আমি ব্লগ লেখার খুব বেশি সমর্থক কোনওদিনও ছিলাম না, সত্যি কথা বলতে কি এখনও যে আছি তা নয় । তার একটা প্রধান কারণ আমার ধারণা ব্লগ লেখার থেকেও পড়া অনেক বেশি ক্লান্তিকর । অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অনেক সময়ই পড়তে শুরু করে শেষ করা হয়ে ওঠে না । নিজের ধৈর্য এবং/অথবা আগ্রহের অভাবকে 'ঠিক আছে, বাকিটা পরে পড়ব' জাতীয় অজুহাত দিয়ে ঢেকে দিই - আর আমরা সবাই জানি সেই 'পরে' টা আর কখনওই আসে না । তো, এই কারণে আমি ঠিক করেছি আমার ব্লগকে কখনওই অন্যের ক্লান্তির কারণ ঘটাব না, আমার ব্লগের বিষয় হবে প্রধানতঃ ভ্রমণ । আমার মতো যেসব বাঙালিরা ঘুরতে ভালোবাসে, তাদের জন্য আমার ব্লগ হবে তথ্যের একটা উৎস । আমার নিজের একটা অভ্যেস আছে, কোনও জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার আগে সেই জায়গাটা সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, আর ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে আমার বরাবরই মনে হয়েছে যে ইন্টারনেটে লেখালেখি করার ব্যাপারে বাঙালিদের থেকে কুঁড়ে খুব কম শিক্ষিত জাতই আছে । আমার মতো যেসব বাঙালিরা আছে, যারা ইন্টারনেটে কোনো একটা ইংরিজীতে লেখা দেখলেই না পড়ার চেষ্টা করে, তাদের জন্য আমার ব্লগ সহায়ক হবে, এই বিশ্বাস নিয়ে শুরু করছি আমার ভ্রমণকাহিনী । আগেই বলে রাখি, আমি স্ট্যাটিসটিক্সের ছাত্র ছিলাম, তাই আমার ব্লগে তত্ত্বের থেকে তথ্যের দেখাই মিলবে বেশি ।

Sunday, January 25, 2026

দার্জিলিঙ হিমালয়ান রেলওয়ে ভ্রমণ

মার ব্লগে আজ পর্যন্ত যত পোস্ট করেছি, তার সবগুলোই কোনও না কোনও জায়গায় ভ্রমণ নিয়ে। সেখানে গিয়েছি, থেকেছি, সাইটসিয়িং করেছি, ফিরে এসেছি। এই পোস্টটা ব্যতিক্রম। এই প্রথম কোনও পোস্ট করছি শুধুমাত্র একটা জার্ণি নিয়ে - একটা ভ্রমণ পথ নিয়ে। আর এই ভ্রমণ পথের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে অন্য কারুর বা আমার কাজে লাগতে পারে, এটা মাথায় রেখেও এই পোস্টটা করছি না। এটা শুধুমাত্র একটা যাত্রাপথের অভিজ্ঞতার পোস্ট - যে অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে এবারে দার্জিলিঙ যাওয়ার সময়ে। মূলতঃ সেই অভিজ্ঞতা আমার ব্লগের পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্যই আলাদা করে এই পোস্টটা করছি।

কিছুটা অতীতের কথা দিয়েই শুরু করা যাক। আমি জীবনে প্রথম দার্জিলিঙ গিয়েছিলাম ১৯৯২ সালে - অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ৩৪ বছর আগে। তখন আমার বয়স ছিল ৯ বছর। তখন শুধু শুনেছিলাম দার্জিলিঙে টয়ট্রেন নামক একটা ট্রেন চলে। সেবার দার্জিলিঙের রাস্তায় ঘোরার সময়ে টয়ট্রেনের লাইন দেখেছিলাম আর একদিন হঠাৎই দেখতে পেয়ে গিয়েছিলাম টয়ট্রেন - আমাদের থেকে অনেক দূরে পাহাড়ের বেশ কিছুটা নিচের দিকে। ছোটাছুটি করে কোনওমতে একটা ছবি তুলেছিলাম (এখনকার দিনের মতো ডিজিট্যাল ক্যামেরা নয়, তখনকার দিনের ফিল্ম ক্যামেরা যাতে এক-একটা ছবি হিসেব করে তুলতে হত)। সেবারেই মতো এইটুকুই। এবারে আগে ২০১৪ সালে যখন দার্জিলিঙ গিয়েছি, তখন এই টয়ট্রেন শুধু দেখার নয়, চড়ার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। দার্জিলিঙ - ঘুম - দার্জিলিঙের চক্রাকার ভ্রমণ, নাম জয় রাইড। অভিজ্ঞতা হিসেবে ভালোই, কিন্তু বড্ড কম। তারপর ২০১৬ সালে যখন তাকদা ভ্রমণের পরিকল্পনা করা হল, তখন ঠিক করেছিলাম নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ঘুম পর্যন্ত টয়ট্রেনে এসে বাকিটা গাড়িতে যাওয়া হবে। সেইমতো টয়ট্রেনের টিকিটও কাটা হয়, কিন্তু শেষ মূহুর্তে রেল কর্তৃপক্ষ ট্রেনটা ক্যানসেল করে দেয়। এই লাইনে এই ঘটনা আকছার ঘটে, তাই সঙ্গে কনফার্ম টিকিট থাকলেও যতক্ষণ না ট্রেনে উঠে বসছি, ততক্ষণ নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না।

ওভারব্রীজ থেকে নামার সময়ে
এবারে দার্জিলিঙ যাওয়ার পরিকল্পনা করেইছিলাম প্রধানতঃ এই টয়ট্রেনের জন্য। এবারে শুধুই আমরা ৬ জন - আমি অমৃতা বাবা মা কথা কলি। ২৪শে জানুয়ারী ২০২৬ শনিবার রাতে শিয়ালদহ থেকে দার্জিলিঙ মেল ধরে ২৫শে জানুয়ারী ২০২৬ রবিবার সকালে নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছলাম। প্রত্যেকবার নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে যখন ওভারব্রীজটা হেঁটে পার হতাম, নিচের টয়ট্রেনের লাইনটা দেখে মনে হত "কোনও একবার ওভারব্রীজটা পার হব না, ওভারব্রীজ থেকে টয়ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে নেমে টয়ট্রেনে চড়ে যাব।" এবারে ঠিক সেটাই ঘটল - ওভারব্রীজ থেকে বাইরে না বেরিয়ে টয়ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে নামলাম।

টয়ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে
টয়ট্রেনের প্ল্যাটফর্মটা ছোট, নিচু আর সেইসঙ্গে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। একটা ফার্স্টক্লাস টয়লেটও আছে, সেটাও যাকে বলে ঝাঁচক্‌চকে। ট্রেন ছাড়ার নির্দিষ্ট সময় সকাল ১০টা অর্থাৎ আমাদের হাতে এখনও ঘন্টাখানেক সময় আছে। এই সময়টার মধ্যে আমরা সঙ্গে থাকা স্যান্ডউইচ্‌ ইত্যাদির সদ্ব্যবহার করে ফেললাম।

আমাদের ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ
ট্রেনটা চলে এল সাড়ে নটার কিছু পরেই। কিন্তু এসে সে প্ল্যাটফর্মে না ঢুকে প্ল্যাটফর্মের কাছে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বুঝলাম সেখানে দাঁড় করিয়ে ট্রেনের যন্ত্রপাতি নিয়ে কিছু কাজকর্ম হচ্ছে। খুট্‌খাট, ঠক্‌ঠক্‌, ঠংঠং ইত্যাদি শব্দ চলতে থাকল। এইভাবে আমাদের প্রায় ৪৫ মিনিট দাঁড় করিয়ে রেখে শেষপর্যন্ত ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢুকল তখন সাড়ে দশটা - অর্থাৎ শুরুতেই আধঘন্টা লেট ! কিন্তু টয়ট্রেনে যেতে হলে সময়ের কথা ভাবলে চলবে না, গাড়ির থেকে অনেক বেশি সময় লাগবে জেনেই আমরা এতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের ট্রেনের দুটো বগি, একটা এ সি চেয়ারকার আর অন্যটা ফার্স্ট ক্লাস। আমাদের ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট কাটা ছিল। কামরার সামনের দিকে একটা ফাঁকা জায়গা আছে, যাত্রীদের মালপত্র সেখানে ডাঁই করে রাখা হয়। আমরা আমাদেরগুলো রেখে নিজেদের সিটে বসে পড়লাম। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই টিটিই আমাদের টিকিট চেকিং করল। আর মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে আমাদের নিয়ে দার্জিলিঙের উদ্দেশ্যে রওনা দিল ৫২৫৪১ নিউ জলপাইগুড়ি - দার্জিলিঙ প্যাসেঞ্জার।

যাওয়ার পথটা আমার অনেকটাই চেনা। এর আগে বিভিন্ন সময়ে পাহাড়ে যাওয়ার জন্য শিলিগুড়ি শহরের বিভিন্ন রাস্তা ও রেলপথ দিয়ে গিয়েছি, তারমধ্যে অনেক সময়েই রাস্তার ধারে টয়ট্রেনের লাইন দেখতে পেয়েছি। কিন্তু এবারের দৃষ্টিভঙ্গিটা আলাদা - সেই টয়ট্রেনের লাইনের উপরে টয়ট্রেনে বসে শহরের রাস্তা, রেলপথগুলো দেখা। পুরোপুরি শহরের মধ্যে প্রায় পঁয়ত্রিশ মিনিট চলার পরে আমাদের ট্রেন পৌঁছলো তার প্রথম স্টপেজ - শিলিগুড়ি জাংশন-এ। এর আগে ডুয়ার্স ভ্রমণের সময়ে আমি অমৃতা কথা কলি এই স্টেশন থেকে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস ধরেছিলাম, তখন এখানকার টয়ট্রেনের স্টেশনটাও দেখেছিলাম। এবারেও দেখলাম তবে টয়ট্রেনের ভিতরে বসে। শিলিগুড়িতে ট্রেন থামল মিনিট পাঁচেক - কেউ ওঠানামা করল না, শুধু রেলের কিছু লোকজন ছাড়া। এখানে জানিয়ে রাখি এই টয়ট্রেনের টিকিট শুধুমাত্র নিউ জলপাইগুড়ি থেক দার্জিলিঙ অথবা দার্জিলিঙ থেকে নিউ জলপাইগুড়িরই কাটা যায়, অন্য কোনও স্টেশন থেকে নামা বা ওঠার টিকিট কাটা যায় না। চাইলে অন্য কোনও স্টেশন থেকে ওঠা যায় বা নামাও যায়, কিন্তু টিকিট পুরো জার্ণিটারই কাটতে হবে।

রেলপথের দুধারে জঙ্গল
শিলিগুড়ি স্টেশন থেকে ট্রেন আরও এগিয়ে চলল। ট্রেনের রাস্তা পুরোটাই হিলকার্ট রোডের উপরে - একেবারে দার্জিলিঙ পর্যন্ত। শিলিগুড়ি থেকে ছেড়ে ট্রেন সমতলের মধ্যে দিয়েই চলেছে, তবে দুদিকে শহর-শহর ব্যাপারটা ক্রমশঃ কমে আসছে। তার বদলে বেশ গাছপালা-ঝোপঝাড় দেখা যাচ্ছে। পরিবেশ মনোরম তবে তাপমাত্রা বেশ চড়া। আমরা কেউই গরম জামা পরিনি আর তাতেই আরাম লাগছিল। শিলিগুড়ি থেকে আরও আধঘন্টা চলার পরে স্টেশন শুক্‌না। ট্রেন এখানে মিনিটখানেক দাঁড়ালো, স্টেশনের রেলের লোকের সঙ্গে কথাবার্তা বলে আমাদের ট্রেন আবার এগিয়ে চলল। আর এবারে যতই এগোতে থাকল, রাস্তার দুদিকে জঙ্গল শুরু হল - এখানে আর কোনও বাড়িঘর নেই। আর এই পথে চলতে চলতেই দেখতে পেলাম আমরা ক্রমশঃ পাহাড়ের উপরে উঠে যাচ্ছি !

রাস্তার সঙ্গে চলেছে টয়ট্রেন
পাহাড়ের পথে ট্রেনে করে ওঠার এই দৃশ্যের বর্ণনা দেওয়ার সাধ্য আমার নেই - কোনও সাহিত্যিক বা নিদেনপক্ষে কবি হলে হয়তো পারতেন। আমি শুধু এটুকুই বলব এই জার্ণির জন্য বহু বছর অপেক্ষা করা সার্থক, দীর্ঘ সময় ধরে এই জার্ণিটা করা সার্থক, বেশি টাকা খরচ করা সার্থক, খাবার জায়গা না পেলে না খেয়ে থাকা সার্থক, টয়লেট পেলে চেপে বসে থাকা সার্থক (না, এটা বোধহয় বাস্তবে বেশিক্ষণ সম্ভব নয় !) - এককথায় এই জার্ণির জন্য অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতিই সহ্য করে নেওয়া যেতে পারে। হিল কার্ট রোড পাহাড়ের গা দিয়ে উপরে উঠছে আর সেইসঙ্গে উঠছে আমাদের টয়ট্রেনের লাইন। কখনও রাস্তার ডানদিকে, কখনও বাঁদিকে, কখনও রাস্তা ছেড়ে কিছুটা নিচে চলে যাচ্ছে আবার কখনও রাস্তা থেকে কিছুটা উপরে উঠে যাচ্ছে। এইভাবে চলতে চলতে পেরিয়ে গেলাম রংটং স্টেশন। এখানে ট্রেন দাঁড়ালোই না।

রেলের Z-রিভার্স পথ (চিত্রঋণ ঃ গুগ্‌ল্‌ ম্যাপ)
আমরা ক্রমশঃ উপরের দিকে উঠছি। পাহাড়ী পথ ধরে ওঠার দৃশ্য নতুন নয়, কিন্তু টয়ট্রেন থেকে সেই দৃশ্য দেখাটা নতুন। আর অসাধারণ। রংটং পেরিয়ে কিছুদূর গিয়ে ট্রেনটা একজায়গায় থেমে গিয়ে পিছন দিকে চলা শুরু করল। কিছুটা পিছন দিকে গিয়ে একটা অন্য লাইন ধরে কিছুটা উপরে উঠে গেল। তারপর আবার একটা অন্য লাইন ধরে সামনের দিকে চলতে শুরু করল। এই জায়গায় লাইনটা একটা Z অক্ষরের মতো। এটাই হল দার্জিলিঙ হিমালয়ান রেলওয়েজের বিখ্যাত 'Z-রিভার্স কৌশল' - এটা থাকার জন্য অল্প দূরত্বের মধ্যে ট্রেনটা বেশ কিছুটা উপরে উঠে যায়। এটার সম্পর্কে একটা গল্প প্রচলিত আছে, সেটা এখানে লিখে রাখি।

দার্জিলিঙ পৌঁছনোর জন্য যখন টয়ট্রেনের পথ তৈরি হচ্ছে, তখন একজন ইঞ্জিনিয়ার পাহাড়ের পথে এই রেলপথ তৈরির ডিজাইন করছিলেন। রংটং-এর এই জায়গায় অল্প দূরত্বের মধ্যে ট্রেনটাকে বেশ কিছুটা খাড়াই পথে উপরে ওঠানোর প্রয়োজন হচ্ছিল। কিন্তু সেটা তিনি কোনওভাবেই পেরে উঠছিলেন না আর এই নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত ছিলেন। একদিন তাঁর স্ত্রী চা দিতে এসে স্বামীকে জিজ্ঞেস করলেন - তুমি কী নিয়ে এত চিন্তা করছ ?

মাথার মধ্যে কাজ সংক্রান্ত চিন্তার মাঝে স্ত্রীর এই প্রশ্নে ইঞ্জিনিয়ারমশাই কিছুটা বিরক্তই হলেন। বললেন - তোমাকে কী বলব, তুমি এর কিছুই বুঝবে না।

- তা হয়তো বুঝবো না, তবে কদিন ধরেই দেখছি তুমি কিছু একটা নিয়ে খুব চিন্তা করছ, তাই ...

টেবিলে রাখা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সামনের ড্রইং-এর দিকে তাকিয়ে গভীরভাবে নিবিষ্ট অবস্থায় ইঞ্জিনিয়ারমশাই কিছুটা অন্যমনস্কভাবেই স্ত্রী-র কথার উত্তরে বললেন - একটা জায়গায় গিয়ে আটকে গেছি, কিছুতেই এগোতে পারছি না।

ইঞ্জিনিয়ার স্বামীর ঘরোয়া স্ত্রী। ইঞ্জিনিয়ারিং বুদ্ধি নেই - সাধারণ বুদ্ধি থেকে একটা হাল্কা কথা বলে হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

- এগোতে না পারো, পিছিয়ে যাও !

কথাটা স্বামীর মাথায় রেখাপাত করল। আবিষ্কার করে ফেললেন অল্প উচ্চতায় ট্রেনকে খাড়াই পথে বেশ কিছুটা উপরে তোলার 'Z-রিভার্স কৌশল'। শুধ রংটং-এ নয়, দার্জিলিং-হিমালয়ান রেলওয়েতে এই কৌশল ব্যবহার করে ট্রেনকে উপরে তোলা হল আরও পাঁচ জায়গায়। সফলভাবে ট্রেন চলা শুরু হল - ইতিহাস সৃষ্টি করে চলতে থাকল প্রায় ১৫০ বছর ধরে !

- এগোতে না পারো, পিছিয়ে যাও !

তিনধারিয়া স্টেশন
রংটং-এর পরের স্টেশন তিনধারিয়া। এখানকার উচ্চতা ২,৮২০ ফুট। এখানে ট্রেন পৌঁছল দুপুর ১ঃ৩০ নাগাদ। তিনধারিয়ায় ট্রেন বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়ায়। স্টেশনটাও তুলনামূলকভাবে একটু বড়, এখানকার টয়লেট ব্যবহার করা যেতে পারে। স্টেশনে কোনও খাবার ব্যবস্থা নেই, তবে স্টেশনের বাইরেই একটা দোকান আছে যেখানে মোমো, জল, কোল্ড ড্রিঙ্কস্‌ ইত্যাদি পাওয়া যায়। তিনধারিয়ায় বেশিক্ষণ দাঁড়ানোর একটা কারণ হল এখানে ফিরতি ট্রেনটা পাস করে। দার্জিলিঙ হিমালয়ান রেলওয়ে সিঙ্গল লাইন, তাই এখানে দুটো ট্রেনের মধ্যে ক্রসিং হয়। আমরা একসঙ্গে দুটো টয়ট্রেন দেখলাম এটাও একটা বড় পাওনা - সচরাচর দেখার সুযোগ পাওয়া যায় না। ফিরতি ট্রেনটা প্ল্যাটফর্মে ঢোকার পরে আমাদের ট্রেন আবার রওনা দিল।

কার্সিয়ং ছেড়ে এগিয়ে চলা
আমরা আরও উপরের দিকে উঠে চলেছি। যত উপরে ওঠা যায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ততই বাড়তে থাকে। তিনধারিয়ার পরে আমরা পরপর দুটো স্টেশন যথাক্রমে গয়াবাড়ি আর মহানদী পেরিয়ে গেলাম - এর কোনওটাতেই ট্রেন থামল না। মহানদীর পরের স্টেশন কার্সিয়ং। আমরা পৌঁছলাম বিকেল ৩ঃ৪৫ নাগাদ। এর আগে কার্সিয়ং ও সিটং ভ্রমণের সময়ে আমরা কার্সিয়ং স্টেশনে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়েছি, জায়গাটা বেশ ভালোরকম চেনা। কার্সিয়ং-এর উচ্চতা ৪,৮৬৪ ফুট। এখানেও ট্রেন আধঘন্টা দাঁড়ায়। আমাদের ট্রেনের গার্ডের কাছ থেকে জানলাম এখান থেকে আরেকটা বগি আমাদের ট্রেনের সঙ্গে জোড়া হবে, সেটা দার্জিলিঙ পর্যন্ত যাবে। কার্সিয়ং স্টেশনের পাশে অনেক দোকানপাট আছে, খাবারের দোকানও অনেক আছে। সেখান থেকে চা-কেক ইত্যাদি খেয়ে নেওয়া হল। ৪ঃ১৫ নাগাদ তিনটে বগি নিয়ে কার্সিয়ং থেকে ট্রেন ছাড়ল। সূর্যাস্ত না হয়ে গিয়ে থাকলেও শীতকালে বিকেল চারটের পরে পাহাড়ে আলো কমতে শুরু করে, তাই দূরের পাহাড়ের সৌন্দর্য আর বেশিক্ষণ উপভোগ করা সম্ভব নয়।

টুং স্টেশন
দেখতে দেখতে আরও দুটো স্টেশন যথাক্রমে টুং আর সোনাদা পেরিয়ে গেল। এগুলোতেও ট্রেন থামল না। কার্সিয়ং স্টেশনের পরে বাকি রাস্তাটার বেশিরভাগটাই লোকবসতিপূর্ণ আর এই বসতির মধ্যে দিয়ে টয়ট্রেনের যাত্রাটা সবসময়েই উপভোগ্য।



সন্ধ্যে ৬ঃ৪০ নাগাদ ট্রেন পৌঁছল ঘুম স্টেশনে। ঘুম হল ভারতবর্ষের উচ্চতম রেল স্টেশন - এর উচ্চতা ৭,৪০৭ ফুট। পৃথিবীতে এর স্থান ১৪ নম্বর। ২০১৪ সালে যখন দার্জিলিঙ এসেছিলাম, তখন টয়ট্রেনের জয় রাইডে দার্জিলিঙ-ঘুম-দার্জিলিঙ রাউন্ড ট্রিপে আমরা ঘুম-এ এসেছিলাম। ট্রেনে করে দেশের উচ্চতম রেল স্টেশনে পৌঁছনোটাও একটা অভিজ্ঞতা !

ঘুম-এর পর থেকে রেলপথ নিচের দিকে নামতে থাকে কারণ দার্জিলিঙের উচ্চতা ঘুমের থেকে কম - ৬,৮০১ ফুট। ঘুম থেকে দার্জিলিঙ পৌঁছতে মিনিট কুড়ি লাগে। রাতের অন্ধকারে ট্রেন যত দার্জিলিঙের দিকে এগোয়, অন্ধকার পাহাড়ের গায়ে দার্জিলিঙ শহরের বিন্দু বিন্দু আলোগুলো ক্রমশঃ স্পষ্ট হয়। আমরা পাহাড়ের কোনও জায়গায় পৌঁছলে সাধারণতঃ দিনের আলোর মধ্যেই পৌঁছই, রাতের অন্ধকারে পাহাড়ের গায়ে আলো দেখার সুযোগ বড় একটা হয় না। এবারে হল আর টয়ট্রেন থেকে হল। এই অভিজ্ঞতা গাড়ি চড়ে দেখার অভিজ্ঞতার থেকে আলাদা কারণ দৃশ্যপট পরিবর্তনের গতি খুব কম।

এরপর আমাদের পথে পড়ল 'বাতাসিয়া লুপ'। এটাও দার্জিলিঙ হিমালয়ান রেলওয়েজের একটা খুবই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ জায়গা। যেহেতু ঘুম থেকে দার্জিলিঙ যাওয়ার সময় ট্রেনকে নিচের দিকে নামতে হয় তাই এই বাতাসিয়া লুপে এসে ট্রেন একটা পাক ঘুরে অনেকটা নিচের দিকে নেমে যেতে পারে। দার্জিলিঙ থেকে জয় রাইডে ঘুম যাওয়ার সময় ট্রেন এই বাতাসিয়া লুপে মিনিট দশেক দাঁড়িয়ে থাকে।

সন্ধ্যে ৭ঃ১০ মিনিটে আমাদের ট্রেন পৌঁছে দিল আমাদের গন্তব্য - ক্যুইন অফ্‌ হিলস্‌ - দার্জিলিঙ-এ। দার্জিলিঙ-হিমালয়ান রেলওয়ের এটাই টার্মিনাল স্টেশন। স্টেশনটা বেশ বড় - এখানে অনেকগুলো লাইন আছে আর সেইসব লাইনে অনেকগুলো ইঞ্জিন আর বগি দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের ট্রেনযাত্রার এখানেই শেষ, আমরা মালপত্র নিয়ে ট্রেন থেকে নেমে পড়লাম। বাইরে বেশ ভালোই ঠান্ডা, ট্রেনের মধ্যে থেকে যেটা এতক্ষণ সেভাবে অনুভব করা যায়নি। স্টেশন চত্বরে কিছু গাড়ি আছে, এরা ট্রেনের যাত্রীদের হোটেলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ডাকাডাকি করছে। আমাদের হোটেল স্টেশন থেকে ৮০০ মিটার দূরে, তাই আমরা হেঁটেই যাব ঠিক ছিল।

টয়ট্রেন আর দার্জিলিঙ স্টেশনকে পিছনে ফেলে রেখে আমরা হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। মনে থেকে গেল শুধু একরাশ ভালোলাগা !

সারসংক্ষেপ ঃ

১. নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিঙ পর্যন্ত (এবং ফিরতি পথে) চলে ৫২৫৪১ নিউ জলপাইগুড়ি - দার্জিলিঙ প্যাসেঞ্জার। এই রেলপথ দার্জিলিঙ-হিমালয়ান রেলওয়েজ (ডি এইচ আর) নামে পরিচিত এবং ১৯৯৯ সাল থেকে এটি ইউনেসকো ওয়র্ল্ড হেরিটেজ প্রপার্টির মধ্যে পড়ে।

২. টয়ট্রেনের টিকিট https://www.irctc.co.in/nget/train-search থেকেই কাটা যায়। টিকিট শুধুমাত্র নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিঙেরই (অথবা দার্জিলিঙ থেকে নিউ জলপাইগুড়ির) কাটা সম্ভব যদিও ট্রেনে ওঠানামা যেকোনও স্টেশন থেকে করা যায়।

৩. টয়ট্রেনের লাইন ২ ফুটের ন্যারো গেজ। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে টয়ট্রেনের আলাদা প্ল্যাটফর্ম আছে, ওভারব্রীজের সাহায্যে এই প্ল্যাটফর্মে পৌঁছনো যায়।

৪. দার্জিলিঙ টয়ট্রেনে সাধারণতঃ দুটো বগি থাকে - একটা এ সি চেয়ারকার আর অন্যটা ফার্স্টক্লাস। এ সি চেয়ারকারের ভাড়া ফার্স্টক্লাসের থেকে বেশি।

৫. ট্রেনের ভিতরে মালপত্র রাখার বিশেষ কোনও জায়গা নেই। বগির সামনের দিকে একটা ফাঁকা জায়গায় বড় ব্যাগ, ট্রলি, স্যুটকেস ইত্যাদি রাখতে হয় আর ছোট ব্যাগগুলো নিজেদের কাছেই রাখতে হয়।

৬. টয়ট্রেনে যাওয়ার সময়ে সঙ্গে খাবারদাবার নিয়ে নিতে হবে কারণ পথে কোনও খাবারের দোকান বা ব্যবস্থা নেই। চাইলে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনের ক্যান্টিন থেকে লাঞ্চ প্যাক করে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে।

৭. যাওয়ার সময়ে কিছু গরম জামাকাপড় সঙ্গে রাখা ভালো কারণ নিউ জলপাইগুড়িতে গরম থাকলেও যত পাহাড়ে ওঠা হবে তত ঠান্ডা লাগবে। আর গরম জামাকাপড় স্যুটকেসে ঢোকানো থাকলে দার্জিলিঙ পৌঁছনোর আগে সেগুলো বের করার সুযোগ নেই।

৮. নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিঙ পৌঁছনোর সময়সীমা সাড়ে সাত ঘন্টা হলেও ট্রেনের পৌঁছতে সাড়ে আট থেকে নয় ঘন্টা প্রায় প্রতিদিনই লেগে যায়। পুরো পথটাই ট্রেন একটা নির্দিষ্ট গতিতে চলে আর সেটা কখনোই ঘন্টায় ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটারের বেশি নয়। 

৯. দার্জিলিঙ যাওয়া বা ফেরার পথে টয়ট্রেন চড়ার ইচ্ছে থাকলে সেটা যাওয়ার সময় করাই ভালো। টয়ট্রেন প্রায়শই অনেক দেরি করে, কাজেই নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছে যদি ওই দিনই ফেরার ট্রেন ধরার পরিকল্পনা থাকে তাহলে ট্রেন মিস হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকবে।

১০. দার্জিলিঙ স্টেশন থেকে হোটেল যদি হাঁটা দূরত্বে না হয় তাহলে গাড়ি আগে থেকেই বুক করা ভালো। স্টেশনের গাড়ি বুক করতে গেলে তারা অনেক বেশি ভাড়া চাইতে পারে।

উপসংহার ঃ

দার্জিলিঙ হিমালয়ান রেলওয়ে
ভারতবর্ষে বর্তমানে পাঁচ জায়গায় টয়ট্রেন চলে। পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিঙ হিমালয়ান রেলওয়ে ছাড়াও এই তালিকায় রয়েছে হিমাচল প্রদেশের কালকা সিমলা রেলওয়ে ও কাঙ্গরা ভ্যালি রেলওয়ে, তামিলনাড়ুর নীলগিরি মাউন্টেন রেলওয়ে আর মহারাষ্ট্রের মাথেরান হিল রেলওয়ে। এদের মধ্যে সবচেয়ে পুরনো ও সবচেয়ে বিখ্যাত হল দার্জিলিঙ হিমালয়ান রেলওয়ে বা দার্জিলিঙ টয়ট্রেন। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিঙের ৮৮ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে এই ট্রেন ৭,৪০০ ফুট উচ্চতায় উঠে আবার ৬,৮০০ ফুট উচ্চতায় নামে। এত অল্প দূরত্বের মধ্যে ট্রেনের এতটা উপরে ওঠার নজির ভারতবর্ষে তো নেইই পৃথিবীর অন্য কোথাও আছে কিনা সন্দেহ। আর দার্জিলিঙ টয়ট্রেন এই কাজটাই করে চলেছে বিগত ১৪৫ বছর ধরে। তাই এই টয়ট্রেনে করে নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিঙ যাওয়াটা একটা বিরল অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়ে থাকা। যাত্রাপথে প্রতিকূলতা আছে অনেক - ধৈর্যের অভাব তার মধ্যে অন্যতম প্রধান। কিন্তু সেইসব প্রতিকূলতাকে যদি উপেক্ষা করা যায় তাহলে নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিঙ পর্যন্ত দার্জিলিঙ হিমালয়ান রেলওয়ের এই ভ্রমণ আক্ষরিক অর্থেই লাইফটাইম এক্সপেরিয়েন্স !

দার্জিলিঙ হিমালয়ান রেলওয়ে ভ্রমণের আরো ছবি দেখতে হলে click here.

No comments:

Post a Comment