আমি ব্লগ লেখার খুব বেশি সমর্থক কোনওদিনও ছিলাম না, সত্যি কথা বলতে কি এখনও যে আছি তা নয় । তার একটা প্রধান কারণ আমার ধারণা ব্লগ লেখার থেকেও পড়া অনেক বেশি ক্লান্তিকর । অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অনেক সময়ই পড়তে শুরু করে শেষ করা হয়ে ওঠে না । নিজের ধৈর্য এবং/অথবা আগ্রহের অভাবকে 'ঠিক আছে, বাকিটা পরে পড়ব' জাতীয় অজুহাত দিয়ে ঢেকে দিই - আর আমরা সবাই জানি সেই 'পরে' টা আর কখনওই আসে না । তো, এই কারণে আমি ঠিক করেছি আমার ব্লগকে কখনওই অন্যের ক্লান্তির কারণ ঘটাব না, আমার ব্লগের বিষয় হবে প্রধানতঃ ভ্রমণ । আমার মতো যেসব বাঙালিরা ঘুরতে ভালোবাসে, তাদের জন্য আমার ব্লগ হবে তথ্যের একটা উৎস । আমার নিজের একটা অভ্যেস আছে, কোনও জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার আগে সেই জায়গাটা সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, আর ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে আমার বরাবরই মনে হয়েছে যে ইন্টারনেটে লেখালেখি করার ব্যাপারে বাঙালিদের থেকে কুঁড়ে খুব কম শিক্ষিত জাতই আছে । আমার মতো যেসব বাঙালিরা আছে, যারা ইন্টারনেটে কোনো একটা ইংরিজীতে লেখা দেখলেই না পড়ার চেষ্টা করে, তাদের জন্য আমার ব্লগ সহায়ক হবে, এই বিশ্বাস নিয়ে শুরু করছি আমার ভ্রমণকাহিনী । আগেই বলে রাখি, আমি স্ট্যাটিসটিক্সের ছাত্র ছিলাম, তাই আমার ব্লগে তত্ত্বের থেকে তথ্যের দেখাই মিলবে বেশি ।

Tuesday, January 1, 2013

কালুক ভ্রমণ


কালুক । সিকিমের পশ্চিমদিকে পাহাড়ের গায়ে ছোট্ট একটা শহর । নিউ জলপাইগুড়ি (শিলিগুড়ি) রেলস্টেশন থেকে ১১৯ কিলোমিটার দূরে এই শহর বেড়ানোর জন্য একটা বেশ নতুন জায়গা । জায়গাটার অনেকগুলো বিশেষত্ব আছে, সেগুলো লেখার মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় লিখব । আপাততঃ প্রথম বিশেষত্বটা দিয়ে শুরু করি – যেটার জন্য আমি এখানে গেছিলাম । কালুক মধুচন্দ্রিমা যাপনের জন্য বিশেষ মনোরম জায়গা !

নিউ জলপাইগুড়ি যাওয়ার পথে - লেটে !
২৬শে ডিসেম্বর, ২০১২ বুধবার রাত ১০:০৫ এ শিয়ালদহ থেকে দার্জিলিঙ মেল ধরে আমরা এন জে পি (নিউ জলপাইগুড়ি) র উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম । সঙ্গী, বলা বাহুল্য, আমার স্ত্রী অমৃতা । এ সি থ্রী টিয়ারে (উচ্চারণটা ‘টায়ার’ নয়) আমরা দু’টো আপার বার্থ নিয়েছিলাম । এ সি কামরায় রাতের বেলা এমনিতেও বাইরে কিছু দেখা যায় না তাই ট্রেনে ওঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই শুয়ে পড়লাম । শিয়ালদহ থেকে এন জে পি র পথের বিবরণ দেওয়ার কিছু নেই, শুধু এটা বলে রাখি এইসময়ে রাস্তায় অনেক সময়ে কুয়াশা হয় তাই আমাদের ট্রেন তিনঘন্টা লেট করে বেলা এগারোটায় পৌঁছল ।

নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে পৌঁছে
এন জে পি থেকে কালুক যাওয়ার গাড়ি পাওয়া সহজ নয় কারণ আগেই বলেছি কালুক বেড়ানোর পক্ষে একটা নতুন এবং ছোট জায়গা । এখানে এখনও খুব বেশি ট্যুরিস্টরা যায় না । হানিমুনে কোনও ঝক্কি নিতে চাই না বলে আমরা আগে থেকেই হোটেলের সঙ্গে কথা বলে গাড়ি বুক করে রেখেছিলাম । এন জে পি তে ‘মারুতি অল্টো’ নিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন ড্রাইভার সুরেশ গুরুং । স্টেশন থেকে বেরিয়ে ড্রাইভারকে খুঁজে বের করে গাড়িতে মালপত্র তুলে আমরা যখন কালুকের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম তখন ঠিক বেলা সাড়ে এগারোটা ।

তিস্তা নদী - এখন ডানদিকে
এই অঞ্চলে যারা গেছে তারা সবাই জানে যে শিলিগুড়ি থেকে সিকিম যেতে হলে সেভক রোড ধরতে হয় । এই সেভক রোড ধরে সমতলে চলতে চলতে হঠাৎ একসময়ে শুরু হয়ে যায় পাহাড় আর তারপর পাহাড়ী রাস্তা ধরে তিস্তা নদীকে কখনও ডানদিকে কখনও বাঁদিকে রেখে এগিয়ে চলা । 





জওহরলাল নেহেরু ব্রীজ - গাড়ির ভেতর থেকে
জোড়থাং
এইভাবে চলতে চলতে একসময়ে একটা ব্রীজ পড়ে যেটা পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিমের সীমানায় । ব্রীজটার নাম ‘জওহরলাল নেহেরু ব্রীজ’ আর জায়গাটার নাম মেল্লি । মেল্লি শহরটার বৈশিষ্ট্য হল এটা পশ্চিমবঙ্গ আর সিকিম দুটো রাজ্যের মধ্যেই পড়ে ।






মেল্লি পেরিয়ে আমরা আরও এগিয়ে চললাম । দুপুর আড়াইটে নাগাদ পৌঁছলাম ‘জোড়থাং’ এ । জোড়থাং হল সিকিমের একটা বড় শহর – প্রধান বানিজ্যকেন্দ্রও বলা যেতে পারে । জোড়থাং থেকে সিকিমের প্রায় সব জায়গার যাওয়া যায় । এখানে আমরা লাঞ্চ করার জন্য দাঁড়ালাম । একটা মোটামুটি চলনসই রেস্টুরেন্টে দু’প্লেট মিক্সড্‌ চাউমিন নেওয়া হল । দাম পড়ল ৬০/- করে ।


এরপর আবার এগিয়ে চলা । এখন আমাদের সঙ্গী ‘রঙ্গিত’ নদী (এই নদীর নাম ছোটবেলায় ভূগোল বইতে আমরা সবাই পড়েছি – তবে এটা বড় না ছোট, সেটা আর জেনে ওঠা হয়নি) । চলতে চলতে একসময়ে দিনের আলো ফুরিয়ে এল । পশ্চিম সিকিমের রাস্তাঘাট বেশ খারাপ আর জায়গায় জায়গায় মেরামতির কাজ চলছে এইসব বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে আমরা যখন কালুক পোঁছলাম তখন ঘড়ি বলছে সন্ধ্যে ছ’টা ।

আমরা ছিলাম ‘ঘন্‌ডে ভিলেজ রিসর্ট’ এ । জায়গাটা কালুক বাজারে । মারুতি অল্টো ঘন্‌ডের একেবারে সামনে পর্যন্ত যায় না, শেষের মিনিট পাঁচেকের ঢালু পথটুকু হেঁটে যেতে হয় । রিসর্টের একজন লোক এসে আমাদের মালপত্র নিয়ে গেল আর আমরা গেলাম রিসেপশনে । এখানে প্রথমেই আমাদের সাদা সিল্কের কাপড় দিয়ে অভ্যর্থনা করা হল । এরপর পেপার ফর্ম্যালিটি সেরে আমরা আমাদের ঘরে চলে এলাম ।

ঘন্‌ডে ভিলেজ রিসর্ট - ঘরের ভেতর
‘ঘন্‌ডে’ র প্রধান হোটেলটা ছাড়াও পাহাড়ের ধাপে ধাপে আলাদা আলাদা কটেজ রয়েছে, তার মধ্যে ‘নর্সিং ২’ এ আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল । এই ঘরগুলো ‘সুপার ডিলাক্স’ রুম – ভাড়া ১,৮০০/- (ব্রেকফাস্ট যোগ করলে ভাড়া ২,১০০/-) । এর সঙ্গে যোগ হবে ১০% সার্ভিস ট্যাক্স । ঘরে চা বা কফি দেওয়া হয় না, তবে চা-কফি-দুধ-চিনির একগুচ্ছ ছোট ছোট প্যাকেট দিয়ে যায় আর এর সঙ্গে ঘরে একটা ইলেক্‌ট্রিক কেটলি আছে যাতে ইচ্ছে হলে চা বা কফি তৈরি করে খাওয়া যেতে পারে । ঘরে রুম হিটার নেই, অবশ্য তার দরকার আছে বলে আমার মনেও হয় না । বাথরুমে গিজার আছে যেটা যেকোনও সময়েই চালানো যেতে পারে । আর রয়েছে ২৪ ঘন্টার রুম সার্ভিস (যদিও মাঝরাতে সার্ভিস পাওয়া যায় কিনা আমরা সেটা দেখার কখনও চেষ্টা করিনি !) ।

হোটেলে পৌঁছে জামাকাপড় ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম । কিছুক্ষণের মধ্যে রাতের ডিনারের অর্ডার দিলাম । এদের একটা ৬ – ৭ পৃষ্ঠার বিশাল মেনু কার্ড আছে যাতে ইন্ডিয়ান-চাইনিজ-কন্টিনেন্টাল সবরকমের খাবার পাওয়া যায় । আমরা আশা করিনি যে সেই মেনুর সব খাবার এরা সাপ্লাই দিতে পারে তাই রুম সার্ভিসের ছেলেটি যখন বলল – “আপ কোই ভী আইটেম অর্ডার কর্‌ সক্‌তে হ্যাঁয়” তখন কিছুটা অবাকই হলাম ।

চাঁদের আলোয় কাঞ্চনজঙ্ঘা
ঘন্‌ডের প্রায় সবক’টা ঘরের ভেতর থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায় । আমরা যেদিন পৌঁছেছি, তার আশেপাশে কোনও একদিন পুর্ণিমা ছিল আর আকাশ পরিষ্কার থাকার জন্য চাঁদের আলোয় কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছিল । দৃশ্যতই অত্যন্ত সুন্দর ।






ডিনার ডাইনিং হলেও করা যায় আবার ঘরেও আনিয়ে খাওয়া যেতে পারে । আমরা দ্বিতীয়টাই করলাম কারণ আমাদের কটেজ থেকে ডাইনিং হলটা হেঁটে বেশ কিছুটা দূরে আর এই পথটা বেশ ঠান্ডা । প্রথমদিন রাতে খাওয়া হল – বাটার রুটি, টিবেটিয়ান নান আর চিকেন দো-পিঁয়াজা । সব মিলিয়ে খরচ হল ২৪২/- (১০% সার্ভিস ট্যাক্স যোগ করে) এরপর ... কালুকে প্রথম রাত্রিযাপন !

কাঞ্চনজঙ্ঘা - পরেরদিন সকালে
২৮ শে ডিসেম্বর, ২০১২, শুক্রবার – কালুকে আমাদের সাইট-সিয়িং প্রথম এর দিন । সকালে হোটেলে ব্রেকফাস্ট করলাম চানা-বাটোরা দিয়ে । খরচ ১৩২/- । ব্রেকফাস্ট দিতে একটু বেশি দেরি করে ফেলায় আমাদের বেরোতে বেরোতে প্রায় সাড়ে দশটা বেজে গেল । গাড়ি বলাই ছিল – আমরা কালুকে যতদিন ছিলাম প্রত্যেকদিনই গেছি সুরেশ গুরুং - এর গাড়িতে । লোকটির কথাবার্তা বেশ ভালো এবং গাড়ি চালানোর হাত খুব ভালো । আমাদের গন্তব্যের মধ্যে আছে – ছায়াতাল, সিংশোর ব্রীজ, চাঙ্গে ফল্‌স্‌, পেলিং, পেমিয়াংচি মনাস্ট্রী আর রাবডেংস্‌ রুইন্‌স । এই জায়গাগুলোয় কালুকের চেয়ে ঠান্ডা বেশি তাই আমরা সেরকম প্রস্তুতি নিয়ে বেরিয়েছিলাম । সাড়ে দশটায় বেরিয়ে আমাদের প্রথম গন্তব্য ‘ছায়াতাল’ এ পৌঁছলাম তখন বেলা এগারোটা কুড়ি ।

ছায়াতাল
ছায়াতাল হচ্ছে একটা হ্রদ । এখানে একটা হোটেলও আছে আর হোটেলের সামনে বসে থাকা একটা বাঙালি পরিবারকেও দেখলাম । ছায়াতালে আর কিছু দেখার নেই, মিনিট পনেরো ঘুরে ছবিটবি তুলে আমরা রওনা দিলাম আমাদের দ্বিতীয় গন্তব্যে ।






সিংশোর ব্রীজ
সিংশোর ব্রীজ
এরপর ‘সিংশোর ব্রীজ' । পৌঁছলাম তখন বারোটা পঞ্চান্ন । সিংশোর ব্রীজ হচ্ছে সিকিমের সর্বোচ্চ ব্রীজ আর এশিয়ার মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ । ব্রীজের মাঝখান থেকে একটা পাথর ফেললে নীচে পড়তে তিন মিনিট সময় লাগে বলে একটা গুজব শুনেছিলাম, কিন্তু সেটা একটা বাজে কথা (H = ½ gt2 ফর্মূলা অনুযায়ী ৩ মিনিটে একটা পাথর ওপর থেকে ১,৫৮,৯২২ মিটার বা ১৫৮ কিলোমিটার পড়তে পারে, যা মাউন্ট এভারেস্টের থেকেও অনেক উঁচু !)আমি একটা পাথর ফেলে দেখলাম সেটা পড়তে দশ সেকেন্ড মতো লাগল । যাই হোক, ব্রীজটা খুবই সুন্দর – আমরা হেঁটে এপার থেকে ওপারে গেলাম । আমাদের গাড়ি ফাঁকা অবস্থায় ওপারে গেল আর ফেরার সময়ে আমাদের নিয়ে পেরোলো । এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য অত্যন্ত চমৎকার !




পেলিং
এরপর পেলিং । আমাদের যাওয়ার পথে চাঙ্গে ফল্‌স্‌ পড়ল কিন্তু ড্রাইভার বলল সেটা আমরা ফেরার সময়ে দেখব । পেলিং এ পৌঁছলাম তখন দুপুর দু’টো । এখানে আমাদের দুপুরের খাওয়ার কথা ছিল – একটা রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করলাম । ভাত, ডাল, তরকারি, মুরগী মিলিয়ে দু’জনের মোট ১৭০/- পড়ল ।



রাবডেংস্‌ রুইন্‌স যাওয়ার পথ
এইরকম সাইনবোর্ড পরপর আছে
রাবডেংস্‌ রুইন্‌স

আমরা পেলিং শহরে আলাদা করে আর কিছু দেখিনি – খাওয়াদাওয়া শেষ করে প্রথমে গেলাম ‘রাবডেংস্‌ রুইন্‌স’ । পৌঁছলাম তখন দু’টো চল্লিশ । এখানে গেটের কাছে গাড়ি রেখে বাকিটা হেঁটে যেতে হয় । গেট থেকে বাঁধানো পাহাড়ি পথে প্রায় এক কিলোমিটার । এটাকে একটা ছোটখাটো ট্রেকিং বলা যেতে পারে । হাঁটতে হাঁটতে একসময়ে দেখলাম একটা সাইনবোর্ডে লেখা আছে KEEP UP THE SPIRIT. THE DAY IS YOURS. 450 METER. অস্বীকার করব না, হাঁটাটা কিছুটা বিরক্তিকরই । সেটা সম্ভবতঃ সবারই হয় বোধহয় সেই জন্যই লোকজনকে উৎসাহিত করার জন্য জায়গায় জায়গায় সাইনবোর্ড লাগানো রয়েছে । আরেকটু এগিয়ে দেখলাম একটা ২৫০ মিটারের বোর্ড রয়েছে । এরপর - DO NOT GET TIRED. GREAT EXCITEMENT IS AWAITING. 200 METER. এরপর পাশের সাইনবোর্ডটা । 



আর তারপর – হ্যাঁ, এটাই আমাদের গন্তব্য - রাবডেংস্‌ রুইন্‌স । এখানে একসময়ে সিকিমের রাজধানী ছিল । এটাকে রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ বলা যেতে পারে । জায়গাটা একটা পাহাড়ের মাথায়, এখান থেকে অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যায় । এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতেও খুব সুন্দর লাগে ।





পেমিয়াংচি মনাস্ট্রী
রাবডেংস্‌ রুইন্‌স দেখে বেরোতে বেরোতে সোয়া একঘন্টা লেগে গেল । এরপর গেলাম ‘পেমিয়াংচি মনাস্ট্রী’ । পৌঁছলাম চারটে । এটা একটা বেশ বড় মনাস্ট্রী এবং বেশ সুন্দর । এখানে ঢুকতে একটা মেইন্টেনেন্স ফি বাবদ মাথাপিছু ২০/- করে দিতে হয় । মনাস্ট্রীর ভেতরে ঢুকে দোতলা এবং তিনতলায় যাওয়া যায় । তিনতলার মেঝেটা পুরোটাই কাঠের । ভেতরে পুরনোদিনের নানারকম জিনিস আছে ।
চাঙ্গে ফল্‌স্‌
এরপর ফেরার পথ ধরলাম । পথে পড়ল ‘চাঙ্গে ফল্‌স্‌’ । অনেকটা উঁচু থেকে পড়ে অনেকটা নিচে চলে যায় – এটাই এই ফল্‌সের বৈশিষ্ট্য । এখানে যখন আমরা পৌঁছলাম তখন প্রায় বিকেল পাঁচটা আর সন্ধ্যে হব হব করছে । এখানে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছবি তুলে আমরা কালুক ফেরার পথ ধরলাম । ফেরার পথে একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেল । এইসময়ে বেশ ঠান্ডা লাগছিল – আমাদের সঙ্গে নিয়ে বেরনো অতিরিক্ত গরম পোষাকগুলোর সদ্ব্যবহার করলাম । কালুকে পৌঁছলাম তখন প্রায় সাতটা । আমাদের প্রথমদিন ঘোরার খরচ ২,৫০০/- । ঘরে পৌঁছে ডিনারের অর্ডার দিয়ে দিলাম । রুটি আর চিকেন বাটার মশালা মিলিয়ে মোট ২৪৪/- পড়ল ।



পরেরদিন ২৯শে ডিসেম্বর, ২০১২, শনিবারআমাদের গন্তব্য সাউথ সিকিম । দেখার জায়গা – স্যামড্রুপসে, নামচি রক্‌ গার্ডেন, নামচি আর চারধাম । নামচি কালুক থেকে অনেকটা দূরে তাই আমাদের ড্রাইভার বলে রেখেছিল যেন সকাল আটটায় বেরোই । আমরা সকালে আর রিসর্টের ব্রেকফাস্ট না নিয়ে নিজেদের আনা খাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম । আমাদের সঙ্গে প্রচুর বিস্কুট, চকোলেট, চানাচুর ইত্যাদি ছিল – তাই খিদেয় পেট চুঁই চুঁই ব্যাপারটা কখনও হয়নি ।

স্যামড্রুপসের ১৩৫ ফুট উঁচু মূর্তি
সবকটা জায়গাই নামচিতে, বা নামচির কাছাকাছি । কালুক থেকে নামচি যেতে গেলে জোড়থাং হয়ে যেতে হয় । প্রথম গন্তব্য ‘স্যামড্রুপসে’তে পৌঁছলাম তখন বেলা এগারোটা পনেরো । জায়গাটার উচ্চতা ৭,০০৯ ফুট । এখানে ঢোকার জন্য টিকিট লাগে, মাথাপিছু ২০/- । এছাড়া গাড়ি পার্কিং এর জন্য ২০/- । স্যামড্রুপসের কোনও ঐতিহাসিক মূল্য নেই এখানে ‘গুরু পদ্মসম্ভব’ এর একটা ১৩৫ ফুট উঁচু মূর্তি আছে । ১৯৯৭ সালে এই জায়গাটা তৈরি হয়েছে । চত্বরটা ঘুরে বেড়ানোর পক্ষে বেশ সুন্দর আর ওপর থেকে অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যায় । উঁচু জায়গা থেকে প্রাকৃতিক দৃশ্যের যে সৌন্দর্য্য সেটাই স্যামড্রুপসের বৈশিষ্ট্য । 
স্যামড্রুপসে থেকে নামচি শহর
জপযন্ত্র


















এখানকার একটা দোকান থেকে দু’টো তিব্বতী জপযন্ত্র কেনা হল । দাম নিল ১০০/- করে ।





নামচি রক গার্ডেন





স্যামড্রুপসের পর ‘নামচি রক্‌ গার্ডেন’ । পাহাড়ী পথে হেঁটে নামতে নামতে পথের দু’ধারে নানারকম সুন্দর গাছ । এই জায়গাটা আমাদের কিছুটা হতাশ করল । কারণ এখানকার গাছপালাগুলো ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না । জায়গাটা দেখতে যে পরিমাণ পরিশ্রম করতে হয় সেটার পক্ষে সৌন্দর্য্যটা যথেষ্ট আকর্ষণীয় নয় ।



এরপর এলাম নামচি শহরে । তখন বাজে দুপুর একটার কিছু বেশি । এখানে আমাদের একটা হোটেলের সামনে নামিয়ে ড্রাইভার একটু এগিয়ে গিয়ে গাড়িটা পার্ক করল । আমরা এই হোটেলে দু’টো চিকেন থালি নিলাম । খরচ হল ১৮০/- ।

নামচি সেন্ট্রাল পার্ক - বিদেশী লোকেশনের মতো
এরপর আমরা কিছুক্ষণ নামচি শহরটা দেখলাম । আমরা ছিলাম ‘সেন্ট্রাল পার্ক’ এ যেটা অত্যন্ত সুন্দর করে তৈরি করা । বাংলা বা হিন্দী ছবিতে যেরকম ফরেন লোকেশন দেখা যায়, নামচির সিটি সেন্টারে গেলে ঠিক সেরকমই দেখতে পাওয়া যায় । এখানে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে ছবি তুলে আমরা হেঁটে হেঁটে চলে গেলাম আমাদের গাড়ির কাছে ।


বদ্রীনাথ ধাম
‘চারধাম’ । আমাদের চতুর্থ তথা শেষ গন্তব্য । পৌঁছলাম তখন পৌনে তিনটে । এখানে কিছু পয়সা খরচের ব্যাপার আছে – প্রথমে গাড়ি পার্কিং এর খরচ ৫০/-, তারপর ক্যামেরা নিয়ে ভেতরে ঢোকার খরচ ৩০/- (মুভি ক্যামেরা হলে ৫০/-) । এছাড়া ভেতরে ঢুকে জুতো রাখার খরচ মাথাপিছু ২/- করে 

(বাঁদিক থেকে) জগন্নাথ ধাম, রামেশ্বরম্‌ ধাম আর দ্বারকা ধাম




চারধাম হচ্ছে ভারতের বিখ্যাত চারটে জায়গার একটা সংক্ষিপ্ত চেহারা । এই চারটে জায়গা হল ‘বদ্রীনাথ ধাম’, ‘দ্বারকা ধাম’, ‘জগন্নাথ ধাম’ আর ‘রামেশ্বরম্‌ ধাম’ । চারটে বিখ্যাত মন্দিরের চারটে ছোট সংস্করণ করে এখানে রাখা হয়েছে ।
দ্বাদশ শিব মন্দিরের দু'টো





এদের সবার ওপরে আছে শিবের বিশাল মূর্তি এবং মন্দির আর সেইসঙ্গে দ্বাদশ শিবমন্দিরও আছে । আর আছে সাঁইবাবার (গেরুয়াধারী সাঁইবাবা নয়) মন্দির । এই জায়গাটারও কোনও ঐতিহাসিক মূল্য নেই । জায়গাটা বিশাল তবে বেশ সুন্দরভাবে সাজানো এবং যথেষ্ট রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় । সর্বোপরি এই চারটে জায়গার আসলগুলো যেরকম নোংরা, তাদের প্রতিরূপ এই জায়গাটা সেরকম একেবারেই নয় ।

বিশালাকৃতিক্স শিব














চারধাম থেকে বেরোলাম তখন পৌনে চারটে । আমাদের আর কিছু দেখার নেই কাজেই আমরা ফেরার পথ ধরলাম । জোড়থাং হয়ে কালুক পৌঁছলাম প্রায় সাড়ে ছ’টা । দ্বিতীয়দিন ঘোরার খরচ ৩,০০০/- । পরেরদিন আমাদের আর দূরে কোথাও যাওয়ার নেই, কালুকে লোকাল সাইট-সিয়িং করব । এটা করতে ঘন্টাখানেকের বেশি লাগবে না তাই ড্রাইভার বলল দুপুর দেড়টায় আসবে । আমরা লাঞ্চ করে বেড়াতে বেরোব । রাতে ডিনারে ভেজ চাউমিন আর চিলি ফিশ অর্ডার দেওয়া হল ২৯০/- ।

ঘন্‌ডে ভিলেজ রিসর্টের কটেজ
ঘন্‌ডে ভিলেজ রিসর্টের কটেজ
পরেরদিন, ৩০শে ডিসেম্বর, ২০১২ রবিবার সকালে একটু দেরি করে উঠলাম । ব্রেকফাস্ট নেওয়া হল – ১০০/- করে চিকেন স্যান্ডউইচ । এরপর রিসর্টটা ভালো করে ঘুরে দেখলাম । এ’কদিন সকালে বেরিয়ে গেছি, অন্ধকার হওয়ার পরে ফিরেছি কাজেই রিসর্টটা দেখার সুযোগ পাওয়া যায়নি । পাহাড়ের ধাপে ধাপে রিসর্টের বিভিন্ন কটেজগুলো ঘুরে টুরে দেখলাম



দুপুরে ভাত, আলুর দম আর চিকেন লোকাল স্টাইল নেওয়া হল । খরচ পড়ল ২৪২/- ।











রিনচেনপং মনাস্ট্রী
দুপুরে পৌনে দু’টোর সময়ে বেরোলাম লোকাল সাইট-সিয়িং করতে । প্রথমে গেলাম ‘রিনচেনপং মনাস্ট্রী’তে । এটা কালুক থেকে মিনিট পনেরো লাগে । জায়গাটা খুব একটা ঘ্যাম কিছু নয় আর সেই জন্যই বোধহয় একটা স্বাভাবিক সৌন্দর্য্য আছে । আমরা যখন গেলাম তখন প্রার্থনা চলছিল, ফলে আমাদের আর ভেতরে ঢোকা সম্ভব হল না । মনাস্ট্রীর সামনে একটা বিশাল ফাঁকা মাঠ আছে যেখানে দুপুরের রোদে হাঁটতে বেশ ভালো লাগে ।

ওল্ড ব্রিটিশ বাংলো
এরপর গেলাম ‘ওল্ড ব্রিটিশ বাংলো’য় । নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে জায়গাটা আসলে কি, তাই আর আলাদা করে বলছি না যে এটা আসলে ব্রিটিশদের একটা পুরনো বাংলো । বাংলো যেরকম হয়, একটা একতলা বাড়ি, মাথায় তেকোনা ছাদ, সামনে লম্বা বারান্দা আর তার সামনে মোরামের রাস্তার দু’দিকে ফুলগাছ – এ’সবই আছে । বাংলোর পেছনে চাকরবাকরদের থাকার ঘরও আছে । এখানে আমরা ছাড়া আর কোনও লোকজন ছিল না, মিনিট পনেরো ঘুরে আবার গাড়িতে উঠে পড়লাম ।

ব্রিটিশ বাংলোর রাস্তাতে পড়ে ‘পয়জন লেক’ । এই লেকে এখন জল নেই, শুধু বর্ষাকালে এখানে জল থাকে । ব্রিটিশদের সঙ্গে নেপালীদের যুদ্ধের সময়ে নেপালীরা এই লেকের জলে বিষ গাছের পাতা মিশিয়ে ব্রিটিশদের হত্যা করে – সেই থেকে পয়জন লেক । আমরা পাহাড়ের ওপরের রাস্তা থেকে নিচে লেকটা দেখলাম, তবে লেকের কাছে আর যাইনি ।

'রবীন্দ্র স্মৃতি ভবন' নামক জায়গা থেকে পাহাড়ের দৃশ্য
এরপর আজকের এবং আমাদের বেড়ানোর শেষ দ্রষ্টব্য – ‘রবীন্দ্র স্মৃতি ভবন’ । এই জায়গাটার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কি সম্পর্ক বুঝলাম না, একটা পায়ে চলা পথে মিনিট পাঁচেক চলার পর একটা ভাঙাচোরা বসার জায়গা । এখান থেকে অন্যান্য পাহাড়ের ঢেউ খুব সুন্দর দেখা যায় কিন্তু ওই পর্যন্তই । জায়গাটার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক আছে এরকম কোনও প্রত্যাশা নিয়ে গেলে হতাশ হতে হবে, তবে দেখার জায়গা হিসেবে চলনসই ।

মন্দিরের সামনে থেকে কালুক শহর
ড্রাইভার আমাদের কালুক বাজারে ছেড়ে দিল লোকাল সাইট-সিয়িং এর জন্য লাগল ৬০০/- । দুপুর তিনটে বাজে, এক্ষুণি রিসর্টে ফেরার মানে হয় না, সেই জন্য আমরা আশপাশটা একটু হাঁটলাম । কালুক বাজারে ওই এলাকার একটা ম্যাপ আছে, সেটায় কোন জায়গা কতদূরে এসব লেখা আছে । সেই ম্যাপ দেখেই জানতে পারলাম ঠিক বাজারের ওপরেই পাহাড়ের ওপর একটা শিবের মন্দির আছে । সিঁড়ি দিয়ে সেই মন্দিরে উঠতে হয় । এখান থেকে পুরো কালুক শহরটা দেখা যায় । মন্দিরটা দেখার সেরকম কিছু না থাকলেও এখানকার দৃশ্য অত্যন্ত মনোরম । কালুকে গিয়ে এই জায়গাটা একবার না গেলে সত্যিই কিছু না দেখা থেকে যাবে ।

পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে এসে আমরা কিছু দোকানপাট দেখলাম । পুরো কালুক বাজারে সবমিলিয়ে  বোধহয় ২৫ – ৩০ টা দোকান আছে, যার মধ্যে অন্ততঃ ৫ টা মদের দোকান । বাকি দোকানগুলোয় মাছমাংস, মনিহারি, মুদির জিনিস পাওয়া যায় । আমাদের কিছু উপহার দেওয়ার মতো জিনিস কেনার ছিল – কিন্তু ওখানে সেরকম দোকান নেই বললেই চলে । ঢাকনা দেওয়া চিনামাটির নক্সা করা কাপ পাওয়া যায় (যেগুলোর দাম ৪০/- করে) কিন্তু সেগুলো ভেঙ্গে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে । অনেক খুঁজে আমাদের রিসর্টের রাস্তার সামনের একটা দোকান থেকে কিছু জিনিস কেনা হল । হয়তো প্রতিযোগিতা নেই বলেই এখানে জিনিস পত্রের দাম একেবারেই কমাতে চায় না । সবমিলিয়ে আমাদের ৫৮০/- হল যা অনেক দরদাম করেও ৫৬০/- নিচে নামানো গেল না ।

দ্য লাস্ট সাপার অ্যাট কালুক
রিসর্টে ফিরে এলাম । এটাই আমাদের কালুকে শেষ রাত্রি – পরেরদিন সকালে আমাদের এন জে পি র জন্য বেরিয়ে পড়তে হবে । সন্ধ্যেবেলা যাবতীয় গোছগাছ সেরে নিলাম । ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে সব টাকা পয়সাও মিটিয়ে দিলাম গাড়ির জন্য আমাদের মোট দিতে হল ১২,০০০/- (এন জে পি থেকে কালুক ৩,০০০ + পেলিং এর দিকের সাইট-সিয়িং ২,৫০০ + নামচির দিকের সাইট-সিয়িং ৩,০০০ + লোকাল সাইট-সিয়িং ৬০০ + কালুক থেকে এন জে পি ৩,০০০ - ছাড় ১০০) । আমরা সাধারণতঃ শেষদিনের ডিনারটা একটু ভালো কিছু করি, তাই মিক্সড্‌ ফ্রাইড রাইস আর চিকেন মাঞ্চুরিয়ান অর্ডার দেওয়া হল । খরচ পড়ল ৩০৮/- ।

এই গাড়ি করেই ঘুরেছিলাম
৩১শে ডিসেম্বর, সোমবার আমাদের ফেরার ট্রেন উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেসের এন জে পি থেকে ছাড়ার সময় বিকেল ৫:৪০, কিন্তু ড্রাইভার বলল রাস্তায় অনেক জায়গায় কাজ হচ্ছে আর বিভিন্ন জায়গায় যানজট হচ্ছে – তাই ঝুঁকি নিয়ে দেরি করে বেরনো ঠিক হবে না । তাই পরেরদিন সকালে ঠিক আটটার সময়ে আমরা নিজেদের আনা খাবার দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়লাম কালুক থেকে । বেরনোর সময়েও আরেকদফা সিল্কের কাপড় দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হল । কাঞ্চনজঙ্ঘাকে একবার শেষবারের মতো অভিবাদন করে গাড়িতে উঠে পড়লাম ।

এন জে পি স্টেশনে - ফেরার পথে
জোড়থাং পৌঁছলাম সকাল দশটায় । এখানে দাঁড়ানোর কোনও দরকার নেই, তাই আরও এগিয়ে চললাম । রাস্তায় সেরকম দাঁড়াতে কোথাও হয়নি, দাঁড়াতে হল সেভক এর কাছে পৌঁছে – এখানে রাস্তায় বেশ যানজট হয় । পাহাড় থেকে সমতলে নেমেও যানজট অব্যাহত রইল । ড্রাইভার সুরেশ গুরুং যখন আমাদের এন জে পি তে নামাল, তখন দুপুর আড়াইটে ।



আমরা স্টেশনের লাগোয়া ভাতের হোটেলে দুপুরের খাওয়া সেরে নিলাম । ‘মটন ভাত’ (হ্যাঁ, এইসব হোটেলে মাটন লেখা থাকে না সাধারণতঃ!) ৮০/- করে । খেয়েদেয়ে ওয়েটিং রুমে এসে বসে রইলাম । সন্ধ্যে ছ’টা নাগার ট্রেন এল । মাঝরাতে ট্রেনের মধ্যেই আমরা New Year celebrate করলাম ফেরার ট্রেন অবশ্য মাত্র ৪৫ মিনিট লেট ছিল – তাও সেটা দমদম আর শিয়ালদহের জঘন্য সিগন্যালিং ব্যবস্থার জন্য । ১লা জানুয়ারি, ২০১৩ মঙ্গলবার সকালে শিয়ালদহ স্টেশন থেকে বেরিয়ে আমরা যখন ট্যাক্সিতে উঠলাম তখন সবে ছ’টা বেজেছে ।

সারসংক্ষেপঃ

. ‘অনুস্বর’ বাদ দিয়ে সিকিমের যে মাত্র কয়েকটা জায়গা আছে, কালুক তার মধ্যে একটা । কালুক শহরটা বেশ ছোট – মধুচন্দ্রিমার পক্ষে বিশেষ সুন্দর ।
. নিউ জলপাইগুড়ি (শিলিগুড়ি) স্টেশন থেকে কালুকের দুরত্ব ১১৯ কিলোমিটার । এন জে পি থেকে গাড়ির ব্যবস্থা আছে – কালুক যেতে মোটামুটি পাঁচ – সাড়ে পাঁচ ঘন্টা লাগে । ছোট গাড়ির ভাড়া ৩,০০০ টাকা । বড় গাড়ির ভাড়া ৩,৫০০ টাকা ।
. কালুকে কিছু হোটেল আছে আর আছে কিছু রিসর্ট । এদের মধ্যে ঘন্‌ডে, রিনচেনপং আর ম্যান্ডারিন উল্লেখযোগ্য । আমরা ছিলাম ঘন্‌ডে রিসর্টে যার ওয়েবসাইট হল : http://www.ghondayresort.com/
. কালুকের প্রায় সব জায়গা থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায় । রিসর্টের ঘরের ভেতর থেকেও দেখা যায় ।
৫. কালুক থেকে সাইট-সিয়িং এর জন্য প্রধানতঃ দু'দিকে যাওয়া যায় - উত্তর-পশ্চিম আর দক্ষিণ । উত্তর-পশ্চিমে পেলিং এর দিকে কিছু দেখার জায়গা আছে - ছোটগাড়ির ভাড়া পড়ে ২,৫০০ টাকা । দক্ষিণে নামচির দিকে যেতে পড়ে ৩,০০০ টাকা ।
৬. এগুলো বাদ দিয়ে লোকাল সাইট-সিয়িং আছে যেটা দেখার জন্য গাড়ি ভাড়া না করে লোকাল গাড়িতেও ঘোরা যেতে পারে । গাড়ি ভাড়া করলে ৬০০ টাকা মতো পড়বে ।
৭. কালুকে ঘোরাঘুরি করার জন্য ড্রাইভার সুরেশ গুরুং এর সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে - ড্রাইভারের সঙ্গে সরাসরি কথা বললে গাড়িভাড়া কিছুটা কম করা যায় । সুরেশ গুরুং এর মোবাইল নম্বর - ৯৬৪৭৮৫৬১৯৫ ।
৮. কালুকে কেনাকাটার জন্য দোকানপাট নেই বললেই চলে - মাত্র একটা-দু'টো দোকানেই কিনে নিয়ে আসার মতো কিছু পাওয়া যায় ।

উপসংহারঃ

কাঞ্চনজঙ্ঘা
মধুচন্দ্রিমা যাপনের জন্য কালুক একটা খুব সুন্দর জায়গা - কিন্তু তার মানে এই নয় যে তাছাড়া এখানে যাওয়ার মানে হয় না । জায়গাটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা, তাই যারা বেশি লোকজনের ভীড় পছন্দ করে না, তাদের জন্য বিশেষ আকর্ষণীয় । দার্জিলিঙ, গ্যাংটক, কার্সিয়ং, কালিম্পং আর পেলিং এ যারা যেতে চায় না, তাদের পক্ষেও কালুক একটা ভালো দেখার জায়গা । এখানে তিনদিনের বেশি থাকার কোনও মানে হয় না, কারণ তাহলে হোটেলে বসে থাকা ছাড়া আর কিছুই করা যাবে না । হয়তো ধীরে ধীরে কালুকও ট্যুরিস্টদের ভীড়ে একসময়ে ঘিঞ্জি হয়ে যাবে - তখন আর এখনকার মতো মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করা যাবে না । কাঞ্চনজঙ্ঘার কোলে সিকিমের আরেকটা শহর দার্জিলিঙ বা গ্যাংটক হয়ে ওঠার আগে একবার কালুক ভ্রমণ করে আসাই ভালো !


কালুক ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here:

Sunday, March 25, 2012

কৃষ্ণনগর ভ্রমণ

কৃষ্ণনগর । কলকাতা থেকে রেলপথে দুরত্ব ঠিক ১০০ কিলোমিটার । আর সড়কপথে ১০৮ কিলোমিটার । মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের কৃষ্ণনগর । গোপালভাঁড়ের কৃষ্ণনগর । মাটির পুতুলের কৃষ্ণনগর । সরপুরিয়া-সরভাজার কৃষ্ণনগর । বাংলার ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা কৃষ্ণনগর । সেই কৃষ্ণনগর ভ্রমণ নিয়েই আমার ব্লগের এবারের পোস্ট ।

২৫ শে মার্চ, ২০১২ রবিবার সকালে একটা 'কৃষ্ণনগর সিটি জংশন' লোকাল ট্রেন ধরে আমরা গেছিলাম । সঙ্গী আমার স্ত্রী অমৃতা । সারাদিনে শিয়ালদহ থেকে কৃষ্ণনগর যাওয়ার অনেকগুলো ট্রেন চলে । ভাড়া ২০ টাকা । সপ্তাহের অন্যদিনে এই ট্রেনগুলো গ্যালপিং হলেও রবিবার সব স্টেশনে থামে । শিয়ালদহ থেকে কৃষ্ণনগর যেতে লাগে প্রায় পৌনে তিন ঘন্টা । কাজেই ট্রেনে বসতে পাওয়াটা খুব দরকারি । তবে যদি প্রথমে বসতে নাও পাওয়া যায়, নৈহাটীর পর থেকে মোটামুটি ফাঁকা হয়ে যায়ই ।

আমরা ধরেছিলাম সকাল ৯:৩৫ এর ট্রেন যেটা কৃষ্ণনগর পৌঁছল বেলা ১২:২০ তে । ট্রেন থেকে নেমে স্টেশনের বাইরে গিয়ে একটা সমস্যা হতে পারে যেটার সম্মুখীন আমরা হয়েছিলাম ।কৃষ্ণনগর জায়গাটা ঠিক ঘুরতে যাওয়ার জন্য প্রসিদ্ধ নয় । এর আগে ব্যান্ডেলে গিয়ে যেমন দেখেছিলাম রিক্সা আর অটোওয়ালারা আমাদের দেখেই 'চার্চ চার্চ' বা 'ইমামবাড়া ইমামবাড়া' বলে হেঁকেছিল, এবারে সেরকম হল না । আসলে কৃষ্ণনগর নদীয়া জেলার যাকে বলে সদর, এখানে প্রচুর লোক চাকরি করতে যায়, তাই এখানকার মানুষ অতিথিদের ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগী নয় ।

কিন্তু এরা আমাদের ব্যাপারে উদ্যোগী না হলে কি হবে, আমরা তো ঘুরতে গেছি । কাজেই উদ্যোগটা আমাদেরই নিতে হল । কৃষ্ণনগরে দেখার জায়গা বলতে প্রধানতঃ চারটে - রাজবাড়ি, ঘুর্ণি, ক্যাথলিক চার্চ আর কলেজ । এগুলো আমরা আগে থেকেই জেনে গেছিলাম । একজন স্থানীয় লোকের সঙ্গে কথা বলে এগুলোর কোনটা কিভাবে যাওয়া যায়, জেনে নিলাম । এদের মধ্যে কলেজটা 'কৃষ্ণনগর কলেজ' নামেই বিখ্যাত - এটা একটা বহু পুরনো কলেজ । কিন্তু রিক্সাওয়ালাকে বোঝাতেই পারলাম না আমরা ঠিক কোন কলেজটায় যেতে চাইছি । বারবারই বলতে থাকল "এখানে সব মিলিয়ে পাঁচটা কলেজ আছে, আপনারা কোথায় যেতে চান বলুন ।"

রাজবাড়ির প্রধান দরজা
কলেজ আমাদের লিস্ট থেকে বাদ দিতে হল । রিক্সা করে প্রথমে গেলাম রাজবাড়ি । নদীয়াধিপতি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের বিখ্যাত রাজপ্রাসাদ । পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বিরাট বড় রাজবাড়ি, কিন্তু ভেতরে ঢুকতে দেয় না । বাইরে থেকে ভেতরটা যতদূর দেখা যায় দেখলাম । রাজবাড়ি সংলগ্ন মাঠে কিছুদিনের মধ্যে একটা মেলা বসবে, তার প্রস্তুতি চলছে । এই মেলা হচ্ছে কৃষ্ণনগরের বিখ্যাত মেলা, প্রতি বছর এপ্রিল মাসে ১৫ দিনের জন্য বসে । এই সময়ে রাজবাড়ির দরজা সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয় । আরও জানলাম রাজবাড়িতে বর্তমানে কেউ থাকে না, রাজার বংশধর কলকাতায় থাকেন (কথা শুনে মনে হল এটা আন্দাজে বলছে, তবে এখানে সত্যি-মিথ্যে যাচাই করার কোনও উপায় নেই) আর মেলার সময়ে এখানে আসেন ।

দোকানে রাখা মাটির পুতুল
পরবর্তী গন্তব্য ঘুর্ণি । এখানেই কৃষ্ণনগরের জগদ্বিখ্যাত মাটির পুতুল তৈরি ও বিক্রি হয় । পাশাপাশি সার দেওয়া পরপর দোকান, সেখানে বসেই কারিগর তৈরি করছেন ও বিক্রি করছেন । সে এক দেখার মতো জিনিস ! কোনও ছাঁচ নেই, শুধু হাত ও নানারকম ছোটখাটো ছুরি চিমটে দিয়ে পরপর পুতুল তৈরি হয়ে চলেছে । দুর্গা, গণেশ, রাধাকৃষ্ণ, কালী, চৈতন্যদেব থেকে শুরু করে সাঁওতাল দম্পতি, গ্রামের ছেলে-বুড়ো, সব্জী বিক্রেতা, কামার, কুমোর সবার মুর্তিই তৈরি হয় । মাটির গয়নাও পাওয়া যায় । সব দোকানে প্রায় একই জিনিস পাওয়া যায়, কিন্তু তাও আমরা প্রত্যেকটা দোকান আলাদা আলাদা করে ঘুরে দেখলাম । হাতে অফুরন্ত সময় ছিলনা সেজন্য বেরিয়ে আসতে হল, তা না হলে আরও অনেকক্ষণ থাকতাম ।

এরপর রিক্সাওয়ালাকে বললাম আমাদের একটা খাবারের হোটেলে নিয়ে যেতে । ঘুর্ণির বাসস্ট্যান্ডটা বেশ বড়, রিক্সাওয়ালা আমাদের সেখানে একটা খাবারের হোটেলের সামনে ছেড়ে দিল । স্টেশন থেকে রাজবাড়ি হয়ে ঘুর্ণি ঘুরে এ'পর্যন্ত ছেড়ে দেওয়ার জন্য রিক্সাওয়ালা নিল মোট ৬০ টাকা । খাবারের হোটেলে ঢুকলাম । হোটেলটা সেরকম impressive কিছু নয়, পরিষ্কার - এ'টুকু বলা যায় । ভাত-ডাল আর একটা সব্জী - ১৫ টাকা । চিকেন ৬০ টাকা । একবারে যা ভাত দেয়, সেটা একজনের পক্ষে যথেষ্ট । আমাদের দু'জনের মোট বিল হল ১৫০ টাকা ।

এরপর আমাদের গন্তব্য চার্চ । হোটেলের সামনে থেকেই আরেকটা রিক্সা ধরে গেলাম চার্চে । এবারে ভাড়া নিল ১৫ টাকা । এই দুরত্বটার ভাড়া স্থানীয় লোকের জন্য ১০ টাকা, কিন্তু আমাদের থেকে ১৫ টাকাই নিল । একটা কথা এখানে লেখা দরকার যে কলকাতার তুলনায় কিন্তু কৃষ্ণনগরের রিক্সাভাড়া কম । ঘুর্ণির বাসস্ট্যান্ড থেকে চার্চের যা দুরত্ব, সেই দুরত্ব কলকাতায় কিছুতেই ১০ টাকায় যাওয়া যায় না ।

Christo Mandir এর ভেতরে
চার্চ দেখে মন ভরে গেল । এমনিতেই চার্চ জায়গাটা খুব পরিষ্কার আর শান্ত হয়, তাই চার্চের ভেতরে গেলে একটা অন্যরকম অনুভূতি হয় । সেটা ঈশ্বরে ভক্তি না থাকলেও হয় । এখানে প্রধান চার্চের পাশে আরেকটা ছোট চার্চ আছে, সেটার নাম Christo Mandir । প্রধান চার্চটা দুপুরে বন্ধ থাকে, বিকেল ৪ টের সময়ে খোলে । Christo Mandir সারাক্ষণ খোলা । এখানে জুতো পরে ঢোকা বা ছবি তোলার কোনও বিধিনিষেধ নেই, যেটা আছে সেটা একটা অনুরোধ - নীরবতা বজায় রাখার । বলাই বাহুল্য, সেটা অগ্রাহ্য করার কোনও প্রশ্নই ওঠে না । বিশাল একটা ছ'কোণা হলঘরের মতো জায়গা যার সমস্ত দেওয়াল জুড়ে যীশুর জীবনী । সিলিংটা গম্বুজের মতো, সেখানে আবার আকাশের তারার মতো নক্সা করা আছে । সব মিলিয়ে খুব সুন্দর ।

Christo Mandir এর বাইরে - কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার
এই Christo Mandir এর বাইরেটাও খুব অভিনব । কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার থেকে শুরু করে গান্ধীজির ডান্ডি অভিযান - সব কিছুরই বিশাল বিশাল মূর্তি আছে । এছাড়া আছে বিভিন্ন Saint দের মূর্তি । একটা চার্চে এরকম জিনিস আমরা কখনও দেখিনি । কিন্তু এগুলোর বিশেষত্ব কী, সেটা জানার কোনও উপায় নেই, কারণ ত্রিসীমানার মধ্যে আমরা দু'জন ছাড়া আর কোনও লোক নেই ।


এই Christo Mandir থেকে বেরিয়ে প্রধান চার্চে গেলাম । চার্চ বন্ধ, তবে কম্পাউন্ডের ভেতরে ঢোকা যায় । খুব সুন্দর করে ঘাস ছাঁটা একটা মাঠ, আর একপাশে সুন্দর ফুলের বাগান ।

ধাপের একেবারে ওপরে
এখান থেকে বেরিয়ে আরেকটা জায়গা আছে, সেটাকে কি বলা উচিৎ সেটা বলা মুস্কিল । দু'দিকে সিঁড়ির মতো উঠে গেছে যার ধাপে ধাপে crucifiction এর ঘটনাটার মূর্তি রাখা আছে । সিঁড়ি দিয়ে উঠে যেখানে পৌঁছনো যায়, সেখানে ক্রুশবিদ্ধ যীশুর একটা মূর্তি আছে ।





স্টেশন - ফেরার পথে
এবার ফেরার পালা । ২০ টাকা রিক্সাভাড়া দিয়ে চার্চ থেকে সোজা স্টেশনে চলে এলাম । ঘোরা মোটামুটি ভালই হয়েছে, শুধু বাকি আছে কৃষ্ণনগরের বিখ্যাত সরপুরিয়া-সরভাজা কেনা । স্টেশনের কাছে কোনও দোকান নেই, তাই আমাদের আবার কিছুটা হেঁটে শহরের দিকে যেতে হল । সেখানেও একটাই দোকান খোলা পাওয়া গেল । সরপুরিয়া-সরভাজা দু'টোরই দাম ৩০০ টাকা/কেজি ।


আমাদের ফেরার ট্রেনের সময় ছিল বিকেল ৪:২৫ ; মিষ্টি কিনে স্টেশনে এসে দেখলাম ট্রেন এসে গেছে । ট্রেন ছাড়ল যথাসময়ে । ফেরার পথে ট্রেনে সাংঘাতিক ভীড় হয়েছিল, সৌভাগ্যবশতঃ আমরা আগে থেকে উঠেছিলাম বলে বসতে পেয়েছিলাম । শিয়ালদহে ট্রেন পোঁছল সাতটার একটু পরে ।

সারসংক্ষেপঃ

১. কলকাতা থেকে রেলপথে ঠিক ১০০ কিলোমিটার দূরে কৃষ্ণনগর একটা বেশ সুন্দর দেখার জায়গা । ট্রেনে যাওয়ার খরচ সবচেয়ে কম, এছাড়া কলকাতা থেকে বাসে বা গাড়ি ভাড়া করেও যাওয়া যেতে পারে ।
২. জায়গাটা ঠিক ঘোরার জায়গা হিসেবে প্রসিদ্ধ নয়, তাই আগে থেকে একটু জেনে যাওয়ার দরকার যে এখানে কি কি দেখার জিনিস আছে, সেগুলোর কোনটা কোথায় আর কিভাবে যেতে হয় ।
৩. ২ জন ঘোরার জন্য রিক্সা হচ্ছে সবচেয়ে সুবিধেজনক । তবে লোকসংখ্যা বেশি হলে অটো ভাড়া করে নেওয়া যেতে পারে ।
৪. এখানে দেখার জায়গা বলতে রাজবাড়ি, কলেজ, ঘূর্ণি আর চার্চ । এর মধ্যে রাজবাড়ির ভেতরে ঢুকতে দেয় না ।
৫. ঘূর্ণি অবশ্যই দেখা উচিৎ । এখানকার মাটির পুতুল পৃথিবীবিখ্যাত আর তার কারণটা এখানে গেলে স্পষ্ট বোঝা যায় ।
৬. চার্চটা দুপুরে বন্ধ থাকে, বিকেল ৪ টেয় খোলে । চার্চের পাশে একটা Christo Mandir আছে যেটা সারাক্ষণ খোলা থাকে । এটা খুব বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ।
৭. খাওয়াদাওয়া এককথায় চলনসই । সাধারণ ভাতের হোটেল আছে অনেক, তবে তার চেয়ে বেশি ভালো রেস্টুরেন্ট আশা না করাই উচিৎ ।

উপসংহারঃ


কৃষ্ণনগর
কৃষ্ণনগর দেখার জায়গা হিসেবে খুব আকর্ষণীয় কিছু নয়, কাজেই 'না দেখলে জীবন অসম্পূর্ণ' - তা নয় কখনওই । কিন্তু যদি ছোটখাটো জায়গায় ঘোরার নেশা থাকে আর তার সঙ্গে 'একদিনে ঘুরে আসতে হবে' এরকম বাধ্যবাধকতা থাকে তাহলে এখানে যাওয়া যেতে পারে । অল্প টাকা খরচ হবে, আর যেটা হবে সেটা উশুল হয়ে যাবে এটা জোর দিয়ে বলাই যায় । মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের রাজধানী এই শহরে এমন অনেক কিছু আছে, যা দেখলে সেই সময়টাকে ছোঁওয়া যায় । কৃষ্ণনগর পর্যটককে হয়তো সেভাবে 'আকর্ষণ' করে না, কিন্তু beauty lies in the eyes of the beholder - এই কথাটা কৃষ্ণনগরের জন্য আশ্চর্যজনকভাবে সত্য !

কৃষ্ণনগর ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here:

Monday, February 13, 2012

চাঁদিপুর ভ্রমণ

দীর্ঘদিন পরে আবার ব্লগকে আপডেট্‌ করার সময় এসেছে । এবার গেছিলাম চাঁদিপুর । উড়িষ্যা আর পশ্চিমবঙ্গের সীমানা থেকে ঢিল ছোঁড়া দুরত্বে এই জায়গা কাজের চাপ থেকে মুক্তির স্বাদ পেতে দু'দিনের ঘোরার পক্ষে খুবই উপযুক্ত । আমাদের পুরো বেড়ানোটাই একটা গাইডের কাজ করবে, তাই আমাদের বেড়ানোর নির্ভেজাল বিবরণ দিতে শুরু করি ।

ট্রেনে যাওয়ার পথে
১১ই ফ্রেব্রুয়ারী, ২০১২ শনিবার আমাদের যাত্রা শুরু । কে কে গেছিলাম, তা আর বিস্তারিতভাবে লিখছি না কারণ একটা বাচ্চাসহ আমাদের দলের মোট সদস্য সংখ্যা ছিল ৩৪ ! এর মধ্যে ২৭ জন আমাদের অফিসের আর বাকিরা কয়েকজনের পরিবারের সদস্য । ট্রেনে চাঁদিপুর যাওয়ার জন্য বালেশ্বরে নামতে হয় । হাওড়া থেকে বালেশ্বর যাওয়ার অনেক ট্রেন আছে, আমরা 'ধৌলি এক্সপ্রেস' ঠিক করেছিলাম । 2S এর ভাড়া ৮৫ টাকা । এটা সকাল ছ'টায় হাওড়া থেকে ছাড়ে । স্লিপার ক্লাস নেই, বসে যেতে হয় । দুরত্বটা খুবই কম, মাত্র ২৩৪ কিলোমিটার, কাজেই সবাই মিলে হৈ হৈ করতে করতে গেলে বসে যাওয়াটা কষ্টকর তো নয়ই, বরং আনন্দের । ট্রেনে দরকার মতো খাবারদাবার সবই ওঠে, এছাড়া IRCTC র নিজস্ব প্যান্ট্রিও আছে ।

OTDC র বাস
ট্রেন পৌঁছনোর কথা ০৯:২৬ এ, আর আমাদের ট্রেন একেবারেই দেরি করেনি । বালেশ্বর থেকে চাঁদিপুরের দুরত্ব ১৬ কিলোমিটারের মতো - এই পথটা যাওয়ার জন্য স্টেশন থেকে অনেক গাড়ি পাওয়া যায় । চাঁদিপুরে অল্প কিছু হোটেল আছে, তবে থাকার জন্য শ্রেষ্ঠ জায়গা Orissa Tourism এর 'পান্থ নিবাস' - এই পান্থ নিবাসের নিজস্ব pick and drop এর ব্যবস্থা আছে, এরাই আমাদের স্টেশন থেকে হোটেল পর্যন্ত নিয়ে গেল । মাথাপিছু ভাড়া ৫০ টাকা । কয়েকটা Bolero আর একটা ১৩ সীট্‌ এর সিটি বাস এ করে প্রায় ত্রিশ মিনিট চলার পর আমরা এসে পৌঁছলাম আমাদের গন্তব্যস্থল - চাঁদিপুর এর পান্থ নিবাসে ।

পান্থ নিবাস-এ পৌঁছে
হোটেল (হ্যাঁ, নাম যাইই হোক, সুবিধের জন্য হোটেলই বলছি । আর শেক্সপীয়ার তো বলেইছেন 'নামে কি আসে যায় ?') দেখে সবারই পছন্দ হল । হওয়ার মতনই । বিরাট হোটেল, বিশাল ব্যবস্থা । সবথেকে আকর্ষণীয় ব্যাপার হল সমুদ্রের নৈকট্য । এই অংশে বিচ্‌টা হোটেলের নিজস্ব, এখানে বাইরের কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না । হোটেলের গেট থেকে বিচ্‌ পর্যন্ত হেঁটে খুব বেশি হলে দু'মিনিট লাগে । হোটেলের গেটের সামনে নিজস্ব বাগান আর একটা ছোট্ট জলাশয় আছে, সেখানে আবার একটা কচ্ছপ আছে । হোটেলের সামনের দিকের ঘরগুলো AC Delux ইত্যাদি ইত্যাদি । বলা বাহুল্য এই ঘরের সবগুলো থেকেই সমুদ্র দেখা যায় । আমাদের ঘরগুলো সাধারণ 2 Bed বা 4 Bed ঘর, সেগুলো, স্বভাবতই, অপেক্ষাকৃত কম ঘ্যাম । 2 Bed এর ভাড়া ৮০০ টাকা আর 4 Bed এর ভাড়া ১,০০০ টাকা ।

হোটেলের গোলাকার ব্যালকনি
রিসেপশনের ফর্ম্যালিটি মিটিয়ে আমরা একে একে ঘর দখল করলাম । আমরা ৪ জন দোতলায় একটা ঘরে ছিলাম । হোটেলের আকৃতিটা অদ্ভুত রকমের গোলাকার । এরকম গোল হোটেল আমি এর আগে কখনও দেখিনি । ব্যালকনির সামনে হোটেলের একটা বেশ বড় মাঠ আছে, যেখানে দোলনা, স্লিপ ইত্যাদি আছে । এছাড়া কিছু ফুলের গাছও আছে । সবমিলিয়ে একটা শান্ত নিরিবিলি আর পরিচ্ছন্ন ভাব যেটা একটা জায়গাকে ভাল লাগার জন্য বেশ উপযোগী ।

হাঁটুজলে হাঁটাহাঁটি
পোশাক পরিবর্তন করে এবার সমুদ্রে ঝাঁপানোর পালা । আগেই বলে রাখি চাঁদিপুরের প্রধান আকর্ষণ কিন্তু সমুদ্রের ঢেউ বা সমুদ্রে চান করা নয় । (আকর্ষণটা কি, সেটা যথাসময়ে বলব) চান করতে গিয়ে দেখলাম জলে কোনও ঢেউ নেই বললেই চলে, গভীরতাও খুব কম । হাঁটু জলকে কোমর পর্যন্ত তুলতে প্রায় তিন-চারশ' মিটার হেঁটে ফেললাম, আর তারপর এক কিলোমিটার হেঁটেও সেই জল আর কোমরের ওপরে উঠল না ! (মনে হচ্ছিল হাঁটতে হাঁটতে আন্দামানও পৌঁছে গেলেও, জলের গভীরতা একই থাকবে !) ঘন্টাদুয়েক কোমরজলে ঘোরাঘুরি (এটাই সঠিক শব্দ) করে তারপর ফিরে এলাম । এরপর হোটেলে আরেকদফা চান ।

বিশাল ডাইনিং রুমে খাওয়াদাওয়া
পান্থনিবাসের নিজস্ব খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা আছে । ডিম, মাছ, মাংস সবই পাওয়া যায় । তবে variety খুব কম । মাছ বলতে পোনা বা পমফ্রেট আর মাংস বলতে শুধু মুরগী । পাঁঠার মাংস পাওয়া সম্ভব একমাত্র যদি সেটা ৩৪ জনের সবার জন্যই অর্ডার দেওয়া হয় । আমরা আর সে'চেষ্টা করিনি । আমাদের প্রথমদিন দুপুরের খাবার কলকাতা থেকেই অর্ডার দেওয়া ছিল, তাই সেই নিয়ে কোনও সমস্যায় পড়তে হয়নি । হোটেলের ডাইনিং হলটা বিরাট আর আমরা একটা বড় দল ছিলাম বলে আমাদের খাবার ওরা সবসময়েই ব্যুফে দিত । অর্থাৎ, মাছ বা মাংস নির্দিষ্ট পরিমাণে পাওয়া যেত, কিন্তু সেটা ছাড়া ডাল আলুভাজা তরকারি চাটনি পাঁপড় সবই অফুরন্তভাবে পাওয়া যেত । এখানে একটা কথা জানিয়ে রাখি, হোটেলের রান্নাকে চলনসই বললেই ঠিক বলা হয়, ভালোর পর্যায়ে পড়ে না । কিন্তু যেহেতু আমাদের হাতে আর কোনও বিকল্প নেই, কাজেই এতেই চালাতে হবে । খাবারের রেট হল - পোনামাছভাত ৯০ টাকা, মাংসভাত ১১০ টাকা ।

এরপর দুপুরে অনেকেই নিজের ঘরে চলে গেল । কিছু লোক সমুদ্রের ধারে বেড়াতে গেল আর আমরা কয়েকজন সামনের মাঠটায় গিয়ে বসলাম । এর আগে আরেকটা দরকারি কাজ সেরে আসা হয়েছে সেটা হল ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করে আমাদের দু'দিনের খাওয়াদাওয়া এবং ঘোরার একটা প্ল্যান করা । আমাদের এই ট্রিপের ম্যানেজার ছিল কঙ্কনাদি যার অসামান্য ভালো ম্যানেজমেন্ট স্কিল এই ট্রিপের সাফল্যের অন্যতম কারণ । আমি নিজে ছিলাম ফান্ড ম্যানেজার কাম অ্যাকাউনটেন্ট ।

বহুদূরে সমুদ্র
সমস্তকিছু নিখুঁতভাবে প্ল্যান করে আমরা গেলাম সমুদ্রের ধারে । কিন্তু কোথায় সমুদ্র ? দিগন্তরেখা পর্যন্ত যতদূর চোখ যায় শুধু বালি আর বালি ! সেই বালি কিন্তু নরম বালি নয়, শক্ত ভিজে বালি । হ্যাঁ, এটাই চাঁদিপুরের প্রধান আকর্ষণ । এখানে ভাঁটার সময়ে সমুদ্র পাড় থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে চলে যায় । পাড় থেকে আর জলের রেখা দেখাও যায় না । জোয়ারভাঁটার মধ্যে এই বিশাল পার্থক্যটা আমি যতদূর শুনেছি সারা ভারতবর্ষে আর কোথাও নেই, সারা পৃথিবীতেও আর শুধুমাত্র অস্ট্রেলিয়ায় এক জায়গায় আছে । বিকেল সাড়ে চারটে বাজে, সূর্য ক্রমশঃ দিগন্তের দিকে ঢলে পড়ছে, এর পরে হলে আর এই বিচে হাঁটা যাবে না, তাই আমরা কয়েকজন জলের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম । ৩ কিলোমিটার শক্ত বালির ওপর হেঁটে চলা সহজ নয়, আর মাঝে মাঝে গোড়ালি ডোবানো জমা জল কাজটাকে আরও কঠিন করে দেয়। তাও পাড় থেকে এক-দেড় কিলোমিটার মতো এগিয়ে আমরা আবার হোটেলে ফিরে এলাম ।

লে পাগলু ডান্স ডান্স ডান্স !
হোটেলে বিকেলে চা আর তার সঙ্গে পিঁয়াজি অর্ডার দেওয়া হয়েছিল । একপ্লেট পিঁয়াজি চারজনের জন্য যথেষ্ট, তবে আমরা ১ : ২ অনুপাতে অর্ডার দেওয়ায় অনেক বেশি হয়ে গেছিল । এরপর ঠিক হল এই মাঠের একটা অংশে Bonfire করা হবে । হোটেলের লোকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল যে তাদের কোনও অসুবিধে নেই । তারাই খুব কম সময়ের মধ্যে কাঠ আর music system এর ব্যবস্থা করে দিল । এর জন্য আমাদের মোট ৮০০ টাকা লাগল । ঘন্টাখানেকের মধ্যেই সবাই তৈরি হয়ে নিল 'সাংস্কৃতিক নৃত্যানুষ্ঠান'-এ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করার জন্য । আর তারপর - 'লে পাগলু ডান্স ডান্স ডান্স' !

পূর্ণচন্দ্র - রাত সাড়ে এগারোটা
আমি বিচ্‌ এ গিয়ে বসলাম । সাধারণতঃ সমুদ্রের ধারে বেড়াতে গেলে আমি সন্ধ্যেবেলা যতটা সম্ভব সময় একা বিচ্‌ এ বসে কাটানোর চেষ্টা করি, এবারেও সেটা করলাম । পাড়ে যে স্ট্রীটলাইটগুলো আছে, সেগুলোর রেঞ্জ খুব বেশি নয় । আমি বালির ওপর বসে ছিলাম আর তখন, আক্ষরিক অর্থেই ত্রিসীমানার মধ্যে কেউ নেই । হঠাৎ স্ট্রীটলাইটগুলো নিভিয়ে দেওয়া হল (দু'দিনের অভিজ্ঞতায় দেখেছিলাম ওগুলো ঠিক রাত ৮টার সময়ে নেভানো হয়) - যার ফলে চারপাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেল । আমার একটু সমস্যা হল কারণ আমি বসেছিলাম হোটেলের মেইনগেট থেকে কিছুটা দূরে, তাই মোবাইলের টর্চ জ্বেলে আস্তে আস্তে ফিরে এলাম । তারপর এমন একটা জায়গায় বসলাম যেখানে হোটেলের আলো কিছুটা হলেও এসে পৌঁছয় । রাত ন'টার সময়ে হোটেলে ফিরে এলাম । বলা বাহুল্য, তখনও 'অনুষ্ঠান' চলছে । এরপর সাড়ে দশটায় ডিনার । অর্ডার আগেই দেওয়া ছিল, আর আমাদের সুবিধের জন্য এবার ওরা খাবার মাঠেই সার্ভ করল ।সবকিছু মিটতে মিটতে এগারোটা বেজে গেল । তারপর আমরা অনেকে আবার বিচ্‌এ গিয়ে বসলাম । আমরা গেছিলাম পুর্ণিমার দু'দিন পরে, কাজেই পূর্ণচন্দ্রও দেখা গেল ।

হোটেলে ফিরলাম তখন বারোটা । পরেরদিন সকাল ছ'টা আঠারোয় সূর্যোদয়, ঠিকসময়ে অ্যালার্ম দিয়ে শুয়ে পড়লাম ।

সূর্যোদয়ের কিছুক্ষণ পরে
১২ই ফ্রেব্রুয়ারী, রবিবার সকাল ছ'টায় উঠে গেলাম বিচ্‌ এ । আকাশের অবস্থা দেখেই মনে হল সূর্যোদয় দেখা যাবে না, কারণ মেঘ করে ছিল । বেশ কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে চলে এলাম । হোটেল থেকে ঘরে ঘরে চা দেয় আর এই চা টা complementary । এরপর আমরা ব্রেকফাস্ট করলাম ডাইনিং হল-এ । এটাও complementary । ব্রেকফাস্টের দু'রকম option আছে, লুচি-তরকারি আর পাঁউরুটি টোস্ট ।

এরপর আবার সমুদ্র । আগেরদিনের থেকে নতুন কিছু নেই, তাই আর পুনরাবৃত্তি করছি না । বরং দুপুরে খাওয়ার পর ২ টোর সময়ে sightseeing করতে বেরোলাম, সেটার কথা বলি । এ'ক্ষেত্রেও হোটেল থেকেই গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছিল । পান্থ নিবাসের নিজস্ব গাড়িগুলো করেই আমরা ঘুরতে বেরিয়েছিলাম । ওরা মোট চারটে জায়গা দেখায়, ভাড়া মাথাপিছু ২৫০ টাকা ।

বুড়িবালাম এর তীরে
প্রথম গন্তব্য বুড়িবালাম । আমাদের হোটেল থেকে ৩ কিলোমিটার মত দূরে জায়গাটা আপাতভাবে একটা নদীর ধার - এখান থেকে মাছ ধরার ট্রলার ছাড়ে । ঐতিহাসিক গুরুত্ব হচ্ছে এখানে বিপ্লবী বাঘা যতীন (যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়) ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন । জায়গাটায় দেখার সেরকম কিছুই নেই, দশ মিনিটের বেশি সময় দেওয়ার কোনও মানেই হয় না ।

এই জলস্রোতের নিচেই পঞ্চলিঙ্গেশ্বর


পরবর্তী দেখার জায়গা পঞ্চলিঙ্গেশ্বর । ৪৮ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের ওপর মন্দির । যেতে সময় লাগল ১ ঘন্টা ২০ মিনিটের মতো । এখানে পাহাড়ের ওপরে উঠতে ২৮৬ টা সিঁড়ি (এটা আমাদের ড্রাইভার কাম গাইড বলল, আমরা কেউই গুনিনি) ভাঙতে হয় । তবে কাজটা সেরকম কঠিন কিছু না । সব জায়গাতেই বসার ব্যবস্থা আছে, কাজেই ওঠার ফাঁকে জিরিয়ে নেওয়া যেতে পারে । ওঠার পথের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে চোখ জুড়িয়ে যায় । পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানে একটা ছোট্ট ঝরনার জলের নিচে পাঁচটা শিবলিঙ্গ আছে (প্রকৃতপক্ষে পাঁচটা বিভিন্ন আকারের এবড়োখেবড়ো পাথর, সেগুলোকেই শিবলিঙ্গ বলা হয়) যেগুলো জলের নিচে থাকায় ওপর থেকে দেখা যায় না, শুধু 'হাত দিয়ে অনুভব' করা যায় । এখানে পুজো দেওয়ার ব্যবস্থাও আছে, যথারীতি ।

সেই বাঁদর - মাল লুট করার পরে
নামার সময়ে একটা ঘটনা ঘটল যেটার জন্য আমরা কেউই তৈরি ছিলাম না । আমাদের দলের সঙ্ঘমিত্রার হাতের প্যাকেটে পুজোর প্রসাদ (প্রধানতঃ কলা) দেখে হঠাৎ একটা বাঁদর ওকে আক্রমণ করল । ব্যাপারটা এতটাই দ্রুত ঘটল যে কেউ কিছু react করার আগেই দেখা গেল প্যাকেট বাঁদরের কব্জায় ! আশেপাশের স্থানীয় লোকজনের প্রতিক্রিয়া দেখে বুঝলাম এরকম ঘটনা ওখানে নতুন নয় । তাই যাদের হাতে পুজোর প্রসাদ থাকবে, তাদের বলছি 'সাবধান' !

নীলাগিরির মন্দির
এরপর নীলাগিরি । দুরত্ব ১০ কিলোমিটার, যেতে লাগল আরও ২০ মিনিট মতো । এখানে একটা জগন্নাথের মন্দির আছে আর তার পাশে আছে এখানকার রাজার বাড়ি । বাড়ির কিছুটা অংশ ভাঙ্গা - পোড়োবাড়ির মতো, আর কিছুটা অংশ মেরামত করে এখনকার রাজা থাকেন । আমাদের দলের কয়েকজন 'রাজার সঙ্গে দেখা করে আসি' বলে সেদিকে এগিয়েছিল, কিন্তু ব্যাপারটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে বলে তাদের নিরস্ত করা হল । এই রাজবাড়ির পাশেই আছে নীলাগিরি পাহাড়, যেটার একেবারে ওপরে না হলেও অনেকদূর পর্যন্ত ট্রেকিং করে ওঠা যায় ।

শ্রী চৈতন্যদেবের পায়ের ছাপ - এটা আসল
সন্ধ্যে প্রায় ছ'টা বাজে । নীলাগিরির সামনে কিছু চায়ের দোকান আছে । আমরা চা-টা খেয়ে নিয়ে এগিয়ে গেলাম আমাদের পরবর্তী তথা শেষ গন্তব্য - রেমুনা । ৯ কিলোমিটার দুরত্ব, ৩০ মিনিট লাগল । এখানকার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানেও একটা জগন্নাথের মন্দির আছে । এই মন্দিরে শ্রী চৈতন্যদেবের দু'জোড়া পায়ের ছাপ রাখা আছে - একটা আসল আরেকটা নকল । ('নকল পায়ের ছাপ ব্যাপারটা আসলে কি, বুঝলাম না । তবে দলের সকলকে বলা হল 'নকল হইতে সাবধান' !) এখানকার সবথেকে বড় আকর্ষণ হল এখানে অত্যন্ত (পড়ার সময়ে 'অত্‌ত্‌ত্‌ত্যন্ত' পড়া উচিৎ !) উৎকৃষ্ট মানের ক্ষীর পাওয়া যায় । দাম ১০ টাকা, ২০ টাকা আর ৪০ টাকা । আমরা বেশ কিছু কিনলাম । কিছু বাড়ি নিয়ে আসার সঙ্কল্প করা হল আর কিছু ফেরার পথেই খেয়ে নেওয়া হল ।

ব্যালকনি থেকে
Sightseeing শেষ । এরপর সোজা হোটেল । ঘড়ি বলছে সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা । সারাদিন ঘোরা হয়েছে, তবে সেরকম কিছু পরিশ্রম হয়নি । তাই লোকজনের প্রবল উৎসাহে হোটেলে ফিরে এসে আবার নাচানাচির ব্যবস্থা করা হল । তবে আজ আর আগুন জ্বালানো হল না, শুধু music system ভাড়া করে নাচা হল । রাত সাড়ে দশটায় ডিনার । আজ আমাদের চাঁদিপুরে শেষ রাত্রি, তাই ডিনারে বিশেষ মেনু রাখা হয়েছিল । মিক্স্‌ড ফ্রাইড রাইস, মিক্স্‌ড চাউমিন আর চিলি চিকেন । যারা চিকেন খায় না তাদের জন্য চিলি পনীর । এর রেট ছিল ১২০ টাকা করে ।

বেড়ানোর (এবং post এর ও !) মোটামুটি শেষের দিকে চলে এসেছি, কাল সকালেই আমরা এখান থেকে পাততাড়ি গোটাব, তাই ডিনারের পরে ম্যানেজারের সঙ্গে formality গুলো সেরে নিলাম । যাবতীয় হিসেবপত্র করে full and final payment করতে একঘন্টা সময় লাগল । তারপর কিছুক্ষণ বিচ্‌ এ গিয়ে বসলাম । হোটেল থেকে বিচ্‌ এ যাওয়ার পথে যে লোহার গেটটা আছে সেটা রাত একটায় বন্ধ হয়, আর বন্ধ হলেও সেটা টপকে অনায়াসে যাতায়াত করা চলে ।

ঝাউবন
১৩ই ফ্রেব্রুয়ারী, সোমবার - আমাদের ফেরার দিন । সকালে আরেকবার সূর্যোদয় দেখার ব্যর্থ চেষ্টা করে আমরা বিচ্‌ ধরে হাঁটতে শুরু করলাম । প্রায় তিন কিলোমিটার হাঁটার পর একটা ঝাউবন পড়ে যেটা বেশ সুন্দর । চাঁদিপুরের বিচ্‌ এ আরেকটা জিনিস অফুরন্ত পাওয়া যায়, সেটা হচ্ছে গোটা ঝিনুক । বিভিন্ন আকারের বিভিন্ন রঙের অসংখ্য ঝিনুক পাওয়া যায় যা কুড়িয়ে কুড়িয়ে শেষ হওয়ার নয় ।

বালেশ্বর স্টেশন
হোটেলের চেক-আউটের সময় সকাল ৮ টা । আমাদের ফেরার ট্রেন ইস্ট কোস্ট এক্সপ্রেস এর সময় সকাল ১১:৪২, তাই হোটেল থেকে সাড়ে দশটায় বেরোনোই যথেষ্ট । এই সময়টুকু যেকোনো হোটেলই থাকতে দেয় আর বিশেষ করে যখন এটা season নয় । চানটান করে আমরা সকাল সাড়ে ন'টার মধ্যে ঘর ছেড়ে দিলাম । তারপর ব্রেকফাস্ট করে গাড়িতে উঠলাম । এই গাড়ি আমাদের বালেশ্বর স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দেবে । আমাদের আগে থেকেই হোটেলে বলা ছিল - পোলাও আর মাংস লাঞ্চ প্যাক করিয়ে নিয়েছিলাম । সেইসব নিয়ে স্টেশনে এসে পৌঁছলাম তখন এগারোটা ।

ইস্ট কোস্ট এক্সপ্রেস । স্লিপার ক্লাস, ভাড়া ১৩২ টাকা । লেট করার ব্যাপারে ইস্ট কোস্ট এক্সপ্রেসের বেশ সুনাম আছে, কিন্তু আমাদের বেলায় সৌভাগ্যবশতঃ সেই সুনাম বজায় রইল না । মাত্র দশ মিনিট দেরিতে ট্রেন এল আর খুব আশ্চর্যজনকভাবে বেশ কিছুটা before time এ পৌঁছে দিল । বিকেল চারটেয় আমরা হাওড়ায় আর তারপর ... যে যার নিজস্ব ডেরায় !

সারসংক্ষেপঃ

১. কলকাতা থেকে খুবই কাছের সমুদ্রতট যেগুলো আছে, চাঁদিপুর তাদের মধ্যে অন্যতম । নিরিবিলি আর শান্ত পরিবেশে সমুদ্র দেখতে চাইলে চাঁদিপুর একটা বেশ ভালো option ।
২. হাওড়া থেকে বালেশ্বর পর্যন্ত কোনও ট্রেনে গিয়ে বাকিটা গাড়িতে যেতে হয় ।
৩. থাকার জায়গা হিসেবে OTDC পান্থ নিবাস খুবই ভালো । এছাড়া আরও কিছু হোটেল আছে তবে সেগুলো ততটা ভালো নয় । পান্থ নিবাসের ভেতরে একটা SBI ATM আছে ।
৪. পান্থ নিবাস থেকে complementary বেড-টী এবং ব্রেকফাস্ট দেওয়া হয় । এখানকার খাবারের মান খুব উন্নত কিছু নয়, তবে এই এলাকায় সবচেয়ে ভালো ।
৫. পান্থ নিবাস থেকে বিচ্‌ খুবই কাছে । বিচ্‌টা পান্থ নিবাসের নিজস্ব, তাই বাইরের লোকের উৎপাত একেবারেই নেই ।
৬. চাঁদিপুরের সমুদ্র চান করার পক্ষে খুব একটা উপযোগী নয়, তবে এখানে ভাঁটার সময়ে জল অনেকদূর চলে যায়, যেটা একটা ভালো দেখার জিনিস ।
৭. চাঁদিপুরে যে অল্প কয়েকটা ঘোরার জায়গা আছে তার মধ্যে পঞ্চলিঙ্গেশ্বর, নীলাগিরি আর রেমুনা উল্লেখযোগ্য । ঘোরার জন্য গাড়ির ব্যবস্থা পান্থ নিবাস থেকেই করা যায় । মাথাপিছু ২৫০ টাকা ।
৮. যাদের ঘুরতে গিয়ে কেনাকাটা করার অভ্যেস আছে, তাদের জন্য চাঁদিপুরে প্রায় কিছুই পাওয়া যাবে না । এখানে সবমিলিয়ে ৬ টা দোকান আছে আর সেখানে ঝিনুকের বা প্লাস্টিকের যা যা পাওয়া যায়, তার কোনওটাই এখানে তৈরি নয় (এই তথ্য আমি স্বয়ং দোকানদারের থেকে পেয়েছি !), সবই ভুবনেশ্বর বা কলকাতা থেকে আনানো ।
৯. পান্থ নিবাসের যোগাযোগঃ B. K. Pattajoshi - Ph: 91-6782-270051/270151 Mo: +91-9437190368. এছাড়া কলকাতা থেকে যোগাযোগ করার জন্য Orissa Tourism Development Corporation - Ph: (033)22654556.

উপসংহারঃ

চাঁদিপুর বিচ্‌
Weekend এ ঘোরার পক্ষে চাঁদিপুর খুব আদর্শ জায়গা । OTDC র নিজস্ব ব্যবস্থায় এখানে যে সুন্দর পর্যটন গড়ে উঠেছে তার সৌন্দর্য অন্য কোনও জায়গার সঙ্গে তুলনীয় নয় । এখানে ভাঁটার সময়ে সমুদ্র বহুদূরে চলে যায়, পাড় থেকে তাকে দেখা যায় না । এটাই এই জায়গার প্রধান আকর্ষণ । আশেপাশে কয়েকটা জায়গা আছে যেখানে ইচ্ছে হলে ঘুরতে যাওয়া যেতে পারে, কিন্তু কোনওটাই 'must visit' নয় । শান্ত পরিবেশে নিজেকে আর নিজের খুব কাছের কাউকে সময় দেওয়ার জন্য চাঁদিপুর খুব ideal জায়গা । এখানে প্রায় কিছুই নেই, কিন্তু তার মধ্যেও এমন কিছু আছে যার স্বাদ যারা একবার পাবে, চাঁদিপুর তাদের বারবার টেনে নিয়ে যাবে - এটা হল্‌ফ্‌ করে বলা যায় !


চাঁদিপুর ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here: