আমি ব্লগ লেখার খুব বেশি সমর্থক কোনওদিনও ছিলাম না, সত্যি কথা বলতে কি এখনও যে আছি তা নয় । তার একটা প্রধান কারণ আমার ধারণা ব্লগ লেখার থেকেও পড়া অনেক বেশি ক্লান্তিকর । অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অনেক সময়ই পড়তে শুরু করে শেষ করা হয়ে ওঠে না । নিজের ধৈর্য এবং/অথবা আগ্রহের অভাবকে 'ঠিক আছে, বাকিটা পরে পড়ব' জাতীয় অজুহাত দিয়ে ঢেকে দিই - আর আমরা সবাই জানি সেই 'পরে' টা আর কখনওই আসে না । তো, এই কারণে আমি ঠিক করেছি আমার ব্লগকে কখনওই অন্যের ক্লান্তির কারণ ঘটাব না, আমার ব্লগের বিষয় হবে প্রধানতঃ ভ্রমণ । আমার মতো যেসব বাঙালিরা ঘুরতে ভালোবাসে, তাদের জন্য আমার ব্লগ হবে তথ্যের একটা উৎস । আমার নিজের একটা অভ্যেস আছে, কোনও জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার আগে সেই জায়গাটা সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, আর ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে আমার বরাবরই মনে হয়েছে যে ইন্টারনেটে লেখালেখি করার ব্যাপারে বাঙালিদের থেকে কুঁড়ে খুব কম শিক্ষিত জাতই আছে । আমার মতো যেসব বাঙালিরা আছে, যারা ইন্টারনেটে কোনো একটা ইংরিজীতে লেখা দেখলেই না পড়ার চেষ্টা করে, তাদের জন্য আমার ব্লগ সহায়ক হবে, এই বিশ্বাস নিয়ে শুরু করছি আমার ভ্রমণকাহিনী । আগেই বলে রাখি, আমি স্ট্যাটিসটিক্সের ছাত্র ছিলাম, তাই আমার ব্লগে তত্ত্বের থেকে তথ্যের দেখাই মিলবে বেশি ।

Thursday, January 2, 2014

মুর্শিদাবাদ ভ্রমণ

ছোটবেলায় ইতিহাস বইতে পড়া বাংলার ইতিহাসের কথা বলতে গেলে সবচেয়ে বেশি করে কোন্‌ জায়গাটার কথা মনে পড়ে ? (আমার এই প্রশ্নের উত্তর 'মুর্শিদাবাদ'ই হবে যেহেতু এই লেখা 'মুর্শিদাবাদ ভ্রমণ' সম্পর্কে । তা নাহলে গৌড়, নদীয়া, বাঁকুড়া, বিষ্ণুপুর - এসবও হতে পারত !) হ্যাঁ, মুর্শিদাবাদ । মুর্শিদকুলি খাঁ থেকে শুরু করে নবাব সিরাজ-উদ্‌-দৌলা পর্যন্ত বাংলার নবাবদের স্মৃতি যেখানে জড়িয়ে আছে, তাঁদের ব্যবহৃত সরঞ্জাম আর জীবনযাপনের ইয়ে যেখানে ছড়িয়ে আছে - সেই মুর্শিদাবাদ । নবাব পরবর্তী যুগের হাজারদুয়ারি যেখানে আছে - সেই মুর্শিদাবাদ । ইতিহাস যেখানে জীবন্ত হয়ে মানুষের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ার মতো চলতে থাকে - সেই মুর্শিদাবাদ ।

মুর্শিদাবাদ স্টেশন
২০১৩ সালটা  ইতিহাস হয়ে যাওয়ার কয়েকমূহুর্ত আগে আমাদের যাত্রা শুরু হল এই ঐতিহাসিক জায়গার উদ্দেশ্যে । ৩১শে ডিসেম্বর সকাল ৬:৫০ এ কলকাতা স্টেশন থেকে হাজারদুয়ারি এক্সপ্রেসে আমরা মুর্শিদাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম । এবারে আমাদের দল আটজনের - আমি আমার স্ত্রী, বাবা, মা ছাড়া আমার স্ত্রীর কলিগ নন্দিনীদি, দীপঙ্করদা আর ওঁদের যমজ ছেলে সায়ক ও সৌনক । (নন্‌-আইডেন্টিক্যাল ট্যুইন্স)  পৌঁছনোর নির্ধারিত সময় বেলা ১১:১৮ হলেও আমরা পৌঁছলাম দুপুর দেড়টায় । এর কারণ হল ঐদিন সকালের লালগোলা প্যাসেঞ্জার বাতিল থাকায় আমাদের  ট্রেনটা রাণাঘাটের পর থেকে অল্‌ স্টপ্‌ হয়ে গেল (পরে অবশ্য জেনেছিলাম এটা শুধু ঐদিন হয়েছে এমন নয়, এই ব্যাপারটা ওই লাইনের প্রায় রোজকার ঘটনা) ।

যে টাঙ্গা আমরা চড়েছি
মুর্শিদাবাদ স্টেশনটা খুব সুন্দর দেখতে - হাজারদুয়ারীর আদলে তৈরি করা । স্টেশন থেকে আমাদের 'হোটেল মঞ্জুষা' প্রায় দু'কিলোমিটার দূরে, তাই টাঙ্গা নেওয়া হল । আটজনের জন্য দু'টো টাঙ্গা । এই টাঙ্গায় চড়াটা আমার মনে হয় সবার কাছেই বেশ উপভোগ্য আর এই সুযোগ খুব বেশি জায়গায় পাওয়াও যায় না । পিচের রাস্তার ওপর দিয়ে ঘোড়ার 'খুট্‌ খুট্‌' শব্দ তুলে এগিয়ে চলা আর তার সঙ্গে সহিসের মাঝে মাঝে ছড়ি দিয়ে ঘোড়াকে আল্‌তো করে মারা আদর করা - সবমিলিয়ে ব্যাপারটা বেশ ভালো লাগে । আমাদের হোটেল হাজারদুয়ারির একেবারে সামনে গঙ্গার পাশে, তাই হোটেলে পৌঁছনোর পথে টুক্‌ করে একবার হাজারদুয়ারি দেখা হয়ে গেল । টাঙ্গাওয়ালারা আমাদের থেকে মাথাপিছু ১০ টাকা করে নিল ।

আমাদের ঘর থেকে গঙ্গার দৃশ্য
'হোটেল মঞ্জুষা' মুর্শিদাবাদের ভালো হোটেলগুলোর একটা । ডিসেম্বর-জানুয়ারি হচ্ছে মুর্শিদাবাদের যাকে বলে 'পীক্‌ সিজন্‌' কাজেই আগে থেকে বুক করে না এলে ঘর পাওয়া অসম্ভব, অন্ততঃ মঞ্জুষার মতো হোটেলে । আমরা দো'তলায় তিনটে ঘর নিয়েছিলাম যার ভাড়া ৮০০ টাকা/প্রতিদিন । (আমাদের একটু চেনা থাকায় ৫০ টাকা করে ছাড় পেয়েছি) ঘর যে খুব কিছু ভালো তা নয়, আয়তনে বেশ ছোট । ঘরে খাট, টিভি, একটা টেবিল, দু'টো চেয়ার আর সেইসঙ্গে অ্যাটাচ্‌ড বাথ সবই আছে কিন্তু যেটা প্রায় নেই সেটা হল হাঁটাচলার জায়গা । কিন্তু আগেই বলেছি, এর থেকে ভালো হোটেল মুর্শিদাবাদে বিশেষ পাওয়া যাবে না, পয়সা ফেললেও না । তবে প্রত্যেকটা ঘরের সঙ্গে একটা করে সুন্দর বারান্দা আছে, আমাদের তিনটে ঘরের মধ্যে দু'টো গঙ্গার দিকে । সেদিকের প্রাকৃতিক দৃশ্য খুবই সুন্দর ।

আমরা দুপুরে খেয়ে নিলাম । এখানে ভাত মিল্‌ সিস্টেমে - ভাত ডাল ভাজা তরকারি আর সেইসঙ্গে মাছ বা মাংস । আমাদের সবমিলিয়ে পড়ল মোট ৯৪০ টাকা ।

এরপর আমরা হোটেলে ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করে নিলাম আমরা কবে কোথায় ঘুরব । আমরা ফিরে যাব পরশুদিন দুপুরের ট্রেনে, তাই আমাদের হাতে আজ বিকেল, কাল সারাদিন আর পরশু সকাল । এর মধ্যে আগামীকাল ১লা জানুয়ারি এবং এইদিন হাজারদুয়ারি তথা মুর্শিদাবাদে প্রচন্ড ভীড় হয় । তাই ঠিক হল আমরা আগামীকাল গঙ্গার ও'পারের মুর্শিদাবাদ ঘুরব আর পরশুদিন সকালে এ'পারের মুর্শিদাবাদ ঘুরব । তাহলে আজ বিকেলে আমরা কি করব ? প্রকৃতিকে দেখবো !

হোটেল মঞ্জুষার বাগান
এ'বার সেই বিশেষ ব্যাপারটার সম্পর্কে লিখি । হোটেল মঞ্জুষার একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল এর বাগান ।হোটেলের চারদিকে নানারকম গাছ লাগিয়ে একটা অসাধারণ বাগান তৈরি করা হয়েছে । আর এর সম্পূর্ণ কৃতিত্বই হল ম্যানেজার মৃদুল সরকার-এর । (এই প্রথম আমার লেখায় কোনও হোটেলের ম্যানেজারের নাম লিখলাম - এর থেকে বোঝা যাবে ভদ্রলোক কতটা বিশিষ্ট) আমাদের পরিচিত প্রায় সব গাছ উনি লাগিয়েছেন তো বটেই, সেইসঙ্গে এমন কিছু গাছ লাগিয়েছেন যেগুলো আমরা যারা শহরে থাকি তারা শুধু নামই শুনেছি, কোনওদিন চোখে দেখিনি । এমনকি এরকম গাছও ওনার বাগানে আছে যেগুলো প্রকৃতপক্ষে সমতলের গাছই নয়, পার্বত্য অঞ্চলের গাছ ! শুধুমাত্র মৃদুলবাবুর আদর আর যত্নে এরা এই পরিবেশে সবার সঙ্গে একসঙ্গে যে শুধু বেঁচেই আছে তাই নয়, দিব্যি ফুল-ফল ফলাচ্ছে । সব দেখে অরণ্যদেবের নন্দনকাননের কথা মনে পড়ে যায় যেখানে বিভিন্নধরনের প্রাণীরা সহাবস্থান করে।
মৃদুল সরকারের নন্দন কাননের ফুল
আমি এখানে কোনও গাছের নাম আলাদা করে লিখছি না, কারণ ওনার বাগানের সব গাছই নিজস্ব বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, স্ব-স্ব মহিমায় বিদ্যমান, তাই কয়েকটা নাম লিখলে আমার মতে বাকিদের প্রতি অবিচার করা হবে আর সবার নাম এখানে লেখা সম্ভব নয় । এখানে শুধু একটা বিশেষ গাছেরই উল্লেখ করছি (আমার ভ্রমণ অভিজ্ঞতা লেখার অভ্যেস আছে শুনে মৃদুলবাবু আমাকে বারবার সেই গাছের ব্যাপারে উল্লেখ করতে বারণ করেছেন, তাই নামটা আর লিখলাম না) যে গাছ ওনার বাগানে তিন-চারটে আছে । এই গাছ যে শুধু দুষ্প্রাপ্য তাই নয়, দুর্মূল্যও । মৃদুলবাবু সবাইকে এই গাছ দেখান না, আমাদের গাছের সম্পর্কে আগ্রহ আছে বলে দেখালেন ।

মঞ্জুষার বাগান থেকে গঙ্গার ওপারে সূর্য্যাস্ত
বাগান দেখা শেষ হলে আমরা গঙ্গার ধারে গিয়ে বসলাম । এই বসার জায়গাও হোটেল মঞ্জুষার নিজস্ব । এখানে আমরা বসে বসে সূর্য্যাস্ত দেখলাম । তারপর ঘরে এসে সন্ধ্যেবেলা চা-টা খেয়ে একটু হাঁটতে বেরোলাম । মৃদুলবাবুর দৌলতে এই সান্ধ্যভ্রমণে আমাদের আরও একটা জায়গা দেখা হয়ে গেল কিন্তু সেটার কথাও ওনার অনুরোধেই আর লিখছি না । শুধু এ'টুকু বলে রাখি মুর্শিদাবাদে এসে এই জায়গাটা দেখার সুযোগ প্রায় কেউই পায় না, আমরা মৃদুলবাবুর সৌজন্যেই পেয়েছি, যিনি ওখানকার একজন বেশ 'ইনফ্লুয়েন্সিয়াল' লোক । হোটেল মঞ্জুষায় উঠে মৃদুল সরকারের সঙ্গে ভাব জমাতে পারলে উনি এই সুযোগ করে দিলেও দিতে পারেন !

রাতের আলোয় হাজারদুয়ারি
আমরা রাতের আলোয় হাজারদুয়ারি দেখলাম । অন্ধকার হয়ে গেছে, আর হাজারদুয়ারি বিকেল ৫টায় বন্ধ হয়ে যায় । হাজারদুয়ারির চারদিকে হলুদ আলো জ্বালিয়ে রাখে আর সবমিলিয়ে খুব সুন্দর লাগে । আমরা কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে কিছু কেনাকাটা করে নিলাম । এখানে একটা বিশেষ জিনিসের কথা উল্লেখ করি । সেটা হল একটা দোকানে ডাবের খোলা দিয়ে নানারকম মূর্তি তৈরি করে সাজিয়ে রাখা রয়েছে । শিল্পী নিজেই বিক্রেতা, আর মূর্তিগুলো খুবই সুন্দর । শুধুমাত্র নানারকম সাইজের ছুরির সাহায্যে পুরোপুরি হাতে তৈরি করা হয়েছে হনুমান, গনেশ, বুদ্ধের মুখ, রবীন্দ্রনাথের মুখ আরও কত কি ! শিল্পীর হাতের কাজের তারিফ না করে পারলাম না আর সেইসঙ্গে দু'টো কিনেও ফেললাম । একেকটা ১৮০ টাকা করে নিল ।

হোটেলের ছাদ থেকে ইমামবাড়ার অংশ
কর্কটক্রান্তিরেখার কাছাকাছি বলে মুর্শিদাবাদের গরম আর ঠান্ডা দু'টোই খুব বেশি পড়ে (এটা লেখার যে বিশেষ দরকার ছিল তা নয়, তবে নন্দিনীদি ভূগোলের শিক্ষিকা কিনা, আমাকে যেন ভূগোলে একেবারে অজ্ঞ না ভাবেন তাই এই জ্ঞানটা ফলালাম !) আর এই ঠান্ডাটা বেশ মালুম পড়ছিল যত রাত বাড়ছিল । সাড়ে সাতটা নাগাদ আমরা হোটেলে ফিরে এসে যে'যার ঘরে গুটিশুটি মারলাম । রাত্রিবেলা আমি একবার ছাদে গেলাম । আমাদের হোটেলের ছাদ থেকে হাজারদুয়ারি আর ইমামবাড়ার বেশ কিছুটা দেখা যায় আর রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে দেখতে বেশ লাগে । কিচ্ছুক্ষণ ছাদে কাটিয়ে নেমে এসে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম । রাতেও মোটামুটি দুপুরের মতো একই মেনু - শুধু এ'বেলা ভাতের বদলে রুটি নেওয়া হল । এবারে মাথাপিছু ১২০ টাকা করে পড়ল ।

ঘরে এসে ঘুমিয়ে পড়লাম ।

হোটেলের ছাদ থেকে সকালের আলোয় হাজারদুয়ারি
Happy New Year, 2014! নতুন বছর - নতুন দিন - নতুন সকাল - "নতুন সূর্য্য আলো দাও আলো দাও" (না, এটা বাড়াবাড়ি হয়ে গেল !) সকালে উঠে প্রথমেই গেলাম ছাদে । সকালের রোদে ছাদ থেকে চারপাশের দৃশ্য মুগ্ধ করে দিল ! বিশেষ করে - হ্যাঁ হাজারদুয়ারি । মনে হতে পারে আমি হাজারদুয়ারি নিয়ে বাড়াবাড়ি করছি, কিন্তু এই বাড়াবাড়িটা লোকে দার্জিলিঙ-সিকিমে গেলে কাঞ্চনজঙ্ঘা নিয়েও করে আর দীঘা-পুরীতে গেলে সমুদ্র নিয়েও করে । কাজেই, এটাও চলতে পারে ।

ভট্‌ভটিতে আমাদের গাড়ি উঠছে
আমাদের গাড়ি আগেই ঠিক করা ছিল, গঙ্গার ওপারের মুর্শিদাবাদ ঘোরার জন্য । সুমো - ভাড়া ১,৫০০ টাকা (গঙ্গা পারাপারের ১২০ টাকা নিয়ে) গাড়ি করে প্রথমে একজায়গায় গিয়ে রাধাবল্লভী দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে নিলাম আর তারপর বেরিয়ে পড়লাম আমাদের গন্তব্যের দিকে । এখানে গঙ্গা পেরোনোর কোনও ব্রীজ নেই, ভট্‌ভটি নৌকো করে মানুষ এবং গাড়ি পারাপার করে । পাশের ছবি থেকে এর সম্পর্কে বোঝা যাচ্ছে, তাই আর ডিটেলে লিখলাম না ।

খোসবাগে সিরাজ-উদ-দৌলার সমাধি
আমাদের প্রথম দেখার জায়গা 'খোসবাগ' - সিরাজ-উদ্‌-দৌলার সমাধি । এখানে সিরাজ ছাড়াও তাঁর পত্নী লুৎফান্নিসা, দাদু আলিবর্দী খাঁ এবং তাঁদের পরিবারের অনেকের সমাধি রয়েছে । তবে কোন্‌টা কার সমাধি নিজে থেকে জানার কোনও উপায় নেই কারণ সমাধির ওপরে আরবিতে লেখা । শুধুমাত্র সিরাজ-এর সমাধিটাই চিনতে পারা যায় এর কেন্দ্রীয় অবস্থান দেখে । সমাধি ছাড়াও এখানে রয়েছে খোসবাগ মস্‌জিদ যেটা নবাব আলিবর্দী খাঁ তৈরি করিয়েছিলেন । জায়গাটা বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় ।







রানীভবানীর তৈরি চারমন্দিরের একটা
এরপর আমাদের দ্বিতীয় গন্তব্য - রানীভবানীর মন্দির । রানীভবানী ছিলেন অনেকটা দক্ষিণেশ্বরের রানী রাসমণির মতো । তিনি এখানে চারটি মুখোমুখি মন্দির তৈরি করান । এই মন্দিরের গায়ে পুরাণের বহুঘটনার ছবি খোদিত আছে । বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগল এই সৌন্দর্য্য দেখতে । এই মন্দিরগুলো থেকে সামান্য কিছু দূরে রানীভবানীর মন্দিরও আছে ।

জগদ্বন্ধু ধাম
এরপর আমরা গেলাম 'জগদ্বন্ধু ধাম' দেখতে । এই জায়গার কোনও ঐতিহাসিক গুরুত্ব নেই, এখানে জগদ্বন্ধুর জন্ম হয়েছিল । এখানকার মন্দিরটা দেখতে খুব সুন্দর - যেটা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে সেটা হল মন্দিরের গায়ে-মাথায় খোল আর কর্তালের ছবি আর মডেল । মন্দিরের লাগোয়া নাটমন্দিরটা বেশ বড় আর পরিষ্কার ।



কিরীটেশ্বরী মন্দির
জগদ্বন্ধুধামের পরে আমাদের চতুর্থ গন্তব্য কিরীটেশ্বরী মন্দির । পুরাণ মতে এখানে সতীর কিরীট পড়েছিল - সেই থেকেই নাম কিরীটেশ্বরী মন্দির । যদিও মন্দির হিসেবে খুব ঘ্যাম কিছু না আর সেইজন্যই পুজো-টুজো দেওয়ার কোনও ব্যাপার নেই । আমরা কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে এগিয়ে চললাম আমাদের আজকের পঞ্চম তথা শেষ গন্তব্যের দিকে ।

রোশনবাগ
রোশনবাগ । জায়গাটা অনেকটা খোসবাগের মতোই তবে খোসবাগের থেকে এর গুরুত্ব কম । এখানে সুজাউদ্দীন খাঁ-এর সমাধি এবং মসজিদ রয়েছে ।








আমাদের প্রথমদিনের ঘোরা শেষ - দুপুর একটা বাজে । রোশনবাগটা একেবারেই গঙ্গার ধারে । আবার একইভাবে নৌকো করে গঙ্গার এ'পারে এলাম । গাড়ি আমাদের একটা ভাতের হোটেলের সামনে নামিয়ে দিল । এখান থেকে আমাদের হোটেল বেশ কাছে - খাওয়ার পরে আমরা হেঁটে ফিরে যাব ।

সেই মিল্‌সিস্টেমের ভাত, সেই ডাল, সেই তরকারি আর সেই মাছ বা মাংস । এবারে আটজনের জন্য মোট খরচ হল ৬৪০ টাকা ।

এরপর হোটেলে ফিরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম । সন্ধ্যেবেলা আলাদা করে কিছু করার নেই, আড্ডা মেরে দিব্যি কেটে গেল । রাতের খাবার আজ একটা অন্য হোটেল থেকে খাওয়া হল । এটার রান্না আগের সবগুলোর চেয়ে ভালো আর এখানকার খাবার সবচেয়ে সস্তা । এখানে আমাদের খরচ পড়ল মাথাপিছু ৬০ টাকার মতো । রাতে শুয়ে পড়লাম । পরেরদিন আমরা মুর্শিদাবাদ ভ্রমণের প্রধান জিনিসগুলো দেখব আর সব দেখে টেখে ফিরেও যাব !

২ রা জানুয়ারি, ২০১৪ - বৃহস্পতিবার । আমাদের আজ ফিরে যাওয়ার দিন, সকাল ন'টায় হোটেল ছেড়ে দিতে হবে । সেইমতো ব্যাগ প্যাক করে সেগুলো ম্যানেজারের জিম্মায় রেখে হোটেলের পাওনাগন্ডা মিটিয়ে আমরা যখন হাজারদুয়ারির উদ্দেশ্যে বেরোলাম তখন বেলা দশটা বাজে । যাওয়ার পথে একটা হোটেলে ব্রেকফাস্ট করে নেওয়া হল । মুর্শিদাবাদে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি যে এখানকার কোনও হোটেলেই মাটন্‌ পাওয়া যায় না । এদিকে আমি আর দীপঙ্করদা বাকিদের তুলনায় একটু বেশিই মাংসাশী । তাই প্রথম দিন থেকে মাংসের খোঁজে ব্যর্থ হতে হতে শেষ পর্যন্ত মাটন্‌ পাওয়া গেল এই হোটেলেই । এরা এমনিতে মাংস করে না, তবে আমাদের আটজনের জন্য আজ দুপুরে করে দেবে । বাকিসব একই মিলসিস্টেম্‌ - শুধু মাছ বা মুরগীর বদলে মাটন্‌ । মাথাপিছু পড়বে ২০০ টাকা করে ।

এরপর আমরা এগিয়ে গেলাম হাজারদুয়ারির দিকে । হাজারদুয়ারি খোলে সকাল ন'টায় । হাজারদুয়ারিতে ঢোকার টিকিট ১০ টাকা করে আর পনেরো বছরের নিচে টিকিট লাগে না । ভেতরে কোনও ক্যামেরা এমনকি মোবাইল ক্যামেরাও নিয়ে যাওয়ার নিয়ম নেই আর লুকিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেও লাভ নেই । গেটে খুব খুঁটিয়ে সিকিউরিটি চেকিং হয় আর এমনকি সঙ্গে যদি ছবি-তোলা-যায়-না মোবাইল থাকে, সেটাকেও এরা ভালোভাবে দেখে নেয় ।

মুর্শিদাবাদের ইমামবাড়া
"হাজারদুয়ারি ভালোভাবে ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেব" বলে এখানে অনেক গাইড্‌ ঘোরাঘুরি করে । মুর্শিদাবাদে যেকোনো জায়গাতেই এই গাইড্‌দের পাওয়া যায় আর আমার মতে সবজায়গাতেই একজনকে নিয়ে নেওয়া ভালো । কারণ মুর্শিদাবাদ প্রধানতঃ ঐতিহাসিক জায়গা, তাই দেখার সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসটা একটু জেনে নিলে ভালোই লাগবে । 'মতিঝিল'-এ আমাদের গাইড একটা খুব সুন্দর কথা বলেছিল - "জানলে ইতিহাস আর না জানলে মাটির দেওয়াল !" যাই হোক, হাজারদুয়ারিতে আমরা একজন গাইড ঠিক করলাম যে আমাদের হাজারদুয়ারির মাঠে 'বাচ্চাওয়ালী কামান', 'সিরাজের মদিনা', 'ইমামবাড়া' ইত্যাদি দেখাল । আর সেইসঙ্গে হাজারদুয়ারির বাইরে থেকে কিছু জিনিস দেখাল । এর জন্য সে নিল ১০০ টাকা । পরে বুঝলাম যে এইসব গাইডরা কেউই ভেতরে ঢুকে কিছু দেখায় না, কিন্তু সেটা এরা প্রথমে বলে না । আমরা না জেনে ১০০ টাকা দিয়ে ঠকেছি । এদেরকে কোনওভাবেই ৫০ টাকার বেশি দেওয়ার মানে হয় না ।

হাজারদুয়ারি
হাজারদুয়ারির সঙ্গে কিন্তু সিরাজ-উদ্‌-দৌলার কোনও সম্পর্ক নেই । সিরাজের মৃত্যুর অনেক পরে হাজারদুয়ারি তৈরি করা হয় । হাজারদুয়ারির সঙ্গে কলকাতার টাউনহলের আকৃতির সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায় - কারণ দু'টোই একই কোম্পানীর ডিজাইন করা । আমরা হাজারদুয়ারির ভেতরে ঢুকলাম । হাজারদুয়ারিতে এক হাজারের মতো দরজা আছে, সেই থেকেই এই নাম, দরজাগুলোর মধ্যে কিছু আসল আর কিছু নকল - এসব মোটামুটি সবাই জানে । কিন্তু যেটা নিয়ে মতানৈক্য শুনেছি সেটা হল কতগুলো আসল আর কতগুলো নকল । বিভিন্ন জায়গা থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিরে লিখছি ১০০ নকল আর ৯০০ আসল । এই নকল দরজাগুলো চট্‌ করে দেখে বোঝা যায়
হাজারদুয়ারির নকল দুয়ার
না, তবে কাছে গিয়ে নিরিক্ষণ
করলে ধরতে পারা যায় । জানলাম ইঁট-চুন-সুরকির সঙ্গে খয়ের জল, আখের গুড়, ডিমের কুসুম ইত্যাদি ব্যবহার করে এই দরজা তৈরি হয়েছিল । (খুবই সুস্বাদু দরজা, তাতে আর সন্দেহ কি !) হাজারদুয়ারির ভেতরে আরেকটা আকর্ষণীয় জিনিস হল সম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার উপহার দেওয়া ১০১ বাতির একটা সুদৃশ্য ঝাড়লন্ঠন । এছাড়া হাজারদুয়ারির ভেতরে রয়েছে নবাব আর ইংরেজদের ব্যবহৃত বহু অস্ত্রসস্ত্র, জিনিসপত্র, বাসনপত্র, আসবাবপত্র, শুধু পত্র, বহু বিখ্যাত শিল্পীদের হাতে আঁকা ছবি, বিলিয়ার্ড বোর্ড, পলাশীর যুদ্ধে ব্যবহৃত সরঞ্জাম ইত্যাদি । হাজারদুয়ারি ভালোভাবে দেখতে গেলে কমপক্ষে দু-আড়াইঘন্টা সময় নিয়ে যাওয়া উচিৎ । হাজারদুয়ারি শুক্রবার বন্ধ থাকে ।

হাজারদুয়ারির ঠিক মুখোমখি রয়েছে ইমামবাড়া - এটা বাংলার সবচেয়ে বড়ো ইমামবাড়া । এটা বছরের মধ্যে শুধুমাত্র মহরমের সময়ে ১০ দিন খোলা থাকে, বাকি সারাবছর বন্ধ থাকে ।

হাজারদুয়ারি থেকে বেরোলাম তখন ঠিক বেলা বারোটা । আমাদের আজকের ঘোরার জন্য একটা ট্রেকার ঠিক করা ছিল । ঘোরাঘুরির জন্য ৮০০ টাকা আর এই ট্রেকারই আমাদের স্টেশনে পৌঁছে দেবে সে'জন্য ১০০ টাকা । ট্রেকারে চড়ে গেলাম আমাদের আজকের দ্বিতীয় গন্তব্যে ।

কামানের আঘাতে গর্ত
মোতিঝিল । গাইড - ৫০ টাকা ।
মোতিঝিল তৈরি করান নবাব আলিবর্দীর জামাই । এখানে একটা অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ আছে যেখানে একসময়ে মোতি বা মুক্তোর চাষ হতো । এখানে একটা মসজিদ আছে । সেগুলোর ইতিহাসের ডিটেলে আর যাচ্ছি না, শুধু একটা ইন্টারেস্টিং গল্প বলছি । মোতিঝিলের মসজিদের পাশে একটা ঘর আছে যার কোনও দরজা বা জানালা নেই । চারদিকে দেওয়াল আর ছাদটাও ঢাকা । কথিত আছে সিরাজ এক ফৈজীর ওপর রেগে গিয়ে তাঁকে মাঝখানে রেখে এই ঘর তৈরি করান । অনেকে মনে করতেন এইঘরে অনেক মণিমুক্তোও আছে । কিন্তু এর আশ্চর্য শক্ত ইঁটের গাঁথনি কেউ কোনওভাবে ভাঙতে পারেনি । পরবর্তীকালে কোনও একজন সাহেব এইঘরের দেওয়াল কামানের গোলা দিয়ে ভাঙার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন এবং সেইদিন রাতেই সাহেব মারা যান । তারপর থেকে এইঘরের দেওয়াল ভাঙার চেষ্টা আর কেউ কখনও করেনি । দেওয়ালে কামানের আঘাতের চিহ্ন আজও স্পষ্ট দেখা যায় ।

জাহানকোষা কামান
তৃতীয় গন্তব্য - জাহান কোষা কামান । গাইড লাগে  না ।
কাটরা মসজিদের ভেঙ্গে পড়া ছাদ
সাড়ে পাঁচ মিটার লম্বা আর চারফুটের মতো পরিধিবিশিষ্ট 'জাহান কোষা কামান' আরেকটা দূর্দান্ত দর্শনীয় বস্তু । এর ওজন সাত টনের বেশি । এটা শাহজাহানের রাজত্বকালে তৈরি হয়েছিল আর তৈরি করেছিলেন একজন বাঙালি ধাতুবিদ্‌ জনার্দন কর্মকার । এর বেশি বিশেষ কিছু জানি না ।

চতুর্থ গন্তব্য - কাটরা মসজিদ । গাইড - ৫০ টাকা ।
এখানে আমরা ৫০ টাকা দিয়ে একজন গাইড নিলাম যাকে না নিলে কাটরা মসজিদ ভালোভাবে দেখা হতো না । মসজিদের পিছন দিয়ে দিক ঢুকতে হয় কারণ সেখান দিয়েই প্রধান রাস্তা চলে গেছে । কাটরা মসজিদে উপাসনা ছাড়াও ছাত্রাবাস ছিল, যেখানে একসঙ্গে বহু আবাসিক একসঙ্গে থেকে পড়াশোনা করতে পারত । মসজিদের সামনের দিকে একটা বিশাল চাতাল আছে যেখানে একসময়ে অনেক মানুষ একসঙ্গে নামাজ পড়তেন । কাটরা মসজিদের সবচেয়ে আগ্রহজনক বিষয় হল এর প্রবেশসিঁড়ির নিচে রয়েছে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ-র সমাধি । নবাবের ইচ্ছানুযায়ী মৃত্যুর পরে তাঁকে এখানে কবর দেওয়া হয় । নবাব বলেছিলেন "মসজিদমে প্রবেশ করনে কে লিয়ে লোগ যব মেরে উপর সে গুজরেঙ্গে, তব যাকে মেরে পাপ ধোনে লাগেঙ্গে" । (আমার ধারণা এইভাবে শুদ্ধ হিন্দীতে বলেননি, কিন্তু মনে হল মুর্শিদাবাদ সম্পর্কে লেখার মধ্যে স্বয়ং মুর্শিদকুলি খাঁ-র একটা ডায়ালগ্‌ থাকলে বেশ হয় - তাই এটা লাগালাম) কাটরা মসজিদের প্রধান উপাসনা গৃহের ছাদে পাঁচটা গম্বুজ ছিল, যার তিনটে ভূমিকম্পে ভেঙ্গে পড়েছে । এখন এর ছাদটা পুরোপুরি অনাবৃত । ভূমিকম্প কাটরা মসজিদের আরও কিছু ক্ষতিও করেছে । মসজিদের চারকোণে চারটে মিনার ছিল যাদের মধ্যে দু'টো ভূমিকম্পে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে ।

কাটরা মসজিদ থেকে আমরা আমাদের খাবার জায়গায় এলাম । আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল বহু প্রতিক্ষিত পাঁঠার মাংসের ঝোল আর ভাত । মাংসগুলো একটু কম সেদ্ধ হলেও ঝোলটা খেতে ভীষণ সুন্দর হয়েছিল । খাওয়া শেষ করে আমাদের পরের দর্শনীয় জায়গার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম তখন দুপুর আড়াইটে বেজে গেছে । আমাদের ট্রেন বিকেল ৪:৪০ এ ।

কাঠগোলা বাগানে দুগারদের বাড়ি
পঞ্চম গন্তব্য - কাঠগোলা বাগান । গাইড - ৫০ টাকা ।
কাঠগোলা বাগানের মধ্যে আসলে রয়েছে দুগার পরিবারের বাড়ি । সম্ভবতঃ রাজস্থান নিবাসী এই দুগার পরিবার অত্যন্ত ধনী ছিলেন এবং এই বাড়িতে তাঁদের ব্যবহৃত সামগ্রী এবং আসবাবপত্র রয়েছে । এই দুগার পরিবারের বংশধর আজও জীবিত আছেন এবং কলকাতায় থাকেন । নিজেদের এই আদিবাড়ি আর সংগ্রহশালাকে সাধারণের উদ্দেশ্যে খুলে দিয়েছেন মাথাপিছু ১৫ টাকা প্রবেশমুল্যের বিনিময়ে । এই হচ্ছে মারোয়াড়ি বুদ্ধি ! দুগারদের বাড়িতে বেশ কিছু দেখার জিনিস থাকলেও খুব আগ্রহজনক কিছু নয় বরং বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে ফুলের বাগানটা খুব সুন্দর । তাছাড়া আছে একটা জৈন মন্দির যার দেওয়ালে নানারকম ভাস্কর্য্য দেখা যায় । একটা কথা বলতে পারি, সবকিছুর পরে দুগারদের বাড়ি বা কাঠগোলা বাগানের সঙ্গে ইতিহাসের কোনও সম্পর্ক নেই, কাজেই হাতে সময় কম থাকলে এই জায়গাটা না দেখলেও চলবে ।

দুপুর ৩:৩৫ বাজে ।

জগৎ শেঠের বাড়ি
ষষ্ঠ গন্তব্য - জগৎ শেঠের বাড়ি । গাইড - ৫০ টাকা ।
যদিও আমরা গাইড নিইনি । সবকিছু দেখে বুঝে নেওয়া আমাদের পক্ষে সময় আমাদের হাতে এখন আর নেই । জগৎ শেঠের বাড়িতে প্রবেশমূল্য মাথাপিছু ১০ টাকা । আমাদের সামনে সামনে একটা গ্রুপ এগোচ্ছিল, তারা একটা গাইড নিয়েছিল । আমরা সেই গ্রুপের সঙ্গে সঙ্গে চললাম আর আমাদের মোটামুটি যা দেখার-জানার তা হয়ে গেল । জগৎ শেঠের বাড়িও কিছুটা দুগারদের মতোই - পার্থক্য হল জগৎ শেঠ হলেন একজন যিনি সিরাজের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন । ইনি একজন ধনকুবের ছিলেন - সেটা ওনার বাড়ির নানারকম সরঞ্জাম থেকেই বোঝা যায় । এখানে মাটির নিচে একটা মিউজিয়াম আছে । এই মিউজিয়ামে বাংলার বিখ্যাত মসলিন্‌ দেখতে পাওয়া যায় । এই মসলিন নাকি এতই নরম যে একে আংটির ভেতর দিয়ে চালান করা যায় । সেটা প্রমাণ করার জন্যই এখানে একটা মসলিন্‌কে তিনটে আংটির ভেতর দিয়ে চালান করে দেখানো আছে । বাড়ির সঙ্গে একটা মন্দির আছে ।

বিকেল ৪ টে ।

এরপর আমাদের পক্ষে আর কিছু দেখা সম্ভব নয় কারণ আমাদের হোটেলে ফিরে মালপত্র নিয়ে স্টেশনের দিকে রওনা হতে হবে । ড্রাইভার বলল - পথে দু'তিনটে জায়গা পড়বে সেগুলো আমরা গাড়ি থেকে না নেমেও দেখতে পারি ।

নসিপুর রাজবাড়ি
সেইমতো প্রথম পড়ল নসিপুর রাজবাড়ি । এর বৈশিষ্ট্য হল এটা হাজারদুয়ারির আদলে তৈরি করা । ভেতরে ঢোকার প্রশ্নই ওঠে না, বাইরে থেকে দেখেই এগিয়ে চললাম ।







বিকেল ৪:০৫ ।

নিমকহারাম দেওড়ী
এরপর পড়ল নিমকহারাম দেওড়ী । এটা আসলে বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরের প্রাসাদ । এখানে মীরজাফরের বংশধররা এখনও বাস করেন । আগে একসময়ে এটা একটা দেখার জায়গা ছিল । পরবর্তীকালে বাসিন্দাদের আপত্তির কারণে এখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয় । (ব্যাপারটা ওনাদের পক্ষে কতদূ্র বিরক্তিকর সেটা বুঝতে পারছিলাম । নানারকম লোকজন ওনাদের বাড়ি দেখতে যেত মনে ওনাদের সম্পর্কে একরাশ ঘৃণা নিয়ে !)

বিকেল ৪:০৮ ।

আজিমুন্নেসার সমাধি
পথে শেষ দেখার জায়গা পড়ল আজিমুন্নেসার সমাধি । ইনি মুর্শিদকুলি খাঁ-র কন্যা আর এনাকেও তাঁর বাবার মতো মসজিদের সিঁড়ির নিচে সমাধিস্থ করা হয় । আমাদের মুর্শিদাবাদ দেখা শেষ - এবার আমাদের ফেরার পালা । লেকিন দিল্লী স্টেশন আবভি দূর হ্যায় !




বিকেল ৪:২০ - আমরা হোটেলে ফিরলাম । ম্যানেজারের জিম্মা থেকে আমাদের মালপত্র নিয়ে হোটেল থেকে বেরোতে সাড়ে চারটে বেজে গেল । ট্রেকারে মঞ্জুষা থেকে স্টেশনে পৌঁছতে মিনিট দশেক লাগার কথা - অর্থাৎ ৪:৪০ বাজবে । আবার এও শুনলাম ট্রেন এখানে মোটামুটি ঠিক সময়েই আসে !

আমাদের ট্রেকার স্টেশনের দিকে এগিয়ে চলেছে । পুরো রাস্তাটাই শহরের মধ্যে দিয়ে, খুব জোরে চালানো যায় না । ঘড়ি এগিয়ে চলেছে । এটা এমন একটা সময় যখন একেকটা মিনিট গুরত্বপূর্ণ । স্টেশনে পৌঁছলাম ৪:৩৭ বাজে । কোনওমতে গাড়ির ছাদ থেকে মালগুলো নামিয়ে প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে দেখি ট্রেন ঢুকছে । সৌভাগ্যক্রমে আমাদের কামরা একেবারে আমাদের সামনের থামল । প্রচন্ড ভীড়ে ঠেলাঠেলি করে ট্রেনে ওঠার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ট্রেন ছেড়ে দিল । "সী ইউ সুন, মুর্শিদাবাদ !"

ফেরার সময়েও একই বিভ্রাট । লালগোলা প্যাসেঞ্জার বাতিল কাজেই আমাদের ট্রেন রাণাঘাট পর্যন্ত সব স্টেশনে থামবে । আমরা কলকাতা স্টেশনে পৌঁছলাম তখন রাত সাড়ে দশটা আর তার আধঘন্টা পরে বাড়ি !

সারসংক্ষেপঃ

১. কলকাতা থেকে দু'তিনদিনের জন্য ঘোরার পক্ষে মুর্শিদাবাদ একটা আদর্শ জায়গা । তবে যদি ইতিহাসে একেবারেই আগ্রহ না থাকে, তাহলে বোধহয় না যাওয়াই শ্রেয় !
২. মুর্শিদাবাদে ট্রেনে যাওয়ার জন্য হাজারদুয়ারি এক্সপ্রেস বা লালগোলা প্যাসেঞ্জারে যাওয়া যেতে পারে । এছাড়া বাসেও যাওয়া সম্ভব ।
৩. মুর্শিদাবাদে যাওয়ার সবথেকে ভালো সময় হল শীতকাল কারণ অন্যান্য সময়ে এখানে কলকাতার থেকে অনেক বেশি গরম থাকে । শীতকালে গেলেও বড়দিনের ছুটি বা বিশেষ করে ১লা জানুয়ারি না যাওয়াই ভালো কারণ এই সময়ে এখানে সাংঘাতিক ভীড় হয় ।
৪. গঙ্গার দু'পাশেই নবাবদের নানারকম কীর্তি আর তাদের ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে আছে । এগুলো চাইলে গাড়িতে বা টাঙায় ঘোরা যেতে পারে ।
৫. মুর্শিদাবাদের সবথেকে আকর্ষণীয় জায়গা হল হাজারদুয়ারি । এটা বর্তমানে প্রকৃতপক্ষে একটা মিউজিয়াম যেখানে অনেক সময় নিয়ে দেখার মতো অনেক জিনিস আছে ।
৬. মুর্শিদাবাদে হোটেলের সংখ্যা খুব বেশি নয় আর ভালো হোটেল নেই বললেই চলে । আমাদের 'হোটেল মঞ্জুষা' সেই অর্থে একটা ভালো হোটেলের পর্যায়েই পড়ে । মঞ্জুষায় যোগাযোগের নম্বর : 0348-2270321.
৭. মুর্শিদাবাদে খুব ভালো খাবারের রেস্টুরেন্ট নেই, বেশিরভাগই সাধারণ ভাতের হোটেল । সেখানকার খাবারের মানও সাধারণ ।

উপসংহারঃ

গঙ্গার ওপরে হাজারদুয়ারি !
বাংলা তথা ভারতবর্ষের ইতিহাসে মুর্শিদাবাদ একটা বিশেষ ভূমিকা পালন করে । আর এই ইতিহাসই মুর্শিদাবাদের আকর্ষণ । ইতিহাস এখানে যেন সত্যিই কথা বলে । মুর্শিদাবাদ ভ্রমণ ভালো লাগার জন্য ইতিহাসের ছাত্র হওয়ার প্রয়োজন নেই, কিন্তু ইতিহাসকে সম্মান করার প্রয়োজন আছে । মুর্শিদাবাদে প্রাকৃতিক কোনও আকর্ষণ নেই - এখানকার আকর্ষণের সবকিছুই হয় মানুষের তৈরি না হয় মানুষের ধ্বংস । মানুষের চরিত্রের যে ভালো বা খারাপ দিকগুলো থাকে, সেগুলোই যেন বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা আর গল্পের মধ্যে দিয়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে মুর্শিদাবাদে । মুর্শিদকুলি খাঁ, নবাব আলিবর্দী, সিরাজ-উদ্‌-দৌলা বা মীরজাফর - এরা কি নিজেদের মতো করে আমাদের চারপাশে আজও বেঁচে নেই ? সেটা উপলব্ধি করার জন্য আগে ভালোভাবে জানার দরকার এরা কে কিরকম লোক ছিল । আর সে'জন্য - জীবনে অন্ততঃ একবার - মুর্শিদাবাদ যাওয়া উচিৎ !

মুর্শিদাবাদ ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

এই লেখায় যে সমস্ত ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ আছে, তার বেশিরভাগই আমি মুর্শিদাবাদে গিয়ে বা অন্য কোথাও কারুর মুখ থেকে শুনেছি । যদি এই ঘটনা বা তথ্যের মধ্যে কারুর কোনও ভ্রান্তি নজরে আসে, ধরিয়ে দিলে বিশেষ উপকৃত হব ।

Thursday, October 31, 2013

পুরী ভ্রমণ

প্রথমেই বলে রাখি আমার ব্লগের এই পোস্টটা বাকিগুলোর থেকে কিছুটা আলাদা হবে, কারণ যেদিন থেকে আমি এই ভ্রমণসর্বস্ব ব্লগ লেখা শুরু করেছিলাম, সেদিনই ঠিক করেছিলাম বাঙালির তিনটে ঘোরার জায়গা দী-পু-দা (অর্থাৎ দীঘা-পুরী-দার্জিলিঙ) সম্পর্কে কখনও লিখব না । কারণ এইসব জায়গা সম্পর্কে বাঙালিদের নতুন করে কিছু জানার নেই । তাই আমাদের এই 'পুরী ভ্রমণ' সম্পর্কে অল্প কিছু কথা লিখে রাখছি এই কারণে যে হয়তো এই তথ্যগুলো অন্য কারুর বা পরবর্তীকালে আমাদের নিজেদেরই কাজে লাগতে পারে ।

যাওয়া : ২৬শে অক্টোবর, ২০১৩ রাত ১০:৩৫ - পুরী এক্সপ্রেস ।
ফেরা : ৩০শে অক্টোবর, ২০১৩ রাত ১০:১৫ - পুরী হাওড়া গরীবরথ এক্সপ্রেস ।

সারসংক্ষেপঃ

১. পুরীতে আমরা ছিলাম ইন্ডিয়ান ওভারসিস্‌ ব্যাঙ্কের হলিডে হোমে । পুরীতে গিয়ে হলিডে হোমে থাকা এখনও পর্যন্ত বেশ কমন্‌ ব্যাপার । কিন্তু যদি নিজেরা রান্না করার পরিকল্পনা না থাকে, তাহলে হলিডে হোমে না থাকাই ভালো । কারণ পুরীতে অনেক হোটেল পাওয়া যায় যেখানে থাকার খরচ হলিডে হোমের খরচের সমান ।
২. হলিডে হোমের দ্বিতীয় অসুবিধে হল বেশিরভাগ হলিডে হোমের সঙ্গে কোনও একটা ট্রাভেল এজেন্সির যোগাযোগ আছে । ঘোরার জন্য সেই এজেন্সির থেকে গাড়ি বা বাস না নিলে এরা ঝামেলা করে । আমরা এই পদ্ধতির কথা জানতাম না, তাই 'নন্দী ঘোষ ট্রাভেল্‌স্‌' - এর লোকজন রীতিমতো আমাদের ঘরে ঢুকে আমাদের হুমকি দিয়ে যায় ।
৩. পুরীর লোক্যাল সাইট সিয়িং এর জন্য বিভিন্ন ধরনের গাড়ি পাওয়া যায়, যার মধ্যে টাটা ম্যাজিক খুব বেশি চলে । আমাদের দলে ন'জন ছিলাম এবং একটা ম্যাজিকের ভাড়া নিল ৪২৫/- ।
৪. কোণার্ক আর ভুবনেশ্বরের ঘোরাঘুরির জন্য গাড়িভাড়া করে ঘোরাই ভাল, কারণ ভিডিও কোচের বাসে ঘোরা কিছুটা কষ্টসাধ্য । সেইসঙ্গে নিজের ভাড়া করা গাড়িতে ঘোরার আরেকটা সুবিধে হল কোনও জায়গায় নিজের মতো যতক্ষণ ইচ্ছে দাঁড়ানো যায় ।

উপসংহারঃ

পুরী !
আমাদের চারপাশে এমন কোনও বাঙালি পরিবার বোধহয় নেই যারা জীবনে কখনও পুরী যায়নি । তাই পুরী সম্পর্কে কিছু জেনে নেওয়া ভীষণ সহজ ব্যাপার । আরেকটা মজার ব্যাপার "পুরী ঘুরে খুব ভালো লাগল" এটা আমি কখনও কারুর মুখে যেমন শুনিনি, তেমনই "দূর দূর, পুরী আবার একটা যাওয়ার মতো জায়গা হল ?" এরকম বলতেও কাউকে শোনা যায় না । কম পুঁজি আর খুব এফর্টলেস্‌লি ঘোরার জন্য পুরী একটা আদর্শ জায়গা । এখানে ঠকে যাওয়া খুব সহজ নয়, কারণ পুরী সম্পর্কে এখানকার লোকেরা যা জানে, বাঙালি ট্যুরিস্টরাও প্রায় তাইই জানে । পুরীর লোকেদের আর কোনও রুজি-রোজগারের ব্যবস্থা নেই, পুরী চলে প্রধানতঃ কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের টাকায় - আমরা হচ্ছি ওদের সবচেয়ে বড় কাস্টমার ! কাজেই "কাস্টমার ইজ গড" - এই কথাটা পুরীতে গিয়ে সবসময়ে মাথায় রাখা উচিৎ । আমরা জগন্নাথদেবের দর্শন করার জন্য পুরী যাই বটে, কিন্তু পুরীর মানুষের কাছে আসলে আমরাই 'জগন্নাথ' !

পুরী ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Thursday, October 24, 2013

রিশপ ও কোলাখাম ভ্রমণ

জানি না কেন লোকের একটা ধারণা আছে যে 'রিশপ' জায়গাটা সিকিম রাজ্যে । (আমি নিশ্চিত এই লাইনটা পড়েই অনেকের মনে হবে "আমি তো সিকিমেই জানতাম ! রিশপ সিকিমে নয় ? তাহলে কোথায়?") যারা জানে না তাদের সবাইকে জানাই রিশপ পশ্চিমবঙ্গেই পড়ে - দার্জিলিঙ জেলায় । নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে প্রায় ১৪০ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের গায়ে ছোট্ট একটা গ্রাম । সেই গ্রামে আমাদের দু'দিন থাকার অভিজ্ঞতা দিয়েই আমার ব্লগের এবারের পোস্ট ।

১৯শে অক্টোবর, ২০১৩ শনিবার আমাদের বেরোনোর দিন । এটা লক্ষ্মীপুজোর পরেরদিন কাজেই অন্যান্য কোনও ট্রেনে বুকিং না পেয়ে আমরা বাধ্য হয়েছিলাম 'পাহাড়িয়া এক্সপ্রেস' নামক ট্রেনে টিকিট কাটতে । আমাদের এবারের টীমের সদস্যসংখ্যা পাঁচ - আমি, আমার স্ত্রী অমৃতা, আমার সহকর্মী সমীরণদা, বৌদি ও ওনাদের এগারো বছরের ছেলে ঋজু । পাহাড়িয়া এক্সপ্রেস ছাড়ে দীঘা থেকে, হাওড়ায় একটা পঞ্চাশ মিনিটের হল্ট দিয়ে এন জে পি র উদ্দেশ্যে রওনা হয় রাত ৯:৫৫ টায় । এখানে জানিয়ে রাখি এন জে পি যাওয়ার জন্য রাতের কোনও ট্রেনে একান্তই বুকিং পাওয়া না গেলে তবেই পাহাড়িয়া এক্সপ্রেসে যাওয়া উচিৎ, না হলে নয় । কামরার ভেতরের আলো পাখা স্যুইচ প্লাগ পয়েন্ট এবং সর্বোপরি বাথরুম - কোনওটাই আশানুরূপ নয় । (আমাদের কামরায় এক ভদ্রলোক বলেই ফেললেন "অন্যান্য ট্রেনের সব বাতিল হয়ে যাওয়া বগিগুলো এই ট্রেনে লাগিয়েছে ।")

সেভক-এ ব্রেকফাস্ট ব্রেক
তবে বগি যাইই হোক, পাহাড়িয়া এক্সপ্রেস এন জে পি পৌঁছল মাত্র একঘন্টা লেটে । এখান থেকে সিন্ডিকেটের একটা বোলেরো গাড়ি বুক করা ছিল - সেই গাড়ি করে রওনা দিলাম রিশপের উদ্দেশ্যে । গাড়িভাড়া ৩,২০০ টাকা । (এখন এই অঞ্চলে কার সিন্ডিকেট সমস্ত গাড়ির রেট বেঁধে দিয়েছে, ড্রাইভাররা আর ইচ্ছেমতো ভাড়া চাইতে পারে না) রাস্তায় সেভক রোডের ওপর তিস্তাব্রীজের কাছে ব্রেকফাস্টের জন্য দাঁড়ানো হল । এখান থেকে আলুর পরোটা আর কফি খেয়ে নেওয়া হল । মাথাপিছু খরচ পড়ল ৪০ টাকা ।

পথের দু'ধারে চা-বাগান
রিশপ যেতে হলে গরুবাথান হয়ে যেতে হয় - অর্থাৎ সেভক থেকে আমরা করোনেশন ব্রীজ পেরিয়ে এগিয়ে চললাম । এখানে রাস্তার দু'দিকে প্রচুর চা-বাগান পড়ে এবং অনেকটা পথ বলতে গেলে সমতলভূমিতেই । এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক দৃশ্য খুবই সুন্দর । বেশ কিছুটা পথে পাশাপাশি চলতে থাকে রেল লাইন । এই রেলপথ চলে গেছে গুয়াহাটী পর্যন্ত ।
মেঘের মাঝে পথ - পথের মাঝে মেঘ

প্রায় ঘন্টাদেড়েক চলার পথে শুরু হল পাহাড়ী রাস্তা । পাহাড়ী রাস্তার বিবরণ দেওয়ার মানে হয় না, এটা আগেও বলেছি । পাহাড় আর খাদকে কখনও ডানদিকে আর কখনও বাঁদিকে রেখে আমরা এগিয়ে চললাম । রিশপ জায়গাটা 'লাভা' থেকে ৫-৬ কিলোমিটার দূরে - লাভা হয়েই রিশপ যেতে হয় । প্রকৃতপক্ষে রিশপ লাভার ওপরেই নির্ভরশীল । রিশপের নিজস্ব কোনও বাজারও নেই, পুরোটাই আসে লাভা থেকে । আমরা লাভা পেরোলাম তখন দুপুর দু'টো ।

লাভা থেকে রিশপ রাস্তাটার একটু বিবরণ দেওয়া দরকার । ৫-৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রাস্তায় কোথাও পিচ্‌ নেই, পুরোটাই অসমান এবড়োখেবড়ো পাথরের । রাস্তা কখনও হঠাৎ করে উঁচু হয়ে যায়, কখনও হঠাৎ নিচু । এর ওপর দিয়ে যখন গাড়ি চলে তখন যাত্রীদের অবস্থা কি হয়, সেটা বোধহয় আর বিস্তারিত না বললেও চলবে । মোটকথা, এই অত্যন্ত জঘন্য রাস্তা দিয়ে (আমি 'অত্যন্ত জঘন্য' লেখামাত্রই সেটা নিজে থেকে strike out হয়ে গেল, এর একটাই মানে হতে পারে - অত্যন্ত জঘন্য জিনিসরাও এই রাস্তাকে নিজেদের দলে জায়গা দিতে অস্বীকার করছে !) যাওয়ার আগে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে যাওয়া ভাল, তাতে কষ্ট হয়তো কিছুটা কম হতে পারে ।

লাভলি রিসর্টে আমাদের কটেজ
দুপুর তিনটে নাগাদ আমরা পোঁছলাম আমার গন্তব্য - রিশপে । রিশপে পৌঁছে প্রথম যে বাড়িটা চোখে পড়ে সেটাই 'লাভলি রিসর্ট' - আমাদের থাকার জায়গা । পাহাড়ের ধাপে এর কটেজগুলো তৈরি করা হয়েছে । আপাতত এখানে আমরা ছাড়া আর কোনও গেস্ট নেই, একটা দোতলা কটেজের দোতলার দু'টো ঘর আমার জন্য বুক করা হয়েছে । ঘর আমাদের সবারই খুব পছন্দ হল । দেওয়াল মেঝে সবই কাঠের এবং খুব সুন্দর করে তৈরি করা । লাভলি রিসর্টের ঘরভাড়া ১,২০০ টাকা করে, তবে আমাদের চেনাজানা ছিল বলে ১,০০০ টাকা করে পড়েছে ।* (এই লেখার নিচে সারসংক্ষেপে বলা আছে কিভাবে যোগাযোগ করা যেতে পারে)

হাতমুখ ধুয়ে আমরা প্রথমেই গেলাম ডাইনিং রুমে । ভাত ডাল আলুপোস্ত আর ডিমের ডালনা নেওয়া হল । রান্নার মান অসাধারণ কিছু না হলেও বেশ ভাল । আমাদের মাথাপিছু খরচ পড়ল ১২০ টাকা মতো ।

আমাদের ঘর
খাওয়া যখন শেষ হল তখন বিকেল সাড়ে চারটে । রোদ পড়ে এসেছে । রিশপের উচ্চতা ৮,০০০ ফুট এবং একটা পাহাড়ের প্রায় মাথায় । স্বাভাবিকভাবেই এখানে ঠান্ডা বেশ বেশি । খাওয়া শেষ করে আমরা নিজেদের ঘরে ফিরে এসে গরম জামাকাপড় চাপালাম ।




চাঁদের আলোয় রিশপ থেকে প্রাকৃতিক দৃশ্য
বিকেল পাঁচটার একটু পরে এখানে সূর্য্যাস্ত হয় । আমাদের রিসর্টের ব্যালকনি থেকে সামনের পাহাড়ের ওপর অস্তগামী সূর্য্যের শেষ আলোকচ্ছটা দেখতে অসাধারণ লাগে । আমাদের আর কিছু করার নেই, তাই কিছুক্ষণ বারান্দায় বসে বসে আড্ডা দিলাম । আস্তে আস্তে চারদিকের আলো কমে গিয়ে একেবারে অন্ধকার হয়ে গেল । তারপর আস্তে আস্তে সামনের পাহাড়গুলোর গায়ে জোনাকীর মতো আলো জ্বলে উঠল । চা খেতে খেতে আমরা এই দৃশ্য দেখলাম । জায়গাটা এমনিতেই ফাঁকা আর সন্ধ্যের পরে যেন একেবারেই নিস্তব্ধ হয়ে যায় । যখন আমরা কথা বলছি না, সেই সময়ে ঝিঁঝির ডাক ছাড়া আর কিছু শোনা যায় না । সবমিলিয়ে একটা ভীষণ সুন্দর পরিবেশ ।

রিশপের দু'টো সমস্যা আছে, সেগুলোর কথা এখানে লিখে রাখি । এক, বিদ্যুতের সমস্যা । এখানে বিদ্যুতের সরবরাহ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম, কাজেই রিসর্টকে সন্ধ্যের পরে বেশিরভাগ সময়েই জেনারেটর জ্বালিয়ে রাখতে হয় । আমাদের ঘরে চারটে সি এফ এল ছিল, কিন্তু তাদের আলো এতটাই মিটমিটে যে সবসময়েই কমপক্ষে দু'টো জ্বালিয়ে রাখতে হয় ।

দ্বিতীয় সমস্যা হল জল, যদিও আমাদের এ'জন্য সেরকম কিছু ভুগতে হয়নি । রিশপে জলের খুব সঙ্কট - সে'জন্য ওখানকার লোকেরা বারবার বলে বাথরুমে বা অন্যান্য কোথাও জলের অপচয় না করতে । বিদ্যুতের সমস্যার জন্য গিজার চালানো যায় না, তবে বললে ওরা বালতি করে গরম জল দিয়ে যায় ।

রাতে খাওয়ার জন্য ডাইনিং রুমে গেলাম । (অবশ্য বললে ওরা ঘরেও দিয়ে যায়) যাওয়ার পথে আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেলাম । আকাশভরা সূর্য্য তারা ! এত তারা আমরা যারা কলকাতায় থাকি তাদের কখনও দেখার সুযোগ হয় না । একে একে কালপুরুষের প্রায় সবক'টা, সপ্তর্ষিমন্ডলের সবক'টা আর টাফা (যেখানে প্রোফেসর শঙ্কু থাকেন !) সবই দেখতে পেলাম ।

রাতে খাওয়া হল রুটি আর চিকেন কারি । মাথাপিছু দাম পড়ল ১৫০ টাকা মতো ।

সকালের আলোয় আমাদের রিসর্ট এবং বাগান
পরেরদিন সকালে উঠলাম তখন সাতটা । এইসময়ে রোদ উঠে যায় আর সকালে রোদে সমস্ত জায়গাটা চমৎকার লাগে । রোদের কিছুটা উত্তাপ থাকায় গরম জামা না পরলেও চলে । রিশপের একটা জিনিস উল্লেখযোগ্য - সেটা হল এখানকার ফুলের বাগান । আমাদের রিসর্টেরও নিজস্ব একটা বাগান আছে । এখানে নানা ধরনের ফুলগাছ এবং টব রাখা আছে । ফুলের মধ্যে গাঁদা চন্দ্রমল্লিকা জবা এবং আরও কয়েকটা নাম না জানা ফুল আছে । আর সবথেকে বেশি আছে গোলাপগাছ । সমস্ত গাছই অত্যন্ত ভালোভাবে পরিচর্যা করা হয় । (আমরা এখান থেকে কিছু গাছ কিনতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ওরা বলল এই গাছ আমাদের সমতলে নিয়ে গেলে বাঁচবে না ।) আমরা বেশ কিছুক্ষণ বাগানে ঘোরাঘুরি করে ব্রেকফাস্ট করে নিলাম । এখানেও আলুর পরোটা । দাম পড়ল ৫০ টাকা করে ।

এরপর সাইট সিয়িং । আগেই বলে রাখি রিশপে সাইট সিয়িং করার মতো প্রায় কিছুই নেই, আর যেহেতু রিশপ এখনও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি, তাই এখানকার লোকেরা এখনও আজেবাজে জায়গাকে 'দেখার জায়গা' বলে টুপি পরায় না । আমাদের রিসর্টের লোকেদের থেকে জানলাম এখানে একটা মনাস্ট্রি আছে আর একটা বাচ্চাদের স্কুল আছে - যানবাহনের কোনও ব্যবস্থা নেই, চাইলে হেঁটে গিয়ে ঘুরে আসা যেতে পারে ।

রিশপে হেঁটে ঘোরার সময়ে
আমরা হাঁটতে শুরু করলাম । রিশপ গ্রামের মধ্যে দিয়েই হাঁটার রাস্তা - পথের দু'ধারে আরও কিছু রিসর্ট দেখতে পেলাম । মনাস্ট্রি যাওয়ার পথে চোখে পড়ল 'নেওড়াভ্যালি রিসর্ট' - এখানে 'শব্দ' নামক বাংলা ছবির শ্যুটিং হয়েছিল । রিশপে আলাদা করে কোনও ঘোরার জায়গা নেই ঠিকই, কিন্তু এখানে এমনি ঘুরতেই বেশ ভালো লাগে । ফাঁকা জায়গা, কম লোকজন, কিছুদূর অন্তর অন্তর একটা রিসর্ট আর তার চারপাশে ফুলের বাগান । সেইসঙ্গে পাহাড়ের গায়ে কখনও রোদ, কখনও ছায়া পড়ে অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য । কখনও আমাদের পাশে মেঘ, কখনও নিচে । কখনও হাওয়ার স্রোত এসে একটা ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব, আবার কখনও রোদ এসে একটা আরামদায়ক আবহাওয়া ।

মনাস্ট্রি - দূর থেকে
প্রায় ২ কিলোমিটার পাহাড়ি চড়াই উৎরাই পেরিয়ে একটা জায়গায় পোঁছলাম যেখান থেকে মনাস্ট্রিটা স্পষ্ট দেখা যায় । আমাদের অবস্থান থেকে এই মনাস্ট্রিতে পৌঁছতে গেলে বেশ অনেকটা নিচে নামতে হবে । নিচে নামাটা কষ্টকর হবে না, কিন্তু ফেরাটা বেশ চাপের হবে - তাই আমরা দূর থেকেই মনাস্ট্রি দেখে ক্ষান্ত হলাম । বাচ্চাদের স্কুলটা মনাস্ট্রি পেরিয়ে আরও কিছুটা নিচে, তাই সেখানেও আর যাওয়ার ঝুঁকি নেওয়া হল না ।

রিশপ থেকে আরেকটা ঘোরার জায়গা আছে সেটা হল লাভা ট্রেকিং । পাহাড়ের গায়ে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার ট্রেক করে রিশপ থেকে লাভা যাওয়া যায় । কিন্তু আমরা আর এই পথে হাঁটলাম না ।

আমাদের রিসর্টের সামনের রাস্তা
সাড়ে দশটায় বেরিয়ে লোক্যাল সাইট সিয়িং করে ফিরে এলাম তখন সাড়ে বারোটা । বস্তুতঃ আমাদের রিশপে ঘোরাঘুরি শেষ - এখানে বলতে গেলে আর কিছু দেখার নেই । আমাদের একমাত্র দেখা বাকি আছে 'টিফিনদাড়া' - যেটা আমরা পরেরদিন সকালে যাব বলে ঠিক করেছি । (টিফিন দাড়ায় কিন্তু কোনও টিফিনের ব্যবস্থা নেই !)


রিসর্টে ফিরে এসে চানটান করে লাঞ্চ করে নিলাম । আজও লাঞ্চে কালকের মেনুই নেওয়া হল । রিশপে মাছ পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম । লাভায় মাছ পাওয়া যায় কিন্তু রিসর্টে বেশি লোক না থাকলে ওদের খরচায় পোষায় না । আর উপস্থিত আমরা ছাড়া আর কোনও লোকও নেই । যদিও আমাদের তাতে কোনও আফসোস নেই, আমরা ডিম আর মাংসের ওপর বেশ আছি !

সূর্য্যাস্তের সময়ে
ঠান্ডা জায়গায় দুপুরে ভাত খাওয়ার পর শোওয়া যায় না, কারণ উঠলেই খুব শীত করে । খাওয়ার পরে আমরা আবার আমাদের বারান্দায় বসলাম আড্ডা দিতে । লাভলি রিসর্টের এই বারান্দাটা এতটাই সুন্দর যে এখানে বসে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেওয়া যায় ।





ক্যাপশনের প্রয়োজন নেই
সন্ধ্যেবেলা অর্ডার দিয়ে আমরা চিকেনমোমো খেলাম । প্লেটে ৫টা করে মোমো । দাম পড়ল ১০০ টাকা করে । এইসব পাহাড়ী অঞ্চল মোমোর জন্য বিখ্যাত, কাজেই মোমো যে অত্যন্ত সুস্বাদু সে'কথা বোধহয় আর আলাদা করে না বললেও চলবে । রাতে ডিনার । ডিনারে মিক্সড চাউমিন আর চিলি চিকেন খাওয়া হল । খরচ পড়ল ১৪০ টাকা করে ।


ডিনারের সময়ে আমাদের পরেরদিন টিফিনদাড়া যাওয়ার ব্যাপারটা ফাইনাল করে নেওয়া হল । টিফিনদাড়ায় গিয়ে সূর্য্যোদয় দেখা যায় । কাঞ্চনজঙ্ঘার ওপরে সূর্য্যের প্রথম আলো - শুনে মনে হল ব্যাপারটা অনেকটা 'টাইগার হিল'-এর মতো । রিশপ থেকে টিফিনিদাড়া ট্রেক করে ওপরদিকে উঠতে হয় - প্রায় একঘন্টা লাগে । ভোর সাড়ে চারটের সময়ে অন্ধকারে বেরিয়ে এই রাস্তাটা যেতে হয় যাতে সূর্য্যোদয়ের আগেই টিফিনদাড়ায় পৌঁছনো যায় । পাহাড়ী পথে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে রাস্তা, কাজেই গাইড ছাড়া যাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না । আমাদের রিসর্টের লোক বলল একজনকে ঠিক করে রাখবে যে সাড়ে চারটের সময়ে এসে আমাদের ডাকবে । আমরা যেন তৈরি হয়ে থাকি । লোকের রেট ৩০০ টাকা ।

পরেরদিন ২২শে অক্টোবর, ২০১৩ মঙ্গলবার । চারটের সময়ে অ্যালার্ম বাজিয়ে ঘুম থেকে উঠে সাড়ে চারটের মধ্যে রেডি হয়ে নিলাম । বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার, কাছাকাছির মধ্যে আমাদের রিসর্টের আলোগুলো জ্বলছে । আর সেইসঙ্গে ঠান্ডা । তারই মধ্যে আমরা অপেক্ষা করছি আমাদের গাইডের জন্য । সাড়ে চারটে - চারটে পঁয়ত্রিশ - পৌনে পাঁচটা । গাইড আর আসে না । দেখতে দেখতে পাঁচটাও বেজে গেল । নাঃ, সে এল না । পাঁচটা বেজে যাওয়ার পর আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে এরপর সে এলেও আমরা আর যাব না, কারণ আমাদের টিফিনদাড়ায় পৌঁছনোর আগেই সূর্য্যোদয় হয়ে যাবে ।

"জাগো - নতুন প্রভাত"
অত্যন্ত বিরক্তি নিয়ে ঘরে এসে আবার শুয়ে পড়লাম । আস্তে আস্তে অন্ধকারটা কেটে যেতে লাগল । আমি জেগেই ছিলাম আর এই সময়ে ঘরে বসে থাকার কোনও মানে হয় না । তাই আমাদের ব্যালকনিতে গিয়ে বসে রইলাম সেই ব্রাহ্মমূহুর্তে । (এটাকে ব্রাহ্মমূহুর্ত বলে কিনা ঠিক জানি না, কিন্তু এই শব্দটা ব্যবহার করতে খুব ইচ্ছে করছিল, তাই এটা এখানে লিখলাম !) দেখতে দেখতে সূর্য্য উঠল । যেন মনে হল "অন্তরে অন্তরে দাও আলো দাও / কালিমা কলুষ যত মুছে নিয়ে যাও" (এটা তখন মনে হয়নি, আসলে আজ ২৪শে অক্টোবর, মান্না দে মারা গেছেন, তাই এটা ওনার প্রতি একটা শ্রদ্ধার্ঘ্য !)

২২শে অক্টোবর আমাদের রিশপ ছেড়ে চলে যাওয়ার দিন । আমাদের গন্তব্য কোলাখাম । আমাদের ট্রিপে আমরা দু'দিন রিশপ আর একদিন কোলাখামে থাকছি । সকাল দশটা নাগাদ ব্রেকফাস্ট সেরে রিশপ থেকে কোলাখামের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়া হল । আবার সেই রাস্তা, কিন্তু একবার গিয়ে অভ্যস্ত হয়ে গেছি ! রিশপ থেকে কোলাখাম যেতে প্রায় দু'ঘন্টা লাগে যদিও রাস্তা মাত্র ১৩ - ১৪ কিলোমিটার । কোলাখামও রিশপের মতোই লাভার ওপর নির্ভরশীল একটা গ্রাম । আমাদের যাওয়ার পথে স্বাভাবিকভাবেই পড়ল - লাভা ।

লাভা মনাস্ট্রি
আমাদের ড্রাইভার নিজের দরকারে লাভায় কিছুক্ষণ দাঁড়ালো - একেবারে লাভা মনাস্ট্রির সামনে । আমার আর অমৃতার লাভা মনাস্ট্রি দেখা নয়, তাই আমরা সেটা দেখতে গেলাম । মনাস্ট্রিটা খুব সুন্দর । অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং ঝকঝকে রঙ করা । দেখতে সবমিলিয়ে মিনিট পনেরো লাগল ।




এরপর লাভা থেকে কোলাখাম । এই রাস্তাটা একেবারেই লাভা থেকে রিশপের মতো - একমাত্র পার্থক্য হল এর দৈর্ঘ্য ৭ - ৮ কিলোমিটার । পথের বিবরণের পুনরাবৃত্তি না করে সোজা কোলাখামে চলে যাচ্ছি, যদিও আমাদের যাত্রা কোলাখামে শেষ হল না । আমরা পাহাড়ী পথে গাড়ি করে আরও ৮ কিলোমিটার নেমে গেলাম - আমাদের গন্তব্য চাঙ্গে ফল্‌স্‌ ।

চাঙ্গে ফল্‌স্‌
চাঙ্গের রাস্তায় শেষ কিছটা আর গাড়ি যায় না, হেঁটে নামতে হয় । হেঁটে হেঁটে একেবারে নিচে নেমে চাঙ্গে । আগেরবার কালুক ভ্রমণের সময়ে পেলিং এর কাছ থেকে চাঙ্গে ফল্‌স্‌ যা দেখেছিলাম এখানে তার থেকে অনেকটাই বড় দেখালো । কাছাকাছি গেলেই জলের ছিটেয় ভিজে যাচ্ছিলাম । আর সেইসঙ্গে অনেকটা ওপর থেকে জল পড়ার প্রচন্ড শব্দ - সবমিলিয়ে বর্ণনাতীত ।
ফল্‌স্‌ দেখে মন ভরে গেল ।

ফিরে এলাম কোলাখামে । রিশপ থেকে কোলাখামের গাড়িভাড়া ১,৪০০ টাকা, আমরা চাঙ্গে গেছিলাম বলে আরও ৮০০ টাকা বেশি পড়ল । কোলাখামে আমাদের রিসর্টের নাম 'ইকো গ্রীন হাটস্‌' - ঘরভাড়া ১,৭৬০ টাকা করে (ট্যাক্স সমেত) ।

আমাদের ঘরের ভেতর
ঘর আমাদের খুবই পছন্দ হল । ডাব্‌ল্‌ বেড রুমের মধ্যে একটা করে সিঁড়ি আছে যেটা দিয়ে রুমের দোতলায় যাওয়া যায় । এই দোতলায় আবার আরেকটা বিছানা পাতা আছে । অর্থাৎ তিনজন এই ঘরে আরামসে থাকতে পারে ।






আমরা চানটান করে দুপুরে খেতে গেলাম । আমাদের ঘরের নিচেরতলাতেই ডাইনিং রুম । এগকারি আর ভাত খাওয়া হল । এখানে মিল সিস্টেমে ফুড প্যাকেজ নিতে হয় । একদিনের খাওয়ার খরচ মাথাপিছু ৪৫০ টাকা আর ঘরের সঙ্গে ব্রেকফাস্টটা ফ্রি । আমরা যেহেতু এইদিন সকালের জলখাবার (যেটা ব্রেকফাস্টের থেকে আলাদা) নিইনি, তাই আমাদের ৩৫০ টাকা করে পড়ল ।

কোলাখাম গ্রাম
খাওয়ার পরে কোলাখাম ঘুরতে বেরোলাম । কোলাখাম রিশপের থেকেও ছোট জায়গা আর এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যই একমাত্র দেখার জিনিস । আমরা রাস্তায় কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে ঘরে এসে রেস্ট নিলাম । সন্ধ্যেবেলা সামনের পাহাড়ের ওপরে সূর্য্যাস্ত দেখলাম । কোলাখামের উচ্চতা ৬,২৫০ ফুট এখানে ঠান্ডা খুব কম । সারা সন্ধ্যে নিজেদের মতো আড্ডা দিয়ে সময় কেটে গেল । মাঝখানে একবার সিন্ডিকেটের অফিসে (যেটা আমাদের ঘর থেকে হেঁটে ৩০ সেকেন্ড লাগে) গিয়ে আমি আর সমীরণদা পরেরদিনের গাড়ি ঠিক করে এলাম ।

রাতে রুটি, আলুর তরকারি আর চিকেন কষা । এ'কথা স্বীকার না করে উপায় নেই যে রিশপের থেকে কোলাখামের খাবারের মান অনেক ভালো ।

পরেরদিন ২৩শে অক্টোবর, ২০১৩ বুধবার - আমাদের ফেরার দিন । সকাল সকাল রেডি হয়ে ব্যাগট্যাগ গুছিয়ে নিলাম । আটটার একটু পরে ব্রেকফাস্ট করে একটা বোলেরো গাড়িতে উঠলাম । কোলাখাম থেকে এন জে পি সরাসরি গাড়ি যায় না । আমাদের গাড়ি লাভা পর্যন্ত যাবে, আর তারপর লাভা থেকে সে আরেকটা গাড়ি ধরিয়ে দেবে । সেই গাড়ি আমাদের এন জে পি নিয়ে যাবে । কোলাখাম থেকে এন জে পি র গাড়িভাড়া ৩,৫০০ টাকা ।

আবার সেই ঝাঁকুনি রাস্তা ধরে ৮ কিলোমিটার - কিন্তু এবার একেবারেই বিরক্ত লাগছিল না কারণ এটা আমাদের ট্রিপের চতুর্থ তথা শেষ ঝাঁকুনি । লাভায় যখন পোঁছলাম তখন বেলা দশটা ।

ফেরার পথে
লাভায় আমাদের একটা সুমো ধরিয়ে দেওয়া হল । এই গাড়ির ড্রাইভার আসতে কিছুক্ষণ দেরি করায় আমাদের লাভা থেকে বেরোতে বেরোতে এগারোটা বেজে গেল । ফেরার পথে যখন গরুবাথানে লাঞ্চ করলাম তখন দুপুর আড়াইটে । এটা রাস্তার পাশের একটা সাধারণ ভাতের হোটেল - দাম স্বাভাবিকভাবেই কম । মাংসভাতের দাম আমাদের মাথাপিছু পড়ল ১০০ টাকা করে ।

এরপর আবার নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন আর সেখান থেকে উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস ধরে ফেরা । ট্রেন খুব সামান্যই লেট ছিল, তাই শিয়ালদহে নেমে ছ'টার মধ্যেই বাড়ি পৌঁছে গেলাম !

সারসংক্ষেপঃ

১. নিউ জলপাইগুড়িতে নেমে যেসব জায়গায় যাওয়া যায়, রিশপ তাদের মধ্যে আরেকটা । শান্ত নিরিবিলি জায়গায় ছুটি কাটানো যাদের উদ্দেশ্য, তাদের জন্য বিশেষ উপযোগী ।
২. নিউ জলপাইগুড়ি থেকে রিশপের দুরত্ব ১৪০ কিলোমিটারের মতো । সিন্ডিকেটের গাড়ির রেট ৩,২০০ টাকা ।
৩. উচ্চতা ৮,০০০ ফুট । স্বাভাবিকভাবেই অক্টোবরের মাঝে এখানকার আবহাওয়া ঠান্ডার দিকে ।
৪. রিশপে বেশ কিছু রিসর্ট আছে যাদের মধ্যে আমাদের 'লাভলি রিসর্ট' উল্লেখযোগ্য । West Bengal Tourism Development Corporation থেকে এদের বুকিং করা যায় অথবা এদের ওয়েবসাইট http://www.rishyap.com/ থেকেও বুকিং করা যেতে পারে ।
*এখানকার কেয়ারটেকার 'তারাপদ জ্ঞান' আমাদের পরিচিত । আমাদের মাধ্যমে এর সঙ্গে যোগাযোগ করলে বেশ কিছুটা কমে ঘর পাওয়া যাবে । অফ্‌ সিজনে খুব অল্প দামেই ঘর পাওয়ার ব্যবস্থা করা যায় ।
৫. রিশপে বিশেষ কিছু দেখার নেই, তবে মনাস্ট্রিটা দেখে আসা যেতে পারে । আর ভোরবেলা উঠে টিফিনদাড়ায় গিয়ে সূর্য্যোদয় দেখাটা মিস্‌ করার কোনও মানেই হয় না ।
৬. রিশপ থেকে লাভা যাওয়ার একটা হাঁটা পথ আছে, সেই পথে লাভা ট্রেক করা যেতে পারে । তবে এটা এমনকিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয় ।
৭. রিশপে বিদ্যুতের একটু সমস্যা আছে, ঘরের আলো বেশিরভাগ সময়েই মিটমিট করে । রিসর্টে জেনারেটর থাকলেও নিজেদেরও কিছু ব্যবস্থা সঙ্গে নিয়ে যাওয়া উচিৎ ।
৮. রিশপে কোনও দোকান বাজার নেই, সবথেকে কাছে লাভা ।
৯. রিশপে খাবারের দাম ঠিকঠাক । মাথাপিছু ৩৫০ - ৪০০ টাকা প্রতিদিন ।
১০. রিশপ থেকে কোলাখামের দুরত্ব ১৩ - ১৪ কিলোমিটারের মতো । গাড়িভাড়া ১,৪০০ টাকা ।
১১. কোলাখাম থেকে অবশ্যই চাঙ্গে ফল্‌স্‌ দেখতে যাওয়া উচিৎ । পাহাড়ের গা বেয়ে প্রবলবেগে আর প্রবল শব্দে নেমে আসা চাঙ্গে ফল্‌স্‌ এত কাছ থেকে এইভাবে দেখতে পাওয়া লাইফটাইম এক্সপেরিয়েন্স !
১২. কোলাখামেও থাকার কিছু জায়গা আছে যার মধ্যে 'ইকো গ্রীন হাটস্‌' উল্লেখযোগ্য । এদের ওয়েবসাইট http://www.hammockshutsholidays.com/. এখানকার ভাড়া ১,৭৬০ টাকা ।
১৩. এখানে খাওয়ার খরচ মাথাপিছু ৪৫০ টাকা করে ।
১৪. কোলাখাম থেকে এন জে পি র গাড়িভাড়া ৩,৫০০ টাকা ।

উপসংহারঃ

রিশপ
প্রকৃতির মধ্যে যে একটা ঝকঝকে ব্যাপার আছে, আমরা যারা দূষণপ্রবণ জায়গায় থাকি, তারা সাধারণতঃ অনুভব করি না । রিশপে এই ঝকঝকে ব্যাপারটা খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করা যায় । এখানকার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য - এই সৌন্দর্য্যের টানেই রিশপ যাওয়া । এখানে সাইট সিয়িং করার কিছু নেই, শুধু দৈনন্দিন জীবন থেকে ছুটি নিয়ে পাহাড়ের কোলে দু'টো দিন বিশ্রাম নেওয়ার জন্য রিশপ একেবারে আদর্শ জায়গা । শান্ত আর নিরিবিলি পরিবেশে প্রকৃতিকে উপভোগ করার সুযোগ রিশপের সবথেকে বড় আকর্ষণ । যদি এই পরিবেশ তোমাকে আকর্ষণ করে, তাহলে বেরিয়ে পড় রিশপ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে । শুধুমাত্র একটাই বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ - পাহাড়িয়া এক্সপ্রেসে না যাওয়ার চেষ্টা কোরো !

রিশপ ও কোলাখাম ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Tuesday, September 17, 2013

মুকুটমণিপুর ভ্রমণ

তুমি যদি কখনও 'মুকুটমণিপুর' যাওয়ার পরিকল্পনা কর আর সেটা তোমার আশেপাশের লোকজন জেনে ফেলে তাহলে তুমি সবচেয়ে বেশি যে কথাটা শুনবে তা হল "ও, মুকুটমণিপুর ! আমি সেই কোন্‌ ছোটবেলায় গেছি !" শুনে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় মুকুটমণিপুরে শুধু ছোটরাই যায় । কিন্তু আমি সেইসব লোকের মধ্যে পড়িনা - আমার 'সেই কোন্‌ ছোটবেলায়' মুকুটমণিপুর যাওয়া হয়নি । অন্যের মুখে এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের কথা শুনতে শুনতেই জায়গাটায় যাওয়ার ইচ্ছে তৈরি হওয়া আর সেই সুবাদেই বেরিয়ে পড়া - আমাদের বেড়ানোর মুকুটে আরেকটা মণি যোগ করার জন্য ।

১৫ই সেপ্টেম্বর, ২০১৩ রবিবার সকাল ছ'টা পঁচিশে সাঁত্রাগাছি স্টেশন থেকে 'রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস' এ মুকুটমণিপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম আমি আর আমার স্ত্রী । (এখানে জানিয়ে রাখি, অনেকেরই ধারণা 'রূপসী বাংলা' 'ধৌলি'র সঙ্গে হাওড়া থেকে একসঙ্গে ছাড়ে, সেটা কিন্তু ঠিক নয় । রূপসী বাংলা ধরতে গেলে এখন সাঁত্রাগাছি থেকেই ধরতে হয়, হাওড়া থেকে ধরা যায় না ) মুকুটমণিপুরে ট্রেন যায় না, সবথেকে কাছের রেলস্টেশন হল বাঁকুড়া । এখান থেকে মুকুটমণিপুর আরও ৫৫ কিলোমিটার ।

বাঁকুড়া স্টেশন
বাঁকুড়া স্টেশন থেকে মুকুটমণিপুর যাওয়ার জন্য গাড়ি ভাড়া করা যেতে পারে আর নাহলে আছে লোক্যাল বাস । বাঁকুড়া স্টেশন থেকে বাঁকুড়া বাসস্ট্যান্ডটা বেশ কিছুটা দূরে - এখানে যাওয়ার জন্য আমাদের আরেকটা বাস ধরতে হল । বাঁকুড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে মুকুটমণিপুরের বাস সংখ্যায় খুবই কম তাই আমরা খাতড়ার বাস ধরলাম । এই বাস খুব সাধারণ ঝরঝরে মার্কা বাস । খাতড়া থেকে আরেকটা বাসে করে মুকুটমণিপুর । আমাদের টাইমিংগুলো হল - বাঁকুড়া স্টেশন সকাল ১০:১০ - বাঁকুড়া বাসস্ট্যান্ড সকাল ১০:৩০ - খাতড়ার বাস বেলা ১১ টা - খাতড়া দুপুর ১:৩০ - মুকুটমণিপুরের বাস দুপুর ১:৪৫ - মুকুটমণিপুর দুপুর ২:১৫ আর আমাদের হোটেল দুপুর ২:৩০ (এগুলো এত ডিটেলে লিখলাম একটাই কারণে - কলকাতা থেকে মুকুটমণিপুর যেতে হলে কেউ যেন ট্রেনে না যায় । এত কষ্ট করে না গিয়ে অনেক সহজে ধর্মতলা থেকে মুকুটমণিপুরের টানা বাসে যাওয়া যায় ।)

অনন্তমূল কটেজ
আমাদের বুকিং ছিল ওয়েস্ট বেঙ্গল ফরেস্ট ডেভেলপমেন্টের 'সোনাঝুরি রিসর্ট'এ । এটার বুকিং কলকাতা অফিস থেকে সরাসরি করা যায় - অথবা ওদের ওয়েবসাইট থেকে অনলাইনও করা যায় । রিসর্টটা খুবই সুন্দর - একটা পাহাড়ের গায়ে গাছপালা ঘেরা বিরাট জায়গা জুড়ে আলাদা আলাদা কটেজ । 'শতমূল' আর 'অনন্তমূল' দু'টো পাশাপাশি কটেজ - এদের মধ্যে আমরা অনন্তমূল বুক করেছিলাম ।

ঘরের ভেতর
ঘরটা বেশ বড় - মাঝখান জুড়ে রয়েছে একটা ৭ X ৭ সাইজের খাট । এছাড়া টিভি চেয়ার টেবিল ইত্যাদি । ঘরের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা দেখবার মতো ! মেঝেটা এত পরিষ্কার যে আমরা ঘরে খালি পায়ে হেঁটেছি । বাথরুমটাও বেশ বড় এবং পরিষ্কার । ঘরের বাইরে একটা ছোট ব্যালকনি রয়েছে সেখানে চেয়ার নিয়ে বসে থাকা যায় । সবমিলিয়ে ব্যবস্থা খুবই ইম্প্রেসিভ ।


সোনাঝুরির ডাইনিং রুম
আমাদের লাঞ্চের অর্ডার দেওয়া ছিল না - কিন্তু ওরা বলল ব্যবস্থা করে দেবে । সেইমতো আমরা ঘরে এসে চানটান করে ফ্রেশ হয়ে নিলাম । তারপর গেলাম ডাইনিং রুমে । এখানে রুমে খাবার দেওয়ার খুব একটা প্রচলন নেই - সবাই ডাইনিং রুমেই খায় । ডাইনিং রুমে একসঙ্গে ১৬ জন বসে খেতে পারে । খাবার সবই মিল সিস্টেম । আমরা দুপুরে নিলাম মাছভাত । রান্না অত্যন্ত সুস্বাদু ! আমাদের মাথাপিছু পড়ল ৭৫ টাকা করে ।

খাওয়ার পরে ঘরে এসে কিছুক্ষণ রেস্ট নিলাম । বিকেলে বেরোলাম চারপাশটা একটু এক্সপ্লোর করতে । মুকুটমণিপুরের প্রধান আকর্ষণ হল ড্যাম - কংসাবতী নদীর জলকে বাঁধের সাহায্যে ধরে রেখে সেচের কাজে ব্যবহার করা হয় । এই ড্যামটা বিশাল বড় আর বলতে গেলে এটা দেখতেই এখানে আসা ।

মুকুটমণিপুরে কংসাবতীর ড্যাম
সোনাঝুরি থেকে ড্যাম হেঁটে মিনিট পনেরো লাগে । ড্যামের পাঁচিলের ওপর দিয়ে রাস্তা চলে গেছে । আমরা এই রাস্তা ধরে কিছুদূর হেঁটে গেলাম । এখানকার সৌন্দর্য অসাধারণ । একদিকে কংসাবতীর বিশাল ড্যাম আর অন্যদিকে পাহাড় আর ছোট ছোট গ্রাম । আমরা বেশ কিছু ছবি তুললাম ঠিকই, কিন্তু জায়গাটার ব্যাপ্তি এতটাই বড় যে ক্যামেরায় একে বন্দী করা সম্ভব না । (ওয়াইড অ্যাঙ্গেলেও না) পাঁচিলের ওপর দিয়ে রাস্তা অনেক দূরে (৭ কিলোমিটার) চলে গেছে । পুরোটা হেঁটে যাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না আর আকাশে মেঘ করে ছিল - তাই হেঁটে খুব বেশি দূরে যাওয়ার সাহসও হল না । আস্তে আস্তে সন্ধ্যে হয়ে আসছিল আর পুরো জায়গাটায় আমরা ছাড়া আর লোকজনও বিশেষ ছিল না, তাই এবার ফেরার পথ ধরলাম । সোনাঝুরিতে যখন ফিরে এলাম তখন অন্ধকার হয়ে গেছে ।

সন্ধ্যেবেলা মুকুটমণিপুরে কিছু করার নেই । যতদূর সম্ভব সোনাঝুরিতে আমরা ছাড়া আর কোনও গেস্টও নেই কাজেই লোকজনের গলার শব্দও শোনা যাচ্ছিল না । ঘরের বাইরে শব্দ বলতে একমাত্র ঝিঁঝির ডাক । রিসর্টের বাইরে রাস্তা আছে, কিন্তু সেটা ঘর থেকে বেশি কিছুটা নিচে । আর সেই রাস্তা দিয়েও কদাচিৎ কখনও গাড়ি চলে । ফরে বাইরের আওয়াজও নেই । আমরা যারা কলকাতায় থাকি তারা এই নিস্তব্ধতার সঙ্গে পরিচিত নই । 'সাইলেন্স হ্যাজ ইট্‌স্‌ ওন ল্যাঙ্গুয়েজ' এই বিখ্যাত কথাটা মুকুটমণিপুরে গিয়ে আবার নতুন করে উপলব্ধি করলাম ।

রাতে চিকেন মিল বলা ছিল - শুধু ভাতের বদলে রুটি । মাংস ছাড়াও তরকারি, ডাল, আলুভাজা ইত্যাদি দেয় । খরচ পড়ল ৯০ টাকা করে ।

অনন্তমূল কটেজ থেকে সোনাঝুরির কিছুটা
পরেরদিন অর্থাৎ ১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০১৩ সোমবার । এই দিনটা আমাদের মুকুটমণিপুরের সাইট সিয়িং করার দিন । ঘোরার দু'রকম ব্যবস্থা আছে - অ্যাম্বাসাডর আর মোটর ভ্যান । মুকুটমণিপুরে সাইট সিয়িং এ খুব বেশি কিছু দেখার নেই - মোটরভ্যানে বড়োজোর ঘন্টা আড়াই লাগবে । অ্যাম্বাসাডরে গেলে সেটা আরও কমে যাবে । আর বাঁধের রাস্তা দিয়ে যখন যাব তখন অ্যাম্বাসাডরে গেলে সবদিক দেখতে দেখতে যাওয়া যাবে না । সেইসব কিছু মাথায় রেখে আমরা মোটর ভ্যানটাই বেছে নিলাম ।

কিন্তু বেছে নিয়েই কি বেরিয়ে পড়লাম ? না রে বাবা, বেরোলাম তো দশটার সময়ে । তার আগে সকালে কি কি হল, সেগুলো বলি ?

সকালে রিসর্টে ব্রেকফাস্ট করে নিলাম । পাঁউরুটি ডিমভাজা আর একটা মিস্টি মিলিয়ে পড়ল ৪০ টাকা করে । এখানে একটা মজার জিনিস বলি । প্রথমদিন ব্রেকফাস্টে পাঁউরুটি খেতে গিয়ে দেখলাম পাঁউরুটিতে জবজবে করে মাখন মাখানো । এত মাখন ? একটু অবাক লাগল । পরেরদিন ব্রেকফাস্টের সময়ে দেখতে পেলাম এত মাখনের কারণ কি । আমরা সাধারণতঃ মাখনের বার থেকে ছুরি বা চামচের সাহায্যে পাঁউরুটিতে মাখন মাখাই । আর ওরা গোটা বারটাকে নিয়েই পাঁউরুটিতে ঘষে ! আর সেইসঙ্গে পাঁউরুটি গরম থাকার হু হু করে মাখন অ্যাবসর্ব হয়ে যায় ! আর এই গোটা ব্যাপারটা ওরা পাঁউরুটির দু'পিঠে করে ! খেতে ভালো না হয়ে যায় কোথায় !

শাল-পিয়াল থেকে কংসাবতী ড্যাম
যাই হোক, ব্রেকফাস্টের পর সোনাঝুরির ভেতরে একটু ঘুরে বেড়ালাম । পাহাড়ের গায়ে গায়ে বিভিন্ন ধাপে আলাদা আলাদা করে একজোড়া কটেজ । তাদের নাম শাল-পিয়াল, তাল-তমাল (ইয়েস্‌ !) ইত্যাদি । এদের মধ্যে শাল-পিয়ালটা পাহাড়ের আরও কিছুটা ওপরে আর এখান থেকে ড্যামের অনেকটা দেখতে পাওয়া যায় । ওফ্‌, অসাধারণ ! সবমিলিয়ে জায়গাটা ওয়েল ডেকরেটেড, ওয়েল প্ল্যান্‌ড্‌, ওয়েল অর্গানাইজড্‌ অ্যান্ড ওয়েল মেইন্টেন্ড ! ওয়েল ... লেট্‌স্‌ স্টপ ইউজিং 'ওয়েল' ।

বাঁধের ওপর থেকে গ্রামের দৃশ্য
দশটার সময়ে বেরোলাম সাইট সিয়িং করতে । প্রথমে বাঁধের রাস্তার ওপর দিয়ে আমাদের নিয়ে গেল মোহনার দিকে । যাওয়ার পথটা অসাধারণ - একটু রোদ্দুরের তেজ থাকলেও সেটা সেরকম গায়ে লাগছিল না । একদিকে বিপুল জলরাশি আর অন্যদিকে দিগন্তবিস্তৃত ধানক্ষেতের মাঝে মাঝে মাটির বাড়ি সম্বলিত গ্রাম - এ'জিনিসের সৌন্দর্য্য নিজের চোখে না দেখলে বলে বোঝানো সম্ভব নয় ।

পরেশনাথ পাহাড় থেকে
আমাদের প্রথম দাঁড়ানোর জায়গা পরেশনাথ পাহাড় । এখানে একটা ছোট্ট টিলার ওপরে একটা শিবলিঙ্গ আছে । টিলার ওপর থেকে বহুদূর পর্যন্ত চমৎকার দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায় । আমরা এখানে দাঁড়িয়ে কিছু ছবি তুললাম ।



কংসাবতী ও কুমারীর মোহনা


এরপরের গন্তব্য মোহনা । এই মোহনার বৈশিষ্ট্য হল এখানে কংসাবতী (বা কাঁসাই) এবং কুমারী দু'টো নদী একসঙ্গে মিলিত হয়েছে । এখান থেকে নৌকো চড়ে নদীর ওপারে যাওয়া যায় আর সেখান থেকে ডিয়ার পার্কে যাওয়া যায় । তবে লোকজনের মতে ডিয়ারপার্কে সেরকম কিছু দেখার নেই, তাই আমরা আর ও'পথ ধরলাম না । মোহনায় কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে চলে এলাম ।

গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙা মাটির পথ
তৃতীয় যাওয়ার জায়গা অম্বিকানগর । এই জায়গাটা বলতে গেলে আমাদের রিসর্টের পাহাড়ের পেছন দিকে - তাই বলতে গেলে আমরা এবার ফেরার রাস্তা ধরলাম । কিন্তু আমাদের ড্রাইভার কাম গাইড এবারে আর বাঁধের ওপর দিয়ে ফিরল না । তার বদলে বাঁধ থেকে গ্রামের পথে নেমে গিয়ে মেঠো পথে ফেরা হল । অর্থাৎ আসার পথে যেসব গ্রাম আর ধানজমি গুলো ওপর থেকে দেখছিলাম, এবার তাদের মধ্যে দিয়ে ফিরলাম । দু'ধারে ধানক্ষেত, ছোট ছোট জনবসতি, পুকুর ইত্যাদি । পথের দু'দিকে নানারকম গাছের শান্তশীতল ছায়া আর তার মাঝখান দিয়ে লালমাটির মেঠো পথটি দিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি আর এক অজানার উদ্দেশ্যে - এর অনুভূতিই আলাদা ! (এত কাব্য করছি কেন ? আসলে আমরা আছি বাঁকুড়ায় আর বাঁকুড়ার পাশেই বীরভূম আর বীরভুম মানেই শান্তিনিকেতন আর শান্তিনিকেতন মানেই রবীন্দ্রনাথ !)

অম্বিকাদেবীর মন্দির
অম্বিকানগর একটা টাউনশিপ - এখানে দেখার জায়গা বলতে একমাত্র অম্বিকাদেবীর মন্দির । রাস্তার ধারে একটা ছোটখাটো মন্দির - সেরকম দূর্দান্ত কিছু নয় । চাইলে এখানে না যাওয়াও যেতে পারে ।





কংসাবতীর ব্যারেজ
এবার আবার মুকুটমণিপুরের রাস্তা ধরলাম । ফেরার পথে আমাদের রিসর্টের সামনের রাস্তা দিয়ে ফিরে এসে আরও কিছুটা এগিয়ে গিয়ে গেলাম ব্যারেজের কাছে । এই ব্যারেজের থেকেই জল ছাড়া হয় যেটা সেচের কাজে ব্যবহার করা হয় । এখন আপাতত লক্‌গেট বন্ধ । সেখানে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে ফিরে এলাম রিসর্টে । এই ঘোরাঘুরির জন্য আমাদের খরচ পড়ল ২৩০ টাকা (অ্যাম্বাসাডরে পড়ত ৪০০ টাকা) ।

ফিরে এসে চানটান করে নিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম । দুপুরে চিকেন মিল বলা ছিল । ভাত ডাল তরকারি আর চিকেন । এরপর ঘরে এসে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে চারটে নাগাদ আবার বেরিয়ে গেলাম ড্যামের ধারে । এবার আমাদের উদ্দেশ্য নৌকাবিহার !

নৌভ্রমণের সময়ে
নৌকো করে এখানে ড্যামের মধ্যে ঘোরা যায় । চাইলে নৌকো করে মোহনা পর্যন্তও ঘুরে আসা যায় । নৌকোর রেট হচ্ছে ২৫০ টাকা - মোটামুটি ১০ - ১২ জন আরাম্‌সে বসতে পারে । কিন্তু আগেই বলেছি আমরা ছাড়া আর কোনও ট্যুরিস্ট নেই, কাজেই পুরো নৌকোটা আমাদেরই ভাড়া করতে হল ২০০ টাকা দিয়ে । নৌকো জলের মধ্যে আধঘন্টা মতো ঘোরায় । (আর ডাঙায় একমিনিটও ঘোরায় না) একবার একেবারে ব্যারেজের কাছে নিয়ে গেল । বেশ ফুরফুর করে হাওয়া দিচ্ছিল । বিকেলের পড়ন্ত আলোয় এই নৌভ্রমণ বেশ সুন্দর একটা অভিজ্ঞতা ।

ড্যামের রাস্তার মুখে কিছু গিফ্‌ট্‌ আইটেমের দোকান আছে । সবমিলিয়ে দশ-বারোটা । জিনিসের দাম সস্তাই বলা যায় । বাঁকুড়ার প্রসিদ্ধ জিনিস হল বিষ্ণুপুরের বিখ্যাত মাটির ঘোড়া - তবে মাটির ঘোড়া নিয়ে আসা রিস্কি বলে কাঠের ঘোড়া কেনা হল ।

কংসাবতীর গতিপথ - ব্যারেজের বিপরীত দিকে
সন্ধ্যে হতে তখনো কিছুটা দেরি আছে , তাই আমরা আরেকবার ব্যারেজের দিকটা গেলাম । আসলে হাতে সময় আছে আর সেরকম কিছু করার নেই, তাই বলতে গেলে একই জায়গা দু'বার করে ঘুরলাম আর কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে ঘরে ফিরে এলাম ।





রাতে চিকেন মিল । খেয়েদেয়ে ঘরে চলে এলাম ।

১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০১৩ মঙ্গলবার । আমাদের ফেরার দিন । আমাদের ফেরার ট্রেন আবার সেই বাঁকুড়া থেকে । রিসর্টে খোঁজ নিয়ে জানলাম সকাল এগারোটা চল্লিশে একটা বাস আছে যেটা সরাসরি বাঁকুড়া যায় । কিন্তু ১৭ই সেপ্টেম্বর বিশ্বকর্ম্মা পুজো - কাজেই বাস চলবে কিনা জানা নেই । তাই ঝুঁকি না নিয়ে ৮০০ টাকায় একটা অ্যাম্বাসাডর ঠিক করা হল যেটা আমাদের একেবারে বাঁকুড়া স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে আসবে । ঠিক হল আমরা সাড়ে এগারোটায় বেরোব ।

হিল্‌টপ থেকে ড্যাম
চানটান করে ব্যাগট্যাগ গুছিয়ে নিয়ে রেডি হয়ে নিয়ে একটা জায়গায় গেলাম যেটা আমাদের দেখা বাকি ছিল । সেটা হচ্ছে সোনাঝুরির হিল্‌টপ । আগেই বলেছি সোনাঝুরি রিসর্টটা একটা পাহাড়ের গায়ে । এই পাহাড়ের মাথায় ওঠার একটা সিঁড়ি আছে । পাহাড়ের মাথায় যখন পৌঁছলাম তখন মুখ দিয়ে আপনা আপনিই বেরিয়ে পড়ল 'বাঃ !' সত্যিই, মুকুটমণিপুরে এসে এখানে না এলে পুরো ঘোরাটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায় ! সামনে কিছুদূরে ড্যামের পাঁচিল আর তার ওপারে বহুদূরবিস্তৃত বিপুল জলরাশি । একটা বিরাট জায়গা একসঙ্গে দেখা যায় এই হিল্‌টপ থেকে । যারা মুকুটমণিপুরে গেছে তারা হয়তো আমার সঙ্গে একমত হবে যে এটাই মুকুটমণিপুরে শ্রেষ্ঠ পাওনা !

এবার ঘরে ফেরার পালা । স্টেশনে পোঁছলাম তখন সাড়ে বারোটা । স্টেশনসংলগ্ন একটা দোকানে ভাতটাত খেয়ে নেওয়া হল । (এটার আর ডিটেল দিচ্ছি না, কারণ খাবারের মান স্টেশনসংলগ্ন দোকানে যেরকম হয়, সেরকমই) আমাদের ট্রেন আরণ্যক এক্সপ্রেসের সময় দু'টো পঁয়তাল্লিশ - তাই স্টেশনে অপেক্ষা করলাম । ট্রেন এল নির্ধারিত সময়ের দশমিনিট পরে । পৌনে সাতটায় সাঁত্রাগাছি আর সেখান থেকে বাড়ি !

সারসংক্ষেপঃ

১. কলকাতা থেকে খুব কাছে দু'দিনের ঘোরার এবং রিল্যাক্স করার জন্য একটা আদর্শ জায়গা মুকুটমণিপুর । ট্রেনে যাওয়ার সুবিধে থাকলেও ধর্ম্মতলা থেকে বাসে যাওয়া অনেক সহজসাধ্য ।
২. মুকুটমণিপুরে অল্প কিছু হোটেল থাকলেও থাকার জন্য সবথেকে উপযোগী হল ওয়েস্ট বেঙ্গল ফরেস্ট ডেভেলপমেন্টের সোনাঝুরি রিসর্ট । বুকিং অফিস  ঃ 6A, Raja Subodh Mullick Square, 7th - Floor, Kolkata-700013 Phone No: 033-2237-0060/ 2237-0061/2225-8549. এছাড়া ওদের ওয়েবসাইট থেকেও সরাসরি বুকিং করা যেতে পারে ঃ http://www.wbfdc.com/.
৩. রিসর্টের খাওয়াদাওয়া অত্যন্ত ভালো এবং সস্তা । এদের রুমে খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা নেই - ডাইনিং এ গিয়ে খেয়ে আসতে হয় ।
৪. এখানে সাইট সিয়িং এর জায়গা বলতে পরেশনাথ পাহাড়, মোহনা, অম্বিকানগর আর ব্যারেজ । সাইট সিয়িং এর জন্য মোটর ভ্যান পাওয়া যায় আর চাইলে রিসর্ট থেকে গাড়িরও ব্যবস্থা করা যেতে পারে ।
৫. কংসাবতী নদীতে নৌকো করে ঘোরা যেতে পারে । নৌভ্রমণের আদর্শ সময় বিকেলবেলা ।
৬. ড্যামে যাওয়ার রাস্তায় কিছু দোকান আছে - এখান থেকে টুকিটাকি জিনিস কেনা যেতে পারে ।
৭. মুকুটমণিপুরে যাওয়ার জন্য ৬ - ৮ জনের গ্রুপ হচ্ছে সবচেয়ে ভালো - সেক্ষেত্রে মাথাপিছু ভ্যান বা নৌকোভাড়াটা অনেক কমে যাবে ।

উপসংহারঃ

মুকুটমণিপুর
পাহাড় আর জলের সহাবস্থানই হল মুকুটমণিপুরের প্রধান আকর্ষণ । শহরের কোলাহল, দূষণ আর যান্ত্রিক পরিবেশ থেকে যেন অনেক দূরে একটা শান্ত নিরিবিলি জায়গায় অবস্থিত এই ভ্রমণকেন্দ্রটি । এখানে খুব বেশি মানুষও বাস করে না আর ট্যুরিজ্‌ম্‌ এদের প্রধান জীবিকাও নয় । তাই কেউ চাইলে নিজের মতো করে জায়গাটা উপভোগ করতে পারে । এখানে বেড়ানোর সব উপকরণই বর্তমান, শুধু নেই বেড়াতে গিয়ে নিয়মের বেড়াজাল । মুকুটমণিপুরের আকর্ষণ থেকে এ'কথা বলাই যায় যে - প্রকৃতিপ্রেমী এবং ভ্রমণপিপাসু মানুষদের দু'ভাগে ভাগ করা যায় । এক, যারা মুকুটমণিপুরে গেছে আর দু'ই যারা মুকুটমণিপুরে যাবে !

মুকুটমণিপুর ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here: