ভ্রমণপথ ঃ
শুক্রবার ১৮ই অক্টোবর, ২০২৪ঃ সকাল ৬ঃ৩০ মিনিটে কলকাতা থেকে গাড়িতে যাত্রা করে বিকেল ৪ঃ৩০ মিনিটে শিমূলতলা - শিমূলতলায় রাত্রিবাস।
শনিবার ১৯শে অক্টোবর, ২০২৪ঃ সকাল ১০ঃ৩০ মিনিটে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে সাইট সিয়িং - শিমূলতলায় রাত্রিবাস।
রবিবার ২০শে অক্টোবর, ২০২৪ঃ সকাল ১০ঃ৩০ মিনিটে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গিরিডিতে সাইট সিয়িং - শিমূলতলায় রাত্রিবাস।
সোমবার ২১শে অক্টোবর, ২০২৪ঃ সকাল ৯ঃ৩০ মিনিটে শিমূলতলা থেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে রাত ৯টায় কলকাতা।
পুরনোদিনের বাংলা উপন্যাস পড়লে জানা যায় আগেকার দিনের অনেক জমিদার বা ধনী ব্যক্তিরা বিভিন্ন জায়গায় একটা করে বাড়ি করে রাখতেন আর মাঝে মাঝে স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য সেখানে গিয়ে মাসখানেক করে থাকতেন। এই বাড়িগুলোর বেশিরভাগেরই অবস্থান ছিল বিহারে (এখনকার বিহার আর ঝাড়খন্ডে) - আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে ছোটনাগপুর মালভূমির মধ্যে। এর প্রধান কারণ হল এই অঞ্চলের জল-হাওয়া খুব ভালো - খাবার হজম হয় খুব ভালোভাবে আর বাতাসও পরিস্রুত। এই জায়গাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল দেওঘর, মধুপুর, হাজারীবাগ, শিমূলতলা ইত্যাদি। লক্ষ্মীপুজোর পরে তিন চারদিনের জন্য এই শিমূলতলা ভ্রমণ নিয়েই আমার ব্লগের এবারের পোস্ট। বলা বাহুল্য আমরা এখানে স্রেফ ঘুরতেই গিয়েছিলাম, স্বাস্থ্যোদ্ধার করতে যাইনি কারণ প্রথমতঃ আমাদের স্বাস্থ্য এমনিতেই যথেষ্ট ভালো, দ্বিতীয়তঃ শিমূলতলায় আমাদের নিজেদের বাড়ি নেই আর তৃতীয়তঃ আমরা কেউই জমিদার বা ধনী ব্যক্তি নই !
| যাওয়ার পথে বরাকর নদী |
আমরা শিমূলতলা পৌঁছলাম বিকেল ৪টে নাগাদ। আমাদের বুকিং ছিল আরাধনা রিসর্ট-এ। এটা আসলে আগেকার দিনের কোনও ব্যক্তির হাওয়াবদলের জন্য তৈরি করা একটা বাড়ি - পরবর্তীকালে এটাকে হোটেলে পরিণত করা হয়েছে। সেইসঙ্গে নতুন করে কিছুটা নির্মাণও করা হয়েছে। হোটেলটা খুবই সুন্দর। আমাদের বুকিং-এর মধ্যে দুটো ঘর ছিল যাদের নাম মেরিলিন আর ক্লাসিও। এই ঘরগুলো যাকে বলে হেরিটেজ। ঘরের ভিতরে কাঠের আলমারি, পুরনো দিনের চেয়ার, কড়ি-বরগার ছাদ। মেরিলিন-এর খাটে আবার ছত্রি আর সেইসঙ্গে পর্দার মতো মশারি। আমরা যে যার ঘরে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নিলাম।
![]() |
| আরাধনা রিসর্টের ভিতরে |
শনিবার ১৯শে অক্টোবর, ২০২৪ আমাদের শিমূলতলা সাইটসিয়িং-এর দিন। আরাধনা রিসর্টের ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টারি। মেনু লুচি, ছোলার ডাল, মিষ্টি আর ডিম (ওমলেট / সিদ্ধ)। ব্রেকফাস্ট করে সকাল ১০ঃ৩০ নাগাদ আমরা গাড়ি নিয়ে বেরোলাম সাইটসিয়িং করতে।
![]() |
| তারা মঠ |
![]() |
| নলডাঙা রাজবাড়ি |
![]() |
| লাট্টু পাহাড় |
![]() |
| ধরহরা ঝর্ণা |
![]() |
| ভিউ পয়েন্ট থেকে তেলয়া নদী |
এখানে একটা টিউব অয়েল দেখতে পেলাম আর সেই জল নিয়ে চোখেমুখে দিলাম। কিছুটা জল বোতলে ভরেও নিলাম। সত্যি বলতে কী, এখানে এসে আমরা এখনও পর্যন্ত শুধুমাত্র বোতলে ভরা কেনা মিনারেল ওয়াটারই খেয়েছি যার আলাদা করে বিশেষ কোনও গুণ নেই। কিন্তু এই টিউব অয়েলের প্রাকৃতিক জলের গুণই আলাদা। এতে ভীষণ ভালো হজম হয় আর খিদেও হয় (আমার অবশ্য এই জল না খেলেও এগুলো হয় !)।
দুপুর দেড়টা বাজে তাই আমরা এবার ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম। ভিউ পয়েন্ট থেকে হোটেলে ফেরার যে রাস্তা গুগ্ল্ ম্যাপ দেখালো তাতে ৩৩৩এ নং জাতীয় সড়ক দিয়ে চলতে চলতে তেলয়া মোড় থেকে বাঁদিকে গিয়ে রেলব্রীজের নিচ দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু এইপথে কিছুদূর গিয়েই বুঝলাম এখান দিয়ে যাওয়া একেবারেই অসম্ভব। রাস্তা বলতে কিছু নেই, সঙ্কীর্ণ মাটির পথ আর দুদিকে উঁচু ঝোপঝাড়। রাস্তাটা এতই সরু যে ঝোপঝাড়গুলো আমাদের গাড়ির একেবারে গা দিয়ে ঘষে যাচ্ছে। বুঝতেই পারছিলাম এই রাস্তা দিয়ে আমরা কোথাও পৌঁছতে পারব না। কিন্তু গাড়ি ঘোরানোরও উপায় নেই। শেষপর্যন্ত একটা সামান্য চওড়া জায়গা পেয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে আবার বাঁধানো রাস্তায় ফিরে এলাম। পাঠকদের বলছি এই বিশেষ রাস্তাটা গুগ্ল্ ম্যাপে দেখালেও কোনওভাবেই গাড়ি নিয়ে এই রাস্তা দিয়ে যাওয়া চলবে না।
হোটেলে ফিরে এসে আমরা লাঞ্চ করে নিলাম। ভাত ডাল তরকারি ডিম চিকেন নিয়ে খরচ হল ৩,৪০০/- টাকা। লাঞ্চের পরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আমরা আবার বেরিয়ে পড়লাম। আমার উদ্দেশ্য ছিল গাড়িতে পেট্রোল ভরা কিন্তু শিমূলতলার ধারেকাছে কোনও পেট্রোলপাম্প নেই। পেট্রোল নিতে গেলে যেতে হবে হয় ২৫ কিলোমিটার দূরে ঝাঁঝায় নতুবা উল্টোদিকে প্রায় একই দূরত্বে কাটোরিয়ায়। আমরা কাটোরিয়াতেই গেলাম আর তারপর সেখান থেকে দেওঘর চলে গেলাম। কাটোরিয়া থেকে দেওঘর যেতে ঘন্টাখানেক মতো লাগে। দেওঘর আমরা আগেও এসেছি আর এখন সন্ধ্যেও হয়ে গেছে, তাই দেওঘরে কিছু দেখাও সম্ভব নয়। আমরা মূলতঃ গিয়েছিলাম আমাদের দলের কয়েকজনের মন্দিরে পুজো দেওয়ার জন্য। এইসময়ে মন্দিরে প্রচন্ড ভীড়, তাই বাকিরা আর মন্দিরে গেলাম না। রাত সাড়ে আটটা নাগাদ আমরা আবার শিমূলতলায় ফিরে এলাম। ডিনারে আগেরদিনের মতোই খাওয়া হল - খরচ হল ২,১১০/- টাকা। শিমূলতলার জল-হাওয়া যে কতটা উপকারী সেটার প্রমাণ পেলাম কথা-কলির খাওয়ার বহর দেখে ! বাড়িতে সাধারণতঃ যা খায়, এখানে প্রায় তার দেড়-দুগুণ খেয়ে নিল।
পরেরদিন রবিবার ২০শে অক্টোবর, ২০২৪ - আমরা গিরিডি যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম। গিরিডি-ও আমার এর আগে তিনবার ঘোরা তবে 'উশ্রী নদীর ঝর্ণা' দেখতে সবসময়েই ভালো লাগে। সকালে ব্রেকফাস্ট করে (আগেরদিনের মতোই মেনু) সাড়ে দশটা নাগাদ আমরা রওনা দিলাম। শিমূলতলা থেকে উশ্রী পৌঁছতে প্রায় তিনঘন্টা সময় লাগল। গিরিডি পর্যন্ত রাস্তা খুবই ভালো তবে তারপরে শেষের কিছুটা রাস্তা তেমন সুবিধের নয়।
![]() |
| উশ্রীর ঝর্ণা |
দুপুর সাড়ে তিনটে বাজে কিন্তু কারুরই সেভাবে খিদে পায়নি তাই আমরা আর লাঞ্চের জন্য কোথাও না দাঁড়িয়ে এগিয়ে চললাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের দিকে।
![]() |
| খান্ডোলি ড্যাম |
গিরিডি থেকে শিমূলতলা পৌঁছতে গেলে দেওঘর রোড ধরেই যেতে হয় আর এই রাস্তাটা খুব সুন্দর। রাত্রিবেলা এই রাস্তা ধরে গাড়ি করে যেতে গতবারেও দারুণ লেগেছিল - এবারেও দারুণ লাগল। এবারে আমি আবার গাড়ির চালকের আসনে। শিমূলতলা পৌঁছতে প্রায় রাত সাড়ে আটটা বেজে গেল। ডিনারের অর্ডার আগেই দেওয়া ছিল - আজ আমাদের ভ্রমণের শেষ দিন তাই স্পেশাল মেনু ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন। খরচ হল ২,৮৬০/- টাকা।
সোমবার ২১শে অক্টোবর, ২০২৪ আমাদের বাড়ি ফেরার দিন। সকাল সাড়ে নটা নাগাদ ব্রেকফাস্ট করে আমরা রওনা দিলাম। দুপুরে একজায়গায় লাঞ্চ করার জন্য দাঁড়ানো হল। মাছভাত আর বিরিয়ানি মিলিয়ে খরচ হল ১,৬০০/- টাকা। তারপর আবার ফেরার পালা। বাবাই আর বুবুমাসিদের নিজের নিজের বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে আমরা বাড়ি পোঁছলাম তখন রাত নটা। ভ্রমণ শেষ !
সারসংক্ষেপ ঃ
১. কলকাতা থেকে দুতিনদিনের জন্য যাওয়ার জায়গা হিসেবে শিমূলতলা একটা ভালো বিকল্প। গ্রীষ্মকালে এখানে গরম বেশ বেশি পড়ে, তাই গ্রীষ্মকাল বাদ দিয়ে বছরের যেকোনও সময়েই যাওয়া যেতে পারে।
২. কলকাতা থেকে শিমূলতলা যাওয়ার একাধিক ট্রেন আছে। শিমূলতলা জায়গাটা খুব একটা বড় নয় আর জায়গাটা মূলতঃ স্টেশন ঘিরেই, তাই কোনও জায়গাই স্টেশন থেকে খুব বেশি দূরে নয়।
৩. কলকাতা থেকে গাড়িতে শিমূলতলার দূরত্ব প্রায় ৪০০ কিলোমিটার আর যেতে প্রায় দশঘন্টা লাগে। ১৯ নং জাতীয় সড়ক ছাড়ার পর রাস্তা খুব একটা চওড়া নয়, তাই গাড়ি বেশি জোরে চালানো যায় না।
৪. শিমূলতলায় একাধিক হোটেল আছে যার মধ্যে আরাধনা রিসর্ট খুবই ভালো। হোটেলটা স্টেশন থেকে দশমিনিটের হাঁটাদূরত্বে অবস্থিত। এদের ওয়েবসাইট https://aradhanaresort.com/ থেকে বুকিং করা যায়। যোগাযোগের নম্বর - 7044693856.
৫. আরাধনা রিসর্ট একটা পুরনো বাড়িকে হোটেলে পরিণত করে করা হয়েছে আর তাই এই বাড়িতে হেরিটেজ রুম রয়েছে। এখানকার খাওয়াদাওয়ার মান খুবই ভালো।
৬. শিমূলতলায় ঘোরাঘুরির বিশেষ অবকাশ নেই। দেখার জায়গার মধ্যে নলডাঙা রাজবাড়ি আর ধরহরা ঝর্ণাই দেখার মতো।
৭. শিমূলতলার প্রধান আকর্ষণ হল এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ। এখানকার জল-হাওয়া খুবই স্বাস্থ্যকর, তবে এখানকার জল খেতে চাইলে টিউবওয়েল বা কলের জল খেতে হবে - মিনারেল ওয়াটার খেলে চলবে না।
৮. শিমূলতলা থেকে দেওঘরের দূরত্ব ৪২ কিলোমিটারের মতো আর যেতে ঘন্টা দেড়েক লাগে। শিমূলতলা থেকে চাইলে একদিনের জন্য দেওঘর ঘুরে আসা যায়।
৯. শিমূলতলায় ফোনের নেটওয়ার্ক সেভাবে পাওয়া যায় না, জিও বা এয়ারটেল সামান্য পাওয়া যায়। এটা মাথায় রেখে ঘোরার পরিকল্পনা করতে হবে।
১০. শিমূলতলায় কোনও পেট্রোল পাম্প নেই, সবথেকে কাছের পেট্রোল পাম্প ঝাঁঝায় অথবা কাটোরিয়ায় আর এই দুটো জায়গাই এখান থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে। তাই শিমূলতলায় পৌঁছনোর আগেই গাড়িতে পেট্রোল ভরে নেওয়া ভালো।
উপসংহার ঃ
![]() |
| আরাধনা রিসর্টের সামনে আমরা সবাই |
শিমূলতলা ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.









No comments:
Post a Comment