আমি ব্লগ লেখার খুব বেশি সমর্থক কোনওদিনও ছিলাম না, সত্যি কথা বলতে কি এখনও যে আছি তা নয় । তার একটা প্রধান কারণ আমার ধারণা ব্লগ লেখার থেকেও পড়া অনেক বেশি ক্লান্তিকর । অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অনেক সময়ই পড়তে শুরু করে শেষ করা হয়ে ওঠে না । নিজের ধৈর্য এবং/অথবা আগ্রহের অভাবকে 'ঠিক আছে, বাকিটা পরে পড়ব' জাতীয় অজুহাত দিয়ে ঢেকে দিই - আর আমরা সবাই জানি সেই 'পরে' টা আর কখনওই আসে না । তো, এই কারণে আমি ঠিক করেছি আমার ব্লগকে কখনওই অন্যের ক্লান্তির কারণ ঘটাব না, আমার ব্লগের বিষয় হবে প্রধানতঃ ভ্রমণ । আমার মতো যেসব বাঙালিরা ঘুরতে ভালোবাসে, তাদের জন্য আমার ব্লগ হবে তথ্যের একটা উৎস । আমার নিজের একটা অভ্যেস আছে, কোনও জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার আগে সেই জায়গাটা সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, আর ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে আমার বরাবরই মনে হয়েছে যে ইন্টারনেটে লেখালেখি করার ব্যাপারে বাঙালিদের থেকে কুঁড়ে খুব কম শিক্ষিত জাতই আছে । আমার মতো যেসব বাঙালিরা আছে, যারা ইন্টারনেটে কোনো একটা ইংরিজীতে লেখা দেখলেই না পড়ার চেষ্টা করে, তাদের জন্য আমার ব্লগ সহায়ক হবে, এই বিশ্বাস নিয়ে শুরু করছি আমার ভ্রমণকাহিনী । আগেই বলে রাখি, আমি স্ট্যাটিসটিক্সের ছাত্র ছিলাম, তাই আমার ব্লগে তত্ত্বের থেকে তথ্যের দেখাই মিলবে বেশি ।

Friday, June 7, 2013

শিলং ভ্রমণ

'প্যারাডাইস্‌ আনএক্সপ্লোর্ড' কাকে বলে ? আমরা অনেকেই জানি না এর দ্বারা ভারতের নর্থ-ইস্টের সাতটা রাজ্যকে বোঝায় । সেই সাতটা রাজ্য যাদের নাম চট্‌ করে বলতে গেলে একটা-দু'টো বাদ চলে যায় । সেই সাতটা রাজ্য আমাদের কাছে যাদের অস্তিত্ব শুধু জঙ্গী হামলার খবরে । সেই সাতটা রাজ্যের দু'টোতে আমাদের এবারের ভ্রমণ - মেঘালয়ের শিলং আর আসামের গুয়াহাটি ।

গুয়াহাটী যাওয়ার পথে
১লা জুন, ২০১৩ - শনিবার । হাওড়া স্টেশন থেকে সরাইঘাট এক্সপ্রেস । শিলং পর্যন্ত ট্রেন যায় না, সবচেয়ে কাছের রেলস্টেশন গুয়াহাটি । হাওড়া বা কলকাতা থেকে গুয়াহাটি যাওয়ার সবথেকে ভালো ট্রেন সরাইঘাট এক্সপ্রেস । ছাড়ে দুপুর ৩ : ৫০ এ । আমি, আমার স্ত্রী, বাবা, মা, আমার বড়মাসি আর মেসোমশাই । ছ'জন থাকায় আমরা ট্রেনের একটা ছ'জনের জায়গার পুরোটাই পেয়েছিলাম । এরকম একটা জায়গায় হৈ হৈ করতে করতে যাওয়ার মজাই আলাদা ! গুয়াহাটি যাওয়ার পথটা কিন্তু খুব অন্যরকম । নিউ কোচবিহার পেরোনোর পর পথের দু'ধার জুড়ে মাঝে মাঝে পাহাড় । কখনও দূরে পাহাড়ের মাথায় মেঘ । রেললাইন কখনও মাটি থেকে অনেক ওপরে উঠে যাচ্ছে, কখনও সমতলে নেমে আসছে । মাঝে মাঝেই হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলো পায়ের নিচ দিয়ে চলে যাচ্ছে ।

ব্রহ্মপুত্রের উপর নরনারায়ণ সেতু
গুয়াহাটী যাওয়ার পথে একটা প্রধান আকর্ষণ হল ব্রহ্মপুত্রের ওপর দিয়ে রেলব্রীজ । এই ব্রীজের নাম নরনারায়ণ সেতু । ২.২ কিলোমিটার চওড়া এই ব্রীজের ওপর দিয়ে যখন ট্রেন যায় তখন নিচের ব্রহ্মপুত্রকে দেখতে অসাধারণ লাগে । এই ব্রীজের আরেকটা বৈশিষ্ট্য হল এটা ডাবল্‌ - ডেক ব্রীজ অর্থাৎ রেল ও সড়ক দু'রকম পরিবহনের ব্যবস্থা আছে ।


গুয়াহাটী স্টেশন
আমরা গুয়াহাটি পৌঁছলাম সকাল ন'টা নাগাদ । স্টেশন থেকে বেরিয়েই সামনে গাড়ির স্ট্যান্ড - এখান থেকে আসাম বা মেঘালয়ের বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার জন্য গাড়ি পাওয়া যায় । শিলং যাওয়ার জন্য গাড়ি ভাড়াও করা যেতে পারে অথবা শেয়ারেও যাওয়া যেতে পারে । আমরা বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে বাসের খোঁজ করে জানলাম ওই সময়ে ওখান থেকে শিলং-এর কোনও বাস নেই । আমরা একটা শেয়ারের সুমো নিলাম । মাথাপিছু পড়ল ১৭০/- ।

গাড়িতে শিলং যাওয়ার পথে
পশ্চিমবঙ্গ বা সিকিমের কোথাও বেড়াতে গেলে আমরা সাধারণতঃ ট্রেন থেকে নেমে আরও উত্তর দিকে এগিয়ে যাই । শিলং কিন্তু গুয়াহাটির দক্ষিণে । কাজেই, এখানে একটা আন-কনভেনশনাল ব্যাপার আছে । গুয়াহাটি থেকে শিলং-এর ১০৫ কিলোমিটার রাস্তা এমনিও খুব সুন্দর । আমি এর আগে পাহাড়ী রাস্তা যেরকম দেখেছি এই রাস্তাটা কিন্তু একেবারেই সেরকম নয় । প্রথমতঃ অনেকটা পর্যন্ত রাস্তাটা ডাবল্‌ওয়ে । রাস্তার দু'দিকের প্রকৃতি অত্যন্ত মনোরম । একেবারে শেষ অংশটা বাদ দিলে প্রায় কোথাওই রাস্তার একদিকে পাহাড় আর অন্যদিকে খাদ - এই চিরাচরিত ব্যাপারটা নেই ।

পুলিশ বাজার @ শিলং
আমাদের গাড়ি ছেড়েছিল সাড়ে দশটায় আর আমরা শিলং পৌঁছলাম দেড়টার একটু পরে । শিলং শহরের প্রাণকেন্দ্র বলা যেতে পারে পুলিশবাজার - এখানে প্রচুর হোটেল আছে । লোকজনকে জিজ্ঞেস করে আমরা আমাদের 'হিল স্টার হোটেল'- এ পৌঁছে গেলাম । আমাদের একটা টু-বেড আর একটা ফোর বেড রুম বুক করা ছিল । ভাড়া যথাক্রমে ৭০০/- ও ১,২০০/- ঘরগুলো দারুণ কিছু নয়, তবে দিব্যি থাকা যায় । ঘরে টিভি আর বাথরুমে গিজার আছে । হোটেলে পোঁছে দুপুরের খাওয়াদাওয়া সেরে নিলাম । হিল স্টার হোটেলের খাবার বেশ উন্নতমানের এবং দাম বেশ কম । ছ'জনের মিলিয়ে আমাদের পড়ল মোট ৫৩০/- ।

শিলং শহর - হোটেলের ব্যালকনি থেকে
প্রথমদিন কোথাও ঘোরার নেই - বিকেলে বেরোলাম পরেরদিনের ঘোরাঘুরির ব্যবস্থা করতে । শিলং থেকে যাওয়ার জায়গা বলতে প্রধানতঃ চেরাপুঞ্জি - এছাড়া নারটিয়াং-ও যাওয়া যেতে পারে । এর সঙ্গে আছে শিলং-এর লোক্যাল সাইটসিয়িং । ঘোরাঘুরির জন্য সবথেকে ভালো ব্যবস্থা হচ্ছে এম টি ডি সি-র (মেঘালয় ট্যুরিজম্‌ ডেভেলপ্‌মেন্ট কর্পোরেশন) বাস । পুলিশ বাজারেই এম টি ডি সি-র অফিস, এখান থেকে বিভিন্নদিন ঘোরাঘুরির জন্য বাসের টিকিট পাওয়া যায় । বড় গ্রুপ থাকলে এদের কাছ থেকে গাড়ি বা বাস বুকিং-ও করা যেতে পারে । আমরা পরেরদিন অর্থাৎ সোমবার চেরাপুঞ্জি যাওয়া আর মঙ্গলবার লোক্যাল সাইটসিয়িং করা ঠিক করলাম । চেরাপুঞ্জির জন্য টিকিটের দাম মাথাপিছু ২৩০/- আর লোক্যাল এর জন্য মাথাপিছু ২০০/- সবমিলিয়ে আমাদের পড়ল ২,৫৮০/- যেটা যথেষ্টই কম । পরে খোঁজ নিয়ে দেখেছিলাম যে নিজেরা গাড়ি ভাড়া করে এই ঘোরাঘুরি করতে গেলে আমাদের ৫,০০০/- পড়ে যেত ।

রাতের শিলং - হোটেলের ব্যালকনি থেকে
শিলং কিছুটা হলেও গন্ডগোলের জায়গা - চেনাজানা অনেকেই আমাদের সাবধান করে দিয়েছিল যে সন্ধ্যে সাতটার পরে যেন আর রাস্তায় না থাকি । আমাদের ফিরতে ফিরতে সাতটা বেজে গেল । খেয়াল করলাম এর মধ্যেই রাস্তায় লোকচলাচল কমে গেছে আর দোকানগুলোর অনেকগুলোই বন্ধ হয়ে গেছে । শিলং-এ সবথেকে বেশি যেটা চোখে পড়ে সেটা হচ্ছে রাস্তায় পুলিশ আর মিলিটারির লোকের আধিক্য । কলকাতায় বনধ্এর দিন বা পুজোর দিনে যেরকম পুলিশ প্রশাসনের লোক দেখতে পাওয়া যায়, শিলং-এ সবসময়েই তত পুলিশ থাকে । রাতে আমরা হোটেল থেকেই খাওয়া দাওয়া সেরে নিলাম ।

৩রা জুন, ২০১৩ - সোমবার । চেরাপুঞ্জি যাওয়ার জন্য এম টি ডি সি-র অফিসে রিপোর্টিং টাইম সকাল ৭:৪৫ আর বাস ছাড়ে ঠিক আটটায় । চেরাপুঞ্জি ট্রিপে এম টি ডি সি মোট আটটা জায়গায় ঘোরায় ।  পাহাড়ী পথে ওঠানামার মধ্যে দিয়ে ঘন্টাখানেক চলার পৌঁছলাম আমাদের প্রথম গন্তব্যে ।

(এখানে বলে রাখি, আমরা যে জায়গাগুলোয় ঘুরেছি, সেগুলোর নামের ইংরিজী বানানই আমার জানা আছে । বাংলা বানান লিখতে গেলে কিছু কিছু জায়গায় উচ্চারণগত ত্রুটির সম্ভাবনা আছে । এই ত্রুটি তোমার ক্ষমা করার কোনও দরকার নেই কারণ আমি ক্ষমা চাইছি না ।)

মাওক্‌ডক্‌ ভ্যালি
প্রথম দ্রষ্টব্যঃ মাওক্‌ডক্‌ ভ্যালি
বাস দাঁড়ানোর সময়ঃ ১৫ মিনিট
টিকিটঃ লাগে না
এখানে পাহাড়ের গা বেয়ে সিঁড়ি বেয়ে বেশ কিছুটা নামতে হয় । নিচে নেমে রেলিং দিয়ে ঘেরা একটা চওড়া প্ল্যাটফর্ম আছে, সেখান থেকে দু'পাশের পাহাড়ের মাঝের জায়গাটা দেখতে খুব সুন্দর লাগে । এছাড়া সিঁড়ি  দিয়ে নামার সময়ে একটা ছোট্ট পাহাড়ী নদী দেখতে পাওয়া যায় । পুরোটা নামতে প্রায় পঞ্চাশটার মতো সিঁড়ি ভাঙতে হলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সেটা পুষিয়ে দেয় ।

বাস যেখানে দাঁড়ায় সেখানে কিছু ছোট খাবারের দোকান আছে । সকালে ব্রেকফাস্ট না করা থাকলে এখানে মোমো, ডিমসেদ্ধ, চা খেয়ে নেওয়া যেতে পারে ।

ইকো পার্ক
দ্বিতীয় গন্তব্যঃ ইকো পার্ক
বাস দাঁড়ানোর সময়ঃ ২০ মিনিট
টিকিটঃ মাথাপিছু ১০/-, ক্যামেরা ১৫/-
এখানেও কিছুটা সিঁড়ি দিয়ে নামতে হয়, তবে সিঁড়ির সংখ্যা বড়জোর ১৫ টা । নিচে নেমে একটা বিরাট সমতল জায়গা, সেখান দিয়ে একটা জলের ধারা গড়িয়ে পাহাড় থেকে বহুনীচে পড়ে যাচ্ছে । জায়গাটায় বেশ মেঘ ছিল আর দৃশ্য খুবই সুন্দর । ভালো করে দেখতে গেলে এই জায়গাটা কিছুতেই ২০ মিনিটে দেখে ফেলা সম্ভব নয়, কিছুটা বেশি সময় লাগবেই । তবে দেরি হলে বারবার হর্ণ দেওয়া ছাড়া বাস আর কিছু করে না !

মাওস্‌মাই কেভের ভেতরে
তৃতীয় গন্তব্যঃ মাওস্‌মাই কেভ
বাস দাঁড়ানোর সময়ঃ ৩০ মিনিট
টিকিটঃ মাথাপিছু ১০/-, ক্যামেরা ১৫/-
চেরাপুঞ্জির সাইট সিয়িং-এর সবচেয়ে সুন্দর আর আকর্ষণীয় জায়গা ! যদি শরীর আর মনের জোর থাকে, তাহলে এই জায়গাটা দেখা অবশ্য কর্তব্য । পাহাড়ের মধ্যে একটা অসাধারণ সুন্দর প্রাকৃতিক গুহা যার ভেতরে স্ট্যালাকটাইট আর স্ট্যালাগমাইট । ভেতরে পুরোটাই বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা করা আছে, কাজেই অন্ধকারে হাতড়ানোর কোনও ব্যাপার নেই । ভেতরের পথ কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু, কোথাও মাথা সোজা করে হাঁটতে হয়, কোথাও মাথা নিচু করে আবার কোথাও একেবারে হামাগুড়ি দিয়ে । একটা বিশেষ জায়গা আছে যেখান দিয়ে গলার পথটা এতটাই ছোট যে মনে হয় বোধহয় মোটা মানুষ গলতে পারবে না । কিন্তু শরীর ভাঁজ করে, মাথা আর পা আগুপিছু করে ঠিক গলে যাওয়া যায় । ভেতরে জুতো খুলে যাওয়াই ভালো কারণ অনেক জায়গাতেই গোড়ালিডোবা জল আছে । তাছাড়া জুতো পরে ভিজে পাথরের মধ্যে হাঁটতে গেলে পা হড়কানোর সম্ভাবনাও থাকবে ।

গুহাটা সবমিলিয়ে ১৫০ মিটার মতো লম্বা । পাথরের ওপর পা ফেলে, মাথায় পাথরের গুঁতো খেয়ে আর ভেতরের অসাধারণ দৃশ্য দেখতে দেখতে এই পথচলাটা - লাইফটাইম্‌ এক্সপেরিয়েন্স !

(বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ - কিছু লোক থাকে যারা প্রাকৃতিক আর কৃত্রিম জিনিসের মধ্যে কোনও ফারাক খুঁজে পায় না । যেমন আমাদের বাসে থাকা একজন ভদ্রলোককে বলতে শুনলাম "এ আর এমন কি, আমাদের কলকাতার নিক্কো পার্কেও এরকম আছে ।" তোমার মানসিকতা যদি এরকম হয়, তাহলে মাওস্‌মাই কেভ কিন্তু তোমার জন্য নয় !)

এই অঞ্চলে কিছু খাবারের দোকান ছাড়াও কিছু জিনিসপত্রের দোকানও আছে ।

সেভেন সিস্টার ফল্‌স্‌
চতুর্থ গন্তব্যঃ নসঙ্গিথিয়াং ফল্‌স্‌ (সেভেন সিস্টার ফল্‌স্‌ )
বাস দাঁড়ানোর সময়ঃ ১০ মিনিট
টিকিটঃ লাগে না
পাহাড়ের ধারে একটা রেলিং দিয়ে ঘেরা জায়গা যেখান থেকে অন্য একটা পাহাড়ের গায়ের পাশাপাশি সাতটা ঝর্ণা দেখতে পাওয়া যায় । গুনলে সাতের বেশিই হবে, আর কোন সাতটা একই মায়ের সন্তান সেটা বোঝার কোনও উপায় নেই । তবে দৃশ্যটা সবমিলিয়ে বেশি সুন্দর ।

বাংলাদেশ !
পঞ্চম গন্তব্যঃ মাও ট্রপ্‌
বাস দাঁড়ানোর সময়ঃ ১৫ মিনিট
টিকিটঃ লাগে না
এটা চেরাপুঞ্জির আরেকটা আকর্ষণীয় জায়গা । এখানে পাহাড়ের ওপরে একটা রেলিং ঘেরা জায়গা থেকে নিচে বাংলাদেশ দেখা যায় । দৃশ্যটা যে খুব স্পষ্ট তা নয়, কারণ জায়গাটা কিছুটা মেঘাচ্ছন্ন, আর সোজাসুজি দেখা গেলেও দূরত্বটা নেহাৎ কম নয় । আমরা পাহাড়ের ওপরে দাঁড়িয়ে আছি, নিচে যতদূর চোখ যায় নদীনালা ঘেরা সমতলভূমি - বাংলাদেশ । 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি' (এটা এমনি লিখলাম, অতকিছুও ইমোশনাল হয়ে পড়িনি !)

থাঙ্খারাং পার্ক
ষষ্ঠ গন্তব্যঃ থাঙ্খারাং পার্ক
বাস দাঁড়ানোর সময়ঃ ২০ মিনিট
টিকিটঃ মাথাপিছু ৫/-, ক্যামেরা ১০/-
এটা একটা বটানিক্যাল গার্ডেন ধরনের জায়গা । অনেকরকম গাছ আছে, তবে ফুলগাছের সংখ্যাই বেশি । এখান থেকে অন্য একটা পাহাড়ের গায়ে একটা ঝর্ণা দেখতে পাওয়া যায় আর তার সঙ্গে দেখা যায় - বাংলাদেশ । 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি' (এবারও এমনিই লিখলাম !)

রামকৃষ্ণ মিশন
সপ্তম গন্তব্যঃ রামকৃষ্ণ মিশন
বাস দাঁড়ানোর সময়ঃ ২০ মিনিট
টিকিটঃ লাগে না
রামকৃষ্ণ মিশন আলাদা করে দেখার কিছু নেই, বিশেষ করে তাদের কাছে যারা বেলুড় মঠ, ব্যারাকপুর বা নরেন্দ্রপুর দেখেছে । তবে ভেতরে একটা মিউজিয়াম আছে যেটায় মেঘালয়ের মানুষের জীবনযাত্রা, তাদের উৎসব-অনুষ্ঠানের কিছু মডেল রাখা আছে । এছাড়া এখানকার পাহাড়ী অধিবাসী গারো, খাসী, জয়ন্তিয়াদের ব্যবহৃত জিনিসপত্রের একটা সংগ্রহশালা গোছেরও আছে ।

নোয়াকালিকাই ফল্‌স্‌ দেখার জায়গা - মেঘে ঢাকা
অষ্টম গন্তব্যঃ নোয়াকালিকাই ফল্‌স্‌
বাস দাঁড়ানোর সময়ঃ কমপক্ষে ১ ঘন্টা
টিকিটঃ মাথাপিছু ১০/-, ক্যামেরা ২০/-
এখানে বাস বেশিক্ষণ দাঁড়ানোর একটা বড় কারণ হচ্ছে এখানেই দুপুরের খাওয়া সারতে হবে । এখানে দু'টো ভাতের হোটেল আছে, যেখানে ভাত-ডাল-তরকারি-মাছ-ডিম-মাংস সবই পাওয়া যায় । মান খুব একটা উন্নত নয়, কিন্তু এখানে এ'ছাড়া আর কোনও ব্যবস্থা নেই । বলা বাহুল্য, আমরা এখানেই দুপুরের খাওয়া সেরে নিলাম । খরচ পড়ল ৪৮০/-।

এরপর ফল্‌স্‌ দেখতে গেলাম । একেবারেই কিছু দেখা গেল না কারণ পুরো জায়গাটাই মেঘে ঢাকা । জায়গাটা কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে চলে এলাম ।

চেরাপুঞ্জি থেকে ফেরার পথে
ছোটবেলায় ভূগোল বই পড়ে চেরাপুঞ্জির সম্পর্কে আমাদের সকলেরই একটা ধারণা থাকে যে এখানে সারাবছরই বৃষ্টি হয় । কথাটা ভুল নয়, কিন্তু সারাবছর বৃষ্টি হয় এর মানে এই নয় যে ৩৬৫ X ২৪ ঘন্টাই বৃষ্টি হয় । আমরা চেরাপুঞ্জিতে যতক্ষণ ছিলাম তার মধ্যে একফোঁটাও বৃষ্টি পাইনি ।




চেরাপুঞ্জি ভ্রমণ শেষ - আমরা শিলং ফিরলাম তখন বিকেল সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে । কিছু খাবারদাবার কিনে আমরা হোটেলে ফিরে এলাম । রাতে যথারীতি হোটেলেই খাওয়া হল । ৩৬০/- ।

৪ঠা  জুন, ২০১৩ - মঙ্গলবার । আমাদের শিলং সাইট সিয়িং করার দিন । এম টি ডি সি-র অফিসে আমাদের রিপোর্টিং টাইম সকাল ৮:১৫, তাই এই ফাঁকে আমরা একটা কাজ করে নিলাম । পরেরদিন আমাদের শিলং থেকে গুয়াহাটী ফেরার কথা, তাই আমরা গেলাম এম এস টি সি (মেঘালয় স্টেট ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন) এর অফিসে । এটা এম টি ডি সি-র অফিসের ঠিক উল্টোদিকে । সেখানে গিয়ে জানা গেল শিলং থেকে গুয়াহাটী যাওয়ার জন্য আপাতত এম এস টি সি-র কোনও বাস নেই, আমরা যেন পরেরদিন সকালে গিয়ে খোঁজ নিই । এই অনিশ্চিতের ভরসায় থাকা মুস্কিল তাই আমরা এ এস টি সি-র (আসাম স্টেট ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন) কাউন্টারে গেলাম, যেটা একই জায়গায় । সৌভাগ্যক্রমে এখান থেকে পরেরদিন গুয়াহাটী যাওয়ার বাসের টিকিট পাওয়া গেল । ভাড়া ১১০/- করে । বাস ছাড়ার সময় সকাল আটটা ।

এরপর এম টি ডি সি-র বাসে করে আমরা শিলং ঘুরতে বেরোলাম । আমাদের মোট সাতটা জায়গা দেখার আছে ।

লেডী হায়দারি পার্ক
প্রথম গন্তব্যঃ লেডী হায়দারি পার্ক
বাস দাঁড়ানোর সময়ঃ ১৫ মিনিট
টিকিটঃ মাথাপিছু ৫/-, ক্যামেরা ১৫/-
একটা বেশ বড় পার্ক যার মধ্যে সুন্দর গার্ডেনিং এবং ফুলগাছ ছাড়াও আছে একটা মিনি চিড়িয়াখানা । সেখানে হরিণ ভাল্লুক বাঁদর সজারু ইত্যাদি আছে । পাখিদের মধ্যে আছে পেঁচা বাজ শালিক ঈগল্‌ ।


ক্যাথিড্রাল চার্চ
দ্বিতীয় গন্তব্যঃ ক্যাথিড্রাল চার্চ
বাস দাঁড়ানোর সময়ঃ ১০ মিনিট
টিকিটঃ লাগে না
এই চার্চের বৈশিষ্ট্য হল এটা শিলং-এর সবথেকে বড় চার্চ । চার্চটা খুবই পরিষ্কার - সাধারণতঃ যেরকম হয় । চার্চটা রাস্তা থেকে বেশ কিছুটা ওপরে - একটা অর্ধ-চন্দ্রাকার সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপরের প্রার্থনাগৃহে যেতে হয় ।


এলিফ্যান্ট ফল্‌স্‌
তৃতীয় গন্তব্যঃ এলিফ্যান্ট ফল্‌স্‌
বাস দাঁড়ানোর সময়ঃ ৩০ মিনিট
টিকিটঃ মাথাপিছু ১০/-, ক্যামেরা ২০/-
মাওস্‌মাই কেভ যেমন চেরাপুঞ্জির সবথেকে বড় আকর্ষণ ঠিক তেমনই শিলং-এর সবথেকে বড় আকর্ষণ হল এলিফ্যান্ট ফল্‌স্‌ । এই ফল্‌স্‌ না দেখলে শিলং ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে । পাহাড়ের গা বেয়ে একটা ঝর্ণা নেমে আসছে - পাহাড়ের ধাপে ধাপে তিনটে জায়গা থেকে সেটা ভালোভাবে দেখা যায় । এগুলোর নাম দেওয়া হয়েছে ফার্স্ট ফল্‌স্‌, সেকেন্ড ফল্‌স্‌ আর থার্ড ফল্‌স্‌ । অদ্ভুত সুন্দর ! থার্ড ফল্‌স্‌ পর্যন্ত পৌঁছতে ৫০ টা মতো সিঁড়ি ভাঙতে হয়, তবে ভাঙাটা সার্থক । একেবারে নিচে দাঁড়িয়ে এলিফ্যান্ট ফল্‌সের যা সৌন্দর্য্য, তা নিজের চোখে না দেখলে জীবনে কিছু অদেখা থেকে যায় । 'ঝর্ণা ঝরঝরিয়ে জল ছড়িয়ে যেন নেচে নেচে যায়' (এবারে সত্যিই ইমোশনাল হয়ে পড়েছি !) ।

স্থানীয় পোষাকে অমৃতা
এলিফ্যান্ট ফল্‌স্‌ এর কাছে একটা লোক্যাল পোষাক পরে ছবি তোলার ব্যবস্থা আছে - মুলতঃ মেয়েরাই এগুলো করে থাকে । আমার স্ত্রী একবার পরলেন ।















এখানে চা-টা খেয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা আছে । আর আছে কিছু জিনিসপত্রের দোকান ।

মেঘে ঢাকা তারা মেঘালয় @ শিলং পীক
চতুর্থ গন্তব্যঃ শিলং পীক্‌
বাস দাঁড়ানোর সময়ঃ ২০ মিনিট
টিকিটঃ মাথাপিছু ২০/-, ক্যামেরা ২০/-
শিলং-এর সবথেকে উঁচু জায়গা । এখান থেকে পুরো শিলং শহরটা দেখা যায় । কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে আমরা কিছুই দেখতে পেলাম না কারণ চারপাশটা সম্পূর্ণভাবে মেঘে ঢেকে গেল । একেবারে নিশ্ছিদ্র মেঘ - কোনও ফাঁক দিয়েই শিলং এর কোনও কোণাও দেখা গেল না ।


এখানেও কিছু খাবারের এবং জিনিসপত্রের দোকান আছে ।

বড়াপানি
পঞ্চম গন্তব্যঃ বড়াপানি (উমিয়াম লেক)
বাস দাঁড়ানোর সময়ঃ ৪০ মিনিট
টিকিটঃ মাথাপিছু ২০/-, ক্যামেরা ৬০/-
পাহাড়ের মাঝখানে বৃষ্টির জলে পুষ্ট একটা লেক । তবে এটা কিছুটা হলেও কৃত্রিম কারণ লেকের একদিকে  বাঁধ দিয়ে এই জলকে ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে । বড়াপানির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য খুবই সুন্দর - বিরাট বড় লেকের মাঝে একটা পাহাড়ও আছে । এটার নাম লাংপেংডং । এখানে বোটিং এর ব্যবস্থাও রয়েছে - স্পীডবোটে করে পুরো লেকটা ঘোরানো হয় । বড়াপানিতে বাস বেশিক্ষণ দাঁড়ানোর একটা বড় কারণ হল এখানে বাস থেকে নেমে বেশ কিছুটা ঢালুপথে নেমে যেতে হয় । ফেরার সময়ে স্বভাবতই বেশি সময় লাগে  ।

এখানে একটা ছোট খাবারের দোকান আছে, সেখানে চা কফি বা সামান্য স্ন্যাক্স খেয়ে নেওয়া যেতে পারে ।

গল্‌ফ্‌ কোর্স
ষষ্ঠ গন্তব্যঃ গল্‌ফ্‌ কোর্স
বাস দাঁড়ানোর সময়ঃ ১০ মিনিট
টিকিটঃ লাগে না
একটা সাধারণ গল্‌ফ্‌ কোর্স । যারা কলকাতারটা দেখেছে, তাদের বাস থেকে নামারও দরকার নেই । বিরাট একটা সবুজ ঘাসে মোড়া উঁচুনিচু মাঠ - ব্যস ।



স্টেট মিউজিয়াম
সপ্তম গন্তব্যঃ স্টেট মিউজিয়াম
বাস দাঁড়ানোর সময়ঃ ২০ মিনিট
টিকিটঃ মাথাপিছু ৫/-, ক্যামেরা ১০/-
রামকৃষ্ণ মিশনের মিউজিয়ামটার একটা বড় ভার্শান হল স্টেট মিউজিয়াম । ভেতরে সবকিছুরই ছবি তোলা যেতে পারে । গারো, খাসী, জয়ন্তিয়া জাতীর মানুষের জীবনযাত্রার মডেল, অস্ত্রশস্ত্র, গয়নাগাটি, রান্নার উপকরণ, পোষাক-পরিচ্ছদের একটা সংগ্রহশালা হল স্টেট মিউজিয়াম ।

আমাদের সাইট সিয়িং শেষ - এরপর বাস আমাদের পুলিশ বাজারে নামিয়ে দিল । প্রায় বিকেল চারটে বাজে - আমাদের এখনও দুপুরের খাওয়া হয়নি । পুলিশ বাজারের একটা ভাতের হোটেলে ঢুকলাম । এটা কলকাতার একটা সাধারণ ভাতের হোটেলেরই মতো, রান্নার মানও তথৈবচ । মাত্র ২৭০/- সবার পেট ভরল (?) ।

পুলিশ বাজারের ট্যাক্সি স্ট্যান্ড
হোটেল থেকে বেরোনোর সময়ে পেলাম সেই জিনিস - মেঘালয় যার জন্য বিখ্যাত । বৃষ্টি । আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি শুরু হল - এবং টানা এক ঘন্টা চলল । পাহাড়ে বৃষ্টির একটা সুবিধে হচ্ছে এখানে জল দাঁড়ায় না, কিছুক্ষণের মধ্যেই সব জল সরে গেল । আমরা হোটেলে ফিরলাম । এটা আমাদের শিলং- এর শেষ রাত্রি - পরেরদিন সকালেই আমরা গুয়াহাটীর চলে যাব । সে'জন্য সন্ধ্যেবেলা বেরিয়ে কিছু কেনাকাটা করে নেওয়া হল । শিলং থেকে কেনার জন্য সবথেকে ভালো জিনিস হল এখানকার বেত ও বাঁশের কাজের জিনিসপত্র । পুলিশবাজারে এসব জিনিসের বেশ কিছু দোকান আছে - আর এরা ট্যুরিস্টদের জন্য দাম সেই অর্থে কিছু বাড়িয়ে রাখে না ।

শিলং-এ আমাদের শেষ ডিনারও হোটেলেই করা হল । খরচ পড়ল ২০০/-।

৫ই জুন, ২০১৩ - বুধবার । আমাদের হোটেলে বিল আগেরদিন রাতেই মেটানো ছিল, তাই সকালে আমরা মালপত্র নিয়ে বেরিয়ে সোজা বাসস্ট্যান্ডে চলে এলাম । বাস ছাড়ল প্রায় সাড়ে আটটা । কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা শিলং ছেড়ে বেরিয়ে গেলাম । শিলং ভ্রমণ শেষ !

গুয়াহাটী পৌঁছলাম তখন প্রায় দুপুর একটা । গুয়াহাটীতে আমাদের মেয়াদ একরাত্রি, তাই কোনও হোটেল বুকিং করা ছিল না । এবং এর কোনও প্রয়োজনও নেই কারণ গুয়াহাটীতে প্রচুর হোটেল আছে । তবে যেহেতু আমরা মাত্র চব্বিশ ঘন্টা গুয়াহাটীতে থাকছি, আমার মেসোমশাই বললেন - আমাদের আরেকটা অপশনও আছে, সেটা হল রেলওয়ে রিটায়ারিং রুম । স্টেশনের চীফ টিকিট চেকারের এই ঘর অ্যালট্‌ করার ক্ষমতা থাকে, তিনি তাঁর বেয়ারার কাছে আমাদের পাঠিয়ে দিলেন । আমরা একটা পাঁচবেডের রুম পেলাম - ভাড়া ৪৪০/- ('খুশি করার ট্যাক্স' সমেত আমাদের পড়ল ৬৫০/-) আমরা রেলওয়ে থেকে এর বিলও পেলাম । রুমের কন্ডিশন যথেষ্ট ভালো - দু'টো অ্যাটাচ্‌ড্‌ বাথরুম সমেত ঘরটা যথেষ্ট বড় । ফ্রেশ হয়ে নিয়ে আমরা রেলওয়ে ক্যান্টিনে খেয়ে নিলাম । ৪০৮/- পড়ল ।

এরপর গেলাম গুয়াহাটীতে আমাদের একমাত্র দেখার জায়গা দেখতে - কামাখ্যা মন্দির । আমরা যেহেতু স্টেশনেই ছিলাম তাই স্টেশনের লাগোয়া গাড়ি বা অটোর স্ট্যান্ডটা আমাদের খুবই কাছে ছিল । সেখান থেকে ৩২০/- দু'টো অটো ভাড়া করে কামাখ্যা মন্দিরে যাওয়া হল । যাওয়ার রাস্তাটা খুবই সুন্দর - বেশ কিছুটা ব্রহ্মপুত্রের পাশ দিয়ে । যেতে আধঘন্টা মতো লাগে ।

কামাখ্যা মন্দির
কামাখ্যা মন্দির ভারতের ৫১ পীঠের মধ্যে অন্যতম - তবে আর পাঁচটা সাধারণ হিন্দু মন্দিরের মতোই । পান্ডা আছে, তবে পান্ডাদের বাড়াবাড়িটা খুব বেশি নেই । মূল মন্দিরের গর্ভগৃহে ঢুকতে গেলে অবশ্য দীর্ঘ লাইন দিতে হয় । ফ্রি, ১০১/- র ৫০১/- এই তিনরকমের লাইন হয় । গর্ভগৃহে না ঢুকেও মন্দিরের চত্বরটায় ঘোরাঘুরি করতে অবশ্য ভালোই লাগে । কামাখ্যা মন্দিরে পাঁঠা ছাড়া পায়রাও বলি দেওয়া হয় - বলির আগের সেইসব প্রাণীগুলোকে এখানে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায় ।

মন্দিরের চত্বরের মধ্যে একটা 'রেন ওয়াটার হার্ভেস্টেশন প্রজেক্ট' আছে - সেটাকে মন্দিরের লোকজন অনায়াসে 'সৌভাগ্যকুন্ড' নাম দিয়ে দিয়েছে । সেখানে একটা ছোট মন্দির তৈরি করে অনায়াসে ইনকাম্‌ (পড় বুজরুকি) চলছে !

মন্দিরের বাইরে যথারীতি জিনিসপত্রের দোকান আছে । আমরা এখান থেকে লোকজনকে উপহার দেওয়ার জন্য কিছু জিনিস কিনে নিলাম ।

ফেরার পথে আমরা ২৫০/- টাকায় একটা মারুতি ওম্‌নি ভাড়া করলাম যেটা আমাদের স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দিল । আমরা তক্ষুণি রুমে না এসে লাইন পেরিয়ে গুয়াহাটীর পল্টনবাজারে একটু ঘোরাঘুরি করলাম । আমাদের ভ্রমণের 'অদ্যই অন্তিম রজনী' - আমার নিয়ম অনুযায়ী আমরা এইদিনের ডিনারটা একটু স্পেশাল করি । স্টেশনের একেবারে কাছেই একটা বেশ ঝাঁ-চক্‌চকে রেস্ট্যুরেন্ট ছিল - নাম 'পুদিনা' - এখান থেকে ফ্রায়েড রাইস আর চিকেন মাঞ্চুরিয়ান নিয়ে নেওয়া হল । দাম পড়ল ৮৩০/- ।

ব্রহ্মপুত্রের তীরে
৬ই জুন, ২০১৩ - বৃহস্পতিবার । আগেরদিন বিকেলে কামাখ্যা যাওয়ার সময়ে দেখেছিলাম স্টেশন থেকে ব্রহ্মপুত্রটা বেশি দূরে নয়, তাই আমি সকালে বেরোলাম জায়গাটা এক্সপ্লোর করতে । সকালে হেঁটে বেড়াতে বেশ ভালোই লাগছিল । ব্রহ্মপুত্রের ধারে কিছুক্ষণ ঘুরে ঘন্টাখানেক পরে আবার রুমে ফিরে এলাম ।



আমাদের ট্রেন দুপুর ১২:৪৫ এ - আর আমরা আছি রেলওয়ে রিটায়ারিং রুমে - তাই কোনও তাড়াহুড়ো নেই । ধীরেসুস্থে ফাইনাল প্যাকিং সেরে রেলওয়ে ক্যান্টিনে লাঞ্চ করে নিলাম । তখন দেখলাম ট্রেন এসে গেছে । তারপর রুমে গিয়ে মাল নিয়ে সবাই মিলে ট্রেনে উঠে বসলাম । কাঁটায় কাঁটায় ১২:৪৫ এ সরাইঘাট এক্সপ্রেস হাওড়ার উদ্দেশ্যে রওনা হল ।

ফেরার পথে ব্রহ্মপুত্রকে দেখতে আরও সুন্দর লাগল । যাওয়ার সময়ে কিছুটা মেঘ ছিল - ফেরার সময়ে একেবারে পরিষ্কার । ব্রহ্মপুত্র ছাড়াও ফেরার পথে দূরে পাহাড়ের গায়ে মেঘের দৃশ্যও খুব চিত্তাকর্ষক । যতক্ষণ আকাশে আলো ছিল, দু'চোখ ভরে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখলাম ।

পরেরদিন হাওড়া পোঁছলাম সকাল ছ'টায় - প্রায় একঘন্টা লেটে । আটটায় বাড়ি !

সারসংক্ষেপঃ

১. কলকাতা থেকে ৪ - ৫ দিনের ঘুরতে যাওয়ার জায়গা হিসেবে শিলং একটা খুব ভালো অপশন । এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য পর্যটককে মুগ্ধ করবেই ।
২. শিলং যাওয়ার সবথেকে ভালো সময় হচ্ছে বর্ষার শুরু - যে সময়ে আমরা গেছিলাম । এই সময়ে এখানে প্রকৃতি সবথেকে বেশি ঝকঝকে থাকে ।
৩. যদিও আমরা শিলং-এ বেশি বৃষ্টি পাইনি, তবুও শিলং গেলে প্রত্যেকেরই সঙ্গে একটা করে ছাতা নিয়ে যাওয়া উচিৎ ।
৪. শিলং-এ তিনটে গোটা দিন থাকাই ভালো - চেরাপুঞ্জি, নারটিয়াং আর লোকাল সাইট সিয়িং এর জন্য । যদি হাতে দু'দিন থাকে তাহলে নারটিয়াং-টা বাদ দেওয়া উচিৎ ।
৫. শিলং-এ ঘোরাঘুরির জন্য সবথেকে ভালো হল এম টি ডি সি-র বাস । কম খরচে এত ভালো ঘোরা অন্য কোনওভাবে সম্ভব নয় ।
৬. চেরাপুঞ্জির জায়গাটা খুব সুন্দর তবে এখানে থাকার কোনও মানে হয় না । চেরাপুঞ্জি ঘুরতে মোটামুটি ৫ - ৬ ঘন্টা লাগে যার মধ্যে 'মাওস্‌মাই কেভ' মাস্ট ওয়াচ্‌ ।
৭. শিলং-এর লোকাল সাইট সিয়িং এর মধ্যে এলিফ্যান্ট ফল্‌স্‌ ও বড়াপানি মাস্ট ওয়াচ্‌ । শরীর অনুমতি দিলে এলিফ্যান্ট ফল্‌সের তিনটে ফল্‌স্‌ই দেখা উচিৎ ।
৮. শিলং-এর প্রাণকেন্দ্র হল পুলিশবাজার - এখানে সবই পাওয়া যায় । এখানে অনেক হোটেলও আছে । কলকাতা থেকে হোটেল বুক করে গেলে সবসময়েই পুলিশবাজারর কোনও হোটেলে চেষ্টা করা উচিৎ ।
৯. শিলং-এর খুব কাছে আসাম হওয়া সত্ত্বেও এখানে চায়ের দাম খুব বেশি (১০ - ১৫/- প্রতি কাপ), তাই চা-প্রেমীদের টী-ব্যাগ বা নিজস্ব চায়ের সরঞ্জাম বহন করাই শ্রেয় ।
১০. শিলং কিছুটা গন্ডগোলের জায়গা তাই সন্ধ্যের পর রাস্তায় লোক চলাচল কমে গেলে হোটেলে ফিরে আসাই শ্রেয় ।
১১. গুয়াহাটীতে কামাখ্যা মন্দির একটা দেখার জায়গা । সেটা ছাড়া বালাজী মন্দিরও দেখতে যাওয়া যেতে পারে ।

উপসংহারঃ

ঘরে ফেরার পালা !
কম খরচে ৪ - ৫ দিনের বেড়ানোর প্ল্যান করলে শিলং-এর মতো জায়গা কমই আছে । মাথাপিছু মাত্র ৩,৭০০/- টাকায় আমাদের পুরো ঘোরা সম্পূর্ণ হয়ে গেছে । এটা ঠিক যে আমরা সেরকম কোনও ভালো হোটেলে থাকিনি, সেরকম হাই-ক্লাস খাওয়াদাওয়াও করিনি । কিন্তু আমি বেড়াতে যাই বেড়ানোর জন্য, ভালো থাকা-খাওয়ার জন্য নয় । শিলং-চেরাপুঞ্জির অনন্যসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য পর্যটককে ভীষণভাবে আকর্শন করে । পশ্চিমবঙ্গ আর সিকিমের পাহাড়ে ঘুরতে ঘুরতে যাদের একঘেয়ে লাগে, তারা আসাম-মেঘালয়ের এই জায়গাগুলো ঘুরে আসতে পারে । ভারতবর্ষের নর্থ-ইস্টের এই 'প্যারাডাইজ আনএক্সপ্লোর্ড' কে এক্সপ্লোর জীবনে একবার অবশ্যই করা উচিৎ !

শিলং ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here:

Monday, April 15, 2013

ফারাক্কা ভ্রমণ

তুমি কি এমন কাউকে চেনো যিনি ষাটের দশকে বা তার আগে কখনও উত্তরবঙ্গে গেছিলেন ? আমার মা এরকম একজন মানুষ । মায়ের মুখে শুনেছি সেই সময়ে, যখন মুর্শিদাবাদ আর মালদার সীমানা দিয়ে বয়ে যাওয়া গঙ্গার ওপরে কোনও ব্রীজ ছিল না, তখন এদিক থেকে ট্রেনে চড়ে মুর্শিদাবাদের সীমানায় গিয়ে নামতে হত আর তারপর নৌকো করে গঙ্গা পেরিয়ে ওপার থেকে আবার ট্রেনে উঠতে হত (যদি তুমি এরকম কাউকে চেনো যিনি উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গে এসেছিলেন, তাহলে ব্যাপারটা উলটে যাবে আর কি !) । এরপর গঙ্গার ওপরে তৈরি হল একটা সেতু কাম ব্যারেজ - ফারাক্কা । এই ব্রীজের ওপর দিয়ে অনেকবার যাতায়াত করলেও ভালো করে দেখার সুযোগ হয়নি কখনও । সেই ব্রীজ এবং ব্যারেজ দেখতেই আমাদের এবারে বেরিয়ে পড়া - ফারাক্কা ভ্রমণ ।

নিউ ফারাক্কা স্টেশন - নির্ধারিত সময়ের আগে !
১৪ই এপ্রিল ২০১৩, রবিবার শিয়ালদহ থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসে আমাদের যাত্রা শুরু হল সকাল ৬:৩৫ এ । মাথাপিছু ভাড়া ১৭০ টাকা । আমাদের চারজনের দল - আমি, আমার স্ত্রী, বাবা ও মা । যাত্রাপথের বিবরণ দেওয়ার মতো বিশেষ কিছু নেই তাই একেবারে ফারাক্কায় ট্রেন থেকে নামা দিয়ে শুরু করি । নামলাম তখন বেলা ১২:৩৫ বাজে । সময়টা উল্লেখযোগ্য কারণ কাঞ্চনজঙ্ঘার ফারাক্কায় পৌঁছনোর কথা ১২:৫০ এ । এটা একেবারেই অপ্রত্যাশিত - বিশেষ করে ভারতীয় রেল এর কাছে !

হোটেল সোনার বাংলা - ৫০০ টাকার ঘর
যাই হোক, স্টেশন থেকে নেমে লোকজনকে জিজ্ঞেস করে আমাদের হোটেলে পৌঁছলাম । স্টেশন থেকে হোটেল খুবই কাছে এবং সঙ্গে বেশি মালপত্র না থাকায় হেঁটেই গেলাম । ফারাক্কার হোটেলগুলো সবই প্রায় একই জায়গায় আর সবগুলোই একই মানের । আমাদের হোটেলের নাম 'সোনার বাংলা' - এখানে আমাদের আগে থেকেই বুকিং করা ছিল । গিয়ে দেখলাম আমরাই হোটেলের একমাত্র অতিথি ! হোটেলে এ সি এবং নন্‌ - এ সি দু'রকম ঘরই আছে । এ সি র ভাড়া ১,০০০ টাকা আর নন্‌ - এ সি র ৫০০ টাকা । আমাদের দু'টো নন এ সি ঘর নেওয়া ছিল ।

এরপর একদফা চানটান করে বেরোলাম খেতে । এখানে খাওয়ার জন্য কোনও রেস্ট্যুরেন্ট আশা কোরো না একেবারে সাধারণ 'ভাতের হোটেল' এর ওপরেই নির্ভর করতে হবে । সেইরকম একটা হোটেলে ভাত ডাল তরকারি দেশী মুরগীর ঝোল টক দই খাওয়া হল । চারজনের খরচ পড়ল ৪৩৫/- ।

ফারাক্কা ব্যারেজগামী রেল লাইন - দূরে ব্যারেজ
এরপর হোটেলে ফিরে এসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে সাড়ে চারটে নাগাদ বেরোলাম আমাদের এখানে আসার প্রধান উদ্দেশ্য নিয়ে - ব্যারেজ দেখতে । আমাদের হোটেল থেকে ব্যারেজ হেঁটে মিনিট দশেক । ব্যারেজের সামনে গিয়ে একটা সাইনবোর্ড দেখলাম যেটা একেবারেই আশা করিনি । 'Photography Strictly Prohibited' । ভাবলাম 'এরকম লেখা তো অনেক জায়গাতেই থাকে, সুযোগ বুঝে তুলে নেব ।' কিন্তু ব্রীজের ওপরে হাঁটা শুরু করার আগেই একজন সিকিউরিটি গার্ড আমার গলায় ক্যামেরা ঝোলানো দেখে ডেকে বলল কোনওভাবেই যেন কোনও ছবি তোলার চেষ্টা না করি । কি আর করা যাবে, ব্যারেজটা নিজেরাই দেখলাম - তোমাকে দেখাতে পারছি না ।

এবার একটু ব্যারেজের বিবরণ দেওয়া যাক । ফারাক্কার মূল ব্যারেজের ওপর মোট ১০৯ টা লক্‌ গেট আছে । পুরো ব্যারেজের দৈর্ঘ্য ২ কিলোমিটারের একটু বেশি । হাঁটতে হাঁটতে নিচের জল খুব বেশি দেখা যায় না, তবে খেয়াল করলে লক্‌গেটগুলোর খোলা-বন্ধ অবস্থা থেকে অনেক কিছু শেখা যায় । (আমি খেয়াল করিনি, তাই শিখিওনি) আমরা রাস্তার বাঁদিকের ফুটপাথ ধরে হাঁটছিলাম - শুধু বাঁদিক ধরেই হাঁটার অনুমতি আছে । আমাদের আরও বাঁদিকে রেললাইন - সেখান দিয়ে অনবরত যাত্রীবাহী ট্রেন এবং মালগাড়ি যাতায়াত করছিল । বিকেলে রোদ্দুরের তাপ বেশ কম ছিল, তাই এই দীর্ঘ রাস্তাটা হেঁটে যেতে বেশ মনোরমই লাগছিল । প্রায় একঘন্টা হেঁটে পুরো ব্যারেজটা পেরিয়ে যখন মালদায় পৌঁছলাম, তখন প্রায় সূর্য্যাস্তের সময় হয়ে গেছে ।

গঙ্গার ওপর সূর্য্যাস্ত
ওপারে গিয়ে গঙ্গার পাড়ে গেলাম । এখান থেকেও ব্যারেজের ছবি তোলার নিয়ম নেই । ফারাক্কায় গঙ্গা বিশাল চওড়া - ওপারে সূর্য্যাস্ত দেখতে খুব সুন্দর লাগে । আমরা কিছুক্ষণ পাড়ে বসে রইলাম । সূর্য্যাস্তের পরে একটা অটো করে আবার এ'পারে ফিরে এলাম । ভাড়া মাথাপিছু ৫ টাকা ।




সন্ধ্যেবেলা ফারাক্কায় জাস্ট কিছু করার নেই, তাই হোটেলেই বসে রইলাম । রাতে আমাদের হোটেলের পাশের 'ভাতের হোটেল' থেকে রুটি, তরকা আর চিকেন কষা নিয়ে এসে খাওয়া হল । অর্ডার দিয়ে আসার পরে এরা হোটেলের ঘরেই ডেলিভারি দিয়ে যায় । ২১০/- ।

পরেরদিন, ১৫ই এপ্রিল, ২০১৩ - বাংলা ১লা বৈশাখ, ১৪২০ সাল । গঙ্গার ওপরে নতুন বছরের প্রথম সূর্য্যোদয় দেখার সুযোগ অবশ্য হল না কারণ আকাশ মেঘলা করে ছিল । এখানে একটা কথা বলে নিই - ফারাক্কার তাপমাত্রা কলকাতার চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি এবং এই সময়ে ফারাক্কায় গরম সাংঘাতিক হলেও আমরা ফারাক্কায় যে ২৪ ঘন্টা ছিলাম, সেই সময়ের বেশিরভাগটাই মেঘলা ছিল । ফলে কখনওই আমাদের বিশেষ গরম লাগেনি ।

ফীডার ক্যানেল
সকালে চা খেয়ে গেলাম স্টেশনের কাছে । সেখান থেকে একটা সাইকেল ভ্যান ভাড়া করে আশপাশটা ঘুরতে যাওয়া হল । ফারাক্কায় দেখার জায়গা বলতে গেলে প্রায় কিছুই নেই - একটা গান্ধীঘাট আর তার পাশে একটা কালীমন্দির (কোনও অজ্ঞাত কারণে লোকে কালীমন্দিরকে 'কালীবাড়ি' বলে !) আছে । এই গান্ধীঘাটে যাওয়ার রাস্তাটা ব্যারেজের পাশ দিয়ে আর এখানে আরেকটা ছোট ব্যারেজ পেরোতে হয় । এটার নাম 'ফীডার ক্যানেল' । (পরে google map দেখে জেনেছি এই ফিডার ক্যানেল থেকেই আমাদের পশ্চিমবঙ্গের গঙ্গা বা ভাগীরথী-হুগলীর সৃষ্টি হয়েছে) এই ফিডার ক্যানেলের ওপর ৯ টা লক্‌গেট আছে - যেগুলো খোলা থাকায় প্রচন্ড জোরে গঙ্গা থেকে জল ফিডার ক্যানেলে প্রবেশ করছে । এখানেও ছবি তোলা বারণ । গান্ধীঘাটে যাওয়ার রাস্তাটা বেশ সুন্দর ।

গান্ধীঘাট
গান্ধীঘাটে পৌঁছলাম সাড়ে আটটার কিছু পরে । এখান থেকে ফারাক্কার ব্যারেজটা ভালই দেখা যায় । এখান থেকেও কিছু ছবি তুললাম । গান্ধীঘাটে কিছু লোকজন দেখলাম যারা পিক্‌নিক্‌ গোছের কিছু করতে গেছিল বোধহয় ।






কালী মন্দির (অথবা কালীবাড়ি !)
এখান থেকে গেলাম কালীমন্দিরে । মন্দিরটা বেশি পুরনো নয়, আর এখানে লোকজনও সেরকম আসে না, তাই বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন । এখানেও কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে ফিরে এলাম । আমাদের এই পুরো ঘোরার জন্য ভ্যান নিল ৬০ টাকা ।






এরপর একটা মিষ্টির দোকানে পরোটা এবং মিষ্টি খাওয়া হল । খাবারের মান - এক কথায় চলনসই ।

ফারাক্কা ব্যারেজ
হোটেলে ফিরে চানটান করে নিলাম । আমাদের ফেরার ট্রেন কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসের সময় দুপুর ১:০৯ আর হোটেল থেকে চেক্‌আউট আগে আমাদের হাতে আরও ঘন্টাখানেকের বেশি সময় আছে দেখে একটু হেঁটে জায়গাটা ঘোরাঘুরি করলাম । এবার গেলাম গঙ্গার পুব দিকের পাড়ে । এখান থেকে ব্যারেজটা খুব স্পষ্ট দেখা যায় । সত্যি কথা বলতে কি, এখান থেকেই ব্যারেজটা সবথেকে ভালো দেখা যায় । আমরা এখান থেকে আরও কিছু ছবি তুললাম ।

এরপর ফেরার সময় এসে গেল । বারোটা নাগাদ হোটেলের পর্ব চুকিয়ে দিয়ে মালপত্র নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে স্টেশনের কাছে একটা খাবারের হোটেলে এলাম । এই হোটেলটা আগেরদিনের থেকে ভালো - খাবারের মান প্রায় একই কিন্তু দাম অনেকটাই কম । এখানে মাছ মাংস ভাত মিলিয়ে ২০৪ টাকা লাগল ।

এবার ফেরার পালা !
তারপর স্টেশনে এসে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা । আসার সময়ে ট্রেন যেমন 'বিফোর টাইম' এ এসে গেছিল, ফেরার সময়ে সেরকম উদারতা দেখাল না । এল নির্ধারিত সময়ের প্রায় চল্লিশ মিনিট পরে আর শিয়ালদা পৌঁছল নির্ধারিত সময়ের একঘন্টা পরে । খেল্‌ খতম্‌ !




সারসংক্ষেপঃ

১. ফারাক্কা ঠিক একটা ঘুরতে যাওয়ার মতো জায়গা নয়, যদি ফারাক্কা ব্যারেজ সম্পর্কে আগ্রহ থাকে তবেই যাওয়া উচিৎ ।
২. ফারাক্কায় ঘোরার জায়গা প্রধানতঃ একটাই - ব্যারেজ । আর ব্যারেজ দেখতে চাইলে গাড়িতে বা রিক্সার ঘুরে লাভ নেই, হেঁটেই যাওয়া ভাল ।
৩. মূল ব্যারেজ ছাড়া ফীডার ক্যানেলটা আরেকটা দেখার মতো জায়গা । এখান থেকে যে জল ছাড়া হয়, সেটা থেকে আমাদের পশ্চিমবঙ্গের গঙ্গায় জল আসে ।
৪. এছাড়া দেখার জায়গা হল গান্ধীঘাট আর কালীমন্দির যেগুলোর কোনওটাই 'মাস্ট ওয়াচ্‌' নয় - তবে দেখে আসা যেতে পারে ।
৫. ফারাক্কায় খাবারের দাম একটু বেশি । বেশি অর্থাৎ দাম যতটা, খাবার সেই অনুপাতে ভালো নয় ।
৬. ফারাক্কায় একদিনের বেশি কোনও কারণেই থাকার কোনও মানে হয় না, এমনকি ছুটি কাটানোর জন্যও নয় ।
৭. ফারাক্কায় গেলে সূর্য্যাস্ত বা সূর্য্যোদয় (যদিও আমি দেখতে পাইনি) মিস্‌ করা একেবারেই উচিৎ নয় ।

উপসংহারঃ

চুম্বক !
দক্ষিণবঙ্গের সঙ্গে উত্তরবঙ্গের সংযোগের একমাত্র সেতু হল ফারাক্কা তাই বাণিজ্যিক বা যোগাযোগের দিক থেকে এর গুরুত্ব অপরিসীম । হোটেলের সামনে দিয়ে ৩৪ নং জাতীয় সড়ক দিয়ে সারাক্ষণ যাতায়াত করছে গাড়ি, লরি ট্রাক । সবমিলিয়ে বেশ শব্দমুখর জায়গা যে শব্দ রাত্রেও কমে না । ফারাক্কায় সাধারণতঃ কেউ ঘুরতে যায় না - আমরা সম্ভবতঃ একমাত্র ট্যুরিস্ট । ফারাক্কার প্রধান আকর্ষণ ফারাক্কা ব্যারেজ আর এই আকর্ষণই আমাদের টেনে নিয়ে গেছিল । (ঈশ্বর যেমন বিভিন্ন ভক্তদের বিভিন্ন মন্দিরে টানেন, অনেকটা সেরকমই বোধহয় !) যদি তোমার হাতে অল্প পুঁজি আর অল্প সময় থাকে আর সেইসঙ্গে ফারাক্কা ব্যারেজের বিশালতা আর uniqueness তোমাকে চুম্বকের মতো টানে, তাহলে যেদিন ইচ্ছে ফারাক্কা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যাও !

ফারাক্কা ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here:

Tuesday, January 1, 2013

কালুক ভ্রমণ


কালুক । সিকিমের পশ্চিমদিকে পাহাড়ের গায়ে ছোট্ট একটা শহর । নিউ জলপাইগুড়ি (শিলিগুড়ি) রেলস্টেশন থেকে ১১৯ কিলোমিটার দূরে এই শহর বেড়ানোর জন্য একটা বেশ নতুন জায়গা । জায়গাটার অনেকগুলো বিশেষত্ব আছে, সেগুলো লেখার মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় লিখব । আপাততঃ প্রথম বিশেষত্বটা দিয়ে শুরু করি – যেটার জন্য আমি এখানে গেছিলাম । কালুক মধুচন্দ্রিমা যাপনের জন্য বিশেষ মনোরম জায়গা !

নিউ জলপাইগুড়ি যাওয়ার পথে - লেটে !
২৬শে ডিসেম্বর, ২০১২ বুধবার রাত ১০:০৫ এ শিয়ালদহ থেকে দার্জিলিঙ মেল ধরে আমরা এন জে পি (নিউ জলপাইগুড়ি) র উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম । সঙ্গী, বলা বাহুল্য, আমার স্ত্রী অমৃতা । এ সি থ্রী টিয়ারে (উচ্চারণটা ‘টায়ার’ নয়) আমরা দু’টো আপার বার্থ নিয়েছিলাম । এ সি কামরায় রাতের বেলা এমনিতেও বাইরে কিছু দেখা যায় না তাই ট্রেনে ওঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই শুয়ে পড়লাম । শিয়ালদহ থেকে এন জে পি র পথের বিবরণ দেওয়ার কিছু নেই, শুধু এটা বলে রাখি এইসময়ে রাস্তায় অনেক সময়ে কুয়াশা হয় তাই আমাদের ট্রেন তিনঘন্টা লেট করে বেলা এগারোটায় পৌঁছল ।

নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে পৌঁছে
এন জে পি থেকে কালুক যাওয়ার গাড়ি পাওয়া সহজ নয় কারণ আগেই বলেছি কালুক বেড়ানোর পক্ষে একটা নতুন এবং ছোট জায়গা । এখানে এখনও খুব বেশি ট্যুরিস্টরা যায় না । হানিমুনে কোনও ঝক্কি নিতে চাই না বলে আমরা আগে থেকেই হোটেলের সঙ্গে কথা বলে গাড়ি বুক করে রেখেছিলাম । এন জে পি তে ‘মারুতি অল্টো’ নিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন ড্রাইভার সুরেশ গুরুং । স্টেশন থেকে বেরিয়ে ড্রাইভারকে খুঁজে বের করে গাড়িতে মালপত্র তুলে আমরা যখন কালুকের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম তখন ঠিক বেলা সাড়ে এগারোটা ।

তিস্তা নদী - এখন ডানদিকে
এই অঞ্চলে যারা গেছে তারা সবাই জানে যে শিলিগুড়ি থেকে সিকিম যেতে হলে সেভক রোড ধরতে হয় । এই সেভক রোড ধরে সমতলে চলতে চলতে হঠাৎ একসময়ে শুরু হয়ে যায় পাহাড় আর তারপর পাহাড়ী রাস্তা ধরে তিস্তা নদীকে কখনও ডানদিকে কখনও বাঁদিকে রেখে এগিয়ে চলা । 





জওহরলাল নেহেরু ব্রীজ - গাড়ির ভেতর থেকে
জোড়থাং
এইভাবে চলতে চলতে একসময়ে একটা ব্রীজ পড়ে যেটা পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিমের সীমানায় । ব্রীজটার নাম ‘জওহরলাল নেহেরু ব্রীজ’ আর জায়গাটার নাম মেল্লি । মেল্লি শহরটার বৈশিষ্ট্য হল এটা পশ্চিমবঙ্গ আর সিকিম দুটো রাজ্যের মধ্যেই পড়ে ।






মেল্লি পেরিয়ে আমরা আরও এগিয়ে চললাম । দুপুর আড়াইটে নাগাদ পৌঁছলাম ‘জোড়থাং’ এ । জোড়থাং হল সিকিমের একটা বড় শহর – প্রধান বানিজ্যকেন্দ্রও বলা যেতে পারে । জোড়থাং থেকে সিকিমের প্রায় সব জায়গার যাওয়া যায় । এখানে আমরা লাঞ্চ করার জন্য দাঁড়ালাম । একটা মোটামুটি চলনসই রেস্টুরেন্টে দু’প্লেট মিক্সড্‌ চাউমিন নেওয়া হল । দাম পড়ল ৬০/- করে ।


এরপর আবার এগিয়ে চলা । এখন আমাদের সঙ্গী ‘রঙ্গিত’ নদী (এই নদীর নাম ছোটবেলায় ভূগোল বইতে আমরা সবাই পড়েছি – তবে এটা বড় না ছোট, সেটা আর জেনে ওঠা হয়নি) । চলতে চলতে একসময়ে দিনের আলো ফুরিয়ে এল । পশ্চিম সিকিমের রাস্তাঘাট বেশ খারাপ আর জায়গায় জায়গায় মেরামতির কাজ চলছে এইসব বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে আমরা যখন কালুক পোঁছলাম তখন ঘড়ি বলছে সন্ধ্যে ছ’টা ।

আমরা ছিলাম ‘ঘন্‌ডে ভিলেজ রিসর্ট’ এ । জায়গাটা কালুক বাজারে । মারুতি অল্টো ঘন্‌ডের একেবারে সামনে পর্যন্ত যায় না, শেষের মিনিট পাঁচেকের ঢালু পথটুকু হেঁটে যেতে হয় । রিসর্টের একজন লোক এসে আমাদের মালপত্র নিয়ে গেল আর আমরা গেলাম রিসেপশনে । এখানে প্রথমেই আমাদের সাদা সিল্কের কাপড় দিয়ে অভ্যর্থনা করা হল । এরপর পেপার ফর্ম্যালিটি সেরে আমরা আমাদের ঘরে চলে এলাম ।

ঘন্‌ডে ভিলেজ রিসর্ট - ঘরের ভেতর
‘ঘন্‌ডে’ র প্রধান হোটেলটা ছাড়াও পাহাড়ের ধাপে ধাপে আলাদা আলাদা কটেজ রয়েছে, তার মধ্যে ‘নর্সিং ২’ এ আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল । এই ঘরগুলো ‘সুপার ডিলাক্স’ রুম – ভাড়া ১,৮০০/- (ব্রেকফাস্ট যোগ করলে ভাড়া ২,১০০/-) । এর সঙ্গে যোগ হবে ১০% সার্ভিস ট্যাক্স । ঘরে চা বা কফি দেওয়া হয় না, তবে চা-কফি-দুধ-চিনির একগুচ্ছ ছোট ছোট প্যাকেট দিয়ে যায় আর এর সঙ্গে ঘরে একটা ইলেক্‌ট্রিক কেটলি আছে যাতে ইচ্ছে হলে চা বা কফি তৈরি করে খাওয়া যেতে পারে । ঘরে রুম হিটার নেই, অবশ্য তার দরকার আছে বলে আমার মনেও হয় না । বাথরুমে গিজার আছে যেটা যেকোনও সময়েই চালানো যেতে পারে । আর রয়েছে ২৪ ঘন্টার রুম সার্ভিস (যদিও মাঝরাতে সার্ভিস পাওয়া যায় কিনা আমরা সেটা দেখার কখনও চেষ্টা করিনি !) ।

হোটেলে পৌঁছে জামাকাপড় ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম । কিছুক্ষণের মধ্যে রাতের ডিনারের অর্ডার দিলাম । এদের একটা ৬ – ৭ পৃষ্ঠার বিশাল মেনু কার্ড আছে যাতে ইন্ডিয়ান-চাইনিজ-কন্টিনেন্টাল সবরকমের খাবার পাওয়া যায় । আমরা আশা করিনি যে সেই মেনুর সব খাবার এরা সাপ্লাই দিতে পারে তাই রুম সার্ভিসের ছেলেটি যখন বলল – “আপ কোই ভী আইটেম অর্ডার কর্‌ সক্‌তে হ্যাঁয়” তখন কিছুটা অবাকই হলাম ।

চাঁদের আলোয় কাঞ্চনজঙ্ঘা
ঘন্‌ডের প্রায় সবক’টা ঘরের ভেতর থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায় । আমরা যেদিন পৌঁছেছি, তার আশেপাশে কোনও একদিন পুর্ণিমা ছিল আর আকাশ পরিষ্কার থাকার জন্য চাঁদের আলোয় কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছিল । দৃশ্যতই অত্যন্ত সুন্দর ।






ডিনার ডাইনিং হলেও করা যায় আবার ঘরেও আনিয়ে খাওয়া যেতে পারে । আমরা দ্বিতীয়টাই করলাম কারণ আমাদের কটেজ থেকে ডাইনিং হলটা হেঁটে বেশ কিছুটা দূরে আর এই পথটা বেশ ঠান্ডা । প্রথমদিন রাতে খাওয়া হল – বাটার রুটি, টিবেটিয়ান নান আর চিকেন দো-পিঁয়াজা । সব মিলিয়ে খরচ হল ২৪২/- (১০% সার্ভিস ট্যাক্স যোগ করে) এরপর ... কালুকে প্রথম রাত্রিযাপন !

কাঞ্চনজঙ্ঘা - পরেরদিন সকালে
২৮ শে ডিসেম্বর, ২০১২, শুক্রবার – কালুকে আমাদের সাইট-সিয়িং প্রথম এর দিন । সকালে হোটেলে ব্রেকফাস্ট করলাম চানা-বাটোরা দিয়ে । খরচ ১৩২/- । ব্রেকফাস্ট দিতে একটু বেশি দেরি করে ফেলায় আমাদের বেরোতে বেরোতে প্রায় সাড়ে দশটা বেজে গেল । গাড়ি বলাই ছিল – আমরা কালুকে যতদিন ছিলাম প্রত্যেকদিনই গেছি সুরেশ গুরুং - এর গাড়িতে । লোকটির কথাবার্তা বেশ ভালো এবং গাড়ি চালানোর হাত খুব ভালো । আমাদের গন্তব্যের মধ্যে আছে – ছায়াতাল, সিংশোর ব্রীজ, চাঙ্গে ফল্‌স্‌, পেলিং, পেমিয়াংচি মনাস্ট্রী আর রাবডেংস্‌ রুইন্‌স । এই জায়গাগুলোয় কালুকের চেয়ে ঠান্ডা বেশি তাই আমরা সেরকম প্রস্তুতি নিয়ে বেরিয়েছিলাম । সাড়ে দশটায় বেরিয়ে আমাদের প্রথম গন্তব্য ‘ছায়াতাল’ এ পৌঁছলাম তখন বেলা এগারোটা কুড়ি ।

ছায়াতাল
ছায়াতাল হচ্ছে একটা হ্রদ । এখানে একটা হোটেলও আছে আর হোটেলের সামনে বসে থাকা একটা বাঙালি পরিবারকেও দেখলাম । ছায়াতালে আর কিছু দেখার নেই, মিনিট পনেরো ঘুরে ছবিটবি তুলে আমরা রওনা দিলাম আমাদের দ্বিতীয় গন্তব্যে ।






সিংশোর ব্রীজ
সিংশোর ব্রীজ
এরপর ‘সিংশোর ব্রীজ' । পৌঁছলাম তখন বারোটা পঞ্চান্ন । সিংশোর ব্রীজ হচ্ছে সিকিমের সর্বোচ্চ ব্রীজ আর এশিয়ার মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ । ব্রীজের মাঝখান থেকে একটা পাথর ফেললে নীচে পড়তে তিন মিনিট সময় লাগে বলে একটা গুজব শুনেছিলাম, কিন্তু সেটা একটা বাজে কথা (H = ½ gt2 ফর্মূলা অনুযায়ী ৩ মিনিটে একটা পাথর ওপর থেকে ১,৫৮,৯২২ মিটার বা ১৫৮ কিলোমিটার পড়তে পারে, যা মাউন্ট এভারেস্টের থেকেও অনেক উঁচু !)আমি একটা পাথর ফেলে দেখলাম সেটা পড়তে দশ সেকেন্ড মতো লাগল । যাই হোক, ব্রীজটা খুবই সুন্দর – আমরা হেঁটে এপার থেকে ওপারে গেলাম । আমাদের গাড়ি ফাঁকা অবস্থায় ওপারে গেল আর ফেরার সময়ে আমাদের নিয়ে পেরোলো । এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য অত্যন্ত চমৎকার !




পেলিং
এরপর পেলিং । আমাদের যাওয়ার পথে চাঙ্গে ফল্‌স্‌ পড়ল কিন্তু ড্রাইভার বলল সেটা আমরা ফেরার সময়ে দেখব । পেলিং এ পৌঁছলাম তখন দুপুর দু’টো । এখানে আমাদের দুপুরের খাওয়ার কথা ছিল – একটা রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করলাম । ভাত, ডাল, তরকারি, মুরগী মিলিয়ে দু’জনের মোট ১৭০/- পড়ল ।



রাবডেংস্‌ রুইন্‌স যাওয়ার পথ
এইরকম সাইনবোর্ড পরপর আছে
রাবডেংস্‌ রুইন্‌স

আমরা পেলিং শহরে আলাদা করে আর কিছু দেখিনি – খাওয়াদাওয়া শেষ করে প্রথমে গেলাম ‘রাবডেংস্‌ রুইন্‌স’ । পৌঁছলাম তখন দু’টো চল্লিশ । এখানে গেটের কাছে গাড়ি রেখে বাকিটা হেঁটে যেতে হয় । গেট থেকে বাঁধানো পাহাড়ি পথে প্রায় এক কিলোমিটার । এটাকে একটা ছোটখাটো ট্রেকিং বলা যেতে পারে । হাঁটতে হাঁটতে একসময়ে দেখলাম একটা সাইনবোর্ডে লেখা আছে KEEP UP THE SPIRIT. THE DAY IS YOURS. 450 METER. অস্বীকার করব না, হাঁটাটা কিছুটা বিরক্তিকরই । সেটা সম্ভবতঃ সবারই হয় বোধহয় সেই জন্যই লোকজনকে উৎসাহিত করার জন্য জায়গায় জায়গায় সাইনবোর্ড লাগানো রয়েছে । আরেকটু এগিয়ে দেখলাম একটা ২৫০ মিটারের বোর্ড রয়েছে । এরপর - DO NOT GET TIRED. GREAT EXCITEMENT IS AWAITING. 200 METER. এরপর পাশের সাইনবোর্ডটা । 



আর তারপর – হ্যাঁ, এটাই আমাদের গন্তব্য - রাবডেংস্‌ রুইন্‌স । এখানে একসময়ে সিকিমের রাজধানী ছিল । এটাকে রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ বলা যেতে পারে । জায়গাটা একটা পাহাড়ের মাথায়, এখান থেকে অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যায় । এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতেও খুব সুন্দর লাগে ।





পেমিয়াংচি মনাস্ট্রী
রাবডেংস্‌ রুইন্‌স দেখে বেরোতে বেরোতে সোয়া একঘন্টা লেগে গেল । এরপর গেলাম ‘পেমিয়াংচি মনাস্ট্রী’ । পৌঁছলাম চারটে । এটা একটা বেশ বড় মনাস্ট্রী এবং বেশ সুন্দর । এখানে ঢুকতে একটা মেইন্টেনেন্স ফি বাবদ মাথাপিছু ২০/- করে দিতে হয় । মনাস্ট্রীর ভেতরে ঢুকে দোতলা এবং তিনতলায় যাওয়া যায় । তিনতলার মেঝেটা পুরোটাই কাঠের । ভেতরে পুরনোদিনের নানারকম জিনিস আছে ।
চাঙ্গে ফল্‌স্‌
এরপর ফেরার পথ ধরলাম । পথে পড়ল ‘চাঙ্গে ফল্‌স্‌’ । অনেকটা উঁচু থেকে পড়ে অনেকটা নিচে চলে যায় – এটাই এই ফল্‌সের বৈশিষ্ট্য । এখানে যখন আমরা পৌঁছলাম তখন প্রায় বিকেল পাঁচটা আর সন্ধ্যে হব হব করছে । এখানে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছবি তুলে আমরা কালুক ফেরার পথ ধরলাম । ফেরার পথে একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেল । এইসময়ে বেশ ঠান্ডা লাগছিল – আমাদের সঙ্গে নিয়ে বেরনো অতিরিক্ত গরম পোষাকগুলোর সদ্ব্যবহার করলাম । কালুকে পৌঁছলাম তখন প্রায় সাতটা । আমাদের প্রথমদিন ঘোরার খরচ ২,৫০০/- । ঘরে পৌঁছে ডিনারের অর্ডার দিয়ে দিলাম । রুটি আর চিকেন বাটার মশালা মিলিয়ে মোট ২৪৪/- পড়ল ।



পরেরদিন ২৯শে ডিসেম্বর, ২০১২, শনিবারআমাদের গন্তব্য সাউথ সিকিম । দেখার জায়গা – স্যামড্রুপসে, নামচি রক্‌ গার্ডেন, নামচি আর চারধাম । নামচি কালুক থেকে অনেকটা দূরে তাই আমাদের ড্রাইভার বলে রেখেছিল যেন সকাল আটটায় বেরোই । আমরা সকালে আর রিসর্টের ব্রেকফাস্ট না নিয়ে নিজেদের আনা খাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম । আমাদের সঙ্গে প্রচুর বিস্কুট, চকোলেট, চানাচুর ইত্যাদি ছিল – তাই খিদেয় পেট চুঁই চুঁই ব্যাপারটা কখনও হয়নি ।

স্যামড্রুপসের ১৩৫ ফুট উঁচু মূর্তি
সবকটা জায়গাই নামচিতে, বা নামচির কাছাকাছি । কালুক থেকে নামচি যেতে গেলে জোড়থাং হয়ে যেতে হয় । প্রথম গন্তব্য ‘স্যামড্রুপসে’তে পৌঁছলাম তখন বেলা এগারোটা পনেরো । জায়গাটার উচ্চতা ৭,০০৯ ফুট । এখানে ঢোকার জন্য টিকিট লাগে, মাথাপিছু ২০/- । এছাড়া গাড়ি পার্কিং এর জন্য ২০/- । স্যামড্রুপসের কোনও ঐতিহাসিক মূল্য নেই এখানে ‘গুরু পদ্মসম্ভব’ এর একটা ১৩৫ ফুট উঁচু মূর্তি আছে । ১৯৯৭ সালে এই জায়গাটা তৈরি হয়েছে । চত্বরটা ঘুরে বেড়ানোর পক্ষে বেশ সুন্দর আর ওপর থেকে অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যায় । উঁচু জায়গা থেকে প্রাকৃতিক দৃশ্যের যে সৌন্দর্য্য সেটাই স্যামড্রুপসের বৈশিষ্ট্য । 
স্যামড্রুপসে থেকে নামচি শহর
জপযন্ত্র


















এখানকার একটা দোকান থেকে দু’টো তিব্বতী জপযন্ত্র কেনা হল । দাম নিল ১০০/- করে ।





নামচি রক গার্ডেন





স্যামড্রুপসের পর ‘নামচি রক্‌ গার্ডেন’ । পাহাড়ী পথে হেঁটে নামতে নামতে পথের দু’ধারে নানারকম সুন্দর গাছ । এই জায়গাটা আমাদের কিছুটা হতাশ করল । কারণ এখানকার গাছপালাগুলো ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না । জায়গাটা দেখতে যে পরিমাণ পরিশ্রম করতে হয় সেটার পক্ষে সৌন্দর্য্যটা যথেষ্ট আকর্ষণীয় নয় ।



এরপর এলাম নামচি শহরে । তখন বাজে দুপুর একটার কিছু বেশি । এখানে আমাদের একটা হোটেলের সামনে নামিয়ে ড্রাইভার একটু এগিয়ে গিয়ে গাড়িটা পার্ক করল । আমরা এই হোটেলে দু’টো চিকেন থালি নিলাম । খরচ হল ১৮০/- ।

নামচি সেন্ট্রাল পার্ক - বিদেশী লোকেশনের মতো
এরপর আমরা কিছুক্ষণ নামচি শহরটা দেখলাম । আমরা ছিলাম ‘সেন্ট্রাল পার্ক’ এ যেটা অত্যন্ত সুন্দর করে তৈরি করা । বাংলা বা হিন্দী ছবিতে যেরকম ফরেন লোকেশন দেখা যায়, নামচির সিটি সেন্টারে গেলে ঠিক সেরকমই দেখতে পাওয়া যায় । এখানে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে ছবি তুলে আমরা হেঁটে হেঁটে চলে গেলাম আমাদের গাড়ির কাছে ।


বদ্রীনাথ ধাম
‘চারধাম’ । আমাদের চতুর্থ তথা শেষ গন্তব্য । পৌঁছলাম তখন পৌনে তিনটে । এখানে কিছু পয়সা খরচের ব্যাপার আছে – প্রথমে গাড়ি পার্কিং এর খরচ ৫০/-, তারপর ক্যামেরা নিয়ে ভেতরে ঢোকার খরচ ৩০/- (মুভি ক্যামেরা হলে ৫০/-) । এছাড়া ভেতরে ঢুকে জুতো রাখার খরচ মাথাপিছু ২/- করে 

(বাঁদিক থেকে) জগন্নাথ ধাম, রামেশ্বরম্‌ ধাম আর দ্বারকা ধাম




চারধাম হচ্ছে ভারতের বিখ্যাত চারটে জায়গার একটা সংক্ষিপ্ত চেহারা । এই চারটে জায়গা হল ‘বদ্রীনাথ ধাম’, ‘দ্বারকা ধাম’, ‘জগন্নাথ ধাম’ আর ‘রামেশ্বরম্‌ ধাম’ । চারটে বিখ্যাত মন্দিরের চারটে ছোট সংস্করণ করে এখানে রাখা হয়েছে ।
দ্বাদশ শিব মন্দিরের দু'টো





এদের সবার ওপরে আছে শিবের বিশাল মূর্তি এবং মন্দির আর সেইসঙ্গে দ্বাদশ শিবমন্দিরও আছে । আর আছে সাঁইবাবার (গেরুয়াধারী সাঁইবাবা নয়) মন্দির । এই জায়গাটারও কোনও ঐতিহাসিক মূল্য নেই । জায়গাটা বিশাল তবে বেশ সুন্দরভাবে সাজানো এবং যথেষ্ট রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় । সর্বোপরি এই চারটে জায়গার আসলগুলো যেরকম নোংরা, তাদের প্রতিরূপ এই জায়গাটা সেরকম একেবারেই নয় ।

বিশালাকৃতিক্স শিব














চারধাম থেকে বেরোলাম তখন পৌনে চারটে । আমাদের আর কিছু দেখার নেই কাজেই আমরা ফেরার পথ ধরলাম । জোড়থাং হয়ে কালুক পৌঁছলাম প্রায় সাড়ে ছ’টা । দ্বিতীয়দিন ঘোরার খরচ ৩,০০০/- । পরেরদিন আমাদের আর দূরে কোথাও যাওয়ার নেই, কালুকে লোকাল সাইট-সিয়িং করব । এটা করতে ঘন্টাখানেকের বেশি লাগবে না তাই ড্রাইভার বলল দুপুর দেড়টায় আসবে । আমরা লাঞ্চ করে বেড়াতে বেরোব । রাতে ডিনারে ভেজ চাউমিন আর চিলি ফিশ অর্ডার দেওয়া হল ২৯০/- ।

ঘন্‌ডে ভিলেজ রিসর্টের কটেজ
ঘন্‌ডে ভিলেজ রিসর্টের কটেজ
পরেরদিন, ৩০শে ডিসেম্বর, ২০১২ রবিবার সকালে একটু দেরি করে উঠলাম । ব্রেকফাস্ট নেওয়া হল – ১০০/- করে চিকেন স্যান্ডউইচ । এরপর রিসর্টটা ভালো করে ঘুরে দেখলাম । এ’কদিন সকালে বেরিয়ে গেছি, অন্ধকার হওয়ার পরে ফিরেছি কাজেই রিসর্টটা দেখার সুযোগ পাওয়া যায়নি । পাহাড়ের ধাপে ধাপে রিসর্টের বিভিন্ন কটেজগুলো ঘুরে টুরে দেখলাম



দুপুরে ভাত, আলুর দম আর চিকেন লোকাল স্টাইল নেওয়া হল । খরচ পড়ল ২৪২/- ।











রিনচেনপং মনাস্ট্রী
দুপুরে পৌনে দু’টোর সময়ে বেরোলাম লোকাল সাইট-সিয়িং করতে । প্রথমে গেলাম ‘রিনচেনপং মনাস্ট্রী’তে । এটা কালুক থেকে মিনিট পনেরো লাগে । জায়গাটা খুব একটা ঘ্যাম কিছু নয় আর সেই জন্যই বোধহয় একটা স্বাভাবিক সৌন্দর্য্য আছে । আমরা যখন গেলাম তখন প্রার্থনা চলছিল, ফলে আমাদের আর ভেতরে ঢোকা সম্ভব হল না । মনাস্ট্রীর সামনে একটা বিশাল ফাঁকা মাঠ আছে যেখানে দুপুরের রোদে হাঁটতে বেশ ভালো লাগে ।

ওল্ড ব্রিটিশ বাংলো
এরপর গেলাম ‘ওল্ড ব্রিটিশ বাংলো’য় । নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে জায়গাটা আসলে কি, তাই আর আলাদা করে বলছি না যে এটা আসলে ব্রিটিশদের একটা পুরনো বাংলো । বাংলো যেরকম হয়, একটা একতলা বাড়ি, মাথায় তেকোনা ছাদ, সামনে লম্বা বারান্দা আর তার সামনে মোরামের রাস্তার দু’দিকে ফুলগাছ – এ’সবই আছে । বাংলোর পেছনে চাকরবাকরদের থাকার ঘরও আছে । এখানে আমরা ছাড়া আর কোনও লোকজন ছিল না, মিনিট পনেরো ঘুরে আবার গাড়িতে উঠে পড়লাম ।

ব্রিটিশ বাংলোর রাস্তাতে পড়ে ‘পয়জন লেক’ । এই লেকে এখন জল নেই, শুধু বর্ষাকালে এখানে জল থাকে । ব্রিটিশদের সঙ্গে নেপালীদের যুদ্ধের সময়ে নেপালীরা এই লেকের জলে বিষ গাছের পাতা মিশিয়ে ব্রিটিশদের হত্যা করে – সেই থেকে পয়জন লেক । আমরা পাহাড়ের ওপরের রাস্তা থেকে নিচে লেকটা দেখলাম, তবে লেকের কাছে আর যাইনি ।

'রবীন্দ্র স্মৃতি ভবন' নামক জায়গা থেকে পাহাড়ের দৃশ্য
এরপর আজকের এবং আমাদের বেড়ানোর শেষ দ্রষ্টব্য – ‘রবীন্দ্র স্মৃতি ভবন’ । এই জায়গাটার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কি সম্পর্ক বুঝলাম না, একটা পায়ে চলা পথে মিনিট পাঁচেক চলার পর একটা ভাঙাচোরা বসার জায়গা । এখান থেকে অন্যান্য পাহাড়ের ঢেউ খুব সুন্দর দেখা যায় কিন্তু ওই পর্যন্তই । জায়গাটার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক আছে এরকম কোনও প্রত্যাশা নিয়ে গেলে হতাশ হতে হবে, তবে দেখার জায়গা হিসেবে চলনসই ।

মন্দিরের সামনে থেকে কালুক শহর
ড্রাইভার আমাদের কালুক বাজারে ছেড়ে দিল লোকাল সাইট-সিয়িং এর জন্য লাগল ৬০০/- । দুপুর তিনটে বাজে, এক্ষুণি রিসর্টে ফেরার মানে হয় না, সেই জন্য আমরা আশপাশটা একটু হাঁটলাম । কালুক বাজারে ওই এলাকার একটা ম্যাপ আছে, সেটায় কোন জায়গা কতদূরে এসব লেখা আছে । সেই ম্যাপ দেখেই জানতে পারলাম ঠিক বাজারের ওপরেই পাহাড়ের ওপর একটা শিবের মন্দির আছে । সিঁড়ি দিয়ে সেই মন্দিরে উঠতে হয় । এখান থেকে পুরো কালুক শহরটা দেখা যায় । মন্দিরটা দেখার সেরকম কিছু না থাকলেও এখানকার দৃশ্য অত্যন্ত মনোরম । কালুকে গিয়ে এই জায়গাটা একবার না গেলে সত্যিই কিছু না দেখা থেকে যাবে ।

পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে এসে আমরা কিছু দোকানপাট দেখলাম । পুরো কালুক বাজারে সবমিলিয়ে  বোধহয় ২৫ – ৩০ টা দোকান আছে, যার মধ্যে অন্ততঃ ৫ টা মদের দোকান । বাকি দোকানগুলোয় মাছমাংস, মনিহারি, মুদির জিনিস পাওয়া যায় । আমাদের কিছু উপহার দেওয়ার মতো জিনিস কেনার ছিল – কিন্তু ওখানে সেরকম দোকান নেই বললেই চলে । ঢাকনা দেওয়া চিনামাটির নক্সা করা কাপ পাওয়া যায় (যেগুলোর দাম ৪০/- করে) কিন্তু সেগুলো ভেঙ্গে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে । অনেক খুঁজে আমাদের রিসর্টের রাস্তার সামনের একটা দোকান থেকে কিছু জিনিস কেনা হল । হয়তো প্রতিযোগিতা নেই বলেই এখানে জিনিস পত্রের দাম একেবারেই কমাতে চায় না । সবমিলিয়ে আমাদের ৫৮০/- হল যা অনেক দরদাম করেও ৫৬০/- নিচে নামানো গেল না ।

দ্য লাস্ট সাপার অ্যাট কালুক
রিসর্টে ফিরে এলাম । এটাই আমাদের কালুকে শেষ রাত্রি – পরেরদিন সকালে আমাদের এন জে পি র জন্য বেরিয়ে পড়তে হবে । সন্ধ্যেবেলা যাবতীয় গোছগাছ সেরে নিলাম । ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে সব টাকা পয়সাও মিটিয়ে দিলাম গাড়ির জন্য আমাদের মোট দিতে হল ১২,০০০/- (এন জে পি থেকে কালুক ৩,০০০ + পেলিং এর দিকের সাইট-সিয়িং ২,৫০০ + নামচির দিকের সাইট-সিয়িং ৩,০০০ + লোকাল সাইট-সিয়িং ৬০০ + কালুক থেকে এন জে পি ৩,০০০ - ছাড় ১০০) । আমরা সাধারণতঃ শেষদিনের ডিনারটা একটু ভালো কিছু করি, তাই মিক্সড্‌ ফ্রাইড রাইস আর চিকেন মাঞ্চুরিয়ান অর্ডার দেওয়া হল । খরচ পড়ল ৩০৮/- ।

এই গাড়ি করেই ঘুরেছিলাম
৩১শে ডিসেম্বর, সোমবার আমাদের ফেরার ট্রেন উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেসের এন জে পি থেকে ছাড়ার সময় বিকেল ৫:৪০, কিন্তু ড্রাইভার বলল রাস্তায় অনেক জায়গায় কাজ হচ্ছে আর বিভিন্ন জায়গায় যানজট হচ্ছে – তাই ঝুঁকি নিয়ে দেরি করে বেরনো ঠিক হবে না । তাই পরেরদিন সকালে ঠিক আটটার সময়ে আমরা নিজেদের আনা খাবার দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়লাম কালুক থেকে । বেরনোর সময়েও আরেকদফা সিল্কের কাপড় দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হল । কাঞ্চনজঙ্ঘাকে একবার শেষবারের মতো অভিবাদন করে গাড়িতে উঠে পড়লাম ।

এন জে পি স্টেশনে - ফেরার পথে
জোড়থাং পৌঁছলাম সকাল দশটায় । এখানে দাঁড়ানোর কোনও দরকার নেই, তাই আরও এগিয়ে চললাম । রাস্তায় সেরকম দাঁড়াতে কোথাও হয়নি, দাঁড়াতে হল সেভক এর কাছে পৌঁছে – এখানে রাস্তায় বেশ যানজট হয় । পাহাড় থেকে সমতলে নেমেও যানজট অব্যাহত রইল । ড্রাইভার সুরেশ গুরুং যখন আমাদের এন জে পি তে নামাল, তখন দুপুর আড়াইটে ।



আমরা স্টেশনের লাগোয়া ভাতের হোটেলে দুপুরের খাওয়া সেরে নিলাম । ‘মটন ভাত’ (হ্যাঁ, এইসব হোটেলে মাটন লেখা থাকে না সাধারণতঃ!) ৮০/- করে । খেয়েদেয়ে ওয়েটিং রুমে এসে বসে রইলাম । সন্ধ্যে ছ’টা নাগার ট্রেন এল । মাঝরাতে ট্রেনের মধ্যেই আমরা New Year celebrate করলাম ফেরার ট্রেন অবশ্য মাত্র ৪৫ মিনিট লেট ছিল – তাও সেটা দমদম আর শিয়ালদহের জঘন্য সিগন্যালিং ব্যবস্থার জন্য । ১লা জানুয়ারি, ২০১৩ মঙ্গলবার সকালে শিয়ালদহ স্টেশন থেকে বেরিয়ে আমরা যখন ট্যাক্সিতে উঠলাম তখন সবে ছ’টা বেজেছে ।

সারসংক্ষেপঃ

. ‘অনুস্বর’ বাদ দিয়ে সিকিমের যে মাত্র কয়েকটা জায়গা আছে, কালুক তার মধ্যে একটা । কালুক শহরটা বেশ ছোট – মধুচন্দ্রিমার পক্ষে বিশেষ সুন্দর ।
. নিউ জলপাইগুড়ি (শিলিগুড়ি) স্টেশন থেকে কালুকের দুরত্ব ১১৯ কিলোমিটার । এন জে পি থেকে গাড়ির ব্যবস্থা আছে – কালুক যেতে মোটামুটি পাঁচ – সাড়ে পাঁচ ঘন্টা লাগে । ছোট গাড়ির ভাড়া ৩,০০০ টাকা । বড় গাড়ির ভাড়া ৩,৫০০ টাকা ।
. কালুকে কিছু হোটেল আছে আর আছে কিছু রিসর্ট । এদের মধ্যে ঘন্‌ডে, রিনচেনপং আর ম্যান্ডারিন উল্লেখযোগ্য । আমরা ছিলাম ঘন্‌ডে রিসর্টে যার ওয়েবসাইট হল : http://www.ghondayresort.com/
. কালুকের প্রায় সব জায়গা থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায় । রিসর্টের ঘরের ভেতর থেকেও দেখা যায় ।
৫. কালুক থেকে সাইট-সিয়িং এর জন্য প্রধানতঃ দু'দিকে যাওয়া যায় - উত্তর-পশ্চিম আর দক্ষিণ । উত্তর-পশ্চিমে পেলিং এর দিকে কিছু দেখার জায়গা আছে - ছোটগাড়ির ভাড়া পড়ে ২,৫০০ টাকা । দক্ষিণে নামচির দিকে যেতে পড়ে ৩,০০০ টাকা ।
৬. এগুলো বাদ দিয়ে লোকাল সাইট-সিয়িং আছে যেটা দেখার জন্য গাড়ি ভাড়া না করে লোকাল গাড়িতেও ঘোরা যেতে পারে । গাড়ি ভাড়া করলে ৬০০ টাকা মতো পড়বে ।
৭. কালুকে ঘোরাঘুরি করার জন্য ড্রাইভার সুরেশ গুরুং এর সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে - ড্রাইভারের সঙ্গে সরাসরি কথা বললে গাড়িভাড়া কিছুটা কম করা যায় । সুরেশ গুরুং এর মোবাইল নম্বর - ৯৬৪৭৮৫৬১৯৫ ।
৮. কালুকে কেনাকাটার জন্য দোকানপাট নেই বললেই চলে - মাত্র একটা-দু'টো দোকানেই কিনে নিয়ে আসার মতো কিছু পাওয়া যায় ।

উপসংহারঃ

কাঞ্চনজঙ্ঘা
মধুচন্দ্রিমা যাপনের জন্য কালুক একটা খুব সুন্দর জায়গা - কিন্তু তার মানে এই নয় যে তাছাড়া এখানে যাওয়ার মানে হয় না । জায়গাটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা, তাই যারা বেশি লোকজনের ভীড় পছন্দ করে না, তাদের জন্য বিশেষ আকর্ষণীয় । দার্জিলিঙ, গ্যাংটক, কার্সিয়ং, কালিম্পং আর পেলিং এ যারা যেতে চায় না, তাদের পক্ষেও কালুক একটা ভালো দেখার জায়গা । এখানে তিনদিনের বেশি থাকার কোনও মানে হয় না, কারণ তাহলে হোটেলে বসে থাকা ছাড়া আর কিছুই করা যাবে না । হয়তো ধীরে ধীরে কালুকও ট্যুরিস্টদের ভীড়ে একসময়ে ঘিঞ্জি হয়ে যাবে - তখন আর এখনকার মতো মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করা যাবে না । কাঞ্চনজঙ্ঘার কোলে সিকিমের আরেকটা শহর দার্জিলিঙ বা গ্যাংটক হয়ে ওঠার আগে একবার কালুক ভ্রমণ করে আসাই ভালো !


কালুক ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here: