আমি ব্লগ লেখার খুব বেশি সমর্থক কোনওদিনও ছিলাম না, সত্যি কথা বলতে কি এখনও যে আছি তা নয় । তার একটা প্রধান কারণ আমার ধারণা ব্লগ লেখার থেকেও পড়া অনেক বেশি ক্লান্তিকর । অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অনেক সময়ই পড়তে শুরু করে শেষ করা হয়ে ওঠে না । নিজের ধৈর্য এবং/অথবা আগ্রহের অভাবকে 'ঠিক আছে, বাকিটা পরে পড়ব' জাতীয় অজুহাত দিয়ে ঢেকে দিই - আর আমরা সবাই জানি সেই 'পরে' টা আর কখনওই আসে না । তো, এই কারণে আমি ঠিক করেছি আমার ব্লগকে কখনওই অন্যের ক্লান্তির কারণ ঘটাব না, আমার ব্লগের বিষয় হবে প্রধানতঃ ভ্রমণ । আমার মতো যেসব বাঙালিরা ঘুরতে ভালোবাসে, তাদের জন্য আমার ব্লগ হবে তথ্যের একটা উৎস । আমার নিজের একটা অভ্যেস আছে, কোনও জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার আগে সেই জায়গাটা সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, আর ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে আমার বরাবরই মনে হয়েছে যে ইন্টারনেটে লেখালেখি করার ব্যাপারে বাঙালিদের থেকে কুঁড়ে খুব কম শিক্ষিত জাতই আছে । আমার মতো যেসব বাঙালিরা আছে, যারা ইন্টারনেটে কোনো একটা ইংরিজীতে লেখা দেখলেই না পড়ার চেষ্টা করে, তাদের জন্য আমার ব্লগ সহায়ক হবে, এই বিশ্বাস নিয়ে শুরু করছি আমার ভ্রমণকাহিনী । আগেই বলে রাখি, আমি স্ট্যাটিসটিক্সের ছাত্র ছিলাম, তাই আমার ব্লগে তত্ত্বের থেকে তথ্যের দেখাই মিলবে বেশি ।

Tuesday, October 14, 2025

জুলুক ভ্রমণ

বিশেষ সতর্কীকরণ ঃ

১. এই পুরো ভ্রমণে আমরা কোনও অবস্থাতেই কোনও পলিথিন বা প্লাস্টিক ব্যবহার করিনি। অর্থাৎ প্লাস্টিকের ব্যবহার না করেও এই ভ্রমণ অনায়াসে করা যায়।

২. এই পুরো ভ্রমণে আমরা কোনও কাগজ ব্যবহার বা নষ্ট করিনি। হোটেল বুকিং-এর রশিদ-এর প্রিন্ট আউট ব্যবহারের কোনও প্রয়োজন হয় না।

৩. এই পুরো ভ্রমণে আমাদের দলের কেউ ধূমপান করেনি। ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর।

আমার ব্লগের সমস্ত পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করছি প্লাস্টিক, অপ্রয়োজনীয় কাগজের ব্যবহার আর ধূমপান বর্জন করার জন্য।

ভ্রমণপথ ঃ

বৃহস্পতিবার ৯ই অক্টোবর, ২০২৫ঃ কলকাতা থেকে রাত্রি ৯ঃ৪৫ মিনিটে গুয়াহাটি গরীব রথ এক্সপ্রেস।

শুক্রবার ১০ই অক্টোবর, ২০২৫ঃ সকাল ৮ঃ৩০ মিনিটে - নিউ জলপাইগুড়ি - পদমচেন - পদমচেনে রাত্রিবাস।

শনিবার ১১ই অক্টোবর, ২০২৫ঃ পদমচেন থেকে জুলুকের সাইট সিয়িং - পদমচেনে রাত্রিবাস ।

রবিবার ১২ই অক্টোবর, ২০২৫ঃ সকাল ১০ঃ৩০ মিনিটে চেক্‌ আউট - গাড়িতে মানখিম - মানখিম-এ রাত্রিবাস।

সোমবার ১৩ই অক্টোবর, ২০২৫ঃ সকাল ৮টায় চেক্‌ আউট - নিউ জলপাইগুড়ি - সন্ধ্যে ৬ঃ২০ মিনিটে গুয়াহাটি ওখা এক্সপ্রেস - রাত্রি ৮ঃ১৫ মিনিটে বারসোই - রাত্রি ১০ঃ০২ মিনিটে রাধিকাপুর কলকাতা এক্সপ্রেস।

মঙ্গলবার ১৪ই অক্টোবর, ২০২৫ঃ সকাল ৬ঃ৩৫ মিনিটে কলকাতা।

জুলুক ভ্রমণের সম্পর্কে লেখার আগে একটু পূর্বকথন দিয়ে শুরু করা যাক। জুলুক যাওয়ার পরিকল্পনা আমরা প্রথম করেছিলাম ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে - যাওয়ার কথা ছিল ২০১৫ সালের জানুয়ারী মাসে। সেইমতো একটা ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে কথা বলা, তাদের অ্যাডভান্স করা - সবই হয়ে গিয়েছিল। তারপর নভেম্বর মাসে জানা গেল অমৃতা সন্তানসম্ভবা আর ডাক্তারের নির্দেশে অতদূরে বেড়াতে যাওয়া চলবে না। তাই ভ্রমণের পরিকল্পনা বাতিল করতে হল। তখন শুধু সন্তানের সম্ভাবনার কথাই জেনেছিলাম, কিন্তু কিছুদিন পরে ইউ এস জি-র রিপোর্ট থেকে জানা গেল সম্ভাবনাটা যুগ্ম-সন্তানের ! সেই যুগ্ম-সন্তান ভূমিষ্ঠ হল, ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল কিন্তু জুলুকের উচ্চতা আর ঠান্ডা সহ্য করার মতো বড়ো হতে সময় লাগে।

এতদিনে হয়েছে বলে আমার ধারণা। আর তাই পুনর্পরিকল্পনা করে ফেলা হল - জুলুক ভ্রমণের।

পুজোর ছুটিতে ট্রেনে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার ব্যাপারে সবথেকে কঠিন সমস্যা হল টিকিট পাওয়া। তাও আবার বিশেষ করে নিউ জলপাইগুড়ির টিকিট। শিয়ালদা বা হাওড়া থেকে টিকিট পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেইই দেখে আমি টিকিট কেটেছিলাম কলকাতা স্টেশন থেকে গুয়াহাটি গরীব রথ এক্সপ্রেসের। বৃহস্পতিবার ৯ই অক্টোবর, ২০২৫ আমাদের যাত্রা শুরু। আমাদের এবারের দল ১৫ জনের। আমি অমৃতা বাবা মা কথা কলি লালমাসি মেসোমশাই বুবুমাসি মেসোমশাই দিদিভাই রাজীবদা দিদি আনন্দদা আর পটাই। ট্রেন নির্ধারিত সময়েই ছাড়ল। দিদিভাইদের বাড়ি শ্রীরামপুরে, তাই ওরা কলকাতার বদলে ব্যান্ডেল থেকে ট্রেনে উঠল। সবাই ট্রেনে ওঠার পরে আমরা সঙ্গে নিয়ে যাওয়া রুমালি রুটি, চিলি চিকেন আর মিষ্টি দিয়ে ডিনার সেরে শুয়ে পড়লাম।

পরেরদিন শুক্রবার ১০ই অক্টোবর, ২০২৫ - আমাদের ট্রেন নির্ধারিত সময়ের একঘন্টা পরে আমাদের নিউ জলপাইগুড়িতে নামিয়ে দিল। আমরা ওয়েটিং রুমে গিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে নিয়ে স্টেশন থেকে বেরোলাম দশটা নাগাদ। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে শেষবার এসেছিলাম দুবছর আগে সিটং ভ্রমণ থেকে ফেরার সময়ে। বাইরে বেরিয়ে দেখলাম স্টেশন চত্বরের চেহারা বদলে গেছে। স্টেশনের বাইরে বিশাল কিছু একটা কর্মকান্ড চলছে, পুরো জায়গাটা জুড়ে নানারকম নির্মাণের কাজ হচ্ছে (পরে জেনেছি নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনকে আধুনিকীকরণ করা হচ্ছে যার ফলে এখানে বিশ্বমানের এয়ারপোর্টের মতো টার্মিনাল তৈরি হবে যেখানে অধিক সংখ্যক যাত্রীধারণ ক্ষমতাসমেত আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, বৃহত্তর পার্কিং এলাকা, সুদৃঢ় নিরাপত্তাব্যবস্থা, পরিবেশ বান্ধব ব্যবস্থাপনা থাকবে)। আর এই নির্মাণকান্ডের জন্য বর্তমান পার্কিং এলাকাটা স্টেশন থেকে বেশ কিছুটা দূরে চলে গেছে। মালপত্র নিয়ে এই দূরত্বটা হাঁটতে আমাদের প্রায় পনেরো মিনিট লাগল। তারপর দুটো গাড়িতে উঠে রওনা দিলাম আমাদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।

আমাদের যাওয়ার রাস্তা সেভক্‌ রোড ধরে। এই পথে এর আগে অনেকবার গিয়েছি আর রাস্তাটা আমার খুব পছন্দের। সমতলের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে রাস্তাটা যেন হঠাৎ করেই পাহাড়ে উঠে যায়। পাহাড়ী পথের বিবরণ আলাদা করে দেওয়ার কিছু নেই কারণ যারা এই দৃশ্য দেখেছে তাদের কাছে এর বিবরণ বাহুল্যমাত্র আর যারা দেখেনি তাদের কাছে বিবরণ দিয়ে এই সৌন্দর্য বর্ণনা করা যায় না। ব্রেকফাস্ট আমরা কলকাতা থেকেই সঙ্গে নিয়ে এসেছিলাম, গাড়ি চলাকালীন সেগুলোর সদ্ব্যবহার করে ফেললাম।

এবারের যাওয়ার পথের সম্পর্কে একটা তথ্য জানানোর দরকার, সেটা এখানে লিখে রাখি। গত বেশ কিছুদিন ধরেই উত্তরবঙ্গে প্রবল বর্ষণের কারণে বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এটা আমরা খবরের চ্যানেলের দৌলতে ভালভাবেই জানতাম। কিছু কিছু জায়গায় সেভক রোড 'ব্যাপকভাবে' ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যানচলাচলের অযোগ্য হয়ে গেছে শুনে একটা সময়ে আমাদের যাওয়া বাতিল করার কথাও ভেবেছিলাম। যাই হোক, 'পরিস্থিতি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে' - খবরের চ্যানেলের এইজাতীয় হেডলাইন সামনে আসার পর আমরাও যাওয়ার সিদ্ধান্ত অপরিবর্তিত রেখেছিলাম। আর সেটা না করলে যে কত বড় ভুল করতাম, সেটা যাওয়ার সময়ে বুঝতে পারলাম। পুরো রাস্তায় মাত্র চারজায়গায় এরকম হয়েছে যে ধসের কারণে রাস্তার একদিকটা ভেঙে গেছে বলে অন্যদিকের সিঙ্গল্‌ লেন দিয়ে দু'দিকের গাড়ি পালা করে চলছে। একইসঙ্গে মেরামতির কাজও চলছে। এজন্য আমাদের পৌঁছতে কিছুটা দেরি হলেও পৌঁছনো অসম্ভব ছিলনা। খবরের চ্যানেল, খবরের কাগজ বিভ্রান্তিমূলক খবর প্রচার করে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে কারণ তাতেই ওদের টি আর পি বাড়ে। কিন্তু এইসব ক্ষেত্রে ওদের উপর নির্ভর না করে স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে আসল পরিস্থিতিটা জানা যায়। যাওয়ার আগে আমরা ঠিক সেটাই করেছিলাম।

রেস্ট্যুরেন্টের পাশে তিস্তা

এরপর একজায়গায় লাঞ্চের জন্য দাঁড়ানো হল। রেস্ট্যুরেন্টটা একেবারে তিস্তার ধারে। বারান্দা থেকে তিস্তার বাঁকের দারুণ সৌন্দর্য দেখা যায়। এখানে আমরা লাঞ্চ করলাম প্রধানতঃ মোমো আর থুক্‌পা দিয়ে, শুধু দুজন ভাত ডাল ইত্যাদি নিল। খরচ পড়ল ৩,৩৮০/- টাকা। আবার এগিয়ে চলা।


আমাদের গন্তব্য পূর্ব সিকিমের পদমচেন। আমাদের ভ্রমণ জুলুকের হলেও আমরা জুলুকে থাকিনি। কারণ জুলুক ইদানীং খুব বিখ্যাত হয়ে যাওয়ার কারণে এখানকার হোম্স্টে‌গুলোর একটু নাকউঁচু হয়ে গেছে। চার্জ বেশি আর পরিষেবা খারাপ। এইসব কারণে আমরা জুলুক থেকে ৫২ কিলোমিটার নিচে পদমচেনে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি পূর্ব সিকিমে পদম্‌চে নামেও একটা জায়গা আছে। গুগ্‌লে পদমচেন সার্চ করলে ঠিক জায়গাটাই দেখায়, কিন্তু সার্চটা গুগ্‌ল ম্যাপে করলে ওটা নিজে থেকেই পদম্‌চে-তে চলে যায় কারণ গুগ্‌ল ম্যাপে পদমচেন জায়গাটার নামের ইংরিজী বানান Phadamchen. অর্থাৎ ম্যাপে পদমচেনকে খুঁজতে গেলে ফদমচেন-কে খুঁজতে হবে ! এই ফদম্‌চেন পদমচেন যাওয়ার পথে আমরা দাঁড়ালাম আমাদের প্রথম সাইট্‌সিয়িং-এ।

শ্রী বিশ্ববিনায়ক মন্দির
শ্রী বিশ্ববিনায়ক মন্দির - শ্রী বিশ্ববিনায়ক মন্দির পাহাড়ের ধারে একটা গণেশের মন্দির। গণেশের মূর্তির বৈশিষ্ট্য হল এর চোদ্দোটা হাত। এরকম মূর্তি আমি আগে কোথাও দেখিনি। মন্দিরের ভিতরটা বেশ বড়। আমরা পৌঁছেছি বিকেল সাড়ে চারটের সময়ে, তখন আমরা ছাড়া আর কোনও লোক ছিল না। মূল মন্দিরের বাইরে আরেকটা ছোট মন্দির আছে সেটা হনুমানের।






দেবাসুরের লড়াই
মন্দিরের বাইরের চত্বরটাও বেশ বড়। এর একপাশে অর্থাৎ পাহাড়ের খাদের দিকের পাঁচিলে রয়েছে সমুদ্রমন্থনের মূর্তি। দুদিক থেকে দেবতা আর অসুররা বাসুকীকে ধরে টানাটানি করছে বাসুকীর সাহায্যে সমুদ্রমন্থন করছে আর মাঝে নীলকন্ঠ শিব মন্দার পর্বতের উপর বসে রেফরি-ইং করছে। (আমি আর অমৃতা এই মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছি - আমরা ওদের টানাটানিতে সাহায্য করছি এরকম পোজ দিয়ে। বলা বাহুল্য, অমৃতা দেবতাদের দিকে আর আমি অসুরদের দিকে !)

আরও মিনিট চল্লিশেক চলার পরে আমরা দাঁড়ালাম রংলি বাজারে। এরপর আমরা যে এলাকায় ঢুকতে চলেছি সেটা সংরক্ষিত এলাকার মধ্যে পড়ে, তাই এখান থেকে আমাদের প্রোটেক্টেড এরিয়া পারমিট জোগাড় করতে হল। সাধারণতঃ গাড়ির ড্রাইভার রংলি থানা থেকে এই পারমিট সংগ্রহ করে। গাড়িপিছু খরচ ১,০০০/- টাকা। রংলি বাজার থেকে কিছুটা এগোনোর পরে একটা চেক্‌পয়েন্টে দাঁড়াতে হল। এটার কথা উল্লেখ করলাম কারণ এখানে আমাদের জোর করে একটা অক্সিজেন ক্যান কিনিয়ে ছাড়ল। উপরে উঠলে অক্সিজেনের অভাব ঘটতে পারে, বয়স্ক লোকদের অসুবিধে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি বলে। আমরা জানি এই অক্সিজেন ক্যান একটা একেবারে ফালতু জিনিস, এগুলোতে কিছুই থাকে না। কিন্তু না কিনলে ওরা যেতে দেবে না, তাই বাধ্য হয়ে ৬০০/- টাকা দিয়ে কিনতে হল। জুলুক যেতে হলে এই অক্সিজেন ক্যান জিনিসটা কলকাতা থেকে কিনে নিয়ে যাওয়াই ভালো। কারণ একে তো কলকাতার ওষুধের দোকান থেকে কিনলে জিনিসটা ঠিকঠাক হবে আর সেইসঙ্গে দামও কম পড়বে। সঙ্গে একটা ক্যান থাকলে এরা এদের ক্যান কেনার জন্য জোর করতে পারবে না।

কিউ খোলা ফলস্‌
কিউ খোলা ফলস্‌ - আরও আধঘন্টা মতো চলার পরে আমরা পৌঁছলাম কিউ খোলা ফল্‌সে। ফল্‌স্‌টা রাস্তার ধারেই, তাই গাড়ি থেকে না নেমেও দেখা যায়। তবে আমরা কয়েকজন গাড়ি থেকে নেমেই দেখলাম। সন্ধ্যে ছটা বেজে গেছে, বাইরে একেবারে অন্ধকার কিন্তু কিউ খোলা ফল্‌সের কাছে বেশ বড় আলোর ব্যবস্থা আছে, তাই দেখতে কোনও অসুবিধে হয় না। ফল্‌সে ভালোই জল আছে আর জলটা বেশ উপর থেকে পড়ছে বলে শব্দও যথেষ্ট। বাইরে খুব ঠান্ডা নেই, গরম জামা না পরলেও দিব্যি চলে যায়।






আরও মিনিট পনেরো চলার পরে পৌঁছলাম আমাদের গন্তব্য - 'সাইলেন্ট উড রিট্রিট' হোমস্টে-তে। হোমস্টে-টা খুব বেশি বড় নয়, দুটো তলা মিলিয়ে বারোটা মতো ঘর যার মধ্যে চারটে সিঙ্গল রুম। হোমস্টেটা বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন - ঘরগুলো বেশ বড়। একপাশে রান্নাঘরের লাগোয়া ডাইনিং হল যেখানে একসঙ্গে ২৫ - ৩০ জন খেতে পারে। আমরা চেক্‌ইন করার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের পেঁয়াজের পকোড়া আর চা দিল। আর রাত সাড়ে নটায় ডিনার। ডিনারের মেনু রুটি, ডাল, আলুভাজা আর চিকেন। সাইলেন্ট উড রিট্রিটের রান্না বেশ ভালো। এইসব পাহাড়ী জায়গায় হোমস্টেগুলোতে সাধারণতঃ থাকা আর খাওয়া মিলিয়ে একটা প্যাকেজ হয়। আমাদের কার্সিয়ং ও সিটং ভ্রমণ-এর সময়ে সিটং-এও এই একই ব্যবস্থা ছিল। আর সবজায়গায় খাবারের মেনুও একই - ব্রেকফাস্টে পাঁউরুটি বা লুচি, লাঞ্চে ভাত ডিমের কারি, সন্ধ্যেবেলা পকোড়া আর ডিনারে রুটি / ভাতের সঙ্গে চিকেন।

শনিবার ১১ই অক্টোবর, ২০২৫ - আমাদের জুলুকের সাইট সিয়িং-এর দিন। আগেরদিন রাতেই হোমস্টের ম্যানেজার আমাদের বলে রেখেছিলেন যে আমাদের সকাল সকাল বেরোতে হবে, তা না হলে লাঞ্চের আগে ফিরতে পারব না। উপরে খাবারের কোনও দোকান নেই, তাই খাবার আগে আমাদের হোটেলে ফিরতে হবে। ব্রেকফাস্টে ম্যাগী খেয়ে সকাল আটটা নাগাদ আমরা রওনা দিলাম জুলুক-এর দিকে।

যাওয়ার পথে কাঞ্চনজঙ্ঘা
পদমচেনের উচ্চতা মোটামুটিভাবে ৮,৫০০ ফুট আর জুলুকের উচ্চতা ১০,০০০ ফুটের মতো। জুলুকের সবচেয়ে বড়ো আকর্ষণ হল এর বিখ্যাত সিল্করুট। পাহাড়ী পথে আমরা যতই উপরে উঠছিলাম, ততই নিচের দিকে তাকালে ফেলে আসা এই সুন্দর রাস্তাটা দেখতে পাচ্ছিলাম। পাহাড়ের গা-দিয়ে জিগজ্যাগভাবে ক্রমশঃ উপরে উঠে গেছে এই রাস্তা। যেতে যেতে একসময়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখাও মিলল।

জুলুকের বিখ্যাত জিগজ্যাগ রাস্তা
জুলুক ভিউ পয়েন্ট - ঘন্টাখানেক চলার পরে আমাদের গাড়ি একসময়ে একটা ভিউ পয়েন্টে দাঁড়াল আর আমরা গাড়ি থেকে নেমে ভালো করে এই জিগজ্যাগ রাস্তাটা দেখলাম। আকাশ ঝকঝকে পরিষ্কার আর চমৎকার রোদ উঠেছে, তাই পরিবেশটা বেশ মনোরম। ঠান্ডা আছে, কিন্তু সাঙ্ঘাতিক কিছু নয়। এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘাও খুব সুন্দর দেখা যায় যদিও এই দৃশ্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না, মেঘ এসে ঢেকে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে মেঘের মধ্যে জিগজ্যাগ রাস্তাটাও প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেল আর আমরা গাড়িতে উঠে আরও উপরে উঠতে শুরু করলাম।

প্রাচীনযুগ থেকে মধ্যযুগে এই সিল্ক রুট ছিল তিব্বত ও ভারতের মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ। মোটামুটিভাবে খ্রীষ্টপূর্ব দুশো থেকে পনেরোশো শতাব্দী পর্যন্ত এই পথে ভারত ও তিব্বত তথা চিনের মধ্যে বাণিজ্যিক আদানপ্রদান চলত আর জিনিসপত্রের মধ্যে অন্যতম প্রধান ছিল সিল্ক যা একসময়ে তিব্বত ও চিন থেকে সারা পৃথিবীতেই রপ্তানী হত। সেই সিল্ক আসার রুট-ই সিল্ক রুট নামে পরিচিত।

গাছপালাহীন রুক্ষ পাহাড়
আমরা যে ক্রমশঃ উপরের দিকে উঠছি সেটা শুধু রাস্তা দেখে নয়, প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখেও বোঝা যাচ্ছে। জুলুকের ১০,০০০ ফুট থেকে যতই উপরে উঠছি, গাছপালার সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসছে। পাহাড়ের গায়ে যে ছোটবড় অসংখ্য গাছ থাকে, যাদের জন্য পাহাড়ের রঙ সবুজ দেখায়, সেগুলো আর বিশেষ দেখা যাচ্ছে না। তার বদলে ছোট ছোট ঝোপঝাড় আর একসময়ে গিয়ে সেগুলোও আর দেখা না গিয়ে শুধুই রুক্ষ পাহাড়। আমি পাহাড়ের এতটা উচ্চতায় এর আগে একবারই উঠেছি গ্যাংটক ভ্রমণ-এর সময়ে কিন্তু তখন তুষারপাত হয়েছিল বলে পাহাড়ের রঙ সর্বত্রই সাদা দেখেছিলাম।

রাস্তা খুবই ভালো আর বেশ চওড়া। পুরো রাস্তায় ট্যুরিস্টের গাড়ির থেকেও যেটা বেশি চোখে পড়ে সেটা হল আর্মির গাড়ি। এই এলাকাগুলো চিনের সীমানার খুবই কাছে আর তাই এখানে নিরাপত্তারও খুব কড়াকড়ি। বেশ কয়েকটা আর্মি ব্যারাক-ও চোখে পড়ল। রাস্তায় দুজায়গায় আমাদের পারমিট চেকিং হল। কিছুক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছিলাম যে ঘুম ঘুম পাচ্ছে। গাড়িতে একটানা যাওয়ার সময়ে ঘুম পেতেই পারে, কিন্তু গাড়ির সবাই-ই একসঙ্গে ঘুমিয়ে পড়াটা একটু অস্বাভাবিক। কথা-কলি মাঝে মাঝে বলছিল পেট ব্যাথা করছে। এগুলো সবই ঘটছে এই উচ্চতায় অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে। আগেরদিনের কেনা অক্সিজেন ক্যানটা কোনও কাজের জিনিস নয়, তবে সঙ্গে যে অব্যর্থ জিনিসটা আছে সেটা হল কয়েকটা ছোট ছোট কৌটয় কিছুটা করে কর্পূর। এটা আমরা বাড়ি থেকেই নিয়ে এসেছিলাম উচ্চতার কথা মাথার রেখে। কর্পূরের কৌটর ঢাকনা খুলে মাঝে মাঝে একটু করে শুঁকলে অক্সিজেনের অভাবজনিত অসুবিধেগুলো থেকে সাময়িক আরাম পাওয়া যায়।

ঘন্টাদেড়েক এইভাবে চলার পরে আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের গন্তব্যে যেটা আমাদের এবারের ভ্রমণের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ বলা যেতে পারে। সেইসঙ্গে জায়গাটা আমার নিজের সর্বোচ্চ উচ্চতায় পদার্পণ - এত উঁচুতে আমি জীবনে কখনও উঠিনি (আঃ বিমানে চড়ে উঁচুতে ওঠার কথা এখানে ধরা হচ্ছে না !)। এখানে ভারত আর চিনের বর্ডার - এর উচ্চতা ১৪,১৪০ ফুট ! জায়গাটার নাম নাথুলা।

নাথু লা - নাথুলা-কে নাথুলা পাস বলা যেতেই পারে, কিন্তু বললে ভুল বলা হবে (অনুরূপ সংলাপ ঋণ - সৃজিত মুখার্জী পরিচালিত 'ইয়েতি অভিযান' সিনেমা) ! এর কারণ তিব্বতী ভাষায় 'লা' কথাটার মানেই পাস, তাই আলাদা করে আর পাস বলার কোনও দরকার নেই। শুধু নাথু লা।

নাথু লায় ওঠার সিঁড়ির পথ
নাথু লায় পৌঁছে আমরা গাড়ি থেকে নামলাম। এটা একটা ট্যুরিস্ট স্পট, প্রচুর লোকজন এসেছে। গাড়ি যে পর্যন্ত যায়, তারপরে পাহাড়ের গায়ে কিছুটা সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে উঠতে হয়। কথা, কলি আর আমি এই পথটা উঠতে শুরু করলাম। কয়েকটা ধাপ ওঠার পরেই অনুভব করলাম নিঃশ্বাস নিতে একটু অসুবিধে হচ্ছে। তিনজনেই সঙ্গে থাকা হোমিওপ্যাথি ওষুধ কোকা-৩০ এর কয়েকটা বড়ি খেয়ে নিলাম। এই ওষুধও শরীরের অক্সিজেনের ঘাটতির সঙ্গে মোকাবিলা করে। ওষুধ খাওয়ার পরে আবার ধীরে ধীরে উপরে ওঠা শুরু করলাম। ওষুধটা একেবারে ম্যাজিকের মতো কাজ করে, কারণ পাঁচমিনিটের মধ্যেই অনুভব করলাম নিঃশ্বাসের সমস্যাটা আর হচ্ছে না। নাথুলার সিঁড়িগুলোর সুবিধে হল এগুলো একটা ধাপের পরে কিছুটা সমতল, তারপর আবার একটা ধাপ। একদিকে রেলিংও আছে। আর সবজায়গাতেই আর্মির লোকেরা রয়েছে, যেকোনও অসুবিধেয় পড়লে তাদের কাছে সাহায্য পাওয়া যাবে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময়ে ধীরে ধীরে একটু একটু করেই ওঠা উচিৎ, তার ফলে একদিকে যেমন ক্লান্তি কম হবে সেইসঙ্গে উচ্চতা বাড়ার কারণে অক্সিজেনের ঘাটতির সঙ্গে শরীর মানিয়ে নিতে পারবে।

বর্ডারের সামনে - পিছনের বাড়িটা চৈনিক
উপরে উঠলাম। আমাদের দলের মধ্যে শুধুমাত্র আমরা তিনজনই উপরে উঠতে পেরেছিলাম। ঠান্ডা সাংঘাতিকরকমের কিছু না হলেও হাওয়াটা প্রচন্ড। সত্যি বলতে কি, এই হাওয়ার জন্যই ঠান্ডাটা লাগে। হাওয়াটা কিন্তু নিচে নেই, উপরেই আছে। উপরটা একটা বড় চাতালের মতো - আমাদের সামনে একটা বড় বাড়ি রয়েছে। একজন আর্মির লোককে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম এই বাড়িটা চিনে অর্থাৎ আমরা ভারত আর চিনের একেবারে সীমানাতে দাঁড়িয়ে রয়েছি। আমাদের সামনেই কাঁটাতারের বেড়া। বেড়ার ওপারে আরও কয়েকটা বাড়ি রয়েছে তার মধ্যে একটার গায়ে লেখা 'অফিস অফ্‌ ইন্টারন্যাশনাল মেইল এক্সচেঞ্জ'। সামনে যেসব পাহাড়গুলো দেখা যাচ্ছে, সেগুলো সবই চিনের সীমানার মধ্যে পড়ে। ঘাড় ঘুরিয়ে আশেপাশের পাহাড়ের গায়ে কয়েকটা চেক্‌পোস্ট দেখতে পেলাম যাদের মধ্যে কয়েকটা ভারতের আর বাকিগুলো চিনের। কিছুক্ষণ থেকে ছবিটবি তুলে আমরা নিচে নেমে এলাম। সিঁড়ির ধাপে একজায়গায় আর্মির লোকজন বার্গার বিক্রি করছে, দাম ৫০/-। আমাদের দলের সবার জন্য কিনে নিলাম। পরে খেয়ে দেখেছি বেশ ভালো।

মোবাইলে তোলা নাথু লা-র চাতালের উপরের ছবিগুলোতে পরে একটা মজার জিনিস দেখলাম। ছবিগুলোর টাইমস্ট্যাম্প ছবি তোলার সময়ের থেকে ঠিক আডাই ঘন্টা এগিয়ে গেছে। অর্থাৎ আমাদের ছবি তোলার সময় বেলা ১১ঃ৩০ টা হয়ে থাকলে ছবির টাইমস্ট্যাম্প দুপুর ২ টো। এটা নিশ্চয়ই চিনের স্থানীয় সময়ের কারণে হয়ে থাকবে। চাতালের নিচের তোলা ছবিগুলোতে কিন্তু এটা নেই।

কুপুপ লেক
কুপুপ লেক - নাথু লা থেকে প্রায় একঘন্টা নেমে এসে আমরা দাঁড়ালাম কুপুপ লেকের ধারে। এটা পাহাড়ের মধ্যে একটা জলাশয়। এখানকার উচ্চতা ১৩,০০০ ফুটের মতো। লেকটা বেশ সুন্দর আর বড়। এখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আমরা আরও নামতে শুরু করলাম।


বাবা মন্দিরের উপর থেকে নিচের দৃশ্য
পুরনো বাবা মন্দির - কুপুপ লেক থেকে আরও মিনিট পনেরো নিচে নামলে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য বাবা হরভজন সিং-এর পুরনো মন্দির। এর আগে গ্যাংটক ভ্রমণ-এর সময়ে বাবা হরভজন সিং-এর যে মন্দিরটা দেখেছিলাম, সেটা নতুন মন্দির। এই পুরনো মন্দিরের কাছেই সিপাই হরভজন সিং-এর বাঙ্কার ছিল, নতুন মন্দিরটা পরে তৈরি করা হয়েছে। এখানে কয়েকটা সিঁড়ি দিয়ে উঠে মন্দিরটায় ঢুকতে হয়। এটা আসলে হরভজন সিং-এর থাকার জায়গা ছিল। ভিতরে ছোট্ট ছোট্ট দুতিনটে ঘর, সেখানে ওনার খাট, চেয়ার, টেবিল ইত্যাদি ব্যবহৃত অনেক জিনিসপত্রই রাখা রয়েছে। বাইরে বেশ ঠান্ডা, কিন্তু ঘরের ভিতরের তাপমাত্রা খুবই আরামদায়ক। মন্দির থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে পাশে আরেকটা ঘর রয়েছে, এখানে ভারতীয় সেনার একটা ছোট মিউজিয়াম গোছের রয়েছে। সব জায়গাতেই আর্মির লোকজন মোতায়েন করা রয়েছে। এখানে আমাদের প্রসাদ দিল - কিসমিস।

নাথাং ভ্যালি
নাথাং ভ্যালি - বাবা মন্দির থেকে আরও মিনিট কুড়ি নিচে নেমে আসার পরে গাড়ি পাহাড়ের রাস্তার ধারে একজায়গায় দাঁড়ালো। এখান থেকে সামনে নিচের দিকে একটা সুবিশাল উপত্যকা ধরনের জায়গা দেখা যাচ্ছে। এরই নাম নাথাং ভ্যালি। চারদিকে পাহাড়ে ঘেরা প্রায় সমতল জায়গায় একটা ছোট গ্রাম। এর মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে পাহাড়ী নদী।

দুপুর দুটো বাজে, খিদেও পেয়েছিল। এখানে একটা মোমোর দোকান থেকে আমরা মোমো কিনে খেলাম। মোমো জিনিসটা এই অঞ্চলের একচেটিয়া আর এরা সবাই-ই জিনিসটা মোটামুটি একইরকম ভালো করে। আমি কলকাতায় অনেক জায়গায় মোমো খেয়েছি, কিন্তু এই দার্জিলিং-সিকিম এলাকার মোমোর মতো ভালো মোমো কলকাতায় প্রায় কোথাওই পাওয়া যায় না।

থাম্বি ভিউ পয়েন্ট
থাম্বি ভিউ পয়েন্ট - আরও মিনিট চল্লিশ নামার পরে আমরা পৌঁছলাম আমাদের দিনের শেষ দ্রষ্টব্য জায়গা - থাম্বি ভিউ পয়েন্ট। এটাও জিগজ্যাগ রাস্তার একটা ভিউ পয়েন্ট - এখান থেকে সিল্ক রুটের বেশ অনেকটাই দেখা যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের নিচের পাহাড়গুলোতে মেঘ এসে পুরো দৃশ্যটাকেই ঢেকে দিল। আমরা গাড়িতে উঠে হোমস্টের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।

হোমস্টেতে এসে পৌঁছলাম তখন দুপুর সাড়ে তিনটে। আগেই বলা ছিল আমরা ফিরে এসে লাঞ্চ করব, সেইমতো আমাদের খাবার চটপট রেডি করে দিল। খাওয়া শেষ করতে বিকেল হয়ে গেল। পাহাড়ে সূর্যাস্ত হয় তাড়াতাড়ি, সূর্য সামনের উঁচু পাহাড়ের ওদিকে চলে গেলেই আস্তে আস্তে অন্ধকার নেমে আসে। এখানে অন্ধকার হয়ে গেলে আর কিছু করার নেই, কিন্তু দল বড় হওয়ার কারণে সময় যে কোথা দিয়ে কেটে যায় বোঝা যায় না। গল্প করতে করতেই সন্ধ্যেবেলা চা-পকোড়া আর রাত্রিবেলা ডিনারে রুটি চিকেন খেয়ে নেওয়া হল।

এখানে একটা কথা অবশ্যই বলব আর সেটা হল জুলুক ভ্রমণ পরিকল্পনা করার সময়ে জুলুকের উচ্চতার কথা অবশ্যই মাথায় রাখা উচিৎ। নাথু লা-র ১৪ হাজার ফুট উচ্চতায় না উঠলেও জুলুকের উচ্চতাই কিন্তু ১০ হাজার ফুটের মতো। এরপরে পুরনো বাবা মন্দির, কুপুপ লেক, থাম্বি ভিউ পয়েন্ট - এদের উচ্চতা আরও বেশি। এই উচ্চতায় অক্সিজেনের অভাব ঘটতে বাধ্য। আমাদের দলের অনেকেই নাথু লায় পৌঁছে গাড়ি থেকে পর্যন্ত নামেনি এবং পুরো সময়টাই ঘুমিয়েছে। তাই বয়স্ক মানুষদের যাওয়ার আগে একবার ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে নেওয়াই ভালো। আর যেকোনও বয়সের লোকজনকে সঙ্গে অবশ্যই রাখতে হবে কৌটর মধ্যে কর্পূর, হোমিওপ্যাথি ওষুধ কোকা-৩০ আর সম্ভব হলে একটা অক্সিজেন ক্যান (ওখানকার লোক্যাল কেনা নয়, কলকাতা বা কোনও বড় শহর থেকে কেনা)।

পদমচেনের হোমস্টের সামনে পুরো দল
রবিবার ১২ই অক্টোবর, ২০২৫ - পদমচেন থেকে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য মানখিম্‌-এ যাওয়ার দিন। পদমচেন থেকে মানখিমের দূরত্ব ৩৫ কিলোমিটারের মতো, যেতে ঘন্টা দেড়েকের বেশি লাগার কথা নয়। আমরা হোমস্টে থেকে চেক্‌আউট করে দশটা নাগাদ বেরোলেও মানখিম্‌ পৌঁছতে প্রায় দুপুর দুটো বেজে গেল। কারণ যাওয়ার পথে আমরা দুটো দেখার জায়গায় দাঁড়ালাম।

আরিতার লেক
আরিতার লেক - আরিতার লেক বা লামাপোখরি লেক মানখিম্‌-এর মধ্যেই পড়ে। এটা সিকিম রাজ্যের সবচেয়ে পুরনো স্বাভাবিক হ্রদ। এখানে ঢোকার এন্ট্রি ফি মাথাপিছু ১৫/- টাকা আর ছোটদের অর্ধেক। লেকটা বেশ বড়, খুব সুন্দর আর এখানকার রক্ষণাবেক্ষণও খুব ভালো। পুরো লেকটাকে ঘিরে বাঁধানো পাড়, পাড়ে উঁচু রেলিং রয়েছে। চাইলে হেঁটে পুরো লেকটা প্রদক্ষিণও করা যায়। লেকে বোটিং-এর ব্যবস্থা আছে। দুপুর বারোটা বাজে আর এখানে ঠান্ডাও পদমচেনের থেকে কম। তাই লেকের জলের স্বাভাবিক ঠান্ডাভাবটা আর সেইসঙ্গে গাছপালার ছায়াঘেরা জায়গাগুলো বেশ ভালো লাগছিল।

এখানে একটা চায়ের দোকান থেকে চা আর মোমো খাওয়া হল। মোমো যথারীতি সুস্বাদু। তারপর আমরা রওনা দিলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের দিকে।

রেহ্‌নক মনাস্ট্রি
রেহ্‌নক মনাস্ট্রি - আরিতার লেক থেকে আরও আধঘন্টা চলার পরে আমরা পৌঁছলাম রেহ্‌নক মনাস্ট্রিতে। মনাস্ট্রির বাইরের গেটটা খুব সুন্দর, গেটের ভিতর দিয়ে ঢালুপথে হেঁটে উপরে উঠতে হয়। মনাস্ট্রি জায়গাটা আমার খুব ভালো লাগে আর তার প্রধান কারণ এর শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ। এখানে কেউ কাউকে বিরক্ত করে না, পুজো দেওয়ার বালাই নেই - নিজের মতো করে সবকিছু দেখা যায়। সেইসঙ্গে মনাস্ট্রিগুলো সাধারণতঃ খুব রঙচঙে হয় বলেও আমার খুব ভালো লাগে। কোথাও ভাঙাচোরা নেই, নোংরা নেই - সবমিলিয়ে একটা মন ভালো হয়ে যাওয়া পরিবেশ। আমরা এখানে অবশ্য মনাস্ট্রির ভিতরে ঢুকতে পারলাম না কারণ বন্ধ ছিল। ভিতরটা না দেখতে পেলেও বাইরে থেকে দেখেই বেশ ভালো লাগল। মনাস্ট্রির একপাশে চারটে বিশাল প্রার্থনা চাকা বা প্রেয়ার হুইল রয়েছে, আমরা সেগুলো ঘুরিয়ে (ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে) পুণ্য সঞ্চয় করলাম (সত্যিই হয় কিনা জানিনা কিন্তু !)।

রেহ্‌নক মনাস্ট্রি থেকে আমাদের থাকার জায়গা মিনিট পাঁচেকের পথ - নাম 'কাঞ্চনজঙ্ঘা মিরর হোমস্টে'। আমাদের গাড়ি আমাদের যেখানে নামালো, সেখান থেকে হোমস্টে-তে ঢোকার কোনও গেট খুঁজে পেলাম না। হোমস্টের ম্যানেজারকে ফোন করে আমাদের আগমনবার্তা জানানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি কয়েকজন লোক নিয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত হলেন। আর তাঁর থেকেই জানলাম এখান থেকে হোমস্টেতে পৌঁছতে আমাদের সিঁড়ি দিয়ে পাহাড়ী পথে কিছুটা উঠতে হবে। হোমস্টের একেবারে সামনে গাড়ি পৌঁছনোর রাস্তা নেই। এটা আমাদের দলের কয়েকজন বয়স্ক লোকের পক্ষে বেশ অসুবিধেজনক। কিন্তু কিছু করার নেই, এইভাবে ছাড়া কাঞ্চনজঙ্ঘা মিরর হোমস্টেতে পৌঁছনোর কোনও উপায় নেই। যদিও নিচ থেকে মালপত্র হোমস্টের লোকেরাই তুলেছে আর ওঠার সময়ে আমাদের পাশে তারা সবসময়েই থেকেছে, কিন্তু তাও বলব যদি সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠার ব্যাপারে কারুর বেশি সমস্যা থাকে, তাহলে কাঞ্চনজঙ্ঘা মিরর হোমস্টে বুকিং না করাই বাঞ্ছনীয়।

তবে এই একটা অসুবিধে বাদ দিলে কাঞ্চনজঙ্ঘা মিরর হোমস্টে-র মতো থাকার জায়গা আমি খুব কম দেখেছি। এর ঘর, প্রাকৃতিক দৃশ্য, খাওয়াদাওয়া, পরিষেবা, ম্যানেজার ও অন্যান্য কর্মচারীদের আন্তরিকতা - সবকিছুই অতুলনীয়। আপাতত খুব কম গেস্ট আছে, তাই ম্যানেজারমশাই প্রায় আট-দশটা ঘর আমাদের ছেড়ে দিয়ে বললেন নিজেদের পছন্দমতো ঘর বেছে নিতে। কোনও ঘরে দুটো বিছানা, কোনওটায় তিনটে, কোনওটায় চারটে, একটায় তো ছ'টা। আমরা আমাদের সুবিধেমতো ছটা ঘর বেছে নিলাম।

হোমস্টের ছাদ থেকে আরিতার লেক
দুপুর দুটো বাজে, তাই আমরা আগে লাঞ্চ করে নিলাম। হোমস্টেটা বেশ বড় আর একটা বেশ সুন্দর মাথাঢাকা ছাদ আছে। ম্যানেজার আমাদের সেখানে নিয়ে গিয়ে দেখালেন সেখান থেকে আরিতার লেক দেখা যায়। সামনে কাঞ্চনজঙ্ঘাও দেখা যায়, তবে সেই দিকটা আপাতত মেঘে ঢাকা। এখান থেকে জুলুকের পাহাড়ও দেখা যায়, সেটাও দেখলাম। সারা বিকেল সন্ধ্যে আমরা ছাদে বসে কাটিয়ে দিলাম।

মোমো হাতে আমরা
হোমস্টের একটা খুব সুন্দর ব্যালকনি আছে, সেখানে অনেকে একসঙ্গে বসে গল্পগুজব, খাওয়াদাওয়া করা যায়। সন্ধ্যেবেলা আমরা এখানে বসে হোমস্টের তৈরি চিকেন মোমো খেলাম (এটা কিন্তু প্যাকেজের মধ্যে নয়)। যথারীতি এরা মোমোগুলো খুবই ভালো করেছিল।


ডিনারে ভাত / রুটি আর চিকেনের পরিবর্তে এঁরা আমাদের ফ্রাইড রাইস আর চিলি চিকেন অফার করলেন। এরকম প্রস্তাবে কে আর অসম্মত হয় ? ডিনার করে যে যার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম।

সোমবার ১৩ই অক্টোবর, ২০২৫ - এবার পাহাড় থেকে নেমে আসার পালা। চেক্‌আউট করে হোমস্টে থেকে বেরোলাম সকাল আটটায়। আমরা আগেরদিনই খবর পেয়েছিলাম মেরামতির কাজের জন্য ১০ নং জাতীয় সড়কের একটা বড় অংশ তিনদিন বন্ধ থাকবে। এ'জন্য আমাদের গাড়িদুটোকে ৬০ কিলোমিটারের মতো বেশি ঘুরতে হবে আর সে'জন্য গাড়িপিছু আমাদের আরও ১,৫০০/- টাকা করে বেশি দিতে হবে। এই রাস্তা দিয়ে নামতে হলে পথে লাভা পড়ে, তাই আমি লাভা মনাস্ট্রিটা আমাদের ভ্রমণের মধ্যে যোগ করে দিলাম।

লাভা মনাস্ট্রি
লাভা মনাস্ট্রি - লাভা মনাস্ট্রিতে পৌঁছলাম বেলা এগারোটা পনেরো নাগাদ। এইসময়ে প্রার্থনার জন্য মনাস্ট্রি কিছুক্ষণ বন্ধ থাকে, সাড়ে এগারোটায় খোলে। মনাস্ট্রি খুললে আমরা ভিতরে ঢুকলাম। আমি আর অমৃতা লাভা মনাস্ট্রিতে আগেও এসেছি রিশপ ও কোলাখাম ভ্রমণ-এর সময়ে, আর দেখে খুব ভালো লেগেছিল বলেই আরেকবার ঢুকলাম। মনাস্ট্রিটা খুব বড়, এর অনেকগুলো তলা। অত্যন্ত পরিষ্কার আর রঙিন। এখানে ছোট-বড় অনেক লামাদের দেখা যায়। এখানে আধঘন্টা থেকে আমরা আবার ফেরার পথ ধরলাম।

দুপুর দেড়টা নাগাদ আমাদের ড্রাইভাররা একজায়গায় থামল লাঞ্চ করার জন্য। আমরাও এখান থেকে রুটি-তরকারি, ফ্রায়েড রাইস, মোমো ইত্যাদি দিয়ে লাঞ্চ করে নিলাম। খরচ হল ৮২৫/- টাকা। নিউ জলপাইগুড়ি পোঁছতে প্রায় বিকেল চারটে বেজে গেল। গাড়ি যেখানে নামালো সেখান থেকে স্টেশনে পৌঁছনোর জন্য আবার মালপত্র নিয়ে ট্যাং ট্যাং করে পনেরো মিনিট হাঁটতে হল। তারপর স্টেশন থেকে রাতের খাবার কিনে নেওয়া হল। আমরা নিউ জলপাইগুড়ি থেকে সরাসরি ফেরার ট্রেনের টিকিট পাইনি, তাই আমাদের বারসোই হয়ে ব্রেকজার্নি করে ফিরতে হবে। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে আমাদের ট্রেন সন্ধ্যে ৬ঃ২০ মিনিটে গুয়াহাটি ওখা এক্সপ্রেস। সেই ট্রেনে বারসোই পৌঁছলাম রাত ৮ঃ২৫ মিনিটে। তারপর বারসোই স্টেশনে বসেই রাতের খাবারগুলো খেয়ে ফেললাম। বারসোই থেকে রাত ১০ঃ০২ মিনিটে রাধিকাপুর কলকাতা এক্সপ্রেসে উঠে মঙ্গলবার ১৪ই অক্টোবর, ২০২৫ সকাল সাড়ে ছটায় পৌঁছলাম কলকাতা স্টেশনে। ভ্রমণ শেষ !

সারসংক্ষেপ ঃ

১. পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়ার জন্য একটা বেশ পরিচিত জায়গা হল জুলুক বা সিল্ক রুট। পাহাড়ী পথে অনেকগুলো জিগজ্যাগ রাস্তার দৃশ্যের জন্য জুলুক বিশেষভাবে বিখ্যাত।

২. জুলুকে যাওয়ার সবথেকে ভালো সময় হল আগস্ট থেকে অক্টোবর মাস। আর জানুয়ারী থেকে মার্চ মাসের মধ্যে গেলে এখানে বরফে ঢাকা পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করা যাবে।

৩. জুলুক বেড়াতে গেলে জুলুকের হোমস্টেগুলোতে না থাকাই ভালো। কাছাকাছির মধ্যে থাকার জন্য পদমচেন একটা খুবই সুন্দর যায়গা।

৪. আমরা জুলুক ভ্রমণের পুরোটাই প্যাকেজ বুকিং করেছিলাম 'বোহেমিয়ান আগন্তুক' নামক ট্যুরিস্ট কোম্পানীর মাধ্যমে। এদের যোগাযোগের ওয়েবসাইট হল https://www.bohemianagantuk.com/ আর ফোন নম্বর 8910651295 / 9163017277. এদের ব্যবস্থাপনা খুবই ভালো এবং এরা আমাদের যে হোমস্টেগুলোয় থাকার ব্যবস্থা করেছিল, সেগুলোও যথেষ্ট ভালো। সেইসঙ্গে এদের রেটও যাকে বলে যথোপযোগী।

৫. হোমস্টের বুকিং সাধারণতঃ থাকা খাওয়া মিলিয়ে মাথাপিছু একটা প্যাকেজ হয়। খাওয়ার মধ্যে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চে ভাত / রুটি ডিমের কারি, সন্ধ্যের স্ন্যাক্স আর রাতে ভাত / রুটি আর চিকেন দেওয়া হয়ে থাকে।

৬. জুলুকের উচ্চতা বেশি হওয়ার কারণে এখানে গেলে অক্সিজেনের অভাবজনিত সমস্যাগুলো হওয়া স্বাভাবিক, তাই তার জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থাগুলো সঙ্গে নিয়ে যাওয়া দরকার। ছোট কৌটয় কর্পূর, হোমিওপ্যাথি ওষুধ কোকা-৩০ সঙ্গে রাখতেই হবে আর প্রয়োজন হলে যাওয়ার আগে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে নেওয়া ভালো।

৭. একেবারে চিনের বর্ডারে হওয়ার কারণে নাথুলায় যাওয়ার অনুমতি সবসময়ে পাওয়া যায় না। তাই যদি নাথুলায় যাওয়ার পরিকল্পনা থাকে, তাহলে আগে খোঁজ নিয়ে যাওয়া দরকার।

৮. জুলুকের লোক্যাল সাইটসিয়িং-এর সবকটা জায়গাই খুব সুন্দর, কোনওটাই বাদ দেওয়ার মতো নয়। নাথুলা-টা জুলুকের সাইটসিয়িং-এর মধ্যে পড়ে না, তার জন্য আলাদাভাবে পারমিট করাতে হয়।

৯. পদমচেন থেকে জুলুক ঘুরে আসতে সবমিলিয়ে সাত-আট ঘন্টা মতো লাগে। জুলুক বা নাথুলাতে কোনও খাবার হোটেল বা দোকান নেই, তাই সঙ্গে কিছু হাল্কা খাবার রাখা দরকার আর লাঞ্চ হোমস্টেতে ফিরে আসার পরে করতে হবে।

১০. মানখিম জায়গাটায় আরিতার লেক আর মনাস্ট্রি ছাড়া কিছুই দেখার নেই। কিন্তু এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য এখানে একটা রাত থাকা যেতেই পারে।

উপসংহার ঃ

জুলুক
যত দিন যাচ্ছে, ট্যুরিস্টের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পাহাড়ে ট্যুরিস্ট স্পটের সংখ্যাও ততই বেড়ে চলেছে। বেশ কয়েকবছর আগে যে জায়গাগুলো লোক্যাল সাইটসিয়িং করেই দেখে আসা যেত, এখন সেখানেও কয়েকটা করে হোমস্টে তৈরি হয়েছে, আর লোকজন সেখানেও দুতিনদিন 'বিশ্রাম নিতে' চলে যায়। আমি অবশ্য কখনও কোনও জায়গায় বিশ্রাম নিতে যাই না, সত্যি বলতে কী, আমি এত কিছু পরিশ্রমই করি না যে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাওয়ার দরকার হবে ! আমি বেড়াতে যাই বেড়ানোর জন্য আর সেটাই আমার প্রাথমিক উদ্দেশ্য। ইস্ট সিকিমের জুলুক এরকম একটা বেড়ানোরই জায়গা। জায়গাটা অনেক পুরনো হলেও এখানকার পর্যটনটা খুব পুরনো নয়, আর দেখার জায়গাও অনেক আছে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়াবাড়িরকমের বেশি নয়, তাই কোথাও বেশি ভীড় নেই। রাস্তাও খুব সুন্দর, কোথাও সেরকম ভাঙাচোরা নেই। আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে ঠান্ডা সাংঘাতিক কিছু নয়, বরং উপভোগ্য। পর্যটক কম তাই হোটেলও কম আর তাই পরিষেবাও ভালো। সবমিলিয়ে এককথায় এই ভ্রমণটা বেশ উপভোগ্য। এটুকু জোর দিয়ে বলতে পারি সঠিকভাবে পরিকল্পনা ও ব্যবস্থা করে যেতে পারলে জুলুকের মতো মনোরম পর্যটনস্থান আমাদের আশেপাশে কমই আছে !

জুলুক ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Thursday, December 19, 2024

শান্তিনিকেতন ভ্রমণ

ভ্রমণপথ ঃ

সোমবার ১৬ই ডিসেম্বর, ২০২৪ঃ সকাল ৭ঃ৩০ মিনিটে কলকাতা থেকে গাড়িতে যাত্রা করে সকাল ১১ঃ৩০ মিনিটে শান্তিনিকেতন - শান্তিনিকেতনে রাত্রিবাস।

মঙ্গলবার ১৭ই ডিসেম্বর, ২০২৪ঃ সকাল ১০ঃ৩০ মিনিটে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে সাইট সিয়িং - শান্তিনিকেতনে রাত্রিবাস।

বুধবার ১৮ই ডিসেম্বর, ২০২৪ঃ সকাল ৯ঃ৩০ মিনিটে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে সাইট সিয়িং - শান্তিনিকেতনে রাত্রিবাস।

বৃহস্পতিবার ১৯শে ডিসেম্বর, ২০২৪ঃ সকাল ১০ঃ৩০ মিনিটে শান্তিনিকেতন থেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে দুপুর ২টোয় কলকাতা।

আমার জীবনের প্রথম ঘুরতে যাওয়ার জায়গার নাম শান্তিনিকেতন। তখন আমার একবছর বয়স। বাবা-মা-ঠাম্মার কাছে শুনেছি আমরা সেবার একটা অ্যাম্বাসাডার গাড়ি করে গিয়েছিলাম আর আমাদের দলের দুজন ট্রেনে গিয়েছিল। আমি নাকি অ্যাম্বাসাডার গাড়ির পিছনের সিটের যাত্রীদের কোলে লম্বা হয়ে শুয়ে থাকতাম। ওখানে আমরা যে হোটেলে ছিলাম সেখানে সেই সময়ে প্রখ্যাত অভিনেতা অনিল চট্টোপাধ্যায় এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে আমাদের আলাপও হয়েছিল। বড়দের মুখে শোনা টুকরো টুকরো গল্প আর কিছু ছবিই আমার সেবারের শান্তিনিকেতন ভ্রমণের সম্বল। সেবারের শান্তিনিকেতন ভ্রমণের কোনও স্মৃতিই আমার নেই - থাকা সম্ভবও নয়। তাই প্রথমবারের না-থাকা স্মৃতিগুলো তৈরির জন্য আমার এই দ্বিতীয়বার শান্তিনিকেতন ভ্রমণ আর সেই নিয়ে আমার ব্লগের এবারের পোস্ট।

আমাদের এবারের দলে শুধুমাত্র আমরা ছজন - আমি অমৃতা বাবা মা কথা কলি। সোমবার ১৬ই ডিসেম্বর, ২০২৪ সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ আমরা ছজন বাড়ি থেকে বেরোলাম আমাদের গাড়ি নিয়ে। শান্তিনিকেতনের দূরত্ব ১৭৩ কিলোমিটার, যেতে সাড়ে তিন ঘন্টা মতো লাগার কথা। আমাদের যাত্রাপথ ডানলপ - বালি ব্রীজ - ১৯ নং জাতীয় সড়ক - বর্ধমান - ১১৪ নং জাতীয় সড়ক - সুরুল রোড - শান্তিনিকেতন। ব্রেকফাস্টের স্যান্ডউইচ্‌ ইত্যাদি আমাদের সঙ্গেই ছিল, রাস্তায় শুধু একবার দাঁড়িয়ে একটু চা-টা খেয়ে নেওয়া হল। তারপর আমরা আবার এগিয়ে চললাম আমাদের গন্তব্যের দিকে।

সুরুল রাজবাড়ি -

টিকিটঃ মাথাপিছু ১০/- টাকা (ছোটদের লাগে না)

রাজবাড়ির নাটমন্দির
আমাদের শান্তিনিকেতন পৌঁছনোর পথে একটা দেখার জায়গা পড়ল তার নাম সুরুল রাজবাড়ি। এখান থেকে শান্তিনিকেতন খুবই কাছে, গাড়িতে মিনিট দশেক। আমরা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সুরুল রাজবাড়িতে থামলাম। সুরুল রাজবাড়ি হল এক সরকার পরিবারের জমিদারবাড়ি। এই বাড়ির সঙ্গে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির রীতিমতো যোগাযোগ ছিল এবং শান্তিনিকেতন তৈরির সময়ে এই পরিবার জমি দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। সুরুল রাজবাড়িতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মহাত্মা গান্ধী একবার এসেছিলেন। আমরা বাড়ির ভিতরে ঢুকলাম। আগেকার দিনের জমিদার বাড়ির মতো ভিতরে একটা বড় উঠোন আর তাকে ঘিরে চারদিকে বারান্দা আর ঘর। বাড়িটা দোতলা। ভিতরে দেখার মতো একটা নাটমন্দির আছে। বাড়ির বয়স ২৭০ বছর হলেও নিয়মিত মেরামত করা হয় এবং এখানে মানুষজন থাকে। সেই কারণে উঠোন ছাড়া বাড়ির একতলা বা দোতলায় বাইরের লোকের কোনও প্রবেশাধিকার নেই।

আমরা এখানে মিনিট দশেক থেকে বেরিয়ে এলাম। তারপর এগিয়ে চললাম শান্তিনিকেতনের দিকে। শান্তিনিকেতনে আমাদের বুকিং ছিল পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের 'রাঙাবিতান ট্যুরিজম প্রপার্টি'-তে। শান্তিনিকেতনে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের দুটো প্রপার্টি আছে - রাঙাবিতান আর শান্তবিতান। এদের মধ্যে শান্তবিতান শহরের মধ্যে আর সেই কারণে এর পরিবেশটা ঠিক 'শান্ত' বলা চলে না। অন্যদিকে রাঙাবিতানের পরিবেশ খুব শান্ত ও নিরিবিলি, শহরের একটু বাইরে একেবারে গাছপালা ঘেরা জায়গায়। সেই কারণে আমরা রাঙাবিতানেই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। দুপুর বারোটার একটু পরে আমরা এখানে পোঁছলাম।

সেঁজুতীর সামনে
বিরাট প্রশস্ত জায়গা, ঢুকেই একট বেশ বড় চত্বরে গাড়ি পার্কিং-এর ব্যবস্থা রয়েছে। তারপরে রিসেপশন বিল্ডিং। চেক্‌ইন করে রিসেপশন বিল্ডিং-এর পাশে একটা চওড়া প্যাসেজ দিয়ে হেঁটে আমরা ভিতরের দিকে এগিয়ে চললাম। এখানে একটা বেশ বড় পুকুর রয়েছে আর দেখে বুঝলাম সেখানে রঙিন ফোয়ারার ব্যবস্থা আছে। বেশ বড় ফাঁকা খোলামেলা জায়গা আর তার মাঝে মাঝে একটা একটা কটেজ। একেকটা কটেজে দুটো করে ঘর। এরকম একটা কটেজে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হল। প্রত্যেকটা কটেজের আলাদা নাম আছে - আমাদের কটেজের নাম সেঁজুতী। ঘরগুলো পরিসরে খুব বড় না হলেও খুব সুন্দর। ঘরের সামনের বারান্দায় চেয়ার-টেবিল রাখা আছে। জায়গাটা আমাদের খুব পছন্দ হল।

আমরা ঘরে ঢুকে চানটান করে খাওয়ার জায়গায় গেলাম। খাওয়ার জায়গাটা রিসেপশন বিল্ডিং-এর পাশে। আমরা ফিশ থালি অর্ডার দিলাম। খাবারের মান খুবই ভালো - আর সবথেকে ইন্টারেস্টিং বিষয় হল এরা থালিগুলো খুব সুন্দর করে সাজিয়ে দেয়। একটা গোল থালার মাঝখানে ভাত আর সেটা ঘিরে অনেকগুলো নানাসাইজের বাটিতে অন্যান্য তরকারি। বাটিগুলো এরা বড় থেকে ছোট এইভাবে সাজিয়ে দেয়। দেখতেও ভালো, খেতেও ভালো ! আমাদের খরচ পড়ল ৯৩৫/- টাকা।

খাওয়ার কিছুক্ষণ পরে আমরা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য এখানকার বিখ্যাত সোনাঝুরি হাট। জায়গাটার দূরত্ব আমাদের রিসর্ট থেকে ৩ কিলোমিটারের মতো। মিনিট দশেক গাড়ি চালিয়ে আমরা এখানে পৌঁছলাম। এখানে গাড়ি রাখার সমস্যা, বিশেষ করে এইসময়ে প্রচুর ট্যুরিস্ট আসার কারণে গাড়ি রাখার জায়গাগুলো একেবারে ভর্তি। শেষপর্যন্ত হাট থেকে বেশ কিছুটা দূরে পার্কিং-এর জায়গা পাওয়া গেল। পার্কিং চার্জ ১০০/- টাকা।

সোনাঝুরি হাট
সোনাঝুরি হাট - খোয়াই রোডের ধারে একটা বেশ বড় সমতল জায়গায় সোনাঝুরি হাট বসে। জায়গাটা গাছপালা ঘেরা, তার মধ্যে মাটিতে প্লাস্টিকের চাদর পেতে বিক্রেতারা জিনিসপত্র নিয়ে বসেছে। হাটটা বিশাল বড়। জিনিসপত্রের মধ্যে জামাকাপড়, শীতের পোষাক, বিছানার চাদর থেকে শুরু করে ঘর সাজানোর জিনিস, গয়নাগাটি সবই পাওয়া যায়। জিনিসের দাম ঠিকঠাক আর দরদাম করে কিনতে পারলে ভালোই পাওয়া যায়। ক্রেতা বিক্রেতা উভয়ের সংখ্যাই অনেক, তবে জায়গাটা বড় হওয়ায় ভীড়টা ছড়িয়ে রয়েছে। আমরা এখান থেকে বেশ কিছু জিনিসপত্র কিনলাম। এই শীতের সময়ে সোনাঝুরি হাট শুধুমাত্র বুধবার ছাড়া সপ্তাহে প্রতিদিনই বসে। অন্যান্য সময়ে এই হাট প্রতি শনিবার বসে।

হাট থেকে আমরা যখন বেরোলাম, তখন দিনের আলো পড়ে এসেছে। এখানে রাস্তার ধারে খেজুর গুড় বিক্রি করছে - ঝোলা, পাটালী দুইই আছে। আমরা দুরকম গুড়ই কিছুটা করে কিনলাম আর সেইসঙ্গে কিছুটা চাখলামও। উত্তম স্বাদ !

রাঙাবিতানের রঙিন ফোয়ারা
রিসর্টে ফিরতে ফিরতে প্রায় অন্ধকার হয়ে গেল। আমাদের রিসর্টের সামনের রাস্তাটায় শুধুমাত্র রিসর্টের সামনের অংশটাতেই আলো আছে, বাকিটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। যাই হোক, ভিতরে এসে গাড়ি পার্কিং করে ঘরে ফিরে এলাম। সকালে যেমন দেখেছিলাম, সন্ধ্যের পরে পুকুরের উপর রঙিন ফোয়ারা শুরু হল। দেখতে খুব সুন্দর লাগছিল। আমরা কিছুক্ষণ রিসর্টের ভিতরে ঘোরাঘুরি করলাম। এখানকার তাপমাত্রা কলকাতার তুলনায় ২-৩ ডিগ্রি কম, তবে ঠান্ডাটা খুব অসহ্য নয় তাই ঘুরতে মন্দ লাগছিল না। রাত সাড়ে নটা নাগাদ যখন সবাই মিলে খেতে গেলাম, তখন সেখানে একটাও ফাঁকা জায়গা নেই। দুপুরে ফাঁকা ছিল কারণ ওইসময়ে সবাই সাইট সিয়িং-এ যায়। রাতের বেলা সবাই রিসর্টেই ডিনার করে। এ'বেলা আমরা রুটি, তরকারী, চিকেন ইত্যাদি খেলাম। খরচ হল ৪৮৩/- টাকা।

রিসর্টের বাইরের লালমাটির রাস্তা
মঙ্গলবার ১৭ই ডিসেম্বর, ২০২৪ সকালে আমি আর কথা-কলি সাড়ে ছটায় উঠে একটু হাঁটতে বেরোলাম। শান্তিনিকেতনের বিখ্যাত কোপাই নদীর দূরত্ব আমাদের রিসর্ট থেকে ১ কিলোমিটারেরও কম, সকালবেলা এই পথটা হাঁটতে ভালোই লাগছিল। বীরভূম লালমাটির জন্য বিখ্যাত আর আমাদের রিসর্টের সামনের রাস্তাটা সেই লালমাটির। সকালে বেশ ঠান্ডা তবে যথাযথ শীতপোষাক পরা ছিল বলে বেশ আরাম লাগছিল।

কোপাই-এর ধারে
হেঁটে হেঁটে আমরা কোপাইয়ের ধারে পৌঁছলাম। এখানে একটা গাড়ি চলাচলের সেতু আছে, সেটায় না উঠে সেটার পাশ দিয়ে গেলে একেবারে নদীর ধারে পৌঁছনো যায়। নদী যদিও খুব একটা চওড়া নয়, তবে জল আছে ভালোই। দূরে নদীর উপরে হাল্কা কুয়াশা। নদীর এই আঁকাবাঁকা পথ দেখে শান্তিনিকেতনে বসে একটা লাইনই মনে হয়। আমার ধারণা লাইনটা সবারই জানা আর এই লেখা পড়তে পড়তে সেটা একবার অন্ততঃ মনে পড়বে, তাই আর এখানে উল্লেখ করলাম না ! প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য এই কোপাই নদী দেখেই রবীন্দ্রনাথ কবিতাটি রচনা করেছিলেন। আমরা নদীর ধারে কিছুক্ষণ বেড়ালাম। তারপর আবার রিসর্টে ফিরে এলাম।

পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের প্রায় সব হোটেল / রিসর্টেই কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট দেয় - শান্তিনিকেতনও তার থেকে আলাদা নয়। আমরা সকাল নটা নাগাদ ব্রেকফাস্ট করতে গেলাম। ব্রেকফাস্টের মেনু লুচি তরকারী / মাখন বা জ্যাম পাঁউরুটি। সেইসঙ্গে একটা করে কলা আর ডিমসেদ্ধ / অমলেট। খাবার যা দেয়, তাতে ভালোই পেট ভরে যায়। আমরা খাওয়াদাওয়া সেরে ঘরে ফিরে এলাম আর তারপর তৈরি হয়ে বেরোলাম আমাদের প্রথমদিনের সাইটসিয়িং-এর জন্য।

শান্তিনিকেতনের প্রধান দেখার জায়গাগুলোর প্রায় সবই বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ। আমরা গাড়ি নিয়ে বিশ্বভারতীর কাছাকাছি পৌঁছলাম। একটা মুস্কিল হল জায়গায়গুলোর কোনটা ঠিক কোথায় জানি না আর সেখানে গাড়ি নিয়ে গেলে পার্কিং-এর জায়গা আছে কিনা তাও জানি না। আবার পুরোটা হেঁটেও ঘোরা সম্ভব নয়। তাই গাড়ি একজায়গায় পার্কিং করে একটা টোটো ভাড়া করা হল। এই টোটো আমাদের বিশ্বভারতীর ভিতরের সবকিছু ঘুরে দেখাবে।

আমরা টোটোয় উঠে জায়গাটা ঘুরে দেখলাম। এই ঘুরে দেখানোটা আসলে একটা ধাপ্পা, এরা শুধু কোথায় কী আছে, ঘুরে ঘুরে সেটাই দেখায়। যেহেতু কোভিডের পর থেকে বিশ্বভারতীর ভিতরে বিভিন্ন জায়গায় ঢোকা বারণ হয়ে গেছে, তাই টোটোওয়ালা বাইরে থেকে আমাদের জায়গাগুলো দেখালো আর তারপর আবার আমাদের গাড়ির কাছে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিল। এর জন্য তাকে দিতে হল ১৫০/- টাকা। তবে এই ঘোরার ফলে আমাদের একটা সুবিধে হল - দেখার জায়গাগুলোর কোনটা কোথায় আর সেটা দেখতে গেলে গাড়ি কোথায় রাখতে হবে তার একটা ধারণা হয়ে গেল। এবার আমরা গাড়ি নিয়ে আবার ওই জায়গাগুলোই দেখতে গেলাম।

পৌষমেলা প্রাঙ্গন
পৌষমেলার মাঠ - গাড়ি নিয়ে বিশ্বভারতীর দিকে এগোনোর সময়ে প্রথমে আমাদের বাঁদিকে পড়ল সুবিশাল একটা মাঠ - এটাই শান্তিনিকেতনের বিখ্যাত পৌষমেলার মাঠ। আর কদিন পরেই এখানে পৌষমেলা শুরু হবে, মাঠে এখন তারই প্রস্তুতি চলছে। বাঁশের প্যান্ডেল, মঞ্চ ইত্যাদি বাঁধা হচ্ছে। মাঠটা এতটাই বড় যে এর একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত প্রায় দেখাই যায় না।

মাঠটাকে বাঁদিকে রেখে আমরা গাড়ি নিয়ে আরও এগিয়ে চললাম। একজায়গায় মাঠটা শেষ হয়ে গিয়ে রাস্তাটা বাঁদিকে ঘুরে গেছে। এই রাস্তার নাম বিবেকানন্দ সরণী। এখান দিয়ে যেতে হলে একটা গেটের ভিতরে ঢুকতে হয় আর কিছুদূর গিয়ে আরেকটা গেট দিয়ে বেরোলে সামনে পড়ে শান্তিনিকেতন রোড। এবার আমরা ডানদিকে ঘুরে এগিয়ে চললাম।

পাঠশালায় মহড়ারত কচিকাঁচারা
মৃণালিনী আনন্দ পাঠশালা - এবার আমাদের বাঁদিকে পড়ল মৃণালিনী আনন্দ পাঠশালা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর নামে এই পাঠশালার নাম। এখানে শান্তিনিকেতনের সবচেয়ে ছোট ছেলেমেয়েরা পড়ে। এটাকে নার্সারি বলা যেতে পারে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পড়াশোনার পরিকল্পনার অনেকটাই শ্রেণীকক্ষের বাইরে আর এই পাঠশালায় সেটাই বেশি করে করা হয়। এখন আপাতত এখানে আসন্ন উৎসবের প্রস্তুতি চলছে। গাছতলায় শতরঞ্চি পেতে গানবাজনার মহড়া হচ্ছে আর তার সামান্য দূরে আরও একগুচ্ছ ছাত্রছাত্রী বসে রয়েছে। বলা বাহুল্য, এরা সবাইই কচিকাঁচা। যে মেয়েটি মহড়া দিচ্ছে সে 'তোমার সুরের ধারা ঝরে যেথায় তারি পারে' গানটা গাইছে। সব মিলিয়ে এই দৃশ্য এতই মনোগ্রাহী যে এখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতেই খুব ভালো লাগে।

তিন পাহাড়
তিন পাহাড় - মৃণালিনী আনন্দ পাঠশালা থেকে অল্প একটু এগোতে বাঁদিকে পড়ল তিন পাহাড়। এখানে একটা বেশ বড় বটগাছ আছে। গাছের গোড়ার কাছে মাটিটা কিছুটা উঁচু ঢিপির মতো, সেই থেকেই এই নাম। রবীন্দ্রনাথ এখানে বসে মাঝে মাঝে ধ্যান করতেন। এবং তাঁর বেশ কিছু কবিতাও এখানে বসেই লেখা। সত্যি বলতে কী, বটগাছ বা তার গোড়ায় মাটির ঢিপি এগুলোর কোনওটারই কোনও বিশেষত্ব নেই, আসল কথাটাই হল এখানে রবীন্দ্রনাথ বসতেন আর সেটাই বড় কথা !






তালধ্বজ
তালধ্বজ - তিন পাহাড় থেকে বাঁদিকে একটা রাস্তা ঢুকে গেছে। এই রাস্তা দিয়ে সামান্য গেলেই বাঁদিকে তালধ্বজ। এখানে একটা তালগাছকে ঘিরে একটা খড়ের চালে ঢাকা গোলাকার মাটির বাড়ি রয়েছে। শান্তিনিকেতনের শিক্ষক তেজেশচন্দ্র সেন এই বাড়িতে থাকতেন। বাড়ির মাঝখান দিয়ে এই গাছটার উঠে যাওয়া দেখে মনে হয় বাড়ির উপরে একটা তালগাছের পতাকা লাগানো রয়েছে। সেই থেকেই এই নাম।






উপাসনা গৃহ
উপাসনা গৃহ - তালধ্বজ থেকে সামান্য এগোলেই বাঁদিকে উপাসনা গৃহ। প্রকৃতপক্ষে আমরা বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমারেখা বরাবর চলেছি, আমাদের বাঁদিকে যা যা পড়ছে, সবই বিশ্বভারতীর অন্তর্গত। উপাসনা গৃহ অর্থাৎ উপাসনার স্থান। দেওয়ালের অনেকটা কাচনির্মিত বলে এর অন্য নাম কাচ মন্দির। এটি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তৈরি করিয়েছিলেন। যেহেতু ঠাকুর পরিবার ছিলেন ব্রাহ্মমতে দীক্ষিত, তাই তাঁদের উপাসনাগৃহে কোনও ঠাকুরের মূর্তি নেই।

বসত বাড়ি
শান্তিনিকেতন বসত বাড়ি - উপাসনাগৃহের পাশ দিয়ে একটা রাস্তা ভিতরে ঢুকে গেছে, এই রাস্তা দিয়ে গেলে শান্তিনিকেতনের বসত বাড়ি। এই বাড়িটাও মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তৈরি করিয়েছিলেন। দূর থেকে দেখেই বুঝলাম বাড়িটা বেশ বড়। বাড়িতে যাওয়ার রাস্তাটার দুধারে সুন্দর করে সাজানো বাগান। পুরো জায়গাটা এত সুন্দরভাবে গাছপালা ঘেরা, দেখতেই খুব সুন্দর লাগে। বাড়ির ভিতরে নিশ্চয়ই দেখার অনেক কিছু আছে, কিন্তু বাইরে থেকে এর বেশি কিছু দেখার উপায় নেই।

ছাতিমতলা
ছাতিমতলা - এরপর সামান্য এগোতেই দেখা গেল ছাতিমতলা। এখানে একটা ছাতিমগাছ ছিল যার নিচে বসে উপাসনা করা হত। পরবর্তীকালে এখানে একটা বড় বাঁধানো চত্বর তৈরি করা হয়েছে। দেবেন্দ্রনাথ বা রবীন্দ্রনাথের সময়ের ছাতিমগাছটা বর্তমানে আর নেই, তার বদলে এখানে তিনটে ছাতিমগাছ লাগানো হয়েছে। সেগুলোও এখন বড় হয়ে গেছে। এই গাছের আরেকটা বিশেষত্ব হল এখানকার স্নাতক ছাত্রছাত্রীদের শংসাপত্রের সঙ্গে সঙ্গে একটা করে এই ছাতিম গাছের ডাল-পাতা দিয়ে সম্মানিত করা হয়।

কলাভবনের সামনে
কলাভবন - ছাতিমতলা থেকে কিছুটা এগিয়ে বাঁদিকে কলাভবন। এই প্রথম একটা জায়গা দেখলাম যেখানে গেট দিয়ে ভিতরে ঢোকার অনুমতি আছে। তাও কলাভবনের ভিতরে ঢোকা যাবে না, শুধুমাত্র বিশ্বভারতীর সীমারেখার ভিতরে ঢোকা যাবে। এখানে মাঠের মধ্যে কয়েকটা মূর্তি রয়েছে, সেগুলো গাছের গুঁড়ি, খড় ইত্যাদির সাহায্যে তৈরি। মূর্তিগুলো সাধারণভাবে দেখতে যে খুব সুন্দর তা নয়, তবে এই ভাস্কর্যের কোনও বিশেষ তাৎপর্য থাকতে পারে যা আমার বোধশক্তির বাইরে। আমরা এখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে ছবি তুলে বেরিয়ে এলাম।

প্রতীচী
প্রতীচী - কলাভবন থেকে কিছুটা এগোলে বাঁদিকে প্রতীচী - নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ্‌ ডঃ অমর্ত্য সেনের বাড়ি। এটা যদিও কোনও দর্শনীয় স্থান নয় আর স্বাভাবিকভাবেই বাড়ির ভিতরেও ঢোকা যায় না, কিন্তু তাও একজন নোবেলজয়ী ব্যক্তির বাসস্থান রোজ রোজ দেখা যায় না, তাই বাইরে থেকে বাড়িটা দেখে ছবি তুলে নিলাম।

এই অঞ্চলে বেশ কয়েকটা হোটেল আছে। এই রাস্তা ধরে এগোলে আর বিশ্বভারতীর দেখার কিছু নেই, তাই আমরা এবার এই পথে উল্টোদিকে ফিরতে শুরু করলাম। কিছুদূর ফেরার পরে কলাভবন পেরোনোর পরে বাঁদিকে পড়ল এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান - রবীন্দ্র মিউজিয়াম।

রবীন্দ্র মিউজিয়াম -

টিকিটঃ মাথাপিছু ১০০/- টাকা (ছোটদের ১০/- টাকা)

রবীন্দ্র মিউজিয়াম প্রধানতঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জিনিসপত্র, ছবি ইত্যাদির সংগ্রহশালা হলেও এখানে ঠাকুরবাড়ির অন্যান্য কিছু জিনিসপত্রও রয়েছে। মিউজিয়ামটা দোতলা। ভিতরে ঢুকে আমরা প্রথমে বাঁদিকের একটা বড় হলঘরে ঢুকলাম। সেখানে ঠাকুর পরিবারের বিভিন্ন মানুষদের বড় বড় ছবি, তাঁদের সম্পর্কে নানারকম তথ্যাদি রয়েছে। পরিবারের বাইরেরও বিভিন্ন বিখ্যাত মানুষের ছবি রয়েছে আর সেইসঙ্গে রয়েছে তাঁদের লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্রের অংশবিশেষ। একটা ছাপার মেশিন রয়েছে যেটা ঠাকুরবাড়ির পত্রিকা ছাপানোর জন্য ব্যবহৃত হত।

মিউজিয়ামের বাইরে
আমরা এই ঘর থেকে বেরিয়ে দোতলায় উঠলাম। এখানে মূলতঃ রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত জিনিসই রাখা রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত কয়েকপ্রস্থ পোষাক, মাথার টুপি, কাঠের চিরুনি, লেখার কলম, দোয়াত, কাগজপত্র, কাচের থালা, কাপডিশ ইত্যাদি আরও অনেককিছু। সবকিছু মনে রাখা সম্ভব নয় আর এখানে কোনও কিছুর ছবি তোলা যায় না বলে পরে দেখার সুযোগ নেই, তাই যতটা সম্ভব দুচোখ ভরে দেখে নিলাম। রবীন্দ্রনাথ তথা ঠাকুর পরিবার যে সম্ভ্রান্ত ও বিত্তশালী পরিবার ছিলেন তা তাঁদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র দেখলেই বোঝা যায়। সেইসঙ্গে এটাও বলা যায় রবীন্দ্রনাথ ছিলেন রীতিমতো শৌখিন মানুষ। এর আগে আমরা এই ধরনের জিনিসপত্র দেখেছি জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে, আর এখানে আবার দেখলাম। রবীন্দ্রনাথ যে কত বড় মাপের মনীষী ছিলেন, তা অনুধাবন করার ক্ষমতা আমার মতো ক্ষুদ্র মানুষের নেই, এখানকার বা জোড়াসাঁকোর রবীন্দ্র মিউজিয়াম ভালোভাবে ঘুরে দেখলে বিন্দুতে সিন্ধুদর্শন হয় মাত্র !

উত্তরায়ণের সামনে
মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে এলাম। এর পাশ দিয়ে একটা হাঁটার রাস্তা চলে গেছে, সেটা দিয়ে কিছুটা গেলে দেখতে পাওয়া যায় উত্তরায়ণ। এটা রবীন্দ্রনাথের এখানে থাকার আরেকটা বাড়ি - উত্তরদিকে বলে এর এই নাম। উত্তরায়ণেরও ভিতরে ঢোকা যায় না, তবে এর দরজা খোলা থাকে এবং বাইরে থেকে ছবি তোলা যায়। উত্তরায়ণের সামনের মাঠটা বেশ বড়, সেখানে দুপুরবেলা ঘুরে বেড়াতে ভালোই লাগছিল। উত্তরায়ণ থেকে আরও উত্তরে গেলে আরও কয়েকটা বাড়ি আছে সেগুলোর নাম উদীচী, পুনশ্চ, শ্যামলী, কোনারক। এগুলো অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট বাড়ি এবং এগুলো রবীন্দ্রনাথ নিরিবিলিতে থেকে কাজ করার জন্য নির্মান করিয়েছিলেন। এখানে বসে তিনি বিভিন্ন চিত্রকলা ও কবিতার চর্চা করতেন।

আমাদের বিশ্বভারতীতে যা যা দেখা সম্ভব তার সবই দেখে ফেলেছি, তাই আমরা এখান থেকে বেরিয়ে পড়লাম। দুপুর আড়াইটে বাজে, তাই এবার খাওয়ার জায়গায় যেতে হবে। আমরা যে অঞ্চলে ঘোরাঘুরি করছিলাম, সেখানে কোনও খাবার হোটেল নেই, শান্তিনিকেতন রোড ধরে বোলপুর স্টেশনের দিকে কিছুটা এগিয়ে একটা খাবার হোটেল পেলাম। হোটেলের খাবারের মান বেশ ভালো আর সেইসঙ্গে অবাক করার মতো এদের আতিথেয়তা। আমরা মাছ আর চিকেন থালি নিয়েছিলাম। থালি সিস্টেমের নিয়ম হল প্রধান পদটা (ডিম / মাছ / মাংস) ছাড়া বাকি সবকিছুই যত ইচ্ছে নেওয়া যায়। কিন্তু এরা প্রথমেই যা দিয়েছিল, সেটাই আমার পক্ষে যথেষ্ট। আমরা আর কিছু নিচ্ছি না দেখে এরা আমাদের রীতিমতো জোর করছিল "আরেকটু ভাত দিই না?" "আরেকটু আলুপোস্ত নেবেন না, কেন রান্না ভালো হয়নি ?" ইত্যাদি বলে। খাওয়ার হোটেলে এরকম বিয়েবাড়ির মতো আপ্যায়ন আমি অন্য কোথাও দেখেছি বলে মনে পড়ে না। সেইসঙ্গে এখানকার রান্নার মানও খুব ভালো। আমাদের সবমিলিয়ে খরচ পড়ল ৯৭০/- টাকা।

খাওয়ার পরে আবার বিশ্বভারতীর দিকেই গেলাম কারণ আমাদের ফেরার পথ সেদিকেই। ফেরার পথে আবার পড়ল মৃণালিনী আনন্দ পাঠশালা, তিন পাহাড়। তিনপাহাড় থেকে আমরা এবার বাঁদিকে না গিয়ে সোজাপথ ধরলাম আর এখানে ডানদিকে পড়ল শান্তিনিকেতন সাব্‌ পোস্ট অফিস।

পোস্ট অফিসের দোতলায়
সাব্‌ পোস্ট অফিস - একটা সাব্‌-পোস্ট অফিস কোনও দেখার জায়গা হওয়ার কথা নয় কিন্তু এরা এখানে একটা মিউজিয়াম গোছের তৈরি করেছে। আমরা গেট দিয়ে ঢুকে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেলাম। সিঁড়ির পাশের দেওয়ালে নানারকম ছবি রয়েছে আর উপরে মিউজিয়ামে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের পাঠানো এবং পাওয়া বিভিন্ন চিঠির ছবি। রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন এই পোস্ট অফিসের মাধ্যমে তাঁর চিঠির আদানপ্রদান হত, সেই হিসেবে এই পোস্ট অফিসও এক ঐতিহাসিক সাক্ষ্য বহন করে। এখানে ভিতরে কিছু মডেল আছে, যেমন একটা কাঠের নৌকো। আমরা ভিতরে কিছু ছবি তুলে বেরিয়ে এলাম।

হোস্টেলের সামনে মূর্তি
প্রথমদিনের সাইটসিয়িং শেষ, আমরা রিসর্টে ফিরে এলাম। ফেরার পথে একটা হোস্টেল দেখতে পেলাম, সেটা দেখে মনে হল এখানে সম্ভবতঃ আর্ট কলেজের ছাত্ররা থাকে। হোস্টেলের বারান্দায়, মাঠে মাটি বা কাঠ দিয়ে তৈরি নানারকম মূর্তি রাখা রয়েছে। কতকগুলো মূর্তি দেখতে খুবই সুন্দর।

রিসর্টে ফিরে এসে দেখলাম আগেরদিনের মতো রঙিন ফোয়ারা শুরু হয়েছে। সন্ধ্যেটা একইরকমভাবে কাটিয়ে দিলাম। রাতে ডিনারে আগেরদিনের মতোই রুটি, ডিম, চিকেন খাওয়া হল। খরচ হল ৪৭৩/- টাকা।




পরেরদিন বুধবার ১৮ই ডিসেম্বর, ২০২৪ - সকালে রিসর্টে ব্রেকফাস্ট করে সাড়ে নটা নাগাদ বেরোলাম। আগেরদিন বিশ্বভারতীর যতটা সম্ভব দেখা হয়ে গেছে, তাই দ্রষ্টব্য শান্তিনিকেতনের অন্যান্য জায়গা। রিসর্ট থেকে বেরিয়ে গাড়িতে আধঘন্টা চলার পরে পৌঁছলাম আমাদের প্রথম গন্তব্য - রেল মিউজিয়ামে। মিউজিয়ামটা একেবারে বোলপুর শান্তিনিকেতন রেলস্টেশনের পাশে। এবং এখানে পৌঁছনোর পথের শেষটা বেশ ঘিঞ্জি। রেল মিউজিয়ামের আলাদা কোনও পার্কিং নেই, তবে এখানে রেলের একটা বেশ বড় পার্কিং এরিয়া আছে। সেখানে গাড়ি রেখে আমরা মিউজিয়ামে ঢুকলাম।

গীতাঞ্জলি রেল মিউজিয়াম - 

টিকিট ঃ মাথাপিছু ৩০/- টাকা (ছোটদের ১০/- টাকা)

রেল মিউজিয়ামটা বেশ বড় একটা বাড়ি। এবং ভিতরে ঢোকার দেওয়ালের গায়েই লেখা আছে 'গীতাঞ্জলি - শান্তিনিকেতনের গল্প'। আর এই গল্পটা যে কতটা বিস্তারিত এবং ইন্টারেস্টিং সেটা জানার জন্য মিউজিয়ামটা খুব মন দিয়ে ভালো করে দেখতে হবে। মিউজিয়ামটা প্রধানতঃ বহু সংখ্যক ছবি এবং সেই ছবির নিচে লেখা দিয়ে সাজানো। এবং এগুলো একটা নির্দিষ্ট ক্রমে সাজানো যা পরপর দেখলে শান্তিনিকেতনের ইতিহাসটা চোখের সামনে দেখা যায়। মিউজিয়ামের ঘরগুলোর ভিতরে এইভাবেই ইতিহাসটা সাজানো হয়েছে এবং কার পরে কোনদিকে যেতে হবে সবই নির্দেশ করা আছে। প্রথমে একতলা, তারপরে দোতলা আর শেষে আবার একতলায় নেমে বেরোনোর দরজা।

মিউজিয়ামের শুরু হয়েছে ১৮৬৩ সালে - যখন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বোলপুরে একটা ছাতিমগাছ ও তার চারপাশে একটা বিস্তীর্ণ জমি ইজারা নেন। এখানে উনি একটি বাড়ি তৈরি করেন এবং তার নাম দেন শান্তিনিকেতন (আমার ধারণা ছিল শান্তিনিকেতন নামটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেওয়া কিন্তু সেটা ভুল)। কার কাছ থেকে কত টাকা দিয়ে ইজারা নেন সেই তথ্য এমনকি সেই দলিলের ছবিও এখানে দেওয়া রয়েছে। সেইসঙ্গে রয়েছে সেইসময়কার কিছু ফোটোগ্রাফ - শান্তিনিকেতনের সেই সময়ের ছবি।

আমরাও এগোচ্ছি, ঘটনাও এগোচ্ছে। শান্তিনিকেতনের ইতিহাসের মধ্যে অবধারিতভাবে চলে এসেছে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির কথা। রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা, তাঁর দাদা দিদিদের কথা। রবীন্দ্রনাথের জীবনের কৈশোর, যৌবনের ঘটনা আর সেইসঙ্গে তাঁর সৃষ্টির কথা। এসেছে তাঁর মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথ ও মেজবৌঠান জ্ঞানদানন্দিনীর কথা, নতুনদাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও নতুন বৌঠান কাদম্বরীর কথা। রবীন্দ্রনাথের বিলেতযাত্রা এবং ধীরে ধীরে কবি, গীতিকার, সুরকার, সুগায়ক হিসেবে পরিচিতির কথা। এরপর তিনি আরও পরিণত হয়েছেন - ক্রমে দেশে বিদেশে খ্যাতিলাভ করেছেন। কত বিখ্যাত মানুষ যে তাঁর সঙ্গে মিলিত হয়েছেন এবং কত দেশে যে তিনি আতিথেয়তা গ্রহণ করেছেন, আমার সে সম্পর্কে ধারণা থাকলেও ধারণার ব্যাপ্তি তৈরি হল এই মিউজিয়াম দেখে। একসময়ে শান্তিনিকেতনে তিনি শুরু করলেন ব্রহ্মচর্যাশ্রম - প্রাচীন বৈদিক পদ্ধতিতে আশ্রমিক শিক্ষাদান। শান্তিনিকেতনের গাছতলায় পড়াশোনা, শিল্প-সাহিত্যচর্চা, বিভিন্ন শিক্ষকদের কথা - সবই এখানে সবিস্তারে তুলে ধরা হয়েছে। মিউজিয়ামের বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে আমি জায়গাটা ঘুরে দেখার আনন্দটা নষ্ট করতে চাই না, তাই একেবারে শেষে চলে যাচ্ছি। 

ধীরে ধীরে বার্দ্ধক্য কবিকে গ্রাস করতে শুরু করল। শরীর ভাঙতে লাগল। এরই মধ্যে ১৩৪৭ বঙ্গাব্দের (১৯৪০ খ্রীষ্টাব্দ) ২৫শে বৈশাখ নিজের জন্মদিনে রচনা করলেন 'হে নূতন দেখা দিক আর বার' গানটি। এরপরের অংশটায় রোগভোগ এবং ডাক্তারদের উল্লেখই বেশি। রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে থাকতে পছন্দ করতেন কিন্তু এখানে চিকিৎসার সুবন্দোবস্ত না থাকার কারণে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হত। ১৯৪১ সালের ২৫শে জুলাই তাঁকে চিকিৎসার জন্য শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়। এটাই তাঁর চিরকালের মতো শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে যাওয়া। ট্রেনের যে বগিতে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়, সেই বগিটা এখানে রাখা রয়েছে। কলকাতায় জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে ৩০শে জুলাই তাঁর অপারেশন করা হয়। ডাক্তারদের যে দল অপারেশন করেন তার মধ্যে ছিলেন দুই প্রখ্যাত ডাক্তার ডঃ নীলরতন সরকার ও ডঃ বিধানচন্দ্র রায়। কিন্তু অপারেশনের পরেও রবীন্দ্রনাথের স্বাস্থ্যের বিশেষ উন্নতি হয় না।

আমরা দোতলা থেকে একতলায় নেমে এসেছি, বুঝতে পারছি এবার আমরা মিউজিয়ামের একেবারে শেষের দিকে চলে এসেছি - চলে এসেছি রবীন্দ্রনাথের জীবনেরও একেবারে শেষের দিকে। শেষ অংশটা এত সুন্দর যে ছবি দেখে আর সঙ্গের লেখা পড়ে গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল ! ডঃ সরকার, ডঃ রায় প্রমুখরা রবীন্দ্রনাথকে দেখতে আসেন। তাঁকে স্যালাইন, অক্সিজেন দেওয়া হয়। ৬ই আগস্ট রাতে তাঁর অবস্থার অবনতি হয়। ৭ই আগস্ট (২২শে শ্রাবণ) সকালে অক্সিজেনের নল খুলে দেওয়া হয় কারণ নল লাগানো থাকায় উনি খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন। অবশেষে আসে সেই মূহুর্ত - ঘড়িতে দুপুর ১২ঃ১০। সবাইকে ছেড়ে চলে যান গুরুদেব - বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর - বাঙালি তথা ভারতের তথা সারা পৃথিবীর সর্বকালের সেরা মনীষীদের অন্যতম ব্যক্তিত্ব !

তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি

বিচিত্র ছলনা-জালে,

হে ছলনাময়ী।

(রবীন্দ্রনাথের লেখা 'তোমার সৃষ্টির পথ' কবিতার প্রথম কয়েকটা লাইন। রচনা করেছিলেন ৩০শে জুলাই সকাল ৯ঃ৩০ মিনিটে, তাঁর অপারেশনের কিছুক্ষণ আগে। লেখনশক্তি ছিল না, মুখে বলে গিয়েছিলেন, লিখে নেওয়া হয়েছিল। এটাই তাঁর জীবনের লেখা শেষ কবিতা।)

মিউজিয়ামের সামনে
মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে এলাম। ভিতরে ছবি তোলার নিয়ম নেই, তাই মিউজিয়ামের বাইরে কয়েকটা ছবি তুললাম। পুরো মিউজিয়ামটা দেখতে আমাদের প্রায় দু'ঘন্টা সময় লেগেছে আর জোর দিয়ে বলতে পারি এই সময় ব্যয় করাটা সার্থক। ছুটির দিন না হওয়ায় মিউজিয়ামে ভীড় একেবারেই ছিল না, আর তাতে আমাদের খুবই সুবিধে হয়েছে। এই মিউজিয়ামটা এতটাই ভালো যে স্রেফ এটা দেখার জন্য একবার শান্তিনিকেতন আসা যেতে পারে। এমনকি কেউ যদি সকালের ট্রেনে এখানে এসে শুধু মিউজিয়ামটা দেখে বিকেলের ট্রেনে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করে, সেটাও বাড়াবাড়ি হবে না !

মিউজিয়াম নিয়ে লেখাটা কিছুটা দীর্ঘ হয়ে গেল। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবেই এটাকে সংক্ষিপ্ত করলাম না - করতে চাইলাম না। এটা এরকমই থাক !

মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে এগিয়ে চললাম পরবর্তী গন্তব্য - কঙ্কালিতলার মন্দিরের দিকে। রেল মিউজিয়াম থেকে এখানে পৌঁছতে লাগল প্রায় আধঘন্টা।

কঙ্কালিতলা মন্দির
কঙ্কালিতলা শক্তিপীঠ মন্দির - কঙ্কালিতলায় মন্দিরের পাশে একটা ফাঁকা জায়গা আছে, সেখানে গাড়ি পার্কিং করা যায়। তারপর আমরা মন্দিরের ভিতরে ঢুকলাম। মন্দিরটা বেশ বড় একটা চত্বরে - চত্বরটা টালি বসিয়ে বাঁধানো এবং বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। পুরাণমতে এখানে দেবী সতীর কোমরের হাড় বা কঙ্কাল পড়েছিল, সেই থেকে এই নাম। এখানে দেবী পার্বতীর মন্দির আছে। মন্দিরটাও বেশ সুন্দর, নাটমন্দিরটা মার্বেল দিয়ে বাঁধানো আর একেবারে ঝাঁ-চকচকে। মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে কোপাই নদী। আমরা মন্দিরে কিছুক্ষণ কাটিতে বেরিয়ে এলাম।

আমাদের এরপরের গন্তব্য তালপুকুর। কঙ্কালিতলা থেকে সেখানে পৌঁছতে লাগল মিনিট কুড়ি। নামে পুকুর হলেও এটা বেশ বড় একটা দীঘি (হ্যাঁ, নামে তালপুকুর এবং ঘটি কেন, ঘটিধারীসুদ্ধ ডুবে যাওয়ার মতো জল রয়েছে !)। দীঘির চারপাশ রেলিং দিয়ে ঘেরা আর তার বাইরে গাছপালা। অর্থাৎ দীঘি দেখতে হলে রেলিং-এর ভিতরে ঢুকতে হবে। একজায়গা একটা লোহার গেট রয়েছে যাতে তালা দেওয়া। অনেক ডাকাডাকি করেও কারোর সাড়া পাওয়া গেল না, ফলে এই জায়গাটা দেখার বাসনা ত্যাগ করতে হল। এগিয়ে চললাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের দিকে।

নদীর ভিউ পয়েন্টে
কোপাই নদী ভিউ পয়েন্ট - তালপুকুর থেকে মিনিট দশেক চলার পরে পৌঁছলাম কোপাই নদী ভিউ পয়েন্টে। এখানে নদীর উপর দিয়ে একটা ব্রীজ চলে গেছে আর ব্রীজের পাশ দিয়ে একটা রাস্তা নেমে গেছে যেখানে গাড়ি রেখে একেবারে নদীর ধারের বালির উপরে গিয়ে বসা যায়। দুপুর দেড়টা বাজে, রোদের তেজও কম নয় তবে শীতকাল বলে ততটা গরম লাগছে না। এখানে নদীর দৃশ্য অসাধারণ। নদীতে জল বেশ ভালোই আছে যদিও চওড়া খুব একটা বেশি নয়। নদীর এ'পারটা ফাঁকা হলেও অন্যপারে অনেক গাছপালা আছে। সবমিলিয়ে আমরা ছোটবেলায় গ্রাম্য নদীর যে দৃশ্য আঁকতাম, এ একেবারে হুবহু তাই।

এরপরের গন্তব্য দ্রষ্টব্য নয়, ভোজ্য। দুপুরে খাবার আমরা কোথায় খাব তা আগেই ঠিক করা ছিল - শান্তিনিকেতনে ইদানীং বিখ্যাত হওয়া হোটেল 'রাম শ্যাম'। ভিউ পয়েন্ট থেকে এখানে পৌঁছতে লাগল দশ মিনিট। জায়গাটা সোনাঝুরি হাটের পিছনের দিকে। যেহেতু বুধবার তাই সোনাঝুরির হাট বসেনি আর তাই আমাদের রাম-শ্যাম-এ পৌঁছনো সহজ হল। এখানে প্রচন্ড ভীড়। গিয়েই জায়গা পাওয়া গেল না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর বসতে পারলাম। এখানে থালি নেওয়াই ভালো। থালিতে অনেকগুলো পদ আর সবকটা রান্নাই খুব ভালো। মানে খুবই ভালো। চিকেন, মাটন, মাছ ইত্যাদি নিয়ে আমাদের খরচ হল ১,৩৬৮/- টাকা। রাম শ্যামে একটা বেশ ভালো মানের ঘি পাওয়া যায়, আমরা এখান থেকে ঘি কিনলাম। ঘি-টা সত্যিই ভালো।

প্রকৃতি ভবন -

টিকিট ঃ মাথাপিছু ৩০/- টাকা

ক্যামেরা / মোবাইলের চার্জ ঃ ২০/- টাকা

প্রকৃতি ভবনের মূর্তির সামনে
রাম শ্যাম থেকে বেরিয়ে খোয়াই রোড ধরে মিনিট পাঁচেক চলার পরে পৌঁছলাম আমাদের ভ্রমণের শেষ গন্তব্য - প্রকৃতি ভবনে। প্রকৃতি ভবন হল প্রকৃতির ভবন। এটা প্রকৃতি থেকে পাওয়া বিভিন্ন পাথর, গাছের ডাল, গাছের গুঁড়ি ইত্যাদির সংগ্রহশালা। এই পাথরগুলো বা গাছের অংশগুলো প্রকৃতির মধ্যে যেভাবে পাওয়া গেছে, এখানে সেভাবেই রাখা হয়েছে - এর উপরে কোনও খোদাই করা বা ভাঙাভাঙি করা হয়নি। এগুলোর বৈশিষ্ট্য হল এর প্রত্যেকটাই একেকটা বিশেষ আকৃতির। যেমন কোনওটার আকার গণেশের মতো, কোনওটার আকার বৃদ্ধ পাখির মতো, আবার কোনওটাকে দেখে শকুন্তলার কথা মনে হয়। এরকম বেশ কিছু মূর্তি মাঠের মধ্যে বেদির উপর রাখা আছে আর তাছাড়া একটা দোতলা বাড়ি আছে যার ভিতরে এইরকম আরও মূর্তি রয়েছে। তবে এগুলোর পুরোটাই সংগ্রাহকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা - যাকে বলে বিমূর্ত শিল্প (অ্যাবস্ট্র্যাক্ট আর্ট)। যে পাথরটা দেখে সংগ্রাহকের শিবের ষাঁড় নন্দী মনে হবে, সেটা দেখে আমার বিরিয়ানীর হাঁড়িও মনে হতে পারে অথবা যেটা দেখে সংগ্রাহকের মনে হয়েছে বসে থাকা গরু, সেটা দেখে আমার চিকেনের থাই-এর পিসও মনে হতে পারে ! যাই হোক, বিকেলের পড়ন্ত আলোয় জায়গাটা দেখতে ভালো লাগছিল, তাই এখানে কিছুক্ষণ বসে রইলাম।

বিকেলে হোটেলে ফেরার পরে আগের দুদিনের মতোই কাটলো। রাতের ডিনারে একটু স্পেশাল খাওয়া দাওয়া হল - ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন। খরচ হল ১,১৩৪/- টাকা।

রাঙাবিতানের গেটের সামনে
পরেরদিন বৃহস্পতিবার ১৯শে ডিসেম্বর, ২০২৪ - সকালে ব্রেকফাস্ট করে বেলা ১০ঃ১৫ নাগাদ মালপত্র নিয়ে চেক্‌আউট করে বেরিয়ে পড়লাম। দুপুর দুটো নাগাদ বাড়ি পৌঁছলাম। শেষ !




সারসংক্ষেপ ঃ

১. কলকাতা থেকে তিন চার ঘন্টা দূরে ঘোরার যে জায়গাগুলো আছে, শান্তিনিকেতন তার মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ জায়গা। শান্তিনিকেতন ভালোভাবে ঘোরার জন্য দুটো দিন হাতে রাখা ভালো তবে সময় কম থাকলে একরাতের জন্যও যাওয়া যেতে পারে।

২. শান্তিনিকেতন গাড়ি নিয়েও যাওয়া যায় আবার ট্রেনেও যাওয়া যায়। ট্রেনে গেলে বোলপুর শান্তিনিকেতন স্টেশনে নামতে হবে। শিয়ালদহ, হাওড়া এবং কলকাতা স্টেশন থেকে বোলপুর যাওয়ার প্রচুর ট্রেন রয়েছে।

৩. নিজেদের গাড়ি না নিয়ে গেলে শান্তিনিকেতনে ঘোরার জন্য টোটো সবথেকে ভালো। এখানে দেখার জায়গাগুলোর কোনওটারই দূরত্ব বেশি নয়, তাই গাড়ি ভাড়া করার কোনও মানেই হয় না।

৪. থাকার জন্য শান্তিনিকেতনে বহুসংখ্যক হোটেল আছে, তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের রাঙাবিতান ট্যুরিজম প্রপার্টি ও শান্তবিতান ট্যুরিজম প্রপার্টি উল্লেখযোগ্য। আমরা এদের ওয়েবসাইট https://wbtdcl.wbtourismgov.in/home থেকে রাঙাবিতান ট্যুরিজম প্রপার্টির বুকিং করেছিলাম।

৫. পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের অন্যান্য হোটেলের মতো রাঙাবিতান ট্যুরিজম প্রপার্টিতেও কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট দেয়। এখানে যা খাবার দেয় তা খেয়ে রীতিমতো পেট ভরে যায় এবং রান্নার মানও বেশ ভালো।

৬. শান্তিনিকেতনের প্রধান আকর্ষণ বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং তার সংলগ্ন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ি, মিউজিয়াম ইত্যাদি। এছাড়া অবশ্য অবশ্য দ্রষ্টব্য হল বোলপুর স্টেশন সংলগ্ন গীতাঞ্জলি রেল মিউজিয়াম। বাকি জায়গার মধ্যে কোপাই নদী এবং সোনাঝুরি হাটও বিশেষভাবে দ্রষ্টব্য এবং বিমূর্ত শিল্পে আগ্রহ থাকলে প্রকৃতি ভবনও।

৭. সোনাঝুরি হাট যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে সেটা সপ্তাহের কোনদিন বসে সেটা আগে থেকে জেনে যাওয়া ভালো। হাটের জিনিসপত্রের দাম যথাযথ।

৮. শীতকালে গেলে শান্তিনিকেতন থেকে গুড় কেনা যেতে পারে। এখানকার গুড়ের দাম কম নয়, তবে মান খুবই উন্নত।

৯. শান্তিনিকেতনের হোটেল রাম শ্যাম খাওয়া দাওয়ার জন্য ইদানীংকালে সুপরিচিত। খাবারের দাম একটু বেশির দিকে তবে অভিজ্ঞতার জন্য একবার এখানে খাওয়া যেতেই পারে।

১০. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রিয় ঋতু বর্ষা হলেও শান্তিনিকেতন ঘোরার জন্য সবথেকে ভালো হল শীতকাল। গ্রীষ্মকালে এখানে ভালোরকম গরম পড়ে, তাই সেইসময়ে না যাওয়াই ভালো।

উপসংহার ঃ

শান্তিনিকেতন
বাঙালি তথা ভারতীয়রা বিশ্বের দরবারে যাঁর জন্য সুপরিচিত - তিনি রবীন্দ্রনাথ। জীবনের আগাগোড়া পরাধীন দেশে থেকেও দেশের শাসকদের থেকে যিনি অর্জন করে নিয়েছিলেন অপরিসীম সম্মান - তিনি রবীন্দ্রনাথ। পরাধীন দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকারীদের যিনি গোপনে সবরকমভাবে সাহায্য করে গেছেন - তিনি রবীন্দ্রনাথ। নিজের গান, কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প দিয়ে যিনি গোটা বিশ্বকে সমৃদ্ধ করেছেন - তিনি রবীন্দ্রনাথ। জীবনে ত্রিশটিরও বেশি দেশ যিনি ভ্রমণ করেছেন এবং সেইসব দেশের অগণিত জ্ঞানী-গুণী মানুষ যাঁর দর্শন ও সান্নিধ্য পেয়ে ধন্য হয়েছেন - তিনি রবীন্দ্রনাথ। 'বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে' চাণক্য শ্লোকের এই অংশটা যাঁর সম্পর্কে সবথেকে বেশি প্রযোজ্য - তিনি রবীন্দ্রনাথ। যাঁর শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতা যাতায়াতের জন্য ভারতীয় রেল একটা আস্ত সেলুন কার সংরক্ষণ করেছিল - তিনি রবীন্দ্রনাথ। অসুস্থ অবস্থায় যাঁর চিকিৎসা করেছিলেন সেইসময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসকরা - তিনি রবীন্দ্রনাথ। যাঁর মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল আপামর জনসাধারণ, যাঁর শেষযাত্রায় সামিল হয়েছিল গোটা কলকাতা শহর - তিনি রবীন্দ্রনাথ। মৃত্যুর ৮৩ বছর পরেও যাঁর সৃষ্টি আজও আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে একইরকমভাবে প্রাসঙ্গিক - তিনি রবীন্দ্রনাথ - একমাত্র 'ঠাকুর' যাঁকে বহু মানুষ সচক্ষে দেখেছে। সেই রবীন্দ্রনাথের তৈরি শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। ৮১ হাজার বর্গমিটার জায়গা জুড়ে তৈরি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আজও - শুধুই তিনি। আর তাঁর জন্যই শান্তিনিকেতনে যাওয়া - জীবনে অন্ততঃ একবার। একবার ঘোরা হয়ে গিয়ে থাকলে আরেকবার। দুবার ঘোরা হয়ে গিয়ে থাকলে আরেকবার। এইভাবে - বারবার। বহুবার।

"আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না"

শান্তিনিকেতন ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Monday, October 21, 2024

শিমূলতলা ভ্রমণ

ভ্রমণপথ ঃ

শুক্রবার ১৮ই অক্টোবর, ২০২৪ঃ সকাল ৬ঃ৩০ মিনিটে কলকাতা থেকে গাড়িতে যাত্রা করে বিকেল  ৪ঃ৩০ মিনিটে শিমূলতলা - শিমূলতলায় রাত্রিবাস।

শনিবার ১৯শে অক্টোবর, ২০২৪ঃ সকাল ১০ঃ৩০ মিনিটে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে সাইট সিয়িং - শিমূলতলায় রাত্রিবাস।

রবিবার ২০শে অক্টোবর, ২০২৪ঃ সকাল ১০ঃ৩০ মিনিটে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গিরিডিতে সাইট সিয়িং - শিমূলতলায় রাত্রিবাস।

সোমবার ২১শে অক্টোবর, ২০২৪ঃ সকাল ৯ঃ৩০ মিনিটে শিমূলতলা থেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে রাত ৯টায় কলকাতা।

পুরনোদিনের বাংলা উপন্যাস পড়লে জানা যায় আগেকার দিনের অনেক জমিদার বা ধনী ব্যক্তিরা বিভিন্ন জায়গায় একটা করে বাড়ি করে রাখতেন আর মাঝে মাঝে স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য সেখানে গিয়ে মাসখানেক করে থাকতেন। এই বাড়িগুলোর বেশিরভাগেরই অবস্থান ছিল বিহারে (এখনকার বিহার আর ঝাড়খন্ডে) - আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে ছোটনাগপুর মালভূমির মধ্যে। এর প্রধান কারণ হল এই অঞ্চলের জল-হাওয়া খুব ভালো - খাবার হজম হয় খুব ভালোভাবে আর বাতাসও পরিস্রুত। এই জায়গাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল দেওঘর, মধুপুর, হাজারীবাগ, শিমূলতলা ইত্যাদি। লক্ষ্মীপুজোর পরে তিন চারদিনের জন্য এই শিমূলতলা ভ্রমণ নিয়েই আমার ব্লগের এবারের পোস্ট। বলা বাহুল্য আমরা এখানে স্রেফ ঘুরতেই গিয়েছিলাম, স্বাস্থ্যোদ্ধার করতে যাইনি কারণ প্রথমতঃ আমাদের স্বাস্থ্য এমনিতেই যথেষ্ট ভালো, দ্বিতীয়তঃ শিমূলতলায় আমাদের নিজেদের বাড়ি নেই আর তৃতীয়তঃ আমরা কেউই জমিদার বা ধনী ব্যক্তি নই !

যাওয়ার পথে বরাকর নদী
আমাদের এবারের দল তেরো জনের। আমি, অমৃতা, বাবা, মা, কথা, কলি, আমার ভাইপো বাবাই, লালমাসি, মেসোমশাই, বুবুমাসি, বলাইমেসো, সাচ্চুমামা আর মাইমা। শুক্রবার ১৮ই অক্টোবর, ২০২৪ সকাল ৬ঃ৩০ মিনিটে বাড়ি থেকে আমাদের গাড়ি নিয়ে বেরনোর পরে প্রথমে মানিকতলা থেকে বুবুমাসি আর বলাইমেসো উঠল। তারপর সাড়ে সাতটা নাগাদ আমরা পৌঁছলাম আমাদের মীটিং পয়েন্ট ডানকুনি এম-বাজারের সামনে। এখানে বাকিদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার পরে আমরা এগিয়ে চললাম আমাদের গন্তব্যের দিকে। আমাদের যাত্রাপথ ডানকুনি - ১৯ নং জাতীয় সড়ক - আসানসোল - ৪১৯ নং জাতীয় সড়ক - ১১৪এ নং জাতীয় সড়ক - বাঙ্কা-দেওঘর রোড - দেওঘর - দেওঘর রোড - ৩৩৩এ নং জাতীয় সড়ক - শিমূলতলা। এছাড়া আরও রাস্তা আছে যেমন ধানবাদ হয়েও যাওয়া যায়। ব্রেকফাস্ট আমাদের সঙ্গেই ছিল, শুধু চা-খাওয়ার জন্য একবার বর্ধমানে দাঁড়ানো হল। আর তারপর দুপুরে একবার লাঞ্চ। ভাত, রুটি, ডাল, তরকারি, ডিম, মাছ ইত্যাদি নিয়ে খরচ হল ১,৩০০/- টাকা।

আমরা শিমূলতলা পৌঁছলাম বিকেল ৪টে নাগাদ। আমাদের বুকিং ছিল আরাধনা রিসর্ট-এ। এটা আসলে আগেকার দিনের কোনও ব্যক্তির হাওয়াবদলের জন্য তৈরি করা একটা বাড়ি - পরবর্তীকালে এটাকে হোটেলে পরিণত করা হয়েছে। সেইসঙ্গে নতুন করে কিছুটা নির্মাণও করা হয়েছে। হোটেলটা খুবই সুন্দর। আমাদের বুকিং-এর মধ্যে দুটো ঘর ছিল যাদের নাম মেরিলিন আর ক্লাসিও। এই ঘরগুলো যাকে বলে হেরিটেজ। ঘরের ভিতরে কাঠের আলমারি, পুরনো দিনের চেয়ার, কড়ি-বরগার ছাদ। মেরিলিন-এর খাটে আবার ছত্রি আর সেইসঙ্গে পর্দার মতো মশারি। আমরা যে যার ঘরে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নিলাম।

আরাধনা রিসর্টের ভিতরে
সন্ধ্যেবেলা আর বিশেষ কিছু করার নেই, তাই আমরা রিসর্টটাই ঘুরে ঘুরে দেখলাম। হোটেলের দুটো ছাদ আছে যার মধ্যে একটা পুরনো আর একটা নতুন। নতুন ছাদটা ছোট আর অনেকটা উঁচু। পুরনো ছাদটায় উঠলে 'জয়বাবা ফেলুনাথ' সিনেমার ঘোষালবাড়ির ছাদের কথা মনে হয়। একটা সিঁড়ি দিয়ে উঠে একটা চাতাল, সেখান থেকে আরও কিছূটা উঠলে আরেকটা ছাদ আর সেখান থেকে আরও কিছুটা উঠলে আরেকটা ছাদ। ছাদ থেকে নেমে এসে আমরা ডাইনিং হলে গেলাম। হোটেলে আরও লোকজন আছে, তবে আমাদের মতো এতবড় দল আর নেই। খাবার আগে থেকেই অর্ডার দেওয়া ছিল। ভাত রুটি ডাল তরকারি ডিম চিকেন মিলিয়ে খরচ হল ২,৩৮০/- টাকা।

শনিবার ১৯শে অক্টোবর, ২০২৪ আমাদের শিমূলতলা সাইটসিয়িং-এর দিন। আরাধনা রিসর্টের ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টারি। মেনু লুচি, ছোলার ডাল, মিষ্টি আর ডিম (ওমলেট / সিদ্ধ)। ব্রেকফাস্ট করে সকাল ১০ঃ৩০ নাগাদ আমরা গাড়ি নিয়ে বেরোলাম সাইটসিয়িং করতে।

তারা মঠ
তারা মঠ - রিসর্ট থেকে বেরিয়ে মিনিট পনেরো চলার পরে পৌঁছলাম আমাদের প্রথম গন্তব্য তারা মঠ-এ। এটাও প্রকৃতপক্ষে একটা বাড়ি আর সেটাকে এখন একটা মন্দিরের মতো করা হয়েছে। এখানে মন্দিরে নিয়মিত পুজো হয় তবে মন্দির দর্শন বলতে যা বোঝায় সেটা এখানে সেভাবে হয় না। আমরা মন্দিরের ভিতরে ঢুকলাম। পুজো দেওয়ার কোনও ব্যাপার নেই। পুরোহিত তাঁর পরিবার নিয়ে এখানেই থাকেন। মন্দির বা বাড়িটা দেখলেই বোঝা যায় সেটা বর্তমানে খুব একটা রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না, তবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়। বাড়িটা মাটি থেকে বেশ কিছুটা উঁচু - অনেকগুলো সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে সামনে একটা বড় চাতাল। সমস্ত জায়গাটা গাছপালা ঘেরা আর সেভাবে দেখাশোনা হয় না বলে প্রায় জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। আমরা এখানে সবকিছু দেখে বেরিয়ে এলাম।

নলডাঙা রাজবাড়ি
নলডাঙা রাজবাড়ি - আমাদের পরবর্তী গন্তব্য শিমূলতলার সবথেকে বিখ্যাত জায়গা নলডাঙা রাজবাড়ি। তারা মঠ থেকে বেরিয়ে বাঁধানো রাস্তা ছেড়ে একটা মেঠো পথ ধরে মিনিট দশেক চলার পরে আমরা এখানে পৌঁছলাম। একটা সুবিশাল ফাঁকা প্রান্তর যেখানে অল্প কিছু গাছপালা আছে, তার মধ্যে একজায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে নলডাঙা রাজবাড়ি বা শিমূলতলা রাজবাড়ি। পাশের ছবিটা দেখলেই বোঝা যাবে কেন এটা বিখ্যাত - ২০১৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছায়াছবি 'দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন'-এর ক্লাইম্যাক্সে দুর্গেশগড় হিসেবে এই বাড়িটাকেই দেখানো হয়েছিল আর এখানেই ছিল মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের গুপ্তধন (আরে সত্যিকারের নয় !)। সপ্তদশ শতকে বিষ্ণুদাস হাজরা এখানে জমিদারী স্থাপন করেন। বর্তমানে বাড়িটা ভগ্নপ্রায়। এর শুধু বাইরের কাঠামোটাই দাঁড়িয়ে আছে, ভিতরের ছাদ সবজায়গাতেই ধসে পড়েছে। এই বাড়ির যেটা সবথেকে আকর্ষণীয় সেটা হল এর সামনের দীর্ঘ সিঁড়ি কিন্তু সিঁড়ি দিয়ে উঠে কোথাও যাওয়া যায় না কারণ তারপরের চাতালটা পুরোটাই ধসে গেছে। সিঁড়িগুলো অবশ্য ভালোই আছে, আর সেটা দিয়ে ওঠানামাও করা যায়। উপরে উঠে চারপাশটা দেখতে ভালোই লাগে - দিগন্তবিস্তৃত উঁচুনিচু জমি, মাঝে মাঝে গাছপালা আর দূরে পাহাড়।

লাট্টু পাহাড়
নলডাঙা রাজবাড়ির সামনেই একটা অনতিউচ্চ পাহাড় আছে, সেটার নাম লাট্টু পাহাড়। এটাও একটা দেখার জায়গা তবে আমাদের আর যাওয়া হয়নি।




ধরহরা ঝর্ণা
ধরহরা ঝর্ণা - নলডাঙা রাজবাড়ি থেকে আধঘন্টা চলার পরে পৌঁছলাম ধরহরা ঝর্ণায়। এই চলাগুলো কিন্তু পুরোপুরিই গুগ্‌ল্‌ ম্যাপের উপর নির্ভর করে কারণ এখানে রাস্তায় মানুষজন ভীষণ কম তাই জিজ্ঞেস করার সুযোগও নেই বললেই চলে। ধরহরা ঝর্ণার কাছে পৌঁছে গাড়ি পার্কিং করে কিছুটা হেঁটে আমরা পৌঁছলাম ঝর্ণার কাছে। ঝর্ণাটা তেলয়া (বা তেলবা) নদীর উপরে। নদী এখানে যে অনেকটা উপর থেকে পড়ছে তা নয়, প্রায় সমতলই বলা চলে। তবে জায়গাটা পাথুরে আর জলের স্রোত বেশ ভালো। এখানে পাথরের উপরে বসে থাকতে বেশ ভালো লাগে। পাথরের উপরে পা দিয়ে নদী পেরিয়ে উল্টোদিকেও যাওয়া যায়। ডিসেম্বর মাস হলেও দুপুরের দিকে রোদের মধ্যে গরমই লাগছিল তাই এখানে ঝর্ণার ধারে বসে থাকতে বেশ আরাম লাগছিল।

ভিউ পয়েন্ট থেকে তেলয়া নদী
ভিউ পয়েন্ট - ধরহরা ঝর্ণা থেকে বেরিয়ে আধঘন্টা চলার পরে আমরা যে জায়গাটায় পৌঁছলাম সেটাকে ধরহরা ঝর্ণার ভিউ পয়েন্ট বলা চলে। জায়গাটা একটা পাহাড়ের উপরে আর এখান থেকে তেলয়া নদী আর ধরহরা ঝর্ণাটা সুন্দরভাবে দেখা যায়। পাহাড়ের গা দিয়ে একটা দীর্ঘ সিঁড়ি নেমে গেছে, সেটা দিয়ে একেবারে তেলয়া নদীর কাছে চলে যাওয়া যায়। এখানকার দৃশ্য খুবই মনোরম। সামনে দিয়ে পাথুরে পথে এঁকেবেঁকে চলেছে তেলয়া নদী - দূরে গাছপালা আর ছোট ছোট পাহাড়। এই ভিউ পয়েন্টে আবার একটা মন্দির আছে (কার মন্দির সেটা অবশ্য জানার সুযোগ পাইনি)।

এখানে একটা টিউব অয়েল দেখতে পেলাম আর সেই জল নিয়ে চোখেমুখে দিলাম। কিছুটা জল বোতলে ভরেও নিলাম। সত্যি বলতে কী, এখানে এসে আমরা এখনও পর্যন্ত শুধুমাত্র বোতলে ভরা কেনা মিনারেল ওয়াটারই খেয়েছি যার আলাদা করে বিশেষ কোনও গুণ নেই। কিন্তু এই টিউব অয়েলের প্রাকৃতিক জলের গুণই আলাদা। এতে ভীষণ ভালো হজম হয় আর খিদেও হয় (আমার অবশ্য এই জল না খেলেও এগুলো হয় !)।

দুপুর দেড়টা বাজে তাই আমরা এবার ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম। ভিউ পয়েন্ট থেকে হোটেলে ফেরার যে রাস্তা গুগ্‌ল্‌ ম্যাপ দেখালো তাতে ৩৩৩এ নং জাতীয় সড়ক দিয়ে চলতে চলতে তেলয়া মোড় থেকে বাঁদিকে গিয়ে রেলব্রীজের নিচ দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু এইপথে কিছুদূর গিয়েই বুঝলাম এখান দিয়ে যাওয়া একেবারেই অসম্ভব। রাস্তা বলতে কিছু নেই, সঙ্কীর্ণ মাটির পথ আর দুদিকে উঁচু ঝোপঝাড়। রাস্তাটা এতই সরু যে ঝোপঝাড়গুলো আমাদের গাড়ির একেবারে গা দিয়ে ঘষে যাচ্ছে। বুঝতেই পারছিলাম এই রাস্তা দিয়ে আমরা কোথাও পৌঁছতে পারব না। কিন্তু গাড়ি ঘোরানোরও উপায় নেই। শেষপর্যন্ত একটা সামান্য চওড়া জায়গা পেয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে আবার বাঁধানো রাস্তায় ফিরে এলাম। পাঠকদের বলছি এই বিশেষ রাস্তাটা গুগ্‌ল্‌ ম্যাপে দেখালেও কোনওভাবেই গাড়ি নিয়ে এই রাস্তা দিয়ে যাওয়া চলবে না।

হোটেলে ফিরে এসে আমরা লাঞ্চ করে নিলাম। ভাত ডাল তরকারি ডিম চিকেন নিয়ে খরচ হল ৩,৪০০/- টাকা। লাঞ্চের পরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আমরা আবার বেরিয়ে পড়লাম। আমার উদ্দেশ্য ছিল গাড়িতে পেট্রোল ভরা কিন্তু শিমূলতলার ধারেকাছে কোনও পেট্রোলপাম্প নেই। পেট্রোল নিতে গেলে যেতে হবে হয় ২৫ কিলোমিটার দূরে ঝাঁঝায় নতুবা উল্টোদিকে প্রায় একই দূরত্বে কাটোরিয়ায়। আমরা কাটোরিয়াতেই গেলাম আর তারপর সেখান থেকে দেওঘর চলে গেলাম। কাটোরিয়া থেকে দেওঘর যেতে ঘন্টাখানেক মতো লাগে। দেওঘর আমরা আগেও এসেছি আর এখন সন্ধ্যেও হয়ে গেছে, তাই দেওঘরে কিছু দেখাও সম্ভব নয়। আমরা মূলতঃ গিয়েছিলাম আমাদের দলের কয়েকজনের মন্দিরে পুজো দেওয়ার জন্য। এইসময়ে মন্দিরে প্রচন্ড ভীড়, তাই বাকিরা আর মন্দিরে গেলাম না। রাত সাড়ে আটটা নাগাদ আমরা আবার শিমূলতলায় ফিরে এলাম। ডিনারে আগেরদিনের মতোই খাওয়া হল - খরচ হল ২,১১০/- টাকা। শিমূলতলার জল-হাওয়া যে কতটা উপকারী সেটার প্রমাণ পেলাম কথা-কলির খাওয়ার বহর দেখে ! বাড়িতে সাধারণতঃ যা খায়, এখানে প্রায় তার দেড়-দুগুণ খেয়ে নিল।

পরেরদিন রবিবার ২০শে অক্টোবর, ২০২৪ - আমরা গিরিডি যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম। গিরিডি-ও আমার এর আগে তিনবার ঘোরা তবে 'উশ্রী নদীর ঝর্ণা' দেখতে সবসময়েই ভালো লাগে। সকালে ব্রেকফাস্ট করে (আগেরদিনের মতোই মেনু) সাড়ে দশটা নাগাদ আমরা রওনা দিলাম। শিমূলতলা থেকে উশ্রী পৌঁছতে প্রায় তিনঘন্টা সময় লাগল। গিরিডি পর্যন্ত রাস্তা খুবই ভালো তবে তারপরে শেষের কিছুটা রাস্তা তেমন সুবিধের নয়।

উশ্রীর ঝর্ণা
উশ্রী ঝর্ণা - উশ্রীর ঝর্ণার কাছে পৌঁছনোর শেষের পথটা পাহাড়ী আর খুব সুন্দর। আমাদের বাম পাশ দিয়ে উশ্রী নদী বয়ে চলেছে। এখানে নদীখাত বেশ চওড়া। ঝর্ণার কাছে গিয়ে ঝর্ণা দেখে মন ভরে গেল। সত্যি বলতে কী, আমি এর আগে যতবার এসেছি জলের এত বেশি স্রোত কোনওবারে দেখিনি। আমরা আগে যে জায়গাগুলোতে দাঁড়িয়ে স্নান করেছি বা ছবি তুলেছি এখন সেখানে যাওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। পাথরের উপর থেকে প্রচন্ড গর্জন করে উশ্রী নদী নিচে পড়ে বীরবিক্রমে এগিয়ে চলেছে বরাকর নদীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য। জায়গাটায় লোকজন ভালোই এসেছে আর তিনচারজন অত্যুৎসাহী অল্পবয়সী ছেলে জলে নেমে স্নানও করছে। জলের কাছাকাছি গেলেই গায়ে জলের ছিটে লাগছে। আমরা এখানে প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট কাটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

দুপুর সাড়ে তিনটে বাজে কিন্তু কারুরই সেভাবে খিদে পায়নি তাই আমরা আর লাঞ্চের জন্য কোথাও না দাঁড়িয়ে এগিয়ে চললাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের দিকে।

খান্ডোলি ড্যাম
খান্ডোলি ড্যাম - উশ্রী থেকে প্রায় একঘন্টা চলার পরে আমরা পৌঁছলাম খান্ডোলি ড্যাম-এ। উশ্রীর ঝর্ণা এর আগে তিনবার দেখলেও খান্ডোলি ড্যাম আমি এর আগে একবারই দেখেছি আমাদের ২০১৬ সালের দেওঘর ভ্রমণের সময়ে। তখন দেখে খুব ভালো লেগেছিল আর তাই এবারে আবার এলাম। খান্ডোলি ড্যামটা বেশ বড় আর এর পাশেই খান্ডোলি পাহাড়। ড্যামের উপরের রাস্তা ধরে হাঁটতে বেশ ভালো লাগে। এখানেও বেশ কিছু লোকজন এসেছে। বিকেল প্রায় সাড়ে পাঁচটা বাজে - দিনের আলো কমে এসেছে। আমরা এবার ফেরার পথ ধরলাম।

গিরিডি থেকে শিমূলতলা পৌঁছতে গেলে দেওঘর রোড ধরেই যেতে হয় আর এই রাস্তাটা খুব সুন্দর। রাত্রিবেলা এই রাস্তা ধরে গাড়ি করে যেতে গতবারেও দারুণ লেগেছিল - এবারেও দারুণ লাগল। এবারে আমি আবার গাড়ির চালকের আসনে। শিমূলতলা পৌঁছতে প্রায় রাত সাড়ে আটটা বেজে গেল। ডিনারের অর্ডার আগেই দেওয়া ছিল - আজ আমাদের ভ্রমণের শেষ দিন তাই স্পেশাল মেনু ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন। খরচ হল ২,৮৬০/- টাকা।

সোমবার ২১শে অক্টোবর, ২০২৪ আমাদের বাড়ি ফেরার দিন। সকাল সাড়ে নটা নাগাদ ব্রেকফাস্ট করে আমরা রওনা দিলাম। দুপুরে একজায়গায় লাঞ্চ করার জন্য দাঁড়ানো হল। মাছভাত আর বিরিয়ানি মিলিয়ে খরচ হল ১,৬০০/- টাকা। তারপর আবার ফেরার পালা। বাবাই আর বুবুমাসিদের নিজের নিজের বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে আমরা বাড়ি পোঁছলাম তখন রাত নটা। ভ্রমণ শেষ !

সারসংক্ষেপ ঃ

১. কলকাতা থেকে দুতিনদিনের জন্য যাওয়ার জায়গা হিসেবে শিমূলতলা একটা ভালো বিকল্প। গ্রীষ্মকালে এখানে গরম বেশ বেশি পড়ে, তাই গ্রীষ্মকাল বাদ দিয়ে বছরের যেকোনও সময়েই যাওয়া যেতে পারে।

২. কলকাতা থেকে শিমূলতলা যাওয়ার একাধিক ট্রেন আছে। শিমূলতলা জায়গাটা খুব একটা বড় নয় আর জায়গাটা মূলতঃ স্টেশন ঘিরেই, তাই কোনও জায়গাই স্টেশন থেকে খুব বেশি দূরে নয়।

৩. কলকাতা থেকে গাড়িতে শিমূলতলার দূরত্ব প্রায় ৪০০ কিলোমিটার আর যেতে প্রায় দশঘন্টা লাগে। ১৯ নং জাতীয় সড়ক ছাড়ার পর রাস্তা খুব একটা চওড়া নয়, তাই গাড়ি বেশি জোরে চালানো যায় না।

৪. শিমূলতলায় একাধিক হোটেল আছে যার মধ্যে আরাধনা রিসর্ট খুবই ভালো। হোটেলটা স্টেশন থেকে  দশমিনিটের হাঁটাদূরত্বে অবস্থিত। এদের ওয়েবসাইট https://aradhanaresort.com/ থেকে বুকিং করা যায়। যোগাযোগের নম্বর - 7044693856.

৫. আরাধনা রিসর্ট একটা পুরনো বাড়িকে হোটেলে পরিণত করে করা হয়েছে আর তাই এই বাড়িতে হেরিটেজ রুম রয়েছে। এখানকার খাওয়াদাওয়ার মান খুবই ভালো।

৬. শিমূলতলায় ঘোরাঘুরির বিশেষ অবকাশ নেই। দেখার জায়গার মধ্যে নলডাঙা রাজবাড়ি আর ধরহরা ঝর্ণাই দেখার মতো।

৭. শিমূলতলার প্রধান আকর্ষণ হল এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ। এখানকার জল-হাওয়া খুবই স্বাস্থ্যকর, তবে এখানকার জল খেতে চাইলে টিউবওয়েল বা কলের জল খেতে হবে - মিনারেল ওয়াটার খেলে চলবে না।

৮. শিমূলতলা থেকে দেওঘরের দূরত্ব ৪২ কিলোমিটারের মতো আর যেতে ঘন্টা দেড়েক লাগে। শিমূলতলা থেকে চাইলে একদিনের জন্য দেওঘর ঘুরে আসা যায়।

৯. শিমূলতলায় ফোনের নেটওয়ার্ক সেভাবে পাওয়া যায় না, জিও বা এয়ারটেল সামান্য পাওয়া যায়। এটা মাথায় রেখে ঘোরার পরিকল্পনা করতে হবে।

১০. শিমূলতলায় কোনও পেট্রোল পাম্প নেই, সবথেকে কাছের পেট্রোল পাম্প ঝাঁঝায় অথবা কাটোরিয়ায় আর এই দুটো জায়গাই এখান থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে। তাই শিমূলতলায় পৌঁছনোর আগেই গাড়িতে পেট্রোল ভরে নেওয়া ভালো।

উপসংহার ঃ

আরাধনা রিসর্টের সামনে আমরা সবাই
পশ্চিমবঙ্গের প্রতিবেশী রাজ্য বিহারে ছোটনাগপুর মালভূমির মধ্যে অবস্থিত শিমুলতলাকে একটা ভ্রমণস্থল না বলে একটা স্বাস্থ্যকর জায়গা হিসেবে দেখাই ভালো। একসময়ে স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য ধনী ব্যক্তিরা এখানে গিয়ে দীর্ঘ সময় থাকলেও এখন আর সেই রেওয়াজ নেই। কিন্তু শিমুলতলার স্বাস্থ্যকর জল-হওয়া এখনও আছে। এখানে যেগুলো ঘোরার জায়গা সেগুলো দারুণ কিছু দ্রষ্টব্য নয়, তবে কিছু করার না থাকলে দেখে আসা যেতে পারে। ভ্রমণকারীদের নিয়ে এখানকার মানুষদের বিশেষ কোনও উৎসাহ নেই, কারণ শিমূলতলা ট্যুরিজমের উপর নির্ভরশীল একটা জায়গা নয়। এখানে খুব বেশি লোকজন যায় না, ফলে ভীড়ও সেরকম নেই। একটা মোটামুটি ফাঁকা জায়গায় দুতিনদিন আরাম করার পক্ষে শিমূলতলা খুবই উপযোগী। আবারও বলছি এখানকার জল-হাওয়াই এখানকার প্রধান আকর্ষণ - তাই সেটা যতটা সম্ভব সেবন করার চেষ্টা করাই ভালো। বোতলবন্দী কেনা জল নয়, খেতে হবে এখানকার নলকূপ বা কলের জল। আর সেইসঙ্গে উপভোগ্য হল এখানকার শান্ত নিরিবিলি প্রাকৃতিক পরিবেশ। যদি এইসব মূল্যবান জিনিসের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করার ইচ্ছে থাকে, তাহলে একবার ঘুরে আসা যেতেই পারে - শিমূলতলা !

শিমূলতলা ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.