আমি ব্লগ লেখার খুব বেশি সমর্থক কোনওদিনও ছিলাম না, সত্যি কথা বলতে কি এখনও যে আছি তা নয় । তার একটা প্রধান কারণ আমার ধারণা ব্লগ লেখার থেকেও পড়া অনেক বেশি ক্লান্তিকর । অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অনেক সময়ই পড়তে শুরু করে শেষ করা হয়ে ওঠে না । নিজের ধৈর্য এবং/অথবা আগ্রহের অভাবকে 'ঠিক আছে, বাকিটা পরে পড়ব' জাতীয় অজুহাত দিয়ে ঢেকে দিই - আর আমরা সবাই জানি সেই 'পরে' টা আর কখনওই আসে না । তো, এই কারণে আমি ঠিক করেছি আমার ব্লগকে কখনওই অন্যের ক্লান্তির কারণ ঘটাব না, আমার ব্লগের বিষয় হবে প্রধানতঃ ভ্রমণ । আমার মতো যেসব বাঙালিরা ঘুরতে ভালোবাসে, তাদের জন্য আমার ব্লগ হবে তথ্যের একটা উৎস । আমার নিজের একটা অভ্যেস আছে, কোনও জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার আগে সেই জায়গাটা সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, আর ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে আমার বরাবরই মনে হয়েছে যে ইন্টারনেটে লেখালেখি করার ব্যাপারে বাঙালিদের থেকে কুঁড়ে খুব কম শিক্ষিত জাতই আছে । আমার মতো যেসব বাঙালিরা আছে, যারা ইন্টারনেটে কোনো একটা ইংরিজীতে লেখা দেখলেই না পড়ার চেষ্টা করে, তাদের জন্য আমার ব্লগ সহায়ক হবে, এই বিশ্বাস নিয়ে শুরু করছি আমার ভ্রমণকাহিনী । আগেই বলে রাখি, আমি স্ট্যাটিসটিক্সের ছাত্র ছিলাম, তাই আমার ব্লগে তত্ত্বের থেকে তথ্যের দেখাই মিলবে বেশি ।

Thursday, January 1, 2026

মুরগুমা ভ্রমণ

ভ্রমণপথ ঃ

সোমবার ২৯শে ডিসেম্বর, ২০২৫ঃ সকাল ৭ঃ৪৫ মিনিটে কলকাতা থেকে গাড়িতে যাত্রা করে সন্ধ্যে ৬ টায় মুরগুমা - মুরগুমায় রাত্রিবাস।

মঙ্গলবার ৩০শে ডিসেম্বর, ২০২৫ঃ দুপুর ১২ টায় গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে সাইট সিয়িং - মুরুগুমায় রাত্রিবাস।

বুধবার ৩১শে ডিসেম্বর, ২০২৫ঃ সকাল ১০ঃ৩০ মিনিটে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে সাইট সিয়িং - মুরুগুমায় রাত্রিবাস ।

বৃহস্পতিবার ১লা জানুয়ারী, ২০২৬ঃ সকাল ১১ টায় মুরুগুমা থেকে বেরিয়ে রাত্রি ৯টায় কলকাতা।

মুরগুমা জায়গাটার নাম আমি প্রথম শুনেছিলাম ২০০৮ সালে - আমার কয়েকজন কলিগ্‌ ওখানে বেড়াতে গিয়েছিল। তারপর এত বছর পরেও জায়গাটা সেরকম কিছু বিখ্যাত নয়, অনেকেই এখনও মুরগুমার নাম জানে না। যারা জানে না তাদের জানিয়ে রাখি মুরগুমা আমাদের পশ্চিমবঙ্গের প্রান্তিক জেলা পুরুলিয়ায় অবস্থিত একটা গ্রাম। পুরুলিয়া জায়গাটা আমাদের খুবই ভালো লাগে - এর আগে দু'বার এসে বরন্তি আর গড় পঞ্চকোট ঘুরে গিয়েছি। তাই ডিসেম্বরের শেষে, যে সময়ে যেকোনও ট্যুরিস্ট স্পটেই লোকজন গিজগিজ করে, সেই সময়ে বেড়ানোর জন্য অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত এই জায়গাটার নামই মাথায় এল। কলকাতা থেকে ৩৫০ কিলোমিটার দূরে এই মুরুগুমায় তিনদিনের ভ্রমণ নিয়েই আমার ব্লগের এবারের পোস্ট।

আমাদের এবারের দলের সদস্যরা হল আমি অমৃতা বাবা মা কথা কলি লালমাসি মেসোমশাই দিদিভাই রাজীবদা মাসিমা আর মেসোমশাই। এছাড়া জয়ন্তদা আর মানসীদি (মোমের শ্বশুরমশাই আর শ্বাশুড়ি মা) ভ্রমণের মাঝে আমাদের সঙ্গে একটা দিন কাটিয়ে গিয়েছিলেন। সেই হিসেবে আমাদের দলের সদস্যসংখ্যা ১২ + ২ = ১৪। সোমবার ২৯শে ডিসেম্বর, ২০২৫ সকাল আটটা নাগাদ আমরা আমাদের গাড়ি নিয়ে কলকাতা থেকে রওনা দিলাম। আমাদের প্রথম মীটিং পয়েন্ট ১৬ নং জাতীয় সড়কের উপর অঙ্কুরহাটি। এখানে আমরা দিদিভাইদের গাড়ির সঙ্গে মীট করলাম আর তারপর আরও এগিয়ে চললাম। এরপর আমরা লালমাসি আর মেসোমশাইকে মীট করলাম কোলাঘাটের কাছে।

এখানে জানিয়ে রাখি কলকাতা থেকে মুরগুমা যাওয়ার বেশ কয়েকটা রাস্তা আছে যার মধ্যে কলকাতা - ডানকুনি - ১৯ নং জাতীয় সড়ক - রানীগঞ্জ - মুরুগুমা এই পথে গেলে নূন্যতম সময় লাগে। কিন্তু যেহেতু লালমাসিরা আমাদের সঙ্গে যাওয়ার ছিল, তাই আমরা কলকাতা - কোনা এক্সপ্রেসওয়ে - ১৬ নং জাতীয় সড়ক - মেদিনীপুর - ৫ নং রাজ্য সড়ক - মুরগুমা এই পথে গিয়েছিলাম। এই পথে গেলে দূরত্ব প্রায় একই, তবে সময় কিছুটা বেশি লাগে।

লালমাসিরা গাড়িতে ওঠার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই আমরা দেউলিয়া বাজারের কাছে থামলাম ব্রেকফাস্ট করার জন্য। রেস্ট্যুরেন্টের নাম সন্দীপা। এখানে আলুর পরোটা আর ধোসা দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে নেওয়া হল। খাবারের মান বেশ ভালো। সবমিলিয়ে আমাদের খরচ পড়ল ১,১০০/- টাকা।

চলার পথে - একটু থেমে
এরপর আবার এগিয়ে চলা। ১৬ নং জাতীয় সড়ক দিয়ে মেদিনীপুর পর্যন্ত যাওয়ার পরে আমরা ঢুকলাম মেদিনীপুর শহরের ভিতরে - এখানে স্বভাবতই গাড়ির গতি অনেক কমাতে হল। প্রকৃতপক্ষে বাকি রাস্তায় আর কোথাও আমরা আর খুব বেশি জোরে চালাতে পারিনি কারণ রাজ্যসড়ক সাধারণতঃ অপেক্ষাকৃত কম চওড়া পথ-বিভাজক বিহীন হয় আর সেইসঙ্গে রাস্তায় খানাখন্দ থাকে। যাই হোক, গাড়ির দূর্দান্ত গতি উপভোগ করতে না পারলেও রাস্তার দুপাশের ক্রমপরিবর্তনশীল প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী আমরা যথেষ্টভাবে উপভোগ করেছি। সকালে হেভি ব্রেকফাস্ট করে সবারই পেট অল্পবিস্তর ভর্তি ছিল আর গাড়িতে কেক, বিস্কুট ইত্যাদি খাবারও বিপুল পরিমাণে ছিল যার সদ্ব্যবহার আমরা মাঝে মাঝে করছিলাম। তাই লাঞ্চের জন্য আর কোথাও না দাঁড়িয়ে আমরা এগিয়ে চললাম আমাদের গন্তব্যের দিকে।

মুরুগুমায় আমাদের বুকিং ছিল পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের 'মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টি'-তে। এখানে পৌঁছনোর পথের শেষ অংশটার সম্পর্কে একটু বিস্তারিত লেখা দরকার। বেগুনকোদর থেকে ৩.৮ কিলোমিটার যাওয়ার পরে গুগ্‌ল্‌ ম্যাপ একটা জায়গায় ডানদিকে যেতে বলছিল (এখানে মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টি-র একটা তীরচিহ্নযুক্ত সাইনবোর্ডও আছে) কিন্তু এখানকার সাধারণ মানুষ আমাদের জানালেন এই পথটা একমুখী, অর্থাৎ ট্যুরিজম প্রপার্টি থেকে বেরোনোর সময়ে এই পথ ব্যবহার করা যায়, কিন্তু ঢোকার সময়ে করা যায় না। আমাদের আরও এগিয়ে 'বাঁধের রাস্তা' ধরতে হবে। সন্ধ্যে হয়ে গেছে, রাস্তায় কোনও আলো নেই, গাড়ির হেড্‌লাইটই সম্বল। রাস্তাটাও সরু। এই পথে ১ কিলোমিটার মতো চলার পরে ডানদিকে একটা হেয়ারপিন বেন্ড টার্ণ নিয়ে আমরা উঠে পড়লাম বাঁধের উপরে। এই বাঁধের উপরের রাস্তাটা রাতের অন্ধকারে রীতিমতো রোমাঞ্চকর কারণ আমাদের বাঁদিকে সুবিশাল মুরগুমা লেক আর ডানদিকের পাড় ঢালু হয়ে নেমে গেছে। রাস্তাটা বাঁধানোও নয়, সুরকির। সেইসঙ্গে বেশ সরু - এখানে পাশাপাশি দুটো গাড়ি চলতে পারে না। রাস্তায় কোনও আলোও নেই। এই পথে গাড়ি চালানোর সময়ে চালককে খুব সতর্কভাবে চালাতে হবে কারণ একটু অসাবধান হলেই হয় বাঁদিকে জলের মধ্যে ঝপাং আর নাহয় ডানদিকে ঢালুপথে গড়াম !

বাঁধের এই রোমাঞ্চকর পথে ১.৭ কিলোমিটার চলার পরে সন্ধ্যে ৬ টা নাগাদ আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের গন্তব্যে। জায়গাটা খুব সুন্দর আর বেশ বড়। গাড়ি পার্কিং-এর একটা আলাদা ছাউনি দেওয়া জায়গা আছে। ঘরগুলোও সুবিশাল - ঘরের লাগোয়া একটা ছোট ব্যালকনি। আমরা আমাদের ঘরে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নিয়ে চা-টা খেয়ে নিলাম।

রাত সাড়ে নটা নাগাদ আমরা ডিনার করতে ডাইনিং এরিয়ায় গেলাম। রিসর্টটা দেখে এমনিতে ফাঁকা ফাঁকা লাগলেও আসলে এখানে সব ঘরেই গেস্ট রয়েছে - শুধুমাত্র প্রচন্ড ঠান্ডার কারণে সবাই ঘরের ভিতরেই রয়েছে। এটা আরও বেশি করে বুঝতে পারলাম ডাইনিং এরিয়ায় গিয়ে কারণ ভিতরটা পুরো ভর্তি। কিছুক্ষণ পরে জায়গা ফাঁকা হলে আমরা ডিনার করে নিলাম। ভাত-রুটি-ডাল-তরকারি-ডিম-চিকেন দিয়ে ডিনার করতে খরচ হল ২,৩৭৩/- টাকা।

পুরুলিয়ার তাপমাত্রা কলকাতার থেকে বেশ কিছুটা কম। রাতে সাড়ে দশটার সময়ে আমরা যখন ডাইনিং এরিয়া থেকে নিজেদের ঘরে ফিরছি, তখন রীতিমতো ঠান্ডা। এখানে মোবাইলের নেটওয়ার্ক সেভাবে কাজ করে না (কোনও সার্ভিস প্রোভাইডারেরই না), তাই যখন একটু আধটু নেটওয়ার্ক পাওয়া গেল, তখন দেখা গেল তাপমাত্রা ৮ - ৯ ডিগির মতো।

মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টির ভিতরে
পরেরদিন মঙ্গলবার ৩০ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ - আমরা সকালে উঠে ব্রেকফাস্ট সেরে নিলাম। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের প্রায় সবকটা প্রপার্টিতেই ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টারি আর এরা খাবার দেয়ও অনেকটা পরিমাণে। ব্রেকফাস্টে দুরকম অপশন - পুরী সব্জি অথবা ব্রেড বাটার / জ্যাম। এরসঙ্গে একটা কলা, দুটো ডিম (সিদ্ধ / ওমলেট / পোচ) আর চা অথবা কফি। সবমিলিয়ে পেট বেশ ভালোরকম ভরে যায়।

ওয়াচ্‌টাওয়ারের উপর থেকে
ব্রেকফাস্ট করার পরে আমরা অপেক্ষা করছিলাম জয়ন্তদা আর মানসীদির জন্য, তাই এই সময়ে রিসর্টের ভিতরটা একটু ঘুরে দেখলাম। এখানে একটা ওয়াচ্‌ টাওয়ার আছে যার উপরে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গিয়ে বেশ অনেকটা দেখতে পাওয়া যায়। আমাদের রিসর্টের সামনেই মুরগুমা লেক কিন্তু কুয়াশার জন্য খুব একটা স্পষ্টভাবে দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল না। আমরা ওয়াচ্‌ টাওয়ারের উপরে কিছু ছবিটবি তুলে নিচে নেমে এলাম।

জয়ন্তদা আর মানসীদি পৌঁছলেন সাড়ে এগারোটা নাগাদ। ওনারা বেরোনোর জন্য তৈরিই ছিলেন, তাই ওনাদের মালপত্র ঘরে রাখা হয়ে গেলে আমরা সবাই একসঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম সাইটসিয়িং করতে।

পিটিডিরি ঝর্ণা - মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টি থেকে পিটিডিরি ঝর্ণার দূরত্ব মাত্র ১০ কিলোমিটার কিন্তু রাস্তাটা তেমন সুবিধের নয়। পাহাড়ী পথে জঙ্গল ও গাছপালার মধ্যে দিয়ে একটা সিঙ্গল লেন প্রচন্ডভাবে এঁকেবেঁকে এগিয়ে চলেছে - হঠাৎ করে উল্টোদিক থেকে গাড়ি এলে বেশ মুশকিলে পড়তে হয়। রাস্তাটা মোটামুটি ভদ্রস্থ হলেও জায়গায় জায়গায় বেশ ভাঙাচোরা আছে। গুগ্‌ল্‌ ম্যাপ দেখে ঝর্ণার কাছে পৌঁছতে আমাদের প্রায় ৩০ মিনিট লেগে গেল।

গাড়ি রাখার জায়গা থেকে ঝর্ণাটা আরও কিছুটা হেঁটে যেতে হয় আর সেই পথটা বেশ কিছুটা উঁচুনিচু। দু'একজায়গায় সামান্য কসরৎও করতে হয়। পায়ের সমস্যা যাদের আছে, তাদের এই পথে না যাওয়াই অভিপ্রেত।

পিটিডিরি ঝর্ণা
ঝর্ণাটা বেশ সুন্দর। আর এই শীতকালেও জলের বেশ স্রোত আছে। ঝর্ণাটা এখানে একটা বড় পাথরের উপর থেকে নিচে একটা জলধারার উপরে পড়ছে। ঝর্ণার বিপরীত দিকে পাথরের উপর দাঁড়িয়ে বসে ঝর্ণার দৃশ্য উপভোগ করা যায়। আমরা এখানে বসে দাঁড়িয়ে বেশ কিছু ছবি তুলে নিলাম। তারপর আবার সেই চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ফিরে এলাম গাড়ি রাখার জায়গায়।

মাচকান্দা ঝর্ণা
মাচকান্দা ঝর্ণা - এরপর আমাদের গন্তব্য মাচকান্দা ঝর্ণা। পিটিডিরি থেকে মাচকান্দার দূরত্ব ২.৫ কিলোমিটার কিন্তু রাস্তা সেই একইরকম অপ্রসস্ত। এখানে গাড়ি রাখারও আলাদা কোনও দরকার নেই, রাতার মধ্যেই একটা অপেক্ষাকৃত চওড়া জায়গায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে আমরা ঝর্ণার পথে হাঁটতে শুরু করলাম। মাচকান্দার পথটা পিটিডিরির মতো দুর্গম নয়, একটা ঢালু পথ নিচের দিকে নেমে গেছে। সেই পথে কয়েক জায়গায় গাছের শিকড় আর পাথর দিয়ে সিঁড়ির ধাপের মতো হয়ে গেছে। এই পথ দিয়ে নিচে নেমে গেলে একটা ভিউ পয়েন্ট পড়ে আর সেখান থেকে ঝর্ণাটা দেখা যায়। এখান থেকে ঝর্ণাটা অনেকটাই দূরে কিন্তু এটাই মাচকান্দা ঝর্ণা দেখার জায়গা। আমরা ঝর্ণা দেখে রওনা দিলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের দিকে।



মাচকান্দা ঝর্ণা থেকে আমাদের গন্তব্য ছিল খয়রাবেড়া ড্যাম। মাচকান্দা থেকে খয়রাবেড়া যাওয়ার দুটো রাস্তা আছে, একটা আমরা যে পথে পিটিডিরি থেকে এসেছি আর অন্যটা আমরা যেদিকে যাচ্ছি। এই সরু রাস্তায় গাড়ি উল্টোদিকে ঘোরানো প্রায় অসম্ভব ব্যাপার, তাই আমরা আরও এগোনোই ঠিক করলাম। রাস্তা দুদিক দিয়ে গেলেই প্রায় ২০ কিলোমিটারের মতো।

গ্রামের বাড়ির নক্সা করা দেওয়াল
আমরা আরও এগিয়ে চললাম সেই সরু রাস্তা ধরে। সরু রাস্তা মাঝে মাঝে চওড়া হচ্ছে আর সেখানে কিছু লোকবসতি। এখানকার মানুষ মাটির বাড়ির গায়ে রঙ দিয়ে সুন্দর নক্সা বা আলপনা করে রাখে। এটা প্রায় সব গ্রামের সব বাড়িতেই দেখা যায়। দেখতে খুব সুন্দর লাগে।

আবার সরু পাহাড়ী রাস্তা ধরে আমরা এগিয়ে চলেছি। দুধারে জঙ্গল। রাস্তা সারাক্ষণ ডানদিক বাঁদিকে ঘুরছে। রাস্তায় আমাদের তিনটে গাড়ি পরপর চলছে আর আমি শুধু গুগ্‌ল্‌ ম্যাপের উপর নির্ভর করে এগিয়ে চলেছি। রাস্তায় আর অন্য কোনও গাড়িও দেখা যাচ্ছে না। এইভাবে প্রায় একঘন্টা ধরে ১৬ কিলোমিটার চলার পরেও আমরা খয়রাবেড়া ড্যাম পেলাম না তবে একটা বেশ উঁচু ওয়াচ্‌ টাওয়ার দেখতে পেলাম।

খয়রাবেড়া ওয়াচ্‌ টাওয়ার
খয়রাবেড়া ওয়াচ্‌ টাওয়ার - চলার পথে উঁচু ওয়াচ্‌ টাওয়ারটা দেখে গাড়ি দাঁড় করালাম। এখানে রাস্তার পাশে কিছুটা জায়গা আছে যেখানে আমাদের তিনটে গাড়ি দাঁড়ানোর জায়গা হয়ে গেল। একটা বাঁধানো সমতল জায়গাকে লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা রয়েছে আর তার মাঝখানে রয়েছে টাওয়ারটা। লোহার রেলিং-এর মাঝে একটা গেট, সেটা খোলাই আছে। আমরা সেই গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। এখানে আর কোনও মানুষও নেই, কাজেই উপরে ওঠা চলবে কিনা জানারও কোনও উপায় নেই। অনুমতি নেওয়ার যখন কোনও উপায় নেই, তাই উপরে ওঠাই ভালো ! টাওয়ারটা তিনতলা, আর গায়ে ঘোরানো সিঁড়ি। আমরা উপরে উঠে দেখলাম চমৎকার দৃশ্য। সামনে পাহাড়, বড় বড় গাছের জঙ্গল আর সেই গাছপালার মধ্যে দিয়ে দেখা যাচ্ছে একটা বেশ বড় জলাশয় - বুঝলাম ওটাই খয়রাবেড়া ড্যাম আর তার মানে আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেটা খয়রাবেড়া ওয়াচ্‌ টাওয়ার। আমাদের কারুর ফোনের অনেকক্ষণ ধরে নেটওয়ার্ক ছিল না, এই ওয়াচ্‌ টাওয়ারে উঠতেই পটাপট নেটওয়ার্ক চলে এল। আমরা কিছুক্ষণ এখানে থেকে নেমে এলাম।

এখানে জানিয়ে রাখি এইসব ভিতরের দিকের রাস্তায়ও বেশিরভাগ জায়গাতেই ফোনের নেটওয়ার্ক থাকে না বা থাকলেও ইন্টারনেট পাওয়া যায় না। তাই যদি গুগ্‌ল্‌ ম্যাপ দেখে ঘোরাঘুরি করার পরিকল্পনা থাকে, তাহলে একবার জিপিএস চালু করে আর কিন্তু ভুলেও সেটা বন্ধ করা যাবে না, তাহলে এই গোলকধাঁধায় পথ হারানোর সম্ভাবনা প্রবল। আর এখানে মানুষের যাতায়াত এতই কম, যে রাস্তা হারিয়ে ফেললে সঠিক রাস্তা বাৎলে দেওয়ার মতো কাউকে পেতে হলেও দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হতে পারে।

দুপুর প্রায় সাড়ে তিনটে বাজে, সবারই খিদে পেয়েছে কিন্তু এই পাহাড়-জঙ্গলের মধ্যে খাবার পাওয়া অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছিল। আর খাবার পাওয়ার মতো জায়গা এখান থেকে কতদূরে, সেটাও সঠিকভাবে জানার কোনও উপায় নেই। যাই হোক, সামান্য দুমিনিট এগোতেই একটা জায়গায় এসে পৌঁছলাম যেখানে দুতিনটে হোটেল রয়েছে। দেখে বুঝলাম এখান থেকে ডানদিকে খরয়াবেড়া ড্যাম যাওয়ার রাস্তা আর তাই এখানে এরা কয়েকটা হোটেল খুলে বসেছে। খোঁজ নিয়ে জানলাম ভেজ থালি, এগ্‌ থালি, ফিশ থালি, চিকেন থালি সবই পাওয়া যাবে। ব্যাস, গাড়ি দাঁড় করিয়ে 'আক্রমণ !!!' বলে আমরা নেমে পড়লাম।

ডাইনিং এরিয়া
খাবারের অর্ডার দিয়ে বসে রইলাম। সব রান্না রেডি থাকে না আর তারপর ১৪ জনের মতো রান্না এইসব হোটেলে চট্‌ করে গিয়ে চাইলেই পাওয়া যায় না। খাওয়ার জায়গাটা হোটেলের লাগোয়া খোলা মাঠের মধ্যে। শীতের বিকেলের পড়ন্ত আলোয় এখানে বসে থাকতে খুব ভালো লাগছিল। পিছনে দেখা যাচ্ছে একটা বেশ বড় পাহাড়। এটা ছোটনাগপুর মালভূমির বিখ্যাত পাহাড় চামতাবুরু। আর তার নামেই হোটেলের নাম 'চামতাবুরু হোটেল অ্যান্ড রিসর্ট'। মিনিট পনেরো পরে খাবার এল। আমি সাধারণতঃ এরকম পথচলতি খাওয়ার হোটেলের নাম ব্লগে উল্লেখ করি না, কিন্তু এটা করলাম। এদের খাবারের মান অসাধারণ ! শুধু খিদের মুখে খেয়েছি বলে নয়, হোটেলের রান্না সত্যিই খুব ভালো। আর সবমিলিয়ে আমাদের খরচ পড়ল ১,৭০০/- টাকা। আমি আমার ব্লগের পাঠকদের বলছি যদি কখনও খয়রাবেড়া ড্যাম দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকে, তাহলে চামতাবুরু হোটেল অ্যান্ড রিসর্টের খাবার একবার খেয়ে দেখতেই হবে।

এবার খয়রাবেড়া ড্যাম। খাওয়ার জায়গা থেকে ড্যামটা খুবই কাছে, গাড়ি চালিয়ে আমাদের মিনিট পাঁচেক লাগল। আর ড্যামের কাছে পৌঁছে দেখলাম যেন মেলা বসেছে ! এতক্ষণ রাস্তায় লোকজন দেখতে পাইনি, এখন মনে হল যত রাজ্যের পর্যটক যেন এখানেই জড়ো হয়েছে। এরমধ্যে পুরুলিয়ার স্থানীয় বাসিন্দাও আছে। এমনই ভীড়, যে গাড়ি পার্কিং-এর জন্য অনেকটা ভিতরে ঢুকতে হল। যাই হোক, গাড়ি পার্কিং করে আমরা ড্যামটা দেখতে গেলাম।

খয়রাবেড়া ড্যাম
খয়রাবেড়া ড্যাম - খয়রাবেড়া ড্যামটা বেশ বড়। ড্যামের একপাশে একটা বড় দেওয়াল তুলে একটা রিসার্ভার বা জলাধার তৈরি করা হয়েছে। এই দেওয়ালের মধ্যে একজায়গায় আছে ল্‌কগেট যার ফাঁক দিয়ে সরু জলের ধারা ড্যাম থেকে জলাধারে ঢুকছে। সেই জল আবার জলাধার থেকে একটা সরু খালের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। ড্যামের উপরের এই রাস্তাটা দিয়েই হেঁটে হেঁটে ঘুরতে হয়। রাস্তাটা খুব চওড়া নয়, তবে বাইক চলাচল করে। এই রাস্তার উপরেই বেশ ভীড়, বিশেষ করে সূর্যাস্তের সময়ে লাল সূর্যের সামনে ছবি তোলার একটা হিড়িক অনেকের মধ্যেই থাকে। অনেক ফেরিওয়ালা এখানে জিনিসপত্র বিক্রি করছে। আমরা এই রাস্তাটা দিয়ে হেঁটে হেঁটে একেবারে শেষপর্যন্ত গিয়ে লক্‌গেটটা দেখে এলাম। বিকেলের আলো পড়ে গেছে, দূরে ড্যামের জলের উপরে কুয়াশা। বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছিল। আমরা এখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে আবার গাড়িতে এসে উঠলাম।

এবার ফেরার পালা। খয়রাবেড়া থেকে যখন রওনা দিলাম তখন বিকেল সাড়ে পাঁচটা। বিকেল বলছি যদিও কিন্তু ডিমেম্বরের শেষে এই সময়টাকে বিকেল বলা চলেনা মোটেই, প্রায় অন্ধকার হয়ে গেছে। খয়রাবেড়া ড্যাম এলাকায় মোবাইলের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়, তাই আবার ম্যাপে জিপিএস ঠিক করে নিলাম। ম্যাপ যদিও বলছে এখান থেকে আমাদের রিসর্টের দূরত্ব ২৪ কিলোমিটার আর যেতে ঘন্টাখানেক লাগবে, কিন্তু সেই ২৪ কিলোমিটারের রাস্তাটা সকালের মতো অর্থাৎ পাহাড়ী আঁকাবাঁকা পথ, জনমানবহীন, জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এবং ফোনের নেটওয়ার্কবিহীন। এই রাস্তা দিয়ে রাত্রিবেলা ফেরাটা খুব বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তাই আমরা গুগ্‌লের নির্দেশিত পথে না গিয়ে কিছুটা অনুমানের উপর নির্ভর করে বুরদা বলে একটা জায়গায় পৌঁছলাম। সেখান থেকে করেং হয়ে ঝালদা-বাঘমুন্ডি রোড ধরে ঝালদা। সেখান থেকে বেগুনকোদর হয়ে মুরগুমা। সবমিলিয়ে রিসর্টে পৌঁছতে লাগল প্রায় দুঘন্টা আর ২৪ এর জায়গায় ৫০ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করতে হল। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে রাতের অন্ধকারে ঝালদা-বাঘমুন্ডি রোডের সৌন্দর্য মনমুগ্ধকর। আকাশে চাঁদের হাল্কা আলো, মাখনের মতো রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলেছে আর গাড়িতে চলছে হাল্কা মেলোডি। এককথায় অনবদ্য !

সন্ধ্যেবেলা রিসর্টে ফিরে একটু চা / কফি আর চিকেন পকোড়া খাওয়া হল। খরচ পড়ল ১,৮৭৪/- টাকা। রাতের ডিনারটা একটু স্পেশাল করা হল - ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন। সেই সঙ্গে পনীর বাটার মশালা ইত্যাদিও নেওয়া হল। সবমিলিয়ে খরচ হল ৩,১০৪/- টাকা। খাওয়ার পরে যে-যার কটেজে ফিরে এলাম।

বুধবার ৩১শে ডিসেম্বর, ২০২৫ আমাদের আরেকটা সাইটসিয়িং-এর দ্বিতীয় দিন। সকালে উঠে যথারীতি ব্রেকফাস্ট করতে গেলাম এবং যথারীতি পেট ঠেসে খেয়ে ফেললাম। সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ আমরা সবাই একসঙ্গে হোটেল থেকে বেরোলাম। জয়ন্তদা আর মানসীদি বাড়ির পথে রওনা হলেন আর আমরা সাইটসিয়িং-এর পথে।

গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে সেই জায়গাটায় এলাম যেখান থেকে হেয়ারপিন বেন্ড টার্ণ নিয়ে মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টিতে পৌঁছতে হয়। আজ সেখান থেকে টার্ণ না নিয়ে সোজা এগিয়ে একটা পাহাড়ী পথে উঠতে শুরু করলাম। মিনিট সাতেক চলার পরে দাঁড়ালাম আমাদের প্রথম গন্তব্যে।

ভিউ পয়েন্ট থেকে মুরগুমা ড্যাম
মুরগুমা ড্যাম ভিউ পয়েন্ট - আমাদের রিসর্ট থেকে এখানে পোঁছতে লাগল পনেরো মিনিট। এখানেও গাড়ির ভীড়। যাই হোক পাহাড়ী পথের ধারে একটা জায়গামতো গাড়িগুলো রেখে আমরা ভিউ পয়েন্টের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। রাস্তা থেকে ভিউ পয়েন্টটা হেঁটে দশমিনিট মতো লাগে। প্রায় পুরো রাস্তাটাই সমতল তবে শেষের কিছুটা যাওয়ার জন্য পাহাড়ের ধাপে ধাপে সিঁড়ির মতো উঠতে হয়। তারপর আবার একটা সমতল চত্বর - এটাই ভিউ পয়েন্ট। এখানকার দৃশ্য দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। এখান থেকে সম্পূর্ণ মুরুগুমা ড্যাম বা মুরগুমা লেকটা দেখা যায়। লেকটা সুবিশাল। আর দেখার জায়গাটা বেশ অনেকটা উঁচু হওয়ায় দেখতে খুব সুন্দর লাগে। শীতকাল বলে হাল্কা কুয়াশা হয়ে আছে তাই দৃশ্যটা পরিষ্কার নয়, কিন্তু তাতেও যা দেখলাম তা অপূর্ব ! আমরা এখানে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আবার গাড়ির কাছে ফিরে এলাম।

আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছলছলিয়া ঝর্ণা। মুরগুমা ভিউ পয়েন্ট থেকে গাড়িতে কুড়ি-পঁচিশ মিনিট চলার পরে এখানে পৌঁছনো যায়। ম্যাপ দেখে আমরা ঠিকই যাচ্ছিলাম, কিন্তু যেখানে পৌঁছলাম সেখানে একজন স্থানীয় লোককে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম ছলছলিয়া ঝর্ণা বর্তমানে আর দেখা যায় না, সেখানে দেখার মতো আর কিছু নেই। তাই এই জায়গাটা আমাদের ঘোরার লিস্ট থেকে বাদ দিতে হল। আমরা গাড়ি ঘুরিয়ে এগোতে শুরু করলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যে। এই যাওয়ার রাস্তাটা একেক জায়গায় বেশ খারাপ, পিচের রাস্তা ভেঙে গিয়ে রীতিমতো মাটির রাস্তা দিয়ে চলতে হয়। এখন শীতকাল বলে মাটি শক্ত, কিন্তু বর্ষাকালে এই রাস্তা দিয়ে আদৌ যাতায়াত করা সম্ভব কিনা জানিনা। কিন্তু এটাই একমাত্র রাস্তা, এছাড়া অন্য কোনও রাস্তাও নেই।

মার্বেল লেকের সামনে আমাদের কয়েকজন
মার্বেল লেক - ছলছলিয়া ঝর্ণা থেকে প্রায় পঁয়ত্রিশ মিনিট গাড়ি চালিয়ে পৌঁছলাম মার্বেল লেকে।  এখানেও বেশ ভীড়। রাস্তার পাশে গাড়ি থামিয়ে আমরা মার্বেল লেক দেখতে গেলাম। রাস্তা থেকে সামান্য হেঁটে গেলেই গভীর লেকটা চোখে পড়ে। লেকের পাড়টা বেশ উঁচু, আর লেকের অনেক নিচে জল। চাইলে ধাপে ধাপে নেমে একেবারে নিচে জলের কাছেও যাওয়া যায়, তবে অনেকটা সময় লাগবে বলে আমরা আর নিচে নামিনি। মার্বেল লেক কিন্তু সত্যিকারের মার্বেল বা শ্বেতপাথরের নয় (প্রকৃতপক্ষে মার্বেলের খনি পশ্চিমবঙ্গে কোথাও নেই) আর এই লেকটা প্রাকৃতিক লেকও নয়। আশেপাশের বিভিন্ন জলাধার নির্মাণের জন্য এখান থেকে মাটি কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আর তার ফলে এখানে গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এই গর্তের দেওয়ালের পাথরের রঙ সাদা এবং ধূসর বলে এর নাম মার্বেল লেক হয়ে গেছে।

ময়ূর পাহাড়ের উপরে
ময়ূর পাহাড় - মার্বেল লেক থেকে মিনিট কুড়ি চলার পরে পৌঁছলাম ময়ূর পাহাড়ে। এই এলাকায় একসময়ে প্রচুর সংখ্যক ময়ূর পাওয়া যেত, সেই থেকে পাহাড়ের এই নাম। অনেকের ধারণা পাহাড়ের আকার ময়ূরের মতো বলে এই নাম, কিন্তু সেটা ঠিক নয় (কার এরকম ধারণা আমি জানিও না, মনে হল কারুর এরকম ধারণা থাকলেও থাকতে পারে, তাই লিখলাম !)। ময়ূর পাহাড়ের নিচে গাড়ি পার্কিং-এর জায়গায় গাড়ি রেখে আমরা উপরে উঠতে শুরু করলাম। প্রথমে পাথরের ধাপে পা দিয়ে কিছুটা উঠে একটা বেশ বড় সমতল জায়গা। তারপর সেখান থেকে আবার বাঁধানো সিঁড়ি দিয়ে পাহাড়ের একেবারে মাথায় ওঠা যায়। এই সিঁড়িগুলো খুব সুন্দর, এগুলোর উচ্চতা খুব কম তাই উঠতে গেলে একেবারেই কষ্ট হয় না। পাহাড়ের মাথায় উঠে চারদিকটা দেখতে খুবই ভালো লাগে। এখানে যাকে বলে ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ। এর আশেপাশে আর কোনও উঁচু পাহাড় নেই, চারপাশে শুধুই জঙ্গল।

দুপুর আড়াইটে বাজে অর্থাৎ লাঞ্চ টাইম। এই জায়গাটা বেশ লোকবসতিপূর্ণ, কয়েকটা হোটেল বা রেস্ট্যুরেন্টও আছে। সেরকমই একটা জায়গা থেকে এগ থালি, ফিশ থালি আর চিকেন থালি দিয়ে লাঞ্চ করা হল। খরচ হল ১,৩৬০/- টাকা। এই হোটেল থেকেই জানলাম এখান থেকে খুব কাছেই একটা দেখার জায়গা আছে, আর তার সম্পর্কেও কিছু তথ্য জানতে পারলাম। খাওয়ার পরে গাড়ি নিয়ে মিনিট পাঁচ-সাতেক চলার পরে পৌঁছলাম সেই দেখার জায়গায়।

সীতা কুন্ড
সীতা কুন্ড - গাড়ি থামিয়ে পাহাড়ের ধাপে অল্প কিছুটা নামার পর সীতাকুন্ড। এটা একটা পাথরের কুয়ো। এর বৈশিষ্ট্য হল এর জলস্তরের গভীরতা সবসময়ে একই থাকে। পুরাণমতে বনবাসের সময়ে এই জায়গায় এসে সীতাদেবীর খুব জলতেষ্টা পেয়েছিল। তখন লক্ষ্মণ তীর মেরে এখানে এই কুয়ো নির্মাণ করেন। আর সেই থেকে এর জল কখনও কমে না। জলের ভিতরে তাকালে দেখা যায় যে এর গভীরতা খুব বেশি নয়, বড়জোর কোমরজল হবে। আর নিচের কুয়োর ভিতরের মেঝেতে কয়েকটা জায়গায় সারাক্ষণ বুদ্বুদ হচ্ছে। এখানকার স্থানীয় লোকেরা বলে কুয়োয় পয়সা ফেলতে, তাতে কুয়োর ভিতরের এই বুদ্বুদ কখনও বন্ধ হবে না বা জল কখনও শেষ হয়ে যাবে না। বলা বাহুল্য, এটা সম্পূর্ণই গাঁজা ! পয়সা ফেলার সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই। এরকম জায়গা পৃথিবীতে অনেক জায়গাতেই আছে। এই জায়গার সঙ্গে ভূপৃষ্ঠের অনেক নিচের সরাসরি যোগাযোগ আছে আর সেখান থেকে প্রধানতঃ গরম হাওয়া সারাক্ষণ এখানকার কয়েকটা ফুটো দিয়ে বেরোতে থাকে। একইভাবে ভূপৃষ্ঠের নিচের জলস্তরের সঙ্গে এর সরাসরি যোগাযোগ থাকায় এর জলস্তর কখনও বাড়ে বা কমে না।

আমাদের পরবর্তী গন্তব্য অযোধ্যা পাহাড়ের আপার ড্যাম। গুগ্‌ল্‌ ম্যাপ দেখে ৬ কিলোমিটার পথ কুড়ি মিনিটে অতিক্রম করে আপার ড্যামের কাছে পৌঁছলাম, কিন্তু পুলিশ এখান দিয়ে আমাদের ঢুকতে দিল না। জানলাম ড্যামে গাড়ির ভীড় খুব বেশি হওয়ার কারণে এখন এই রাস্তায় একমুখী যানচলাচল করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের ড্যামে যেতে গেলে পাহাড়ের নিচের দিকের রাস্তাটা দিয়ে ঢুকতে হবে। ম্যাপ দেখে বুঝলাম এ'জন্য আমাদের আরও ১৭ কিলোমিটার ঘুরতে হবে অর্থাৎ এখান থেকে ৭০০ মিটার দূরে যাওয়ার জন্য ১৭ কিলোমিটার বেশি ঘুরতে হবে। অগত্যা !

সীতা কুন্ড থেকে এখানে আসার সময়ে একটা মোড় পড়েছিল, তার নাম আপার ড্যাম মোড়। এখান থেকে আমরা এবার বাঁদিকের রাস্তা ধরলাম। এই রাস্তা একেবারে পাহাড়ী রাস্তার মতো অর্থাৎ প্রচন্ড ডানদিক বাঁদিকে ঘুরছে তবে রাস্তা যথেষ্ট চওড়া আর সেইসঙ্গে খুবই মসৃণ। আমরা কিছুটা উঠে কিছুটা নেমে পৌঁছে গেলাম অযোধ্যা পাহাড়ের লোয়ার ড্যামের কাছে। তারপর আবার পাহাড় বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করলাম। এই রাস্তা আমাদের চেনা, এর আগেরবার বরন্তি ও গড়পঞ্চকোট ভ্রমণের সময়ে এখান দিয়েই আপার ড্যামে পৌঁছেছিলাম।

আপার ড্যাম থেকে বছরের শেষ সূর্যাস্ত
অযোধ্যা পাহাড় আপার ড্যাম - পাহাড়ী পথে উপরে উঠে দেখলাম আপার ড্যামের রাস্তায় যেন গাড়ির মেলা বসেছে ! আগেরবার যখন এসেছিলাম তখন এই জায়গাটা ছিল প্রায় ফাঁকা, আমরা ছাড়া প্রায় কোনও গাড়িই ছিল না। আর এবারে এত বেশি গাড়ি যে যদি একমুখী যানচলাচলের ব্যবস্থা না করা হত, তাহলে সত্যিই সাংঘাতিক যানজট হয়ে যেত। কোনওমতে একটা জায়গায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে গাড়ি থেকে নেমে একটু দাঁড়ালাম। বিকেল প্রায় পাঁচটা বাজে, সূর্যাস্ত হচ্ছে। ২০২৫ সালের শেষ সূর্যের শেষ কয়েকটা মূহুর্তকে ক্যামেরাবন্দী করছে কয়েকশো মানুষ। দেখতে দেখতে সূর্যাস্ত হয়ে গেল। শেষ হয়ে গেল ২০২৫ সালের শেষ দিবস - নিয়ে চলে গেল এ'বছরের যত ব্যর্থতা, নিরাশা, হতাশা, দুঃখ।

আমরা গাড়িতে উঠে এগিয়ে চললাম। আবার সেই জায়গাটা দিয়েই যেতে হল যেখান থেকে কিছুক্ষণ আগে ফিরে গেছি। আবার আপার ড্যাম মোড় থেকে আগের রাস্তাটা দিয়েই এগিয়ে চললাম। এইপথে মিনিট কুড়ি চলার পর পৌঁছলাম বামনি ঝর্ণার কাছে। একটু আগেই এখান দিয়ে গিয়েছি আর ভীড় দেখে গাড়ি থামাইনি। এবারেও পৌঁছে দেখলাম ভীড় বিশেষ কমেনি তাই গাড়ি থামালাম না, ফলে বামনি ঝর্ণা আমাদের সাইটসিয়িং-এর লিস্ট থেকে বাদ চলে গেল। আমরা আরও এগিয়ে চললাম।

তুর্গা ঝর্ণা
তুর্গা ঝর্ণা - বামনি থেকে মিনিট পাঁচেক চলার পরে পৌঁছলাম তুর্গা ঝর্ণার কাছে। এখান দিয়েও একটু আগে গিয়েছি। এখন দিনের আলো একটু কমলেও ভীড় কমেনি। গাড়ি রাস্তার ধারের দাঁড় করিয়ে তুর্গা ঝর্ণা দেখতে গেলাম। এখানে পাহাড়ের ধাপে ধাপে বেশ খাড়াই কিছুটা নামতে হয়। আমি কথা কলি নিচে নামলাম। ঝর্ণাটা বেশ সুন্দর। আর এখন শীতকালেও ভালোই জল আছে। জলটা বেশ কিছুটা উপর থেকে পড়ছে বসে জলের স্রোতও বেশ ভালোই। আমরা এখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে আবার উপরে উঠে এলাম।





তুর্গা ড্যাম - তুর্গা ঝর্ণা থেকে মিনিট পনেরো দূরে তুর্গা ড্যাম। কিন্তু সন্ধ্যে হয়ে আসছে, তাই আর গিয়ে খুব বেশি কিছু দেখা যাবে না বলে সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করলাম। কিন্তু আমরা যেখান দিয়ে রাস্তা থেকে তুর্গা ঝর্ণা দেখতে নেমেছি, সেখান থেকেই দূরে তুর্গা ড্যাম আবছা দেখা যাচ্ছিল। তাই এখান থেকেই যতটা সম্ভব দেখে নিলাম।

দোকানে নানান মুখোশের সমাহার
চরিদা মুখোশগ্রাম - মিনিট কুড়ি চলার পরে আমাদের পরবর্তী তথা শেষ গন্তব্য - চরিদা মুখোশগ্রাম। পুরুলিয়ার বৈচিত্র্যময় মুখোশের কথা সর্বজনবিদিত আর সেই মুখোশের একটা বড় অংশ তৈরি হয় এই চরিদা গ্রামে। এখানে এটা একটা কুটির শিল্পের পর্যায়ে পড়ে, হাজার হাজার মানুষ এখানে আসেন আর মুখোশ কিনে নিয়ে যান। এই মুখোশ প্রধানতঃ ঘর সাজানোর কাজেই ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া বিভিন্ন নাটক বা যাত্রাপালাতেও এর ব্যবহার হয়। এই মুখোশের বৈশিষ্ট্য হল এগুলো সম্পূর্ণই কাগজ দিয়ে তৈরি। অনেকগুলো কাগজকে জলে ভিজিয়ে শুকনো করে তারপর প্রয়োজনমতো কেটে নিয়ে বিভিন্ন আকার দিয়ে এর উপর রঙ চাপানো হয়। এই রঙও প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি করা হয়, এর মধ্যে কোনও কৃত্রিম রাসায়নিক নেই। আগেরবার অযোধ্যা পাহাড়ের উপরে এই মুখোশ বিক্রি হচ্ছিল, মাসিমা আমাদের কিনে উপহার দিয়েছিলেন। আর এবারে আমরা নিজেরাই পৌঁছে গেছি এর উৎপাদনস্থলে।

সৃষ্টিরত শ্রষ্টা
মুখোশ গ্রামে পৌঁছে দেখলাম এখানে একটা বেশ বড় ফাঁকা জায়গায় এরা পরপর মুখোশের দোকান করেছে আর সেখানে শিল্পী নিজেই বসে একটার পর একটা মুখোশ তৈরি করে চলেছেন, সাহায্য করছেন তাঁর বাড়ির মানুষেরা। তাঁরা নিজেরাই বিক্রেতা। বাঁশের কাঠামোর উপর ত্রিপল আর ভিতরে পলিথিন শিট লাগানো ছোট ছোট দোকান - সব দোকানে মোটামুটি একই জিনিস পাওয়া যায়। মুখোশের মুখ বেশিরভাগই ঠাকুরের, সেইসঙ্গে সাঁওতাল রমণী, পুরুষের মুখোশও আছে। আমরা ঘুরে ঘুরে দরদাম করে বেশ কয়েকটা মুখোশ কিনলাম।




সন্ধ্যে সাতটা বাজে, এবার ফিরতে হবে। ম্যাপ বলছে এখান থেকে আমাদের রিসর্টের দূরত্ব ৩৪ কিলোমিটার আর রাস্তাটা অযোধ্যা পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে, অর্থাৎ যে পথে এখানে এসেছি। কিন্তু দিদিভাই এই রাতের অন্ধকারে পাহাড়ী পথ দিয়ে যেতে কিছুতেই রাজী নয়, কাজেই উল্টোদিকের পথ ধরতে হল। সেই পথে রিসর্টের দূরত্ব ৫০ কিলোমিটার। সেই গতকালের পথই - করেং - ঝালদা - বেগুনকোদর হয়ে মুরুগুমা। রাস্তাটা আজও আগেরদিনের মতোই ভালো লাগছিল। তবে আমি গাড়ি চালাতে চালাতে খেয়াল করলাম ঝালদা পেরনোর একটু পরে একটা রাস্তা ডানদিকে ঢুকে গেছে, সেটা দিয়ে গেলে ২ কিলোমিটার মতো কম হবে। কমটা বড় কথা নয়, একটা নতুন রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে সেটাই বড় কথা। ঝালদা পেরিয়ে ঢুকে পড়লাম ডানদিকে - আমাদের গাড়ির পিছনে রাজীবদার গাড়ি।

রাস্তাটা অপেক্ষাকৃত সরু আর পিচেরও নয়, কংক্রিটের। রাস্তার দুধারে জঙ্গল। তবে রাস্তাটা পাহাড়ী নয়, সমতল। কিন্তু বেশ ভালোই আঁকাবাঁকা। কোথাও কোনও আলো নেই, বাড়িঘর নেই, মানুষজন নেই। হেডলাইটের আলোয় যা দেখা যায় সেই হিসেবেই গাড়ি চলছে কিন্তু ক্ষণে ক্ষণে রাস্তা বাঁক নেওয়ায় বেশি  দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। মোবাইলের নেটওয়ার্ক না থাকলেও জিপিএস চালু রয়েছে। ম্যাপ বলছে এখান থেকে রিসর্টের দূরত্ব ৮.২ কিলোমিটার। রাস্তাটা এতই সরু যেখান দিয়ে কেবলমাত্র একটা গাড়িই চলতে পারে। রাস্তার দুধারে মানুষ সমান উঁচু গাছ, ঘাস কিন্তু সেগুলো সমতল নাকি ঢালু হয়ে নিচে নেমে গেছে, সে'সম্পর্কে আমার কোনও ধারণা নেই। আমাদের পরপর দুটো গাড়ি চলেছে। মাঝে মাঝে ভাবছি যদি কোথাও পৌঁছে দেখি গাড়ি আর এগোনোর জায়গা নেই, তাহলে কী করব। এই রাস্তায় গাড়ি ঘোরানো যাবে না আর এই অন্ধকারে গাড়িকে পিছনে নিয়ে চালানোও অত্যন্ত বিপজ্জনক।

এইভাবেই চলতে থাকলাম। গাড়ির ভিতরে গান চলছে না, কারণ এই রাস্তায় চালানোর সময়ে গভীর মনঃসংযোগের প্রয়োজন, গান চললে সেটা করা কঠিন। আমাদের গাড়ির বাকি যাত্রীদের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে গতকাল আমরা এই রাস্তা দিয়ে ফিরেছি নাকি ফিরিনি - এই বিষয় নিয়ে। যারা বলছে 'গিয়েছি' তারা খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে রাস্তার নামারকম গাছপালা দেখিয়ে বলছে "এই তো, গতকাল তো এটা এখানেই ছিল" আর অন্যরা ততটাই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলছে "এগুলো গতকালকের রাস্তায় ছিল না।" মজার ব্যাপার আলোচনাটা বাকিরা নিজেদের মধ্যেই করছে, আমাকে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করছে না, তাই আমি কোনও মন্তব্য করছি না। আমি একমনে গাড়ি চালিয়ে চলেছি। এইভাবে চলতে চলতে রাস্তা একসময়ে চওড়া হল আর আমরা একটা গ্রামের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। ঢুকেই আবার বেরিয়েও পড়লাম কারণ গ্রামে বাড়ির সংখ্যা বড়জোর ১০। আবার জঙ্গলের সরু রাস্তা শুরু হল। সবমিলিয়ে রাস্তাটা যে কিছুটা হলেও ভীতিপ্রদর্শক সেটা অস্বীকার করব না। একে অন্ধকার, তার উপর সরু রাস্তা, তার উপর রাস্তার দুপাশে কী আছে জানি না, তার উপর রাস্তার দৈর্ঘ্য খুব কম নয়, তার উপর রাস্তায় কোনও আলো নেই, তার উপর আমাদের ভরসা শুধুমাত্র গুগ্‌ল্‌ ম্যাপ যে অনেক সময়ে ভুল রাস্তাও দেখায় আর সবার উপরে আমাদের কারুর ফোনে কোনও নেটওয়ার্ক নেই।

যাই হোক, পথ দীর্ঘ হলেও পথের বর্ণনাও দীর্ঘ হতে হবে এমন কোনও কথা নেই। আরও কিছুটা এগোতে আবার লোকালয় দেখা গেল আর রাস্তাও চওড়া হল। এবার আমাদের গাড়ির লোকেরাও বুঝে গেল এই রাস্তা দিয়ে কাল ফেরা হয়নি। আর অল্প কিছুক্ষণ চলার পরেই আমাদের সামনে এসে পড়ল মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টির মেইন গেট। সবমিলিয়ে একটা চরম রোমাঞ্চকর জার্ণির সাক্ষী হয়ে রইলাম আমরা সবাই।

রাতে ডিনারে প্রথমদিনের মতো ভাত-রুটি-ডাল-তরকারি-ডিম-চিকেন দিয়ে ডিনার করলাম। খরচ হল ১,৩৬৫/- টাকা।

বৃহস্পতিবার ১লা জানুয়ারী, ২০২৬ - আমার ব্লগের সমস্ত পাঠকদের জানাই হ্যাপি নিউ ইয়ার ! সকালে উঠে ব্রেকফাস্ট করে চেক্‌আউট করে বেলা এগারোটা নাগাদ মুরগুমা থেকে রওনা দিলাম। সঙ্গে কিছু খাবারদাবার ছিল, গাড়ি চলতে চলতে সেইসবই খাওয়া হচ্ছিল। সেই কারণে দুপুরে অনেকেই আর লাঞ্চ করতে চাইল না। আমার আবার ওইসবে হয় না, ট্যাঙ্কে পেট্রোল কম থাকলে গাড়ি চলতে চায় না ! তাই আমি আর বাকিদের মধ্যে কয়েকজন একটা পথচলতি হোটেল থেকে লাঞ্চ করে নিলাম। খরচ হল ১,৩২০/- টাকা।

লাঞ্চের পরে আবার চলতে শুরু করলাম। যাওয়ার সময়ে যে পথে গিয়েছিলাম, সেই পথের ফিরলাম। কোলাঘাটের কাছে মেসোমশাই আর লালমাসি নেমে গেল। অঙ্কুরহাটি থেকে দিদিভাইরা আলাদা হয়ে গেল। আমরা বাড়ি পৌঁছলাম রাত নটা নাগাদ।

সারসংক্ষেপ ঃ

১. কলকাতা থেকে দুতিনদিনের ঘোরার জন্য পুরুলিয়ার মুরগুমা একটা দূর্দান্ত ঘোরার জায়গা। বছরের যেকোনও ঋতুতেই এখানে যাওয়া যেতে পারে, তবে গরমকালে গেলে ঘোরাঘুরি করাটা কষ্ঠকর হবে।

২. কলকাতা থেকে মুরগুমা গাড়িতে যাওয়ার একাধিক রাস্তা আছে, তার মধ্যে ডানকুনি - দুর্গাপুর - রানীগঞ্জ হয়ে গেলে দূরত্ব ৩৪০ কিলোমিটার আর সময় সবথেকে কম লাগে। এছাড়া ডানকুনি - আরামবাগ - বিষ্ণুপুর অথবা কোলাঘাট - মেদিনীপুর - ঝাড়গ্রাম হয়েও যাওয়া যেতে পারে।

৩. ট্রেনে মুরগুমা যেতে হলে ঝালদা স্টেশন হয়ে যাওয়া যেতে পারে। তবে ঝালদা যাওয়ার খুব কম ট্রেন আছে বলে সবথেক সুবিধেজনক হল মুরি স্টেশনে নেমে যাওয়া।

৪. মুরগুমায় থাকার অনেক হোটেল আছে, তার মধ্যে অবস্থানগত দিক থেকে সবচেয়ে ভালো পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের 'মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টি'। আমরা এদের ওয়েবসাইট https://wbtdcl.wbtourismgov.in/home থেকে বুকিং করেছিলাম।

৫. পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের অন্যান্য হোটেলের মতো মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টিতেও কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট দেয়। এখানে যা খাবার দেয় তা খেয়ে রীতিমতো পেট ভরে যায়। এখানকার রান্নার মান বেশ ভালো।

৬. মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টির কাছাকাছি আরও কিছু হোটেল আছে। এগুলো হাঁটাদূরত্বে তাই চাইলে সেখান থেকেও গিয়ে খাবার খাওয়া যেতে পারে। 

৭. মুরগুমা থেকে সাইটসিয়িং করার মতো যে জায়গাগুলো আছে তার বেশিরভাগগুলোই অযোধ্যা পাহাড়ের এলাকায়। সাইটসিয়িং এর মধ্যে পিটিডিরি ঝর্ণা, খয়রাবেড়া ড্যাম, মুরগুমা ড্যাম, ময়ূর পাহাড় আর অযোধ্যা পাহাড়ের লোয়ার ও আপার ড্যাম অবশ্য দ্রষ্টব্য।

৮. শীতকালে পুরুলিয়ায় বেশ ঠান্ডা পড়ে। রাতের দিকে তাপমাত্রা ৪ - ৫ ডিগ্রিতেও নেমে যায়, তাই পর্যাপ্ত শীতপোষাক সঙ্গে রাখা দরকার।

৯. মুরগুমার বেশিরভাগ জায়গাতেই মোবাইলের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। তাই এটা মাথায় রেখে বাকি সব পরিকল্পনা করতে হবে।

১০. মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টির কাছাকাছি কোনও পেট্রোল পাম্প নেই, সবথেকে কাছেরটাও এখান থেকে ১১ কিলোমিটার। তাই গাড়ি নিয়ে গেলে এখানে ঘোরার সময়ে সুযোগমতো গাড়ির পেট্রোল ভরে নেওয়া ভালো।

উপসংহার ঃ

মুরগুমা ড্যাম

ডেভেলপ্‌মেন্ট বা উন্নয়নের মানে যদি সভ্যতার বিকাশ মনে করা হয়, তাহলে তার অভাবটা পশ্চিমবঙ্গের জেলাগুলোর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে সবথেকে বেশি। এর আগেও আমরা পুরুলিয়ায় গিয়েছি আর এটা আর আগেও একইরকমভাবে চোখে পড়েছে। কিন্তু এটাকে আমি যে খুব নেতিবাচকভাবে দেখেছি, তা নয়। বিকাশের অভাব মানে যদি উঁচু উঁচু বাড়ি তৈরি না করা হয়, তাহলে বিকাশের অভাবই ভালো। বিকাশের অভাব মানে যদি গাছপালা কেটে শহর তৈরি না করা হয়, তাহলে বিকাশের অভাবই ভালো। বিকাশের অভাব মানে যদি পুকুর-জলাশয় বুজিয়ে না ফেলা হয়, তাহলে বিকাশের অভাবই ভালো। মানুষের যে প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সভ্যতার বিকাশ ঘটে, এখানে এলে মনে হয় সেই প্রয়োজনগুলোই এখানে তেমন প্রকট নয়। আর তাই পুরুলিয়া আছে পুরুলিয়াতেই। মুরগুমাতেও এই ছবিটা আলাদা নয়। সেই কারণেই এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ আমার এত প্রিয়। মুরগুমা থেকে সাইটসিয়িং-এর কিছু কিছু জায়গায় গিয়ে মনে হয় যেন অতীত কালে চলে গিয়েছি কারণ আজ থেকে একশ' দুশ বছর আগেও এই জায়গাগুলো এইরকমই ছিল। আর এগুলোই আমার ভালো লাগে। আমার মতো এই অপরিবর্তনশীল সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ যাদের ভাল লাগে, তাদের একবার মুরগুমা ভ্রমণ অবশ্য কর্তব্য !

মুরগুমা ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

No comments:

Post a Comment