ভ্রমণপথ ঃ
শনিবার ২৫শে জুলাই, ২০২৬ঃ সকাল ৭টায় কলকাতা থেকে গাড়িতে যাত্রা করে দুপুর ১টায় তাজপুর - তাজপুরে রাত্রিবাস।
রবিবার ২৬শে জুলাই, ২০২৬ঃ বেলা ১১টায় তাজপুর থেকে যাত্রা করে বেলা সাড়ে এগারোটায় দীঘা - দীঘা থেকে দুপুর ৩টেয় যাত্রা করে রাত ৯টায় কলকাতা।
শিরোনাম তাজপুর ভ্রমণ দ্বিতীয়বার হলেও এটা আসলে আমার তৃতীয়বার তাজপুর ভ্রমণ। ২০০৯ সালে যখন প্রথমবার তাজপুর গিয়েছিলাম, তখন ব্লগ লিখতাম না। তারপর গিয়েছি ২০১৪ সালে। আর এবার আবার। আসলে কলকাতা থেকে একরাত্রির জন্য ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করলে প্রধানতঃ সমুদ্রের কথাই মনে হয় আর সমুদ্রের অন্যান্য অপ্শন হল - দীঘা (ভীড় বেশি আর ইদানীং জগন্নাথ মন্দির হওয়ার পর থেকে সাধারণ হোটেলের ভাড়া আকাশচুম্বী), মন্দারমনি (পরিবারের লোকজনদের নিয়ে যাওয়ার পক্ষে একেবারেই উপযোগী নয়), শঙ্করপুর বা উদয়পুর (সমুদ্রে স্নান করার সুযোগ কম), বক্খালি (সমুদ্রের কাছে কোনও হোটেল নেই)। তাই তাজপুর। আর সেই তাজপুর ভ্রমণ নিয়েই আমার ব্লগের এবারের পোস্ট।
আমাদের এবারের দল আটজনের। আমি, অমৃতা, বাবা, মা, কথা, কলি আর সেইসঙ্গে আমাদের প্রতিবেশী আপালদা ও টিক্লি বৌদি। প্রতিবেশীদের সঙ্গে যাওয়ার একটা সুবিধে হল আলাদা করে কোনও মীটিং পয়েন্ট ঠিক করতে হয় না, সবাই একজায়গা থেকে যাত্রা শুরু করা যায়। সেইমতো ২৫শে জুলাই ২০২৬ শনিবার সকাল ৭টার সময়ে আমরা আমাদের গাড়িতে রওনা দিলাম তাজপুরের উদ্দেশ্যে।
বিদ্যাসাগর সেতু পেরিয়ে কোণা এক্সপ্রেসওয়ে - ১৬ নং জাতীয় সড়ক - কোলাঘাট - ১১৬ নং জাতীয় সড়ক - নন্দকুমার - ১১৬বি নং জাতীয় সড়ক - বালিসাই - বালিসাই তাজপুর সী বিচ্ রোড - তাজপুর। কলকাতা থেকে তাজপুরের দূরত্ব ১৮৪ কিলোমিটার। যাওয়ার পথে কোলাঘাটে ব্রেকফাস্ট করার জন্য দাঁড়ালাম। যেটা আমাদের সবাইকেই বেশ অবাক করল সেটা হল এখানে খাওয়ার জায়গাগুলোয় মানুষের ভীড়। এটা কোনও বিশেষ সপ্তাহান্ত নয়, টানা তিনদিনের ছুটিও নেই কিন্তু তাও খাওয়ার জায়গাগুলোয় প্রচন্ড ভীড় - আর লোকজনদের দেখে বোঝা যায় এরা সবাই আমাদের মতো বেড়াতেই যাচ্ছে। অনেক খোঁজাখুঁজি করে একটা রেস্ট্যুরেন্টে বসার জায়গা পাওয়া গেল। পুরী-সব্জী আর আলুর পরোটা নিয়ে খরচ পড়ল ৬৫০/- টাকা।
নন্দকুমার পর্যন্ত রাস্তাটা বেশ চওড়া এবং মাঝে ডিভাইডার আছে। কিন্তু এরপর থেকে বাকি ৭৮ কিলোমিটার রাস্তা তুলনামূলকভাবে সরু আর মাঝে ডিভাইডার না থাকায় গাড়ি বেশি জোরে চালানো যায়না। দুপুর ১টা নাগাদ আমরা তাজপুর পৌঁছলাম।
![]() |
| বার্ড নেস্ট রিসর্ট |
![]() |
| তাজপুরের সমুদ্রে - জলে নামার আগে |
![]() |
| এপাং ওপাং ঝপাং ! |
এরপরেই যেটা পায় সেটা হল প্রচন্ড খিদে। আমাদের দুপুরের খাবারের আগেই অর্ডার দেওয়া ছিল, হোটেলের ডাইনিং রুমে গিয়ে খেয়ে নিলাম। ভাত ডাল আলুভাজা ডিম মাছ মাংস মিলিয়ে খরচ হল ১,৮১৫ টাকা। এর পরে যেটা পায় সেটা হল প্রচন্ড ঘুম। সবাই যে যার ঘরে ঢুকে কয়েকঘন্টা ঘুমিয়ে নিলাম।
![]() |
| সমুদ্রের ধারে খাবারের দোকানে |
ঘন্টাখানেক বসে আমরা আবার হোটেলে ফিরে এলাম। এখানে কিছুই করার নেই, শুধুমাত্র গল্প করেই সময় কাটাতে হয়। রাতে ডিনারে ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন খাওয়া হল। খরচ হল ১,৬৮০/- টাকা।
![]() |
| সকালবেলা সমুদ্রের ধারে |
নটা নাগাদ ডাইনিং রুমে গিয়ে ব্রেকফাস্ট করলাম। লুচি-তরকারি, ব্রেড-বাটার আর অমলেট নিয়ে খরচ হল ৮০৫/- টাকা। স্নান করে বেলা ১১টায় চেক্ আউট করে আমরা এগিয়ে গেলাম দীঘার দিকে। তাজপুর থেকে দীঘা বালিসাই হয়ে জাতীয় সড়ক দিয়েও যাওয়া যায় তবে ভিতরের রাস্তা দিয়ে গেলে দূরত্বও কম হয় আর অসাধারণ দৃশ্যও দেখা যায়। এই পথে দীঘার দূরত্ব ১৬ কিলোমিটার আর সময় লাগল আধঘন্টা মতো। রাস্তাটার অনেকটাই সমুদ্রের ধার দিয়ে। কিছুদূর গিয়ে সমুদ্র আমাদের থেকে দূরে চলে গেল আর আমরা চম্পা নদী পেরোলাম। কিছুদূর গিয়ে এই চম্পা নদী সমুদ্রের সঙ্গে মিলিত হয়েছে, সেই জায়গাটায় অনেক মাছধরার নৌকো দেখা গেল।
![]() |
| কম্পাইউন্ডের বাইরে থেকে জগন্নাথ মন্দির |
![]() |
| সম্পূর্ণ জগন্নাথ মন্দির |
সবমিলিয়ে দীঘার জগন্নাথ মন্দির আমার খুবই ভালো লেগেছে। এই মন্দির তৈরির পিছনে যে রাজনৈতিক তরজা আছে, সরকারী অর্থ যেভাবে ব্যয় (বা অনেকের মতে অপচয়) হয়েছে, জগন্নাথ দেবের অবস্থান পুরীতে নাকি দীঘায় নাকি দুটো জায়গাতেই - এর কোনওকিছু নিয়েই এখানে আলোচনা করতে চাই না। আমার কাছে একটা মন্দিরে দেবতার অবস্থানের থেকেও অনেক বেশি আকর্ষণীয় হল এর কারুকার্য, স্থাপত্যশৈলী। আর সেই কারণেই এই জগন্নাথ মন্দির দর্শন। প্রাসঙ্গিকভাবে 'জয়বাবা ফেলুনাথ' ছবিতে অম্বিকানাথ ঘোষালের সেই সংলাপটা এখানে উল্লেখ করছি - "শুধু সুন্দর নয়, ওয়ার্ক অফ্ আর্ট আর সেইটাই বড় কথা। ওসব ভাগ্য ফেরানো টেরানোর কথা আমি বিশ্বাস করি না। একটা তিন ইঞ্চি মূর্তি মানুষের ভাগ্য ফেরাতে পারে না।"
![]() |
| দীঘার সমুদ্রের ধারে সবাই |
ফেরার পথে জায়গায় জায়গায় বৃষ্টি পেলাম। আমার হাইওয়েতে বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি চালাতে খুব ভালো লাগে। সেইসঙ্গে গাড়ির ভিতরে সবাই বক্বক্ করছে - সবমিলিয়ে দূর্দান্ত অভিজ্ঞতা। রাত ন'টা নাগাদ বাড়ি পৌঁছলাম। ভ্রমণ শেষ !
সারসংক্ষেপ ঃ
১. কলকাতা থেকে সপ্তাহান্তে ঘুরতে যাওয়ার জায়গা খুব বেশি নেই, যা আছে তার মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য হল তাজপুর। পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় অবস্থিত এই সমুদ্রসৈকত এর শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশের জন্য বিখ্যাত।
২. কলকাতা থেকে তাজপুর গাড়িতে যেতে সাড়ে চার ঘন্টার মতো সময় লাগে। ট্রেনে যেতে চাইলে হাওড়া থেকে দীঘাগামী ট্রেনে গিয়ে রামনগর স্টেশনে নামতে হবে আর সেখান থেকে গাড়িভাড়া করতে হবে।
৩. তাজপুরে অনেক হোটেল আছে যার মধ্যে বার্ড নেস্ট রিসর্ট অন্যতম। এদের ওয়েবসাইট https://www.tajpurbirdnestresort.com/থেকে বুকিং করা যায়, যদিও আমরা MakeMyTrip থেকে বুকিং করেছিলাম। যোগাযোগের নম্বর - 7319255371, 8145341227.
৪. তাজপুরের আলাদা কোনও খাবার হোটেল বা রেস্ট্যুরেন্ট নেই, প্রত্যেকটা হোটেলেরই নিজস্ব খাবার ব্যবস্থা আছে। বার্ড নেস্ট রিসর্টের খাবারের মান ভালো।
৫. তাজপুরের সমুদ্র স্নানের পক্ষে খুবই উপযোগী তবে সেটা শুধুমাত্র ভাঁটার সময়ে। জোয়ারের সময়ে সমুদ্রে নামার কোনও প্রশ্নই ওঠে না।
৬. সমুদ্রের পাড়ে খুঁটির উপরে বেশ কিছু খাবারের দোকান আছে যেগুলো প্রধানতঃ সন্ধ্যের স্ন্যাক্স পাওয়া যায়। এখানকার খাবার দাম বেশ বেশি আর পরিমাণ বেশ কম।
৭. তাজপুর বছরের যেকোনও সময়েই যাওয়া যেতে পারে। এখানকার প্রকৃতি সারাবছর বিশেষ পালটায় না।
৮. তাজপুর থেকে দীঘার দূরত্ব মাত্র ১৬ কিলোমিটার, তাই ইচ্ছে করলে দীঘায় না থেকে তাজপুর থেকে দীঘা ঘুরে চলে আসা যেতে পারে। তাজপুর থেকে দীঘা যাওয়ার রাস্তাটা খুবই চিত্তাকর্ষক।
৯. দীঘার নবতম সংযোজিত দর্শনীয় স্থান হল জগন্নাথ মন্দির। একটা বিশাল চত্বরের উপর তৈরি এই মন্দির খুবই সুন্দর এবং অবশ্য দ্রষ্টব্য।
উপসংহার ঃ
![]() |
| তাজপুরের সমুদ্র |
তাজপুর ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.









No comments:
Post a Comment