আমি ব্লগ লেখার খুব বেশি সমর্থক কোনওদিনও ছিলাম না, সত্যি কথা বলতে কি এখনও যে আছি তা নয় । তার একটা প্রধান কারণ আমার ধারণা ব্লগ লেখার থেকেও পড়া অনেক বেশি ক্লান্তিকর । অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অনেক সময়ই পড়তে শুরু করে শেষ করা হয়ে ওঠে না । নিজের ধৈর্য এবং/অথবা আগ্রহের অভাবকে 'ঠিক আছে, বাকিটা পরে পড়ব' জাতীয় অজুহাত দিয়ে ঢেকে দিই - আর আমরা সবাই জানি সেই 'পরে' টা আর কখনওই আসে না । তো, এই কারণে আমি ঠিক করেছি আমার ব্লগকে কখনওই অন্যের ক্লান্তির কারণ ঘটাব না, আমার ব্লগের বিষয় হবে প্রধানতঃ ভ্রমণ । আমার মতো যেসব বাঙালিরা ঘুরতে ভালোবাসে, তাদের জন্য আমার ব্লগ হবে তথ্যের একটা উৎস । আমার নিজের একটা অভ্যেস আছে, কোনও জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার আগে সেই জায়গাটা সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, আর ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে আমার বরাবরই মনে হয়েছে যে ইন্টারনেটে লেখালেখি করার ব্যাপারে বাঙালিদের থেকে কুঁড়ে খুব কম শিক্ষিত জাতই আছে । আমার মতো যেসব বাঙালিরা আছে, যারা ইন্টারনেটে কোনো একটা ইংরিজীতে লেখা দেখলেই না পড়ার চেষ্টা করে, তাদের জন্য আমার ব্লগ সহায়ক হবে, এই বিশ্বাস নিয়ে শুরু করছি আমার ভ্রমণকাহিনী । আগেই বলে রাখি, আমি স্ট্যাটিসটিক্সের ছাত্র ছিলাম, তাই আমার ব্লগে তত্ত্বের থেকে তথ্যের দেখাই মিলবে বেশি ।

Sunday, April 27, 2014

তাজপুর ভ্রমণ

২০১২ সালে চাঁদিপুর ভ্রমণের দু'বছর পরে অফিস থেকে আমরা এবারে তাজপুর বেড়াতে গেলাম । এবারের দলে একজন শিশুসহ মোট ২৪ জন যার মধ্যে ১৮ জন অফিসের আর বাকিরা তাদের পরিবার । যদিও বেশিরভাগ লোকই জানে, তাও বলছি তাজপুর পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে দীঘার কাছে আরেকটা বীচ্‌ । দীঘা বা মন্দারমণির মতো ঘিঞ্জি নয় - তাজপুর বেশ ফাঁকা ফাঁকা একটা জায়গা । সেই তাজপুর ভ্রমণ নিয়েই আমার ব্লগের এবারের নাতিদীর্ঘ পোস্ট ।

রামনগর স্টেশনে সবাই
২৬শে এপ্রিল, ২০১৪ শনিবার সকাল ৬:৪০ এ হাওড়া স্টেশন থেকে তাম্রলিপ্ত এক্সপ্রেসে আমাদের যাওয়া । ট্রেনে না গিয়ে গাড়ি নিয়েও যাওয়া যেতে পারে, তবে তাতে খরচ কিছুটা বাড়বে । তাজপুর যাওয়ার জন্য রামনগর স্টেশনে নামতে হয় - সেখান থেকে মোটর ভ্যানে বা গাড়িতে তাজপুর । তাম্রলিপ্ত এক্সপ্রেস রামনগর পৌঁছয় সকাল ৯:৪৪ এ । আমাদের ট্রেন মিনিট দশেক লেট ছিল ।

রামনগর স্টেশন থেকে আমরা তাজপুর যাওয়ার জন্য গাড়ি ভাড়া করলাম । আগেই বলেছি মোটর ভ্যানের ব্যবস্থা আছে তবে এপ্রিলের প্রবল গরমে বেলা ১০ টার সময়ে মাথাখোলা ভ্যানে যাওয়ার বাড়াবাড়িটা বোধহয় না করাই ভালো । আমরা তিনটে মারুতি ওম্‌নি নিলাম । প্রতি গাড়ির ভাড়া ৩৫০ টাকা (এখানে একটা সিন্ডিকেটের চার্ট টাঙানো আছে, চাইলেও এদের বেশি দেওয়ার কোনও মানে হয় না) । রামনগর থেকে তাজপুর যেতে প্রায় আধঘন্টা লাগে ।

তাজপুর রিট্রিটে আমাদের কটেজ
তাজপুরে আমাদের বুকিং ছিল 'তাজপুর রিট্রিটে' । এখানে বলে রাখি তাজপুরে সমুদ্রের ধারে কিন্তু কোনও হোটেল বা থাকার জায়গা নেই, কাজেই কোনও হোটেলওয়ালা বা তাদের প্রতিনিধিরা (মানে দালাল আর কি !) যদি সেটা দাবী করে তাহলে বুঝতে হবে তারা প্রতারক এবং তাদের বিরুদ্ধে সরব হতে হবে । তাজপুর রিট্রিটে নন্‌ এসি ডাব্‌ল্‌ বেডের ভাড়া ১,০০০ টাকা, এসি ডাব্‌ল্‌ বেড ১,৫০০ টাকা । তবে আমরা মাথাপিছু ১,২০০ টাকা হিসেবে প্যাকেজ সিস্টেম নিয়েছিলাম । প্যাকেজে থাকছে - পরেরদিন বিকেল ৫টা পর্যন্ত থাকা, প্রথমদিনের লাঞ্চ, বিকেলের চা ও স্ন্যাক্স, ডিনার, পরেরদিন সকালে চা ও ব্রেকফাস্ট আর দুপুরের লাঞ্চ ।

তাজপুরের সমুদ্র
সাধারণতঃ সকালে এইরকম সময়ে সমুদ্রের কাছে পৌঁছলে চান করাটা অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে, আমরাও তাই কিছুক্ষণের মধ্যেই তৈরি হয়ে গেলাম সমুদ্রের দিকে । তাজপুরের গাড়ি চলাচলের প্রধান রাস্তাটা পেরিয়ে একটা ঝাউবনের ভেতর দিয়ে ৫ মিনিট হাঁটলেই সমুদ্র । তাজপুরের সমুদ্র সম্পর্কে একটা কথা প্রায়ই শোনা যায় যে এখানে সমুদ্র নাকি একেবারে ডোবা ! কথাটা যে একেবারেই সত্যি নয়, আশা করি আমাদের তোলা ছবিগুলো তার যথেষ্ট প্রমাণ বহন করবে । বেলা সাড়ে এগারোটা বাজে - প্রায় ভাঁটার সময়ে, কিন্তু তাও সমুদ্রে চান করে বেশ ভালো লাগল । ঘন্টাখানেক জলে লাফালাফি করে জল থেকে উঠে ডাব খেয়ে (মানে ডাবের জল খেয়ে - না, শাঁস ছিল না) হোটেলে ফিরে এলাম । তাজপুরের বীচ্‌ আরও একটা কারণে বিশেষ উল্লেখযোগ্য, সেটার কথা যথাসময়ে বলব ।

কটেজের ভিতর
হোটেলে ফিরে আরেকদফা চান । তাজপুর রিট্রিটের ঘরগুলো বেশ বড় আর প্রত্যেকটা ঘরেই এসির ব্যবস্থা করা আছে । ঘরে একটা বাথরুম কাম্‌ টয়লেট আর একটা শুধু টয়লেট । ঘরগুলো কটেজ টাইপ আর বাইরে বেশ গরম বেশ বেশি হলেও ঘরের ভেতরটা বেশ আরামদায়ক । তবে এইপ্রসঙ্গে বলে রাখি তাজপুরে কিন্তু কলকাতার থেকে কম গরম লাগছিল । গাছপালা ঘেরা জায়গা বলেই হোক বা সমুদ্রের ধার বলেই হোক, কলকাতার হাঁসাফাঁসানি থেকে তাজপুরে গিয়ে কিছুটা মুক্তিই পেলাম ।

দুপুরে ভাত, ডাল, পোস্ত, আলুভাজা আর পারশে মাছের ঝাল । কটেজগুলোর বাইরে একটা খাওয়ার জায়গা আছে - সেখানেই সবাই মিলে বসে খেলাম । তারপর দুপুরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে আবার সমুদ্রের ধারে গেলাম ।

সমুদ্রের ওপর সূর্য্যাস্ত
বিকেলের জোয়ারের সময় । আমরা গেছি কৃষ্ণপক্ষের দ্বাদশীতে, জোয়ারের জোর স্বাভাবিকভাবেই বেশি । বিকেলে চান করার ব্যাপার নেই, বালির ওপর চটি খুলে রেখে প্যান্ট/পাজামা/সালোয়ার গুটিয়ে পা ভেজানো আর কিছুক্ষণ অন্তর পিছিয়ে গিয়ে চটিজোড়াকে আরও কিছুটা পিছনে রেখে আসা । বিকেলে গরম একেবারেই লাগছিল না, বেশ আরামদায়ক আবহাওয়া আরও অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরি করে আমরা সমুদ্রের ওপর সন্ধ্যে নামা দেখলাম ।

এরপর আবার হোটেলে ফিরে এসে চা আর পকোড়া খাওয়া হল । তাজপুরে সমুদ্র ছাড়া দেখার আর কিচ্ছুই নেই, আর আমাদের মতো যাদের সমুদ্রের জল ছাড়া আর কোনও 'জলের' অভ্যেস নেই, তাদের জন্য সন্ধ্যের পর সমুদ্রই ভালো অপ্‌শন্‌ । হোটেলের লোকের কথা শুনে এবারে আমরা পাঁচজন (আমি, আমার স্ত্রী অমৃতা, আমার কলিগ্‌ কঙ্কনাদি, অমিতদা আর ওদের একবছরের মেয়ে অন্নিকা) আর ঝাউবনের মধ্যে দিয়ে না গিয়ে এবার মোহনার দিকে গেলাম । তাজপুরের গাড়ি চলার প্রধান রাস্তাটা ধরে মিনিট কুড়ি হাঁটলেই মোহনায় পৌঁছনো যায় ।

রাত্রিবেলা মোহনাটা খুবই মনোরম । এই মোহনারই অন্য পাড়ে মন্দারমনি । আমরা জলের কাছে গিয়ে বালির ওপর বসলাম । জায়গাটা মোটামুটি অন্ধকার - দূরে কয়েকটা টালির/খড়ের চালের ছোট দোকান রয়েছে সেখানে টিমটিম করে আলো জ্বলছে । এই দোকানগুলোয় খুব সামান্য টুকিটাকি জিনিস আর ডাব পাওয়া যায় । আমরা ঘন্টাখানেক বসে ডাব খেয়ে (মানে ডাবের জল খেয়ে - হ্যাঁ, এবারে মোটা শাঁস ছিল) ফেরার পথ ধরলাম ।

হোটেলে ফিরতে দশটা বেজে গেল । তারপর ডিনার করলাম । ডিনারে ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন ।

তাজপুরের সূর্য্যোদয়
পরেরদিন ২৭শে এপ্রিল, ২০১৪ রবিবার । সমুদ্রের ধারে বেড়াতে গেলে সানরাইজ দেখতে যাওয়ার একটা ব্যাপার থাকেই, আমি সেইমতো ভোর পাঁচটার সময়ে বেরোলাম । আমাদের দলের আরও অনেকে বেরোলো । তাজপুর এমনিতেই ফাঁকা, আমরা ছাড়া আর খুব কম লোকই এসেছে আর সকালের বীচে গিয়ে দেখা গেল আমরাই শুধু এসেছি । যাই হোক, বীচে পৌঁছে দেখলাম সূর্য্যোদয় তখনো হয়নি আর দেখার কোনও সম্ভাবনাও নেই কারণ আকাশ মেঘে ঢাকা । কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর সূর্য্যের দেখা পাওয়া গেল ঠিকই, তবে ততক্ষণে উনি মেঘের আড়াল দিয়ে অনেকটা উঠে পড়েছেন ।

তাজপুরের লাল কাঁকড়া
এবার সেই বিশেষ জিনিসটার উল্লেখ করি । তাজপুরের বীচে পৌঁছে দেখা যায় বালির ওপর বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে - লাল কাঁকড়া । সংখ্যায় অগুনতি । কাছে গেলেই টুপটুপ করে গর্তের মধ্যে ঢুকে যায় । যতই পা টিপে টিপে সন্তর্পণে যাওয়া হোক না কেন, ওরা ঠিক পায়ের কম্পন বুঝতে পারে । এই লালকাঁকড়া তাজপুরের একটা বিশেষত্ব । এরা আকারে খুব বড় নয় - এদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এদের গায়ের রঙ । আমার মতো মানসিকতা যাদের তাদের জন্য খারাপ খবর - এগুলো মানুষের খাদ্য নয় !

আরও কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে হোটেলে ফিরে এলাম । তাজপুর রিট্রিটের বাগানে দোলনা টাঙানো আছে, সেখানে সকালে বসে থাকতে দিব্যি লাগছিল । কিছুক্ষণ পরে আলুর পরোটা আর আচার দিয়ে ব্রেকফাস্ট করলাম ।

এরপর আবার সমুদ্রে চান । দ্বিতীয়দিন প্রথমদিনের থেকে আগে জলে নামা হয়েছে, তাই জোয়ারের জোরটা বেশি । চান কর আগেরদিনের থেকেও বেশি ভাল লাগল । প্রায় দু'আড়াইঘন্টা চান করে হোটেলে ফিরে এলাম ।

বাকিটা গতানুগতিক । হোটেলে ফিরে চান, তারপর দুপুরে পোনা মাছের ঝাল দিয়ে ভাত । তারপর কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে বিকেলে বেরোলাম তখন সোয়া পাঁচটা । আবার তিনটে গাড়িতে ২৩ + ১ জন । রামনগর স্টেশনে এসে সন্ধ্যে ৬:২৯ এ কান্ডারি এক্সপ্রেসে উঠলাম । কান্ডারির হাওড়ায় পৌঁছনোর কথা রাত ৯:৫০ এ - পৌঁছল সাড়ে দশটার পরে । তাজপুর ভ্রমণ শেষ ।

সারসংক্ষেপঃ

১. কলকাতার কাছে একদিনের ঘুরে আসার জন্য যে জায়গাগুলো আছে, তাদের মধ্যে তাজপুর বিশেষ উল্লেখযোগ্য । ফাঁকা বীচ্‌, ফাঁকা জায়গা যাদের আকর্ষণ করে তাদের জন্যই তাজপুর ।
২. হাওড়া থেকে দীঘাগামী যেকোনও ট্রেনে রামনগরে নেমে গাড়িতে বা মোটর ভ্যানে তাজপুর যাওয়া যেতে পারে । এছাড়া নিজেদের গাড়িতে করে গেলে কাঁথি-দীঘা রোডে বালিসাই থেকে বাঁদিকে ঘুরে তাজপুর যেতে হবে ।
৩. তাজপুরে হোটেলের সংখ্যা বেশি নয়, আর এখানে খুব বেশি লোক যায় না । তাই পীক্‌ সিজ্‌ন্‌ ছাড়া অন্য সময়ে আগে থেকে হোটেল বুকিং না করে গেলেও চলবে ।
৪. আমরা ছিলাম তাজপুর রিট্রিটে । এদের ওয়েবসাইট http://www.tajpurhotel.com/ । এছাড়া এদের সঙ্গে যোগাযোগের নম্বর - 9830271064.
৫. তাজপুর রিট্রিটে মোট আটটা ডাবল্‌ বেড রুম আছে, সেখানে এরা আমাদের ১৯ জনের ব্যবস্থা করেছিল । বাকিচারজনের জন্য যে দু'টো ঘর দিয়েছিল সেগুলো অন্য হোটেলের এবং সেটা এদের কম্পাউন্ডের বাইরে । তাই যদি বড় দলে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকে তাহলে বিশেষতঃ এই বিষয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে নেওয়াই ভালো ।
৬. তাজপুরের সমুদ্র চান করার পক্ষে বেশ উপযোগী । সমুদ্রে যথেষ্ট ঢেউ আছে এবং বীচে যথেষ্ট লোক নেই, তাই একা বেশিদূরে না যাওয়াই শ্রেয় ।
৭. তাজপুরের বীচে একটা বিশেষ উল্লেখযোগ্য জিনিস হল অসংখ্য লালকাঁকড়া । যাদের এই জিনিস দেখার বিশেষ অভিজ্ঞতা নেই, তাদের এই দৃশ্য মুগ্ধ করবে বলেই মনে হয় ।

উপসংহারঃ

তাজপুর !
কলকাতা থেকে সপ্তাহান্তের ছুটি উপভোগ করার জন্য তাজপুর বেশ ভালো একটা জায়গা । এখানে থাকার জন্য একদিনই যথেষ্ট - তার বেশি থাকলে একঘেয়ে লাগার সম্ভাবনা । লোকসমাগম কম, নিরিবিলি, দোকানপাট বিহীন, প্রায় নির্জন এই জায়গা বিশ্রাম নেওয়ার পক্ষে একেবারে আদর্শ । সকালে সমুদ্রে চান, ডাব খাওয়া (মানে ডাবের জল খাওয়া - শাঁস পেলে খাওয়া যেতে পারে) আর বিকেলে সমুদ্রের তীরে ঘুরে বেড়ানো - এই নিয়েই তাজপুর । এখানে সমুদ্র ছাড়া দেখার আর কিছুই নেই । তাই ঘুরতে গিয়ে বেশি ঘোরাঘুরি না করে শরীর আর মনের ক্লান্তি দূর করা যাদের উদ্দেশ্য, তাজপুর তাদের জন্যই । আমি তাজপুর ২০০৯ সালেও গেছি, এবারে গিয়েও আমার সেই অনুভূতিটাই হল যেটা আমার বক্‌খালি-তেও হয়েছিল । তাই বক্‌খালি ভ্রমণের সেই কথাগুলো দিয়েই শেষ করছি - দীঘা পুরী মন্দারমণির মতো ঘ্যাম নয়, অল্প হোটেল-দোকান, সমুদ্রের লাল কাঁকড়া আর শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ নিয়ে তাজপুর থাকুক তাজপুরেই !

তাজপুর ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Tuesday, April 15, 2014

সাতকোশিয়া ভ্রমণ

আমার ধারণা আমার ব্লগে যেসব জায়গায় ভ্রমণ সম্পর্কে পোস্ট করেছি, তাদের মধ্যে সাতকোশিয়ার নাম সবচেয়ে কম লোক শুনেছে । আমি নিজেও জায়গাটার নাম জেনেছি যাওয়ার মাসতিনেক আগে - 'সানন্দা' থেকে (এটা শুনে "এবাবা, তুই/তুমি/আপনি সানন্দা পড়িস/পড়ো/পড়েন !" বলে হ্যাটা করার কোনও কারণ নেই, কারণ আমি নিয়মিত পড়ি না, মাঝে মাঝে ওখানকার 'বেড়ানো' বিভাগটা ওল্টাই) । সাতকোশিয়া জায়গাটা উড়িষ্যায় । মহানদীর প্রবাহপথের এই সাত ক্রোশ বা চোদ্দ মাইল পথের এলাকাকে বলা হয় 'সাতকোশিয়া' । পুরো জায়গাটাই পাহাড়ে ঘেরা বলে একে বলা হয় 'সাতকোশিয়া গর্জ' ।

১২ই এপ্রিল, ২০১৪ - শনিবার রাত ৮:৫৫ য় হাওড়া থেকে সম্বলপুর এক্সপ্রেসে আমাদের যাত্রা শুরু । আমাদের এবারের দল ছ'জনের - সেই ছ'জন যারা দার্জিলিঙ গিয়েছিলাম অর্থাৎ আমি, আমার স্ত্রী অমৃতা, নন্দিনীদি, দীপঙ্করদা আর ওদের যমজ ছেলে সায়ক ও সৌনক । সাতকোশিয়া যাওয়ার জন্য অঙ্গুলে নামতে হয় আর হাওড়া থেকে অঙ্গুল যাওয়ার একটিই ট্রেন আছে, সম্বলপুর এক্সপ্রেস যা আবার সাপ্তাহিক - শুক্রবার ওদিক থেকে এদিকে আর শনিবার এদিক থেকে ওদিকে । কাজেই যদি শনিবার ছাড়া অন্য কোনওদিন বেরোনোর পরিকল্পনা থাকে তাহলে হাওড়া থেকে কটক গিয়ে সেখান থেকে বাসে বা গাড়িতে অঙ্গুল যেতে হবে ।

সম্বলপুর এক্সপ্রেস অঙ্গুল পৌঁছয় ভোর পাঁচটায় এবং আমাদের ক্ষেত্রে একেবারেই লেট করল না । আমরা যখন অঙ্গুলে নামলাম তখন চারদিক ফর্সা হয়ে গেলেও সূর্য্য ওঠেনি । এখানে একটা কথা বলে রাখি সাতকোশিয়া কিন্তু কোনও বিশেষ জায়গা নয়, এটা একটা বড় এলাকা । সাতকোশিয়া প্রধানতঃ পাহাড় এবং জঙ্গলপ্রধান একটা জায়গা আর পুরোটাই উড়িষ্যা বনদপ্তরের এলাকা । এখানে থাকার জায়গাগুলো হল - টিকরপাড়া, পুরুনাকোটে, ছোটকেই, লবঙ্গী প্রভৃতি । এই সব জায়গাতেই থাকার জন্য উড়িষ্যা বনদপ্তরের কাছে বুকিং করতে হয় যার অফিস অঙ্গুলে । আমাদের প্রায় দু'মাস আগে থেকে অগ্রিমবুকিং করা ছিল ।

অঙ্গুল থেকে আমাদের গাড়ি ঠিক করা ছিল । সাতকোশিয়া ভ্রমণের জন্য নিজস্ব গাড়ি থাকা বিশেষ প্রয়োজনীয়, না হলে ঘোরাঘুরি করা সহজ হবে না । আমাদের প্রথম গন্তব্য টিকরপাড়া - সেখানে আমরা একদিন থাকব । অঙ্গুল থেকে টিকরপাড়ার দূরত্ব ৪০ কিলোমিটারের মতো । টিকরপাড়া একটা ছোট্ট গ্রাম, দোকানপাটও প্রায় নেই বললেই চলে । আমাদের ড্রাইভার বলল - যেতে ঘন্টাখানেক লাগবে এবং ওখানে গিয়ে ব্রেকফাস্ট পাওয়া যাবে না, কাজেই আমাদের যাওয়ার পথে ব্রেকফাস্ট সেরে নেওয়াই ভালো । সেইমতো একটা পাঞ্জাবি ধাবা থেকে আমরা পরোটা আর পনীরবাটার মশালা দিয়ে ব্রেকফাস্ট করলাম । এটা যে আমাদের পক্ষে কতটা ভালো হল সেটা বুঝলাম আরও মিনিট পনেরো চলার পরে । বড় রাস্তা ছেড়ে আমাদের গাড়ি যখন দু'দিকে পাহাড় আর জঙ্গল ঘেরা সম্পূর্ণ জনবসতিবিহীন রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলল তখন বুঝলাম এখানে ব্রেকফাস্ট পাওয়ার থেকে নিজেরা বন্যজন্তুদের হাতে ব্রেকফাস্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি !

আরও কিছুক্ষণ চলার পরে পড়ল 'পম্পাসার চেক পয়েন্ট' । এখানে বুকিং এর কাগজ দেখালে এরা ভেতরে যাওয়ার অনুমতিপত্র দেয় । মাথাপিছু ২০ টাকা এবং গাড়ির জন্য ৫ টাকা (প্রতিদিন) হিসেবে এখানে প্রবেশমূল্য দিতে হয় (বাঃ, জন্তুজানোয়ার দেখতে গেলে প্রবেশমূল্য দিতে হবে না ?) । পম্পাসার থেকে টিকরপাড়া যেতে আরও আধঘন্টা লাগল - আমরা পৌঁছলাম সাড়ে আটটার সময়ে ।

টিকরপাড়ায় পৌঁছে আমরা কিছুটা সমস্যায় পড়লাম ।  টিকরপাড়ায় থাকার জায়গা নেচার ক্যাম্পের টেন্ট - পৌঁছে দেখলাম তার গেট বন্ধ আর আশেপাশে কাউকে দেখা যাচ্ছে না । সেইসঙ্গে আমাদের কারুর মোবাইলও কাজ করছে না । অর্থাৎ আমাদের বুকিং-এর কাগজপত্রে দেওয়া ফোন নম্বরে যোগাযোগ করার কোনও উপায় নেই । কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর একজনের দেখা পাওয়া গেল, সেই হল এখানকার কেয়ারটেকার । তার কাছ থেকে জানলাম অঙ্গুলের অফিস থেকে আমাদের আসার খবর তাকে পাঠানো হয়নি । এটা নাকি সিজ্‌ন নয়, ওর কাজের ছেলেরাও এখন প্রায় কেউই নেই কাজেই আমাদের থাকার মতো কোনও বন্দোবস্তই করা নেই । অগত্যা আমাদের একটু অপেক্ষা করতে হবে ।

টিকরপাড়া নেচার ক্যাম্প
আমরা বসে রইলাম । জায়গাটায় টেন্ট ছাড়াও গাছের ছায়ায় ছোট ছোট বসার জায়গা আছে আর একটা খড়ের চাল দেওয়া খাওয়ার জায়গা আছে । জায়গাটা মহানদীর একেবারে ধারে, বসে বসে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে ভালোই লাগছিল । এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় - প্রচন্ড গরম হওয়া উচিৎ কিন্তু জায়গাটা গাছপালা ঘেরা হওয়ায় আর আগেরদিন রাতে বৃষ্টি হওয়ায় গরম তো লাগছিলই না, বরং কিছুটা ঠান্ডার দিকেই । ইতিমধ্যে আরেকটা ট্যুরিস্ট দল এসে হাজির হয়েছে - বলা বাহুল্য বাঙালি দল । এদেরও আমাদের মতোই অবস্থা অর্থাৎ এদের আসার খবরও কেয়ারটেকারের কাছে পৌঁছয়নি । সাড়ে দশটার কিছু আগে আমাদের টেন্ট রেডি হল ।

আমরা নিয়েছিলাম ডিলাক্স টেন্ট যার ভাড়া ২,০০০ টাকা (খাওয়াসুদ্ধ) । টেন্টগুলো বেশ সুন্দর, ভেতরে একটা খাট, দু'টো চেয়ার আর একটা টেবিল আছে । প্রত্যেকটা টেন্টের পেছনে বাইরে একটা বাথরুম । প্রত্যেকটা টেন্টের চারপাশে বাঁশের বেড়া দেওয়া আছে যদিও তার মানে এই নয় যে একটা থেকে অন্যটায় যেতে গেলে খুব বেগ পেতে হবে ।

(এখানে না বলে পারছি না যে টিকরপাড়ার মানুষের জীবনযাত্রা খুব বাঁশের ওপর নির্ভরশীল । আমাদের নেচার ক্যাম্পে গাছের গা থেকে ঝোলানো একটা দোলনা আছে যেটা দড়ির বদলে বাঁশ দিয়ে আটকানো । এরা জামাকাপড় শুকোতে দেওয়ার সময়েও দড়ির বদলে বাঁশের ওপর টাঙায় । কাজেই এখানে বেড়াতে গেলে 'বাঁশ হইতে সাবধান' !)

মহানদী - কুমীর প্রকল্পে যাওয়ার পথে
টেন্টের ভেতরে কোনও পাখার ব্যবস্থা নেই, সাধারণতঃ কোনও টেন্টেই থাকে না । গরমকালে এইসব জায়গায় কেউ যায়ও না কাজেই পাখার ব্যবস্থা করার দরকার পড়ে না । যত বেলা বাড়তে লাগল তত তাপমাত্রাও বাড়তে থাকল আর আমরা অনুভব করলাম টেন্টের ভেতরে থাকা যাচ্ছে না । তবে তাতে সমস্যা নেই কারণ টেন্টের সামনে নদীর ধারে গাছের তলায় বেঞ্চির ওপর বসে/শুয়ে থাকতে ভালোই লাগছিল ।

কুমীর প্রকল্পে ঘড়িয়াল
একটু পরে আমরা গেলাম কাছেই 'কুমীর প্রকল্প' দেখতে । যদিও আমরা গাড়ি নিয়ে গেলাম তবে এই পথটুকু হেঁটেই যাওয়া যায় । একেবারে নদীর ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যেতে হয় এই জায়গায় । দেখার মধ্যে কিছু কুমীর আর ঘড়িয়াল আছে । তাছাড়া আছে একটা কচ্ছপ । এই জায়গাটাও গাছপালায় ঘেরা - ফুরফুরে হাওয়ায় ঘুরঘুর করতে বেশ লাগে ।

মহানদীতে চান
ফিরে এসে আমরা গেলাম মহানদীতে চান করতে । মহানদীতে প্রচুর কুমীর আর ঘড়িয়াল আছে (ভয় দেখানোর জন্য বাড়িয়ে বলছি না) কাজেই চান করা বিপজ্জনক । বিভিন্ন জায়গায় সাইনবোর্ডে লেখাও আছে জলে না নামার কথা । যদিও এদের স্থানীয় লোকেরা নদীতে চান করে, কাপড় কাচে কিন্তু এরাও নদীর ধারেই থাকে, বেশিদূর এগোয় না । তাই চান করতে ইচ্ছে হলে আরও লোকজন যেখানে আছে, সেরকম জায়গায় যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ । আমরা কিছুক্ষণ চানটান করে ফিরে এলাম (Performed by experts. Do not try this) ।

দুপুরে ভাত-ডাল-আলুভাজা-তরকারি আর চিকেন । রান্না এককথায় বেশ বাজে । কেয়ারটেকার নিজেই রান্না করেছে - আমাদেরও আর কোনও উপায় নেই, তাই ঐ খাবারই খেতে হল । দুপুরে টেন্টের ভেতরটা অগ্নিকুন্ড হয়ে আছে, তাই বাইরেই বসে রইলাম ।

টিকরপাড়ায় ঝড়ের তান্ডব
বিকেল হতে দেখা গেল আকাশটা ক্রমশঃ কালো হয়ে আসছে । চারটের একটু পরে আকাশ একেবারে কালো হয়ে প্রচন্ড ঝড় শুরু হল । এই ঝড়ে টেন্টে থাকা নিরাপদ নয়, তাই আমরা সবাই মিলে খড়ের চালে ঢাকা খাওয়া জায়গাটায় আশ্রয় নিলাম । সেখান থেকে দেখলাম মহানদী আর সাতকোশিয়া গর্জে ঝড় আর বৃষ্টির তান্ডব । প্রচন্ড ঝড় আর সেইসঙ্গে বৃষ্টি - চারদিক একেবারে সাদা হয়ে গেছে । আমাদের টেন্টের ক্যানভাসগুলো অসহায়ের মতো এদিকওদিক ঝাপটাচ্ছে । খাওয়ার জায়গাটার শুধু মাথাটাই ঢাকা - চারপাশটা খোলা । সেখান দিয়ে অনবরত বৃষ্টির ছাট গায়ে লাগছিল । আমরা কোনওমতে বৃষ্টি বাঁচিয়ে (খুব যে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলাম এমন নয়, দুপুরের ওই গরমের পর বৃষ্টিটা ভালোই লাগছিল) দাঁড়িয়ে রইলাম । আমাদের মাথার ওপরে খড়ের চালের কিছুটা উড়ে গিয়ে সেখান দিয়ে জল পড়তে লাগল । সবমিলিয়ে যাকে বলে বেশ থ্রিলিং ব্যাপার !

সূর্য্যাস্তের ঠিক আগে
বৃষ্টি থামল ঘন্টাখানেক পরে । আমি আমাদের নেচার ক্যাম্প থেকে নদীর একেবারে ধারে চলে গেলাম । প্রচন্ড জোরে হাওয়া সেখানে তখনও অল্প অল্প বৃষ্টির আমেজ অনুভব করছিলাম । অত ঝড়ের পর নদীর জলের অস্থিরতা তখনও কমেনি । সেখানে দাঁড়িয়ে দেখলাম দু'টো পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে সূর্য্য অস্ত চলে গেল । পরিবেশটার মধ্যে একটা ভীষণ ভালোলাগা কাজ করছিল যা শুধু অনুভবই করা যায়, ব্যাখ্যা করা যায় না ।

রাতের আলোয় টিকরপাড়া নেচার ক্যাম্প
সন্ধ্যেবেলা আর কিছু করার নেই । গরম একেবারেই লাগছিল না, চাঁদের আলোয় টেন্টের বাইরে বসে বসে সবাই মিলে আড্ডা দিলাম । দুপুরে চিকেনের শোচনীয় অবস্থা দেখে নন্দিনীদি আগেই বলে রেখেছিলেন যে রাতের চিকেনটা উনি রান্না করবেন । এতে কেয়ারটেকার খুশিই হল কারণ রান্নাটা ওর নিজের সামর্থ্যের মধ্যের জিনিস নয় । রাতে নন্দিনীদির রান্না করা চিকেন দিয়ে (অসাধারণ হয়েছিল, নন্দিনীদি !) রুটি খেয়ে শুয়ে পড়লাম ।

মহানদীতে নৌভ্রমণ
পরেরদিন সকালে উঠে চা খেয়ে রেডি হয়ে নিলাম । আগে থেকেই পরিকল্পনা ছিল আমরা মহানদীতে নৌভ্রমণে বেরোব । দলে আমরা ছ'জন ছাড়াও আরও সাতজন (যারা গতকাল এখানে এসেছিল) । নৌকো বলতে আসলে একটা ডিঙিই বলা চলে । নদীর ধার দিয়ে মাঝে মাঝে দাঁড় বেয়ে মাঝে মাঝে লগি ঠেলে আমাদের নৌকা চলল । অভিজ্ঞতাটা আমার কাছে নতুন না হলেও অনেকদিন পরে - কাজেই বেশ মজা লাগছিল । যেতে যেতে মাঝে দূর থেকে জলের মধ্যে একটা কুমীর দেখা গেল (বলা বাহুল্য তাতে দলের সবার মধ্যেই বেশ চাঞ্চল্য দেখা গেল - লোকজন ছবিটবিও তুলল) ।

পাথরে ঢাকা নৌ-হল্ট্‌
প্রায় ঘন্টাখানেক চলার পর নৌকো একজায়গায় ভিড়ল । জায়গাটা পাথর দিয়ে ঢাকা - ছোটো ছোটো পাথরের স্তুপ । আমরা সেখানে কিছু ঘোরাঘুরি করে আবার ফেরার পথ ধরলাম । ফেরার সময়ে নৌকো কিছুটা মাঝখান দিয়ে ফিরল আর স্রোতের অনুকূলে হওয়ার দরুণ ফিরতে কম সময় লাগল । নৌকোর ভাড়া নিল ৮০০ টাকা ।



এরপর আমরা লুচি তরকারি দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়লাম । আমাদের পরের গন্তব্য পুরুনাকোটে ।

পুরুনাকোটের কটেজের ঘর
যে রাস্তা দিয়ে আমরা কাল টিকরপাড়া গেছিলাম, পুরুনাকোটে যেতে গেলে সেই রাস্তা দিয়েই কিছুটা ফিরে আসতে হয় । টিকরপাড়া থেকে পুরুনাকোটের দুরত্ব ১০ - ১৫ কিলোমিটারের মতো । পুরুনাকোটে টিকরপাড়ার মতো রিমোট নয়, এখানে কিছু দোকান টোকান আছে । এখানে উড়িষ্যা বনদপ্তরের 'ফরেস্ট রেস্ট হাউস' আছে - পুরুনাকোটের থাকার জায়গাটাও সেখানেই । এখানে পৌঁছেও আমরা একই সমস্যার সম্মুখিন হলাম - অঙ্গুল থেকে এখানে কোনও খবর আসেনি । পুরুনাকোটের থাকার জায়গাটা কটেজ, সেখানে আবার বিদ্যুতের সমস্যা । এখানে মাত্র দু'টোই ঘর আছে - সেগুলো পরিষ্কার হতে কিছুক্ষণ সময় লাগল । পুরুনাকোটের ঘরভাড়া ১,০০০ টাকা করে আর সেটা খাওয়াসুদ্ধ নয় । এখানে প্রতি দু'জনের জন্য ৫০০ টাকা করে খাবার নেওয়া যেতে পারে । আমরা সেরকম ব্যবস্থাই করলাম ।

দুপুরে ডিমের ডালনা দিয়ে ভাত খেয়ে আমরা গাড়ি নিয়ে ঘুরতে বেরোলাম । এখান থেকে পম্পাসার চেক পয়েন্টের দিকে আরও কিছুটা এগোলে লবঙ্গীর দিকে যাওয়া যায় । আমাদের কেয়ারটেকার বলল - লবঙ্গীর ওয়াচ্‌ টাওয়ার থেকে কিছু জন্তু জানোয়ারের দেখা মিলতে পারে ।

লবঙ্গী যাওয়ার পথ
সেইমতো আমরা লবঙ্গীর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম । এই যাওয়ার পথটাই বিশেষ উল্লেখযোগ্য । দু'দিকের জঙ্গলের মধ্যের কাঁচা রাস্তার মধ্যে দিয়ে উঁচুনিচু পথে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলল । মাঝে একজায়গায় আমরা গাড়ি থামিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম । জঙ্গলের ভেতরে নিস্তব্ধতার মধ্যে সে এক অদ্ভুত গা-ছমছমানি পরিবেশ । প্রতিমূহুর্তে বন্য জন্তুদের দেখতে পাওয়ার এক অনাবিল আকর্ষণ (আমি এই ভাষায় লিখি না, এই দু'টো লাইন সানন্দার প্রতিবেদকের প্রতি একটা ছোট্ট শ্রদ্ধার্ঘ্য) ।

যাওয়ার পথে একজায়গায় চোখে পড়ল উড়ন্ত কাঠবিড়ালী । লবঙ্গীতে পৌঁছে জানা গেল এখন উড়িষ্যা ভোটের জন্য অনেক কিছু বন্ধ - ওয়াচ্‌টাওয়ারেও যাওয়া যাবে না । আমরা লবঙ্গীর ফরেস্ট রেস্ট হাউস পর্যন্ত পৌঁছলাম । এখানেও আর কোনও ট্যুরিস্ট নেই । আমরা কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে আবার ফেরার পথ ধরলাম । জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়ি পথে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ফেরার সময়ে থেকে থেকেই কেন জানি না গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিল ! (আদৌ উঠছিল না, এটাও ওই - শ্রদ্ধার্ঘ্য !)

পুরুনাকোটেতে চাঁদের আলোয় আড্ডা
কটেজে ফিরে দেখলাম লোডশেডিং । কেয়ারটেকার জানালো কোথায় একজায়গায় হাতি ইলেকট্রিকের তার ছিঁড়ে দিয়েছে - রাতের মধ্যে কারেন্ট আসার সম্ভাবনা কম । আমরা কটেজের সামনের লনে বসে রইলাম । আকাশে পূর্ণচন্দ্র - আর খুব হাল্কা হাল্কা হাওয়া দিচ্ছিল বলে গরম লাগছিল না ।



রাতে রুটি আর চিকেন । এখানেও নন্দিনীদিই রান্না করলেন । আলো না থাকায় আমরা লনেই খোলা আকাশের নিচে বসে যাকে বলে 'মুনলাইট ডিনার' করলাম । পুরুনাকোটেতে আমাদের রাত্রিযাপন এভাবেই শেষ হল ।

পরেরদিন ১৫ই এপ্রিল, ২০১৪ । বাংলা নববর্ষ । আমাদের ফেরার দিন । সকালে লুচি আর আলুর তরকারি দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়লাম । আগেই বলেছি অঙ্গুল থেকে আমাদের ফেরার কোনও উপায় নেই তাই আমাদের কটক যেতে হবে । কটক থেকে দুপুরে ধৌলি এক্সপ্রেস ধরে হাওড়া ।

কটক স্টেশন
আমাদের গাড়ি আমাদের কটক স্টেশনে ছেড়ে দিল । পুরুনাকোটে থেকে কটক আসতে ঘন্টাতিনেক লাগে । কটকে এসে আমরা স্টেশন থেকে দুপুরের খাওয়া সেরে নিলাম । তারপর ট্রেনে চড়ে হাওড়া ! খতম্‌ !






সারসংক্ষেপঃ

১. উড়িষ্যার কটকের কাছে পাহাড় আর জঙ্গল ঘেরা একটা জায়গা সাতকোশিয়া । এখানকার সিজ্‌ন্‌ নভেম্বর থেকে মার্চ - এই সময়সীমার বাইরে সাতকোশিয়ায় যাওয়ার মানে হয় না, কারণ তাতে এখানে যাওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য চরিতার্থ নাও হতে পারে ।
২. সাতকোশিয়ার সবচেয়ে কাছের রেলস্টেশন অঙ্গুল - এখান থেকে গাড়িতে যেতে ঘন্টাখানেক লাগে । হাওড়া থেকে অঙ্গুল যাওয়ার ট্রেন সপ্তাহে একটাই ছাড়ে - শনিবার রাতে । এছাড়া কটক পর্যন্ত্য ট্রেনে গিয়ে তিনঘন্টার গাড়ির জার্নি করেও সাতকোশিয়া যাওয়া যেতে পারে ।
৩. সাতকোশিয়ায় থাকার বা ঘোরার জায়গা প্রধানতঃ চারটে - টিকরপাড়া, ছোটকেই, পুরুনাকোটে আর লবঙ্গী । এদের মধ্যে টিকরপাড়াতে একদিন অবশ্যই থাকা উচিৎ ।
৪. যদিও এখানে বিভিন্ন রুটে সরকারি বাস চলে, কিন্তু সাতকোশিয়ায় ঘোরার জন্য নিজস্ব গাড়ি থাকাই শ্রেয় । অঙ্গুল বা কটক থেকে অল্প খরচে ২ - ৩ দিনের জন্য গাড়ি ভাড়া করে নেওয়া যেতে পারে ।
৫. সাতকোশিয়ার সবজায়গাতেই উড়িষ্যার বনদপ্তরের থাকার জায়গা রয়েছে । বুকিং এর জন্য এদের ওয়েবসাইট http://www.satkosia.org/ দেখা যেতে পারে অথবা ইমেল বা ফোনে যোগাযোগ করা যেতে পারে । ইমেল : dfosatkosiawl@yahoo.co.in, ফোন : 08763102681.
৬. সাতকোশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় একটা বড় সমস্যা হল এখানে মোবাইলের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না বা পাওয়া গেলেও তা খুবই ক্ষীণ । কাজেই বাইরের কারুর সঙ্গে দরকার পড়লেও যোগাযোগ করা যাবে না এটা ধরে নিয়েই সাতকোশিয়ায় যাওয়া উচিৎ ।
৭. এখানে দোকানপাট নেই বললেই চলে - খাওয়াদাওয়ার জন্যও রিসর্টের ওপরেই নির্ভর করতে হয় । নিজের ইচ্ছেমতো খাদ্যসামগ্রীও পাওয়ারও সম্ভাবনা নেই ।

উপসংহারঃ

সাতকোশিয়া 
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে সাতকোশিয়ার পরিবেশ বেড়ানোর পক্ষে যথেষ্ট অনুকূল নয় । হ্যাঁ, এটা ঠিক নাগরিক পরিষেবা বলতে যে জিনিসগুলো আমরা প্রতিমূহুর্তেই পেতে অভ্যস্ত, তার অনেককিছুই এখানে পাওয়া যায় না, পয়সা ফেললেও না । কিন্তু এটাই হয়তো এই জায়গার ইউ এস পি । প্রতিকূল অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটাও জীবনের একটা শিক্ষা । বিশেষ করে তার পরিবর্তে যদি অসামান্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য দেখার সু্যোগ পাওয়া যায় । প্রকৃতির মধ্যে থাকা, প্রকৃতিকে দেখা - এগুলোই সাতকোশিয়ার মূল আকর্ষণ । আমরা এর আগেও প্রকৃতির মধ্যে থেকেছি, কিন্তু এভাবে একেবারে কেন্দ্রস্থলে গিয়ে কখনও পড়িনি । এর একটা আলাদা স্বাদ আছে - অনুভূতি আছে - গন্ধ আছে । আর এগুলোর কোনওটাই যদি টের না পাওয়া যায়, তাহলে নিজের ফুসফুসটাকে চাঙ্গা করতে অন্তত বিশুদ্ধ অক্সিজেন তো আছেই । এইসবকিছুকে পেতে হলে কলকাতা থেকে মাত্র ঘন্টা ৯ ঘন্টার দুরত্বে সাতকোশিয়ায় একবার ঘুরে আসতেই হবে !
বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ - অফ্‌ সিজ্‌নে সাতকোশিয়ায় নৈব নৈব চ ।

সাতকোশিয়া ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Sunday, February 16, 2014

কলকাতা ভ্রমণ : পর্ব - ১ (চিড়িয়াখানা)

কলকাতা ভ্রমণ ! শুনেই পড়েই একটু অবাক লাগছে কি ? লাগারই কথা । আমি কলকাতার ছেলে - বলতে গেলে প্রায় সারা বছর কলকাতাতেই থাকি, সেখানে আবার ভ্রমণ কি ? আসলে আমার এই প্রিয় শহরটাতেও ভ্রমণের বা দেখার জায়গা অনেকগুলো আছে, কিন্তু এর অনেকগুলোই আমাদের দেখা হয়ে ওঠে নি / ওঠে না । ঘোরার জন্য - দেখার জন্য আমরা শহরের বাইরে, রাজ্যের বাইরে, দেশের বাইরে, মহাদেশের বাইরে এমনকি পৃথিবীর বাইরেও যাই কিন্তু "দেখা হয় নাই ... শিশিরবিন্দু !" সেইজন্য ঠিক করেছি এবার কলকাতা ভ্রমণ নিয়ে লেখা শুরু করব ।

কলকাতা ভ্রমণ একবারে লেখা সম্ভব নয় । তার প্রধানতঃ দু'টো কারণ - ১) কলকাতায় এত দেখা জায়গা আছে যার সব একবারে দেখে ফেলে লিখে ফেলা দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ আর ২) যা দেখার জায়গা আছে সেগুলো একবারে দেখা সম্ভবও নয় । তাই যখন যেরকম দেখা হবে, সেইমতো কলকাতা ভ্রমণ সম্পর্কে লেখা চলতে থাকবে ।

কলকাতার চিড়িয়াখানা প্রায় সব্বাই ছোটবেলায় একবার করে যায় আর বহু লোকের ক্ষেত্রে দেখেছি বড় হয়ে আর কিছুতেই যাওয়া হয়ে ওঠে না । আমি নিজেও ছোটবেলায় বছর ৪ - ৫ বয়সে একবার গেছিলাম আর বড় হওয়ার পর বহুবার চেষ্টা করেও যাওয়া হয়ে ওঠেনি । অবশেষে একটা পুচকেকে নিয়ে যাওয়ার জন্যই আমার বড় বয়সে চিড়িয়াখানা যাওয়াটা হয়ে গেল - তিনি হলেন আমার বড় শ্যালিকার দু'বছরের ছেলে শ্রীমান আত্মদীপ চট্টোপাধ্যায় । দলে আমি আর সে ছাড়াও আমার স্ত্রী আর তার বাবা-মা ।

১৬ই ফ্রেব্রুয়ারী, ২০১৪ রবিবার । দিনটা কিছুটা দুর্যোগপূর্ণ হওয়ায় আমরা আলিপুর পৌঁছলাম তখন দুপুর পৌনে একটা । গাড়ি পার্কিং এর জায়গাটা চিড়িয়াখানা থেকে মিনিট পাঁচেকের হাঁটা পথ - এখানে সারাদিনের জন্য গাড়ি রাখতে ১৫০ টাকা নিল (মরশুমের সময়ে সেটা নাকি ২৫০ - ৩০০ তেও পৌঁছে যায় !) । চিড়িয়াখানার একেবারে কাছে সেরকম কোনও ভালো খাবার দোকান নেই, মেইন গেটের উল্টোদিকে একটা সাধারণ ভাতের হোটেল আছে ।

চিড়িয়াখানায় ঢোকার আগে এর উল্টোদিকে 'অ্যাকোরিয়াম' দেখে নেওয়া যেতে পারে । প্রবেশমূল্য মাথাপিছু ৫ টাকা আর দু'বছরের নিচে টিকিট লাগে না । অ্যাকোরিয়ামে যথারীতি নানা প্রজাতির নানা রঙের নানা আকৃতির নানা দেশের মাছ রয়েছে । অ্যাকোরিয়ামটা বেশ বড় এবং ভেতরে ছবি তোলা নিষিদ্ধ । এদের মধ্যে রাক্ষুসে মাছ 'পিরান্‌হা'কেও দেখতে পেলাম ।

এবার রাস্তা পেরিয়ে মূল চিড়িয়াখানায় প্রবেশ । এখানে প্রবেশমূল্য ২০ টাকা আর দু'বছর পর্যন্ত ফ্রি । ক্যামেরার জন্য কোনও টিকিট লাগে না (এটা আমার বেশ ভালো লাগল কারণ ইদানিংকালে দার্জিলিঙ, নন্দনকানন বা শিলং-এ যে'কটা চিড়িয়াখানা দেখেছি, প্রত্যেকটাতেই ক্যামেরার জন্য আলাদা টিকিট লেগেছে) । চিড়িয়াখানার সময়সীমা সকাল ন'টা থেকে বিকেল পাঁচটা । প্রতি বৃহস্পতিবার চিড়িয়াখানা বন্ধ থাকে তবে কোনও বৃহস্পতিবার কোনও সরকারী ছুটির দিন পড়ে গেলে সেদিন খোলা থাকে ।

ভেতরে ঢুকেই প্রথমে একটা ম্যাপ দেওয়া আছে, সেখানে বিভিন্ন জন্তু এবং নিজেদের অবস্থান দেখে নেওয়া যেতে পারে । আমাদের খুব কাছেই রয়েছে বাঘ - তাই আমরা সেদিকেই এগোলাম । যাওয়ার পথে কিছু কাকাতুয়া, ম্যাকাও ইত্যাদি দেখে নেওয়া গেল ।

রানি
এরপর 'রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার' । একটা পরিখাঘেরা বেশ বড় জায়গায় এনাকে রাখা হয়েছে এবং আমরা যতক্ষণ ছিলাম তিনি পুরো জায়গাটা পায়চারি করলেন । আমরা রাজসকাষে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে 'রানি'কে (এটাই বাঘের নাম) দেখলাম আর অনেক ছবি তুললাম ।



পাখিদের খাঁচা
এরপর আরও কিছু পাখির খাঁচা ছিল, সেখানে কয়েকজনকে দেখা গেল । আরও কিছুটা এগিয়ে ময়ূরের খাঁচায় ময়ূরকে দেখা গেল কিছু তার পেখম দেখা গেল না (যথারীতি কিছু লোক খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে ময়ূরকে পেখম তোলার জন্য বিশুদ্ধ বাংলায় অনুরোধ করছিল, কিন্তু কেন জানিনা ময়ূর কিছুতেই তাদের কথা শুনছিল না !) ।


জিরাফের ঘর
চিড়িয়াখানার ভেতরে কিছু জলাশয় আছে আর সেগুলো পেরোনোর জন্য ছোট ছোট ব্রীজও করা আছে । সেরকম একটা ব্রীজ পেরিয়ে আমাদের সামনে পড়ল জিরাফের খাঁচা । তখন বৃষ্টি বেশ জোরে পড়ছে - বেচারা জিরাফরা তাদের দর্শনার্থীদের দর্শনার্থে কিছুতেই বাইরে বেরোতে চাইল না । আমরা ঘরের ভেতরে তাদের যতদূর দেখা যায়, দেখলাম । একটা বাচ্চা জিরাফ বারবার বেরিয়ে আসছিল আর একটা বড় জিরাফ তাকে ধরে আবার ভেতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছিল । দেখে মনে হল :
মা : বাবু, আবার বৃষ্টির মধ্যে ভিজছ ?
বাবু : একটু যাই না !
মা  : না সোনা, বৃষ্টিতে ভিজলে ঠান্ডা লেগে যাবে । কাল আকাশ পরিষ্কার থাকলে অনেক লোক আসবে, তাদের সামনে ঘোরাঘুরি করতে হবে না ? এখন একদম ভিজবে না !

হাতিদের বাড়ি
জিরাফের পরে কিছু চিতাবাঘ, প্যান্থার ইত্যাদিদের দেখা গেল । তারপর আমরা গেলাম হাতির কাছে । তিনটে বড় আর একটা বাচ্চা হাতিকে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম । বোধহয় বৃষ্টির জন্যই হাতিরও সেরকম হাঁটাচলা দেখা গেল না ।





হাতির পরে যেটা উল্লেখযোগ্য সেটা হল সিংহ । সিংহকেও বাঘের মতো একটা পরিখাঘেরা খোলা জায়গায় রাখা হয়েছে আর পশুরাজকে আমরা দেখলাম ওনার ঘরের সামনে শুয়ে বিশ্রাম করছেন । মাঝে একবার ঘাড়টা তুলে আমাদের একটু তাচ্ছিল্যমিশ্রিত দর্শন দিলেন, তারপর আবার শুয়ে পড়লেন ।

আমরা আরও এগিয়ে চললাম । শুরুতে বৃষ্টিটা ঝিরঝির করে হলেও এখন ঝমঝম করে হচ্ছে । এরপর আমরা দেখতে পেলাম জলহস্তিকে । তার পুরো শরীরটাই জলের নিচে - শুধু পিঠের ওপরের কিছুটা ওপরে । একবার মাথাটা সামান্য তুলল, আবার যেই-কে-সেই ।

খাঁচার ভেতরে সাদা বাঘ
আরও এগিয়ে আরেকটা বাঘের খাঁচা - তবে এবার আর কোনও খোলা জায়গা নয়, একেবারে ঢাকা খাঁচা । সেখানেও বাঘকে পায়চারি করতে দেখা গেল আর এবার একেবারে খাঁচার সামনের দিক ঘেঁষে । অর্থাৎ দর্শকের সঙ্গে তার দূরত্ব হাত দু'য়েকের বেশি নয় । বাঘের পাশের সাদা বাঘ । একেও দেখলাম খাঁচার ভেতরে পায়চারি করতে ।


শীতকালে চিড়িয়াখানায় সরীসৃপের ঘর বন্ধ থাকে, আমরা আর ওদিকে গেলাম না । তার বদলে বাঁদরের খাঁচার সামনে দিয়ে এলাম আর সামনেই জলের মধ্যে কুমীরকে দেখলাম ।

আমাদের চিড়িয়াখানা দেখা শেষ - বৃষ্টিও সেইসঙ্গে সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে, তাই এবার আমরা ফেরার পথ ধরলাম ।

উপসংহারঃ

কলকাতা চিড়িয়াখানা
কলকাতার চিড়িয়াখানা সম্পর্কে প্রথম যে কথাটা উল্লেখ করতেই হবে সেটা হল আমাদের ভুল ধারণার কথা । কেন জানি না, বহু লোক মনে করে আলিপুর চিড়িয়াখানায় কোনও রক্ষণাবেক্ষণ হয় না । হয়তো একসময়ে সত্যিই হতো না, কিন্তু এখন হয় এবং স্বীকার করতেই হয় বেশ ভালোভাবেই হয় । একটা ভালো জিনিস লক্ষ্য করলাম সেটা হল প্রত্যেকটা জন্তুর দায়িত্ব একজন/কোনো সংস্থা নিয়েছেন । তিনি/তাঁরা ১৮ই সেপ্টেম্বর ২০১৩ - ১৭ই সেপ্টেম্বর ২০১৪ পর্যন্ত এই দায়িত্ব নিয়েছেন । আন্দাজ করলাম প্রত্যেক বছর এই দায়িত্ব নতুন করে বিন্যাস করা হয় । এছাড়া আলিপুর চিড়িয়াখানা যথেষ্ট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন । ভেতরে কিছু স্ন্যাক্স খাওয়ার ব্যবস্থাও আছে । সবমিলিয়ে যথেষ্ট চিত্তাকর্ষক । আমি এখানে আমাদের দেখা প্রধান জন্তু বা পাখিদের কথাই উল্লেখ করেছি, কিছু ছোটখাটো জিনিস আর বিস্তারিত উল্লেখ করিনি । কাজেই আমার লেখা পড়ে যদি মনে হয় "এ আর কি এমন, এই ক'টা জিনিস দেখতে যাওয়ার কোনও মানে হয় না" তাহলে ভুল হবে । আমার মতে ইদানীংকালে না গিয়ে থাকলে কলকাতা চিড়িয়াখানায় একবার যাওয়া যেতেই পারে !

কলকাতা চিড়িয়াখানার নিজস্ব ওয়েবসাইট http://www.kolkatazoo.in/ থেকে এখানকার সম্পর্কে আরও তথ্য জানা যেতে পারে ।

Monday, January 27, 2014

দার্জিলিঙ ভ্রমণ

আগেই বলেছি, দী-পু-দা সম্পর্কে আমার ভ্রমণসর্বস্ব ব্লগ মূলতঃ নীরবতাই পালন করবে । সেই সূত্র ধরেই এবারের দার্জিলিঙ ভ্রমণ এক নাতিদীর্ঘ শুধুমাত্র তথ্যসমৃদ্ধ রচনায় পরিণত হতে চলেছে । ভাষার এই গাম্ভীর্য্যের কারণ ? সম্প্রতি আমার জনৈকা পাঠিকা আমাকে এক বাজারচলতি পত্রিকায় একটি ভ্রমণকাহিনী পড়িয়ে বলেছেন "তুমি এ'রকম ভাষায় লিখতে পারো না ?" বলা বাহুল্য, সে'ভাষা এরকমই অ-চলিত । একটা পূর্ণদৈর্ঘ্যের ভ্রমণ-অভিজ্ঞতাকে এই ভাষায় মুখর করে তোলা আমার মতো অপটু লেখকের কাছে শুধু পরিশ্রমসাপেক্ষই নয়, ক্লান্তিকরও বটে - তাই এই সংক্ষিপ্ত রচনায় আমার এই 'ছোট্ট' প্রয়াস ।

যাওয়া ঃ ২২শে জানুয়ারী, ২০১৪ রাত ৯:৪০ - কলকাতা ডিব্রুগড় এক্সপ্রেস (সাপ্তাহিক ট্রেন) ।
ফেরা ঃ ২৬শে জানুয়ারী, ২০১৪ বিকেল ৫:৪০ - উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস ।

আমাদের দলে আমি, আমার স্ত্রী অমৃতা, তার কলিগ্‌ নন্দিনীদি, দীপঙ্করদা আর ওঁদের যমজ ছেলে সায়ক ও সৌনক ।

সারসংক্ষেপঃ

১. দার্জিলিঙ-এর মরশুম প্রধানতঃ মে-জুন মাস বা সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাস । সেই অর্থে জানুয়ারী মাস মন্দা-মরশুম । আর সেই কারণেই আমরা বিভিন্নরকম ক্ষেত্রে বেশ কিছু আর্থিক ছাড় পেয়েছি ।
২. আমরা নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন সংলগ্ন 'নিউ সিকিম ট্রাভেল' থেকে প্যাকেজ গাড়ি নিয়েছিলাম । এই গাড়ি আমাদের নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিঙ পৌঁছে দেওয়া, দার্জিলিঙ-এর আশপাশ ঘোরা আর দার্জিলিঙ থেকে নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছে দেওয়া - পুরোটার জন্য মোট ৬,৫০০ টাকা নিয়েছে ।
৩. আমরা ছিলাম 'বেলভিউ হোটেল'-এ । বেলভিউ দার্জিলিঙ এর সর্ব্বোত্তম হোটেলগুলোর মধ্যে অন্যতম । এখানকার যে ঘরগুলো মরশুমে ২,০০০ টাকা ভাড়া - সেগুলো আমরা পেয়েছি ১,৪০০ টাকায় । বেলভিউ হোটেলের ওয়েবসাইট http://www.bellevuehotel-darjeeling.com/ এবং ফোনে যোগাযোগ করার উপায় - Tashi Pulger - 9800667148.
৪. দার্জিলিঙ-এর আশেপাশে ঘোরার জন্য অনেকগুলো জায়গা থাকলেও মূলতঃ দেখার জায়গা টাইগার হিল, বাতাসিয়া লুপ, চিড়িয়াখানা আর রোপওয়ে । কোনও কারণেই এরমধ্যে কোনওটা বাদ দেওয়ার মানে হয় না ।
৫. আমার মতে দার্জিলিঙ-এর সবথেকে বড় আকর্ষণ দু'টো - টয়ট্রেন (দার্জিলিঙ-হিমালয়ান রেলওয়ে) আর ম্যাল । (কাঞ্চনজঙ্ঘা লিখলাম না, কারণ কাঞ্চনজঙ্ঘা দার্জিলিঙ ছাড়াও অন্য জায়গা থেকে দেখা যায়) এদের মধ্যে ম্যালে সবসময়েই যাওয়া যায়, কিন্তু সবসময়ে পাওয়া যায় না টয়ট্রেনের দেখা । আমরা সৌভাগ্যবান - আমরা ১৩৩ বছরের প্রাচীন এই ঐতিহ্যে সামিল হতে পেরেছি ।
৬. নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিঙ পর্যন্ত টয়ট্রেনের পরিশেবা বর্তমানে বন্ধ আছে - এখন দার্জিলিঙ থেকে কার্সিয়াং পর্যন্ত ট্রেনে যাওয়া যায় । এছাড়া দার্জিলিঙ-ঘুম-দার্জিলিঙ এ একটা ট্রেন চলে যার নাম জয় ট্রিপ । https://www.irctc.co.in/ থেকে দার্জিলিঙ-হিমালয়ান রেলওয়ের টিকিট কাটা যায় ।
৭. ম্যাল থেকে মিনিটসাতেকের হাঁটা পথে দার্জিলিঙ-এর এক বিখ্যাত রেস্ট্যুরেন্ট কেভেন্টার্স । এখানকার খাবার যে খুব বৈশিষ্ট্যপূর্ণ তা নয় - কেভেন্টার্সে পাওয়া যায় এরকম সব খাবারই অন্যান্য জায়গায় লভ্য । এখানকার মূল আকর্ষণ হল এর ছাদে বসে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে দেখতে খাবার খাওয়া । কেভেন্টার্স ১০০ বছরের পুরোনো দোকান এবং সত্যজিৎ রায়ের একাধিক লেখায় এর উল্লেখ পাওয়া যায় । 'কাঞ্চনজঙ্ঘা' ছবির শ্যুটিং-এর সময়ে এখানে সত্যজিৎ রায় এসেছিলেন - সেই ছবি কেভেন্টার্সের দেওয়ালে টাঙানো রয়েছে ।
৮. দার্জিলিঙ-এ দুপুরের বা রাতের খাওয়ার জন্য অনেক ছোটোখাটো হোটেল আছে, কিন্তু সবথেকে ভালো রেস্ট্যুরেন্ট হল - গ্লেনারিজ । ম্যাল থেকে মিনিট পাঁচেকের হাঁটা দূরত্বে এই রেস্ট্যুরেন্টের খাবার নিঃসন্দেহে খুব ভালো কিন্তু যেটা একেবারেই সন্তোষজনক নয় সেটা হল এদের পরিশেবা । এরা অর্ডার নিতে দেরি করে - আর সেই দেরি করার প্রথাটা বজায় রাখে একেবারে বিল দেওয়া পর্যন্ত ! মাঝখানের কথা আর নাই বা উল্লেখ করলাম ।

উপসংহারঃ

টয়ট্রেন থেকে দার্জিলিঙ শহর
বাংলার তথা ভারতের সবচেয়ে পুরনো শৈলশহরগুলো মধ্যে দার্জিলিঙ বিশেষ উল্লেখযোগ্য । দু'শো বছরের শাসনকালের মধ্যে ইংরেজরা ভারতে অনেক ভালো কাজও করেছিল - তাদের মধ্যে একটা হল এই পর্যটনকেন্দ্রটি নির্মাণ করা । ম্যাল অক্সফোর্ড টয়ট্রেন কেভেন্টার্স কাঞ্চনজঙ্ঘা - এইসব মিলিয়ে দার্জিলিঙের ঐতিহ্যগত গুরুত্ব অপরিসীম । দার্জিলিঙে যেতে হলে মরশুমে না যাওয়াই ভাল, তাতে অবাঞ্ছিত ভীড়ের কবলে পড়তে হয় না । পর্যটকের ভীড়, দোকানদারদের ডাকাডাকি, হোটেলওয়ালা আর গাড়িওয়ালাদের হাত ধরে টানাটানি সহ্য করার সহিষ্ণুতা যদি না থাকে তাহলে তাহলে ডিসেম্বর-জানুয়ারী হল দার্জিলিঙ যাওয়ার পক্ষে সবচেয়ে উপযোগী সময় । যদি আয়েস করা উদ্দেশ্য হয় তাহলে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাত হাজার ফুটেরও বেশি ওপরে এই প্রাচীন শহরটি সেই উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য অনবদ্য ভূমিকা পালন করবে - বিশ্বাস রাখি !

দার্জিলিঙ ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Thursday, January 2, 2014

মুর্শিদাবাদ ভ্রমণ

ছোটবেলায় ইতিহাস বইতে পড়া বাংলার ইতিহাসের কথা বলতে গেলে সবচেয়ে বেশি করে কোন্‌ জায়গাটার কথা মনে পড়ে ? (আমার এই প্রশ্নের উত্তর 'মুর্শিদাবাদ'ই হবে যেহেতু এই লেখা 'মুর্শিদাবাদ ভ্রমণ' সম্পর্কে । তা নাহলে গৌড়, নদীয়া, বাঁকুড়া, বিষ্ণুপুর - এসবও হতে পারত !) হ্যাঁ, মুর্শিদাবাদ । মুর্শিদকুলি খাঁ থেকে শুরু করে নবাব সিরাজ-উদ্‌-দৌলা পর্যন্ত বাংলার নবাবদের স্মৃতি যেখানে জড়িয়ে আছে, তাঁদের ব্যবহৃত সরঞ্জাম আর জীবনযাপনের ইয়ে যেখানে ছড়িয়ে আছে - সেই মুর্শিদাবাদ । নবাব পরবর্তী যুগের হাজারদুয়ারি যেখানে আছে - সেই মুর্শিদাবাদ । ইতিহাস যেখানে জীবন্ত হয়ে মানুষের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ার মতো চলতে থাকে - সেই মুর্শিদাবাদ ।

মুর্শিদাবাদ স্টেশন
২০১৩ সালটা  ইতিহাস হয়ে যাওয়ার কয়েকমূহুর্ত আগে আমাদের যাত্রা শুরু হল এই ঐতিহাসিক জায়গার উদ্দেশ্যে । ৩১শে ডিসেম্বর সকাল ৬:৫০ এ কলকাতা স্টেশন থেকে হাজারদুয়ারি এক্সপ্রেসে আমরা মুর্শিদাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম । এবারে আমাদের দল আটজনের - আমি আমার স্ত্রী, বাবা, মা ছাড়া আমার স্ত্রীর কলিগ নন্দিনীদি, দীপঙ্করদা আর ওঁদের যমজ ছেলে সায়ক ও সৌনক । (নন্‌-আইডেন্টিক্যাল ট্যুইন্স)  পৌঁছনোর নির্ধারিত সময় বেলা ১১:১৮ হলেও আমরা পৌঁছলাম দুপুর দেড়টায় । এর কারণ হল ঐদিন সকালের লালগোলা প্যাসেঞ্জার বাতিল থাকায় আমাদের  ট্রেনটা রাণাঘাটের পর থেকে অল্‌ স্টপ্‌ হয়ে গেল (পরে অবশ্য জেনেছিলাম এটা শুধু ঐদিন হয়েছে এমন নয়, এই ব্যাপারটা ওই লাইনের প্রায় রোজকার ঘটনা) ।

যে টাঙ্গা আমরা চড়েছি
মুর্শিদাবাদ স্টেশনটা খুব সুন্দর দেখতে - হাজারদুয়ারীর আদলে তৈরি করা । স্টেশন থেকে আমাদের 'হোটেল মঞ্জুষা' প্রায় দু'কিলোমিটার দূরে, তাই টাঙ্গা নেওয়া হল । আটজনের জন্য দু'টো টাঙ্গা । এই টাঙ্গায় চড়াটা আমার মনে হয় সবার কাছেই বেশ উপভোগ্য আর এই সুযোগ খুব বেশি জায়গায় পাওয়াও যায় না । পিচের রাস্তার ওপর দিয়ে ঘোড়ার 'খুট্‌ খুট্‌' শব্দ তুলে এগিয়ে চলা আর তার সঙ্গে সহিসের মাঝে মাঝে ছড়ি দিয়ে ঘোড়াকে আল্‌তো করে মারা আদর করা - সবমিলিয়ে ব্যাপারটা বেশ ভালো লাগে । আমাদের হোটেল হাজারদুয়ারির একেবারে সামনে গঙ্গার পাশে, তাই হোটেলে পৌঁছনোর পথে টুক্‌ করে একবার হাজারদুয়ারি দেখা হয়ে গেল । টাঙ্গাওয়ালারা আমাদের থেকে মাথাপিছু ১০ টাকা করে নিল ।

আমাদের ঘর থেকে গঙ্গার দৃশ্য
'হোটেল মঞ্জুষা' মুর্শিদাবাদের ভালো হোটেলগুলোর একটা । ডিসেম্বর-জানুয়ারি হচ্ছে মুর্শিদাবাদের যাকে বলে 'পীক্‌ সিজন্‌' কাজেই আগে থেকে বুক করে না এলে ঘর পাওয়া অসম্ভব, অন্ততঃ মঞ্জুষার মতো হোটেলে । আমরা দো'তলায় তিনটে ঘর নিয়েছিলাম যার ভাড়া ৮০০ টাকা/প্রতিদিন । (আমাদের একটু চেনা থাকায় ৫০ টাকা করে ছাড় পেয়েছি) ঘর যে খুব কিছু ভালো তা নয়, আয়তনে বেশ ছোট । ঘরে খাট, টিভি, একটা টেবিল, দু'টো চেয়ার আর সেইসঙ্গে অ্যাটাচ্‌ড বাথ সবই আছে কিন্তু যেটা প্রায় নেই সেটা হল হাঁটাচলার জায়গা । কিন্তু আগেই বলেছি, এর থেকে ভালো হোটেল মুর্শিদাবাদে বিশেষ পাওয়া যাবে না, পয়সা ফেললেও না । তবে প্রত্যেকটা ঘরের সঙ্গে একটা করে সুন্দর বারান্দা আছে, আমাদের তিনটে ঘরের মধ্যে দু'টো গঙ্গার দিকে । সেদিকের প্রাকৃতিক দৃশ্য খুবই সুন্দর ।

আমরা দুপুরে খেয়ে নিলাম । এখানে ভাত মিল্‌ সিস্টেমে - ভাত ডাল ভাজা তরকারি আর সেইসঙ্গে মাছ বা মাংস । আমাদের সবমিলিয়ে পড়ল মোট ৯৪০ টাকা ।

এরপর আমরা হোটেলে ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করে নিলাম আমরা কবে কোথায় ঘুরব । আমরা ফিরে যাব পরশুদিন দুপুরের ট্রেনে, তাই আমাদের হাতে আজ বিকেল, কাল সারাদিন আর পরশু সকাল । এর মধ্যে আগামীকাল ১লা জানুয়ারি এবং এইদিন হাজারদুয়ারি তথা মুর্শিদাবাদে প্রচন্ড ভীড় হয় । তাই ঠিক হল আমরা আগামীকাল গঙ্গার ও'পারের মুর্শিদাবাদ ঘুরব আর পরশুদিন সকালে এ'পারের মুর্শিদাবাদ ঘুরব । তাহলে আজ বিকেলে আমরা কি করব ? প্রকৃতিকে দেখবো !

হোটেল মঞ্জুষার বাগান
এ'বার সেই বিশেষ ব্যাপারটার সম্পর্কে লিখি । হোটেল মঞ্জুষার একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল এর বাগান ।হোটেলের চারদিকে নানারকম গাছ লাগিয়ে একটা অসাধারণ বাগান তৈরি করা হয়েছে । আর এর সম্পূর্ণ কৃতিত্বই হল ম্যানেজার মৃদুল সরকার-এর । (এই প্রথম আমার লেখায় কোনও হোটেলের ম্যানেজারের নাম লিখলাম - এর থেকে বোঝা যাবে ভদ্রলোক কতটা বিশিষ্ট) আমাদের পরিচিত প্রায় সব গাছ উনি লাগিয়েছেন তো বটেই, সেইসঙ্গে এমন কিছু গাছ লাগিয়েছেন যেগুলো আমরা যারা শহরে থাকি তারা শুধু নামই শুনেছি, কোনওদিন চোখে দেখিনি । এমনকি এরকম গাছও ওনার বাগানে আছে যেগুলো প্রকৃতপক্ষে সমতলের গাছই নয়, পার্বত্য অঞ্চলের গাছ ! শুধুমাত্র মৃদুলবাবুর আদর আর যত্নে এরা এই পরিবেশে সবার সঙ্গে একসঙ্গে যে শুধু বেঁচেই আছে তাই নয়, দিব্যি ফুল-ফল ফলাচ্ছে । সব দেখে অরণ্যদেবের নন্দনকাননের কথা মনে পড়ে যায় যেখানে বিভিন্নধরনের প্রাণীরা সহাবস্থান করে।
মৃদুল সরকারের নন্দন কাননের ফুল
আমি এখানে কোনও গাছের নাম আলাদা করে লিখছি না, কারণ ওনার বাগানের সব গাছই নিজস্ব বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, স্ব-স্ব মহিমায় বিদ্যমান, তাই কয়েকটা নাম লিখলে আমার মতে বাকিদের প্রতি অবিচার করা হবে আর সবার নাম এখানে লেখা সম্ভব নয় । এখানে শুধু একটা বিশেষ গাছেরই উল্লেখ করছি (আমার ভ্রমণ অভিজ্ঞতা লেখার অভ্যেস আছে শুনে মৃদুলবাবু আমাকে বারবার সেই গাছের ব্যাপারে উল্লেখ করতে বারণ করেছেন, তাই নামটা আর লিখলাম না) যে গাছ ওনার বাগানে তিন-চারটে আছে । এই গাছ যে শুধু দুষ্প্রাপ্য তাই নয়, দুর্মূল্যও । মৃদুলবাবু সবাইকে এই গাছ দেখান না, আমাদের গাছের সম্পর্কে আগ্রহ আছে বলে দেখালেন ।

মঞ্জুষার বাগান থেকে গঙ্গার ওপারে সূর্য্যাস্ত
বাগান দেখা শেষ হলে আমরা গঙ্গার ধারে গিয়ে বসলাম । এই বসার জায়গাও হোটেল মঞ্জুষার নিজস্ব । এখানে আমরা বসে বসে সূর্য্যাস্ত দেখলাম । তারপর ঘরে এসে সন্ধ্যেবেলা চা-টা খেয়ে একটু হাঁটতে বেরোলাম । মৃদুলবাবুর দৌলতে এই সান্ধ্যভ্রমণে আমাদের আরও একটা জায়গা দেখা হয়ে গেল কিন্তু সেটার কথাও ওনার অনুরোধেই আর লিখছি না । শুধু এ'টুকু বলে রাখি মুর্শিদাবাদে এসে এই জায়গাটা দেখার সুযোগ প্রায় কেউই পায় না, আমরা মৃদুলবাবুর সৌজন্যেই পেয়েছি, যিনি ওখানকার একজন বেশ 'ইনফ্লুয়েন্সিয়াল' লোক । হোটেল মঞ্জুষায় উঠে মৃদুল সরকারের সঙ্গে ভাব জমাতে পারলে উনি এই সুযোগ করে দিলেও দিতে পারেন !

রাতের আলোয় হাজারদুয়ারি
আমরা রাতের আলোয় হাজারদুয়ারি দেখলাম । অন্ধকার হয়ে গেছে, আর হাজারদুয়ারি বিকেল ৫টায় বন্ধ হয়ে যায় । হাজারদুয়ারির চারদিকে হলুদ আলো জ্বালিয়ে রাখে আর সবমিলিয়ে খুব সুন্দর লাগে । আমরা কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে কিছু কেনাকাটা করে নিলাম । এখানে একটা বিশেষ জিনিসের কথা উল্লেখ করি । সেটা হল একটা দোকানে ডাবের খোলা দিয়ে নানারকম মূর্তি তৈরি করে সাজিয়ে রাখা রয়েছে । শিল্পী নিজেই বিক্রেতা, আর মূর্তিগুলো খুবই সুন্দর । শুধুমাত্র নানারকম সাইজের ছুরির সাহায্যে পুরোপুরি হাতে তৈরি করা হয়েছে হনুমান, গনেশ, বুদ্ধের মুখ, রবীন্দ্রনাথের মুখ আরও কত কি ! শিল্পীর হাতের কাজের তারিফ না করে পারলাম না আর সেইসঙ্গে দু'টো কিনেও ফেললাম । একেকটা ১৮০ টাকা করে নিল ।

হোটেলের ছাদ থেকে ইমামবাড়ার অংশ
কর্কটক্রান্তিরেখার কাছাকাছি বলে মুর্শিদাবাদের গরম আর ঠান্ডা দু'টোই খুব বেশি পড়ে (এটা লেখার যে বিশেষ দরকার ছিল তা নয়, তবে নন্দিনীদি ভূগোলের শিক্ষিকা কিনা, আমাকে যেন ভূগোলে একেবারে অজ্ঞ না ভাবেন তাই এই জ্ঞানটা ফলালাম !) আর এই ঠান্ডাটা বেশ মালুম পড়ছিল যত রাত বাড়ছিল । সাড়ে সাতটা নাগাদ আমরা হোটেলে ফিরে এসে যে'যার ঘরে গুটিশুটি মারলাম । রাত্রিবেলা আমি একবার ছাদে গেলাম । আমাদের হোটেলের ছাদ থেকে হাজারদুয়ারি আর ইমামবাড়ার বেশ কিছুটা দেখা যায় আর রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে দেখতে বেশ লাগে । কিচ্ছুক্ষণ ছাদে কাটিয়ে নেমে এসে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম । রাতেও মোটামুটি দুপুরের মতো একই মেনু - শুধু এ'বেলা ভাতের বদলে রুটি নেওয়া হল । এবারে মাথাপিছু ১২০ টাকা করে পড়ল ।

ঘরে এসে ঘুমিয়ে পড়লাম ।

হোটেলের ছাদ থেকে সকালের আলোয় হাজারদুয়ারি
Happy New Year, 2014! নতুন বছর - নতুন দিন - নতুন সকাল - "নতুন সূর্য্য আলো দাও আলো দাও" (না, এটা বাড়াবাড়ি হয়ে গেল !) সকালে উঠে প্রথমেই গেলাম ছাদে । সকালের রোদে ছাদ থেকে চারপাশের দৃশ্য মুগ্ধ করে দিল ! বিশেষ করে - হ্যাঁ হাজারদুয়ারি । মনে হতে পারে আমি হাজারদুয়ারি নিয়ে বাড়াবাড়ি করছি, কিন্তু এই বাড়াবাড়িটা লোকে দার্জিলিঙ-সিকিমে গেলে কাঞ্চনজঙ্ঘা নিয়েও করে আর দীঘা-পুরীতে গেলে সমুদ্র নিয়েও করে । কাজেই, এটাও চলতে পারে ।

ভট্‌ভটিতে আমাদের গাড়ি উঠছে
আমাদের গাড়ি আগেই ঠিক করা ছিল, গঙ্গার ওপারের মুর্শিদাবাদ ঘোরার জন্য । সুমো - ভাড়া ১,৫০০ টাকা (গঙ্গা পারাপারের ১২০ টাকা নিয়ে) গাড়ি করে প্রথমে একজায়গায় গিয়ে রাধাবল্লভী দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে নিলাম আর তারপর বেরিয়ে পড়লাম আমাদের গন্তব্যের দিকে । এখানে গঙ্গা পেরোনোর কোনও ব্রীজ নেই, ভট্‌ভটি নৌকো করে মানুষ এবং গাড়ি পারাপার করে । পাশের ছবি থেকে এর সম্পর্কে বোঝা যাচ্ছে, তাই আর ডিটেলে লিখলাম না ।

খোসবাগে সিরাজ-উদ-দৌলার সমাধি
আমাদের প্রথম দেখার জায়গা 'খোসবাগ' - সিরাজ-উদ্‌-দৌলার সমাধি । এখানে সিরাজ ছাড়াও তাঁর পত্নী লুৎফান্নিসা, দাদু আলিবর্দী খাঁ এবং তাঁদের পরিবারের অনেকের সমাধি রয়েছে । তবে কোন্‌টা কার সমাধি নিজে থেকে জানার কোনও উপায় নেই কারণ সমাধির ওপরে আরবিতে লেখা । শুধুমাত্র সিরাজ-এর সমাধিটাই চিনতে পারা যায় এর কেন্দ্রীয় অবস্থান দেখে । সমাধি ছাড়াও এখানে রয়েছে খোসবাগ মস্‌জিদ যেটা নবাব আলিবর্দী খাঁ তৈরি করিয়েছিলেন । জায়গাটা বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় ।







রানীভবানীর তৈরি চারমন্দিরের একটা
এরপর আমাদের দ্বিতীয় গন্তব্য - রানীভবানীর মন্দির । রানীভবানী ছিলেন অনেকটা দক্ষিণেশ্বরের রানী রাসমণির মতো । তিনি এখানে চারটি মুখোমুখি মন্দির তৈরি করান । এই মন্দিরের গায়ে পুরাণের বহুঘটনার ছবি খোদিত আছে । বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগল এই সৌন্দর্য্য দেখতে । এই মন্দিরগুলো থেকে সামান্য কিছু দূরে রানীভবানীর মন্দিরও আছে ।

জগদ্বন্ধু ধাম
এরপর আমরা গেলাম 'জগদ্বন্ধু ধাম' দেখতে । এই জায়গার কোনও ঐতিহাসিক গুরুত্ব নেই, এখানে জগদ্বন্ধুর জন্ম হয়েছিল । এখানকার মন্দিরটা দেখতে খুব সুন্দর - যেটা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে সেটা হল মন্দিরের গায়ে-মাথায় খোল আর কর্তালের ছবি আর মডেল । মন্দিরের লাগোয়া নাটমন্দিরটা বেশ বড় আর পরিষ্কার ।



কিরীটেশ্বরী মন্দির
জগদ্বন্ধুধামের পরে আমাদের চতুর্থ গন্তব্য কিরীটেশ্বরী মন্দির । পুরাণ মতে এখানে সতীর কিরীট পড়েছিল - সেই থেকেই নাম কিরীটেশ্বরী মন্দির । যদিও মন্দির হিসেবে খুব ঘ্যাম কিছু না আর সেইজন্যই পুজো-টুজো দেওয়ার কোনও ব্যাপার নেই । আমরা কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে এগিয়ে চললাম আমাদের আজকের পঞ্চম তথা শেষ গন্তব্যের দিকে ।

রোশনবাগ
রোশনবাগ । জায়গাটা অনেকটা খোসবাগের মতোই তবে খোসবাগের থেকে এর গুরুত্ব কম । এখানে সুজাউদ্দীন খাঁ-এর সমাধি এবং মসজিদ রয়েছে ।








আমাদের প্রথমদিনের ঘোরা শেষ - দুপুর একটা বাজে । রোশনবাগটা একেবারেই গঙ্গার ধারে । আবার একইভাবে নৌকো করে গঙ্গার এ'পারে এলাম । গাড়ি আমাদের একটা ভাতের হোটেলের সামনে নামিয়ে দিল । এখান থেকে আমাদের হোটেল বেশ কাছে - খাওয়ার পরে আমরা হেঁটে ফিরে যাব ।

সেই মিল্‌সিস্টেমের ভাত, সেই ডাল, সেই তরকারি আর সেই মাছ বা মাংস । এবারে আটজনের জন্য মোট খরচ হল ৬৪০ টাকা ।

এরপর হোটেলে ফিরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম । সন্ধ্যেবেলা আলাদা করে কিছু করার নেই, আড্ডা মেরে দিব্যি কেটে গেল । রাতের খাবার আজ একটা অন্য হোটেল থেকে খাওয়া হল । এটার রান্না আগের সবগুলোর চেয়ে ভালো আর এখানকার খাবার সবচেয়ে সস্তা । এখানে আমাদের খরচ পড়ল মাথাপিছু ৬০ টাকার মতো । রাতে শুয়ে পড়লাম । পরেরদিন আমরা মুর্শিদাবাদ ভ্রমণের প্রধান জিনিসগুলো দেখব আর সব দেখে টেখে ফিরেও যাব !

২ রা জানুয়ারি, ২০১৪ - বৃহস্পতিবার । আমাদের আজ ফিরে যাওয়ার দিন, সকাল ন'টায় হোটেল ছেড়ে দিতে হবে । সেইমতো ব্যাগ প্যাক করে সেগুলো ম্যানেজারের জিম্মায় রেখে হোটেলের পাওনাগন্ডা মিটিয়ে আমরা যখন হাজারদুয়ারির উদ্দেশ্যে বেরোলাম তখন বেলা দশটা বাজে । যাওয়ার পথে একটা হোটেলে ব্রেকফাস্ট করে নেওয়া হল । মুর্শিদাবাদে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি যে এখানকার কোনও হোটেলেই মাটন্‌ পাওয়া যায় না । এদিকে আমি আর দীপঙ্করদা বাকিদের তুলনায় একটু বেশিই মাংসাশী । তাই প্রথম দিন থেকে মাংসের খোঁজে ব্যর্থ হতে হতে শেষ পর্যন্ত মাটন্‌ পাওয়া গেল এই হোটেলেই । এরা এমনিতে মাংস করে না, তবে আমাদের আটজনের জন্য আজ দুপুরে করে দেবে । বাকিসব একই মিলসিস্টেম্‌ - শুধু মাছ বা মুরগীর বদলে মাটন্‌ । মাথাপিছু পড়বে ২০০ টাকা করে ।

এরপর আমরা এগিয়ে গেলাম হাজারদুয়ারির দিকে । হাজারদুয়ারি খোলে সকাল ন'টায় । হাজারদুয়ারিতে ঢোকার টিকিট ১০ টাকা করে আর পনেরো বছরের নিচে টিকিট লাগে না । ভেতরে কোনও ক্যামেরা এমনকি মোবাইল ক্যামেরাও নিয়ে যাওয়ার নিয়ম নেই আর লুকিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেও লাভ নেই । গেটে খুব খুঁটিয়ে সিকিউরিটি চেকিং হয় আর এমনকি সঙ্গে যদি ছবি-তোলা-যায়-না মোবাইল থাকে, সেটাকেও এরা ভালোভাবে দেখে নেয় ।

মুর্শিদাবাদের ইমামবাড়া
"হাজারদুয়ারি ভালোভাবে ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেব" বলে এখানে অনেক গাইড্‌ ঘোরাঘুরি করে । মুর্শিদাবাদে যেকোনো জায়গাতেই এই গাইড্‌দের পাওয়া যায় আর আমার মতে সবজায়গাতেই একজনকে নিয়ে নেওয়া ভালো । কারণ মুর্শিদাবাদ প্রধানতঃ ঐতিহাসিক জায়গা, তাই দেখার সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসটা একটু জেনে নিলে ভালোই লাগবে । 'মতিঝিল'-এ আমাদের গাইড একটা খুব সুন্দর কথা বলেছিল - "জানলে ইতিহাস আর না জানলে মাটির দেওয়াল !" যাই হোক, হাজারদুয়ারিতে আমরা একজন গাইড ঠিক করলাম যে আমাদের হাজারদুয়ারির মাঠে 'বাচ্চাওয়ালী কামান', 'সিরাজের মদিনা', 'ইমামবাড়া' ইত্যাদি দেখাল । আর সেইসঙ্গে হাজারদুয়ারির বাইরে থেকে কিছু জিনিস দেখাল । এর জন্য সে নিল ১০০ টাকা । পরে বুঝলাম যে এইসব গাইডরা কেউই ভেতরে ঢুকে কিছু দেখায় না, কিন্তু সেটা এরা প্রথমে বলে না । আমরা না জেনে ১০০ টাকা দিয়ে ঠকেছি । এদেরকে কোনওভাবেই ৫০ টাকার বেশি দেওয়ার মানে হয় না ।

হাজারদুয়ারি
হাজারদুয়ারির সঙ্গে কিন্তু সিরাজ-উদ্‌-দৌলার কোনও সম্পর্ক নেই । সিরাজের মৃত্যুর অনেক পরে হাজারদুয়ারি তৈরি করা হয় । হাজারদুয়ারির সঙ্গে কলকাতার টাউনহলের আকৃতির সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায় - কারণ দু'টোই একই কোম্পানীর ডিজাইন করা । আমরা হাজারদুয়ারির ভেতরে ঢুকলাম । হাজারদুয়ারিতে এক হাজারের মতো দরজা আছে, সেই থেকেই এই নাম, দরজাগুলোর মধ্যে কিছু আসল আর কিছু নকল - এসব মোটামুটি সবাই জানে । কিন্তু যেটা নিয়ে মতানৈক্য শুনেছি সেটা হল কতগুলো আসল আর কতগুলো নকল । বিভিন্ন জায়গা থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিরে লিখছি ১০০ নকল আর ৯০০ আসল । এই নকল দরজাগুলো চট্‌ করে দেখে বোঝা যায়
হাজারদুয়ারির নকল দুয়ার
না, তবে কাছে গিয়ে নিরিক্ষণ
করলে ধরতে পারা যায় । জানলাম ইঁট-চুন-সুরকির সঙ্গে খয়ের জল, আখের গুড়, ডিমের কুসুম ইত্যাদি ব্যবহার করে এই দরজা তৈরি হয়েছিল । (খুবই সুস্বাদু দরজা, তাতে আর সন্দেহ কি !) হাজারদুয়ারির ভেতরে আরেকটা আকর্ষণীয় জিনিস হল সম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার উপহার দেওয়া ১০১ বাতির একটা সুদৃশ্য ঝাড়লন্ঠন । এছাড়া হাজারদুয়ারির ভেতরে রয়েছে নবাব আর ইংরেজদের ব্যবহৃত বহু অস্ত্রসস্ত্র, জিনিসপত্র, বাসনপত্র, আসবাবপত্র, শুধু পত্র, বহু বিখ্যাত শিল্পীদের হাতে আঁকা ছবি, বিলিয়ার্ড বোর্ড, পলাশীর যুদ্ধে ব্যবহৃত সরঞ্জাম ইত্যাদি । হাজারদুয়ারি ভালোভাবে দেখতে গেলে কমপক্ষে দু-আড়াইঘন্টা সময় নিয়ে যাওয়া উচিৎ । হাজারদুয়ারি শুক্রবার বন্ধ থাকে ।

হাজারদুয়ারির ঠিক মুখোমখি রয়েছে ইমামবাড়া - এটা বাংলার সবচেয়ে বড়ো ইমামবাড়া । এটা বছরের মধ্যে শুধুমাত্র মহরমের সময়ে ১০ দিন খোলা থাকে, বাকি সারাবছর বন্ধ থাকে ।

হাজারদুয়ারি থেকে বেরোলাম তখন ঠিক বেলা বারোটা । আমাদের আজকের ঘোরার জন্য একটা ট্রেকার ঠিক করা ছিল । ঘোরাঘুরির জন্য ৮০০ টাকা আর এই ট্রেকারই আমাদের স্টেশনে পৌঁছে দেবে সে'জন্য ১০০ টাকা । ট্রেকারে চড়ে গেলাম আমাদের আজকের দ্বিতীয় গন্তব্যে ।

কামানের আঘাতে গর্ত
মোতিঝিল । গাইড - ৫০ টাকা ।
মোতিঝিল তৈরি করান নবাব আলিবর্দীর জামাই । এখানে একটা অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ আছে যেখানে একসময়ে মোতি বা মুক্তোর চাষ হতো । এখানে একটা মসজিদ আছে । সেগুলোর ইতিহাসের ডিটেলে আর যাচ্ছি না, শুধু একটা ইন্টারেস্টিং গল্প বলছি । মোতিঝিলের মসজিদের পাশে একটা ঘর আছে যার কোনও দরজা বা জানালা নেই । চারদিকে দেওয়াল আর ছাদটাও ঢাকা । কথিত আছে সিরাজ এক ফৈজীর ওপর রেগে গিয়ে তাঁকে মাঝখানে রেখে এই ঘর তৈরি করান । অনেকে মনে করতেন এইঘরে অনেক মণিমুক্তোও আছে । কিন্তু এর আশ্চর্য শক্ত ইঁটের গাঁথনি কেউ কোনওভাবে ভাঙতে পারেনি । পরবর্তীকালে কোনও একজন সাহেব এইঘরের দেওয়াল কামানের গোলা দিয়ে ভাঙার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন এবং সেইদিন রাতেই সাহেব মারা যান । তারপর থেকে এইঘরের দেওয়াল ভাঙার চেষ্টা আর কেউ কখনও করেনি । দেওয়ালে কামানের আঘাতের চিহ্ন আজও স্পষ্ট দেখা যায় ।

জাহানকোষা কামান
তৃতীয় গন্তব্য - জাহান কোষা কামান । গাইড লাগে  না ।
কাটরা মসজিদের ভেঙ্গে পড়া ছাদ
সাড়ে পাঁচ মিটার লম্বা আর চারফুটের মতো পরিধিবিশিষ্ট 'জাহান কোষা কামান' আরেকটা দূর্দান্ত দর্শনীয় বস্তু । এর ওজন সাত টনের বেশি । এটা শাহজাহানের রাজত্বকালে তৈরি হয়েছিল আর তৈরি করেছিলেন একজন বাঙালি ধাতুবিদ্‌ জনার্দন কর্মকার । এর বেশি বিশেষ কিছু জানি না ।

চতুর্থ গন্তব্য - কাটরা মসজিদ । গাইড - ৫০ টাকা ।
এখানে আমরা ৫০ টাকা দিয়ে একজন গাইড নিলাম যাকে না নিলে কাটরা মসজিদ ভালোভাবে দেখা হতো না । মসজিদের পিছন দিয়ে দিক ঢুকতে হয় কারণ সেখান দিয়েই প্রধান রাস্তা চলে গেছে । কাটরা মসজিদে উপাসনা ছাড়াও ছাত্রাবাস ছিল, যেখানে একসঙ্গে বহু আবাসিক একসঙ্গে থেকে পড়াশোনা করতে পারত । মসজিদের সামনের দিকে একটা বিশাল চাতাল আছে যেখানে একসময়ে অনেক মানুষ একসঙ্গে নামাজ পড়তেন । কাটরা মসজিদের সবচেয়ে আগ্রহজনক বিষয় হল এর প্রবেশসিঁড়ির নিচে রয়েছে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ-র সমাধি । নবাবের ইচ্ছানুযায়ী মৃত্যুর পরে তাঁকে এখানে কবর দেওয়া হয় । নবাব বলেছিলেন "মসজিদমে প্রবেশ করনে কে লিয়ে লোগ যব মেরে উপর সে গুজরেঙ্গে, তব যাকে মেরে পাপ ধোনে লাগেঙ্গে" । (আমার ধারণা এইভাবে শুদ্ধ হিন্দীতে বলেননি, কিন্তু মনে হল মুর্শিদাবাদ সম্পর্কে লেখার মধ্যে স্বয়ং মুর্শিদকুলি খাঁ-র একটা ডায়ালগ্‌ থাকলে বেশ হয় - তাই এটা লাগালাম) কাটরা মসজিদের প্রধান উপাসনা গৃহের ছাদে পাঁচটা গম্বুজ ছিল, যার তিনটে ভূমিকম্পে ভেঙ্গে পড়েছে । এখন এর ছাদটা পুরোপুরি অনাবৃত । ভূমিকম্প কাটরা মসজিদের আরও কিছু ক্ষতিও করেছে । মসজিদের চারকোণে চারটে মিনার ছিল যাদের মধ্যে দু'টো ভূমিকম্পে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে ।

কাটরা মসজিদ থেকে আমরা আমাদের খাবার জায়গায় এলাম । আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল বহু প্রতিক্ষিত পাঁঠার মাংসের ঝোল আর ভাত । মাংসগুলো একটু কম সেদ্ধ হলেও ঝোলটা খেতে ভীষণ সুন্দর হয়েছিল । খাওয়া শেষ করে আমাদের পরের দর্শনীয় জায়গার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম তখন দুপুর আড়াইটে বেজে গেছে । আমাদের ট্রেন বিকেল ৪:৪০ এ ।

কাঠগোলা বাগানে দুগারদের বাড়ি
পঞ্চম গন্তব্য - কাঠগোলা বাগান । গাইড - ৫০ টাকা ।
কাঠগোলা বাগানের মধ্যে আসলে রয়েছে দুগার পরিবারের বাড়ি । সম্ভবতঃ রাজস্থান নিবাসী এই দুগার পরিবার অত্যন্ত ধনী ছিলেন এবং এই বাড়িতে তাঁদের ব্যবহৃত সামগ্রী এবং আসবাবপত্র রয়েছে । এই দুগার পরিবারের বংশধর আজও জীবিত আছেন এবং কলকাতায় থাকেন । নিজেদের এই আদিবাড়ি আর সংগ্রহশালাকে সাধারণের উদ্দেশ্যে খুলে দিয়েছেন মাথাপিছু ১৫ টাকা প্রবেশমুল্যের বিনিময়ে । এই হচ্ছে মারোয়াড়ি বুদ্ধি ! দুগারদের বাড়িতে বেশ কিছু দেখার জিনিস থাকলেও খুব আগ্রহজনক কিছু নয় বরং বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে ফুলের বাগানটা খুব সুন্দর । তাছাড়া আছে একটা জৈন মন্দির যার দেওয়ালে নানারকম ভাস্কর্য্য দেখা যায় । একটা কথা বলতে পারি, সবকিছুর পরে দুগারদের বাড়ি বা কাঠগোলা বাগানের সঙ্গে ইতিহাসের কোনও সম্পর্ক নেই, কাজেই হাতে সময় কম থাকলে এই জায়গাটা না দেখলেও চলবে ।

দুপুর ৩:৩৫ বাজে ।

জগৎ শেঠের বাড়ি
ষষ্ঠ গন্তব্য - জগৎ শেঠের বাড়ি । গাইড - ৫০ টাকা ।
যদিও আমরা গাইড নিইনি । সবকিছু দেখে বুঝে নেওয়া আমাদের পক্ষে সময় আমাদের হাতে এখন আর নেই । জগৎ শেঠের বাড়িতে প্রবেশমূল্য মাথাপিছু ১০ টাকা । আমাদের সামনে সামনে একটা গ্রুপ এগোচ্ছিল, তারা একটা গাইড নিয়েছিল । আমরা সেই গ্রুপের সঙ্গে সঙ্গে চললাম আর আমাদের মোটামুটি যা দেখার-জানার তা হয়ে গেল । জগৎ শেঠের বাড়িও কিছুটা দুগারদের মতোই - পার্থক্য হল জগৎ শেঠ হলেন একজন যিনি সিরাজের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন । ইনি একজন ধনকুবের ছিলেন - সেটা ওনার বাড়ির নানারকম সরঞ্জাম থেকেই বোঝা যায় । এখানে মাটির নিচে একটা মিউজিয়াম আছে । এই মিউজিয়ামে বাংলার বিখ্যাত মসলিন্‌ দেখতে পাওয়া যায় । এই মসলিন নাকি এতই নরম যে একে আংটির ভেতর দিয়ে চালান করা যায় । সেটা প্রমাণ করার জন্যই এখানে একটা মসলিন্‌কে তিনটে আংটির ভেতর দিয়ে চালান করে দেখানো আছে । বাড়ির সঙ্গে একটা মন্দির আছে ।

বিকেল ৪ টে ।

এরপর আমাদের পক্ষে আর কিছু দেখা সম্ভব নয় কারণ আমাদের হোটেলে ফিরে মালপত্র নিয়ে স্টেশনের দিকে রওনা হতে হবে । ড্রাইভার বলল - পথে দু'তিনটে জায়গা পড়বে সেগুলো আমরা গাড়ি থেকে না নেমেও দেখতে পারি ।

নসিপুর রাজবাড়ি
সেইমতো প্রথম পড়ল নসিপুর রাজবাড়ি । এর বৈশিষ্ট্য হল এটা হাজারদুয়ারির আদলে তৈরি করা । ভেতরে ঢোকার প্রশ্নই ওঠে না, বাইরে থেকে দেখেই এগিয়ে চললাম ।







বিকেল ৪:০৫ ।

নিমকহারাম দেওড়ী
এরপর পড়ল নিমকহারাম দেওড়ী । এটা আসলে বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরের প্রাসাদ । এখানে মীরজাফরের বংশধররা এখনও বাস করেন । আগে একসময়ে এটা একটা দেখার জায়গা ছিল । পরবর্তীকালে বাসিন্দাদের আপত্তির কারণে এখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয় । (ব্যাপারটা ওনাদের পক্ষে কতদূ্র বিরক্তিকর সেটা বুঝতে পারছিলাম । নানারকম লোকজন ওনাদের বাড়ি দেখতে যেত মনে ওনাদের সম্পর্কে একরাশ ঘৃণা নিয়ে !)

বিকেল ৪:০৮ ।

আজিমুন্নেসার সমাধি
পথে শেষ দেখার জায়গা পড়ল আজিমুন্নেসার সমাধি । ইনি মুর্শিদকুলি খাঁ-র কন্যা আর এনাকেও তাঁর বাবার মতো মসজিদের সিঁড়ির নিচে সমাধিস্থ করা হয় । আমাদের মুর্শিদাবাদ দেখা শেষ - এবার আমাদের ফেরার পালা । লেকিন দিল্লী স্টেশন আবভি দূর হ্যায় !




বিকেল ৪:২০ - আমরা হোটেলে ফিরলাম । ম্যানেজারের জিম্মা থেকে আমাদের মালপত্র নিয়ে হোটেল থেকে বেরোতে সাড়ে চারটে বেজে গেল । ট্রেকারে মঞ্জুষা থেকে স্টেশনে পৌঁছতে মিনিট দশেক লাগার কথা - অর্থাৎ ৪:৪০ বাজবে । আবার এও শুনলাম ট্রেন এখানে মোটামুটি ঠিক সময়েই আসে !

আমাদের ট্রেকার স্টেশনের দিকে এগিয়ে চলেছে । পুরো রাস্তাটাই শহরের মধ্যে দিয়ে, খুব জোরে চালানো যায় না । ঘড়ি এগিয়ে চলেছে । এটা এমন একটা সময় যখন একেকটা মিনিট গুরত্বপূর্ণ । স্টেশনে পৌঁছলাম ৪:৩৭ বাজে । কোনওমতে গাড়ির ছাদ থেকে মালগুলো নামিয়ে প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে দেখি ট্রেন ঢুকছে । সৌভাগ্যক্রমে আমাদের কামরা একেবারে আমাদের সামনের থামল । প্রচন্ড ভীড়ে ঠেলাঠেলি করে ট্রেনে ওঠার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ট্রেন ছেড়ে দিল । "সী ইউ সুন, মুর্শিদাবাদ !"

ফেরার সময়েও একই বিভ্রাট । লালগোলা প্যাসেঞ্জার বাতিল কাজেই আমাদের ট্রেন রাণাঘাট পর্যন্ত সব স্টেশনে থামবে । আমরা কলকাতা স্টেশনে পৌঁছলাম তখন রাত সাড়ে দশটা আর তার আধঘন্টা পরে বাড়ি !

সারসংক্ষেপঃ

১. কলকাতা থেকে দু'তিনদিনের জন্য ঘোরার পক্ষে মুর্শিদাবাদ একটা আদর্শ জায়গা । তবে যদি ইতিহাসে একেবারেই আগ্রহ না থাকে, তাহলে বোধহয় না যাওয়াই শ্রেয় !
২. মুর্শিদাবাদে ট্রেনে যাওয়ার জন্য হাজারদুয়ারি এক্সপ্রেস বা লালগোলা প্যাসেঞ্জারে যাওয়া যেতে পারে । এছাড়া বাসেও যাওয়া সম্ভব ।
৩. মুর্শিদাবাদে যাওয়ার সবথেকে ভালো সময় হল শীতকাল কারণ অন্যান্য সময়ে এখানে কলকাতার থেকে অনেক বেশি গরম থাকে । শীতকালে গেলেও বড়দিনের ছুটি বা বিশেষ করে ১লা জানুয়ারি না যাওয়াই ভালো কারণ এই সময়ে এখানে সাংঘাতিক ভীড় হয় ।
৪. গঙ্গার দু'পাশেই নবাবদের নানারকম কীর্তি আর তাদের ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে আছে । এগুলো চাইলে গাড়িতে বা টাঙায় ঘোরা যেতে পারে ।
৫. মুর্শিদাবাদের সবথেকে আকর্ষণীয় জায়গা হল হাজারদুয়ারি । এটা বর্তমানে প্রকৃতপক্ষে একটা মিউজিয়াম যেখানে অনেক সময় নিয়ে দেখার মতো অনেক জিনিস আছে ।
৬. মুর্শিদাবাদে হোটেলের সংখ্যা খুব বেশি নয় আর ভালো হোটেল নেই বললেই চলে । আমাদের 'হোটেল মঞ্জুষা' সেই অর্থে একটা ভালো হোটেলের পর্যায়েই পড়ে । মঞ্জুষায় যোগাযোগের নম্বর : 0348-2270321.
৭. মুর্শিদাবাদে খুব ভালো খাবারের রেস্টুরেন্ট নেই, বেশিরভাগই সাধারণ ভাতের হোটেল । সেখানকার খাবারের মানও সাধারণ ।

উপসংহারঃ

গঙ্গার ওপরে হাজারদুয়ারি !
বাংলা তথা ভারতবর্ষের ইতিহাসে মুর্শিদাবাদ একটা বিশেষ ভূমিকা পালন করে । আর এই ইতিহাসই মুর্শিদাবাদের আকর্ষণ । ইতিহাস এখানে যেন সত্যিই কথা বলে । মুর্শিদাবাদ ভ্রমণ ভালো লাগার জন্য ইতিহাসের ছাত্র হওয়ার প্রয়োজন নেই, কিন্তু ইতিহাসকে সম্মান করার প্রয়োজন আছে । মুর্শিদাবাদে প্রাকৃতিক কোনও আকর্ষণ নেই - এখানকার আকর্ষণের সবকিছুই হয় মানুষের তৈরি না হয় মানুষের ধ্বংস । মানুষের চরিত্রের যে ভালো বা খারাপ দিকগুলো থাকে, সেগুলোই যেন বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা আর গল্পের মধ্যে দিয়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে মুর্শিদাবাদে । মুর্শিদকুলি খাঁ, নবাব আলিবর্দী, সিরাজ-উদ্‌-দৌলা বা মীরজাফর - এরা কি নিজেদের মতো করে আমাদের চারপাশে আজও বেঁচে নেই ? সেটা উপলব্ধি করার জন্য আগে ভালোভাবে জানার দরকার এরা কে কিরকম লোক ছিল । আর সে'জন্য - জীবনে অন্ততঃ একবার - মুর্শিদাবাদ যাওয়া উচিৎ !

মুর্শিদাবাদ ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

এই লেখায় যে সমস্ত ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ আছে, তার বেশিরভাগই আমি মুর্শিদাবাদে গিয়ে বা অন্য কোথাও কারুর মুখ থেকে শুনেছি । যদি এই ঘটনা বা তথ্যের মধ্যে কারুর কোনও ভ্রান্তি নজরে আসে, ধরিয়ে দিলে বিশেষ উপকৃত হব ।