আমি ব্লগ লেখার খুব বেশি সমর্থক কোনওদিনও ছিলাম না, সত্যি কথা বলতে কি এখনও যে আছি তা নয় । তার একটা প্রধান কারণ আমার ধারণা ব্লগ লেখার থেকেও পড়া অনেক বেশি ক্লান্তিকর । অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অনেক সময়ই পড়তে শুরু করে শেষ করা হয়ে ওঠে না । নিজের ধৈর্য এবং/অথবা আগ্রহের অভাবকে 'ঠিক আছে, বাকিটা পরে পড়ব' জাতীয় অজুহাত দিয়ে ঢেকে দিই - আর আমরা সবাই জানি সেই 'পরে' টা আর কখনওই আসে না । তো, এই কারণে আমি ঠিক করেছি আমার ব্লগকে কখনওই অন্যের ক্লান্তির কারণ ঘটাব না, আমার ব্লগের বিষয় হবে প্রধানতঃ ভ্রমণ । আমার মতো যেসব বাঙালিরা ঘুরতে ভালোবাসে, তাদের জন্য আমার ব্লগ হবে তথ্যের একটা উৎস । আমার নিজের একটা অভ্যেস আছে, কোনও জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার আগে সেই জায়গাটা সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, আর ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে আমার বরাবরই মনে হয়েছে যে ইন্টারনেটে লেখালেখি করার ব্যাপারে বাঙালিদের থেকে কুঁড়ে খুব কম শিক্ষিত জাতই আছে । আমার মতো যেসব বাঙালিরা আছে, যারা ইন্টারনেটে কোনো একটা ইংরিজীতে লেখা দেখলেই না পড়ার চেষ্টা করে, তাদের জন্য আমার ব্লগ সহায়ক হবে, এই বিশ্বাস নিয়ে শুরু করছি আমার ভ্রমণকাহিনী । আগেই বলে রাখি, আমি স্ট্যাটিসটিক্সের ছাত্র ছিলাম, তাই আমার ব্লগে তত্ত্বের থেকে তথ্যের দেখাই মিলবে বেশি ।

Sunday, January 31, 2021

ক্ষীরাই ভ্রমণ

ক্ষীরাই জায়গাটার নাম বছরখানেক আগেও জানতাম না। বারবার লক্‌ডাউন আর আন্‌লকের অনিশ্চয়তার জেরে ৩-৪ দিনের বেড়ানোর পরিকল্পনা করা যখন খুব কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন কাছাকাছির মধ্যে কোথায় ডে-আউট ট্রিপ করা যায় সেটা খুঁজতে গিয়ে ইউটিউবে ক্ষীরাই-এর সম্পর্কে একটা ভিডিও পেলাম। ক্ষীরাই পূর্ব মেদিনীপুর জেলার একটা গ্রাম যেখানে ফুলের চাষ হয়। এখানে বহুসংখ্যক সুবিশাল আকৃতির ক্ষেত আছে, যে ক্ষেতের ফুল পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের বিভিন্ন জায়গায় রপ্তানী করা হয়। ভিডিওটা বেশ তথ্যসমৃদ্ধ আর সবটা ভালো করে দেখে এবং সেইসঙ্গে নিজে ইন্টারনেটে কিছুটা ঘাঁটাঘাঁটি করে জায়গাটা সম্পর্কে মোটামুটি জেনে ফেললাম। তারপর প্ল্যান করা আর সেই প্ল্যানের এক্সিকিউশন। গন্তব্য ক্ষীরাই - আমার ব্লগের এবারের পোস্ট।

৩১শে জানুয়ারী, ২০২১ রবিবার - সকাল ৮টা নাগাদ গাড়ি নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোলাম আমরা ছ'জন অর্থাৎ আমি, অমৃতা, বাবা, মা, কথা, কলি। যাওয়ার পথে সোনামাসিকেও তুলে নিলাম। আমাদের যাত্রাপথ বিদ্যাসাগর সেতু - কোনা এক্সপ্রেসওয়ে - এন এইচ ১৬ - পাঁশকুড়া পুরাতন বাজার রোড - বাকিটা জিজ্ঞেস করে অথবা গুগ্‌ল্‌ ম্যাপ দেখে। বিদ্যাসাগর সেতু থেকে মোট রাস্তা ৮৫ কিলোমিটার। ধুলাগোড়ীর কাছে একটা পাঞ্জাবী রেস্ট্যুরেন্ট থেকে আলুর পরোটা দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে নিলাম।

দুপুর সাড়ে বারোটার একটু পরে লোকজনকে জিজ্ঞেস করে করে আমরা অবশেষে ক্ষীরাই পৌঁছলাম। এখানে জানিয়ে রাখি, ক্ষীরাই বলতে কিন্তু বিশেষ কোনও একটা জায়গা বা ফুলের ক্ষেতকে বোঝায় না। এখানে অনেক জায়গাতেই এই ক্ষেত দেখা যায়, তবে সবথেকে বেশি বিখ্যাত যে জায়গাটা সেটা হল রেলব্রীজের নিচে। শেষের পথটা বেশ সরু, দু'টো গাড়ি পাশাপাশি চলতে বেশ অসুবিধে হয়। যাই হোক, উঁচুনীচু পথ দিয়ে আমরা গন্তব্যে পৌঁছে ... একটা বড় ধাক্কা খেলাম !

রেলব্রীজের নিচে গাড়ির মেলা
এর আগে ক্ষীরাই সম্পর্কে যা জানা ছিল তাতে জানতাম জায়গাটায় খুব বেশি লোক যায় না। আমরা গিয়ে দেখলাম হাজার হাজার লোক ! জানলাম জানুয়ারী মাসের একটা রবিবারের আনন্দবাজার পত্রিকায় ক্ষীরাই সম্পর্কে একটা লেখা বেরিয়েছে আর তাতেই অনেকে জায়গাটার সম্পর্কে জানতে পেরেছে। আর আমাদেরই মতো এই লক্‌ডাউনে দূরে কোথাও যেতে না পেরে এখানে এসে জুটেছে। যতদূর চোখ যায়, ফুলগাছের চেয়ে মানুষের সংখ্যা বেশি। রেলব্রীজের নিচে যেন মেলা বসেছে। মেলা যে শুধু মানুষের তাইই নয়, গাড়িরও। পুরো জায়গাটায় যত গাড়ি এসে উপস্থিত হয়েছে তত গাড়ি শুধু রবিবার বিকেলে কলকাতার শপিং মলের পার্কিং লটেই দেখা যায় ! আর এখানে পার্কিং ম্যানেজ করার কেউ নেই, যে যার সুবিধেমতো গাড়ি রাখছে। আমরাও সেরকমই করলাম। ব্যতিক্রমই যেখানে নিয়ম, সেখানে আলাদা করে নিয়ম মানার চেষ্টা করা বৃথা (এটা দারুণ দিলাম, তাই না ? এটা একেবারে মৌলিক - আমার নিজস্ব - কপিরাইট প্রোটেক্টেড !)।

রেলব্রীজের পাশে গাঁদাফুলের ক্ষেত
রেলব্রীজটা আসলে কংসাবতী নদীর উপরে যদিও এখন নদীতে জল নেই। নদীর উপরেও অনেকে গাড়ি পার্কিং করেছে, ফেরিওয়ালারা নানারকম জিনিস নিয়ে বসে গেছে। রেলব্রীজের নিচ দিয়ে ব্রীজটা পেরিয়ে গেলে কয়েকটা বিশাল গাঁদাফুলের ক্ষেত রয়েছে, কিন্তু ভীড় দেখে আমরা আর সেদিকে এগোলাম না। বরং স্থানীয় লোকের কাছে জানা গেল এখান থেকে মিনিট দশেকের টোটো দূরত্বে আরেকটা এরকম বড় ক্ষেত রয়েছে, সেখানে চাইলে যাওয়া যেতে পারে। আমরা হেঁটে নদী পেরিয়ে ওপারে গিয়ে একটা টোটো ধরে গেলাম সেই ক্ষেতে।

চন্দ্রমল্লিকার ক্ষেত
এই ক্ষেতটা বিশেষ করে চন্দ্রমল্লিকার। সাদা হলুদ কমলা সবুজ ইত্যাদি নানারঙের চন্দ্রমল্লিকার দিগন্তবিস্তৃত ক্ষেত। এর মধ্যে সাদাটাই বেশি। দেখে মনে হয় সুবিশাল মাঠের মধ্যে যেন বরফ পড়েছে। এই ক্ষেতের মধ্যে ঢুকে গিয়ে ফুলের গায়ে হাত দিতে বারণ নেই, তবে সেটা না দেওয়াই ভালো। ক্ষেতের মধ্যে বাঁশের বেড়া দিয়ে পাঁচিল করা রয়েছে, তার মধ্যে দিয়ে হাঁটার পথ। আমরা হেঁটে হেঁটে ক্ষেতের অনেকটা ভিতরে চলে গেলাম। এখানেও লোকজনের সংখ্যা খুব কম নয়, তবে অনেকটা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ফুলের ক্ষেতের মধ্যে কয়েকটা স্থানীয় বাচ্চা ছেলেমেয়ে ফুলের মুকুট বিক্রি করছে। সরু তার দিয়ে ফুল গেঁথে তৈরি, দাম ১০/- টাকা। আমরা কয়েকটা কিনলাম।

ফুলের ক্ষেতে ফুলের মুকুট পরে ফুলেরা আর ফুলকি
ফুলের ক্ষেতে আমরা আরও কিছুক্ষণ কাটালাম, তবে এর বিবরণ আলাদা করে দেওয়ার আর কিছু নেই। ক্ষেতগুলো সব একইরকম, ফুলগুলো আলাদা। আরও কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে একজায়গায় দেখলাম ক্ষেতের মধ্যেই একটা ছাউনি ধরনের করে সেখানে একটা অস্থায়ী ভাতের হোটেল খুলে ফেলেছে। ক্ষীরাই এর ফুলের ক্ষেতের মধ্যে খাবারের ব্যবস্থা কিছুই নেই, তাই আমরা এখানেই দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। রান্না বেশ ভালো। ভাত, ডাল, ডিমের কারি, চিকেন ইত্যাদি নিয়ে খরচ হল ৩৫০/- টাকা।

রেললাইনের উপরে
খাওয়ার পরে আমরা আরও কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে টোটো ধরে রেলব্রীজের নিচ পর্যন্ত ফিরে এলাম। এই রাস্তাটায় কিছু গাড়ি নিয়ে চলাচল করা একেবারেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না কারণ এখানে রাস্তা পিচের নয় আর একটামাত্র গাড়িই চলাচল করতে পারে। উল্টোদিক থেকে একটা বাইক এসে গেলেও রাস্তায় যানজট হয়ে যাবে। রেলব্রীজের নিচে পৌঁছে আমি, কথা আর কলি একবার ব্রীজের উপরটা ঘুরে এলাম। এখানে পাশেই দক্ষিণপূর্ব রেলওয়ের ক্ষীরাই স্টেশন। এই লাইনে বেশ ঘনঘন ট্রেন চলাচল করে, কয়েকটা ট্রেন দেখারও সুযোগ হয়ে গেল।

দুপুর সাড়ে তিনটে বাজে, ক্ষীরাইতে আর কিছু করার নেই তাই আমরা গাড়ি নিয়ে ফেরার পথ ধরলাম। যে পথে যাওয়া, সেই পথেই ফেরা। ফেরার পথে কোলাঘাট পেরোনোর একটু পরে একজায়গায় দাঁড়িয়ে একটু চা খেয়ে নেওয়া হল। তারপর আবার বাড়ি ফেরার পথ ধরলাম।

সারসংক্ষেপঃ

১. কলকাতা থেকে ৮৫ কিলোমিটার দূরে পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় পাঁশকুড়ার কাছে একটা গ্রাম ক্ষীরাই। ফুলচাষ ও ফুলের রপ্তানীর জন্য এই গ্রাম বিখ্যাত।
২. ক্ষীরাই যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় হল ফ্রেব্রুয়ারীর মাঝামাঝি থেকে মার্চের মাঝামাঝি। এই সময়ে এখানকার ক্ষেতে অন্যান্যফুলের সঙ্গে গোলাপও দেখা যায়।
৩. গাড়ি করে যাওয়ার রাস্তা হল বিদ্যাসাগর সেতু - কোনা এক্সপ্রেসওয়ে - এন এইচ ১৬ - পাঁশকুড়া পুরাতন বাজার রোড। শেষের পথটা গুগ্‌ল্‌ ম্যাপ দেখে বা স্থানীয় লোককে জিজ্ঞেস করে যেতে হবে। 
৪. ট্রেনে গেলে হাওড়া থেকে দক্ষিণ-পূর্ব রেলওয়ের লোক্যাল ট্রেন ধরে (এক্সপ্রেস ট্রেন এখানে থামে না) পাঁশকুড়ার পরের স্টেশন ক্ষীরাইতে নামতে হবে। হাওড়া থেকে ক্ষীরাই ট্রেনে ১ঃ৫০ মিনিট সময় লাগে।
৫. গাড়ি অথবা ট্রেন যাতেই যাওয়া হোক, ঘুরে ঘুরে ফুলের ক্ষেত দেখার জন্য টোটো ভাড়া করে নেওয়াই ভালো। তাতে আরেকটা সুবিধে এই যে টোটোর ড্রাইভাররা ফুলের ক্ষেতের জায়গাগুলো ভালোভাবে চেনে।
৬. ক্ষীরাইতে নানারকম ফুলের বাগান আছে, যার মধ্যে গাঁদা আর চন্দ্রমল্লিকার প্রাধান্য বেশি। এখানে বিভিন্ন ফুলগাছের চারা বিক্রিও হয়।
৭. ক্ষীরাইতে খাওয়াদাওয়ার বিশেষ কোনও জায়গা নেই, তাই সঙ্গে অবশ্যই কিছু শুকনো খাবার রাখা উচিৎ। ছুটির দিনে ভিড় বেশি হলে এখানে কিছু অস্থায়ী খাবারের ব্যবস্থা হয় ঠিকই, কিন্তু তার উপর নির্ভর না করাই ভালো।

উপসংহারঃ

ক্ষীরাই
কলকাতার বেশ কাছে একটা ছোটখাটো ডে-আউট প্ল্যানের জন্য ক্ষীরাই বেশ ভালো একটা জায়গা। নানারকমের ফুলের ক্ষেতের সমারোহে জায়গাটায় একটা নয়নাভিরাম ব্যাপার আছে, সেটা বলতেই হবে। দিগন্তবিস্তৃত জমিতে যতদূর দু'চোখ যায়, মনে হয় নানারঙের চাদর বিছানো রয়েছে। যদিও এখানকার সৌন্দর্য প্রকৃতির স্বাভাবিক সৃষ্টি নয়, বরং বলা যায় প্রকৃতির দাক্ষিণ্যে মানুষের সৃষ্টি, কিন্তু তাও এখানকার সৌন্দর্য বিশেষ মনোরম। ক্ষীরাইতে অনেককিছু দেখার আছে তা নয়, তবে ঘোরাঘুরি করে সারাদিনটা বেশ কেটে যায়। গাড়িতে বা ট্রেনে যেভাবেই যাওয়া হোক, যাতায়াতের রাস্তাটাও বেশ সুন্দর। করোনার লক্‌ডাউনের মধ্যে বাড়িতে বসে থাকার একঘেয়েমি কাটানোর জন্য এখানে যাওয়া যেতেই পারে। আর করোনা পরবর্তী সময়েও এখানে একটা দিন কাটাতে ভালো লাগবে বলেই আমার ধারণা। তবে রবিবার বা ছুটির দিনগুলো এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করাই ভালো, কারণ 'মানুষ' জীবটা যতই প্রকৃতির সৃষ্টি হোক, ফুলের ভীড়ের মাঝে তাদের ভীড়টা শুধু অনভিপ্রেতই নয়, বিরক্তির উদ্রেককারীও বটে !

ক্ষীরাই ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Friday, January 22, 2021

কলকাতা ভ্রমণ : পর্ব - ৩ (বটানিক্যাল গার্ডেন)

'আচার্য্য জগদীশ চন্দ্র বোস ভারতীয় উদ্ভিদ উদ্যান' বা 'বটানিক্যাল গার্ডেন' জায়গাটা ভৌগলিকভাবে যদিও কলকাতার মধ্যে পড়ে না, কিন্তু কলকাতা ও হাওড়াকে একসঙ্গে যমজ শহর বলা হয় অর্থাৎ যা এখানকার তাইই ওখানকার । সেই কারণে বটানিক্যাল গার্ডেন ভ্রমণের কথা কলকাতা ভ্রমণের মধ্যেই লিখছি । হাওড়া জেলার শিবপুরে অবস্থিত এই বটানিক্যাল গার্ডেন ভারতবর্ষের মধ্যে শুধু বৃহত্তমই নয়, প্রাচীনতমও বটে । জায়গাটা আমার মাসির বাড়ির খুব কাছে হওয়ায় ছোটবেলায় বেশ কয়েকবার গিয়েছি । তারপর যা হয় - বড় হওয়ার পরে সেভাবে কখনও যাওয়া হয়ে ওঠেনি । করোনা পরিস্থিতির মধ্যে যখন ডে-আউট ট্রিপের মাধ্যমে নিজের শহরটাকে আরেকটু ভালোভাবে দেখে নেওয়ার কথা ভাবলাম, তখন সেই লিস্টে ওপরের দিকেই রাখা হল বটানিক্যাল গার্ডেনের নাম ।

গেট দিয়ে ভিতরে ঢোকার পর
২২শে জানুয়ারী, ২০২১ শুক্রবার । দুপুর বারোটা নাগাদ আমি, অমৃতা, বাবা, মা আর কথা-কলি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে বটানিক্যাল গার্ডেন পৌঁছলাম তখন সাড়ে বারোটা । গুগ্‌ল্‌ ম্যাপের যুগে পথনির্দেশ দেওয়া নিষ্প্রয়োজন শুধু এইটুকু জানিয়ে রাখি নিজেদের গাড়ি নিয়ে গেলে পার্কিং-এর জন্য বটানিক্যাল গার্ডেনের ১ নং গেটে যেতে হবে । কলকাতা থেকে গেলে দ্বিতীয় হুগলী সেতু পেরিয়ে আন্দুল রোড ধরে শিবপুরের ইন্ডিয়ান ইনিস্টিটিউট অফ্‌ ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (পূর্বতন শিবপুর বি ই কলেজের)-এর সামনে দিয়ে গিয়ে ১ নং গেটে গাড়ি পার্কিং করার জায়গা । এখানে ৫০ টাকা দিয়ে সারাদিনের জন্য গাড়ি পার্কিং করা যায় । পার্কিং করে আমরা ভিতরে ঢোকার টিকিট কাটলাম । টিকিটের দাম মাথাপিছু ১০/- টাকা (বাচ্চাদের টিকিট লাগে না)।

এখানে আরও একটা দরকারী তথ্য জানিয়ে রাখি । বটানিক্যাল গার্ডেন ভালোভাবে ঘুরে দেখতে কমপক্ষে ৪ - ৫ ঘন্টা সময় লাগে, তাই সঙ্গে খাবারদাবার ও পর্যাপ্ত পরিমাণ পানীয় জল রাখা ভালো কারণ ভিতরে এইদু'টোর কোনওটারই ব্যবস্থা নেই । গতবছরের আমফানের ফলে ভিতরের জল সরবরাহব্যবস্থা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বর্তমানে এখানে হাতধোওয়ার নূন্যতম জলের যোগানও নেই । যদিও বটানিক্যাল গার্ডেনের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে ভিতরে খাবার নিয়ে ঢোকার নিয়ম নেই, কিন্তু আমরা গেটের সিকিউরিটি গার্ডকে জিজ্ঞেস করেই সঙ্গে খাবার নিয়ে ঢুকেছি । ভিতরে বসে স্বচ্ছন্দে খাবার খাওয়া যেতে পারে, তবে এইটুকু খেয়াল রাখতেই হবে কোনওভাবেই যেন ভিতরের পরিবেশ নোংরা না হয় । আরও একটা কথা - রবিবার বা ছুটির দিনে এখানে কিছুটা ভীড় হয়, তাই সেরকম বাদ দিয়ে যেতে পারলে ঘুরতে সুবিধে হবে বলে আমার ধারণা ।

বটানিক্যাল গার্ডেনের ভিতরে
বটানিক্যাল গার্ডেনের ভিতরে ঘোরার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ করে দিচ্ছি না কারণ গাছপালা লতাগুল্ম ছোটবড় লেক জলাশয় বাগান গ্রিন হাউস মিলিয়ে ভিতরটা সবকিছুর একটা সাড়ে বত্রিশভাজা যেখানে এ বলে আমার দ্যাখ, ও বলে আমায় দ্যাখ ! আমি বটানির ছাত্র নই, আমাদের চারপাশের কিছু পরিচিত গাছপালার বাইরে খুব বেশি কোনও গাছ চিনি না কিন্তু আমি গাছ খুব ভালোবাসি আর সেই কারণে বটানিক্যাল গার্ডেনের পরিবেশ আমার কাছে খুবই চিত্তাকর্ষক । ভিতরের রাস্তা খুবই পরিপাটি আর জায়গায় জায়গায় টাঙানো ম্যাপ দেখে এগোতে কোনওই অসুবিধে হয় না । বিশেষ কিছু দেখার উদ্দেশ্যে নয়, পুরো জায়গাটা শুধু হাঁটতেই খুব ভালো লাগে (ভিতরে এমনিতেও কোনও যানবাহনের ব্যবস্থা নেই, কাজেই ঘোরার একমাত্র উপায় হল হাঁটা !)।

বিশাল বটবৃক্ষ (প্যানোরমিক ভিউ)

তবে একেবারে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে হাঁটা নয়, বটানিক্যাল গার্ডেনে এসে এখানকার বিখ্যাত 'বিশাল বটবৃক্ষ'টা দেখার আগ্রহ আমার সবসময়েই থাকে । যারা জানে না, তাদের উদ্দেশ্যে জানাচ্ছি বটানিক্যাল গার্ডেনের এই সুবিশাল বটগাছটা পৃথিবীর সবথেকে বড় বটগাছ । প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো এই গাছের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এর বিপুল সংখ্যক বায়বীয় মূল বা এরিয়াল রুট (উইকিপিডিয়া অনুযায়ী বর্তমানে এই মূলের সংখ্যা ৩,৭৭২)। পরপর দু'টো ঘূর্ণিঝড়ে এর মূল কান্ড ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার পর ১৯২৫ সালে এই মূল কান্ডটাকে সরিয়ে ফেলা হয় । কিন্তু তারপরেও গাছটি অনায়াসে বেঁচে রয়েছে এবং নিজের শাখা-প্রশাখা ও মূল বিস্তার করে চলেছে । দর্শকরা যাতে গাছের একেবারে কাছে যেতে না পারে সে'জন্য এই গাছের চারদিকে একটা লোহার জালঘেরা পাঁচিল করে দেওয়া হয়েছে এবং সেই পাঁচিলের চারদিকে একটা হাঁটার রাস্তা রয়েছে যার দৈর্ঘ্য ৩৩০ মিটার । গাছ অবশ্য এই পাঁচিলের বাইরেও নিজের ডালপালা বিস্তার করে চলেছে । দূর থেকে গাছটাকে একটা গাছের বদলে একটা ছোটখাটো বন বলে মনে হয় । আমরা গাছের কাছে গিয়ে ভালোভাবে দেখলাম ও ছবি তুললাম । বটানিক্যাল গার্ডেনে যাওয়ার একটা প্রধান আকর্ষণ যে এই 'বিশাল বটবৃক্ষ' দর্শন সেটা অস্বীকার করব না ।

গোলাপ বাগান
বটগাছ দর্শনের পরে ডানদিকে সামান্য কিছুটা এগোলে একটা ঘেরা জায়গায় গোলাপের বাগান । লাল, গোলাপী, হলুদ, সাদা ইত্যাদি নানারঙের গোলাপের এক অপূর্ব সমারোহ এই বাগান । এখানেও অত্যুৎসাহী জনতাকে ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হয় না, তাই বাইরে থেকে দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে ।





এই গোলাপ বাগানের কাছেই রাস্তার ধারে একটা জায়গায় বসে আমরা সঙ্গে আনা লুচি, আলুরদম, সীতাভোগ, মিহিদানা দিয়ে আমাদের দুপুরের খাওয়া সেরে নিলাম । এখানে জায়গায় জায়গায় ডাস্টবিন রয়েছে, তাই খাওয়ার পর আবর্জনা ফেলার জায়গার অভাব নেই । তাই আবারও বলছি যেখানে সেখানে জিনিস ফেলে নোংরা করা একেবারেই চলবে না ।

বটানিক্যাল গার্ডেন থেকে গঙ্গার দৃশ্য
খাওয়ার পরে আবার হাঁটতে শুরু করলাম । এবারে আমাদের উদ্দেশ্য গঙ্গার ধারে যাওয়া । বটগাছটা বাগানের একদিকে আর গঙ্গার ধারটা অন্যদিকে । এই দুইয়ের ব্যবধানটা হেঁটে মেটাতে আমাদের লাগল প্রায় চল্লিশ মিনিট । গঙ্গার ধারে বসার কয়েকটা জায়গা আছে, সেখানে আমরা কিছুক্ষণ বসে রইলাম । বিকেল পৌনে চারটে বাজে, সূর্য পশ্চিম আকাশে গিয়ে আজকের মতো দিনের ইতি ঘোষণা করার তোড়জোড় শুরু করেছে । গঙ্গার ওপরে আমাদের সামনে দিয়ে একটা লঞ্চ চলে গেল । ওপারে কলকাতার মেটিয়াবুরুজ এলাকায় কারখানার চিমনি থেকে ধোঁওয়া বেরোচ্ছে । আমরা যেখানে বসে আছি সেখানে গাছের পাতার শিরশির শব্দ আর পাখির ডাক ছাড়া কোনও অপ্রাকৃতিক শব্দ নেই । এই পরিবেশে চুপচাপ বসে বসে প্রকৃতির শোভা উপভোগ করতে খুব ভালো লাগে - মনটা চলে যায় কোনও এক সুদূর অতীতে - মনের মণিকোঠায় ঘুরেফিরে আসে কতই না পুরনো স্মৃতি !

ফেরার পথে
সম্বিৎ ফিরল (না এটা বাড়াবাড়ি হয়ে গেল, অতও কিছু আত্মনিমগ্ন হয়ে পড়িনি !) সিকিউরিটি গার্ডদের ডাকাডাকিতে । বটানিক্যাল গার্ডেন পাঁচটায় বন্ধ, চারটে থেকেই এরা লোকজনকে তাড়িয়ে বের করার কাজ শুরু করে । এত বড় জায়গায় এ'ছাড়া আর উপায় নেই । আমরা এদের সঙ্গে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করে বেরোনোর পথ ধরলাম । গঙ্গার ধারে যেখানে বসেছিলাম সেখান থেকে ১ নং গেটে পৌঁছতে আমাদের প্রায় আধঘন্টা সময় লাগল ।

বাগানের সময়সূচী
গেটের ঠিক পাশেই বাগান খোলা-বন্ধের সময়ের একটা ফলক লাগানো আছে । সময়ের তালিকাটা লেখার মধ্যে দেওয়ার বদলে এখানে সেই ফলকেরই একটা ছবি দিয়ে দিলাম (যদি কেউ বাংলা না পড়তে পারে তাহলে অন্ততঃ সে হিন্দী বা ইংরিজীতে বাগানের সময়সীমাটা দেখে নিতে পারবে যদিও বাংলা না পড়তে পারলে ব্লগটা পড়তে পারবে কিনা সেই নিয়ে আমার সন্দেহ আছে !)।


উপসংহারঃ

বটানিক্যাল গার্ডেন
১৭৮৭ সালে তৈরি এই বটানিক্যাল গার্ডেন প্রাথমিকভাবে মূলতঃ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে তৈরি হলেও পরবর্তীকালে জায়গাটা দেশবিদেশের গাছের সংগ্রহশালায় পরিণত হয় । বর্তমানে পৃথিবীর সাতটি মহাদেশের সবক'টির কিছু কিছু গাছের নমূনা রয়েছে এই বটানিক্যাল গার্ডেনে । শুধুমাত্র পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বটবৃক্ষের জন্য নয়, এই বটানিক্যাল গার্ডেনের সৌন্দর্য এর অসাধারণ প্রাকৃতিক পরিবেশে । গাছপালা লতাগুল্ম সম্বলিত এত সুবিশাল পরিবেশ আমাদের চারপাশে দুর্লভ - বিশেষ করে আমরা যারা শহরের 'জাংগল অফ্‌ কনক্রিট'-এর মধ্যে থাকি । কনক্রিটের জঙ্গল ছেড়ে উদ্ভিদের এই জঙ্গলে কয়েক ঘন্টা কাটানো আমাদের কাছে তাই এক অসামান্য অভিজ্ঞতা । যেদিকেই তাকানো যায়, শুধু সবুজের সমারোহ - চোখের পক্ষে এক অত্যন্ত আরামদায়ক অনুভূতি । এই অনুভূতির টানেই যাওয়া - প্রকৃতির হাতে কয়েকঘন্টার জন্য নিজেকে সঁপে দেওয়ার টান । এই টানটা যারা অনুভব করে, তাদের জন্য বটানিক্যাল গার্ডেন অবশ্য গন্তব্য !

বটানিক্যাল গার্ডেন ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Sunday, January 10, 2021

কলকাতা ভ্রমণ : পর্ব - ২ (স্বামীনারায়ণ মন্দির)

শ দিন আগে নতুন বছর শুরু হয়েছে । আমাদের রাজ্যে তথা দেশে লক্‌ডাউন না থাকলেও করোনার অতিমারী পরিস্থিতি বর্তমান । এই পরিস্থিতিতে কোথাও বেড়াতে গিয়ে রাত্রিযাপন নিরাপদ নয় (যদিও চারপাশে অনেককেই এটা করতে দেখছি । সৌভাগ্যের বিষয় সেরকম কারুর সামাজিক সংস্পর্শে এখনও পর্যন্ত আমাকে আসতে হয় নি !), তাই আমরা ঠিক করেছি আপাতত শুধু ডে-আউট ট্রিপ করব । আর সেটা করার জন্য আমাদের প্রিয় শহর কলকাতার চেয়ে উপযুক্ত কিছু আছে কি ? তাও ভাবতে অবাক লাগে যে কলকাতা ভ্রমণের দ্বিতীয় পর্ব আজ লিখতে বসেছি, সেই কলকাতা ভ্রমণের পর্ব ১ লিখেছিলাম আজ থেকে প্রায় সাত বছর আগে ! সত্যিই, আমাদের এই প্রিয় শহরটার কত কি যে আজও আমাদের দেখা বাকি । এইরকম অদেখা দ্রষ্টব্যের লিস্টে একটা টিক্‌ দেওয়ার জন্য আমাদের এবারের সংক্ষিপ্ত ভ্রমণ - স্বামীনারায়ণ মন্দির ।

১০ই জানুয়ারী ২০২১, রবিবার । দুপুরের খাবার খেয়ে বাড়ি থেকে গাড়ি নিয়ে বেরোলাম আমি, অমৃতা, বাবা, মা আর কথা-কলি । কলকাতা থেকে ডায়মন্ড হারবার রোড ধরে জোকা পেরিয়ে অল্প কিছুদূর গেলেই স্বামীনারায়ণ মন্দিরের অবস্থান - আমাদের বাড়ি থেকে দূরত্ব ২৮ কিলোমিটারের মতো (রাজভবন থেকে দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার) । পৌঁছতে লাগল ঠিক এক ঘন্টা ।

পার্কিং লট থেকে স্বামীনারায়ণ মন্দির
স্বামীনারায়ণ মন্দিরটা ডায়মন্ড হারবার রোডের উপরেই । গেট দিয়ে ঢুকে সুবিশাল পার্কিংলটে ৪০ টাকা দিয়ে গাড়ি রেখে আমরা মন্দিরের দিকে গেলাম । শীতকালের রবিবার বিকেল - তাই মন্দিরে ভীড় হয়েছে ভালোই । তবে চত্বরটা বিশেষ বড় হওয়ায় আর লোকসমাগম প্রচন্ডরকমের না হওয়ায় ঠাসাঠাসিটা হয়নি । পার্কিং লট থেকে মন্দিরে যাওয়ার পথে চোখে পড়ল এখানকার খাবারের জায়গা । 


এখানে সেইসঙ্গে একটা তালিকা চোখে পড়ল যেটা আমি এর আগে কখনও কোনও মন্দিরে দেখিনি । তালিকাটা হল গো-পালনের অর্থদানের । সেই তালিকা অনুযায়ী সবচেয়ে কম একটি গরু একদিন পালনের জন্য দানের অর্থ ৫০০/- থেকে সবচেয়ে বেশি ২৫টি গরু একবছর পালনের জন্য ২১ লক্ষ টাকা দেওয়া যেতে পারে (আমি নিশ্চিত এর বেশিও দেওয়া যায় !)। 

মন্দিরের সামনের চত্বর
খাবারের জায়গাটা পেরিয়ে মূল মন্দিরের দিকে এগিয়ে গেলাম । পুরো জায়গাটা খোলামেলা হওয়াতে সুবিশাল মন্দিরটা সব জায়গা থেকেই দেখা যায় । মন্দিরের সামনে একটা বিরাট মার্বেলের চত্বর, সেখানে লোকজন ইতস্ততঃ ঘোরাঘুরি করছে । মূল মন্দিরে ছবি তোলা নিষেধ, তাই এখানে দাঁড়িয়ে মন্দিরকে ডাইনে বাঁয়ে ওপরে নিচে রেখে বা আদৌ না রেখে নানারকম অ্যাঙ্গেলে লোকজন ছবি বা সেল্‌ফি বা গ্রুপফি তুলছে । এখানে বসার জায়গা নেই, তবে চত্বরের দু'পাশে ইঞ্চিআটেক উঁচু আর ফুটখানেক চওড়া ছোট্ট পাঁচিলের মতো করা আছে, সেখানে চাইলে বসা যেতে পারে ।

মন্দিরে ওঠার সিঁড়ি
এই চত্বরটা যেখানে গিয়ে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে মূল মন্দিরের ওঠার সিঁড়ি । এখানে ওঠার আগে অবশ্যই জুতো খুলতে হয় আর এখান থেকেই ছবি না তোলার এলাকা শুরু । পুরো জায়গাটায় প্রচুর সংখ্যক সিকিউরিটি গার্ড আর সেইসঙ্গে মন্দিরের কর্মীরা রয়েছেন, তাই কারুর চোখকে ফাঁকি দিয়ে কিছু করার চেষ্টা না করাই ভালো ! আমরা সিঁড়ি দিয়ে মূল মন্দিরের উপরে উঠলাম । উপর থেকে চারপাশের দৃশ্য খুবই সুন্দর । পুরো জায়গাটা ফাঁকা হওয়াতে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায় । বিকেল পৌনে পাঁচটা বাজে, এখান থেকে অস্তগামী সূর্যের দৃশ্যও বেশ ভালো লাগল ।

এখানে পাশাপাশি তিনটে প্রকোষ্ঠে তিনরকম মূর্তি রয়েছে । একটাতে ভগবান স্বামীনারায়ণ ও অক্ষরব্রাহ্মণ গুণতিআনন্দ স্বামী, একটাতে শ্রী ঘনশ্যাম মহারাজ আর তৃতীয়টায় শ্রী হরিকৃষ্ণ মহারাজ ও শ্রী রাধাকৃষ্ণদেব । মূর্তিগুলো খুব সুন্দরভাবে কারুকার্য করা আর সাজানো । আমরা কিছুক্ষণ এখানে দাঁড়িয়ে আবার সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলাম ।

করোনা পরিস্থিতির জন্য কিনা জানি না, তবে মন্দির কর্তৃপক্ষ পুরো জায়গাটায় একমুখী জনতার স্রোত বজায় রেখেছে । অর্থাৎ আমরা যেদিক দিয়ে মন্দিরে উঠেছিলাম, সেদিক দিয়ে নামলাম না । নিচে নেমে বেরোনোর পথ মন্দিরের ভিতর দিয়ে । এখানে ভিতরের দেওয়ালে স্বামীনারায়ণ মহারাজের জীবনের নানারকম ঘটনাবলীর আঁকা ছবি টাঙানো রয়েছে । ঘরের মাঝখানে একটা কাচের ঘরের মধ্যে নীলকান্ত বর্ণির (ওরফে স্বামীনারায়ণ) একটা সোনার মূর্তি রয়েছে । এই ঘর ঘিরে দর্শনার্থীদের ভিড় রয়েছে । তাছাড়া এখানে মন্দির, স্বামীনারায়ণ ইত্যাদির সম্পর্কে বইও পাওয়া যায় । এখানেও ছবি তোলা নিষেধ, তাই আমরা কিছুক্ষণ দেখে বেরিয়ে এলাম ।

এখানে জানিয়ে রাখি মন্দির খোলা থাকার সময় সকাল ৭ঃ৩০ থেকে দুপুর ১২ টা এবং বিকেল ৪ টে থেকে রাত ৮ঃ১৫ । কিন্তু এর মাঝেও বিভিন্ন সময়ে মন্দির দর্শনের জন্য বন্ধ থাকে, তাই যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে মন্দিরের ওয়েবসাইট থেকে দর্শনের সময়টা জেনে নিয়ে যাওয়াই ভালো । বর্তমান সময়সূচীটা আমি এখানে দিয়ে দিলাম (সৌজন্যে মন্দিরের ওয়েবসাইট)।










সন্ধ্যের আলোয় স্বামীনারায়ণ মন্দির
মন্দিরের সামনের চত্বরে পৌঁছে আমরা আরও কিছুক্ষণ বসে রইলাম । সন্ধ্যে হয়ে গেছে, মন্দিরের আলোগুলো সব জ্বলে গেছে । এইসময়ে মন্দিরটা দেখতে বেশ সুন্দর লাগে । তাই যদি মন্দিরে বিকেলের দিকে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকে, তাহলে সন্ধ্যে পর্যন্ত অপেক্ষা করে তারপর বেরোলেই ভালো লাগবে । সন্ধ্যে ছ'টা নাগাদ আমরা মন্দির থেকে বেরিয়ে পড়লাম ।



উপসংহার ঃ

স্বামীনারায়ণ মন্দির
ঐতিহাসিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ না হলেও স্থাপত্যের নিদর্শন হিসেবে কলকাতার দর্শনীয় জায়গাগুলোর মধ্যে অন্যতম স্বামীনারায়ণ মন্দির । এর ভৌগোলিক অবস্থান এই জায়গাকে কিছু স্বাভাবিক বাড়তি সুবিধে দিয়েছে । নিজের গাড়ি নিয়ে গেলে যেমন এখানে পার্কিং-এর সুব্যবস্থা আছে, তেমনই পাবলিক ট্রান্সপোর্টে গেলে মন্দিরের গেটের একেবারে সামনে পর্যন্ত পৌঁছনোর সুবিধেও রয়েছে । এই মন্দিরের সবকিছুই ভীষণভাবে নিউ দিল্লীর অক্ষরধাম স্বামীনারায়ণের মন্দিরকে মনে করিয়ে দেয়, যদিও ওখানে কিছু বাড়াবাড়ি আছে যেগুলো এখানে নেই । এখানে না গেলে যে বিরাট কিছু অদেখা থেকে যাবে এমন নয়, কিন্তু সময় করে একদিন দেখে এলে ভালই লাগবে । পুরো জায়গাটা ঘুরে দেখতে ঘন্টাখানেকের বেশি লাগবে না আর আমার মনে হয় স্বামীনারায়ণ মন্দির আমাদের সে'টুকু সময় লগ্নি করার যোগ্য !

স্বামীনারায়ণ মন্দিরের নিজস্ব ওয়েবসাইট https://www.baps.org/Global-Network/India/Kolkata.aspx থেকে এখানকার সম্পর্কে আরও তথ্য জানা যেতে পারে ।

Saturday, September 12, 2020

বক্‌খালি ভ্রমণ (দ্বিতীয়বার)

প্রথমেই বলি বক্‌খালি ভ্রমণ সম্পর্কে নতুন করে লেখাটা আমার কাছে একটা বিশেষ ঘটনা কারণ আজ থেকে দশ বছর আগে বক্‌খালি ভ্রমণের অভিজ্ঞতা দিয়েই আমার এই ভ্রমণ ব্লগের জন্ম হয়েছিল । চলতি বছরটা আমার ব্লগের দশ বছর পূর্তির বছর । আর সেদিক থেকে দেখতে গেলে এই 'ভরসাফুর্তি' (বর্ষপূর্তি) উদ্‌যাপন করার জন্য বক্‌খালি ভ্রমণের থেকে ভালো আর কিছু হতেই পারত না (না, আমার কাউকে খাওয়ানোর কোনও পরিকল্পনা নেই, দুঃখিত !)।

আমার গতবারের বক্‌খালি ভ্রমণ সম্পর্কে পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করতে হবে । এ'বারেরটা পড়ার আগে আগেরবারেরটা পড়ে নিলে ভালো হবে বলে আমার মনে হয় ।

২০১০ থেকে ২০২০ - দশ বছর । অনেকটা সময় । এই সময়ের মধ্যে আমাদের রাজ্যে সরকার থেকে আমার নিজের রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস - বদলে গেছে অনেক কিছুই । স্বয়ং আমিই বদলে গেছি ! সেইসঙ্গে বদলে গেছে বক্‌খালি ভ্রমণের ভ্রমণসঙ্গী । গতবার আমরা গিয়েছিলাম ছ'জন বন্ধু আর এ'বারে আমার সঙ্গে অমৃতা, বাবা, মা, কথা, কলি আর আমার বড়মাসি । গতবার বক্‌খালি ভ্রমণ ছিল 1N/2D আর এবারে ডে-আউট ।

যাওয়ার পথে
১২ই সেপ্টেম্বর ২০২০, শনিবার । রাজ্যে এবং দেশে করোনা ভাইরাসের অতিমারী পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য 'আন্‌লক' প্রক্রিয়া কিছুদিন হল শুরু হয়েছে । এরই মধ্যে আমরা বেরিয়ে পড়লাম আমাদের গাড়ি নিয়ে সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ । কলকাতা থেকে বক্‌খালি দু'রকম রাস্তা দিয়ে যাওয়া যায় - একটা ই এম বাইপাস - কামালগাজী - বারুইপুর - আমতলা হয়ে আর অন্যটা খিদিরপুর - ডায়মন্ড হারবার রোড - বেহালা - আমতলা হয়ে । আমার মনে হয় দ্বিতীয়টা দিয়ে যাওয়া বাঞ্ছনীয় কারণ এতে সময় কম লাগে । আমরা বেহালার কাছে একটা মিও আমোরে থেকে স্যান্ড-উইচ্‌ ইত্যাদি কিনে নিলাম সকাল ও সন্ধ্যের জলখাবারের জন্য । তারপর আরও কিছুক্ষণ চলার পরে সাড়ে দশটা নাগাদ রাস্তায় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে সেগুলোর সদ্ব্যবহার করে ফেললাম ।

রাস্তা সম্পর্কে একটা জরুরি তথ্য এখানে দেওয়া দরকার । ডায়মন্ড হারবার রোড ধরে চলতে চলতে শিরাকোলের কাছে রাস্তাটা দু'ভাগে ভাগ হয়ে গেছে - ডানদিকে চলে গেছে ডায়মন্ড হারবার রোড আর সোজা চলে গেছে উস্থি রোড । গুগল্‌ ম্যাপ বলে এই উস্থি রোড ধরে যাওয়ার জন্য কারণ এতে সময় সামান্য কিছুটা কম লাগে আর দূরত্ব অনুযায়ীও এটা প্রায় ৮ কিলোমিটার কম । কিন্তু এই রাস্তার প্রধান সমস্যা হল এটা জনবহুল, কিছু জায়গায় ভাঙাচোরা এবং উস্থি বাজারের কাছে বিশেষ যানজটসঙ্কুল । এই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার পথে ডায়মন্ড হারবার পড়ে না । প্রায় ১৮ কিলোমিটার চলার পর এই রাস্তা আবার রাজ্যসড়ক ১২ এর সঙ্গে মিলিত হয়, সেখান থেকে রাস্তা আবার সুন্দর । আমরা যাওয়ার সময়ে এই রাস্তা দিয়ে গেলেও ফেরার পথে ডায়মন্ড হারবার হয়েই ফিরেছি ।

নামখানা ব্রীজ থেকে হাতানিয়া-দোয়ানিয়া নদী
সাড়ে এগারোটা নাগাদ পথে নামখানা ব্রিজ পড়ল । আগেরবার যখন গিয়েছিলাম তখন এই ব্রিজ তৈরি হয়নি, ভেসেলে করে নদী পার হতে হত । গত বছর থেকে এই ব্রিজ চালু হয়েছে, এখন গাড়ি ব্রিজের সাহায্যের পারাপার করে । ব্রিজটা বেশ সুন্দর দেখতে, ক্যান্টিলিভার সিস্টেম । আমরা ব্রিজের ওপর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দু'দিকের অসাধারণ সৌন্দর্য্য উপভোগ করলাম । নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে হাতানিয়া-দোয়ানিয়া নদী যার ওপর ভেসে রয়েছে অগণিত ছোট বড় নৌকো, স্টীমার, লঞ্চ ইত্যাদি জলযান । এখান থেকে আর সামান্য পরেই এই নদী হুগলী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে, সেই মোহনার জায়গাটাও ব্রিজের ওপর থেকে দেখা যায় । ব্রিজ থেকে নেমে ব্রিজ ব্যবহারের টোল ট্যাক্সের টিকিট কেটে আমরা আবার বক্‌খালির দিকে রওনা দিলাম ।


বক্‌খালির পার্কিং এরিয়া
আরও আধঘন্টা মতো চলার পরে সামনে বিশাল বিশাল বাতপতাকা (উইন্ড মিল) দেখে বুঝলাম আমরা বক্‌খালি পৌঁছে গেছি । সমুদ্র অবশ্য এখান থেকে আরও দু'কিলোমিটার আর এই পথটার মধ্যেই বক্‌খালির যাবতীয় হোটেলগুলো পড়ে । এটা মনে রাখতে হবে বক্‌খালিতে সমুদ্রের একেবারে কাছে কিন্তু কোনও হোটেল নেই, কোনও হোটেল থেকেই সমুদ্র দেখা যায় না । সমুদ্রের একেবারে কাছে পৌঁছে দেখলাম সেখানে একটা সুবিশাল গাড়ি পার্কিং-এর ব্যবস্থা করা হয়েছে । সেইসঙ্গে তার লাগোয়া একটা স্নানাগারও তৈরি হয়েছে যেটা ব্যবহারযোগ্য । সমুদ্রস্নান করার পরে কেউ চাইলে এখানে দ্বিতীয়বার চান করে নিয়ে হোটেলে ফিরতে পারে । আবার আমাদের মতো যারা ডে-আউট ট্রিপে বক্‌খালি আসে, তারাও সমুদ্রে চান করে এখানে দ্বিতীয়বার চান করে পোষাক পরিবর্তন করে নিতে পারে । বক্‌খালিতে ডে-আউট ট্রিপের জন্য হোটেল বুক করার কোনও দরকার নেই ।

বক্‌খালির সমুদ্রে স্নান
গাড়ি পার্কিং করে আমরা এগিয়ে গেলাম সমুদ্রের দিকে । বক্‌খালিতে সমুদ্রের ঢেউ বিশাল কিছু নয়, কিন্তু সৌন্দর্য্য মনোরম । আমরা তৈরি হয়েই গিয়েছিলাম - আমি আর কথা-কলি ভরপুর চান করলাম । এই অতিমারী পরিস্থিতিতে সবচেয়ে যেটা একটা সুবিধে পাওয়া গেল সেটা হল বিচে বেশ কিছু লোকজন থাকলেও সবাই সবার থেকে অনেকটা করে দূরে রয়েছে, ফলে একটা শারীরিক দূরত্ব স্বাভাবিকভাবেই মেনে চলা হয়ে যাচ্ছে । আমরা যেখানে চান করেছি, তার অন্ততঃ একশ' মিটারের মধ্যে আর কেউ ছিল না । আধঘন্টা চান করে আমরা উঠে পড়লাম ।

পার্কিং লটের লাগোয়া স্নানাগারে দ্বিতীয়বার চান করে একটা হোটেলে ঢুকলাম । এই এলাকায় অনেকগুলো ভাতের হোটেল আছে, খাবার মান আর দাম প্রায় সবগুলোতেই এক । হোটেলে স্যানিটাইজেশনের বিরাট কিছু ব্যবস্থা নেই - ঐ স্যানিটাইজার দিয়ে টেবিল মোছা ছাড়া আর আমাদের হাতে স্যানিটাইজার স্প্রে করা ছাড়া । তবে একটা তথ্য জানলাম যে বক্‌খালিতে সেভাবে করোনার প্রকোপ ছড়ায়নি । ফাঁকা জায়গা আর লোকজন কম হওয়াটাই এইসব জায়গার বাড়তি সুবিধা । আমরা ইলিশ থালি অর্ডার দিলাম । ইলিশের পিস্‌টা মাঝারি আর স্বাদ বেশ ভালো । থালির দাম মাথাপিছু ১৮০/- টাকা ।

বক্‌খালির বিচ্‌
খাওয়ার পরে আবার গেলাম সমুদ্রের ধারে । এখানে সমুদ্রের ধারে সেরকম বসার জায়গা নেই আর দুপুর রোদে বালির ওপরে বসাটাও মোটেই আরামদায়ক অনুভূতি নয় । কিছুদূর হেঁটে গেলে একটা টাওয়ার গোছের জিনিস আছে, যদিও সেখানে বসার জায়গা বিশেষ নেই, তবে রোদের তেজ এড়িয়ে ছায়ায় দাঁড়ানোর সুযোগ আছে । আমরা কিছুক্ষণ এখানে দাঁড়িয়ে দুপুর সাড়ে তিনটে নাগাদ ফেরার পথ ধরলাম ।


আগেই ঠিক ছিল ফেরার পথে ডায়মন্ড হারবার হয়ে ফিরব । ডায়মন্ড হারবারে গঙ্গার কাছাকাছি আসার আগেই একটা মাছের বাজার পড়ে, যেখানে নানা জাতের নানা সাইজের মাছ দেখে বেশ লোভ লাগে । এখান থেকে কলকাতা ও শহরতলীর একটা বিরাট অংশের মাছের সরবরাহ হয় আর সেটা এখানকার মাছের সম্ভার দেখে সহজেই অনুমান করা যায় । এই মাছের ভিড়ে ইলিশ মাছও আছে, তবে নিয়ে আসার সুবিধে হবে না বলে আমরা আর গাড়ি থেকে নেমে দরদাম করলাম না । সোজা ডায়মন্ড হারবারের নদীর ধারে এসে দাঁড়ালাম ।

ডায়মন্ড হারবারে গঙ্গার ওপরে সূর্য্যাস্ত
আগেরবার বক্‌খালি ভ্রমণের সময়ে আমরা ডায়মন্ড হারবারে এসেছিলাম, এছাড়া বছর দুয়েক আগে একবার শুধু ডায়মন্ড হারবারেই ঘুরে গেছি । কিন্তু এবারে দিনের যে সময়টায় এখানে এলাম, সেরকম সময়ে কখনও আসিনি । বিকেল সোয়া পাঁচটা বাজে, সূর্য্যদেব নিজের ল্যাপটপে আজকের মতো শাট-ডাউন দেওয়ার উপক্রম করছেন । আর গঙ্গার জল তাঁর চলে যাওয়ার ছবিটা নিজের বুকে ধরে রাখছে । সে এক অন্যবদ্য দৃশ্য ! ডায়মন্ড হারবারে গঙ্গার বাঁধানো পাড়ে সুন্দর বসার জায়গা আছে, এখানে ভীড়ও ভালোই । তারই মধ্যে একটা অপেক্ষাকৃত ফাঁকা জায়গায় আমরা কিছুক্ষণ বসলাম ।

মিনিট কুড়ি বসার পরে আবার রওনা দিলাম । বাড়ি পৌঁছতে রাত আটটার কিছু বেশি হল । শেষ হল অতিমারী আবহে একটা ছোট্ট কিন্তু অসাধারণ ভ্রমণ অভিজ্ঞতা !

সারসংক্ষেপ ঃ

১. কলকাতার সবথেকে নিকটবর্তী সমুদ্র বিচ্‌ হল বক্‌খালি । কলকাতা থেকে বক্‌খালির দূরত্ব ১৪০ কিলোমিটারের মতো আর যেতে চার থেকে সাড়ে চার ঘন্টা মতো লাগে ।
২. বক্‌খালিতে ডে-আউট করা যায় আবার চাইলে রাতে থাকাও যেতে পারে । পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের হোটেল ছাড়াও এখানে প্রচুর ছোটবড় বেসরকারী হোটেল আছে ।
৩. বক্‌খালিতে একরাতের বেশি থাকার মানে হয় না, তবে এখান থেকে আরও কয়েকটা জায়গা ঘুরতে যাওয়া যেতে পারে । সেই জায়গাগুলোর মধ্যে হেনরি আইল্যান্ড, জম্বুদ্বীপ, সাগরদ্বীপ এগুলো উল্লেখযোগ্য ।
৪. বক্‌খালি বিচের কাছেই বেশ বড় গাড়ি পার্কিং-এর ব্যবস্থা আছে । এখানে একটা স্নানাগারও আছে যেটা দারুণ কিছু না হলেও কাজ চালানোর পক্ষে যথেষ্ট ।
৫. পার্কিং-এর জায়গা থেকে বিচ্‌ হেঁটে ৩০০ মিটারের মতো । এই যাওয়ার পথে একাধিক ভাতের হোটেল, নানারকম জিনিসপত্রের দোকান ইত্যাদি আছে ।
৬. বক্‌খালির বিচ্‌সংলগ্ন ভাতের হোটেলের খাবারের মান ও দাম প্রায় একইরকম । একটু উন্নতমানের হোটেল চাইলে বিচ্‌ থেকে কিছুটা ভিতরের দিকে আসতে হবে ।
৭. গাড়ি নিয়ে গেলে বক্‌খালি যাওয়া বা ফেরার পথে ডায়মন্ড হারবার হয়েই যাতায়াত করা শ্রেয় । ডায়মন্ড হারবারে গঙ্গার ওপর সূর্য্যাস্তের দৃশ্য একটা অতিরিক্ত পাওনা । 

উপসংহার ঃ

বক্‌খালি
বক্‌খালি আমার অত্যন্ত প্রিয় একটা ভ্রমণস্থল । শুধু আমার ব্লগের প্রথম পোস্ট বলে নয়, বক্‌খালি জায়গাটা আমাকে সবসময়েই বিশেষভাবে আকর্ষণ করে । আমার লেখার প্রথমেই লিখেছি ২০১০ থেকে ২০২০ - এই দশ বছরে অনেক কিছু বদলে গেছে । কিন্তু মজার ব্যাপার - এই দশ বছরে একটুও বদলায়নি বক্‌খালির সমুদ্র । একটুও বদলায়নি বক্‌খালির বিচ্‌ । একটুও বদলায়নি বক্‌খালির বিচ্‌ সংলগ্ন দোকানগুলো । একটুও বদলায়নি এখানকার শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ যা আমাকে সবসময়েই মুগ্ধ করে । ঠিক যেমন করেছিল প্রথমবারেও ।  আমার এই দ্বিতীয়বার বক্‌খালি ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাই শেষ করছি প্রথমবারের লেখার শেষ কয়েকটা লাইন দিয়েই - "জায়গাটার একটা স্বাভাবিক সৌন্দর্য্য আছে, যেটা খুব জনবহুল জায়গায় কখনওই পাওয়া যায় না । দীঘা পুরী মন্দারমণির মতো ঘ্যাম নয়,  অল্প হোটেল-দোকান আর শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ নিয়ে বক্‌খালি থাকুক বক্‌খালিতেই ।"

বক্‌খালি ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Thursday, October 10, 2019

কামারপুকুর জয়রামবাটী ভ্রমণ

ভ্রমণপথঃ

বুধবার ৯ই অক্টোবর, ২০১৯ঃ সকাল ৭ঃ৩০ মিনিটে কলকাতা - সকাল ১১ টা কামারপুকুর - কামারপুকুরে রাত্রিবাস
বৃহস্পতিবার ১০ই অক্টোবর ২০১৯ঃ সকাল ৯ টা কামারপুকুর - সকাল ১০ টা জয়রামবাটী - কোয়ালপাড়া - আনুড় - বিকেল ৫ঃ৩০ মিনিটে কলকাতা

ঠারো বছর বয়সে একজন মানুষ সাবালক হয় । আর তখন থেকেই সে নিজের জীবনের পথ নিজের মতো করে তৈরি করে নেওয়ার ছাড়পত্রও পায় । কিন্তু এই আঠারো বছর বয়স শুধু যে মানুষ বা অন্যান্য জীবের হয় তা নয়, প্রতিজ্ঞারও হয় । সেই প্রতিজ্ঞা যা একটা আঠারো বছরের ছেলে করেছিল আজ থেকে প্রায় আঠারো বছর আগের একটা সকালে ।

দিনটা ছিল ১০ই নভেম্বর, ২০০১ । কয়েকঘন্টা হল ছেলেটা শ্মশান থেকে ফিরেছে তার ভীষণ নিজের 'ঠাম্‌মা'কে দাহ করে । কোনও একটা অলিখিত নিয়মে দাদু-ঠাম্‌মার সঙ্গে নাতি-নাতনীদের আত্মিক বন্ধন সাধারণতঃ খুব গভীর হয় । আর এই ছেলেটার বড় হয়ে ওঠার পিছনে তার ঠাম্‌মার ভূমিকা অপরিসীম । ছেলেটার জীবনের ইমারত নির্মিতই হয়েছে ছোটবেলা থেকে ঠাম্‌মার তৈরি করা মূল্যবোধের ভিতের ওপর । 'নাতি' বলতে তিনিও অজ্ঞান ছিলেন, নাতিকে প্রাণাধিক ভালোবাসতেন, কিন্তু কখনও আস্কারা দিতেন না । সেই ঠাম্‌মা ৭৮ বছর বয়সে পড়ে গিয়ে পায়ের হাড় ভাঙলেন ২০০১ সালের আগস্ট মাসে । হাড় আর জোড়া লাগল না । মাসতিনেক শয্যাশায়ী থেকে অবশেষে ৯ই নভেম্বর সন্ধ্যেবেলা চলে গেলেন । রেখে গেলেন একমাত্র ছেলে, ছেলের বউ, আদরের নাতি আর - একটা অতৃপ্ত ইচ্ছেকে । এই ইচ্ছেটা ওনার নিজের ভাষাতেই লিখছি - "একবার জয়রামবাটী-কামারপুকুর দেখে আসব ।" শ্মশান থেকে ফিরে এসে ছেলেটা প্রতিজ্ঞা করল ঠাম্‌মাকে সে জয়রামবাটী-কামারপুকুর দেখাতে নিয়ে যাবে ।

দেহের মৃত্যু হয়, আত্মার হয় না । ঠাম্‌মাও কোনওদিনই তাঁর আদরের নাতির থেকে দূরে যেতে পারবেন না, তাই ঠামমাকে ঘোরানোর জন্যই ছেলেটা কামারপুকুর-জয়রামবাটী যাওয়ার পরিকল্পনা করল । সঙ্গে থাকল মা-বাবা, স্ত্রী অমৃতা, কথা-কলি আর বড়মাসি ।

আমি আমার কোনও লেখা কখনও কাউকে উৎসর্গ করিনি । আজ করতে ইচ্ছে করছে । তোমার জন্য আমার বড় হয়ে ওঠাটা এত সুন্দর । তোমার কাছে শেখার ফলে নিজের হাতের লেখা নিয়ে আজও আমার গর্ব আছে । তোমার কাছেই প্রথম আঁকা শেখা । ইস্কুলের সব গল্পের তুমিই অক্লান্ত শ্রোতা । আজ ব্লগ লেখার সুবাদে যেটুকু লিখতে পারি, সেটা তোমার কাছ থেকেই শেখা । কামারপুকুর-জয়রামবাটী তোমার জন্যই যাওয়া । তাই এই ভ্রমণ আর ভ্রমণকাহিনী - তোমাকেই উৎসর্গ করছি ।

বৃষ্টিভেজা পথে
৯ই অক্টোবর, ২০১৯ বুধবার - তিথি হিসেবে দেখতে গেলে দুর্গাপুজোর একাদশী । সকাল সাড়ে সাতটার সময়ে আমরা আমাদের গাড়ি নিয়ে বেরোলাম । বলা বাহুল্য, চালক আমি । কলকাতা থেকে যেতে গেলে কামারপুকুর আগে পড়ে আর তার দূরত্ব একশ' কিলোমিটারের মতো । যেতে ঘন্টাতিনেকের বেশি লাগার কথা নয়, তবে আমাদের একটা ঘুরে যেতে হবে কারণ বড়মাসিকে তার বাড়ি থেকে তুলতে হবে । রাস্তা মোটামুটি জানাই ছিল আর সেইসঙ্গে Google Map এর সাহায্য নিয়ে যেতে কোনও অসুবিধেই হল না । যাওয়ার পথে যেটা উপরি পাওনা সেটা হল তুমুল বৃষ্টি যেটা লঙ-ড্রাইভে একটা অসাধারণ উপভোগ্য জিনিস । রাস্তার দু'পাশে কখনও শহর, কখনও শহরতলী, কখনও গ্রাম আর কখনও শুধু ধানক্ষেত - এইসবের মাঝখান দিয়ে বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি চালিয়ে যেতে দুর্দান্ত লাগছিল ।

প্রাতঃরাশ বিরতি
গাড়ি প্রথমবার থামল ব্রেকফাস্টের জন্য আরামবাগ পৌঁছনোর কিছুটা আগে । দোকানটার নাম 'কৈলাশ হোটেল ও গেস্ট হাউস' ।  নামটা এইজন্যই উল্লেখ করলাম যে এখানকার খাবার বেশ ভালো এবং দামও খুব বেশি নয় । আর সেইসঙ্গে ভালো মালিকের আতিথেয়তা । আমরা এখানে পাঁউরুটি আর ওমলেট খেয়ে নিলাম । কামারপুকুর যাওয়া আসার সময়ে চাইলে এখানে খাওয়াদাওয়া করে নেওয়া যেতে পারে । রেস্টুরেন্টের যোগাযোগের নম্বর - ৭০০১৮২৩৯৪৪ ।

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য এই দোকানে মাত্র কয়েকদিন আগে এসেছিলেন স্বয়ং পি সি সরকার (জুনিয়র) । এখানে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করেন এবং খাওয়াদাওয়া করেন । হোটেলের মালিক স্বাভাবিকভাবেই ওনার সঙ্গে সপরিবারে ছবিটবি তোলেন । পি সি সরকার ওনাকে যাওয়ার আগে কয়েকটা ম্যাজিক শিখিয়ে দিয়ে যান যার একটা উনি আমাদের দেখালেন । ওনার হোটেলে ঢোকার আগে আমাদের পকেটে যা টাকা ছিল, সবাই মিলে ব্রেকফাস্ট করে বেরোনোর পরে দেখলাম তার থেকে ২৬৫/- টাকা কম আছে !

এখান থেকে কামারপুকুর আরও ২০ কিলোমিটারের মতো রাস্তা আর আমাদের পৌঁছতে লাগল আরও চল্লিশ মিনিট । সকাল এগারোটা নাগাদ পোঁছে আমাদের প্রথমেই যে কাজটা করতে হল সেটা হচ্ছে রামকৃষ্ণ মিশনের ভোগের টিকিট সংগ্রহ করা । ভোগের মূল্য মাথাপিছু ৪০/- টাকা । যদি মঠে ভোগ খাওয়ার ইচ্ছে থাকে তাহলে সাড়ে এগারোটার মধ্যে এই টিকিট সংগ্রহ করতে হবে । আমরা টিকিট কাটার পরে সুবিশাল হলঘরে ঢুকে খেতে বসলাম । এখানে ছেলে আর মেয়েদের আলাদা বসার ব্যবস্থা ।

খাবারের বিস্তারিত বিবরণ দিচ্ছি না আর ভোগের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করেই বলছি, এখানকার খাবার অতি অখাদ্য ! নিরামিষ রান্না কিন্তু সেটা আমার অপছন্দের প্রধান কারণ নয় । চাইলে নিরামিষ রান্নাও একটা পর্যায় পর্যন্ত্য সুস্বাদু করা সম্ভব । কিন্তু এদের খাবার খেয়ে মনে হয় এরা যেন চেষ্টা করেই রান্নাটা অখাদ্য খেতে করে । রাস্তার ধারের যেকোনও সাধারণ ভাতের হোটেলে এদের থেকে সুস্বাদু রান্না করতে পারে ।

পরমপুরুষ হোটেলের ঘর
খাওয়া (বা বলা ভালো আবর্জনা দিয়ে গর্ত বোজানো) শেষ করে আমরা গেলাম আমাদের 'হোটেল পরমপুরুষ'-এ । পীক সিজন্‌ না হলে এখানে হোটেল আগে থেকে বুকিং না করে গেলেও চলে । মঠ অফিসের একজন ভদ্রলোকের কাছ থেকে আমরা এই হোটেলের সন্ধান পেলাম । মঠ থেকে গাড়িতে মিনিট পাঁচেক, হেঁটে গেলেও দশমিনিটের বেশি লাগার কথা নয় । হোটেলটা বেশ ভালোই । আমরা দু'টো ডাবল বেড ঘর নিলাম । ভাড়া ঘরপিছু ৫০০/- টাকা ।

সত্যি বলতে কি, পরমপুরুষ হোটেলকে হোটেল না বলে বাড়ি বলাই ভালো । বাড়ির মালিক নিজে থাকেন একতলায় আর দোতলা, তিনতলাটা হোটেল হিসেবে ভাড়া দেন । ঘরগুলো বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, বাথরুমে গিজার সবই আছে । আমরা দুপুরে ঘরে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে নিলাম । তারপর বিকেল চারটে নাগাদ বেরোলাম ।

যারা জানে না তাদের জন্য বলছি , কামারপুকুর হল শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জন্মস্থান । আর জয়রামবাটী সারদামণির জন্মস্থান । এখানে একটা কথা লেখা দরকার বহু মানুষকে বিভিন্নসময়ে দেখেছি শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে 'ঠাকুর' আর সারদামণিকে 'মা' বলে সম্বোধন করতে । আমি কিন্তু এটা করি না আর তাই আমার লেখায় শ্রীরামকৃষ্ণকে 'শ্রীরামকৃষ্ণ' বা কখনও কখনও 'রামকৃষ্ণ' বলেই উল্লেখ থাকবে । একইভাবে সারদামণিকে আমি 'সারদা মা' বা কখনও কখনও শুধু 'সারদা'ও লিখব । এতে কারুর ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত লাগলে আমি আমার হৃদয়ের অন্তরতম বিন্দু থেকে তাদের জানাচ্ছি যে - আমার তাতে কিচ্ছু এসে যায় না । স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণের অনুরাগীদের বলেছিলেন - আপনারা ওনাকে (রামকৃষ্ণকে) মানুষই থাকতে দিন, দয়া করে ওনাকে ভগবান বানাবেন না !

কামারপুকুর ভ্রমণঃ

কামারপুকুর মঠের ঠিক উল্টোদিকে বেশ বড় একটা পার্কিং লট আছে, সেখানে গাড়ি রেখে মঠের ভিতরে ঢোকা যায় । মঠের খোলাবন্ধের সময় নিম্নরূপ -
এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর ঃ ভোর ৫ঃ৩০ থেকে বেলা ১১ঃ৩০ পর্যন্ত্য ও বিকেল ৪ টে থেকে রাত ৮ঃ৩০ পর্যন্ত্য ।
অক্টোবর থেকে মার্চ ঃ সকাল ৬ টা থেকে বেলা ১১ঃ৩০ পর্যন্ত্য ও বিকেল ৩ঃ৩০ থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত্য ।
আমরা মঠের ভিতরে ঢুকে দেখা শুরু করলাম । এখানে ভিতরে ফোটো তোলা বারণ, সেটা বিভিন্ন জায়গায় লেখা আছে আর সেইসঙ্গে নিরাপত্তারক্ষীরা সেই বিষয়ে কড়া নজর রাখে । এরকম পরিস্থিতিতে কিছু লোকজনের লুকিয়ে চুরিয়ে ছবি তোলার অভ্যেস থাকলেও সেটা আমার নেই, তাই এই লেখার সঙ্গে ভিতরের ছবি দেওয়া গেল না ।

শ্রীরামকৃষ্ণ মঠের গেটের ঠিক ভিতরে
শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ - মঠের মেইন গেট দিয়ে ঢুকে ভিতরে ঢোকার সময়ে একটা আমগাছ দেখা যায়, যেটা শ্রীরামকৃষ্ণের লাগানো । এই গাছ বেঁচেও আছে  আর ফলও দেয় । এটা এখন মানুষের কাছে একটা ধর্মীয় জিনিস, এর গায়ে হাত দিয়ে নমস্কার করে লোকজন পুণ্য সঞ্চয় করে । মঠ কর্তৃপক্ষ তাই এর পাশে একটা লোহার জাল লাগিয়ে দিয়েছে যেটা ভেদ করে গাছের গায়ে হাত দেওয়া কিঞ্চিৎ কষ্টসাধ্য ।

ভিতরে দ্বিতীয় দ্রষ্টব্য হল রামকৃষ্ণের মন্দির । এই মন্দিরে রামকৃষ্ণের মূর্তি আছে । এই জায়গাটার বৈশিষ্ট্য হল আজ থেকে ১৮৩ বছর আগে ঠিক এই জায়গাতেই শ্রীরামকৃষ্ণ জন্মেছিলেন । এই জায়গাটা সেইসময়ে ছিল ওনাদের বাড়িরই একটা অংশ ।

এই মন্দিরের সঙ্গে প্রায় লাগোয়া রামকৃষ্ণের বাড়ি । আগেকার দিনে গ্রামবাংলায় যেরকম বাড়ি দেখা যেত, একেবারে সেই জিনিস । খড়ের চাল দিয়ে ঢাকা মাটির কুঁড়েঘর । এরকম কয়েকটা কুঁড়েঘর আর মাঝখানে উঠোন নিয়ে ছিল রামকৃষ্ণের পিতা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি । এখানে রামকৃষ্ণের ঘর আর ওনার দাদার ঘর ছাড়াও দেখা যায় ওনাদের গৃহদেবতা রঘুবীরের মন্দির । শ্রীরামকৃষ্ণের ঘরটাকে বর্তমানে বইপত্র রাখার কাজে ব্যবহার করা হয় আর ভিতরে সাধারণ দর্শনার্থীদের ঢুকতে দেয় না । আমরা বাইরে থেকে দেখে চলে এলাম ।

মঠের ভিতরে এছাড়া দেখা যায় মঠ কার্যালয়, কিন্তু সেখানে দেখার কিছু নেই । এটা বাদ দিয়ে আর একটা জিনিসই দেখার ছিল সেটা হল যুগি শিবের মন্দির । যুগিবংশীয় রামানন্দ যুগি এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন । এর বৈশিষ্ট্য হল শ্রীরামকৃষ্ণ জন্মানোর আগে নাকি ওনার মা চন্দ্রামণি দেবী এই শিবের থেকে স্বপ্ন পান ইত্যাদি ইত্যাদি । আমি সেইসমস্ত গপ্প এখানে বিস্তারিত লিখছি না, যদি জানার ইচ্ছে থাকে কামারপুকুর সম্পর্কে ইন্টারনেটে একটু খুঁজলেই পাওয়া যাবে । আর খুব ইচ্ছে থাকলে কামারপুকুর চলে যাওয়াই হবে উপযুক্ত কাজ !

হালদার পুকুর
হালদার পুকুর - সন্ধ্যে হয়ে আসছিল আর মঠের ভিতরে আর কিছু দেখারও নেই, তাই আমরা বেরিয়ে এলাম । মঠের গেটের ঠিক উল্টোদিকে একটা পুকুর আছে, সেটার নাম হালদারপুকুর । এই পুকুরে রামকৃষ্ণ চান করতেন । পুকুরটার একটা বৈশিষ্ট্য হল এর আকৃতি চৌকো, সাধারণতঃ এরকম আকারের পুকুর খুব একটা দেখা যায় না । আমরা পুকুরের পাশে কিছুক্ষণ বসে ছবি টবি তুলে চলে এলাম ।

কামারপুকুরে আরও কয়েকটা জায়গা আছে, সেগুলো গাড়ি করে দেখা সম্ভব নয় । তার কারণ একেকটা জায়গা এমনই সরু গলির মধ্যে যে সেখানে গাড়ি ঢুকবে না । কোনও জায়গাই বিশাল কিছু দূর নয় যে হেঁটে ঘোরা অসম্ভব, তবে সঙ্গে বাচ্চা বা বয়স্ক লোক থাকলে সেটা না করাই ভালো । মঠের গেটের সামনে টোটো পাওয়া যায় যারা এই সবক'টা জায়গা ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেয় । ভাড়া ১০০ টাকা । আমাদের দলে পাঁচজন বড় আর দু'জন বাচ্চা তাই আমাদের একটা টোটোতেই হয়ে গেল ।

লক্ষ্মণ পাইনের বাড়ির লাগোয়া মন্দির
লক্ষ্মণ পাইনের বাড়ি - টোটো প্রথমে আমাদের নিয়ে গেল লক্ষ্মণ পাইনের বাড়ি । এই বাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণ ছোটবেলায় যেতেন । এখানে রামায়ণ - মহাভারত ইত্যাদি পাঠ হত আর সেখানে রামকৃষ্ণ ভাবাবেশে উপস্থিত হতেন (এটা এই বাড়ির গায়ে লেখা আছে) । এই বাড়ির লাগোয়া একটা মন্দির গোছের আছে, পাঠ সেখানেই হত ।




দুর্গাদাস পাইনের বাড়ি - লক্ষ্মণ পাইনের বাড়ি থেকে ফেরার পথে টোটোওয়ালা আরেকটা বাড়ি দেখালো, সেটা দুর্গাদাস পাইনের । কামারপুকুরে এসে রামকৃষ্ণের পিতা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় প্রথম কিছুদিন এনার বাড়িতেই বাস করেন । এই বাড়িতে এখন দুর্গাদাস পাইনের বংশধররা থাকেন বলে এই বাড়ির ভিতরে ঢুকে দেখা যায় না ।

লাহাবাবুদের মন্দির
লাহাবাবুদের বিষ্ণুমন্দির - এরপর লাহাবাবুদের বিষ্ণুমন্দির । ধর্মদাস লাহা ছিলেন এই বাড়ির মালিক । এনার সঙ্গে ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের বিশেষ বন্ধুত্ব ছিল । এই মন্দিরটা দোতলা । এর নিচে বিষ্ণুর মন্দির আর উপরে দুর্গার মন্দির ।














রামকৃষ্ণের পাঠশালা
রামকৃষ্ণের পাঠশালা - লাহাবাবুদের বিষ্ণুমন্দিরের লাগোয়া হল পাঠশালা যেখানে রামকৃষ্ণ পড়তে যেতেন । রামকৃষ্ণ নাকি পাঠশালায় পড়তে না গিয়ে এই মন্দিরে এসে মা-কালীর মূর্তি আঁকতেন আর ধ্যান করতেন (খুবই অমনোযোগী ছাত্র ছিলেন আর কি !)। মন্দিরের লাগোয়া পাঠশালাটা বেশ সুন্দর । পাঠশালা জিনিসটা সাধারণতঃ সিনেমাতেই দেখেছি, সত্যিকারের পাঠশালা কেমন দেখতে হয় সেটা আগে কখনও দেখিনি । বেশ ভালোই লাগছিল । পাঠশালার ঠিক পাশে একটা রাসমন্দির আছে যেখানে রাধাকৃষ্ণের মূর্তি রয়েছে ।

গোপেশ্বর শিবমন্দির
গোপেশ্বর শিবমন্দির - এরপর পথে পড়ল গোপেশ্বর শিবমন্দির । এখানে আমরা নামিনি, টোটোওয়ালা মন্দির দেখিয়ে বলল এখানে রামকৃষ্ণের মা চন্দ্রামণি দেবী আসতেন । আমরা এগিয়ে চললাম ।








ভবতারিণী মন্দির
ভবতারিণী মন্দির - পরবর্তী গন্তব্য ভবতারিণী মন্দির । রামকৃষ্ণের জন্মদাত্রী ধাইমা ধোনী কামারনির মন্দির যিনি তৈরি করেন, সেই রাধাচরণ দাসের ঠাকুরবাড়ি হল এই ভবতারিণীর মন্দির ।














ধোনী কামারনির মন্দির
ধোনী কামারনির মন্দির ও বাড়ি - এরপর ধোনী কামারনির মন্দির এবং তাঁর বাড়ি । আগেই বলেছি ধোনী কামারনি ছিলেন রামকৃষ্ণের ধাইমা । সেইসঙ্গে উপনয়ন (পৈতে)-এর সময়ে তিনি রামকৃষ্ণের ভিক্ষামা-ও ছিলেন । ধোনী কামারনি ছিলেন অব্রাহ্মণ আর সেইযুগে অব্রাহ্মণদের ভিক্ষামা হওয়া ছিল রীতিবিরুদ্ধ (সেই নিয়ম আজও অপরিবর্তিত আছে)। কিন্তু রামকৃষ্ণ চেয়েছিলেন তাঁর জন্মদাত্রী ধাইমা-ই তাঁর ভিক্ষামা হোন । রামকৃষ্ণের দাদা রামকুমার এর তীব্র বিরোধিতা করলেও শেষপর্যন্ত্য রামকৃষ্ণেরই জয় হয় । অব্রাহ্মণ ধোনী কামারনি হয়ে যান রামকৃষ্ণের ভিক্ষামা ।

যাঁরা রামকৃষ্ণকে 'ঠাকুর' বলে সম্বোধন করেন আর তাঁর তথাকথিত অলৌকিক ক্রিয়াকলাপ শুনে অশ্রুবিগলিত হয়ে পড়েন, তাঁদের মধ্যে এরকম কতজন আছেন যাঁরা তাঁদের নিজেদের বা পরিচিতদের পরিবারে এরকম একটা আবহমানকাল ধরে চলে আসা অবান্তর নিয়মের বিরোধিতা করে সেটাকে বন্ধ করতে পারেন ? বন্ধ করা তো দূরের কথা, করার সাহস দেখাতে পারেন ? তিনি রামকৃষ্ণ বলে এটা করতে পারেননি, করতে পেরেছিলেন বলে তিনি রামকৃষ্ণ । আমি তাঁকে এই কারণেই শ্রদ্ধা করি - এই কারণেই তিনি আমার কাছে ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব !

'কামারপুকুর'
কামারপুকুর - এরপর আমরা গেলাম 'কামারপুকুর' দেখতে । এটা একটা পুকুর আর এই পুকুরের নামেই গ্রামের নাম । পুকুরটার কোনও আলাদা বৈশিষ্ট্য নেই, এখনও এর জল স্বাভাবিক জনজীবনে ব্যবহার হয় । রাতের অন্ধকারে আমরা পুকুরটা বিশেষ দেখতে পেলাম না, তাই পরেরদিন সকালে গেলাম আরেকবার দেখতে । পরেরদিন সকালে তোলা ছবিটাই এখানে লেখার সঙ্গে দেওয়া হল ।

চিনু শাঁখারির বাড়ির পাঁচিল
চিনু শাঁখারির বাড়ি - আমাদের শেষ গন্তব্য চিনু শাঁখারির বাড়ি । এই ব্যক্তিই নাকি রামকৃষ্ণকে প্রথমবার ঈশ্বররূপে দেখতে পান । রামকৃষ্ণ এনাকে বলেন ব্যাপারটা গোপন রাখতে কিন্তু সে চতুর্দিকে সেটা রাষ্ট্র করে বেড়ায় । এরফলে রামকৃষ্ণের অভিশাপে (যদিও অভিশাপ জিনিসটা রামকৃষ্ণের ভাবমূর্তির সঙ্গে ঠিক খাপ খায় না) সে নির্বংশ হয়ে যায় । এই কারণে চিনু শাঁখারির বাড়ি আজ আর নেই, বাড়ির এলাকাটা মঠের সম্পত্তি আর তারা এটা পাঁচিল দিয়ে ঘিরে রেখেছে । এই জায়গাটাও আমরা রাতের অন্ধকারে ভালোভাবে দেখতে পাইনি, পরেরদিন সকালে আবার দেখলাম ।

আমাদের কামারপুকুর দেখা শেষ । টোটো আমাদের মঠের সামনে নামিয়ে দিল । আমরা সন্ধ্যের টিফিনের জন্য কিছু খাবার কিনে হোটেলে ফিরে এলাম । আমাদের হোটেলে গাড়ি রাখার কোনও জায়গা নেই, এইজাতীয় হোটেলে সেটা আশা করাও ঠিক নয় । হোটেলের মালিকের পরামর্শে আমরা গাড়ি রাখলাম হোটেল থেকে অনতিদূরে রাস্তার পাশে একটা ফাঁকা জায়গায় ।

রাতের রুটি আর ডিমের কারি হোটেল থেকেই নেওয়া হল আর বাইরে থেকে আনা চিকেন কারি ছিল । সবমিলিয়ে ডিনারে খরচ হল ২৯০ টাকা ।

হোটেলের ছাদ থেকে দৃশ্য
১০ই অক্টোবর, ২০১৯ বৃহস্পতিবার । সকালে ঘুম থেকে উঠে চানটান করে রেডি হয়ে নিলাম । আমাদের হোটেলের ছাদটা খুব সুন্দর, সেখান থেকে আশেপাশে অনেকদূর পর্যন্ত্য দেখা যায় । এখানে পাশদিয়েই একটা রেললাইন গেছে, যদিও সেটা এখনও অসম্পূর্ণ তাই সেখান দিয়ে কোনও ট্রেন যায় না । কামারপুকুর হাওড়া-তারকেশ্বর-আরামবাগ লাইনে পড়ে, সেই পথেই এখানে ট্রেনে আসা যায় ।


সকাল ন'টা নাগাদ হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়লাম । যাওয়ার পথে কামারপুকুর আর চিনু শাঁখারির বাড়িটা আরেকবার দেখে নিলাম ।

মানিক রাজার প্রাসাদের ভগ্নাবশেষ
মানিক রাজার প্রাসাদ - কামারপুকুর থেকে আমাদের গন্তব্য জয়রামবাটী । কামারপুকুর থেকে জয়রামবাটীর দূরত্ব ৫.৫ কিলোমিটারের মতো তবে পথে আরেকটা দেখার মতো জায়গা আছে । সেটা হল মানিক রাজার প্রাসাদ । কামারপুকুর থেকে কামারপুকুর-জয়রামবাটী রোড ধরে ১.৫ কিলোমিটার মতো গিয়ে একজায়গায় মেইন রোড ছেড়ে একটা মাটির রাস্তা ধরে ৭০০ মিটার মতো গিয়ে একজায়গায় আমরা গাড়ি রাখলাম । এই মাটির রাস্তাটা একেক জায়গায় বেশ সরু আর বর্ষার সময়ে কাদা থাকলে এ'পথে গাড়ি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা না করাই ভালো । গাড়ি একজায়গায় রেখে আমরা বাকি পথটা হেঁটে গেলাম মানিক রাজার প্রাসাদ দেখতে ।

মানিক রাজা ছিলেন এই অঞ্চলের জমিদার এবং একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি । এনার বাড়িতে রামকৃষ্ণের যাতায়াত ছিল । বাড়ি বলতে এখন আর কিছুই নেই, একটা বড় বাড়ির ভগ্নাবশেষ । তবে মাঠের মাঝখানে রাজবাড়ির মূলফটকটা আজও দাঁড়িয়ে আছে । জায়গাটা কোনওভাবে সংরক্ষণও করা হয় না, কাজের এর ইতিহাস সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানতে পারলাম না ।

জয়রামবাটী ভ্রমণঃ

মানিক রাজার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমরা ধরলাম জয়রামবাটীর পথ । রাস্তাটা বেশ সুন্দর আর রোদের তেজ সেরকম বেশি না থাকায় বেশ আরামদায়ক একটা অনুভূতি হচ্ছিল । সকাল প্রায় দশটা নাগাদ আমরা জয়রামবাটীতে পৌঁছলাম ।

জয়রামবাটীতেও কামারপুকুরের মতো একটা বড় পার্কিং লট আছে, সেখানে গাড়ি রেখে আমরা কচুরি-তরকারি দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে নিলাম । তারপর মিনিট পাঁচেক হেঁটে পৌঁছলাম মাতৃ মন্দিরে ।

জয়রামবাটীর মাতৃমন্দিরের বাইরে
মাতৃমন্দির - কামারপুকুরের মতো জয়রামবাটীতেও মাতৃমন্দিরের ভিতরে ছবি তোলা নিষিদ্ধ । জয়রামবাটীতে সারদা মা যেখানে জন্মগ্রহণ করেন, সেই জায়গায় মাতৃমন্দির তৈরি করা হয়েছে । ঠিক যে জায়গায় সারদা মা জন্মগ্রহণ করেন, সেখানে তাঁর একটা শ্বেতপাথরের মূর্তি রয়েছে । কামারপুকুরের মতো এখানেও সেই মূর্তির সামনে একটা বেশ বড় হলঘরের মতো রয়েছে যেখানে বসে সবাই প্রার্থনা বা ধ্যান করতে পারে । আমরা মন্দিরটা কিছুক্ষণ ঘুরে বেরিয়ে এলাম ।

পুন্যিপুকুর - মাতৃমন্দিরের ঠিক সামনেই পুন্যিপুকুর । সারদা মা এই পুকুর ব্যবহার করতেন । পুকুরটা বিশাল বড়, এবং চারদিক রেলিং দিয়ে ঘেরা ।

নতুন বাড়ি - মাতৃমন্দিরের বাঁদিক দিয়ে কিছুটা হেঁটে গেলে একটা পাঁচিল ঘেরা জায়গার ভিতরে সারদা মায়ের নতুন বাড়ি । ১৯১৫ সাল থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত্য তিনি এখানে থাকতেন । রামকৃষ্ণের বাড়ির মতো এখানেও কয়েকটা খড়ের চাল দিয়ে ঢাকা মাটির কুঁড়েঘর আর একটা উঠোন রয়েছে ।

পুরনো বাড়ি - মাতৃমন্দিরের মূল ফটক থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে পড়ে সারদা মায়ের পুরনো বাড়ি । এখানে ১৯১৫ সালের আগে পর্যন্ত্য তিনি থাকতেন । নতুন বাড়ির মতো এখানেও খড়ের চাল দিয়ে ঢাকা কয়েকটা মাটির বাড়ি রয়েছে ।

জয়রামবাটী ভ্রমণ এখানে শেষ, আমাদের এখানে আর কিছু দেখার নেই । জয়রামবাটীর যেদিকে কামারপুকুর তার বিপরীত দিকে আরও ৭.৫ কিলোমিটার গেলে পড়ে কোয়ালপাড়া আশ্রম । জয়রামবাটী থেকে আমরা রওনা দিলাম এই আশ্রমের উদ্দেশ্যে ।

কোয়ালপাড়া আশ্রম
কোয়ালপাড়া আশ্রম - জয়রামবাটী থেকে কলকাতা আসার সময়ে এখানে সারদা মা বিশ্রাম করতেন । আমরা যখন এখানে পৌঁছলাম তখন বেলা ১১ঃ৫০ আর ততক্ষণে মন্দির বন্ধ হয়ে গিয়েছিল । আমরা মন্দিরের ভিতরে ঢুকতে না পারলেও আশ্রমের ভিতরে ঢুকে কিছুক্ষণ কাটালাম । এখানে একটা সাইনবোর্ড থেকে জানতে পারলাম যে স্বদেশী আন্দোলনের সময়ে এই আশ্রম বিশেষ ভূমিকা পালন করে । এই আশ্রমে সারদা মায়ের উদ্যোগ চরকা কেটে কাপড় বোনার কাজ শুরু হয় ।

আশ্রম থেকে বেরোনোর সময়ে দেখলাম এখানে একটা আমগাছ আছে, যেটা সারদা মায়ের আম খেয়ে ফেলে দেওয়া আঁটি থেকে তৈরি হয়েছে ।

এবার আমরা ফেরার পথ ধরলাম । ফেরার পথে আবার জয়রামবাটী আশ্রমের রাস্তা পড়ল । সেটা পেরিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম । কামারপুকুর মঠ থেকে ১ কিলোমিটার দূরে আমরা বাঁদিকে ঢুকে গেলাম । এবারে আমাদের গন্তব্য আনুড় বিশালাক্ষী মন্দির ।

বিশালাক্ষী মন্দির
আনুড় বিশালাক্ষী মন্দির - কামারপুকুর-জয়রামবাটী রোড থেকে ২.৮ কিলোমিটার ভিতরে গেলে পড়ে আনুড় বিশালাক্ষী মন্দির । এই মন্দিরে রামকৃষ্ণ আসতেন । মন্দিরটা খুব একটা বড় নয় তবে চারপাশটা খুব সুন্দর । আমরা এখানে কিছুক্ষণ থেকে আবার ফেরার পথ ধরলাম ।





বিশালাক্ষী মন্দির থেকে বেরোলাম তখন দুপুর ১২ঃ৩০ । এখান থেকে আমরা ফেরার পথে আবার গেলাম 'কৈলাশ হোটেল ও গেস্ট হাউস' । আগেই ফোন করে লাঞ্চের অর্ডার দেওয়া ছিল, আমরা গিয়ে চিকেন কারি আর এগ কারি দিয়ে ভাত খেয়ে নিলাম । খরচ হল ৫৪৫/- টাকা ।

এরপর আর দাঁড়াইনি । যাওয়ার পথেই ফিরলাম আর ফেরার পথে বড়মাসিকে বাড়িতে নামিয়ে দিলাম । বিকেলে যখন বাড়ি ফিরলাম তখন প্রায় সাড়ে পাঁচটা ।

সারসংক্ষেপঃ

১. কলকাতা থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে শ্রীরামকৃষ্ণ আর সারদা মায়ের জন্মস্থান হুগলী জেলায় কামারপুকুর আর বাঁকুড়া জয়রামবাটী । কলকাতা থেকে গেলে কামারপুকুর প্রথমে পড়ে আর জয়রামবাটী পরে পড়ে ।
২. কলকাতা থেকে কামারপুকুর গাড়ি করে যাওয়া যায় । এছাড়া ধর্মতলা থেকে সরাসরি কামারপুকুর যাওয়ার জন্য বিভিন্ন সরকারি বা বেসরকারি বাস আছে ।
৩. হাওড়া থেকে লোক্যাল ট্রেনে করেও কামারপুকুর যাওয়া যায় । কামারপুকুরের সবথেকে কাছের স্টেশন হল গোঘাট, সেখান থেকে টোটো বা ভ্যানে করে কামারপুকুর যাওয়া যায় ।
৪. গোঘাটের ট্রেন খুব কম, তাই আরামবাগ বা তারকেশ্বর লোক্যালে করে যাওয়া সুবিধেজনক । এই দুই স্টেশন থেকেই কামারপুকুরের বাস ছাড়ে ।
৫. কামারপুকুর আর জয়রামবাটী মন্দিরের খোলা-বন্ধের নির্দিষ্ট সময় আছে । সেইসময়মতো যাওয়াটাই শ্রেয় ।
৬. দুটো জায়গা ভালোভাবে দেখার জন্য একটা রাত এখানে থাকতে পারলে ভালো । তবে সেই সময় হাতে না থাকলে দুটো জায়গা একদিনেও দেখে নেওয়া যায় ।
৭. কামারপুকুরে থাকার জন্য এখানে কিছু কিছু হোটেল আছে যার মধ্যে 'পরমপুরুষ হোটেল' বেশ ভালো । এদের যোগাযোগ নম্বরঃ ৯৪৭৫৩৫৫৮৮৩ । এখানে খাওয়ার ব্যবস্থা না থাকলেও অনুরোধ করলে রান্না করে দেয় । এছাড়া মঠের কাছে খাবারের একাধিক দোকান আছে ।
৮. থাকার জন্য এখানে রামকৃষ্ণ মিশনের যাত্রীনিবাস আছে । তবে মিশনের লোকই জানাল সেটা সপরিবারে থাকার পক্ষে একেবারেই উপযুক্ত নয় । তাই পরিবারের লোকজন নিয়ে গেলে হোটেলই শ্রেয় ।
৯. কামারপুকুরে শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ প্রধান দেখার জায়গা । এছাড়া আশেপাশে আরও কতগুলো দেখার জায়গা আছে যেগুলো দেখার জন্য টোটো সবথেকে ভালো অপশন ।
১০. কামারপুকুর থেকে জয়রামবাটীর দূরত্ব ৭.৫ কিলোমিটারের মতো । দু'জায়গাতেই গাড়ি পার্কিং-এর সুবন্দোবস্ত আছে । টোটো বা বাসে করেও কামারপুকুর থেকে জয়রামবাটী যাওয়া যায় ।
১১. জয়রামবাটীতে মাতৃমন্দির ছাড়া আর সেরকম কিছু দেখার নেই । এখানেও খাবারের জন্য একাধিক দোকান আছে ।
১২. জয়রামবাটী থেকে অনতিদূরে কোয়ালপাড়া আশ্রম আছে । কলকাতা যাতায়াতের সময়ে এখানে সারদা দেবী বিশ্রাম করতেন । পরবর্তীকালে স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ে এই আশ্রম উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করে ।
১৩. কামারপুকুরের খুব কাছে আনুড় বিশালাক্ষী মন্দির আছে । রামকৃষ্ণ ছোটবেলায় এখানে যাতায়াত করতেন ।

উপসংহারঃ

কামারপুকুর
ঈশ্বরে ভক্তি থাকুক বা না থাকুক, শ্রীরামকৃষ্ণ আর সারদা মাকে আস্তিক-নাস্তিক সকলেই বেশ পছন্দ করে এটা আমি বিভিন্ন সময়ে দেখেছি । আমার ধারণা এর প্রধান কারণ এনাদের অনাড়ম্বর জীবনযাপন আর সেইসঙ্গে মানুষের মধ্যে অবস্থান । শ্রীরামকৃষ্ণ একদিকে যেমন প্রচলিত আচার-বিচার মানতেন না, সেইসঙ্গে তাঁর মধ্যে খুব কঠিন তাত্ত্বিক কথা খুব সরলভাবে গল্পের মাধ্যমে বলতে পারার একটা স্বাভাবিক ক্ষমতা ছিল । ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলেই তাঁর শিষ্য হতে পারত । এই সহজ-সরল মাটির স্বাভাবিক টানটা তাঁদের জন্মস্থানে গেলে আজও কিছুটা অনুভব করা যায় । হয়তো এই কারণেই মঠ বা অন্যান্য জায়গাগুলোর কোনওটাতেই ব্যবসায়িক লেনদেনের ব্যাপারটা একেবারেই চোখে পড়ে না । তাই ঈশ্বরের ভক্তদের কাছে ঈশ্বর, রামকৃষ্ণের ভক্তদের কাছে তাঁদের প্রিয় 'ঠাকুর', তীর্থযাত্রীদের কাছে তীর্থস্থান আর ভ্রমণপিপাসুদের কাছে দ্রষ্টব্যস্থল - সবধরনের মানুষের কাছে তাদের চাহিদাপূরণ করার জন্য দুই অনবদ্য পীঠস্থান কামারপুকুর আর জয়রামবাটী !

কামারপুকুর-জয়রামবাটী ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Friday, May 31, 2019

মহিষাদল রাজবাড়ি ভ্রমণ

এ'কথা অনস্বীকার্য্য যে নির্ঝঞ্ঝাট সুষ্ঠু ভ্রমণের জন্য নিখুঁত পরিকল্পনার বিশেষ প্রয়োজনীয়তা আছে । আবার সেইসঙ্গে এটাও ঠিক যে কোনও কোনও ভ্রমণের মাধুর্য্য তার পরিকল্পনাহীনতায় । সেক্ষেত্রে একমাত্র সম্বল বেরিয়ে পড়ার একটা অদম্য ইচ্ছে । কিন্তু পরিস্থিতি, পারিপার্শ্বিকতা ইত্যাদি কয়েকটা শব্দ আমাদের জীবনে থাকেই, ফলে সেই বিধিনিষেধের বেড়াজালের বাইরে বেরোনো সমীচীনও নয়, অভিপ্রেতও নয় । যদি একান্তই বেরোতে হয়, ফেরার পথও খোলা রাখতে হয় । এই অবস্থায় 'ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া' যতদূর যাওয়া সম্ভব, ততদূর যাওয়াই অনুমোদনযোগ্য যাতে সন্ধ্যের আগে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসতে পারে ! এই কথাগুলো মাথায় রেখেই আমাদের এবারের ভ্রমণস্থল 'মহিষাদল রাজবাড়ি' । কলকাতা থেকে দূরত্ব ১১০ কিলোমিটার - গাড়িতে ঘন্টা তিনেক ।

(আগের প্যারাগ্রাফের ভাষাটা আমার স্বাভাবিক ভাষা নয় । ঠিক যেরকম পরিকল্পনাবিহীন ভ্রমণও আমার স্বাভাবিক ভ্রমণ নয় । ওই ভাষা আর এই ভ্রমণ দু'টোরই অভিসন্ধি এক - স্বাদবদল ! যদি খটোমটো লাগে বা বুঝতে অসুবিধে হয়, দ্বিতীয়বার পড়ার দরকার নেই । ওই প্যারাগ্রাফে এমন কোনও দরকারী তথ্য নেই যেটা না পড়লে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে !)

শুক্রবার ৩১শে মে, ২০১৯ - সকাল দশটা নাগাদ বাড়ি থেকে গাড়ি নিয়ে বেরোলাম আমি আর অমৃতা । কোনও পরিকল্পনা ছিল না, উদ্দেশ্য লঙ ড্রাইভে যাওয়া । তবে মহিষাদল রাজবাড়ি যাওয়া যেতে পারে, এরকম ভেবে রেখেছিলাম । জায়গাটা পূর্ব মেদিনীপুর জেলার হলদীয়া মহকুমার মধ্যে পড়ে এটা জানা ছিল, কিন্তু কোলাঘাটের পরে আর রাস্তা চিনতাম না । ভরসা গুগ্‌ল ম্যাপ । কোলাঘাট - মেচেদা পেরিয়ে ১১৬ নং জাতীয় সড়ক ধরে ২৭ কিলোমিটার মতো গেলে নন্দকুমার-এর মোড় । এখানে আমরা একটা বিরিয়ানির হোটেল থেকে লাঞ্চ সেরে নিলাম । বীফ্‌ বিরিয়ানি আর বীফ্‌ ভুনা । খরচ হল ১৬০/- টাকা । নন্দকুমার থেকে বাঁদিকে ঘুরে ৪ নং রাজ্যসড়ক হয়ে ৮ কিলোমিটার গেলে মহিষাদল রাজবাড়ি । আমরা পৌঁছলাম তখন দুপুর ১ঃ১৫ মিনিট ।

মহিষাদল রাজবাড়ির প্রধান প্রবেশপথ
মেইন গেটের বাইরে গাড়ি পার্কিং করে আমরা ভিতরে ঢুকলাম । এখানে ঢোকার টিকিট লাগে, মাথাপিছু ১০/- টাকা । ভিতরে একটা বিশাল জমির ওপর প্রকান্ড রাজবাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে । চন্দ্রকেতুগড়ের মতো এখানেও ঢোকার আগে জায়গাটা সম্পর্কে কিছু তথ্য দিয়ে রাখি । এই তথ্যের সূত্র মহিষাদল রাজবাড়ির দেওয়ালে লাগানো একটি সূচনা ।



মহিষাদল রাজপরিবারের বংশতালিকা
ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে উত্তর প্রদেশ থেকে জনার্দন উপাধ্যায় এই অঞ্চলে বাণিজ্য করতে এসে এখানে একটি জমিদারী কিনে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন । এই জনার্দন উপাধ্যায়ই মহিষাদল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা । তিনি মোঘল সম্রাট আকবরের সনন্দমূলে মহিষাদলাধিপতির স্বীকৃতি পান । পরবর্তীকালে জনার্দন উপাধ্যায়ের বংশধর মন্থরা দেবীর পুত্র গুরুপ্রসাদ গর্গ এই রাজবংশের রাজা হন । এই সময় থেকেই এই রাজবংশ উপাধ্যায়দের জায়গায় গর্গদের নামে হয়ে যায় । ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত্য এই গর্গ বংশ এখানকার রাজা ছিলেন । বর্তমানে এই বংশের বংশধররা কলকাতায় থাকেন এবং ব্যবসাবাণিজ্য করেন ।

এই রাজপরিবার এই অঞ্চলে বহু জনহিতকর কাজকর্ম করেছে । বিভিন্ন সময়ে এঁরা মোট তিনটি রাজবাড়ি তৈরি করেন । এগুলোর মধ্যে একটা অবলুপ্ত হয়ে গেছে, দ্বিতীয় 'রঙ্গীবসান রাজবাটী' নবাবদের আমলে তৈরি হয় । এটির অবস্থাও বর্তমানে খুব একটা ভালো নয় । তৃতীয় 'ফুলবাগ রাজবাটী' ইংরেজ আমলে তৈরি হয় আর এটাই পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত । এই রাজবাড়িতেই গর্গ পরিবার মহিষাদল রাজবাড়ির সংগ্রহশালাটি তৈরি করেছে ।

রাজবাড়িতে ঢোকার দরজা
ফটক দিয়ে ঢুকে আমরা প্রথমে গেলাম মূল বাড়িটাতে । বাড়ির ভিতরে জুতো খুলে ঢুকতে হয় । এগারো ধাপ সিঁড়ি উঠে (এটা তখন গুনিনি, পরে ছবি দেখে গুনেছি) বাড়ির ভিতরে ঢুকে সামনেই যে সুবিশাল হলঘরটা রয়েছে, সেটা যে এককালে বৈঠকখানা ছিল সে আর বলে দিতে হয় না । এই বৈঠকখানা ঘরের মধ্যে সোফা, শ্বেতপাথরের টেবিল, আলমারি ইত্যাদি অনেক আসবাবপত্র রয়েছে । উপাধ্যায় তথা গর্গ রাজবংশের অবস্থা যে বেশ উঁচুদরের ছিল, সেটা এখান থেকে ভালোই বোঝা যায় । এই ঘরের সামনে একজন ভদ্রলোক বসেছিলেন, যিনি বোধহয় এখানকার কেয়ারটেকার । ঢোকার সময়েই আমাদের বললেন সব ঘরের ভিতরেই ফোটো তোলা বারণ, তাই আমরা এখানে কোনও ছবি তুলিনি ।

বৈঠকখানা ঘর থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে গেলে বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে যে ঘরটা রয়েছে সেটাকে লাইব্রেরী ঘর বলা চলে । ঘরটা বিরাট বড় না হলেও এখানে বেশ কয়েকটা আলমারি রয়েছে আর সেগুলোয় বই ঠাসা । এর মধ্যে কোনও দুষ্প্রাপ্য বই আছে কিনা জানি না, তবে বইগুলো যে সযত্নেরক্ষিত সে'কথা বলা চলে না । হয়তো নিয়মিত ঝাড়পোঁছ করা হয়, কিন্তু সজ্জিতকরণের অভাব । এখানে আমাদের চেনাজানা কয়েকটা বইও দেখতে পেলাম ।

লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে পুবদিকের বারান্দা দিয়ে গেলে প্রথমে শিকারের ঘর । এখানে বিভিন্ন আকারের, বিভিন্ন ধরনের অনেকগুলো বন্দুক, রাইফেল, রিভলভার, পিস্তল ইত্যাদি রাখা রয়েছে । এর পাশের একটা ঘরে শিকার করা জানোয়ারদের মাথা, দেহ ইত্যাদি স্টাফ করে রাখা আছে । সেখান থেকে বেরোলে আরেকটা ঘরে একগাদা বাদ্যযন্ত্র রাখা আছে । সবমিলিয়ে দেখে বোঝা যায় যেকোনও বড় রাজপরিবারের মতো মহিষাদল রাজবাড়িতেও বিভিন্ন সময়ে সঙ্গীত, শিকার ইত্যাদির বিশেষ প্রচলন ছিল ।

বাড়ির পিছন দিকে একটা অপেক্ষাকৃত চওড়া বারান্দা । সেখানে একটা বিশাল শ্বেতপাথরের গোল টেবিল আর তার চারদিকে চারটে চেয়ার । চাইলে এখানে কিছুক্ষণ বসাও যেত, কিন্তু দু'টো চেয়ারে দু'জন লোক বসেছিল (বোধহয় বাড়ির দেখাশোনা করে), তাই আর বসলাম না । এনাদের জিজ্ঞেস করলাম দোতলায় দেখার কিছু আছে কিনা । উত্তরে জানলাম দোতলাটা সাধারণ লোককে দেখতে দেওয়া হয়না কারণ সেখানে বাসযোগ্য ঘর আছে আর গর্গ পরিবারের লোকজন এখানে এলে ঐ ঘরগুলোতেই থাকেন । একতলায় উত্তরপূর্ব কোণে একটা শোওয়ার ঘর আছে, আমরা সেটায় ঢুকলাম ।

ঘরটা বেশ বড়, প্রায় মাঝখানে একটা ছত্রিবিশিষ্ট খাট । খাটটা মেঝে থেকে বেশ কিছুটা উঁচু বলে ওঠার জন্য একটা রেলিংবিশিষ্ট কাঠের সিঁড়ি রয়েছে । বড় খাটটা ছাড়াও দেওয়ালের পাশে আরেকটা ছোট খাট আছে যেটা সম্ভবতঃ বাচ্চা শোওয়ানোর জন্য ব্যবহার হত । এছাড়া ঘরে একটা ড্রেসিং টেবিল, একটা আলমারি, একটা পিয়ানো ইত্যাদি রয়েছে ।

বারান্দায় রাখা পালকি
ঘর থেকে বেরিয়ে আমরা আবার বাড়ির সামনের দিকে চলে এলাম । আগেই দেখেছিলাম সামনের বারান্দায় একটা পালকি রাখা রয়েছে । এখানে ছবি তোলার কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই বলে এটার ছবি তুললাম ।







মহিষাদল রাজবাড়ির একটা বিশেষ উল্লেখযোগ্য অংশ হল বাড়ির সামনের বিশাল গোলাকৃতি বাগান । এখানে বেশ কিছু চেয়ার, বেঞ্চি ইত্যাদি রাখা রয়েছে । মে মাসের দুপুরে গরম যথেষ্ট, কিন্তু সেটা এখানে ততটাও লাগছিল না কারণ দিগন্তবিস্তৃত মাঠের ওপর দিয়ে খুব মনোরম হাওয়া দিচ্ছিল । বেশ বুঝতে পারছিলাম গরমকালে সন্ধ্যেবেলা আর শীতকালের দুপুরবেলা এখানে বসে থাকতে দিব্যি লাগবে । এই গোল বাগানটাকে ঘিরে আবার একটা ফুলের বাগান, সেখানে একাধিক গাছপালা রয়েছে । দেখে বোঝা যায় বাগানটার বেশ ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় ।

সতীপ্রসাদ গর্গের মূর্তি
বাড়ির দক্ষিণ দিকে মাঠের মধ্যে দিয়ে পায়ে চলা পথে কিছুটা গেলে একটা শ্বেতপাথরের মূর্তি দেখতে পাওয়া যায়, সেটা রাজা সতীপ্রসাদ গর্গের । ১৯১৩ সালে ইনি ব্রিটীশ সরকারের কাছ থেকে 'রাজাবাহাদুর' খেতাব পান । মূর্তির নিচের ফলক থেকে জানলাম গর্গমশাই ২৭শে ডিসেম্বর ১৮৮২ থেকে ১৯শে মার্চ ১৯২৬ পর্যন্ত্য বেঁচেছিলেন ।











গোপাল জেউ মন্দির
আমাদের ফুলবাগ রাজবাটী দেখা শেষ, তাই আমরা হাঁটা লাগালাম রঙ্গীবসান রাজবাটীর দিকে । দুপুরবেলা পুরো এলাকায় বিশেষ লোকজন নেই, তাই খুঁজে পেতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছিল । একজন আইসক্রিমওয়ালার থেকে পথের হদিস জানতে পারলাম (হ্যাঁ, সেইসঙ্গে ম্যাঙ্গো স্টিক আইসক্রিমও খেলাম !)। হেঁটে যাওয়ার পথটা বেশ সুন্দর, একটা পুকুর, আমবাগান ইত্যাদি দেখা যায় । একেবারে গ্রাম আর কি ! যাওয়ার পথে একটা মন্দির পড়ে, সেটার নাম গোপাল জিউ মন্দির । মন্দিরের আদলটা একেবারে দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণীর মন্দিরের মতো । দুপুরবেলা মন্দিরের গেট বন্ধ, তাই বাইরে থেকে দেখেই খুশি থাকতে হল ।


পুরনো রাজবাড়ির সিংহদুয়ার
মন্দিরের সামনের রাস্তা ধরে আরও মিনিট তিনেক হাঁটলে পুরনো রাজবাড়িটা দেখতে পাওয়া যায় । বাড়ির চারদিকে লোহার ভারা আর টিনের পাঁচিল - দেখেই বোঝা যায় সংস্কারের কাজ চলছে । বাড়ির সামনের রাস্তা ধরে গেলে বাড়ির প্রধান ফটক বা সিংহদুয়ার । এটার উপরের তলায় লোকজন থাকে । আমরা সিংহদুয়ার দিয়ে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আবার ফুলবাগ রাজবাড়ির দিকে চলে এলাম কারণ আমাদের গাড়ি ওখানেই রাখা আছে ।

হেঁটে আসার পথে একটা ঘটনা ঘটল যেটা আমাদের দু'জনকেই খুব আপ্লুত করল । একজন ভদ্রলোক বরফ দেওয়া লেবুর সরবৎ বিক্রি করছিলেন । গরমের দুপুরের ঘন্টাদেড়েক হাঁটাহাঁটি করার পর এর থেকে উপাদেয় জিনিস আর হয়ই না । আমরা একগ্লাস করে খাওয়ার পরে তিনি নিজে থেকেই জিজ্ঞেস করলেন আমরা কোথা থেকে আসছি ইত্যাদি । তারপর ওনার ঝোলা থেকে একটা পাকা আম বের করে আমাদের দিলেন । এটা এখানকার আমবাগানের আম, অনুরোধ করলেন আমরা যেন বাড়ি গিয়ে সেটা খাই । ভদ্রলোককে বিদায় জানিয়ে আমরা চলে এলাম । এই আন্তরিকতা সচরাচর শহরাঞ্চলের অপরিচিত মানুষের মধ্যে দেখা যায় না, সেই বিষয়ে আমরা দু'জনেই একমত ।

এবার ফেরার পথ ধরলাম । যেপথে গিয়েছিলাম, আবার সেই পথেই ফিরে এলাম । ফেরার পথে আর কোথাও দাঁড়াইনি । সন্ধ্যে ছটার মধ্যে বাড়ি পৌঁছে গেলাম !

সারসংক্ষেপঃ

১. কলকাতা থেকে ডে-আউট ট্রিপে ঘোরার জন্য অন্যতম অপ্শ‌ন্‌ হল মহিষাদল রাজবাড়ি । পূর্ব মেদিনীপুর জেলার হলদীয়া মহকুমার মধ্যে অবস্থিত এই রাজবাড়ি দেখার জায়গা হিসেবে বেশ সুন্দর ।
২. কলকাতা থেকে গাড়ি নিয়ে মহিষাদল যেতে ঘন্টাতিনেক লাগে । এছাড়া হাওড়া স্টেশন থেকে হলদীয়া লোক্যালে সতীশ সামন্ত হল্ট স্টেশনে নেমেও এখানে যাওয়া যায় । স্টেশন থেকে টোটো বা রিক্সায় মহিষাদল রাজবাড়ি যেতে মিনিট পনেরো লাগে ।
৩. বর্তমানের প্রধান রাজবাড়িটা হচ্ছে সংগ্রহশালা । এখানে বিভিন্ন ঘরে বিভিন্ন দেখার জিনিস আছে ।
৪. মূল রাজবাড়ির কাছে একটা পুরনো রাজবাড়ি আছে যেটা বর্তমানে সংস্কার চলছে । সংস্কার হয়ে গেলে এটাও হয়তো একটা দেখার জায়গা হবে ।
৫. দুই রাজবাড়ির মাঝে একটা গোপালের মন্দির আছে । মন্দিরটা দুপুরবেলা বন্ধ থাকে, তাই বিকেলের দিকে গেলে মন্দির খোলা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে ।
৬. এখানে বছরের যেকোনও সময়েই যাওয়া যেতে পারে তবে বর্ষাকালটা এড়িয়ে যাওয়াই ভালো । রাস্তাঘাট অনেকাংশেই মাটির, তাই বর্ষাকালে চলাচলের পক্ষে অনুকূল নাও থাকতে পারে ।
৭. রাজবাড়ির একেবারে কাছে কোনও দোকানপাট নেই । তবে মহিষাদল বাজার বা কলেজ এলাকায় বেশি কিছু দোকানপাট এবং সেইসঙ্গে খাবারের দোকান আছে ।

উপসংহারঃ

মহিষাদল রাজবাড়ি
রাজতন্ত্র জিনিসটা আমাকে চিরকালই বেশ আকর্ষণ করে । ইংরেজ আমল শুরু হওয়ার আগে প্রধানতঃ জমিদারদেরই রাজা বলা হত, এই মহিষাদল রাজবাড়ি সেরকমই একটা রাজবাড়ি । ব্রিটীশরা রাজাদের ক্ষমতা অনেকটাই কেড়ে নিলেও প্রজাবৎসল ভালো রাজার প্রতি প্রজাদের আনুগত্য তাতে কমেনি । আমরা এই রাজবংশের ইতিহাস যতটা জানতে পেরেছি, সেটা এঁদের নিজেদেরই প্রকাশ করা তাই তার থেকে কয়েনের ও'পিঠের ছবিটা দেখতে পাওয়া সম্ভব নয় । সত্যি বলতে কি, না পেলে বিশেষ কিছু আসে যায়ও না । রাজা নেই, রাজতন্ত্রও নেই কাজেই সেই রাজা কেমন ছিলেন সে'প্রশ্ন অবান্তর । যেটা ভালো লাগল যে এই বংশের বংশধররা আজও চেষ্টা করে যাচ্ছেন এই বংশের ইতিহাসকে ধরে রাখতে আর সেটা পর্যটকদের সামনে তুলে ধরতে । আর সেই চেষ্টায় প্রয়োজন পর্যটকদেরও সক্রিয় অংশগ্রহণ । বিশাল কিছু দেখতে পাওয়ার প্রত্যাশা নয়, প্রয়োজন আমাদের খুব কাছে অবস্থিত প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো রাজপরিবারের কীর্তিকলাপ নিজের চোখে দেখার ইচ্ছে । আছে ? তাহলে আরে কি, বেরিয়ে পড়তে হবে !

মহিষাদল রাজবাড়ি ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.