আমি ব্লগ লেখার খুব বেশি সমর্থক কোনওদিনও ছিলাম না, সত্যি কথা বলতে কি এখনও যে আছি তা নয় । তার একটা প্রধান কারণ আমার ধারণা ব্লগ লেখার থেকেও পড়া অনেক বেশি ক্লান্তিকর । অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অনেক সময়ই পড়তে শুরু করে শেষ করা হয়ে ওঠে না । নিজের ধৈর্য এবং/অথবা আগ্রহের অভাবকে 'ঠিক আছে, বাকিটা পরে পড়ব' জাতীয় অজুহাত দিয়ে ঢেকে দিই - আর আমরা সবাই জানি সেই 'পরে' টা আর কখনওই আসে না । তো, এই কারণে আমি ঠিক করেছি আমার ব্লগকে কখনওই অন্যের ক্লান্তির কারণ ঘটাব না, আমার ব্লগের বিষয় হবে প্রধানতঃ ভ্রমণ । আমার মতো যেসব বাঙালিরা ঘুরতে ভালোবাসে, তাদের জন্য আমার ব্লগ হবে তথ্যের একটা উৎস । আমার নিজের একটা অভ্যেস আছে, কোনও জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার আগে সেই জায়গাটা সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, আর ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে আমার বরাবরই মনে হয়েছে যে ইন্টারনেটে লেখালেখি করার ব্যাপারে বাঙালিদের থেকে কুঁড়ে খুব কম শিক্ষিত জাতই আছে । আমার মতো যেসব বাঙালিরা আছে, যারা ইন্টারনেটে কোনো একটা ইংরিজীতে লেখা দেখলেই না পড়ার চেষ্টা করে, তাদের জন্য আমার ব্লগ সহায়ক হবে, এই বিশ্বাস নিয়ে শুরু করছি আমার ভ্রমণকাহিনী । আগেই বলে রাখি, আমি স্ট্যাটিসটিক্সের ছাত্র ছিলাম, তাই আমার ব্লগে তত্ত্বের থেকে তথ্যের দেখাই মিলবে বেশি ।

Sunday, October 15, 2017

মধ্যপ্রদেশ ভ্রমণ

ভ্রমণপথঃ

শুক্রবার ৬ই অক্টোবর, ২০১৭ঃ হাওড়া - রাত ১০ টায় হাওড়া মুম্বই মেল (ভায়া এলাহাবাদ)
শনিবার ৭ই অক্টোবর, ২০১৭ঃ সন্ধ্যে ৬ঃ৪৫ মিনিট - জব্বলপুর - জব্বলপুরে রাত্রিবাস
রবিবার ৮ই অক্টোবর, ২০১৭ঃ জব্বলপুর - ভেদঘাট - রাত ১১ঃ৫৫ মিনিটে জব্বলপুর ইন্দোর এক্সপ্রেস
সোমবার ৯ই অক্টোবর, ২০১৭ঃ সকাল ৫ঃ৫০ মিনিট - ভোপাল - সাঁচি - ভোপালে রাত্রিবাস
মঙ্গলবার ১০ই অক্টোবর, ২০১৭ঃ ভোপাল - ভীমবেঠকা - ভোজপুর - ভোপালে রাত্রিবাস
বুধবার ১১ই অক্টোবর, ২০১৭ঃ ভোপাল - সকাল ৮ঃ৩৫ মিনিটের সোমনাথ জব্বলপুর এক্সপ্রেস - দুপুর ১২ঃ১০ মিনিটে পিপারিয়া - পাঁচমারি - পাঁচমারিতে রাত্রিবাস
বৃহস্পতিবার ১২ই অক্টোবর, ২০১৭ঃ পাঁচমারি সাইট সিয়িং - পাঁচমারিতে রাত্রিবাস
শুক্রবার ১৩ই অক্টোবর, ২০১৭ঃ পাঁচমারি সাইট সিয়িং - পাঁচমারিতে রাত্রিবাস
শনিবার ১৪ই অক্টোবর, ২০১৭ঃ পাঁচমারি - পিপারিয়া - দুপুর ১২ঃ১৫ মিনিটের মুম্বই হাওড়া মেল (ভায়া এলাহাবাদ)
রবিবার ১৫ই অক্টোবর, ২০১৭ঃ বিকেল ৫ টা - হাওড়া

মধ্যপ্রদেশ জায়গাটা আমার খুবই প্রিয় । আগে শুধু নিজের শরীরেরটা ছিল, এবার তার সঙ্গে দেশেরটাও যোগ হল । ঠিক কিভাবে হল, সেটা আশা করি পুরো লেখাটা পড়লে জানা যাবে তবে আপাতত বলে রাখি লেখার শিরোনাম 'মধ্যপ্রদেশ ভ্রমণ' হলেও এটা স্পষ্ট যে সম্পূর্ণ রাজ্যটা ঘুরে ফেলা আমাদের এই ছোট পরিসরে সম্ভব নয় । তাই শুধুমাত্র ওপরের ভ্রমণপথে উল্লিখিত জায়গায় ঘোরাঘুরির বিস্তারিত বিবরণই আমার ব্লগের এবারের বিষয়বস্তু ।

জব্বলপুর ভ্রমণঃ

আমার ব্লগের প্রথা ভেঙে প্রথমেই একটা 'সমস্যা'র কথা লিখি । জব্বলপুর তথা মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার একটা অসুবিধে হল হাওড়া থেকে রেলযোগাযোগ খুব কম । হাওড়া থেকে জব্বলপুরে মাত্র দু'টো ট্রেন যায় আর তাদের মধ্যে মুম্বই মেল (ভায়া এলাহাবাদ) এর সময়সূচীটাই সুবিধেজনক । শুক্রবার ৬ই অক্টোবর, ২০১৭ রাত ১০ টায় এই ট্রেনে আমাদের যাত্রা শুরু হল । এবারে আমাদের দলের সদস্য আমি, অমৃতা, বাবা, মা, কথা, কলি, কঙ্কনাদি, অমিতদা, মিঙ্কা (কারোর পরিচয়ই আর আলাদা করে দিচ্ছি না, কারণ আমার ব্লগের নিয়মিত পাঠকরা এতদিনে সবাইকেই চিনে গেছে বলে আমার বিশ্বাস) । আমরা এ সি থ্রি টীয়ারের টিকিট পাইনি তাই স্লীপারে যেতেই বাধ্য হয়েছিলাম ।

যত দিন যাচ্ছে, ট্রেনের স্লীপারক্লাসে যাতায়াত করা যে কতটা দুঃসাধ্য হয়ে যাচ্ছে, সেটা যাঁরা যাতায়াত করেন তাঁরা জানেন । একটা স্লীপারক্লাসের কামরায় রিজার্ভ করা লোকের থেকে উটকো লোক থাকে বেশি । এদের কারোরই রিজার্ভ কামরায় ওঠার বৈধ টিকিট নেই, টিকিট পরীক্ষককে ঘুষ দিয়ে এরা অনায়াসে সীটে এসে বসে থাকে বা রাত্রে দু'টো লোয়ার বার্থের মাঝখানে শুয়ে থাকে । এদেরকে কিছু বলেও কোনও লাভ হয়না, টি টি কে বলে তো আরওই কিছু হয় না -কারণটা সহজেই অনুমেয় ।

পরেরদিন শনিবার ৭ই অক্টোবর, ২০১৭ - দিনের বেলাটা পুরোটাই ট্রেনে । দুপুরে রেলের খাবার নেওয়া হল । এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে রেলের খাবারের মান আগের থেকে উন্নত হয়েছে । খুব ভালো কিছু হয়েছে এটা বলব না, তবে আগে যেরকম পুরো খাবারটা খাওয়াই যেত না, এখন অন্তত সেটা হয় না । চিকেন মিল, এগ মিল মিলিয়ে আমাদের খরচ পড়ল ৫০০/- টাকা ।

ট্রেনের নাম মুম্বই মেল ভায়া এলাহাবাদ হলেও এর রুট পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে, তাই ট্রেনটা এখন আর এলাহাবাদ যায় না । এই ট্রেনটা লেট করে চলার জন্য কুখ্যাত যদিও মাত্র একঘন্টা লেট করে আমাদের জব্বলপুর পৌঁছে দিল সন্ধ্যে ৬ঃ৪৫ মিনিটে ।

জব্বলপুর স্টেশনের একটা ব্যাপার চোখে পড়ার মতো - সেটা হল এর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা । প্ল্যাটফর্মে বা স্টেশন চত্বরে কোথাও একটা কাগজ বা প্ল্যাস্টিকের টুকরোও পড়ে নেই । কেউ কোথাও পানের পিক বা সিগারেটের টুকরো ফেলে না । 'স্টেশন নোংরা করলে জরিমানা হবে' এরকম লেখা বোর্ড কিছুদূর অন্তরই রয়েছে কিন্তু শুধুমাত্র আইন করে বা জরিমানার ভয় দেখিয়ে এসব বন্ধ করা যায় না । এগুলো আসে মানুষের নিজস্ব সচেতনতা সেইসঙ্গে মানবিকতা থেকে আর সেটা যে স্টেশন ব্যবহারকারীদের আছে, তার প্রমাণ সর্বত্র ।

জব্বলপুর স্টেশন
জব্বলপুরে আমরা কোনও হোটেল বুকিং করিনি, তার বদলে আমাদের বুকিং ছিল রেলওয়ে রিটায়ারিং রুমে । এর আগে শিলং ভ্রমণ-এর সময়ে গুয়াহাটী স্টেশনে আমরা ছিলাম রিটায়ারিং রুমে । জব্বলপুরে আমরা তিনটে ডাবল্‌ বেড ঘর বুক করেছিলাম । এখানে আমাদের মেয়াদ ঠিক একদিন আর ট্রেনের একটা পি এন আর এর জন্য সর্বোচ্চ ৪৮ ঘন্টা পর্যন্ত্য রিটায়ারিং রুম বুক করা যায় । রেলের রিটায়ারিং রুমের ভাড়া হোটেলের তুলনায় অনেক কম আর গুয়াহাটীর মতো এখানেও ঘরগুলো যথেষ্ট বড় এবং অন্যান্য ব্যবস্থাও বেশ ভালো । আমরা ঘরে চেক্‌ইন করে মালপত্র রেখে একটু ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম । পরেরদিন আমাদের জব্বলপুর ঘোরার আছে, তাই গাড়ি বুক করার দরকার ছিল । স্টেশনে থাকার অনেকগুলো সুবিধের মধ্যে একটা হল বাইরে বেরোলেই গাড়ির স্ট্যান্ড । একটা এ সি (এখানে নন এ সি গাড়ি পাওয়া যায় না) ইনোভা গাড়ি ঠিক করা হল যে আমাদের জব্বলপুরের সাইট সিয়িং করাবে । গাড়ির ভাড়া ৩,০০০/- টাকা ।

আমরা স্টেশন চত্বরটা আরেকটু ঘোরাঘুরি করে আবার ঘরে চলে এলাম । রাত সাড়ে ন'টার সময়ে খেতে বেরোলাম । জব্বলপুর স্টেশনের একটা সমস্যা হল এখানে আমিষ খাবারের দোকান খুব কম । আমরা ছিলাম ১ নং প্ল্যাটফর্মে, খুঁজেপেতে ৬ নং প্ল্যাটফর্মে একটা দোকান পাওয়া গেল । সেখানে রুটি চিকেন ডিম মিলিয়ে খাওয়া হল - খরচ হল ৩৩৯/- টাকা ।

রানি দুর্গাবতী ফোর্ট
রবিবার ৮ই অক্টোবর, ২০১৭ আমাদের জব্বলপুর ঘোরার দিন । স্টেশনের একটা দোকান থেকে আলুর পরোটা দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়লাম । আমাদের প্রথম দেখার জায়গা 'রানি দুর্গাবতী ফোর্ট' যার অন্য নাম 'মদনমহল' । এটা স্টেশন থেকে ৭.৫ কিলোমিটার দূরে । এখানে একটা পাহাড়ের ওপরে একটা ছোট দূর্গ রয়েছে । পাহাড়ে ওঠার জন্য বেশ অনেকগুলো সিঁড়ি ভাঙতে হয়, যদিও সেগুলো একটানা না হওয়ায় ব্যাপারটা খুব ক্লান্তিকর নয় । জায়গায় জায়গায় গাছের ছায়া আছে, আমরা মাঝে মাঝেই সেখানে দাঁড়িয়ে নিচ্ছিলাম । তবে পরিশ্রম করে পাহাড়ে ওঠার পরে দেখলাম সেটা করাটা খুবই সার্থক । দূর্গটা খুবই ছোট, কিন্তু বেশ সুন্দর । দূর্গের ভেতরে ঢুকে একেবারে ছাদ পর্যন্ত্য উঠে যাওয়া যায় । ছাদ থেকে জব্বলপুর শহরের অনেকটা দেখা যায় । রোদের তেজ খুব কড়া ছিল না আর একটা হাল্কা হাওয়া সারাক্ষণই বইছিল । ফলে দূর্গের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকতে ভালোই লাগছিল । আমরা আরও কিছুক্ষণ থেকে তারপর নেমে এলাম । বলা বাহুল্য - প্রথমে দূর্গ থেকে আর তারপরে পাহাড় থেকে ।

ব্যালেন্সিং রক
রানি দুর্গাবতী ফোর্টের একেবারে পাশেই যেটা রয়েছে তার নাম 'ব্যালেন্সিং রক্‌' । এটা বেশ অদ্ভুত ধরনের একটা জিনিস । একটা পাথরের ওপর আরেকটা পাথর এমনভাবে ব্যালেন্স করে রয়েছে যে দেখে মনে হয় এক্ষুণি পড়ে যাবে । দুটো পাথর একটা খুব ছোট্ট জায়গায় পরস্পরকে স্পর্শ করে আছে আর বাকিটা পুরোপুরি ব্যালেন্স করা রয়েছে - সেই থেকেই এর নাম ব্যালেন্সিং রক । পাথরদুটো দেখে একটা কথাই মনে হয় "আচ্ছা, যদি ওপরেরটাকে একটা ঠেলা দেওয়া যায়, তাহলে কি হবে ?" উত্তর হল ঠেলার জায়গায় ধাক্কা দিলেও কিছুই হবে না, কারণ ওই পাথরকে হাত দিয়ে ঠেলে সরানো মানুষের কম্ম নয় !

পিষানহরি কি মদিয়া
এরপর আমরা গেলাম 'পিষানহরি কি মদিয়া' । এটা একটা জৈন মন্দির । এখানে একটা পাহাড় আছে আর পাহাড়ের ওপরে বেশ কয়েকটা মন্দির । ওঠার কোনও অসুবিধে নেই, কারণ পুরোটা জুড়েই নিচু নিচু সিঁড়ি করা আছে । তবে সিঁড়ির সংখ্যা নেহাৎ কম নয়, প্রায় তিনশোর কাছাকাছি । তাই যারা ওপরে উঠতে চায় না তাদের জন্য নিচেও একটা মন্দির আছে আর সেটাও বেশ সুন্দর । ওপরের মন্দিরগুলোও বেশ সুন্দর আর পুরো চত্বরটা অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন । আমরা কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে ছবি তুলে ফিরে এসে এগিয়ে গেলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ।

এরপর জব্বলপুরের প্রধান আকর্ষণ - ভেদঘাটে মার্বেল রক্‌ এবং ধুঁয়াধার ফল্‌স্‌ । পুরোটাই নর্মদা নদীর গতিপথ । এখানে একটা কথা বলে রাখি এই দুটো জায়গা মোটামুটি একই জায়গায় হলেও একটা থেকে অন্যটা এতটাও কাছে নয় যে হেঁটে যাওয়া যায় । আর দুটো জায়গাই দেখতে বেশ ভালোই সময় লাগে । তাই ভেদঘাট ভালোভাবে দেখতে গেলে হাতে অন্ততঃ ঘন্টাচারেক সময় নিয়ে যাওয়া দরকার ।

ভেদঘাটে আমাদের গাড়ি প্রথমে আমাদের নিয়ে গেল ধুঁয়াধার ফল্‌স্‌ এর কাছে । এখানে গাড়ির পার্কিং এর জায়গার পাশে অনেক ভাতের হোটেল আছে । একটা সমস্যা হল এই হোটেলগুলোর সবগুলোই নিরামিষ - এই এলাকায় কোনও আমিষ খাবার পাওয়া যায় না । এরকম একটা হোটেল থেকে লাঞ্চ করে নেওয়া হল । আগেও দেখেছি নিরামিষের সর্বোৎকৃষ্ট খাবার হল পনীর, তাই এই পনীরেরই গোটা তিনেক আলাদা আলাদা ডিশ নেওয়া হল । খাবারের মান অবশ্য মোটেই খারাপ নয়, বলতে গেলে ভালোর দিকেই (মানে নিরামিষ যতটা ভালো রান্না করা যায় আর কি !) । সবমিলিয়ে খরচ হল ১,০৩০/- টাকা ।

ধুঁয়াধার ফল্‌স্‌
এরপর আমরা জলপ্রপাতের দিকে রওনা দিলাম । পার্কিং-এর জায়গা থেকে হেঁটে পৌঁছতে মিনিট দশেক লাগে । জব্বলপুরের অন্য জায়গায় সেরকম ট্যুরিস্টের ভীড় না দেখা গেলেও এখানে দেখলাম ভালোই ভীড় রয়েছে । মূল ফল্‌সের কাছে রেলিং এর মতো করা রয়েছে, সেখানে প্রচুর লোক জমা হয়েছে । দুপুর প্রায় তিনটে বাজে আর রোদের তেজও ভালো, তাই আমরা ভীড়ের মধ্যে না গিয়ে রোপওয়ের দিকে রওনা দিলাম । যাওয়া ও আসা একত্রে টিকিটের দাম মাথাপিছু ৯৫/- টাকা (তিন বৎসরের উর্ধ্বে পুরা ভাড়া লাগিবে) । টিকিট কেটে আমরা রোপওয়েতে চড়ে বসলাম । রোপওয়ে আসলে নর্মদা নদীটাকে পার করে দেয় আর ওপর থেকে পুরোটা দেখতেও খুব সুন্দর লাগে । যাওয়া আর ফেরা মিলিয়ে বড়জোর দশমিনিট তবে ওপারে পৌঁছে চাইলে এদিক ওদিক ঘুরেও আসা যায় । আমরা ওপারে পৌঁছে হেঁটে হেঁটে জলের যতটা কাছে যাওয়া সম্ভব গেলাম । ধুঁয়াধার ফল্‌সের নাম ধুঁয়াধার হওয়ার কারণ হল এখানে মূল জলপ্রপাতের জলটা এত জোরে পড়ে যে জায়গাটা ধোঁওয়ার মতো হয়ে যায় । কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি আমরা সেরকম কিছু দেখলাম না । নর্মদার জলের তেজ খুব একটা বেশি নয়, জায়গায় জায়গায় পাথরের মধ্যে দিয়ে জল বয়ে চলেছে । এর প্রধান কারণ হল অপর্য্যাপ্ত বৃষ্টিপাত । এ'বছর মধ্যপ্রদেশে বৃষ্টি খুব কম হয়েছে, তাই নদীতে জলের পরিমাণও কম । আমরা ধুঁয়াবিহীন ধুঁয়াধার ফল্‌স্‌ দেখে আবার রোপওয়ে ধরে ফিরে এলাম ।

পার্কিং-এ পৌঁছে গাড়ি ধরে এবার আমরা গেলাম মার্বেল রক দেখতে । গাড়ি যেখানে নামাবে এখানেও সেখান থেকে হেঁটে কিছুটা নামতে হয় । মার্বেল রক্‌ দেখতে গেলে বোটিং করতেই হবে । তবে বোটিংটা সারা বছর চলে না । বর্ষার শেষে যখন নদীতে জলের পরিমাণ বাড়ে তখনই এটা চালু হয় । আমাদের সৌভাগ্য এ'বছর এটা চালু হয়েছে ১লা অক্টোবর থেকে । আধঘন্টায় মাথাপিছু ৫০/- টাকা করে টিকিট কেটে এখানে বোটিং করা যায় আর একঘন্টার জন্য ১০০/- টাকা । তবে সেক্ষেত্রে অন্য লোকের সঙ্গে বোট শেয়ার করতে হবে । আমরা ৮০০/- টাকা দিয়ে একটা বোট ভাড়া করে তাতে চড়ে বসলাম ।

মার্বেলরকে বোটিং করাকালীন
মার্বেল রক্‌- এ বোটিং-টা এখানকার সবথেকে বড় আকর্ষণ । বিভিন্ন ধরনের বিভিন্ন রঙের অনুচ্চ পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে নর্মদা নদী আর তার ওপর দিয়ে আমরা চলেছি দাঁড় টানা নৌকোয় করে । নৌকোর যিনি হালধারী তিনি আবার গাইডও, যেতে যেতে আমাদের নামারকম তথ্য দিচ্ছিলেন । প্রকৃতির নিয়মে কোনও কোনও পাহাড় বিশেষ বিশেষ আকৃতি নিয়েছে, সেগুলোও আমাদের দেখালেন । বিকেল সাড়ে চারটে বাজে, রোদের তেজ কমে এসেছে - মার্বেল রকে বোটিং-এর জন্য এটা একেবারে আদর্শ সময় । জলটা যে খুব পরিষ্কার তা নয় আর সেটা কোনও প্রাকৃতিক কারণে নয় - এর কারণ পর্যটকদের রুচি । যাইহোক, আমরা প্রায় আধঘন্টা চলার পরে একটা সরু খাঁড়ির মতো জায়গায় পৌঁছলাম । এখানে দুপাশে অনেকটা উঁচু পর্যন্ত্য মার্বেল পাথর উঠে গেছে (আমাদের গাইড জানাল 'মহেঞ্জোদারো' ছবিতে হৃতিক রোশন কর্তৃক বিশালাকার কুমীর হত্যার দৃশ্যটা এখানেই শ্যুটিং হয়েছিল) । এখান থেকে আমাদের নৌকো ফেরার পথ ধরল । যাওয়া এবং ফেরা - পুরোটাই আমাদের খুব ভালো লাগল । সবাইকে অবশ্যই বলব জব্বলপুরে গিয়ে মার্বেল রক্‌ দেখার পরিকল্পনা থাকলে অবশ্যই এরকম সময়ে যাওয়া উচিৎ যখন বোটিং চালু আছে । তা না হলে দেখার বারো আনা মজাই মাটি ! মার্বেল রকের মধ্যে দিয়ে নৌবিহার - এটা নিঃসন্দেহে একটা অসাধারণ অভিজ্ঞতা !

কচনার সিটির শিবের মূর্তি
বিকেল হয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেল, আমরা ফেরার পথ ধরলাম । এবার আমাদের নিয়ে যাওয়া হল 'কচনার সিটি' । জায়গাটা আসলে একটা রিসর্ট গোছের তবে এখানে ট্যুরিস্টদের আকর্ষণ হল এখানকার শিবের মন্দির । মন্দিরের ওপরে একটা বিশালাকার শিবের মূর্তি আছে যার উচ্চতা ৭৬ ফুট । জায়গাটা রাত ন'টা পর্যন্ত্য খোলা থাকে, আর অন্ধকার হয়ে গেলে খুব সুন্দর আলো দিয়ে সাজায় । বিশেষ করে শিবের মূর্তির দিকে কয়েকটা আলো ফোকাস করা আছে যেগুলোর রঙ প্রতিমূহুর্তে বদলায় । ব্যাপারটার মধ্যে বেশ একটা ঘ্যাম আছে । এখানে যেটা বিশেষ উল্লেখযোগ্য সেটা হল শিবের মূর্তির পারিপাট্য । শিবের মুখে একটা স্নিগ্ধভাব আর শরীরটা সেরকমই নিখুঁতভাবে তৈরি । দেখে শিবের প্রতি ভক্তি জাগে কিনা জানিনা, তবে কারিগর বা কারিগরদের প্রতি যে একটা শ্রদ্ধা তৈরি হয় সেটা স্বীকার করতেই হবে ।

কচনার সিটি থেকে জব্বলপুর রেল স্টেশন ৭.৫ কিলোমিটার, আমাদের পৌঁছতে আধঘন্টা মতো লাগল । রাত পৌনে আটটা মতো বাজে । আমরা চা-টা খেয়ে নিয়ে ঘরে এসে জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলাম । আমাদের জব্বলপুর ঘোরা শেষ, আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ভোপাল । রাত সাড়ে ন'টা নাগাদ স্টেশনের সেই একমাত্র আমিষ হোটেল থেকে ডিনার করে নেওয়া হল । মেনু সেই একই রুটি চিকেন আর ডিম । এরপর ঘরে ফিরে ট্রেনের সময় হওয়ার জন্য অপেক্ষা কারণ স্টেশন পর্যন্ত্য পৌঁছনোর ঝক্কিটা আমাদের নেই ।

সারসংক্ষেপঃ

১. হাওড়া থেকে জব্বলপুর যাওয়ার মাত্র দু'টো ট্রেন আছে, তাদের মধ্যে মুম্বই মেল (ভায়া এলাহাবাদ) ই সময়ের দিক থেকে সুবিধেজনক । এই ট্রেনের দেরি করার জন্য খ্যাতি আছে, যদিও আমরা মাত্র একঘন্টা লেটেই জব্বলপুরে পৌঁছেছিলাম ।
২. জব্বলপুরে আমরা যেহেতু রেলের রিটায়ারিং রুমে ছিলাম, তাই কোনও হোটেলের সম্পর্কে বলা সম্ভব হবে না । রিটায়ারিং রুমগুলো বেশ বড় এবং সবরকম সুবিধেসম্পন্ন ।
৩. জব্বলপুর স্টেশন চত্বরের খাবারের দোকান বেশিরভাগই নিরামিষ । ৬ নং প্ল্যাটফর্মে একটা খাবারের হোটেল আছে সেখানে আমিষ পাওয়া যায় ।
৪. জব্বলপুর ঘোরাঘুরির জন্য গাড়ি স্টেশনের বাইরের গাড়ির স্ট্যান্ডেই পাওয়া যায় । সারাদিনের জন্য এ সি গাড়ি ৩,০০০/- টাকা নেয় ।
৫. যেহেতু ঘোরাঘুরির জায়গা কোনওটাই খুব বেশি দূরে নয়, তাই চাইলে এখানে অটোরিক্সা করেও ঘোরাঘুরি করা যেতে পারে । একটা অটোয় সর্ব্বোচ্চ পাঁচজন যেতে পারে ।
৬. জব্বলপুরে ঘোরার জায়গা যা আছে তার জন্য একটা গোটা দিনই যথেষ্ট । ইন্টারনেটে সার্চ করলে এখানে ঘোরার অনেক জায়গা দেখা যায় ঠিকই, কিন্তু তার মধ্যে অনেকগুলোই খুব দারুণ কিছু নয় ।
৭. জব্বলপুরের সবথেকে বিখ্যাত এবং সুন্দর জায়গা হল ভেদঘাটে ধুঁয়াধার ফল্‌স্‌ ও মার্বেল রক্‌ । ভালোভাবে দেখার জন্য হাতে অন্ততঃ ঘন্টাচারেক সময় নিয়ে এখানে যাওয়া উচিৎ ।
৮. ভেদঘাটে মার্বেল রক্‌ দেখতে গেলে বোটিং করা অবশ্য কর্তব্য । বোটিং সারা বছর হয় না, তাই জব্বলপুর যেতে গেলে ভালোভাবে জেনে যাওয়ার দরকার কোন সময়ে বোটিং হয় ।
৯. ধুঁয়াধার ফল্‌স্‌ এখানকার অন্যতম আকর্ষণ । তবে এ'বছর বৃষ্টি কম হওয়ায় আমরা এই জলপ্রপাতের জোর সেভাবে দেখতে পাইনি ।

ভোপাল ভ্রমণঃ

জব্বলপুর থেকে ভোপালের ট্রেন রাত ১১ঃ৫৫ মিনিটে জব্বলপুর ইন্দোর এক্সপ্রেস । আমরা সাড়ে এগারোটা নাগাদ জব্বলপুরের রিটায়ারিং রুম থেকে চেক্‌আউট করে বেরিয়ে পড়লাম । ৬ নং প্ল্যাটফর্মে ট্রেন অনেকক্ষণ আগে থেকেই এসে দাঁড়িয়ে ছিল, আমরা উঠেই শুয়ে পড়লাম । ট্রেন নির্ধারিত সময়ে ছেড়ে এগিয়ে চলল গন্তব্যের দিকে । এখানে জানানো দরকার জব্বলপুর বা ভোপালের তাপমাত্রা কলকাতার মতোই হলেও রাত্রিবেলা যখন ট্রেন ভোপালের দিকে যাচ্ছিল, তখন একটু শীত শীত করছিল ।

পরেরদিন সোমবার ৯ই অক্টোবর, ২০১৭ জব্বলপুর ইন্দোর এক্সপ্রেসের ভোপালে পোঁছনোর কথা সকাল ৫ঃ৫০ মিনিটে । ট্রেন মাত্র মিনিট দশেক দেরিতে আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিল । জব্বলপুরের মতো ভোপালেও আমরা রেলের রিটায়ারিং রুমই বুক করেছিলাম । পার্থক্য হল এখানে আমরা আলাদা ঘর না নিয়ে একটা ডরমেটরি বুক করেছিলাম । ডরমেটরিটাতে সাতজনের বিছানা আছে, কিন্তু আমাদের যাত্রী ছ'জন । সেক্ষেত্রে এই সাতটা বিছানাই যাতে আমাদের থাকে অর্থাৎ এই ডরমেটরিটা যাতে শুধু আমরাই ব্যবহার করতে পারি, সেজন্য আমরা একটা দারুণ ব্যবস্থা করেছিলাম (কিভাবে করেছিলাম তার ডিটেলটা এখানে লিখব না । কারোর দরকার হলে আমাদের থেকে জেনে নিতে পারে) । কিন্তু আমাদের বুকিং সকাল ৮ টা থেকে ছিল আর খোঁজ নিয়ে জানা গেল সকাল ৮ টার আগে ডরমেটরিটা ফাঁকা হবে না । তাই মাঝখানের সময়টা স্টেশনে বসে কাটানো ছাড়া উপায় নেই । এই সময়ে আমরা যেটা করে ফেললাম সেটা হল ঘোরাঘুরির জন্য গাড়ি ঠিক করা । একটা গাড়ি ঠিক করা হল যেটা প্রথমদিন আমাদের নিয়ে যাবে 'সাঁচী' আর পরেরদিন 'ভীমবেঠকা' ও 'ভোজপুর' । এছাড়া ভোপালের অন্যান্য কাছাকাছি ঘোরার জায়গাগুলোও দেখাবে । দু'দিনের জন্য গাড়ি নেবে মোট ৪,৫০০/- টাকা ।

৮ টার সময়ে আমরা ঘরে ঢুকলাম । ডরমেটরিটা সবমিলিয়ে খারাপ নয়, একটা অসুবিধে হল ঘরে ফ্যানের সংখ্যা পর্য্যাপ্ত নয় । এছাড়া আরেকটা বড় অসুবিধে হল দুটো টয়লেটের দুটোই ভারতীয় পদ্ধতির অর্থাৎ ... । যাই হোক, রিটায়ারিং রুমের কোনওকিছু নিয়ে অভিযোগ করার মানে হয় না । একটা ভালো ব্যাপার হল এই প্রথমবার আমাদের দলের সবাই একটা ঘরে থাকার সুযোগ পেলাম ।

দুপুর একটা নাগাদ আমরা ঘর থেকে বেরিয়ে লাঞ্চ করে নিলাম । এখানে IRCTC র রেস্ট্যুরেন্ট আছে, সেখানে আমিষ-নিরামিষ দুইই পাওয়া যায় । আমরা সেখান থেকে এগ থালি, চিকেন থালি ইত্যাদি দিয়ে লাঞ্চ করে নিলাম । খরচ হল ৭০৭/- টাকা ।

কর্কটক্রান্তি রেখা
ভোপালে আমাদের গাড়ি ট্যাভেরা । সেই গাড়ি চড়ে আমরা প্রথমে গেলাম সাঁচিস্তূপ । যাওয়ার পথে একজায়গায় আমাদের গাড়ি থামল, দেখি সেখানে রাস্তার মধ্যে একটা হলুদ দাগ করা রয়েছে । রাস্তার দু'পাশে একটা করে ছোট বসার জায়গা করা রয়েছে আর সেখানেই লেখা রয়েছে ওই দাগের অর্থ । ওই দাগ হল 'কর্কটক্রান্তি রেখা', ইংরিজীতে যাকে বলে Tropic of Cancer । এটা তেমন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কিছু না হলেও মধ্যপ্রদেশ সরকারের এই নতুনত্বপূর্ণ ভাবনার প্রশংসা না করে পারলাম না । কর্কটক্রান্তি রেখা তো ভারতবর্ষের অনেক জায়গার ওপর দিয়েই গেছে, আমাদের পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়েও গেছে । কিন্তু এরকম রাস্তার ওপর দাগ কেটে সেটা উল্লেখ করার উদ্যোগ আর কোথাও দেখিনি বা শুনিনি । কিছু কিছু জিনিস খুব কম বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হয়েও শুধুমাত্র তার অভিনবত্বের জন্য প্রশংসার দাবী রাখে । ভোপাল থেকে সাঁচি যাওয়ার পথে কর্কটক্রান্তি রেখার এই দাগটা এরকমই একটা জিনিস ।

ভোপাল থেকে সাঁচির দূরত্ব প্রায় ৫০ কিলোমিটার, তবে রাস্তা খুব ভালো হওয়ায় যেতে একঘন্টা পনেরো মিনিটের মতো লাগে । সাঁচি-র টিকিট মাথাপিছু ৩০/- টাকা আর গাড়ির পার্কিং ২০/- টাকা । আমরা সাঁচিতে পোঁছনোমাত্রই হঠাৎ প্রচন্ড বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল । বৃষ্টি চলল প্রায় আধঘন্টা ধরে আর এই সময়টা আমাদের একটা ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে কাটাতে হল । বৃষ্টি থামলে আমরা এগিয়ে গেলাম স্তূপের দিকে ।

সাঁচিস্তূপ
সাঁচিস্তূপ আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ্‌ ইন্ডিয়া রক্ষণাবেক্ষণ করে । এটা আসলে একটা বৌদ্ধস্তূপ । খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে গৌতম বুদ্ধের স্মরণে সম্রাট অশোক এর নির্মাণ শুরু করেন । নিকটবর্তী বিদিশা-র বণিকের মেয়ে 'দেবী'-র সঙ্গে অশোকের বিয়ে এই সাঁচিস্তূপেই হয় । সাঁচি 'দেবী'-র জন্মস্থান হিসেবেও পরিচিত । সম্রাট অশোকের সময়ে এর নির্মাণ হলেও পরবর্তীকালে বিভিন্ন রাজাদের রাজত্বকালে এর নির্মাণে নানারকম জিনিস যোগ করা হয় ।

মূলস্তূপের ওপরে সিঁড়ি দিয়ে ওঠা যায় । এখানে স্তূপ ছাড়াও আরও বেশ কিছু নির্মাণ আছে, তার মধ্যে মন্দির, ছাত্রাবাস, অধ্যয়নের জায়গা এগুলোও দেখলাম । একেবারে সমসাময়িক না হলেও সাঁচির সঙ্গে নালন্দার নির্মাণ ও আকৃতিগত কিছু মিল আছে । এখানকার দক্ষিণদিকের গেটের কাছে একটা অশোকস্তম্ভ ছিল যার গোড়াটা এখনও রয়েছে । ওপরের অংশটা সাঁচির আর্কিওলজিক্যাল মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে ।

স্তূপ নং ২
মূলস্তূপের পশ্চিমদিকে একটা সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাওয়া যায়, এখানে একটা জলাশয় রয়েছে যদিও তাতে জল খুবই কম । এখানে আমরা তিনটে ময়ূর দেখতে পেলাম (না, পেখম তোলা অবস্থায় দেখতে পাইনি) । এই জলাশয়ের পাশ দিয়ে কিছুটা হেঁটে গেলে একটা ছাত্রাবাস দেখা যায় । সেখান থেকে পাহাড়ের ধাপে ধাপে নিচে নামা যায় । মিনিট দশেক নামলে দেখা যাবে ২ নং স্তূপ । সাঁচির মূলস্তূপের আদলে এখানে আরও দু'টো স্তূপ আছে, এটা তাদেরই একটা । পার্থক্য হল এগুলোর কোনওটাই মূলস্তূপের মতো বড় নয় আর এর চারদিকে, গেটে বা অন্যান্য জায়গায় কারুকার্যও কম । এখানে কিছুক্ষণ ঘুরে আমরা ওপরে ফিরে এলাম । স্তূপের পূর্বদিকে কিছুটা হেঁটে গেলে এখানে একটা ভিউপয়েন্ট আছে যেখান থেকে অনেকটা দূর পর্যন্ত্য দেখা যায় ।

পিপল্‌স্‌ মল
বিকেল পৌনে ছ'টা বাজে, আমরা এবার ভোপালে ফেরার জন্য গাড়িতে উঠলাম । একবার বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় আবহাওয়াটা বেশ আরামদায়ক লাগছিল । আমাদের গাড়ি আমাদের নিয়ে এল ভোপালের 'পিপল্‌স্‌ মল'-এ । আপাতভাবে মনে হচ্ছিল "মল-এ আবার যাওয়ার কি আছে, কলকাতায় তো মল-এর কোনও অভাব নেই" কিন্তু গিয়ে বুঝলাম পিপল্‌স্‌ মলের বিশেষত্ব কি । আমরা মল বলতে সাধারণতঃ যা বুঝি, এটা তার থেকে অনেকটাই আলাদা । এখানে ঢোকার পথে দুদিকে দুটো বিশাল আকারের জাহাজ রয়েছে । তার পাশ দিয়ে ঢোকার পুরো রাস্তাটাই ছোটদের জন্য নানারকম ছবি আর ছোট ছোট মডেল পুতুল দিয়ে সাজানো । চত্বরটা সুবিশাল, হেঁটে হেঁটে দেখতে দেখতে ঢুকতে সময় লাগে । ভেতরে যেখানে পৌঁছলাম, সেখানে একটা রেষ্ট্যুরেন্ট । সন্ধ্যে প্রায় সাড়ে সাতটা বাজে আর খিদেও পেয়েছিল, তাই রেষ্ট্যুরেন্টের ভেতরে ঢুকলাম । তবে ঢুকেই নিরাশ হতে হল কারণ এটা একটা নিরামিষ রেষ্ট্যুরেন্ট আর এখানে খাবারের দামও বেশ বেশি । আমরা বাইরে বেরিয়ে এসে ফুচকা আর আইসক্রিম খেয়ে গাড়িতে উঠে স্টেশনে ফিরে এলাম ।

রাত্রিবেলা ডিনার করতে যাওয়া হল দশটা নাগাদ । গিয়ে দেখি আমিষ শেষ, নিরামিষ দিয়েই খেতে হল । সবাই খেল না, আমাদের খরচ পড়ল ৩৩৬/- টাকা ।

মঙ্গলবার ১০ই অক্টোবর, ২০১৭ । আমার জীবনের একটা অন্যতম স্মরণীয় দিন । কারণ - এই দিনে আমি 'ভীমবেঠকা' দেখেছি । আর আমার বিশ্বাস যে যখনই ভীমবেঠকায় যাবে, তার তখনই সেই দিনটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে ।

সকালে আমরা ব্রেকফাস্ট করে বেরোলাম তখন দশটা । ভোপাল থেকে ভীমবেঠকার দূরত্ব ৪৬ কিলোমিটার, অর্থাৎ প্রায় সাঁচির মতোই । তবে এটা সাঁচির একেবারে বিপরীত দিকে । রাস্তাটাও ততটা ভালো নয়, তাই আমাদের যেতে ঘন্টাদেড়েকের বেশি লেগে গেল । ভীমবেঠকা জায়গাটা একটা পাহাড়ের ওপরে এবং ওপর পর্যন্ত্য গাড়ি নিয়ে যেতে হয় । এখানকার ঢোকার টিকিট মাথাপিছু ৫০/- টাকা আর গাড়ির ঢোকার জন্য ২৫০/- । টাকাটা একটু বেশি । কিন্তু ভীমবেঠকা দেখার জন্য এই খরচটা অসংগত নয় ।

ভীমবেঠকা দেখার জন্য তিনটে জিনিস থাকার দরকার - ১) ইতিহাসে আগ্রহ, ২) ঘন্টাখানেক চড়াই-উৎরাইতে হাঁটার মত শরীর ও মনের জোর, ৩) অবাক হতে পারার ক্ষমতা । ভীমবেঠকা-কে UNESCO ২০০৩ সালে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করেছে । বর্তমানে আর্কিওলিজিক্যাল সার্ভে অফ্‌ ইন্ডিয়া এখানে নানারকম পরীক্ষানিরীক্ষা করে যদিও জায়গাটা তারা রক্ষণাবেক্ষণ করে না । আমরা প্রথমেই ৪০০/- টাকা দিয়ে একজন গাইড নিলাম । কারণ ভীমবেঠকার মতো জায়গায় গাইড ছাড়া কিছুই দেখে বোঝা যাবে না বা সব জায়গাগুলো নিজেরা খুঁজে পাওয়াও সহজ হবে না ।

ভীমবেঠকায় গুহামানবদের আঁকা ছবি
গাইড আমাদের দেখাতে দেখাতে নিয়ে চলল । ভীমবেঠকার নাম ভীমবেঠকা হওয়ার কারণ হল পুরাণমতে এখানে মহাভারতের ভীম হিড়িম্বার সঙ্গে বসে বসে প্রেম করত বৈঠক করত । এটা পুরাণের কথা, ইতিহাস স্বভাবতই এটাকে স্বীকার করে না । ইতিহাসের দিক থেকে ভীমবেঠকা যে জন্য সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত সেটা হল এখানে আদিম মানুষের আঁকা ছবি পাওয়া গেছে । এবং এইসব ছবিগুলো ইতিহাসের কোনও একসময়ে আঁকা নয় । বিভিন্ন যুগের বিভিন্ন মানুষের আঁকা ছবি । এখানে সবচেয়ে পুরনো যেসব ছবি পাওয়া গেছে সেগুলো আজ থেকে ১৫,০০০ বছরেরও বেশি আগে আঁকা (আমরা জানি বর্তমানে কার্বন টেস্ট করে যেকোনও পুরনো জিনিসের বয়সের সত্যতা যাচাই করা যায়) । ছবির বিষয়বস্তু কখনও মানুষের জীবনযাত্রা, কখনও তাদের দেখা যুদ্ধ, কখনও তাদের দেখা বিনোদন আবার কখনও তাদের সমবেত শিকার । এইসব ছবির রঙও আলাদা । ভীমবেঠকার ছবিতে প্রধানতঃ চাররকম রঙের ব্যবহার দেখা যায় - সাদা, লাল, হলুদ আর সবুজ । চুন, ফুলের রস, গাছের পাতার রস, মাটি, পাথরের গুঁড়ো এইগুলোই মূলতঃ রঙের উপাদান । এখানকার বৈশিষ্ট্য এটাই যে এতদিন পরেও এইসব ছবির কোনওটা ম্লান হয়নি বা নষ্ট হয়নি । আর তার একটা বড় কারণ হল এইসব ছবিগুলোর বেশিরভাগই রক্‌শেল্টার বা পাথরের ছায়ায় আঁকা । এগুলো এমন জায়গা যে এখানে দিনেরবেলা আলো সবসময়েই থাকে কিন্তু সূর্য্যের কিরণ সরাসরি কখনওই এসে পড়ে না । সেইসঙ্গে পাথরের ছায়ায় হওয়ার জন্য এখানে কখনও বৃষ্টির জলও পড়ে না । ফলে হাজার হাজার বছর ধরে এই ছবিগুলো একইরকম রয়ে গেছে । এখানে প্রায় ৭৫০ এরকম রক্‌শেল্টার আছে আর তার মধ্যে ৫০০ টাতেই কোনও না কোনও ছবি আঁকা রয়েছে ।

পাথুরে কচ্ছপ
এইসব ছবিগুলো থেকেই এখানে আদিম মানুষের বসবাসের প্রমাণ পাওয়া যায় । একেকটা জায়গা আছে যেখানে পাহাড়ের ছায়ায় অনায়াসে তিরিশ চল্লিশজন লোক বসতে পারে । কিছু কিছু জায়গা অপেক্ষাকৃত নিচু, কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে আদিম মানুষের উচ্চতা বর্তমান যুগের মানুষের থেকে কম ছিল তাই এইসব জায়গায় তারা সহজেই ঢুকে গিয়ে বসে থাকতে পারত । বৃষ্টি, শীত আর হিংস্র জন্তুর হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য ভীমবেঠকার কয়েকটা রক্‌শেল্টারের তুলনা নেই । আমাদের গাইড আমাদের একটা পাথর দেখাল - এটার নাম টরটয়েজ রক্‌ । এটা একটা বেশ বড় সাইজের পাথর এবং এর আকৃতি একটা অতিকায় কচ্ছপের মতো । এছাড়া একটা 'টাইগার জ' রক আছে, যেটা একটা বাঘের মুখের মতো দেখতে ।

অসহায় মানুষের ছবি
গাইড আমাদের কয়েকজনকে একটা বিশেষ জায়গায় নিয়ে গেল । এটা সবাইকে যেতে বারণ করল কারণ পাহাড়ি পথে মিনিটদশেক উৎরাইতে নামতে হবে আর ফেরার পথে সেটা চড়াইতে উঠতেও হবে । ব্যাপারটা কিছুটা পরিশ্রমসাধ্য সেটা অস্বীকার করব না । সেখানে নেমে গিয়ে একটা বিশেষ ছবি দেখাল যেরকম ছবি ভীমবেঠকায় আর নেই । লাল রঙ দিয়ে আঁকা একটা ছবি তাতে একটা বন্য শূয়োর একজন মানুষকে মারছে । এই ছবির তাৎপর্য হল এটা যে সময়ে আঁকা, তখন মানুষ ছিল একা এবং তারা কোনও অস্ত্রের ব্যবহার জানত না । বন্য হিংস্র জানোয়ারের সামনে তারা ছিল অসহায় । এর পরবর্তীকালে মানুষ দলবেঁধে অস্ত্র দিয়ে জানোয়ারদের শিকার করেছে, অন্যান্য জায়গায় তার ছবি এঁকেছে । কিন্তু অন্য প্রাণীর হাতে মানুষের সংহারের দৃশ্য ভীমবেঠকায় এই একটাই ।

প্রাকৃতিক কলম
পুরো জায়গাটা একটা মোটামুটি বৃত্তাকার পথে হাঁটতে হয় অর্থাৎ যেখান থেকে শুরু সেখানে ফিরে আসতে হয় । একজায়গায় গাইড আমাদের একটা গাছ দেখালো যেখানে একটা গাছের ডাল থেকে অন্য একটা গাছের জন্ম হয়েছে । বাংলায় যাকে কলম বলে । পার্থক্য হল কলম মানুষের সৃষ্টি আর এখানে ব্যাপারটা প্রকৃতি নিজে থেকে করেছে ।


এরপর আমরা আরও কিছু ছবি দেখে আমাদের আগের জায়গায় ফিরে এলাম ।আমাদের গাইড এখান থেকে বিদায় নিল । আমরা আরও কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে বেরিয়ে এসে গাড়িতে উঠে পড়লাম ।

আমাদের গাড়ি পাহাড় থেকে নেমে ফেরার পথ ধরল । দুপুর পৌনে দুটো বাজে, তাই একটা হোটেলে গিয়ে লাঞ্চ করে নেওয়া হল । আবার ভেজ ! কিন্তু এখানে ত্রিসীমানার মধ্যে আর কোনও দোকান নেই, তাই অভিযোগ করেও কোনও লাভ নেই । আবার সেই পনীর, আলুর দম ইত্যাদি দিয়ে ভাত খাওয়া হল । এখানকার রান্নাও বেশ ভালো । সবমিলিয়ে খরচ হল ১,৩৬০/- টাকা ।

ভোজপুরে 'পুবের সোমনাথ' মন্দির
এবার আমাদের গন্তব্য 'ভোজপুর' (এই জায়গা থেকেই বিখ্যাত ভোজপুরী গান আর ভোজপুরী সিনেমার উৎপত্তি, এরকম ভাবার কোনও কারণ নেই) । এখানে একটা শিবের মন্দির আছে । "শিবের মন্দির বলে আর দেখার কি আছে" এরকম যদি মনে হয় (আমাদেরও যে সেটা একেবারে মনে হয়নি তা নয় !) তাহলে বলব জায়গাটা দেখা অবশ্যই উচিৎ । ভীমবেঠকা থেকে ভোজপুরের দূরত্ব ২৫ কিলোমিটারের মতো আর শেষের বেশ কিছুটা রাস্তা বেশ খারাপ । কিন্তু ভোজপুরে গিয়ে মন্দির দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল । মন্দিরের নির্মাণ ১২ থেকে ১৩ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে শুরু হয়, যদিও এর নির্মাণ কখনও সম্পূর্ণ হয়নি । একটা বিশালাকার মন্দির যার উচ্চতা ৬৬ ফুট আর তার ভেতরে একটা বিশালাকার শিবের মূর্তি শিবলিঙ্গ । শিবলিঙ্গের ওপরটা আবার চৌকো (আমি কখনও এই জিনিসটা চৌকো দেখিনি আর জানি যে বায়োলজিক্যালি এটা ভুল) । যাই হোক, এতবড় শিবলিঙ্গ সাধারণতঃ দেখা যায় না । মন্দিরের মেঝে থেকে এর যা উচ্চতা তাতে পূজারী দেখলাম শিবলিঙ্গের ওপরে চড়ার জন্য মই ব্যবহার করেন । এটাই স্বাভাবিক । ভোজপুরের শিবের নাম ভোজেশ্বর আর একে বলা হয় 'পুবের সোমনাথ' । মন্দিরের গায়ে কিছু কারুকার্য আছে । জায়গাটায় কিছু ট্যুরিস্ট ছিল, তবে ভীড় একেবারেই নেই, তাই আমরা ভালোভাবে সবকিছু দেখতে পেলাম ।

ভোপাল লেক
এবার আমরা ভোপাল ফিরে এলাম । ভোপালে আমাদের দুটো জিনিস দেখার ছিল - বিড়লা মন্দির আর ভোপাল লেক । বিড়লা মন্দির জিনিসটা সারা ভারতবর্ষে একইরকম, কলকাতাতেই দেখেছি । তাই আমরা সোজা ভোপাল লেক চলে গেলাম । পৌঁছনোর আগে মনে হচ্ছিল 'লেক আর দেখার কি আছে', বিশেষ করে আমি নিজেই যেখানে সুভাষ সরোবরের পাশে থাকি ! কিন্তু পৌঁছে লেকটা দেখে চোখ কপালে উঠে গেল । সত্যি বলতে কি, চিল্কা ছাড়া আমি এতবড় লেক কোনওদিন দেখিনি । পরে জেনেছিলাম এর আয়তন ৩১ বর্গকিলোমিটার । একাদশ সালে ভোপালের রাজা ভোজের আমলে এই লেক তৈরি হয় । তাঁর নাম থেকেই এই লেকের নাম 'ভোজতাল' আর শহরের নাম 'ভোজপাল' - পরবর্তীকালে 'ভোপাল' (বাঙালিরা অনেক সময়ে ভোপালকে ভুল করে 'ভূপাল' উচ্চারণ করে । মনে রাখতে হবে, ভোপাল নামের সঙ্গে কিন্তু ভূমির কোনও সম্পর্ক নেই, সম্পর্ক আছে রাজা ভোজের) ।

পুরো লেকটাই সুন্দরভাবে বাঁধানো । লেকে বোটিং-এর ব্যবস্থা আছে, একটা নির্দিষ্ট জায়গা থেকে এই বোটগুলো ছাড়ে । তিনধরনের বোট হয় - প্যাডেল বোট, স্পীডবোট আর মোটরচালিত বড় বোট । আমরা অবশ্য বোটে চড়িনি, লেকের পাড় ধরেই কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করলাম । বিকেল ৬ টা বাজে আর এইসময়ে এখানে ঘুরতে খুব ভালো লাগছিল । জায়গাটা বেশ মনোরম এবং খেয়াল করলাম আমাদের মতো ট্যুরিস্টরা ছাড়া ভোপালের অধিবাসীরাও এখানে ঘুরতে আসে । লেকের মাঝখানে একটা দ্বীপ আছে, নৌকো করে সেখানে যাওয়া যেতে পারে । সন্ধ্যের পর দ্বীপটায় নানারঙের আলো জ্বলে উঠল । লেকের পাড়ে একটা পুরনো কয়লার রেলইঞ্জিন রাখা রয়েছে । লেকের অন্য পাড়টা ছোট টিলার মতো আর সেখানে কিছু বাড়িঘর রয়েছে ।

ভোপালের বিদ্যাসাগর সেতু
লেকের একটা প্রান্তে একটা ব্রীজ রয়েছে যেটা অনেকটা কলকাতার বিদ্যাসাগর সেতুর মতো দেখতে, যদিও আকারে অনেক ছোট । রাতের অন্ধকারে এই ব্রীজের আলোগুলো যখন জ্বলে, তখন জলের ওপরে এর প্রতিবিম্ব দেখতে খুব সুন্দর লাগে । আমরা লেক থেকে ফেরার সময়ে এই ব্রীজের ওপর দিয়েই ফিরলাম ।



স্টেশনে পৌঁছে আমরা আমাদের ঘরে ফিরে এলাম । আমাদের ভোপাল ভ্রমণ শেষ, তাই আমরা ঘরে এসে মালপত্র গুছিয়ে নিলাম । রাতে ডিনার খাওয়া হল একই জায়গায় । খরচ হল ৩৭৫/- টাকা ।

সারসংক্ষেপঃ

১. জব্বলপুর থেকে ভোপাল যাওয়ার অনেক ট্রেন আছে, তবে তার মধ্যে জব্বলপুর ইন্দোর এক্সপ্রেস বেশ ভালো ট্রেন । রাত্রিবেলা ডিনার করে ট্রেনে উঠে পরেরদিন ভোরবেলা ভোপাল পৌঁছে যাওয়া যায় এবং এতে সময় একেবারেই নষ্ট হয়না ।
২. আমরা ভোপালে রিটায়ারিং রুমে ছিলাম, তাই এখানেও কোনও হোটেলের সম্পর্কে বলব না । আমরা ছিলাম একটা ডরমেটরিতে, যেটার ব্যবস্থা খুব ভালো না হলেও চলনসই ।
৩. ভোপাল স্টেশনে খাবারের বেশ কয়েকটা দোকান আছে । আমরা IRCTC-র দোকান থেকে খাওয়া দাওয়া করেছি, যেখানকার রান্না ভালোই আর সেইসঙ্গে আমিষও পাওয়া যায় ।
৪. ভোপালেও ঘোরাঘুরির জন্য স্টেশনের বাইরে গাড়ি পাওয়া যায় । ভোপাল ভালোভাবে ঘুরতে দু'দিন লাগে আর এই দু'দিনের জন্য গাড়ি আমাদের থেকে নিয়েছিল ৪,৫০০/- টাকা ।
৫. ভোপাল থেকে যাওয়ার জন্য বিখ্যাত জায়গা হল সাঁচি আর ভীমবেঠকা । দু'টো একদিনে ঘোরা কঠিন, কারণ ভোপাল থেকে দুটো জায়গা সম্পূর্ণ বিপরীতদিকে ।
৬. যদি এই দু'টো জায়গাই দেখার জন্য হাতে যথেষ্ট সময় না থাকে, তাহলে সেক্ষেত্রে সাঁচি বাদ দিয়ে ভীমবেঠকা দেখা উচিৎ । কারণ সাঁচিস্তূপের যেসব ছবি দেখতে পাওয়া যায়, তার থেকে এর সম্পর্কে ধারণা করা যায়, কিন্তু ভীমবেঠকা নিজের চোখে না দেখলে এর কিছুই বোঝা যায় না ।
৭. সাঁচিস্তূপ ভালোভাবে দেখার জন্য অন্ততঃ দু'ঘন্টা সময় হাতে থাকার দরকার । আর সেইসঙ্গে জায়গাটা সম্পর্কে আগে থেকে একটু জেনে নিতে পারলে আরও ভালো লাগবে ।
৮. ভীমবেঠকায় ভালোভাবে দেখতে হলে ঘন্টাখানেক সময় দরকার আর সেইসঙ্গে দরকার একজন দক্ষ অভিজ্ঞ গাইড । পড়াশোনা করা থাকলেও ভালোভাবে দেখার জন্য ভীমবেঠকায় একজন গাইড নেওয়া অবশ্য কর্তব্য ।
৯. ভীমবেঠকা থেকে ভোপাল ফেরার পথে ভোজপুরের শিবমন্দিরও একটা আকর্ষণীয় দেখার জায়গা । প্রায় হাজার বছরের পুরনো এই বিশালাকার শিবমন্দিরের শিবলিঙ্গটি খুবই চিত্তাকর্ষক ।
১০. ভোপালের বিখ্যাত লেকও একটা অত্যাবশ্যক দেখার জায়গা । ৩১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই লেকে বিকেলের দিকে গেলে এর মনোরম পরিবেশে ঘুরতে খুব ভালো লাগে ।

পাঁচমারি ভ্রমণঃ

পিপারিয়া যাওয়ার পথে
বুধবার ১১ই অক্টোবর, ২০১৭ । আমরা সকাল ৮ টার সময়ে ঘর ছেড়ে দিয়ে প্ল্যাটফর্মে চলে গেলাম । ভোপাল থেকে আমাদের গন্তব্য পাঁচমারি - মধ্যপ্রদেশের একমাত্র হিলস্টেশন । পাঁচমারিতে ট্রেন যায় না, সবচেয়ে কাছের স্টেশন হল পিপারিয়া । ভোপাল থেকে পিপারিয়া যেতে ঘন্টা তিনেক লাগে । আমরা সকাল ৮ঃ৩৫ মিনিটের সোমনাথ জব্বলপুর এক্সপ্রেসে চড়ে পিপারিয়ার জন্য রওনা হলাম । এই ট্রেনজার্ণিটা খুব সুন্দর । ভোপাল থেকে ইতার্শি পর্যন্ত রেলপথটা পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে, কয়েকটা টানেলও আছে । এই রেলপথটা আমাদের মহারাষ্ট্র ভ্রমণের রত্নগিরি যাওয়ার পথের কোঙ্কনকন্যা রেলওয়েকে মনে করিয়ে দেয় । ইতার্শিতে ট্রেনটা মিনিট কুড়ি দাঁড়ায় আর তারপর আবার বিপরীত দিকে চলা শুরু করে । আমাদের ট্রেন আধঘন্টা দেরি করে পিপারিয়া নামালো বেলা ১২ঃ১০ মিনিটে ।

পিপারিয়া স্টেশনে
এখানে জানিয়ে রাখি, জব্বলপুর থেকে ভোপাল যেতে গেলে এই পিপারিয়া-ইতার্শি হয়েই যেতে হয় । আমরা দুদিন আগে যখন জব্বলপুর থেকে ভোপাল গেছি, তখন এই পথ দিয়েই গেছি । পার্থক্য হল সেদিন পথটা গেছি মাঝরাতে । মনে হতে পারে, সেক্ষেত্রে কেন আমরা জব্বলপুর থেকে আগে ভোপাল না গিয়ে পাঁচমারি হয়ে ভোপাল গেলাম না । এর কারণ হল, ভোপাল থেকে হাওড়া ফেরার কোনও সরাসরি ট্রেন নেই, মুম্বই মেল ধরার জন্য আমাদের আবার সেই ইতার্শিতেই আসতে হত । আর সেক্ষেত্রেও সুবিধেমতো কোনও কানেক্টিং ট্রেন ছিল না, তাই আমরা এরকমই ব্যবস্থা করেছিলাম ।

পাঁচমারির সম্পর্কে বলতে গেলে যাঁর কথা উল্লেখ করতেই হবে তিনি হলেন আমাদের হোটেলের মালিক মিঃ রিজওয়ান কুরেশি । আমরা ইন্টারনেট থেকে পাঁচমারির 'হোটেল এঞ্জেল' বুকিং করেছিলাম আর প্রথমদিন থেকেই মিঃ কুরেশির কাছ থেকে আমরা নানারকম সহায়তা পেয়ে এসেছি । আমাদের পুরো পাঁচমারি ভ্রমণে এঁর এবং এঁর পরিবারের কাছে আমরা যেরকম আতিথেয়তা পেয়েছি, আমাদের এতগুলো বেড়ানোর মধ্যে সেরকম আর কোথাও পেয়েছি বলে বিশেষ মনে পড়ে না । #ভালো হোটেল, #ভালো আতিথেয়তা, #ভালো ব্যবহার, #ভালো পরিষেবা, #অসাধারণ খাবার ইত্যাদি নানারকম #ট্যাগ দিয়ে পাঁচমারির হোটেল এঞ্জেলকে বর্ণণা করা যায় ।

পিপারিয়া স্টেশনে নেমেই আমরা ভদ্রলোকের শরণাপন্ন হলাম । পনেরো মিনিটের মধ্যে ৮০০/- টাকায় আমাদের একটা বোলেরোর ব্যবস্থা করে দিলেন যেটা পিপারিয়া থেকে আমাদের পাঁচমারিতে ওনার হোটেলে নামিয়ে দেবে । আমরা স্টেশনের বাইরে এসে গাড়িতে চড়ে এগিয়ে চললাম পাঁচমারির দিকে । পোঁছতে প্রায় ঘন্টা দেড়েক লাগবে, তাই রাস্তায় একজায়গায় লাঞ্চ করে নেওয়া হল । আবার নিরামিষ - খরচ হল ১,২০০/- টাকা ।

আবার এগিয়ে চলা । পাঁচমারির উচ্চতা ৩,৫০০ ফুট । কিছুক্ষণ চলার পরেই আমরা পাহাড়ে উঠতে শুরু করলাম । রাস্তাটা বেশ সুন্দর, দু'পাশে জঙ্গল । আমাদের ড্রাইভারের থেকে জানলাম এই জঙ্গলে বেশি কিছু হিংস্র জানোয়ার আছে । মাসছয়েক আগে এখানে রাস্তায় একটা লোক্যাল মেয়ে জঙ্গলে কাঠ আনতে গিয়ে মারা গেছে বাঘের হাতে । "বা-বা-বাঘ" ! আমরা গাড়িসুদ্ধ লোক একটু চমকে উঠলাম । জানা গেল বাঘ ছাড়াও ভাল্লুক, হরিণ ইত্যাদি এখানে প্রায়ই দেখা যায় । জঙ্গলে জানোয়ার দেখতে গিয়ে জানোয়ার দেখার অভিজ্ঞতা হয়তো খারাপ নয়, কিন্তু একটা বোলেরো চড়ে মালপত্র নিয়ে গন্তব্যে যাওয়ার সময়ে রাস্তায় হঠাৎ হিংস্র জানোয়ারের দেখা পাওয়াটা অন্ততঃ আমার কাছে বাঞ্ছনীয় নয় - সৌভাগ্যের বিষয় এই অবাঞ্ছিত কাজটা আমাকে করতেও হয়নি !

আমাদের ঘরের জানালা থেকে
পাঁচমারি পৌঁছলাম দুপুর সাড়ে তিনটে । আগেই বলেছি আমাদের 'হোটেল এঞ্জেল' বেশ ভালো একটা হোটেল । ঘর বেশ পরিষ্কার, বাথরুমও বেশ বড় । আমাদের দোতলায় একটা আর চারতলায় দুটো ঘর ছিল । জায়গাটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা - আমাদের ঘরের জানালা থেকে অনেকদূর পর্যন্ত্য দেখা যায় । আমরা একটু ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম হেঁটে ঘোরাঘুরি করার জন্য ।

পাঁচমারি জায়গাটা মূলতঃ মিলিটারি এলাকা আর এখানে ঘোরাঘুরির জন্য জিপসি ছাড়া অন্য কোনও গাড়ি চলার নিয়ম নেই । পাঁচমারি ভালো করে ঘুরে দেখতে লাগে দুদিন - এদের মধ্যে একদিন আমরা ফরেস্ট এর এলাকার মধ্যে ঢুকব আর অন্যদিন অন্যান্য দেখার জায়গাগুলো দেখব । যেখানেই ঘুরি, এখানকার ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন থেকে জিপসির ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে ১,৪২৫/- টাকা । এছাড়া ফরেস্ট এলাকায় ঘুরতে হলে আরও ৯৬০/- টাকা লাগে এবং এতে একজন ফরেস্ট গাইড সঙ্গে দেওয়া হয় ।

জটাশঙ্করের পথে
আমাদের হোটেলের কাছাকাছি একটা দেখার জায়গা আছে - জটাশঙ্কর । বিকেলে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা সেদিকে এগিয়ে চললাম । জায়গাটা কাছে হলেও ততটাও কাছে নয় তাই আমাদের পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যে হয়ে গেল । পাহাড়ের ধাপে ধাপে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গিয়ে মন্দিরে পৌঁছতে হয় আর এই পথটাতে কোনও আলো নেই । তাই আমরা আপাতত জটাশঙ্করকে দেখার ইচ্ছে ত্যাগ করে আবার উলটোপথে হাঁটা শুরু করলাম ।

ফেরার পথে একটা দোকান থেকে চা-সিঙাড়া ইত্যাদি খেয়ে নেওয়া হল । সন্ধ্যেবেলা একটা হাল্কা ঠান্ডা ভাব অনুভব করছিলাম । পাঁচমারি হল হিলস্টেশন - এখানে শীতকালে ভালোই ঠান্ডা পড়ে । দুপুরে আমরা যখন এসে পৌঁছেছি, তখনও মনে হয়েছিল ঠান্ডা না লাগলেও গরমের ভাবটা একেবারেই নেই । সাতটা নাগাদ আমরা আবার ঘরে ফিরে এলাম ।

হোটেল এঞ্জেলের একটা সমস্যা হল এখানে খাবারের ব্যবস্থা নেই । মিঃ কুরেশি আমাদের বললেন উনি আমাদের জন্য ডিনারের ব্যবস্থা করে দিতে পারেন তবে সেটা পরেরদিন থেকে হবে । "আজ বাহার যাকে কাম চালা লিজিয়ে" । সেইমতো আমরা আমাদের হোটেল থেকে বেরিয়ে কাছের একটা অন্য হোটেল থেকে ডিনার করে নিলাম । আবার নিরামিষ ! খরচ হল ৬৬০/- টাকা ।

আমাদের জিপসি
বৃহস্পতিবার ১২ই অক্টোবর, ২০১৭ - আমাদের পাঁচমারি ঘোরার প্রথমদিন । সকাল ১০ টা নাগাদ আলুর পরোটা দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে (সৌজন্যে মিঃ কুরেশি) আমরা বেরোলাম । হোটেল থেকেই গাড়ি ঠিক করা ছিল । আমরা বলে রেখেছিলাম মাথাখোলা জিপসির জন্য । আমি কোনওদিন জিপসিতে চড়িনি আর মাথাখোলা গাড়ি হওয়ায় আরও মজা লাগছিল । ড্রাইভার আমাদের প্রথমে নিয়ে গেল ফরেস্ট এন্ট্রি পয়েন্টে । এখানে আমরা ফরেস্টে ঢোকার অনুমতি কিনলাম আর সেইসঙ্গে পেলাম একজন ফরেস্ট গাইড কাম ড্রাইভার । বাকি রাস্তা এই লোকই আমাদের গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাবে ।

বাইসন লজের সামনে
বাইসন লজ ও মিউজিয়ামঃ এই এন্ট্রি পয়েন্টেই দুটো মিউজিয়াম রয়েছে । পাঁচমারি জায়গাটা ব্রিটিশদের তৈরি আর এই এন্ট্রি পয়েন্টে একটা ব্রিটিশ বাংলো রয়েছে । এই বাংলোটাকেই মিউজিয়ামে পরিণত করা হয়েছে । এর মধ্যে একটার নাম বাইসন লজ । কোনও এক সাহেব এখানে একটি বাইসন মেরেছিলেন, তার মাথাটা এখানে স্টাফ করে রাখা আছে । এছাড়া আরও কিছু জন্তু পাখি সরীসৃপ ইত্যাদির মডেল করে রাখা আছে এখানে । আমরা মিউজিয়ামে কিছুক্ষণ থেকে গাড়িতে উঠে পড়লাম ।

পান্ডব গুহা
পান্ডব গুহাঃ বাইসন লজ থেকে গাড়িতে মিনিট দশেক চলার পর আমরা পোঁছলাম পান্ডব গুহায় । এখানে একটা ছোট পাহাড়ের গায়ে পাঁচটা গুহা আছে আর স্থানীয় লোকেদের ধারণা অনুযায়ী মহাভারতের পঞ্চপান্ডবরা বনবাসের সময়ে এখানে কিছুদিন ছিলেন । এই জায়গার নাম থেকেই পাঁচমারি নামের উৎপত্তি - 'পাঁচমারি' অর্থাৎ পাঁচটি গুহা বা পাঁচটি কূটীর । প্রকৃতপক্ষে এই গুহাগুলো প্রথম থেকে দশম শতকের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের তৈরি । পাঁচটা গুহার মধ্যে দুটো গুহা বর্তমানে জনগণের জন্য খোলা আছে, বাকিগুলোর ভেতরে পর্য্যাপ্ত আলো না থাকায় সেগুলোয় ঢুকতে দেওয়া হয় না । গুহাগুলো পাহাড়ের ধাপে ধাপে, সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে দেখতে হয় । পাহাড়ের মাথায়ও চাইলে ওঠা যায় । পুরো এলাকাটা খুব সুন্দরভাবে ছোট ছোট গাছ আর বাগান করা । আমরা এখানে খানিকক্ষণ ঘুরে নেমে এলাম ।

বী-ফল্‌স্‌ - ওপরে
বী-ফল্‌স্‌ঃ পরবর্তী গন্তব্য বী-ফল্‌স্‌ । পান্ডব গুহা থেকে গাড়িতে করে মিনিট পনেরো পাহাড়ী পথে চলার পরে গিয়ে পৌঁছতে হয় বী-ফল্‌স্‌ এ । যাওয়ার রাস্তাটা বেশ ভালো, পাহাড় আর জঙ্গল । আমাদের গাইড বলল এখানকার জঙ্গলের বেশিরভাগ গাছই হল পাইন আর পাইন হল চিরহরিৎ বৃক্ষ । সেই কারণ এখানকার জঙ্গল সারাবছরই সবুজ থাকে । কাঠের চালান করা হল পাঁচমারির প্রধান উপজীবিকা - এখানকার ৭০% মানুষ এই কাজ করেন ।

বী-ফল্‌স্‌ এ যেখানে গাড়ি থামে সেখান থেকে হেঁটে আরও কিছুটা সিঁড়ি দিয়ে নেমে ঝরনার সামনে পৌঁছতে হয় । এখানে ঝরনাটা কিছুটা সমতলের ওপর দিয়ে গেছে, তাই চাইলে এখানে চান করা যায় আবার জলে পা ডুবিয়ে বসেও থাকা যায় । পা-ডুবিয়ে বসে থাকলে কিছুক্ষণের মধ্যেই কিছু ছোট ছোট মাছ এসে পায়ে লেগে থাকে আর পায়ের ময়লা খেয়ে পরিষ্কার করে দেয় । ন্যাচারাল পেডিকিওর । ঝরনাটা এখানে সমতলের ওপর থেকে অনেকটা নিচে চলে গেছে । নিচে যেখানে ঝরনার জলটা পড়ছে সেখানে জলের ফোঁটা এত জোরে পড়ে যে গায়ে পড়লে মনে হয় মৌমাছি কামড়াচ্ছে । সেই থেকেই এই ঝরনার নাম বী-ফল্‌স্‌ । ওপর থেকে নিচে নামার জন্য সিঁড়ি আছে । কিন্তু জায়গাটা বেশ অনেকটা নিচে, তাই ফেরার সময়ে ওঠার ব্যাপারটা সহজ হবে না । আমাদের গাইড বলল যাদের দম আছে তারাই যেন যাই ।

বী-ফল্‌স্‌ - নিচে
দলের মধ্যে আমরা তিনজন নিচে নামলাম । সিঁড়ির সংখ্যা দুশোর মতো, নিচে নামতে বেশ কিছুটা সময় লাগে । নিচের দৃশ্য আরও সুন্দর । বেশ অনেকটা ওপর থেকে জলটা নিচের পাথরের ওপর পড়ছে, এখানে অনেকেই দাঁড়িয়ে চান করছে । আমরা পাথরের ওপর পা দিয়ে জলের একেবারে সামনে গেলাম । জলটা ঠান্ডা, তবে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে বেশ ভালো লাগে ।


ওপরে ওঠার কাজটা সত্যিই কঠিন । পাহাড়ী পথে এতগুলো সিঁড়ি বেয়ে ওঠা সহজ নয়, মাঝে মাঝেই দাঁড়িয়ে দম নিতে হচ্ছিল । একজায়গায় লেবুর জল বিক্রি হচ্ছে, দাম ২০/- টাকা । আমরা ১-২ গ্লাস করে খেয়ে শরীরে বল সংগ্রহ করে নিলাম । ওপরে এসে কিছুক্ষণ দম নিয়ে আরও ওপরে উঠে এলাম অর্থাৎ যেখানে আমাদের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে । দুপুর দুটো বাজে, তাই আমাদের ড্রাইভার আমাদের নিয়ে গেল খাবার জায়গায় । সৌভাগ্যক্রমে এখানে আমিষ খাবার পাওয়া যায় । আমরা ভাত, ডাল, আলুভাজা, চিকেন খেয়ে নিলাম । খরচ হল ১,৩৭০/- টাকা ।

এরপর আমাদের যাওয়ার পথে পড়ল প্যারাসেইলিং পয়েন্ট । জিনিসটা নতুন কিছু নয় আর পাঁচমারির স্পেশালিটি তো নয়ই । তাই আমরা এখানে কোনও সময় নষ্ট না করে এগিয়ে গেলাম ।

রিচ্‌ গড়
রিচ্‌ গড় ও একো পয়েন্টঃ এর পরে আমরা গেলাম রিচ্‌ গড় । এখানে গাড়ি থেকে নেমে কিছুটা চরাই-উৎরাই পেরিয়ে যেতে হয় । এখানকার বৈশিষ্ট্য হল এখানে দুটো পাশাপাশি পাহাড় পরস্পরকে ঠেসান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যদিও আপাতদৃষ্টিতে দেখলে মনে হয় পাথরের গায়ে ফাটল ধরেছে । একটা পাহাড়ের মধ্যে একটা গুহা আছে যেটার নাম ভালুক গুহা । আগে এখানে একটা ভাল্লুক থাকত, যদিও সে বর্তমানে গুহা ছেড়ে জঙ্গলে চলে গেছে । গুহার ভেতরটা অন্ধকার তবে এর বৈশিষ্ট্য হল একদিন দিয়ে ঢুকে অন্যদিক দিয়ে বেরোনো যায় । গুহার অন্যদিকটা যেখানে বেরোয় সেখানে রয়েছে একো পয়েন্ট । এখানে পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনি শোনা যায় । আমরা নিজেরা ব্যাপারটা পরখ করে দেখলাম (মানে জোরে চিৎকার করলাম আর আমাদের চিৎকারের প্রতিধ্বনি স্পষ্টভাবে শুনলাম) । বেশ মজার অনুভূতি সন্দেহ নেই ।

ধুপ গড় যাওয়ার পথে
ধুপ গড়ঃ গাড়ি পাহাড়ি পথে আরও এগিয়ে চলল । কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারলাম আমরা একটা উঁচু পাহাড়ের ওপরে উঠছি । রাস্তাটা যথেষ্ট খাড়াই আর এতক্ষণে বুঝতে পারলাম কেন এখানে জিপসি ব্যবহার করা হয় । ফোর হুইল ইঞ্জিন ছাড়া অন্য কোনও গাড়ির পক্ষে সাতজন লোক নিয়ে এই রাস্তা দিয়ে ওঠা সম্ভব নয় । যে পাহাড়টায় উঠছি দেখে মনে হচ্ছিল সেটাই এই এলাকার সবচেয়ে উঁচু পাহাড় । দৃশ্য খুব সুন্দর । বিকেল সাড়ে চারটে বাজে, সূর্য্য অস্ত যাওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে । গাড়িকে বলে একজায়গায় আমরা কয়েক মিনিটের জন্য থামলাম । এখানে থেকে পাহাড়শ্রেণীর একটা দূর্দান্ত দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল । দিগন্তবিস্তৃত সারি সারি পাহাড় আর তার ওপরে সূর্য্য । সূর্য্যাস্তের সময় পৌনে ছটা থেকে ছটা, কিন্তু এই সময়ের সূর্য্যও দেখতে খুব ভালো লাগে ।

সাতপুরা পর্ব্বতশ্রেণী - সানরাইজ পয়েন্ট থেকে
আমরা আরও এগিয়ে গেলাম । ধুপগড় হল পাঁচমারির সবচেয়ে উঁচু জায়গা । গন্তব্যে পৌঁছে আমাদের গাইড বলে দিল এই পাহাড়ের ওপরে দুদিকে দুটো জায়গা আছে - সানরাইজ পয়েন্ট আর সানসেট পয়েন্ট । বিকেল পাঁচটার সময়ে সানরাইজ দেখতে একমাত্র রজনীকান্তই পারে, তাই আমরা শুধু জায়গাটা দেখতে গেলাম । সমতলে হেঁটে মিনিট পাঁচেক রাস্তা আর তার পরে একজায়গা থেকে জায়গাটা দেখা যায় । এখানকার দৃশ্য অসাধারণ ! সাতপুরা পর্বতশ্রেণীর একটা সুবিশাল অংশ এখান থেকে দেখা যায় । আগেই বলেছি, আমাদের পাহাড়টা এই অঞ্চলের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় । সানরাইজ পয়েন্ট থেকে যতটা দেখা যায় দিগন্তবিস্তৃত পাহাড়ের শ্রেণী ।

সাতপুরা পর্ব্বতশ্রেণী - সানসেট পয়েন্ট থেকে
এবার পাহাড়ের বিপরীত দিকটায় গেলাম । এটা সানসেট পয়েন্ট । আকাশে মেঘ থাকায় সূর্য্যাস্ত দেখা যাবে না বুঝতে পারলাম । সূর্য্যাস্ত দেখা না গেলেও জায়গাটা খুব সুন্দর, এদিক থেকেও সাতপুরা পাহাড় শ্রেণীর অন্য একটা দিক দেখতে পাওয়া যায় । সূর্য্যাস্ত দেখা না গেলেও আমরা সূর্য্যাস্তের সময় পর্যন্ত্য অপেক্ষা করলাম আর তার মধ্যে মামা আমাদের একঝলক দেখাও দিল ।


ব্রিটিশ বাংলো
সানরাইজ আর সানসেট পয়েন্টের মাঝামাঝি পাহাড়ের ওপরে একটা বাংলো আছে - ব্রিটিশদের তৈরি । একশ বছরেরও বেশি পুরনো এই বাংলো তৈরি করার সময়ে নাকি খরচ হয়েছিল ৫,০০০/- টাকা ! আর কয়েকবছর আগে এখানে কিছু মেরামতির কাজ করা হয় সংরক্ষণের জন্য । তার জন্য খরচ হয়েছে সাত লক্ষেরও বেশি । বাংলোটা বর্তমানে একটা সংগ্রহশালা, যদিও কিসের সংগ্রহ সেটা আর শেষপর্যন্ত্য দেখা হয়ে ওঠেনি !

এবার ফেরার পথ ধরলাম । আমরা ছিলাম ৪,৫০০ ফুটের ওপরে । পাহাড়ী অঞ্চলে সূর্য্যাস্তের পর ঝপ করে ঠান্ডা পড়ে যায় । সেজন্য আমাদের সঙ্গে কিছু গরম জামাকাপড় ছিল । আমাদের গাড়ি যখন আমাদের হোটেলের সামনে নামাল সন্ধ্যে প্রায় সাতটা ।

রাতে হোটেল থেকেই আমাদের ডিনারের ব্যবস্থা করে দিল । আগেই বলেছি, হোটেল এঞ্জেলে কোনও খাবার ব্যবস্থা নেই, এটা এঁরা শুধু স্পেশাল রিকোয়েস্টে করেন । আমরা নিয়েছিলাম রুটি আর চিকেন কারি । একেবারেই ঘরোয়া রান্না - খেতেও ভালো আর খেয়ে শরীর খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা নেই । আমাদের খরচ হল ৬৬০/- টাকা ।

হোটেলের ঘর থেকে সূর্য্যোদয়
পরেরদিন শুক্রবার ১৩ই অক্টোবর, ২০১৭ - পাঁচমারিতে আমাদের ঘোরার দ্বিতীয় তথা শেষ দিন । সকালে উঠে পাহাড়ের ওপর সূর্য্যোদয় দেখলাম । এটা দেখার জন্য কোথাও যেতে হয়না - হোটেলে আমাদের ঘর থেকেই দেখা যায় । অসাধারণ দৃশ্য ! সূর্য্যোদয় জিনিসটা প্রত্যেকদিন একরকম হলেও স্থান-কাল ভেদে এর সৌন্দর্য্য একেকরকম হয় । পাঁচমারির পাহাড়ের ওপর থেকে এই সূর্য্যোদয়ের দৃশ্যও সেরকমই অনন্য ।

সকালের ব্রেকফাস্টে আবার আলুর পরোটা । এটা বলতেই হবে এঁরা আলুর পরোটাও খুব ভালো তৈরি করে । আগেরদিন মাত্র একটা করে খেয়ে আমাদের পেট বা মন কোনওটাই ভরেনি, তাই আজ দুটো করে খাওয়া হল । ব্রেকফাস্ট করে আমরা বেরোলাম সেই একই জিপসিতে । আজকের গন্তব্য পাঁচমারির অন্যান্য সাইটসিয়িং - নন ফরেস্ট এলাকা ।

হান্ডি খো
হান্ডি খোঃ হোটেল থেকে বেরিয়ে মিনিট পনেরো চলার পরে পৌঁছলাম আমাদের প্রথম দেখার জায়গা হান্ডি খো-তে । এখানে একটা ভিউ পয়েন্ট থেকে দুটো পাহাড়ের মাঝের অংশটা দেখা যায় । জায়গাটা একেবারেই একটা খাদের ধারে, যদিও ভালোভাবে রেলিং লাগানো আছে । আমাদের ড্রাইভার জানালো এটা সুইসাইডাল পয়েন্ট । "আপকো সির্ফ দেখনা হ্যায়, করনা নেহি হ্যায়" । আমরা এখানে কিছু ছবিটবি তুলে গাড়িতে চড়ে বসলাম ।

প্রিয়দর্শিনী ভিউ পয়েন্ট থেকে
প্রিয়দর্শিনীঃ হান্ডি খো থেকে গাড়িতে মিনিট পাঁচেক চলার পরে দ্বিতীয় দ্রষ্টব্য - প্রিয়দর্শিনী । এখানে গাড়ি থেকে নেমে মিনিট দশেক অল্প চড়াই-উৎরাই হাঁটার পর যেখানে পৌঁছলাম সেটাও আসলে একটা ভিউ পয়েন্ট । এখান থেকে সবুজ পাহাড়ের অনেকটা দেখতে পাওয়া যায় আর সেইসঙ্গে সামনের অনেক উঁচু পাহাড়ের ওপর একটা মন্দির দেখা যায় । এখানে আমরা কিছুক্ষণ ঘুরে ফিরে এলাম ।

মহাদেও ও গুপ্ত মহাদেওঃ প্রিয়দর্শিনী থেকে মিনিট কুড়ি গাড়িতে চলার পরে পৌঁছলাম মহাদেও ও গুপ্ত মহাদেওতে । এখানে প্রথমেই যেটার কথা বলতে হবে সেটা হল বাঁদরের উৎপাত । আমাদের গাড়ি এখানে থামতে না থামতেই তাদের বাঁদরামি শুরু হয়ে গেল । আর এই বাঁদরামির মাত্রা এতটাই বেশি যে এরা একেবারে আমাদের গাড়ির ওপর চড়ে বসল । আমাদের ড্রাইভার আমাদের কয়েকটা লাঠি দিয়ে বলল এগুলো হাতে রাখতে । বলা বাহুল্য, এগুলো বাঁদরদের ভয় দেখানোর জন্য । আমরা প্রথমে গুপ্ত মহাদেও দেখতে গেলাম । গাড়ির স্ট্যান্ড থেকে হেঁটে মিনিট পাঁচেক লাগে । এই পুরো পথটাতেই বাঁদর ঘোরাঘুরি করে, তবে আমাদের সঙ্গে একাধিক লাঠি থাকায় খুব কাছে ঘেঁষছিল না । যদিও আমাদের সঙ্গে কোনও খাবার ছিল না, কিন্তু বাঁদরকে ঠিক বিশ্বাস করা যায় না । এটা ভুলে গেলে চলবে না আমাদের পূর্বপুরুষদের বুদ্ধি আমাদের সমান আর ক্ষিপ্রতা আমাদের থেকে বেশি । এর আগে চাঁদিপুর ভ্রমণ-এর সময়ে আমাদের একটা ভয়মিশ্রিত বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তাই আবারও বলছি - বাঁদর হইতে সাবধান !

গুপ্ত মহাদেও ঢোকার পথে
গুপ্ত মহাদেও-তে পৌঁছে দেখলাম সেটা একটা পাহাড়ের গুহার ভেতরে । ভেতরে আলোর ব্যবস্থা করা থাকলেও আমাদের খুব একটা ঢোকার আগ্রহ জন্মালো না, বিশেষ করে যখন দেখলাম ঢুকতে গেলে একটা জনা কুড়ি লোকের লাইনের পিছনে দাঁড়াতে হবে । আমরা এখান থেকে বাঁদরের গুষ্টি পেরিয়ে আবার গাড়ির স্ট্যান্ডে ফিরে এলাম ।


মহাদেও মন্দিরের সামনে
গাড়ির স্ট্যান্ড থেকে উল্টোপথে মিনিট পাঁচেক হাঁটলে মহাদেও । এটাও একটা পাহাড়ের গুহার মধ্যে, তবে গুহার মুখটা বেশ বড় । গুহার ভেতরে একেবারে শেষপ্রান্তে শিবলিঙ্গ । এখানে ছবি তোলা বারণ । ভেতরে শিবের কাছে পৌঁছতে গেলে একটা জলের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে হয় । জায়গাটা একটু স্যাঁতসেঁতে, তবে খুব সুন্দর ।



এরপর লাঞ্চব্রেক । কিন্তু সেখানে যাওয়ার সময়ে হঠাৎ প্রচন্ড বৃষ্টি এসে গেল । জিপসির সবদিকই খোলা, তবে সাধারণতঃ ঢাকা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে । কিন্তু আমাদের গাড়িতে দেখা গেল শুধু মাথা ঢাকা দেওয়ারই ব্যবস্থা আছে, সাইডগুলো খোলাই রয়ে গেল । ফলে আমরা যারা ধারে বসেছিলাম, তারা কিছুটা ভিজে গেলাম । ড্রাইভারকে ভর্তসনা বা তিরষ্কার করলে ভেজা জামা শুকোবে না, তাই সেটা আর করলাম না ।

ড্রাইভার বেশ একটা ঘ্যাম রেষ্ট্যুরেন্টে নিয়ে গেল । ভেতরটা বেশ ভালো কিন্তু ... সেই নিরামিষ ! আমরা এটা-ওটা-সেটা (সেই একই জিনিস, তাই আর বিস্তারিত লিখলাম না) দিয়ে পেট ভরালাম । খরচ হল ১,৪৯০/- টাকা ।

লাঞ্চের পরেও আমরা কিছুক্ষণ আটকে গেলাম কারণ বৃষ্টি । থামার পর গেলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যে ।

রাজেন্দ্রগিরি
রাজেন্দ্রগিরিঃ ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদের নামে এই পাহাড়ের নাম । উনি মাঝে মাঝেই পাঁচমারিতে আসতেন বলে এই পাহাড়ের এই নামকরণ করা হয়েছে । জায়গাটায় একটা বাগান আছে এবং সেটা যথেষ্ট ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় । জায়গাটা একটা সানসেট পয়েন্ট, তবে আকাশে মেঘ থাকায় সানসেট দেখার কোনও সুযোগ নেই । তাই আমরা এখানে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে চলে এলাম ।

পাঁচমারি লেক
পাঁচমারি লেকঃ রাজেন্দ্রগিরি থেকে মিনিট দশেক গাড়িতে চলার পর পৌঁছলাম পাঁচমারি লেকে । লেকটা বিশাল কিছু বড় নয়, তবে এখানে বোটিং-এর ব্যবস্থা আছে । আমরা বোটিং করার কথা ভাবছিলাম কিন্তু আবার বৃষ্টি শুরু হয়ে যাওয়ায় সেই পরিকল্পনা বাতিল করতে হল । এখানে একটা মাথায় ছাউনি দেওয়া জায়গা আছে, সেখানে দাঁড়িয়ে লেকের ওপর বৃষ্টি দেখতে বেশ ভালো লাগছিল । এখানে বোটিং ছাড়াও জিপ লাইন রয়েছে । জিপ লাইনটা লেকের ওপর দিয়ে একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত পর্যন্ত্য রয়েছে । এটা করার জন্য ৫০০/- টাকা করে লাগে ।

বৃষ্টি একটু কমলে আমরা আবার গাড়িতে করে বেরিয়ে পড়লাম । গাড়ি নিয়ে চলল আমাদের পাঁচমারি তথা মধ্যেপ্রদেশ ভ্রমণের শেষ গন্তব্যে ।

জটাশঙ্করের শেষের নামার পথ
জটাশঙ্করঃ প্রথমদিন বিকেলে আরেকটু আগে পোঁছতে পারলে যেটা হত আমাদের পাঁচমারি ভ্রমণের প্রথম দ্রষ্টব্য, ঘটনাচক্রে সেটাই হয়ে গেল শেষ দ্রষ্টব্য । আমরা জটাশঙ্কর পৌঁছলাম বিকেল সোয়া চারটে নাগাদ । পাহাড়ের মধ্যে সিঁড়ি দিয়ে অনেকটা নেমে গিয়ে মূলমন্দিরে পৌঁছতে হয় । যাওয়ার পথে দুপাশে অনেক দোকান আছে, যেটা যেকোনও তীর্থস্থানেই থাকে । পাহাড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামাটা অবশ্য বেশ খানিকটা, যদিও মনে ভক্তির বাড়াবাড়ি থাকলে এটা অতিক্রম করা যে কোনও কঠিন কাজ নয় সেটা আমরা পঁচাত্তরোর্ধ দুজন ভদ্রলোককে দেখে বুঝলাম । একেবারে শেষের পথটুকুতে সিঁড়িটা বেশ খাড়া আর সরু, যদিও দুপাশে রেলিং করা আছে । নিচে নেমে জটাশঙ্করকে দর্শন করে আমরা আবার ফিরে এলাম । আমাদের গাড়ি আমাদের হোটেলে পৌঁছে দিল ।


আমাদের ভ্রমণপর্ব এখানেই শেষ, আমরা সন্ধ্যেবেলা বেরোলাম কিছু কেনাকাটা করতে । রাতে হোটেলে ফিরে এসে খাওয়া হল রুটি আর মাটন কারি । খরচ হল ৬০০/- টাকা (হ্যাঁ, এখানে চিকেন কারির থেকে মাটন কারি সস্তা !) ।

পরেরদিন ১৪ই অক্টোবর, ২০১৭ শনিবার । সকালে উঠে বেরোনোর তোড়জোড় শুরু হল । আমাদের ফেরার ট্রেন পিপারিয়া থেকে মুম্বই হাওড়া মেল সকাল ১০ঃ৩৩ মিনিটে । পাঁচমারি থেকে আমাদের বেরোতে বেরোতে সকাল নটা বেজে গেল । ট্রেন নির্ধারিত সময়ে এলে আমাদের পক্ষে একটু চাপের হত, কারণ পাঁচমারি থেকে পিপারিয়া আসতে প্রায় দেড় ঘন্টা সময় লাগে । তবে রাস্তাতেই জানতে পারলাম ট্রেন আধঘন্টা দেরি আছে (সৌজন্যে https://etrain.info/in), তাই কোনও উদ্বেগের কারণ রইল না । স্টেশনে পৌঁছে দেওয়ার জন্য গাড়ি নিল ৮০০/- টাকা ।

স্টেশনে এসে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে শুরু করলাম । ট্রেন এল দুপুর ১২ঃ১৫ নাগাদ, অর্থাৎ পৌনে দুঘন্টা লেট । এবং সারাক্ষণ ট্রেনের লেট মেকআপ করার কোনও লক্ষণ তো দেখা গেলই না, উল্টে সে আরও দেরি করল । আমরা দুপুরে চিকেন, ডিম, ভাত নিলাম - খরচ হল ৪৪০/- টাকা আর রাতে প্রায় একই মেনুতে খরচ হল ৪৩০/- টাকা । আমাদের ফেরার টিকিট ছিল এ সি থ্রী টিয়ারে, তাই ফেরার জার্ণিটা কিছুটা আরামদায়ক হল ।

রবিবার ১৫ই অক্টোবর আমাদের ট্রেনের হাওড়ায় ঢোকার নির্ধারিত সময় সকাল ১১ঃ৪৫ আর ট্রেন পৌঁছল বিকেল ৫ টা - অর্থাৎ সোয়া পাঁচঘন্টা লেট । হাওড়া স্টেশন থেকে বাড়ি এলাম আর সেইসঙ্গে শেষ হল আমাদের নয়দিন ব্যাপী দীর্ঘ ভ্রমণ !

সারসংক্ষেপঃ

১. মধ্যপ্রদেশের একমাত্র হিল স্টেশন হল পাঁচমারি । সাতপুরা পর্বতশ্রেণীর মধ্যে ৩,৫০০ ফুট উঁচুতে একটা সুন্দর মনোরম জায়গায় এটা অবস্থিত ।
২. পাঁচমারিতে কোনও ট্রেন যায় না, এর নিকটবর্তী রেলস্টেশন পিপারিয়া থেকে গাড়িতে করে পাঁচমারি যেতে হয় । ভোপাল থেকে পিপারিয়া যাওয়ার অনেক ট্রেন আছে, এর মধ্যে সোমনাথ জব্বলপুর এক্সপ্রেসে গেলে বেলা বারোটার মধ্যে পিপারিয়া পৌঁছনো যায় ।
৩. পিপারিয়া থেকে পাঁচমারি গাড়িতে যেতে লাগে ঘন্টা দেড়েকের মতো । এই পথের প্রাকৃতিক দৃশ্য অত্যন্ত সুন্দর ।
৪. পাঁচমারিতে থাকার একাধিক ভালো হোটেল নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু আমি সবাইকে অনুরোধ করব 'হোটেল এঞ্জেল' এ থাকার জন্য । ন্যায্য ভাড়া, সহায়তাপূর্ণ ম্যানেজার ও মালিক, সহযোগিতাপূর্ণ হোটেল কর্মচারী, অসাধারণ খাবার - এইসব নিয়ে এত ভালো হোটেল চট করে পাওয়া যায় না । হোটেলের যোগাযোগের নম্বর হল - 07578-252092 / 09425433745 / 08989982949 । এছাড়া নিচের লিঙ্ক থেকেও বুকিং করা যায় ।
https://www.goibibo.com/hotels/angel-hotel-in-pachmarhi-2346603597471443245/
http://www.holidayiq.com/Hotel-Angel-Pachmarhi-hotel-632078.html
https://www.makemytrip.com/hotels/hotel_angel-details-pachmarhi.html
৫. অক্টোবর মাসে পাঁচমারিতে সন্ধ্যের পর মোটামুটি ঠান্ডা পড়ে, তাই হাল্কা কিছু শীতের পোষাক সঙ্গে রাখা ভাল ।
৬. পাঁচমারিতে লোক্যাল সাইট সিইং-এর জন্য দুটো পুরো দিন হাতে রাখতে হবে । এছাড়া যদি জঙ্গল সাফারি করার ইচ্ছে থাকে তাহলে আরেকটা দিনও দরকার হবে ।
৭. পাঁচমারিতে ঘোরাঘুরির জন্য শুধুমাত্র জিপসি গাড়ি চলে । এখানে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় জিপসির জন্য টাকা জমা দিতে হয় ।
৮. ঘোরাঘুরির জায়গাকে দুভাগে ভাগ করা যায় - ফরেস্ট এরিয়া আর নন-ফরেস্ট এরিয়া । ফরেস্ট এরিয়ায় ঢুকতে গেলে একটা পার্মিশন করাতে হয় আর সেইসঙ্গে একজন ফরেস্ট গাইড সঙ্গে থাকে ।
৯. ফরেস্ট এরিয়ায় বী-ফলস্‌ আর রিচ গড় অবশ্য দ্রষ্টব্য । বাকি জায়গাগুলোও ভালো তবে এই দুটো কোনওমতেই বাদ দেওয়া চলবে না ।

উপসংহারঃ

শুধুমাত্র আটদিনের পরিসরে একটা রাজ্যের পুরোটা দেখা যায় না, বিশেষ করে সে'রাজ্য যদি হয় মধ্যপ্রদেশ । কিন্তু তাই এই অল্প সময়ের মধ্যে আমরা যা যা দেখেছি, যতটা দেখেছি তা আমাদের কাছে পরম প্রাপ্তির বিষয় । মধ্যপ্রদেশের যে'কটা জায়গা আমরা ঘুরেছি, তার মধ্যে যেটা সবচেয়ে বেশি আমাদের নজর কেড়েছে তা হল এখানকার মানুষের অতিথিবৎসলতা । রাজ্যটা বেশ অনেকটাই ট্যুরিজমের উপর নির্ভরশীল, কিন্তু সেরকম হলেই যে মানুষ সবসময়ে অতিথিবৎসল হয়, তা নয় । আরেকটা জিনিস আমাদের ভালো লেগেছে, সেটা হল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা । মধ্যপ্রদেশের যে'কটা জায়গা আমরা দেখেছি, সেগুলো প্রত্যেকটাই অত্যন্ত সুন্দর - প্রত্যেকটা জায়গাতেই গিয়ে মনটা ভরে যায় । একটা ব্যাপার আমরা আগেই লক্ষ্য করেছিলাম, সেটা হল আমাদের চারপাশে চেনাশোনা লোকজনদের মধ্যে মধ্যপ্রদেশ ঘুরেছে, এরকম লোক কমই আছে । তাই আমাদের অভিজ্ঞতা একদিক থেকে দেখতে গেলে খুবই মৌলিক । তাই যদি একটা সপ্তাহের পাঁচদিন ছুটি পাওয়া যায়, তাহলে দূটো উইকএন্ড যোগ করে ন'দিন ঘোরার জন্য মধ্যপ্রদেশ একটা ভীষণ ভালো ঘোরার জায়গা । ঘোরার খরচ ভারতবর্ষের অন্য অনেক জায়গার থেকে কম, ঘুরে ভালো লাগার কোসেন্ট (যদি সেটা আদৌ পরিমাপযোগ্য হয় !) অনেক জায়গার থেকে বেশি । মধ্যপ্রদেশের রেল সংযোগ একটু দুর্বল, কিন্তু সঠিকভাবে পরিকল্পনা করতে পারলে সেটাকেও নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসা সম্ভব । তাই যদি মার্বেল রক সাঁচি ভীমবেঠকা পাঁচমারি ভ্রমণের অসাধারণ অভিজ্ঞতাকে উপলব্ধি করার ইচ্ছে হয়, তাহলে রেডি - গেট সেট - অন্‌ ইয়োর মার্ক ...!

মধ্যপ্রদেশ ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Sunday, April 16, 2017

বারকুল (চিল্কা) ভ্রমণ

ভ্রমণপথঃ

বৃহস্পতিবার ১৩ই এপ্রিল, ২০১৭ঃ হাওড়া - রাত ১১ঃ৩০ মিনিটে অমরাবতী এক্সপ্রেস
শুক্রবার ১৪ই এপ্রিল, ২০১৭ঃ সকাল ৬ঃ১০ মিনিট - ভুবনেশ্বর - সকাল ৭ঃ১০ মিনিটের ভুবনেশ্বর-ভিশাখাপত্তনম ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস - সকাল ৯ টা - বালুগাঁও - বারকুল । বারকুল - গোপালপুর - বারকুল । বারকুলে রাত্রিবাস ।
শনিবার ১৫ই এপ্রিল, ২০১৭ঃ বারকুলে জলপথে ভ্রমণ - বারকুলে রাত্রিবাস ।
রবিবার ১৬ই এপ্রিল, ২০১৭ঃ বারকুল - বালুগাঁও - সকাল ৮ঃ৪৯ মিনিটের ফলকনামা এক্সপ্রেস - বিকেল ৬ঃ২০ মিনিট - হাওড়া

ভারতবর্ষের ম্যাপ আঁকার সময়ে উড়িষ্যার এক জায়গায় একটা ছোট্ট জলাশয়ের খাঁজ দিতে হয়, মনে আছে ? (এটা না দিলে ভুল হয় না, তবে দিলে শিক্ষক-শিক্ষিকারা বেশি পছন্দ করেন ।) জায়গাটার নাম চিল্কা । ভারতবর্ষের বৃহত্তম আর পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম উপহ্রদ । লেকটা সুবিশাল, তার মধ্যে দু'টো জায়গায় দু'টো ট্যুরিস্ট স্পট আছে - রম্ভা আর বারকুল । এদের মধ্যে বারকুলে ১৪২৩ আর ১৪২৪ বাংলা বছরের সন্ধিক্ষণে সপ্তাহান্তে  দু'দিন কাটানোর অভিজ্ঞতা আমার ব্লগের এবারের বিষয় ।

ট্রেনে বালুগাঁও যাওয়ার পথে
আমাদের এবারের দল রাজগীর-এর অপরিবর্তিত দল । বারকুল যাওয়ার জন্য বালুগাঁওতে নামতে হয় আর হাওড়া থেকে বালুগাঁও যাওয়ার জন্য একাধিক ট্রেন রয়েছে । সবথেকে ভালো ট্রেন হল চেন্নাই মেল কিন্তু টিকিট না পাওয়ার জন্য আমরা ব্রেকজার্নি করতে বাধ্য হলাম । ১৩ই এপ্রিল, ২০১৭ বৃহস্পতিবার রাত ১১ঃ৩০ মিনিটের অমরাবতী এক্সপ্রেস ধরে আমরা পরেরদিন সকাল ৬ঃ১০ মিনিটে ভুবনেশ্বর নামলাম । সেখান থেকে সকাল ৭ঃ১০ মিনিটের ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস ধরে সকাল ৯ টায় বালুগাঁও । এই ভুবনেশ্বর থেকে বালুগাঁও যাওয়ার সময়ে প্রাকৃতিক দৃশ্য খুব সুন্দর । মাঝে মাঝেই ছোট ছোট পাহাড় - সেগুলোকে পাহাড় না বলে টিলা বলাই ভাল । এর মাঝখান দিয়ে ট্রেন ছুটে চলেছে । এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি হওয়া সত্ত্বেও গরম সেরকম লাগছিল না, একটা আরামদায়ক হাওয়া সারাক্ষণই পাওয়া যাচ্ছিল ।

বালুগাঁও স্টেশন থেকে বারকুল যাওয়ার জন্য চাইলে ও টি ডি সি (ওড়িশা ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন) থেকে গাড়ি বুক করে রাখা যায় । সেটা না করতে চাইলে শুধুমাত্র অটোই ভরসা । স্টেশন থেকে বারকুলের দূরত্ব ৭ কিলোমিটার মতো আর অটোয় যেতে মিনিট কুড়ির বেশি লাগে না । আমরা দু'টো অটো ধরে পৌঁছে গেলাম বারকুল পান্থনিবাসে ।

ব্যালকনি থেকে চিল্কা
এর আগে চাঁদিপুরে আমরা ও টি ডি সি-তে ছিলাম আর এবারে বারকুলে । জায়গাটা একটা বিশাল চত্বর আর তার মাঝে মাঝে কয়েকটা দোতলা বিল্ডিং । ট্যুরিজমের ব্যাপারে উড়িষ্যা সরকার বিশেষ যত্নবান এটা আগেও দেখেছি - এই রাজ্যের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তিই হল ট্যুরিজম । একটা বিল্ডিং-এর দোতলায় পাশাপাশি তিনটে ঘরে আমরা আর কঙ্কনাদিরা থাকলাম । কিছুটা দূরে একটা এ সি কটেজে সমীরণদারা । আমাদের ঘরগুলো সবই লেকের সামনে - প্রত্যেকটা ঘরের সঙ্গেই লাগোয়া ব্যালকনি আছে যেখানে বসে লেকের দৃশ্য উপভোগ করা যায় (দাঁড়িয়েও করা যায়, যেহেতু উপভোগের সঙ্গে আরামের সরাসরি সম্পর্ক আছে তাই বসলে বেশী ভালো লাগে !) । আমরা ঘরে ঢুকে একটু হাতমুখ ধুয়ে চলে গেলাম ডাইনিং হলে ।

চত্বরের মধ্যেই একটা সুবিশাল ডাইনিং হল । ভেতরটা এ সি । এখানে একসঙ্গে অন্ততঃ ৫০ - ৬০ জন বসে খেতে পারে । এখানে ঘরের চার্জের সঙ্গে ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টারি, যদিও প্রথমদিনের ব্রেকফাস্টটা আমরা কমপ্লিমেন্টারি নিলাম না, সেটা আমরা রেখে দিলাম ফেরার দিনের জন্য ।
(অঙ্কটা বোঝা যাচ্ছে না ? বুঝিয়ে দিচ্ছি । আমরা থাকছি দু'দিন । সেই হিসেবে আমাদের দু'টো ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টারি হয় । আমরা প্রথমদিন নিলাম না, দ্বিতীয়দিন একটা আর তৃতীয়দিন সকালে আমরা যখন চেক্‌আউট করব, তখন আরেকটা নিয়ে নেব ।)
ব্রেকফাস্টে আমরা পাঁউরুটি-ডিমসেদ্ধ-কলা আর পুরী-সবজি নিলাম । এখানকার রান্না বেশ ভালো আর খিদেও পেয়েছিল, তাই গপাগপ খেয়ে ফেললাম !

পান্থনিবাসের ভেতরে
ঘরে ফিরে এসে চানটান করে নিলাম । এখানে ঘরে বসে এমনিই সময় কেটে যায় আর আমাদের সঙ্গে ছোটো বাচ্চা থাকায় আমাদের সময় কাটানোর কোনও সমস্যা হয় না (সত্যি বলতে কি, আমাদের মাঝে মাঝে সময়ের অভাবই হয় !) । দুপুরে দু'টো নাগাদ খেতে গেলাম । এখানে একধরনের মাছ পাওয়া যায় - নাম খাইঙ্গা । এটা এই অঞ্চলেরই মাছ, এখানেই লেক থেকে জেলেরা ধরে । একপ্লেটের দাম একপ্লেট পোনা মাছের দ্বিগুণ । আমরা একপ্লেট নিলাম টেস্ট করার জন্য । খেতে অনেকটা ভেটকি মাঝের মতো, তবে ভেটকির মতো অত সুস্বাদু নয় । ভাত, ডাল, আলুভাজা, মাছ আর চিংড়ি নিয়ে আমাদের ন'জনের মোট খরচ পড়ল ২,১৪৫/- টাকা ।

গোপালপুর যাওয়ার পথে
দুপুরে ঘরে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম । বিকেল ৪ টের সময়ে একটা বোলেরো নিয়ে বেরিয়ে পড়া হল গোপালপুরের উদ্দেশ্যে । একটা বোলেরোতে ন'জন ধরা আক্ষরিক অর্থেই 'বেশ চাপের' কিন্ত কথায় বলে "যদি হও সুজন/বোলেরোতে ন'জন" - তাই কষ্টেসৃষ্টে আমরা বসে পড়লাম । বারকুল থেকে গোপালপুরের দুরত্ব ৭৫ কিলোমিটার হলেও যেতে ঘন্টা দেড়েকের বেশি লাগল না তার প্রধান কারণ হল রাস্তাটা দুর্দান্ত । একেবারে মাখনের মতো সুন্দর রাস্তা তাই গাড়িতে বসে বোঝাই যাচ্ছিল না যে মাঝে মাঝে গাড়ির গতি ঘন্টায় ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি হয়ে যাচ্ছে । রাস্তার দৃশ্যও খুব সুন্দর - একজায়গায় রাস্তাটা একটা পাহাড়ের গা দিয়ে কিছুটা গেছে । সেখান থেকে চিল্কা লেকের দৃশ্য খুব সুন্দর । এখানে আমরা মিনিট দশেক দাঁড়িয়ে ছবিটবি তুললাম ।

গোপালপুর সি-বিচ্‌
গোপালপুর মানে 'গোপালপুর অন্‌ সি' (কেন যে গোপালপুরকে 'গোপালপুর অন্‌ সি' বলা হয় আমি কখনও বুঝিনি । সমুদ্রের ধারের যেকোনও জায়গাই তো অন্‌ সি । কিন্তু পুরী অন্‌ সি বা দীঘা অন্‌ সি কখনও বলা হয় না, শুধুমাত্র গোপালপুরই অন্‌ সি ।) । গোপালপুরের বিচটা খুব সুন্দর । আমরা যখন পৌঁছেছি, তখন সবেমাত্র সূর্য্যাস্ত হয়েছে । আকাশ আর সমুদ্রের মধ্যে চলেছে রঙের আদানপ্রদান । আবহাওয়া খুবই আরামদায়ক - একটা সুন্দর হাওয়া দিচ্ছিল । গরম একেবারেই লাগছিল না । আমরা কিছুক্ষণ জলে পা-টা দিয়ে পাড়ে এসে বসলাম । বাঁধানো পাড়ে সুন্দর বসার জায়গা করা আছে । এখানে বসে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দেওয়া যায় । আমরা অবশ্য অতঘন্টা বসিনি, কিছুক্ষণ বসার পরে ওখান থেকে উঠে এসে একটা দোকান থেকে চিকেন পকোড়া খেয়ে নেওয়া হল । খরচ হল ৩০০/- টাকা ।

৭ টা নাগাদ আমরা ফেরার পথ ধরলাম । ফেরার জন্য সময় বেশি লাগল কারণ রাত্রিবেলা অত জোরে গাড়ি চালানো যায় না, চালানো উচিৎও নয় । বারকুল পান্থনিবাসে পৌঁছতে আমাদের প্রায় ন'টা বেজে গেল । গোপালপুর যাতায়াতের জন্য গাড়ি নিল ২,৫০০/- টাকা । দশটা নাগাদ আমরা ডাইনিং হলে গেলাম । রাতের মেনু ছিল রুটি আর চিকেন কারি । খরচ হল ১,১৯৭/- টাকা ।

লেকের ওপরে সূর্য্যোদয়
১৫ই এপ্রিল, ২০১৭ শনিবার - বাংলা নববর্ষ । সকালে যখন উঠলাম তখন সবে সূর্য্যোদয় হয়েছে । আমাদের ঘরগুলো থেকে খুব সুন্দর সূর্য্যোদয় দেখা যায় । একেবারে লেকের জলের ওপর থেকে সূর্য্য ওঠে । কিছুক্ষণ পরে আমরা ডাইনিং রুমে গেলাম ব্রেকফাস্ট করতে । মেনু আগের দিনের মতোই - এখানে এই মেনুই প্রতিদিন হয় । ব্রেকফাস্ট করে সকাল ৯ টার সময়ে আমরা বেরোলাম জলবিহারে । ও টি ডি সি থেকে বোটে করে বিভিন্ন দ্বীপে যাওয়ার ব্যবস্থা আছে । সেরকমই একটা বোট আমরা ভাড়া করেছিলাম । বোটে ২০ জনের বসার জায়গা আছে । মাথাটা পুরোটাই ছাউনি দেওয়া । বোটে চড়ার জন্য ও টি ডি সি-র নিজস্ব জেটির মতো আছে । সেখান থেকে বোটে চড়ে আমরা রওনা দিলাম 'কালিজাই দ্বীপ'-এর দিকে । চিল্কায় একটা জায়গা আছে যেখানে গেলে ডলফিন দেখতে পাওয়া যায় (মানে গেলে দেখতে পাওয়া যাবেই এরকম কোনও কথা নেই - অনেকটা সুন্দরবনে গিয়ে বাঘ দেখতে পাওয়ার মতো । না, ভুল লিখলাম । হয়তো এতটা অনিশ্চিতও নয় ।) । কিন্তু আমরা গেলাম না কারণ এখন গ্রীষ্মকাল আর এই সময়ে নাকি ডলফিন সেভাবে দেখা যায় না ।

আমাদের বোটে আমরা সবাই
আমাদের এই জলপথে ভ্রমণটা খুবই সুন্দর । চিল্কার সঙ্গে সমুদ্রের যোগাযোগ আছে আর যেহেতু এর পরিসর সুবিশাল তাই এখানে ঢেউও আছে । তারই মধ্যে আমাদের বোট এগিয়ে চলল । রোদের তেজ বেশ বেশি হলেও জলের মধ্যে সেরকম গরম লাগে না - একটা ঠান্ডা হাওয়া বইতে থাকে । এই জলপথে ভ্রমণটা আমাদের মহারাষ্ট্র ভ্রমণ-এ যেদিন আমরা লঞ্চে করে মুম্বই থেকে এলিফ্যান্টা গেছিলাম, সেদিনের মতো ।  পার্থক্য হল সেদিন লঞ্চে আমাদের দল ছাড়াও আরও লোক ছিল আর এবারে শুধু আমরাই ।

কালিজাই মন্দিরের সামনে
প্রায় ৪৫ মিনিট চলার পর আমরা পৌঁছলাম কালিজাই দ্বীপ-এ । এখানে একটা কালিজাই দেবীর মন্দির আছে । দ্বীপটা সবমিলিয়ে খুব একটা বড় না, পুরোটা হেঁটে ঘুরতে বড়জোর ঘন্টাখানেক লাগে । আর সত্যি কথা বলতে কি ঘুরে দেখার মতো সেরকম কিছু নেইও । দ্বীপের মধ্যে একটা ছোট্ট টিলা আছে আর এর ওপরে একটা ছাউনি দেওয়া জায়গা । আমরা সেই ছাউনিটার ওপরে উঠলাম । এটাই দ্বীপের সর্ব্বোচ্চ জায়গা । এখান থেকে অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যায় । সেখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে নেমে এসে আমাদের মধ্যে কয়েকজন গেলাম দ্বীপটাকে একটা চক্কর দিতে । কিছুদূর গিয়েই বুঝতে পারলাম দেখার কিছুই নেই, ঝোপঝাড় গাছপালার মধ্যে একটা সিমেন্টের বাঁধানো পায়ে চলা পথ । সেটা দিয়ে দ্বীপের কিছুটা ঘুরে আমরা যেখানে বোট থেকে নেমেছিলাম, সেখানে ফিরে এলাম । ঘড়ি বলছে বেলা সাড়ে দশটা, আর তাই আমরা এবার ফেরার জন্য বোটে উঠে পড়লাম (না, আমরা কালিজাই মন্দিরে ঢুকিনি, পুজো দেবারও কোনও প্রশ্ন ওঠে না) ।

ফেরাটাও একই রকম তাই সেটার সম্পর্কে আর বিস্তারিত লিখছি না । ফেরার সময়েও একই সময় লাগল । বোট থেকে নেমে যখন পান্থনিবাসের দিকে যাচ্ছি, তখন গরমটা টের পাওয়া যাচ্ছিল । এখানে জানিয়ে রাখি চিল্কা হ্রদ হিসেবে সুবিশাল হলেও আদপে এটা একটা হ্রদই, তাই সমুদ্রের মতো সবসময়ে এখানে হাওয়া দেবে এরকম আশা করা ঠিক নয় । বিশেষ করে মাঝে মাঝে বেশ গুমোটই লাগে । তবে জলের ধারে জায়গা, তাই বাতাসে আর্দ্রতা বেশি, তাই গরমে গা পুড়ে যাওয়ার ব্যাপারটা নেই ।

ঘরে ফিরে এসে আবার সেই 'কিছু করার নেই' অর্থাৎ অনেক কিছু করার আছে । দুপুরে খেতে গেলাম দু'টো নাগাদ । মেনু প্রায় একই, তবে মাছের বদলে বেশ কয়েক প্লেট চিকেন নেওয়া হল বলে খরচ কিছুটা কম পড়ল - ১,৪১০/- টাকা । ঘরে ফিরে এসে কিছুক্ষণ বারান্দায় বসে আড্ডা মারলাম ।

ও টি ডি সি-র নিজস্ব ঘেরা জায়গায়
বিকেলে আমাদের আর আলাদা করে কোথাও যাওয়ার ছিল না, তাই পান্থনিবাসের সামনেই ও টি ডি সি-র যে জেটিটা আছে, সেখানে গেলাম । এখানে লেকের কিছুটা জায়গা ও টি ডি সি ঘিরে রেখেছে, সেই ঘেরা জায়গার পাঁচিলের ওপর দিয়ে চাইলে হেঁটে ঘোরা যায় । এখানে নির্দিষ্ট দূরে কয়েকটা বসার জায়গাও রয়েছে । আমরা যখন সেখানে গেলাম, তখন সবেমাত্র সূর্য্যাস্ত হয়েছে, পেছনের পাহাড়ের ওপর সেই দৃশ্য দেখতে ভারী সুন্দর লাগছিল । জায়গাটায় পর্য্যাপ্ত আলো আছে, তাই সন্ধ্যে পেরিয়ে গেলেও কোনও অসুবিধে নেই । আর সবথেকে বড় কথা জায়গাটা ও টি ডি সি-র এলাকার মধ্যে, তাই নিরাপত্তা নিয়েও কোনও সমস্যা নেই ।

এখান থেকে ফিরে এসে আমরা বেরোলাম পান্থনিবাসের বাইরে । কিছু দেখার নেই, তবে একটা বড় দলে সবাই মিলে একসঙ্গে হেঁটে ঘোরাঘুরি করতেও ভালোই লাগে, আর আমরা মাঝে মাঝে সেটাই করে থাকি । পান্থনিবাসের বাউন্ডারির বাইরেই কিছু দোকান আছে, সেখান বসে আমরা বাঁধাকপির পকোড়া, বড়া ইত্যাদি খেলাম । বাঁধাকপির পকোড়াটা বেশ নতুন ধরনের, খেয়ে একেবারেই বোঝা যায় না যে বাঁধাকপি দিয়ে তৈরি । এই দোকানেই আমাদের ডিনার অর্ডার দিয়ে ঘরে ফিরে এলাম । রাত ন'টা নাগাদ গিয়ে ডিনার নিয়ে আসা হল । বলা বাহুল্য, খরচ অনেক কম পড়ল । রুটি আর চিকেন নিয়ে খরচ হল ৮৯৯/- টাকা ।

১৬ই এপ্রিল, ২০১৭ - রবিবার সকালে ঘুম ভাঙল আগেরদিনের থেকেও আগে - তখনও অন্ধকার কাটেনি । এই অবস্থা থেকে আলো ফুটে সূর্য্যোদয় যতক্ষণে হয়, সেই পুরো সময়টা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে খুব ভাল লাগে । আগেই বলেছি, এখানে জলের ওপর থেকে সূর্য্যোদয় দেখা যায় । বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য উপভোগ করলাম ।

আমাদের ঘর
সকাল ৮ টা নাগাদ আমরা পান্থনিবাস থেকে চেক্‌আউট করে বেরিয়ে পড়লাম । আমাদের প্রাপ্য ব্রেকফাস্টটা আমরা প্যাক করে নিয়ে নিলাম । আমাদের ফেরার ট্রেন ফলকনামা এক্সপ্রেস বালুগাঁও থেকে সকাল ৮ঃ৪৯ মিনিটে । স্টেশনে আসতে মিনিট কুড়ির বেশি লাগে না । স্টেশনে এসে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরেই ট্রেন এসে গেল । ফলকনামা একেবারে হাওড়া পর্যন্ত্য যায়, তাই ফেরার সময়ে আমাদের আর ব্রেকজার্নি করতে হবে না । আমাদের সঙ্গে কোনও লাঞ্চের ব্যবস্থা ছিল না, ট্রেনের প্যান্ট্রির খাবারই ভরসা । দুপুরে চিকেনভাত আর নিরামিষ ভাত নিয়ে ভাগাভাগি করে খাওয়া হল ।

ফলকনামার হাওড়া পৌঁছনোর নির্ধারিত সময় বিকেল ৫ঃ৪৫ মিনিট আর মাত্র আধঘন্টা দেরীতে আমরা পৌঁছে গেলাম । তারপর ট্যাক্সিতে বাড়ি !

সারসংক্ষেপঃ

১. কলকাতা থেকে ৯ ঘন্টার ট্রেনের দূরত্বে উড়িষ্যায় চিল্কা হ্রদ একটা বিখ্যাত বেড়ানোর জায়গা । চিল্কায় থাকার জায়গা মূলতঃ দু'টো - বারকুল আর রম্ভা ।
২. বারকুল আর রম্ভা দু'টো জায়গাতেই ও টি ডি সি-র পান্থনিবাস আছে । এদের ওয়েবসাইট https://visitodisha.org/Search-Hotel-List থেকে বুকিং করা যায় অথবা এদের কলকাতার অফিস 'উৎকল ভবন' থেকেও বুকিং করা যায় । উৎকল ভবনের ফোন নম্বর হল - (033)22493653.
৩. শুধুমাত্র বারকুল নয়, ও টি ডি সি-র যেকোনও পান্থনিবাসে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য ১০% ছাড় আছে । যদি দলে কোনও প্রবীণ নাগরিক থাকেন তাহলে তাঁর নামে বুকিং করার সময়ে সেটা মাথায় রাখলে ভাল ।
৪. বারকুল পান্থনিবাসের চেক-আউটের সময় হল সকাল ৮ টা অর্থাৎ এদের সময়সীমা ৮ টা থেকে ৮ টা ।
৫. পান্থনিবাসের ঘরগুলো সবই লেকের দিকের । ঘরের ব্যালকনি থেকে লেকের দৃশ্য উপভোগ করা যায় ।
৬. প্রত্যেক ঘরের সঙ্গেই কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট রয়েছে । এখানে খাবারের মান বেশ ভালো । এখানে একটা আলাদা ডাইনিং রুম আছে আবার চাইলে ঘরে আনিয়েও খাবার খাওয়া যেতে পারে ।
৭. এখানে বেড়ানোর জায়গা বলতে চিল্কা লেক । লেকে বোটিং করার ব্যবস্থা আছে, আর বোটে করে এখান থেকে কাছাকাছি কালিজাই দ্বীপে যাওয়া যায় ।
৮. বারকুল থেকে কালিজাই দ্বীপ বোটে যেতে ৪০ - ৪৫ মিনিট লাগে । এই দ্বীপে মুলতঃ একটা কালিমন্দির আছে । দ্বীপটা খুব একটা বড় নয়, পুরোটা হেঁটে ঘুরতে ঘন্টাখানেকের বেশি লাগার কথা নয় ।
৯. এখানে একটা জায়গা আছে যেখান থেকে ডলফিন দেখতে পাওয়া যায় । তবে গরমকালে দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে আমরা আর এখানে যাইনি ।
১০. বারকুল থেকে চাইলে গোপালপুর যাওয়া যেতে পারে - দূরত্ব ৭৫ কিলোমিটার । গোপালপুরের আলাদা কোনও বৈশিষ্ট্য নেই - শুধুমাত্র একটা সী-বিচ্‌ ।
১১. গোপালপুর যাতায়াতের রাস্তাটা খুব সুন্দর । কিছুটা রাস্তা পাহাড়ের ওপর দিয়ে আর সেখান থেকে লেকের দৃশ্য দেখতে খুবই ভালো লাগে ।
১২. বছরের যেকোনও সময়েই বারকুল যাওয়া যেতে পারে । জলের ধারে হওয়ায় এখানকার তাপমাত্রায় বিশেষ পরিবর্তন দেখা যায় না ।

উপসংহারঃ

চিল্কা
প্রধানতঃ সমুদ্রভিত্তিক পর্যটনশিল্পভিত্তিক রাজ্য উড়িষ্যার একটা অন্যতম পর্যটনের জায়গা হল চিল্কা - যেটা সমুদ্রভিত্তিক নয় । আর চিল্কার এক দিকে বারকুলে পর্যটন শিল্প গড়ে উঠেছে । এখানে সমুদ্রের গর্জন নেই, রয়েছে লেকের নিস্তব্ধতা । এখানে জলের উচ্ছাস নেই, রয়েছে স্নিগ্ধতা । এখানকার জলে স্নান করা যায় না, শুধুই দেখে উপভোগ করত হয় । আর এগুলোই চিল্কার ইউ এস পি । এখানে কাছাকাছির মধ্যে দেখার আর কিছুই নেই কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না । আমাদের মতো যারা বেড়াতে গিয়ে 'ক'টা জায়গা দেখা হল' আঙুলের গাঁট গুণে সেই হিসেব করে না, তাদের জন্য চিল্কা একটা আকর্ষণীয় জায়গা । শান্ত, নিরিবিলি জায়গায় প্রকৃতির সৌন্দর্য্য উপভোগ করার জন্য চিল্কা । দৈনন্দিন একঘেয়ে রুটিনের বাইরে বেরিয়ে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার জন্য চিল্কা । কম পুঁজি আর দিনতিনেকের ছুটি সম্বল করে বেড়ানোর মতো জায়গা হল চিল্কা । চিল্কা এমন একটা জায়গা যেখানে বারবার গেলেও একঘেয়ে লাগবে না । আর যারা কখনও যায়নি, তাদের ভালো লাগতে বাধ্য । এই ভালো লাগাটা অনুভব করার জন্য একবার ঘুরে আসতেই হবে - চিল্কা !

বারকুল ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Sunday, January 1, 2017

রাজগীর ভ্রমণ

ভ্রমণপথঃ

বুধবার ২৮শে ডিসেম্বর, ২০১৬ঃ হাওড়া - রাত ৮ঃ৩৫ মিনিটে দানাপুর এক্সপ্রেস
বৃহস্পতিবার ২৯শে ডিসেম্বর, ২০১৬ঃ সকাল ৭ঃ৪৫ মিনিট - বখ্‌তিয়ারপুর - সকাল ১০ টায় প্যাসেঞ্জার ট্রেন - দুপুর ১২ টা - রাজগীর । রাজগীরে রাত্রিবাস ।
শুক্রবার ৩০শে ডিসেম্বর, ২০১৬ঃ রাজগীর - নালন্দা - রাজগীরে রাত্রিবাস ।
শনিবার ৩১শে ডিসেম্বর, ২০১৬ঃ রাজগীরে লোক্যাল সাইট সিয়িং - গাড়িতে বখ্‌তিয়ারপুর - রাত ১০ঃ০৯ মিনিটে রাজেন্দ্রনগর হাওড়া এক্সপ্রেস
রবিবার ১লা জানুয়ারী, ২০১৭ঃ সকাল ১০ টা - হাওড়া

মাধ্যমিকে যখন ইতিহাস পড়েছি, তখন বইয়ের প্রথমদিকে যেসব সাম্রাজ্য বা রাজবংশের কথা লেখা থাকত তার বেশিরভাগগুলোরই সময়কাল BC অর্থাৎ যীশুখৃষ্টের জন্মের আগেকার । এইসময়কার বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শনের কিছু আমাদের চারপাশে এখনও দেখা যায় - এখনও ভারতবর্ষে এরকম অনেক জায়গা রয়েছে যেগুলো সেইসময়কার ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে । সেইরকমই একটা আদ্যন্ত ঐতিহাসিক জায়গা হল - বিহারের 'রাজগীর' । রাজগীর শব্দটা আসলে 'রাজগৃহ' শব্দ থেকে এসেছে যার অর্থ রাজার গৃহ । ইতিহাসের বিভিন্ন রাজারা এখানে বিভিন্ন সময়ে রাজধানী স্থাপন করেছেন । মৌর্য্য বংশ, সম্রাট অশোক, হর্যঙ্ক বংশ, বিম্বিসার, অজাতশত্রু ইতিহাসের এইসব নাম এই রাজগীরের সঙ্গে যুক্ত । গত ইংরিজী বছরের শেষ ক'টা দিন এখানে ঘোরাঘুরির অভিজ্ঞতাই আমার এবারের লেখার বিষয়বস্তু ।

আমরা প্রত্যেকবারই যেখানে বেড়াতে যাই, আগে থেকে সেই জায়গাটার সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, এটা আগেও বলেছি । কিন্তু রাজগীরের ক্ষেত্রে সেটা করতে গিয়ে যে বিশেষ অসুবিধের মধ্যে পড়তে হয়েছে সেটা হল ইন্টারনেটে রাজগীর সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না । তার মানে এই নয় যে এখানে লোকজন বেড়াতে যায় না, তবে ট্যুরিজমের ব্যাপারে বিহার যে ভারতের বেশিরভাগ রাজ্যের থেকে এখনও অনেকটা পিছিয়ে আছে, সেটা বলতেই হবে । হোটেল বুকিং-এর ক্ষেত্রেও আমাদের বিস্তর খোঁজাখুঁজি করতে হয়েছে আর শেষ পর্যন্ত আমরা যা পেয়েছিলাম ... থাক সেটার ব্যাপারে বিস্তারিত যথাসময়ে লিখব । আপাতত বেড়ানো শুরু করা যাক !

এবারে আমাদের দল তিনজন শিশুসমেত বারোজনের । কে কে ছিল সেটা আর আলাদা করে লিখছি না, এটা আমাদের দেওঘর ভ্রমণের অপরিবর্তিত দল । ২৮শে ডিসেম্বর, ২০১৬ বুধবার হাওড়া স্টেশন থেকে রাত ৮ঃ৩৫ মিনিটে দানাপুর এক্সপ্রেসে আমরা রওনা দিলাম । রাজগীরে স্টেশন থাকলেও এটা মেইন লাইনের মধ্যে পড়ে না, অনেকটা দেওঘরের মতোই । দেওঘর যেতে গেলে যেমন জসিডি-তে নেমে ট্রেন বা গাড়ি করে যাওয়া যায়, সেরকমই রাজগীর যেতে গেলে নামতে হয় বখ্তি‌য়ারপুরে (এটা শুনেই বখ্তি‌য়ার খিলজীর কথা মনে পড়ছে তো ? সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবেই জিজ্ঞেস করছি, ওনার
পুরো নাম মনে আছে ? যাদের মনে নেই তাদের জন্য উত্তরটা হল 'ইখতিয়ার-উদ্দীন মহম্মদ বিন বখ্তি‌য়ার খিলজী') । তবে দেওঘরের সঙ্গে পার্থক্য হল বখ্‌তিয়ারপুর থেকে রাজগীর পৌঁছতে দু'ঘন্টা সময় লাগে ।

বখ্‌তিয়ারপুর স্টেশনে কুয়াশা
দানাপুর এক্সপ্রেসের বখ্তি‌য়ারপুর পৌঁছনোর কথা ভোর ৪ঃ৫৩ মিনিটে । আমরা ঠিক করে রেখেছিলাম বখ্‌তিয়ারপুর থেকে সকাল ৬ঃ১০ এর প্যাসেঞ্জার ট্রেনে রাজগীর যাব । কিন্তু কুয়াশার জন্য দানাপুর এক্সপ্রেস প্রায় তিনঘন্টা লেট করে বখ্‌তিয়ারপুর পৌঁছল । স্বভাবতই আমাদের প্যাসেঞ্জার ট্রেন আর ধরা হল না এবং আমরা পরের ট্রেন ধরলাম । এই পরের ট্রেনটা সকাল ৮ঃ০৫ - এ বখ্‌তিয়ারপুর থেকে ছাড়ার কথা হলেও সেটা ছাড়ল প্রায় ১০ টা । যাইহোক, নানারকম বিভ্রাটের মধ্যে দিয়ে আমরা রাজগীর পৌঁছলাম দুপুর বারোটা ।

রাজগীর স্টেশন থেকে আমাদের হোটেলের দূরত্ব খুব বেশি না, আমরা একটা টাঙ্গা আর দু'টো রিক্সা করে পৌঁছে গেলাম 'হোটেল মমতা'-য় । হোটেলটার সম্পর্কে খুব বিস্তারিত লিখছি না তবে এটা বলতে পারি আমরা আজ পর্যন্ত্য বেড়াতে গিয়ে যত হোটেলে থেকেছি, হোটেল মমতা তার সবথেকে খারাপগুলোর একটা । আমাদের যেরকম ঘর দেওয়ার কথা ছিল, যে তলায় দেওয়ার কথা ছিল, সেসব তো এরা কিছু দিতে পারলই না, উপরন্তু হোটেলের রিসেপশনে যারা বসে তাদের ব্যবহারও সাংঘাতিক রকমের খারাপ । আমি ইতিমধ্যেই হলিডে-আই-কিউ এ এই হোটেলের পেজে আমার রিভিউ লিখে ফেলেছি । জানতে চাইলে এখানে ক্লিক করতে হবে ।

দুপুরে আমরা এখান থেকেই খেয়ে নিলাম । মমতা হোটেলের খাবারের মান তুলনামূলকভাবে খারাপ নয়, ভাত মাছ ডিম চিকেন নিয়ে খরচ পড়ল ১,৬১৪/- টাকা । খাওয়া শেষ করে ঘরে এলাম তখন বিকেল সাড়ে তিনটে বেজে গেছে । আমাদের ট্রেন দেরি না করলে প্রথমদিনটা হয়তো আমরা কিছুটা ঘুরতে পারতাম, কিন্তু এখন আর সেই প্রশ্ন ওঠে না । তাই যে যার ঘরে বিশ্রাম নিয়ে আর আড্ডা মেরে সন্ধ্যেটা কাটিয়ে দিলাম । রাতে ফ্রাইড রাইস, রুটি, চিকেন কারি ইত্যাদি খাওয়া হল । খরচ হল ১,০৬৯/- টাকা ।

হোটেল আনন্দলোকের ঘর
পরেরদিন ৩০শে ডিসেম্বর, ২০১৬ শুক্রবার । সকালে উঠে আমাদের প্রথম কাজ হল মালপত্র গুছিয়ে হোটেল থেকে চেক্‌ আউট করা । হ্যাঁ, আমরা এটাই করেছি । এদের কাছে আমাদের যা অগ্রিম দেওয়া ছিল তার থেকে একদিনের ভাড়া বাদ দিয়ে বাকিটা ফেরৎ নিয়ে সকাল ন'টা নাগাদ মমতা হোটেলের বিরক্তিকর পরিষেবা থেকে বেরিয়ে আমরা চলে গেলাম 'হোটেল আনন্দলোক'-এ । এই হোটেলটা আগেরদিন সন্ধ্যেবেলাই ঠিক করা হয়েছিল । এটা দারুণ কিছু না হলেও মমতা-র থেকে ভালো । একটা সমস্যা হল এখানে খাওয়ার ব্যবস্থা নেই । তবে বাজারের কাছে হওয়ায় কাছাকাছির মধ্যে খাওয়ার জায়গার অভাব নেই ।

এবার আমাদের ঘুরতে বেরোনো । রাজগীরে এসে ইতিমধ্যেই অনেক সময় নষ্ট হয়েছে । হোটেলের কাছে একটা দোকান থেকে কচুরি-জিলিপি দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে একটা টাটাসুমো নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম আমাদের প্রথমদিনের গন্তব্য 'নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়'-এর ধ্বংসস্তূপ দেখতে ।

রাজগীরের কাছাকাছি যেসব দেখার জায়গা আছে, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় তারমধ্যে সবথেকে বেশি ঘ্যাম । রাজগীর থেকে নালন্দা যেতে গাড়িতে আধঘন্টা মতো লাগে । এখানে গিয়ে দেখলাম প্রচন্ড ভীড় - ৩০শে ডিসেম্বরের ছুটিতে শুধু দূরের পর্যটকরা নয়, স্থানীয় লোকজন এমনকি কয়েকটা স্কুলের বাচ্চারাও হাজির হয়েছে ।

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় 'আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া' রক্ষণাবেক্ষণ করে । এবং এটা 'ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ প্রপার্টি' । ঢোকার টিকিট মাথাপিছু ১৫/- টাকা এবং পনেরো বছরের নিচে ফ্রি । মূল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে একটা বড় চৌহদ্দী আছে, গেট দিয়ে ঢোকার পর সেটা দেখতে পাওয়া যায় । এখানে বেশ সুন্দর করে ছাঁটা ঘাস, ফুলের বাগান ইত্যাদি রয়েছে ।

এরপর আমরা মূল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ঢুকলাম । এই জাতীয় ঐতিহাসিক জায়গায় একজন গাইড নিলে ভালো দেখা যায় এটা আগেও দেখেছি, (মুর্শিদাবাদের সেই গাইডের কথা আমি কখনও ভুলব না "জানলে ইতিহাস আর না জানলে মাটির দেওয়াল") তাই আমরা ২০০/- টাকা দিয়ে একজন গাইড ভাড়া করলাম । সেই গাইড আমাদের পুরো জায়গাটা ঘুরে দেখাল । আমি এখানে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিস্তারিত লিখব না, এই সম্পর্কে ইন্টারনেটে অনেক লেখা পাওয়া যায় । আমি শুধু সেটাই লিখছি যেটা আমরা নিজের চোখে দেখেছি আর নিজের কানে শুনেছি ।

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় আনুমানিক পঞ্চম ও ষষ্ঠ খ্রীষ্টাব্দ থেকে তৈরি শুরু হয় । গুপ্ত বংশের আমলে এর খ্যাতি খুব বেশি হয় । এরপর বিভিন্ন রাজবংশের আমলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গঠনগত নির্মাণের কিছু পরিবর্তন করা হয় । আমাদের গাইড আমাদের একটা বিশাল চত্বরে নিয়ে গেল যেটাকে আধুনিককালের একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ হোস্টেল বা ছাত্রাবাস বলা যেতে পারে । এখানে ছাত্রদের জন্য থাকার ঘর, জলের জন্য কুয়ো, রান্নার ব্যবস্থা ইত্যাদি তো রয়েইছে, সেইসঙ্গে আছে পড়াশোনা এবং অধ্যাপকের থাকার ব্যবস্থা । নালন্দায় সাহিত্য, দর্শন, ধর্ম প্রভৃতি বিষয়ে পড়ানো হত । এখানে বলে রাখি নালন্দার ধ্বংসস্তূপ মাটির নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিল, ভারতীয় পুরাতত্ত্ববিভাগ এই নিয়ে কাজ করছে । এখনও এর বেশ কিছু অংশ মাটির নিচেই আছে বলে অনুমান করা হয় । যতটা উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে তার মধ্যে আমাদের দেখা ছাত্রাবাসের মতো মোট ন'টা ছাত্রাবাস আছে । প্রত্যেকটা ছাত্রাবাসের বাইরে একটা করে বৌদ্ধমন্দির রয়েছে । প্রত্যেকদিন অধ্যায়নের শুরু এবং শেষে ছাত্রদের এখানে একবার করে পুজো করতে হত ।

ছাত্রাবাস
ছাত্রাবাসে প্রত্যেক ছাত্র এবং শিক্ষকের নিজস্ব ঘরের ব্যবস্থা ছিল, অর্থাৎ এখনকার দিনের হোস্টেলের মতো একই ঘরে একের বেশি ছাত্রকে থাকতে হত না । রান্নাবান্না ছাত্রদেরই করতে হত এবং নিজেদের অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজকর্ম্মও নিজেদেরই করতে হত । নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় সেইযুগে শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম ছিল, সারা দেশ থেকে ছাত্ররা এখানে পড়তে আসত । কিন্তু চাইলেই এখানে পড়াশোনার সুযোগ মিলত না, নালন্দার প্রবেশিকা পরীক্ষা ছিল রীতিমতো কঠিন । বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রবেশদ্বারে যে দ্বারপাল থাকত, বাইরে থেকে আসা ছাত্রদের প্রথমে তার কাছে পরীক্ষা দিতে হত । সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তবেই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের অনুমতি মিলত, না হলে সেখান থেকেই ফিরে যেতে হত । এইভাবে প্রত্যেক বছর মাত্র ৩০% ছাত্র নালন্দায় প্রবেশ করতে পারত । আমাদের গাইড হিন্দীতে বলল "তাহলেই বুঝে দেখুন, যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারপালই এত পন্ডিত, সেখানকার অধ্যাপকরা কিরকম হত !"

নালন্দার সেই স্তূপ
ছাত্রাবাসের বাইরে মাঠের মধ্যে অনেক ছোট ছোট বৌদ্ধস্তূপ ছড়িয়ে রয়েছে । এসব ছাড়া যেটা বেশি করে চোখে পড়ে সেটা হল নালন্দার সেই বিখ্যাত স্তূপ - যেটা আমরা ইতিহাস বইয়ের পাতায় সবসময়ে দেখতে পাই । মজার ব্যাপার হল এটা নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাগোয়া হলেও এর সঙ্গে কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও সম্পর্ক নেই - এটা সম্রাট অশোকের সময়ে তৈরি । আমরা এই চত্বরে আরও কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে বেরিয়ে পড়লাম ।

পাওয়াপুরী
আমাদের পরবর্তী গন্তব্য 'পাওয়াপুরী' । এখানে একটা জৈনমন্দির আছে । নালন্দা থেকে পাওয়াপুরী যেতে কুড়ি মিনিট মতো লাগে । পাওয়াপুরীর মন্দিরের বৈশিষ্ট্য হল এটা একটা হ্রদের মাঝখানে । হ্রদের পাড় থেকে একটা রাস্তা চলে গেছে মন্দির পর্যন্ত্য । এখান দিয়ে যাওয়ার সময়ে জলের মধ্যে মাছ, হাঁস প্রভৃতি দেখা যায় ।  মন্দিরটা সম্পূর্ণ শ্বেতপাথরের তৈরি । চত্বরটা খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন । আমরা এখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে ফেরার পথ ধরলাম ।

বিকেল প্রায় চারটে বাজে এবং এখনও পর্যন্ত্য আমাদের দুপুরের খাওয়া হয়নি । পাওয়াপুরী থেকে অল্প কিছুটা আসার পর এক জায়গায় আমাদের গাড়ি লাঞ্চের জন্য দাঁড়াল । এখানে ভাত-ডিম-চিকেন নিয়ে আমাদের খরচ পড়ল ১,৪৪০/- টাকা । এরপর আমরা রাজগীর ফিরে এলাম । সারাদিনের ঘোরার জন্য গাড়ি নিল ১,০০০/- টাকা ।

আমরা হোটেলে ফিরেছি সন্ধ্যেবেলা । ঘরে বসে কিছু করার নেই, তাই আমরা আবার বেরিয়ে পড়লাম - এবার পদব্রজে । আমাদের হোটেলটা একেবারেই শহরের প্রাণকেন্দ্রে - দোকানপাট থেকে শুরু করে খাবার জায়গা সবই এখানে । আমরা কয়েকটা দোকান ঘোরাঘুরি করে কিছু জিনিসপত্র কেনাকাটা করলাম । বলা বাহুল্য, এমন কোনও জিনিস নেই যা কলকাতায় পাওয়া যায় না, তবে বেড়াতে গিয়ে সেই জায়গা থেকে কিছু কেনাকাটা করা কিছু মানুষের অভ্যেস আর সেরকম মানুষ আমাদের দলেও আছে !

রাত্রি সাড়ে আটটা নাগাদ আমরা হোটেলে ফিরে এলাম । রাজগীরে রাত্রের দিকে বেশ ভালোই ঠান্ডা পড়ে আর এর মধ্যে কেউই বাইরে বেরিয়ে খেতে যেতে চাইলাম না । কাছাকাছি একটা হোটেল থেকে ডিনার আনিয়ে খাওয়া হল । ভাত-রুটি-চিকেন নিয়ে খরচ পড়ল ৯৫০/- টাকা ।

টাঙ্গা
৩১শে ডিসেম্বর, ২০১৬ শনিবার । সকালে উঠে ব্রেকফাস্ট করলাম আগেরদিনের দোকান থেকেই - কচুরি-তরকারী দিয়ে । রাজগীরে একটা বড় সমস্যা হল লোক্যাল সাইট সিয়িং-এর জন্য কোনও গাড়ি পাওয়া যায় না, শুধুমাত্র টাঙ্গাই ভরসা । এটাই নাকি এখানে গাড়িওয়ালাদের সঙ্গে টাঙ্গাওয়ালাদের চুক্তি । কোনও গাড়ি লোক্যাল ঘোরাঘুরির জন্য পাওয়া যাবে না । টাঙ্গার রেটও বেশ বেশি, টাঙ্গাপিছু ১,২৫০/- টাকা । একটা টাঙ্গায় সবচেয়ে বেশি পাঁচজন যাত্রী বসতে পারে, কিন্তু তার থেকে কম লোক হলেও ওই টাকাই দিতে হবে । টাঙ্গাদের ইউনিয়ন বেশ শক্তিশালী আর কিছুক্ষণ দরাদরি করেও যখন এরা কিছু কম করল না, তখন বাধ্য হয়ে আমরা এই টাকাতেই যেতে রাজী হলাম ।

মনিয়ার মঠ
টাঙ্গাতে চড়ে আমাদের প্রথম গন্তব্য হল 'মনিয়ার মঠ' । এখানে একটা বৌদ্ধ স্তূপের মত আছে । তবে অন্য স্তূপের সঙ্গে এর পার্থক্য হল এর ভেতরটা ফাঁপা । এর দেওয়ালে বুদ্ধের কিছু ছবি আছে । এছাড়া এখানে হিন্দু নাগদেবীরও অবস্থান আছে বলে মনে করা হয় । জায়গাটায় দেখার সেরকম কিছু নেই আর সবটা দেখতে মিনিট পনেরোর বেশি লাগে না ।

সোনা ভান্ডার
দ্বিতীয় গন্তব্য হল 'সোনা ভান্ডার' । টাঙ্গাকে একই জায়গায় দাঁড় করিয়ে রেখে মনিয়ার মঠ থেকে ভেতরের দিকের রাস্তা দিয়ে আরও ৬৫০ মিটার হেঁটে গেলে দেখতে পাওয়া যায় একটা অনতিউচ্চ পাহাড় । এই পাহাড়ের নামই 'সোনা ভান্ডার' । এর ভূ-তাত্বিক বৈশিষ্ট্য হল এর মধ্যে দু'টো বেশ বড় ফাঁকা ঘরের মতো আছে আর এই পুরো ব্যাপারটাই একটামাত্র বড় পাথর কেটে তৈরি । মনে করার হয় এটা আসলে রাজা বিম্বিসারের স্বর্ণভান্ডারের প্রবেশপথ । এর দেওয়ালে শঙ্খলিপিতে কিছু লেখা আছে যেটা আসলে সেই স্বর্ণভান্ডারে প্রবেশ করার সংকেত । তবে আজ পর্যন্ত্য সেই লিপির পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়নি আর তাই বিম্বিসারের স্বর্ণভান্ডারও অধরাই থেকে গেছে ! (তবে সবার জন্য অধরা নয়, অচেনা লিপির পাঠোদ্ধার করে ব্যাগে যতটা ধরে ততটা সোনা আমি নিজে নিয়ে এসেছি, কাউকে দেব না !) পাথরের ওপর পা দিয়ে এই পাহাড়ের মাথায় ওঠা যায়, আমরা উঠে ছবিটবি তুলে নেমে এলাম ।

বিশ্বশান্তি স্তূপের তোরণদ্বার
তৃতীয় গন্তব্য হল 'বিশ্ব শান্তি স্তূপ' - রাজগীরের লোক্যাল সাইট সিয়িং-এর সবথেকে উল্লেখযোগ্য জায়গা । শান্তিস্তূপটা গৃধকূট পাহাড়ের ওপরে আর পাহাড়ে ওঠার জন্য রোপ-ওয়ে চলে । এই রোপ-ওয়ে সম্পর্কে একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে এটা নাকি চারদিক খোলা । এটা একটা ভুল তথ্য - এগুলো বলতে গেলে চারদিকটাই ঘেরা । তবে এর একটা বৈশিষ্ট্য হল এর একটায় একজনই উঠতে পারে আর এগুলো চলার পথে কখনও থামে না । অর্থাৎ চলন্ত রোপ-ওয়েতে উঠতে হয় যদিও সেটার গতি এতটাই কম যে উঠতে কোনও অসুবিধে হয় না । এই রোপওয়েতে ওঠার টিকিট ১০০/- টাকা করে যদিও আমরা এতে উঠিনি । সামনে প্রায় ২০০ - ২৫০ জন লোকের লাইন, উঠতে গেলে ঘন্টা দু'য়েক এখানেই কেটে যাবে, তাই আমরা শান্তিস্তূপ দেখার ইচ্ছে ত্যাগ করলাম ।

বিম্বিসার জেল
এতক্ষণ আমরা আমাদের শুরুর জায়গা থেকে ক্রমশই দূরে যাচ্ছিলাম, এবার ফেরার পথ ধরলাম । ফেরার পথে দেখার জায়গা 'বিম্বিসার জেল' । এখানে রাজা বিম্বিসারকে তাঁর ছেলে অজাতশত্রু বন্দী করে রেখেছিল । এই জায়গাটা বিম্বিসার নিজেই পছন্দ করেছিলেন বন্দী থাকার জন্য । এখান থেকে গৃধকূট পাহাড় সরাসরি দেখা যায়, তাই বিম্বিসার এখানে থেকে ভগবান বুদ্ধকে প্রতক্ষ্য করতে চেয়েছিলেন । বিম্বিসার জেল এখন সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রায় । এখন একটা জেলের পাঁচিলের শুধুমাত্র নিচের অংশটা রয়েছে । এখানে মিনিট দশেক কাটিয়ে আমরা আবার ফেরার পথে চলতে শুরু করলাম ।

দুপুর প্রায় আড়াইটে বাজে, তাই এবার একটা জায়গায় লাঞ্চ সেরে নেওয়া হল । খাবারের মান খুব একটা ভালো নয়, মোটামুটি যতটা সম্ভব গর্তবোঝাই করা হল । খরচ হল ১,০৫৫/- টাকা ।

উষ্ণপ্রস্রবণ
খাবারের জায়গা থেকে সামান্য হেঁটে পৌছলাম আমাদের পঞ্চম গন্তব্য 'শতধারা কুন্ড' বা উষ্ণপ্রস্রবণ । মাটির অনেকটা নিচ থেকে সরাসরি উঠে আসে বলে এই জল বেশ গরম হয় এটা প্রচলিত মত হলেও আসলে বেশিরভাগ উষ্ণপ্রস্রবণের জলই কৃত্রিম উপায়ে গরম করা হয় । এখানে চান করার যে কুন্ডটা রয়েছে একটা পাঁচিলের উপর দিয়ে সেটা দেখা যায় । দেখলাম জলের বেগ খুবই কম যদিও তার মধ্যেই প্রচুর সংখ্যক মানুষ চান করছে । উষ্ণপ্রস্রবণে চান করাটা একটা আধ্যাত্মিক ব্যাপার, এটা করলে পুণ্য অর্জন করা যায়, এই বিশ্বাস থেকেই ঠান্ডাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে লোকজন চান করছে - করে ।

জৈন মিউজিয়াম
এবার মেইন রাস্তাটা ছেড়ে আমরা অন্য আরেকটা রাস্তা ধরলাম । এই রাস্তার পাশে নবনির্মিয়মান নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেল দেখা গেল । কিছুদূর চলার পরে পড়ল একটা মিউজিয়াম - এটা একটা জৈন মিউজিয়াম । বিহারের ইতিহাস গৌতম বুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গে মহাবীরের জন্যও বিখ্যাত, এখানে মহাবীরেরও নানারকম সৌধ আছে । এই জৈন মিউজিয়ামে টিকিট কেটে ঢুকতে হয়, মূল্য ২০/- টাকা । এখানে মিউজিয়ামের ভিতরে ক্যামেরার ব্যবহার নিষিদ্ধ । মিউজিয়ামটা খুবই সুন্দর - মহাবীরের এবং আরও কিছু জৈন বিখ্যাত লোকেদের জীবনের নানারকম বিখ্যাত ঘটনাকে মডেলের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে । আমাদের হাতে সময় বেশি নেই, তাই মডেলগুলো আর সেইসঙ্গে তার ওপরের লেখাগুলো একবার করে চোখ বুলিয়ে বেরিয়ে বেরিয়ে এলাম । জৈন ইতিহাস ভালো করে জানার ইচ্ছে থাকুক আর না থাকুক, এই মিউজিয়ামটা সময় নিয়ে দেখা অবশ্যই উচিৎ । দেখতে ভালোও লাগবে বলে আমার বিশ্বাস ।

জাপানী মন্দিরে বুদ্ধমূর্তি
এবার আবার ফেরার পথ ধরলাম । একটু এগোতেই পড়ল আমাদের সপ্তম তথা শেষ গন্তব্য 'জাপানী মন্দির' । এটা আর পাঁচটা জাপানী মন্দিরের মতোই (যদিও জাপানী মন্দির জিনিসটা শিবমন্দিরের মতো কমন্‌ নয়, পাড়ায় পাড়ায় একটা করে থাকে না !) এবং এখানে একটা বিরাট বুদ্ধমূর্তি আছে । এখানে ভেতরে উপাসনা (অথবা ওই জাতীয় কিছু) চলছিল আর সেইসঙ্গে গমগম শব্দে দামামা বাজছিল । আর সেইসঙ্গে বাজছিল কোনও একটা জাপানী সুর । আমরা এখানে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে হোটেলে ফেরার পথ ধরলাম । সায়োনারা !

টাঙ্গা আমাদের যেখান থেকে তুলেছিল, সেখানেই নামিয়ে দিল । বিকেল পাঁচটা বাজে, আমরা বাড়ি ফেরার পথে রওনা হব সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ । আমাদের ফেরার ট্রেন আর রাজগীর থেকে ধরা যাবে না, আমাদের যেতে হবে বখ্‌তিয়ারপুর আর সেটা যেতে হবে গাড়িতে । রাত ১০ঃ০৯ মিনিটের রাজেন্দ্রনগর হাওড়া এক্সপ্রেসে আমাদের ফেরার কথা । রাজগীর থেকে বখ্‌তিয়ারপুরের দূরত্ব ৫৪ কিলোমিটার আর গাড়িতে ঘন্টা দেড়েকের বেশি লাগার কথা নয়, কিন্তু এখানে রাতের দিকে প্রচন্ড কুয়াশা হয় আর তখন গাড়ি খুব সাবধানে ধীরে ধীরে চালাতে হয় । তাই ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না । আমরা আগেরদিন যে দোকান থেকে ডিনার আনিয়েছিলাম, সেই দোকানেই ডিনারের অর্ডার দিয়ে দিলাম । আমাদের গাড়ি ছাড়ার আগে আমরা এখান থেকে প্যাক করা খাবার নিয়ে নেব ।

হোটেলে ফিরে মালপত্র গুছিয়ে চেক্‌আউট করতে করতে কিছুটা দেরি হয়েই গেল । খাবার নিয়ে আমরা যখন রাজগীর ছেড়ে বখ্‌তিয়ারপুরের দিকে রওনা হলাম, তখন প্রায় সাড়ে সাতটা ।

আমাদের ড্রাইভার ঠিকই বলেছিল । রাস্তায় জায়গায় জায়গায় কুয়াশার ঘনত্ব এতটাই বেশি যে সামনের গাড়িটাও ভালো করে দেখা যাচ্ছে না । এই অবস্থাটা হবে জানাই ছিল আর আমাদের হাতে সে'জন্য বেশি সময় নেওয়াও ছিল । আমরা যখন স্টেশনে পৌঁছলাম তখন প্রায় রাত ন'টা ।

রাজগীর অঞ্চলে রাতে কিরকম ঠান্ডা পড়ে সেটা আজ ভালোভাবে টের পেলাম । আগের দু'দিন এই সময়ে হোটেলে ছিলাম বলে ঠান্ডাটা সেভাবে গায়ে অনুভব করিনি । বখ্‌তিয়ারপুর স্টেশনে কোনও ওয়েটিং রুম নেই, তাই খোলা স্টেশনের মধ্যেই একটা ছাদওয়ালা জায়গায় বসে থাকতে হল । প্রচন্ড ঠান্ডা আর সেইসঙ্গে ঘন কুয়াশা । আমি ঠান্ডার জায়গায় এর আগেও গেছি, এর থেকে অনেক বেশি ঠান্ডায় থেকেছি । কিন্তু রাজগীরের মতো এরকম জমাট বাঁধা ঠান্ডা এর আগে সেভাবে কোথাও পাইনি । এই ঠান্ডাটা যেন ভীষণ বেশি করে গায়ের ওপর চেপে বসে । সেইসঙ্গে কুয়াশার জন্য আবহাওয়াটা খুব বেশি আর্দ্র । সবমিলিয়ে আমি এটা জোর দিয়ে বলতে পারি রাজগীরের এই ঠান্ডা এমনকি যারা ঠান্ডা বা শীত ভালোবাসে, তাদেরও খারাপ লাগতে বাধ্য ।

ট্রেন এল নির্ধারিত সময়ের প্রায় চল্লিশ মিনিট দেরিতে । আমাদের অপেক্ষার শেষের দিকটা আরও ভয়ঙ্কর - ট্রেন আসছে ঘোষণা করার পর আমরা উঠে গিয়ে আমাদের কামরা সম্ভাব্য যেখানে পড়তে পারে সেখানে গিয়ে দাঁড়ালাম । সেখানে কোনও ছাউনিও নেই । নাক আর কান দিয়ে গলগল করে ধোঁয়া বেরোচ্ছে - বড়দের থেকেও বেশি কষ্ট হচ্ছে বাচ্চাদের । ট্রেনে উঠে একটু গরম হওয়ার সুযোগ পেয়ে নিজেদের ধন্য মনে হল ।

চারবছর আগে কালুক থেকে ফেরার সময়ে ট্রেনে ইংরিজী নববর্ষ উদ্‌যাপন করেছিলাম, এবারে আবার সেটা হল । আমাদের দলের সবাই সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে শুয়ে পড়লাম । পরেরদিন সকালে ট্রেনের হাওড়া পৌঁছনোর নির্ধারিত সময় সকাল ৬ঃ৩৫ মিনিট হলেও ট্রেন পৌঁছল প্রায় সাড়ে তিনঘন্টা দেরিতে । স্টেশন থেকে বাড়ি !

সারসংক্ষেপঃ

১. কলকাতা থেকে দু'তিনদিনের জন্য বেড়াতে যাওয়ার জন্য কলকাতা থেকে বেশি দূরে নয় এরকম একটা জায়গা হল আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য বিহারের রাজগীর । জায়গাটা প্রধানতঃ ঐতিহাসিক দর্শনীয় জায়গা হিসেবে বিখ্যাত ।
২. হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে রাজগীরে সরাসরি কোনও এক্সপ্রেস ট্রেন যায় না, এর নিকটবর্তী বড় স্টেশন হল বখ্‌তিয়ারপুর । বখ্‌তিয়ারপুর থেকে চাইলে লোক্যাল ট্রেনে অথবা গাড়িতে রাজগীর যাওয়া যায় ।
৩. রাজগীর ঐতিহাসিক জায়গা হিসেবে সুবিখ্যাত হলেও ট্যুরিজমের দিক থেকে বিহার অনেকটাই পিছিয়ে । তাই ইন্টারনেট বা অন্যান্য বৈদ্যুতিন পরিষেবার মাধ্যমে এখানে ভালো হোটেল পাওয়া বেশ কঠিন ।
৪. রাজগীরে আমরা যে হোটেলে প্রথমে উঠেছিলাম, 'হোটেল মমতা' সেখানে না থাকার জন্যই সবাইকে বলব । আর আমরা যে দ্বিতীয় হোটেলটায় উঠেছিলাম, 'হোটেল আনন্দলোক' সেটা আগেরটার থেকে ভালো হলেও সেরকম কিছুও নয় । তাই এখানে কোনও হোটেলের যোগাযোগের নম্বরই দিলাম না । রাজগীরের হোটেল নিজের ঝুঁকিতেই বুক করা ভাল !
৫. রাজগীরের কাছাকাছি সবথেকে ঘ্যাম জায়গা হল 'নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়'-এর ধ্বংসাবশেষ । যদি ইতিহাস সম্পর্কে আগ্রহ থাকে, তাহলে নালন্দা সম্পর্কে আগে থেকে একটু জেনে গেলে ভালো লাগবে ।
৬. নালন্দায় ঘোরার জন্য কমপক্ষে হাতে ঘন্টাতিনেক সময় নিয়ে যাওয়া দরকার । এবং একজন গাইড সঙ্গে থাকলে ভালোই লাগবে ।
৭. এখান থেকে কাছেই হল পাওয়াপুরীতে জৈনমন্দির । লেকের মাঝখানে তৈরি মন্দিরটা দেখতে ভাল লাগবে ।
৮. রাজগীরের লোক্যাল সাইটসিয়িং-এর মধ্যে বিশ্বশান্তি স্তূপ, বিম্বিসার জেল আর জৈন মিউজিয়ামটাই দেখার মতো - বাকিগুলোতে যাওয়া সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছু নয় । লোক্যাল সাইটসিয়িং-এর জন্য এখানে গাড়ি পাওয়া যায় না, টাঙ্গাই ভরসা ।
৯. প্রচন্ড শীতে রাজগীরে না যাওয়াই ভালো - কারণ এখানকার ঠান্ডা খুব খারাপ, শরীর রীতিমতো খারাপ হয়ে যায় ।
১০. কিছুটা মালভূমি ধরণের জায়গা হওয়া সত্ত্বেও রাজগীরের জল খুব একটা ভালো না, বিশেষ করে 'এখানকার জলে খুব ভালো হজম হয়' এই কথাটা রাজগীরের সম্পর্কে একেবারেই খাটে না ।

উপসংহারঃ

রাজগীর
ভারতবর্ষের প্রাচীণ যুগের ইতিহাস নিয়ে আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য বিহারে রাজগীর একটা দর্শনীয় জায়গা । প্রধানতঃ বৌদ্ধ ও কিছুটা জৈনধর্মের জন্য বিখ্যাত এই জায়গা এখনও ইতিহাসের বেশ কিছু সাক্ষ্য বহন করে । এছাড়া পরবর্তীকালেরও কিছু কিছু রাজবংশের কীর্তিকলাপের নিদর্শন দেখা যায় এই রাজগীরে । তবে সুদীর্ঘকাল ধরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব বেশিরভাগ নির্মাণগুলোকেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে । রাজগীরের খুব কাছেই ইতিহাসপ্রসিদ্ধ নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে । নালন্দা শুধু ভারতবর্ষের নয়, ততকালীন বিশ্বের অন্যতম প্রধান শিক্ষার পীঠস্থান বলে মনে করা হয় । এই নালন্দা রাজগীর ভ্রমণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দেখার জায়গা । এছাড়া কাছাকাছির মধ্যে আরও কিছু দেখার জায়গাও আছে । তবে এ'কথা বলতেই হবে যে প্রধানতঃ বেড়ানোর জায়গা হিসেবে বিখ্যাত হলেও এখানকার মানুষের মধ্যে অতিথিবৎসলতার কিছুটা অভাব রয়েছে - এখানকার মানুষ এখনও ট্যুরিজমের দিক থেকে সেভাবে উন্নত নয় । জায়গাটা বেশ অপরিষ্কার - 'বিহার' বলতেই যা যা মনে পড়ে তার সবই এখানে রয়েছে । তবে এইসব প্রতিকূলতাগুলো কিছুটা মানিয়ে নিতে পারলে দেখার জায়গা হিসেবে রাজগীর-নালন্দা বেশ ভালো । অল্পখরচ আর দিনতিনেকের ছুটি পুঁজি থাকলে অনায়াসেই বেরিয়ে পড়া যেতে পারে !

রাজগীর ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Tuesday, October 25, 2016

তাকদা ভ্রমণ

তাকদা । নামটা শুনে প্রথমেই লোকজন জিজ্ঞেস করে "কি ? চাকদা? চাকদায় আবার বেড়াতে যাওয়ার কি আছে ?" তাদের বলতে হয় - না, এই জায়গাটার নাম তাকদা । দার্জিলিঙ জেলার ছোট্ট একটা গ্রাম । দার্জিলিঙ জেলায় 'ততটা বিখ্যাত নয়' এরকম যে বেড়ানোর জায়গাগুলো আছে, তাদের মধ্যে অন্যতম । সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫,৫০০ ফুট উচ্চতায় আর শিলিগুড়ি থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে পাহাড় দিয়ে ঘেরা এই সুন্দর জায়গায় তিনদিনের বেড়ানো নিয়ে আমার ব্লগের এবারের পোস্ট ।

২০শে অক্টোবর, ২০১৬ বৃহস্পতিবার শিয়ালদহ থেকে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেসে রাত সাড়ে আটটায় আমাদের যাত্রা শুরু - গন্তব্য নিউ জলপাইগুড়ি । কাঞ্চনকন্যার সমস্যা হল এর স্টপেজ খুব বেশি । তবে এটা সকাল সাড়ে সাতটায় নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছয় শুধুমাত্র এই কারণেই আমরা এই ট্রেনটা পছন্দ করেছিলাম ।

এটা আমাদের দরকার ছিল কারণ আমরা নিউ জলপাইগুড়ি থেকে তাকদা যাওয়ার জন্য 'দার্জিলিঙ হিমালয়ান রেলওয়ে' (টয়ট্রেন) বুকিং করেছিলাম । টয়ট্রেন ছাড়ে সকাল ৮ঃ৩০ -এ । টয়ট্রেন তাকদা যায় না, ঠিক ছিল আমরা 'ঘুম' পর্যন্ত্য টয়ট্রেনে গিয়ে সেখান থেকে গাড়িতে তাকদা যাব । কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাত কারণে ভারতীয় রেল কিছুদিনের জন্য টয়ট্রেনের পরিষেবা বন্ধ করে দিয়েছে, তাই আমাদের এই কাঞ্চনকন্যায় যাওয়াটা অর্থহীন হয়ে গেল ।

কাঞ্চনকন্যা থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা
আমাদের এবারের দল ৩ জন শিশুসমেত ১৩ জনের । বাবা, মা, আমি, অমৃতা, কথা, কলি, আমার বড়মাসি, কঙ্কনাদি, অমিতদা, মিঙ্কা, বৈশাখী, কাকিমা আর সমীরণদা - এককথায় বলতে গেলে আমাদের নিয়মিত দলের প্রায় সবাই আর সেইসঙ্গে আমার বড়মাসি । আমাদের ট্রেন প্রথমদিকে কিছুটা দেরিতে চললেও নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছে দিল প্রায় সঠিক সময়ে । ট্রেন যখন প্রায় নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে ঢুকছে, ট্রেন থেকে দেখা গেল কাঞ্চনজঙ্ঘা । এটা আমাদের একটা খুব বড় প্রাপ্তি । আমি নিজে এই জিনিস আগে দেখে থাকলেও জানি খুব বেশি লোকের এটা দেখার সৌভাগ্য হয় না । তাকদায় আমরা যেখানে থাকব, সেখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার কোনও ভিউ নেই, তাই এখান থেকেই যা দেখার দেখে নিলাম ।

তিস্তা ব্রীজের কাছে ব্রেকফাস্ট ব্রেক
একটা ১০৫ বছরের পুরনো ব্রিটিশ হেরিটেজ বাংলো তাকদায় থাকার জন্য সুপরিচিত (এই ১০৫ সংখ্যাটা অবশ্য অনেকদিন আপডেট হয়নি !) - এছাড়া আর দু'একটা থাকার জায়গা আছে । টয়ট্রেন না থাকায় আমরা বাংলো থেকেই একটা গাড়ি বুক করে রেখেছিলাম কারণ নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে তাকদা যাওয়ার গাড়ি পাওয়া সহজ নয় । স্টেশন থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে রওনা দিতে দিতে সাড়ে আটটা বেজে গেল । আমাদের দলে পূর্ণবয়স্ক লোকের সংখ্যা ১০ আর সবাই একটা টাটা সুমোতে (একটু হয়তো বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে কিন্তু পাহাড়ে এটা অস্বাভাবিক কিছু নয় । যেভাবেই হোক সবার জায়গা হয়েও গেল )। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে তাকদা হিলকার্ট রোডে হয়েও যাওয়া যায় আবার সেভক হয়েও যাওয়া যায় - আমরা দ্বিতীয়টা ধরলাম । ঘন্টাখানেক চলার পর তিস্তা ব্রীজের কাছে ব্রেকফাস্টের জন্য দাঁড়ানো হল । চিকেন চাউমিন, ভেজ মোমো, চিকেন থুকপা, ছোলে-বাটুরে এইসব দিয়ে ভালো করে ব্রেকফাস্ট করে নেওয়া হল । খরচ হল মোট ১,৪০০/- টাকা ।

তাকদায় পৌঁছনোর রাস্তার শেষের দিকটা বেশ খারাপ । গাড়িতে ১০ জন বসে এতক্ষণ একটু চাপাচাপি হচ্ছিল কিন্তু এই রাস্তায় এসে গাড়ির ভেতরে এমন 'মুড়ির টিন' ঝাঁকানি শুরু হল যে একসময়ে মনে হচ্ছিল গাড়িতে বোধহয় চাইলে আরও একজনের জায়গা হয়ে যাবে !

তাকদায় ব্রিটিশ হেরিটেজ বাংলো
তাকদা পৌঁছলাম দুপুর একটা নাগাদ । আমরা থাকার জন্য ব্রিটিশ বাংলোয় দু'টো ডাবল বেড আর দু'টো ট্রিপল বেড ঘর বুক করেছিলাম । বাংলোটা একটা L আকৃতির বাড়ি । এর একটা দিকে চারটে ব্রিটিশ আমলের ঘর । অন্যদিকে দু'টো ঘর যেগুলো পরবর্তীকালে তৈরি । ব্রিটিশ আমলের ঘরগুলোর ভেতরে ফায়ারপ্লেস আছে, চাইলে ব্যবহার করা যায় (অবশ্যই অর্থের বিনিময়ে) । তাকদায় ঠান্ডা খুব বেশি নয়, দিনের বেলা সোয়েটার লাগে না আর রাত্রিবেলা ঘরের বাইরে বেরোলে একটা জাম্পার বা জ্যাকেট থাকলেই চলে । তবে এমনিতে ঠান্ডা সেরকম না লাগলেও একটা ঠান্ডা হাওয়া মাঝে মাঝে দিচ্ছিল যেটা বেশ আরামদায়ক ।

আমরা চানটান সেরে নিলাম । বাথরুমে গিজারের ব্যবস্থা আছে । এখানে আগেই আমরা দুপুরের খাবারের কথা বলে রেখেছিলাম । সেইমতো দুপুরে এরা আমাদের ভাত, ডাল, স্কোয়াশের তরকারি, ডাবল ডিমের এগ্‌কারি দিল । এই ব্রিটিশ বাংলোয় খাওয়ার জন্য মাথাপিছু প্রতিদিন ৬০০/- লাগে । এর মধ্যে পাওয়া যায় -
সকালে ঃ বেড-টি, ব্রেকফাস্ট (লুচি-তরকারী/পরোটা-তরকারী/পাঁউরুটি টোস্ট), আবার চা
দুপুরে ঃ ভাত, ডাল, তরকারী, ডাবল ডিমের এগ্‌কারি
বিকেলে ঃ চা, পপকর্ণ
রাতে ঃ ভাত/রুটি, চিকেন

বাংলোর ব্যালকনিতে - রাতের বেলায়
দুপুরে খাওয়ার পর বাংলোর লনে এসে বসলাম । এখান থেকে সামনের পাহাড়ের ভিউ চমৎকার । দলে বেশি লোকজন থাকার সুবিধে হচ্ছে স্রেফ আড্ডা মেরে সময় কেটে যায় । দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল, আমাদের বাংলোর পিছনের পাহাড়ের ওপরে একসময়ে সূর্য্যাস্ত হয়ে গেল । এইসময়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য্য সত্যিই অসাধারণ । আশেপাশের পাহাড়গুলোর ওপর ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসার দৃশ্য দেখতে দেখতে কিভাবে যেন সময় কেটে যায় । একসময়ে সেইসব পাহাড়গুলোর ওপরের জনবসতিগুলোয় একটু একটু করে আলো জ্বলে উঠল । আমরা বাংলোর ব্যালকনিতে বসে সন্ধ্যের চা খেলাম আর আড্ডা চলতেই থাকল । শতাধিক পুরনো ব্রিটিশ বাংলোয় কোনও ভূতের গল্প আছে কিনা জানি না তাই আমরা নিজেরাই কিছু তৈরি করে নিলাম (ভেবেছিলাম ভূত নিয়ে আলোচনা করলে হয়তো তাদের দেখা মিললেও মিলতে পারে, কিন্তু সে গুড়ে বালি !) । রাত্রি ন'টা নাগাদ খাওয়ার ঘরের ডাকে সাড়া দিয়ে দেখলাম আমাদের জন্য রুটি আর চিকেন কারি রেডি ।

পরেরদিন ২২শে অক্টোবর, ২০১৬ শনিবার । তাকদায় প্রকৃতপক্ষে দেখার খুব বেশি কিছু নেই, আমাদের বাংলোর ম্যানেজার তাই আগেই বলে রেখেছিলেন কালিম্পং-এর দিকটা যাওয়ার জন্য । সেইমতো সকাল সাড়ে ন'টা নাগাদ আমরা বেরোলাম । ঘন্টাখানেক যাওয়ার পর পড়ল আমাদের প্রথম গন্তব্য - 'তিনচুলে ভিউ পয়েন্ট' ।

তিনচুলে ভিউ পয়েন্ট থেকে ভিউ
তিনচুলে ভিউ পয়েন্ট থেকে অনেকগুলো পাহাড়ের দৃশ্য দেখা যায় । এখানে একটা ছোট টাওয়ার গোছের আছে, তার ওপরে বসার জায়গাও আছে । এখানে ওঠার জন্য অল্প কয়েকটা সিঁড়ি ভাঙ্গতে হয় আর সেটা করা সার্থক । আমরা ভিউপয়েন্ট থেকে বেশি কিছু ছবি তুললাম । এখানে সবমিলিয়ে মিনিট পনেরো থাকার পর এগিয়ে চললাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্য 'ছোটামাঙ্গয়া অরেঞ্জ গার্ডেন'-এর দিকে ।

অরেঞ্জ গার্ডেন
তিনচুলে ভিউ পয়েন্ট থেকে অরেঞ্জ গার্ডেন আরও ৪৫ মিনিট মতো লাগল । দূরত্ব খুব বেশি না, তবে রাস্তা খারাপ হওয়ায় সময় লাগে । অরেঞ্জ গার্ডেনে ঢুকতে মাথাপিছু ৩০/- টাকা করে টিকিট লাগে । পাহাড়ের গায়ে ধাপে ধাপে এখানে কমলালেবুর চাষ করা হয়, তবে কমলালেবু ছাড়াও বাগানে আরও অনেক গাছ আছে (কি কি গাছ তখন জেনেছিলাম, এখন আর সেভাবে মনে নেই) । একটা বাঁশগাছ দেখলাম, সেটা হচ্ছে জাপানি বাঁশ গাছ । এর বৈশিষ্ট্য হল এর গা ভীষণ মসৃণ । এছাড়া বাগানটার মধ্যে দিয়ে একটা ছোট ঝর্ণা নেমে গেছে সেটাও খুব সুন্দর । সম্পূর্ণভাবে মানুষের হাতের তৈরি হলেও বাগানটায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য স্পষ্ট ।

অরেঞ্জ গার্ডেনের ভেতরে একটা ফ্যাক্টরি আছে, এখানে অরেঞ্জ জুস, অরেঞ্জ স্কোয়াশ তৈরি হয় । এখানে বিক্রির ব্যবস্থাও আছে । আমরা সেখানে গিয়ে কিছুক্ষণ বসলাম । এখানে অরেঞ্জ জুস, স্কোয়াশ ছাড়াও লঙ্কা ইত্যাদি পাওয়া যায় । আমরা অবশ্য কিছু কিনিনি । বাগান থেকে বেরিয়ে এসে আমরা রওনা দিলাম কালিম্পং এর দিকে ।

কালিম্পং শহর
ছোটামাঙ্গয়া থেকে কালিম্পং পৌঁছতে আরও একঘন্টা মতো লাগল । কালিম্পং দার্জিলিঙ-এর মতো একটা হিলস্টেশন - অনেক পুরনো । এখানকার রাস্তাঘাট, দোকানপাট একেবারেই দার্জিলিঙ এর মতো, ভীড়ও দার্জিলিঙ-এর মতো । আমাদের প্ল্যানে কালিম্পং-এ সেভাবে দেখার কিছু ছিলনা, এখানে আমরা থামলাম লাঞ্চের জন্য । কালিম্পং-এ বাঙালি গিজগিজ করছে - আমরা 'মাসিমার হোটেল' দেখে সেখানে থামলাম । এটা কলকাতার একটা সাধারণ ভাতের হোটেলের মতোই - ভাত মাছ মাংস ডিম ডাল তরকারি সবই পাওয়া যায় । এখানে সবার লাঞ্চ করতে খরচ পড়ল ৯৭০/- টাকা ।

ডেলো পার্ক
এরপর আমরা এগিয়ে গেলাম আমাদের শেষ গন্তব্য ডেলো-র দিকে (হ্যাঁ, এই সেই ডেলো !) । কালিম্পং শহর থেকে কিছুটা দূরে একটা পাহাড়ের মাথায় একটা রিসর্ট আছে আর তার চারপাশটা নানারকমভাবে সাজানো হয়েছে । ডেলোয় ঢুকতে মাথাপিছু ১০/- টাকা করে টিকিট লাগে । আমরা এখানে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে ছবিটবি তুলে চলে এলাম । এখানে চাইলে প্যারা-গ্লাইডিং করা যেতে পারে । সাধারণভাবে ৩,০০০/- টাকা আর হাই-গ্লাইডিং এর জন্য ৫,০০০/- টাকা । আমরা কেউই করিনি তবে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখেছি ব্যাপারটা অনেকেই করে ।

এবার আমরা তাকদা ফেরার পথ ধরলাম । পাহাড়ে অন্ধকার খুব তাড়াতাড়ি নেমে আসে, কিছুক্ষণ গাড়ি চলার পরেই এমন অবস্থা হল যে হেডলাইট-এর আলোয় যেটুকু রাস্তা দেখা যাচ্ছে তার বাইরে আর কোথাও কিছু দৃশ্যমান নয় । একজায়গায় দাঁড়িয়ে চা খাওয়া হল । তারপর আবার চলা । অন্ধকারে পাহাড়ী পথে গাড়িতে চলার অভিজ্ঞতা বেশ সুন্দর । এর প্রধান কারণ হয়তো পাহাড়ে বেড়াতে গেলে রাতেরবেলা গাড়ি চড়ার সুযোগ কমই হয় । আমরা যখনই পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে সাইট-সিয়িং এ বেরোই, সাধারণতঃ সকাল সকাল বেরিয়ে বিকেল বা বড়জোর সন্ধ্যের মধ্যে হোটেলে ফিরে আসি । অন্ধকার হয়ে গেলে পাহাড়ে গাড়ি, লোকজন সবই কমে যায় আর সেইজন্যই হয়তো ব্যাপারটা রোমাঞ্চকর লাগে । অন্ধকার রাস্তায় গাড়ি চলেছে, হেডলাইটের আলো রাস্তায়, রাস্তার ধারে পড়ছে আর সেই আলো প্রতিফলিত হয়ে সামান্য গাড়ির ভেতরে ঢুকে গাড়ির ভেতরটাকে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার হতে দিচ্ছে না - এই পরিবেশের যেন কোনও তুলনা হয় না । রাত্রির নিস্তব্ধতার একটা নিজস্ব সৌন্দর্য্য আছে আর সেটা এইসব সময়ে আরও বেশি করে বোঝা যায় । চলতে চলতে আমরা একটা পাশের পাহাড়ে অনেকটা ওপরদিকে একটা আলো জ্বলতে দেখলাম । আমাদের ড্রাইভার বলল সেটা 'স্যামড্রুপসে' । কালুক ভ্রমণের সময়ে আমরা এখানে গিয়েছিলাম ।

বাংলোয় ফিরলাম সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ । আবার আগেরদিনের মতোই - সন্ধ্যের পরে আর কিছু করার নেই । কিন্তু আমাদের বড় দল থাকায়, কিছু করার নেই বললেও অনেক কিছু করার থাকে । আবার আগেরদিনের মতোই ন'টার সময়ে ডিনার করে নিলাম । আমাদের কথা অনুযায়ী এরা ডিনারে চিলি-চিকেন রান্না করেছিল যদিও সেটা খুব ভালো কিছু হয়নি । এরা সাধারণভাবে এখানে চিকেন কারি রান্না করে আর সেটাই ভালো করতে পারে । অন্যরকম কিছু রান্না করতে বলার এক্সপেরিমেন্টটা এদের সঙ্গে না করাই ভালো !

তাকদায় সূর্য্যোদয়
পরেরদিন সকালে অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছিলাম - পাঁচটার সময়ে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে লনে চলে এলাম । আকাশ এখনও অন্ধকার । সূর্য্যোদয় হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে । এই সময়ে বেশ ঠান্ডা লাগে । আমাদের বাংলোর পিছনে কয়েকধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠলে তাকদা মনাস্ট্রি - এখান থেকে সূর্য্যোদয়ের দৃশ্য আরও সুন্দর । আমরা ক্যামেরা নিয়ে সেখানে গিয়ে বসে রইলাম । এই সময়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকাটাই একটা অভিজ্ঞতা - প্রতি মূহুর্তেই রঙ পাল্টাতে থাকে । পিছন দিকে তাকালে দেখা যায় দূরে একটা উঁচু পাহাড়ের ওপর থেকে ফ্লাশের ঝলকানি দেখা যাচ্ছে । জেনেছিলাম ওটা দার্জিলিঙ এর টাইগার হিল ।

সূর্য্যোদয় হল । আমি লেখক নই - এই দৃশ্যের বর্ণনা দেওয়ার মতো বিশেষণ আমার জানা নেই । শুধু এককথায় বলছি - অসাধারণ !

চা-বাগান
২৩শে অক্টোবর, ২০১৬ - রবিবার আমাদের তাকদার লোক্যাল সাইট-সিয়িং এর দিন । আগেই বলেছি তাকদায় দেখার সেরকম অনেক কিছু নেই, তাই আমরা বেরোলাম বেলা দশটা নাগাদ । এই যাওয়ার রাস্তাটা খুব সুন্দর । প্রথমে রাস্তাটা একটা পাইনফরেস্ট-এর মধ্যে দিয়ে চলল । কিছুক্ষণ চলার পর একটা অর্কিড গার্ডেন পড়ল । এখানে আমরা থামলাম না, ঠিক হল যদি ফেরার পথে সময় থাকে তাহলেই থামব । আরও এগিয়ে চলার পর শুরু হল রাস্তার দু'পাশের চা-বাগান । এখানকার 'রাংলি-রাংলিওট চা-বাগান' খুব বিখ্যাত । এই চা-বাগানের দৃশ্যও খুব সুন্দর - বিশেষ করে এরকম রাস্তার দু'পাশে চা-বাগান খুব বেশি দেখা যায় না । এই চা-বাগানের মধ্যে দিয়ে চলতে চলতেই পৌঁছে গেলাম আমাদের প্রথম স্টপেজ - 'তিস্তা ভ্যালি দূরবীন ভিউ পয়েন্ট'-এ ।

তিস্তা ভ্যালি ভিউ পয়েন্ট থেকে তিস্তার ভিউ
প্রথমেই বলে রাখি এটাও একটা চা-বাগান । এই চা-বাগানের মধ্যেই একটা চাতাল মতো করা আছে - সেখানে দাঁড়িয়ে তিস্তা নদী আর তিস্তার ভ্যালি দেখা যায় । বেলা পৌনে বারোটা বাজে, আকাশে রোদের তেজও বেশ বেশী । কিন্তু এই ভিউ পয়েন্টে একটা চমৎকার ঠান্ডা হাওয়া দেয় যাতে খুব আরাম লাগছিল । এটা একটা ছবি তোলার জন্য আদর্শ জায়গা আর আমরা আমাদের সঙ্গে থাকা মোট পাঁচটা ক্যামেরার যথোপযুক্ত ব্যবহার করলাম । জায়গাটা এতটাই সুন্দর যে আমরা এখানে নির্ধারিত সময়ের অনেক বেশি সময় কাটিয়ে ফেললাম । কিন্তু তাতে আফশোসের কিছু নেই কারণ সব সুন্দর জায়গা কখনও দেখা হয়ে ওঠে না, তাই যেটা দেখছি সেটাকেই সম্পূর্ণভাবে উপভোগ করার নামই জীবন । (কাব্য করে ফেললাম ! তবে এটাকে স্থানমাহাত্ম্য ছাড়া আর কিছু বলার নেই)

হ্যাঙ্গিং ব্রীজে যাওয়ার রাস্তা
এরপরের জায়গার নাম হল 'বারবাটে হ্যাঙ্গিং ব্রীজ' । তিস্তা ভ্যালি থেকে প্রায় একঘন্টা গাড়িতে যাওয়ার পর এখানে পৌঁছলাম । এখানে একটা শতবর্ষ পুরনো ঝুলন্ত সেতু আছে । একসময়ে এর ওপর দিয়ে জিপ চললেও এখন বাইক ছাড়া কোনও গাড়ি চলে না । আমাদের গাড়ি যেখানে আমাদের নামিয়ে দিল সেখান থেকে ঢালু পথে কিছুটা নেমে গেলে সেতুতে পৌঁছনো যায় । এই ঢালু পথটা বেশ ঢালু এবং চকচকে পাথর দিয়ে তৈরি । তাই চটি পরে এই রাস্তা দিয়ে না নামাই ভালো কারণ ফিরতি পথে ওঠার সময়ে অসুবিধে হতে পারে । তবে এই পথে না ফিরে অন্য একটা পথ দিয়েও ফেরা যায়, সেক্ষেত্রে একটা ঝর্ণার ওপর পাথরে পা দিয়ে ফিরতে হবে । দু'টোই কিছুটা কঠিন - সেইসঙ্গে থ্রিলিং-ও ।

বারবাটে হ্যাঙ্গিং ব্রীজ
আমাদের দলের কয়েকজন ব্রীজটা দেখতে গেলাম । হেঁটে পেরোতে বেশ ভালো লাগে - বিশেষ করে মাঝখানে পৌঁছে নিচের দিকে দেখতেও খুব ভালো লাগে । নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে একটা ঝর্ণা । বর্ষার পরে এই সময়ে পাহাড়ী ঝর্ণাগুলো বেশ পরিপুষ্ট থাকে তাই দেখতেও খুব ভালো লাগে । আমরা এখানে আবার অনেকটা সময় ব্যয় করলাম । ব্রীজটা পেরিয়ে একটা পায়ে চলা পথ আছে যেটা দিয়ে অন্য ফেরার পথটা ধরতে হয় । এখানে আমরা নিজেরাই আমাদের গাইড, যে পথে চলেছি আদৌ সেটা দিয়ে কোথাও পৌঁছনো যায় কিনা জানিনা কিন্তু ওই অজানার উদ্দেশ্যে এগিয়ে চলাই আনন্দের । ফেরার পথের একটাই সুবিধে যে কোনও চড়াই চড়তে হয় না, কিন্তু এক জায়গায় এসে ওই ঝর্ণাটা আবার পেরোতে হয় (এখানে একটা সিমেন্টের ব্রীজ তৈরি হচ্ছে, কিন্তু সেটা এখনও অসম্পূর্ণ, তাই পায়ে হেঁটে ঝর্ণা পেরোনো ছাড়া উপায় নেই) । এখানে পাথরের ওপর পা দিয়ে ঝর্ণা পেরোলাম । কাজটা খুব সহজ নয় বিশেষ করে কোনও কারণে পা হড়কালে মৃত্যু না হলেও গুরুতর চোটের সম্ভাবনা । যাই হোক, কোনওরকম চোট না পেয়ে আমরা এপারে চলে এসে গাড়িতে উঠলাম ।

তাকদা চার্চ
দুপুর দু'টো বাজে - এখান থেকে বাংলোয় ফিরতে প্রায় একঘন্টা লাগবে তাই আমরা ফেরার পথে অর্কিড গার্ডেন দেখার ইচ্ছে ত্যাগ করলাম । বাংলোয় ফিরে দুপুরের খাবার খেয়ে নেওয়া হল । বিকেলে কিছু করার নেই, তাই আমাদের বাংলোর চারপাশটা হেঁটে ঘোরার প্ল্যান করলাম । বাংলো থেকে নিচে নেমে এসে একটা রাস্তা ধরে কিছুটা উঠলে একটা চার্চ দেখতে পাওয়া যায় । এটা আগে আরেকটা বাংলোই ছিল, পরবর্তীকালে একে চার্চে পরিণত করা হয়েছে ।

তাকদার বাড়িঘর
চার্চ থেকে আমরা আরও এগোতে থাকলাম । রাস্তাটা প্রকৃতপক্ষে আমাদের বাংলোকে ঘিরে পাহাড়ের গা দিয়ে একটা পায়ে চলা পথ । এখানে আরও কিছু লোকজনের বাড়ি ইত্যাদি রয়েছে । এইভাবে চলতে চলতে একসময়ে গ্রামটা শেষ হয়ে পথটা জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেল । বিকেল শেষ হয়ে আসছে, এইসময়ে জঙ্গলে ঘোরাঘুরি করা বিভিন্ন কারণেই নিরাপদ নয়, তাই জঙ্গলের মধ্যে কিছুদূর গিয়ে আমরা ফেরার পথ ধরলাম । তবে এইটুকুর মধ্যেই যতটা ট্রেকিং করলাম সেটা মনে রাখার মতো । ফেরার পথটা তাকদা মনাস্ট্রির পাশ দিয়ে । ঘরে ফিরে গিয়ে সেরকম কিছু করার নেই, তাই আমি আর বৈশাখী এখানে কিছুক্ষণ বসে রইলাম । সূর্য্যাস্ত হয়ে গেছে, পাহাড়ের ওপরে ক্রমশঃ আলো কমে আসছে - এই সময়টা এখানে বসে থাকতে খুব ভালো লাগে । এরপর একেবারে অন্ধকার হয়ে গেলে আমরা বাংলোয় ফিরে এলাম ।

আমাদের বেড়ানো এখানেই প্রায় শেষ কারণ পরেরদিন আমরা ফেরার ট্রেন ধরব । তাকদায় শেষ রাত্রিটা একইরকম সুন্দরভাবে কাটল ।

পরেরদিন আবার সকাল সকাল উঠলাম সূর্য্যোদয় দেখব বলে । এবারে আর বিস্তারিত বিবরণ দিচ্ছি না কারণ সেটা প্রায় একই কথার পুনরাবৃত্তি হয়ে যাবে । শুধু এ'টুকু বলছি আগেরদিনের থেকে আকাশ আরও বেশি পরিষ্কার থাকায় সূর্য্যোদয়টা আরও সুন্দর লাগল ।

পাইন ফরেস্টের রাস্তা
সাতটা নাগাদ আমরা তিনজন বেরোলাম হেঁটে পাইন ফরেস্ট দেখার জন্য । তাকদা জায়গাটা খুবই ছোট একটা গ্রাম - মিনিট দশেক হাঁটলেই গ্রাম শেষ হয়ে গিয়ে পাইনের জঙ্গল শুরু হয়ে যায় । আমরা যে রাস্তা দিয়ে হাঁটছি, আগেরদিন সেই রাস্তা দিয়েই গাড়ি করে গেছি । হাঁটতে বেশ ভালো লাগছিল । রাস্তার দু'পাশে ঘন পাইনের জঙ্গল আর গাছগুলোর মধ্যে দিয়ে সূর্য্যের আলো পড়ছে - এই দৃশ্য সত্যিই খুব সুন্দর । আমরা হেঁটে হেঁটে অর্কিড গার্ডেন পর্যন্ত্য গিয়ে আবার ফিরে এলাম ।

তাকদায় আর কিছু ঘোরার নেই - আমরা ব্রেকফাস্ট করে ব্যাগ প্যাক করে নিলাম । পাহাড় থেকে নামার সময়ে সবসময়েই হাতে সময় নিয়ে বেরোতে হয়, বিশেষ করে দুপুরের পর থেকে সেভক রোডে ভীষণ জ্যাম হয় আর একবার সেই জ্যামে পড়লে ট্রেন ফেল হয়ে যেতে পারে । তাই আমরা বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম তাকদা থেকে । ঘন্টা দু'য়েক চলার পর লোহাপুল বলে একটা জায়গায় গাড়ি থামল লাঞ্চের জন্য । এখানে আমরা চিকেন মোমো, ভাত, এগ-কারী আর চিকেন দিয়ে লাঞ্চ সেরে নিলাম । খরচ পড়ল ১,০৫০/- টাকা ।

আবার গাড়ি এগিয়ে চলল । আমরা সেভকের জ্যাম না পেলেও রাস্তা বেশ খারাপ হওয়ায় নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছতে বিকেল সাড়ে চারটে বেজে গেল । স্টেশন থেকে আমরা ডিনারের মিক্সড চাউমিন আর চিলি চিকেন কিনে নিলাম । আমাদের ফেরার ট্রেন ছিল উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস যার স্টেশনে ঢোকার নির্ধারিত সময় বিকেল ৫:৪০ । ট্রেন ঢুকল প্রায় পঁয়ত্রিশ মিনিট লেটে আর আমাদের শিয়ালদহে পৌঁছে দিল পরেরদিন সকাল সাড়ে পাঁচটা । ভ্রমণ শেষ !

সারসংক্ষেপঃ

১. শিলিগুড়ি বা নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ঘন্টাতিনেকের গাড়ির দূরত্বে একটা তুলনামূলক কম বিখ্যাত জায়গা তাকদা । এখানকার উচ্চতা ৫,৫০০ ফুট - ঠান্ডা মাঝারি ধরনের ।
২. স্টেশন থেকে তাকদা যাওয়ার জন্য গাড়ি পাওয়া সহজ নয়, তাই আগে থেকে বুক করে রাখাই ভাল । সুমো বা ওই জাতীয় বড় গাড়ির তাকদা যাওয়ার ভাড়া ৩,০০০/- টাকা ।
৩. তাকদায় থাকার জায়গা হল 'ব্রিটিশ হেরিটেজ বাংলো' (এর অন্য নাম 'সাইনো হেরিটেজ গেস্ট হাউস') । এদের ওয়েবসাইট http://heritagebungalows.com/takdah-british-bungalow-west-bengal/ থেকে এদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় । কলকাতা থেকে এদের বুকিং করার ফোন নম্বর ঃ (033)25299689, 8902232559 ।
৪. তাকদার ব্রিটিশ বাংলো একটা পাহাড়ের ওপরে । এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য খুবই মনোরম ।
৫. ব্রিটিশ বাংলোয় সারাদিনের খাওয়াদাওয়ার জন্য মাথাপিছু প্রতিদিন ৬০০/- টাকা করে লাগে । এতে সকালে ব্রেকফাস্ট, দুপুরে লাঞ্চ, বিকেলে চা আর রাতের ডিনার পাওয়া যায় । এর বাইরে খাবার নিলে তার জন্য আলাদা চার্জ লাগে ।
৬. এখানকার খাবারের মান বেশ ভালো । এরা একেবারেই ঘরোয়া রান্না করে যার ফলে খেয়ে কখনও শরীর খারাপ করার সম্ভাবনা থাকে না ।
৭. বাংলোর ঠিক পিছনেই কয়েকধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠলে তাকদা মনাস্ট্রি । এখান থেকে সূর্য্যোদয় বা সূর্য্যাস্তের দৃশ্য অত্যন্ত সুন্দর । তবে এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার কোনও ভিউ পাওয়া যায় না ।
৮. বাংলো থেকে পায়ে হাঁটা পথে মিনিটদশেক হাঁটলে পৌঁছনো যায় একটা চার্চে । এটা আগে একটা বাংলো ছিল -বর্তমানে চার্চে পরিণত করা হয়েছে ।
৯. বাংলোর পিছনে পায়ে হাঁটা পথ দিয়ে ইচ্ছে করলে ট্রেকিং করা যায় । কিছুদূর এগোলে পাহাড়ী পথে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়া যায়, তবে সঠিক জুতো না পরে এখানে যাওয়া ঠিক হবে না ।
১০. বাংলো থেকে পায়ে হাঁটা দূরত্বে পাইন ফরেস্ট আছে । এখানে দেখা যায় নানারকম নাম-না-জানা পাহাড়ী ফুলের গাছ যা দেখতে খুব ভালো লাগে ।
১১. তাকদার লোক্যাল সাইট সিয়িং-এর মধ্যে আছে 'অর্কিড গার্ডেন', 'রাংলি-রাংলিওট টি-গার্ডেন', 'তিস্তা ভ্যালি দূরবীন ভিউ পয়েন্ট', 'বারবাটে হ্যাঙ্গিং ব্রীজ' । এগুলোর কোনওটাই খুব বেশি দূরে নয়, তাই গাড়িতে হাফ-ডে ট্যুরেই ঘুরে আসা যায় । গাড়ি এরজন্য নেয় ২,০০০/- টাকা ।
১২. তাকদা থেকে সারাদিনের সাইট-সিয়িং এর জন্য কালিম্পং বা দার্জিলিঙ যাওয়া যেতে পারে । গাড়ি এরজন্য নেয় ৩,০০০/- টাকা ।
১৩. তাকদা থেকে কালিম্পং যাওয়ার পথে 'তিনচুলে ভিউ পয়েন্ট', 'ছোটামাঙ্গয়া অরেঞ্জ গার্ডেন' দেখার মতো জায়গা । তাকদা থেকে কালিম্পং যেতে ঘন্টা দুয়েক লাগে ।
১৪. কালিম্পং শহরে একটা ক্যাকটাস গার্ডেন আছে যেটা দেখার মতো । এছাড়া কালিম্পং থেকে অনতিদূরে ডেলো পার্ক আছে যেখানে যাওয়া যেতে পারে ।

উপসংহারঃ

তাকদা
দার্জিলিঙ-কার্শিয়ং-কালিম্পং এর ভীড়ভাট্টা যাদের পছন্দ নয়, তাদের জন্য প্রায় একই দূরত্বে আরেকটা ঘোরার জায়গা - তাকদা । আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা - তাকদার সবকিছুই ভালো । ভালো থাকার জায়গা, ভালো খাওয়া, ভালো প্রাকৃতিক দৃশ্য, ভালো ঘোরা সবমিলিয়ে তাকদা অনবদ্য । এটা আসলে একটা ছোট গ্রাম, খুব বেশি লোকের বসতিও নেই । ট্যুরিস্টদের কেনাকাটা করার মতো সেরকম কোনও দোকান নেই আর তাই ট্যুরিস্টদের নিয়ে এখানকার মানুষের কোনও বাড়াবাড়িও নেই । আর এই বৈশিষ্ট্যই জায়গাটাকে আরও মনোরম করে তুলেছে । এখানে সূর্য্যোদয় আর সূর্য্যাস্ত দু'টোই ভীষণ সুন্দর হয় - যা খুব কম পাহাড়ী জায়গাতেই দেখা যায় । এখানে এসে যদি আর কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা নাও করা হয়, শুধুমাত্র দু'তিন দিন এখানে বসে আড্ডা দিয়ে কাটিয়ে দিতেও দারুণ লাগবে । একটা ছোট্ট পরিসরে ততধিক ছোট্ট একটা গ্রাম - কিন্তু সৌন্দর্য্যের দিক থেকে বিশালাকার । প্রকৃতি এখানে নিজেকে মেলে ধরেছে স্বমহিমায় আর সেই জন্যই কৃত্রিমতার ছাপ খুব কম । তাই এইরকম জায়গা এবং পরিবেশ যাদের পছন্দ, তাকদায় একবার ঘুরে আসাটা তাদের জন্য একটা লাইফটাইম এক্সপেরিয়েন্স - এটা বলা যেতেই পারে !

তাকদা ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.