ভ্রমণপথ ঃ
সোমবার ১৬ই ডিসেম্বর, ২০২৪ঃ সকাল ৭ঃ৩০ মিনিটে কলকাতা থেকে গাড়িতে যাত্রা করে সকাল ১১ঃ৩০ মিনিটে শান্তিনিকেতন - শান্তিনিকেতনে রাত্রিবাস।
মঙ্গলবার ১৭ই ডিসেম্বর, ২০২৪ঃ সকাল ১০ঃ৩০ মিনিটে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে সাইট সিয়িং - শান্তিনিকেতনে রাত্রিবাস।
বুধবার ১৮ই ডিসেম্বর, ২০২৪ঃ সকাল ১১টায় গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে সাইট সিয়িং - শান্তিনিকেতনে রাত্রিবাস।
বৃহস্পতিবার ১৯শে ডিসেম্বর, ২০২৪ঃ সকাল ১০ঃ৩০ মিনিটে শান্তিনিকেতন থেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে দুপুর ২টোয় কলকাতা।
আমার জীবনের প্রথম ঘুরতে যাওয়ার জায়গার নাম শান্তিনিকেতন। তখন আমার একবছর বয়স। বাবা-মা-ঠাম্মার কাছে শুনেছি আমরা সেবার একটা অ্যাম্বাসাডার গাড়ি করে গিয়েছিলাম আর আমাদের দলের দুজন ট্রেনে গিয়েছিল। আমি নাকি অ্যাম্বাসাডার গাড়ির পিছনের সিটের যাত্রীদের কোলে লম্বা হয়ে শুয়ে থাকতাম। ওখানে আমরা যে হোটেলে ছিলাম সেই সময়ে সেখানে প্রখ্যাত অভিনেতা অনিল চট্টোপাধ্যায় এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে আমাদের আলাপও হয়েছিল। বড়দের মুখে শোনা টুকরো টুকরো গল্প আর কিছু ছবিই আমার সেবারের শান্তিনিকেতন ভ্রমণের সম্বল। সেবারের শান্তিনিকেতন ভ্রমণের কোনও স্মৃতিই আমার নেই - থাকা সম্ভবও নয়। তাই প্রথমবারের না-থাকা স্মৃতিগুলো তৈরির জন্য আমার এই দ্বিতীয়বার শান্তিনিকেতন ভ্রমণ আর সেই নিয়ে আমার ব্লগের এবারের পোস্ট।
আমাদের এবারের দলে শুধুমাত্র আমরা ছজন - আমি অমৃতা বাবা মা কথা কলি। সোমবার ১৬ই ডিসেম্বর, ২০২৪ সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ আমরা ছজন বাড়ি থেকে বেরোলাম আমাদের গাড়ি নিয়ে। শান্তিনিকেতনের দূরত্ব ১৭৩ কিলোমিটার, যেতে সাড়ে তিন ঘন্টা মতো লাগার কথা। আমাদের যাত্রাপথ ডানলপ - বালি ব্রীজ - ১৯ নং জাতীয় সড়ক - বর্ধমান - ১১৪ নং জাতীয় সড়ক - সুরুল রোড - শান্তিনিকেতন। ব্রেকফাস্টের স্যান্ডউইচ্ ইত্যাদি আমাদের সঙ্গেই ছিল, রাস্তায় শুধু একবার দাঁড়িয়ে একটু চা-টা খেয়ে নেওয়া হল। তারপর আমরা আবার এগিয়ে চললাম আমাদের গন্তব্যের দিকে।
সুরুল রাজবাড়ি -
টিকিটঃ মাথাপিছু ১০/- টাকা (ছোটদের লাগে না)
![]() |
| রাজবাড়ির নাটমন্দির |
আমরা এখানে মিনিট দশেক থেকে বেরিয়ে এলাম। তারপর এগিয়ে চললাম শান্তিনিকেতনের দিকে। শান্তিনিকেতনে আমাদের বুকিং ছিল পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের 'রাঙাবিতান ট্যুরিজম প্রপার্টি'-তে। শান্তিনিকেতনে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের দুটো প্রপার্টি আছে - রাঙাবিতান আর শান্তবিতান। এদের মধ্যে শান্তবিতান শহরের মধ্যে আর সেই কারণে এর পরিবেশটা ঠিক 'শান্ত' বলা চলে না। অন্যদিকে রাঙাবিতানের পরিবেশ খুব শান্ত ও নিরিবিলি, শহরের একটু বাইরে একেবারে গাছপালা ঘেরা জায়গায়। সেই কারণে আমরা রাঙাবিতানেই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। দুপুর বারোটার একটু পরে আমরা এখানে পোঁছলাম।
![]() |
| সেঁজুতীর সামনে |
আমরা ঘরে ঢুকে চানটান করে খাওয়ার জায়গায় গেলাম। খাওয়ার জায়গাটা রিসেপশন বিল্ডিং-এর পাশে। আমরা ফিশ থালি অর্ডার দিলাম। খাবারের মান খুবই ভালো - আর সবথেকে ইন্টারেস্টিং বিষয় হল এরা থালিগুলো খুব সুন্দর করে সাজিয়ে দেয়। একটা গোল থালার মাঝখানে ভাত আর সেটা ঘিরে অনেকগুলো নানাসাইজের বাটিতে অন্যান্য তরকারি। বাটিগুলো এরা বড় থেকে ছোট এইভাবে সাজিয়ে দেয়। দেখতেও ভালো, খেতেও ভালো ! আমাদের খরচ পড়ল ৯৩৫/- টাকা।
খাওয়ার কিছুক্ষণ পরে আমরা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য এখানকার বিখ্যাত সোনাঝুরি হাট। জায়গাটার দূরত্ব আমাদের রিসর্ট থেকে ৩ কিলোমিটারের মতো। মিনিট দশেক গাড়ি চালিয়ে আমরা এখানে পৌঁছলাম। এখানে গাড়ি রাখার সমস্যা, বিশেষ করে এইসময়ে প্রচুর ট্যুরিস্ট আসার কারণে গাড়ি রাখার জায়গাগুলো একেবারে ভর্তি। শেষপর্যন্ত হাট থেকে বেশ কিছুটা দূরে পার্কিং-এর জায়গা পাওয়া গেল। পার্কিং চার্জ ১০০/- টাকা।
![]() |
| সোনাঝুরি হাট |
হাট থেকে আমরা যখন বেরোলাম, তখন দিনের আলো পড়ে এসেছে। এখানে রাস্তার ধারে খেজুর গুড় বিক্রি করছে, ঝোলা, পাটালী দুইই আছে। আমরা কিছুটা কিছুটা করে গুড় কিনলাম আর সেইসঙ্গে কিছুটা চাখলামও। উত্তম স্বাদ !
![]() |
| রাঙাবিতানের রঙিন ফোয়ারা |
![]() |
| রিসর্টের বাইরের লালমাটির রাস্তা |
![]() |
| কোপাই-এর ধারে |
পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের প্রায় সব হোটেলেই কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট দেয় - শান্তিনিকেতনও তার থেকে আলাদা নয়। আমরা সকাল নটা নাগাদ ব্রেকফাস্ট করতে গেলাম। ব্রেকফাস্টের মেনু লুচি তরকারী / মাখন বা জ্যাম পাঁউরুটি। সেইসঙ্গে একটা করে কলা আর ডিমসেদ্ধ / অমলেট। খাবার যা দেয়, তাতে ভালোই পেট ভরে যায়। আমরা খাওয়াদাওয়া সেরে ঘরে ফিরে এলাম আর তারপর তৈরি হয়ে বেরোলাম আমাদের প্রথমদিনের সাইটসিয়িং-এর জন্য।
শান্তিনিকেতনের প্রধান দেখার জায়গাগুলোর প্রায় সবই বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ। আমরা গাড়ি নিয়ে বিশ্বভারতীর কাছাকাছি পৌঁছলাম। একটা মুস্কিল হল জায়গায়গুলোর কোনটা ঠিক কোথায় জানি না আর সেখানে গাড়ি নিয়ে গেলে পার্কিং-এর জায়গা আছে কিনা তাও জানি না। আবার পুরোটা হেঁটেও ঘোরা সম্ভব নয়। তাই গাড়ি একজায়গায় পার্কিং করে একটা টোটো ভাড়া করা হল। এই টোটো আমাদের বিশ্বভারতীর ভিতরের সবকিছু ঘুরে দেখাবে।
আমরা টোটোয় উঠে জায়গাটা ঘুরে দেখলাম। এই ঘুরে দেখানোটা আসলে একটা ধাপ্পা, এরা শুধু কোথায় কী আছে, ঘুরে ঘুরে সেটাই দেখায়। যেহেতু বর্তমানে কোভিডের পর থেকে বিশ্বভারতীর ভিতরে বিভিন্ন জায়গায় ঢোকা বারণ হয়ে গেছে, তাই টোটোওয়ালা বাইরে থেকে আমাদের জায়গাগুলো দেখালো আর তারপর আবার আমাদের গাড়ির কাছে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিল। এর জন্য তাকে দিতে হল ১৫০/- টাকা। তবে এই ঘোরার ফলে আমাদের একটা সুবিধে হল - দেখার জায়গাগুলোর কোনটা কোথায় আর সেটা দেখতে গেলে গাড়ি কোথায় রাখতে হবে তার একটা ধারণা হয়ে গেল। এবার আমরা গাড়ি নিয়ে আবার ওই জায়গাগুলোই দেখতে গেলাম।
![]() |
| পৌষমেলা প্রাঙ্গন |
মাঠটাকে বাঁদিকে রেখে আমরা গাড়ি নিয়ে আরও এগিয়ে চললাম। একজায়গায় মাঠটা শেষ হয়ে গিয়ে রাস্তাটা বাঁদিকে ঘুরে গেছে। এই রাস্তার নাম বিবেকানন্দ সরণী। এখান দিয়ে যেতে হলে একটা গেটের ভিতরে ঢুকতে হয় আর কিছুদূর গিয়ে আরেকটা গেট দিয়ে বেরোলে সামনে পড়ে শান্তিনিকেতন রোড। এবার আমরা ডানদিকে ঘুরে এগিয়ে চললাম।
![]() |
| পাঠশালায় মহড়ারত কচিকাঁচারা |
![]() |
| তিন পাহাড় |
![]() |
| তালধ্বজ |
![]() |
| উপাসনা গৃহ |
![]() |
| বসত বাড়ি |
![]() |
| ছাতিমতলা |
![]() |
| কলাভবনের সামনে |
![]() |
| প্রতীচী |
এই অঞ্চলে বেশ কয়েকটা হোটেল আছে। এই রাস্তা ধরে এগোলে আর বিশ্বভারতীর দেখার কিছু নেই, তাই আমরা এবার এই পথে উল্টোদিকে ফিরতে শুরু করলাম। কিছুদূর ফেরার পরে কলাভবন পেরোনোর পরে বাঁদিকে পড়ল এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান - রবীন্দ্র মিউজিয়াম।
রবীন্দ্র মিউজিয়াম -
টিকিটঃ মাথাপিছু ১০০/- টাকা (ছোটদের ১০/- টাকা)
রবীন্দ্র মিউজিয়াম প্রধানতঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জিনিসপত্র, ছবি ইত্যাদির সংগ্রহশালা হলেও এখানে ঠাকুরবাড়ির অন্যান্য কিছু জিনিসপত্রও রয়েছে। মিউজিয়ামটা দোতলা। ভিতরে ঢুকে আমরা প্রথমে বাঁদিকের একটা বড় হলঘরে ঢুকলাম। সেখানে ঠাকুর পরিবারের বিভিন্ন মানুষদের বড় বড় ছবি, তাঁদের সম্পর্কে নানারকম তথ্যাদি রয়েছে। বিভিন্ন মানুষের ছবি রয়েছে আর সেইসঙ্গে রয়েছে তাঁদের লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্রের অংশবিশেষ। একটা ছাপার মেশিন রয়েছে যেটা ঠাকুরবাড়ির পত্রিকা ছাপানোর জন্য ব্যবহৃত হত।
![]() |
| মিউজিয়ামের বাইরে |
![]() |
| উত্তরায়ণের সামনে |
আমাদের বিশ্বভারতীতে যা যা দেখা সম্ভব তার সবই দেখে ফেলেছি, তাই আমরা এবার এখান থেকে বেরিয়ে পড়লাম। দুপুর আড়াইটে বাজে, তাই এবার খাওয়ার জায়গায় যেতে হবে। আমরা যে অঞ্চলে ঘোরাঘুরি করছিলাম, সেখানে কোনও খাবার হোটেল নেই, শান্তিনিকেতন রোড ধরে বোলপুর স্টেশনের দিকে কিছুটা এগিয়ে একটা খাবার হোটেল পেলাম। হোটেলের খাবারের মান বেশ ভালো আর সেইসঙ্গে অবাক করার মতো এদের আতিথেয়তা। আমরা মাছ আর চিকেন থালি নিয়েছিলাম। থালি সিস্টেমের নিয়ম হল এখানে প্রধান পদটা (ডিম / মাছ / মাংস) ছাড়া বাকি সবকিছুই যত ইচ্ছে নেওয়া যায়। কিন্তু এরা প্রথমেই যা দিয়েছিল, সেটাই আমার পক্ষে যথেষ্ট। আমরা আর কিছু নিচ্ছি না দেখে এরা আমাদের রীতিমতো জোর করছিল "আরেকটু ভাত দিই না?" "আরেকটু আলুপোস্ত নেবেন না, কেন রান্না ভালো হয়নি ?" ইত্যাদি বলে। খাওয়ার হোটেলে এরকম বিয়েবাড়ির মতো আপ্যায়ন আমি অন্য কোথাও দেখেছি বলে মনে পড়ে না। সেইসঙ্গে এখানকার রান্নার মানও খুব ভালো। আমাদের সবমিলিয়ে খরচ পড়ল ৯৭০/- টাকা।
খাওয়ার পরে আবার বিশ্বভারতীর দিকেই গেলাম কারণ আমাদের ফেরার পথ সেদিকেই। ফেরার পথে আবার পড়ল মৃণালিনী আনন্দ পাঠশালা, তিন পাহাড়। তিনপাহাড় থেকে আমরা এবার বাঁদিকে না গিয়ে সোজাপথ ধরলাম আর এখানে ডানদিকে পড়ল শান্তিনিকেতন সাব্ পোস্ট অফিস।
![]() |
| পোস্ট অফিসের দোতলায় |
![]() |
| হোস্টেলের সামনে মূর্তি |
রিসর্টে ফিরে এসে দেখলাম আগেরদিনের মতো রঙিন ফোয়ারা শুরু হয়েছে। সন্ধ্যেটা একইরকমভাবে কাটিয়ে দিলাম। রাতে ডিনারে আগেরদিনের মতোই রুটি, ডিম, চিকেন খাওয়া হল। খরচ হল ৪৭৩/- টাকা।
পরেরদিন বুধবার ১৮ই ডিসেম্বর, ২০২৪ - সকালে রিসর্টে ব্রেকফাস্ট করে সাড়ে নটা নাগাদ বেরোলাম। আগেরদিন বিশ্বভারতীর যতটা সম্ভব দেখা হয়ে গেছে, তাই দ্রষ্টব্য শান্তিনিকেতনের অন্যান্য জায়গা। রিসর্ট থেকে বেরিয়ে গাড়িতে আধঘন্টা চলার পরে পৌঁছলাম আমাদের প্রথম গন্তব্য - রেল মিউজিয়ামে। মিউজিয়ামটা একেবারে বোলপুর শান্তিনিকেতন রেলস্টেশনের পাশে। এবং এখানে পৌঁছনোর পথের শেষটা বেশ ঘিঞ্জি। রেল মিউজিয়ামের আলাদা কোনও পার্কিং নেই, তবে এখানে রেলের একটা বেশ বড় পার্কিং এরিয়া আছে। সেখানে গাড়ি রেখে আমরা মিউজিয়ামে ঢুকলাম।
গীতাঞ্জলি রেল মিউজিয়াম -
টিকিট ঃ মাথাপিছু ৩০/- টাকা (ছোটদের ১০/- টাকা)
রেল মিউজিয়ামটা বেশ বড় একটা বাড়ি। এবং ভিতরে ঢোকার দেওয়ালের গায়েই লেখা আছে 'গীতাঞ্জলি - শান্তিনিকেতনের গল্প'। আর এই গল্পটা যে কতটা বিস্তারিত এবং ইন্টারেস্টিং সেটা জানার জন্য মিউজিয়ামটা খুব মন দিয়ে ভালো করে দেখতে হবে। মিউজিয়ামটা প্রধানতঃ বহু সংখ্যক ছবি এবং সেই ছবির নিচে লেখা দিয়ে সাজানো। এবং এগুলো একটা নির্দিষ্ট ক্রমে সাজানো যা পরপর দেখলে শান্তিনিকেতনের ইতিহাসটা চোখের সামনে দেখা যায়। মিউজিয়ামের ঘরগুলোর ভিতরে এইভাবেই ইতিহাসটা সাজানো হয়েছে এবং তীরচিহ্নের সাহায্যে কার পরে কোনদিকে যেতে হবে সবই নির্দেশ করা আছে। প্রথমে একতলা, তারপরে দোতলা আর শেষে আবার একতলায় নেমে বেরোনোর দরজা।
মিউজিয়ামের শুরু হয়েছে ১৮৬৩ সালে - যখন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বোলপুরে একটা ছাতিমগাছ ও তার চারপাশে একটা বিস্তীর্ণ জমি ইজারা নেন। এখানে উনি একটি বাড়ি তৈরি করেন এবং তার নাম দেন শান্তিনিকেতন (আমার ধারণা ছিল শান্তিনিকেতন নামটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেওয়া কিন্তু সেটা ভুল)। কার কাছ থেকে কত টাকা দিয়ে ইজারা নেন এবং সেই দলিলের ছবিও এখানে দেওয়া রয়েছে। সেইসঙ্গে রয়েছে সেইসময়কার কিছু ফোটোগ্রাফ - শান্তিনিকেতনের সেই সময়ের ছবি।
আমরাও এগোচ্ছি, ঘটনাও এগোচ্ছে। শান্তিনিকেতনের ইতিহাসের মধ্যে অবধারিতভাবে চলে এসেছে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির কথা। রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা, তাঁর দাদা দিদিদের কথা। রবীন্দ্রনাথের জীবনের কৈশোর, যৌবনের ঘটনা আর সেইসঙ্গে তাঁর সৃষ্টির কথা। এসেছে তাঁর মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথ ও মেজবৌঠান জ্ঞানদানন্দিনীর কথা, নতুনদাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও নতুন বৌঠান কাদম্বরীর কথা। রবীন্দ্রনাথের বিলেতযাত্রা এবং ধীরে ধীরে কবি, গীতিকার, সুরকার, সুগায়ক হিসেবে পরিচিতির কথা। এরপর তিনি পরিণত হয়েছেন - ক্রমে দেশে বিদেশে পরিচিতিলাভ করেছেন। কত বিখ্যাত মানুষের সঙ্গে যে তাঁর সঙ্গে মিলিত হয়েছেন এবং কত দেশে যে তিনি আতিথেয়তা গ্রহণ করেছেন, আমার সে সম্পর্কে ধারণা থাকলেও ধারণার ব্যাপ্তি তৈরি হল এই মিউজিয়াম দেখে। একসময়ে শান্তিনিকেতনে তিনি শুরু করলেন ব্রহ্মচর্যাশ্রম - প্রাচীন বৈদিক পদ্ধতিতে আশ্রমিক শিক্ষাদান। শান্তিনিকেতনের গাছতলায় পড়াশোনা, শিল্প-সাহিত্যচর্চা, বিভিন্ন শিক্ষকদের কথা - সবই এখানে সবিস্তারে তুলে ধরা হয়েছে। মিউজিয়ামের বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে আমি জায়গাটা ঘুরে দেখার আনন্দটা নষ্ট করতে চাই না, তাই একেবারে শেষে চলে যাচ্ছি।
ধীরে ধীরে বার্দ্ধক্য কবিকে গ্রাস করতে শুরু করল। শরীর ভাঙতে লাগল। এরই মধ্যে ১৩৪৭ বঙ্গাব্দের (১৯৪০ খ্রীষ্টাব্দ) ২৫শে বৈশাখ নিজের জন্মদিনে রচনা করলেন 'হে নূতন দেখা দিক আর বার' গানটি। এরপরের অংশটায় রোগভোগ এবং ডাক্তারদের উল্লেখই বেশি। রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে থাকতে পছন্দ করতেন কিন্তু এখানে চিকিৎসার সুবন্দোবস্ত না থাকার কারণে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হত। ১৯৪১ সালের ২৫শে জুলাই তাঁকে চিকিৎসার জন্য শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়। এটাই তাঁর চিরকালের মতো শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে যাওয়া। ট্রেনের যে বগিতে তাঁকে নিয়ে আসা হয়, সেই বগিটা এখানে রাখা রয়েছে। কলকাতায় জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে ৩০শে জুলাই তাঁর অপারেশন করা হয়। ডাক্তারদের যে দল তাঁর অপারেশন করেন তার মধ্যে ছিলেন দুই প্রখ্যাত ডাক্তার ডঃ নীলরতন সরকার ও ডঃ বিধানচন্দ্র রায়। কিন্তু অপারেশনের পরেও রবীন্দ্রনাথের স্বাস্থ্যের বিশেষ উন্নতি হয় না।
আমরা দোতলা থেকে একতলায় নেমে এসেছি, বুঝতে পারছি এবার আমরা মিউজিয়ামের একেবারে শেষের দিকে চলে এসেছি - চলে এসেছি রবীন্দ্রনাথের জীবনেরও একেবারে শেষের দিকে। শেষ অংশটা এত সুন্দর যে ছবি দেখে আর সঙ্গের লেখা পড়ে গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল ! ডঃ সরকার, ডঃ রায় প্রমুখরা রবীন্দ্রনাথকে দেখতে আসেন। তাঁকে স্যালাইন, অক্সিজেন দেওয়া হয়। ৬ই আগস্ট রাতে তাঁর অবস্থার অবনতি হয়। ৭ই আগস্ট (২২শে শ্রাবণ) সকালে অক্সিজেনের নল খুলে দেওয়া হয় কারণ নল লাগানো থাকায় উনি খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন। অবশেষে আসে সেই মূহুর্ত - ঘড়িতে দুপুর ১২ঃ১০। সবাইকে ছেড়ে চলে যান গুরুদেব - বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর - বাঙালি তথা ভারতের তথা সারা পৃথিবীর সর্বকালের সেরা মনিষীদের অন্যতম ব্যক্তিত্ব !
তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি
বিচিত্র ছলনা-জালে,
হে ছলনাময়ী।
(রবীন্দ্রনাথের লেখা 'তোমার সৃষ্টির পথ' কবিতার প্রথম কয়েকটা লাইন। রচনা করেছিলেন ৩০শে জুলাই সকাল ৯ঃ৩০ মিনিটে, তাঁর অপারেশনের কিছুক্ষণ আগে। লেখনশক্তি ছিল না, মুখে বলে গিয়েছিলেন, লিখে নেওয়া হয়েছিল। এটাই তাঁর জীবনের লেখা শেষ কবিতা।)
![]() |
| মিউজিয়ামের সামনে |
মিউজিয়াম নিয়ে লেখাটা কিছুটা দীর্ঘ হয়ে গেল। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবেই এটাকে সংক্ষিপ্ত করলাম না - করতে চাইলাম না। এটা এরকমই থাক !
মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে এগিয়ে চললাম পরবর্তী গন্তব্য - কঙ্কালিতলার মন্দিরের দিকে। রেল মিউজিয়াম থেকে এখানে পৌঁছতে লাগল প্রায় আধঘন্টা।
![]() |
| কঙ্কালিতলা মন্দির |
আমাদের এরপরের গন্তব্য তালপুকুর। কঙ্কালিতলা থেকে সেখানে পৌঁছতে লাগল মিনিট কুড়ি। নামে পুকুর হলেও এটা বেশ বড় একটা দীঘি (হ্যাঁ, নামে তালপুকুর এবং ঘটি কেন, ঘটিধারী ডুবে যাওয়ার মতো জল রয়েছে !)। দীঘির চারপাশ রেলিং দিয়ে ঘেরা আর তাই বাইরে গাছপালা। অর্থাৎ দীঘি দেখতে হলে রেলিং-এর ভিতরে ঢুকতে হবে। একজায়গা একটা লোহার গেট রয়েছে যাতে তালা দেওয়া। অনেক ডাকাডাকি করেও কারোর সাড়া পাওয়া গেল না, ফলে এই জায়গাটা দেখার বাসনা ত্যাগ করতে হল। এগিয়ে চললাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের দিকে।
![]() |
| নদীর ভিউ পয়েন্টে |
এরপরের গন্তব্য দ্রষ্টব্য নয়, ভোজ্য। দুপুরে খাবার আমরা কোথায় খাব তা আগেই ঠিক করা ছিল। শান্তিনিকেতনে ইদানীং বিখ্যাত হওয়া হোটেল রাম শ্যাম। ভিউ পয়েন্ট থেকে এখানে পৌঁছতে লাগল দশ মিনিট। জায়গাটা সোনাঝুরি হাটের পিছনের দিকে। যেহেতু বুধবার তাই সোনাঝুরির হাট বসেনি আর তাই আমাদের রাম-শ্যাম-এ পৌঁছনো সহজ হল। এখানে প্রচন্ড ভীড়। গিয়েই জায়গা পাওয়া গেল না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর বসতে পারলাম। এখানে থালি নেওয়াই ভালো। থালিতে অনেকগুলো পদ আর সবকটাই খুব ভালো। মানে খুবই ভালো। চিকেন, মাটন, মাছ ইত্যাদি নিয়ে আমাদের খরচ হল ১,৩৬৮/- টাকা। রাম শ্যামে একটা বেশ ভালো মানের ঘি পাওয়া যায়, আমরা এখান থেকে ঘি কিনলাম। ঘি-টা সত্যিই ভালো।
প্রকৃতি ভবন -
টিকিট ঃ মাথাপিছু ৩০/- টাকা
ক্যামেরা / মোবাইলের চার্জ ঃ ২০/- টাকা
![]() |
| প্রকৃতি ভবনের মূর্তির সামনে |
বিকেলে হোটেলে ফেরার পরে আগের দুদিনের মতোই কাটলো। রাতের ডিনারে একটু স্পেশাল খাওয়া দাওয়া হল - ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন। খরচ হল ১,১৩৪/- টাকা।
![]() |
| রাঙাবিতানের গেটের সামনে |
সারসংক্ষেপ ঃ
১. কলকাতা থেকে তিনচার ঘন্টা দূরে ঘোরার যে জায়গাগুলো আছে, শান্তিনিকেতন তার মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ জায়গা। শান্তিনিকেতন ভালোভাবে ঘোরার জন্য দুটো দিন হাতে রাখা ভালো তবে সময় কম থাকলে একরাতের জন্যও যাওয়া যেতে পারে।
২. শান্তিনিকেতন গাড়ি নিয়েও যাওয়া যায় আবার ট্রেনেও যাওয়া যায়। ট্রেনে গেলে বোলপুর শান্তিনিকেতন স্টেশনে নামতে হবে। শিয়ালদহ, হাওড়া এবং কলকাতা স্টেশন থেকে বোলপুর যাওয়ার প্রচুর সংখ্যক ট্রেন রয়েছে।
৩. নিজেদের গাড়ি না নিয়ে গেলে শান্তিনিকেতনে ঘোরার জন্য টোটো সবথেকে ভালো। এখানে দেখার জায়গাগুলোর কোনওটারই দূরত্ব বেশি নয়, তাই গাড়ি ভাড়া করার কোনও মানেই হয় না।
৪. থাকার জন্য শান্তিনিকেতনে বহুসংখ্যক হোটেল আছে, তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের রাঙাবিতান ট্যুরিজম প্রপার্টি ও শান্তবিতান ট্যুরিজম প্রপার্টি উল্লেখযোগ্য। আমরা এদের ওয়েবসাইট https://wbtdcl.wbtourismgov.in/home থেকে রাঙাবিতান ট্যুরিজম প্রপার্টির বুকিং করেছিলাম।
৫. পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের অন্যান্য হোটেলের মতো রাঙাবিতান ট্যুরিজম প্রপার্টিতেও কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট দেয়। এখানে যা খাবার দেয় তা খেয়ে রীতিমতো পেট ভরে যায় এবং এখানকার রান্নার মানও বেশ ভালো।
৬. শান্তিনিকেতনের প্রধান আকর্ষণ বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং তার সংলগ্ন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ি, মিউজিয়াম ইত্যাদি। এছাড়া অবশ্য অবশ্য দ্রষ্টব্য হল রেলস্টেশন সংলগ্ন গীতাঞ্জলি রেল মিউজিয়াম। বাকি জায়গার মধ্যে কোপাই নদী এবং সোনাঝুরি হাটও বিশেষভাবে দ্রষ্টব্য এবং বিমূর্ত শিল্পে আগ্রহ থাকলে প্রকৃতি ভবনও।
৭. সোনাঝুরি হাট যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে সেটা সপ্তাহের কোনদিন বসে সেটা আগে থেকে জেনে যাওয়া ভালো। হাটের জিনিসপত্রের দাম যথাযথ।
৮. শীতকালে গেলে শান্তিনিকেতন থেকে গুড় কেনা যেতে পারে। এখানকার গুড়ের দাম কম নয়, তবে মান খুবই উন্নত।
৯. শান্তিনিকেতনের হোটেল রাম শ্যাম খাওয়া দাওয়ার জন্য ইদানীংকালে সুপরিচিত। খাবারের দাম একটু বেশির দিকে তবে অভিজ্ঞতার জন্য একবার এখানে খাওয়া যেতেই পারে।
১০. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রিয় ঋতু বর্ষা হলেও শান্তিনিকেতন ঘোরার জন্য সবথেকে ভালো হল শীতকাল। গ্রীষ্মকালে এখানে ভালোরকম গরম পড়ে, তাই সেইসময়ে না যাওয়াই ভালো।
উপসংহার ঃ
![]() |
| শান্তিনিকেতন |
"আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না"
শান্তিনিকেতন ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.
























