আমি ব্লগ লেখার খুব বেশি সমর্থক কোনওদিনও ছিলাম না, সত্যি কথা বলতে কি এখনও যে আছি তা নয় । তার একটা প্রধান কারণ আমার ধারণা ব্লগ লেখার থেকেও পড়া অনেক বেশি ক্লান্তিকর । অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অনেক সময়ই পড়তে শুরু করে শেষ করা হয়ে ওঠে না । নিজের ধৈর্য এবং/অথবা আগ্রহের অভাবকে 'ঠিক আছে, বাকিটা পরে পড়ব' জাতীয় অজুহাত দিয়ে ঢেকে দিই - আর আমরা সবাই জানি সেই 'পরে' টা আর কখনওই আসে না । তো, এই কারণে আমি ঠিক করেছি আমার ব্লগকে কখনওই অন্যের ক্লান্তির কারণ ঘটাব না, আমার ব্লগের বিষয় হবে প্রধানতঃ ভ্রমণ । আমার মতো যেসব বাঙালিরা ঘুরতে ভালোবাসে, তাদের জন্য আমার ব্লগ হবে তথ্যের একটা উৎস । আমার নিজের একটা অভ্যেস আছে, কোনও জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার আগে সেই জায়গাটা সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, আর ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে আমার বরাবরই মনে হয়েছে যে ইন্টারনেটে লেখালেখি করার ব্যাপারে বাঙালিদের থেকে কুঁড়ে খুব কম শিক্ষিত জাতই আছে । আমার মতো যেসব বাঙালিরা আছে, যারা ইন্টারনেটে কোনো একটা ইংরিজীতে লেখা দেখলেই না পড়ার চেষ্টা করে, তাদের জন্য আমার ব্লগ সহায়ক হবে, এই বিশ্বাস নিয়ে শুরু করছি আমার ভ্রমণকাহিনী । আগেই বলে রাখি, আমি স্ট্যাটিসটিক্সের ছাত্র ছিলাম, তাই আমার ব্লগে তত্ত্বের থেকে তথ্যের দেখাই মিলবে বেশি ।

Thursday, December 19, 2024

শান্তিনিকেতন ভ্রমণ

ভ্রমণপথ ঃ

সোমবার ১৬ই ডিসেম্বর, ২০২৪ঃ সকাল ৭ঃ৩০ মিনিটে কলকাতা থেকে গাড়িতে যাত্রা করে সকাল ১১ঃ৩০ মিনিটে শান্তিনিকেতন - শান্তিনিকেতনে রাত্রিবাস।

মঙ্গলবার ১৭ই ডিসেম্বর, ২০২৪ঃ সকাল ১০ঃ৩০ মিনিটে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে সাইট সিয়িং - শান্তিনিকেতনে রাত্রিবাস।

বুধবার ১৮ই ডিসেম্বর, ২০২৪ঃ সকাল ১১টায় গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে সাইট সিয়িং - শান্তিনিকেতনে রাত্রিবাস।

বৃহস্পতিবার ১৯শে ডিসেম্বর, ২০২৪ঃ সকাল ১০ঃ৩০ মিনিটে শান্তিনিকেতন থেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে দুপুর ২টোয় কলকাতা।

মার জীবনের প্রথম ঘুরতে যাওয়ার জায়গার নাম শান্তিনিকেতন। তখন আমার একবছর বয়স। বাবা-মা-ঠাম্মার কাছে শুনেছি আমরা সেবার একটা অ্যাম্বাসাডার গাড়ি করে গিয়েছিলাম আর আমাদের দলের দুজন ট্রেনে গিয়েছিল। আমি নাকি অ্যাম্বাসাডার গাড়ির পিছনের সিটের যাত্রীদের কোলে লম্বা হয়ে শুয়ে থাকতাম। ওখানে আমরা যে হোটেলে ছিলাম সেই সময়ে সেখানে প্রখ্যাত অভিনেতা অনিল চট্টোপাধ্যায় এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে আমাদের আলাপও হয়েছিল। বড়দের মুখে শোনা টুকরো টুকরো গল্প আর কিছু ছবিই আমার সেবারের শান্তিনিকেতন ভ্রমণের সম্বল। সেবারের শান্তিনিকেতন ভ্রমণের কোনও স্মৃতিই আমার নেই - থাকা সম্ভবও নয়। তাই প্রথমবারের না-থাকা স্মৃতিগুলো তৈরির জন্য আমার এই দ্বিতীয়বার শান্তিনিকেতন ভ্রমণ আর সেই নিয়ে আমার ব্লগের এবারের পোস্ট।

আমাদের এবারের দলে শুধুমাত্র আমরা ছজন - আমি অমৃতা বাবা মা কথা কলি। সোমবার ১৬ই ডিসেম্বর, ২০২৪ সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ আমরা ছজন বাড়ি থেকে বেরোলাম আমাদের গাড়ি নিয়ে। শান্তিনিকেতনের দূরত্ব ১৭৩ কিলোমিটার, যেতে সাড়ে তিন ঘন্টা মতো লাগার কথা। আমাদের যাত্রাপথ ডানলপ - বালি ব্রীজ - ১৯ নং জাতীয় সড়ক - বর্ধমান - ১১৪ নং জাতীয় সড়ক - সুরুল রোড - শান্তিনিকেতন। ব্রেকফাস্টের স্যান্ডউইচ্‌ ইত্যাদি আমাদের সঙ্গেই ছিল, রাস্তায় শুধু একবার দাঁড়িয়ে একটু চা-টা খেয়ে নেওয়া হল। তারপর আমরা আবার এগিয়ে চললাম আমাদের গন্তব্যের দিকে।

সুরুল রাজবাড়ি -

টিকিটঃ মাথাপিছু ১০/- টাকা (ছোটদের লাগে না)

রাজবাড়ির নাটমন্দির
আমাদের শান্তিনিকেতন পৌঁছনোর পথে একটা দেখার জায়গা পড়ল তার নাম সুরুল রাজবাড়ি। এখান থেকে শান্তিনিকেতন খুবই কাছে, গাড়িতে মিনিট দশেক। আমরা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সুরুল রাজবাড়িতে থামলাম। সুরুল রাজবাড়ি হল এক সরকার পরিবারের জমিদারবাড়ি। এই বাড়ির সঙ্গে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির রীতিমতো যোগাযোগ ছিল এবং শান্তিনিকেতন তৈরির সময়ে এই পরিবার জমি দিয়ে সাহায্য করেন। সুরুল রাজবাড়িতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মহাত্মা গান্ধী একবার এসেছিলেন। আমরা বাড়ির ভিতরে ঢুকলাম। আগেকার দিনের জমিদার বাড়ির মতো ভিতরে একটা বড় উঠোন আর তাকে ঘিরে চারদিকে বাড়ি। বাড়িটা দোতলা। ভিতরে দেখার মতো একটা নাটমন্দির আছে। বাড়ির বয়স ২৭০ বছর হলেও নিয়মিত মেরামত করা হয় এবং এখানে মানুষজন থাকে। সেই কারণে উঠোন ছাড়া বাড়ির একতলা বা দোতলায় বাইরের লোকের কোনও প্রবেশাধিকার নেই।

আমরা এখানে মিনিট দশেক থেকে বেরিয়ে এলাম। তারপর এগিয়ে চললাম শান্তিনিকেতনের দিকে। শান্তিনিকেতনে আমাদের বুকিং ছিল পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের 'রাঙাবিতান ট্যুরিজম প্রপার্টি'-তে। শান্তিনিকেতনে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের দুটো প্রপার্টি আছে - রাঙাবিতান আর শান্তবিতান। এদের মধ্যে শান্তবিতান শহরের মধ্যে আর সেই কারণে এর পরিবেশটা ঠিক 'শান্ত' বলা চলে না। অন্যদিকে রাঙাবিতানের পরিবেশ খুব শান্ত ও নিরিবিলি, শহরের একটু বাইরে একেবারে গাছপালা ঘেরা জায়গায়। সেই কারণে আমরা রাঙাবিতানেই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। দুপুর বারোটার একটু পরে আমরা এখানে পোঁছলাম।

সেঁজুতীর সামনে
বিরাট প্রশস্ত জায়গা, ঢুকেই একট বেশ বড় চত্বরে গাড়ি পার্কিং-এর ব্যবস্থা রয়েছে। তারপরে রিসেপশন বিল্ডিং। চেক্‌ইন করে রিসেপশন বিল্ডিং-এর পাশে একটা চওড়া প্যাসেজ দিয়ে হেঁটে আমরা ভিতরের দিকে এগিয়ে চললাম। এখানে একটা বেশ বড় পুকুর রয়েছে আর দেখে বুঝলাম সেখানে রঙিন ফোয়ারার ব্যবস্থা আছে। বেশ বড় ফাঁকা খোলামেলা জায়গা আর তার মাঝে মাঝে একটা একটা কটেজ। একেকটা কটেজে দুটো করে ঘর। এরকম একটা কটেজে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হল। প্রত্যেকটা কটেজের আলাদা নাম আছে - আমাদের কটেজের নাম সেঁজুতী। ঘরগুলো পরিসরে খুব বড় না হলেও খুব সুন্দর। ঘরের সামনের বারান্দায় চেয়ার-টেবিল রাখা আছে। জায়গাটা আমাদের খুব পছন্দ হল।

আমরা ঘরে ঢুকে চানটান করে খাওয়ার জায়গায় গেলাম। খাওয়ার জায়গাটা রিসেপশন বিল্ডিং-এর পাশে। আমরা ফিশ থালি অর্ডার দিলাম। খাবারের মান খুবই ভালো - আর সবথেকে ইন্টারেস্টিং বিষয় হল এরা থালিগুলো খুব সুন্দর করে সাজিয়ে দেয়। একটা গোল থালার মাঝখানে ভাত আর সেটা ঘিরে অনেকগুলো নানাসাইজের বাটিতে অন্যান্য তরকারি। বাটিগুলো এরা বড় থেকে ছোট এইভাবে সাজিয়ে দেয়। দেখতেও ভালো, খেতেও ভালো ! আমাদের খরচ পড়ল ৯৩৫/- টাকা।

খাওয়ার কিছুক্ষণ পরে আমরা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য এখানকার বিখ্যাত সোনাঝুরি হাট। জায়গাটার দূরত্ব আমাদের রিসর্ট থেকে ৩ কিলোমিটারের মতো। মিনিট দশেক গাড়ি চালিয়ে আমরা এখানে পৌঁছলাম। এখানে গাড়ি রাখার সমস্যা, বিশেষ করে এইসময়ে প্রচুর ট্যুরিস্ট আসার কারণে গাড়ি রাখার জায়গাগুলো একেবারে ভর্তি। শেষপর্যন্ত হাট থেকে বেশ কিছুটা দূরে পার্কিং-এর জায়গা পাওয়া গেল। পার্কিং চার্জ ১০০/- টাকা।

সোনাঝুরি হাট
সোনাঝুরি হাট - খোয়াই রোডের ধারে একটা বেশ বড় সমতল জায়গায় সোনাঝুরি হাট বসে। জায়গাটা গাছপালা ঘেরা, তার মধ্যে মাটিতে প্লাস্টিকের চাদর পেতে বিক্রেতারা জিনিসপত্র নিয়ে বসেছে। হাটটা বিশাল বড়। জিনিসপত্রের মধ্যে জামাকাপড়, শীতের পোষাক, বিছানার চাদর থেকে শুরু করে ঘর সাজানোর জিনিস, গয়নাগাঁটি সবই পাওয়া যায়। জিনিসের দাম ঠিকঠাক আর দরদাম করে কিনতে পারলে ভালোই পাওয়া যায়। ক্রেতা বিক্রেতা উভয়ের সংখ্যাই অনেক, তবে জায়গাটা বড় হওয়ায় ভীড়টা ছড়িয়ে রয়েছে। আমরা এখান থেকে বেশ কিছু জিনিসপত্র কিনলাম। এই শীতের সময়ে সোনাঝুরি হাট শুধুমাত্র বুধবার ছাড়া সপ্তাহে প্রতিদিনই বসে। এমনিতে এই হাট প্রতি শনিবার বসে।

হাট থেকে আমরা যখন বেরোলাম, তখন দিনের আলো পড়ে এসেছে। এখানে রাস্তার ধারে খেজুর গুড় বিক্রি করছে, ঝোলা, পাটালী দুইই আছে। আমরা কিছুটা কিছুটা করে গুড় কিনলাম আর সেইসঙ্গে কিছুটা চাখলামও। উত্তম স্বাদ !

রাঙাবিতানের রঙিন ফোয়ারা
রিসর্টে ফিরতে ফিরতে প্রায় অন্ধকার হয়ে গেল। আমাদের রিসর্টের সামনের রাস্তাটায় শুধুমাত্র রিসর্টের সামনের অংশটায় আলো আছে, বাকিটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। যাই হোক, ভিতরে এসে গাড়ি পার্কিং করে আবার ঘরে ফিরে এলাম। সকালে যেমন দেখেছিলাম, সন্ধ্যের পরে পুকুরের উপর রঙিন ফোয়ারা শুরু হল। দেখতে খুব সুন্দর লাগছিল। আমরা কিছুক্ষণ রিসর্টের ভিতরে ঘোরাঘুরি করলাম। এখানকার তাপমাত্রা কলকাতার তুলনায় ২-৩ ডিগ্রি কম, তবে ঠান্ডাটা খুব অসহ্য নয় তাই ঘুরতে মন্দ লাগছিল না। রাত সাড়ে নটা নাগাদ যখন সবাই মিলে খেতে গেলাম, তখন সেখানে একটাও ফাঁকা জায়গা নেই। দুপুরে ফাঁকা ছিল কারণ ওইসময়ে সবাই সাইট সিয়িং-এ যায়। রাতের বেলা সবাই রিসর্টেই ডিনার করে। এ'বেলা আমরা রুটি, তরকারী, চিকেন ইত্যাদি খেলাম। খরচ হল ৪৮৩/- টাকা।

রিসর্টের বাইরের লালমাটির রাস্তা
মঙ্গলবার ১৭ই ডিসেম্বর, ২০২৪ - সকালে আমি আর কথা-কলি সাড়ে ছটায় উঠে একটু হাঁটতে বেরোলাম। শান্তিনিকেতনের বিখ্যাত কোপাই নদীর দূরত্ব আমাদের রিসর্ট থেকে ১ কিলোমিটারেরও কম, আর সকালবেলা এই পথটা হাঁটতে ভালোই লাগছিল। বীরভূম লালমাটির জন্য বিখ্যাত আর আমাদের রিসর্টের সামনের রাস্তাটা সেই লালমাটির। সকালে বেশ ঠান্ডা তবে যথাযথ শীতপোষাক পরা ছিল বলে বেশ আরাম লাগছিল।

কোপাই-এর ধারে
হেঁটে হেঁটে আমরা কোপাইয়ের ধারে পৌঁছলাম। এখানে একটা সেতু আছে, সেটার পাশ দিয়ে গেলে একেবারে নদীর ধারে পৌঁছনো যায়। নদী যদিও খুব একটা চওড়া নয়, তবে জল আছে ভালোই। দূরে নদীর উপরে হাল্কা কুয়াশা। নদীর এই আঁকাবাঁকা পথ দেখে শান্তিনিকেতনে বসে একটা লাইনই মনে হয়। আমার ধারণা লাইনটা সবারই জানা আর এই লেখা পড়তে পড়তে সেটা একবার অন্ততঃ মনে পড়বে, তাই আর এখানে উল্লেখ করলাম না ! প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য এই নদী দেখেই রবীন্দ্রনাথ কবিতাটি রচনা করেছিলেন। আমরা ব্রীজের নিচ দিয়ে নদীর ধারে কিছুক্ষণ বেড়ালাম। তারপর আবার রিসর্টে ফিরে এলাম।

পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের প্রায় সব হোটেলেই কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট দেয় - শান্তিনিকেতনও তার থেকে আলাদা নয়। আমরা সকাল নটা নাগাদ ব্রেকফাস্ট করতে গেলাম। ব্রেকফাস্টের মেনু লুচি তরকারী / মাখন বা জ্যাম পাঁউরুটি। সেইসঙ্গে একটা করে কলা আর ডিমসেদ্ধ / অমলেট। খাবার যা দেয়, তাতে ভালোই পেট ভরে যায়। আমরা খাওয়াদাওয়া সেরে ঘরে ফিরে এলাম আর তারপর তৈরি হয়ে বেরোলাম আমাদের প্রথমদিনের সাইটসিয়িং-এর জন্য।

শান্তিনিকেতনের প্রধান দেখার জায়গাগুলোর প্রায় সবই বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ। আমরা গাড়ি নিয়ে বিশ্বভারতীর কাছাকাছি পৌঁছলাম। একটা মুস্কিল হল জায়গায়গুলোর কোনটা ঠিক কোথায় জানি না আর সেখানে গাড়ি নিয়ে গেলে পার্কিং-এর জায়গা আছে কিনা তাও জানি না। আবার পুরোটা হেঁটেও ঘোরা সম্ভব নয়। তাই গাড়ি একজায়গায় পার্কিং করে একটা টোটো ভাড়া করা হল। এই টোটো আমাদের বিশ্বভারতীর ভিতরের সবকিছু ঘুরে দেখাবে।

আমরা টোটোয় উঠে জায়গাটা ঘুরে দেখলাম। এই ঘুরে দেখানোটা আসলে একটা ধাপ্পা, এরা শুধু কোথায় কী আছে, ঘুরে ঘুরে সেটাই দেখায়। যেহেতু বর্তমানে কোভিডের পর থেকে বিশ্বভারতীর ভিতরে বিভিন্ন জায়গায় ঢোকা বারণ হয়ে গেছে, তাই টোটোওয়ালা বাইরে থেকে আমাদের জায়গাগুলো দেখালো আর তারপর আবার আমাদের গাড়ির কাছে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিল। এর জন্য তাকে দিতে হল ১৫০/- টাকা। তবে এই ঘোরার ফলে আমাদের একটা সুবিধে হল - দেখার জায়গাগুলোর কোনটা কোথায় আর সেটা দেখতে গেলে গাড়ি কোথায় রাখতে হবে তার একটা ধারণা হয়ে গেল। এবার আমরা গাড়ি নিয়ে আবার ওই জায়গাগুলোই দেখতে গেলাম।

পৌষমেলা প্রাঙ্গন
পৌষমেলা প্রাঙ্গন - গাড়ি নিয়ে বিশ্বভারতীর দিকে এগোনোর সময়ে প্রথমে আমাদের বাঁদিকে পড়ল সুবিশাল একটা মাঠ - এটাই শান্তিনিকেতনের বিখ্যাত পৌষমেলার মাঠ। আর কদিন পরেই এখানে পৌষমেলা শুরু হবে, মাঠে এখন তারই প্রস্তুতি চলছে। বাঁশের প্যান্ডেল, মঞ্চ ইত্যাদি বাঁধা হচ্ছে। মাঠটা এতটাই বড় যে এর একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত প্রায় দেখাই যায় না।

মাঠটাকে বাঁদিকে রেখে আমরা গাড়ি নিয়ে আরও এগিয়ে চললাম। একজায়গায় মাঠটা শেষ হয়ে গিয়ে রাস্তাটা বাঁদিকে ঘুরে গেছে। এই রাস্তার নাম বিবেকানন্দ সরণী। এখান দিয়ে যেতে হলে একটা গেটের ভিতরে ঢুকতে হয় আর কিছুদূর গিয়ে আরেকটা গেট দিয়ে বেরোলে সামনে পড়ে শান্তিনিকেতন রোড। এবার আমরা ডানদিকে ঘুরে এগিয়ে চললাম।

পাঠশালায় মহড়ারত কচিকাঁচারা
মৃণালিনী আনন্দ পাঠশালা - এবার আমাদের বাঁদিকে পড়ল মৃণালিনী আনন্দ পাঠশালা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর নামে এই পাঠশালার নাম। এখানে শান্তিনিকেতনের সবচেয়ে ছোট ছেলেমেয়েরা পড়ে। এটাকে নার্সারি বলা যেতে পারে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পড়াশোনার পরিকল্পনার অনেকটাই শ্রেণীকক্ষের বাইরে আর এই পাঠশালায় সেটাই বেশি করে করা হয়। এখন আপাতত এখানে আসন্ন উৎসবের প্রস্তুতি চলছে। গাছতলায় শতরঞ্চি পেতে গানবাজনার মহড়া হচ্ছে আর তার সামান্য দূরে আরও একগুচ্ছ ছাত্রছাত্রী বসে রয়েছে। বলা বাহুল্য, এরা সবাইই কচিকাঁচা। যে মেয়েটি মহড়া দিচ্ছে সে 'তোমার সুরের ধারা ঝরে যেথায় তারি পারে' গানটা গাইছে। সব মিলিয়ে এই দৃশ্য এতই মনোগ্রাহী যে এখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতেই খুব ভালো লাগে।

তিন পাহাড়
তিন পাহাড় - মৃণালিনী আনন্দ পাঠশালা থেকে অল্প একটু এগোতে বাঁদিকে পড়ল তিন পাহাড়। এখানে একটা বেশ বড় বটগাছ আছে। গাছের গোড়ার কাছে মাটিটা কিছুটা উঁচু ঢিপির মতো, সেই থেকেই এই নাম। রবীন্দ্রনাথ এখানে বসে মাঝে মাঝে ধ্যান করতেন। এবং তাঁর বেশ কিছু কবিতাও এখানে বসেই লেখা। সত্যি বলতে কী, বটগাছ বা তার গোড়ায় মাটির ঢিপি এগুলোর কোনওটারই কোনও বিশেষত্ব নেই, আসল কথাটাই হল এখানে রবীন্দ্রনাথ বসতেন আর সেটাই বড় কথা !






তালধ্বজ
তালধ্বজ - তিন পাহাড় থেকে বাঁদিকে একটা রাস্তা ঢুকে গেছে। এই রাস্তা দিয়ে সামান্য গেলেই বাঁদিকে তালধ্বজ। এখানে একটা তালগাছকে ঘিরে একটা খড়ের চালে ঢাকা গোলাকার মাটির বাড়ি রয়েছে। শান্তিনিকেতনের শিক্ষক তেজেশচন্দ্র সেন এই বাড়িতে থাকতেন। বাড়ির মাঝখান দিয়ে এই গাছটা উঠে যাওয়ার দেখে মনে হয় বাড়ির উপরে একটা তালগাছের পতাকা লাগানো রয়েছে। সেই থেকেই এই নাম।






উপাসনা গৃহ
উপাসনা গৃহ - তালধ্বজ থেকে সামান্য এগোলেই বাঁদিকে উপাসনা গৃহ। প্রকৃতপক্ষে আমরা বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমারেখা বরাবর চলেছি, আমাদের বাঁদিকে যা যা পড়ছে, সবই বিশ্বভারতীর অন্তর্গত। উপাসনা গৃহ উপাসনার স্থান। দেওয়ালের অনেকটা কাচনির্মিত বলে এর অন্য নাম কাচ মন্দির। এটি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তৈরি করিয়েছিলেন। যেহেতু ঠাকুর পরিবার ছিলেন ব্রাহ্মমতে দিক্ষিত, তাই তাঁদের উপাসনাগৃহে কোনও ঠাকুরের মূর্তি নেই।

বসত বাড়ি
শান্তিনিকেতন বসত বাড়ি - উপাসনাগৃহের পাশ দিয়ে একটা রাস্তা ভিতরে ঢুকে গেছে, এখান এই রাস্তা দিয়ে গেলে শান্তিনিকেতনের বসত বাড়ি। এই বাড়িটাও মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তৈরি করিয়েছিলেন। বাড়িটা দূর থেকেই দেখতে হল, আর দেখে বুঝলাম বাড়িটা বেশ বড়। বাড়িতে যাওয়ার রাস্তাটার দুধারে সুন্দর করে সাজানো বাগান। পুরো জায়গাটা এত সুন্দরভাবে গাছপালা ঘেরা, দেখতেই খুব সুন্দর লাগে। বাড়ির হয়তো দেখার অনেক কিছু আছে, কিন্তু বাইরে থেকে এর বেশি কিছু দেখার উপায় নেই।

ছাতিমতলা
ছাতিমতলা - এরপর সামান্য এগোতেই দেখা গেল ছাতিমতলা। এখানে একটা ছাতিমগাছ ছিল যার নিচে বসে উপাসনা করা হত। পরবর্তীকালে এখানে একটা বড় বাঁধানো চত্বর তৈরি করা হয়েছে। দেবেন্দ্রনাথ বা রবীন্দ্রনাথের সময়ের ছাতিমগাছটা বর্তমানে আর নেই, তার বদলে এখানে তিনটে ছাতিমগাছ লাগানো হয়েছে। সেগুলোও এখন বড় হয়ে গেছে। এই গাছের আরেকটা বিশেষত্ব হল এখানকার স্নাতক ছাত্রছাত্রীদের শংসাপত্রের সঙ্গে সঙ্গে একটা করে এই ছাতিম গাছের ডাল-পাতা দিয়ে সম্মানিত করা হয়।

কলাভবনের সামনে
কলাভবন - ছাতিমতলা থেকে কিছুটা এগিয়ে বাঁদিকে কলাভবন। এই প্রথম একটা জায়গা দেখলাম যেখানে গেট দিয়ে ভিতরে ঢোকার অনুমতি আছে। তাও কলাভবনের ভিতরে ঢোকা যাবে না, শুধুমাত্র বিশ্বভারতীর সীমারেখার ভিতরে ঢোকা যাবে। এখানে মাঠের মধ্যে কয়েকটা মূর্তি রয়েছে, সেগুলো গাছের গুঁড়ি, খড় ইত্যাদির সাহায্যে তৈরি। মূর্তিগুলো সাধারণভাবে দেখতে যে খুব সুন্দর তা নয়, তবে এই ভাস্কর্যের কোনও বিশেষ তাৎপর্য থাকতে পারে যা আমার বোধশক্তির বাইরে। আমরা এখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে ছবি তুলে বেরিয়ে এলাম।

প্রতীচী
প্রতীচী - কলাভবন থেকে কিছুটা এগোলে বাঁদিকে প্রতীচী - নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ্‌ ডঃ অমর্ত্য সেনের বাড়ি। এটা যদিও কোনও দর্শনীয় স্থান নয় আর স্বাভাবিকভাবেই বাড়ির ভিতরেও ঢোকা যায় না, কিন্তু তাও একজন নোবেলজয়ী ব্যক্তির বাসস্থান রোজ রোজ দেখা যায় না, তাই বাইরে থেকে বাড়িটা দেখে ছবি তুলে চলে এলাম।

এই অঞ্চলে বেশ কয়েকটা হোটেল আছে। এই রাস্তা ধরে এগোলে আর বিশ্বভারতীর দেখার কিছু নেই, তাই আমরা এবার এই পথে উল্টোদিকে ফিরতে শুরু করলাম। কিছুদূর ফেরার পরে কলাভবন পেরোনোর পরে বাঁদিকে পড়ল এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান - রবীন্দ্র মিউজিয়াম।

রবীন্দ্র মিউজিয়াম -

টিকিটঃ মাথাপিছু ১০০/- টাকা (ছোটদের ১০/- টাকা)

রবীন্দ্র মিউজিয়াম প্রধানতঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জিনিসপত্র, ছবি ইত্যাদির সংগ্রহশালা হলেও এখানে ঠাকুরবাড়ির অন্যান্য কিছু জিনিসপত্রও রয়েছে। মিউজিয়ামটা দোতলা। ভিতরে ঢুকে আমরা প্রথমে বাঁদিকের একটা বড় হলঘরে ঢুকলাম। সেখানে ঠাকুর পরিবারের বিভিন্ন মানুষদের বড় বড় ছবি, তাঁদের সম্পর্কে নানারকম তথ্যাদি রয়েছে। বিভিন্ন মানুষের ছবি রয়েছে আর সেইসঙ্গে রয়েছে তাঁদের লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্রের অংশবিশেষ। একটা ছাপার মেশিন রয়েছে যেটা ঠাকুরবাড়ির পত্রিকা ছাপানোর জন্য ব্যবহৃত হত।

মিউজিয়ামের বাইরে
আমরা এই ঘর থেকে বেরিয়ে দোতলায় উঠলাম। এখানে মূলতঃ রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত জিনিসই রাখা রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত কয়েকপ্রস্থ পোষাক, মাথার টুপি, কাঠের চিরুনি, লেখার কলম, দোয়াত, কাগজপত্র, কাচের থালা, কাপডিশ ইত্যাদি আরও অনেককিছু। সবকিছু মনে রাখা সম্ভব নয় আর এখানে কোনও কিছুর ছবি তোলা যায় না বলে পরে দেখার সুযোগ নেই, তাই যতটা সম্ভব দুচোখ ভরে দেখে নিলাম। রবীন্দ্রনাথ তথা ঠাকুর পরিবার যে সম্ভ্রান্ত ও বিত্তশালী পরিবার ছিলেন তা তাঁদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র দেখলেই বোঝা যায়। সেইসঙ্গে এটাও বলা যায় রবীন্দ্রনাথ ছিলেন রীতিমতো সৌখিন মানুষ। এর আগে আমরা এই ধরনের জিনিসপত্র দেখেছি জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে, আর এখানে আবার দেখলাম। রবীন্দ্রনাথ যে কত বড় মাপের মনিষী ছিলেন, তা অনুধাবন করার ক্ষমতা আমার মতো ক্ষুদ্র মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, এখানকার বা জোড়াসাঁকোর রবীন্দ্র মিউজিয়াম ভালোভাবে ঘুরে দেখলে বিন্দুতে সিন্ধুদর্শন হয় মাত্র !

উত্তরায়ণের সামনে
মিউজিয়ামের পাশ দিয়ে একটা হাঁটার রাস্তা চলে গেছে, এখান দিয়ে কিছুটা গেলে দেখতে পাওয়া যায় উত্তরায়ণ। এটা রবীন্দ্রনাথের এখানে থাকার আরেকটা বাড়ি - উত্তরদিকে বলে এর এই নাম। উত্তরায়ণেরও ভিতরে ঢোকা যায় না, তবে এর দরজা খোলা থাকে এবং বাইরে থেকে ছবি তোলা যায়। এখানকার সামনের মাঠটা বেশ বড়, সেখানে দুপুরবেলা ঘুরে বেড়াতে ভালোই লাগছিল। উত্তরায়ণ থেকে আরও উত্তরে গেলে আরও কয়েকটা বাড়ি আছে সেগুলোর নাম উদীচী, পুনশ্চ, শ্যামলী, কোনারক। এগুলো অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট বাড়ি এবং এগুলো রবীন্দ্রনাথ নিরিবিলিতে থেকে কাজ করার জন্য নির্মান করিয়েছিলেন। এখানে বসে তিনি বিভিন্ন চিত্রকলা ও কবিতার চর্চা করতেন।

আমাদের বিশ্বভারতীতে যা যা দেখা সম্ভব তার সবই দেখে ফেলেছি, তাই আমরা এবার এখান থেকে বেরিয়ে পড়লাম। দুপুর আড়াইটে বাজে, তাই এবার খাওয়ার জায়গায় যেতে হবে। আমরা যে অঞ্চলে ঘোরাঘুরি করছিলাম, সেখানে কোনও খাবার হোটেল নেই, শান্তিনিকেতন রোড ধরে বোলপুর স্টেশনের দিকে কিছুটা এগিয়ে একটা খাবার হোটেল পেলাম। হোটেলের খাবারের মান বেশ ভালো আর সেইসঙ্গে অবাক করার মতো এদের আতিথেয়তা। আমরা মাছ আর চিকেন থালি নিয়েছিলাম। থালি সিস্টেমের নিয়ম হল এখানে প্রধান পদটা (ডিম / মাছ / মাংস) ছাড়া বাকি সবকিছুই যত ইচ্ছে নেওয়া যায়। কিন্তু এরা প্রথমেই যা দিয়েছিল, সেটাই আমার পক্ষে যথেষ্ট। আমরা আর কিছু নিচ্ছি না দেখে এরা আমাদের রীতিমতো জোর করছিল "আরেকটু ভাত দিই না?" "আরেকটু আলুপোস্ত নেবেন না, কেন রান্না ভালো হয়নি ?" ইত্যাদি বলে। খাওয়ার হোটেলে এরকম বিয়েবাড়ির মতো আপ্যায়ন আমি অন্য কোথাও দেখেছি বলে মনে পড়ে না। সেইসঙ্গে এখানকার রান্নার মানও খুব ভালো। আমাদের সবমিলিয়ে খরচ পড়ল ৯৭০/- টাকা।

খাওয়ার পরে আবার বিশ্বভারতীর দিকেই গেলাম কারণ আমাদের ফেরার পথ সেদিকেই। ফেরার পথে আবার পড়ল মৃণালিনী আনন্দ পাঠশালা, তিন পাহাড়। তিনপাহাড় থেকে আমরা এবার বাঁদিকে না গিয়ে সোজাপথ ধরলাম আর এখানে ডানদিকে পড়ল শান্তিনিকেতন সাব্‌ পোস্ট অফিস।

পোস্ট অফিসের দোতলায়
সাব্‌ পোস্ট অফিস - একটা সাব্‌-পোস্ট অফিস একটা দেখার জায়গা হওয়ার কথা নয় কিন্তু এরা এখানে একটা মিউজিয়াম গোছের তৈরি করেছে। আমরা গেট দিয়ে ঢুকে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেলাম। সিঁড়ির পাশের দেওয়ালে নানারকম ছবি রয়েছে আর উপরে মিউজিয়ামে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের পাঠানো এবং পাওয়া বিভিন্ন চিঠির ছবি। রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন এই পোস্ট অফিসের মাধ্যমে তাঁর চিঠির আদানপ্রদান হত, সেই হিসেবে এই পোস্ট অফিসও এক ঐতিহাসিক সাক্ষ্য বহন করে। এখানে ভিতরে কিছু মডেল আছে, যেমন একটা কাঠের নৌকো। আমরা ভিতরে কিছু ছবি তুলে বেরিয়ে এলাম।

হোস্টেলের সামনে মূর্তি
প্রথমদিনের সাইটসিয়িং শেষ, আমরা রিসর্টে ফিরে এলাম। ফেরার পথে একটা হোস্টেল দেখতে পেলাম, সেটা দেখে মনে হল এখানে সম্ভবতঃ আর্ট কলেজের ছাত্ররা থাকে। হোস্টেলের বারান্দায়, মাঠে মাটি বা কাঠ দিয়ে তৈরি নানারকম মূর্তি রাখা রয়েছে। কতকগুলো মূর্তি দেখতে খুবই সুন্দর।

রিসর্টে ফিরে এসে দেখলাম আগেরদিনের মতো রঙিন ফোয়ারা শুরু হয়েছে। সন্ধ্যেটা একইরকমভাবে কাটিয়ে দিলাম। রাতে ডিনারে আগেরদিনের মতোই রুটি, ডিম, চিকেন খাওয়া হল। খরচ হল ৪৭৩/- টাকা।




পরেরদিন বুধবার ১৮ই ডিসেম্বর, ২০২৪ - সকালে রিসর্টে ব্রেকফাস্ট করে সাড়ে নটা নাগাদ বেরোলাম। আগেরদিন বিশ্বভারতীর যতটা সম্ভব দেখা হয়ে গেছে, তাই দ্রষ্টব্য শান্তিনিকেতনের অন্যান্য জায়গা। রিসর্ট থেকে বেরিয়ে গাড়িতে আধঘন্টা চলার পরে পৌঁছলাম আমাদের প্রথম গন্তব্য - রেল মিউজিয়ামে। মিউজিয়ামটা একেবারে বোলপুর শান্তিনিকেতন রেলস্টেশনের পাশে। এবং এখানে পৌঁছনোর পথের শেষটা বেশ ঘিঞ্জি। রেল মিউজিয়ামের আলাদা কোনও পার্কিং নেই, তবে এখানে রেলের একটা বেশ বড় পার্কিং এরিয়া আছে। সেখানে গাড়ি রেখে আমরা মিউজিয়ামে ঢুকলাম।

গীতাঞ্জলি রেল মিউজিয়াম - 

টিকিট ঃ মাথাপিছু ৩০/- টাকা (ছোটদের ১০/- টাকা)

রেল মিউজিয়ামটা বেশ বড় একটা বাড়ি। এবং ভিতরে ঢোকার দেওয়ালের গায়েই লেখা আছে 'গীতাঞ্জলি - শান্তিনিকেতনের গল্প'। আর এই গল্পটা যে কতটা বিস্তারিত এবং ইন্টারেস্টিং সেটা জানার জন্য মিউজিয়ামটা খুব মন দিয়ে ভালো করে দেখতে হবে। মিউজিয়ামটা প্রধানতঃ বহু সংখ্যক ছবি এবং সেই ছবির নিচে লেখা দিয়ে সাজানো। এবং এগুলো একটা নির্দিষ্ট ক্রমে সাজানো যা পরপর দেখলে শান্তিনিকেতনের ইতিহাসটা চোখের সামনে দেখা যায়। মিউজিয়ামের ঘরগুলোর ভিতরে এইভাবেই ইতিহাসটা সাজানো হয়েছে এবং তীরচিহ্নের সাহায্যে কার পরে কোনদিকে যেতে হবে সবই নির্দেশ করা আছে। প্রথমে একতলা, তারপরে দোতলা আর শেষে আবার একতলায় নেমে বেরোনোর দরজা।

মিউজিয়ামের শুরু হয়েছে ১৮৬৩ সালে - যখন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বোলপুরে একটা ছাতিমগাছ ও তার চারপাশে একটা বিস্তীর্ণ জমি ইজারা নেন। এখানে উনি একটি বাড়ি তৈরি করেন এবং তার নাম দেন শান্তিনিকেতন (আমার ধারণা ছিল শান্তিনিকেতন নামটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেওয়া কিন্তু সেটা ভুল)। কার কাছ থেকে কত টাকা দিয়ে ইজারা নেন এবং সেই দলিলের ছবিও এখানে দেওয়া রয়েছে। সেইসঙ্গে রয়েছে সেইসময়কার কিছু ফোটোগ্রাফ - শান্তিনিকেতনের সেই সময়ের ছবি।

আমরাও এগোচ্ছি, ঘটনাও এগোচ্ছে। শান্তিনিকেতনের ইতিহাসের মধ্যে অবধারিতভাবে চলে এসেছে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির কথা। রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা, তাঁর দাদা দিদিদের কথা। রবীন্দ্রনাথের জীবনের কৈশোর, যৌবনের ঘটনা আর সেইসঙ্গে তাঁর সৃষ্টির কথা। এসেছে তাঁর মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথ ও মেজবৌঠান জ্ঞানদানন্দিনীর কথা, নতুনদাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও নতুন বৌঠান কাদম্বরীর কথা। রবীন্দ্রনাথের বিলেতযাত্রা এবং ধীরে ধীরে কবি, গীতিকার, সুরকার, সুগায়ক হিসেবে পরিচিতির কথা। এরপর তিনি পরিণত হয়েছেন - ক্রমে দেশে বিদেশে পরিচিতিলাভ করেছেন। কত বিখ্যাত মানুষের সঙ্গে যে তাঁর সঙ্গে মিলিত হয়েছেন এবং কত দেশে যে তিনি আতিথেয়তা গ্রহণ করেছেন, আমার সে সম্পর্কে ধারণা থাকলেও ধারণার ব্যাপ্তি তৈরি হল এই মিউজিয়াম দেখে। একসময়ে শান্তিনিকেতনে তিনি শুরু করলেন ব্রহ্মচর্যাশ্রম - প্রাচীন বৈদিক পদ্ধতিতে আশ্রমিক শিক্ষাদান। শান্তিনিকেতনের গাছতলায় পড়াশোনা, শিল্প-সাহিত্যচর্চা, বিভিন্ন শিক্ষকদের কথা - সবই এখানে সবিস্তারে তুলে ধরা হয়েছে। মিউজিয়ামের বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে আমি জায়গাটা ঘুরে দেখার আনন্দটা নষ্ট করতে চাই না, তাই একেবারে শেষে চলে যাচ্ছি। 

ধীরে ধীরে বার্দ্ধক্য কবিকে গ্রাস করতে শুরু করল। শরীর ভাঙতে লাগল। এরই মধ্যে ১৩৪৭ বঙ্গাব্দের (১৯৪০ খ্রীষ্টাব্দ) ২৫শে বৈশাখ নিজের জন্মদিনে রচনা করলেন 'হে নূতন দেখা দিক আর বার' গানটি। এরপরের অংশটায় রোগভোগ এবং ডাক্তারদের উল্লেখই বেশি। রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে থাকতে পছন্দ করতেন কিন্তু এখানে চিকিৎসার সুবন্দোবস্ত না থাকার কারণে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হত। ১৯৪১ সালের ২৫শে জুলাই তাঁকে চিকিৎসার জন্য শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়। এটাই তাঁর চিরকালের মতো শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে যাওয়া। ট্রেনের যে বগিতে তাঁকে নিয়ে আসা হয়, সেই বগিটা এখানে রাখা রয়েছে। কলকাতায় জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে ৩০শে জুলাই তাঁর অপারেশন করা হয়। ডাক্তারদের যে দল তাঁর অপারেশন করেন তার মধ্যে ছিলেন দুই প্রখ্যাত ডাক্তার ডঃ নীলরতন সরকার ও ডঃ বিধানচন্দ্র রায়। কিন্তু অপারেশনের পরেও রবীন্দ্রনাথের স্বাস্থ্যের বিশেষ উন্নতি হয় না।

আমরা দোতলা থেকে একতলায় নেমে এসেছি, বুঝতে পারছি এবার আমরা মিউজিয়ামের একেবারে শেষের দিকে চলে এসেছি - চলে এসেছি রবীন্দ্রনাথের জীবনেরও একেবারে শেষের দিকে। শেষ অংশটা এত সুন্দর যে ছবি দেখে আর সঙ্গের লেখা পড়ে গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল ! ডঃ সরকার, ডঃ রায় প্রমুখরা রবীন্দ্রনাথকে দেখতে আসেন। তাঁকে স্যালাইন, অক্সিজেন দেওয়া হয়। ৬ই আগস্ট রাতে তাঁর অবস্থার অবনতি হয়। ৭ই আগস্ট (২২শে শ্রাবণ) সকালে অক্সিজেনের নল খুলে দেওয়া হয় কারণ নল লাগানো থাকায় উনি খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন। অবশেষে আসে সেই মূহুর্ত - ঘড়িতে দুপুর ১২ঃ১০। সবাইকে ছেড়ে চলে যান গুরুদেব - বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর - বাঙালি তথা ভারতের তথা সারা পৃথিবীর সর্বকালের সেরা মনিষীদের অন্যতম ব্যক্তিত্ব !

তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি

বিচিত্র ছলনা-জালে,

হে ছলনাময়ী।

(রবীন্দ্রনাথের লেখা 'তোমার সৃষ্টির পথ' কবিতার প্রথম কয়েকটা লাইন। রচনা করেছিলেন ৩০শে জুলাই সকাল ৯ঃ৩০ মিনিটে, তাঁর অপারেশনের কিছুক্ষণ আগে। লেখনশক্তি ছিল না, মুখে বলে গিয়েছিলেন, লিখে নেওয়া হয়েছিল। এটাই তাঁর জীবনের লেখা শেষ কবিতা।)

মিউজিয়ামের সামনে
মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে এলাম। ভিতরে ছবি তোলার নিয়ম নেই, তাই মিউজিয়ামের বাইরে কয়েকটা ছবি তুললাম। পুরো মিউজিয়ামটা দেখতে আমাদের প্রায় দু'ঘন্টা সময় লেগেছে আর জোর দিয়ে বলতে পারি এই সময় ব্যয় করাটা সার্থক। ছুটির দিন না হওয়ায় মিউজিয়ামে ভীড় একেবারেই ছিল না, আর তাতে আমাদের খুবই সুবিধে হয়েছে। এই মিউজিয়ামটা এতটাই ভালো যে স্রেফ এটা দেখার জন্য একবার শান্তিনিকেতন আসা যেতে পারে। এমনকি কেউ যদি সকালের ট্রেনে এখানে এসে শুধু মিউজিয়ামটা দেখে বিকেলের ট্রেনে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করে, সেটাও বাড়াবাড়ি হবে না !

মিউজিয়াম নিয়ে লেখাটা কিছুটা দীর্ঘ হয়ে গেল। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবেই এটাকে সংক্ষিপ্ত করলাম না - করতে চাইলাম না। এটা এরকমই থাক !

মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে এগিয়ে চললাম পরবর্তী গন্তব্য - কঙ্কালিতলার মন্দিরের দিকে। রেল মিউজিয়াম থেকে এখানে পৌঁছতে লাগল প্রায় আধঘন্টা।

কঙ্কালিতলা মন্দির
কঙ্কালিতলা শক্তিপীঠ মন্দির - কঙ্কালিতলায় মন্দিরের পাশে একটা ফাঁকা জায়গা আছে, সেখানে গাড়ি পার্কিং করা যায়। তারপর আমরা মন্দিরের ভিতরে ঢুকলাম। মন্দিরটা বেশ বড় একটা চত্বরে এবং চত্বরটা টালি বসিয়ে বাঁধানো এবং বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। পুরাণমতে এখানে দেবী সতীর কোমরের হাড় বা কঙ্কাল পড়েছিল, সেই থেকে এই নাম। এখানে দেবী পার্বতীর মন্দির আছে। মন্দিরটাও বেশ সুন্দর, নাটমন্দিরটা মার্বেল দিয়ে বাঁধানো আর একেবারে ঝাঁ-চকচকে। মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে কোপাই নদী। আমরা মন্দিরে কিছুক্ষণ কাটিতে বেরিয়ে এলাম।

আমাদের এরপরের গন্তব্য তালপুকুর। কঙ্কালিতলা থেকে সেখানে পৌঁছতে লাগল মিনিট কুড়ি। নামে পুকুর হলেও এটা বেশ বড় একটা দীঘি (হ্যাঁ, নামে তালপুকুর এবং ঘটি কেন, ঘটিধারী ডুবে যাওয়ার মতো জল রয়েছে !)। দীঘির চারপাশ রেলিং দিয়ে ঘেরা আর তাই বাইরে গাছপালা। অর্থাৎ দীঘি দেখতে হলে রেলিং-এর ভিতরে ঢুকতে হবে। একজায়গা একটা লোহার গেট রয়েছে যাতে তালা দেওয়া। অনেক ডাকাডাকি করেও কারোর সাড়া পাওয়া গেল না, ফলে এই জায়গাটা দেখার বাসনা ত্যাগ করতে হল। এগিয়ে চললাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের দিকে।

নদীর ভিউ পয়েন্টে
কোপাই নদী ভিউ পয়েন্ট - তালপুকুর থেকে মিনিট দশেক চলার পরে পৌঁছলাম কোপাই নদী ভিউ পয়েন্টে। এখানে নদীর উপর দিয়ে একটা ব্রীজ চলে গেছে আর ব্রীজের পাশ দিয়ে একটা রাস্তা নেমে গেছে যেখানে গাড়ি রেখে একেবারে নদীর ধারের বালির উপরে গিয়ে বসা যায়। দুপুর দেড়টা বাজে, রোদের তেজও কম নয় তবে শীতকাল বলে ততটা গরম লাগছে না। এখানে নদীর দৃশ্য অসাধারণ। নদীতে জল বেশ ভালোই আছে যদিও চওড়া খুব একটা বেশি নয়। নদীর এ'পারটা ফাঁকা হলেও অন্যপারে অনেক গাছপালা আছে। সবমিলিয়ে আমরা ছোটবেলায় গ্রাম্য নদীর যে দৃশ্য আঁকতাম, এ একেবারে হুবহু তাই।

এরপরের গন্তব্য দ্রষ্টব্য নয়, ভোজ্য। দুপুরে খাবার আমরা কোথায় খাব তা আগেই ঠিক করা ছিল। শান্তিনিকেতনে ইদানীং বিখ্যাত হওয়া হোটেল রাম শ্যাম। ভিউ পয়েন্ট থেকে এখানে পৌঁছতে লাগল দশ মিনিট। জায়গাটা সোনাঝুরি হাটের পিছনের দিকে। যেহেতু বুধবার তাই সোনাঝুরির হাট বসেনি আর তাই আমাদের রাম-শ্যাম-এ পৌঁছনো সহজ হল। এখানে প্রচন্ড ভীড়। গিয়েই জায়গা পাওয়া গেল না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর বসতে পারলাম। এখানে থালি নেওয়াই ভালো। থালিতে অনেকগুলো পদ আর সবকটাই খুব ভালো। মানে খুবই ভালো। চিকেন, মাটন, মাছ ইত্যাদি নিয়ে আমাদের খরচ হল ১,৩৬৮/- টাকা। রাম শ্যামে একটা বেশ ভালো মানের ঘি পাওয়া যায়, আমরা এখান থেকে ঘি কিনলাম। ঘি-টা সত্যিই ভালো।

প্রকৃতি ভবন -

টিকিট ঃ মাথাপিছু ৩০/- টাকা

ক্যামেরা / মোবাইলের চার্জ ঃ ২০/- টাকা

প্রকৃতি ভবনের মূর্তির সামনে
রাম শ্যাম থেকে বেরিয়ে খোয়াই রোড ধরে মিনিট পাঁচেক চলার পরে পৌঁছলাম আমাদের ভ্রমণের শেষ গন্তব্য - প্রকৃতি ভবনে। প্রকৃতি ভবন হল প্রকৃতির ভবন। এটা প্রকৃতি থেকে পাওয়া বিভিন্ন পাথর, গাছের ডাল, গাছের গুঁড়ি ইত্যাদির সংগ্রহশালা। এই পাথরগুলো বা গাছের অংশগুলো প্রকৃতির মধ্যে যেভাবে পাওয়া গেছে, এখানে সেভাবেই রাখা হয়েছে - এর উপরে কোনও খোদাই করা বা ভাঙাভাঙি করা হয়নি। এগুলোর বৈশিষ্ট্য হল এর প্রত্যেকটাই একেকটা বিশেষ আকৃতির। যেমন কোনওটার আকার গণেশের মতো, কোনওটার আকার বৃদ্ধ পাখির মতো, আবার কোনওটাকে দেখে শকুন্তলার কথা মনে হয়। এরকম বেশ কিছু মূর্তি মাঠের মধ্যে বেদির উপর রাখা আছে আর তাছাড়া একটা দোতলা বাড়ি আছে যার ভিতরে এইরকম আরও মূর্তি রয়েছে। তবে এগুলোর পুরোটাই সংগ্রাহকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা - যাকে বলে বিমূর্ত শিল্প (অ্যাবস্ট্র্যাক্ট আর্ট)। যে পাথরটা দেখে সংগ্রাহকের শিবের ষাঁড় নন্দী মনে হবে, সেটা দেখে আমার বিরিয়ানীর হাঁড়িও মনে হতে পারে অথবা যেটা দেখে সংগ্রাহকের মনে হয়েছে বসে থাকা গরু, সেটা দেখে আমার চিকেনের থাই-এর পিসও মনে হতে পারে ! যাই হোক, বিকেলের পড়ন্ত আলোয় জায়গাটা দেখতে ভালো লাগছিল, তাই এখানে কিছুক্ষণ বসে রইলাম।

বিকেলে হোটেলে ফেরার পরে আগের দুদিনের মতোই কাটলো। রাতের ডিনারে একটু স্পেশাল খাওয়া দাওয়া হল - ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন। খরচ হল ১,১৩৪/- টাকা।

রাঙাবিতানের গেটের সামনে
পরেরদিন বৃহস্পতিবার ১৯শে ডিসেম্বর, ২০২৪ - সকালে ব্রেকফাস্ট করে বেলা ১০ঃ১৫ নাগাদ মালপত্র নিয়ে চেক্‌আউট করে বেরিয়ে পড়লাম। দুপুর দুটো নাগাদ বাড়ি পৌঁছলাম। শেষ !




সারসংক্ষেপ ঃ

১. কলকাতা থেকে তিনচার ঘন্টা দূরে ঘোরার যে জায়গাগুলো আছে, শান্তিনিকেতন তার মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ জায়গা। শান্তিনিকেতন ভালোভাবে ঘোরার জন্য দুটো দিন হাতে রাখা ভালো তবে সময় কম থাকলে একরাতের জন্যও যাওয়া যেতে পারে।

২. শান্তিনিকেতন গাড়ি নিয়েও যাওয়া যায় আবার ট্রেনেও যাওয়া যায়। ট্রেনে গেলে বোলপুর শান্তিনিকেতন স্টেশনে নামতে হবে। শিয়ালদহ, হাওড়া এবং কলকাতা স্টেশন থেকে বোলপুর যাওয়ার প্রচুর সংখ্যক ট্রেন রয়েছে।

৩. নিজেদের গাড়ি না নিয়ে গেলে শান্তিনিকেতনে ঘোরার জন্য টোটো সবথেকে ভালো। এখানে দেখার জায়গাগুলোর কোনওটারই দূরত্ব বেশি নয়, তাই গাড়ি ভাড়া করার কোনও মানেই হয় না।

৪. থাকার জন্য শান্তিনিকেতনে বহুসংখ্যক হোটেল আছে, তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের রাঙাবিতান ট্যুরিজম প্রপার্টি ও শান্তবিতান ট্যুরিজম প্রপার্টি উল্লেখযোগ্য। আমরা এদের ওয়েবসাইট https://wbtdcl.wbtourismgov.in/home থেকে রাঙাবিতান ট্যুরিজম প্রপার্টির বুকিং করেছিলাম।

৫. পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের অন্যান্য হোটেলের মতো রাঙাবিতান ট্যুরিজম প্রপার্টিতেও কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট দেয়। এখানে যা খাবার দেয় তা খেয়ে রীতিমতো পেট ভরে যায় এবং এখানকার রান্নার মানও বেশ ভালো।

৬. শান্তিনিকেতনের প্রধান আকর্ষণ বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং তার সংলগ্ন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ি, মিউজিয়াম ইত্যাদি। এছাড়া অবশ্য অবশ্য দ্রষ্টব্য হল রেলস্টেশন সংলগ্ন গীতাঞ্জলি রেল মিউজিয়াম। বাকি জায়গার মধ্যে কোপাই নদী এবং সোনাঝুরি হাটও বিশেষভাবে দ্রষ্টব্য এবং বিমূর্ত শিল্পে আগ্রহ থাকলে প্রকৃতি ভবনও।

৭. সোনাঝুরি হাট যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে সেটা সপ্তাহের কোনদিন বসে সেটা আগে থেকে জেনে যাওয়া ভালো। হাটের জিনিসপত্রের দাম যথাযথ।

৮. শীতকালে গেলে শান্তিনিকেতন থেকে গুড় কেনা যেতে পারে। এখানকার গুড়ের দাম কম নয়, তবে মান খুবই উন্নত।

৯. শান্তিনিকেতনের হোটেল রাম শ্যাম খাওয়া দাওয়ার জন্য ইদানীংকালে সুপরিচিত। খাবারের দাম একটু বেশির দিকে তবে অভিজ্ঞতার জন্য একবার এখানে খাওয়া যেতেই পারে।

১০. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রিয় ঋতু বর্ষা হলেও শান্তিনিকেতন ঘোরার জন্য সবথেকে ভালো হল শীতকাল। গ্রীষ্মকালে এখানে ভালোরকম গরম পড়ে, তাই সেইসময়ে না যাওয়াই ভালো।

উপসংহার ঃ

শান্তিনিকেতন
বাঙালি তথা ভারতীয়রা বিশ্বের দরবারে যাঁর জন্য সুপরিচিত - তিনি রবীন্দ্রনাথ। জীবনের আগাগোড়া পরাধীন দেশে থেকেও দেশের শাসকদের থেকে যিনি অর্জন করে নিয়েছিলেন অপরিসীম সম্মান - তিনি রবীন্দ্রনাথ। পরাধীন দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকারীদের যিনি গোপনে সবরকমভাবে সাহায্য করে গেছেন - তিনি রবীন্দ্রনাথ। নিজের গান, কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প দিয়ে যিনি গোটা বিশ্বকে সমৃদ্ধ করেছেন - তিনি রবীন্দ্রনাথ। জীবনে ত্রিশটিরও বেশি দেশ যিনি ভ্রমণ করেছেন এবং সেইসব দেশের অগণিত জ্ঞানী-গুণী মানুষ যাঁর দর্শন ও সান্নিধ্য পেয়ে ধন্য হয়েছেন - তিনি রবীন্দ্রনাথ। 'বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে' চাণক্য শ্লোকের এই অংশটা যাঁর সম্পর্কে সবথেকে বেশি খাটে - তিনি রবীন্দ্রনাথ। যাঁর শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতা যাতায়াতের জন্য ভারতীয় রেল একটা আস্ত সেলুন কার সংরক্ষণ করেছিল - তিনি রবীন্দ্রনাথ। অসুস্থ অবস্থায় যাঁর চিকিৎসা করেছিলেন সেইসময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসকরা - তিনি রবীন্দ্রনাথ। যাঁর মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল আপামর জনসাধারণ, যাঁর শেষযাত্রায় সামিল হয়েছিল গোটা কলকাতা শহর - তিনি রবীন্দ্রনাথ। মৃত্যর ৮৩ বছর পরেও যাঁর সৃষ্টি আজও আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে একইরকমভাবে প্রাসঙ্গিক - তিনি রবীন্দ্রনাথ - একমাত্র 'ঠাকুর' যাঁকে বহু মানুষ সচক্ষে দেখেছে। সেই রবীন্দ্রনাথের তৈরি শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। ৮১ হাজার বর্গমিটার জায়গা জুড়ে তৈরি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আজও - শুধুই তিনি। আর তাঁর জন্যই শান্তিনিকেতনে যাওয়া - জীবনে অন্ততঃ একবার। একবার ঘোরা হয়ে গিয়ে থাকলে আরেকবার। দুবার ঘোরা হয়ে গিয়ে থাকলে আরেকবার। এইভাবে - বারবার। বহুবার।

"আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না"

শান্তিনিকেতন ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

No comments:

Post a Comment