আমরা ছাড়া আমাদের কাছাকাছি আর কোনও দর্শনার্থী নেই, আর আমরা নিজেরাও ইচ্ছাকৃতভাবেই চুপচাপ হাঁটছি। আমাদের বাঁদিকে পাথরের উপর দিয়ে কুলকুল শব্দে বয়ে চলেছে নর্মদা নদী, অনেকটা উপর থেকে নেমে এখানে তার গতি কিছুটা বেশি। সেইসঙ্গে নাম-না-জানা পাখির ডাক। আর গাছপালার মধ্যে ঝিঁঝির ডাক। সবমিলিয়ে এক অপার্থিব সৌন্দর্য।

দুধধারা ফল্‌স্‌
একেবারে নিচে কয়েকধাপ সিঁড়ি আছে, সেটা দিয়ে নামলে দুধধারা জলপ্রপাতটা দেখা যায়। এখানে জলের ধারা ঘন হয়ে দুধের মতো সাদা হয়ে যায়, তাই এই নাম। জলের উচ্চতা এখানে খুব বেশি নয়, ছ'সাত ফুট হবে। এখানে পাশেই একটা মন্দির আছে সেটা আসলে মহর্ষি দুর্বাশার গুহা।


জলধারার মাঝে
দুধধারা দেখে আমরা পাথরের উপর পা দিয়ে নর্মদার জলের ধারার মাঝখানে গেলাম। ঝর্ণার জলে প্রচুর মিনারেলস্‌ থাকে, তাই এটা খাওয়া স্বাস্থ্যকর। আঁজলা করে এই জল খেলে আর সেইসঙ্গে চোখে-মুখে-ঘাড়ে এই জল দিলে শরীরটা অনেক বেশি তরতাজা লাগে। আমরা তাইই করলাম। তারপর ফেরার পথ ধরলাম। নামার সময়ে দেখেছিলাম এক জায়গায় লেবুর শরবৎ বিক্রি হচ্ছে। ক্লান্তিতে লেবু জিনিসটা ম্যাজিকের মতো কাজ করে তাই চারজনেই এক-দু গ্লাস করে খেয়ে নিলাম। তারপর বাকিটা হেঁটে উঠতে কষ্ট কম হল।

উপরে উঠে হাঁটতে হাঁটতে আবার বৃষ্টি শুরু হল। বৃষ্টির স্থায়িত্ব বেশিক্ষণ নয়, একজায়গায় মিনিট পাঁচেক অপেক্ষা করতে হল। তারপর গাড়িতে এসে উঠলাম।

অরন্ডী মন্দিরের পাশে মাধব সরোবর
অরন্ডী মন্দির - গাড়ি করে প্রায় পনেরো মিনিট চলার পরে পৌঁছলাম অরন্ডী মন্দিরে। এই জায়গাটা প্রকৃতপক্ষে একটা বেশ বড় হ্রদ - এর নাম মাধব সরোবর। নর্মদা নদীর সঙ্গে এখানে অরন্ডী নদী মিলিত হয়েছে তাই এই জায়গাটাকে অরন্ডী সঙ্গমও বলা হয়ে থাকে। সরোবরটা খুব সুন্দর। এর পাড়ে বসে দেখতে খুব ভাল লাগছিল। বিকেল সাড়ে তিনটে বাজে, আকাশে রোদ আর মেঘের খেলা। আলোটা খুব সুন্দরভাবে হ্রদে পড়েছে। আমরা এখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে মন্দিরে ঢুকলাম।

মন্দিরের একতলায় বা ভূগর্ভে
মন্দিরটা দেখতে সুন্দর। মন্দিরের ভিতরে ঢুকে কোনও ঠাকুর নেই, একপাশে একটা রেলিং-এর পাশ দিয়ে নিচে নেমে যাওয়ার সিঁড়ি আছে। কয়েকধাপ নিচে নেমে মন্দিরের আসল গর্ভগৃহটা দেখতে পেলাম। সেখানে রাম-সীতা-লক্ষণের মূর্তি আছে। এছাড়া আরও কয়েকটা মূর্তি রয়েছে, তবে সেগুলো কোনও ঠাকুরদেবতার নয়, গুরুস্থানীয় কারোর। মন্দিরে কোনও পূজারী নেই, তাই আর কোনও কথা জানা গেল না। এই ঘরটায় যাওয়ার জন্য সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে হলেও এটাকে ঠিক মাটির নিচের ঘর বলা যায় না কারণ এর একপাশে দুটো জানালা রয়েছে আর সেখান দিয়ে দিনের আলো আসছে। জানালার পাশেই উঁচু জমি। আসলে পাহাড়ের পাশের ঘর এরকমই হয় - সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলে নিচটা একতলা আর উপরে উঠলে উপরটাও একতলা।

আমরা গাড়িতে উঠলাম আর বেশ জোরে বৃষ্টি শুরু হল। এরপরের গন্তব্য অমরেশ্বর মন্দির। জায়গাটা বেশ কিছুটা দূরে, পৌঁছতে প্রায় আধঘন্টা লাগল। কিন্তু শেষের কিছুটা রাস্তায় কাজ হচ্ছে বলে রাস্তা বন্ধ। যেখানে কাজ হচ্ছে তার পাশে একটা সঙ্কীর্ণ পথ রয়েছে যেটা ইঁট-সুরকির আর এই বৃষ্টির মধ্যে সেই রাস্তা দিয়ে গাড়ি নিয়ে যাওয়া নিরাপদ নয়, তাই এই পয়েন্টটা দেখার আশা ত্যাগ করতে হল। আমরা যে পথে গিয়েছিলাম সেই পথেই আবার ফিরতে শুরু করলাম।

ফেরার সময়ে বৃষ্টি আরও বাড়ল। এবারে একেবারে সাদা হয়ে পড়ছে, সামনে ৩০-৪০ মিটারের বেশি দেখা যাচ্ছে না। পাহাড়ী পথে ফাঁকা রাস্তায় বৃষ্টি এমনিতেই বেশি বলে মনে হয়। এইভাবে মিনিট কুড়ি চলার পর আমরা পৌঁছলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যে।

জৈন মন্দির
সর্বোদয় দীগম্বর জৈন মন্দির - জৈন মন্দিরে যখন গাড়ি পৌঁছলো, তখন বৃষ্টিটা থেমে গেছে যদিও আকাশ দেখে মনে হচ্ছে আবার বৃষ্টি আসবে। মন্দিরের চত্বরটা বিশাল আর একেবারে মূলমন্দিরের ভিতরে ছাড়া বৃষ্টি এলে দাঁড়াবার আর কোনও জায়গা নেই। তাই আমরা যতটা সম্ভব পা-চালিয়ে মন্দিরটা দেখতে গেলাম। মন্দিরের সামনে একটা ১৩ তলা উঁচু স্তম্ভের মতো রয়েছে, দেখে মনে হয় সেটার ভিতরে সিঁড়ি দিয়ে একেবারে উপরে ওঠার ব্যবস্থা আছে। তবে সেই ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে সাধারণ মানুষের জন্য নয়। স্তম্ভটা পেরিয়ে এগিয়ে গেলে মূল মন্দিরটা পড়ে। চত্বরের মেঝেটা মার্বেলের আর বৃষ্টির জলে সেটা প্রচন্ড পিছল হয়ে আছে তাই খুব সাবধানে পা ফেলে চলতে হচ্ছিল। মন্দিরের চূড়োর চারদিকে ভারা করা আছে, দেখে বুঝলাম হয় তৈরির কাজ চলছে না হয় মেরামতির। মন্দিরটা বেশ সুন্দর। এখানে প্রথম জৈন তীর্থঙ্করের মূর্তি রয়েছে।

আমরা মন্দির দেখে যখন বেরোচ্ছি তখন আবার ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হল। আমরা যতটা সম্ভব দ্রুত ফেরার চেষ্টা করলেও শেষরক্ষা হল না, গাড়িতে ওঠার আগেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল। বাধ্য হয়ে একটা চায়ের দোকানে আশ্রয় নিলাম। বৃষ্টি থামলে গাড়িতে গিয়ে উঠলাম।

দুর্গাধারা ফল্‌স্‌
দুর্গাধারা ফল্‌স্‌ - জৈন মন্দির থেকে পনেরো মিনিট মতো পাহাড়ী পথে নামার পরে পড়ল আমাদের অমরকন্টক তথা মধ্যপ্রদেশ ভ্রমণের শেষ পয়েন্ট - দুর্গাধারা ফল্‌স্‌ (অবস্থানগতভাবে দুর্গাধারা ফল্‌স্‌কে মধ্যপ্রদেশ ভ্রমণের মধ্যে ফেলাও যায় না কারণ এর অবস্থান ছত্তিশগড় রাজ্যে)। এখানে যখন পৌঁছলাম আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমি, অমৃতা আর দিদি গাড়ি থেকে নেমে ফল্‌স্‌টা দেখতে গেলাম। সৌভাগ্যক্রমে সামান্য একটু গেলেই ফল্‌স্‌টা দেখা যায়, বেশিদূর হলে বৃষ্টির মধ্যে দেখতে যাওয়া সম্ভব হত না। ফল্‌স্‌টা বেশ সুন্দর আর জলের ধারাও বেশ জোরালো। জল কিছুটা ধূসরবর্ণের - আন্দাজ করলাম জলের সঙ্গে মাটি মিশে আছে। বৃষ্টি বাড়ছিল, গাড়িতে ফিরে আসতে আসতে অনেকটাই ভিজে গেলাম।




এরপর ঘরে ফেরার পালা। এবার পেন্ড্রা রোড দিয়ে পেন্ড্রা রোডে পৌঁছলাম। রাস্তায় বৃষ্টিটা থেমে গেলেও স্টেশনে যখন পৌঁছলাম তখন আবার ঝিরঝির করে শুরু হয়েছে। আমরা কোনওমতে গাড়ি থেকে নেমে মালপত্র নিয়ে স্টেশনে ঢুকে পড়লাম। স্টেশনে কিছু বিস্কুট - চিপসের দোকান থাকলেও এখানে ডিনার কেনার মতো কোনও দোকান নেই অর্থাৎ ডিনারের খাবার ট্রেন থেকেই কিনতে হবে। স্টেশনে যখন বসে আছি, তখন আবার একদফা মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল। স্টেশনের শেডের নিচে বসে বা দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখতে আমার দারুণ লাগে। সন্ধ্যে সাড়ে ছটা বাজে, আকাশ মেঘে ঢাকা তাই আর দিনের আলো নেই। গরম একেবারেই লাগছিল না, স্টেশনের পরিবেশটা খুব ভাল লাগছিল।

আমাদের ফেরার ট্রেন উদয়পুর সিটি - শালিমার সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস আসার কথা সন্ধ্যে ৭ঃ৪০ মিনিটে, সে এল আধঘন্টা দেরিতে। আমরা ট্রেনে উঠলাম। ট্রেনে ডিনারে আমিষের একমাত্র অপশন এগ থালি, তাইই নিয়ে নেওয়া হল। দুটো করে ডিম দিয়ে এগথালির দাম ১৪০/- টাকা।

পরেরদিন রবিবার ৩১শে মে, ২০২৬ - আমাদের ট্রেনের সাঁত্রাগাছি পৌঁছনোর নির্ধারিত সময় সকাল ৯টা হলেও ট্রেন পৌঁছল দুপুর ১ঃ৩০ মিনিটে (দক্ষিণ-পূর্ব রেলওয়ের এই বিপুল দেরিটা নিয়ে বোধহয় এখন আর কেউই মাথা ঘামায় না !)। ভ্রমণ শেষ !

সারসংক্ষেপ ঃ

১. অমরকন্টকের কোনও রেলযোগাযোগ নেই, সবথেকে কাছের স্টেশন পেন্ড্রা রোড। শালিমার থেকে সপ্তাহে দুদিন পেন্ড্রা রোড যাওয়ার ট্রেন চলে। এছাড়া বিলাসপুর বা রায়পুর থেকে ব্রেকজার্ণি করেও পেন্ড্রা রোড পৌঁছনো যায়।

২. পেন্ড্রা রোড স্টেশন এলাকাটা জনবহুল আর এখানে গাড়ির স্ট্যান্ডও আছে। আগে থেকে বুক করা না থাকলেও এখান থেকে অমরকন্টক যাওয়ার গাড়ি পাওয়া যায়। পেন্ড্রা রোড থেকে অমরকন্টক গাড়িতে এক ঘন্টা মতো লাগে।

৩. অমরকন্টকে খুব বেশি হোটেল নেই, তবে যা আছে তার মধ্যে জে পি প্যালেস বেশ ভাল একটা হোটেল। আমরা MakeMyTrip থেকে এদের বুকিং করেছিলাম। যোগাযোগের নম্বর - 7000363614.

৪. অমরকন্টক সরকারীভাবে নিরামিষ শহর হিসেবে ঘোষিত। এখানে কোথাও কোনও আমিষ খাবার পাওয়া যায় না।

৫. অমরকন্টকের প্রধান আকর্ষণ নর্মদা নদীর উৎস নর্মদা কুন্ড এবং তৎসংলগ্ন নর্মদা মন্দির। এই মন্দিরটা খুব সুন্দর এবং এর মধ্যে একটা জলাশয় আছে যেটাকে নর্মদার উৎস ধরা হয়। এই মন্দির অবশ্য দ্রষ্টব্য।

৬. অমরকন্টকের অন্যান্য সাইটসিয়িং-এর মধ্যে সোনমূড়া, কলাচুরীর মন্দির, কপিলধারা ও দুধধারা ফল্‌স্‌ অবশ্য দ্রষ্টব্য। কপিলধারা ও দুধধারা যাওয়ার জন্য একটু কষ্ট করতে হবে, কিন্তু করাটা ফলপ্রসূ।

৭. অমরকন্টকে কোনও পাবলিক ট্রান্সপোর্ট চলে না। সাইটসিয়িং-এর জায়গাগুলোর বেশিরভাগই খুব বেশি দূরে না হওয়া সত্ত্বেও ঘোরার জন্য শুধুমাত্র প্রাইভেট গাড়িই ভরসা।

৮. অমরকন্টক জায়গাটা পাহাড়ের উপরে হওয়ায় এখানে গরম তুলনামূলকভাবে কম। গরমকালেও সন্ধ্যের পরে দিব্যি আরামদায়ক তাপমাত্রা।

উপসংহার ঃ

আগেরবার মধ্যপ্রদেশ ঘুরে এসে লিখেছিলাম "শুধুমাত্র আটদিনের পরিসরে একটা রাজ্যের পুরোটা দেখা যায় না, বিশেষ করে সে'রাজ্য যদি হয় মধ্যপ্রদেশ"। এবারে আরও ছ'দিন ঘোরার পরও এটাই বলব আট + ছয় = চোদ্দ দিনেও একটা রাজ্যের পুরোটা দেখা যায় না, বিশেষ করে সে'রাজ্য যদি হয় মধ্যপ্রদেশ। কিন্তু তাও এবারে যা ঘুরেছি আর যে যে জায়গাগুলোতে ঘুরেছি সেগুলো এতটাই নিজস্বতায় ভরা যে আমাদের বেড়ানোটা হয়ে উঠেছে খুবই বৈচিত্রপূর্ণ। উজ্জয়িনী আর অমরকন্টক দুটোই ধর্মীয় স্থান হওয়ায় এদের মধ্যে কিছু কিছু মিল থাকলেও উজ্জয়িনী সমতলে আর অমরকন্টক পাহাড়ী এলাকায়, তাই তাদের মধ্যে অমিলটাই বেশি। উজ্জয়িনীতে মানুষ গিজগিজ করছে আর অমরকন্টক ফাঁকা। দুটো জায়গারই নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। আর বান্ধবগড় তো এদের থেকে একেবারেই আলাদা। বান্ধবগড়ের বাঘ যে শুধু বনের রাজা তাইই নয়, সে এখানকার অর্থনীতির প্রধান নিয়ামক। মধ্যপ্রদেশ যাওয়ার একটা প্রধান অন্তরায় অবশ্যই এর রেলযোগাযোগের সীমাবদ্ধতা কিন্তু আগেরবার যেটা বলেছিলাম, এবারেও সেটাই বলব "সঠিকভাবে পরিকল্পনা করতে পারলে সেটাকেও নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসা সম্ভব"। উজ্জয়িনী, বান্ধবগড় আর অমরকন্টক এই তিনটে জায়গাতেই গিয়ে বুঝেছি এখানে বাঙালি পর্যটক আসে খুব কম। এটাও একটা কারণ এই জায়গাগুলোকে ভালভাবে দেখতে পারার। তাই যদি উজ্জয়িনী-বান্ধবগড়-অমরকন্টককে দেখার ইচ্ছে থাকে, তাহলে একটা পাঁচদিনের ছুটির সঙ্গে দুটো উইক-এন্ড, অল্প কিছু টাকা আর মনে নতুন জায়গা দেখার অনেকটা আগ্রহ নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে এই ভ্রমণের উদ্দেশ্যে !

মধ্যপ্রদেশ ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.