আমি ব্লগ লেখার খুব বেশি সমর্থক কোনওদিনও ছিলাম না, সত্যি কথা বলতে কি এখনও যে আছি তা নয় । তার একটা প্রধান কারণ আমার ধারণা ব্লগ লেখার থেকেও পড়া অনেক বেশি ক্লান্তিকর । অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অনেক সময়ই পড়তে শুরু করে শেষ করা হয়ে ওঠে না । নিজের ধৈর্য এবং/অথবা আগ্রহের অভাবকে 'ঠিক আছে, বাকিটা পরে পড়ব' জাতীয় অজুহাত দিয়ে ঢেকে দিই - আর আমরা সবাই জানি সেই 'পরে' টা আর কখনওই আসে না । তো, এই কারণে আমি ঠিক করেছি আমার ব্লগকে কখনওই অন্যের ক্লান্তির কারণ ঘটাব না, আমার ব্লগের বিষয় হবে প্রধানতঃ ভ্রমণ । আমার মতো যেসব বাঙালিরা ঘুরতে ভালোবাসে, তাদের জন্য আমার ব্লগ হবে তথ্যের একটা উৎস । আমার নিজের একটা অভ্যেস আছে, কোনও জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার আগে সেই জায়গাটা সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, আর ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে আমার বরাবরই মনে হয়েছে যে ইন্টারনেটে লেখালেখি করার ব্যাপারে বাঙালিদের থেকে কুঁড়ে খুব কম শিক্ষিত জাতই আছে । আমার মতো যেসব বাঙালিরা আছে, যারা ইন্টারনেটে কোনো একটা ইংরিজীতে লেখা দেখলেই না পড়ার চেষ্টা করে, তাদের জন্য আমার ব্লগ সহায়ক হবে, এই বিশ্বাস নিয়ে শুরু করছি আমার ভ্রমণকাহিনী । আগেই বলে রাখি, আমি স্ট্যাটিসটিক্সের ছাত্র ছিলাম, তাই আমার ব্লগে তত্ত্বের থেকে তথ্যের দেখাই মিলবে বেশি ।

Monday, October 29, 2018

ভাইজ্যাগ-আরাকু ভ্রমণ

বিশেষ সতর্কীকরণঃ

১. এই পুরো ভ্রমণে আমরা কোনও অবস্থাতেই কোনও পলিথিন বা প্লাস্টিক ব্যবহার করিনি । অর্থাৎ প্লাস্টিকের ব্যবহার না করেও এই ভ্রমণ অনায়াসে করা যায় ।

২. এই পুরো ভ্রমণে শুধুমাত্র হোটেল বুকিং-এর প্রিন্টআউট ছাড়া আমরা কোনও কাগজ ব্যবহার বা নষ্ট করিনি । হোটেল বুকিং-এর হার্ড কপি না বের করে সফট্‌ কপিতেও সহজেই কাজ চালানো যায় ।

৩. এই পুরো ভ্রমণে আমাদের দলের কেউ ধূমপান করেনি । ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর ।

আমার ব্লগের সমস্ত পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করছি প্লাস্টিক, অপ্রয়োজনীয় কাগজের ব্যবহার আর ধূমপান বর্জন করার জন্য ।

ভ্রমণপথঃ

বুধবার ২৪শে অক্টোবর, ২০১৮ঃ সাঁত্রাগাছি - বিকেল ৪ঃ১৮ মিনিটে শালিমার সাঁত্রাগাছি এসি সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস ।
বৃহস্পতিবার ২৫শে অক্টোবর, ২০১৮ঃ সকাল ৫ঃ৪৫ মিনিটে বিশাখাপত্তনম । বিশাখাপত্তনমে রাত্রিবাস ।
শুক্রবার ২৬শে অক্টোবর, ২০১৮ঃ বিশাখাপত্তনমে লোক্যাল সাইট সিয়িং । বিশাখাপত্তনমে রাত্রিবাস ।
শনিবার ২৭শে অক্টোবর, ২০১৮ঃ বিশাখাপত্তনম - সকাল ৬ঃ৫০ মিনিটে বিশাখাপত্তনম কিরন্ডুল  প্যাসেঞ্জার । সকাল ১১ টা আরাকু । আরাকুতে রাত্রিবাস ।
রবিবার ২৮শে অক্টোবর, ২০১৮ঃ আরাকুতে গাড়ি করে লোক্যাল সাইট সিয়িং - বোরা কেভস্‌ - বিশাখাপত্তনম । রাত্রি ৮ঃ৫৫ মিনিটে চেন্নাই সাঁত্রাগাছি এসি সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস ।
সোমবার ২৯শে অক্টোবর, ২০১৮ঃ দুপুর ১ টা - সাঁত্রাগাছি ।

"ভারতবর্ষের কোথায় পাহাড় আর সমুদ্র একসঙ্গে দেখতে পাওয়া যায় ?" ক্যুইজের এই প্রশ্নের উত্তরে সবার মনে প্রথম যে জায়গাটা আসে সেটা হল 'গোয়া' । এই প্রশ্নের অন্য উত্তর হল 'ভাইজ্যাগ' বা 'বিশাখাপত্তনম' । অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যে সমুদ্রের ধারে অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের অধিকারী এই শহর ভ্রমণপিপাসুদের এক প্রধান আকর্ষণ । আমাদের দেশে বেড়াতে যাওয়ার জন্য যে কয়েকটা খুব ঘ্যাম জায়গা আছে, ভাইজ্যাগ তাদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য । আর এর সঙ্গে যার নাম স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে সেটা হল আরাকু ভ্যালি - ভাইজ্যাগ থেকে ১১৫ কিলোমিটার দূরে একটা পাহাড় ঘেরা শহর । এই ভাইজ্যাগ আর আরাকু ভ্রমণ নিয়ে আমার ব্লগের এবারের পোস্ট ।

সাঁত্রাগাছি স্টেশনে আমরা
বুধবার ২৪শে অক্টোবর, ২০১৮ লক্ষ্মীপূজোর দিন আমাদের যাত্রা শুরু । আমরা বলতে আমি, আমার স্ত্রী অমৃতা, বাবা, মা, কথা, কলি । আমাদের ট্রেন ছিল সাঁত্রাগাছি স্টেশন থেকে । এর আগে একবারই আমরা সাঁত্রাগাছি থেকে ট্রেন ধরেছি - মুকুটমণিপুর যাওয়ার সময়ে । আমাদের ট্রেন শালিমার সাঁত্রাগাছি এসি সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস ছাড়ল নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় ১০ মিনিট পরে ।


এসি-তে গেলে জার্নিটা আরামদায়ক হয় ঠিকই, কিন্তু সেইসঙ্গে বাইরের দৃশ্য বিশেষ ভালোভাবে দেখা যায় না । তবে অক্টোবরের শেষে বিকেল সাড়ে পাঁচটার মধ্যেই অন্ধকার হয়ে যায়, তাই বাইরে বিশেষ কিছু দেখাও যাচ্ছিল না । রাতে বাড়ি থেকে নিয়ে আসা রুটি আর চিলি চিকেন দিয়ে আমরা ডিনার করে নিলাম ।

বিশাখাপত্তনম স্টেশনে
পরেরদিন সকাল ৫ঃ৪৫ মিনিটে আমাদের বিশাখাপত্তনম পৌঁছনোর কথা আর ট্রেন একেবারেই লেট না করে আমাদের পৌঁছে দিল । বিশাখাপত্তনম স্টেশনের বাইরের দৃশ্য দেখে খুব সুন্দর লাগল । আগেই জানতাম ভাইজ্যাগ পাহাড়ী শহর নয়, পাহাড় দিয়ে ঘেরা একটা প্রায় সমতলভূমি । সেই দৃশ্যের প্রতিফলন স্টেশনের বাইরে থেকেই দেখতে পাওয়া শুরু হল । এখানকার তাপমাত্রা ঠান্ডা বলা যায় না, তবে সকালের দিক হওয়াতে বেশ আরাম লাগছিল । আমরা স্টেশন থেকে একটা বড় অটো নিয়ে হোটেলে চলে গেলাম ।

রুষিকোন্ডা বীচে সূর্য্যোদয়ের পরে
ভাইজ্যাগে অন্ধ্রপ্রদেশ ট্যুরিজমের দু'টো রিসর্ট আছে - একটা রামকৃষ্ণ বীচে আর অন্যটা রুষিকোন্ডা বীচে (হ্যাঁ নামটা রুষিকোন্ডা, ঋষিকোন্ডা নয় !) । দুটোরই নাম হরিথা বীচ রিসর্ট । রামকৃষ্ণ বীচটা ভাইজ্যাগ শহরের মধ্যে আর স্টেশন থেকে কাছে । রুষিকোন্ডা বীচটা স্টেশন থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে আর শহরের থেকে একটু বাইরে । রুষিকোন্ডা বীচের রিসর্টের ভাড়াও তুলনামূলকভাবে বেশি । তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের দিক থেকে রুষিকোন্ডা অনেক বেশি আকর্ষণীয়, তাই আমরা এটাই পছন্দ করেছিলাম । অটো করে যখন পৌঁছলাম তখন প্রায় সকাল ৭ টা । সূর্য্য সবেমাত্র উঠেছে । রিসর্টটা পাহাড়ের উপরে আর সামনে দিগন্তবিস্তৃত সমুদ্র । সবমিলিয়ে মনে হল ভাইজ্যাগে এসে এখানে না থাকলে একটা আফসোস চিরদিন থেকে যেত (তবে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হওয়া এখানেই শেষ নয় । মুগ্ধতার দ্বিতীয় পর্য্যায়ের কথা যথাসময়ে লিখব) ।

ডাইনিং স্পেশের লাগোয়া ছাদ
আমাদের ঘরের চেক-ইন টাইম সকাল ১০ টা, তাই ঘর খালি হতে একটু সময় লাগল । সেই সময়ের মধ্যে আমরা ব্রেকফাস্ট করে নিলাম । রিসর্টের খাওয়ার জায়গাটাও খুব সুন্দর - তিনদিক কাচ দিয়ে ঘেরা । একটা বড় ঘর । আবার চাইলে লাগোয়া ছাদে বসেও খাওয়াদাওয়া করা যায় । দিনের বেলা সেটা খুব আরামদায়ক না হলেও রাত্রিবেলা সেটা বেশ মনোরম অভিজ্ঞতা হবে বলেই মনে হল । আমরা পুরি-তরকারি দিয়ে ব্রেকফাস্ট সারলাম । খরচ হল ৩৮৪/- টাকা । ভাইজ্যাগের ঘরের সঙ্গে কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট আছে, কিন্তু সেটা চেক-ইন করার পরেই পাওয়া সম্ভব অর্থাৎ আমরা সেটা পরেরদিন পাব । তাই প্রথমদিনের খাওয়াটা নিজেদের টাকা দিয়েই খেতে হল ।

হরিথা বীচ রিসর্ট (রুষিকোন্ডা) এর ঘর
আগেই ঠিক করা ছিল প্রথমদিনটা কোথাও ঘুরতে যাব না, বিশেষ করে ভাইজ্যাগ শহরটা ঘোরার জন্য হাতে একটা গোটা দিন থাকলেই হয় । তাই ঘরে এসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে নিলাম । এখানকার সব ঘরই এসি আর ঘরগুলো বেশ বড় । ঘরের লাগোয়া বাথরুমে যেতে গেলে চারধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয় । একেকটা আলাদা আলাদা কটেজের মতো বাড়ি আর সেখানে দোতলা আর তিনতলায় দুটো করে ঘর । একটা কটেজের দোতলায় দুটো ঘর আমাদের দিয়েছিল ।

আমাদের ব্যালকনি থেকে
দুটো ঘরের লাগোয়া একটা ব্যালকনি আছে যেখান থেকে সমুদ্রের অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায় । ব্যালকনিতে চেয়ারও আছে, আর এখানে বসে বসে অনায়াসে সময় কাটানো যায় ।

রুষিকোন্ডা বীচে স্নান





একটু বেলা হলে আমরা সমুদ্রে গেলাম । কটেজগুলো পাহাড়ের ওপরে আর সেখান থেকে সমুদ্রে যেতে গেলে সিঁড়ি দিয়ে অনেকটা নেমে যেতে হয় । নামার সময়ে অসুবিধে না হলেও বেশ বুঝতে পারছিলাম ফেরার সময়ে হালুয়া টাইট হয়ে যাবে । ভাইজ্যাগের সমুদ্র বঙ্গোপসাগর হলেও এখানে খুব বেশি ঢেউ নেই আর সমুদ্রের নাব্যতাও ('নাব্যতা' কি মনে না পড়লে আমি বলব না, কাছাকাছি ক্লাস সেভেনের কোনও ছাত্র/ছাত্রী বা কোনও ভূগোলের শিক্ষক/শিক্ষিকাকে জিজ্ঞেস করতে পার) কম তাই চান করাটা দুর্দান্ত কিছু অভিজ্ঞতা নয় । তবে সমুদ্রে চান জিনিসটা আমার খুব পছন্দের, তাই যতটা পারলাম উপভোগ করলাম ।

ঘরে ফিরে আরেকদফা চান করে দুপুরে খেতে গেলাম খাওয়া জায়গায় । রিসর্ট পুরো ভর্তি, পূজোর ছুটিতে লোকজন ভাইজ্যাগ বেড়াতে চলে এসেছে ! কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আমরা বসার জায়গা পেলাম । লাঞ্চে ভাত ডাল ডিম চিকেন নেওয়া হল । খরচ হল ৭৮২/- টাকা ।

ব্যালকনির অন্য কোণ থেকে
দুপুরে ঘরেই থাকলাম । বিকেলবেলা বারান্দায় বসে সমুদ্রের দৃশ্য দেখলাম । আমার মতে ভাইজ্যাগ গেলে একটা দিন শুধুমাত্র রিসর্টে বসে কাটানোর জন্য রাখা ভালো, কারণ পাহাড়ের ওপরে বসে সমুদ্রের ওপর প্রকৃতির আলোর খেলা দেখার সুযোগ অন্ততঃ ভারতবর্ষে খুব বেশি পাওয়া যায় না । সকালে আমাদের সামনে দিয়ে সূর্য্যোদয় হয়েছে, তাই সূর্য্যাস্ত হবে আমাদের পিছনে । তাই সমুদ্রের ওপরে সূর্য্যাস্তের দৃশ্য না দেখতে পেলেও আমাদের ব্যালকনিতে বসে যা দেখতে পেলাম তাও অসাধারণ !

রাতের ভাইজ্যাগের দৃশ্য
সন্ধ্যে ছ'টা নাগাদ আমরা আবার পাহাড় থেকে নেমে সমুদ্রের ধারে এলাম । প্রায় অন্ধকার হয়ে গেছে, সমুদ্রের বাঁধানো পাড়ে বসে থাকতে ভালোই লাগছিল । হাল্কা একটা হাওয়া সারাক্ষণই দিচ্ছিল । আমরা কিছুক্ষণ বসে তারপর উঠে পড়লাম । সমুদ্রের ধারে অনেক দোকান আছে সেখানে খাবার থেকে শুরু করে ঘর সাজানোর জিনিস সবই পাওয়া যায় । রুষিকোন্ডা বীচের রিসর্টে না থাকলেও এই বীচটা ভাইজ্যাগ সিটি ট্যুরের মধ্যে পড়ে তাই ভাইজ্যাগে যারা বেড়াতে আসে তারা প্রায় সকলেই এখানে একবার করে আসে । আমরা দোকানে ঘুরে টুরে ডাব, চাট, আইসক্রিম ইত্যাদি খেলাম । তারপর আবার ফেরার পথ ধরে রিসর্টে ফিরে এলাম ।

দিনের বেলার থেকে রাত্রে ডাইনিং রুমে স্বাভাবিকভাবেই বেশি ভিড় । তাই আমরা ডিনারের খাবার প্যাক করে ঘরে নিয়ে চলে এলাম । এখানে ঘরে খাবারের সব ব্যবস্থাই আছে, তাই খেতে কোনও অসুবিধে হল না । রুটি, চিকেন আর এগকারি নিয়ে খরচ হল ৫২০/- টাকা ।

সিটি ট্যুরে বেরনোর আগে
পরেরদিন ২৬শে অক্টোবর, ২০১৮ - আমাদের ভাইজ্যাগ ঘোরার দিন । ভাইজ্যাগ ঘোরার জন্য এ পি ট্যুরিজমের একাধিক প্যাকেজ ট্যুর আছে । এগুলো এ পি ট্যুরিজমের ওয়েবসাইট থেকে দেখা যায় বা আমাদের হোটেলের থেকেও জানতে পারা যায় । তবে বুকিং অনেকটাই নির্ভর করে সিজনের ওপর । প্যাকেজ ট্যুরগুলোর মধ্যে ভাইজ্যাগ সিটি ট্যুর ছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার প্যাকেজ আছে । আমাদের পরিকল্পনা শুধুমাত্র ভাইজ্যাগ ঘোরাই ছিল । সিটি ট্যুরের জন্য বাস চলে তবে আমরা হিসেব করে দেখলাম বাসের থেকে সামান্য বেশি টাকায় আমরা একটা গাড়ি বুক করতে পারি আর তাতে সুবিধে হল আমরা নিজেদের ইচ্ছেমতো ঘুরতে পারব । তাই আমরা সেটাই করলাম ।

বেরোনোর আগে আমরা ডাইনিং রুম থেকে কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট করে নিলাম । ব্রেকফাস্টের মেনু ইডলি, ধোসা, বড়া ইত্যাদি আর সেইসঙ্গে চা ও কফি । খাবার যত ইচ্ছে খাওয়া যায় ঠিকই তবে এই খাবার বেশি খাওয়া যায় না । খেয়েদেয়ে আমরা ঘুরতে বেরোলাম সকাল ১০ টা নাগাদ । আমাদের বাহন একটা চারজন বসার সিডান ।

রামা নাইডু স্টুডিও - আমাদের প্রথম গন্তব্য রামা নাইডু স্টুডিও । হরিথা বীচ রিসর্ট থেকে এর দূরত্ব ৫.৫ কিলোমিটারের মতো । যাওয়ার পথটার অনেকটাই সমুদ্রের একেবারে পাশ দিয়ে । হুবহু না হলেও রাস্তাটা অনেকটা মুম্বই-এর মেরিন ড্রাইভের কথা মনে করিয়ে দেয় । স্টুডিওটা একটা পাহাড়ের ওপরে । পাহাড়ের গায়ের জিগজ্যাগ রাস্তা দিয়ে একেবারে স্টুডিওর গেট পর্যন্ত্য গাড়ি যায় । ভিতরে ঢোকার চার্জ মাথাপিছু ৫০/- টাকা আর বাচ্চাদের ফ্রি । ক্যামেরা নিয়ে গেলে আলাদা চার্জ লাগে তবে মোবাইল ক্যামেরায় কোনও সমস্যা নেই । আমরা ভিতরে ঢুকে দেখা শুরু করলাম ।

হাভেলির বারান্দায় 'ঠাকুরসাহাব' দর্শন দিচ্ছেন
রামা নাইডু স্টুডিওতে এখন আর কোনও ছবির শুটিং না হলেও একসময়ে এটা নাকি বেশ ভালো একটা স্টুডিও ছিল । আমি কখনও কোনও স্টুডিওর ভিতরে ঢুকিনি, এখানে ঢুকে বিভিন্ন ধরনের সেট্‌ সাজানোর বাড়িগুলো কেমন দেখতে হয় দেখলাম । একটা থানা, তার ভিতরে লক্‌আপ, একাধিক দোকান, বন্ধ শাটার, সাধারণ বাড়ি, জমিদার বাড়ি (যাকে হিন্দী ছবির ভাষায় বলে 'হাভেলি') এই সবই আছে । এখানে যেহেতু ছবির শুটিং হয়না তাই জিনিসগুলোকে দারুণভাবে মেন্টেইন করার বিশেষ তাগিদ আছে বলে মনে হয় না, তবে আমাদের মতো লোকজন এখানে বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে বসে অভিনেতাদের মতো পোজ দিয়ে ছবি তোলে । এখানে একটা মিউজিয়াম গোছের আছে সেখানে পুরনো দিনে ব্যবহার হওয়া ক্যামেরা আর অন্যান্য ছবি তোলার সরঞ্জাম রয়েছে । এছাড়া একটা ফোটো গ্যালারি আছে যেখানে বিভিন্ন দক্ষিণ ভারতীয় ও বলিউডের অভিনেতা/অভিনেত্রীদের ছবি রয়েছে যাঁরা রামা নাইডু স্টুডিওতে তাঁদের ছবির শুটিং করেছেন ।

ভিউ পয়েন্ট থেকে ভিউ
এখানে একটা ভিউ পয়েন্ট আছে যেখান থেকে সমুদ্রের অসাধারণ ভিউ পাওয়া যায় । আমরা এখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছবি তুলে চলে এলাম ।









নরসিমা স্বামী মন্দির - রামা নাইডু স্টুডিওর পাহাড় থেকে নেমে আমরা এগিয়ে গেলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্য নরসিমা স্বামী মন্দিরের দিকে । এই জায়গাটা আরেকটা পাহাড়ের ওপরে । মজার ব্যাপার আমাদের দর্শনীয় জায়গাগুলো একেকটা পাহাড়ের ওপরে আর সেখানে যাওয়ার জন্য একেকবার পাহাড় থেকে নেমে সমতলে চলতে হয় । রামা নাইডু স্টুডিও থেকে নরসিমা স্বামী মন্দির গাড়িতে প্রায় একঘন্টা লাগে । নরসিমার পাহাড়ে ওঠার সময়ে একজায়গায় গাড়ির জন্য ৩০/- টাকা টোল ট্যাক্স দিতে হল ।

নরসিমা মন্দিরের গেট
নরসিমা মন্দিরের কাছে পার্কিং-এ গাড়ি রেখে আমরা গেলাম মন্দিরে । এখানে মন্দিরে জুতো খুলে যেতে হয় আর ক্যামেরা নিয়ে ঢোকার অনুমতিও নেই (না, মোবাইল নিয়েও ঢোকা চলবে না) । মন্দিরের প্রধান ফটকটা টিপিক্যাল দক্ষিণ ভারতীয় মন্দিরের ফটকের মতো - বিশাল ঢ্যাঙা উঁচু আর তার গায়ে একগাদা মূর্তি-টুর্তি বসানো । মন্দিরটা এখানে বেশ বিখ্যাত সেটা বোঝা যাচ্ছিল এতে ঢোকার রেলিং আর নিয়মের বহর দেখে । অনেক এদিক-সেদিক ঘুরে শেষে যদিও বা আমরা মন্দিরের মূল দরজার সামনে পোঁছলাম কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখলাম ভিতরে ঢুকতে আবার টিকিট লাগবে । আমরা ঠাকুর দেখার জন্য টিকিট কাটার পক্ষপাতী নই তাই এ'যাত্রায় নরসিমা স্বামী আমাদের দেখতে পাওয়ার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিতই রয়ে গেলেন ! রোদের মধ্যে এতটা হাঁটাহাঁটি করে বেশ তেষ্টা পেয়ে গিয়েছিল, লস্যি বিক্রি হচ্ছে দেখে কিনলাম । খেয়ে দেখলাম জিনিসটা লস্যিই, তবে উপাদানটা দই হলেও স্বাদটা একেবারেই মিষ্টি নয়, নোনতা । খেতে খুব একটা ভালো না লাগলেও একচুমুকে খেয়ে নিয়ে ফেরার পথ ধরলাম ।

কৈলাশগিরি পাহাড় - নরসিমা স্বামী মন্দির থেকে আধঘন্টা লাগল পরের জায়গা কৈলাশগিরি পাহাড়ে পৌঁছতে । বলা বাহুল্য, নরসিমা মন্দিরের পাহাড়ের ওপর থেকে সমতলে নেমে আমাদের আবার আরেকটা পাহাড়ের ওপরে উঠতে হল । পরে শুনেছিলাম এ পি ট্যুরিজমের বাস নাকি এই পাহাড়ের ওপরে ওঠে না । সেক্ষেত্রে রোপওয়ে চড়ে পাহাড়ের নিচ থেকে ওপরে উঠতে হয়, আবার একইরকমভাবে নামতে হয় । আমাদের গাড়ি অবশ্য সোজা পাহাড়ের ওপরেই আমাদের নিয়ে হাজির হল ।

টাইটানিক ভিউ পয়েন্ট থেকে
কৈলাশগিরি পাহাড় হচ্ছে ভাইজ্যাগের যাকে বলে সবথেকে বড় আকর্ষণ । এটা ভাইজ্যাগের সবথেকে উঁচু জায়গা । এখানে ঢোকার মুখে একটা রেলিং ঘেরা জায়গা আছে যেটাকে 'টাইটানিক ভিউ পয়েন্ট' বলা হয় । রেলিং-এর কোণটা একেবারে টাইটানিক জাহাজের সামনের রেলিং-এর মতো আর এখান থেকে সমুদ্রের অসাধারণ ভিউ পাওয়া যায় (যারা 'টাইটানিক' দেখেছে তাদের মধ্যে প্রায় সকলেই একবাক্যে স্বীকার করবে রেলিং-এর ওপর দাঁড়িয়ে জ্যাক আর রোজের সমুদ্রের দৃশ্য দেখার এই সিনটাই ছবির শ্রেষ্ঠ সিন)। চাইলে রেলিং-এর ওপর দাঁড়িয়ে টাইটানিক পোজে ছবিও তোলা যায় !

কৈলাশগিরিতে কথা-কলির সঙ্গে শিব ও দূর্গা
এরপর আমরা পাহাড়ের অন্যদিকটায় গেলাম । এখানে একটা বড় গেট আছে, সেটা দিয়ে মূল জায়গাটায় ঢুকতে হয় । কৈলাশগিরি পাহাড়ের ওপরে শিব আর দূর্গার দুটো বিশাল সাইজের মূর্তি আছে, সেই থেকেই এই পাহাড়ের নাম কৈলাশগিরি । পাহাড়ের ওপরটা খুব সুন্দর করে সাজানো, পায়ে চলার রাস্তা, বাগান, মূর্তি ইত্যাদি অনেক কিছু আছে । পুরো জায়গাটা ঘুরে দেখতে সময় লাগে আবার ভালোও লাগে । জায়গায় জায়গায় বসার জায়গা করা আছে, সেখানে বসে বিশ্রাম নেওয়া যেতে পারে । রোদ থাকলেও পাহাড়ের ওপরে একটা ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছিল সেই জন্য খুব গরম লাগছিল না । আমরা ভালো করে সবজায়গাটা ঘুরে দেখলাম ।

কৈলাশগিরির টয়ট্রেন
এখানে পাহাড়ের ওপরে একটা টয়ট্রেন চলে যেটা পাহাড়ের ওপরটাকে একটা চক্কর দেয় । ট্রেনের টিকিট বড়দের মাথাপিছু ৪০/- টাকা আর ছোটদের মাথাপিছু ৩০/- টাকা । এরকম একটা দারুণ জিনিস না চড়ার কোনও মানেই হয় না, তাই টিকিট কেটে আমরা চড়ে বসলাম । এই টয়ট্রেন কলকাতার অটো আর লোক্যাল ট্রেনের কম্বিনেশন - নির্দিষ্ট সময়ে ছাড়ার ব্যাপারে কোনও মাথাব্যাথা নেই আর ভর্তি না হলে ছাড়ে না !

টয়ট্রেন থেকে ভাইজ্যাগ শহর







যাই হোক, শেষ পর্যন্ত্য ভর্তি হল আর ছাড়ল নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় ২০ মিনিট পরে । ট্রেনে করে ঘুরে দারুণ লাগল । ট্রেন থেকে পাহাড়ের চারপাশে পুরো ভাইজ্যাগ শহরটা দেখা যায় আর সমুদ্রের দিকটাও দেখা যায় । অসাধারণ দৃশ্য ! ভাইজ্যাগ গেলে এই একটা জিনিস কোনওমতেই মিস্‌ করা চলবে না । একটা সাজেশন দিচ্ছি - এই ট্রেনে সবসময়ে ডানদিকের সিটে বসার চেষ্টা করা উচিৎ, তাহলেই এই দৃশ্য উপভোগ করা সম্ভব । যদি ট্রেনে ওঠার সময়ে দেখা যায় ডানদিকের সিট ভর্তি হয়ে গেছে, সেক্ষেত্রে পরের ট্রেনে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ (পরের ট্রেন বলতে এই ট্রেনের পরের ট্রিপ কারণ এই লাইনে এই একটাই ট্রেন চলে)। আমাদের ২০ মিনিটব্যাপী টয়ট্রেন ভ্রমণ শেষ হল তখন দুপুর ২ঃ৫০ মিনিট ।

স্টেশনের পাশেই একাধিক রেস্ট্যুরেন্ট আছে । তারই একটা থেকে আমরা মিক্সড ফ্রাইড রাইস আর চিকেন মাঞ্চুরিয়ান খেলাম । খরচ হল ৩৪০/- টাকা ।

এয়ারক্র্যাফট মিউজিয়ামের ভেতরে মডেল
এয়ারক্র্যাফ্‌ট মিউজিয়াম - আমাদের পাহাড়ের ওপরের দেখার জায়গা শেষ, এরপর যা দেখার সবই সমতলে । আমাদের গাড়ি এরপর আমাদের নিয়ে গেল এয়ারক্র্যাফ্‌ট মিউজিয়ামে । এটা একেবারে সমুদ্রের ধারে । কৈলাশগিরি পাহাড় থেকে এখানে যেতে লাগল মিনিট কুড়ি । এখানে ঢোকার টিকিট মাথাপিছু ৭০/- টাকা আর বাচ্চাদের টিকিট লাগে না । মিউজিয়ামটা খুবই সুন্দর । এখানে বিভিন্ন যাত্রীবিমান, যুদ্ধবিমানের নানারকম যন্ত্রাংশ ইত্যাদি রাখা আছে । যন্ত্রপাতিগুলো কিভাবে কাজ করে, বিমানের মধ্যে কিভাবে কম জায়গায় অনেক সরঞ্জাম রাখা যায় সেই সম্পর্কে প্রচুর তথ্য নানারকম মডেলের মাধ্যমে দেখানো আছে । মিউজিয়ামটা বিশাল কিছু বড় নয় আর ভেতরটা খুব সুন্দর ।

আসল যুদ্ধবিমান
মিউজিয়ামের বেরোনোর গেটে একটা সত্যিকারের গোটা যুদ্ধবিমান রাখা আছে এবং সেটার ভিতরে ঢুকে সবটা দেখার জন্য ব্যবস্থা করা আছে । সিঁড়ি দিয়ে উঠে প্লেনের ভিতরে ঢুকে আমরা ভালো করে সব দেখে নিলাম । এই জিনিস সিনেমায় অনেকবার দেখেছি (যেগুলোর পিছনটা খুলে যায় আর সেখান থেকে সৈন্যরা টপাটপ ঝাঁপ দেয়), তবে সেটা সামনাসামনি দেখার সুযোগ এই প্রথমবার পাওয়া গেল ।

সাবমেরিন মিউজিয়াম - এয়ারক্র্যাফ্‌ট মিউজিয়ামের সামনে বীচ রোড আর সেটা পেরিয়ে সমুদ্রের ধারে সাবমেরিন মিউজিয়াম । এখানে ঢোকার টিকিট মাথাপিছু ৪০/- টাকা আর এখানেও বাচ্চাদের টিকিট লাগে না । এটা একটা সত্যিকারের আস্ত সাবমেরিন । এর নাম আই এন এস কুরসুরা । এখানেও সিঁড়ি দিয়ে উঠে সাবমেরিনে ঢুকে ভিতরটা দেখতে হয় । এই জিনিসও হলিউডের সিনেমায় দেখেছি তবে সামনাসামনি এই প্রথম । সাবমেরিনের ভিতরটা একটা দেখবার মতো জিনিস । আমরা ছাড়াও আরও অনেক দর্শক ছিল আর কর্তৃপক্ষ পুরো দলের জন্য একজন গাইড দেয়, সেই আমাদের সব দেখিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছিল ।

সাবমেরিন
একটা ছোট জায়গার ভিতরে যে কি অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে সবকিছুর ব্যবস্থা করা আছে, সেটা নিজের চোখে না দেখলে বোঝা যায় না । এই সাবমেরিনে একসঙ্গে চব্বিশজন লোক থাকতে পারে, তাদের মধ্যে পালা করে আটজন ঘুমোতে পারে । তাদের শোওয়ার ব্যবস্থা, খাওয়ার ব্যবস্থা, স্নানাদির ব্যবস্থা, বিনোদনের ব্যবস্থা সবই করা আছে এই সাবমেরিনের মধ্যে । হঠাৎ প্রয়োজন পড়লে যাতে তারা যেকোনও পরিস্থিতিতে তাড়াতাড়ি তৈরি হতে পারে সেই ব্যবস্থাও করা আছে এর ভিতরে । এখানে ভিতরে ফোটো তোলার নিয়ম নেই, তাই শুধু বাইরে থেকে তোলা ছবি দেওয়া গেল ।

সাবমেরিন মিউজিয়ামের পাশের পার্ক
সাবমেরিন মিউজিয়ামের বেরোনোর গেটের পাশে একটা ছোট পার্ক গোছের আছে, সেখানে বসার জায়গা, বাচ্চাদের ঢেঁকি ইত্যাদি আছে । আমরা অবশ্য সেখানে সময় নষ্ট না করে এগিয়ে গেলাম আমাদের দিনের শেষের গন্তব্যগুলোর দিকে ।





রামকৃষ্ণ বীচ
রামকৃষ্ণ বীচ - সাবমেরিন মিউজিয়ামের থেকে ২ মিনিট গাড়িতে গেলে শুরু হয়ে যায় রামকৃষ্ণ বীচ । এই বীচের খুব কাছেই আছে এখানকার রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম, সেই থেকেই বীচের নাম । যারা ভাইজ্যাগে এসে রামকৃষ্ণ বীচে থাকে, তাদের জন্য রুষিকোন্ডা বীচ একটা ভিউ পয়েন্ট আর যারা রুষিকোন্ডা বীচে থাকে, তাদের জন্য রামকৃষ্ণ বীচ একটা ভিউ পয়েন্ট । আর যারা এই দুটোর কোনওটাতেই থাকে না তাদের জন্য দুটোই ভিউ পয়েন্ট !

রামকৃষ্ণ বীচের সামনের রাস্তা
আমরা রামকৃষ্ণ বীচের পাশে রাস্তার পাঁচিলের ওপর কিছুক্ষণ বসে রইলাম । বিকেল ৫ঃ৩০ বাজে, বীচে লোকজনের বেশ ভিড় । বীচটা খুব সুন্দর এটা বলতেই হবে । খুব সুন্দর হাওয়া দিচ্ছিল, বসে থাকতে বেশ ভালো লাগছিল । এখানেও বীচের ওপর ঘোড়া চলে, বীচের ওপর দোকান বসে । সবমিলিয়ে আমাদের পরিচিত আর পাঁচটা জনবহুল বীচের সঙ্গে বিশেষ পার্থক্য নেই, আর সেই কারণেই হয়তো বসে থাকাটা বেশ উপভোগ করছিলাম । বীচে বসে কিছু খাব না, এটা হতেই পারে না তাই কুলফি খাওয়া হল । সারাদিন ঘোরার পর সেটা বেশ একটা উপাদেয় জিনিস !

কালীমন্দির
কালী মন্দির - রামকৃষ্ণ আছেন আর কালী ঠাকুর নেই তা কি হয় ? রামকৃষ্ণ বীচে আমরা যেখানে বসেছিলাম তার ঠিক উল্টোদিকেই রাস্তা পেরিয়ে এখানকার কালীমন্দির । মন্দিরটার বৈশিষ্ট্য হল এটা দেখতে একেবারে দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরের মতো, তবে কিছুটা আকারে ছোট । মন্দিরের ভেতরে ঢুকতে গেলে আবার জুতো খোলার হ্যাপা আছে, তাই আমরা সেটা উপেক্ষা করলাম । মন্দিরের পাশেই আমাদের গাড়ি রাখা ছিল, সেটায় উঠে এবার আমরা ফেরার পথ ধরলাম ।

রামকৃষ্ণ বীচ থেকে রুষিকোন্ডা বীচে আমাদের রিসর্টে ফিরতে সময় লাগল আধঘন্টা । গাড়ি আমাদের রিসর্টের দরজায় নামিয়ে দিয়ে তার প্রাপ্য ২,৩০০/- টাকা নিয়ে চলে গেল ।

আমাদের ভাইজ্যাগ ঘোরা শেষ । এটা বলব না যে আমরা ভাইজ্যাগের সবকটা দেখার জায়গাই দেখে ফেলেছি, কিন্তু এটা ঠিক যে আমরা বেশিরভাগ ভালো জায়গাগুলোই দেখতে পেরেছি । যেকোনও জনপ্রিয় ঘোরার জায়গাতেই এরকম অনেকগুলো দেখার পয়েন্ট থাকে । কিন্তু শুধু সংখ্যার বিচারে সবকটা জায়গা দেখার আমি কোনও যৌক্তিকতা খুঁজে পাইনা । আমার মতে, তার থেকে অনেক ভালো হচ্ছে যে ক'টা জায়গা দেখব, সেগুলো ভালোভাবে খুঁটিয়ে দেখব । সেই বিচারে আমরা ভাইজ্যাগে যা দেখেছি, তা খুব ভালোভাবেই দেখেছি ।

দ্বিতীয়বার অবাক হওয়া !
ঘরে ফিরলাম তখন সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা । আমরা ব্যালকনিতে বসে রয়েছি, আকাশে চাঁদ উঠেছে । দিনটা কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমার মাত্র দুদিন পরে, তাই চাঁদের আলোর জৌলুস দেখার মতো । সেই চাঁদের জ্যোৎস্না সমুদ্রের ওপর প্রতিফলিত হয়ে এক অসামান্য আলোকোদ্ভাসিত দৃশ্যপটের সৃষ্টি করেছে ! আগেও বলেছি, সমুদ্রের পাশে এসে পাহাড়ের ওপর থেকে সমুদ্র দেখার সুযোগ সচরাচর পাওয়া যায় না আর এই উচ্চতা থেকে সমুদ্রের জলে পূর্ণচন্দ্রের প্রতিফলনের সৌন্দর্য্য যে কতখানি, তা লিখে বোঝানো সম্ভব নয় । বাইরের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে প্রকৃতির এই অকৃপণ দানে নিজেকে ঋণী বলে মনে হচ্ছিল (লেখার মধ্যে কাব্য বেশি হয়ে যাওয়ার জন্য দুঃখিত !)। রুষিকোন্ডা বীচে থাকার পরিপ্রেক্ষিতে এই আমার দ্বিতীয়বার মুগ্ধ হওয়া ।

কাব্য জিনিসটা খারাপ নয়, তবে খালি পেটে বেশিক্ষণ ভালো লাগে না ! রাতে রুটি, চিকেন, এগকারী নেওয়া হল । খরচ হল ৬৫৮/- টাকা ।

পরেরদিন শনিবার ২৭শে অক্টোবর, ২০১৮ - আমাদের আরাকু যাওয়ার দিন । আমাদের ট্রেন সকাল ৬ঃ৫০ মিনিটে বিশাখাপত্তনম স্টেশন থেকে, তাই সকাল ৬ টা নাগাদ আমরা মালপত্র নিয়ে চেক-আউট করে হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়লাম । সকালের কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্টটা আমাদের পাওনা ছিল, কিন্তু ব্রেকফাস্ট কাউন্টার খোলে সকাল ৭ টায়, তাই ওই ব্রেকফাস্টের মায়া ত্যাগ করা ছাড়া উপায় ছিল না । আসার দিনের মতোই একটা অটো নেওয়া হল তবে আসার দিনের চেয়ে ৫০/- টাকা বেশি দিতে হল । প্রায় সাড়ে ছটা নাগাদ আমরা পৌঁছলাম স্টেশনে ।

এখানে একটা দরকারী তথ্য দিয়ে রাখি । ভাইজ্যাগ থেকে আরাকু যাওয়ার জন্য এ পি ট্যুরিজমের একটা রেল কাম রোড ট্রিপ ছিল । এই ট্রিপে ট্রেনে করে ভাইজ্যাগ থেকে আরাকু নিয়ে যাওয়া হত আর গাড়ি বা বাসে করে আরাকু থেকে ভাইজ্যাগ ফেরৎ নিয়ে আসা হত । ভাইজ্যাগের বুকিং করার সময়ে আমরা এ পি ট্যুরিজমের কলকাতার অফিসে গিয়ে এই ব্যাপারে খোঁজ করেছিলাম । ওরা জানাল এই রেল কাম রোড ট্রিপ ওরা কয়েকবছর আগে বন্ধ করে দিয়েছে । এখন যেটা আছে সেটা শুধুই রোড ট্রিপ অর্থাৎ গাড়িতে যাওয়া আর গাড়িতেই ফেরা । অথচ ভাইজ্যাগ থেকে আরাকু যাওয়ার প্রধান আকর্ষণই হল এই ট্রেনজার্নি, তাই আমরা এ পি ট্যুরিজমের কাছে বুকিং না করে আলাদা করে নিজেদের মতো করেছিলাম ।

পাহাড়ে ওঠার আগে
ভাইজ্যাগ থেকে আরাকু যাওয়ার তিনটে ট্রেন আছে, তার মধ্যে সকালে সবথেকে আগে ছাড়ে কিরন্ডুল প্যাসেঞ্জার । আমরা এখানে সেকেন্ড ক্লাস সিটিং-এর টিকিট কেটেছিলাম কারণ আর কোনও ক্লাসের টিকিট পাওয়া যায়নি । এই ট্রেনে একটা ক্লাস আছে, এক্সিকিউটিভ এ সি চেয়ার কার । এই কামরার বৈশিষ্ট্য হল এর জানালা বিশাল বিশাল কাচের আর ছাদটাও কাচের । স্বাভাবিকভাবেই এই কামরার ভিউ অত্যন্ত সুন্দর । কিন্তু এর বুকিং পাওয়া সহজ নয় । ভাইজ্যাগ থেকে আরাকু পৌঁছতে ট্রেনে চারঘন্টার মতো লাগে । সকাল ৬ঃ৫০ মিনিটে বিশাখাপত্তনম স্টেশন আমাদের ট্রেন রওনা দিল আরাকুর উদ্দেশ্যে । শুরু হল ভারতবর্ষের প্রথম দশটা সবথেকের দুর্দান্ত ট্রেনজার্নির মধ্যে অন্যতম সেরাটা !

সেই বিখ্যাত বাঁকগুলোর একটা
ট্রেনজার্নির প্রথমদিকে সেরকম কোনও বিশেষত্ব নেই । প্রায় সমতলের ওপর দিয়ে ট্রেন চলছে, চারপাশে সাধারণ মাঠ রাস্তা চাষের জমি ইত্যাদি । ঘন্টা দেড়েক পর থেকে আস্তে আস্তে আরম্ভ হল পাহাড় । আর ট্রেন ধীরে ধীরে পাহাড়ে উঠতে শুরু করল । কিছুক্ষণের মধ্যেই বাইরের দৃশ্যের আকর্ষণ এরকম বাড়তে লাগল যে ট্রেনের সিটে বসে থাকার চেয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকাই যাত্রীদের কাছে বেশি আগ্রহজনক বলে মনে হতে লাগল । যতই পাহাড়ের উচ্চতা বাড়ে, ততই বাড়ে বাইরের দৃশ্যের আকর্ষণ । সেই সঙ্গে একের পর এক টানেল । আগেই জানতাম ভাইজ্যাগ থেকে আরাকুর মধ্যে ছোটবড় মিলিয়ে মোট ৫৮ টা টানেল আছে, যদিও সেই সংখ্যাটা সঠিক কিনা সেটা আমি ভেরিফাই করার চেষ্টা করিনি !

ট্রেন থেকে অসাধারণ সিনিক বিউটি
বেশ কিছু ছবি তুললাম কিন্তু বেশিরভাগ লোকের মতো ছবি তোলাটাকেই মুখ্য কাজ বলে মনে করিনি । সত্যি বলতে কি ইন্টারনেটে সার্চ করলে এই জার্নির অনেক ছবি পাওয়া যায় আর ইউটিউবে সার্চ করলে প্রচুর ভিডিও-ও পাওয়া যায় । তাই ছবি বা ভিডিও না তুলে যেটা করা যায় সেটাই করেছি - মন ভরে প্রাণ ভরে ট্রেনজার্নির এই রূপসুধা পান করেছি (এটা বোধহয় যথাযথ হল না, কিন্তু সাহিত্যিক নই বলে উপযুক্ত অলঙ্কারের অভাব আমার সবসময়েই থাকে) ।

পাহাড়ের ওপর ছোট্ট বোরা গুহালু স্টেশন
ঘন্টাতিনেক চলার পর 'বোরা গুহালু' বলে একটা স্টেশন পড়ে - নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে এটা 'বোরা কেভ' বা 'বোরা গুহা'র স্টেশন । এটা একটা দর্শনীয় স্থান, তাই এখানে কিছু লোক ট্রেন থেকে নেমে গেল । আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা আরাকু থেকে ফেরার পথে এটা দেখব, তবে চাইলে যাওয়ার পথেও দেখে নেওয়া যেতে পারে । সেক্ষেত্রে গুহা দেখে গাড়ি করে আরাকু যেতে হবে কারণ গুহা দেখা শেষ হওয়ার পরে আর কোনও ট্রেন পাওয়া যাবে না ।

বোরা গুহালু থেকে আরও একঘন্টা পাহাড়ী পথে চলার পর ট্রেন পৌঁছল আমাদের গন্তব্য 'আরাকু ভ্যালি' স্টেশনে । স্টেশনটা বেশ ছিমছাম আর খুব একটা বড় নয় । স্টেশনের চারপাশে পাহাড় আর রেললাইনটা এখান থেকে ঘুরে গেছে বলে আমাদের ট্রেনটা অনেক দূর পর্যন্ত্য দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল । আমি ছবি তুলছিলাম কিন্তু স্টেশনের একজন মিলিটারি ব্যক্তি এসে আমাকে বললেন এখানে ছবি তোলা বারণ । তাই ছবিটা এখানে লেখার সঙ্গে দিলাম না ।

স্টেশন থেকে আমাদের হোটেল ৮০০ মিটার, কিন্তু তাই বলে মালপত্র নিয়ে হেঁটে যাওয়া সম্ভব নয় । একটা টাভেরা আমাদের ৫০/- টাকার বিনিময়ে হোটেলে পৌছে দিল ।

কৃষ্ণ তারা কমফর্টস
আরাকুতে আমাদের হোটেলের নাম 'কৃষ্ণ তারা কমফর্টস' । যখন বুকিং করেছিলাম তখনও ছবি দেখেছিলাম আর পৌঁছে হোটেলটা আরও ভালো লাগল । আমরা যত জায়গায় যত হোটেলে থেকেছি, এই হোটেল তাদের মধ্যে ওপরের দিকে থাকবে । হোটেলটা বেশ নতুন, এখনও সব জায়গা তৈরির কাজ শেষ হয়নি । পুরো জায়গাটা দারুণ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন । কম্পাউণ্ডের দুদিকে দুটো বিল্ডিং আর মাঝখানে একটা বাচ্চাদের পার্ক নিয়ে পুরো হোটেলটা ।

কৃষ্ণ তারা কমফর্টসে আমাদের ঘর
একদিকের বিল্ডিং-এর তিনতলায় আমাদের দুটো ঘর দিল । ঘরের সঙ্গে লাগোয়া ব্যালকনি আর সেখান দিয়ে অসাধারণ সিনিক বিউটি দেখা যায় । আরাকু হচ্ছে ভ্যালি বা উপত্যকা অর্থাৎ পাহাড় দিয়ে ঘেরা প্রায় সমতলভূমি । হোটেলের ব্যালকনি থেকে চারদিকের পাহাড় দেখা যায় আর দূরে রেললাইনও দেখা যায় । জায়গাটা আমাদের মধ্যপ্রদেশ ভ্রমণের পাঁচমারির কথা মনে করিয়ে দেয়, যদিও এখানে পাঁচমারির থেকে লোকসংখ্যা অনেক কম । বেশিরভাগ লোকই ভাইজ্যাগ থেকে আরাকু ডে-ট্রিপ করে চলে যায়, আমরা সেই স্রোতে গা না ভাসানোয় নিজেদের ভাগ্যবান বলে মনে হচ্ছিল । আরাকুর উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৯১০ মিটার, তাই অক্টোবরের শেষে দুপুর ১২ টার সময়ে গরম তো লাগছিলই না, বরং বলা যেতে পারে ঠান্ডা ঠান্ডা আরামদায়ক আবহাওয়া ।

হোটেলের একটা আলাদা ডাইনিং স্পেস আছে কিন্তু বোধহয় যথেষ্ট সংখ্যক কর্মচারীর অভাবে এরা ঘরে এসে খাবার দিয়ে যাওয়াটাই প্রেফার করে । খাবারের সঙ্গে থালা গ্লাস চামচ সবই দিয়ে যায় । আমরা লাঞ্চে ভাত, ডাল, আলুভাজা, চিকেন মশালা, চিকেন কারি নিলাম । এখানকার রান্না বিশেষ করে চিকেনটা খুবই ভালো খেতে । খরচ হল ৮০০/- টাকা ।

পাহাড়ের ওপর সূর্য্যাস্ত
দুপুরে আমরা ঘরে শুয়ে বিশ্রাম করলাম । আরাকু ভ্যালি জায়গাটায় আলাদা করে অনেক কিছু দেখার নেই, যেগুলো আছে সেগুলো আরাকু থেকে ভাইজ্যাগ ফেরার পথে দেখে নিতে হয় । বিকেলে আমরা হাঁটতে বেরোলাম । কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে হাঁটছিলাম না, তবে এরকম একটা জায়গায় এরকম শান্ত, প্রায় নিস্তব্ধ পরিবেশে হাঁটতেও ভালো লাগে । হাঁটতে হাঁটতে পাহাড়ের ওপরে সূর্য্যাস্তও দেখার সৌভাগ্য হয়ে গেল ।

আমরা হাঁটছিলাম আরাকু-বিশাখাপত্তনম রোড দিয়ে স্টেশনের বিপরীত দিকে । রাস্তার লোকের থেকে জানতে পারলাম অল্প হাঁটলেই কাছাকাছির মধ্যে আছে আরাকু ভ্যালির 'ট্রাইবাল মিউজিয়াম' ।

ট্রাইবাল মিউজিয়ামের ভেতরে মডেল
ট্রাইবাল মিউজিয়াম - নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে ভেতরে জিনিসটা কি থাকতে পারে । ঢোকার টিকিট মাথাপিছু ৪০/- টাকা আর বাচ্চাদের টিকিট লাগে না । এই অঞ্চলের ট্রাইবাল বা আদিবাসীদের জীবনযাত্রা নিয়ে তৈরি এই মিউজিয়াম । ভেতরটা বেশ বড় আর বেশ সুন্দর । বিশাল এলাকা জুড়ে তৈরি এই মিউজিয়ামটার বৈশিষ্ট্য হল এটা কোনও একটা বিরাট আকারের সংগ্রহশালা নয়, আলাদা আলাদা জায়গায় ছোট ছোট বাড়ির মধ্যে বিভিন্ন মডেল তৈরি করা হয়েছে । আমরা ঢুকেছি তখন বিকেল সাড়ে পাঁচটা, পুরোটা ভালোভাবে দেখতে ঘন্টাখানেক লাগে । এরই মাঝখানে আবার এখানে মাদল বাজিয়ে নাচগান শুরু হল । একইরকম পোষাক পরা কিছু আদিবাসী মহিলা নাচ দেখাল আর সেইসঙ্গে দর্শকরাও তাদের সঙ্গে কোমর মেলালো । সবমিলিয়ে বেশ একটা ছন্দময় ব্যাপার !

ট্রাইবাল মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে আমরা একটা অটো ধরে হোটেলে ফিরে এলাম । রাস্তাটা বেশি নয়, অটোয় লাগল ৫ মিনিট, কিন্তু ফেরার সময়ে অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল আর ঠান্ডাও লাগছিল বলে আর হেঁটে ফেরার চেষ্টা করলাম না । অটো আমাদের হোটেলের রাস্তার মুখে নামিয়ে দিল । এখানে কয়েকটা খাবারের দোকান আছে, সেখান থেকে আমরা পরোটা আর আলুর দম খেয়ে নিলাম । খরচ হল ১৯০/- টাকা ।

রাতের খাবার যথারীতি ঘরে বসেই খাওয়া হল । রুটি, চিকেন, ডিম ইত্যাদি নিয়ে খরচ হল ৫৪০/- টাকা । এখানে রাতে ভালোই ঠান্ডা পড়ে । ঘরে কম্বল আছে আর শোওয়ার সময়ে সেটার সদ্ব্যবহারও করলাম ।

পাহাড়ের ওপরে সূর্য্যোদয়
পরেরদিন রবিবার ২৮শে অক্টোবর, ২০১৮ - আমাদের আরাকু থেকে ভাইজ্যাগ ফেরার দিন আর সেইসঙ্গে ভাইজ্যাগ থেকে বাড়ি ফেরারও দিন । সকালে উঠে পাহাড়ের ওপর সূর্য্যোদয় দেখলাম । আরাকু জায়গাটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা আর আমাদের ঘর তিনতলায় হওয়ার জন্যই এটা সম্ভব হল । সে এক অসাধারণ দৃশ্য ! হয়তো দৃশ্যটার মধ্যে নতুনত্ব নেই, যেকোনও পাহাড়ী অঞ্চলে গেলেই এরকম দেখা যায় কিন্তু যেকোনও কারণেই হোক সূর্য্যোদয় জিনিসটা আমার কাছে কখনও পুরনো হয় না । সূর্য্যোদয় মানেই নতুন একটা দিন, নতুন একটা সম্ভাবনা, নতুন করে বাঁচা, নতুন করে ভালোমন্দ খাওয়াদাওয়া করা ইত্যাদি ইত্যাদি !

এই হোটেলেও কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট আছে । ইডলি, ধোসা, বঢ়া ইত্যাদি । এই জিনিসগুলো খুব উপাদেয় হয় না, তবে পেট ভরানোর পক্ষে যথেষ্ট । ব্রেকফাস্ট করে ন'টার একটু পরে আমরা চেক-আউট করে বেরিয়ে পড়লাম । গাড়ি আগেরদিনই ঠিক করা ছিল । এই গাড়ি আমাদের আরাকু থেকে ভাইজ্যাগ পৌঁছে দেবে আর রাস্তায় সব দেখার জায়গাগুলো দেখাবে ।

গাড়ির প্রথম দেখানোর জায়গা ট্রাইবাল মিউজিয়াম যেটা আমরা আগেরদিনই দেখে ফেলেছি । তাই গাড়ি আমাদের নিয়ে গেল ট্রাইবাল মিউজিয়ামের লাগোয়া 'কফি মিউজিয়াম'এ ।

কফি মিউজিয়ামের ভেতরে
কফি মিউজিয়াম - শুধুমাত্র কফি বস্তুটার ওপর যে একটা মিউজিয়াম হতে পারে সে'বিষয়ে আমার কোনও ধারণা ছিল না । তাই মাথাপিছু ১০/- টাকার টিকিট (বাচ্চাদের ফ্রি) কেটে ভিতরে ঢুকে নানাভাবে সমৃদ্ধ হলাম । আমরা বাড়িতে সাধারণতঃ নেস্‌ক্যাফে খাই, কেউ কেউ ব্রু এর কফিও খেয়ে থাকে । সেই থেকে আমার ধারণা ছিল ওই নেসক্যাফের টেস্টটাই কফির টেস্ট । কিন্তু কফি জিনিসটা যে বিভিন্ন রকমের হয়, চায়ের মতো কফিরও আলাদা আলাদা স্বাদ আছে এবং কফি তৈরির পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে তার স্বাদ, গন্ধ আর রঙ আলাদা হতে পারে সেটাও আমার ধারণা ছিল না । কফির একটা বড় গুণ হল কফি খেলে নেশা হয় না, যেটা চায়ে হয় । চায়ের সঙ্গে কফির প্রধাণ পার্থক্য চা হল গাছের পাতা আর কফি হল বীজ । দাক্ষিণাত্যের এই নীলগিরি পার্বত্য এলাকায় কফির প্রচুর চাষ হয় এটা তো ছোটবেলাতেই পড়েছি, আর সেই কারণেই এখানে এই কফি মিউজিয়াম । এখানে গাছ থেকে কফি তোলা থেকে শুরু করে কাপে কফি পরিবেশন করা পর্যন্ত্য পুরো পদ্ধতিটা অনেকগুলো মডেলের সাহায্যে দেখানো আছে । হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলে অনেকবার ভ্রমণ করার সুবাদে চা কিভাবে তৈরি হয় সে'সম্পর্কে একটা মোটামুটি ধারণা থাকলেও কফির ব্যাপারে এই অভিজ্ঞতা একেবারেই নতুন । সাধে কি আর কথায় বলে 'ভ্রমণে মনের প্রসার বাড়ে' !

কফি গাছ
কফি মিউজিয়ামে কফি সম্পর্কিত তথ্য ছাড়াও কিছু ঘরসাজানোর জিনিসের দোকান আছে । আর আছে কিছু কফি গাছ । আমি আগে কখনও কফি গাছ দেখিনি, এখানে দেখলাম সেগুলো কিরকম দেখতে হয় আর ডাল থেকে কিরকম ফল ঝোলে । এছাড়া এখানে ছোট্ট একটা পার্ক গোছের আছে । জায়গাটা সবমিলিয়ে খুব বড় না হলেও খুব সুন্দর করে সাজানো ।


শ্যুটিং স্পট
শ্যুটিং স্পট - মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে মিনিট কুড়ি পাহাড়ি পথে চলার পর একটা জায়গা দেখিয়ে ড্রাইভার বলল এটা শ্যুটিং স্পট । জায়গাটার আলাদা কোনও বৈশিষ্ট্য নেই, তবে ছবি বা সিরিয়ালের শ্যুটিং হয় বলে পরিচিত (না, আমরা কোনও ছবির শ্যুটিং দেখতে পাইনি)।




আমরা পাহাড়ী পথে এগিয়ে চললাম । রাস্তাটা খুবই সুন্দর এই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই । ঠান্ডা লাগছিল না, আবার গরমও লাগছিল না ।

গালিকোন্ডা ভিউ পয়েন্ট থেকে
গালিকোন্ডা ভিউ পয়েন্ট - আরও মিনিট দশেক চলার পর আমাদের ড্রাইভার একজায়গায় গাড়ি দাঁড় করালো - জায়গাটার নাম গালিকোন্ডা ভিউ পয়েন্ট । এখান থেকে বিস্তীর্ণ পাহাড়ের সারি দেখা যায় । ভিউ পয়েন্টে একটা রেলিং দিয়ে ঘেরা প্ল্যাটফর্ম করা আছে, সেখানে দাঁড়িয়ে পাহাড়ের দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হতে হয় । এরকম দৃশ্য যে আগে কখনও দেখিনি এমন নয়, কিন্তু আমার কাছে প্রাকৃতিক দৃশ্য কখনও একঘেয়ে বা রিপিটিটিভ বলে মনে হয় না ।

ব্যাম্বু চিকেন প্রস্তুত প্রণালী
এই গালিকোন্ডা ভিউ পয়েন্ট থেকে আমরা একটা জিনিস কিনলাম, তার নাম 'ব্যাম্বু চিকেন' । ভাইজ্যাগে এসে পর্যন্ত্য এই জিনিসটার নাম বেশ কয়েকবার শুনেছি কিন্তু চেখে দেখার সুযোগ হয়নি । মুরগীর মাংস ছোট ছোট করে কেটে মশলা মাখিয়ে একটা ফুটখানেক লম্বা বাঁশের ফুটোর মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে সেই বাঁশটাকে আগুনে পুড়িয়ে তৈরি হয় এই ব্যাম্বু চিকেন । ভিউ পয়েন্টের পাশেই কয়েকটা ছোট ছোট দোকানে এগুলো পাওয়া যাচ্ছিল । জিনিসটা ওজনে বিক্রি হয়, আমরা ৫০০ গ্রাম কিনলাম ১৫০/- টাকা দিয়ে । খেতে অপূর্ব, অসাধারণ ! (সাধারণতঃ বাঁশ জিনিসটাকেই একটা বিশেষ জায়গায় ঢোকানো হয় । কিন্তু সেই বাঁশের মধ্যে কিছু ঢুকিয়ে যে এরকম অসাধারণ একটা খাবার জিনিস তৈরি করা সম্ভব, সে'ব্যাপারে আমার কোনও ধারণা ছিল না !)

গালিকোন্ডা ভিউ পয়েন্ট থেকে আমরা এগিয়ে চললাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের দিকে । আরও মিনিট পনেরো চলার পর পড়ল আমাদের পরবর্তী দেখার জায়গা ।

আরাকু কফি গার্ডেন
আরাকু কফি গার্ডেন - রাস্তার ধারে একজায়গায় কফি গার্ডেনটা রয়েছে । মূল রাস্তা থেকে পাহাড়ের গায়ে পায়ে চলার মতো ধাপ তৈরি হয়েছে, সে ধাপেই কফির গাছ । কফি গাছ চা গাছের মতো সবকটা সমান আকারের বা অত ঘন হয় না, তবে চা বাগানের মতো এখানেও কফি গাছের মাঝে মাঝে অন্য বড় গাছ আছে । কফি গাছের উচ্চতা খুব বেশি হলে একজন মানুষের মতো হয় আর আপাতদৃষ্টিতে দেখলে গাছটাকে অন্য গাছের মধ্যে চেনাও সহজ নয় । যদি গাছ থেকে ফল ঝোলে সেটা দেখে বোঝা যায় । আমরা কিছুক্ষণ বাগানের মধ্যে থেকে আবার উপরে রাস্তায় উঠে এলাম ।

এখানে রাস্তায় কফি বিক্রি হয় । এককাপ কফি ১০/- টাকা । খেয়ে দেখলাম স্বাদটা যে শুধু ভালো তাইই নয়, স্বাদটা আমাদের চেনা কফির থেকে অনেকটাই আলাদা । রঙটাও একেবারে বাদামী নয়, একটা হাল্কা সবুজের ভাব রয়েছে । আমরা এখান থেকে এক প্যাকেট কফি কিনে নিলাম বাড়িতে নিয়ে আসার জন্য ।

টাটিগুড়া ফল্‌স্‌ - কফি গার্ডেন থেকে আরও মিনিট কুড়ি চলার পর আমাদের পরবর্তী ভিউ পয়েন্ট - টাটিগুড়া জলপ্রপাত । এতক্ষণ আমরা আরাকু-বিশাখাপত্তনম রোড ধরেই যাচ্ছিলাম, এই ফলসে আসার জন্য সেই রাস্তা থেকে একটা গ্রাম্য পথে ঢুকতে হল । সেই পথে মিনিট দশেক চলার পর একজায়গায় গাড়ি দাঁড়াল । সেখান থেকে মিনিট পাঁচেক হেঁটে আমরা পৌঁছলাম ভিউ পয়েন্টে ।

টাটিগুড়া ফল্‌স্‌
ভিউ পয়েন্ট থেকে ফলস্‌টা বেশ ভালো দেখা যায় । তবে অক্টোবরের শেষ ফল্‌সে বিশেষ জল নেই । ভিউ পয়েন্টের পাশ দিয়ে একটা সিঁড়ি নেমে গেছে, সেটা দিয়ে ফল্‌সের একেবারে পাশে চলে যাওয়া যায় । আমি সেখানে নেমে গেলাম যদিও সেখান থেকে খুব বেশি কিছু দেখা গেল না । যে পাহাড়টার গা-বেয়ে ফল্‌স্‌টা নামছে সেটার বেশিরভাগ জায়গাই শুকনো, শুধু দু'টো জায়গা দিয়ে দু'টো ক্ষীণ জলের ধারা নেমে আসছে । এর পাশে পাহাড়ের ধাপে ধাপে ছোট ছোট চাষের জমি রয়েছে, সেগুলো দেখতে বেশ সুন্দর ।

বোরা কেভস্‌ - টাটিগুড়া ফল্‌স্‌ থেকে প্রায় একঘন্টা চলার পর আমাদের পরবর্তী তথা শেষ গন্তব্য বোরা কেভস্‌ বা বোরা গুহাগুলি । আরাকু থেকে ভাইজ্যাগের মধ্যে যে দেখার জায়গাগুলো আছে, তাদের মধ্যে বোরা কেভস্‌ হচ্ছে সবথেকে বেশি ঘ্যাম । এখানে ঢোকার টিকিট বড়দের মাথাপিছু ৬০/- টাকা আর ছোটদের মাথাপিছু ৪৫/- টাকা । এছাড়া ক্যামেরার চার্জ আলাদা ।

বোরা কেভসে প্রবেশপথ
বোরা কেভসে বেশ ভীড়, আগের জায়গাগুলোর মতো ফাঁকা ফাঁকা নয় । এখানে ঢোকার ঠিক মুখে একটা বড় সাইনবোর্ডে এই গুহার সম্পর্কে অনেক তথ্য দেওয়া আছে । সেটা থেকে জানলাম ১৮০৭ সালে ব্রিটীশ ভূতাত্বিক উইলিয়াম কিং এই গুহা আবিষ্কার করেন । অনুমান করা হয় এই গুহা পনেরো কোটি বছরের পুরনো । ভেতরটা সুবিশাল আর রঙপরিবর্তনশীল আলো দিয়ে আলোকিত করা । তাই অন্ধকার বা প্রায়ান্ধকারে গুহার ভেতরটা এক্সপ্লোর করার রোমাঞ্চ এখানে পাওয়ার সম্ভাবনা কম ।

আলোকোদ্ভাসিত বোরা কেভসে মানুষের ঢল
বোরা কেভসের ভেতরে স্ট্যালাকটাইট আর স্ট্যালাগমাইট দুটোই দেখতে পাওয়া যায় । ভেতরে অনেক চড়াই-উৎরাই আছে, বয়স্ক লোকদের পুরোটা যাওয়ার চেষ্টা না করাই ভালো । প্রথমে বেশ অনেকটাই সিঁড়ি দিয়ে নামতে হয়, তারপর সমতল, তারপর আবার নামা আর শেষের কিছুটা ওঠা । লোকজন বলল একেবারে শেষে একটা মন্দির আছে যেটা আমরা আর যাইনি । বাইরের আলো ভেতরে ঢোকার প্রশ্নই ওঠে না, আর ভেতরে বিভিন্ন জলা জায়গা থাকার জন্য পুরো এলাকাটা স্যাঁতসেঁতে । ভেতরে একটা জায়গা আছে যেখানে ইস্ট কোস্ট রেলওয়ে একটা ফলক বসিয়ে রেখেছে । ফলকটায় ইংরিজীতে লেখাঃ
১. ঠিক এই জায়গার ১৭৮ ফুট উপর দিয়ে কোট্টাভালাসা কিরন্ডুল রেলওয়ের লাইন চলে যাচ্ছে । রেললাইনের নিচের পাথর এই জায়গায় ১০০ ফুট মোটা ।
২. আপনি এখানে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,১৮২ ফুট উপরে রয়েছেন ।
৩. ইস্ট কোস্ট রেলওয়ে আপনাকে শুভ ভ্রমণ জানাচ্ছে ।
প্রথম পয়েন্টটা আমার বেশ মজার লাগল । আগেরদিন সকালে আমরা ট্রেনে করে যে জায়গা দিয়ে এসেছি, আজ তার ঠিক নিচে দাঁড়িয়ে আছি ভাবতে বেশ ভালো লাগছিল ।

বাঁদরের আইসক্রিম খাওয়া
গুহার ঠিক বাইরে বাঁদরের বেশ উৎপাত আছে । একটু অন্যমনস্ক হলেই এই বাঁদররা বাঁদরামি করে লোকজনের হাত থেকে জিনিস ছিনিয়ে নেয় । একবার নিলে সেটা ফেরৎ পাওয়ার সম্ভাবনা কম কারণ এখানে কেউ ওদেরকে সুপারভাইজ করে না । আমাদের চোখের সামনেই একটা বাঁদর একজন ভদ্রমহিলার থেকে তাঁর কোন আইসক্রিমটা ছিনিয়ে নিয়ে খেতে লাগল (দৃশ্যটা আপাতদৃষ্টিতে বেদনাদায়ক হলেও বিস্ময়উদ্রেককারী কারণ আমি এর আগে কখনও কোনও বাঁদরকে আইসক্রিম খেতে দেখিনি !)

আগেই বলেছি বোরা কেভস্‌ এর কাছে 'বোরাগুহালু' স্টেশন আছে । তাই বোরা কেভস্‌ থেকে বেরিয়ে কিছুটা ওপরে তাকালে রেললাইন দেখতে পাব, এতে আশ্চর্য্য হওয়ার কিছু নেই । তবে যেটা দেখতে ভালো লাগে ওপরে রেললাইনটা পাহাড়ের গা দিয়ে গোল করে ঘুরে চলে গেছে আর আমাদের সৌভাগ্যক্রমে সেইসময়ে একটা ট্রেনও দেখতে পেয়ে গেলাম ।

আমাদের দেখার জায়গা এখানেই শেষ, দুপুর হয়ে গিয়েছিল তাই ড্রাইভার আমাদের খাওয়ার দোকানে নিয়ে গেল । বোরা কেভসের একেবারে কাছেই কোনও খাবারের দোকান নেই, ১ কিলোমিটার দূরে যেতে হয় । দোকানটা অতি সাধারণ । এখানে ভাত, ডাল আর ডিমের কারি খেয়ে পেট ভরাতে হল । খরচ হল ৪৬০/- টাকা ।

এই জায়গায় আমাদের ভ্রমণপথ নির্ধারণে একটা ভুল করেছিলাম, যেটা না করলে আমাদের জার্নি আরও আরামদায়ক আর কম খরচসাপেক্ষ হতো । বোরা কেভস্‌ দেখে আমরা বেরোলাম তখন দুপুর ২ঃ১৫ মিনিট । সেখান থেকে বেরিয়ে লাঞ্চ শেষ হল তখন ৩ঃ১৫ মিনিট । যেখানে লাঞ্চ করলাম, বোরা গুহালু স্টেশনটা তার খুবই কাছে । আমাদের গাড়ির সঙ্গে কথা ছিল সে আমাদের ভাইজ্যাগ পর্যন্ত্য পৌঁছে দেবে । সেটা না করে আমরা অনায়াসে এখানে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে বিশাখাপত্তনমের ট্রেন ধরতে পারতাম । দুপুর ৩ঃ২৫ মিনিট আর বিকেল ৪ঃ৫০ মিনিটে বোরা গুহালু থেকে বিশাখাপত্তনমের ট্রেন পাওয়া যায় । যদি কেউ আমাদের ভ্রমণপথ অনুসরণ করে (যেটা নিঃসন্দেহে একটা অসাধারণ ভ্রমণপথ !) তাহলে তাকে এই ছোট্ট পরিবর্তনটা করে নিতে বলব ।

লাঞ্চের পরে গাড়ি আমাদের নিয়ে রওনা দিল বিশাখাপত্তনমের উদ্দেশ্যে । রাস্তা খুবই ভালো, আর ঘন্টাখানেক চলার পর গাড়ি সমতলে এসে গিয়ে আরও স্পীড বাড়াল । সন্ধ্যে ছ'টার একটু পরে আমরা পৌঁছে গেলাম বিশাখাপত্তনম স্টেশনে । গাড়ি আমাদের কাছ থেকে নিল ৫,০০০/- টাকা ।

বিশাখাপত্তনম থেকে আমাদের ফেরার ট্রেন চেন্নাই সাঁত্রাগাছি এসি সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস রাত ৮ঃ৫৫ মিনিটে । ট্রেন এল আধঘন্টা দেরিতে । রাতে ট্রেনে খাওয়ার জন্য স্টেশন থেকে আলুর পরোটা কেনা হয়েছিল, তাই খেলাম ।

পরেরদিন সোমবার ২৯শে অক্টোবর, ২০১৮ - ট্রেন সাঁত্রাগাছি পৌঁছনোর কথা ছিল দুপুর ১ টায়, পৌঁছলো প্রায় আড়াইটে । সেখান থেকে উবের ধরে বাড়ি !

সারসংক্ষেপঃ

১. ভাইজ্যাগ যাওয়ার সবথেকে ভালো সময় হচ্ছে অক্টোবর-নভেম্বর বা ফ্রেব্রুয়ারী-মার্চ । এই সময়ে এখানকার আবহাওয়া সবথেকে মনোরম থাকে ।
২. হাওড়া থেকে ভাইজ্যাগ বা বিশাখাপত্তনম যাওয়ার একাধিক ট্রেন আছে । তার মধ্যে সাঁত্রাগাছি থেকে শালিমার সাঁত্রাগাছি এ সি সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস সবথেকে কম সময়ে ভাইজ্যাগ পৌঁছয় ।
৩. ভাইজ্যাগে থাকার বহু হোটেল থাকলেও রুষিকোন্ডা বীচে অন্ধ্রপ্রদেশ ট্যুরিজমের হরিথা বীচ রিসর্টে থাকার অভিজ্ঞতা অত্যন্ত সুন্দর । জায়গাটা একটু খরচসাপেক্ষ হলেও খরচ করাটা যুক্তিযুক্ত । অন্ধ্রপ্রদেশ ট্যুরিজমের ওয়েবসাইট https://tourism.ap.gov.in/home থেকে বুকিং করা যায় আবার এদের অফিস থেকেও বুকিং করা যায় । এদের কলকাতার অফিসের ফোন নম্বরঃ 03322813679, 9433044584.
৪. হরিথা বীচ রিসর্টে কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট আছে । তবে ব্রেকফাস্টটা চেক্‌-ইন করা হলে তবেই পাওয়া যাবে ।
৫. রুষিকোন্ডায় থাকলে একটা দিন শুধুমাত্র রিসর্টে বসে কাটানোর জন্য রাখা ভালো । এখানে সবঘর থেকেই সমুদ্রের ভিউ পাওয়া যায় আর ব্যালকনিতে বসে সেই দৃশ্য উপভোগ করাটা একটা বিশেষ অভিজ্ঞতা ।
৬. রুষিকোন্ডা বীচে স্নান করা যেতে পারে । বঙ্গোপসাগর হলেও এখানে সমুদ্রের তেজ খুব একটা বেশি নয় ।
৭. রুষিকোন্ডা বীচে থাকলে খাওয়ার জন্য হরিথা বীচ রিসর্টের ওপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় নেই কারণ এখানে কাছাকাছির মধ্যে আর কোনও খাবারের দোকান নেই । এখানকার খাবারের মান বেশ ভালো ।
৮. ভাইজ্যাগে লোক্যাল সাইট সিয়িং-এর জন্য এ পি ট্যুরিজমের প্যাকেজ ট্যুর আছে, তবে চাইলে নিজস্ব গাড়ি ভাড়া করেও ঘোরাঘুরি করা যায় । হরিথা বীচ রিসর্ট থেকে এই প্যাকেজ ট্যুর বুকিং করা যায় ।
৯. ভাইজ্যাগের লোক্যাল সাইট সিয়িং-এর মধ্যে কৈলাশগিরি পাহাড়, এয়ারক্র্যাফট্‌ মিউজিয়াম আর সাবমেরিন মিউজিয়াম দেখা অবশ্য কর্তব্য । কৈলাশগিরি পাহাড়ের টয়ট্রেনটাও অবশ্যই চড়া উচিৎ ।
১০. ভাইজ্যাগ গেলে পূর্ণিমা দেখে যেতে পারলে ভালো হয় । রুষিকোন্ডা বীচের রিসর্টের ব্যালকনি থেকে সমুদ্রের ওপর চাঁদের আলোর দৃশ্য দেখলে সারাজীবন মনে থাকবে ।
১১. ভাইজ্যাগ থেকে আরাকু ভ্যালি গাড়িতেও যাওয়া যায় আবার ট্রেনেও যাওয়া যায় । তবে ট্রেনে গেলে কিছু দুর্দান্ত দৃশ্য দেখার অভিজ্ঞতা হয় যেটা গাড়িতে সম্ভব নয় । ট্রেনে গেলে চেষ্টা করা দরকার ট্রেনের ডানদিকের জানালার ধারে বসার ।
১২. পীক্‌ সিজনে গেলে অবশ্যই ট্রেনের বুকিং খোলার মূহুর্তেই টিকিট কাটতে হবে । তা না হলে টিকিট পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে ।
১৩. ভাইজ্যাগ-আরাকুর মধ্যে চলা কিরন্ডুল প্যাসেঞ্জারের একটা ক্লাস হল এক্সিকিউটিভ এ সি চেয়ার কার । ট্রেনে এরকম একটাই কামরা আছে আর এর বৈশিষ্ট্য হল এর বিশাল বিশাল কাচের জানালা আর ছাদটাও কাচের । এর বুকিং করতে চাইলেও খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে ।
১৪. ভাইজ্যাগ থেকে আরাকু একদিনের মধ্যেই গিয়ে ফিরে আসা যায় । তবে আরাকুতে একটা দিন থাকতে পারলে ভালো লাগবে ।
১৫. আরাকুতেও অন্ধ্রপ্রদেশ ট্যুরিজমের একাধিক থাকার জায়গা রয়েছে যদিও আমরা এর কোনওটাতেই বুকিং পাইনি । প্রত্যেকটা রিসর্টই খুব ভালো লোকেশনে তাই সিজনের সময়ে এখানে থাকতে চাইলে আগে থেকে বুকিং করতে হবে ।
১৬. অন্ধ্রপ্রদেশ ট্যুরিজমের রিসর্ট ছাড়াও আরাকুতে অনেক প্রাইভেট হোটেল আছে, যার মধ্যে 'কৃষ্ণ তারা কমফর্টস' খুব ভালো হোটেল । এদের নিজস্ব কোনও ওয়েবসাইট নেই, তবে https://www.makemytrip.com/ থেকে এদের বুকিং করা যায় । এদের ফোন নম্বরঃ 8008000855.
১৭. আরাকু ভ্যালির একটা সমস্যা হল এখানে মোবাইলের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না ।
১৮. আরাকু ভ্যালিতে সেরকম কিছু দেখার নেই, ট্রাইবাল মিউজিয়াম আর কফি মিউজিয়াম ছাড়া । এগুলো আরাকু থেকে ভাইজ্যাগ ফেরার পথে দেখে নেওয়া যায় ।
১৯. যারা কফি ভালোবাসে তাদের এখানকার কফি চেখে দেখা আর সেইসঙ্গে পারলে সংগ্রহ করা উচিৎ । এছাড়া এখানকার ব্যাম্বু চিকেনও খেয়ে দেখা উচিৎ ।
২০. আরাকুর সাইট সিয়িং-এর মধ্যে বোরা কেভ্‌স্‌ অবশ্য দ্রষ্টব্য । ঢোকা থেকে বেরোনো পর্যন্ত্য ভালোভাবে দেখতে প্রায় ঘন্টাদুয়েক সময় লাগে, তাই এই সময়টা হাতে রাখা দরকার ।
২১. বোরা কেভস্‌ এ বাঁদরের খুব উৎপাত আছে, এরা ট্যুরিস্টদের থেকে ছোঁ মেরে জিনিস নিয়ে নেয় ।তাই ছোটোখাটো জিনিস, খাবার এগুলো হাতে না রাখাই ভালো আর ব্যাগ মোবাইল ক্যামেরা পার্স সানগ্লাস এগুলো শক্ত করে ধরে রাখা দরকার ।
২২. বোরা কেভ্‌সের ঠিক সামনেই কোনও খাবারের দোকান নেই, কেভ্‌স্‌ থেকে এক কিলোমিটার দূরে আছে । এখানকার সব দোকানেরই খাবারের মান চলনসই ।
২৩. বোরা কেভস্‌ দেখে গাড়ি করে ভাইজ্যাগ ফেরার কোনও মানে হয় না, এখানকার বোরাগুহালু স্টেশন থেকে ট্রেন ধরা যায় । সেক্ষেত্রে আগে থেকে ট্রেনের বুকিং করে রাখতে হবে ।

উপসংহারঃ

ভাইজ্যাগ
পাহাড় আর সমুদ্রের সঙ্গমস্থল অন্ধ্রপ্রদেশ জেলার ভাইজ্যাগ আর তার থেকে অনতিদূরে আরাকু ভ্যালি । একটু খরচসাপেক্ষ হলেও এই জায়গাদুটো ভারতের বিশেষ দ্রষ্টব্য স্থানের মধ্যে পড়ে । একদিকে প্রকৃতি যেমন তার অকৃপণ দানে এই জায়গাকে সমৃদ্ধ করেছে, অন্যদিকে মানুষ সেই দান শুধু গ্রহণ করেই নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকেনি, প্রদত্ত বস্তুর ওপর নিজের বুদ্ধি আর পরিশ্রম দিয়ে সুবিশাল ট্যুরিজম ইমারত গড়ে তুলেছে । সেইজন্য প্রতিবছর ভাইজ্যাগ আর আরাকুর ভ্রমণকারীদের কাছ থেকে এখানকার মানুষের বিপুল পরিমাণ আয় হয় । অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য যেমন একদিকে ভাইজ্যাগ-আরাকুর মূল আকর্ষণ তেমনই ভালো এখানকার মানুষজনের আতিথেয়তা । তবে ভাইজ্যাগ বা আরাকুতে যেতে গেলে যে জিনিসটা ভালোভাবে করতেই হবে সেটা হল নিখুঁত পরিকল্পনা । সবমিলিয়ে জায়গাগুলো ঘুরতে দিনচারেকের বেশি লাগে না কিন্তু এই সময়টাকেই কি করে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, সেটা আগে থেকে ঠিক করে নিতে হবে । আর এখনকার ইন্টারনেটের যুগে সেটা করা বিশেষ কিছু পরিশ্রমসাধ্য নয় । তাই পকেট যদি বিরাট বাধা হয়ে না দাঁড়ায় তাহলে দেরি না করে তাড়াতাড়ি 'ভাইজ্যাগ-আরাকু' ঘুরে আসাটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ !

ভাইজাগ-আরাকু ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Tuesday, October 2, 2018

ডায়মন্ড হারবার ভ্রমণ

আমার ব্লগের প্রথম পোস্ট হল বক্‌খালি ভ্রমণ । আজ থেকে ৮ বছর আগে যখন বক্‌খালি গিয়েছিলাম, তখন যাওয়ার পথে ডায়মন্ড হারবারে কিছুক্ষণের জন্য চা-বিরতি নেওয়া হয়েছিল । সময়টা ছিল ২০১০ সালের আগস্ট মাস - বর্ষাকাল - তখন ডায়মন্ড হারবারে নদীর রূপ দেখে আমাদের সকলেরই খুব ভালো লেগেছিল । যে পাঁচজন বন্ধুর সঙ্গে বক্‌খালি গিয়েছিলাম, কালের নিয়মে তাদের অনেকের সঙ্গেই আজ আর সেভাবে যোগাযোগ নেই । কিন্তু যেটা থেকে গেছে সেটা হল ডায়মন্ড হারবারকে ভালো লাগার সেই রেশটা - যেটাকে সম্বল করেই আমার এই তৃতীয়বার ডায়মন্ড হারবার পাড়ি দেওয়া (প্রথমবার গিয়েছিলাম বাবার সঙ্গে ২০০৪ সালে, তখন ব্লগ লিখতাম না)।

২রা অক্টোবর, ২০১৮ সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ গাড়ি নিয়ে বেরোলাম আমি আর অমৃতা । ডায়মন্ড হারবার আমাদের বাড়ি থেকে দু'ভাবে যাওয়া যায় । এক, বাইপাস - মা ফ্লাইওভার - হেস্টিংস - ডায়মন্ড হারবার রোড, এই পথে দূরত্ব ৫৮ কিলোমিটারের মতো । দুই, বাইপাস - এক্সটেন্ডেড বাইপাস - বারুইপুর আমতলা রোড - আমতলা মোড় - ডায়মন্ড হারবার রোড, এই পথে দূরত্ব ৬৭ কিলোমটারের মতো । রাস্তা বেশি হলেও আমরা এই দ্বিতীয়টাই পছন্দ করলাম কারণ এই রাস্তায় ট্র্যাফিক জ্যাম কম হয় । আমতলার মোড়টা একটু জ্যাম হয়, তবে সেটা পেরোনোর পর গাড়ির স্পীড নামানোর আর বিশেষ দরকার পড়ে না ।

সাগরিকার জানালা থেকে নদীর দৃশ্য
ডায়মন্ড হারবার যখন পৌঁছলাম তখন দুপুর প্রায় একটা বাজে । আমরা সবথেকে আগে লাঞ্চ করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম । ডায়মন্ড হারবারে হোটেল রেস্ট্যুরেন্ট অনেক আছে, তাদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন দপ্তরের 'সাগরিকা'র লোকেশন বেশ ভালো । আমরা এখানে ঢুকে লাঞ্চ সেরে নিলাম । চিকেন বিরিয়ানি, ফ্রাইড রাইস আর চিকেন কারি নিয়ে মোট খরচ পড়ল ৪৩১/- টাকা ।

দাঁড়ানোর জায়গা
লাঞ্চ করে আমরা নদীকে ডানদিকে রেখে গাড়ি নিয়ে আরও কিছুটা এগিয়ে গেলাম । নদীর পাড়টা খুব সুন্দর করে বাঁধানো, অনেক বসার জায়গাও আছে কিন্তু দুপুর রোদে সেখানে বসতে যাওয়াটা তসরিফের পক্ষে খুব আরামদায়ক হবে না, তাই সেটা আর করলাম না । (তসরিফ শব্দের মানে আমি জানি না । তবে উর্দুতে একটা কথা আছে 'তসরিফ রাখিয়ে' যার মানে 'বসুন' । তার থেকে তসরিফের যা মানে দাঁড়াচ্ছে, সেটাই এখানে ব্যবহার করলাম) রাস্তটা যেখানে নদীর ধার থেকে একটু ভিতরের দিকে ঢুকে গেছে, সেখান থেকে আরেকটা সরু রাস্তা নদীর পাড়ের দিকে এগিয়ে গেছে । আমরা এই রাস্তা ধরে কিছুটা চলে গেলাম । রাস্তাটা তিনশ' মিটার মতো গিয়ে মাঠের মধ্যে শেষ হয়ে গেছে । একটা গাছের ছায়ায় গাড়িটা রেখে আমরা নদীর ধারে গেলাম । এখানেও রোদ তবে বেশ কিছু গাছ থাকার জন্য তার ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে বেশ ভালো লাগছিল । আমরা এখানে বেশ কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করলাম ।

নদীর উপর জাহাজ চলা
ডায়মন্ড হারবার জায়গাটা হুগলী নদীর ধারে । বৃটীশ আমলে যখন হুগলী নদী দিয়ে জাহাজ চলাচল করত, তখন সমুদ্রে পড়ার আগে এখানে জাহাজ শেষবারের মতো বিশ্রাম নিত । এই অঞ্চলে হুগলী নদী প্রায় ৪.৫ কিলোমিটার চওড়া - খালি চোখে শুধু অন্যপারের সীমারেখাটা দেখা যায় আর ক্যামেরার জুম লেন্সের সাহায্যে অন্যপারের কিছু কারখানার চিমনি ইত্যাদি দেখা যায় । অন্যপারটা হল পূর্ব মেদিনীপুর জেলা । হুগলী নদী ধরে ডায়মন্ড হারবার থেকে উত্তর দিকে গেলে রায়চক্‌ আর আরও উত্তরে গেলে গঙ্গা আর রূপনারায়ণের মিলনস্থল যার তিন পাড়ে তিনটে ছোট ছোট ট্যুরিস্ট স্পট - নূরপূর, গাদিয়াড়া আর গেঁওখালি । (এই তথ্যগুলো সাধারণ জ্ঞান বাড়ানোর জন্য দিচ্ছি, এর আর কোনও উদ্দেশ্য নেই বা আমাদের ডায়মন্ড হারবার ভ্রমণের সঙ্গেও বিশেষ সম্পর্ক নেই)

পিকনিক স্পট
ডায়মন্ড হারবারের একটা প্রধান খ্যাতি হল পিকনিক স্পট হিসেবে । শীতকালে যখন পিকনিকের সিজ্‌ন চলে, তখন ছুটির দিনে এখানে পিকনিক স্পটে জায়গা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে । আমরা যে জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রকৃতির শোভা উপভোগ করছিলাম, সেইসব জায়গাই লোকে গিজগিজ করে । আপাতত কিছু ছাগল, কিছু লোক্যাল ছেলে ছোকরা আর আইসক্রিমওয়ালা ছাড়া বিশেষ কেউ নেই । আমরা আইসক্রিমওয়ালার কাছ থেকে আইসক্রিম খেলাম ।

আর কিছু দেখার নেই, তাই ঘরে ফেরার পথে পা বাড়ালাম । ফেরার সময়েও একই রাস্তা আর সেই রাস্তা ধরে বিকেল সাড়ে পাঁচটার মধ্যে বাড়ি !

সারসংক্ষেপ ঃ

১. কলকাতার দক্ষিণে দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলায় ডায়মন্ড হারবার । কলকাতা থেকে দূরত্ব ৬০ কিলোমিটারের মতো ।
২. কলকাতার বিভিন্ন জায়গা থেকে ডায়মন্ড হারবার যাওয়ার প্রচুর বাস পাওয়া যায় । তাছাড়া শিয়ালদহ থেকে প্রত্যেক এক ঘন্টা অন্তর ডায়মন্ড হারবার লোক্যাল পাওয়া যায় যাতে করে ডায়মন্ড হারবার যেতে পৌনে দু'ঘন্টা মতো লাগে । ডায়মন্ড হারবার স্টেশন থেকে নদীর ধারের দূরত্ব অতি সামান্য যা অনায়াসে হেঁটেই যাওয়া যায় ।
৩. ডায়মন্ড হারবারে প্রচুর সংখ্যক খাবার হোটেল আর রেস্ট্যুরেন্ট আছে যার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন বিভাগের সাগরিকা উল্লেখযোগ্য । এখানকার খাবারের মান বেশ ভালো এবং দামও বেশি নয় ।
৪. ডায়মন্ড হারবারে রাত্রিযাপনের খুব একটা মানে হয় না, তবে থাকতে চাইলে পূর্ণিমার রাতে থাকা শ্রেয় আর নদীর ধারের কোনও হোটেল বা রিসর্টে থাকতে পারলে ভালো । নদীর জলে পূর্ণিমার জ্যোৎস্নার প্রতিফলনের দৃশ্য চিত্তাকর্ষক হওয়া উচিৎ ।
৫. ডায়মন্ড হারবারে একটা পুরানো কেল্লার ভগ্নাবশেষ আছে যেখানে দেখতে গেলে শুধুই ভগ্ন - অবশেষ বিশেষ কিছুই নেই । এটা দেখতে যাওয়ার জন্য টাকা খরচ করার কোনও প্রশ্নই ওঠে না ।
৬. এখানে একটা পরিত্যক্ত লাইট হাউস আছে যেটা দেখতে যাওয়া যেতে পারে । এছাড়া এখানে দেখবার সেরকম কিছুই নেই ।
৭. দুপুরের রোদের তেজ কমে যাওয়ার পর নদীর ধারে বসে থাকতে ভালো লাগবে । এখানে প্রায় ৫০০ মিটার নদীর পাড়ে বসার ব্যবস্থা করা আছে যা বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় ।
৮. দুপুরের দিকে গেলে সূর্য্যাস্তের আগে ফিরে আসাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না । নদীর ওপরে সূর্য্যাস্তের দৃশ্য অবশ্যই দর্শনীয় ।

উপসংহার ঃ

ডায়মন্ড হারবার !
কলকাতা থেকে খুব কাছাকাছি ঘোরার জায়গা যেগুলো আছে, ডায়মন্ড হারবার তার মধ্যে বেশ বিখ্যাত এবং চর্চিত । পিকনিক স্পট হিসেবে বা সপ্তাহান্তে ঘুরতে যাওয়ার জায়গা হিসেবে ডায়মন্ড হারবারের কথা জানে না, এরকম বাঙালি পাওয়া কঠিন । কিন্তু সেইসঙ্গে আবার 'ডায়মন্ড হারবারে আবার দেখার কি আছে !' এরকম একটা উন্নাসিকতাও দেখা যায় অনেক লোকজনের মধ্যে । না, ডায়মন্ড হারবার কোনও ট্যুরিস্ট প্লেস নয় । এখানে 'ফাইভ পয়েন্ট', 'সেভেন পয়েন্ট' দেখার জায়গা নেই । এখানে যেটা আছে সেটাই এখানকার ইউ এস পি । চোখের সামনে দিগন্তবিস্তৃত ভাগীরথী-হুগলী নদী যে তার ২,৬০০ কিলোমিটারের যাত্রা শেষ করে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে মিলিত হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই । এই বিশালত্বের সামনে গিয়ে পড়লে একটা বিশেষ অনুভূতিটা হয় সেটা লিখে বোঝানো বেশ মুস্কিল । এই অনুভূতির টানেই গিয়ে পড়া । সৌন্দর্য্য দৃশ্যের উপর নির্ভর করে না, দর্শকের দৃষ্টির উপর নির্ভর করে - বহুল প্রচলিত এই প্রবাদটার সত্যতা ডায়মন্ড হারবারে গেলে উপলব্ধি করা যায় । খ্যাপা সারা পৃথিবী ঘুরে পরশপাথর খুঁজে ফেরে যেখানে সত্যিকারের হীরে আমাদের মুঠোর মধ্যেই পাওয়া সম্ভব !

ডায়মন্ড হারবার ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Wednesday, June 20, 2018

টাকি ভ্রমণ

আমাদের ছোটবেলায় একধরনের অ্যাডভেঞ্চার ছিল - কোনও একটা অচেনা অজানা রাস্তা দিয়ে বেশ কিছুটা গেলে কোথায় পৌঁছনো যায় সেটা পরীক্ষা করে দেখা । ছোটবেলায় আমাদের পরিধিটা থাকে ছোট, তাই খুব বেশি দূরে গিয়ে পড়ার সৌভাগ্য সেভাবে হয় না (সবথেকে দূরে যাওয়ার যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল সেটা হল ই এম বাইপাসটা কোথায় শেষ হয় সেটা দেখার জন্য সুভাষ সরোবর থেকে কামালগাজী পর্যন্ত্য বাইপাস ধরে সাইকেল করে চলে গেছিলাম । ব্যস, ঐ পর্যন্ত্যই !) বড় হওয়ার পরে এখন পরিধিটা বেড়েছে, সাইকেল ছেড়ে গাড়ি চালাই কিন্তু সেই 'অচেনা রাস্তা ধরে এগিয়ে যাওয়ার' অ্যাডভেঞ্চারের নেশাটা চলে গেছে । আর তার প্রধান কারণ হল গুগ্‌ল্‌ ম্যাপ । কোনও রাস্তা কোথায় যাচ্ছে, সেই রাস্তা ধরে কতক্ষণ বা কতদূর গেলে কোথায় পোঁছনো যায় এগুলো জানার জন্য এখন আর কোথাও যেতে হয় না, বাড়িতে বসে গুগ্‌লকে জিজ্ঞেস করলেই জানা যায় । তাই আমাদের তথাকথিত অচেনা রাস্তা বাসন্তী হাইওয়ে ধরে যখন এগিয়ে যাওয়ার কথা মাথায় এল, তখনই জানতাম আমাদের গন্তব্য টাকি - দূরত্ব ৬৫ কিলোমিটার (পরমা আইল্যান্ড থেকে) আর যেতে ঘন্টা দুয়েক ।

বসিরহাট-মালঞ্চ রোড
বুধবার ২০শে জুন, ২০১৮ সকাল দশটার একটু পরে আমি আর অমৃতা গাড়ি নিয়ে বেরোলাম । শুরুর দিকের কিছুটা রাস্তা জানা - আমাদের বাড়ি থেকে বাইপাস - পরমা আইল্যান্ড - সেখান থেকে বাসন্তী হাইওয়ে । এই বাসন্তী হাইওয়েটা কিন্তু 'হাইওয়ে' বলতে আমরা সাধারণতঃ যা বুঝি তার থেকে অনেকটাই আলাদা । এখানে রাস্তায় কোনও রোড ডিভাইডার নেই আর কিছুদূর ছাড়া ছাড়াই একটা করে জনপদ । সেখানে দোকানপাট বাস লরি অটো রিক্সা ভ্যান সাইকেল লোকজন সবমিলিয়ে এমন একটা অবস্থা যে গাড়ির স্পীড কুড়ি কিলোমিটারের বেশি তোলা যায় না । তবে ঘন্টা দেড়েক চলার পরে একটা জায়গা আসে যেখান থেকে পরবর্তী রাস্তাটা বেশ সুন্দর । এই জায়গাটার নাম 'মালঞ্চ' । এখান থেকে বাসন্তী হাইওয়ে ছেড়ে আমরা বসিরহাট-মালঞ্চ রোড
বৃষ্টির বেগ কমে আসার পর
ধরলাম । কিছুক্ষণ ধরেই আকাশে মেঘ করেছিল, এখন প্রচন্ড বৃষ্টি শুরু হল । সে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা ! দু'পাশে ধানক্ষেত, পুকুর, জলাশয় আর তার মাঝখানের রাস্তা দিয়ে মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে আমরা গাড়ি নিয়ে এগিয়ে চলেছি । বৃষ্টির জন্য গাড়ির স্পীড চল্লিশের বেশি তোলা যাচ্ছে না । উইন্ডস্ক্রীনের ওয়াইপার সর্বোচ্চ গতিতে যাতায়াত করে সামনেটা দৃশ্যমান করার চেষ্টা করছে । তবে বেশিক্ষণ এইভাবে চলল না । মিনিট কুড়ি চলার পর বৃষ্টি একটু কমল আর একেবারে কমতে কমতে আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের গন্তব্য - টাকি ।

এখানে জানিয়ে রাখি টাকি জায়গাটার প্রতি আমার ব্যক্তিগতভাবে একটা বিশেষ শ্রদ্ধার জায়গা আছে । আমি টাকী হাউস (বয়েজ) এর ছাত্র আর শুনেছি এই টাকির এক জমিদার আমাদের আর টাকি গার্লস স্কুলের জমিটা স্কুল তৈরির জন্য দান করেছিলেন । সেই জমিদারমশাই এর বাড়ি কোথায় জানিনা, তাঁর বংশধররা কেউ আছেন কিনা তাও জানি না । কিন্তু জানি তাঁর দান করা জমিটা রয়ে গেছে আর সেই উর্বর জমিতে প্রতি বছর তৈরি হচ্ছে আমাদের মতো 'উৎকৃষ্ট ফসল' ! (এই 'উৎকৃষ্ট ফসল' কথাটা কিন্তু আত্মশ্লাঘা নিয়ে লিখলাম, ব্যঙ্গ করে নয়)

ইচ্ছামতীর তীরে বাঁধানো বসার জায়গা
টাকিতে আমাদের বিশেষ কোনও জায়গায় যাওয়ার ছিল না, তাই সোজা গিয়ে হাজির হলাম ইচ্ছামতী নদীর ধারে । এখানে নদীর ধারে পিকনিক স্পট আছে, তাই গাড়ি পার্কিং-এর জায়গাও রয়েছে । আমরা গাড়ি পার্ক করে নদীর ধারে গেলাম । এখানে নদীর পাড়ে দিব্যি বাঁধানো ছাউনি দেওয়া বসার জায়গা রয়েছে । আমরা সেখানে কিছুক্ষণ বসে ছবিটবি তুললাম । ইচ্ছামতী নদী হল পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষ আর বাংলাদেশের সীমানা । নদীর ওপারে বাংলাদেশ । নদীর মাঝবরাবর জলের ওপর একটা দড়ি টাঙানো রয়েছে, বোধহয় সেটা দুই দেশের সীমান্ত । নদী
বসার জায়গায়
বেশ চওড়া, ওপারে গাছপালা দেখা যাচ্ছে । এর আগে শিলং ভ্রমণের সময়ে মাও ট্রপ থেকে বাংলাদেশ দেখেছিলাম কিন্তু তার থেকে এটা ঢের বেশি কাছে । আমরা নদীর এ'পারে দাঁড়িয়ে আছি, ওপারে গাছপালার পিছনে - বাংলাদেশ । 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি' (এটা এমনি লিখলাম, অতকিছুও ইমোশনাল হয়ে পড়িনি !) (এই অংশটা শিলং এর পোস্ট থেকেই কপি পেস্ট করলাম )

আমরা নদীর ধারের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম । এই অঞ্চলে কয়েকটা দোকান আছে আর সেইসঙ্গে কিছু সাধারণ ভাতের হোটেলও রয়েছে । দিনটা বুধবার আর কোনও ছুটির দিনও নয় তাই স্বাভাবিকভাবেই এখানে ট্যুরিস্টের কোনও ভিড় নেই । দুপুর একটা বাজে, তাই একটা হোটেলে গিয়ে ভাতের কথা জিজ্ঞেস করাতে জানা গেল এখানে শুধুমাত্র বোর্ডারদের জন্য রান্না হয় । আমরা চাইলেই খাবার পাওয়া যাবে না, খেতে চাইলে খাবারের টাকা আগে থেকে দিয়ে একঘন্টা পরে আসতে হবে । সেই সময়ের মধ্যে খাবার রেডি হয়ে যাবে । আমরা ভাত, ডাল, আলুভাজা ইত্যাদি আর ভেটকি মাছের ঝাল অর্ডার দিলাম । দাম নিল মাথাপিছু ১৫০/- টাকা ।

ইচ্ছামতীর তীরে
হাতে ঘন্টাখানেক সময় আছে, তাই আমরা হেঁটে কাছাকাছি ঘুরতে গেলাম । এখানে যে অনেক কিছু দেখার আছে তা নয় তবে নদীর ধার ধরে হাঁটতে বেশ ভালো লাগে । আর মেঘলা আবহাওয়া থাকায় গরম সেরকম লাগছিল না । বেশ জোরে হাওয়া দিচ্ছিল যেটায় আরামই লাগছিল । আমরা নদীকে বাঁদিকে রেখে কিছুদূর হাঁটলাম । সেখানে একটা অনেক পুরনো ভাঙ্গা বাড়ি দেখা গেল যেটা দেখে বোঝাই যায় এটা অন্ততঃ দেড়শ বছরের পুরনো । এছাড়া কিছু গ্রাম্য পাকা বাড়ি দেখা গেল ।

হাঁটাহাঁটির পথে
এরপর আমরা বিপরীত দিকে হেঁটে কিছুদূর গেলাম । হেঁটে খুব বেশি দূর যাওয়া সম্ভব নয় । আমাদের সঙ্গে গাড়ি আছে ঠিকই কিন্তু এই রাস্তাটা গাড়ি চলার পক্ষে একেবারেই চওড়া নয় । এখানে সাইকেল ভ্যান চলে যারা লোক্যাল সাইট সিয়িং করার জন্য বলে কিন্তু আমরা জানি এখানে দেখার সেরকম কিছু নেই যার জন্য এদের সঙ্গে যাওয়ার কোনও মানে হয় । কিছুদূর গিয়ে একটা মিলিটারি ওয়াচ্‌ টাওয়ার দেখতে পেলাম । কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে আমাদের খাবার হোটেলে ফিরে এলাম ।







দোতলায় খাবার ঘরে বসার পর আমাদের খাবার দিল । এখানকার রান্না বেশ ভালো - বেশ তৃপ্তি করে খাওয়া গেল । খাবার পরে আর কিছু করার নেই, তাই আমরা গাড়িতে এসে কিছুক্ষণ দিবানিদ্রা দিলাম । তারপর ফেরার পথ ধরলাম ।

ফেরার সময়ে আবার একদফা বৃষ্টি হল যদিও সেটা খুব একটা জোরে নয় । সন্ধ্যে ছ'টার মধ্যে বাড়ি পৌঁছে গেলাম । ভ্রমণ শেষ !

সারসংক্ষেপ ঃ

১. কলকাতা থেকে পূর্বদিকে ৬৫ কিলোমিটার দূরে ভারত-বাংলাদেশ সীমানায় ইচ্ছামতী নদীর তীরে টাকি শহর । ডে-আউট ট্রিপে বা ওয়ান নাইট স্টে করার জন্য এটা বেশ সুন্দর একটা জায়গা ।
২. নিজেদের গাড়ি অথবা বাসে করেও কলকাতা থেকে টাকি যাওয়া যায় । এছাড়া শিয়ালদহ থেকে হাসনাবাদ লোক্যালে চড়ে টাকি রোড স্টেশনে নেমেও যাওয়া যায় । ট্রেনে যেতে আড়াই ঘন্টা মতো লাগে ।
৩. এখানে থাকার জন্য কয়েকটা হোটেল আছে । এখানকার সিজন টাইম হল দুর্গাপুজোর দশমীর সময়, তাই সেই সময়টা বাদ দিলে অন্যান্য সময়ে হোটেলে ঘর পাওয়া কঠিন নয় ।
৪. টাকিতে প্রধান দেখার জায়গা হল ইচ্ছামতী নদীর ধার । এখানে বসার সুবন্দোবস্ত আছে ।
৫. ইচ্ছামতী নদীর ধার দিয়ে হেঁটে বা ভ্যানে করে বা বাইক নিয়ে অনেকদূর পর্যন্ত্য যাওয়া যায় । তবে এই রাস্তা গাড়ি চলাচলের উপযোগী চওড়া নয় ।
৬. নদীর ধারের এই এলাকায় কিছু দোকানপাট থাকলেও সেগুলোয় গেলেই খাবার পাওয়া যায় না । তাই ডে-আউটের পরিকল্পনা থাকলে আগেই গিয়ে দোকানে খাবারের অর্ডার দিয়ে দিতে হবে ।

উপসংহার ঃ

ইচ্ছামতীর তীরে - টাকি
কলকাতা থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে ইচ্ছামতী নদীর তীরে টাকি শহর । ডে-আউট বা একরাত্রি যাপনের জন্য বিশেষ উপযোগী । টাকির একটা বিশেষ আকর্ষণ হল দুর্গাপুজোর দশমীর দিনের বিসর্জন । দু'টো নৌকোর ওপর একটা কাঠের পাটাতন আড়াআড়িভাবে রেখে তার উপর ঠাকুর বসিয়ে মাঝনদীতে নিয়ে গিয়ে দু'টো নৌকো দু'দিকে সরিয়ে দিয়ে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়ার এই প্রাচীন পদ্ধতি অনুসরণ করে এখানে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয় । ইচ্ছামতী নদীর দুই পারের দুই বাংলার শত শত প্রতিমা এইভাবে বিসর্জন দেওয়া হয় আর তা দেখতে আসে হাজার হাজার মানুষ । আমার নিজের ব্যক্তিগতভাবে এই অভিজ্ঞতা না থাকলেও শুনেছি এ এক অনন্য সাধারণ দৃশ্য । টাকিতে এমনিতে দেখার বিশেষ কিছু না থাকলেও এর সৌন্দর্য্যের মধ্যে একটা আকর্ষণ আছে । শহরের রোজনামচার মধ্যে থেকে আমাদের মনের যে সূক্ষ্ম দিকগুলো ক্রমশঃ ভোঁতা হয়ে যায়, সেগুলোকে শান দিয়ে নেওয়ার জন্য মাঝে মাঝে এইধরনের ট্রিপের প্রয়োজন । কোনও চোখ ঝলসানো দেখার জায়গায় ঘোরাঘুরি করা নয়, শান্ত, নিরিবিলি প্রাকৃতিক পরিবেশে শরীর আর মনকে বিশ্রাম দেওয়াই এই ভ্রমণের প্রধান উদ্দেশ্য । আর সেই বিশ্রাম যদি হয় অসীম জলরাশির সামনে তাহলে তো আরও ভাল । এখানে রাতে থাকলে ভোরবেলা অনবদ্য সূর্য্যোদয় দেখার সুযোগ মিলতে পারে । তাই যারা যাব যাব করছে কিন্তু জায়গা খুঁজে পাচ্ছে না, তাদের জন্য এই টাকি ভ্রমণ !

টাকি ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Friday, May 18, 2018

কালনা ভ্রমণ

আমরা যেখানে থাকি, খুঁজে দেখলে তার চারপাশেই অনেক মণিমুক্তোর সন্ধান পাওয়া যায় - এ'কথা হয়তো আগেও কখনও লিখেছি । এই মণিমুক্তোগুলো খোঁজার সুবিধে হল এরজন্য বেশি কিছু পরিকল্পনা করতে হয় না, প্রস্তূতি নিতে হয় না, অর্থব্যয় করতে হয় না - শুধু একটু খুঁজে দেখার মানসিকতা থাকলেই চলে । সবসময়েই এই খোঁজার পরিশ্রমের অসামান্য ফল পাওয়া যায় না এ'কথা যেমন সত্যি তেমনি এটাও সত্যি কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই প্রাপ্তি হয়ে ওঠে প্রত্যাশার তূলনায় অনেক - অনেক বেশি । সেইসব দিনগুলোতে নিজেকে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের থেকে কম বলে মনে হয় না । সেইরকমই একটা দিন হল শুক্রবার ১৮ই মে, ২০১৮ । আমাদের ভ্রমণস্থান কালনা - পূর্ব বর্ধমান জেলার ছোট্ট একটা শহরতলী ।

রাস্তার ধারের ধানক্ষেত ও গরু
সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ গাড়ি নিয়ে বেরোলাম আমি আর অমৃতা । আমাদের বাড়ি থেকে কালনা যাওয়ার একাধিক রাস্তা থাকলেও সবথেকে কম সময়ে পৌঁছনো যায় ডানকুনি হয়ে এন-এইচ ১৯ বা দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে গেলে । এই রাস্তাটা গাড়ি চালানোর পক্ষে অসাধারণ - অনায়াসে ঘন্টায় ১২০ - ১৪০ কিলোমিটার স্পীড তোলা যায় । ডানকুনি টোল প্লাজা থেকে একসঙ্গে যাওয়া এবং ফেরার টোল ট্যাক্স দিয়ে আরও ৪০ কিলোমিটার গেলে গুড়াপ এর ক্রসিং । (এখানে জানিয়ে রাখি চাইলে এই টোল ট্যাক্সটা বাইপাস করা সম্ভব । সেটা করতে হলে টোল প্লাজার কিছুটা আগে এন-এইচ ১৯ এর পাশে সার্ভিস রোডে ঢুকে পড়তে হবে আর এই রাস্তা দিয়ে গেলে গাড়ির স্পীড কখনওই ঘন্টায় ৪০ কিলোমিটারের বেশি তোলা সম্ভব হবে না) এই ক্রসিং থেকে হাইওয়ে ছেড়ে আমরা নেমে পড়লাম মগরা-গুড়াপ রোডে । দু'দিকের ধানক্ষেতের মধ্যে দিয়ে প্রথমে মগরা-গুড়াপ রোড, তারপর বৈঁচি-ধনিয়াখালি রোড আর সবশেষে বৈঁচি-কালনা রোড ধরে মোট ৩৬ কিলোমিটার মতো গিয়ে আমরা পৌঁছলাম আমাদের গন্তব্যস্থলে ।

দুপুর প্রায় একটা বাজে তাই আমরা আগেই লাঞ্চ করার সিদ্ধান্ত নিলাম । কালনা-কাটোয়া রোডের উপর একাধিক ভাতের হোটেল আর রেস্ট্যুরেন্ট আছে, তাদের মধ্যে 'পথের সাথী' হল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের । আমরা এখানে ফ্রাইড রাইস আর চিকেন মাঞ্চুরিয়ান খেয়ে নিলাম । মোট খরচ হল ২২০/- টাকা ।

কালনার বিখ্যাত ১০৮ শিবমন্দির (ক্যামেরায়
প্যানরামিক ভিউ এর সুযোগ না থাকায় দু'টো
আলাদা ছবি পাশাপাশি জোড়া হয়েছে)
এরপর আমরা গেলাম কালনার প্রধান আকর্ষণ ১০৮ শিব মন্দির দেখতে । শেষের রাস্তাটুকু বিশেষ চওড়া নয় তবে দুপুরবেলা গাড়ি বেশি না থাকায় সেরকম অসুবিধে হল না । শিব মন্দিরের বাইরে একটা ফাঁকা জায়গায় গাড়ি রেখে আমরা মন্দিরের ঢোকার গেটের সামনে গেলাম । গেট দুপুর বারোটা থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত্য বন্ধ থাকে তাই ভিতরে ঢুকতে পারলাম না । তবে বাইরে থেকে ভিতরের যতটা দেখা যায় সেটাও খুব কম নয় । পুরো জায়গাটা মন্দিরনির্মিত দু'টো সমকেন্দ্রীক বৃত্ত যার বাইরের বৃত্তে ৭৪ টা আর ভিতরের বৃত্তে ৩৪ টা শিবের মন্দির মিলিয়ে মোট ১০৮ টা মন্দির আছে । প্রত্যেকটা মন্দির শিবের একেকটা আলাদা নামে (যারা জানে না তাদের জানাচ্ছি শুধু নারায়ণের নয়, মহাদেবেরও ১০৮ টা নাম আছে - বিস্তারিত জানতে চাইলে click here (তথ্য যাচাই করা হয়নি)) মন্দিরগুলো ১৮০৯ সালে মহারাজ তেজ চন্দ্র বাহাদুর তৈরি করেন । ভিতরে ঢুকতে না পারলেও আমরা পুরো জায়গাটা একবার বৃত্তাকারে চক্কর দিলাম । এর আগে একজায়গায় অনেকগুলো করে শিবের মন্দির থাকতে দেখেছি, যেমন দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণীর মন্দিরের সঙ্গে দ্বাদশ শিবমন্দির বা খড়দহে ছাব্বিশ শিবমন্দির, কিন্তু তার চেয়ে বেশি কখনও দেখিনি । একজায়গায় ১০৮ শিবমন্দির শুধুমাত্র ভারতবর্ষে নয়, আমার ধারণা সারা বিশ্বেই নজিরবিহীন ।

রাজবাড়ির বাগান ও মন্দির
১০৮ শিবমন্দিরের ঠিক বিপরীত দিকেই কালনা রাজবাড়ির চত্বর । সৌভাগ্যক্রমে এটা খোলা ছিল । ভিতরে ঢুকে দেখলাম জায়গাটা প্রকৃতপক্ষে বেশ কিছু মন্দির আর বাগানের সমাহার । বাগানটা যে নিয়মিত পরিচর্যা করা হয় সেটা দেখেই বোঝা যায় । মন্দিরগুলোর মধ্যে বদ্রীনারায়ণ, পঞ্চরত্ন, প্রতাপেশ্বর, গিরি গোবর্ধন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য । মন্দিরের গায়ের ইঁটের গাঁথনি দেখে মনে হয় সেগুলো আলাদা আলাদা সময়ে তৈরি । এখানেও কয়েকটা ছোট ছোট শিবমন্দির আছে । মন্দিরগুলোর সামনে আলোর ব্যবস্থা দেখে মনে হয় সন্ধ্যের পরে আলো জ্বললে খুব সুন্দর দেখতে লাগবে । এই চত্বরটা পেরিয়ে গেলে রাজবাড়ির মাঠ ।  মেঘলা আবহাওয়া হওয়াতে রোদের তেজ অনুভব করছিলাম না, তাই সবকিছু বেশ ভালো করে ঘুরে দেখে নিলাম ।

মদন গোপাল মন্দির
রাজবাড়ির গেট দিয়ে বেরিয়ে এসে আমরা বাঁদিকে কিছুটা হেঁটে গিয়ে আরেকটা মন্দির দেখতে পেলাম । এটার নাম মদন গোপাল মন্দির । এই মন্দিরটা একটা ছোট পাঁচিল দিয়ে ঘেরা । এটা সেরকম কিছু বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নয়, আমরা এখানে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে ছবি তুলে চলে এলাম ।












দুপুর প্রায় তিনটে বাজে আর আমাদের আর বিশেষ কিছু দেখারও নেই, তাই আমরা ফেরার পথ ধরলাম । ফেরা একই পথ ধরে । বিকেল সাড়ে পাঁচটার একটু পরে বাড়ি পৌঁছে গেলাম ।

সারসংক্ষেপ ঃ

১. কলকাতা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে পূর্ব বর্ধমান জেলায় হুগলী নদীর তীরে কালনা শহর । মন্দির ও অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থাপত্যের জন্য এই জায়গাটি বিখ্যাত ।
২. কলকাতা থেকে গাড়ি নিয়ে ছাড়া ট্রেনেও কালনা যাওয়া যায় । হাওড়া থেকে প্রতি দু'ঘন্টা ছাড়া ছাড়া কাটোয়া লোক্যাল পাওয়া যায় অথবা শিয়ালদহ থেকেও কাটোয়া লোক্যালে যাওয়া যায় । এখানকার নিকটবর্তী স্টেশন হল অম্বিকা কালনা । স্টেশন থেকে টোটো বা রিক্সা পাওয়া যায় ।
৩. কালনার প্রধান আকর্ষণ হল ১০৮ শিবমন্দির । একজায়গায় একসঙ্গে এতগুলো শিবমন্দির এক নজিরবিহীন স্থাপত্য । দুপুর বারোটা থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত্য মন্দিরের গেট বন্ধ থাকে ।
৪. শিবমন্দিরের ঠিক উল্টোদিকেই আছে রাজবাড়ির বাগান, সংলগ্ন মন্দির আর খেলার মাঠ । এই গেট সারাদিনই খোলা থাকে ।
৫. রাজবাড়ি আর ১০৮ শিবমন্দির ছাড়াও এই অঞ্চলে আরও কয়েকটা মন্দির আছে । এগুলো খুব কিছু বৈশিষ্ট্যপূর্ণ না হলেও ঘুরে দেখতে ভালো লাগবে ।
৬. মন্দির বা রাজবাড়ির খুব কাছে সেরকম কোনও ভালো খাবার হোটেল নেই । খাবারের জন্য স্টেশন বা সংলগ্ন কালনা-কাটোয়া রোডের ওপর একাধিক হোটেল পাওয়া আছে । এদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের 'পথের সাথী' উল্লেখযোগ্য । এখানে খাবারের দাম কম আর মান বেশ ভালো ।
৭. কালনা ডে-ট্রিপ করার পক্ষেই উপযোগী, কোনও কারণেই এখানে রাত্রিযাপনের কোনও মানে হয় না । তা সত্ত্বেও করতে চাইলে এই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের 'পথের সাথী'তে থাকার ব্যবস্থা আছে ।

উপসংহার ঃ

কালনা রাজবাড়ির মন্দির
কলকাতা থেকে ডে-আউট ট্রিপে ছোট্ট শহর - কালনা । ঐতিহাসিক দিক থেকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ । হুগলী নদীর একেবারে তীরে হওয়ায় সপ্তম খ্রীষ্টাব্দে বাংলার সম্রাট শশাঙ্কের আমলে এই কালনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল একটি উন্নতমানের নৌবহর । আবার শ্রী চৈতন্যর জীবদ্দশায় একমাত্র চৈতন্য মন্দির নির্মিত হয়েছিল এই কালনাতেই । অষ্টাদশ শতাব্দীতে বর্ধমানের রাজাদের আমলে কালনা সর্ব্বোচ্চ খ্যাতি অর্জন করে - এখানকার বেশিরভাগ মন্দির আর স্থাপত্য এই সময়েই নির্মিত হয় । না, এগুলো আমাদের ইতিহাসে পড়ানো হয় না । আমাদের স্কুলের ইতিহাস বই থেকে আমরা জানতে পারি না যে আমাদের 'ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া'ই দেখতে পাওয়া যায় শুধুমাত্র শিবমন্দির দিয়ে নির্মিত দু'টো সমকেন্দ্রিক বৃত্ত । এখানেই দেখতে পাওয়া যায় বাংলার সেরা কিছু স্থাপত্য-ভাস্কর্য্য । দোষ আমাদেরই - আমরাই আমাদের ইতিহাসকে কখনও গুরুত্বপূর্ণভাবে পরিবেশন করতে পারিনি । আর সেই কারণেই হয়তো আমরা আমাদের ইতিহাসের প্রতি কখনও সেভাবে টানও অনুভব করিনি - করিনা । ইতিহাস শুধু পাঠ্যবই আর পরীক্ষার নম্বরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে - আমাদের জ্ঞানের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়নি । কখনও উপলব্ধি করিনি এগিয়ে চলার জন্য পিছনদিকে রাস্তাটা কোথা থেকে এসেছে সেটাও জানার দরকার । তাই যদি এই জানা সত্যিই দরকার বলে মনে হয় তাহলে - 'কালনা', আজই যেতে হবে !

কালনা ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Monday, April 2, 2018

গ্যাংটক ভ্রমণ

ভ্রমণপথঃ

বুধবার ২৮শে মার্চ, ২০১৮ঃ শিয়ালদহ - রাত ১১ঃ১৫ মিনিটে পদাতিক এক্সপ্রেস
বৃহস্পতিবার ২৯শে মার্চ, ২০১৮ঃ সকাল ১০ঃ৩০ মিনিট - নিউ জলপাইগুড়ি - গ্যাংটক - গ্যাংটকে রাত্রিবাস
শুক্রবার ৩০শে মার্চ, ২০১৮ঃ গ্যাংটকে সাইট সিয়িং - গ্যাংটকে রাত্রিবাস
শনিবার ৩১শে মার্চ, ২০১৮ঃ গ্যাংটক - ছাঙ্গু লেক - বাবামন্দির - গ্যাংটকে রাত্রিবাস
রবিবার ১লা এপ্রিল, ২০১৮ঃ গ্যাংটক - নিউ জলপাইগুড়ি - দুপুর ২ঃ৪০ মিনিটে ক্যাপিটাল এক্সপ্রেস - বিকেল ৫ঃ১৫ মিনিট - বারসোই - সন্ধ্যে ৭ঃ১০ মিনিটে রাধিকাপুর এক্সপ্রেস
সোমবার ২রা এপ্রিল, ২০১৮ঃ সকাল ৬ টা - কলকাতা

গ্যাংটক । দীঘা-পুরী-দার্জিলিঙ আর তার সঙ্গে দেওঘর বাদ দিলে বাঙালির সবথেকে পরিচিত ঘোরার জায়গা (আমার এই নিয়ে দ্বিতীয়বার হল) । আমাদের প্রতিবেশী সিকিম রাজ্যের রাজধানী এই শহর বহুদিন ধরেই পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় । সিকিম ভারতের সবথেকে পরিচ্ছন্ন রাজ্য আর গ্যাংটকে গেলে সেটা ভালোভাবেই বোঝা যায় । এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ অত্যন্ত মনোরম আর সেটাই আমাদের এই ভ্রমণের অন্যতম কারণ । হিমালয়ের কোলে এই জনবহুল শহরে তিনদিনের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়েই আমার ব্লগের এবারের পোস্ট ।

এবারের দলে মোট ১৪ জন । আমি, অমৃতা, কথা-কলি, বাবা, মা, সমীরণদা, বৌদি, ঋজু, কঙ্কনাদি, অমিতদা, মিঙ্কা, কাকু ও কাকিমা (অমিতদার বাবা ও মা) । ঘোরার জন্য সংখ্যাটা একেবারে যাকে বলে আইডিয়াল কারণ দুটো গাড়ি ভাড়া করতে হবে আর সেগুলো সম্পূর্ণভাবে ব্যবহারও হবে । ২৮শে মার্চ, ২০১৮ বুধবার শিয়ালদহ থেকে পদাতিক এক্সপ্রেসের এ সি থ্রি টিয়ারে আমাদের যাত্রা শুরু হলো । ট্রেন ছাড়ার সময় রাত্রি ১১:১৫ বলে আমরা বাড়ি থেকে ডিনার করেই বেরিয়েছিলাম, তাই ট্রেন ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই শুয়ে পড়লাম ।

নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে সবাই
পরের দিন সকালে ব্রেকফাস্টে সঙ্গে নিয়ে আসা কুকিজারের চিকেন স্যান্ডউইচ খাওয়া হল । ট্রেনের নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছনোর কথা ছিল সকাল ৯ঃ৩০ মিনিটে । আমরা একঘন্টা লেট করে পৌঁছলাম ১০ঃ৩০ মিনিটে । নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে গ্যাংটক যাওয়ার অনেক গাড়ি পাওয়া যায় । সেরকমই একটা ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে রফা করে আমরা দুটো সুমো বুক করলাম । তবে গাড়ি বুকিং যে শুধু আমাদের নিউ জলপাইগুড়ি থেকে গ্যাংটক যাওয়ার জন্য করা হল তা নয়, আমাদের গ্যাংটকের যাবতীয় ঘোরাঘুরি আর ফেরার দিন গ্যাংটক থেকে নিউ জলপাইগুড়ি আসার বুকিংও একইসঙ্গে করে ফেলা হল । সবমিলিয়ে একটা প্যাকেজ যার জন্য আমাদের মোট দিতে হবে ২৮,৩০০/- টাকা । বলা বাহুল্য এর কিছুটা আমাদের নিউ জলপাইগুড়িতেই দিতে হল ।

গাড়ি নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করলাম । নিউ জলপাইগুড়ি থেকে গ্যাংটক যাওয়ার জন্য সেভক দিয়েই যেতে হয় । এই রাস্তা দিয়ে এর আগে আমরা অনেকবার গেছি । দুপুর দেড়টা নাগাদ তিস্তা ব্রীজের কাছে আমাদের পরিচিত রেস্ট্যুরেন্টে থামা হল লাঞ্চের জন্য । আমরা এই রাস্তা দিয়ে গেলে সাধারণতঃ এখানেই খাওয়াদাওয়া করি । ভাত, ফ্রাইড রাইস আর চিকেন নিয়ে মোট খরচ হল ১,৯১০/- টাকা ।

আবার এগিয়ে চলা । পাহাড়ী রাস্তার বিবরণ দেওয়ার খুব একটা মানে হয় না কারণ এই রাস্তা সবসময়ে একই থাকে । আমার আগের যেকোনও পাহাড় ভ্রমণের যাত্রাপথের বিবরণ পড়লে দেখা যাবে ব্যাপারটা একইরকম । কিন্তু একইরকম হলেও একঘেয়ে নয় । বারবার দেখেও এই রাস্তা পুরনো হয় না, প্রত্যেকবারই একইরকমভাবে ভালো লাগে । রাস্তায় বিকেলবেলা আরেকবার থামা হল চায়ের জন্য । আমরা গ্যাংটক পৌঁছলাম তখন প্রায় সন্ধ্যে সাতটা । গাড়ির ভেতরে যতক্ষণ ছিলাম টের পাইনি, গাড়ি থেকে নেমে বুঝলাম বাইরে বেশ ঠান্ডা । আমাদের হাতের কাছেই কিছু গরম জামাকাপড় রাখা ছিল, সেগুলোর সদ্ব্যবহার করা হল ।

ব্রাদার্স গেস্ট হাউসের ঘর (সৌজন্যেঃ ব্রাদ্রার্স গেস্ট হাউস)
গ্যাংটকে আমাদের হোটেল 'ব্রাদার্স গেস্ট হাউস' । হোটেলটা এম জি মার্গের ওপরে । এই হোটেলের একটা সুবিধে হল একেবারে দরজা পর্যন্ত্য গাড়ি যায় । হোটেলটা বেশ সুন্দর এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন । আমরা দু'টো ট্রিপল বেড রুম আর একটা সিক্স বেড রুম নিয়েছিলাম । সিক্স বেড রুমটা একটু অন্যরকম, একটা দরজা দিয়ে ঢুকে প্রথমে একটা ঘরে দুটো বেড, তারপর একটা প্যাসেজের লাগোয়া আরও দুটো বেড । সেই প্যাসেজের শেষে একটা দরজা আর তার পিছনে আরেকটা ঘরে আরও দুটো বেড ।

ব্রাদার্স গেস্ট হাউসে ডাইনিংএর ব্যবস্থা নেই, তবে ব্রেকফাস্ট বা চায়ের ব্যবস্থা আছে । সেইসঙ্গে যদি আমরা বাইরে থেকে খাবার নিয়ে এসে খেতে চাই, তাহলে এরা বাসনপত্রও দেয় । এই হোটেলের সামনেই গ্যাংটকের তথাকথিত ম্যাল আর সেখানে সারি সারি দোকান রয়েছে । আমরা এখানকার একটা বাঙালি দোকান থেকে ডিনারের জন্য ভাত, রুটি, ডাল, আলুভাজা, ডিম, চিকেন ইত্যাদি নিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম ।

হোটেলের ছাদ থেকে ম্যালের ভিউ
পরেরদিন ৩০শে মার্চ, ২০১৮ শুক্রবার - আমাদের গ্যাংটকের লোক্যাল সাইট সিয়িং-এর দিন । আমি সকালে উঠে হোটেলের ছাদে গেলাম । এখানে সূর্য্যোদয় দেখতে পাওয়া যায় না, আর সেভাবে কাঞ্চনজঙ্ঘার ভিউও পাওয়া যায় না । আমি ছাদে উঠে খুব অল্প সময়ের জন্য কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পেলাম । তবে এটা আমি আগেও বলেছি আমার কাঞ্চনজঙ্ঘা নিয়ে বাড়াবাড়িটা নেই, তাই না দেখতে পেলে বেড়ানোটা ব্যর্থ বলে মনে করিনা ! ছাদ থেকে ম্যালের ভিউটা খুব সুন্দর । সকাল সাড়ে সাতটার সময়ে দোকানপাট প্রায় সবই বন্ধ, তবে রাস্তাটা দেখতেও বেশ ভালো লাগে ।

সকালে হোটেল থেকেই ব্রেকফাস্ট নেওয়া হল । পাঁউরুটি আর ডাবল্‌ ডিমের ওমলেট । এখানে খাবারের দাম একটু বেশি, ব্রেকফাস্টে আমাদের সবমিলিয়ে খরচ হল ৮৬০/- টাকা । সাড়ে ন'টার একটু পরে দু'টো সুমো নিয়ে আমরা বেরোলাম সাইট সিয়িং-এর জন্য । আমাদের প্রথম গন্তব্য রুমটেক মনাস্ট্রি ।

রুমটেক মনাস্ট্রির পথে প্রার্থনা চক্র
রুমটেক মনাস্ট্রি - গ্যাংটকের সাইট সিয়িংএর মধ্যে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হল রুমটেক মনাস্ট্রি - এটা সিকিমের সবথেকে বড় মনাস্ট্রি । গ্যাংটক থেকে রুমটেকের দূরত্ব অনেক, আমাদের পৌঁছতে লাগল প্রায় পৌনে দু'ঘন্টা । গাড়ি আমাদের মনাস্ট্রির মেইন গেটে নামিয়ে দিল । বাকি পথটা পাহাড়ী পথে চড়াইয়ে হেঁটে উঠতে হবে । এমনিতে গাড়ির গেটের ভিতরে যাওয়ার অনুমতি নেই, তবে বয়স্ক মানুষের জন্য এরা অ্যালাও করে । সেইভাবে আমাদের দলের চারজন গাড়িতে উঠল আর বাকিরা হেঁটে উঠলাম । ওঠার পথের পাশে পরপর রয়েছে বেবিফুডের টিনের মতো সেই জিনিসগুলো যেগুলোকে 'প্রার্থনা চক্র' বলে । এগুলোর গায়ে তিব্বতী মহামন্ত্র 'ওম্‌ মণিপদ্মে হুম্‌' লেখা থাকে আর সেইজন্য এগুলোকে ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘোরাতে হয়, তাতে লেখাটা পড়া যায় । এগুলো ঘোরালে পুণ্য অর্জন হয় তাই এই পথে ওঠার সময়ে আমরা প্রভূত পরিমাণ পুণ্য সঞ্চয় করে ফেললাম !

রুমটেক মনাস্ট্রি
পাহাড়ের মাথায় একটা সমতল জায়গায় মনাস্ট্রিটা রয়েছে । ঢোকার টিকিট মাথাপিছু ১০/- টাকা আর বাচ্চাদের টিকিট লাগে না । মনাস্ট্রি জিনিসটা আমার খুব ভালো লাগে আর তার একটা কারণ এর রঙের বৈচিত্র্য । অন্য কোনও ধর্মীয় স্থানে রঙের এই বৈচিত্র্য সাধারণতঃ দেখতে পাওয়া যায় না । গেট দিয়ে ঢুকে একটা বিশাল চত্বর আর তার মাঝখানে একটা স্তম্ভ । এই চত্বরের একদিকে মনাস্ট্রি আর অন্যদিকে আবাসিকদের ঘর । আমরা এখানে কিছুক্ষণ থেকে ডানদিকের একটা গেট দিয়ে বাইরে বেরোলাম ।

এই গেট দিয়ে বাইরে বেরিয়ে একটা রাস্তা আছে যেটা দিয়ে গিয়ে একটা সিঁড়ি দিয়ে উঠে মনাস্ট্রির উপাসনাগৃহে পৌঁছনো যায় । মনাস্ট্রির ভিতরটাও আমার খুব ভালো লাগে - জায়গায় জায়গায় প্রদীপ জ্বলছে, প্রার্থনা বা উপাসনার নানারকম সরঞ্জাম রাখা আর সেইসঙ্গে গৌতম বুদ্ধের বিশাল মূর্তি । ভিতরটা খুব শান্ত আর নিস্তব্ধ হয় আর এই কারণেই এখানে কিছুক্ষণ সময় কাটাতে ভালো লাগে । ভিতরে ক্যামেরা নিয়ে ঢোকা বারণ তবে মোবাইলে ছবি তুললে কিছু বলে না । আমরা ভালো করে দেখে বেরিয়ে এলাম ।

মনাস্ট্রির পিছনে কলেজ
এই উপাসনাগৃহের ঠিক পিছনেই মনাস্ট্রির কলেজ । স্বাভাবিকভাবেই সেখানে ঢোকার নিয়ম নেই । আমরা এখানে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে ফিরে এলাম । নামার সময়েও একই নিয়ম - যারা পারবে তারা হেঁটে আর যারা পারবে না তারা গাড়িতে ।






শান্তি ভিউ পয়েন্ট থেকে ভিউ
শান্তি ভিউ পয়েন্ট - রুমটেক মনাস্ট্রি থেকে নামার পথে ড্রাইভার একটা জায়গায় গাড়ি দাঁড় করাল, সেটার নাম শান্তি ভিউ পয়েন্ট । এখান থেকে গ্যাংটক শহরের ভিউ দেখতে পাওয়া যায় । এখানে একটা চায়ের দোকান দেখে সবাই সেখানে চা খাওয়া হল ।





বনজাকরি ওয়াটার ফলসের লাগোয়া বোটিং-এর ব্যবস্থা
বনজাকরি ওয়াটার ফলস্‌ - শান্তি ভিউ পয়েন্ট থেকে প্রায় সোয়া একঘন্টা মতো চলার পর আমরা পৌঁছলাম বনজাকরি ফলসে । এটাও গ্যাংটকের একটা অন্যতম সেরা দ্রষ্টব্য স্থান । এখানে ঢোকার টিকিট মাথাপিছু ৫০/- টাকা আর বাচ্চাদের টিকিট লাগে না । ভেতরে কয়েকটা রেস্ট্যুরেন্ট আছে । দুপুর আড়াইটে বাজে আর বেশ খিদেও পেয়ে গেছিল তাই আমরা এদের মধ্যে একটা রেস্ট্যুরেন্টে খেতে বসলাম । খেতে লাগল পনেরো মিনিট আর আগে খাবার আসতে লাগল পঁয়তাল্লিশ মিনিট ! হ্যাঁ, সেটাই । আমরা এদের মেনু থেকে অতি সাধারণ ভাত, ফ্রাইড রাইস, চিকেন ইত্যাদিই অর্ডার দিয়েছিলাম আর অর্ডার নেওয়ার সময়ে এদের বক্তব্যও ছিল সেটা পেতে মিনিট দশেকের বেশি লাগবে না, কিন্তু সবমিলিয়ে আমরা খাবার পেলাম অনেকটা দেরিতে । খাবারের মান যে খুব ভালো তা নয়, তবে খেয়ে নেওয়া যায় । আমাদের বিল হল ১,৪০০/- টাকা ।

বনজাকরি ফলস্‌
এবার আমরা গেলাম মূল ফলস্‌ বা জলপ্রপাতটা দেখতে । পুরো এলাকাটা বেশ বড় আর সেখানে ফলস্‌ ছাড়াও একটা পার্ক, বোটিং এর ব্যবস্থা, বসে বিশ্রাম নেওয়ার ব্যবস্থা ইত্যাদি রয়েছে । ফলস্‌টা যেখানে পাহাড়ের ওপর থেকে নিচে নামছে, সেখানে যেতে গেলে কিছু সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয় । সেই জায়গাটায় গিয়ে চাইলে জলে নামা যেতে পারে । আমি পা দিয়ে দেখলাম জলটা বেশ ঠান্ডা । এখানে পাথরে পাথরে পা দিয়ে জলের ধারার অন্যপারেও যাওয়া যায় । আমি একবার অন্যপারে গিয়ে ফিরে এলাম । জলের স্রোত সাংঘাতিক কিছু না হলেও একবার পা হড়কালে নির্ঘাত মৃত্যু হাত-পা ভাঙা ।
বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ These actions are performed by experts. Please do not try this if you are not!

বলজাকরি ফলস্‌ দেখে প্রায় বিকেল চারটে নাগাদ আমরা বেরোলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ।

রিজ পার্ক ফ্লাওয়ার এক্সিবিশন সেন্টার - বনজাকরি ওয়াটার ফলস্‌ থেকে ঘন্টাখানেক গাড়িতে চলার পর আমরা পৌঁছলাম রিজ পার্কে ফ্লাওয়ার এক্সিবিশন সেন্টার বা পুষ্প প্রদর্শনী কেন্দ্রে । ঢোকার টিকিট মাথাপিছু ২০/- টাকা - বাচ্চাদের টিকিট লাগেনা ।

রিজ পার্ক ফ্লাওয়ার এক্সিবিশন সেন্টার
পুষ্প প্রদর্শনী কেন্দ্রটা খুবই সুন্দর । ভেতরের জায়গাটা গোলাকার, তার মাঝখানে একটা রেলিং ঘেরা জায়গা যার মধ্যে অনেক ফুলের গাছ রয়েছে । আবার গোলাকার ঘরটার দেওয়ার বরাবরও একটা রেলিং চলে গেছে আর তার ওদিকেও অনেক ফুলের গাছ । এর মাঝখান দিয়ে চলে গেছে দর্শকদের জন্য পায়ে চলার রাস্তা । ফুল সম্পর্কে আমার জ্ঞান খুবই সীমিত তাই প্রদর্শনীতে দেখা বেশিরভাগ ফুলেরই নাম বলতে পারব না । কিন্তু নানা রঙের, নানা আকারের, নানা সাইজের, নানা ধরনের, নানা পাটেকরের ফুল দেখে অবাক ও মুগ্ধ হয়ে গেলাম ।

ফ্লাওয়ার এক্সিবিশন সেন্টার থেকে বেরিয়েই একজায়গায় এখানকার পোষাক পরে ছবি তোলার ব্যবস্থা আছে । কথা, কলি আর মিঙ্কা সেই পোষাক পরে ছবি তুলল ।

আমাদের গ্যাংটকের সাইট সিয়িং এখানেই শেষ । এছাড়া আরও বেশ কয়েকটা দেখার জায়গা আছে যেগুলো সময়ের অভাবে দেখার সুযোগ হয়নি । কিন্তু তাতে আফসোস করার কিছু নেই । সবকিছুই যদি একবারে দেখে ফেলি তাহলে পরেরবার আসব কিসের টানে ?

গাড়ি ফেরার সময়ে আমাদের হোটেলের সামনে নামিয়ে দিল । আগেই বলেছি আমাদের হোটেলটা একেবারে ম্যালের ওপরে । সাড়ে ছটা নাগাদ হোটেলে ফিরে আমরা ম্যালে গেলাম । সেখানে একটা দোকান থেকে চিকেন রোল কিনে খাওয়া হল ।

রাতে ম্যালের ভিউ
গ্যাংটকের ম্যাল জায়গাটা আমার অসাধারণ লাগে । এর আগে ছবি দেখেছি, কিন্তু স্বচক্ষে দেখা হয়নি । শুনেছি ক্রিসমাসের সময়ে এরা জায়গাটাকে খুব সুন্দর করে সাজায় । তাই সেই সময়ে এখানে এলে খুব ভালো লাগবে । কিন্তু তাই বলে মার্চ মাসে আমাদেরও খারাপ লাগছিল না । ম্যালের রাস্তায় গাড়ি চলে না, শুধু হাঁটা যায় । পুরো রাস্তাটা মসৃণ কালো পাথর দিয়ে ঢাকা । অল্প অল্প ব্যবধানে সুন্দর বসার জায়গা । জায়গায় জায়গায় ফোয়ারা আর সেইসঙ্গে গাছপালা লাগানো । পুরো জায়গাটা আলোয় আলোকিত, তার মধ্যে রাস্তার আলো ছাড়াও সৌন্দর্য্যায়নের আলোও রয়েছে । রাস্তার দু'পাশে সারিবদ্ধ দোকান আর সেখানে পাওয়া যায় না এরকম জিনিস নেই । সন্ধ্যেবেলা থেকে এখানে ভীড়ও হয় খুব, দোকানপাট রাস্তা বসার জায়গা সবই লোকে ভর্তি ।

আমরা ঘন্টা দুয়েক ঘুরে রাতের খাবার কিনে নিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম । মেনু আগেরদিনের মতোই - খরচ হল ৯১০/- টাকা ।

৩১শে মার্চ, ২০১৮ শনিবার - আমার জীবনের একটা বিশেষ স্মরণীয় দিন ! আজ পর্যন্ত্য যতবার যত জায়গায় বেড়াতে গেছি, এইদিনের মতো অভিজ্ঞতা আমার খুব কমই হয়েছে । মুগ্ধতা, বিস্ময়, আনন্দ, উত্তেজনা সবমিলিয়ে এই দিনটা সত্যজিৎ রায়ের ভাষায় 'আমার জীবনে একটা লালদাগ মার্কা তারিখ' হয়ে রইল । কেন, কিভাবে সেটা এবার বলি ।

এইদিনটা আমাদের ছাঙ্গুলেক আর বাবা মন্দির যাওয়ার দিন । এখানে একটা কথা জানিয়ে রাখি ছাঙ্গু লেক এবং বাবা মন্দির যাওয়ার জন্য পার্মিশন লাগে । জিনিসটা পাওয়া দুঃসাধ্য কিছু নয়, তবে তার জন্য নিজের দু'কপি করে ফোটো আর একটা সচিত্র পরিচয়পত্র সঙ্গে থাকা বাধ্যতামূলক । আমরা আগেরদিন এইসব জিনিস আমাদের ট্রাভেল এজেন্সির এখানকার অফিসে জমা দিয়েছিলাম এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে ৩১শে মার্চ সকালে যাওয়ার পার্মিট পেলাম । জিনিসটা গাড়ির ড্রাইভারের কাছে থাকে, যাওয়ার সময়ে সেইই যা করার করে । হোটেল থেকে ব্রেকফাস্ট করেই বেরিয়েছিলাম, পার্মিট সংগ্রহ করে যখন আমরা যাত্রা শুরু করলাম ছাঙ্গু লেকের উদ্দেশ্যে তখন সকাল সাড়ে নটা ।

ছাঙ্গুর পথে - চা পানের বিরতি
গ্যাংটকের উচ্চতা ৫,৪০০ ফুট আর ছাঙ্গু লেকের উচ্চতা ১২,৩০০ ফুট, অর্থাৎ গ্যাংটকের দ্বিগুণেরও বেশি । তাই গ্যাংটক থেকে ছাঙ্গু লেকের দূরত্ব মাত্র ৩৭ কিলোমিটার হলেও এই পথটা যেতে প্রায় দু'ঘন্টা সময় লাগে । আমরা রাস্তায় এক জায়গায় দাঁড়ালাম চা-টা খাওয়ার জন্য । সকাল থেকে মেঘ করে থাকার কারণে রোদ খুব একটা ওঠেনি, তাই ঠান্ডাটাও বেশ অনুভব করছিলাম ।


পাহাড়ের গা বেয়ে বরফ নেমে আসা
চা খাওয়ার পর আমরা আবার এগিয়ে চললাম । পথে মোট তিন জায়গায় চেকিং হল । এত নিরাপত্তার কারণ ছাঙ্গু লেক ভারত আর চিন অধিকৃত তিব্বতের বর্ডারের খুব কাছে । উচ্চতা বাড়ছে আর সেইসঙ্গে বাড়ছে ঠান্ডা । আমরা কাচ তুলে দিয়ে গাড়ির মধ্যে বসে আছি বলে ঠান্ডাটা একটু কম লাগছে । একসময়ে উপরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে দেখলাম পাহাড়ের গায়ের গাছপালার মধ্যে দিয়ে সাদা রঙের কি যেন ওপর থেকে নিচের দিকে স্রোতের মতো নেমে আসছে । আমাদের ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করাতে বলল - বরফ । পাহাড়ের উপরের দিকে তুষারবৃষ্টি হচ্ছে আর সেই বরফ গা বেয়ে নিচের দিকে নেমে আসছে ! আমি কোনওদিন তুষারবৃষ্টি দেখিনি, তখনও যে দেখতে পাচ্ছিলাম তা নয়, কিন্তু পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা বরফ দেখেই যথেষ্ট উত্তেজনা অনুভব করছিলাম !

ছাঙ্গু লেক ফেলে আমরা এগিয়ে চলেছি
উত্তেজনার যে তখনও কিছুই হয়নি, সেটা বুঝলাম ছাঙ্গুর কাছাকাছি পৌঁছে । তখন ওই অঞ্চলে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে, তুষারপাত দেখার জন্য আর পাহাড়ের ওপর দিকে তাকানোর দরকার হচ্ছে না । ছাঙ্গুতে পৌঁছে দেখলাম ভালোই ভিড় । আমাদের গাড়িটা সামনে ছিল আর অন্য গাড়িটা বেশ কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিল বলে আমরা চাইছিলাম ওখানে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে । এখানে মোবাইল ফোন কাজ করে না তাই গাড়িটার অবস্থান জানার কোনও উপায় নেই । কিন্তু ড্রাইভার আমাদের কথা না শুনে গাড়ি আরও এগিয়ে নিয়ে চলল । সেই মূহুর্তে ব্যাপারটার জন্য ওর ওপর একটু বিরক্ত লাগলেও পরে বুঝেছিলাম এতে, অন্ততঃ আমাদের, ভালোই হয়েছে ।

লোকজনের বরফ নিয়ে খেলা
আমরা এগিয়ে চললাম 'বাবা মন্দির'-এর দিকে । ছাঙ্গু থেকে এর দূরত্ব আরও ১৬ কিলোমিটার আর উচ্চতা ১৩,১০০ ফুট । ঝিরঝির করে তুষারপাত হচ্ছে, হয়েই চলেছে । ছাঙ্গু লেকটা ক্রমশঃ নিচে নেমে যাচ্ছে । বাইরে যেদিকে তাকাচ্ছি, সবকিছুই সাদা । ফেলুদার 'বাক্স রহস্য' উপন্যাস থেকে জটায়ুর কথা ধার করে বলি "রাস্তায় বরফ, গাছে বরফ, পাহাড়ে বরফ - চতুর্দিক তুষারে তুষারময় !" (আমাদের রাস্তায় যদিও কোনও গাছ ছিল না)  একজায়গায় দেখলাম পাহাড়ের গায়ে পুরু বরফের চাদরের ওপর লোকজন লাফালাফি করছে, বরফের গোলা বানিয়ে ছোঁড়াছুঁড়ি করছে - মানে এককথায় বরফ নিয়ে খেলছে ! আমাদের ড্রাইভারকে গাড়ি দাঁড় করাতে বলতে সে কোনও ভ্রুক্ষেপই করল না । প্রায় আধঘন্টা এইভাবে বরফে প্রায় ঢাকা রাস্তার ওপর দিয়ে চলে আমরা পৌঁছে গেলাম 'বাবা হরভজন সিং-এর মন্দির'-এ ।

বাবা হরভজন সিং-এর মন্দির
এখানেও বেশ ভিড় তবে ছাঙ্গুর মতো নয় । গাড়ি থেকে নেমে যেটা টের পেলাম সেটা হল ঠান্ডা ।  তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে তবে কত সেটা জানি না । সেইসঙ্গে একটানা তুষারপাত হয়ে চলেছে । জিনিসটা একেবারেই বৃষ্টির মতো তবে পার্থক্য হল জলের বদলে কুচি কুচি বরফ । আরেকটা পার্থক্য হল এর কোনও আওয়াজ নেই । চতুর্দিক সাদা হয়ে রয়েছে, একেবারে সামনের পাহাড়গুলো ছাড়া আর কোনওদিকেই কিছু দেখা যাচ্ছে না । আমরা বাবার মন্দিরটা দেখতে গেলাম । হরভজন সিং ছিলেন ভারতীয় আর্মির একজন জওয়ান যিনি ১৯৬৮ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে নাথুলাতে ভারত আর চিনের যুদ্ধে মারা যান । এই ঘটনার পর থেকে নানাকারণে এখানে পোস্টেড ভারতীয় জওয়ানদের মধ্যে বিশ্বাস জন্মায় যে ওনার আত্মা আজও এই অঞ্চলে তাদের রক্ষা করেন । (আমি খুব বিস্তারিত লিখছি না, ইন্টারনেটে সার্চ করলে এই বিষয়ে বিশদে জানতে পারা যাবে) সেই থেকেই উনি 'বাবা হরভজন সিং' আর ওনার নামে এই মন্দির । এখানে ওনার থাকার ঘর, অফিস সবই আছে আর সেইসঙ্গে নিয়মিত ওনার পুজোও হয় । পুজোর প্রসাদটা বেশ ইন্টারেস্টিং - কাজু, কিসমিস আর বাদাম । প্রসাদ পেতে গেলে পুজো দিতেই হবে এরকম কোনও কথা নেই, হাত পাতলেই একজন জওয়ান প্রসাদ দেয় । আমি বেশ কিছুটা সংগ্রহ করে গাড়িতে ফিরে এলাম ।

এখানে বলে রাখা দরকার এই উচ্চতায় অক্সিজেনের ঘাটতি হওয়ার একটা সম্ভাবনা আছে । যাঁদের হার্টের সমস্যা আছে, তাঁদের বাবামন্দির পর্যন্ত্য না যাওয়াই ভালো । যাঁদের বেশি উঁচুতে উঠলে শ্বাসকষ্ট হয়, তাঁদের উচিৎ উপযুক্ত ব্যবস্থা (ইনহেলার, ওষুধ ইত্যাদি) সঙ্গে রাখা । বয়স্ক লোকেদের ডাক্তারের পরামর্শ নিয়েই যাওয়া উচিৎ । আমাদের গাড়িতে ছিলাম আমি, অমৃতা, বাবা, মা, কথা, কলি আর ঋজু । গাড়ি থেকে নামার সময়েই ড্রাইভার আমাদের বলে দিয়েছিল যেন এখানে বেশি সময় না নিই । কিন্তু কথা-কলি ঘুমিয়ে পড়ায় আমাদের যাওয়াটা দু'দফায় করতে হল । আমরা ওদের ইচ্ছে করেই জাগাইনি কারণ ভেবেছিলাম তিনবছর বয়সের বাচ্চাদের শ্বাসকষ্ট হতে পারে । কিন্তু পরে জেনেছিলাম উচ্চতার কারণে এই শ্বাসকষ্টের সমস্যা ছোট বাচ্চাদের কখনওই হয়না কারণ তাদের হার্ট বড়দের থেকে অনেক কম অক্সিজেনে কাজ করতে পারে ।

ফেরার পথে ছাঙ্গু লেক
বাবা মন্দির থেকে আমরা ফেরার পথ ধরলাম । আবার বরফের রাস্তা । একটা জিনিস খেয়াল করলাম আমাদের ফেরার সময়ে সামনের দিক থেকে কোনও গাড়ি আসছে না । আসার সময়েও আমাদের পিছনে মাত্র একটা কি দু'টো গাড়িই এসেছিল । ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করাতে বলল - তুষারপাত হওয়ার কারণে রাস্তা বরফে ঢেকে যাওয়ায় মিলিটারির লোকেরা ছাঙ্গুর পরে গাড়ি আসা বন্ধ করে দিয়েছে । এটা হবে সে আগেই জানত আর তাই ছাঙ্গুতে গাড়ি না দাঁড় করিয়ে আমাদের সোজা বাবা মন্দিরে নিয়ে এসেছিল । আমাদের দলের কিছু লোকের বাবা মন্দির দেখা হল না ঠিকই কিন্তু ড্রাইভারের উপস্থিত বুদ্ধির জোরে আমাদের কয়েকজনের দেখা হয়ে গেল বলে তার প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞ বোধ করলাম !

এই অঞ্চলে ছাঙ্গু লেক, বাবা মন্দির ছাড়াও আরেকটা জিনিস দেখার আছে - সেটা হল নাথুলা পাস । এই জায়গাটা ভারত আর চিন অধিকৃত তিব্বতের সংযোগস্থল অর্থাৎ এই রাস্তা দিয়ে ভারত থেকে তিব্বত যাওয়া যায় । তবে এখানে যাওয়ার জন্য আলাদা পার্মিট লাগে আর বছরের বেশিরভাগ সময়ে বরফ বা অন্য কোনও কারণে জায়গাটা বন্ধই থাকে । আমরা আগে থেকেই জানতাম যে এটা বন্ধ আছে, তাই আমাদের দেখার সুযোগ হয়নি । গ্যাংটক থেকে ছাঙ্গু আর বাবা মন্দির গেলে নাথুলার ব্যাপারে একবার খোঁজ নিয়ে নেওয়া ভালো, যদি খোলা পাওয়া যায় তাহলে দেখে আসাটা একটা দারুণ অভিজ্ঞতা হবে ।

ছাঙ্গুতে ফিরে এলাম তখন দুপুর সোয়া দু'টো । কিছুক্ষণের চেষ্টায় আমাদের অন্য গাড়িটা খুঁজে পাওয়া গেল । ছাঙ্গুতে আমরা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছবিটবি তুললাম । বাবা মন্দিরের তুলনায় ছাঙ্গুর তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি (তাই বলে গরম লাগছিল না !)। লেকে এখন জলই দেখা যাচ্ছে তবে শীতকালে নাকি এই জল বরফে পরিণত হয় । এখানে ইয়াক বা চমরি গাই ভাড়া করে তাদের পিঠে চড়ে ছবি তোলা যায়, একটু আধটু ঘোরাও যায় । এছাড়া এখানে বরফের ওপরে হাঁটার জুতোও ভাড়া পাওয়া যায় । আমাদের ড্রাইভার বলল - আবহাওয়া খুব একটা ভালো নয়, তাই সময় থাকতে থাকতে নিচে নেমে যাওয়াই ভালো হবে । আমাদেরও সবকিছু দেখা হয়ে গিয়েছিল, তাই আর সময় নষ্ট করলাম না ।

এখানে একটা ঘটনা বলি । এটা আমাদের ঘোরার অংশ না হলেও আমার মনে হয় অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক আর শিক্ষণীয় । ঘটনাটা ১৯৯৭ সালের । আমার ছোটমামা আর তার কয়েকজন বন্ধু সপরিবারে গ্যাংটকে বেড়াতে এসেছিল আর সেখান থেকে ছাঙ্গুতে এসেছিল । ছাঙ্গুতে তখন এরকমই ঠান্ডা, কিছু বেশিকম হতে পারে । আমার মামাতো বোন তন্নির বয়স তখন সাড়ে তিন । তখন সুমো চলত না, বড় সাইজের জিপেই ঘুরতে হত । ছাঙ্গুতে এসে সবাই গাড়ি থেকে নেমে এদিক-ওদিক ঘুরছে আর ছোটমামা তন্নিকে নিয়ে জিপের পিছনে বসে আছে । হঠাৎ খেয়াল করল তন্নি কিরকম নেতিয়ে পড়েছে । ছোটমামার কোলে শুয়ে তার কিরকম একটা ঝিমধরা ভাব । এরকম হচ্ছে কেন ? স্বাভাবিকভাবেই ছোটমামা একটু ভয় পেয়ে যায় । কি করবে বুঝতে পারছে না, সঙ্গে থাকা জলের বোতল থেকে তন্নির চোখেমুখে জল দিচ্ছে, হাতের কাছে থাকা মোটা জ্যাকেট দিয়ে আরও জড়িয়ে ধরছে । কিন্তু তন্নির অবস্থার কোনও উন্নতি হচ্ছে না, মেয়ে প্রায় অজ্ঞান । মিনিট কয়েক এরকম চলার পরে গাড়ি থেকে নেমে পাশের একটা দোকানে অসহায়ের মতো গিয়ে বলে - মেরি বেটি কে লিয়ে থোড়া পানি মিলেগা ?
দোকানদার সেটা দিয়ে নিজে ব্যাপারটা কি দেখতে এগিয়ে আসে । ছোটোমামা তখন গাড়ির পিছনে শুয়ে থাকা মেয়েকে জল খাওয়াতে যাচ্ছে । দোকানদার জিজ্ঞেস করে - কেয়া হুয়া উসকো ?
- পতা নেহি । ক্যায়সে চুপ হো গয়ী হ্যায় ... এই বলে আবার জল খাওয়াতে চেষ্টা করে ।
দোকানদার 'হাঁ হাঁ' করে ওঠে । বলে - ঠান্ডা পানি মাৎ পিলাইয়ে উসকো !
এই বলে সে দ্রুত নিজের দোকানে ফিরে যায় । ঝটপট সাত-আটটা কাঁচালঙ্কা কুচি কুচি করে কেটে ফেলে । আর সেগুলো একটা কেটলির গরম জলের মধ্যে ফেলে দেয় । তারপর সেই জলটা একটা গ্লাসে ঢেলে ছোটমামাকে দিয়ে বলে - ইয়ে পিলাইয়ে উসকো ।
প্রায় অজ্ঞান মেয়েকে কোনওমতে কয়েকঢোক জল খাওয়াতে পারে ছোটমামা । আর তার ফল হয় ম্যাজিকের মতো ! পাঁচমিনিটের মধ্যে তন্নি লাফিয়ে উঠে জিপ থেকে নেমে গায়ের জ্যাকেট ফ্যাকেট খুলে দৌড়দৌড়ি করতে শুরু করে ! আনন্দে চোখে জল এসে যায় ছোটমামার (এটা ঘটেছিল কিনা আমি জানি না, শেষটা একটু নাটকীয় করার জন্য লিখলাম) !
ব্যাপারটা কি হল ? অতিরিক্ত ঠান্ডায় রক্ত চলাচলের বেগ কমে গিয়ে শরীর ঠান্ডা হয়ে যায় । এর ফলে তন্নির শরীর অবশ হয়ে গিয়েছিল । এইসময়ে ঠান্ডা জল খাওয়ালে কোনও ফল হয় না । দোকানদার দিয়েছিল গরম জল আর সেইসঙ্গে পাহাড়ী লঙ্কা ! শরীরকে মূহুর্তের মধ্যে গরম করার জন্য অব্যর্থ পাহাড়ী টোটকা । ফলাফল - হাতেনাতে !

নামার পথে তুষারপাতটা আস্তে আস্তে কমে গিয়ে একসময়ে বন্ধ হয়ে গেল । আমাদের কারুরই দুপুরে খাওয়া হয়নি, কিন্তু এই রাস্তায় সেরকম খাবারের কোনও দোকানও নেই । গাড়ির ড্রাইভার আমাদের বলল একেবারে গ্যাংটকে গিয়েই খাবারের দোকান পাওয়া যাবে । আমরা গ্যাংটক পৌঁছলাম তখন প্রায় বিকেল চারটে । গাড়ি আমাদের হোটেলের কাছে এক জায়গায় নামিয়ে দিল । সেখানে আমরা একটা কাছাকাছি বাঙালী রেস্ট্যুরেন্টে ঢুকে খেয়ে নিলাম । ভাত, ডাল, মাছ, চিকেন, চাউমিন, চিকেন মাঞ্চুরিয়ান মিলিয়ে খরচ হল ২,০৮৫/- টাকা ।

এখান থেকে আমরা হেঁটে হোটেলে পৌঁছে গেলাম । হোটেলে ঢুকতেই ম্যানেজার জিজ্ঞেস করল আমরা ছাঙ্গুতে গিয়ে বরফ পেয়েছি কিনা । আমরা "হ্যাঁ" বলাতে সে বলল - "আপলোগ বহোৎ লাকি হো সার ! ইস সাল ইঁহা ইৎনা আচ্ছা স্নোফল আজ পহলিবার হুয়া !"

সন্ধ্যেবেলা আমাদের আর কিছু করার ছিল না । ম্যালেও আর গেলাম না কারণ পরেরদিন আমাদের ফেরার দিন তাই গোছগাছ করে নেওয়ার ছিল । রাত ন'টা নাগাদ বেরিয়ে ডিনার নিয়ে এলাম একটা অন্য দোকান থেকে । এই দোকানটা ম্যালের একেবারে শেষপ্রান্তে । চাউমিন আর চিলি চিকেন - খরচ হল ১,২৬০/- টাকা ।

হোটেলের ছাদ থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার ভিউ
পরেরদিন ১লা এপ্রিল, ২০১৮ আমাদের ফেরার দিন । সকালে উঠে ছাদে যেতেই মেঘ আমাকে 'এপ্রিল ফুল' করে সরে গিয়ে বেশ পরিষ্কারভাবে দেখিয়ে দিল - কাঞ্চনজঙ্ঘা !







ব্রেকফাস্টের জায়গা থেকে পাহাড়ের ভিউ
হোটেল থেকে চেক্‌ আউট করে বেরোলাম আটটা নাগাদ । গ্যাংটক থেকে নিউ জলপাইগুড়ি ঘন্টাতিনেক লাগে তবে ব্রেকফাস্টের জন্য দাঁড়াতে হবে বলে তাড়াতাড়িই বেরিয়ে পড়লাম । আর সকালে কোথাও ঘোরার না থাকলে পাহাড় থেকে সকাল সকাল নেমে পড়াই বুদ্ধিমানের কাজ কারণ কোনও কারণে রাস্তায় কোথাও আটকে পড়লে ট্রেন মিস্‌ হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায় । সাড়ে নটা নাগাদ এক জায়গায় আমাদের গাড়ি থামল । সেখানে আমরা পরোটা আর তরকারী দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে নিলাম । খরচ হল ৭১০/- টাকা ।

গাড়ি নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন পৌঁছল দুপুর বারোটার একটু পরে । স্টেশনের IRCTC-র ক্যান্টিন থেকে ভাত ডাল মাছের ঝোল দিয়ে লাঞ্চ করে নিলাম । আমরা নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ফেরার সরাসরি টিকিট পাইনি, তাই দুপুর ২ঃ৪০ মিনিটের ক্যাপিটাল এক্সপ্রেসে ধরে বিকেল ৫ঃ১৫ মিনিটে পৌঁছলাম বারসোই । বারসোই থেকে সন্ধ্যে ৭ঃ১০ মিনিটের রাধিকাপুর এক্সপ্রেস ধরলাম । ডিনার আমরা নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকেই কিনে নিয়েছিলাম, রাতে খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়লাম । ট্রেন আমাদের কলকাতা স্টেশনে এসে পৌঁছে দিল পরেরদিন সোমবার ২রা এপ্রিল, ২০১৮ সকাল ৬ টায় । ভ্রমণ শেষ !

সারসংক্ষেপঃ

১. পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিকে দার্জিলিঙ বাদ দিলে সবচেয়ে পরিচিত বেড়ানোর জায়গা সিকিমের গ্যাংটক । ভারতের পরিচ্ছন্নতম রাজ্যের রাজধানী এই জায়গা সারা বছরই পর্যটকদের আকর্ষণ করে থাকে ।
২. গ্যাংটকের উচ্চতা ৫,৪০০ ফুট যা দার্জিলিঙের থেকে প্রায় ১,৩০০ ফুট কম । তাই এখানে ঠান্ডাও তুলনামূলকভাবে কম ।
৩. নিউ জলপাইগুড়ি বা শিলিগুড়ি বা বাগডোগরা থেকে গাড়ি নিয়ে গ্যাংটক যেতে হয় । ঘন্টা চারেক সময় লাগে ।
৪. গ্যাংটকে থাকার প্রচুর হোটেল আছে, তবে এম জি মার্গের ওপরে কোনও হোটেলে থাকতে পারলে ভালো । আমাদের হোটেল 'ব্রাদার্স গেস্ট হাউস' খুবই সুন্দর আর এদের ভাড়াও খুব একটা বেশি নয় । এদের নিজস্ব ওয়েবসাইট নেই, আমরা https://www.goibibo.com/ থেকে এদের বুকিং করেছিলাম । এছাড়া অন্যান্য ওয়েবসাইট থেকেও বুকিং করা যায় । হোটেলের ফোন নম্বরঃ 03592202091, 03452398111, 9933091115, 9564000767.
৫. এই হোটেলে ব্রেকফাস্ট, ইভনিং স্ন্যাক্স বা চায়ের ব্যবস্থা থাকলেও লাঞ্চ বা ডিনারের ব্যবস্থা নেই । তবে বাইরে থেকে খাবার নিয়ে এসে এদের ডাইনিং রুমে খাওয়া যেতে পারে বা ঘরে বসেও খাওয়া যেতে পারে - সেক্ষেত্রে এরা বাসনপত্র দেয় ।
৬. এই হোটেলটা একেবারে ম্যালের ওপরেই । এখানে কাছাকাছি অনেক খাবার দোকান আছে আর একাধিক বাঙালী রেস্ট্যুরেন্টও আছে ।
৭. গ্যাংটকের ম্যাল সন্ধ্যের পরে সময় কাটানোর জন্য একটা অসাধারণ জায়গা । অত্যন্ত সুন্দরভাবে সাজানো এই ম্যালের চারপাশ ঘিরে রয়েছে প্রচুরসংখ্যক দোকান যেখান থেকে নানারকম দরকারী বা অদরকারী জিনিস কেনা যেতে পারে ।
৮. গ্যাংটকের সাইট সিয়িং-এর মধ্যে সবথেকে বিখ্যাত হল রুমটেক মনাস্ট্রি । গ্যাংটক গেলে সিকিম রাজ্যের সবথেকে বড় এই মনাস্ট্রিতে অবশ্যই যাওয়া উচিৎ ।
৯. অন্যান্য সাইট সিয়িং এর মধ্যে বনজাকরি ওয়াটার ফলস্‌ আর রিজ পার্ক ফ্লাওয়ার এক্সিবিশন সেন্টারও খুব সুন্দর । এছাড়া আরও অনেক ঘোরার জায়গা আছে যেগুলোর সম্পর্কে ইন্টারনেটে জেনে নেওয়া যেতে পারে বা এখানকার হোটেলের থেকেও জানা যেতে পারে ।
১০. গ্যাংটক থেকে ডে-ট্রিপে ছাঙ্গু বা আর বাবা হরভজন সিং-এর মন্দির অবশ্যই দেখতে হবে । এখানকার উচ্চতা গ্যাংটকের দ্বিগুণেরও বেশি তাই হৃদযন্ত্র বা ফুসফুসের সমস্যা থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়েই যাওয়া উচিৎ ।
১১. এই দুটো জায়গায় গেলে নাথুলা পাস খোলা আছে কিনা জেনে নেওয়া দরকার । যদি থাকে তাহলে নাথুলাও দেখে আসতে হবে ।
১২. এই জায়গাগুলো দেখার জন্য মিলিটারির পার্মিট লাগে । এই পার্মিট পাওয়ার জন্য নিজের দু'কপি করে ফোটো আর সচিত্র পরিচয়পত্র সঙ্গে থাকতে হবে । পার্মিট জোগাড় করতে সাধারণতঃ একদিন সময় লাগে, তাই যেদিন গ্যাংটকে পৌঁছনো হচ্ছে তার পরেরদিনই এখানে যাওয়ার পরিকল্পনা না করাই ভালো ।
১৩. গ্যাংটকের তুলনায় ছাঙ্গুর তাপমাত্রা অনেক কম । বছরের মধ্যে ছ'মাস তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে থাকে । তাই উপযুক্ত গরম পোষাক সঙ্গে রাখা দরকার ।
১৪. খুব শীতের সময়ে ছাঙ্গু লেক বরফে ঢেকে যায়, সে দৃশ্যও চমৎকার । কিন্তু অনেক সময়ে রাস্তায় খুব বরফ পড়লে মিলিটারির লোকেরা এখানে যাওয়ার অনুমতি দেয় না । সেই বিষয়গুলো আগে থেকে খোঁজ নিয়ে যাওয়াই ভাল ।

উপসংহারঃ

গ্যাংটক !
যদি পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছে আর সেইসঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যের দাবী থাকে তাহলে গ্যাংটক হচ্ছে একেবারে আদর্শ জায়গা । পশ্চিমবঙ্গের উত্তরে যে জায়গাগুলো যাওয়া যায় তার মধ্যে জনপ্রিয়তার দিক থেকে দার্জিলিঙের পরেই গ্যাংটকের স্থান আর এখানে তুলনায় ভিড় কম হয় । গ্যাংটক সিকিমের রাজধানী, তাই অসম্ভব পরিচ্ছন্ন হবে তাতে আশ্চর্য্য হওয়ার কিছু নেই । কিন্তু জায়গার সঙ্গে সঙ্গে পরিচ্ছন্ন এখানকার মানুষের মন । এদের জীবনযাত্রা সচ্ছল আর তাই অন্য অনেক জায়গার মতো নোংরামি জিনিসটা এখানে একেবারেই নেই । সিকিমের আয়ের একটা প্রধান উৎস ট্যুরিজম আর সেটা এখানকার মানুষ খুব ভালোভাবে জানে । তাই এদের আতিথেয়তায় কখনও কোনও ত্রুটি দেখা যায় না । আর এই আতিথেয়তা শুধু মানুষের কাছ থেকে নয়, তার সমান প্রকাশ প্রকৃতির মধ্যেও বর্তমান । অসাধারণ সিনিক বিউটি অবারিত দ্বার খুলে প্রকৃতি যেন এখানে পর্যটকদের চুম্বকের মতো টানে । প্রকৃতি আর সভ্যতার যুগপত সেই টান অনুভব করা সম্ভব যেকোনও প্রান্ত থেকেই - শুধু নিজের মধ্যে থাকতে হবে সেই টান অনুভব করতে পারার ক্ষমতা । তাই নিজে যদি লোহা হতে পারা যায়, তাহলে এই চুম্বকের টানকে উপেক্ষা না করে বেরিয়ে পড়তে হবে পাহাড়ের চূড়া - গ্যাংটকের উদ্দেশ্য !

গ্যাংটক ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.