কিছুটা অতীতের কথা দিয়েই শুরু করা যাক। আমি জীবনে প্রথম দার্জিলিঙ গিয়েছিলাম ১৯৯২ সালে - অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ৩৪ বছর আগে। তখন আমার বয়স ছিল ৯ বছর। তখন শুধু শুনেছিলাম দার্জিলিঙে টয়ট্রেন নামক একটা ট্রেন চলে। সেবার দার্জিলিঙের রাস্তায় ঘোরার সময়ে টয়ট্রেনের লাইন দেখেছিলাম আর একদিন হঠাৎই দেখতে পেয়ে গিয়েছিলাম টয়ট্রেন - আমাদের থেকে অনেক দূরে পাহাড়ের বেশ কিছুটা নিচের দিকে। ছোটাছুটি করে কোনওমতে একটা ছবি তুলেছিলাম (এখনকার দিনের মতো ডিজিট্যাল ক্যামেরা নয়, তখনকার দিনের ফিল্ম ক্যামেরা যাতে এক-একটা ছবি হিসেব করে তুলতে হত)। সেবারেই মতো এইটুকুই। এবারে আগে ২০১৪ সালে যখন দার্জিলিঙ গিয়েছি, তখন এই টয়ট্রেন শুধু দেখার নয়, চড়ার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। দার্জিলিঙ - ঘুম - দার্জিলিঙের চক্রাকার ভ্রমণ, নাম জয় রাইড। অভিজ্ঞতা হিসেবে ভালোই, কিন্তু বড্ড কম। তারপর ২০১৬ সালে যখন তাকদা ভ্রমণের পরিকল্পনা করা হল, তখন ঠিক করেছিলাম নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ঘুম পর্যন্ত টয়ট্রেনে এসে বাকিটা গাড়িতে যাওয়া হবে। সেইমতো টয়ট্রেনের টিকিটও কাটা হয়, কিন্তু শেষ মূহুর্তে রেল কর্তৃপক্ষ ট্রেনটা ক্যানসেল করে দেয়। এই লাইনে এই ঘটনা আকছার ঘটে, তাই সঙ্গে কনফার্ম টিকিট থাকলেও যতক্ষণ না ট্রেনে উঠে বসছি, ততক্ষণ নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না।
![]() |
| ওভারব্রীজ থেকে নামার সময়ে |
![]() |
| টয়ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে |
![]() |
| আমাদের ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ |
যাওয়ার পথটা আমার অনেকটাই চেনা। এর আগে বিভিন্ন সময়ে পাহাড়ে যাওয়ার জন্য শিলিগুড়ি শহরের বিভিন্ন রাস্তা ও রেলপথ দিয়ে গিয়েছি, তারমধ্যে অনেক সময়েই রাস্তার ধারে টয়ট্রেনের লাইন দেখতে পেয়েছি। কিন্তু এবারের দৃষ্টিভঙ্গিটা আলাদা - সেই টয়ট্রেনের লাইনের উপরে টয়ট্রেনে বসে শহরের রাস্তা, রেলপথগুলো দেখা। পুরোপুরি শহরের মধ্যে প্রায় পঁয়ত্রিশ মিনিট চলার পরে আমাদের ট্রেন পৌঁছলো তার প্রথম স্টপেজ - শিলিগুড়ি জাংশন-এ। এর আগে ডুয়ার্স ভ্রমণের সময়ে আমি অমৃতা কথা কলি এই স্টেশন থেকে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস ধরেছিলাম, তখন এখানকার টয়ট্রেনের স্টেশনটাও দেখেছিলাম। এবারেও দেখলাম তবে টয়ট্রেনের ভিতরে বসে। শিলিগুড়িতে ট্রেন থামল মিনিট পাঁচেক - কেউ ওঠানামা করল না, শুধু রেলের কিছু লোকজন ছাড়া। এখানে জানিয়ে রাখি এই টয়ট্রেনের টিকিট শুধুমাত্র নিউ জলপাইগুড়ি থেক দার্জিলিঙ অথবা দার্জিলিঙ থেকে নিউ জলপাইগুড়িরই কাটা যায়, অন্য কোনও স্টেশন থেকে নামা বা ওঠার টিকিট কাটা যায় না। চাইলে অন্য কোনও স্টেশন থেকে ওঠা যায় বা নামাও যায়, কিন্তু টিকিট পুরো জার্ণিটারই কাটতে হবে।
![]() |
| রেলপথের দুধারে জঙ্গল |
![]() |
| রাস্তার সঙ্গে চলেছে টয়ট্রেন |
![]() |
| রেলের Z-রিভার্স পথ (চিত্রঋণ ঃ গুগ্ল্ ম্যাপ) |
দার্জিলিঙ পৌঁছনোর জন্য যখন টয়ট্রেনের পথ তৈরি হচ্ছে, তখন একজন ইঞ্জিনিয়ার পাহাড়ের পথে এই রেলপথ তৈরির ডিজাইন করছিলেন। রংটং-এর এই জায়গায় অল্প দূরত্বের মধ্যে ট্রেনটাকে বেশ কিছুটা খাড়াই পথে উপরে ওঠানোর প্রয়োজন হচ্ছিল। কিন্তু সেটা তিনি কোনওভাবেই পেরে উঠছিলেন না আর এই নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত ছিলেন। একদিন তাঁর স্ত্রী চা দিতে এসে স্বামীকে জিজ্ঞেস করলেন - তুমি কী নিয়ে এত চিন্তা করছ ?
মাথার মধ্যে কাজ সংক্রান্ত চিন্তার মাঝে স্ত্রীর এই প্রশ্নে ইঞ্জিনিয়ারমশাই কিছুটা বিরক্তই হলেন। বললেন - তোমাকে কী বলব, তুমি এর কিছুই বুঝবে না।
- তা হয়তো বুঝবো না, তবে কদিন ধরেই দেখছি তুমি কিছু একটা নিয়ে খুব চিন্তা করছ, তাই ...
টেবিলে রাখা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সামনের ড্রইং-এর দিকে তাকিয়ে গভীরভাবে নিবিষ্ট অবস্থায় ইঞ্জিনিয়ারমশাই কিছুটা অন্যমনস্কভাবেই স্ত্রী-র কথার উত্তরে বললেন - একটা জায়গায় গিয়ে আটকে গেছি, কিছুতেই এগোতে পারছি না।
ইঞ্জিনিয়ার স্বামীর ঘরোয়া স্ত্রী। ইঞ্জিনিয়ারিং বুদ্ধি নেই - সাধারণ বুদ্ধি থেকে একটা হাল্কা কথা বলে হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
- এগোতে না পারো, পিছিয়ে যাও !
কথাটা স্বামীর মাথায় রেখাপাত করল। আবিষ্কার করে ফেললেন অল্প উচ্চতায় ট্রেনকে খাড়াই পথে বেশ কিছুটা উপরে তোলার 'Z-রিভার্স কৌশল'। শুধ রংটং-এ নয়, দার্জিলিং-হিমালয়ান রেলওয়েতে এই কৌশল ব্যবহার করে ট্রেনকে উপরে তোলা হল আরও পাঁচ জায়গায়। সফলভাবে ট্রেন চলা শুরু হল - ইতিহাস সৃষ্টি করে চলতে থাকল প্রায় ১৫০ বছর ধরে !
- এগোতে না পারো, পিছিয়ে যাও !
![]() |
| তিনধারিয়া স্টেশন |
![]() |
| কার্সিয়ং ছেড়ে এগিয়ে চলা |
![]() |
| টুং স্টেশন |
সন্ধ্যে ৬ঃ৪০ নাগাদ ট্রেন পৌঁছল ঘুম স্টেশনে। ঘুম হল ভারতবর্ষের উচ্চতম রেল স্টেশন - এর উচ্চতা ৭,৪০৭ ফুট। পৃথিবীতে এর স্থান ১৪ নম্বর। ২০১৪ সালে যখন দার্জিলিঙ এসেছিলাম, তখন টয়ট্রেনের জয় রাইডে দার্জিলিঙ-ঘুম-দার্জিলিঙ রাউন্ড ট্রিপে আমরা ঘুম-এ এসেছিলাম। ট্রেনে করে দেশের উচ্চতম রেল স্টেশনে পৌঁছনোটাও একটা অভিজ্ঞতা !
ঘুম-এর পর থেকে রেলপথ নিচের দিকে নামতে থাকে কারণ দার্জিলিঙের উচ্চতা ঘুমের থেকে কম - ৬,৮০১ ফুট। ঘুম থেকে দার্জিলিঙ পৌঁছতে মিনিট কুড়ি লাগে। রাতের অন্ধকারে ট্রেন যত দার্জিলিঙের দিকে এগোয়, অন্ধকার পাহাড়ের গায়ে দার্জিলিঙ শহরের বিন্দু বিন্দু আলোগুলো ক্রমশঃ স্পষ্ট হয়। আমরা পাহাড়ের কোনও জায়গায় পৌঁছলে সাধারণতঃ দিনের আলোর মধ্যেই পৌঁছই, রাতের অন্ধকারে পাহাড়ের গায়ে আলো দেখার সুযোগ বড় একটা হয় না। এবারে হল আর টয়ট্রেন থেকে হল। এই অভিজ্ঞতা গাড়ি চড়ে দেখার অভিজ্ঞতার থেকে আলাদা কারণ দৃশ্যপট পরিবর্তনের গতি খুব কম।
এরপর আমাদের পথে পড়ল 'বাতাসিয়া লুপ'। এটাও দার্জিলিঙ হিমালয়ান রেলওয়েজের একটা খুবই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ জায়গা। যেহেতু ঘুম থেকে দার্জিলিঙ যাওয়ার সময় ট্রেনকে নিচের দিকে নামতে হয় তাই এই বাতাসিয়া লুপে এসে ট্রেন একটা পাক ঘুরে অনেকটা নিচের দিকে নেমে যেতে পারে। দার্জিলিঙ থেকে জয় রাইডে ঘুম যাওয়ার সময় ট্রেন এই বাতাসিয়া লুপে মিনিট দশেক দাঁড়িয়ে থাকে।
সন্ধ্যে ৭ঃ১০ মিনিটে আমাদের ট্রেন পৌঁছে দিল আমাদের গন্তব্য - ক্যুইন অফ্ হিলস্ - দার্জিলিঙ-এ। দার্জিলিঙ-হিমালয়ান রেলওয়ের এটাই টার্মিনাল স্টেশন। স্টেশনটা বেশ বড় - এখানে অনেকগুলো লাইন আছে আর সেইসব লাইনে অনেকগুলো ইঞ্জিন আর বগি দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের ট্রেনযাত্রার এখানেই শেষ, আমরা মালপত্র নিয়ে ট্রেন থেকে নেমে পড়লাম। বাইরে বেশ ভালোই ঠান্ডা, ট্রেনের মধ্যে থেকে যেটা এতক্ষণ সেভাবে অনুভব করা যায়নি। স্টেশন চত্বরে কিছু গাড়ি আছে, এরা ট্রেনের যাত্রীদের হোটেলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ডাকাডাকি করছে। আমাদের হোটেল স্টেশন থেকে ৮০০ মিটার দূরে, তাই আমরা হেঁটেই যাব ঠিক ছিল।
টয়ট্রেন আর দার্জিলিঙ স্টেশনকে পিছনে ফেলে রেখে আমরা হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। মনে থেকে গেল শুধু একরাশ ভালোলাগা !
সারসংক্ষেপ ঃ
১. নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিঙ পর্যন্ত (এবং ফিরতি পথে) চলে ৫২৫৪১ নিউ জলপাইগুড়ি - দার্জিলিঙ প্যাসেঞ্জার। এই রেলপথ দার্জিলিঙ-হিমালয়ান রেলওয়েজ (ডি এইচ আর) নামে পরিচিত এবং ১৯৯৯ সাল থেকে এটি ইউনেসকো ওয়র্ল্ড হেরিটেজ প্রপার্টির মধ্যে পড়ে।
২. টয়ট্রেনের টিকিট https://www.irctc.co.in/nget/train-search থেকেই কাটা যায়। টিকিট শুধুমাত্র নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিঙেরই (অথবা দার্জিলিঙ থেকে নিউ জলপাইগুড়ির) কাটা সম্ভব যদিও ট্রেনে ওঠানামা যেকোনও স্টেশন থেকে করা যায়।
৩. টয়ট্রেনের লাইন ২ ফুটের ন্যারো গেজ। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে টয়ট্রেনের আলাদা প্ল্যাটফর্ম আছে, ওভারব্রীজের সাহায্যে এই প্ল্যাটফর্মে পৌঁছনো যায়।
৪. দার্জিলিঙ টয়ট্রেনে সাধারণতঃ দুটো বগি থাকে - একটা এ সি চেয়ারকার আর অন্যটা ফার্স্টক্লাস। এ সি চেয়ারকারের ভাড়া ফার্স্টক্লাসের থেকে বেশি।
৫. ট্রেনের ভিতরে মালপত্র রাখার বিশেষ কোনও জায়গা নেই। বগির সামনের দিকে একটা ফাঁকা জায়গায় বড় ব্যাগ, ট্রলি, স্যুটকেস ইত্যাদি রাখতে হয় আর ছোট ব্যাগগুলো নিজেদের কাছেই রাখতে হয়।
৬. টয়ট্রেনে যাওয়ার সময়ে সঙ্গে খাবারদাবার নিয়ে নিতে হবে কারণ পথে কোনও খাবারের দোকান বা ব্যবস্থা নেই। চাইলে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনের ক্যান্টিন থেকে লাঞ্চ প্যাক করে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে।
৭. যাওয়ার সময়ে কিছু গরম জামাকাপড় সঙ্গে রাখা ভালো কারণ নিউ জলপাইগুড়িতে গরম থাকলেও যত পাহাড়ে ওঠা হবে তত ঠান্ডা লাগবে। আর গরম জামাকাপড় স্যুটকেসে ঢোকানো থাকলে দার্জিলিঙ পৌঁছনোর আগে সেগুলো বের করার সুযোগ নেই।
৮. নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিঙ পৌঁছনোর সময়সীমা সাড়ে সাত ঘন্টা হলেও ট্রেনের পৌঁছতে সাড়ে আট থেকে নয় ঘন্টা প্রায় প্রতিদিনই লেগে যায়। পুরো পথটাই ট্রেন একটা নির্দিষ্ট গতিতে চলে আর সেটা কখনোই ঘন্টায় ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটারের বেশি নয়।
৯. দার্জিলিঙ যাওয়া বা ফেরার পথে টয়ট্রেন চড়ার ইচ্ছে থাকলে সেটা যাওয়ার সময় করাই ভালো। টয়ট্রেন প্রায়শই অনেক দেরি করে, কাজেই নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছে যদি ওই দিনই ফেরার ট্রেন ধরার পরিকল্পনা থাকে তাহলে ট্রেন মিস হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকবে।
১০. দার্জিলিঙ স্টেশন থেকে হোটেল যদি হাঁটা দূরত্বে না হয় তাহলে গাড়ি আগে থেকেই বুক করা ভালো। স্টেশনের গাড়ি বুক করতে গেলে তারা অনেক বেশি ভাড়া চাইতে পারে।
উপসংহার ঃ
![]() |
| দার্জিলিঙ হিমালয়ান রেলওয়ে |
দার্জিলিঙ হিমালয়ান রেলওয়ে ভ্রমণের আরো ছবি দেখতে হলে click here.










No comments:
Post a Comment