আমি ব্লগ লেখার খুব বেশি সমর্থক কোনওদিনও ছিলাম না, সত্যি কথা বলতে কি এখনও যে আছি তা নয় । তার একটা প্রধান কারণ আমার ধারণা ব্লগ লেখার থেকেও পড়া অনেক বেশি ক্লান্তিকর । অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অনেক সময়ই পড়তে শুরু করে শেষ করা হয়ে ওঠে না । নিজের ধৈর্য এবং/অথবা আগ্রহের অভাবকে 'ঠিক আছে, বাকিটা পরে পড়ব' জাতীয় অজুহাত দিয়ে ঢেকে দিই - আর আমরা সবাই জানি সেই 'পরে' টা আর কখনওই আসে না । তো, এই কারণে আমি ঠিক করেছি আমার ব্লগকে কখনওই অন্যের ক্লান্তির কারণ ঘটাব না, আমার ব্লগের বিষয় হবে প্রধানতঃ ভ্রমণ । আমার মতো যেসব বাঙালিরা ঘুরতে ভালোবাসে, তাদের জন্য আমার ব্লগ হবে তথ্যের একটা উৎস । আমার নিজের একটা অভ্যেস আছে, কোনও জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার আগে সেই জায়গাটা সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, আর ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে আমার বরাবরই মনে হয়েছে যে ইন্টারনেটে লেখালেখি করার ব্যাপারে বাঙালিদের থেকে কুঁড়ে খুব কম শিক্ষিত জাতই আছে । আমার মতো যেসব বাঙালিরা আছে, যারা ইন্টারনেটে কোনো একটা ইংরিজীতে লেখা দেখলেই না পড়ার চেষ্টা করে, তাদের জন্য আমার ব্লগ সহায়ক হবে, এই বিশ্বাস নিয়ে শুরু করছি আমার ভ্রমণকাহিনী । আগেই বলে রাখি, আমি স্ট্যাটিসটিক্সের ছাত্র ছিলাম, তাই আমার ব্লগে তত্ত্বের থেকে তথ্যের দেখাই মিলবে বেশি ।

Monday, October 21, 2024

শিমূলতলা ভ্রমণ

ভ্রমণপথ ঃ

শুক্রবার ১৮ই অক্টোবর, ২০২৪ঃ সকাল ৬ঃ৩০ মিনিটে কলকাতা থেকে গাড়িতে যাত্রা করে বিকেল  ৪ঃ৩০ মিনিটে শিমূলতলা - শিমূলতলায় রাত্রিবাস।

শনিবার ১৯শে অক্টোবর, ২০২৪ঃ সকাল ১০ঃ৩০ মিনিটে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে সাইট সিয়িং - শিমূলতলায় রাত্রিবাস।

রবিবার ২০শে অক্টোবর, ২০২৪ঃ সকাল ১০ঃ৩০ মিনিটে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গিরিডিতে সাইট সিয়িং - শিমূলতলায় রাত্রিবাস।

সোমবার ২১শে অক্টোবর, ২০২৪ঃ সকাল ৯ঃ৩০ মিনিটে শিমূলতলা থেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে রাত ৯টায় কলকাতা।

পুরনোদিনের বাংলা উপন্যাস পড়লে জানা যায় আগেকার দিনের অনেক জমিদার বা ধনী ব্যক্তিরা বিভিন্ন জায়গায় একটা করে বাড়ি করে রাখতেন আর মাঝে মাঝে স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য সেখানে গিয়ে মাসখানেক করে থাকতেন। এই বাড়িগুলোর বেশিরভাগেরই অবস্থান ছিল বিহারে (এখনকার বিহার আর ঝাড়খন্ডে) - আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে ছোটনাগপুর মালভূমির মধ্যে। এর প্রধান কারণ হল এই অঞ্চলের জল-হাওয়া খুব ভালো - খাবার হজম হয় খুব ভালোভাবে আর বাতাসও পরিস্রুত। এই জায়গাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল দেওঘর, মধুপুর, হাজারীবাগ, শিমূলতলা ইত্যাদি। লক্ষ্মীপুজোর পরে তিন চারদিনের জন্য এই শিমূলতলা ভ্রমণ নিয়েই আমার ব্লগের এবারের পোস্ট। বলা বাহুল্য আমরা এখানে স্রেফ ঘুরতেই গিয়েছিলাম, স্বাস্থ্যোদ্ধার করতে যাইনি কারণ প্রথমতঃ আমাদের স্বাস্থ্য এমনিতেই যথেষ্ট ভালো, দ্বিতীয়তঃ শিমূলতলায় আমাদের নিজেদের বাড়ি নেই আর তৃতীয়তঃ আমরা কেউই জমিদার বা ধনী ব্যক্তি নই !

যাওয়ার পথে বরাকর নদী
আমাদের এবারের দল তেরো জনের। আমি, অমৃতা, বাবা, মা, কথা, কলি, আমার ভাইপো বাবাই, লালমাসি, মেসোমশাই, বুবুমাসি, বলাইমেসো, সাচ্চুমামা আর মাইমা। শুক্রবার ১৮ই অক্টোবর, ২০২৪ সকাল ৬ঃ৩০ মিনিটে বাড়ি থেকে আমাদের গাড়ি নিয়ে বেরনোর পরে প্রথমে মানিকতলা থেকে বুবুমাসি আর বলাইমেসো উঠল। তারপর সাড়ে সাতটা নাগাদ আমরা পৌঁছলাম আমাদের মীটিং পয়েন্ট ডানকুনি এম-বাজারের সামনে। এখানে বাকিদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার পরে আমরা এগিয়ে চললাম আমাদের গন্তব্যের দিকে। আমাদের যাত্রাপথ ডানকুনি - ১৯ নং জাতীয় সড়ক - আসানসোল - ৪১৯ নং জাতীয় সড়ক - ১১৪এ নং জাতীয় সড়ক - বাঙ্কা-দেওঘর রোড - দেওঘর - দেওঘর রোড - ৩৩৩এ নং জাতীয় সড়ক - শিমূলতলা। এছাড়া আরও রাস্তা আছে যেমন ধানবাদ হয়েও যাওয়া যায়। ব্রেকফাস্ট আমাদের সঙ্গেই ছিল, শুধু চা-খাওয়ার জন্য একবার বর্ধমানে দাঁড়ানো হল। আর তারপর দুপুরে একবার লাঞ্চ। ভাত, রুটি, ডাল, তরকারি, ডিম, মাছ ইত্যাদি নিয়ে খরচ হল ১,৩০০/- টাকা।

আমরা শিমূলতলা পৌঁছলাম বিকেল ৪টে নাগাদ। আমাদের বুকিং ছিল আরাধনা রিসর্ট-এ। এটা আসলে আগেকার দিনের কোনও ব্যক্তির হাওয়াবদলের জন্য তৈরি করা একটা বাড়ি - পরবর্তীকালে এটাকে হোটেলে পরিণত করা হয়েছে। সেইসঙ্গে নতুন করে কিছুটা নির্মাণও করা হয়েছে। হোটেলটা খুবই সুন্দর। আমাদের বুকিং-এর মধ্যে দুটো ঘর ছিল যাদের নাম মেরিলিন আর ক্লাসিও। এই ঘরগুলো যাকে বলে হেরিটেজ। ঘরের ভিতরে কাঠের আলমারি, পুরনো দিনের চেয়ার, কড়ি-বরগার ছাদ। মেরিলিন-এর খাটে আবার ছত্রি আর সেইসঙ্গে পর্দার মতো মশারি। আমরা যে যার ঘরে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নিলাম।

আরাধনা রিসর্টের ভিতরে
সন্ধ্যেবেলা আর বিশেষ কিছু করার নেই, তাই আমরা রিসর্টটাই ঘুরে ঘুরে দেখলাম। হোটেলের দুটো ছাদ আছে যার মধ্যে একটা পুরনো আর একটা নতুন। নতুন ছাদটা ছোট আর অনেকটা উঁচু। পুরনো ছাদটায় উঠলে 'জয়বাবা ফেলুনাথ' সিনেমার ঘোষালবাড়ির ছাদের কথা মনে হয়। একটা সিঁড়ি দিয়ে উঠে একটা চাতাল, সেখান থেকে আরও কিছূটা উঠলে আরেকটা ছাদ আর সেখান থেকে আরও কিছুটা উঠলে আরেকটা ছাদ। ছাদ থেকে নেমে এসে আমরা ডাইনিং হলে গেলাম। হোটেলে আরও লোকজন আছে, তবে আমাদের মতো এতবড় দল আর নেই। খাবার আগে থেকেই অর্ডার দেওয়া ছিল। ভাত রুটি ডাল তরকারি ডিম চিকেন মিলিয়ে খরচ হল ২,৩৮০/- টাকা।

শনিবার ১৯শে অক্টোবর, ২০২৪ আমাদের শিমূলতলা সাইটসিয়িং-এর দিন। আরাধনা রিসর্টের ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টারি। মেনু লুচি, ছোলার ডাল, মিষ্টি আর ডিম (ওমলেট / সিদ্ধ)। ব্রেকফাস্ট করে সকাল ১০ঃ৩০ নাগাদ আমরা গাড়ি নিয়ে বেরোলাম সাইটসিয়িং করতে।

তারা মঠ
তারা মঠ - রিসর্ট থেকে বেরিয়ে মিনিট পনেরো চলার পরে পৌঁছলাম আমাদের প্রথম গন্তব্য তারা মঠ-এ। এটাও প্রকৃতপক্ষে একটা বাড়ি আর সেটাকে এখন একটা মন্দিরের মতো করা হয়েছে। এখানে মন্দিরে নিয়মিত পুজো হয় তবে মন্দির দর্শন বলতে যা বোঝায় সেটা এখানে সেভাবে হয় না। আমরা মন্দিরের ভিতরে ঢুকলাম। পুজো দেওয়ার কোনও ব্যাপার নেই। পুরোহিত তাঁর পরিবার নিয়ে এখানেই থাকেন। মন্দির বা বাড়িটা দেখলেই বোঝা যায় সেটা বর্তমানে খুব একটা রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না, তবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়। বাড়িটা মাটি থেকে বেশ কিছুটা উঁচু - অনেকগুলো সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে সামনে একটা বড় চাতাল। সমস্ত জায়গাটা গাছপালা ঘেরা আর সেভাবে দেখাশোনা হয় না বলে প্রায় জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। আমরা এখানে সবকিছু দেখে বেরিয়ে এলাম।

নলডাঙা রাজবাড়ি
নলডাঙা রাজবাড়ি - আমাদের পরবর্তী গন্তব্য শিমূলতলার সবথেকে বিখ্যাত জায়গা নলডাঙা রাজবাড়ি। তারা মঠ থেকে বেরিয়ে বাঁধানো রাস্তা ছেড়ে একটা মেঠো পথ ধরে মিনিট দশেক চলার পরে আমরা এখানে পৌঁছলাম। একটা সুবিশাল ফাঁকা প্রান্তর যেখানে অল্প কিছু গাছপালা আছে, তার মধ্যে একজায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে নলডাঙা রাজবাড়ি বা শিমূলতলা রাজবাড়ি। পাশের ছবিটা দেখলেই বোঝা যাবে কেন এটা বিখ্যাত - ২০১৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছায়াছবি 'দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন'-এর ক্লাইম্যাক্সে দুর্গেশগড় হিসেবে এই বাড়িটাকেই দেখানো হয়েছিল আর এখানেই ছিল মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের গুপ্তধন (আরে সত্যিকারের নয় !)। সপ্তদশ শতকে বিষ্ণুদাস হাজরা এখানে জমিদারী স্থাপন করেন। বর্তমানে বাড়িটা ভগ্নপ্রায়। এর শুধু বাইরের কাঠামোটাই দাঁড়িয়ে আছে, ভিতরের ছাদ সবজায়গাতেই ধসে পড়েছে। এই বাড়ির যেটা সবথেকে আকর্ষণীয় সেটা হল এর সামনের দীর্ঘ সিঁড়ি কিন্তু সিঁড়ি দিয়ে উঠে কোথাও যাওয়া যায় না কারণ তারপরের চাতালটা পুরোটাই ধসে গেছে। সিঁড়িগুলো অবশ্য ভালোই আছে, আর সেটা দিয়ে ওঠানামাও করা যায়। উপরে উঠে চারপাশটা দেখতে ভালোই লাগে - দিগন্তবিস্তৃত উঁচুনিচু জমি, মাঝে মাঝে গাছপালা আর দূরে পাহাড়।

লাট্টু পাহাড়
নলডাঙা রাজবাড়ির সামনেই একটা অনতিউচ্চ পাহাড় আছে, সেটার নাম লাট্টু পাহাড়। এটাও একটা দেখার জায়গা তবে আমাদের আর যাওয়া হয়নি।




ধরহরা ঝর্ণা
ধরহরা ঝর্ণা - নলডাঙা রাজবাড়ি থেকে আধঘন্টা চলার পরে পৌঁছলাম ধরহরা ঝর্ণায়। এই চলাগুলো কিন্তু পুরোপুরিই গুগ্‌ল্‌ ম্যাপের উপর নির্ভর করে কারণ এখানে রাস্তায় মানুষজন ভীষণ কম তাই জিজ্ঞেস করার সুযোগও নেই বললেই চলে। ধরহরা ঝর্ণার কাছে পৌঁছে গাড়ি পার্কিং করে কিছুটা হেঁটে আমরা পৌঁছলাম ঝর্ণার কাছে। ঝর্ণাটা তেলয়া (বা তেলবা) নদীর উপরে। নদী এখানে যে অনেকটা উপর থেকে পড়ছে তা নয়, প্রায় সমতলই বলা চলে। তবে জায়গাটা পাথুরে আর জলের স্রোত বেশ ভালো। এখানে পাথরের উপরে বসে থাকতে বেশ ভালো লাগে। পাথরের উপরে পা দিয়ে নদী পেরিয়ে উল্টোদিকেও যাওয়া যায়। ডিসেম্বর মাস হলেও দুপুরের দিকে রোদের মধ্যে গরমই লাগছিল তাই এখানে ঝর্ণার ধারে বসে থাকতে বেশ আরাম লাগছিল।

ভিউ পয়েন্ট থেকে তেলয়া নদী
ভিউ পয়েন্ট - ধরহরা ঝর্ণা থেকে বেরিয়ে আধঘন্টা চলার পরে আমরা যে জায়গাটায় পৌঁছলাম সেটাকে ধরহরা ঝর্ণার ভিউ পয়েন্ট বলা চলে। জায়গাটা একটা পাহাড়ের উপরে আর এখান থেকে তেলয়া নদী আর ধরহরা ঝর্ণাটা সুন্দরভাবে দেখা যায়। পাহাড়ের গা দিয়ে একটা দীর্ঘ সিঁড়ি নেমে গেছে, সেটা দিয়ে একেবারে তেলয়া নদীর কাছে চলে যাওয়া যায়। এখানকার দৃশ্য খুবই মনোরম। সামনে দিয়ে পাথুরে পথে এঁকেবেঁকে চলেছে তেলয়া নদী - দূরে গাছপালা আর ছোট ছোট পাহাড়। এই ভিউ পয়েন্টে আবার একটা মন্দির আছে (কার মন্দির সেটা অবশ্য জানার সুযোগ পাইনি)।

এখানে একটা টিউব অয়েল দেখতে পেলাম আর সেই জল নিয়ে চোখেমুখে দিলাম। কিছুটা জল বোতলে ভরেও নিলাম। সত্যি বলতে কী, এখানে এসে আমরা এখনও পর্যন্ত শুধুমাত্র বোতলে ভরা কেনা মিনারেল ওয়াটারই খেয়েছি যার আলাদা করে বিশেষ কোনও গুণ নেই। কিন্তু এই টিউব অয়েলের প্রাকৃতিক জলের গুণই আলাদা। এতে ভীষণ ভালো হজম হয় আর খিদেও হয় (আমার অবশ্য এই জল না খেলেও এগুলো হয় !)।

দুপুর দেড়টা বাজে তাই আমরা এবার ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম। ভিউ পয়েন্ট থেকে হোটেলে ফেরার যে রাস্তা গুগ্‌ল্‌ ম্যাপ দেখালো তাতে ৩৩৩এ নং জাতীয় সড়ক দিয়ে চলতে চলতে তেলয়া মোড় থেকে বাঁদিকে গিয়ে রেলব্রীজের নিচ দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু এইপথে কিছুদূর গিয়েই বুঝলাম এখান দিয়ে যাওয়া একেবারেই অসম্ভব। রাস্তা বলতে কিছু নেই, সঙ্কীর্ণ মাটির পথ আর দুদিকে উঁচু ঝোপঝাড়। রাস্তাটা এতই সরু যে ঝোপঝাড়গুলো আমাদের গাড়ির একেবারে গা দিয়ে ঘষে যাচ্ছে। বুঝতেই পারছিলাম এই রাস্তা দিয়ে আমরা কোথাও পৌঁছতে পারব না। কিন্তু গাড়ি ঘোরানোরও উপায় নেই। শেষপর্যন্ত একটা সামান্য চওড়া জায়গা পেয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে আবার বাঁধানো রাস্তায় ফিরে এলাম। পাঠকদের বলছি এই বিশেষ রাস্তাটা গুগ্‌ল্‌ ম্যাপে দেখালেও কোনওভাবেই গাড়ি নিয়ে এই রাস্তা দিয়ে যাওয়া চলবে না।

হোটেলে ফিরে এসে আমরা লাঞ্চ করে নিলাম। ভাত ডাল তরকারি ডিম চিকেন নিয়ে খরচ হল ৩,৪০০/- টাকা। লাঞ্চের পরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আমরা আবার বেরিয়ে পড়লাম। আমার উদ্দেশ্য ছিল গাড়িতে পেট্রোল ভরা কিন্তু শিমূলতলার ধারেকাছে কোনও পেট্রোলপাম্প নেই। পেট্রোল নিতে গেলে যেতে হবে হয় ২৫ কিলোমিটার দূরে ঝাঁঝায় নতুবা উল্টোদিকে প্রায় একই দূরত্বে কাটোরিয়ায়। আমরা কাটোরিয়াতেই গেলাম আর তারপর সেখান থেকে দেওঘর চলে গেলাম। কাটোরিয়া থেকে দেওঘর যেতে ঘন্টাখানেক মতো লাগে। দেওঘর আমরা আগেও এসেছি আর এখন সন্ধ্যেও হয়ে গেছে, তাই দেওঘরে কিছু দেখাও সম্ভব নয়। আমরা মূলতঃ গিয়েছিলাম আমাদের দলের কয়েকজনের মন্দিরে পুজো দেওয়ার জন্য। এইসময়ে মন্দিরে প্রচন্ড ভীড়, তাই বাকিরা আর মন্দিরে গেলাম না। রাত সাড়ে আটটা নাগাদ আমরা আবার শিমূলতলায় ফিরে এলাম। ডিনারে আগেরদিনের মতোই খাওয়া হল - খরচ হল ২,১১০/- টাকা। শিমূলতলার জল-হাওয়া যে কতটা উপকারী সেটার প্রমাণ পেলাম কথা-কলির খাওয়ার বহর দেখে ! বাড়িতে সাধারণতঃ যা খায়, এখানে প্রায় তার দেড়-দুগুণ খেয়ে নিল।

পরেরদিন রবিবার ২০শে অক্টোবর, ২০২৪ - আমরা গিরিডি যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম। গিরিডি-ও আমার এর আগে তিনবার ঘোরা তবে 'উশ্রী নদীর ঝর্ণা' দেখতে সবসময়েই ভালো লাগে। সকালে ব্রেকফাস্ট করে (আগেরদিনের মতোই মেনু) সাড়ে দশটা নাগাদ আমরা রওনা দিলাম। শিমূলতলা থেকে উশ্রী পৌঁছতে প্রায় তিনঘন্টা সময় লাগল। গিরিডি পর্যন্ত রাস্তা খুবই ভালো তবে তারপরে শেষের কিছুটা রাস্তা তেমন সুবিধের নয়।

উশ্রীর ঝর্ণা
উশ্রী ঝর্ণা - উশ্রীর ঝর্ণার কাছে পৌঁছনোর শেষের পথটা পাহাড়ী আর খুব সুন্দর। আমাদের বাম পাশ দিয়ে উশ্রী নদী বয়ে চলেছে। এখানে নদীখাত বেশ চওড়া। ঝর্ণার কাছে গিয়ে ঝর্ণা দেখে মন ভরে গেল। সত্যি বলতে কী, আমি এর আগে যতবার এসেছি জলের এত বেশি স্রোত কোনওবারে দেখিনি। আমরা আগে যে জায়গাগুলোতে দাঁড়িয়ে স্নান করেছি বা ছবি তুলেছি এখন সেখানে যাওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। পাথরের উপর থেকে প্রচন্ড গর্জন করে উশ্রী নদী নিচে পড়ে বীরবিক্রমে এগিয়ে চলেছে বরাকর নদীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য। জায়গাটায় লোকজন ভালোই এসেছে আর তিনচারজন অত্যুৎসাহী অল্পবয়সী ছেলে জলে নেমে স্নানও করছে। জলের কাছাকাছি গেলেই গায়ে জলের ছিটে লাগছে। আমরা এখানে প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট কাটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

দুপুর সাড়ে তিনটে বাজে কিন্তু কারুরই সেভাবে খিদে পায়নি তাই আমরা আর লাঞ্চের জন্য কোথাও না দাঁড়িয়ে এগিয়ে চললাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের দিকে।

খান্ডোলি ড্যাম
খান্ডোলি ড্যাম - উশ্রী থেকে প্রায় একঘন্টা চলার পরে আমরা পৌঁছলাম খান্ডোলি ড্যাম-এ। উশ্রীর ঝর্ণা এর আগে তিনবার দেখলেও খান্ডোলি ড্যাম আমি এর আগে একবারই দেখেছি আমাদের ২০১৬ সালের দেওঘর ভ্রমণের সময়ে। তখন দেখে খুব ভালো লেগেছিল আর তাই এবারে আবার এলাম। খান্ডোলি ড্যামটা বেশ বড় আর এর পাশেই খান্ডোলি পাহাড়। ড্যামের উপরের রাস্তা ধরে হাঁটতে বেশ ভালো লাগে। এখানেও বেশ কিছু লোকজন এসেছে। বিকেল প্রায় সাড়ে পাঁচটা বাজে - দিনের আলো কমে এসেছে। আমরা এবার ফেরার পথ ধরলাম।

গিরিডি থেকে শিমূলতলা পৌঁছতে গেলে দেওঘর রোড ধরেই যেতে হয় আর এই রাস্তাটা খুব সুন্দর। রাত্রিবেলা এই রাস্তা ধরে গাড়ি করে যেতে গতবারেও দারুণ লেগেছিল - এবারেও দারুণ লাগল। এবারে আমি আবার গাড়ির চালকের আসনে। শিমূলতলা পৌঁছতে প্রায় রাত সাড়ে আটটা বেজে গেল। ডিনারের অর্ডার আগেই দেওয়া ছিল - আজ আমাদের ভ্রমণের শেষ দিন তাই স্পেশাল মেনু ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন। খরচ হল ২,৮৬০/- টাকা।

সোমবার ২১শে অক্টোবর, ২০২৪ আমাদের বাড়ি ফেরার দিন। সকাল সাড়ে নটা নাগাদ ব্রেকফাস্ট করে আমরা রওনা দিলাম। দুপুরে একজায়গায় লাঞ্চ করার জন্য দাঁড়ানো হল। মাছভাত আর বিরিয়ানি মিলিয়ে খরচ হল ১,৬০০/- টাকা। তারপর আবার ফেরার পালা। বাবাই আর বুবুমাসিদের নিজের নিজের বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে আমরা বাড়ি পোঁছলাম তখন রাত নটা। ভ্রমণ শেষ !

সারসংক্ষেপ ঃ

১. কলকাতা থেকে দুতিনদিনের জন্য যাওয়ার জায়গা হিসেবে শিমূলতলা একটা ভালো বিকল্প। গ্রীষ্মকালে এখানে গরম বেশ বেশি পড়ে, তাই গ্রীষ্মকাল বাদ দিয়ে বছরের যেকোনও সময়েই যাওয়া যেতে পারে।

২. কলকাতা থেকে শিমূলতলা যাওয়ার একাধিক ট্রেন আছে। শিমূলতলা জায়গাটা খুব একটা বড় নয় আর জায়গাটা মূলতঃ স্টেশন ঘিরেই, তাই কোনও জায়গাই স্টেশন থেকে খুব বেশি দূরে নয়।

৩. কলকাতা থেকে গাড়িতে শিমূলতলার দূরত্ব প্রায় ৪০০ কিলোমিটার আর যেতে প্রায় দশঘন্টা লাগে। ১৯ নং জাতীয় সড়ক ছাড়ার পর রাস্তা খুব একটা চওড়া নয়, তাই গাড়ি বেশি জোরে চালানো যায় না।

৪. শিমূলতলায় একাধিক হোটেল আছে যার মধ্যে আরাধনা রিসর্ট খুবই ভালো। হোটেলটা স্টেশন থেকে  দশমিনিটের হাঁটাদূরত্বে অবস্থিত। এদের ওয়েবসাইট https://aradhanaresort.com/ থেকে বুকিং করা যায়। যোগাযোগের নম্বর - 7044693856.

৫. আরাধনা রিসর্ট একটা পুরনো বাড়িকে হোটেলে পরিণত করে করা হয়েছে আর তাই এই বাড়িতে হেরিটেজ রুম রয়েছে। এখানকার খাওয়াদাওয়ার মান খুবই ভালো।

৬. শিমূলতলায় ঘোরাঘুরির বিশেষ অবকাশ নেই। দেখার জায়গার মধ্যে নলডাঙা রাজবাড়ি আর ধরহরা ঝর্ণাই দেখার মতো।

৭. শিমূলতলার প্রধান আকর্ষণ হল এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ। এখানকার জল-হাওয়া খুবই স্বাস্থ্যকর, তবে এখানকার জল খেতে চাইলে টিউবওয়েল বা কলের জল খেতে হবে - মিনারেল ওয়াটার খেলে চলবে না।

৮. শিমূলতলা থেকে দেওঘরের দূরত্ব ৪২ কিলোমিটারের মতো আর যেতে ঘন্টা দেড়েক লাগে। শিমূলতলা থেকে চাইলে একদিনের জন্য দেওঘর ঘুরে আসা যায়।

৯. শিমূলতলায় ফোনের নেটওয়ার্ক সেভাবে পাওয়া যায় না, জিও বা এয়ারটেল সামান্য পাওয়া যায়। এটা মাথায় রেখে ঘোরার পরিকল্পনা করতে হবে।

১০. শিমূলতলায় কোনও পেট্রোল পাম্প নেই, সবথেকে কাছের পেট্রোল পাম্প ঝাঁঝায় অথবা কাটোরিয়ায় আর এই দুটো জায়গাই এখান থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে। তাই শিমূলতলায় পৌঁছনোর আগেই গাড়িতে পেট্রোল ভরে নেওয়া ভালো।

উপসংহার ঃ

আরাধনা রিসর্টের সামনে আমরা সবাই
পশ্চিমবঙ্গের প্রতিবেশী রাজ্য বিহারে ছোটনাগপুর মালভূমির মধ্যে অবস্থিত শিমুলতলাকে একটা ভ্রমণস্থল না বলে একটা স্বাস্থ্যকর জায়গা হিসেবে দেখাই ভালো। একসময়ে স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য ধনী ব্যক্তিরা এখানে গিয়ে দীর্ঘ সময় থাকলেও এখন আর সেই রেওয়াজ নেই। কিন্তু শিমুলতলার স্বাস্থ্যকর জল-হওয়া এখনও আছে। এখানে যেগুলো ঘোরার জায়গা সেগুলো দারুণ কিছু দ্রষ্টব্য নয়, তবে কিছু করার না থাকলে দেখে আসা যেতে পারে। ভ্রমণকারীদের নিয়ে এখানকার মানুষদের বিশেষ কোনও উৎসাহ নেই, কারণ শিমূলতলা ট্যুরিজমের উপর নির্ভরশীল একটা জায়গা নয়। এখানে খুব বেশি লোকজন যায় না, ফলে ভীড়ও সেরকম নেই। একটা মোটামুটি ফাঁকা জায়গায় দুতিনদিন আরাম করার পক্ষে শিমূলতলা খুবই উপযোগী। আবারও বলছি এখানকার জল-হাওয়াই এখানকার প্রধান আকর্ষণ - তাই সেটা যতটা সম্ভব সেবন করার চেষ্টা করাই ভালো। বোতলবন্দী কেনা জল নয়, খেতে হবে এখানকার নলকূপ বা কলের জল। আর সেইসঙ্গে উপভোগ্য হল এখানকার শান্ত নিরিবিলি প্রাকৃতিক পরিবেশ। যদি এইসব মূল্যবান জিনিসের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করার ইচ্ছে থাকে, তাহলে একবার ঘুরে আসা যেতেই পারে - শিমূলতলা !

শিমূলতলা ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.