আমি ব্লগ লেখার খুব বেশি সমর্থক কোনওদিনও ছিলাম না, সত্যি কথা বলতে কি এখনও যে আছি তা নয় । তার একটা প্রধান কারণ আমার ধারণা ব্লগ লেখার থেকেও পড়া অনেক বেশি ক্লান্তিকর । অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অনেক সময়ই পড়তে শুরু করে শেষ করা হয়ে ওঠে না । নিজের ধৈর্য এবং/অথবা আগ্রহের অভাবকে 'ঠিক আছে, বাকিটা পরে পড়ব' জাতীয় অজুহাত দিয়ে ঢেকে দিই - আর আমরা সবাই জানি সেই 'পরে' টা আর কখনওই আসে না । তো, এই কারণে আমি ঠিক করেছি আমার ব্লগকে কখনওই অন্যের ক্লান্তির কারণ ঘটাব না, আমার ব্লগের বিষয় হবে প্রধানতঃ ভ্রমণ । আমার মতো যেসব বাঙালিরা ঘুরতে ভালোবাসে, তাদের জন্য আমার ব্লগ হবে তথ্যের একটা উৎস । আমার নিজের একটা অভ্যেস আছে, কোনও জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার আগে সেই জায়গাটা সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, আর ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে আমার বরাবরই মনে হয়েছে যে ইন্টারনেটে লেখালেখি করার ব্যাপারে বাঙালিদের থেকে কুঁড়ে খুব কম শিক্ষিত জাতই আছে । আমার মতো যেসব বাঙালিরা আছে, যারা ইন্টারনেটে কোনো একটা ইংরিজীতে লেখা দেখলেই না পড়ার চেষ্টা করে, তাদের জন্য আমার ব্লগ সহায়ক হবে, এই বিশ্বাস নিয়ে শুরু করছি আমার ভ্রমণকাহিনী । আগেই বলে রাখি, আমি স্ট্যাটিসটিক্সের ছাত্র ছিলাম, তাই আমার ব্লগে তত্ত্বের থেকে তথ্যের দেখাই মিলবে বেশি ।

Tuesday, September 21, 2021

দীঘা ভ্রমণ

আগেও বলেছি বাঙালীর তিনটে ঘোরার জায়গা দী-পু-দা সম্পর্কে আমার ব্লগে কখনও লিখব না। পু অর্থাৎ পুরী আর দা অর্থাৎ দার্জিলিঙ এর আগেই হয়ে গেছে, বাকি ছিল শুধু দী অর্থাৎ দীঘা। দীঘা আমি এর আগেও চারবার গেছি, কিন্তু শেষবার যখন গেছি তখনও ব্লগ লিখতাম না। এবারেও দীঘায় গিয়ে সেরকম নতুন এমন কিছুই দেখিনি যা জানানোর জন্য একটা পূর্ণদৈর্ঘ্যের ব্লগ লেখার দরকার হতে পারে। তাই পুরী আর দার্জিলিঙের মতো দীঘা ভ্রমণেও থাকছে শুধুমাত্র ভ্রমণপথ, ভ্রমণের সারসংক্ষেপ আর উপসংহার।

বিশেষ সতর্কীকরণঃ

১. এই ভ্রমণে আমরা জনবহুল স্থানে, বিশেষতঃ স্টেশনে, ট্রেনে ইত্যাদি জায়গায় সারাক্ষণ মাস্ক পরে থেকেছি এবং দূরত্ববিধি যথাসম্ভব মেনে চলার চেষ্টা করেছি। সেইসঙ্গে প্রয়োজনমতো হ্যান্ড স্যানিটাইজারও ব্যবহার করেছি।

২. এই ভ্রমণে আমরা কোনও অবস্থাতেই কোনও পলিথিন বা প্লাস্টিক ব্যবহার করিনি। অর্থাৎ প্লাস্টিকের ব্যবহার না করেও এই ভ্রমণ অনায়াসে করা যায়।

৩. এই ভ্রমণে আমরা কোনও কাগজ ব্যবহার বা নষ্ট করিনি। হোটেল বুকিং-এর রশিদ-এর প্রিন্ট আউট ব্যবহারের কোনও প্রয়োজন হয় না।

৪. এই ভ্রমণে আমাদের দলের কেউ ধূমপান করেনি। ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর।

আমার ব্লগের সমস্ত পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করছি বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে করোনা ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ করার জন্য সরকারী বিধিনিষেধ মেনে চলার জন্য। সেইসঙ্গে অনুরোধ করছি প্লাস্টিক, অপ্রয়োজনীয় কাগজের ব্যবহার আর ধূমপান বর্জন করার জন্য।

ভ্রমণপথঃ

রবিবার ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ঃ হাওড়া স্টেশন থেকে সকাল ৬ঃ৫০ মিনিটে হাওড়া দীঘা স্পেশাল ট্রেন - সকাল ১০ঃ১০ মিনিটে দীঘা। নিউ দীঘায় রাত্রিবাস।

সোমবার ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ঃ নিউ দীঘা থেকে ওল্ড দীঘায় গিয়ে ঘন্টাখানেক ঘোরা। নিউ দীঘায় রাত্রিবাস।

মঙ্গলবার ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ঃ দীঘা থেকে দুপুর ১২ঃ৩০ মিনিটে দীঘা হাওড়া স্পেশাল ট্রেন (সঠিক সময় সকাল ১০ঃ৩৫ মিনিট) - দুপুর ৩ঃ৩০ মিনিটে সাঁত্রাগাছি (ট্রেনটা সাঁত্রাগাছি থেকে হাওড়া পর্যন্ত বাতিল হয়ে গিয়েছিল)।

সারসংক্ষেপঃ

১. কলকাতা থেকে সড়কপথে নিউ দীঘার দূরত্ব ১৮৫ কিলোমিটারের মতো। ওল্ড দীঘার দূরত্ব এর থেকে ১.৫ কিলোমিটার কম।

২. কলকাতার বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন সময়ে দীঘা যাওয়ার জন্য বাস ছাড়ে। বাসে দীঘা যেতে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘন্টা সময় লাগে।

৩. দীঘা যাতায়াতের জন্য হাওড়া থেকে দৈনিক দু'টো করে ট্রেন চলে। যেতে ৩ঃ২০ ঘন্টার মতো সময় লাগে।

৪. দীঘা স্টেশনটা প্রকৃতপক্ষে নিউ দীঘায়। স্টেশনের কাছাকাছির মধ্যেই অনেকগুলো হোটেল আছে। স্টেশন থেকে টোটো করে অথবা হেঁটে হোটেলে যাওয়া যায়।

৫. দীঘায় আমরা যে হোটেলে ছিলাম তার নাম 'হোটেল আমার দীঘা'। এদের ওয়েবসাইট http://www.hotelamardigha.com/ থেকে বুকিং করা যায় অথবা https://www.makemytrip.com/ থেকেও বুকিং করা যায়। হোটেলের যোগাযোগের নম্বরঃ 9874778528.

৬. 'হোটেল আমার দীঘা' খুবই ভালো একটা হোটেল। এর ঘর থেকে সমুদ্র দেখা না গেলেও এখান থেকে সমুদ্র হেঁটে মিনিট পাঁচেকের বেশি লাগে না। হোটেলের পরিষেবা এবং খাবার খুবই উন্নত মানের।

৭. দীঘার সমুদ্রের পাড় বাঁধানো আর এখানে বসে বসে সমুদ্রের শোভা উপভোগ করা যায়। জোয়ারের সময়ে জলের টান বেশি থাকলে অবশ্য এখানে পুলিশ বসতে দেয় না।

৮. দীঘা থেকে কাছাকাছির মধ্যে তালসারিতে ঘুরে আসা যায়। যাতায়াতের পথে চন্দনেশ্বর মন্দির পড়ে, সেটাও দেখে নেওয়া যেতে পারে। এই দু'টো জায়গাই উড়িষ্যার মধ্যে।

৯. দীঘা স্টেশনের একেবারে কাছে রয়েছে অমরাবতী লেক ও পার্ক। এখানে বোটিং, রোপওয়ের ব্যবস্থা আছে।

১০. নিউ দীঘার বিচের কাছে একটা মার্কেট আছে, এখানে সবধরনের জিনিসই পাওয়া যায়। এখান থেকে প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয় নানারকম জিনিস কেনা যেতে পারে।

১১. নিউ দীঘার বীচের একেবারে পাশেই সরকারী লিজ নেওয়া একটা রেস্ট্যুরেন্ট আছে। এখানে সস্তায় অত্যন্ত ভালো মানের খাবার পাওয়া যায়।

১২. দীঘার সমুদ্রে জোয়ারের জলোচ্ছাস দেখার আগ্রহ থাকলে অবশ্যই পূর্ণিমা বা অমাবস্যায় যাওয়া উচিৎ। অমাবস্যায় জলোচ্ছাসের মাত্রা পূর্ণিমার থেকে বেশি ঠিকই, কিন্ত পূর্ণিমার সন্ধ্যে থেকে রাত পর্যন্ত জলের উপর চাঁদের আলোর সৌন্দর্যও কিছু কম আকর্ষক দৃশ্য নয়।

উপসংহারঃ

দীঘার সমুদ্রসৈকত
বাঙালীদের মধ্যে সবথেকে জনপ্রিয় ঘোরার জায়গা যদি পুরী হয়, তাহলে দীঘা নিঃসন্দেহে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে। দীঘা যাতায়াতের খরচ পুরীর থেকে কম কিন্তু দীঘায় সেরকম কোনও বড় মন্দির না থাকায় এর কোনও ঐশ্বরিক আকর্ষণ নেই। একসময়ে দীঘার খ্যাতি ছিল হানিমুনের জন্য, আজকাল মূলতঃ সপ্তাহান্তের ঘোরার জায়গায় পরিণত হয়েছে। দীঘা যাওয়ার জন্য কোনও প্রস্তুতি লাগে না, ট্রেনের বুকিং অথবা বাসের টিকিট সহজেই পাওয়া যায়। নিজের গাড়ি নিয়ে গেলেও সহজেই যাওয়া যায়। দীঘায় আগে থেকে বুকিং না করে গেলে ঘর পেতেও কোনও অসুবিধে হয় না। কম খরচে নির্ঝঞ্ঝাটে সমুদ্রসৈকতে দু'তিনদিন কাটানোর জন্য দীঘা একেবারে আদর্শ জায়গা। পুরী বা দার্জিলিঙের মতো দীঘাও বছরের যেকোনও সময়ে যাওয়া যায় আর এখানে সবকিছুই খুব সহজে পাওয়া যায়। পুরীর মতো এখানেও "ঘুরে খুব ভালো লাগল" এটা আমি কখনও কারুর মুখে যেমন শুনিনি, তেমনই "দূর দূর, দীঘা আবার একটা যাওয়ার মতো জায়গা হল ?" এরকম বলতেও কাউকে শোনা যায় না। তাই জীবনে কখনও দীঘায় না গিয়ে থাকলে (যেটার সম্ভাবনা খুবই কম) অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য একবার যেতে সব বাঙালিকেই অনুরোধ করব।

দীঘা ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Sunday, September 12, 2021

কলকাতা ভ্রমণ : পর্ব - ৫ (নেহেরু চিলড্রেন্স মিউজিয়াম)

কলকাতা ভ্রমণের প্রথম পর্ব চিড়িয়াখানা ভ্রমণের পোস্টে লিখেছিলাম "কলকাতার চিড়িয়াখানা প্রায় সব্বাই ছোটবেলায় একবার করে যায় আর বহু লোকের ক্ষেত্রে দেখেছি বড় হয়ে আর কিছুতেই যাওয়া হয়ে ওঠে না"। কলকাতার নেহেরু চিলড্রেন্স মিউজিয়ামের ক্ষেত্রেও বোধহয় একই কথাই প্রযোজ্য, যদিও চিড়িয়াখানায় যত লোক ছোটবেলায় যায় তত লোক বোধহয় নেহেরু চিলড্রেন্স মিউজিয়ামে যায় না। আমি  এখানে ছোটবেলায় বারদুয়েক গেছি আর তারপর বড় হয়ে কখনও যাওয়া হয়নি। এবারে গেলাম - প্রধানতঃ আমার দুই কন্যাকে তাদের ছোটবেলার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করাতে (যাতে বড় হয়ে ওরাও একই ধরনের কথা বলতে পারে !)। কলকাতা ভ্রমণের এই পর্বে থাকছে সেই নেহেরু চিলড্রেন্স মিউজিয়ামে আমাদের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা।

১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ - রবিবার আমরা নেহেরু চিলড্রেন্স মিউজিয়াম পৌঁছলাম দুপুর চারটে পনেরো নাগাদ। নেহেরু চিলড্রেন্স মিউজিয়াম প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যে ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে (সোমবার বন্ধ)। এবারে আমরা সাতজন - আমরা ছ'জন ছাড়া আমাদের সঙ্গে টুটুন। নেহেরু চিলড্রেন্স মিউজিয়ামের অবস্থান জওহরলাল নেহেরু রোডে - এক্সাইডের মোড় থেকে এস্‌প্ল্যানেডের দিকের রাস্তা অর্থাৎ জওহরলাল নেহেরু রোড ধরে মিনিট খানেক হাঁটলে বাঁদিকে মিউজিয়ামটা পড়ে। এখানে রাস্তার উপরেই গাড়ি পার্কিং করা যায়।

নেহেরু চিলড্রেন্স মিউজিয়ামের ঢোকার টিকিট বড়দের মাথাপিছু ২০/- টাকা আর ছোটদের (১৬ বছরের নিচে) মাথাপিছু ১০/- টাকা। টিকিট কেটে আমরা ভিতরে ঢুকলাম। পুরো বাড়িটা ছ'তলা যদিও দেখার জিনিস শুধুমাত্র দোতলা, তিনতলা আর চারতলায়। এখানকার দেখার জিনিসগুলোকে মোটামুটি চারভাগে ভাগ করা যায় - পুতুলের গ্যালারি, গণেশের গ্যালারি, রামায়ণ আর মহাভারত। এর মধ্যে পুতুলের গ্যালারি সবতলাতেই আছে, মহাভারত আছে তিনতলায় আর রামায়ণ আর গণেশ চারতলায়।

পুতুলের গ্যালারি
পুতুলের গ্যালারি -
 নেহেরু চিলড্রেন্স মিউজিয়ামের পুতুলের গ্যালারিতে পুতুলের সম্ভার দেখে তাজ্জব বনে যেতে হয় ! ঘরের চারদিকের দেওয়ালে এবং মাঝখানে বিশাল কাচের শোকেসে এই পুতুলগুলো রাখা হয়েছে। দেশ-বিদেশের নানারকমের পুতুল রয়েছে এই গ্যালারিতে। বিভিন্ন আকারের, বিভিন্ন ভঙ্গিতে দাঁড়ানো বসা শোওয়া এইসব পুতুলগুলো বিভিন্ন দেশের বা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের শিল্পকলার অসাধারণ নিদর্শন। দুর্গার মূর্তি থেকে ইংরেজ বণিক, ব্রাহ্মণ পুরোহিত থেকে মিজোরামের রাজকন্যা, জার্মান থেকে রাশিয়ার পুতুল - সবই রয়েছে এইসব পুতুলের ঘরগুলোতে। একটা একটা করে সবকটা পুতুল দেখা সম্ভব নয়, তবে প্রত্যেকটা পুতুলই দেখতে যে খুবই সুন্দর - সেটা বলতেই হবে। এখানে চাইলে নিজের কাছে থাকা পুতুল দিয়েও দেওয়া যায়, এরা সেগুলো এই সংগ্রহের মধ্যে রেখে দেবে। বিভিন্ন দেশের সরকার থেকে এখানে বিভিন্ন পুতুল উপহার দেওয়া হয়েছে, সেগুলো এখানে লেখাও রয়েছে।

অর্জুনের লক্ষ্যভেদ
মহাভারত -
 দোতলা আর তিনতলার পুতুলের গ্যালারির পরে আমরা গেলাম তিনতলার মহাভারত গ্যালারি দেখতে। এখানে একটা বিশাল ঘরের মধ্যে মহাভারতের বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য ঘটনার মডেল তৈরি করে কাচের শোকেসের মধ্যে রাখা রয়েছে। শোকেসের সামনে দেওয়ালের উপরদিকে সেই ঘটনার বিবরণ লেখা হয়েছে। এইসব ঘটনার মধ্যে পাশা খেলা, পান্ডবদের বনবাস, অর্জুনের লক্ষ্যভেদ, মহাভারতের যুদ্ধ, ভীষ্মের শরসজ্জা ইত্যাদি অনেক কিছুই রয়েছে। আমার মতে মহাভারত সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য - এর মতো এত ঘটনাবহুল কাব্যগ্রন্থ পৃথিবীতে আর আছে বলে আমার জানা নেই। সেই মহাভারতের ঘটনাবলীর এত সুন্দর মডেল দেখতে খুবই ভালো লাগছিল। শুধু আমরা বড়রা নই, মহাভারতের বিস্তারিত গল্প কথা-কলিও জানে, তাই ওরাও মডেলগুলো দেখে নিজেরাই কোনটা কি বলে যাচ্ছিল।

রাবণের সীতাহরণ
রামায়ণ -
 চারতলায় রামায়ণ গ্যালারি। মহাভারতের মতো এখানেও বিশেষ বিশেষ ঘটনাবলীর মডেল তৈরি করে কাচের শোকেসে রাখা রয়েছে। রামের হরধনু ভঙ্গ, রাবণের সীতাহরণ, হনুমানের লঙ্কাকান্ড ইত্যাদি নানারকম ঘটনার মডেল রয়েছে এখানে। ব্যক্তিগতভাবে আমার রামায়ণ যদিও সেরকম কিছু ভালো লাগে না (বলতে চাইছি পোষায় না), কিন্তু তাও গ্যালারিটা খুবই ভালো লাগল।









গণেশের গ্যালারি
গণেশ গ্যালারি -
 চারতলায় রামায়ণ গ্যালারি থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামার আগে বাঁদিকে গণেশের গ্যালারি। এখানে অনেকগুলো ছোট ছোট নানাধরনের গণেশের মূর্তি রয়েছে। অনেকগুলোই বেশ মজাদার, যেমন - ফুটবলার গণেশ, ব্রাহ্মণ গণেশ, স্কুলবয় গণেশ, পুলিশ গণেশ ইত্যাদি। এছাড়া কয়েকটা চিরাচরিত গনেশের মূর্তিও রয়েছে। এইসব দেখে আমরা নেহেরু চিলড্রেন্স মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে এলাম।

উপসংহারঃ

মিউজিয়ামের পুতুলের সামনে আমার দুই পুতুল !
কলকাতা শহরে ছোটদের দেখার মতো যে কয়েকটা জায়গা রয়েছে, তার মধ্যে নেহেরু চিলড্রেন্স মিউজিয়াম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এখনকার দিনের মা-বাবারা বাচ্চাদের এখানে কতটা নিয়ে যান জানি না, তবে গেলে বাচ্চাদের ভালো লাগারই কথা। আমার ছোটবেলায় আমার ভালো লাগত, কথা-কলির ছোটবেলায় ওদেরও ভালো লেগেছে। পুরো মিউজিয়ামটা দেখতে ঘন্টাদেড়েকের মতো লাগে, তাই কোনও একটা ছুটির দিনে এখানে গেলে সময়টা ভালোই কাটবে। নেহেরু চিলড্রেন্স মিউজিয়ামে শুধুমাত্র চারধরনের গ্যালারি ছাড়াও ছোটদের আঁকা, আবৃত্তি, নাচ, গান, ম্যাজিক, নাটক শেখানো হয়। কেউ নিজের ছেলেমেয়েকে এসব শেখাতে চাইলে এখানে যোগাযোগ করতে পারেন (নাও পারেন, আপনার ইচ্ছে !)। তবে ছোটবড় নির্বিশেষে এই মিউজিয়ামটা একবার দেখে আসার জন্য সবাইকেই অনুরোধ করছি।

নেহেরু চিলড্রেন্স মিউজিয়াম ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

কলকাতা ভ্রমণ : পর্ব - ৪ (জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি)

কলকাতা শহরের প্রথম পাঁচটা দ্রষ্টব্য জায়গা কি কি - এই প্রশ্নের উত্তরে যে যাইই বলুক, তার মধ্যে যে নামটা থাকবেই সেটা হল জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মস্থান ও বাসস্থান হিসেবে ঐতিহাসিক ও পর্যটনের দিক থেকে এই বাড়ির গুরুত্ব অপরিসীম। ছোটবেলা থেকে অনেকবার বিভিন্ন সময়ে এখানে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হলেও শেষ পর্যন্ত আমার আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি। তাই এই করোনা পরিস্থিতিতে নিজের শহরটাকে দেখে নেওয়ার যে প্রকল্প আমরা শুরু করেছি, তার মধ্যে এবারে সংযোজন হল জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি।

যাওয়ার দিন ১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ - আমরা জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি পৌঁছলাম তখন দুপুর ১২ টা। ঠাকুরবাড়ি সোমবার বন্ধ থাকে। বাকি দিনগুলো সকাল ১০ঃ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্য খোলা থাকে। এবারে আমাদের দল সাতজনের - আমরা ছ'জন ছাড়া আমাদের সঙ্গে টুটুন। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির ভৌগোলিক অবস্থান জানেনা এরকম মানুষ বোধহয় কলকাতায় নেই, তবে আমার ব্লগের কলকাতার বাইরের (বা পশ্চিমবঙ্গের বাইরের বা ভারতবর্ষের বাইরের !) পাঠক/পাঠিকাদের জন্য জানাচ্ছি জায়গাটা গণেশটকি বা সিংহীবাগান অঞ্চলে আর গিরীশপার্ক মেট্রো স্টেশন থেকে খুবই কাছে। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে ঢোকার দরজাটা চিৎপুর রোডের উপরে। এখানে গাড়ি পার্কিং-এর জায়গাও আছে। তবে ভীড়ের দিনে গেলে পার্কিং-এর জায়গা পাওয়া সহজ হবে না কারণ এখানে জায়গা সীমিত।

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ করে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। গেটের পাশে টিকিট কাউন্টার। মাথাপিছু ২০/- টাকা করে টিকিট কেটে (বাচ্চাদের লাগে না) আমরা ভিতরে ঢুকলাম। এখানে জানিয়ে রাখি জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে ছবি তুলতে গেলে তার জন্য আলাদা করে টাকা দিতে হয়। আর এঁরা সেই ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর। ভিতরে কোথাও লুকিয়ে ছবি তোলার চেষ্টা করাও উচিৎ নয় কারণ সর্বত্র সি সি ক্যামেরা লাগানো আছে। আমরা ভিতরে কোনও ছবি তুলিনি, কারণ আমরা টাকা দিইনি।

ঠাকুরবাড়িতে ঢোকার আগে
টিকিট কেটে আমরা প্রথমে গেলাম টিকিট কাউন্টারের ঠিক পিছনে ঠাকুরবাড়ির গ্যারেজের দিকে। এখানে রবীন্দ্রনাথ ব্যবহৃত ১৯৩৩ সালের হাম্বার সিডান গাড়িটা রাখা আছে। গাড়ি দেখার পর ভিতরের বিশাল মাঠের পাশ দিয়ে আমরা এগিয়ে গেলাম লাল রঙের মূল বাড়িটার দিকে। বাড়িতে ঢোকার মুখে একটা সিঁড়ি আছে, সেখানে সবাইকে জুতো খুলতে হয়। তারপর আমরা প্রবেশ করলাম এই ঐতিহ্যমন্ডিত ঠাকুরবাড়ির ভিতরে।

ঠাকুরবাড়ির একতলায় কিছু দেখার নেই, সব দর্শনীয় জায়গাগুলো দোতলা আর তিনতলায়। তাছাড়া চারতলার ছাদেও যাওয়া যায়, যদিও সেখানে দেখার কিছু নেই। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে আমরা একের পর এক ঘরগুলো দেখতে থাকলাম। ঠাকুরবাড়ি প্রকৃতপক্ষে একটা অত্যন্ত ধনী জমিদারবাড়ি, তাই এখানে তাঁদের ব্যবহৃত সবকিছুর মধ্যেই আভিজাত্য ও বিলাসিতার ছাপ সুস্পষ্ট। কোনঘরে গিয়ে কি দেখলাম সেটা আর আলাদা করে লিখছি না, তবে এটা বলতেই হবে যে বিশ্বভারতী এখানকার সবকিছু অত্যন্ত সুন্দরভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করে। রান্নাঘর, খাওয়ার ঘর, শোওয়ার ঘর, বসার ঘর ইত্যাদি দেখে আমরা একটা ঘরে ঢুকলাম যেখানে রবীন্দ্রনাথের জীবনের শেষ অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল (ডাক্তারদের মধ্যে ছিলেন স্বয়ং বিধানচন্দ্র রায়)।

ভিতরের বারান্দা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আরও কয়েকটা ঘর দেখলাম যেখানে নানারকম ছবি ইত্যাদি সংগ্রহ করা হয়েছে। তারপর আরও কয়েকটা ঘর দেখলাম যেখানে একটা ঘরের মধ্যে দিয়ে আরেকটা ঘরে যেতে হয়, সেটার ভিতর দিয়ে আরেকটা ঘরে যাওয়া যায় আর সেটার ভিতরে দিয়ে আরেকটা ঘরে যাওয়া যায়। সত্যি বলতে কি, বাড়িটা এতটাই বড় আর সেইসঙ্গে ভিতরের ম্যাপটাও বেশ জটিল। হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই, কিন্তু ভিতরে ঢুকে "কোন ঘরটা দেখলাম আর কোনটা বাকি রয়ে গেল" এটা হিসেব রাখা সহজ নয়। এই শেষের ঘরগুলো রবীন্দ্রনাথের বিদেশভ্রমণ সংক্রান্ত। রবীন্দ্রনাথ বেশ অনেকবার বিদেশে গিয়েছিলেন - এই ঘরগুলোতে প্রধানতঃ তাঁর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে ভ্রমণের সময়কার ছবি ও তথ্য রাখা আছে। সব ছবির লাগোয়া সবলেখা পড়া সম্ভব হয়নি, কারণ গেটে ঢোকার সময়ে আমাদের বলা হয়েছে একঘন্টার মধ্যে পুরোটা দেখে নেমে আসতে।

এরপর আমরা গেলাম একটা ঘরে সেখানে ঠাকুরবাড়ি বিভিন্ন ব্যক্তিদের পূর্ণ তৈলচিত্র আঁকা রয়েছে। আর এখানেই দেখতে পেলাম সেই মহান ব্যক্তির তৈলচিত্র - যিনি ঠাকুরবাড়িতে আমার আসার মূল অনুপ্রেরণা। তিনি এই বাড়ির নির্মাতা না হলেও আকারে অপেক্ষাকৃত ছোট বাড়িটিকে তিনিই সুবিশাল জমিদারবাড়ির আকার দিয়েছিলেন। একজন সাধারণ জমিদার হিসেবে জীবন শুরু করে আজ থেকে প্রায় দু'শো বছর আগে যিনি বাঙালিদের মধ্যে তো বটেই, সম্ভবতঃ ভারতবর্ষেরও সবথেকে ধনী ব্যবসায়ী হয়ে উঠেছিলেন। জমিদারী, কয়লা, ব্যাঙ্কিং, ইন্সিওরেন্স, চটকল, চা, আফিম, জাহাজ ইত্যাদি আরও নানারকম জিনিসের ব্যবসা করে সেই যুগে যাঁর সম্পত্তির পরিমাণ ছিল কোটি টাকার উপরে (আজকালকার দিনের টাটা-আম্বানীদের থেকেও বেশি !)। যিনি রাজা রামমোহন রায়ের প্রায় সমস্ত সমাজসংস্কারমূলক কাজে ছিলেন তাঁর ছায়াসঙ্গী। যিনি মেডিক্যাল কলেজ, হিন্দু স্কুল প্রতিষ্ঠার মতো যেকোনও উন্নয়নমূলক আর সৃজনশীল কাজে সবসময়ে অকাতরে অর্থব্যয় করেছেন কিন্তু নিজে থেকেছেন প্রচারবিমুখ। যিনি ব্রাহ্মসমাজের শুরু থেকে ছিলেন তার প্রধান পৃষ্ঠপোষক। যিনি পরাধীন দেশের একজন নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও ইংল্যান্ডে স্বয়ং মহারাণী ভিক্টোরিয়ার আমন্ত্রণে তাঁর প্রাসাদে গিয়ে তাঁর আতিথেয়তা গ্রহণ করেছিলেন - যে সম্মান সেই যুগে খোদ ইংল্যান্ডের বহু অভিজাত সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরাও পেতেন না। যিনি ছিলেন ফ্রান্সের সম্রাটের বন্ধু ও প্রিয়পাত্র। আমার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি যাওয়ার প্রধান কারণ সেই ব্যক্তির বাসস্থান দর্শন করা - তিনি প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর - এমন একজন 'প্রিন্স' যাঁর বাবা কোনও 'কিং' ছিলেন না !

এই শেষ লাইনটার জন্য আমি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই রাজা ভট্টাচার্য রচিত 'দ্বারকানাথ' বইটির নাম। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর সম্পর্কে কিছু তথ্য আমি জানতে পারি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'সেই সময়' উপন্যাসে। মাস ছয়েক আগে রাজা ভট্টাচার্যের এই 'দ্বারকানাথ' বইটা থেকে আমি দ্বারকানাথ ঠাকুর সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারি। 'সেই সময়' পড়ে যে মানুষটির প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা জন্মেছিল, 'দ্বারকানাথ' পড়ে তাঁকে মনে মনে ঠাকুরের আসনে বসিয়েছিলাম। রবীন্দ্রনাথ কারুর কারুর কাছে ঠাকুর, শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব কারুর কারুর কাছে ঠাকুর। ঠিক সেভাবেই প্রিন্স দ্বারকানাথ আমার কাছে ঠাকুর - 'বাঙালির দ্বারা ব্যবসা হয়না' প্রচলিত এই ধারণার গালে যিনি নিজেই একটি সপাট চড় ! আমার ব্লগের পাঠক/পাঠিকাদের মধ্যে যাঁদের বই পড়ার একটুআধটু অভ্যেস আছে, রাজা ভট্টাচার্যের 'দ্বারকানাথ' বইটা অবশ্যই পড়ার জন্য তাঁদের বিশেষভাবে অনুরোধ করছি। অত্যন্ত যত্নসহকারে পড়ে অক্ষত অবস্থায় ফেরৎ দেওয়ার অঙ্গীকার করলে আমি বইটা ধার দিতেও রাজী আছি।

দ্বারকানাথের তৈলচিত্র আর তাঁর ব্যবহৃত কিছু জিনিস দেখার পরে বাকি সবকিছু কেমন ফিকে লাগছিল। এরপর আমরা দোতলা থেকে তিনতলায় গিয়ে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিল্পকলার কিছু নমুনা দেখলাম। তিনতলার বারান্দা থেকে সামনের মাঠের দৃশ্য দেখতে বেশ সুন্দর লাগে। ঠাকুরবাড়ির একটা অংশে কিছু লোকজন থাকে আর কিছু অংশে বিশ্বভারতীর কাজকর্ম হয় বলে সেই অংশগুলোতে সাধারণ মানুষকে যেতে দেওয়া হয় না। আমরা ছাদটা একবার দেখে নিয়ে নিচে নেমে এলাম।

বাড়ির ভিতরের উঠোন
বাড়ির ভিতরের উঠোনে একটা নাটমন্দির গোছের আছে, যেখানে চাইলে ছবি তোলা যেতে পারে। এই জায়গাতেই প্রতিবছর পঁচিশে বৈশাখ বিচিত্রানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এখানে এমনিতে দেখার সেরকম কিছু নেই, তাই আমরা কিছুক্ষণ বসে দু'একটা ছবি তুলে বেরিয়ে এলাম। ঠাকুরবাড়ির গেটের কাছ থেকে পুরো বাড়িটার ছবি তোলা যেতে পারে, যদিও এখানকার লোকজন সেটা ভালোভাবে নেয় না। যাই হোক আমাদের সময় শেষ হয়ে গিয়েছিল, তাই আমরা এবার বেরিয়ে এলাম জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি থেকে।

উপসংহারঃ

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি
জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে বিভিন্ন সময়ে অনেক বিশিষ্ট মানুষেরা জন্ম নিয়েছেন। প্রিন্স দ্বারকানাথের জ্যেষ্ঠপুত্র মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বাবার মতো ব্যবসায়ী না হলেও ছিলেন ধনী জমিদার ও ব্রাহ্মসমাজের প্রাণপুরুষ। তাঁর পুত্র দ্বিজেন্দ্রনাথ ছিলেন দার্শনিক ও কবি। আরেক পুত্র সত্যেন্দ্রনাথ প্রথম ভারতীয় যিনি সিভিল সার্ভিসে চাকরি পেয়েছিলেন। আরেক পুত্র জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তাঁর বাবার সঙ্গে জমিদারীর দেখাশোনা ছাড়াও নিজে একটি জাহাজ চালাতেন। অবনীন্দ্রনাথ ও গগনেন্দ্রনাথ শিল্পকলা ও ছবি আঁকায় বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ঠাকুরবাড়ির মহিলা সন্তানদের মধ্যেও অনেক কৃতী সন্তান জন্মেছেন। আর সর্বোপরি রবীন্দ্রনাথ - যাঁর সম্পর্কে যে কোনও কথাই সর্বজনবিদিত, তাই আলাদা করে আর কিছু লিখছি না। এঁদের সবার বাড়ি - জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি। এই বাড়ির প্রতিটি কোণায় রয়েছে এইসমস্ত স্বনামধন্য মানুষদের কীর্তিকলাপের নিদর্শন। এঁদের সম্পর্কে আমরা বইতে যাইই পড়ে থাকি, এই বাড়িতে গিয়ে সেগুলো চাক্ষুস দেখার অভিজ্ঞতাই আলাদা। তাই এই অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য অবশ্য গন্তব্য জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি !

Monday, March 15, 2021

বরন্তি ভ্রমণ

বিশেষ সতর্কীকরণ ঃ

১. এই ভ্রমণে আমরা জনবহুল স্থানে, বিশেষতঃ স্টেশনে, ট্রেনে ইত্যাদি জায়গায় সারাক্ষণ মাস্ক পরে থেকেছি এবং দূরত্ববিধি যথাসম্ভব মেনে চলার চেষ্টা করেছি । সেইসঙ্গে প্রয়োজনমতো হ্যান্ড স্যানিটাইজারও ব্যবহার করেছি ।

২. এই পুরো ভ্রমণে আমরা কোনও অবস্থাতেই কোনও পলিথিন বা প্লাস্টিক ব্যবহার করিনি । অর্থাৎ প্লাস্টিকের ব্যবহার না করেও এই ভ্রমণ অনায়াসে করা যায় ।

৩. এই পুরো ভ্রমণে আমরা কোনও কাগজ ব্যবহার বা নষ্ট করিনি । হোটেল বুকিং-এর রশিদ-এর প্রিন্ট আউট ব্যবহারের কোনও প্রয়োজন হয় না ।

৪. এই পুরো ভ্রমণে আমাদের দলের কেউ ধূমপান করেনি । ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর ।

আমার ব্লগের সমস্ত পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করছি বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে করোনা ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ করার জন্য সরকারী বিধিনিষেধ মেনে চলার জন্য । সেইসঙ্গে অনুরোধ করছি প্লাস্টিক, অপ্রয়োজনীয় কাগজের ব্যবহার আর ধূমপান বর্জন করার জন্য ।

ভ্রমণপথ ঃ

শনিবার ১৩ই মার্চ, ২০২১ঃ হাওড়া থেকে সকাল ৮ টায় হাওড়া নিউ দিল্লী স্পেশাল ট্রেন - সকাল ১০ঃ৪০ মিনিটে আসানসোল । আসানসোল থেকে একঘন্টা গাড়িতে বরন্তি । বরন্তিতে রাত্রিবাস ।

রবিবার ১৪ই মার্চ, ২০২১ঃ বরন্তির লোক্যাল সাইট সিয়িং । বরন্তিতে রাত্রিবাস ।

সোমবার ১৫ই মার্চ, ২০২১ঃ বরন্তি থেকে গাড়িতে আসানসোল । আসানসোল থেকে সকাল ১০ঃ৪৩ মিনিটে পাটনা হাওড়া স্পেশাল ট্রেন - দুপুর ১ঃ১০ মিনিটে হাওড়া ।

বরন্তি (স্থানীয় মানুষের উচ্চারণে বড়ন্তিও বলা যেতে পারে, কিন্তু কোনওভাবেই বারান্তি নয় !)। কলকাতা থেকে ঘন্টা তিনেকের দূরত্বে পুরুলিয়া জেলায় পাহাড় ঘেরা ছোট্ট একটা গ্রাম । করোনার আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য সুদীর্ঘদিন বাড়িতে বসে থাকার পরে ট্রেনে করে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা যখনই করলাম, এই জায়গাটার কথা মাথায় এল । তার একটা কারণ এখানে যাতায়াতটা বেশ সহজসাধ্য, আর অন্য কারণ হল জায়গাটা ফাঁকা ফাঁকা । এই বরন্তিতে দু'দিনের অভিজ্ঞতা নিয়েই আমার ব্লগের এবারের পোস্ট ।

কলকাতা থেকে বরন্তির দূরত্ব ২৪০ কিলোমিটারের মতো  - গাড়িতে ঘন্টা চারেক । টানা গাড়িতেও যাওয়া যায় (যেটা অনেকেই করেন) আবার ট্রেনেও যাওয়া যায় । আমরা অবশ্য ট্রেনেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম । কাঁটায় কাঁটায় সকাল আটটার সময়ে হাওড়া থেকে হাওড়া - নিউ দিল্লী স্পেশাল ট্রেন যখন ছাড়ল, তখন সত্যিই ভালো লাগছিল । ভাইজ্যাগ-আরাকু ভ্রমণের দীর্ঘ দু'বছর পাঁচ মাস পরে আমরা আবার ট্রেনে করে কোথাও গেলাম । আমরা বলতে আমরা ছ'জন অর্থাৎ আমি, অমৃতা, বাবা, মা, কথা-কলি । ট্রেনে এই প্রথমবার কথা-কলির টিকিট লেগেছে - ওরা নিজেদের আলাদা বসার সিট্‌ পেয়েছে, এতে ওরাও খুব খুশি ।

বৃষ্টির মধ্যে আসানসোল স্টেশন
ট্রেন বর্ধমান পেরোনোর পর থেকেই আকাশের অবস্থা খারাপ হতে শুরু করল । সূর্যকে আর দেখা গেল না বরং আকাশ বেশ মেঘলা হয়ে গেল । দুর্গাপুর পেরোনোর পরে ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হল যেটা আমরা আসানসোলে পৌঁছনোর পরেও থামল না । আসানসোল স্টেশন থেকে বরন্তি যাওয়ার গাড়ি হোটেলের সাহায্যে আগেই বুক করা ছিল । স্টেশনে পৌঁছে বৃষ্টির মধ্যে মালপত্র নিয়ে গাড়িতে উঠে বরন্তির দিকে রওনা হওয়ার সময়ে আমরা সবাইই অল্পবিস্তর ভিজে গেলাম ।

দামোদর নদ

আসানসোল স্টেশন থেকে বরন্তি গাড়িতে ঘন্টাখানেক লাগে - ভাড়া ১,১০০/- টাকা । ছোট বা বড় সব গাড়ির ভাড়াই সমান - আমাদের লোকসংখ্যা ৬ হওয়ায় আমাদের একটা স্কর্পিও গাড়ি নেওয়া হয়েছিল । পশ্চিম বর্ধমান আর পুরুলিয়ার জেলার সীমারেখা নির্ধারণ করে বয়ে চলেছে দামোদর নদ । তার উপরের ব্রীজ পেরোনোর সময়ে একটা পুলিশের চেক্‌ পয়েন্ট আছে যেখানে পুলিশ গাড়ির ভিতরে ব্যাগ খুলিয়ে সবকিছু ভালোভাবে চেক্‌ করে (যারা বেআইনি অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে যাতাযাত করে, তাদের জন্য বলছি এই জায়গাটায় কিন্তু খুব সাবধান !)। দামোদর ব্রীজটা খুব সুন্দর আর আকাশ মেঘলা থাকায় দৃশ্য আরও সুন্দর লাগছিল । পুলিশ যতক্ষণ আমাদের গাড়ি চেকিং করল, আমি সেই সময়ে গাড়ি থেকে নেমে ব্রীজের উপর থেকে বেশ কিছু ছবি তুলে নিলাম ।

ঝোড়ো হাওয়ায় বরন্তি লেক
আরও কিছুক্ষণ চলার পরে রাস্তার শহুরে ব্যাপারটা কমে গিয়ে গ্রাম্য ব্যাপারটা শুরু হল । দু'পাশে গাছপালা পুকুর খাল ইত্যাদির সঙ্গে সঙ্গে কিছু ছোট ছোট পাহাড় দেখতে পাওয়া গেল । মাঝে মাঝে মাটির বাড়ি - গরু গোয়াল এসবও চোখে পড়ছিল । বৃষ্টি কিছুক্ষণ আগেই থেমে গেছে, পরিবেশটা ভীষণ মনোরম হয়ে রয়েছে । একটা মোড় ঘুরে আমাদের গাড়িটা একটা সুবিশাল জলাশয়ের পাশ দিয়ে চলতে লাগল - এটাই বরন্তি লেক । বরন্তি লেকের বিস্তারিত বিবরণ পরে দেব, আপাতত বলি এর পাশ দিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা । বৃষ্টি থেমে গেলেও যথেষ্ট জোরে বাতাস বইছে আর তাতে লেকের জলে সমুদ্রের মতো ছোট ছোট ঢেউ উঠছে । এই দৃশ্য দেখতে খুবই ভালো লাগছিল ।

আরণ্যক বননিবাস
লেক পেরিয়ে অল্পদূর গিয়েই পৌঁছে গেলাম আমাদের গন্তব্য 'আরণ্যক রিসর্ট'-এ । রিসর্টটা বেশ সুন্দর - একটা একতলা আর একটা দোতলা কটেজ নিয়ে তৈরি । এছাড়া রয়েছে একটা রান্না এবং খাওয়ার জায়গা আর সেইসঙ্গে বাকি জায়গাটা জুড়ে একটা সুবিশাল বাগান । সেই বাগানে নানারকম ফুল ও ফলের গাছ আর সেইসঙ্গে রয়েছে নানারকম সব্জীর গাছ । পুরো জায়গাটাই যাকে বলে পরিপাটিভাবে সাজানো ।


আমরা চেক্‌ইন করে চানটান করে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম । এখানে জানিয়ে রাখি বরন্তি একটা প্রত্যন্ত গ্রাম - এখানে ত্রিসীমানার মধ্যে কোনও দোকানপাট নেই । তাই রিসর্টের বাইরে খাওয়া দাওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না । এখানে সব রিসর্টেই খাওয়ার প্যাকেজ পাওয়া যায় - সকালের চা, ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, সন্ধ্যের চা ও স্ন্যাক্স আর রাতের ডিনার । 'আরণ্যক রিসর্ট' - এ এই প্যাকেজের মূল্য মাথাপিছু ৪৫০/- টাকা । দুপুরের লাঞ্চের মেনু ভাত, ডাল, আলুভাজা, আলুপোস্ত, মাছের ঝোল, চাটনি, পাঁপড় । এখানকার রান্না একেবারেই ঘরোয়া আর সেইসঙ্গে অত্যন্ত সুস্বাদু । 

লাঞ্চ করে আমরা দুপুর ২ঃ১৫ নাগাদ গাড়ি নিয়ে বেরোলাম । বৃষ্টি একেবারেই থেমে গেছে, অল্প রোদও উঠেছে । আমাদের গন্তব্য শুশুনিয়া ও বিহারীনাথ পাহাড় । বরন্তি থেকে এগুলো ঘুরে আসতে ঘন্টা চারেক লাগে - গাড়িভাড়া ১,৭০০/- টাকা । আমাদের প্রথম গন্তব্য শুশুনিয়া পাহাড় । বরন্তি থেকে দূরত্ব ৩৫ কিলোমিটারের মতো আর যেতে লাগে একঘন্টা ।

৩০০ মিটার উচ্চতায় খুদে চ্যাম্পিয়ন !
শুশুনিয়া পাহাড়ে পৌঁছে দেখলাম এখানে ট্রেকিং করে উপরে ওঠার ব্যবস্থা রয়েছে । পাহাড়ের গায়ে পাথরের উপর দিয়ে সিঁড়ির মতো ধাপে ধাপে উপরে ওঠা যায়, তবে কাজটা যে সহজ তা বলব না । আমাদের ছ'জনের মধ্যে আমি, কথা আর কলি কিছুদূর ওঠার পরে কলিও আর উঠতে চাইল না । শেষপর্যন্ত আমি আর কথা উপরে উঠলাম । শুশুনিয়া পাহাড়ের উচ্চতা প্রায় ৪৫০ মিটার । আমরা ৩০০ মিটার পর্যন্ত উঠে আর না ওঠার সিদ্ধান্ত নিলাম (আমরা মানে এক্ষেত্রে আমি । কথার আরও ওঠার ইচ্ছে ছিল)। পুরো রাস্তাটা কথা একাই উঠেছে, আমার সাহায্য ছাড়াই । সত্যি বলতে আমি একেবারেই আশা করিনি ও এইটুকু বয়সে এতটা উঠতে পারবে । উপরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছবি তুলে আমরা আবার নিচের দিকে রওনা দিলাম । ওঠানামার পথে অনেককেই উঠতে নামতে দেখলাম যদিও ৩০০ মিটার পর্যন্ত প্রায় কেউই যায়নি । আর যারা ওঠানামা করছিল, তাদের কারুরই বয়স কথার ধারেকাছেও নয় - এটা জোর দিয়ে বলতে পারি !

বিহারীনাথ পাহাড়ের সামনে
নিচে নেমে আইসক্রিম খেয়ে আমরা আবার গাড়িতে উঠে চললাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্য বিহারীনাথ পাহাড়ের দিকে । শুশুনিয়া থেকে বিহারীনাথের দূরত্ব প্রায় ৩২ কিলোমিটার আর পৌঁছতে লাগে প্রায় একঘন্টা । বিহারীনাথে যখন পৌঁছলাম তখন সূর্য্যাস্ত হয়ে গেছে । বিহারীনাথের উচ্চতা শুশুনিয়ার মতোই যদিও এর উপরে ওঠার ইচ্ছে বা সময় কোনওটাই আমাদের ছিল না । সেইসঙ্গে দেখলাম বিহারীনাথের উপরে ওঠার রাস্তাটা বন্ধ করে রাখা রয়েছে (তবে এটা সবসময় থাকে কিনা জানি না)।

বিহারীনাথ মন্দির
বিহারীনাথ পাহাড়ের পাশেই বিহারীনাথ মন্দির । মন্দিরের পাশে একটা মেলা বসেছে । আমরা মন্দিরটা ঘুরে দেখে নিলাম । নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে - এটা আসলে শিবের মন্দির । মন্দিরের চাতালে তারস্বরে নামসংকীর্তন চলছে, তাই নিজেদের কানের স্বার্থেই মন্দির দেখতে বেশিক্ষণ সময় ব্যয় করলাম না ।



বিহারীনাথ পাহাড় থেকে রিসর্টের দূরত্ব ১৮ কিলোমিটার - আমাদের ফিরতে লাগল ৪৫ মিনিটের মতো । যখন ফিরলাম তখন অন্ধকার হয়ে গেছে । বরন্তিতে রাস্তায় আলোর কোনও ব্যবস্থা নেই, রাস্তার উপর কিছু দূরে দূরে একেকটা রিসর্ট রয়েছে, যা আলো শুধু সেখানেই আছে । রিসর্টে ফেরার পরে আমাদের চা ও সন্ধ্যের জলখাবার মুড়ি-চানাচুর-আলুর চপ দিল (যারা ভাবছে আমার মতো আমিষাশী এগুলো কিকরে খেল তাদের জানিয়ে রাখি আমি এগুলোর সবই খাই এবং পরিস্থিতিবিশেষে ভালোওবাসি !)।

আরণ্যক রিসর্টের ফুলের বাগান
সন্ধ্যের পরে বরন্তিতে কিছু করার নেই, তবে এখানে বারান্দায় বসে থাকতেই বেশ ভালো লাগে । এই সময়ে আমাদের পরিচয় হল রিসর্টের মালিক মিঃ মুকুল দাসের সঙ্গে । ভদ্রলোক কলকাতার বেহালায় থাকেন, মাঝে মাঝে বরন্তিতে যাতায়াত করেন । ওনার কাছ থেকে অনেক কিছু জানতে পারলাম । ভদ্রলোকের নিজের খুব গাছের শখ - বিভিন্ন জায়গা থেকে গাছের চারা এনে এখানে বসিয়েছেন । শীতকালে টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকোলি ইত্যাদি নানারকম সব্জী হয় ওনার বাগানে । তাছাড়া পালংশাক, লালশাক প্রভৃতিও হয় । এখানে যে সব্জী হয় সেগুলো দিয়েই এখানে অতিথিদের জন্য তরকারি রান্না হয় । সব্জী ছাড়াও অনেকরকম ফুল ও ফলের গাছ আছে এই বাগানে যার বেশ কিছু আমরা নিজের চোখেই দেখেছি । অত্যন্ত সুন্দরভাবে যে উনি এই বাগানের এবং রিসর্টের পরিচর্যা করেন, সেটা ওনার কথা শুনেও বোঝা যায় ।

রিসর্টের ভাড়ার ব্যাপারে বললেন এখানে উনি শুধুমাত্র ফ্যামিলি হলে তবেই ভাড়া দেন । বুকিং-এর সময়ে বারবার জিজ্ঞেস করে সেটা ভালোভাবে জেনে নেন এবং কিছুমাত্র সন্দেহ হলে তখন আর তাদের ভাড়া দেন না । বরন্তির মতো জায়গায় এই বিধিনিষেধটা আরোপ করে উনি যে একটা বেশ বড়সংখ্যক কাস্টমার হারান, সেটা উনি নিজেও জানেন কিন্তু এটাই ওনার বিজনেস এথিক্স, কাজেই এতে কারুর কিছু বলার থাকতে পারে না । তবে অতিথিদের প্রতি ওনার এবং ওনার কর্মচারীদের ব্যবহার বিশেষভাবে প্রশংসা করার মতো । আমরা ছাড়াও আরেকটি পরিবার এখানে ছিল, তাঁরাও এঁদের আতিথেয়তার বিশেষ প্রশংসা করছিলেন । আমার ব্লগের পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করছি বরন্তিতে পরিবারের সঙ্গে গেলে 'আরণ্যক রিসর্ট'-এই ওঠার জন্য । দায়িত্ব নিয়ে বলছি এখানে থাকলে খুব ভালো লাগবে (না, এগুলো লেখার জন্য মিঃ মুকুল দাস বা অন্য কেউ আমাদের ঘুষ দেননি বা অন্য কোনও বিশেষ পরিষেবা দেননি । খুব ভালো ব্যবহার পেলে নিজের থেকেই এগুলো অন্যদের বলতে ইচ্ছে করে, যেমন বলেছিলাম মুর্শিদাবাদ বা পাঁচমারির হোটেলের সম্পর্কে ।)

রাতে ডিনারের মেনু ছিল ভাত/রুটি, তরকারি আর চিকেন কারি । রান্না অত্যন্ত সুস্বাদু । খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়লাম ।

মাঠের ওপর সূর্য্যোদয়
পরেরদিন রবিবার ১৪ই মার্চ, ২০২১ । সকাল ছ'টার সময়ে রিসর্টের পিছন দিকে মাঠের উপর সূর্য্যোদয়ের দৃশ্য দেখতে পেলাম । দৃশ্যটা অত্যন্ত সুন্দর আর সকাল সকাল এই দৃশ্য দেখে মন ভরে যায় ।





আরণ্যকের ভিতরে
আগে ঠিক ছিল এ'দিন আমরা গড়পঞ্চকোট, মাইথন, পাঞ্চেৎ, কল্যাণেশ্বরী মন্দির ইত্যাদি দেখতে যাব, কিন্তু পরে আমরা সেই পরিকল্পনা বাতিল করলাম । এর কারণ এই জায়গাগুলোর সবগুলোই বরন্তি থেকে বেশ কিছুটা দূরে আর এগুলো অন্য সময়েও যাওয়া যায় । বরন্তিতে এসে বরন্তিটা ভালো করে দেখলে সেটাই হবে সবথেকে বড় প্রাপ্তি । তবে এটা ঠিক বরন্তিতে বরন্তি লেক ছাড়া আর বিশেষ কিছু দেখার নেই, কিন্তু আগেই বলেছি এখানে রিসর্টের বারান্দায় বসে থাকাটাই একটা ভীষণ ভালো অভিজ্ঞতা ।

সকালে চায়ের পরে ব্রেকফাস্টে লুচি আর তরকারি দিল । সেগুলো খেয়ে মা-বাবা, কথা-কলি রিসর্ট থেকে বেরিয়ে একবার বরন্তি লেকটা ঘুরে এল । দুপুরে লাঞ্চের মেনু আগেরদিনের মতোই । খাওয়ার পরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বিকেল ৪ঃ১৫ নাগাদ সবাই মিলে বেরোলাম বরন্তি লেকের উদ্দেশ্যে ।

বরন্তি লেকের উপর সূর্য্যাস্ত (প্যানোরমিক ভিউ)
আরণ্যক রিসর্ট থেকে বরন্তি লেকের দূরত্ব ১.২ কিলোমিটার, কিন্তু তাও হেঁটে আমাদের প্রায় আধঘন্টা লাগল । লেকের দৃশ্য অনবদ্য । ঘন্টাখানেকের মধ্যে লেকের জলের ওপর সূর্য্যাস্ত হবে তাই এইসময়ে লেকের ধারের রাস্তায় ট্যুরিস্টের ভীড় চোখে পড়ার মতো । শুধুমাত্র যারা বরন্তিতে এসেছে তারাই নয়, অন্যান্য জায়গা থেকেও গাড়ি করে লোকজন বরন্তি লেক দেখতে এসেছে । লেকের একদিকে একটা নাতিউচ্চ পাহাড় (পাহাড় না বলে টিলা বলাই ভালো) এবং লেকের জলে তার ছায়া লেকের দৃশ্যকে আরও সুন্দর করে তুলেছে । আমাদের চোখের সামনে সেই অভিপ্রেত সূর্য্যাস্ত হল । আজ গড়পঞ্চকোট ইত্যাদি জায়গায় না যাওয়ার যে সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলাম, সেটার জন্য মনে মনে বেশ আত্মশ্লাঘা অনুভব করছিলাম কারণ গেলে এই দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য হত না ।

সূর্য্যাস্তের পরে ফেরার পথ ধরলাম । পথে একজায়গায় খেজুর গুড় বিক্রি হচ্ছিল, সেখান থেকে আমরা কিছুটা গুড় কিনলাম । এখানকার দাম কলকাতার থেকে বেশি তবে এর বৈশিষ্ট্য হল এতে কোনও চিনির ভেজাল নেই । বরন্তিতে গণপরিবহনের খুব অভাব - রিক্সা, ভ্যান, টোটো খুব কম চলে । তবে আমাদের বিশেষ কিছু ক্লান্তি নেই, ফিরতি পথে আধঘন্টা হেঁটে আবার রিসর্টে পৌঁছে গেলাম । আজকের সন্ধ্যের জলখাবারও গতকালেরই মতো তফাৎ শুধু আলুর চপের বদলে পিঁয়াজী । মিঃ মুকুল দাস ও তাঁর স্ত্রী গত তিনসপ্তাহ একটানা বরন্তিতে থাকার পরে আজ দুপুরে কলকাতা চলে গেছেন, কাজেই সন্ধ্যেবেলা তাঁর সঙ্গে গল্প করার সুযোগ আর নেই । আমরা বাকি সময়টা যথারীতি বারান্দায় বসেই কাটিয়ে দিলাম । রাতের মেনুও গতকালেরই মতো, খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়লাম ।

ফেরার পথে আসানসোল স্টেশন
সোমবার ১৫ই মার্চ, ২০২১ - আমাদের বাড়ি ফেরার দিন । সকালে চা খেয়ে তৈরি হয়ে নিলাম । আমাদের ফেরার ট্রেন আসানসোল থেকে সকাল ১০ঃ৪৩ মিনিটে, তাই আমরা বরন্তি থেকে সাড়ে আটটায় বেরোনোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম । এত সকালে ব্রেকফাস্ট করাটা একটু চাপের, তাই ব্রেকফাস্টটা প্যাকিং করে সঙ্গে নিয়ে নেওয়া হল । ঠিক সাড়ে আটটায় বরন্তি থেকে বেরিয়ে আসানসোল স্টেশনে পৌঁছলাম তখন সকাল দশটা । তারপর প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে সঙ্গে থাকা লুচি তরকারিগুলোর সদ্ব্যবহার করে ফেললাম ।

ফেরার পথে পাটনা হাওড়া স্পেশাল ট্রেন কাঁটায় কাঁটায় সকাল ১০ঃ৩৯ মিনিটে আসানসোল স্টেশনে এল আর কাঁটায় কাঁটায় ১০ঃ৪৩ মিনিটে ছাড়ল । ট্রেনের হাওড়া পৌঁছনোর কথা দুপুর ১ঃ২৫ মিনিটে আর ট্রেন নির্ধারিত সময়ের পনেরো মিনিট আগে আমাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দিল । স্টেশন থেকে ট্যাক্সি করে বাড়ি !

সারসংক্ষেপ ঃ

১. কলকাতা থেকে ২-৩ দিনের ঘোরার জন্য একটা দূর্দান্ত জায়গা পুরুলিয়া জেলার বরন্তি । এখানকার প্রধান আকর্ষণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ।

২. বরন্তি যাওয়ার জন্য হাওড়া, শিয়ালদহ বা কলকাতা থেকে ট্রেনে আসানসোল পর্যন্ত্য গিয়ে সেখান থেকে গাড়িতে যেতে হয় । আসানসোল থেকে বরন্তির দূরত্ব ৩৭ কিলোমিটারের মতো, যেতে ঘন্টাখানেক সময় লাগে ।

৩. গাড়ির রাস্তায় কলকাতা থেকে বরন্তির দূরত্ব ২৪০ কিলোমিটার - টানা গাড়িতে গেলে ঘন্টা চারেক লাগে । রাস্তা জানা না থাকলে যাওয়ার জন্য গুগ্‌ল্‌ ম্যাপের সাহায্য নেওয়াই সুবিধেজনক ।

৪. বরন্তিতে থাকার অনেক হোটেল বা রিসর্ট আছে তবে 'আরণ্যক বননিবাস'-এর কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । এখানকার ঘরভাড়া এবং খাবার খরচ বেশ কম এবং পরিষেবা অত্যন্তু উন্নতমানের । আরণ্যকের ওয়েবসাইট http://aaronnok.in/ থেকে এখানকার সম্পর্কে আরও তথ্য জানা যেতে পারে । যোগাযোগের নম্বর - 9830024052 / 8240283452 / 9836099007 / 8910398217.

৫. এখানে আলাদাভাবে খাবারের কোনও জায়গা নেই, হোটেল/রিসর্টের খাবারের উপরেই নির্ভর করতে হবে । এখানে প্রায় সব হোটেলেই প্যাকেজ সিস্টেমে সারাদিনের খাবার পাওয়া যায় ।

৬. বরন্তিতে ঘোরাঘুরির জন্য কোনও গাড়ির ব্যবস্থা করা দুষ্কর, তাই হোটেল থেকেই গাড়ির ব্যবস্থা করা শ্রেয় । কাছাকাছি যাতায়াতের জন্য টোটো বা রিক্সাও এখানে সহজে পাওয়া যায় না ।

৭. এখানে সেভাবে কোনও দোকানপাট নেই তাই সাধারণ দরকারি জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে যাওয়াই ভালো । এখানে মোবাইলের নেটওয়ার্ক বেশ ভালো, 4G-ও দিব্যি কাজ করে ।

৮. বরন্তিতে দেখবার একমাত্র জায়গা বরন্তি লেক । বিকেলের দিকে গেলে লেকের ওপরে সূর্য্যাস্তের দৃশ্য দেখতে খুবই ভালো লাগবে ।

৯. এখান থেকে গাড়ি নিয়ে শুশুনিয়া ও বিহারীনাথ পাহাড় দেখতে যাওয়া যেতে পারে । এই দু'টো পাহাড়েরই উপর পর্যন্ত্য হেঁটে ওঠা যায় ।

১০. বরন্তি থেকে ডে-আউটে গড়পঞ্চকোট, পাঞ্চেৎ, মাইথন, কল্যাণেশ্বরী মন্দির দেখে আসা যেতে পারে । তবে জায়গাগুলো কোনওটাই বরন্তি থেকে খুব কাছে নয় ।

১১. বরন্তি যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় হল শীতকাল, তাছাড়া বর্ষাকালে গেলেও ভালোই লাগবে । গরমের সময়ে না যাওয়াই ভালো।

উপসংহার ঃ

বরন্তি
কলকাতা থেকে দু'দিনের জন্য ঘুরে আসার পক্ষে বরন্তি একটা অত্যন্ত সুন্দর জায়গা । কলকাতা থেকে সামান্য দূরে অবস্থিত পুরুলিয়া জেলার এই গ্রামটার প্রধান আকর্ষণ হল এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ । চারপাশে পাহাড়, অদূরে বরন্তি লেক, গাছপালা, বনজঙ্গল, পাখির ডাক - এইসব মিলিয়ে এখানকার শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ আমাদের মতো শহুরে মানুষদের কাছে একটা বিরাট পাওনা । যারা বেড়াতে গিয়ে বিশেষ হৈ চৈ কোলাহল পছন্দ করে না, বরন্তি তাদের জন্য । যারা বেড়াতে গিয়ে নির্ঝঞ্ঝাটভাবে নিজের সঙ্গে দু'দন্ড সময় কাটাতে চায়, বরন্তি তাদের জন্য । যারা বেড়াতে গিয়ে এ'দোকান সে'দোকান ঘুরে কেনাকাটা করতে পছন্দ করে না, বরন্তি তাদের জন্য । কিন্তু তার মানে এই নয় যে বাকিদের বরন্তি গেলে ভালো লাগবে না । আসলে এই জায়গাটার বৈশিষ্ট্যই হল যে এখানে গেলে ভালো লাগতে বাধ্য । তাই যদি দিনতিনেকের জন্য কোথাও ঘুরে আসার জন্য মনটা উড়ু উড়ু করে, তাহলে বরন্তি নিঃসন্দেহে একটা দূর্দান্ত অপশন !

বরন্তি ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Sunday, January 31, 2021

ক্ষীরাই ভ্রমণ

ক্ষীরাই জায়গাটার নাম বছরখানেক আগেও জানতাম না। বারবার লক্‌ডাউন আর আন্‌লকের অনিশ্চয়তার জেরে ৩-৪ দিনের বেড়ানোর পরিকল্পনা করা যখন খুব কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন কাছাকাছির মধ্যে কোথায় ডে-আউট ট্রিপ করা যায় সেটা খুঁজতে গিয়ে ইউটিউবে ক্ষীরাই-এর সম্পর্কে একটা ভিডিও পেলাম। ক্ষীরাই পূর্ব মেদিনীপুর জেলার একটা গ্রাম যেখানে ফুলের চাষ হয়। এখানে বহুসংখ্যক সুবিশাল আকৃতির ক্ষেত আছে, যে ক্ষেতের ফুল পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের বিভিন্ন জায়গায় রপ্তানী করা হয়। ভিডিওটা বেশ তথ্যসমৃদ্ধ আর সবটা ভালো করে দেখে এবং সেইসঙ্গে নিজে ইন্টারনেটে কিছুটা ঘাঁটাঘাঁটি করে জায়গাটা সম্পর্কে মোটামুটি জেনে ফেললাম। তারপর প্ল্যান করা আর সেই প্ল্যানের এক্সিকিউশন। গন্তব্য ক্ষীরাই - আমার ব্লগের এবারের পোস্ট।

৩১শে জানুয়ারী, ২০২১ রবিবার - সকাল ৮টা নাগাদ গাড়ি নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোলাম আমরা ছ'জন অর্থাৎ আমি, অমৃতা, বাবা, মা, কথা, কলি। যাওয়ার পথে সোনামাসিকেও তুলে নিলাম। আমাদের যাত্রাপথ বিদ্যাসাগর সেতু - কোনা এক্সপ্রেসওয়ে - এন এইচ ১৬ - পাঁশকুড়া পুরাতন বাজার রোড - বাকিটা জিজ্ঞেস করে অথবা গুগ্‌ল্‌ ম্যাপ দেখে। বিদ্যাসাগর সেতু থেকে মোট রাস্তা ৮৫ কিলোমিটার। ধুলাগোড়ীর কাছে একটা পাঞ্জাবী রেস্ট্যুরেন্ট থেকে আলুর পরোটা দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে নিলাম।

দুপুর সাড়ে বারোটার একটু পরে লোকজনকে জিজ্ঞেস করে করে আমরা অবশেষে ক্ষীরাই পৌঁছলাম। এখানে জানিয়ে রাখি, ক্ষীরাই বলতে কিন্তু বিশেষ কোনও একটা জায়গা বা ফুলের ক্ষেতকে বোঝায় না। এখানে অনেক জায়গাতেই এই ক্ষেত দেখা যায়, তবে সবথেকে বেশি বিখ্যাত যে জায়গাটা সেটা হল রেলব্রীজের নিচে। শেষের পথটা বেশ সরু, দু'টো গাড়ি পাশাপাশি চলতে বেশ অসুবিধে হয়। যাই হোক, উঁচুনীচু পথ দিয়ে আমরা গন্তব্যে পৌঁছে ... একটা বড় ধাক্কা খেলাম !

রেলব্রীজের নিচে গাড়ির মেলা
এর আগে ক্ষীরাই সম্পর্কে যা জানা ছিল তাতে জানতাম জায়গাটায় খুব বেশি লোক যায় না। আমরা গিয়ে দেখলাম হাজার হাজার লোক ! জানলাম জানুয়ারী মাসের একটা রবিবারের আনন্দবাজার পত্রিকায় ক্ষীরাই সম্পর্কে একটা লেখা বেরিয়েছে আর তাতেই অনেকে জায়গাটার সম্পর্কে জানতে পেরেছে। আর আমাদেরই মতো এই লক্‌ডাউনে দূরে কোথাও যেতে না পেরে এখানে এসে জুটেছে। যতদূর চোখ যায়, ফুলগাছের চেয়ে মানুষের সংখ্যা বেশি। রেলব্রীজের নিচে যেন মেলা বসেছে। মেলা যে শুধু মানুষের তাইই নয়, গাড়িরও। পুরো জায়গাটায় যত গাড়ি এসে উপস্থিত হয়েছে তত গাড়ি শুধু রবিবার বিকেলে কলকাতার শপিং মলের পার্কিং লটেই দেখা যায় ! আর এখানে পার্কিং ম্যানেজ করার কেউ নেই, যে যার সুবিধেমতো গাড়ি রাখছে। আমরাও সেরকমই করলাম। ব্যতিক্রমই যেখানে নিয়ম, সেখানে আলাদা করে নিয়ম মানার চেষ্টা করা বৃথা (এটা দারুণ দিলাম, তাই না ? এটা একেবারে মৌলিক - আমার নিজস্ব - কপিরাইট প্রোটেক্টেড !)।

রেলব্রীজের পাশে গাঁদাফুলের ক্ষেত
রেলব্রীজটা আসলে কংসাবতী নদীর উপরে যদিও এখন নদীতে জল নেই। নদীর উপরেও অনেকে গাড়ি পার্কিং করেছে, ফেরিওয়ালারা নানারকম জিনিস নিয়ে বসে গেছে। রেলব্রীজের নিচ দিয়ে ব্রীজটা পেরিয়ে গেলে কয়েকটা বিশাল গাঁদাফুলের ক্ষেত রয়েছে, কিন্তু ভীড় দেখে আমরা আর সেদিকে এগোলাম না। বরং স্থানীয় লোকের কাছে জানা গেল এখান থেকে মিনিট দশেকের টোটো দূরত্বে আরেকটা এরকম বড় ক্ষেত রয়েছে, সেখানে চাইলে যাওয়া যেতে পারে। আমরা হেঁটে নদী পেরিয়ে ওপারে গিয়ে একটা টোটো ধরে গেলাম সেই ক্ষেতে।

চন্দ্রমল্লিকার ক্ষেত
এই ক্ষেতটা বিশেষ করে চন্দ্রমল্লিকার। সাদা হলুদ কমলা সবুজ ইত্যাদি নানারঙের চন্দ্রমল্লিকার দিগন্তবিস্তৃত ক্ষেত। এর মধ্যে সাদাটাই বেশি। দেখে মনে হয় সুবিশাল মাঠের মধ্যে যেন বরফ পড়েছে। এই ক্ষেতের মধ্যে ঢুকে গিয়ে ফুলের গায়ে হাত দিতে বারণ নেই, তবে সেটা না দেওয়াই ভালো। ক্ষেতের মধ্যে বাঁশের বেড়া দিয়ে পাঁচিল করা রয়েছে, তার মধ্যে দিয়ে হাঁটার পথ। আমরা হেঁটে হেঁটে ক্ষেতের অনেকটা ভিতরে চলে গেলাম। এখানেও লোকজনের সংখ্যা খুব কম নয়, তবে অনেকটা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ফুলের ক্ষেতের মধ্যে কয়েকটা স্থানীয় বাচ্চা ছেলেমেয়ে ফুলের মুকুট বিক্রি করছে। সরু তার দিয়ে ফুল গেঁথে তৈরি, দাম ১০/- টাকা। আমরা কয়েকটা কিনলাম।

ফুলের ক্ষেতে ফুলের মুকুট পরে ফুলেরা আর ফুলকি
ফুলের ক্ষেতে আমরা আরও কিছুক্ষণ কাটালাম, তবে এর বিবরণ আলাদা করে দেওয়ার আর কিছু নেই। ক্ষেতগুলো সব একইরকম, ফুলগুলো আলাদা। আরও কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে একজায়গায় দেখলাম ক্ষেতের মধ্যেই একটা ছাউনি ধরনের করে সেখানে একটা অস্থায়ী ভাতের হোটেল খুলে ফেলেছে। ক্ষীরাই এর ফুলের ক্ষেতের মধ্যে খাবারের ব্যবস্থা কিছুই নেই, তাই আমরা এখানেই দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। রান্না বেশ ভালো। ভাত, ডাল, ডিমের কারি, চিকেন ইত্যাদি নিয়ে খরচ হল ৩৫০/- টাকা।

রেললাইনের উপরে
খাওয়ার পরে আমরা আরও কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে টোটো ধরে রেলব্রীজের নিচ পর্যন্ত ফিরে এলাম। এই রাস্তাটায় কিছু গাড়ি নিয়ে চলাচল করা একেবারেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না কারণ এখানে রাস্তা পিচের নয় আর একটামাত্র গাড়িই চলাচল করতে পারে। উল্টোদিক থেকে একটা বাইক এসে গেলেও রাস্তায় যানজট হয়ে যাবে। রেলব্রীজের নিচে পৌঁছে আমি, কথা আর কলি একবার ব্রীজের উপরটা ঘুরে এলাম। এখানে পাশেই দক্ষিণপূর্ব রেলওয়ের ক্ষীরাই স্টেশন। এই লাইনে বেশ ঘনঘন ট্রেন চলাচল করে, কয়েকটা ট্রেন দেখারও সুযোগ হয়ে গেল।

দুপুর সাড়ে তিনটে বাজে, ক্ষীরাইতে আর কিছু করার নেই তাই আমরা গাড়ি নিয়ে ফেরার পথ ধরলাম। যে পথে যাওয়া, সেই পথেই ফেরা। ফেরার পথে কোলাঘাট পেরোনোর একটু পরে একজায়গায় দাঁড়িয়ে একটু চা খেয়ে নেওয়া হল। তারপর আবার বাড়ি ফেরার পথ ধরলাম।

সারসংক্ষেপঃ

১. কলকাতা থেকে ৮৫ কিলোমিটার দূরে পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় পাঁশকুড়ার কাছে একটা গ্রাম ক্ষীরাই। ফুলচাষ ও ফুলের রপ্তানীর জন্য এই গ্রাম বিখ্যাত।
২. ক্ষীরাই যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় হল ফ্রেব্রুয়ারীর মাঝামাঝি থেকে মার্চের মাঝামাঝি। এই সময়ে এখানকার ক্ষেতে অন্যান্যফুলের সঙ্গে গোলাপও দেখা যায়।
৩. গাড়ি করে যাওয়ার রাস্তা হল বিদ্যাসাগর সেতু - কোনা এক্সপ্রেসওয়ে - এন এইচ ১৬ - পাঁশকুড়া পুরাতন বাজার রোড। শেষের পথটা গুগ্‌ল্‌ ম্যাপ দেখে বা স্থানীয় লোককে জিজ্ঞেস করে যেতে হবে। 
৪. ট্রেনে গেলে হাওড়া থেকে দক্ষিণ-পূর্ব রেলওয়ের লোক্যাল ট্রেন ধরে (এক্সপ্রেস ট্রেন এখানে থামে না) পাঁশকুড়ার পরের স্টেশন ক্ষীরাইতে নামতে হবে। হাওড়া থেকে ক্ষীরাই ট্রেনে ১ঃ৫০ মিনিট সময় লাগে।
৫. গাড়ি অথবা ট্রেন যাতেই যাওয়া হোক, ঘুরে ঘুরে ফুলের ক্ষেত দেখার জন্য টোটো ভাড়া করে নেওয়াই ভালো। তাতে আরেকটা সুবিধে এই যে টোটোর ড্রাইভাররা ফুলের ক্ষেতের জায়গাগুলো ভালোভাবে চেনে।
৬. ক্ষীরাইতে নানারকম ফুলের বাগান আছে, যার মধ্যে গাঁদা আর চন্দ্রমল্লিকার প্রাধান্য বেশি। এখানে বিভিন্ন ফুলগাছের চারা বিক্রিও হয়।
৭. ক্ষীরাইতে খাওয়াদাওয়ার বিশেষ কোনও জায়গা নেই, তাই সঙ্গে অবশ্যই কিছু শুকনো খাবার রাখা উচিৎ। ছুটির দিনে ভিড় বেশি হলে এখানে কিছু অস্থায়ী খাবারের ব্যবস্থা হয় ঠিকই, কিন্তু তার উপর নির্ভর না করাই ভালো।

উপসংহারঃ

ক্ষীরাই
কলকাতার বেশ কাছে একটা ছোটখাটো ডে-আউট প্ল্যানের জন্য ক্ষীরাই বেশ ভালো একটা জায়গা। নানারকমের ফুলের ক্ষেতের সমারোহে জায়গাটায় একটা নয়নাভিরাম ব্যাপার আছে, সেটা বলতেই হবে। দিগন্তবিস্তৃত জমিতে যতদূর দু'চোখ যায়, মনে হয় নানারঙের চাদর বিছানো রয়েছে। যদিও এখানকার সৌন্দর্য প্রকৃতির স্বাভাবিক সৃষ্টি নয়, বরং বলা যায় প্রকৃতির দাক্ষিণ্যে মানুষের সৃষ্টি, কিন্তু তাও এখানকার সৌন্দর্য বিশেষ মনোরম। ক্ষীরাইতে অনেককিছু দেখার আছে তা নয়, তবে ঘোরাঘুরি করে সারাদিনটা বেশ কেটে যায়। গাড়িতে বা ট্রেনে যেভাবেই যাওয়া হোক, যাতায়াতের রাস্তাটাও বেশ সুন্দর। করোনার লক্‌ডাউনের মধ্যে বাড়িতে বসে থাকার একঘেয়েমি কাটানোর জন্য এখানে যাওয়া যেতেই পারে। আর করোনা পরবর্তী সময়েও এখানে একটা দিন কাটাতে ভালো লাগবে বলেই আমার ধারণা। তবে রবিবার বা ছুটির দিনগুলো এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করাই ভালো, কারণ 'মানুষ' জীবটা যতই প্রকৃতির সৃষ্টি হোক, ফুলের ভীড়ের মাঝে তাদের ভীড়টা শুধু অনভিপ্রেতই নয়, বিরক্তির উদ্রেককারীও বটে !

ক্ষীরাই ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Friday, January 22, 2021

কলকাতা ভ্রমণ : পর্ব - ৩ (বটানিক্যাল গার্ডেন)

'আচার্য্য জগদীশ চন্দ্র বোস ভারতীয় উদ্ভিদ উদ্যান' বা 'বটানিক্যাল গার্ডেন' জায়গাটা ভৌগলিকভাবে যদিও কলকাতার মধ্যে পড়ে না, কিন্তু কলকাতা ও হাওড়াকে একসঙ্গে যমজ শহর বলা হয় অর্থাৎ যা এখানকার তাইই ওখানকার । সেই কারণে বটানিক্যাল গার্ডেন ভ্রমণের কথা কলকাতা ভ্রমণের মধ্যেই লিখছি । হাওড়া জেলার শিবপুরে অবস্থিত এই বটানিক্যাল গার্ডেন ভারতবর্ষের মধ্যে শুধু বৃহত্তমই নয়, প্রাচীনতমও বটে । জায়গাটা আমার মাসির বাড়ির খুব কাছে হওয়ায় ছোটবেলায় বেশ কয়েকবার গিয়েছি । তারপর যা হয় - বড় হওয়ার পরে সেভাবে কখনও যাওয়া হয়ে ওঠেনি । করোনা পরিস্থিতির মধ্যে যখন ডে-আউট ট্রিপের মাধ্যমে নিজের শহরটাকে আরেকটু ভালোভাবে দেখে নেওয়ার কথা ভাবলাম, তখন সেই লিস্টে ওপরের দিকেই রাখা হল বটানিক্যাল গার্ডেনের নাম ।

গেট দিয়ে ভিতরে ঢোকার পর
২২শে জানুয়ারী, ২০২১ শুক্রবার । দুপুর বারোটা নাগাদ আমি, অমৃতা, বাবা, মা আর কথা-কলি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে বটানিক্যাল গার্ডেন পৌঁছলাম তখন সাড়ে বারোটা । গুগ্‌ল্‌ ম্যাপের যুগে পথনির্দেশ দেওয়া নিষ্প্রয়োজন শুধু এইটুকু জানিয়ে রাখি নিজেদের গাড়ি নিয়ে গেলে পার্কিং-এর জন্য বটানিক্যাল গার্ডেনের ১ নং গেটে যেতে হবে । কলকাতা থেকে গেলে দ্বিতীয় হুগলী সেতু পেরিয়ে আন্দুল রোড ধরে শিবপুরের ইন্ডিয়ান ইনিস্টিটিউট অফ্‌ ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (পূর্বতন শিবপুর বি ই কলেজের)-এর সামনে দিয়ে গিয়ে ১ নং গেটে গাড়ি পার্কিং করার জায়গা । এখানে ৫০ টাকা দিয়ে সারাদিনের জন্য গাড়ি পার্কিং করা যায় । পার্কিং করে আমরা ভিতরে ঢোকার টিকিট কাটলাম । টিকিটের দাম মাথাপিছু ১০/- টাকা (বাচ্চাদের টিকিট লাগে না)।

এখানে আরও একটা দরকারী তথ্য জানিয়ে রাখি । বটানিক্যাল গার্ডেন ভালোভাবে ঘুরে দেখতে কমপক্ষে ৪ - ৫ ঘন্টা সময় লাগে, তাই সঙ্গে খাবারদাবার ও পর্যাপ্ত পরিমাণ পানীয় জল রাখা ভালো কারণ ভিতরে এইদু'টোর কোনওটারই ব্যবস্থা নেই । গতবছরের আমফানের ফলে ভিতরের জল সরবরাহব্যবস্থা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বর্তমানে এখানে হাতধোওয়ার নূন্যতম জলের যোগানও নেই । যদিও বটানিক্যাল গার্ডেনের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে ভিতরে খাবার নিয়ে ঢোকার নিয়ম নেই, কিন্তু আমরা গেটের সিকিউরিটি গার্ডকে জিজ্ঞেস করেই সঙ্গে খাবার নিয়ে ঢুকেছি । ভিতরে বসে স্বচ্ছন্দে খাবার খাওয়া যেতে পারে, তবে এইটুকু খেয়াল রাখতেই হবে কোনওভাবেই যেন ভিতরের পরিবেশ নোংরা না হয় । আরও একটা কথা - রবিবার বা ছুটির দিনে এখানে কিছুটা ভীড় হয়, তাই সেরকম বাদ দিয়ে যেতে পারলে ঘুরতে সুবিধে হবে বলে আমার ধারণা ।

বটানিক্যাল গার্ডেনের ভিতরে
বটানিক্যাল গার্ডেনের ভিতরে ঘোরার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ করে দিচ্ছি না কারণ গাছপালা লতাগুল্ম ছোটবড় লেক জলাশয় বাগান গ্রিন হাউস মিলিয়ে ভিতরটা সবকিছুর একটা সাড়ে বত্রিশভাজা যেখানে এ বলে আমার দ্যাখ, ও বলে আমায় দ্যাখ ! আমি বটানির ছাত্র নই, আমাদের চারপাশের কিছু পরিচিত গাছপালার বাইরে খুব বেশি কোনও গাছ চিনি না কিন্তু আমি গাছ খুব ভালোবাসি আর সেই কারণে বটানিক্যাল গার্ডেনের পরিবেশ আমার কাছে খুবই চিত্তাকর্ষক । ভিতরের রাস্তা খুবই পরিপাটি আর জায়গায় জায়গায় টাঙানো ম্যাপ দেখে এগোতে কোনওই অসুবিধে হয় না । বিশেষ কিছু দেখার উদ্দেশ্যে নয়, পুরো জায়গাটা শুধু হাঁটতেই খুব ভালো লাগে (ভিতরে এমনিতেও কোনও যানবাহনের ব্যবস্থা নেই, কাজেই ঘোরার একমাত্র উপায় হল হাঁটা !)।

বিশাল বটবৃক্ষ (প্যানোরমিক ভিউ)

তবে একেবারে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে হাঁটা নয়, বটানিক্যাল গার্ডেনে এসে এখানকার বিখ্যাত 'বিশাল বটবৃক্ষ'টা দেখার আগ্রহ আমার সবসময়েই থাকে । যারা জানে না, তাদের উদ্দেশ্যে জানাচ্ছি বটানিক্যাল গার্ডেনের এই সুবিশাল বটগাছটা পৃথিবীর সবথেকে বড় বটগাছ । প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো এই গাছের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এর বিপুল সংখ্যক বায়বীয় মূল বা এরিয়াল রুট (উইকিপিডিয়া অনুযায়ী বর্তমানে এই মূলের সংখ্যা ৩,৭৭২)। পরপর দু'টো ঘূর্ণিঝড়ে এর মূল কান্ড ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার পর ১৯২৫ সালে এই মূল কান্ডটাকে সরিয়ে ফেলা হয় । কিন্তু তারপরেও গাছটি অনায়াসে বেঁচে রয়েছে এবং নিজের শাখা-প্রশাখা ও মূল বিস্তার করে চলেছে । দর্শকরা যাতে গাছের একেবারে কাছে যেতে না পারে সে'জন্য এই গাছের চারদিকে একটা লোহার জালঘেরা পাঁচিল করে দেওয়া হয়েছে এবং সেই পাঁচিলের চারদিকে একটা হাঁটার রাস্তা রয়েছে যার দৈর্ঘ্য ৩৩০ মিটার । গাছ অবশ্য এই পাঁচিলের বাইরেও নিজের ডালপালা বিস্তার করে চলেছে । দূর থেকে গাছটাকে একটা গাছের বদলে একটা ছোটখাটো বন বলে মনে হয় । আমরা গাছের কাছে গিয়ে ভালোভাবে দেখলাম ও ছবি তুললাম । বটানিক্যাল গার্ডেনে যাওয়ার একটা প্রধান আকর্ষণ যে এই 'বিশাল বটবৃক্ষ' দর্শন সেটা অস্বীকার করব না ।

গোলাপ বাগান
বটগাছ দর্শনের পরে ডানদিকে সামান্য কিছুটা এগোলে একটা ঘেরা জায়গায় গোলাপের বাগান । লাল, গোলাপী, হলুদ, সাদা ইত্যাদি নানারঙের গোলাপের এক অপূর্ব সমারোহ এই বাগান । এখানেও অত্যুৎসাহী জনতাকে ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হয় না, তাই বাইরে থেকে দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে ।





এই গোলাপ বাগানের কাছেই রাস্তার ধারে একটা জায়গায় বসে আমরা সঙ্গে আনা লুচি, আলুরদম, সীতাভোগ, মিহিদানা দিয়ে আমাদের দুপুরের খাওয়া সেরে নিলাম । এখানে জায়গায় জায়গায় ডাস্টবিন রয়েছে, তাই খাওয়ার পর আবর্জনা ফেলার জায়গার অভাব নেই । তাই আবারও বলছি যেখানে সেখানে জিনিস ফেলে নোংরা করা একেবারেই চলবে না ।

বটানিক্যাল গার্ডেন থেকে গঙ্গার দৃশ্য
খাওয়ার পরে আবার হাঁটতে শুরু করলাম । এবারে আমাদের উদ্দেশ্য গঙ্গার ধারে যাওয়া । বটগাছটা বাগানের একদিকে আর গঙ্গার ধারটা অন্যদিকে । এই দুইয়ের ব্যবধানটা হেঁটে মেটাতে আমাদের লাগল প্রায় চল্লিশ মিনিট । গঙ্গার ধারে বসার কয়েকটা জায়গা আছে, সেখানে আমরা কিছুক্ষণ বসে রইলাম । বিকেল পৌনে চারটে বাজে, সূর্য পশ্চিম আকাশে গিয়ে আজকের মতো দিনের ইতি ঘোষণা করার তোড়জোড় শুরু করেছে । গঙ্গার ওপরে আমাদের সামনে দিয়ে একটা লঞ্চ চলে গেল । ওপারে কলকাতার মেটিয়াবুরুজ এলাকায় কারখানার চিমনি থেকে ধোঁওয়া বেরোচ্ছে । আমরা যেখানে বসে আছি সেখানে গাছের পাতার শিরশির শব্দ আর পাখির ডাক ছাড়া কোনও অপ্রাকৃতিক শব্দ নেই । এই পরিবেশে চুপচাপ বসে বসে প্রকৃতির শোভা উপভোগ করতে খুব ভালো লাগে - মনটা চলে যায় কোনও এক সুদূর অতীতে - মনের মণিকোঠায় ঘুরেফিরে আসে কতই না পুরনো স্মৃতি !

ফেরার পথে
সম্বিৎ ফিরল (না এটা বাড়াবাড়ি হয়ে গেল, অতও কিছু আত্মনিমগ্ন হয়ে পড়িনি !) সিকিউরিটি গার্ডদের ডাকাডাকিতে । বটানিক্যাল গার্ডেন পাঁচটায় বন্ধ, চারটে থেকেই এরা লোকজনকে তাড়িয়ে বের করার কাজ শুরু করে । এত বড় জায়গায় এ'ছাড়া আর উপায় নেই । আমরা এদের সঙ্গে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করে বেরোনোর পথ ধরলাম । গঙ্গার ধারে যেখানে বসেছিলাম সেখান থেকে ১ নং গেটে পৌঁছতে আমাদের প্রায় আধঘন্টা সময় লাগল ।

বাগানের সময়সূচী
গেটের ঠিক পাশেই বাগান খোলা-বন্ধের সময়ের একটা ফলক লাগানো আছে । সময়ের তালিকাটা লেখার মধ্যে দেওয়ার বদলে এখানে সেই ফলকেরই একটা ছবি দিয়ে দিলাম (যদি কেউ বাংলা না পড়তে পারে তাহলে অন্ততঃ সে হিন্দী বা ইংরিজীতে বাগানের সময়সীমাটা দেখে নিতে পারবে যদিও বাংলা না পড়তে পারলে ব্লগটা পড়তে পারবে কিনা সেই নিয়ে আমার সন্দেহ আছে !)।


উপসংহারঃ

বটানিক্যাল গার্ডেন
১৭৮৭ সালে তৈরি এই বটানিক্যাল গার্ডেন প্রাথমিকভাবে মূলতঃ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে তৈরি হলেও পরবর্তীকালে জায়গাটা দেশবিদেশের গাছের সংগ্রহশালায় পরিণত হয় । বর্তমানে পৃথিবীর সাতটি মহাদেশের সবক'টির কিছু কিছু গাছের নমূনা রয়েছে এই বটানিক্যাল গার্ডেনে । শুধুমাত্র পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বটবৃক্ষের জন্য নয়, এই বটানিক্যাল গার্ডেনের সৌন্দর্য এর অসাধারণ প্রাকৃতিক পরিবেশে । গাছপালা লতাগুল্ম সম্বলিত এত সুবিশাল পরিবেশ আমাদের চারপাশে দুর্লভ - বিশেষ করে আমরা যারা শহরের 'জাংগল অফ্‌ কনক্রিট'-এর মধ্যে থাকি । কনক্রিটের জঙ্গল ছেড়ে উদ্ভিদের এই জঙ্গলে কয়েক ঘন্টা কাটানো আমাদের কাছে তাই এক অসামান্য অভিজ্ঞতা । যেদিকেই তাকানো যায়, শুধু সবুজের সমারোহ - চোখের পক্ষে এক অত্যন্ত আরামদায়ক অনুভূতি । এই অনুভূতির টানেই যাওয়া - প্রকৃতির হাতে কয়েকঘন্টার জন্য নিজেকে সঁপে দেওয়ার টান । এই টানটা যারা অনুভব করে, তাদের জন্য বটানিক্যাল গার্ডেন অবশ্য গন্তব্য !

বটানিক্যাল গার্ডেন ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.

Sunday, January 10, 2021

কলকাতা ভ্রমণ : পর্ব - ২ (স্বামীনারায়ণ মন্দির)

দশ দিন আগে নতুন বছর শুরু হয়েছে । আমাদের রাজ্যে তথা দেশে লক্‌ডাউন না থাকলেও করোনার অতিমারী পরিস্থিতি বর্তমান । এই পরিস্থিতিতে কোথাও বেড়াতে গিয়ে রাত্রিযাপন নিরাপদ নয় (যদিও চারপাশে অনেককেই এটা করতে দেখছি । সৌভাগ্যের বিষয় সেরকম কারুর সামাজিক সংস্পর্শে এখনও পর্যন্ত আমাকে আসতে হয় নি !), তাই আমরা ঠিক করেছি আপাতত শুধু ডে-আউট ট্রিপ করব । আর সেটা করার জন্য আমাদের প্রিয় শহর কলকাতার চেয়ে উপযুক্ত কিছু আছে কি ? তাও ভাবতে অবাক লাগে যে কলকাতা ভ্রমণের দ্বিতীয় পর্ব আজ লিখতে বসেছি, সেই কলকাতা ভ্রমণের পর্ব ১ লিখেছিলাম আজ থেকে প্রায় সাত বছর আগে ! সত্যিই, আমাদের এই প্রিয় শহরটার কত কি যে আজও আমাদের দেখা বাকি । এইরকম অদেখা দ্রষ্টব্যের লিস্টে একটা টিক্‌ দেওয়ার জন্য আমাদের এবারের সংক্ষিপ্ত ভ্রমণ - স্বামীনারায়ণ মন্দির ।

১০ই জানুয়ারী ২০২১, রবিবার । দুপুরের খাবার খেয়ে বাড়ি থেকে গাড়ি নিয়ে বেরোলাম আমি, অমৃতা, বাবা, মা আর কথা-কলি । কলকাতা থেকে ডায়মন্ড হারবার রোড ধরে জোকা পেরিয়ে অল্প কিছুদূর গেলেই স্বামীনারায়ণ মন্দিরের অবস্থান - আমাদের বাড়ি থেকে দূরত্ব ২৮ কিলোমিটারের মতো (রাজভবন থেকে দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার) । পৌঁছতে লাগল ঠিক এক ঘন্টা ।

পার্কিং লট থেকে স্বামীনারায়ণ মন্দির
স্বামীনারায়ণ মন্দিরটা ডায়মন্ড হারবার রোডের উপরেই । গেট দিয়ে ঢুকে সুবিশাল পার্কিংলটে ৪০ টাকা দিয়ে গাড়ি রেখে আমরা মন্দিরের দিকে গেলাম । শীতকালের রবিবার বিকেল - তাই মন্দিরে ভীড় হয়েছে ভালোই । তবে চত্বরটা বিশেষ বড় হওয়ায় আর লোকসমাগম প্রচন্ডরকমের না হওয়ায় ঠাসাঠাসিটা হয়নি । পার্কিং লট থেকে মন্দিরে যাওয়ার পথে চোখে পড়ল এখানকার খাবারের জায়গা । 


এখানে সেইসঙ্গে একটা তালিকা চোখে পড়ল যেটা আমি এর আগে কখনও কোনও মন্দিরে দেখিনি । তালিকাটা হল গো-পালনের অর্থদানের । সেই তালিকা অনুযায়ী সবচেয়ে কম একটি গরু একদিন পালনের জন্য দানের অর্থ ৫০০/- থেকে সবচেয়ে বেশি ২৫টি গরু একবছর পালনের জন্য ২১ লক্ষ টাকা দেওয়া যেতে পারে (আমি নিশ্চিত এর বেশিও দেওয়া যায় !)। 

মন্দিরের সামনের চত্বর
খাবারের জায়গাটা পেরিয়ে মূল মন্দিরের দিকে এগিয়ে গেলাম । পুরো জায়গাটা খোলামেলা হওয়াতে সুবিশাল মন্দিরটা সব জায়গা থেকেই দেখা যায় । মন্দিরের সামনে একটা বিরাট মার্বেলের চত্বর, সেখানে লোকজন ইতস্ততঃ ঘোরাঘুরি করছে । মূল মন্দিরে ছবি তোলা নিষেধ, তাই এখানে দাঁড়িয়ে মন্দিরকে ডাইনে বাঁয়ে ওপরে নিচে রেখে বা আদৌ না রেখে নানারকম অ্যাঙ্গেলে লোকজন ছবি বা সেল্‌ফি বা গ্রুপফি তুলছে । এখানে বসার জায়গা নেই, তবে চত্বরের দু'পাশে ইঞ্চিআটেক উঁচু আর ফুটখানেক চওড়া ছোট্ট পাঁচিলের মতো করা আছে, সেখানে চাইলে বসা যেতে পারে ।

মন্দিরে ওঠার সিঁড়ি
এই চত্বরটা যেখানে গিয়ে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে মূল মন্দিরের ওঠার সিঁড়ি । এখানে ওঠার আগে অবশ্যই জুতো খুলতে হয় আর এখান থেকেই ছবি না তোলার এলাকা শুরু । পুরো জায়গাটায় প্রচুর সংখ্যক সিকিউরিটি গার্ড আর সেইসঙ্গে মন্দিরের কর্মীরা রয়েছেন, তাই কারুর চোখকে ফাঁকি দিয়ে কিছু করার চেষ্টা না করাই ভালো ! আমরা সিঁড়ি দিয়ে মূল মন্দিরের উপরে উঠলাম । উপর থেকে চারপাশের দৃশ্য খুবই সুন্দর । পুরো জায়গাটা ফাঁকা হওয়াতে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায় । বিকেল পৌনে পাঁচটা বাজে, এখান থেকে অস্তগামী সূর্যের দৃশ্যও বেশ ভালো লাগল ।

এখানে পাশাপাশি তিনটে প্রকোষ্ঠে তিনরকম মূর্তি রয়েছে । একটাতে ভগবান স্বামীনারায়ণ ও অক্ষরব্রাহ্মণ গুণতিআনন্দ স্বামী, একটাতে শ্রী ঘনশ্যাম মহারাজ আর তৃতীয়টায় শ্রী হরিকৃষ্ণ মহারাজ ও শ্রী রাধাকৃষ্ণদেব । মূর্তিগুলো খুব সুন্দরভাবে কারুকার্য করা আর সাজানো । আমরা কিছুক্ষণ এখানে দাঁড়িয়ে আবার সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলাম ।

করোনা পরিস্থিতির জন্য কিনা জানি না, তবে মন্দির কর্তৃপক্ষ পুরো জায়গাটায় একমুখী জনতার স্রোত বজায় রেখেছে । অর্থাৎ আমরা যেদিক দিয়ে মন্দিরে উঠেছিলাম, সেদিক দিয়ে নামলাম না । নিচে নেমে বেরোনোর পথ মন্দিরের ভিতর দিয়ে । এখানে ভিতরের দেওয়ালে স্বামীনারায়ণ মহারাজের জীবনের নানারকম ঘটনাবলীর আঁকা ছবি টাঙানো রয়েছে । ঘরের মাঝখানে একটা কাচের ঘরের মধ্যে নীলকান্ত বর্ণির (ওরফে স্বামীনারায়ণ) একটা সোনার মূর্তি রয়েছে । এই ঘর ঘিরে দর্শনার্থীদের ভিড় রয়েছে । তাছাড়া এখানে মন্দির, স্বামীনারায়ণ ইত্যাদির সম্পর্কে বইও পাওয়া যায় । এখানেও ছবি তোলা নিষেধ, তাই আমরা কিছুক্ষণ দেখে বেরিয়ে এলাম ।

এখানে জানিয়ে রাখি মন্দির খোলা থাকার সময় সকাল ৭ঃ৩০ থেকে দুপুর ১২ টা এবং বিকেল ৪ টে থেকে রাত ৮ঃ১৫ । কিন্তু এর মাঝেও বিভিন্ন সময়ে মন্দির দর্শনের জন্য বন্ধ থাকে, তাই যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে মন্দিরের ওয়েবসাইট থেকে দর্শনের সময়টা জেনে নিয়ে যাওয়াই ভালো । বর্তমান সময়সূচীটা আমি এখানে দিয়ে দিলাম (সৌজন্যে মন্দিরের ওয়েবসাইট)।










সন্ধ্যের আলোয় স্বামীনারায়ণ মন্দির
মন্দিরের সামনের চত্বরে পৌঁছে আমরা আরও কিছুক্ষণ বসে রইলাম । সন্ধ্যে হয়ে গেছে, মন্দিরের আলোগুলো সব জ্বলে গেছে । এইসময়ে মন্দিরটা দেখতে বেশ সুন্দর লাগে । তাই যদি মন্দিরে বিকেলের দিকে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকে, তাহলে সন্ধ্যে পর্যন্ত অপেক্ষা করে তারপর বেরোলেই ভালো লাগবে । সন্ধ্যে ছ'টা নাগাদ আমরা মন্দির থেকে বেরিয়ে পড়লাম ।



উপসংহার ঃ

স্বামীনারায়ণ মন্দির
ঐতিহাসিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ না হলেও স্থাপত্যের নিদর্শন হিসেবে কলকাতার দর্শনীয় জায়গাগুলোর মধ্যে অন্যতম স্বামীনারায়ণ মন্দির । এর ভৌগোলিক অবস্থান এই জায়গাকে কিছু স্বাভাবিক বাড়তি সুবিধে দিয়েছে । নিজের গাড়ি নিয়ে গেলে যেমন এখানে পার্কিং-এর সুব্যবস্থা আছে, তেমনই পাবলিক ট্রান্সপোর্টে গেলে মন্দিরের গেটের একেবারে সামনে পর্যন্ত পৌঁছনোর সুবিধেও রয়েছে । এই মন্দিরের সবকিছুই ভীষণভাবে নিউ দিল্লীর অক্ষরধাম স্বামীনারায়ণের মন্দিরকে মনে করিয়ে দেয়, যদিও ওখানে কিছু বাড়াবাড়ি আছে যেগুলো এখানে নেই । এখানে না গেলে যে বিরাট কিছু অদেখা থেকে যাবে এমন নয়, কিন্তু সময় করে একদিন দেখে এলে ভালই লাগবে । পুরো জায়গাটা ঘুরে দেখতে ঘন্টাখানেকের বেশি লাগবে না আর আমার মনে হয় স্বামীনারায়ণ মন্দির আমাদের সে'টুকু সময় লগ্নি করার যোগ্য !

স্বামীনারায়ণ মন্দিরের নিজস্ব ওয়েবসাইট https://www.baps.org/Global-Network/India/Kolkata.aspx থেকে এখানকার সম্পর্কে আরও তথ্য জানা যেতে পারে ।