আমি ব্লগ লেখার খুব বেশি সমর্থক কোনওদিনও ছিলাম না, সত্যি কথা বলতে কি এখনও যে আছি তা নয় । তার একটা প্রধান কারণ আমার ধারণা ব্লগ লেখার থেকেও পড়া অনেক বেশি ক্লান্তিকর । অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অনেক সময়ই পড়তে শুরু করে শেষ করা হয়ে ওঠে না । নিজের ধৈর্য এবং/অথবা আগ্রহের অভাবকে 'ঠিক আছে, বাকিটা পরে পড়ব' জাতীয় অজুহাত দিয়ে ঢেকে দিই - আর আমরা সবাই জানি সেই 'পরে' টা আর কখনওই আসে না । তো, এই কারণে আমি ঠিক করেছি আমার ব্লগকে কখনওই অন্যের ক্লান্তির কারণ ঘটাব না, আমার ব্লগের বিষয় হবে প্রধানতঃ ভ্রমণ । আমার মতো যেসব বাঙালিরা ঘুরতে ভালোবাসে, তাদের জন্য আমার ব্লগ হবে তথ্যের একটা উৎস । আমার নিজের একটা অভ্যেস আছে, কোনও জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার আগে সেই জায়গাটা সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, আর ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে আমার বরাবরই মনে হয়েছে যে ইন্টারনেটে লেখালেখি করার ব্যাপারে বাঙালিদের থেকে কুঁড়ে খুব কম শিক্ষিত জাতই আছে । আমার মতো যেসব বাঙালিরা আছে, যারা ইন্টারনেটে কোনো একটা ইংরিজীতে লেখা দেখলেই না পড়ার চেষ্টা করে, তাদের জন্য আমার ব্লগ সহায়ক হবে, এই বিশ্বাস নিয়ে শুরু করছি আমার ভ্রমণকাহিনী । আগেই বলে রাখি, আমি স্ট্যাটিসটিক্সের ছাত্র ছিলাম, তাই আমার ব্লগে তত্ত্বের থেকে তথ্যের দেখাই মিলবে বেশি ।

Monday, June 2, 2014

মহারাষ্ট্র ভ্রমণ

মি আমার বেড়ানোর ব্লগ যেদিন থেকে লেখা শুরু করেছি, তারপরে মহারাষ্ট্র ভ্রমণই সবচেয়ে দীর্ঘ । শনিবার ২৪শে মে, ২০১৪ রাতে বেরিয়ে আমরা ফিরেছি সোমবার ২রা জুন, ২০১৪ । এটা ঠিক যে সময়ের এই পরিসরে গোটা মহারাষ্ট্র রাজ্যটা দেখা সম্ভব নয়, আমরা দেখিও নি । আমরা মহারাষ্ট্রের কয়েকটা বিশেষ জায়গায় ভ্রমণ করেছি, তাই এই লেখার নাম মহারাষ্ট্র ভ্রমণ । এই ৯ - ১০ দিনে আমরা যা ঘুরেছি, তা একসঙ্গে লিখে পোস্ট করতে অনেকদিন সময় লাগবে শুধু তাইই নয়, লেখার পরিমানও দীর্ঘ হবে যা একসঙ্গে পড়ে ওঠা ক্লান্তিকর লাগতে পারে । তাই এবারে একটু অন্যভাবে লিখব । আমাদের ভ্রমণের একেকটা জায়গা লিখে পোস্ট করে দেব । তারপরে আবার পরের ভ্রমণের জায়গাটা যোগ করব । এই পরিকল্পনা মাথায় রেখে আমাদের ভ্রমণের প্রথম জায়গা থেকে শুরু করছি - মুম্বই ।

মুম্বই ভ্রমণঃ

২৪শে মে, ২০১৪ হাওড়া থেকে মুম্বই মেলের এসি থ্রি-টীয়ারে আমাদের যাত্রা শুরু । এবারে দলে একজন শিশুসহ মোট ১৪ জন - আমি, আমার স্ত্রী, বাবা, মা, আমার অফিসের কলিগ্‌ সমীরণদা, বৌদি, ঋজু, আমার আরেক কলিগ্‌ কঙ্কনাদি, অমিতদা, মিনকা (শিশুশিল্পী), কাকু, কাকিমা (কঙ্কনাদির বাবা-মা), আমার আরেক কলিগ্‌ বৈশাখী ও কাকিমা । মুম্বই মেল ছাড়ে রাত ৮ : ১৫ য় । ট্রেনে রাতের খাবার আমরা নিয়েই উঠেছিলাম রুটি আর বৈশাখীর রান্না করা চিকেন । খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়লাম ।

নাগপুরে রেললাইনের ক্রসিং
দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ ২৫শে মে, আমরা সারাদিনই ট্রেনে । আমাদের সবার সীট্‌ একসঙ্গে পড়েনি, জায়গা আর মানুষজন পারমুটেশন করে সবার সঙ্গে সবাই আড্ডা দিচ্ছিলাম । দূরে কোথাও গেলে বড় দলে যাওয়ার এই হচ্ছে সুবিধে - না হলে একটু বোরই লাগে । যাই হোক, ট্রেনের পথে একটা উল্লেখযোগ্য জায়গা হল নাগপুর । নাগপুর স্টেশনে ঢোকার ঠিক আগে একটা রেল লাইনের ক্রসিং আছে যেখানে আমাদের দু'জোড়া লাইন অন্য দু'জোড়া লাইনকে প্রায় ৯০ ডিগ্রিতে ক্রস করে । এই জিনিস সারা ভারতের মধ্যে শুধু এখানেই আছে । এখানে ট্রেন খুব ধীরে চলে, তাই বেশ ভালোভাবেই জিনিসটা দেখতে পেলাম ।

দুপুরে রেলের ক্যান্টিন থেকে চিকেন ভাত নেওয়া হল । রান্না বেশ বাজে । বিকেলে আকোলা-য় ট্রেন থামার পর আমরা এখানকার 'কাম সাম' এ খাবারের খোঁজ করলাম । মুস্কিল হল এখানে আবার নিরামিষ ছাড়া কিছু পাওয়া যায় না । কিন্তু এরা আমাদের একটা ভালো উপদেশ দিল । বলল - আমরা চাইলে ওদের কাছ থেকে নম্বর নিয়ে জলগাঁও এর 'কাম সাম' এ খাবারের অর্ডার দিয়ে রাখতে পারি । আমাদের কোচ আর সীট্‌ নম্বর বলে দিলে ওরা নিজেরা আমাদের খাবার পৌঁছে দিয়ে যাবে । সেইমতো জলগাঁও এর কাম সামে ফোন করে মিক্সড্‌ চাউমিন অর্ডার দেওয়া হল । ট্রেন জলগাঁও পৌঁছয় রাত পৌনে দশটায় - দাঁড়ায় এক মিনিট । এরই মধ্যে কাম সামের লোক এসে আমাদের খাবার দিয়ে গেল (আর অবশ্যই টাকা নিয়ে গেল) । দুপুরের ওই বাজে রান্না খাওয়ার পর এই খাবার সত্যিই অমৃত মনে হচ্ছিল । গপ্‌গপ্‌ করে খেয়ে ফেললাম ।

সি এস টি স্টেশনে আমাদের দল
২৬শে মে, ২০১৪ সোমবার । মুম্বই মেল মুম্বই পৌঁছয় ভোর ৫ : ২৫ এ আর আমাদের ট্রেন একটুও লেট না করে আমাদের পৌঁছে দিল । মুম্বই ! মানুষের স্বপ্নের শহর মুম্বই ! ছত্রপতি শিবাজী টার্মিনাস, গেটওয়ে অফ্‌ ইন্ডিয়া, মেরিন ড্রাইভ, তাজ হোটেল, বান্দ্রা, জুহু, সি-লীঙ্ক সম্বলিত মুম্বই ! শচীন গাভাসকার অমিতাভ আমীর খান শাহরুখের মুম্বই ! যে শহর সারারাত জেগে থাকে, সেই মুম্বই ! যে শহরের মানুষের প্রধান প্রিয় খাবার বড়াপাও, সেই মুম্বই ! তাজ হোটেলে জঙ্গী হামলার মুম্বই ! রেল বিস্ফোরণের মুম্বই ! আবার সেই বিস্ফোরণ থেকে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরতে পারে যে শহর - সেই মুম্বই !

আমাদের 'হোটেল নিউ বেঙ্গল' ক্রওফর্ড মার্কেটে - স্টেশন থেকে হেঁটে মিনিটদশেক । তবে সঙ্গে মালপত্র থাকায় আর রাস্তায় লোকজনকে জিজ্ঞেস করতে হওয়ায় এই পথটা যেতে আমাদের আধঘন্টার বেশি লেগে গেল । হোটেলটা সবমিলিয়ে বেশ ভালো । ভেতরটা একটু গোলকধাঁধার মতো - হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা না থাকলেও হোটেলের ঘরের বিন্যাস বেশ জটিল । সেসব বাদ দিলে এমনিতে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ।

আমরা চানটান করে রেডী হয়ে নিলাম । আমাদের এখানে বিশ্রাম নেওয়ার সময় নেই - প্রথমদিনই আমাদের গন্তব্য 'আলিবাগ' । তার আগে হোটেলের লাগোয়া রেস্ট্যুরেন্টে কম্‌প্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট সেরে নেওয়া হল ।

গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া
আলিবাগ মুম্বই থেকে দু'ভাবে যাওয়া যায় । এক, মুম্বই থেকে মান্ডোয়া (হ্যাঁ, সেই মান্ডোয়া - ভিজয় দীননাথ চৌহান !) পর্যন্ত লঞ্চে গিয়ে মান্ডোয়া থেকে বাসে আলিবাগ । আর দুই, পুরোটাই গাড়িতে । সেক্ষেত্রে সময় এবং খরচ অনেক বেশি । যাদের জলপথ পরিবহনে সমস্যা আছে, তাদের জন্য দ্বিতীয়টাই শ্রেয় ।



ক্যাটামেরনে যাওয়ার সময়ে ফেলে আসা মুম্বই শহর
আমরা হোটেল থেকে বেরিয়ে কয়েকটা ট্যাক্সি নিয়ে পৌঁছে গেলাম গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ায় - এখান থেকেই আলিবাগের লঞ্চ ছাড়ে । পি এন পি, অজন্তা আর মালদার - এই তিনটে বেসরকারি সংস্থার লঞ্চ চলে । লঞ্চের পরিষেবা খুবই ঘনঘন, কাজেই তাড়াহুড়ো না করলেও চলবে । আমরা পি এন পি র ক্যাটামেরন এ চড়লাম । এর নিচের ডেকটা এসি এবং নীল কাচে ঢাকা । চাইলে ওপরের ডেকে গিয়েও দাঁড়ানো যায় । ক্যাটামেরন ছাড়ামাত্রই আমরা ওপরে গিয়ে হাজির হলাম । শুধু আমরাই নয়, আরও বহু যাত্রীই এটা করল । ওপরের ডেকে দাঁড়িয়ে আরব সাগরের ওপর দিয়ে যেতে যেতে মুম্বই শহরের ক্রমশঃ দূরে সরে যাওয়া দেখতে অসাধারণ লাগে ! ক্যাটামেরনের টিকিট আগে থেকে কাটা না থাকলে কোনও ক্ষতি নেই, এরা যাওয়ার পথেই টিকিট কেটে নেয় । ভাড়া মাথাপিছু ১৫০ টাকা । এটা একটা ফেরি-কাম-বাস সার্ভিস, অর্থাৎ টিকিটের ভাড়াটা মুম্বই থেকে মান্ডোয়া পর্যন্ত ক্যাটামেরন আর মান্ডোয়া থেকে আলিবাগ পর্যন্ত বাস যোগ করে (না, ফেরারটা একসঙ্গে নয়, অত আবদার করে না !) ।

মান্ডোয়া জেটী
মান্ডোয়া পোঁছলাম দুপুর একটার একটু পরে । জেটীর কাছ থেকেই বাস ছাড়ে - আমরা বাসে উঠে পড়লাম । মান্ডোয়া থেকে আলিবাগ যাওয়ার রাস্তাটাও খুব সুন্দর । রাস্তার দু'ধারে পাহাড়ের সারি, আর গাছপালা ।






আমরা আলিবাগ পোঁছলাম তখন দুপুর পৌনে দু'টো । আলিবাগের প্রধান আকর্ষণ হল সমুদ্রের বীচ আর আলিবাগ কেল্লা । বাস কিন্তু বীচ্‌ পর্যন্ত নিয়ে যায় না । বাস থেকে নেমে আমরা ঠিক করলাম আগে লাঞ্চ করে তারপর সমুদ্রের ধারে যাব । এখানে একটা মুস্কিল হল । আলিবাগ শহরে আমিষ রেস্ট্যুরেন্ট প্রায় নেই বললেই চলে । অনেক খুঁজে বেশ অনেকটা হেঁটে তবে একটা পাওয়া গেল (নিরামিষই খেয়ে নিতে পারতাম ? কেন ??? আমি কি উন্মাদ ???) । সেখানে আমরা ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেন ইত্যাদি খেয়ে আলিবাগ বীচের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম দু'টো বড়ো অটো নিয়ে । অটোপিছু ১০০ টাকা করে পড়ল ।

আলিবাগ বীচ থেকে কেল্লা
আলিবাগ বীচে কিন্তু সমুদ্র বিশেষ ঘ্যাম কিছু না । ঢেউ ফেউ কিস্যু নেই । এখানকার প্রধান দেখার জায়গা হল শিবাজীর কেল্লা । এই কেল্লা সমুদ্রের জলের মধ্যে - ভাঁটার সময়ে হেঁটে যাওয়া গেলেও জোয়ারের সময়ে যাওয়া যায় না । সমুদ্রের পাড় থেকে এই কেল্লা প্রায় এক কিলোমিটারের মতো । আমরা দু'টো ঘোড়ার গাড়ি নিলাম যাওয়ার জন্য । যাতায়াত মিলিয়ে পড়ল মাথাপিছু ১০০ টাকা করে ।

আলিবাগ কেল্লার মাথা থেকে ভেতরের দৃশ্য
আলিবাগে ঢুকতে মাথাপিছু ৫ টাকা করে টিকিট লাগে । কেল্লার ভেতরটা বেশ বড়, যদিও অনেক জায়গাই ভেঙ্গে গেছে । তবে কেল্লাটা দেখে বোঝা যায় যে এখানে সুরক্ষা ব্যবস্থা বেশ ভালো ছিল । সাধারণতঃ বাইরের শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এবং দূর থেকে শত্রুকে দেখতে পেয়ে যুদ্ধ করার জন্য এই জাতীয় কেল্লা তৈরি করা হয়, আলিবাগ কেল্লা দেখে মনে হয় এটা সে'ব্যাপারে বেশ উপযুক্তই ছিল । কেল্লার ভেতরে একটা মন্দির আছে যেটা রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় । কেল্লার সামনের দিকে একটা দরজা আছে যেটা দিয়ে বেরিয়ে পাথরে পাথরে পা দিয়ে সমুদ্রের ধারে যাওয়া যায় । জায়গাটায় ঘুরতে বেশ লাগে ।

ফেরার সময়ে আলিবাগ জেটী থেকে
আলিবাগ কেল্লায় বেশ অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরি করে আমরা আবার সমুদ্রের পাড়ে ফিরে এলাম । সেখানে প্রথমে গোলা খাওয়া হল । তারপর আরও কিছুক্ষণ পরে আবার অটো ধরে বাসস্ট্যান্ডে এলাম । এখানে এসে আবার আখের রস খাওয়া হল । তখন বাজে বিকেল পৌনে ছটা । ফেরার পথেও আমরা পি এন পি র বাস ধরলাম । ৬ : ৩০ টায় পি এন পি র শেষ বাস আর সাড়ে সাতটায় শেষ ফেরি । মান্ডোয়া জেটি থেকে যখন আমাদের ক্যাটামেরন ছাড়ল, তখন আকাশের আলো দেখে বিকেল বলা না গেলেও রাত বলা যায় না কখনওই, বরং সন্ধ্যে বলা যেতে পারে ।

রাতের আলোয় গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া
গেটওয়ে অফ্‌ ইন্ডিয়া ফিরতে ফিরতে রাত ৮ : ৩০ বাজল । আমাদের অফিসের কয়েকজন প্রাক্তন সহকর্মী তাদের বর্তমান কর্মসূত্রে মুম্বইতে থাকে, আমরা আগে থেকেই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঠিক করেছিলাম আজ সন্ধ্যেয় দেখা করব । সেইমতো সবার সঙ্গে দেখা করে আমরা ডিনার করতে গেলাম মুম্বইয়ের বিখ্যাত রেস্ট্যুরেন্ট 'বড়েমিঞা'য় । এটা গেটওয়ে অফ্‌ ইন্ডিয়া থেকে হেঁটে বড়জোর মিনিট দশেক । এখানে অত্যন্ত সুস্বাদু বিরিয়ানি, ব্রেন ফ্রাই, ভুনা ইত্যাদি ইত্যাদি খাওয়া হল ।

বান্দ্রা বীচ্‌
রাত সাড়ে দশটা বাজে, কিন্তু মুম্বইতে এটা কিছুই না । আমাদের দলের কয়েকজন হোটেলে ফিরে গেল আর বাকিরা ট্যাক্সি নিয়ে গেলাম বান্দ্রা । জায়গাটা বিশেষ কিছু না, সমুদ্রের ধারে পাথরের ওপর বসার জায়গা । কিন্তু যাওয়ার পথটা সুন্দর - বিশেষ করে বান্দ্রা-ওর্লি সী-লিঙ্ক । এই সী-লিঙ্ক সম্পর্কে বিস্তারিত বলছি না, গুগল্‌ সার্চ করলে অনেক বেশি তথ্য জানা যাবে । যেটা গুগল্‌ থেকে জানা যাবে না সেটা হল এর ওপর দিয়ে যাওয়ার অসাধারণ অভিজ্ঞতা, যা আমাদের হল । গাড়ির স্পীড প্রায় একশ' র কাছাকাছি রেখে আলোকোদ্ভাসিত ৫.৬ কিলোমিটার লম্বা এই ব্রীজে চড়ে সমুদ্রের ওপর দিয়ে যাওয়া আর সেইসঙ্গে ডানদিকে চোখ রেখে মুম্বই শহরের স্কাইস্ক্যাপার এর দৃশ্য দেখা - এ জিনিস নিজের চোখে না দেখলে ভালোলাগাটা অনুভব করা শক্ত । বান্দ্রায় শাহরুখের বাড়ি মান্নাত-এর সামনে আমরা ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে সমুদ্রের ধারে গিয়ে বসলাম (বাড়ির ভেতরে আর গেলাম না কারণ গেলে আমাদের ডিনার করার জন্য জোর করত আর আমাদের পেটে তখন একেবারেই জায়গা ছিল না) । সমুদ্রের ধারে বসে থাকতেও খুব ভালো লাগছিল । ফেরার সময়েও একই পথ । হোটেলে ফিরলাম তখন রাত প্রায় একটা ।

২৭শে মে, ২০১৪ মঙ্গলবার । আমাদের 'এলিফ্যান্টা কেভ' যাওয়ার দিন । সকালটা মোটামুটি আগেরদিনের মতোই, ব্রেকফাস্ট করে ট্যাক্সি নিয়ে গেটওয়ে অফ্‌ ইন্ডিয়া যাওয়া আর সেখান থেকে 'এলিফ্যান্টা' র লঞ্চ ধরা । এটা আগেরদিনের মতো ক্যাটামেরন নয়, পাতি লঞ্চ । লঞ্চের ভাড়া মাথাপিছু ১৫০ টাকা, তবে এটা যাতায়াত মিলিয়ে । জলপথের বিবরণ প্রায় আগেরদিনের মতোই, পার্থক্য হল মান্ডোয়া বা আলিবাগ মূল ভূখন্ডের মধ্যেই আর এলিফ্যান্টা একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ।

এলিফ্যান্টা যাওয়ার টয়ট্রেন
এলিফ্যান্টা দ্বীপে লঞ্চ জেটী থেকে একটা টয়ট্রেন চলে যেটা পাহাড়ের নিচ পর্যন্ত নিয়ে যায় । পথটা হেঁটে যাওয়ার পক্ষেও বেশি নয়, তবে ট্রেনে যাতায়াতের জন্য ১০ টাকাটা একেবারেই কম, তাই সবাই ট্রেনেই যায় । ট্রেন থেকে নেমে আমরা সিঁড়ি দিয়ে পাহাড়ের ওপরে উঠলাম ।




এলিফ্যান্টার ১ নং গুহা
এলিফ্যান্টা 'ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ' রক্ষণাবেক্ষণ করে । ঢোকার টিকিট মাথাপিছু ১০ টাকা আর ১৫ বছরের নিচে কোনও টিকিট লাগে না । এলিফ্যান্টা পাহাড় খোদাই করে তৈরি করা গুহামন্দির । এখানে সবমিলিয়ে মোট পাঁচটা গুহা আছে যার মধ্যে প্রথমটাই সবচেয়ে বড় আর সবচেয়ে সুন্দর । সম্পূর্ণভাবে পাহাড় কেটে তৈরি এই গুহামন্দিরের ভেতরে পাথরে খোদাই করে প্রচুর মূর্তি আর ছবি । জিনিসগুলো দেখে আশ্চর্য হয়ে যেতে হয় ! কোনও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির সাহায্য ছাড়াই শুধুমাত্রা ছেনি আর হাতুড়ির সাহায্যের এই অসাধারণ ভাস্কর্য সৃষ্টি করেছিলেন সে'যুগের শিল্পীরা । এই গুহা তৈরির সময়কাল আনুমানিক পঞ্চম থেকে অষ্টম শতাব্দী যদিও কে বা কারা তৈরি করেছিলেন সেটা সঠিকভাবে জানা যায় না । বাইরে প্রবল গরম হলেও গুহার ভেতরটা বেশ ঠান্ডা । এখানে আমরা বেশ অনেকক্ষণ ধরে এই সৌন্দর্য্য উপভোগ করলাম ।

এরপর আমরা একে একে ২, ৩, ৪ ও ৫ নম্বর কেভে গেলাম । এগুলো তুলনামূলকভাবে ছোট আর শেষেরটা অসম্পূর্ণ । সবকিছু দেখা শেষ হলে আমরা এলিফ্যান্টা গুহা থেকে বেরিয়ে আবার পাহাড়ের নিচে নেমে এলাম ।

গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ার সামনে আমাদের দল
দুপুর দু'টো বাজে, এখন মুম্বই গিয়ে লাঞ্চ করতে গেলে অনেক দেরি হয়ে যাবে তাই ঠিক হল এখানেই খেয়ে নেওয়া হবে । সেইমতো একটা ভাতের হোটেলে ঢুকে খেয়েদেয়ে নেওয়া হল । তারপর এলিফ্যান্টা থেকে ফেরা । প্রথমে টয়ট্রেন আর তারপর লঞ্চ । ফেরার সময়ে বোধহয় জোয়ার ছিল, আমাদের লঞ্চটা বেশ দুলছিল আর মাঝে মাঝেই সমুদ্রের জলের ঝাপ্টা লঞ্চের মধ্যে ঢুকে আমাদের ভিজিয়ে দিচ্ছিল । সে এক মজার অভিজ্ঞতা । যাই হোক, মুম্বই পৌঁছলাম তখন বিকেল সাড়ে চারটে । এখান থেকে আমাদের হ্যাঙ্গিং গার্ডেন বা ঝুলন্ত উদ্যানে (না না, ব্যাবিলনের নয়, মুম্বইতেও একট আছে) যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সেটা পাঁচটায় বন্ধ তাই আর গিয়ে লাভ নেই । সবাই হোটেলে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল । বাকিরা ট্যাক্সিতে চলে গেল আর আমি হেঁটে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম । গেটওয়ে অফ্‌ ইন্ডিয়া থেকে আমাদের হোটেল হেঁটে আধঘন্টার বেশি লাগবে না, তাই শহরটাকে একটু পরিক্রমা করার জন্য হাঁটা শুরু করলাম ।

ফ্লোরা ফাউন্টেন
রাস্তায় যে উল্লেখযোগ্য জিনিসগুলো দেখলাম সেগুলো আগে লিখে নিই । মুম্বই মিউজিয়াম, বি এস ই বা বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ এর বিশাল ঢ্যাঙা বাড়িটা, মুম্বই ইউনিভার্সিটি, ফ্লোরা ফাউন্টেন, ওরিয়েন্টাল বিল্ডিং এবং অবশ্যই সি এস টি । একটা কথা স্বীকার না কর উপায় নেই যে মুম্বইয়ের রাস্তাঘাট বেশ পরিষ্কার এবং লোকজনও রাস্তায় নিয়ম মেনে চলে বা গাড়ি চালায় । রাস্তায় হাঁটতে বেশ ভালোই লাগছিল ।

হোটেলে ফিরে এসে আবার তৈরি হলাম বেরোনোর জন্য । আমাদের মুম্বই ভ্রমণ প্রায় শেষের দিকে, এবার আমরা গেলাম মুম্বইয়ের বিখ্যাত মেরিন ড্রাইভের দিকে । হোটেল থেকে ট্যাক্সি নিয়ে মেরিন ড্রাইভের ওপর দিয়ে আমরা পৌঁছলাম চৌপাট্টি-তে । রাস্তাটা অনবদ্য । বহু হিন্দী ছবিতে মেরিন ড্রাইভ দেখানো হয় তাই মেরিন ড্রাইভ কেমন দেখতে সেটা আর কাউকে বলে দিতে হয় না । তবে জায়গাটা দিয়ে যেতে বা দাঁড়িয়ে থাকতে অসাধারণ লাগে সেটা বলতেই হবে ।

চৌপাট্টি
চৌপাট্টিতে আমরা সমুদ্রের ধারে কিছুক্ষণ সময় কাটালাম । সূর্য্যাস্ত হয়ে গেছে, আকাশের আলোটা দেখবার মতো হয়েছে । দেখতে পেলাম মেরিন ড্রাইভের আলোগুলো জ্বলে উঠল । এই জিনিসটাকে 'কুইন্স নেকলেস' বলে । চৌপাট্টিতে প্রচুর খাবারের দোকান আছে । আমরা সেখান থেকে বড়াপাও খেলাম । যারা খেতে ভালোবাসে তাদের উদ্দেশ্যে জানাই, মুম্বই বা মহারাষ্ট্রের লোকজন বড়াপাওকে একটা প্রচন্ড ঘ্যাম খাবার মনে করলেও জিনিসটা আদপেও তা নয় । দু'টো বান-পাঁউরুটি র মধ্যে একটা বড় সাইজের ডালবড়া - ব্যাস । এবং খেতে সেরকম ভালো কিছু নয় । যাই হোক, এরপর আমরা ফুচকা, কুলফি ইত্যাদি খেয়ে আবার ফেরার পথ ধরলাম ।

হোটেলে ফিরে জিনিসপত্র গুছিয়ে হোটেল থেকে বেরোলাম তখন সাড়ে ন'টা । আমাদের পরবর্তী গন্তব্য 'গণপতিপুলে' । সেখানে যাওয়ার জন্য আমরা সি এস টি থেকে ট্রেন ধরে নামব রত্নগিরি । রত্নগিরি থেকে গণপতিপুলে গাড়িতে প্রায় একঘন্টা ।

আমাদের মুম্বই ভ্রমণ শেষ । এটা ঠিক যে আমরা আমাদের এই দু'দিনের সফরে মুম্বই শহরের প্রায় কিছুই দেখিনি । তবে যা দেখেছি সেই আলিবাগ বা এলিফ্যান্টা আমাদের খুবই ভালো লেগেছে । সেই ভালোলাগার অনুভূতি সঙ্গে নিয়েই শেষ করছি ব্লগের 'মুম্বই ভ্রমণ' ।

সারসংক্ষেপঃ

১. হাওড়া থেকে মুম্বই যাওয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় ট্রেন হল মুম্বই মেল । এছাড়া হাওড়া-মুম্বই দুরন্ত আছে কিন্তু এটা সপ্তাহে প্রতিদিন চলে না ।
২. যদি ট্রেনের ক্যান্টিনের খাবার ভালো না লাগে, তাহলে কাম-সাম থেকে নেওয়া যেতে পারে । এদের সুবিধে হল যেকোনও বড় স্টেশনেই এদের কাউন্টার আছে, আর ফোন করে অর্ডার দিলে আর সেইসঙ্গে কোচ নম্বর আর বার্থ নম্বর বলে দিলে এরা ট্রেনে এসে খাবার দিয়ে যায় ।
৩. মুম্বইতে অসংখ্য হোটেল আছে, তবে কম দামে হোটেল পাওয়া প্রায় অসম্ভব । আমরা ছিলাম ক্রওফর্ড মার্কেটের 'নিউ বেঙ্গল হোটেল'-এ । হোটেলের মান দারুণ কিছু না হলেও মোটামুটি দামের মধ্যে চলনসই । এদের ওয়েবসাইট http://www.hotelnewbengal.net/ থেকে সরাসরি বুকিং করা যেতে পারে বা এদের কলকাতার অফিস থেকেও বুকিং করা যেতে পারে । যোগাযোগ 033-22486664.
৪. মুম্বইতে বেশ কিছু ঘোরার জায়গা আছে তাদের মধ্যে গেটওয়ে অফ্‌ ইন্ডিয়া, মেরিন ড্রাইভ, হ্যাঙ্গিং গার্ডেন, চৌপাট্টি, জুহু, মিউজিয়াম ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য । যদিও আমাদের সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য আমরা এর মধ্যে শুধুমাত্র মেরিন ড্রাইভ আর চৌপাট্টিই দেখতে পেরেছি ।
৫. মুম্বই থেকে জলপথে আলিবাগে যাওয়া যেতে পারে । এখানকার শিবাজীর কেল্লা বিশেষ উল্লেখযোগ্য ।
৬. মুম্বই থেকে জলপথে এলিফ্যান্টা দ্বীপে গিয়ে এলিফ্যান্টা গুহা অবশ্যই দেখা উচিৎ । পাহাড় কেটে তৈরি প্রায় ছ'শ - ন'শ বছরের পুরনো এই গুহার ভেতরের ভাস্কর্য ভীষণরকমই চিত্তাকর্ষক ।
৭. মুম্বই গেলে একবার অন্তত মেরিন ড্রাইভে যাওয়াই উচিৎ । দিন বা রাত যেকোনও সময়েই এর দৃশ্য অনবদ্য ।

মুম্বই ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

গণপতিপুলে ভ্রমণঃ

মুম্বই থেকে রত্নগিরি যাওয়ার জন্য রাত ১১ : ০৫ এ ছাড়ে কোঙ্কন কন্যা এক্সপ্রেস । এবারে আমরা স্লীপার ক্লাসের টিকিট কেটেছিলাম । রত্নগিরি পৌঁছনোর সময় হল পরেরদিন সকাল ৫ : ৩০ । আমরা হোটেল থেকে ডিনার প্যাক করে নিয়েছিলাম, ট্রেনে বসে সেগুলো খেয়ে ফেললাম । মেনু ছিল রুটি আর চিকেন বাটার মশালা ।

রত্নগিরি যাওয়ার এই রেলপথের নাম হল ‘কোঙ্কন রেলওয়ে’ । আমি আগেই শুনেছিলাম কোঙ্কন রেলওয়ের পথটা খুব সুন্দর, অনেকটা অংশই পাহাড় ও নদীর মধ্যে দিয়ে । যেহেতু আমরা পুরো পথটাই রাতে যাচ্ছি, কাজেই সেসব দেখার সুযোগ আপাতত নেই । শুয়ে পড়লাম ।

আমার ট্রেনে সাধারণতঃ ঘুম হয় না, আলো ফোটার পর দরজার ধারে গিয়ে দাঁড়ালাম । বাইরের দৃশ্য সত্যিই খুব সুন্দর । রেলপথটা পুরোটাই পাহাড়ের ভেতর দিয়ে, মাঝে মাঝে পাশে নদী চলেছে । পথটা অনেকটা উঁচু । মাঝে মাঝে ট্রেন টানেলের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে । একেকটা টানেল বেশ লম্বা । রত্নগিরি পৌঁছনোর কিছুক্ষণ আগে একটা টানেল পড়ল সেটা যেন শেষই হতে চাইছিল না । আমার ধারণা সেটা প্রায় ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ । আমরা যারা সমতলে থাকি, পাহাড়ের টানেলের মধ্যে দিয়ে ট্রেনে যাওয়ার সুযোগ যাদের কদাচিৎ হয়, তারা এই জিনিস দেখে যে অভিভূত হয়ে পড়বে তাতে আর সন্দেহ কি ?

এই সুন্দর পথে চলতে চলতেই সুন্দর স্টেশন রত্নগিরি এসে গেল । আমাদের ট্রেন আধঘন্টা মতো লেট ছিল । রত্নগিরি স্টেশনটা বলতে গেলে একটা পাহাড়ের মাথায়, স্টেশন থেকে বেরোতে গেলে আরও কিছুটা ওপরে উঠতে হয় । এবার আমাদের কাজ গণপতিপুলে যাওয়ার গাড়ি জোগাড় করা ।

রত্নগিরির পথ ধরে
রত্নগিরি থেকে গাড়ি পাওয়াটা খুব একটা সহজ নয় । প্রথমতঃ স্টেশনটা খুব বড় কিছু নয়, তাই স্টেশনে কোনও গাড়ির স্ট্যান্ড নেই । যেটা আছে সেটা অটোর স্ট্যান্ড । এখান থেকে অটো গণপতিপুলে যায় কিন্তু আমাদের মালপত্র নিয়ে সেভাবে যাওয়া সম্ভব নয় । অনেক খোঁজাখুঁজি করে শেষপর্যন্ত্য দু’টো গাড়ি পাওয়া গেল । দু’টো গাড়ি মিলিয়ে পড়ল ২,৮০০ টাকা ।

গণপতিপুলের পথে সমুদ্রের দৃশ্য

রত্নগিরি জায়গাটা বেশ সুন্দর । বেশ ফাঁকা ফাঁকা মালভূমি ধরনের জায়গা । রাস্তাগুলো মাঝে মাঝে অনেকটা ওপরে উঠে গেছে আবার কখনও কখনও নেমে গেছে । এইভাবে প্রায় মিনিট চল্লিশেক চলার পরে হঠাৎ আমাদের পাশে চলে এল সমুদ্র । পাহাড়ের ওপর থেকে এভাবে আমি কখনও সমুদ্র দেখিনি । জলে প্রচন্ড ঢেউ না থাকলেও পরিষ্কার জলটা দেখতে দারুণ লাগছিল । এই দৃশ্যই রত্নগিরি থেকে গণপতিপুলে যাওয়ার পথে সবথেকে বড় পাওনা ।

গণপতিপুলে পোঁছলাম তখন সকাল ৭ : ৪৫ । এখানে আমাদের বুকিং ছিল এম টি ডি সি-র (মহারাষ্ট্র ট্যুরিজম্‌ ডেভেলপ্‌মেন্ট কর্পোরেশন) রিসর্টে । আমাদের বুকিং সকাল ১০ টা থেকে । এরা বলল তার আগে কোনও ঘরই ফাঁকা হবে না, তাই আমাদের ১০ টা পর্যন্ত বসে থাকতে হবে । তবে ঘর না পেলেও একটা কমন্‌ রেস্ট রুম আছে সেখানে ফ্রেশ হয়ে নেওয়া যেতে পারে ।

গণপতিপুলে রিসর্টের ভেতর
রিসর্টের ভেতরটা খুব সুন্দর – গাছপালা বা বাগানের নিয়মিত পরিচর্যা করা হয় । একেকটা দোতলা বিল্ডিং-এ মোট বারোটা করে ঘর । জায়গাটা সবমিলিয়ে বেশ বড় । প্রত্যেকটা বিল্ডিং-এর সামনে একটা ছোট পার্কের মতো জায়গা, সেখানে স্লীপ, দোলনা, ঢেঁকি, বসার জায়গা ইত্যাদি আছে ।

রিসর্টে আমাদের কটেজ
এরকমই একটা বিল্ডিং-এর দোতলায় আমাদের চারটে ঘর দেওয়া হল । একটায় আমরা চারজন, একটায় কঙ্কনাদিরা চারজন, আর বাকি দু’টোয় বৈশাখী ও সমীরণদারা । ঘরগুলো খুবই সুন্দর এবং বেশ বড় । চারজন থাকার জন্য একটা করে ডাবল্‌ বেড আর দু’টো করে গদি দেয় । প্রত্যেকটা ঘরের লাগোয়া একটা ব্যালকনি আছে সেখান থেকে সমুদ্র দেখা যায় । সামনের নারকোল গাছের মধ্যে দিয়ে এই দৃশ্য অসাধারণ !

গণপতিপুলে বীচ্‌
আমরা কিছুক্ষণের মধ্যে সমুদ্রের গেলাম চান করতে । আমি এর যতবার সমুদ্রে গেছি, বঙ্গোপসাগরেই গেছি - কখনও আরব সাগরে চান করিনি, এবারেই প্রথম করলাম (না, আলাদা কিছু লাগল না !) । আরব সাগরে এমনিতে ঢেউ কম, তবে গণপতিপুলে অঞ্চলে সমুদ্রের ঢাল বেশ বেশি, তাই এখানে ঢেউ বেশি আর সেই সঙ্গে সঙ্গে আন্ডার কারেন্টও বেশি । আর এখানকার জলের আরেকটা বৈশিষ্ট্য হল জলটা বেশ নীল, বিশেষ ঘোলা নয় । জলে চালানোর জন্য আবার ওয়াটারক্র্যাফটও ভাড়া পাওয়া যায় ।

প্রায় ঘন্টাখানেক চানটান করে জল থেকে উঠে এলাম । সমুদ্রে চান করলেই প্রচন্ড খিদে পায় আর ঠিক পাড়েই যখন শাঁসালো ডাব বিক্রি করে, তখন খিদেটা আরও বেড়ে যায় । যাই হোক, ডাব টাব (টাব মানে ডাবের শাঁস) খেয়ে ঘরে এসে আবার চান করে নিলাম ।

এখানে একটা বেশ বড় ডাইনিং এরিয়া আছে । দুপুরে ভাত, ডাল, তরকারি, মাংস, ফ্রাইড রাইস, চিলি চিকেন ইত্যাদি খাওয়া হল । খাবারের মান ভালো, কিন্তু এদের একটা সমস্যা হল এরা খাবার সার্ভ করতে ভীষণ দেরি করে । খাওয়ার পরে যে যার ঘরে এসে বিশ্রাম নিলাম ।

সমুদ্রের ওপর মেঘের আড়ালে সূর্য্যাস্ত
বিকেলে আরেকবার সমুদ্রের ধারে যাওয়া হল । গণপতিপুলেতে সমুদ্র ছাড়া আর কিছুই নেই, তবে এখানকার বীচটা খুব সুন্দর, বসে থাকতে ভালোই লাগে । বীচে তিনচাকার মোটরবাইক, টয়ট্রেন ইত্যাদি চলে । বসে বসে সূর্য্যাস্ত দেখলাম । এটা আমার দেখা আরেকটা বিশেষ জিনিস – সমুদ্রের ওপর সূর্য্যাস্ত । সাধারণতঃ বঙ্গোপসাগরে বীচগুলোয় অর্থাৎ দীঘা, পুরী, তাজপুর, মন্দারমণি, শঙ্করপুরে আমরা সূর্য্যোদয়ই দেখি, সূর্য্যাস্ত দেখা যায় না কারণ এইসব জায়গায় সমুদ্রের ওপর সূর্য্যাস্ত হয় না । গণপতিপুলেতে ঠিক এটাই দেখা গেল কারণ আরব সাগর ভারতের পশ্চিমে । অবশ্য পুরোটা দেখা গেল না, কারণ শেষটা সূর্য্য মেঘে ঢেকে গেছিল ।  তবে দিনের শেষ আলোয় যে বর্ণচ্ছটা, সেই পাওনাটাই বা কম কি ?

এরপরে আর কিছু করার নেই – কিছু দেখারও নেই । সন্ধ্যেবেলা চা-টা খেয়ে আড্ডা মেরে সময় কাটল । রাতে খাওয়ার সময়ে মোটামুটি দুপুরের মেনুই নেওয়া হল আর এরা দুপুরের মতোই দিতে দেরিও করল । আমরা পরেরদিন সকালে এখান থেকে বেরিয়ে যাব – আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ‘সির্ডি’ । সেইমতো রাতেই ব্যাগট্যাগ গুছিয়ে রেখে শুয়ে পড়লাম । আমাদের চারজনের মধ্যে আমি ব্যালকনিতে শুলাম । এখানে নিরাপত্তার কোনও সমস্যা নেই, তাই ব্যালকনির দিকের দরজা খুলেই রাখলাম । মজার ব্যাপার, সমুদ্রের একেবারে ধারে হওয়া সত্ত্বেও বারান্দার হাওয়া একেবারেই দিচ্ছিল না । তবে বাইরেটা খুব গরম না হওয়ায় শুয়ে থাকতে ভালোই লাগছিল ।

আমাদের ব্যালকনি থেকে সমুদ্র
পরেরদিন সকালে আমাদের গাড়ি এল তখন ছ’টা । এটা একটা ১৮ সীটের টেম্পো-ট্রাভেলর । সেই গাড়ি আমাদের আবার রত্নগিরি পৌঁছে দিল তখন সাতটা বাজে । রত্নগিরি থেকে আমরা নাসিকের ট্রেন ধরব । নাসিক থেকে আবার গাড়ি করে সির্ডি । সেখানে ভ্রমণটা আসবে আমার ‘মহারাষ্ট্র ভ্রমণ’-এর পরবর্তী অংশে । আপাতত ‘গণপতিপুলে ভ্রমণ’ এই পর্যন্তই ।

সারসংক্ষেপঃ

১. মহারাষ্ট্রের সমুদ্র সৈকতে গণপতিপুলে একটা সুন্দর ঘোরার জায়গা । কলকাতা থেকে শুধু গণপতিপুলে যাওয়ার কোনও মানে না হলেও মুম্বই গেলে এখানে একবার যাওয়া যেতেই পারে । বিশেষ করে যারা মুম্বইতে বা মহারাষ্ট্রের উপকূল এলাকায় থাকে, তারা একবার এখানে ঘুরে আসতেই পারে ।
২. গণপতিপুলের নিকটতম রেলওয়ে স্টেশন রত্নগিরি । এখান থেকে গণপতিপুলে যাওয়ার জন্য গাড়ি বা অটোরিক্সা পাওয়া যায় । রত্নগিরি থেকে গণপতিপুলে যেতে একঘন্টার মতো লাগে ।
৩. গণপতিপুলেতে কিছু হোটেল থাকলেও এম টি ডি সি র রিসর্টটাই সবচেয়ে সুন্দর এবং সবচেয়ে সুন্দর জায়গায় । ভাড়া একটু বেশি হলেও এখানেই থাকা শ্রেয় । এদের ওয়েবসাইট http://mtdcrrs.maharashtratourism.gov.in/Account/Login.aspx থেকে সরাসরি বুকিং করা যেতে পারে ।
৪. এম টি ডি সি-র রিসর্টটা সমুদ্রের একেবারে ধারেই । ঘর থেকেই সমুদ্র দেখতে পাওয়া যায় ।
৫. এখানকার সমুদ্রের রঙ বেশ নীল । এখানে সমুদ্রে ঢেউও বেশ ভালো, তাই চান করেও আনন্দ পাওয়া যায় ।
৬. এম টি ডি সি-র খাওয়াদাওয়া ভালোই, তবে দাম একটু বেশি ।

গণপতিপুলে ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

সির্ডি ভ্রমণঃ

রত্নগিরি থেকে নাসিক যাওয়ার জন্য মঙ্গলা – লাক্ষাদ্বীপ এক্সপ্রেস ছাড়ে সকাল ৭ :  ৪০ এ । আমাদের ট্রেন এল মিনিট দশেক দেরিতে । এই রেলপথও কোঙ্কন রেলওয়ে – আমরা আগেরদিন যে পথ দিয়ে এসেছি সেই পথেই পানভেল পর্যন্ত্য ফিরে যাব । পানভেল থেকে পথ আলাদা হবে । অর্থাৎ এখন যেতে যেতে আমরা দিনের আলোয় দেখতে পাব কোঙ্কন রেলওয়ের অসাধারণ সৌন্দর্য্য ।

কোঙ্কন রেলওয়ে
গেলাম – দেখলাম – এনজয় করলাম । সত্যিই অনবদ্য দৃশ্য । আগেরদিন সকালে যে দৃশ্য অল্পক্ষণের জন্য দেখতে পেয়েছিলাম সেই দৃশ্যই অনেকক্ষণ ধরে দেখলাম । একের পর এক পাহাড়, তার মাঝখান দিয়ে ছুটে চলেছে আমাদের ট্রেন । একটা পাহাড়ের টানেল থেকে বেরোচ্ছে তো আরেকটায় ঢুকে পড়ছে । পুরো রাস্তাটাই পাহাড়ের ওপর দিয়ে, নিচে – বহুনিচে মাঝে মাঝে মানুষজন বসতি দেখা যাচ্ছে । চাষের ক্ষেত, নদী, জলাশয় সবমিলিয়ে এত সুন্দর লাগছিল যে সেটা লিখে বোঝানো কঠিন । এটুকু বলতেই পারি সির্ডিতে গিয়ে সাঁইবাবার মন্দির দেখে কার কিরকম ভালো লাগবে জানি না তবে আমাদের সির্ডি ভ্রমণের ষোলো আনার মধ্যে বারো আনা উশুল এই যাত্রাপথেই ।

কোঙ্কন রেলওয়ের আরও দৃশ্য
ট্রেনটা পাহাড়ী পথে বেশ ঠিকঠাক সময়ে চললেও সমতলে নামবার পর বেশ লেট করা শুরু করল । এছাড়া আমরা আরেকটা সমস্যায় পড়লাম আর সেটা হল লাঞ্চ নিয়ে । ট্রেনের ক্যান্টিনের যা লাঞ্চ তা আমাদের কারুরই পছন্দ হল না । কিন্তু ট্রেন সেরকম কোনও বড় স্টেশন দিয়েও যায় না যেখান থেকে লাঞ্চ তুলে নেওয়া যেতে পারে । এই পরিস্থিতিতে আমরা ক্যান্টিন থেকে কিছু ব্রেকফাস্ট নিয়ে নিলাম – পাঁউরুটি টোস্ট, ধোসা, বঢ়া ইত্যাদি । সেগুলোই লাঞ্চে খেয়ে নেওয়া হল ।

ট্রেনের নাসিক রোড পৌঁছনোর সময় হল বিকেল ৪ :  ৩৫ আর লেট করে সে পৌঁছল তখন সাড়ে পাঁচটা । নাসিক থেকে সির্ডি আরও ১০০ কিলোমিটারের কাছাকাছি, গাড়িতে প্রায় তিনঘন্টা লাগে । আমরা দু’টো গাড়ি বুক করে এগিয়ে চললাম সাঁইবাবার ডাকে সাড়া দিতে !

নাসিক থেকে সির্ডি - পথের বিবরণ দেওয়ার কিছু নেই । এটা একটা হাইওয়ে – আর পাঁচটা হাইওয়ের মতোই । মাঝে একবার একজায়গায় থেমে কিছু খেয়েদেয়ে নেওয়া হল । শেষপর্যন্ত্য আমরা সির্ডিতে আমাদের হোটেলে যখন পৌঁছলাম তখন রাত ন’টা ।

হোটেল অশোকা এক্সিকিউটিভের ঘর
সির্ডিতে আমাদের হোটেলের নাম হোটেল ‘অশোকা এক্সিকিউটিভ’ । শুধু আমি নয়, আমাদের দলের সকলের মতেই এই হোটেলটা আমাদের মহারাষ্ট্র ভ্রমণের মধ্যে সবচেয়ে ভালো হোটেল । ঘরগুলো প্রসস্ত, সুন্দরভাবে পরিচর্যা করা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন । এবং সেই অনুপাতে ভাড়া সেরকম কিছু বেশি নয় । এখানেও আমরা একটা চারবিছানার ঘর নিয়েছিলাম । সির্ডিতে আমাদের থাকার মেয়াদ খুব অল্প সময়, পরেরদিন সকালেই আমরা রওনা হয়ে যাব ঔরঙ্গাবাদ তথা ইলোরার উদ্দেশ্যে । বারবারই মনে হচ্ছিল এরকম সুন্দর একটা হোটেলে আরও কিছুক্ষণ থাকতে পারলে মন্দ হত না !

অশোকা এক্সিকিউটিভের নিজস্ব কোনও খাওয়ার ব্যবস্থা নেই । এবং সির্ডিতে আরেকটা অসুবিধে হল এখানে আমিষ রেস্ট্যুরেন্ট খুব কম । যাই হোক, বেশ খুঁজে পেতে একটা পাওয়া গেল যেটা আমাদের হোটেল থেকে যেদিকে সাঁই মন্দির, তার উল্টোদিকে মিনিট সাতেক হাঁটা দূরত্বে । এখানেও যেটা ভালো লাগল যে খাবারের মান বেশ ভালো এবং সেই অনুপাতে দাম বেশ কম । আমরা নানারকম খাবার ভাগাভাগি করে নিয়েছিলাম এবং তাতে মাথাপিছু খরচ পড়ল ১৫০ টাকা ।

৩০শে মে, ২০১৪ শুক্রবার । আমাদের সাঁই মন্দির দেখে ঔরঙ্গাবাদ যাওয়ার দিন । সাঁই মন্দির খোলে সকাল ছ’টায় । আমরা সকালে বেরিয়ে কয়েকটা অটো করে মন্দিরে গেলাম । এখান থেকে মন্দিরের অটোভাড়া মাথাপিছু ১০ টাকা করে, তবে সেটা আগে থেকে জানা না থাকলে অটোওয়ালারা যা খুশি তাই বলে । আমাদের হোটেল থেকে এটা আমাদের আগেই জানা ছিল ।

সাঁই মন্দিরে কোনও বৈদ্যুতিন দ্রব্য নিয়ে ঢোকা নিষিদ্ধ । আমাদের সঙ্গে থাকা ক্যামেরা মোবাইল চটি (হ্যাঁ, আমি জানি চটি বৈদ্যুতিন দ্রব্য নয়) সবই মন্দিরের গেটের উল্টোদিকে একটা দোকানে রেখে দিলাম । এই দোকান থেকেই আমাদের পুজোর সামগ্রী কেনা হল । তারপর মন্দিরের গেটের ভেতরে ঢুকে লাইন দেওয়া । মন্দিরের লাইনের একটা বৈশিষ্ট্য হল এখানে পুরো জায়গাটাই লোহার বেড়া দিয়ে চ্যানেল মতো করা আছে, সেখান দিয়েই এগিয়ে যেতে হবে । এইভাবে এগিয়ে যেতে যেতে একজায়গায় দেখলাম একটা বিশাল হলঘরের মতো জায়গায় টাকা গোনা হচ্ছে । বুঝলাম সাইঁবাবার প্রণামী বাক্সে যা জমা পড়ে সেগুলোর হিসেব করা হচ্ছে । আরেকটু এগোতে একটা কাউন্টারের সামনে দিয়ে আমাদের লাইনটা গেল সেখানে একটা ছোটো প্যাকেটে দু’টো করে লাড্ডু বিতরণ করা হচ্ছে (একজনকে একটা প্যাকেটই দেয়, আমি দু’টো পাওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই লোকটা আমার দিকে কট্‌মট্‌ করে তাকালো) । সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হল পুজো দেব কি দেব না, তার ওপর এই লাড্ডু প্রাপ্তি নির্ভর করে না, এটা এরা সকল দর্শনার্থীদেরই দেয় । একটু এগোতেই দেখলাম একজায়গায় এই লাড্ডু পাকানো হচ্ছে (আহাঃ, দুর্দান্ত ঘিয়ের গন্ধের কথা মনে পড়ে আমার এখনও জিভে জল এসে যাচ্ছে) ।

যাই হোক, এইভাবে এগোতে এগোতে একসময়ে সাঁইবাবার মর্মরনির্মিত মূর্তির সামনে পৌঁছলাম এবং দেখে দর্শন করে বেরিয়েও এলাম । মন্দিরটা সবমিলিয়ে বেশ ভালো – সবচেয়ে বড় কথা হল পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, মারামারি ঠেলাঠেলি নেই, পান্ডা/পূজারীদের হম্বিতম্বি নেই এবং অবশ্যই বিনামূল্যে দুর্দান্ত লাড্ডু আছে । সবমিলিয়ে দেখতে আমাদের লাগল ঘন্টা দেড়েক আর এখানকার লোকের মতে ফাঁকা থাকার জন্যই এত কম সময়ে হয়ে গেছে !

আমাদের গাড়ি আগেই ঠিক করা ছিল, অটোয় হোটেলে ফিরে এসে যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব রেডী হয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ঔরঙ্গাবাদের উদ্দেশ্যে । এবারেও দু’টো গাড়ি । কিছুদূর এগিয়ে একজায়গায় রাস্তার ধারে একটা হোটেলে আমরা আলুর পরোটা দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে নিলাম । সবমিলিয়ে খরচ পড়ল ৭৫০ টাকা ।

‘সির্ডি ভ্রমণ’ এখানেই শেষ । এরপর আসবে আমাদের ভ্রমণের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ‘ইলোরা ভ্রমণ’ ।

সারসংক্ষেপঃ

১. সির্ডি জায়গাটা সাঁইবাবার মন্দিরের জন্যই বিখ্যাত । মনে ভক্তি থাকুক বা না থাকুক, মন্দিরটা একবার দেখে আসা যেতেই পারে ।
২. সাঁইবাবার মন্দির ছাড়া সির্ডিতে দেখার আর কিছুই নেই । তাই এখানে কোনও কারণেই একদিনের বেশি থাকার মানে হয় না কারণ জায়গাটা বেশ ঘিঞ্জি, বিশ্রাম নেওয়ার জন্যও এখানে থাকার মানে হয় না ।
৩. সির্ডিতে আমিষ রেস্ট্যুরেন্টের একটু অভাব রয়েছে । খুঁজলে পাওয়া যায় না তা নয়, তবে না খুঁজে পাওয়া কঠিন ।
৪. নিজের জানাশোনা কোনও হোটেলে যদি না থাকে, তাহলে সির্ডিতে গিয়ে ‘অশোকা এক্সিকিউটিভ’এ থাকার জন্য বলব । এই ভাড়ায় এত ভালো হোটেলে পাওয়া সত্যিই সহজ নয় । এদের ওয়েবসাইট http://hotelashokaexecutive.com/ থেকে বুকিং করা যেতে পারে অথবা http://hotel.makemytrip.com/ থেকেও বুকিং করা যেতে পারে ।

(লেখার সঙ্গের ছবি ছাড়া সির্ডিতে আর কোনও ছবি তোলা হয়নি, তাই সির্ডি ভ্রমণের আরও ছবির কোনও লিঙ্ক দেওয়া হল না ।)

ইলোরা ভ্রমণঃ

সির্ডি থেকে ঔরঙ্গাবাদ যাওয়ার পথেই পড়ে ইলোরা । সে’জন্য সির্ডি থেকে যেতে হলে পথেই ইলোরা দেখে ঔরঙ্গাবাদ যাওয়া উচিত কারণ ঔরঙ্গাবাদ থেকে ইলোরা বেশ অনেকটাই দূরে । আমরা যে গাড়িগুলো ঠিক করেছিলাম, সেগুলোর সঙ্গে কথা ছিল তারা আমাদের সির্ডি থেকে ঔরঙ্গাবাদ পৌঁছে দেবে এবং পথে চারটে জায়গা দেখাবে । সেই জায়গাগুলো হল – গৃষ্মেশ্বর মন্দির, ইলোরা গুহা, ভদ্রমূর্তি মন্দির এবং বিবি কা মক্‌বারা । গাড়িওয়ালারা জোর করলেও এদের মধ্যে গৃষ্মেশ্বর মন্দির আর ভদ্রমূর্তি মন্দিরে গিয়ে সময় নষ্ট করার একেবারেই মানে হয় না ।

সির্ডি থেকে প্রায় ৯৫ কিলোমিটার দূরে আর ঔরঙ্গাবাদ থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে আমাদের প্রথম দেখার জায়গা গৃষ্মেশ্বর মন্দির । এটা একটা অত্যন্ত সাধারণ মন্দির তবে লোকজনের লাইন পড়ে মোটামুটি । এখানে দর্শনের জন্য প্রায় ঘন্টাখানেক সময় লেগে যাবে বলে আমরা সেই উদ্দেশ্য ত্যাগ করলাম । এখানে আসার প্রধান লক্ষ্য হল ইলোরা গুহা দেখা – সেখানে যতটা সম্ভব বেশি সময় কাটানো ।

গৃষ্মেশ্বর মন্দির থেকে ইলোরা গুহা খুবই কাছে । ইলোরাও ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের তত্বাবধানে এবং ১০ টাকা করে টিকিট । গেটে ঢোকার পর আরও বেশ কিছুটা পাহাড়ের ওপর উঠে প্রথম দেখার জায়গায় পৌঁছনো যায় ।

ইলোরার গুহা
এখানে বলে রাখি ইলোরায় সবমিলিয়ে যা দেখার আছে, তার জন্য এখানে একদিন থাকলে ভালো হয় । ইলোরার গুহার কাছেই মহারাষ্ট্র ট্যুরিজম এর থাকার ব্যবস্থা আছে, চাইলে এখানে থাকা যেতে পারে । আর একটু ভালোভাবে দেখে বোঝার জন্য কিছুটা পড়াশোনা করে নিলে ভালো হয় । তবে বেশি আগ্রহ না পেলে শুধুমাত্র প্রধান প্রধান গুহাগুলো দেখে নেওয়া যেতে পারে । আমাদের ভালোভাবে দেখার ইচ্ছে থাকলেও সময় বেশি ছিল না, তাই প্রধান গুহাগুলো দেখেই ফিরে আসতে হল ।

গাড়ি যেখানে দাঁড় করায় সেখান থেকে কিছুটা পায়ে হেঁটে ওপরে উঠে ৩০ – ৩৪ নম্বর গুহা । আমি ঐতিহাসিক বিস্তারিত তথ্যে যাচ্ছি না, ইন্টারনেটে খুঁজলে এই সম্পর্কে অনেক জানা যায় । তার চেয়ে আমরা কি দেখলাম আর আমাদের কিরকম লাগল, সেগুলো লিখি ।

ইলোরার গুহায় ইন্দ্রের মূর্তি
ইলোরার প্রধান বৈশিষ্ট্য এই গুহাগুলো সম্পূর্ণভাবেই পাহাড় কেটে তৈরি করা । আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে আমাদের দেশের শিল্পকীর্তি যে কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, সেটা আমরা ছোটোবেলায় ইতিহাস বইতে অনেকবার পড়েছি । কিন্তু সেগুলো নিজের চোখে দেখার অভিজ্ঞতাই আলাদা । ডিনামাইট বা কোনওরকম বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের সাহায্য ছাড়া শুধুমাত্র ছেনি আর হাতুড়ির সাহায্যে এত নিপুনভাবে পাহাড় কেটে তৈরি এই গুহা এবং সেইসঙ্গে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মূর্তি এবং কারুকার্যের কথা ভাবতেই অবাক লাগে আর সেগুলো চোখের সামনে দেখলে বিস্ময় জাগে (অবাক হওয়া আর বিস্মিত হওয়ার মধ্যে আভিধানিক কোনও পার্থক্য নেই কিন্তু আমি এখানে বিস্ময় >> অবাক হিসেবে ব্যবহার করছি !) । দেবদেবী মানুষ পশুপাখি গাছপালা কি নেই সেই কারুকার্যের মধ্যে ! তখনকার দিনের মানুষের জীবনযাত্রা, ব্যবহারের সামগ্রী সবকিছুরই নিখুঁত প্রতিরূপ রয়েছে এই কারুকার্যের মধ্যে । এছাড়া রয়েছে গুহার দেওয়ালে আঁকা ছবি । ছবিতে রঙের ব্যবহার বিশেষ প্রশংসার দাবী রাখে । আমরা একজন গাইড নিয়েছিলাম । এরা যে অনেককিছু জানে বা দেখায় তা নয়, কিন্তু কিছু কিছু মূর্তি বা ছবি দেখিয়ে কিছু কিছু গল্প বলে যেগুলো শুনতে ভালো লাগে (মুর্শিদাবাদের মতিঝিলের গাইডের সেই কথাটা আমাকে বেশ নাড়া দিয়েছিল
গুহার দেওয়ালে জীবনযাত্রার ছবি
– “জানলে ইতিহাস আর না জানলে মাটির দেওয়াল”) । আমাদের গাইড আমাদের অনেককিছু দেখালো আর বলে গেল – সবগুলো মনে নেই । তবে দু’টো জিনিসের কথা এখানে উল্লেখ করছি ।







হলঘর
এক, একটা থাম দেখাল যেটায় হাত দিয়ে জোরে মারলে তবলার মতো আওয়াজ বেরোয় ! গাইড আমাদের সেটা বাজিয়ে শোনাল - তারপর আমরা নিজেরাও ব্যাপারটা করে দেখলাম এবং মুগ্ধ হলাম । একটা নিরেট পাথরের থামের মধ্যে থেকে কিকরে এরকম শব্দ বেরোনো সম্ভব সেটা বেশ অদ্ভুত । গাইডও জানে না কারণ এই পুরো জিনিসটা একটা পাহাড় কেটে তৈরি – থামটা না ভেঙ্গে এর ভেতরে কি আছে, কিভাবে তবলার মতো শব্দ তৈরি হচ্ছে জানা সম্ভব নয় ।

দুই, একটা হলঘরের মতো ঘর । গাইড বলল – এটা ছিল উপাসনাগৃহ । ঘরটা বেশ বড়, জায়গায় জায়গায় পাথর কেটে থাক বসানো আছে । এই ঘরের সাউন্ড সিস্টেম হল এখানকার বৈশিষ্ট্য । তখনকার দিনে মাইক বা লাউড স্পীকারের ব্যবস্থা ছিল না, তাই এই ঘরে এমন ব্যবস্থা করা আছে যে ঘরের কেন্দ্রস্থলে বসে না চেঁচিয়ে কথা বললেও ঘরের সবাই সেটা শুনতে পাবে । আমাদের গাইড সেই জায়গাটায় গিয়ে ব্যাপারটা আমাদের করে দেখাল । আমরা আবার মুগ্ধ হলাম ।

এই গুহাগুলো দেখে আমরা আবার গাড়ি করে পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে এলাম । এবার আমাদের দ্রষ্টব্য হল ইলোরার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ – কৈলাস মন্দির ।

কৈলাস মন্দির
অষ্টম শতকে রাষ্ট্রকূট বংশের রাজত্বকালে তৈরি হয় এই কৈলাস মন্দির । এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এটা একটা পাথর কেটে তৈরি করা । মন্দিরটা দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে বেশ বড় । আমরা ভেতরে ঢুকে সব জায়গাটা ভালোভাবে ঘুরলাম । প্রধান মন্দিরটা দোতলা – দোতলাতেই মন্দিরের সামনে একটা চাতাল আর তারও সামনে একটা জায়গা যেখান থেকে অনেকটা জায়গা দেখা যায় । মন্দিরটা ঘিরে একটা বেশি বড় চাতাল আছে আর তাকে ঘিরে আবার আরেকদফা বারান্দার মতো । বড় চাতালটায় হাতির মূর্তি, ওবেলিস্ক-এর মতো বিশাল স্তম্ভ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য ।

আমাদের ইলোরার গুহা দেখা শেষ । আগেই বলেছি ইলোরার সবকিছু এত অল্প সময়ে দেখা অসম্ভব তবে এটাও ঠিক আমরা প্রধান জায়গাগুলোর সবই দেখেছি । ঘড়ি বলছে দুপুর সাড়ে তিনটে আর ইলোরা দেখার পরে মনের মধ্যে মুগ্ধতা ছাড়া আর যে অনুভূতিটা কাজ করছে তা হল খিদে – প্রচন্ড খিদে ।

ইলোরার অসুবিধে হল এখানে রেস্ট্যুরেন্ট খুব কম আর যাও বা আছে, সেগুলো আবার নিরামিষ । কিন্তু আর কোনও উপায় না থাকায় ঐ খেয়েই গর্ত বোজানো হল । তবে দু’একটা আইটেম খেতে বেশ ভালো হয়েছিল এটা না বললেই নয় । তবে – আফটার অল্‌ নিরামিষ, তাই কি কি খেলাম সেগুলো আর বিস্তারিত লিখছি না । সবমিলিয়ে খরচ পড়ল ২,১০০ টাকা ।

ভদ্রমূর্তি মন্দির
খাওয়ার পর আমাদের পরবর্তী দ্রষ্টব্য স্থান – ভদ্রমূর্তি মন্দির । ইলোরা থেকে এর দূরত্ব ৫ কিলোমিটারের মতো । এটাও একটা সাধারণ মন্দির – হনুমানের । এখানে হনুমানের একটা শোওয়ানো মূর্তি আছে । আগেই বলেছি এটাও না দেখলে চলবে ।





এরপর আমাদের দিনের শেষ গন্তব্য – বিবি কা মক্‌বারা । ঘড়িতে প্রায় সাড়ে পাঁচটা বাজে আর ড্রাইভার বলল বিবি কা মক্‌বারা ছ’টায় বন্ধ হয়ে যায় তাই এই জায়গাটা আমাদের লিস্ট থেকে বাদ দিতে হল ।

এবার আসি একটা বিশেষ দরকারি ঘটনার ব্যাপারে । ভদ্রমূর্তি মন্দির থেকে বেরিয়ে আমাদের ড্রাইভাররা আমাদের সঙ্গে হঠাৎ খারাপ ব্যবহার করা শুরু করে দিল । আমাদের গাড়ির জন্য মোট দেওয়ার কথা ৬,৮০০ টাকা যার মধ্যে ৫,৫০০ টাকা আমরা ইতিমধ্যেই দিয়ে দিয়েছি । ড্রাইভারদের বক্তব্য হল বাকি টাকাও তাদের তখনই দিতে হবে, নাহলে তারা গাড়ি নিয়ে যাবে না । সেইসঙ্গে এদের আরও দাবী এরা আমাদের হোটেল পর্যন্ত পৌঁছে দেবে না কারণ ঔরঙ্গাবাদ শহরে ঢুকলে এদের নাকি পুলিশকে টাকা দিতে হবে । এই পুলিশকে টাকা দেওয়ার ব্যাপারটা আমরা গাড়ি বুক করার সময়েই শুনেছিলাম এবং সেইজন্য গাড়িপিছু পুলিশভাড়া ২০০ টাকা করে মোট ৪০০ টাকা ধরেই আমাদের ৬,৮০০ টাকা । কিন্তু ড্রাইভাররা কিছুই শুনতে রাজী নয় । ব্যাপারটা এরকম জায়গায় পৌঁছে গেল যে এদের দাবী না মানলে এরা এখান থেকে গাড়ি নিয়ে এগোবেই না । শেষপর্যন্ত ফয়সালা হল কিছু স্থানীয় লোকের মধ্যস্থতায় (যদিও মধ্যস্থতা বলছি কিন্তু আসলে লোকগুলো আমাদের হয়েই কথা বলেছিল) । এরাও গাড়ির ড্রাইভার – অন্য ট্যুরিস্ট নিয়ে এসেছে । এরা আমাদের কথা শুনে বুঝল যে আমরা যা বলছি তার মধ্যে অন্যায় কিছু নেই, তাই এরা সবাইমিলে একরকম জোর করেই আমাদের ড্রাইভারকে আমাদের দাবী মেনে নিতে রাজী করালো । শেষমেশ গাড়ি চলল আর আমরা ঔরঙ্গাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম । পরে আমাদের ঔরঙ্গাবাদের হোটেলের ম্যানেজারের কাছ থেকে শুনেছিলাম সির্ডির প্রত্যেক গাড়িওয়ালারাই নাকি এরকম । এরা একরকম কথা বলে সির্ডি থেকে বেরোয় আর এখানে এসে আরেক ঝামেলা করে । এদের উদ্দেশ্য থাকে ঔরঙ্গাবাদ থেকে সির্ডি ফেরার পথে যাত্রী নিয়ে যাওয়া আর সেইজন্য বেশিরভাগ সময়েই এরা ইচ্ছে করে ঝামেলা করে যাতে লোকে সব জায়গাগুলো না দেখতে পারে । আমরা পরেরদিন যখন বিবি কা মক্‌বারা দেখতে গেলাম, তখন আমি কাউন্টার থেকে জিজ্ঞেস করে জেনেছিলাম বিবি কা মক্‌বারা আসলে রাত দশটা পর্যন্ত খোলা থাকে ।

ঔরঙ্গাবাদ যাওয়ার পথে রাস্তা থেকে আরেকটা জিনিস দেখতে পেলাম আর সেটা হল দৌলতাবাদ কেল্লা । এটা একটা পাহাড়ের মাথায় এবং এখানে কিছুদূর যাওয়ার পরে আর গাড়ি যায় না – বাকিটা হেঁটে উঠতে হয় । বলা বাহুল্য আমরা এখানে যাইনি, তবে যদি ঔরঙ্গাবাদ বা ইলোরায় একদিন থাকা যায়, তাহলে মহম্মদ-বিন-তুঘলকের আমলে তৈরি এই বিশেষ কেল্লাটা অবশ্যই দেখা উচিৎ (মহম্মদ-বিন-তুঘলক – পাগলা রাজা – দাক্ষিণাত্যে শাসনব্যবস্থা জোরদার করার জন্য রাজধানী দিল্লী থেকে দৌলতাবাদে স্থানান্তরণ – সেখানে দু’বছর থাকার পর ফের দিল্লীতে ফেরৎ আসা – মনে পড়ছে ?) ।

ঔরঙ্গাবাদের তোরণদ্বার
ঔরঙ্গাবাদ শহরের আরেকটা উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল এর শহরে ঢোকার মুখের তোরণদ্বার । একসময়ে মোট ৫২ টা দ্বার থাকলেও বর্তমানে ছোটবড় মিলিয়ে মাত্র ১৩ টাই অবশিষ্ট আছে । এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় আর সবচেয়ে পুরনো হল ‘ভাদকাল দ্বার’ । আসলে দাক্ষিণাত্যে শাসনব্যবস্থা জোরদার করার জন্য ঔরঙ্গজেব যখন এখানে থাকা শুরু করেন তখনই নিরাপত্তার কারণে পুরো ঔরঙ্গাবাদ শহরটাকে পাঁচিল দিয়ে ঘিরে ফেলা হয় । সেই পাঁচিলের মাঝেই এই গেটগুলো । এখন অবশ্য পাঁচিলের খুব সামান্যই অবশিষ্ট আছে ।

আমরা হোটেল প্রীতম-এ পৌঁছলাম তখন তখন সাড়ে ছ’টা । হোটেলটা অসাধারণ কিছু না হলেও মোটের ওপর মন্দ নয় । এখানেও আমাদের মেয়াদ পরেরদিন সকাল পর্যন্ত, তাই রাতটা কাটানো নিয়ে কথা ।

ঔরঙ্গাবাদ মহারাষ্ট্রে হলেও মুম্বই বা উপকূলবর্তী জায়গা থেকে অনেকটাই পুবদিকে, তাই এখানে মুম্বইয়ের মতো অত বেশিক্ষণ আলো থাকে না । মোটামুটি সাতটা থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যে সন্ধ্যে হয়ে যায় ।

হোটেল প্রীতমের নিজস্ব খাওয়ার ব্যবস্থা নেই, তবে আশেপাশেই একাধিক খাবারের হোটেল আছে । সেরকমই একটা হোটেল থেকে রুটি, চিকেন, চাউমিন, ফ্রাইড রাইস ইত্যাদি নেওয়া হল । খরচ হল ১,১৮০ টাকা । অবশ্য আমাদের দলের দু’একজন অবশ্য দুপুরে দেরিতে খাওয়া হয়েছে বলে রাতে আর কিছু খেলো না । খাওয়া শেষ করে হোটেলে ফিরলাম তখন সাড়ে দশটা বেজে গেছে । সাড়ে দশটা ঔরঙ্গাবাদের পক্ষে বেশ ভালোই রাত । রাস্তায় লোক চলাচল কমে যায়, গাড়িও খুব বেশি দেখা যায় না, আর দোকানপাটও বন্ধ হয়ে যায় । আমাদের হোটেলের ম্যানেজার বলল – এখানে সকাল তাড়াতাড়ি হয় আর রাত দশটার বেজে গেলে আর বিশেষ কিছু পাওয়া যায় না ।

ঘরে এসে শুয়ে পড়লাম । পরেরদিন আমাদের গন্তব্য অজন্তা – আমাদের মুম্বই ভ্রমণের পঞ্চম তথা শেষ জায়গা । যাওয়ার পথে আমরা বিবি কা মক্‌বারা দেখে যাব ।

৩১শে মে, ২০১৪ শনিবার । সকাল আটটার সময়ে হোটেল থেকে মালপত্র নিয়ে দু’টো গাড়িতে করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম । আমরা প্রথমে যাব বিবি কা মক্‌বারা আর তারপর সোজা অজন্তা ।

বিবি কা মক্‌বারা
ঔরঙ্গাবাদ শহর থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে ‘বিবি কা মক্‌বারা’ বা মিনি তাজমহল । আগ্রায় মায়ের সমাধি আসল তাজমহল এর আদলে ঔরঙ্গজেব এটা তৈরি করান নিজের পত্নীর সমাধিস্থলে । বিবি কা মক্‌বারা দেখতে একেবারেই তাজমহলের মতো তবে আকারে কিছুটা ছোট । আর তাজমহলের সঙ্গে এর আরেকটা পার্থক্য হল এটা তাজমহলের মতো পুরোপুরি মার্বেল দিয়ে তৈরি নয়, নিচের দিকে কিছুটা মার্বেল দেওয়ার পর ওপরের দিকটা সারা রঙ করা । আর ঠিক সেইজন্যই তাজমহলের মতো এটা জলবায়ুর কারণে দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না ।

আমি ব্যক্তিগতভাবে তাজমহলের থেকে বিবি কা মক্‌বারাকে বেশি নম্বর দেব আর সেটা ঐতিহাসিক কারণে । আকবরের তৈরি করা অর্থভান্ডার শাহজাহান প্রায় নিঃশেষ করেছিলেন নিজের বিলাসিতা এবং শিল্পনির্মাণে । আর এই বিপুল অর্থভান্ডারের একটা বড় অংশ ব্যয় হয় তাজমহল তৈরিতে । সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে বিবি কা মকবারা যখন ঔরঙ্গজেব তৈরি করান, তখন মুঘল সাম্রাজ্যের অর্থভান্ডার তলানিতে । সেইজন্যই হয়তো বিবি কা মক্‌বারার শুধু নিচের দিকটাই মার্বেল দিয়ে তৈরি । মুঘল সাম্রাজ্যের সেই ভরাডুবির সময়ে তাজমহলের আদলে আরেকটা স্মৃতিসৌধ তৈরি করার চেষ্টা করাটা রীতিমতো দুঃসাহসের পরিচয় !

ঔরঙ্গজেবের পত্নীর সমাধি
বিবি কা মক্‌বারাও ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ দেখাশোনা করে । এখানে গেটে ৫ টাকার টিকিট কেটে ঢুকতে হয় । জায়গাটা বেশ ফাঁকাই থাকে আর সকালের আলোয় দেখতে খুব সুন্দর লাগে । আমরা চাতালে কিছুক্ষণ বসে ভেতরে ঢুকে ঔরঙ্গজেবের পত্নীর সমাধি দেখে বেরিয়ে এলাম । বিবি কা মক্‌বারা ভালো করে ঘুরে দেখতে আধঘন্টার বেশি লাগে না ।


এরপর আমরা এগিয়ে চললাম অজন্তার দিকে । পথে আমাদের গাড়ি খারাপ হওয়ার জন্য প্রায় দেড় ঘন্টা দেরি হয়ে গেল । তারপর রাস্তায় এক জায়গায় পুরি-সবজী দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে নেওয়া হল । এরপর সোজা অজন্তা । সেখানে ঘোরাটা আসবে এই পোস্টের শেষ অংশে ‘অজন্তা ভ্রমণ’ ।

সারসংক্ষেপঃ

১. ঐতিহাসিক স্থাপত্যকীর্তির জন্য ভারতের যে কয়েকটা জায়গা পৃথিবীবিখ্যাত ইলোরা তাদের মধ্যে অন্যতম । ছেনি আর হাতুড়ির সাহায্যে একটা গোটা পাহাড়কে কেটে ফেলে শিল্পের এই নিদর্শন পর্যটকদের বিস্ময়ের বিষয় ।
২. ইলোরার কাছাকাছি বড় শহর ঔরঙ্গাবাদে থেকে ইলোরায় যাওয়া যায় । তাছাড়া ইলোরায় মহারাষ্ট্র ট্যুরিজমের নিজস্ব থাকার ব্যবস্থা রয়েছে ।
৩. ইলোরা ভালোভাবে এবং সম্পূর্ণভাবে দেখতে গেলে একদিন যথেষ্ট নয় । তবে মোটামুটিভাবে প্রধান গুহাগুলো এবং সেইসঙ্গে কৈলাস মন্দির দেখার জন্য হাতে ঘন্টা তিনেক থাকলেই চলবে ।
৪. ইলোরা খোলে সকাল ন’টায় আর বন্ধ হয় বিকেল সাড়ে পাঁচটায় । এছাড়া প্রতি মঙ্গলবার ইলোরা বন্ধ থাকে ।
৫. ইলোরা ছাড়া এখানে কাছাকাছির মধ্যে আরও দু’টো মন্দির রয়েছে । গাড়ির ড্রাইভার হাজার পীড়াপীড়ি করলেও এগুলোর কোনওটাতেই যাওয়ার একেবারেই মানে হয় না ।
৬. ইলোরার কাছে সেরকম কোনও ভালো খাওয়ার জায়গা নেই । দু’তিনটে চলনসই নিরামিষ হোটেল আছে ।
৭. ইলোরা ছাড়া ঔরঙ্গাবাদের অন্যতম দর্শনীয় স্থান বিবি কা মকবারা । আগ্রায় তাজমহলের আদলে তৈরি এই স্মৃতিসৌধটা দেখতে খুবই সুন্দর । ঔরঙ্গাবাদ গেলে এখানে অবশ্যই যাওয়া উচিৎ ।
৮. কাছাকাছির মধ্যে দৌলতাবাদ কেল্লা আছে । পায়ের আর মনের জোর থাকলে পাহাড়ের ওপরে এই কেল্লাটা একবার গিয়ে দেখে আসা যেতেই পারে ।
৯. আমাদের হোটেল প্রীতমের নিজস্ব ওয়েবসাইট http://www.hotelpreetamaurangabad.com/ থেকে এখানে সরাসরি বুকিং করা যায় । এছাড়া http://www.goibibo.com/ থেকেও এখানে বুকিং করা যায় ।
বিশেষ সতর্কীকরণ – সির্ডি থেকে গাড়ি নিয়ে ঔরঙ্গাবাদে এলে ড্রাইভার ঝামেলা করার সম্ভাবনা প্রবল । সেক্ষেত্রে সির্ডি থেকেই গাড়ির সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলে নেওয়ার দরকার । আর গন্তব্যস্থানে না পৌঁছে কখনওই ড্রাইভারকে পুরো টাকা দেওয়া চলবে না, যা কথা হয়েছে কমপক্ষে তার ২০ - ২৫% বাকি রাখতেই হবে ।

ইলোরা ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

অজন্তা ভ্রমণঃ

অজন্তা যাওয়ার পথে
ছোটবেলা থেকে অজন্তা-ইলোরা একসঙ্গে শুনে মনে হয় এগুলো বুঝি পাশাপাশি, কিন্তু বাস্তবে তা একেবারেই নয় । ইলোরা বা ঔরঙ্গাবাদ থেকে অজন্তার দূরত্ব প্রায় ১১০ কিলোমিটার আর যেতে তিনঘন্টার মতো লাগে । আগেই বলেছি আমাদের গাড়ি খারাপ হয়ে যাওয়ায় আমরা ঘন্টা দেড়েক দেরিতে চলছিলাম । ফলে শেষ পর্যন্ত যখন অজন্তায় পৌঁছলাম তখন প্রায় দুপুর দু’টো । অজন্তায় আমাদের বুকিং ছিল হোটেল কে পি পার্কে । হোটেলটা বেশ নতুন এবং ছিমছাম আর বেশ ছোটখাটো । আমরা হোটেলে ঢুকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রেডী হয়ে নিলাম কারণ আজই আমাদের অজন্তা গুহা দেখতে যেতে হবে । কে পি পার্ক একটা নিরামিষ হোটেল এবং এই অঞ্চলেও নাকি আমিষ হোটেল পাওয়া যায় না (ব্যাপার কি ? এরা এত নিরামিষভোজী কেন ?) । স্বাভাবিকভাবেই খাবারের দাম বেশ কম । আমরা নিরামিষ থালি নিলাম আর এর জন্য আমাদের সবমিলিয়ে ৯২০ টাকা খরচ হল ।

অজন্তার গুহা দেখার জন্য টি-জাংশন বলে একটা জায়গা আছে সেটা আমাদের হোটেল থেকে ২ কিলোমিটার মতো দূরে (টি-জাংশনের সঙ্গে চায়ের কোনও সম্পর্ক নেই, জায়গাটা T অক্ষরের মতো দেখতে বলে এই নাম) । বাইরের গাড়ি এই পর্যন্তই যেতে পারে আর এখান থেকে এম টি ডি সি-র বাস ধরতে হয় । আমাদের হোটেল থেকে টি-জাংশন পর্যন্ত ফ্রি ড্রপ আর পিক্‌আপ ছিল, সেই গাড়ি আমাদের যখন টি-জাংশনে নামালো তখন বেলা তিনটে বেজে গেছে ।

এম টি ডি সি-র বাসস্ট্যান্ড
টি-জাংশন থেকে এম টি ডি সি-র বাস প্রতি দশ মিনিট অন্তর ছাড়ে । এসি বাসের ভাড়া মাথাপিছু ২০ টাকা করে । এই বাস আমাদের পাহাড়ি রাস্তা ধরে দশ মিনিট চলার পর এক জায়গায় নামিয়ে দেয় যেখান থেকে পদব্রজে অজন্তা দেখা শুরু হয় । অজন্তাও ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ দেখাশোনা করে । অজন্তা বন্ধ হয়ে যায় বিকেল সাড়ে পাঁচটায় – তাই আমরা আর সময় নষ্ট না করে মাথাপিছু ১০ টাকার টিকিট কেটে উঠতে শুরু করে দিলাম ।

অজন্তায় ওঠার ঢালু পথ
অজন্তায় হেঁটে ঘোরা ছাড়াও ডুলি পাওয়া যায় যা একটা গুহা থেকে অন্য গুহায় পৌঁছে দেয় । তবে এখানে বলে রাখি অজন্তায় পাহাড়ে ওঠার জন্য প্রথমটাই যা একটু কষ্ট করতে হয়, বেশ অনেকগুলো সিঁড়ি ভাঙতে হয় (অবশ্য সিঁড়ি না ভেঙ্গে ঢালু পথেও ওঠার ব্যবস্থা করা আছে) । কিন্তু একবার এখানে উঠে পড়তে পারলে তারপর বাকিটা সমতল ।


অজন্তার গুহাচিত্র
আমরা একে একে গুহাগুলো দেখা শুরু করলাম । অজন্তাতেও ইলোরার মতোই – পাহাড় কেটে গুহা তৈরি করা । পার্থক্য হল এখানে গুহাগুলোর মধ্যে মূর্তির তুলনায় চিত্রের সংখ্যা বেশি । প্রাচীন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা নিজেদের থাকার জন্য পাহাড় কেটে এই গুহাগুলো তৈরি করেছিলেন এবং ভেতরের দেওয়ালে নানারকম ছবি এঁকেছিলেন । আবার সেই অবাক আর বিস্ময় – সেযুগের মানুষের ধৈর্য্য, অধ্যাবসায়, নৈপুণ্য, ছেনি আর হাতুড়ি ক্ষমতা দেখে । সেইসঙ্গে রঙের ব্যবহার আরও প্রশংসনীয় । আমরা একের পর এক গুহা দেখে চললাম ।

গুহার ছাদে চিত্র
গুহার ভেতরগুলো দেখার জন্য বাইরে থেকে যা আলো ঢোকে, তাতেই দেখতে হয় । শুধুমাত্র দু’টো গুহার ভেতরে কৃত্রিম আলোর ব্যবস্থা করা আছে । গুহার ভেতরে, যেখানে ছবি আঁকা আছে সেখানে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ ব্যবহার করে ছবি তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ যদিও ফ্ল্যাশ ব্যবহার না করে ছবি তোলা যেতেই পারে । আসলে ফ্ল্যাশের জোরালো আলো ছবিকে নষ্ট করে দেয় । বেশ কিছু কিছু জায়গার ছবি ইতিমধ্যেই নষ্ট হয়ে গেছে, বাকিটাকে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করা হচ্ছে । এখানে অনেক সিকিউরিটি গার্ড আছে যারা সারাক্ষণ এটা বলতে থাকে যে ফ্ল্যাশ ব্যবহার না করতে । এবং সেটা যথেষ্ট ভালোভাবেই বলে । এবং আমার নিজেরও মনে হয় নিজেদের দেশের এই অত্যাশ্চর্য্য সম্পদকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এটা না করা আমাদের সবারই দায়িত্বের মধ্যে পড়ে ।

অজন্তার গুহা
প্রায় সবক’টা গুহার ভেতরেই বুদ্ধদেবের মূর্তি আছে আর সেইসঙ্গে আরও নানারকম মূর্তি আছে যেগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত লিখছি না । রাস্তাটা মোটামুটি সমতল হলেও মাঝে মাঝে কোনও কোনও গুহায় যেতে গেলে কিছু সিঁড়ি ভাঙতে হয় । এখানে কিছুদূর অন্তর অন্তর শীতল পানীয় জলের ব্যবস্থা আছে । আমরা যেসময়ে গেছি তখন মোটামুটি তাপমাত্রা চল্লিশ ডিগ্রির কাছাকাছি, তাই সেখানে এই জলটা একটা আশীর্ব্বাদের মতো মনে হচ্ছিল ।

অজন্তার মডেল
গুহাগুলোর মধ্য কোনও একটা গুহায় অজন্তার একটা ছোট মডেল রাখা রয়েছে । এটা অবশ্য এ’যুগের মানুষের সৃষ্টি । এটা ভালোভাবে দেখে নিলে আমরা নিজেরা কোথায় আছি, কোথায় কোথায় কিভাবে যাওয়া যেতে পারে এগুলো সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি করা যায় ।





মহাপরিনির্বাণ
বাকিগুহাগুলো দেখে আমরা শেষ গেলাম ২৬ নম্বর গুহায় । এটায় হল সর্বশেষ গুহা এবং এই গুহাটার সম্পর্কে একটু লেখা দরকার । এটা বাকিগুলোর থেকে একটু আলাদা এবং বৌদ্ধ স্থাপত্যকীর্তির মধ্যে বিশেষ ব্যতিক্রমী । সাধারণতঃ বৌদ্ধ গুহার মধ্যে স্তূপ অথবা মূর্তি দেখা যায় । এই গুহার ভেতরে একটা স্তূপ আছে যেটা আবার একটা বেশ বড় মূর্তিও । এরকম কীর্তি বৌদ্ধস্থাপত্যে বিরল । এছাড়া এই গুহার ভেতরে আছে বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ – যেটা এই গুহার মূল আকর্ষণ । দেওয়ালে একটা ১০ – ১২ ফুট দীর্ঘ শোওয়ানো বুদ্ধিমূর্তি খোদাই করা আছে । বুদ্ধদেবের মুখে একটা স্মিত হাসি । এত বড় শোওয়ানো বুদ্ধমূর্তি আর কোথাও নেই ।

এরপরে আর এগোনো যায় না । গুহা দেখা ছাড়াও অজন্তায় পাহাড়ের ওপর ওঠা যায় কিন্তু বর্তমানে বন্ধ আছে । তাছাড়া আমাদের হাতে আর সময়ও ছিল না । তবে সেই নিয়ে আমাদের কোনও আক্ষেপ নেই কারণ এখানকার মূল জিনিসগুলো আমাদের দেখা হয়ে গেছে ।

বাইরে বেরিয়ে এখানে একটা এম টি ডি সি-র রেস্ট্যুরেন্ট আছে, সেখান থেকে আমের জুস খাওয়া হল । এটা খেতে খুবই ভালো, সম্পূর্ণভাবে আম থেকে শাঁস বের করে তার সঙ্গে জল বরফ মিশিয়ে তৈরি করা – কোনও ভেজাল নেই । খেয়ে প্রাণ জুড়িয়ে গেল । তবে বেরোনো আগে যখন ১২৯০ টাকার একটা বিল মেটাতে হল তখন বুকে একটা ছোটোখাটো ধাক্কা লাগল । হ্যাঁ, আমের সরবতের একেকটা গ্লাসের দাম ৭০ টাকা করে !

অজন্তা
আবার ফেরার পথে বাস ধরলাম – সেই বাস আমাদের টি-জাংশনে নামিয়ে দিল । ফেরার সময়ে এসি বাস নয়, তাই ভাড়া ১৫ টাকা করে । টি-জাংশনে একটা বাজার আছে, সেখানে হার চুড়ি থেকে শুরু করে ঘর সাজানোর জিনিস সবই পাওয়া যায় । ঠিকমতো দরদাম করতে পারলে এখানে ঠিকঠাক দামে জিনিস পাওয়া যেতে পারে ।



টি-জাংশনে আমাদের জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছিল । সেই গাড়ি ধরে আবার হোটেলে ফিরে এলাম তখন প্রায় সাতটা ।

অজন্তা ভ্রমণ বলত গেলে এখানেই শেষ – এবার মহারাষ্ট্র ভ্রমণের শেষ অংশ ।

সন্ধ্যেবেলা ঘরে বসে সবাই মিলে আড্ডা দিলাম । আজই শেষ দিন – আগামীকাল এই সময়ে আমরা থাকব ট্রেনে আর পরশু এই সময়ে যে যার বাড়িতে । গত সাতদিনের অভিজ্ঞতা, সুখ-দুঃখ, চাওয়া-পাওয়া, কিছু পাওয়া – কিছু না পাওয়া এইসব নিয়ে গল্প হচ্ছিল । হোটেল কে পি পার্ক এমনিতে নিরামিষ তবে আমরা অনেক লোক থাকায় বলল – চিকেনের ব্যবস্থা করে দেবে । রাতে রুটি দিয়ে সেই চিকেন খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়লাম ।

১লা জুন ২০১৪, রবিবার । আমাদের ফেরার ট্রেন ধরার দিন । আমাদের সকালবেলাই বেরিয়ে পড়তে হবে । অজন্তা থেকে আমাদের যেতে হবে জলগাঁও – সেখান থেকে আমাদের ফেরার ট্রেন গীতাঞ্জলি এক্সপ্রেস দুপুর ১২ টায় । সকালে লুচি সবজী দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে একেবারে বেরোনোর জন্য রেডী হয়ে নিলাম । আমাদের গাড়ি বলা ছিল সকাল সাড়ে ন’টায় । এখানে একটা সমস্যা হয়েছিল, স্টেশন যাওয়ার জন্য হোটেল থেকে গাড়ি না নেওয়ায় হোটেলের লোকেরা কিছুটা অসন্তুষ্ট হয়েছিল । না নেওয়ার কারণ খুব স্পষ্ট – আমরা আরও কম টাকায় গাড়ি পেয়ে গেছিলাম । কিন্তু এখানে এদের লবির ব্যাপার থাকে – এরা চাইলে এমন কিছু করতে পারে যাতে আমাদের গাড়ি আমাদের স্টেশনে না নিয়ে যেতে পারে এবং নিজেদের গাড়ি নেওয়ার জন্য আমাদের বাধ্য করতে পারে । দশটার সময়েও যখন গাড়ি এসে পৌঁছল না, তখন একটু চিন্তাই হচ্ছিল । যদিও অজন্তা থেকে জলগাঁও যেতে একঘন্টা লাগে, কিন্তু এখানে ঝামেলা হলে আমরা মুস্কিলে পড়ব । যাই হোক, সোয়া দশটার একটু পরে দু’টো গাড়ি এসে পৌঁছল আর আমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গাড়িতে উঠে এলাকা ত্যাগ করলাম ।

জলগাঁও স্টেশনে পৌঁছলাম তখন বেলা এগারোটা । দু’টো গাড়ি মিলিয়ে আমাদের পড়ল ৩,২০০ টাকা । এরপর স্টেশনে পৌঁছে আমরা কাম-সাম থেকে দুপুরের খাবার নিয়ে নিলাম । তারপর নির্ধারিত সময়ের আধঘন্টা পরে ট্রেন এলে উঠে পড়লাম ।

ফেরার পথের বিবরণ দেওয়ার আর কিছু নেই তবে যেটা বলার সেটা হল গীতাঞ্জলি এক্সপ্রেসে ফেরার জঘন্য অভিজ্ঞতার কথা । আমরা জলগাঁও থেকে সবক’টা এসি-র টিকিট পাইনি, অনেকগুলোই স্লীপারে নিতে হয়েছিল । গীতঞ্জলি এক্সপ্রেসে স্লীপারে পুরো কামরা জুড়ে প্রচুর লোক বসে থাকে যাদের টিকিট হয় কনফার্মড হয়নি অথবা তাদের কাছে জেনারেলের টিকিট আছে । এই ভীড়টা এতই বেশি যে কামরার ভেতরে চলাচল করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে । নাগপুরের টি.টি.ই.কে এটা বলা হলেও স্বাভাবিকভাবেই তিনি কোনও ব্যবস্থা নিলেন না । পরেরদিন টাটানগর পর্যন্ত্য আমাদের এই ভীড়ের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল ।

রাতের খাবার আমরা নাগপুর স্টেশনের কাম-সাম থেকে নিলাম । সেগুলো খেয়েদেয়ে রাতে শুয়ে পড়লাম । কিছুক্ষণের মধ্যেই লোয়ার বাঙ্কদু’টোর মাঝের মেঝেটায় দু’জন লোক এসে শুয়ে পড়ল ।

গীতাঞ্জলি এক্সপ্রেস হাওড়ায় পৌঁছল তখন বেলা একটা । সবাই সবাইকে টাটা বলে যে যার বাড়ির পথ ধরলাম !

সারসংক্ষেপঃ

১. ভারতের শ্রেষ্ঠ স্থাপত্যকীর্তিগুলোর মধ্যে অজন্তা ইলোরার মতোই আরেকটা বিশেষ উল্লেখযোগ্য নাম । এখানকার গুহার বৈশিষ্ঠ হল এগুলোর ভেতরে মূর্তির থেকে ছবির প্রাধান্যই বেশি ।
২. অজন্তা দেখতেও ইলোরার মতোই সারাদিন লাগে, তবে এখানকার সুবিধেটা হল সবটাই প্রায় একই জায়গায় । খুব ভালোভাবে খুঁটিয়ে না দেখলে গুহাগুলো দেখার জন্য হাতে ঘন্টা তিনেক সময় থাকলেই চলবে ।
৩. যেসব গুহার ভেতরে ছবি আছে, সেখানে ফ্ল্যাশ ব্যবহার করে ছবি তোলা একেবারেই উচিৎ নয় । এতে ছবিগুলোর মারাত্মক ক্ষতি হয় ।
৪. অজন্তার গুহা খোলে সকাল ন'টা থেকে । প্রতি সোমবার অজন্তা বন্ধ থাকে ।
৫ অজন্তার গুহা পর্যন্ত্য গাড়ি নিয়ে যাওয়া যায় না, টি-জাংশন থেকে এম টি ডি সি-র বাস ধরতে হয় । এই টি-জাংশন অজন্তার গুহার সবথেকে কাছে এবং এখানেই এম টি ডি সি-র রিসর্টটা রয়েছে ।
৬. আমাদের হোটেল কে পি পার্কটা এই টি-জাংশন থেকে দু’তিন কিলোমিটার মতো দূরে । অজন্তায় খুব বেশি হোটেল নেই, সেই হিসেবে এই হোটেলটা মোটের ওপর মন্দ নয় । এদের ওয়েবসাইট http://www.newkppark.com/ থেকে সরাসরি বুকিংও করা যেতে পারে ।
৭. অজন্তার নিকটবর্তী রেলওয়ে স্টেশন জলগাঁও যেতে অজন্তা থেকে ঘন্টাখানেক লাগে । মুম্বই যাতায়াতের প্রায় সব ট্রেনই এখানে দাঁড়ায় ।

অজন্তা ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

উপসংহারঃ

আমাদের মহারাষ্ট্র ভ্রমণের সময়টা পুরোপুরিই গরমের সময়ে – সেইজন্য অনেকেই বলেছিল যে ভালোভাবে ঘুরতে পারব না । আমাদের গরম লেগেছে এটা অস্বীকার করব না তবে সেটা কখনওই ঘোরার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি – এটা জোর দিয়ে বলতে পারি । মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় কলকাতার মতই গরম, তবে শুকনো গরম হওয়ায় সেরকম ঘাম হয়না । আর সেই কারণেই গায়ে গরম লাগলেও শরীরে ক্লান্তি লাগে না । আমাদের এই সাতদিন ব্যাপী ভ্রমণে আমরা ঘুরেছি – মুম্বই, গণপতিপুলে, সির্ডি, ইলোরা ও অজন্তা । আমাদের এই ভ্রমণসূচীর মধ্যে আরেকটা জায়গা চাইলে ঢোকানো যেতে পারত – সেটা হল মহাবালেশ্বর । জায়গাটা সেরকম দারুণ কিছু নয়, এটা প্রকৃতপক্ষে মহারাষ্ট্রের একটা হিল স্টেশন । বলা বাহুল্য, এই জায়গাগুলো ছাড়া মহারাষ্ট্রে অনেক জায়গা আছে, তবে আমাদের ঘোরা এই জায়গাগুলো পারলে একবারেই ঘুরে আসা ভালো । পুরো ঘোরাঘুরিটা কিছুটা হলেও অস্থির, কিন্তু সবমিলিয়ে খুবই আনন্দদায়ক । সাতদিনের ঘোরাঘুরি নিয়ে আমাদের মাথাপিছু খরচ হয়েছে ১৩,০০০ টাকার মতো, যেটা এই ঘোরাঘুরিটার পক্ষে বেশ সস্তাই । কোনও বিশেষ জায়গা সম্পর্কে আলাদা করে এখানে লিখছি না – সেগুলো লেখার মধ্যেই আছে । প্রত্যেকটা জায়গা তাদের নিজের মাহাত্ম্যের জন্য সুন্দর – স্বতন্ত্র – বিশিষ্ট । যদি বেরিয়ে পড়ার জন্য এই পুঁজি আর সেইসঙ্গে ছুটি - দু’টো জিনিস একসঙ্গে হাতে থাকে তাহলে মহারাষ্ট্রের এই জায়গাগুলো ভ্রমণের জন্য বেরিয়ে পড়া যেতেই পারে ।

Sunday, April 27, 2014

তাজপুর ভ্রমণ

০১২ সালে চাঁদিপুর ভ্রমণের দু'বছর পরে অফিস থেকে আমরা এবারে তাজপুর বেড়াতে গেলাম । এবারের দলে একজন শিশুসহ মোট ২৪ জন যার মধ্যে ১৮ জন অফিসের আর বাকিরা তাদের পরিবার । যদিও বেশিরভাগ লোকই জানে, তাও বলছি তাজপুর পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে দীঘার কাছে আরেকটা বীচ্‌ । দীঘা বা মন্দারমণির মতো ঘিঞ্জি নয় - তাজপুর বেশ ফাঁকা ফাঁকা একটা জায়গা । সেই তাজপুর ভ্রমণ নিয়েই আমার ব্লগের এবারের নাতিদীর্ঘ পোস্ট ।

রামনগর স্টেশনে সবাই
২৬শে এপ্রিল, ২০১৪ শনিবার সকাল ৬:৪০ এ হাওড়া স্টেশন থেকে তাম্রলিপ্ত এক্সপ্রেসে আমাদের যাওয়া । ট্রেনে না গিয়ে গাড়ি নিয়েও যাওয়া যেতে পারে, তবে তাতে খরচ কিছুটা বাড়বে । তাজপুর যাওয়ার জন্য রামনগর স্টেশনে নামতে হয় - সেখান থেকে মোটর ভ্যানে বা গাড়িতে তাজপুর । তাম্রলিপ্ত এক্সপ্রেস রামনগর পৌঁছয় সকাল ৯:৪৪ এ । আমাদের ট্রেন মিনিট দশেক লেট ছিল ।

রামনগর স্টেশন থেকে আমরা তাজপুর যাওয়ার জন্য গাড়ি ভাড়া করলাম । আগেই বলেছি মোটর ভ্যানের ব্যবস্থা আছে তবে এপ্রিলের প্রবল গরমে বেলা ১০ টার সময়ে মাথাখোলা ভ্যানে যাওয়ার বাড়াবাড়িটা বোধহয় না করাই ভালো । আমরা তিনটে মারুতি ওম্‌নি নিলাম । প্রতি গাড়ির ভাড়া ৩৫০ টাকা (এখানে একটা সিন্ডিকেটের চার্ট টাঙানো আছে, চাইলেও এদের বেশি দেওয়ার কোনও মানে হয় না) । রামনগর থেকে তাজপুর যেতে প্রায় আধঘন্টা লাগে ।

তাজপুর রিট্রিটে আমাদের কটেজ
তাজপুরে আমাদের বুকিং ছিল 'তাজপুর রিট্রিটে' । এখানে বলে রাখি তাজপুরে সমুদ্রের ধারে কিন্তু কোনও হোটেল বা থাকার জায়গা নেই, কাজেই কোনও হোটেলওয়ালা বা তাদের প্রতিনিধিরা (মানে দালাল আর কি !) যদি সেটা দাবী করে তাহলে বুঝতে হবে তারা প্রতারক এবং তাদের বিরুদ্ধে সরব হতে হবে । তাজপুর রিট্রিটে নন্‌ এসি ডাব্‌ল্‌ বেডের ভাড়া ১,০০০ টাকা, এসি ডাব্‌ল্‌ বেড ১,৫০০ টাকা । তবে আমরা মাথাপিছু ১,২০০ টাকা হিসেবে প্যাকেজ সিস্টেম নিয়েছিলাম । প্যাকেজে থাকছে - পরেরদিন বিকেল ৫টা পর্যন্ত থাকা, প্রথমদিনের লাঞ্চ, বিকেলের চা ও স্ন্যাক্স, ডিনার, পরেরদিন সকালে চা ও ব্রেকফাস্ট আর দুপুরের লাঞ্চ ।

তাজপুরের সমুদ্র
সাধারণতঃ সকালে এইরকম সময়ে সমুদ্রের কাছে পৌঁছলে চান করাটা অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে, আমরাও তাই কিছুক্ষণের মধ্যেই তৈরি হয়ে গেলাম সমুদ্রের দিকে । তাজপুরের গাড়ি চলাচলের প্রধান রাস্তাটা পেরিয়ে একটা ঝাউবনের ভেতর দিয়ে ৫ মিনিট হাঁটলেই সমুদ্র । তাজপুরের সমুদ্র সম্পর্কে একটা কথা প্রায়ই শোনা যায় যে এখানে সমুদ্র নাকি একেবারে ডোবা ! কথাটা যে একেবারেই সত্যি নয়, আশা করি আমাদের তোলা ছবিগুলো তার যথেষ্ট প্রমাণ বহন করবে । বেলা সাড়ে এগারোটা বাজে - প্রায় ভাঁটার সময়ে, কিন্তু তাও সমুদ্রে চান করে বেশ ভালো লাগল । ঘন্টাখানেক জলে লাফালাফি করে জল থেকে উঠে ডাব খেয়ে (মানে ডাবের জল খেয়ে - না, শাঁস ছিল না) হোটেলে ফিরে এলাম । তাজপুরের বীচ্‌ আরও একটা কারণে বিশেষ উল্লেখযোগ্য, সেটার কথা যথাসময়ে বলব ।

কটেজের ভিতর
হোটেলে ফিরে আরেকদফা চান । তাজপুর রিট্রিটের ঘরগুলো বেশ বড় আর প্রত্যেকটা ঘরেই এসির ব্যবস্থা করা আছে । ঘরে একটা বাথরুম কাম্‌ টয়লেট আর একটা শুধু টয়লেট । ঘরগুলো কটেজ টাইপ আর বাইরে বেশ গরম বেশ বেশি হলেও ঘরের ভেতরটা বেশ আরামদায়ক । তবে এইপ্রসঙ্গে বলে রাখি তাজপুরে কিন্তু কলকাতার থেকে কম গরম লাগছিল । গাছপালা ঘেরা জায়গা বলেই হোক বা সমুদ্রের ধার বলেই হোক, কলকাতার হাঁসাফাঁসানি থেকে তাজপুরে গিয়ে কিছুটা মুক্তিই পেলাম ।

দুপুরে ভাত, ডাল, পোস্ত, আলুভাজা আর পারশে মাছের ঝাল । কটেজগুলোর বাইরে একটা খাওয়ার জায়গা আছে - সেখানেই সবাই মিলে বসে খেলাম । তারপর দুপুরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে আবার সমুদ্রের ধারে গেলাম ।

সমুদ্রের ওপর সূর্য্যাস্ত
বিকেলের জোয়ারের সময় । আমরা গেছি কৃষ্ণপক্ষের দ্বাদশীতে, জোয়ারের জোর স্বাভাবিকভাবেই বেশি । বিকেলে চান করার ব্যাপার নেই, বালির ওপর চটি খুলে রেখে প্যান্ট/পাজামা/সালোয়ার গুটিয়ে পা ভেজানো আর কিছুক্ষণ অন্তর পিছিয়ে গিয়ে চটিজোড়াকে আরও কিছুটা পিছনে রেখে আসা । বিকেলে গরম একেবারেই লাগছিল না, বেশ আরামদায়ক আবহাওয়া আরও অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরি করে আমরা সমুদ্রের ওপর সন্ধ্যে নামা দেখলাম ।

এরপর আবার হোটেলে ফিরে এসে চা আর পকোড়া খাওয়া হল । তাজপুরে সমুদ্র ছাড়া দেখার আর কিচ্ছুই নেই, আর আমাদের মতো যাদের সমুদ্রের জল ছাড়া আর কোনও 'জলের' অভ্যেস নেই, তাদের জন্য সন্ধ্যের পর সমুদ্রই ভালো অপ্‌শন্‌ । হোটেলের লোকের কথা শুনে এবারে আমরা পাঁচজন (আমি, আমার স্ত্রী অমৃতা, আমার কলিগ্‌ কঙ্কনাদি, অমিতদা আর ওদের একবছরের মেয়ে অন্নিকা) আর ঝাউবনের মধ্যে দিয়ে না গিয়ে এবার মোহনার দিকে গেলাম । তাজপুরের গাড়ি চলার প্রধান রাস্তাটা ধরে মিনিট কুড়ি হাঁটলেই মোহনায় পৌঁছনো যায় ।

রাত্রিবেলা মোহনাটা খুবই মনোরম । এই মোহনারই অন্য পাড়ে মন্দারমনি । আমরা জলের কাছে গিয়ে বালির ওপর বসলাম । জায়গাটা মোটামুটি অন্ধকার - দূরে কয়েকটা টালির/খড়ের চালের ছোট দোকান রয়েছে সেখানে টিমটিম করে আলো জ্বলছে । এই দোকানগুলোয় খুব সামান্য টুকিটাকি জিনিস আর ডাব পাওয়া যায় । আমরা ঘন্টাখানেক বসে ডাব খেয়ে (মানে ডাবের জল খেয়ে - হ্যাঁ, এবারে মোটা শাঁস ছিল) ফেরার পথ ধরলাম ।

হোটেলে ফিরতে দশটা বেজে গেল । তারপর ডিনার করলাম । ডিনারে ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন ।

তাজপুরের সূর্য্যোদয়
পরেরদিন ২৭শে এপ্রিল, ২০১৪ রবিবার । সমুদ্রের ধারে বেড়াতে গেলে সানরাইজ দেখতে যাওয়ার একটা ব্যাপার থাকেই, আমি সেইমতো ভোর পাঁচটার সময়ে বেরোলাম । আমাদের দলের আরও অনেকে বেরোলো । তাজপুর এমনিতেই ফাঁকা, আমরা ছাড়া আর খুব কম লোকই এসেছে আর সকালের বীচে গিয়ে দেখা গেল আমরাই শুধু এসেছি । যাই হোক, বীচে পৌঁছে দেখলাম সূর্য্যোদয় তখনো হয়নি আর দেখার কোনও সম্ভাবনাও নেই কারণ আকাশ মেঘে ঢাকা । কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর সূর্য্যের দেখা পাওয়া গেল ঠিকই, তবে ততক্ষণে উনি মেঘের আড়াল দিয়ে অনেকটা উঠে পড়েছেন ।

তাজপুরের লাল কাঁকড়া
এবার সেই বিশেষ জিনিসটার উল্লেখ করি । তাজপুরের বীচে পৌঁছে দেখা যায় বালির ওপর বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে - লাল কাঁকড়া । সংখ্যায় অগুনতি । কাছে গেলেই টুপটুপ করে গর্তের মধ্যে ঢুকে যায় । যতই পা টিপে টিপে সন্তর্পণে যাওয়া হোক না কেন, ওরা ঠিক পায়ের কম্পন বুঝতে পারে । এই লালকাঁকড়া তাজপুরের একটা বিশেষত্ব । এরা আকারে খুব বড় নয় - এদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এদের গায়ের রঙ । আমার মতো মানসিকতা যাদের তাদের জন্য খারাপ খবর - এগুলো মানুষের খাদ্য নয় !

আরও কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে হোটেলে ফিরে এলাম । তাজপুর রিট্রিটের বাগানে দোলনা টাঙানো আছে, সেখানে সকালে বসে থাকতে দিব্যি লাগছিল । কিছুক্ষণ পরে আলুর পরোটা আর আচার দিয়ে ব্রেকফাস্ট করলাম ।

এরপর আবার সমুদ্রে চান । দ্বিতীয়দিন প্রথমদিনের থেকে আগে জলে নামা হয়েছে, তাই জোয়ারের জোরটা বেশি । চান কর আগেরদিনের থেকেও বেশি ভাল লাগল । প্রায় দু'আড়াইঘন্টা চান করে হোটেলে ফিরে এলাম ।

বাকিটা গতানুগতিক । হোটেলে ফিরে চান, তারপর দুপুরে পোনা মাছের ঝাল দিয়ে ভাত । তারপর কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে বিকেলে বেরোলাম তখন সোয়া পাঁচটা । আবার তিনটে গাড়িতে ২৩ + ১ জন । রামনগর স্টেশনে এসে সন্ধ্যে ৬:২৯ এ কান্ডারি এক্সপ্রেসে উঠলাম । কান্ডারির হাওড়ায় পৌঁছনোর কথা রাত ৯:৫০ এ - পৌঁছল সাড়ে দশটার পরে । তাজপুর ভ্রমণ শেষ ।

সারসংক্ষেপঃ

১. কলকাতার কাছে একদিনের ঘুরে আসার জন্য যে জায়গাগুলো আছে, তাদের মধ্যে তাজপুর বিশেষ উল্লেখযোগ্য । ফাঁকা বীচ্‌, ফাঁকা জায়গা যাদের আকর্ষণ করে তাদের জন্যই তাজপুর ।
২. হাওড়া থেকে দীঘাগামী যেকোনও ট্রেনে রামনগরে নেমে গাড়িতে বা মোটর ভ্যানে তাজপুর যাওয়া যেতে পারে । এছাড়া নিজেদের গাড়িতে করে গেলে কাঁথি-দীঘা রোডে বালিসাই থেকে বাঁদিকে ঘুরে তাজপুর যেতে হবে ।
৩. তাজপুরে হোটেলের সংখ্যা বেশি নয়, আর এখানে খুব বেশি লোক যায় না । তাই পীক্‌ সিজ্‌ন্‌ ছাড়া অন্য সময়ে আগে থেকে হোটেল বুকিং না করে গেলেও চলবে ।
৪. আমরা ছিলাম তাজপুর রিট্রিটে । এদের ওয়েবসাইট http://www.tajpurhotel.com/ । এছাড়া এদের সঙ্গে যোগাযোগের নম্বর - 9830271064.
৫. তাজপুর রিট্রিটে মোট আটটা ডাবল্‌ বেড রুম আছে, সেখানে এরা আমাদের ১৯ জনের ব্যবস্থা করেছিল । বাকিচারজনের জন্য যে দু'টো ঘর দিয়েছিল সেগুলো অন্য হোটেলের এবং সেটা এদের কম্পাউন্ডের বাইরে । তাই যদি বড় দলে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকে তাহলে বিশেষতঃ এই বিষয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে নেওয়াই ভালো ।
৬. তাজপুরের সমুদ্র চান করার পক্ষে বেশ উপযোগী । সমুদ্রে যথেষ্ট ঢেউ আছে এবং বীচে যথেষ্ট লোক নেই, তাই একা বেশিদূরে না যাওয়াই শ্রেয় ।
৭. তাজপুরের বীচে একটা বিশেষ উল্লেখযোগ্য জিনিস হল অসংখ্য লালকাঁকড়া । যাদের এই জিনিস দেখার বিশেষ অভিজ্ঞতা নেই, তাদের এই দৃশ্য মুগ্ধ করবে বলেই মনে হয় ।

উপসংহারঃ

তাজপুর !
কলকাতা থেকে সপ্তাহান্তের ছুটি উপভোগ করার জন্য তাজপুর বেশ ভালো একটা জায়গা । এখানে থাকার জন্য একদিনই যথেষ্ট - তার বেশি থাকলে একঘেয়ে লাগার সম্ভাবনা । লোকসমাগম কম, নিরিবিলি, দোকানপাট বিহীন, প্রায় নির্জন এই জায়গা বিশ্রাম নেওয়ার পক্ষে একেবারে আদর্শ । সকালে সমুদ্রে চান, ডাব খাওয়া (মানে ডাবের জল খাওয়া - শাঁস পেলে খাওয়া যেতে পারে) আর বিকেলে সমুদ্রের তীরে ঘুরে বেড়ানো - এই নিয়েই তাজপুর । এখানে সমুদ্র ছাড়া দেখার আর কিছুই নেই । তাই ঘুরতে গিয়ে বেশি ঘোরাঘুরি না করে শরীর আর মনের ক্লান্তি দূর করা যাদের উদ্দেশ্য, তাজপুর তাদের জন্যই । আমি তাজপুর ২০০৯ সালেও গেছি, এবারে গিয়েও আমার সেই অনুভূতিটাই হল যেটা আমার বক্‌খালি-তেও হয়েছিল । তাই বক্‌খালি ভ্রমণের সেই কথাগুলো দিয়েই শেষ করছি - দীঘা পুরী মন্দারমণির মতো ঘ্যাম নয়, অল্প হোটেল-দোকান, সমুদ্রের লাল কাঁকড়া আর শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ নিয়ে তাজপুর থাকুক তাজপুরেই !

তাজপুর ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Tuesday, April 15, 2014

সাতকোশিয়া ভ্রমণ

মার ধারণা আমার ব্লগে যেসব জায়গায় ভ্রমণ সম্পর্কে পোস্ট করেছি, তাদের মধ্যে সাতকোশিয়ার নাম সবচেয়ে কম লোক শুনেছে । আমি নিজেও জায়গাটার নাম জেনেছি যাওয়ার মাসতিনেক আগে - 'সানন্দা' থেকে (এটা শুনে "এবাবা, তুই/তুমি/আপনি সানন্দা পড়িস/পড়ো/পড়েন !" বলে হ্যাটা করার কোনও কারণ নেই, কারণ আমি নিয়মিত পড়ি না, মাঝে মাঝে ওখানকার 'বেড়ানো' বিভাগটা ওল্টাই) । সাতকোশিয়া জায়গাটা উড়িষ্যায় । মহানদীর প্রবাহপথের এই সাত ক্রোশ বা চোদ্দ মাইল পথের এলাকাকে বলা হয় 'সাতকোশিয়া' । পুরো জায়গাটাই পাহাড়ে ঘেরা বলে একে বলা হয় 'সাতকোশিয়া গর্জ' ।

১২ই এপ্রিল, ২০১৪ - শনিবার রাত ৮:৫৫ য় হাওড়া থেকে সম্বলপুর এক্সপ্রেসে আমাদের যাত্রা শুরু । আমাদের এবারের দল ছ'জনের - সেই ছ'জন যারা দার্জিলিঙ গিয়েছিলাম অর্থাৎ আমি, আমার স্ত্রী অমৃতা, নন্দিনীদি, দীপঙ্করদা আর ওদের যমজ ছেলে সায়ক ও সৌনক । সাতকোশিয়া যাওয়ার জন্য অঙ্গুলে নামতে হয় আর হাওড়া থেকে অঙ্গুল যাওয়ার একটিই ট্রেন আছে, সম্বলপুর এক্সপ্রেস যা আবার সাপ্তাহিক - শুক্রবার ওদিক থেকে এদিকে আর শনিবার এদিক থেকে ওদিকে । কাজেই যদি শনিবার ছাড়া অন্য কোনওদিন বেরোনোর পরিকল্পনা থাকে তাহলে হাওড়া থেকে কটক গিয়ে সেখান থেকে বাসে বা গাড়িতে অঙ্গুল যেতে হবে ।

সম্বলপুর এক্সপ্রেস অঙ্গুল পৌঁছয় ভোর পাঁচটায় এবং আমাদের ক্ষেত্রে একেবারেই লেট করল না । আমরা যখন অঙ্গুলে নামলাম তখন চারদিক ফর্সা হয়ে গেলেও সূর্য্য ওঠেনি । এখানে একটা কথা বলে রাখি সাতকোশিয়া কিন্তু কোনও বিশেষ জায়গা নয়, এটা একটা বড় এলাকা । সাতকোশিয়া প্রধানতঃ পাহাড় এবং জঙ্গলপ্রধান একটা জায়গা আর পুরোটাই উড়িষ্যা বনদপ্তরের এলাকা । এখানে থাকার জায়গাগুলো হল - টিকরপাড়া, পুরুনাকোটে, ছোটকেই, লবঙ্গী প্রভৃতি । এই সব জায়গাতেই থাকার জন্য উড়িষ্যা বনদপ্তরের কাছে বুকিং করতে হয় যার অফিস অঙ্গুলে । আমাদের প্রায় দু'মাস আগে থেকে অগ্রিমবুকিং করা ছিল ।

অঙ্গুল থেকে আমাদের গাড়ি ঠিক করা ছিল । সাতকোশিয়া ভ্রমণের জন্য নিজস্ব গাড়ি থাকা বিশেষ প্রয়োজনীয়, না হলে ঘোরাঘুরি করা সহজ হবে না । আমাদের প্রথম গন্তব্য টিকরপাড়া - সেখানে আমরা একদিন থাকব । অঙ্গুল থেকে টিকরপাড়ার দূরত্ব ৪০ কিলোমিটারের মতো । টিকরপাড়া একটা ছোট্ট গ্রাম, দোকানপাটও প্রায় নেই বললেই চলে । আমাদের ড্রাইভার বলল - যেতে ঘন্টাখানেক লাগবে এবং ওখানে গিয়ে ব্রেকফাস্ট পাওয়া যাবে না, কাজেই আমাদের যাওয়ার পথে ব্রেকফাস্ট সেরে নেওয়াই ভালো । সেইমতো একটা পাঞ্জাবি ধাবা থেকে আমরা পরোটা আর পনীরবাটার মশালা দিয়ে ব্রেকফাস্ট করলাম । এটা যে আমাদের পক্ষে কতটা ভালো হল সেটা বুঝলাম আরও মিনিট পনেরো চলার পরে । বড় রাস্তা ছেড়ে আমাদের গাড়ি যখন দু'দিকে পাহাড় আর জঙ্গল ঘেরা সম্পূর্ণ জনবসতিবিহীন রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলল তখন বুঝলাম এখানে ব্রেকফাস্ট পাওয়ার থেকে নিজেরা বন্যজন্তুদের হাতে ব্রেকফাস্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি !

আরও কিছুক্ষণ চলার পরে পড়ল 'পম্পাসার চেক পয়েন্ট' । এখানে বুকিং এর কাগজ দেখালে এরা ভেতরে যাওয়ার অনুমতিপত্র দেয় । মাথাপিছু ২০ টাকা এবং গাড়ির জন্য ৫ টাকা (প্রতিদিন) হিসেবে এখানে প্রবেশমূল্য দিতে হয় (বাঃ, জন্তুজানোয়ার দেখতে গেলে প্রবেশমূল্য দিতে হবে না ?) । পম্পাসার থেকে টিকরপাড়া যেতে আরও আধঘন্টা লাগল - আমরা পৌঁছলাম সাড়ে আটটার সময়ে ।

টিকরপাড়ায় পৌঁছে আমরা কিছুটা সমস্যায় পড়লাম ।  টিকরপাড়ায় থাকার জায়গা নেচার ক্যাম্পের টেন্ট - পৌঁছে দেখলাম তার গেট বন্ধ আর আশেপাশে কাউকে দেখা যাচ্ছে না । সেইসঙ্গে আমাদের কারুর মোবাইলও কাজ করছে না । অর্থাৎ আমাদের বুকিং-এর কাগজপত্রে দেওয়া ফোন নম্বরে যোগাযোগ করার কোনও উপায় নেই । কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর একজনের দেখা পাওয়া গেল, সেই হল এখানকার কেয়ারটেকার । তার কাছ থেকে জানলাম অঙ্গুলের অফিস থেকে আমাদের আসার খবর তাকে পাঠানো হয়নি । এটা নাকি সিজ্‌ন নয়, ওর কাজের ছেলেরাও এখন প্রায় কেউই নেই কাজেই আমাদের থাকার মতো কোনও বন্দোবস্তই করা নেই । অগত্যা আমাদের একটু অপেক্ষা করতে হবে ।

টিকরপাড়া নেচার ক্যাম্প
আমরা বসে রইলাম । জায়গাটায় টেন্ট ছাড়াও গাছের ছায়ায় ছোট ছোট বসার জায়গা আছে আর একটা খড়ের চাল দেওয়া খাওয়ার জায়গা আছে । জায়গাটা মহানদীর একেবারে ধারে, বসে বসে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে ভালোই লাগছিল । এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় - প্রচন্ড গরম হওয়া উচিৎ কিন্তু জায়গাটা গাছপালা ঘেরা হওয়ায় আর আগেরদিন রাতে বৃষ্টি হওয়ায় গরম তো লাগছিলই না, বরং কিছুটা ঠান্ডার দিকেই । ইতিমধ্যে আরেকটা ট্যুরিস্ট দল এসে হাজির হয়েছে - বলা বাহুল্য বাঙালি দল । এদেরও আমাদের মতোই অবস্থা অর্থাৎ এদের আসার খবরও কেয়ারটেকারের কাছে পৌঁছয়নি । সাড়ে দশটার কিছু আগে আমাদের টেন্ট রেডি হল ।

আমরা নিয়েছিলাম ডিলাক্স টেন্ট যার ভাড়া ২,০০০ টাকা (খাওয়াসুদ্ধ) । টেন্টগুলো বেশ সুন্দর, ভেতরে একটা খাট, দু'টো চেয়ার আর একটা টেবিল আছে । প্রত্যেকটা টেন্টের পেছনে বাইরে একটা বাথরুম । প্রত্যেকটা টেন্টের চারপাশে বাঁশের বেড়া দেওয়া আছে যদিও তার মানে এই নয় যে একটা থেকে অন্যটায় যেতে গেলে খুব বেগ পেতে হবে ।

(এখানে না বলে পারছি না যে টিকরপাড়ার মানুষের জীবনযাত্রা খুব বাঁশের ওপর নির্ভরশীল । আমাদের নেচার ক্যাম্পে গাছের গা থেকে ঝোলানো একটা দোলনা আছে যেটা দড়ির বদলে বাঁশ দিয়ে আটকানো । এরা জামাকাপড় শুকোতে দেওয়ার সময়েও দড়ির বদলে বাঁশের ওপর টাঙায় । কাজেই এখানে বেড়াতে গেলে 'বাঁশ হইতে সাবধান' !)

মহানদী - কুমীর প্রকল্পে যাওয়ার পথে
টেন্টের ভেতরে কোনও পাখার ব্যবস্থা নেই, সাধারণতঃ কোনও টেন্টেই থাকে না । গরমকালে এইসব জায়গায় কেউ যায়ও না কাজেই পাখার ব্যবস্থা করার দরকার পড়ে না । যত বেলা বাড়তে লাগল তত তাপমাত্রাও বাড়তে থাকল আর আমরা অনুভব করলাম টেন্টের ভেতরে থাকা যাচ্ছে না । তবে তাতে সমস্যা নেই কারণ টেন্টের সামনে নদীর ধারে গাছের তলায় বেঞ্চির ওপর বসে/শুয়ে থাকতে ভালোই লাগছিল ।

কুমীর প্রকল্পে ঘড়িয়াল
একটু পরে আমরা গেলাম কাছেই 'কুমীর প্রকল্প' দেখতে । যদিও আমরা গাড়ি নিয়ে গেলাম তবে এই পথটুকু হেঁটেই যাওয়া যায় । একেবারে নদীর ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যেতে হয় এই জায়গায় । দেখার মধ্যে কিছু কুমীর আর ঘড়িয়াল আছে । তাছাড়া আছে একটা কচ্ছপ । এই জায়গাটাও গাছপালায় ঘেরা - ফুরফুরে হাওয়ায় ঘুরঘুর করতে বেশ লাগে ।

মহানদীতে চান
ফিরে এসে আমরা গেলাম মহানদীতে চান করতে । মহানদীতে প্রচুর কুমীর আর ঘড়িয়াল আছে (ভয় দেখানোর জন্য বাড়িয়ে বলছি না) কাজেই চান করা বিপজ্জনক । বিভিন্ন জায়গায় সাইনবোর্ডে লেখাও আছে জলে না নামার কথা । যদিও এদের স্থানীয় লোকেরা নদীতে চান করে, কাপড় কাচে কিন্তু এরাও নদীর ধারেই থাকে, বেশিদূর এগোয় না । তাই চান করতে ইচ্ছে হলে আরও লোকজন যেখানে আছে, সেরকম জায়গায় যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ । আমরা কিছুক্ষণ চানটান করে ফিরে এলাম (Performed by experts. Do not try this) ।

দুপুরে ভাত-ডাল-আলুভাজা-তরকারি আর চিকেন । রান্না এককথায় বেশ বাজে । কেয়ারটেকার নিজেই রান্না করেছে - আমাদেরও আর কোনও উপায় নেই, তাই ঐ খাবারই খেতে হল । দুপুরে টেন্টের ভেতরটা অগ্নিকুন্ড হয়ে আছে, তাই বাইরেই বসে রইলাম ।

টিকরপাড়ায় ঝড়ের তান্ডব
বিকেল হতে দেখা গেল আকাশটা ক্রমশঃ কালো হয়ে আসছে । চারটের একটু পরে আকাশ একেবারে কালো হয়ে প্রচন্ড ঝড় শুরু হল । এই ঝড়ে টেন্টে থাকা নিরাপদ নয়, তাই আমরা সবাই মিলে খড়ের চালে ঢাকা খাওয়া জায়গাটায় আশ্রয় নিলাম । সেখান থেকে দেখলাম মহানদী আর সাতকোশিয়া গর্জে ঝড় আর বৃষ্টির তান্ডব । প্রচন্ড ঝড় আর সেইসঙ্গে বৃষ্টি - চারদিক একেবারে সাদা হয়ে গেছে । আমাদের টেন্টের ক্যানভাসগুলো অসহায়ের মতো এদিকওদিক ঝাপটাচ্ছে । খাওয়ার জায়গাটার শুধু মাথাটাই ঢাকা - চারপাশটা খোলা । সেখান দিয়ে অনবরত বৃষ্টির ছাট গায়ে লাগছিল । আমরা কোনওমতে বৃষ্টি বাঁচিয়ে (খুব যে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলাম এমন নয়, দুপুরের ওই গরমের পর বৃষ্টিটা ভালোই লাগছিল) দাঁড়িয়ে রইলাম । আমাদের মাথার ওপরে খড়ের চালের কিছুটা উড়ে গিয়ে সেখান দিয়ে জল পড়তে লাগল । সবমিলিয়ে যাকে বলে বেশ থ্রিলিং ব্যাপার !

সূর্য্যাস্তের ঠিক আগে
বৃষ্টি থামল ঘন্টাখানেক পরে । আমি আমাদের নেচার ক্যাম্প থেকে নদীর একেবারে ধারে চলে গেলাম । প্রচন্ড জোরে হাওয়া সেখানে তখনও অল্প অল্প বৃষ্টির আমেজ অনুভব করছিলাম । অত ঝড়ের পর নদীর জলের অস্থিরতা তখনও কমেনি । সেখানে দাঁড়িয়ে দেখলাম দু'টো পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে সূর্য্য অস্ত চলে গেল । পরিবেশটার মধ্যে একটা ভীষণ ভালোলাগা কাজ করছিল যা শুধু অনুভবই করা যায়, ব্যাখ্যা করা যায় না ।

রাতের আলোয় টিকরপাড়া নেচার ক্যাম্প
সন্ধ্যেবেলা আর কিছু করার নেই । গরম একেবারেই লাগছিল না, চাঁদের আলোয় টেন্টের বাইরে বসে বসে সবাই মিলে আড্ডা দিলাম । দুপুরে চিকেনের শোচনীয় অবস্থা দেখে নন্দিনীদি আগেই বলে রেখেছিলেন যে রাতের চিকেনটা উনি রান্না করবেন । এতে কেয়ারটেকার খুশিই হল কারণ রান্নাটা ওর নিজের সামর্থ্যের মধ্যের জিনিস নয় । রাতে নন্দিনীদির রান্না করা চিকেন দিয়ে (অসাধারণ হয়েছিল, নন্দিনীদি !) রুটি খেয়ে শুয়ে পড়লাম ।

মহানদীতে নৌভ্রমণ
পরেরদিন সকালে উঠে চা খেয়ে রেডি হয়ে নিলাম । আগে থেকেই পরিকল্পনা ছিল আমরা মহানদীতে নৌভ্রমণে বেরোব । দলে আমরা ছ'জন ছাড়াও আরও সাতজন (যারা গতকাল এখানে এসেছিল) । নৌকো বলতে আসলে একটা ডিঙিই বলা চলে । নদীর ধার দিয়ে মাঝে মাঝে দাঁড় বেয়ে মাঝে মাঝে লগি ঠেলে আমাদের নৌকা চলল । অভিজ্ঞতাটা আমার কাছে নতুন না হলেও অনেকদিন পরে - কাজেই বেশ মজা লাগছিল । যেতে যেতে মাঝে দূর থেকে জলের মধ্যে একটা কুমীর দেখা গেল (বলা বাহুল্য তাতে দলের সবার মধ্যেই বেশ চাঞ্চল্য দেখা গেল - লোকজন ছবিটবিও তুলল) ।

পাথরে ঢাকা নৌ-হল্ট্‌
প্রায় ঘন্টাখানেক চলার পর নৌকো একজায়গায় ভিড়ল । জায়গাটা পাথর দিয়ে ঢাকা - ছোটো ছোটো পাথরের স্তুপ । আমরা সেখানে কিছু ঘোরাঘুরি করে আবার ফেরার পথ ধরলাম । ফেরার সময়ে নৌকো কিছুটা মাঝখান দিয়ে ফিরল আর স্রোতের অনুকূলে হওয়ার দরুণ ফিরতে কম সময় লাগল । নৌকোর ভাড়া নিল ৮০০ টাকা ।



এরপর আমরা লুচি তরকারি দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়লাম । আমাদের পরের গন্তব্য পুরুনাকোটে ।

পুরুনাকোটের কটেজের ঘর
যে রাস্তা দিয়ে আমরা কাল টিকরপাড়া গেছিলাম, পুরুনাকোটে যেতে গেলে সেই রাস্তা দিয়েই কিছুটা ফিরে আসতে হয় । টিকরপাড়া থেকে পুরুনাকোটের দুরত্ব ১০ - ১৫ কিলোমিটারের মতো । পুরুনাকোটে টিকরপাড়ার মতো রিমোট নয়, এখানে কিছু দোকান টোকান আছে । এখানে উড়িষ্যা বনদপ্তরের 'ফরেস্ট রেস্ট হাউস' আছে - পুরুনাকোটের থাকার জায়গাটাও সেখানেই । এখানে পৌঁছেও আমরা একই সমস্যার সম্মুখিন হলাম - অঙ্গুল থেকে এখানে কোনও খবর আসেনি । পুরুনাকোটের থাকার জায়গাটা কটেজ, সেখানে আবার বিদ্যুতের সমস্যা । এখানে মাত্র দু'টোই ঘর আছে - সেগুলো পরিষ্কার হতে কিছুক্ষণ সময় লাগল । পুরুনাকোটের ঘরভাড়া ১,০০০ টাকা করে আর সেটা খাওয়াসুদ্ধ নয় । এখানে প্রতি দু'জনের জন্য ৫০০ টাকা করে খাবার নেওয়া যেতে পারে । আমরা সেরকম ব্যবস্থাই করলাম ।

দুপুরে ডিমের ডালনা দিয়ে ভাত খেয়ে আমরা গাড়ি নিয়ে ঘুরতে বেরোলাম । এখান থেকে পম্পাসার চেক পয়েন্টের দিকে আরও কিছুটা এগোলে লবঙ্গীর দিকে যাওয়া যায় । আমাদের কেয়ারটেকার বলল - লবঙ্গীর ওয়াচ্‌ টাওয়ার থেকে কিছু জন্তু জানোয়ারের দেখা মিলতে পারে ।

লবঙ্গী যাওয়ার পথ
সেইমতো আমরা লবঙ্গীর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম । এই যাওয়ার পথটাই বিশেষ উল্লেখযোগ্য । দু'দিকের জঙ্গলের মধ্যের কাঁচা রাস্তার মধ্যে দিয়ে উঁচুনিচু পথে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলল । মাঝে একজায়গায় আমরা গাড়ি থামিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম । জঙ্গলের ভেতরে নিস্তব্ধতার মধ্যে সে এক অদ্ভুত গা-ছমছমানি পরিবেশ । প্রতিমূহুর্তে বন্য জন্তুদের দেখতে পাওয়ার এক অনাবিল আকর্ষণ (আমি এই ভাষায় লিখি না, এই দু'টো লাইন সানন্দার প্রতিবেদকের প্রতি একটা ছোট্ট শ্রদ্ধার্ঘ্য) ।

যাওয়ার পথে একজায়গায় চোখে পড়ল উড়ন্ত কাঠবিড়ালী । লবঙ্গীতে পৌঁছে জানা গেল এখন উড়িষ্যা ভোটের জন্য অনেক কিছু বন্ধ - ওয়াচ্‌টাওয়ারেও যাওয়া যাবে না । আমরা লবঙ্গীর ফরেস্ট রেস্ট হাউস পর্যন্ত পৌঁছলাম । এখানেও আর কোনও ট্যুরিস্ট নেই । আমরা কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে আবার ফেরার পথ ধরলাম । জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়ি পথে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ফেরার সময়ে থেকে থেকেই কেন জানি না গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিল ! (আদৌ উঠছিল না, এটাও ওই - শ্রদ্ধার্ঘ্য !)

পুরুনাকোটেতে চাঁদের আলোয় আড্ডা
কটেজে ফিরে দেখলাম লোডশেডিং । কেয়ারটেকার জানালো কোথায় একজায়গায় হাতি ইলেকট্রিকের তার ছিঁড়ে দিয়েছে - রাতের মধ্যে কারেন্ট আসার সম্ভাবনা কম । আমরা কটেজের সামনের লনে বসে রইলাম । আকাশে পূর্ণচন্দ্র - আর খুব হাল্কা হাল্কা হাওয়া দিচ্ছিল বলে গরম লাগছিল না ।



রাতে রুটি আর চিকেন । এখানেও নন্দিনীদিই রান্না করলেন । আলো না থাকায় আমরা লনেই খোলা আকাশের নিচে বসে যাকে বলে 'মুনলাইট ডিনার' করলাম । পুরুনাকোটেতে আমাদের রাত্রিযাপন এভাবেই শেষ হল ।

পরেরদিন ১৫ই এপ্রিল, ২০১৪ । বাংলা নববর্ষ । আমাদের ফেরার দিন । সকালে লুচি আর আলুর তরকারি দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়লাম । আগেই বলেছি অঙ্গুল থেকে আমাদের ফেরার কোনও উপায় নেই তাই আমাদের কটক যেতে হবে । কটক থেকে দুপুরে ধৌলি এক্সপ্রেস ধরে হাওড়া ।

কটক স্টেশন
আমাদের গাড়ি আমাদের কটক স্টেশনে ছেড়ে দিল । পুরুনাকোটে থেকে কটক আসতে ঘন্টাতিনেক লাগে । কটকে এসে আমরা স্টেশন থেকে দুপুরের খাওয়া সেরে নিলাম । তারপর ট্রেনে চড়ে হাওড়া ! খতম্‌ !






সারসংক্ষেপঃ

১. উড়িষ্যার কটকের কাছে পাহাড় আর জঙ্গল ঘেরা একটা জায়গা সাতকোশিয়া । এখানকার সিজ্‌ন্‌ নভেম্বর থেকে মার্চ - এই সময়সীমার বাইরে সাতকোশিয়ায় যাওয়ার মানে হয় না, কারণ তাতে এখানে যাওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য চরিতার্থ নাও হতে পারে ।
২. সাতকোশিয়ার সবচেয়ে কাছের রেলস্টেশন অঙ্গুল - এখান থেকে গাড়িতে যেতে ঘন্টাখানেক লাগে । হাওড়া থেকে অঙ্গুল যাওয়ার ট্রেন সপ্তাহে একটাই ছাড়ে - শনিবার রাতে । এছাড়া কটক পর্যন্ত্য ট্রেনে গিয়ে তিনঘন্টার গাড়ির জার্নি করেও সাতকোশিয়া যাওয়া যেতে পারে ।
৩. সাতকোশিয়ায় থাকার বা ঘোরার জায়গা প্রধানতঃ চারটে - টিকরপাড়া, ছোটকেই, পুরুনাকোটে আর লবঙ্গী । এদের মধ্যে টিকরপাড়াতে একদিন অবশ্যই থাকা উচিৎ ।
৪. যদিও এখানে বিভিন্ন রুটে সরকারি বাস চলে, কিন্তু সাতকোশিয়ায় ঘোরার জন্য নিজস্ব গাড়ি থাকাই শ্রেয় । অঙ্গুল বা কটক থেকে অল্প খরচে ২ - ৩ দিনের জন্য গাড়ি ভাড়া করে নেওয়া যেতে পারে ।
৫. সাতকোশিয়ার সবজায়গাতেই উড়িষ্যার বনদপ্তরের থাকার জায়গা রয়েছে । বুকিং এর জন্য এদের ওয়েবসাইট http://www.satkosia.org/ দেখা যেতে পারে অথবা ইমেল বা ফোনে যোগাযোগ করা যেতে পারে । ইমেল : dfosatkosiawl@yahoo.co.in, ফোন : 08763102681.
৬. সাতকোশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় একটা বড় সমস্যা হল এখানে মোবাইলের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না বা পাওয়া গেলেও তা খুবই ক্ষীণ । কাজেই বাইরের কারুর সঙ্গে দরকার পড়লেও যোগাযোগ করা যাবে না এটা ধরে নিয়েই সাতকোশিয়ায় যাওয়া উচিৎ ।
৭. এখানে দোকানপাট নেই বললেই চলে - খাওয়াদাওয়ার জন্যও রিসর্টের ওপরেই নির্ভর করতে হয় । নিজের ইচ্ছেমতো খাদ্যসামগ্রীও পাওয়ারও সম্ভাবনা নেই ।

উপসংহারঃ

সাতকোশিয়া 
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে সাতকোশিয়ার পরিবেশ বেড়ানোর পক্ষে যথেষ্ট অনুকূল নয় । হ্যাঁ, এটা ঠিক নাগরিক পরিষেবা বলতে যে জিনিসগুলো আমরা প্রতিমূহুর্তেই পেতে অভ্যস্ত, তার অনেককিছুই এখানে পাওয়া যায় না, পয়সা ফেললেও না । কিন্তু এটাই হয়তো এই জায়গার ইউ এস পি । প্রতিকূল অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটাও জীবনের একটা শিক্ষা । বিশেষ করে তার পরিবর্তে যদি অসামান্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য দেখার সু্যোগ পাওয়া যায় । প্রকৃতির মধ্যে থাকা, প্রকৃতিকে দেখা - এগুলোই সাতকোশিয়ার মূল আকর্ষণ । আমরা এর আগেও প্রকৃতির মধ্যে থেকেছি, কিন্তু এভাবে একেবারে কেন্দ্রস্থলে গিয়ে কখনও পড়িনি । এর একটা আলাদা স্বাদ আছে - অনুভূতি আছে - গন্ধ আছে । আর এগুলোর কোনওটাই যদি টের না পাওয়া যায়, তাহলে নিজের ফুসফুসটাকে চাঙ্গা করতে অন্তত বিশুদ্ধ অক্সিজেন তো আছেই । এইসবকিছুকে পেতে হলে কলকাতা থেকে মাত্র ঘন্টা ৯ ঘন্টার দুরত্বে সাতকোশিয়ায় একবার ঘুরে আসতেই হবে !
বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ - অফ্‌ সিজ্‌নে সাতকোশিয়ায় নৈব নৈব চ ।

সাতকোশিয়া ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Sunday, February 16, 2014

কলকাতা ভ্রমণ : পর্ব - ১ (চিড়িয়াখানা)

লকাতা ভ্রমণ ! শুনেই পড়েই একটু অবাক লাগছে কি ? লাগারই কথা । আমি কলকাতার ছেলে - বলতে গেলে প্রায় সারা বছর কলকাতাতেই থাকি, সেখানে আবার ভ্রমণ কি ? আসলে আমার এই প্রিয় শহরটাতেও ভ্রমণের বা দেখার জায়গা অনেকগুলো আছে, কিন্তু এর অনেকগুলোই আমাদের দেখা হয়ে ওঠে নি / ওঠে না । ঘোরার জন্য - দেখার জন্য আমরা শহরের বাইরে, রাজ্যের বাইরে, দেশের বাইরে, মহাদেশের বাইরে এমনকি পৃথিবীর বাইরেও যাই কিন্তু "দেখা হয় নাই ... শিশিরবিন্দু !" সেইজন্য ঠিক করেছি এবার কলকাতা ভ্রমণ নিয়ে লেখা শুরু করব ।

কলকাতা ভ্রমণ একবারে লেখা সম্ভব নয় । তার প্রধানতঃ দু'টো কারণ - ১) কলকাতায় এত দেখা জায়গা আছে যার সব একবারে দেখে ফেলে লিখে ফেলা দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ আর ২) যা দেখার জায়গা আছে সেগুলো একবারে দেখা সম্ভবও নয় । তাই যখন যেরকম দেখা হবে, সেইমতো কলকাতা ভ্রমণ সম্পর্কে লেখা চলতে থাকবে ।

কলকাতার চিড়িয়াখানা প্রায় সব্বাই ছোটবেলায় একবার করে যায় আর বহু লোকের ক্ষেত্রে দেখেছি বড় হয়ে আর কিছুতেই যাওয়া হয়ে ওঠে না । আমি নিজেও ছোটবেলায় বছর ৪ - ৫ বয়সে একবার গেছিলাম আর বড় হওয়ার পর বহুবার চেষ্টা করেও যাওয়া হয়ে ওঠেনি । অবশেষে একটা পুচকেকে নিয়ে যাওয়ার জন্যই আমার বড় বয়সে চিড়িয়াখানা যাওয়াটা হয়ে গেল - তিনি হলেন আমার বড় শ্যালিকার দু'বছরের ছেলে শ্রীমান আত্মদীপ চট্টোপাধ্যায় । দলে আমি আর সে ছাড়াও আমার স্ত্রী আর তার বাবা-মা ।

১৬ই ফ্রেব্রুয়ারী, ২০১৪ রবিবার । দিনটা কিছুটা দুর্যোগপূর্ণ হওয়ায় আমরা আলিপুর পৌঁছলাম তখন দুপুর পৌনে একটা । গাড়ি পার্কিং এর জায়গাটা চিড়িয়াখানা থেকে মিনিট পাঁচেকের হাঁটা পথ - এখানে সারাদিনের জন্য গাড়ি রাখতে ১৫০ টাকা নিল (মরশুমের সময়ে সেটা নাকি ২৫০ - ৩০০ তেও পৌঁছে যায় !) । চিড়িয়াখানার একেবারে কাছে সেরকম কোনও ভালো খাবার দোকান নেই, মেইন গেটের উল্টোদিকে একটা সাধারণ ভাতের হোটেল আছে ।

চিড়িয়াখানায় ঢোকার আগে এর উল্টোদিকে 'অ্যাকোরিয়াম' দেখে নেওয়া যেতে পারে । প্রবেশমূল্য মাথাপিছু ৫ টাকা আর দু'বছরের নিচে টিকিট লাগে না । অ্যাকোরিয়ামে যথারীতি নানা প্রজাতির নানা রঙের নানা আকৃতির নানা দেশের মাছ রয়েছে । অ্যাকোরিয়ামটা বেশ বড় এবং ভেতরে ছবি তোলা নিষিদ্ধ । এদের মধ্যে রাক্ষুসে মাছ 'পিরান্‌হা'কেও দেখতে পেলাম ।

এবার রাস্তা পেরিয়ে মূল চিড়িয়াখানায় প্রবেশ । এখানে প্রবেশমূল্য ২০ টাকা আর দু'বছর পর্যন্ত ফ্রি । ক্যামেরার জন্য কোনও টিকিট লাগে না (এটা আমার বেশ ভালো লাগল কারণ ইদানিংকালে দার্জিলিঙ, নন্দনকানন বা শিলং-এ যে'কটা চিড়িয়াখানা দেখেছি, প্রত্যেকটাতেই ক্যামেরার জন্য আলাদা টিকিট লেগেছে) । চিড়িয়াখানার সময়সীমা সকাল ন'টা থেকে বিকেল পাঁচটা । প্রতি বৃহস্পতিবার চিড়িয়াখানা বন্ধ থাকে তবে কোনও বৃহস্পতিবার কোনও সরকারী ছুটির দিন পড়ে গেলে সেদিন খোলা থাকে ।

ভেতরে ঢুকেই প্রথমে একটা ম্যাপ দেওয়া আছে, সেখানে বিভিন্ন জন্তু এবং নিজেদের অবস্থান দেখে নেওয়া যেতে পারে । আমাদের খুব কাছেই রয়েছে বাঘ - তাই আমরা সেদিকেই এগোলাম । যাওয়ার পথে কিছু কাকাতুয়া, ম্যাকাও ইত্যাদি দেখে নেওয়া গেল ।

রানি
এরপর 'রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার' । একটা পরিখাঘেরা বেশ বড় জায়গায় এনাকে রাখা হয়েছে এবং আমরা যতক্ষণ ছিলাম তিনি পুরো জায়গাটা পায়চারি করলেন । আমরা রাজসকাষে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে 'রানি'কে (এটাই বাঘের নাম) দেখলাম আর অনেক ছবি তুললাম ।



পাখিদের খাঁচা
এরপর আরও কিছু পাখির খাঁচা ছিল, সেখানে কয়েকজনকে দেখা গেল । আরও কিছুটা এগিয়ে ময়ূরের খাঁচায় ময়ূরকে দেখা গেল কিছু তার পেখম দেখা গেল না (যথারীতি কিছু লোক খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে ময়ূরকে পেখম তোলার জন্য বিশুদ্ধ বাংলায় অনুরোধ করছিল, কিন্তু কেন জানিনা ময়ূর কিছুতেই তাদের কথা শুনছিল না !) ।


জিরাফের ঘর
চিড়িয়াখানার ভেতরে কিছু জলাশয় আছে আর সেগুলো পেরোনোর জন্য ছোট ছোট ব্রীজও করা আছে । সেরকম একটা ব্রীজ পেরিয়ে আমাদের সামনে পড়ল জিরাফের খাঁচা । তখন বৃষ্টি বেশ জোরে পড়ছে - বেচারা জিরাফরা তাদের দর্শনার্থীদের দর্শনার্থে কিছুতেই বাইরে বেরোতে চাইল না । আমরা ঘরের ভেতরে তাদের যতদূর দেখা যায়, দেখলাম । একটা বাচ্চা জিরাফ বারবার বেরিয়ে আসছিল আর একটা বড় জিরাফ তাকে ধরে আবার ভেতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছিল । দেখে মনে হল :
মা : বাবু, আবার বৃষ্টির মধ্যে ভিজছ ?
বাবু : একটু যাই না !
মা  : না সোনা, বৃষ্টিতে ভিজলে ঠান্ডা লেগে যাবে । কাল আকাশ পরিষ্কার থাকলে অনেক লোক আসবে, তাদের সামনে ঘোরাঘুরি করতে হবে না ? এখন একদম ভিজবে না !

হাতিদের বাড়ি
জিরাফের পরে কিছু চিতাবাঘ, প্যান্থার ইত্যাদিদের দেখা গেল । তারপর আমরা গেলাম হাতির কাছে । তিনটে বড় আর একটা বাচ্চা হাতিকে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম । বোধহয় বৃষ্টির জন্যই হাতিরও সেরকম হাঁটাচলা দেখা গেল না ।





হাতির পরে যেটা উল্লেখযোগ্য সেটা হল সিংহ । সিংহকেও বাঘের মতো একটা পরিখাঘেরা খোলা জায়গায় রাখা হয়েছে আর পশুরাজকে আমরা দেখলাম ওনার ঘরের সামনে শুয়ে বিশ্রাম করছেন । মাঝে একবার ঘাড়টা তুলে আমাদের একটু তাচ্ছিল্যমিশ্রিত দর্শন দিলেন, তারপর আবার শুয়ে পড়লেন ।

আমরা আরও এগিয়ে চললাম । শুরুতে বৃষ্টিটা ঝিরঝির করে হলেও এখন ঝমঝম করে হচ্ছে । এরপর আমরা দেখতে পেলাম জলহস্তিকে । তার পুরো শরীরটাই জলের নিচে - শুধু পিঠের ওপরের কিছুটা ওপরে । একবার মাথাটা সামান্য তুলল, আবার যেই-কে-সেই ।

খাঁচার ভেতরে সাদা বাঘ
আরও এগিয়ে আরেকটা বাঘের খাঁচা - তবে এবার আর কোনও খোলা জায়গা নয়, একেবারে ঢাকা খাঁচা । সেখানেও বাঘকে পায়চারি করতে দেখা গেল আর এবার একেবারে খাঁচার সামনের দিক ঘেঁষে । অর্থাৎ দর্শকের সঙ্গে তার দূরত্ব হাত দু'য়েকের বেশি নয় । বাঘের পাশের সাদা বাঘ । একেও দেখলাম খাঁচার ভেতরে পায়চারি করতে ।


শীতকালে চিড়িয়াখানায় সরীসৃপের ঘর বন্ধ থাকে, আমরা আর ওদিকে গেলাম না । তার বদলে বাঁদরের খাঁচার সামনে দিয়ে এলাম আর সামনেই জলের মধ্যে কুমীরকে দেখলাম ।

আমাদের চিড়িয়াখানা দেখা শেষ - বৃষ্টিও সেইসঙ্গে সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে, তাই এবার আমরা ফেরার পথ ধরলাম ।

উপসংহারঃ

কলকাতা চিড়িয়াখানা
কলকাতার চিড়িয়াখানা সম্পর্কে প্রথম যে কথাটা উল্লেখ করতেই হবে সেটা হল আমাদের ভুল ধারণার কথা । কেন জানি না, বহু লোক মনে করে আলিপুর চিড়িয়াখানায় কোনও রক্ষণাবেক্ষণ হয় না । হয়তো একসময়ে সত্যিই হতো না, কিন্তু এখন হয় এবং স্বীকার করতেই হয় বেশ ভালোভাবেই হয় । একটা ভালো জিনিস লক্ষ্য করলাম সেটা হল প্রত্যেকটা জন্তুর দায়িত্ব একজন/কোনো সংস্থা নিয়েছেন । তিনি/তাঁরা ১৮ই সেপ্টেম্বর ২০১৩ - ১৭ই সেপ্টেম্বর ২০১৪ পর্যন্ত এই দায়িত্ব নিয়েছেন । আন্দাজ করলাম প্রত্যেক বছর এই দায়িত্ব নতুন করে বিন্যাস করা হয় । এছাড়া আলিপুর চিড়িয়াখানা যথেষ্ট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন । ভেতরে কিছু স্ন্যাক্স খাওয়ার ব্যবস্থাও আছে । সবমিলিয়ে যথেষ্ট চিত্তাকর্ষক । আমি এখানে আমাদের দেখা প্রধান জন্তু বা পাখিদের কথাই উল্লেখ করেছি, কিছু ছোটখাটো জিনিস আর বিস্তারিত উল্লেখ করিনি । কাজেই আমার লেখা পড়ে যদি মনে হয় "এ আর কি এমন, এই ক'টা জিনিস দেখতে যাওয়ার কোনও মানে হয় না" তাহলে ভুল হবে । আমার মতে ইদানীংকালে না গিয়ে থাকলে কলকাতা চিড়িয়াখানায় একবার যাওয়া যেতেই পারে !

কলকাতা চিড়িয়াখানার নিজস্ব ওয়েবসাইট http://www.kolkatazoo.in/ থেকে এখানকার সম্পর্কে আরও তথ্য জানা যেতে পারে ।

Monday, January 27, 2014

দার্জিলিঙ ভ্রমণ

গেই বলেছি, দী-পু-দা সম্পর্কে আমার ভ্রমণসর্বস্ব ব্লগ মূলতঃ নীরবতাই পালন করবে । সেই সূত্র ধরেই এবারের দার্জিলিঙ ভ্রমণ এক নাতিদীর্ঘ শুধুমাত্র তথ্যসমৃদ্ধ রচনায় পরিণত হতে চলেছে । ভাষার এই গাম্ভীর্য্যের কারণ ? সম্প্রতি আমার জনৈকা পাঠিকা আমাকে এক বাজারচলতি পত্রিকায় একটি ভ্রমণকাহিনী পড়িয়ে বলেছেন "তুমি এ'রকম ভাষায় লিখতে পারো না ?" বলা বাহুল্য, সে'ভাষা এরকমই অ-চলিত । একটা পূর্ণদৈর্ঘ্যের ভ্রমণ-অভিজ্ঞতাকে এই ভাষায় মুখর করে তোলা আমার মতো অপটু লেখকের কাছে শুধু পরিশ্রমসাপেক্ষই নয়, ক্লান্তিকরও বটে - তাই এই সংক্ষিপ্ত রচনায় আমার এই 'ছোট্ট' প্রয়াস ।

যাওয়া ঃ ২২শে জানুয়ারী, ২০১৪ রাত ৯:৪০ - কলকাতা ডিব্রুগড় এক্সপ্রেস (সাপ্তাহিক ট্রেন) ।
ফেরা ঃ ২৬শে জানুয়ারী, ২০১৪ বিকেল ৫:৪০ - উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস ।

আমাদের দলে আমি, আমার স্ত্রী অমৃতা, তার কলিগ্‌ নন্দিনীদি, দীপঙ্করদা আর ওঁদের যমজ ছেলে সায়ক ও সৌনক ।

সারসংক্ষেপঃ

১. দার্জিলিঙ-এর মরশুম প্রধানতঃ মে-জুন মাস বা সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাস । সেই অর্থে জানুয়ারী মাস মন্দা-মরশুম । আর সেই কারণেই আমরা বিভিন্নরকম ক্ষেত্রে বেশ কিছু আর্থিক ছাড় পেয়েছি ।
২. আমরা নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন সংলগ্ন 'নিউ সিকিম ট্রাভেল' থেকে প্যাকেজ গাড়ি নিয়েছিলাম । এই গাড়ি আমাদের নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিঙ পৌঁছে দেওয়া, দার্জিলিঙ-এর আশপাশ ঘোরা আর দার্জিলিঙ থেকে নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছে দেওয়া - পুরোটার জন্য মোট ৬,৫০০ টাকা নিয়েছে ।
৩. আমরা ছিলাম 'বেলভিউ হোটেল'-এ । বেলভিউ দার্জিলিঙ এর সর্ব্বোত্তম হোটেলগুলোর মধ্যে অন্যতম । এখানকার যে ঘরগুলো মরশুমে ২,০০০ টাকা ভাড়া - সেগুলো আমরা পেয়েছি ১,৪০০ টাকায় । বেলভিউ হোটেলের ওয়েবসাইট http://www.bellevuehotel-darjeeling.com/ এবং ফোনে যোগাযোগ করার উপায় - Tashi Pulger - 9800667148.
৪. দার্জিলিঙ-এর আশেপাশে ঘোরার জন্য অনেকগুলো জায়গা থাকলেও মূলতঃ দেখার জায়গা টাইগার হিল, বাতাসিয়া লুপ, চিড়িয়াখানা আর রোপওয়ে । কোনও কারণেই এরমধ্যে কোনওটা বাদ দেওয়ার মানে হয় না ।
৫. আমার মতে দার্জিলিঙ-এর সবথেকে বড় আকর্ষণ দু'টো - টয়ট্রেন (দার্জিলিঙ-হিমালয়ান রেলওয়ে) আর ম্যাল । (কাঞ্চনজঙ্ঘা লিখলাম না, কারণ কাঞ্চনজঙ্ঘা দার্জিলিঙ ছাড়াও অন্য জায়গা থেকে দেখা যায়) এদের মধ্যে ম্যালে সবসময়েই যাওয়া যায়, কিন্তু সবসময়ে পাওয়া যায় না টয়ট্রেনের দেখা । আমরা সৌভাগ্যবান - আমরা ১৩৩ বছরের প্রাচীন এই ঐতিহ্যে সামিল হতে পেরেছি ।
৬. নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিঙ পর্যন্ত টয়ট্রেনের পরিশেবা বর্তমানে বন্ধ আছে - এখন দার্জিলিঙ থেকে কার্সিয়াং পর্যন্ত ট্রেনে যাওয়া যায় । এছাড়া দার্জিলিঙ-ঘুম-দার্জিলিঙ এ একটা ট্রেন চলে যার নাম জয় ট্রিপ । https://www.irctc.co.in/ থেকে দার্জিলিঙ-হিমালয়ান রেলওয়ের টিকিট কাটা যায় ।
৭. ম্যাল থেকে মিনিটসাতেকের হাঁটা পথে দার্জিলিঙ-এর এক বিখ্যাত রেস্ট্যুরেন্ট কেভেন্টার্স । এখানকার খাবার যে খুব বৈশিষ্ট্যপূর্ণ তা নয় - কেভেন্টার্সে পাওয়া যায় এরকম সব খাবারই অন্যান্য জায়গায় লভ্য । এখানকার মূল আকর্ষণ হল এর ছাদে বসে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে দেখতে খাবার খাওয়া । কেভেন্টার্স ১০০ বছরের পুরোনো দোকান এবং সত্যজিৎ রায়ের একাধিক লেখায় এর উল্লেখ পাওয়া যায় । 'কাঞ্চনজঙ্ঘা' ছবির শ্যুটিং-এর সময়ে এখানে সত্যজিৎ রায় এসেছিলেন - সেই ছবি কেভেন্টার্সের দেওয়ালে টাঙানো রয়েছে ।
৮. দার্জিলিঙ-এ দুপুরের বা রাতের খাওয়ার জন্য অনেক ছোটোখাটো হোটেল আছে, কিন্তু সবথেকে ভালো রেস্ট্যুরেন্ট হল - গ্লেনারিজ । ম্যাল থেকে মিনিট পাঁচেকের হাঁটা দূরত্বে এই রেস্ট্যুরেন্টের খাবার নিঃসন্দেহে খুব ভালো কিন্তু যেটা একেবারেই সন্তোষজনক নয় সেটা হল এদের পরিশেবা । এরা অর্ডার নিতে দেরি করে - আর সেই দেরি করার প্রথাটা বজায় রাখে একেবারে বিল দেওয়া পর্যন্ত ! মাঝখানের কথা আর নাই বা উল্লেখ করলাম ।

উপসংহারঃ

টয়ট্রেন থেকে দার্জিলিঙ শহর
বাংলার তথা ভারতের সবচেয়ে পুরনো শৈলশহরগুলো মধ্যে দার্জিলিঙ বিশেষ উল্লেখযোগ্য । দু'শো বছরের শাসনকালের মধ্যে ইংরেজরা ভারতে অনেক ভালো কাজও করেছিল - তাদের মধ্যে একটা হল এই পর্যটনকেন্দ্রটি নির্মাণ করা । ম্যাল অক্সফোর্ড টয়ট্রেন কেভেন্টার্স কাঞ্চনজঙ্ঘা - এইসব মিলিয়ে দার্জিলিঙের ঐতিহ্যগত গুরুত্ব অপরিসীম । দার্জিলিঙে যেতে হলে মরশুমে না যাওয়াই ভাল, তাতে অবাঞ্ছিত ভীড়ের কবলে পড়তে হয় না । পর্যটকের ভীড়, দোকানদারদের ডাকাডাকি, হোটেলওয়ালা আর গাড়িওয়ালাদের হাত ধরে টানাটানি সহ্য করার সহিষ্ণুতা যদি না থাকে তাহলে তাহলে ডিসেম্বর-জানুয়ারী হল দার্জিলিঙ যাওয়ার পক্ষে সবচেয়ে উপযোগী সময় । যদি আয়েস করা উদ্দেশ্য হয় তাহলে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাত হাজার ফুটেরও বেশি ওপরে এই প্রাচীন শহরটি সেই উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য অনবদ্য ভূমিকা পালন করবে - বিশ্বাস রাখি !

দার্জিলিঙ ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.