আমি ব্লগ লেখার খুব বেশি সমর্থক কোনওদিনও ছিলাম না, সত্যি কথা বলতে কি এখনও যে আছি তা নয় । তার একটা প্রধান কারণ আমার ধারণা ব্লগ লেখার থেকেও পড়া অনেক বেশি ক্লান্তিকর । অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অনেক সময়ই পড়তে শুরু করে শেষ করা হয়ে ওঠে না । নিজের ধৈর্য এবং/অথবা আগ্রহের অভাবকে 'ঠিক আছে, বাকিটা পরে পড়ব' জাতীয় অজুহাত দিয়ে ঢেকে দিই - আর আমরা সবাই জানি সেই 'পরে' টা আর কখনওই আসে না । তো, এই কারণে আমি ঠিক করেছি আমার ব্লগকে কখনওই অন্যের ক্লান্তির কারণ ঘটাব না, আমার ব্লগের বিষয় হবে প্রধানতঃ ভ্রমণ । আমার মতো যেসব বাঙালিরা ঘুরতে ভালোবাসে, তাদের জন্য আমার ব্লগ হবে তথ্যের একটা উৎস । আমার নিজের একটা অভ্যেস আছে, কোনও জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার আগে সেই জায়গাটা সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, আর ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে আমার বরাবরই মনে হয়েছে যে ইন্টারনেটে লেখালেখি করার ব্যাপারে বাঙালিদের থেকে কুঁড়ে খুব কম শিক্ষিত জাতই আছে । আমার মতো যেসব বাঙালিরা আছে, যারা ইন্টারনেটে কোনো একটা ইংরিজীতে লেখা দেখলেই না পড়ার চেষ্টা করে, তাদের জন্য আমার ব্লগ সহায়ক হবে, এই বিশ্বাস নিয়ে শুরু করছি আমার ভ্রমণকাহিনী । আগেই বলে রাখি, আমি স্ট্যাটিসটিক্সের ছাত্র ছিলাম, তাই আমার ব্লগে তত্ত্বের থেকে তথ্যের দেখাই মিলবে বেশি ।

Sunday, July 26, 2026

তাজপুর ভ্রমণ (দ্বিতীয়বার)

ভ্রমণপথ ঃ

শনিবার ২৫শে জুলাই, ২০২৬ঃ সকাল ৭টায় কলকাতা থেকে গাড়িতে যাত্রা করে দুপুর ১টায় তাজপুর - তাজপুরে রাত্রিবাস।

রবিবার ২৬শে জুলাই, ২০২৬ঃ বেলা ১১টায় তাজপুর থেকে যাত্রা করে বেলা সাড়ে এগারোটায় দীঘা - দীঘা থেকে দুপুর ৩টেয় যাত্রা করে রাত ৯টায় কলকাতা।

শিরোনাম তাজপুর ভ্রমণ দ্বিতীয়বার হলেও এটা আসলে আমার তৃতীয়বার তাজপুর ভ্রমণ। ২০০৯ সালে যখন প্রথমবার তাজপুর গিয়েছিলাম, তখন ব্লগ লিখতাম না। তারপর গিয়েছি ২০১৪ সালে। আর এবার আবার। আসলে কলকাতা থেকে একরাত্রির জন্য ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করলে প্রধানতঃ সমুদ্রের কথাই মনে হয় আর সমুদ্রের অন্যান্য অপ্‌শন হল - দীঘা (ভীড় বেশি আর ইদানীং জগন্নাথ মন্দির হওয়ার পর থেকে সাধারণ হোটেলের ভাড়া আকাশচুম্বী), মন্দারমনি (পরিবারের লোকজনদের নিয়ে যাওয়ার পক্ষে একেবারেই উপযোগী নয়), শঙ্করপুর বা উদয়পুর (সমুদ্রে স্নান করার সুযোগ কম), বক্‌খালি (সমুদ্রের কাছে কোনও হোটেল নেই)। তাই তাজপুর। আর সেই তাজপুর ভ্রমণ নিয়েই আমার ব্লগের এবারের পোস্ট।

আমাদের এবারের দল আটজনের। আমি, অমৃতা, বাবা, মা, কথা, কলি আর সেইসঙ্গে আমাদের প্রতিবেশী আপালদা ও টিক্‌লি বৌদি। প্রতিবেশীদের সঙ্গে যাওয়ার একটা সুবিধে হল আলাদা করে কোনও মীটিং পয়েন্ট ঠিক করতে হয় না, সবাই একজায়গা থেকে যাত্রা শুরু করা যায়। সেইমতো ২৫শে জুলাই ২০২৬ শনিবার সকাল ৭টার সময়ে আমরা আমাদের গাড়িতে রওনা দিলাম তাজপুরের উদ্দেশ্যে।

বিদ্যাসাগর সেতু পেরিয়ে কোণা এক্সপ্রেসওয়ে - ১৬ নং জাতীয় সড়ক - কোলাঘাট - ১১৬ নং জাতীয় সড়ক - নন্দকুমার - ১১৬বি নং জাতীয় সড়ক - বালিসাই - বালিসাই তাজপুর সী বিচ্‌ রোড - তাজপুর। কলকাতা থেকে তাজপুরের দূরত্ব ১৮৪ কিলোমিটার। যাওয়ার পথে কোলাঘাটে ব্রেকফাস্ট করার জন্য দাঁড়ালাম। যেটা আমাদের সবাইকেই বেশ অবাক করল সেটা হল এখানে খাওয়ার জায়গাগুলোয় মানুষের ভীড়। এটা কোনও বিশেষ সপ্তাহান্ত নয়, টানা তিনদিনের ছুটিও নেই কিন্তু তাও খাওয়ার জায়গাগুলোয় প্রচন্ড ভীড় - আর লোকজনদের দেখে বোঝা যায় এরা সবাই আমাদের মতো বেড়াতেই যাচ্ছে। অনেক খোঁজাখুঁজি করে একটা রেস্ট্যুরেন্টে বসার জায়গা পাওয়া গেল। পুরী-সব্জী আর আলুর পরোটা নিয়ে খরচ পড়ল ৬৫০/- টাকা।

নন্দকুমার পর্যন্ত রাস্তাটা বেশ চওড়া এবং মাঝে ডিভাইডার আছে। কিন্তু এরপর থেকে বাকি ৭৮ কিলোমিটার রাস্তা তুলনামূলকভাবে সরু আর মাঝে ডিভাইডার না থাকায় গাড়ি বেশি জোরে চালানো যায়না। দুপুর ১টা নাগাদ আমরা তাজপুর পৌঁছলাম।

বার্ড নেস্ট রিসর্ট
তাজপুরে আমাদের বুকিং ছিল বার্ড নেস্ট রিসর্ট-এ। হোটেলটা সমুদ্র থেকে খুবই কাছে (এখানকার একজন কর্মচারী আমাদের বললেন "হেঁটে ৩৫ সেকেন্ড")। হোটেলটা বেশ বড়। হোটেলের চৌহদ্দীর ভিতরেই গাড়ি রাখার জায়গা আছে। আমরা চেক্‌-ইন করে ঘরে ঢুকলাম। ঘরগুলো খুব বড় না হলেও বেশ সুন্দর ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। আমরা তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম সমুদ্রস্নানের উদ্দেশ্যে !

তাজপুরের সমুদ্রে - জলে নামার আগে
৩৫ সেকেন্ড না হলেও হেঁটে মিনিট তিনেকের বেশি লাগল না সমুদ্রে পৌঁছতে। একটা কংক্রিটের পথ সমুদ্রের ধারে গিয়ে শেষ হয়ে গেছে, সেখান থেকে কয়েকধাপ সিঁড়ি দিয়ে নামলে বালি। এই সিঁড়িটা মোটেই সুবিধের নয় কারণ এর শেষ ধাপটা বালি থেকে প্রায় আড়াই ফুট উঁচু। বয়স্ক মানুষদের বা যাদের পায়ের সমস্যা আছে, তাদের পক্ষে এখান দিয়ে নামা খুবই দুস্কর। এখানে সমুদ্রের ধারে বালির মধ্যে খুঁটি পুঁতে কাঠ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি পরপর খাবারের দোকান হয়েছে। এইসব দোকানে প্রধানতঃ সন্ধ্যেবেলার স্ন্যাক্সই পাওয়া যায়।

এপাং ওপাং ঝপাং !
এখন ভাঁটা চলছে, সমুদ্র কিছুটা দূরে। আমরা বালিতে নেমে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে এলাম। তারপর যা হয় - সমুদ্রের ধারে চটি খুলে ঝপাং ঝপাং ঝপাং ! এই অনুভূতির কোনও তুলনা নেই। প্রথমে পায়ের পাতা ডোবা জল, তারপর হাঁটু, তারপর কোমর, তারপর বুক আর সবশেষে মাথা ডোবা জলে প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে লাফালাফি ঝাঁপাঝাঁপি করলাম (These actions are performed by experts. Do not try these if you are not!)। তারপর জল থেকে উঠে হোটেলে ফিরে এলাম। হোটেলের ঘরে আরেকদফা স্নান।

এরপরেই যেটা পায় সেটা হল প্রচন্ড খিদে। আমাদের দুপুরের খাবারের আগেই অর্ডার দেওয়া ছিল, হোটেলের ডাইনিং রুমে গিয়ে খেয়ে নিলাম। ভাত ডাল আলুভাজা ডিম মাছ মাংস মিলিয়ে খরচ হল ১,৮১৫ টাকা। এর পরে যেটা পায় সেটা হল প্রচন্ড ঘুম। সবাই যে যার ঘরে ঢুকে কয়েকঘন্টা ঘুমিয়ে নিলাম।

সমুদ্রের ধারে খাবারের দোকানে
সন্ধ্যেবেলা যখন ঘুম ভাঙল তখন অন্ধকার হয়ে গেছে। এটা সমুদ্রে স্নান করার নয়, সমুদ্র দেখার সময়। কংক্রিটের রাস্তা ধরে সমুদ্রের কাছে গিয়ে দেখলাম নিচে নামার কোনও প্রশ্ন ওঠে না, কারণ নিচের সিঁড়িগুলো পর্যন্ত জল চলে এসেছে। অর্থাৎ এখন ভরা জোয়ার। সমুদ্র দেখার জন্য পাড়ে সেই খুঁটির উপর কাঠের তৈরি দোকানগুলো রয়েছে। আর এই কংক্রিটের রাস্তা থেকেই দোকানে যাওয়ার কাঠের সিঁড়ি উঠে গেছে। আমরা একটা দোকানে ঢুকলাম। এখানে বেশ কয়েকটা টেবিল আর তার চারদিকে চেয়ার পাতা। লোকজন ভালোই রয়েছে আর পানাহারও চলছে (কী পান চলছে সেটা আর বিশেষভাবে উল্লেখ করলাম না)। দোকানে মূলতঃ মাছভাজা, কাঁকড়াভাজা, চিংড়ি ভাজা, মুরগী ভাজা এইসব পাওয়া যায়। আমরা একপ্লেট লোটেমাছ  (বা লইট্যামাছ) আর দু'প্লেট চিংড়ি ভাজা নিলাম। একপ্লেটে দশটা। চিংড়ি বা লোটে কোনওটারই সাইজ এক আঙুলের বেশি নয়। একপ্লেট লোটের দাম ২০০/- টাকা আর একপ্লেট চিংড়ির দাম ৪০০/- টাকা ! খেতে দূর্দান্ত কিছু নয় আর সেইসঙ্গে দাম অত্যধিক বেশি।

ঘন্টাখানেক বসে আমরা আবার হোটেলে ফিরে এলাম। এখানে কিছুই করার নেই, শুধুমাত্র গল্প করেই সময় কাটাতে হয়। রাতে ডিনারে ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন খাওয়া হল। খরচ হল ১,৬৮০/- টাকা।

সকালবেলা সমুদ্রের ধারে
পরেরদিন রবিবার ২৬শে জুলাই, ২০২৬ - ভোরবেলা সূর্যোদয় দেখতে ইচ্ছে করেই যাইনি কারণ আকাশে যা মেঘ ছিল তাতে সূর্যোদয় দেখা যেত না। সকালে একবার সমুদ্রের ধারে গেলাম। আগেরদিন সন্ধ্যেবেলা যে সময়ে এসেছিলাম, তার প্রায় বারো ঘন্টা পরে এসেছি তাই এখনও সমুদ্রে জোয়ারই পেলাম এবং কংক্রিটের রাস্তার নিচে বালিতে নামা গেল না। খাবারের দোকানগুলোও এখন বন্ধ। আমরা এখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আবার হোটেলে ফিরে এলাম।

নটা নাগাদ ডাইনিং রুমে গিয়ে ব্রেকফাস্ট করলাম। লুচি-তরকারি, ব্রেড-বাটার আর অমলেট নিয়ে খরচ হল ৮০৫/- টাকা। স্নান করে বেলা ১১টায় চেক্‌ আউট করে আমরা এগিয়ে গেলাম দীঘার দিকে। তাজপুর থেকে দীঘা বালিসাই হয়ে জাতীয় সড়ক দিয়েও যাওয়া যায় তবে ভিতরের রাস্তা দিয়ে গেলে দূরত্বও কম হয় আর অসাধারণ দৃশ্যও দেখা যায়। এই পথে দীঘার দূরত্ব ১৬ কিলোমিটার আর সময় লাগল আধঘন্টা মতো। রাস্তাটার অনেকটাই সমুদ্রের ধার দিয়ে। কিছুদূর গিয়ে সমুদ্র আমাদের থেকে দূরে চলে গেল আর আমরা চম্পা নদী পেরোলাম। কিছুদূর গিয়ে এই চম্পা নদী সমুদ্রের সঙ্গে মিলিত হয়েছে, সেই জায়গাটায় অনেক মাছধরার নৌকো দেখা গেল।

কম্পাইউন্ডের বাইরে থেকে জগন্নাথ মন্দির
আমাদের দীঘা যাওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল 'জগন্নাথ মন্দির' দর্শন (মন্দির দেখা কথাটা লেখা যায় না, দর্শন লিখতে হয়)। মন্দিরটা একেবারে দীঘা রেলস্টেশনের পাশেই। কাছাকাছি একজায়গায় গাড়ি পার্কিং করে মন্দিরের পাঁচিলের বাইরে ডালা আর্কেডে চটি-জুতো খুলে আমরা হেঁটে মন্দিরে ঢুকলাম। চত্বরটা বিশাল। এবং খুব সুন্দর। বিশাল হওয়ার কারণে এখানে ভীড়টা ছড়িয়ে রয়েছে। একটা পথ দিয়ে আমরা মূলমন্দিরের দিকে এগিয়ে চললাম। পরপর আরও কয়েকটা মন্দির চোখে পড়ল। আকাশে বেশ মেঘ করে আছে, যেকোনও সময়ে বৃষ্টি আসতে পারে। বৃষ্টি এলে আশ্রয় নেওয়ার একমাত্র উপায় হল মন্দিরের ভিতরে ঢুকে পড়া। তবে আকাশে রোদ না থাকায় একটা সুবিধে হল যে মেঝেটা গরম নয়।

সম্পূর্ণ জগন্নাথ মন্দির
প্রথমে কিছুটা এগিয়ে কয়েকধাপ উঠে একটা মন্দির। তারপর আরও কিছুটা এগিয়ে আরও কয়েকধাপ উঠে আরেকটা মন্দির (কোনটা কোন ঠাকুরের মনে নেই)। একেবারে শেষে জগন্নাথের মূল মন্দির। মূলমন্দিরের বাইরের আকৃতিটা পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের আদলে তৈরি আর সেটাই এই মন্দিরের বৈশিষ্ট্য। সম্পূর্ণ মেঝেটা মার্বেলের তৈরি। পাশে কয়েকটা ছোট ছোট জলাশয়। আমরা মূল মন্দিরে ঢুকলাম। ভিতরের কারুকার্য বা মূর্তি কোনও কিছুই পুরীর মন্দিরের মতো নয়। এখানে একটা নতুন জিনিস দেখলাম - প্রণামী বাক্সের গায়ে QR Code লাগানো। ভিতরে ছবি তোলার নিয়ম নেই, তবে মোবাইল নিয়ে ঢোকার বারণ নেই আর বুঝলাম তার প্রধান কারণই হল এই QR Code. আমরা যখন ঢুকলাম তখন জগন্নাথের আরতি হচ্ছে। আর সেইসঙ্গে বাইরে শুরু হয়েছে প্রচন্ড বৃষ্টি। আমরা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরে বৃষ্টি কিছুটা কমল আর আমরা ছাতামাথায় হেঁটে বেরিয়ে এসে গাড়িতে উঠলাম।

সবমিলিয়ে দীঘার জগন্নাথ মন্দির আমার খুবই ভালো লেগেছে। এই মন্দির তৈরির পিছনে যে রাজনৈতিক তরজা আছে, সরকারী অর্থ যেভাবে ব্যয় (বা অনেকের মতে অপচয়) হয়েছে, জগন্নাথ দেবের অবস্থান পুরীতে নাকি দীঘায় নাকি দুটো জায়গাতেই - এর কোনওকিছু নিয়েই এখানে আলোচনা করতে চাই না। আমার কাছে একটা মন্দিরে দেবতার অবস্থানের থেকেও অনেক বেশি আকর্ষণীয় হল এর কারুকার্য, স্থাপত্যশৈলী। আর সেই কারণেই এই জগন্নাথ মন্দির দর্শন। প্রাসঙ্গিকভাবে 'জয়বাবা ফেলুনাথ' ছবিতে অম্বিকানাথ ঘোষালের সেই সংলাপটা এখানে উল্লেখ করছি - "শুধু সুন্দর নয়, ওয়ার্ক অফ্‌ আর্ট আর সেইটাই বড় কথা। ওসব ভাগ্য ফেরানো টেরানোর কথা আমি বিশ্বাস করি না। একটা তিন ইঞ্চি মূর্তি মানুষের ভাগ্য ফেরাতে পারে না।"

দীঘার সমুদ্রের ধারে সবাই
দুপুর একটা বেজে গেছে তাই মন্দির থেকে বেরিয়ে আমরা এবার লাঞ্চ করার জন্য গেলাম 'ভরপেট' নামক রেস্ট্যুরেন্টে। ভিতরটা বেশ বড় কিন্তু ফাঁকা টেবিল প্রায় নেই বললেই চলে। এখানে ভাত ডাল আলুভাজা ইলিশ মাছ আর কাঁকড়া খাওয়া হল। খরচ হল ২,৮৪৩/- টাকা। লাঞ্চ করে আমরা কিছুক্ষণ সমুদ্রের ধারে গিয়ে দাঁড়ালাম। সেখানে ডাব খাওয়া হল। আর তারপর দুপুর তিনটে নাগাদ বাড়ি ফেরার পথ ধরলাম।

ফেরার পথে জায়গায় জায়গায় বৃষ্টি পেলাম। আমার হাইওয়েতে বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি চালাতে খুব ভালো লাগে। সেইসঙ্গে গাড়ির ভিতরে সবাই বক্‌বক্‌ করছে - সবমিলিয়ে দূর্দান্ত অভিজ্ঞতা। রাত ন'টা নাগাদ বাড়ি পৌঁছলাম। ভ্রমণ শেষ !

সারসংক্ষেপ ঃ

১. কলকাতা থেকে সপ্তাহান্তে ঘুরতে যাওয়ার জায়গা খুব বেশি নেই, যা আছে তার মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য হল তাজপুর। পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় অবস্থিত এই সমুদ্রসৈকত এর শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশের জন্য বিখ্যাত।

২. কলকাতা থেকে তাজপুর গাড়িতে যেতে সাড়ে চার ঘন্টার মতো সময় লাগে। ট্রেনে যেতে চাইলে হাওড়া থেকে দীঘাগামী ট্রেনে গিয়ে রামনগর স্টেশনে নামতে হবে আর সেখান থেকে গাড়িভাড়া করতে হবে।

৩. তাজপুরে অনেক হোটেল আছে যার মধ্যে বার্ড নেস্ট রিসর্ট অন্যতম। এদের ওয়েবসাইট  https://www.tajpurbirdnestresort.com/থেকে বুকিং করা যায়, যদিও আমরা MakeMyTrip থেকে বুকিং করেছিলাম। যোগাযোগের নম্বর - 7319255371, 8145341227.

৪. তাজপুরের আলাদা কোনও খাবার হোটেল বা রেস্ট্যুরেন্ট নেই, প্রত্যেকটা হোটেলেরই নিজস্ব খাবার ব্যবস্থা আছে। বার্ড নেস্ট রিসর্টের খাবারের মান ভালো।

৫. তাজপুরের সমুদ্র স্নানের পক্ষে খুবই উপযোগী তবে সেটা শুধুমাত্র ভাঁটার সময়ে। জোয়ারের সময়ে সমুদ্রে নামার কোনও প্রশ্নই ওঠে না।

৬. সমুদ্রের পাড়ে খুঁটির উপরে বেশ কিছু খাবারের দোকান আছে যেগুলো প্রধানতঃ সন্ধ্যের স্ন্যাক্স পাওয়া যায়। এখানকার খাবার দাম বেশ বেশি আর পরিমাণ বেশ কম।

৭. তাজপুর বছরের যেকোনও সময়েই যাওয়া যেতে পারে। এখানকার প্রকৃতি সারাবছর বিশেষ পালটায় না।

৮. তাজপুর থেকে দীঘার দূরত্ব মাত্র ১৬ কিলোমিটার, তাই ইচ্ছে করলে দীঘায় না থেকে তাজপুর থেকে দীঘা ঘুরে চলে আসা যেতে পারে। তাজপুর থেকে দীঘা যাওয়ার রাস্তাটা খুবই চিত্তাকর্ষক।

৯. দীঘার নবতম সংযোজিত দর্শনীয় স্থান হল জগন্নাথ মন্দির। একটা বিশাল চত্বরের উপর তৈরি এই মন্দির খুবই সুন্দর এবং অবশ্য দ্রষ্টব্য।

উপসংহার ঃ

তাজপুরের সমুদ্র
২০০৯ সালে যখন প্রথমবার তাজপুর গিয়েছিলাম, তখন তাজপুর জায়গাটার নামই খুব কম লোক জানত। তখন তাজপুরে হোটেল প্রায় ছিলই না, আমরা যে হোটেলে ছিলাম তাদের কোনও ঘরও ছিল না, ছিল শুধু তাঁবু। সেখানে থাকার অভিজ্ঞতাও ছিল রোমাঞ্চকর। বিচে গিয়ে যেটা সবথেকে বেশি চোখে পড়েছিল সেটা হল লালকাঁকড়া। এরপর গিয়েছি ২০১৪ সালে, তখন হোটেল অনেক হয়ে গিয়ে থাকলেও বিচ্‌টা সুন্দর ছিল। বিচে লালকাঁকড়াও ছিল। আর তারপর এবারে - ২০২৬ সালে। হোটেলের সংখ্যা আরও বেড়েছে, অনেকগুলো সুইমিং পুল যুক্ত হোটেল হয়েছে। বিচে খুঁটির উপর সন্ধ্যেবেলা পানাহার করার দোকান হয়েছে। আর সেইসঙ্গে হারিয়ে গেছে লালকাঁকড়া। কমে গেছে ঝাউবন। তাজপুরের সুন্দর নিরিবিলি পরিবেশ আজও আছে ঠিকই কিন্তু তার অনেকটাই কৃত্রিম। এবারে গিয়ে প্রকৃতির সেই নিজস্বতাটা কম চোখে পড়ল। আগেরবার তাজপুর ভ্রমণের শেষে লিখেছিলাম "দীঘা পুরী মন্দারমণির মতো ঘ্যাম নয়, অল্প হোটেল-দোকান, সমুদ্রের লাল কাঁকড়া আর শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ নিয়ে তাজপুর থাকুক তাজপুরেই"। কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি তাজপুর আর সেই তাজপুরে নেই। হয়তো এটাই প্রগতি - হয়তো এটাই উন্নয়ন !

তাজপুর ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.