![]() |
| দার্জিলিঙ |
আমি ব্লগ লেখার খুব বেশি সমর্থক কোনওদিনও ছিলাম না, সত্যি কথা বলতে কি এখনও যে আছি তা নয় । তার একটা প্রধান কারণ আমার ধারণা ব্লগ লেখার থেকেও পড়া অনেক বেশি ক্লান্তিকর । অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অনেক সময়ই পড়তে শুরু করে শেষ করা হয়ে ওঠে না । নিজের ধৈর্য এবং/অথবা আগ্রহের অভাবকে 'ঠিক আছে, বাকিটা পরে পড়ব' জাতীয় অজুহাত দিয়ে ঢেকে দিই - আর আমরা সবাই জানি সেই 'পরে' টা আর কখনওই আসে না । তো, এই কারণে আমি ঠিক করেছি আমার ব্লগকে কখনওই অন্যের ক্লান্তির কারণ ঘটাব না, আমার ব্লগের বিষয় হবে প্রধানতঃ ভ্রমণ । আমার মতো যেসব বাঙালিরা ঘুরতে ভালোবাসে, তাদের জন্য আমার ব্লগ হবে তথ্যের একটা উৎস । আমার নিজের একটা অভ্যেস আছে, কোনও জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার আগে সেই জায়গাটা সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, আর ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে আমার বরাবরই মনে হয়েছে যে ইন্টারনেটে লেখালেখি করার ব্যাপারে বাঙালিদের থেকে কুঁড়ে খুব কম শিক্ষিত জাতই আছে । আমার মতো যেসব বাঙালিরা আছে, যারা ইন্টারনেটে কোনো একটা ইংরিজীতে লেখা দেখলেই না পড়ার চেষ্টা করে, তাদের জন্য আমার ব্লগ সহায়ক হবে, এই বিশ্বাস নিয়ে শুরু করছি আমার ভ্রমণকাহিনী । আগেই বলে রাখি, আমি স্ট্যাটিসটিক্সের ছাত্র ছিলাম, তাই আমার ব্লগে তত্ত্বের থেকে তথ্যের দেখাই মিলবে বেশি ।
Thursday, January 29, 2026
দার্জিলিঙ ভ্রমণ (দ্বিতীয়বার)
Sunday, January 25, 2026
দার্জিলিঙ হিমালয়ান রেলওয়ে ভ্রমণ
![]() |
| ওভারব্রীজ থেকে নামার সময়ে |
![]() |
| টয়ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে |
![]() |
| আমাদের ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ |
যাওয়ার পথটা আমার অনেকটাই চেনা। এর আগে বিভিন্ন সময়ে পাহাড়ে যাওয়ার জন্য শিলিগুড়ি শহরের বিভিন্ন রাস্তা ও রেলপথ দিয়ে গিয়েছি, তারমধ্যে অনেক সময়েই রাস্তার ধারে টয়ট্রেনের লাইন দেখতে পেয়েছি। কিন্তু এবারের দৃষ্টিভঙ্গিটা আলাদা - সেই টয়ট্রেনের লাইনের উপরে টয়ট্রেনে বসে শহরের রাস্তা, রেলপথগুলো দেখা। পুরোপুরি শহরের মধ্যে প্রায় পঁয়ত্রিশ মিনিট চলার পরে আমাদের ট্রেন পৌঁছলো তার প্রথম স্টপেজ - শিলিগুড়ি জাংশন-এ। এর আগে ডুয়ার্স ভ্রমণের সময়ে আমি অমৃতা কথা কলি এই স্টেশন থেকে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস ধরেছিলাম, তখন এখানকার টয়ট্রেনের স্টেশনটাও দেখেছিলাম। এবারেও দেখলাম তবে টয়ট্রেনের ভিতরে বসে। শিলিগুড়িতে ট্রেন থামল মিনিট পাঁচেক - কেউ ওঠানামা করল না, শুধু রেলের কিছু লোকজন ছাড়া। এখানে জানিয়ে রাখি এই টয়ট্রেনের টিকিট শুধুমাত্র নিউ জলপাইগুড়ি থেক দার্জিলিঙ অথবা দার্জিলিঙ থেকে নিউ জলপাইগুড়িরই কাটা যায়, অন্য কোনও স্টেশন থেকে নামা বা ওঠার টিকিট কাটা যায় না। চাইলে অন্য কোনও স্টেশন থেকে ওঠা যায় বা নামাও যায়, কিন্তু টিকিট পুরো জার্ণিটারই কাটতে হবে।
![]() |
| রেলপথের দুধারে জঙ্গল |
![]() |
| রাস্তার সঙ্গে চলেছে টয়ট্রেন |
![]() |
| রেলের Z-রিভার্স পথ (চিত্রঋণ ঃ গুগ্ল্ ম্যাপ) |
![]() |
| তিনধারিয়া স্টেশন |
![]() |
| কার্সিয়ং ছেড়ে এগিয়ে চলা |
![]() |
| টুং স্টেশন |
![]() |
| দার্জিলিঙ হিমালয়ান রেলওয়ে |
Thursday, January 1, 2026
মুরগুমা ভ্রমণ
ভ্রমণপথ ঃ
সোমবার ২৯শে ডিসেম্বর, ২০২৫ঃ সকাল ৭ঃ৪৫ মিনিটে কলকাতা থেকে গাড়িতে যাত্রা করে সন্ধ্যে ৬ টায় মুরগুমা - মুরগুমায় রাত্রিবাস।
মঙ্গলবার ৩০শে ডিসেম্বর, ২০২৫ঃ দুপুর ১২ টায় গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে সাইট সিয়িং - মুরগুমায় রাত্রিবাস।
বুধবার ৩১শে ডিসেম্বর, ২০২৫ঃ সকাল ১০ঃ৩০ মিনিটে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে সাইট সিয়িং - মুরগুমায় রাত্রিবাস ।
বৃহস্পতিবার ১লা জানুয়ারী, ২০২৬ঃ সকাল ১১ টায় মুরগুমা থেকে বেরিয়ে রাত্রি ৯টায় কলকাতা।
মুরগুমা জায়গাটার নাম আমি প্রথম শুনেছিলাম ২০০৮ সালে - আমার কয়েকজন কলিগ্ ওখানে বেড়াতে গিয়েছিল। তারপর এত বছর পরেও জায়গাটা সেরকম কিছু বিখ্যাত নয়, অনেকেই এখনও মুরগুমার নাম জানে না। যারা জানে না তাদের জন্য বলছি মুরগুমা আমাদের পশ্চিমবঙ্গের প্রান্তিক জেলা পুরুলিয়ায় অবস্থিত একটা গ্রাম। পুরুলিয়া জায়গাটা আমাদের খুবই ভালো লাগে - এর আগে দু'বার এসে বরন্তি আর গড় পঞ্চকোট ঘুরে গিয়েছি। তাই ডিসেম্বরের শেষে, যে সময়ে যেকোনও ট্যুরিস্ট স্পটেই লোকজন গিজগিজ করে, সেই সময়ে বেড়ানোর জন্য অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত এই জায়গাটার নামই মাথায় এল। কলকাতা থেকে ৩৫০ কিলোমিটার দূরে এই মুরগুমায় তিনদিনের ভ্রমণ নিয়েই আমার ব্লগের এবারের পোস্ট।
আমাদের এবারের দলের সদস্যরা হল আমি অমৃতা বাবা মা কথা কলি লালমাসি মেসোমশাই দিদিভাই রাজীবদা মাসিমা আর মেসোমশাই। এছাড়া জয়ন্তদা আর মানসীদি (মোমের শ্বশুরমশাই আর শ্বাশুড়ি মা) ভ্রমণের মাঝে আমাদের সঙ্গে একটা দিন কাটিয়ে গিয়েছিলেন। সেই হিসেবে আমাদের দলের সদস্যসংখ্যা ১২ + ২ = ১৪। সোমবার ২৯শে ডিসেম্বর, ২০২৫ সকাল ৭ঃ৪৫ নাগাদ আমরা আমাদের গাড়ি নিয়ে কলকাতা থেকে রওনা দিলাম। আমাদের প্রথম মীটিং পয়েন্ট ১৬ নং জাতীয় সড়কের উপর অঙ্কুরহাটি। এখানে আমরা দিদিভাইদের গাড়ির সঙ্গে মীট করলাম আর তারপর আরও এগিয়ে চললাম। এরপর আমরা লালমাসি আর মেসোমশাইকে মীট করলাম কোলাঘাটের কাছে।
এখানে জানিয়ে রাখি কলকাতা থেকে মুরগুমা যাওয়ার বেশ কয়েকটা রাস্তা আছে যার মধ্যে কলকাতা - ডানকুনি - ১৯ নং জাতীয় সড়ক - রানীগঞ্জ - মুরগুমা এই পথে গেলে ন্যূনতম সময় লাগে। কিন্তু যেহেতু লালমাসিরা আমাদের সঙ্গে যাওয়ার ছিল, তাই আমরা কলকাতা - কোনা এক্সপ্রেসওয়ে - ১৬ নং জাতীয় সড়ক - মেদিনীপুর - ৫ নং রাজ্য সড়ক - মুরগুমা এই পথে গিয়েছিলাম। এই পথে গেলে দূরত্ব প্রায় একই, তবে সময় কিছুটা বেশি লাগে।
লালমাসিরা গাড়িতে ওঠার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই আমরা দেউলিয়া বাজারের কাছে থামলাম ব্রেকফাস্ট করার জন্য। রেস্ট্যুরেন্টের নাম সন্দীপা। এখানে আলুর পরোটা আর ধোসা দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে নেওয়া হল। খাবারের মান বেশ ভালো। সবমিলিয়ে আমাদের খরচ পড়ল ১,১০০/- টাকা।
![]() |
| চলার পথে - একটু থেমে |
মুরগুমায় আমাদের বুকিং ছিল পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের 'মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টি'-তে। এখানে পৌঁছনোর পথের একেবারে শেষ অংশটার সম্পর্কে একটু বিস্তারিত লেখা দরকার। বেগুনকোদর থেকে ৩.৮ কিলোমিটার যাওয়ার পরে গুগ্ল্ ম্যাপ একটা জায়গায় ডানদিকে যেতে বলছিল (এখানে মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টি-র একটা তীরচিহ্নযুক্ত সাইনবোর্ডও আছে) কিন্তু এখানকার সাধারণ মানুষ আমাদের জানালেন এই পথটা একমুখী, অর্থাৎ ট্যুরিজম প্রপার্টি থেকে বেরোনোর সময়ে এই পথ ব্যবহার করা যায়, কিন্তু ঢোকার সময়ে করা যায় না। আমাদের আরও এগিয়ে 'বাঁধের রাস্তা' ধরতে হবে। সন্ধ্যে হয়ে গেছে, রাস্তায় কোনও আলো নেই, গাড়ির হেড্লাইটই সম্বল। রাস্তাটাও সরু। এই পথে ১ কিলোমিটার মতো চলার পরে ডানদিকে একটা হেয়ারপিন বেন্ড টার্ণ নিয়ে আমরা উঠে পড়লাম বাঁধের উপরে। এই বাঁধের উপরের রাস্তাটা রাতের অন্ধকারে রীতিমতো রোমাঞ্চকর কারণ আমাদের বাঁদিকে সুবিশাল মুরগুমা লেক আর ডানদিকের পাড় ঢালু হয়ে নেমে গেছে। রাস্তাটা বাঁধানোও নয়, সুরকির। সেইসঙ্গে বেশ সরু - এখানে পাশাপাশি দুটো গাড়ি চলতে পারে না। রাস্তায় কোনও আলোও নেই। এই পথে গাড়ি চালানোর সময়ে চালককে খুব সতর্কভাবে চালাতে হবে কারণ একটু অসাবধান হলেই হয় বাঁদিকে জলের মধ্যে ঝপাং আর নাহয় ডানদিকে ঢালুপথে গড়াম !
বাঁধের এই রোমাঞ্চকর পথে ১.৭ কিলোমিটার চলার পরে সন্ধ্যে ৬ টা নাগাদ আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের গন্তব্যে। জায়গাটা খুব সুন্দর আর বেশ বড়। গাড়ি পার্কিং-এর একটা আলাদা ছাউনি দেওয়া জায়গা আছে। রিসর্টের ঘরগুলোও বেশ বড় - ঘরের লাগোয়া একটা ছোট ব্যালকনি। আমরা আমাদের ঘরে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নিয়ে চা-টা খেয়ে নিলাম।
রাত সাড়ে নটা নাগাদ আমরা ডিনার করতে ডাইনিং এরিয়ায় গেলাম। রিসর্টটা দেখে এমনিতে ফাঁকা ফাঁকা লাগলেও আসলে এখানে সব ঘরেই গেস্ট রয়েছে - শুধুমাত্র প্রচন্ড ঠান্ডার কারণে সবাই ঘরের ভিতরেই রয়েছে। এটা আরও বেশি করে বুঝতে পারলাম ডাইনিং এরিয়ায় গিয়ে কারণ ভিতরটা পুরো ভর্তি। কিছুক্ষণ পরে জায়গা ফাঁকা হলে আমরা ডিনার করে নিলাম। ভাত-রুটি-ডাল-তরকারি-ডিম-চিকেন দিয়ে ডিনার করতে খরচ হল ২,৩৭৩/- টাকা।
পুরুলিয়ার তাপমাত্রা কলকাতার থেকে বেশ কিছুটা কম। রাতে সাড়ে দশটার সময়ে আমরা যখন ডাইনিং এরিয়া থেকে নিজেদের ঘরে ফিরছি, তখন রীতিমতো ঠান্ডা। এখানে মোবাইলের নেটওয়ার্ক সেভাবে কাজ করে না (কোনও সার্ভিস প্রোভাইডারেরই না), তাই যখন একটু আধটু নেটওয়ার্ক পাওয়া গেল, তখন দেখা গেল তাপমাত্রা ৭ - ৮ ডিগ্রির মতো।
![]() |
| মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টির ভিতরে |
![]() |
| ওয়াচ্টাওয়ারের উপর থেকে |
জয়ন্তদা আর মানসীদি পৌঁছলেন সাড়ে এগারোটা নাগাদ। ওনারা বেরোনোর জন্য তৈরিই ছিলেন, তাই ওনাদের মালপত্র ঘরে রাখা হয়ে গেলে আমরা সবাই একসঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম সাইটসিয়িং করতে।
পিটিডিরি ঝর্ণা - মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টি থেকে পিটিডিরি ঝর্ণার দূরত্ব মাত্র ১০ কিলোমিটার কিন্তু রাস্তাটা তেমন সুবিধের নয়। পাহাড়ী পথে জঙ্গল ও গাছপালার মধ্যে দিয়ে একটা সিঙ্গল লেন প্রচন্ডভাবে এঁকেবেঁকে এগিয়ে চলেছে - হঠাৎ করে উল্টোদিক থেকে গাড়ি এলে বেশ মুশকিলে পড়তে হয়। রাস্তাটা মোটামুটি ভদ্রস্থ হলেও জায়গায় জায়গায় বেশ ভাঙাচোরা আছে। গুগ্ল্ ম্যাপ দেখে ঝর্ণার কাছে পৌঁছতে আমাদের প্রায় ৩০ মিনিট লেগে গেল।
গাড়ি রাখার জায়গা থেকে ঝর্ণাটা আরও কিছুটা হেঁটে যেতে হয় আর সেই পথটা বেশ কিছুটা উঁচুনিচু। দু'একজায়গায় কিছুটা কসরৎও করতে হয়। পায়ের সমস্যা যাদের আছে, তাদের এই ঝর্ণা দেখতে না যাওয়াই ভালো।
![]() |
| পিটিডিরি ঝর্ণা |
![]() |
| মাচকান্দা ঝর্ণা |
মাচকান্দা ঝর্ণা থেকে আমাদের গন্তব্য ছিল খয়রাবেড়া ড্যাম। মাচকান্দা থেকে খয়রাবেড়া যাওয়ার দুটো রাস্তা আছে, একটা আমরা যে পথে পিটিডিরি থেকে এসেছি আর অন্যটা আমরা যেদিকে যাচ্ছি। এই সরু রাস্তায় গাড়ি উল্টোদিকে ঘোরানো প্রায় অসম্ভব ব্যাপার, তাই আমরা আরও এগোনোই ঠিক করলাম। রাস্তা দুদিক দিয়ে গেলেই প্রায় ২০ কিলোমিটারের মতো।
![]() |
| গ্রামের বাড়ির নক্সা করা দেওয়াল |
আবার সরু পাহাড়ী রাস্তা ধরে আমরা এগিয়ে চলেছি। দুধারে জঙ্গল। রাস্তা সারাক্ষণ ডানদিক বাঁদিকে ঘুরছে। রাস্তায় আমাদের তিনটে গাড়ি পরপর চলছে আর আমি শুধু গুগ্ল্ ম্যাপের উপর নির্ভর করে এগিয়ে চলেছি। রাস্তায় আর অন্য কোনও গাড়িও দেখা যাচ্ছে না। এইভাবে প্রায় একঘন্টা ধরে ১৬ কিলোমিটার চলার পরেও আমরা খয়রাবেড়া ড্যাম পেলাম না তবে একটা বেশ উঁচু ওয়াচ্ টাওয়ার দেখতে পেলাম।
![]() |
| খয়রাবেড়া ওয়াচ্ টাওয়ার |
এখানে জানিয়ে রাখি এইসব ভিতরের দিকের রাস্তায় বেশিরভাগ জায়গাতেই ফোনের নেটওয়ার্ক থাকে না বা থাকলেও ইন্টারনেট পাওয়া যায় না। তাই যদি গুগ্ল্ ম্যাপ দেখে ঘোরাঘুরি করার পরিকল্পনা থাকে, তাহলে একবার জিপিএস চালু করে আর কিন্তু ভুলেও সেটা বন্ধ করা যাবে না, তাহলে এই গোলকধাঁধায় পথ হারানোর সম্ভাবনা প্রবল। আর এখানে মানুষের যাতায়াত এতই কম, যে রাস্তা হারিয়ে ফেললে সঠিক রাস্তা বাৎলে দেওয়ার মতো কাউকে পেতে হলেও দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হতে পারে।
দুপুর প্রায় সাড়ে তিনটে বাজে, সবারই খিদে পেয়েছে কিন্তু এই পাহাড়-জঙ্গলের মধ্যে খাবার পাওয়া অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছিল। আর খাবার পাওয়ার মতো জায়গা এখান থেকে কতদূরে, সেটাও সঠিকভাবে জানার কোনও উপায় নেই। কিন্তু গাড়ি নিয়ে সামান্য দুতিন মিনিট এগোতেই আমাদের সামনে একটা জায়গা এসে পড়ল যেখানে কয়েকটা হোটেল রয়েছে। দেখে বুঝলাম এখান থেকে ডানদিকে খরয়াবেড়া ড্যাম যাওয়ার রাস্তা আর তাই এখানে এরা হোটেল খুলে বসেছে। খোঁজ নিয়ে জানলাম ভেজ থালি, এগ্ থালি, ফিশ থালি, চিকেন থালি সবই পাওয়া যাবে। ব্যাস, গাড়ি দাঁড় করিয়ে 'আক্রমণ !!!' বলে আমরা নেমে পড়লাম।
![]() |
| ডাইনিং এরিয়া |
এবার খয়রাবেড়া ড্যাম। খাওয়ার জায়গা থেকে ড্যামটা খুবই কাছে, গাড়ি চালিয়ে আমাদের মিনিট পাঁচেক লাগল। আর ড্যামের কাছে পৌঁছে দেখলাম যেন মেলা বসেছে ! এতক্ষণ রাস্তায় লোকজন দেখতে পাইনি, এখন মনে হল সব পর্যটকরা যেন এখানেই জড়ো হয়েছে। এরমধ্যে পুরুলিয়ার স্থানীয় বাসিন্দাও আছে। এমনই ভীড় যে গাড়ি পার্কিং-এর জন্য অনেকটা ভিতরে ঢুকতে হল। গাড়ি পার্কিং করে আমরা ড্যামটা দেখতে গেলাম।
![]() |
| খয়রাবেড়া ড্যাম |
এবার ফেরার পালা। খয়রাবেড়া থেকে যখন রওনা দিলাম তখন বিকেল সাড়ে পাঁচটা। বিকেল বলছি যদিও কিন্তু ডিসেম্বরের শেষে এই সময়টাকে বিকেল বলা চলেনা মোটেই, প্রায় অন্ধকার হয়ে গেছে। খয়রাবেড়া ড্যাম এলাকায় মোবাইলের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়, তাই আবার ম্যাপে জিপিএস ঠিক করে নিলাম। ম্যাপ যদিও বলছে এখান থেকে আমাদের রিসর্টের দূরত্ব ২৪ কিলোমিটার আর যেতে ঘন্টাখানেক লাগবে, কিন্তু সেই ২৪ কিলোমিটারের রাস্তাটা সকালের মতো অর্থাৎ পাহাড়ী আঁকাবাঁকা পথ, জনমানবহীন, জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এবং ফোনের নেটওয়ার্কবিহীন। এই রাস্তা দিয়ে রাত্রিবেলা ফেরাটা খুব বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তাই আমরা গুগ্লের নির্দেশিত পথে না গিয়ে কিছুটা অনুমানের উপর নির্ভর করে বুরদা বলে একটা জায়গায় পৌঁছলাম। সেখান থেকে করেং হয়ে ঝালদা-বাঘমুন্ডি রোড ধরে ঝালদা। সেখান থেকে বেগুনকোদর হয়ে মুরগুমা। সবমিলিয়ে রিসর্টে পৌঁছতে লাগল প্রায় দুঘন্টা আর ২৪ এর জায়গায় ৫০ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করতে হল। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে রাতের অন্ধকারে ঝালদা-বাঘমুন্ডি রোডের সৌন্দর্য মনমুগ্ধকর। আকাশে চাঁদের হাল্কা আলো, মাখনের মতো রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলেছে আর গাড়িতে চলছে হাল্কা মেলোডি। এককথায় অনবদ্য !
সন্ধ্যেবেলা রিসর্টে ফিরে একটু চা / কফি আর চিকেন পকোড়া খাওয়া হল। খরচ পড়ল ১,৮৭৪/- টাকা। রাতের ডিনারটা একটু স্পেশাল করা হল - ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন। সেই সঙ্গে পনীর বাটার মশালা ইত্যাদিও নেওয়া হল। সবমিলিয়ে খরচ হল ৩,১০৪/- টাকা। খাওয়ার পরে যে-যার কটেজে ফিরে এলাম।
বুধবার ৩১শে ডিসেম্বর, ২০২৫ আমাদের সাইটসিয়িং-এর দ্বিতীয় দিন। সকালে উঠে যথারীতি ব্রেকফাস্ট করতে গেলাম এবং যথারীতি পেট ঠেসে খেয়ে ফেললাম। সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ আমরা সবাই একসঙ্গে হোটেল থেকে বেরোলাম। জয়ন্তদা আর মানসীদি বাড়ির পথে রওনা হলেন আর আমরা সাইটসিয়িং-এর পথে।
গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে সেই জায়গাটায় এলাম যেখান থেকে হেয়ারপিন বেন্ড টার্ণ নিয়ে মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টিতে পৌঁছতে হয়। আজ সেখান থেকে টার্ণ না নিয়ে সোজা এগিয়ে একটা পাহাড়ী পথে উঠতে শুরু করলাম। মিনিট দশেক চলার পরে দাঁড়ালাম আমাদের প্রথম গন্তব্যে।
![]() |
| ভিউ পয়েন্ট থেকে মুরগুমা ড্যাম |
আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছলছলিয়া ঝর্ণা। মুরগুমা ভিউ পয়েন্ট থেকে গাড়িতে কুড়ি-পঁচিশ মিনিট চলার পরে এখানে পৌঁছনো যায়। ম্যাপ দেখে আমরা ঠিকই যাচ্ছিলাম, কিন্তু যেখানে পৌঁছলাম সেখানে একজন স্থানীয় লোককে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম ছলছলিয়া ঝর্ণা বর্তমানে আর দেখা যায় না, সেখানে দেখার মতো আর কিছু নেই। তাই এই জায়গাটা আমাদের ঘোরার লিস্ট থেকে বাদ দিতে হল। আমরা গাড়ি ঘুরিয়ে এগোতে শুরু করলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যে। এই যাওয়ার রাস্তাটা একেক জায়গায় বেশ খারাপ, পিচের রাস্তা ভেঙে গিয়ে রীতিমতো মাটির রাস্তা দিয়ে চলতে হয়। এখন শীতকাল বলে মাটি শক্ত, কিন্তু বর্ষাকালে এই রাস্তা দিয়ে আদৌ যাতায়াত করা সম্ভব কিনা জানিনা। কিন্তু এটাই একমাত্র রাস্তা, এছাড়া অন্য কোনও রাস্তাও নেই।
![]() |
| মার্বেল লেকের সামনে আমাদের কয়েকজন |
![]() |
| ময়ূর পাহাড়ের উপরে |
দুপুর আড়াইটে বাজে অর্থাৎ লাঞ্চ টাইম। এই জায়গাটা বেশ লোকবসতিপূর্ণ, কয়েকটা হোটেল বা রেস্ট্যুরেন্টও আছে। সেরকমই একটা জায়গা থেকে এগ থালি, ফিশ থালি আর চিকেন থালি দিয়ে লাঞ্চ করা হল। খরচ হল ১,৩৬০/- টাকা। এই হোটেল থেকেই জানলাম এখান থেকে খুব কাছেই একটা দেখার জায়গা আছে যেটা আমাদের লিস্টে নেই। জায়গাটার সম্পর্কেও কিছু তথ্য জানতে পারলাম। খাওয়ার পরে গাড়ি নিয়ে মিনিট পাঁচ-সাতেক চলার পরে পৌঁছলাম সেই দেখার জায়গায়।
![]() |
| সীতা কুন্ড |
আমাদের পরবর্তী গন্তব্য অযোধ্যা পাহাড়ের আপার ড্যাম। গুগ্ল্ ম্যাপ দেখে ৬ কিলোমিটার পথ কুড়ি মিনিটে অতিক্রম করে আপার ড্যামের কাছে পৌঁছলাম, কিন্তু পুলিশ এখান দিয়ে আমাদের ঢুকতে দিল না। জানলাম ড্যামে গাড়ির ভীড় খুব বেশি হওয়ার কারণে এখন এই রাস্তায় একমুখী যানচলাচল করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের ড্যামে যেতে গেলে পাহাড়ের নিচের দিকের রাস্তাটা দিয়ে ঢুকতে হবে। ম্যাপ দেখে বুঝলাম এ'জন্য আমাদের আরও ১৭ কিলোমিটার ঘুরতে হবে অর্থাৎ এখান থেকে ৭০০ মিটার দূরে যাওয়ার জন্য ১৭ কিলোমিটার বেশি ঘুরতে হবে। অগত্যা !
সীতা কুন্ড থেকে এখানে আসার সময়ে একটা মোড় পড়েছিল, তার নাম আপার ড্যাম মোড়। এখান থেকে আমরা এবার বাঁদিকের রাস্তা ধরলাম। এই রাস্তা একেবারে পাহাড়ী রাস্তার মতো অর্থাৎ প্রচন্ড ডানদিক বাঁদিকে ঘুরছে তবে রাস্তা যথেষ্ট চওড়া আর সেইসঙ্গে খুবই মসৃণ। আমরা কিছুটা উঠে কিছুটা নেমে পৌঁছে গেলাম অযোধ্যা পাহাড়ের লোয়ার ড্যামের কাছে। তারপর আবার পাহাড় বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করলাম। এই রাস্তা আমাদের চেনা, এর আগেরবার বরন্তি ও গড়পঞ্চকোট ভ্রমণের সময়ে এখান দিয়েই আপার ড্যামে পৌঁছেছিলাম।
![]() |
| আপার ড্যাম থেকে বছরের শেষ সূর্যাস্ত |
আমরা গাড়িতে উঠে এগিয়ে চললাম। আবার সেই জায়গাটা দিয়েই যেতে হল যেখান থেকে কিছুক্ষণ আগে ফিরে গেছি। আবার আপার ড্যাম মোড় থেকে আগের রাস্তাটা দিয়েই এগিয়ে চললাম। এইপথে মিনিট কুড়ি চলার পর পৌঁছলাম বামনি ঝর্ণার কাছে। একটু আগেই এখান দিয়ে গিয়েছি আর ভীড় দেখে গাড়ি থামাইনি। এবারেও পৌঁছে দেখলাম ভীড় বিশেষ কমেনি তাই গাড়ি থামালাম না, ফলে বামনি ঝর্ণা আমাদের সাইটসিয়িং-এর লিস্ট থেকে বাদ চলে গেল। আমরা আরও এগিয়ে চললাম।
![]() |
| তুর্গা ঝর্ণা |
তুর্গা ড্যাম - তুর্গা ঝর্ণা থেকে মিনিট পনেরো দূরে তুর্গা ড্যাম। কিন্তু সন্ধ্যে হয়ে আসছে, তাই আর গিয়ে খুব বেশি কিছু দেখা যাবে না বলে সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করলাম। কিন্তু আমরা যেখান দিয়ে রাস্তা থেকে তুর্গা ঝর্ণা দেখতে নেমেছি, সেখান থেকেই দূরে তুর্গা ড্যাম আবছা দেখা যাচ্ছিল। তাই এখান থেকেই যতটা সম্ভব দেখে নিলাম।
![]() |
| দোকানে নানান মুখোশের সমাহার |
![]() |
| সৃষ্টিরত শ্রষ্টা |
সন্ধ্যে সাতটা বাজে, এবার ফিরতে হবে। ম্যাপ বলছে এখান থেকে আমাদের রিসর্টের দূরত্ব ৩৪ কিলোমিটার আর রাস্তাটা অযোধ্যা পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে, অর্থাৎ যে পথে এখানে এসেছি। কিন্তু দিদিভাই এই রাতের অন্ধকারে পাহাড়ী পথ দিয়ে যেতে কিছুতেই রাজী নয়, অগত্যা উল্টোদিকের পথ ধরতে হল। সেই পথে রিসর্টের দূরত্ব ৫০ কিলোমিটার। সেই গতকালের পথই - করেং - ঝালদা - বেগুনকোদর হয়ে মুরগুমা। রাস্তাটা আজও আগেরদিনের মতোই ভালো লাগছিল। তবে আমি গাড়ি চালাতে চালাতে খেয়াল করলাম ঝালদা পেরনোর একটু পরে একটা রাস্তা ডানদিকে ঢুকে গেছে, সেটা দিয়ে গেলে বেগুনকোদর হয়ে যেতে হবে না আর ২ কিলোমিটার মতো কম হবে। কমটা বড় কথা নয়, একটা নতুন রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে, সেটাই বড় কথা। ঝালদা পেরিয়ে ঢুকে পড়লাম ডানদিকে - আমাদের গাড়ির পিছনে রাজীবদার গাড়ি।
রাস্তাটা অপেক্ষাকৃত সরু আর পিচেরও নয়, কংক্রিটের। রাস্তার দুধারে জঙ্গল। তবে রাস্তাটা পাহাড়ী নয়, সমতল। কিন্তু বেশ ভালোই আঁকাবাঁকা। কোথাও কোনও আলো নেই, বাড়িঘর নেই, মানুষজন নেই। হেডলাইটের আলোয় যা দেখা যায় সেই হিসেবেই গাড়ি চলছে কিন্তু ক্ষণে ক্ষণে রাস্তা বাঁক নেওয়ায় বেশি দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। মোবাইলের নেটওয়ার্ক না থাকলেও জিপিএস চালু রয়েছে। ম্যাপ বলছে এখান থেকে রিসর্টের দূরত্ব ৮.২ কিলোমিটার। রাস্তাটা এতই সরু যে এখান দিয়ে কেবলমাত্র একটা গাড়িই চলতে পারে। রাস্তার দুধারে মানুষ সমান উঁচু গাছ, ঘাস কিন্তু সেগুলো সমতল নাকি ঢালু হয়ে নিচে নেমে গেছে, সে'সম্পর্কে আমার কোনও ধারণা নেই। আমাদের পরপর দুটো গাড়ি চলেছে। মাঝে মাঝে ভাবছি যদি কোথাও পৌঁছে দেখি গাড়ি আর এগোনোর জায়গা নেই, তাহলে কী করব। এই রাস্তায় গাড়ি ঘোরানো যাবে না আর এই অন্ধকারে গাড়িকে পিছন দিকে চালানোও অত্যন্ত বিপজ্জনক।
এইভাবেই চলতে থাকলাম। গাড়ির ভিতরে গান চলছে না, কারণ এই রাস্তায় চালানোর সময়ে গভীর মনঃসংযোগের প্রয়োজন, গান চললে সেটা করা কঠিন। আমাদের গাড়ির বাকি যাত্রীদের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে গতকাল আমরা এই রাস্তা দিয়ে ফিরেছি নাকি ফিরিনি - এই বিষয় নিয়ে। যারা বলছে 'গিয়েছি' তারা খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে রাস্তার নানারকম গাছপালা ইত্যাদি দেখিয়ে বলছে "এই তো, গতকাল তো এটা এখানেই ছিল" আর অন্যরা ততটাই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলছে "এগুলো গতকালকের রাস্তায় ছিল না।" মজার ব্যাপার আলোচনাটা বাকিরা নিজেদের মধ্যেই করছে, আমাকে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করছে না, তাই আমি কোনও মন্তব্য করছি না। আমি একমনে গাড়ি চালিয়ে চলেছি। এইভাবে চলতে চলতে রাস্তা একসময়ে চওড়া হল আর আমরা একটা গ্রামের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। ঢুকেই আবার বেরিয়েও পড়লাম কারণ গ্রামটা খুবই ছোট - বাড়ির সংখ্যা বড়জোর ১০। আবার জঙ্গলের সরু রাস্তা শুরু হল। সবমিলিয়ে রাস্তাটা যে কিছুটা হলেও ভীতিপ্রদর্শক সেটা অস্বীকার করব না। একে রাতের অন্ধকার, তার উপর সরু রাস্তা, তার উপর রাস্তার দুপাশে কী আছে জানি না, তার উপর রাস্তার দৈর্ঘ্য খুব কম নয়, তার উপর রাস্তায় কোনও আলো নেই, তার উপর আমাদের ভরসা শুধুমাত্র গুগ্ল্ ম্যাপ যে অনেক সময়ে ভুল রাস্তাও দেখায় আর সবার উপরে আমাদের কারুর ফোনে কোনও নেটওয়ার্ক নেই।
যাই হোক, পথ দীর্ঘ হলেও পথের বর্ণনাও দীর্ঘ হতে হবে এমন কোনও কথা নেই। আরও কিছুটা এগোতে আবার লোকালয় দেখা গেল আর রাস্তাও চওড়া হল। এবার আমাদের গাড়ির লোকেরাও বুঝে গেল এই রাস্তা দিয়ে কাল ফেরা হয়নি। আর অল্প কিছুক্ষণ চলার পরেই আমাদের সামনে এসে পড়ল মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টির মেইন গেট। সবমিলিয়ে একটা চরম রোমাঞ্চকর জার্ণির সাক্ষী হয়ে রইলাম আমরা সবাই।
রাতে প্রথমদিনের মতো ভাত-রুটি-ডাল-তরকারি-ডিম-চিকেন দিয়ে ডিনার করলাম। খরচ হল ১,৩৬৫/- টাকা।
বৃহস্পতিবার ১লা জানুয়ারী, ২০২৬ - আমার ব্লগের সমস্ত পাঠকদের জানাই হ্যাপি নিউ ইয়ার ! সকালে উঠে ব্রেকফাস্ট করে চেক্আউট করে বেলা এগারোটা নাগাদ মুরগুমা থেকে রওনা দিলাম। সঙ্গে কিছু খাবারদাবার ছিল, গাড়ি চলতে চলতে সেইসবই খাওয়া হচ্ছিল। সেই কারণে দুপুরে অনেকেই আর লাঞ্চ করতে চাইল না। আমার আবার ওইসবে হয় না, ট্যাঙ্কে পেট্রোল কম থাকলে গাড়ি চলতে চায় না ! তাই আমি আর বাকিদের মধ্যে কয়েকজন একটা পথচলতি হোটেল থেকে লাঞ্চ করে নিলাম। খরচ হল ১,৩২০/- টাকা।
লাঞ্চের পরে আবার চলতে শুরু করলাম। যাওয়ার সময়ে যে পথে গিয়েছিলাম, সেই পথেই ফিরলাম। কোলাঘাটের কাছে মেসোমশাই আর লালমাসি নেমে গেল। অঙ্কুরহাটি থেকে দিদিভাইরা আলাদা হয়ে গেল। আমরা বাড়ি পৌঁছলাম রাত নটা নাগাদ।
সারসংক্ষেপ ঃ
১. কলকাতা থেকে দুতিনদিনের ঘোরার জন্য পুরুলিয়ার মুরগুমা একটা দূর্দান্ত ঘোরার জায়গা। বছরের যেকোনও ঋতুতেই এখানে যাওয়া যেতে পারে, তবে গরমকালে গেলে ঘোরাঘুরি করাটা কষ্ঠকর হবে।
২. কলকাতা থেকে মুরগুমা গাড়িতে যাওয়ার একাধিক রাস্তা আছে, তার মধ্যে ডানকুনি - দুর্গাপুর - রানীগঞ্জ হয়ে গেলে দূরত্ব ৩৪০ কিলোমিটার আর সময় সবথেকে কম লাগে। এছাড়া ডানকুনি - আরামবাগ - বিষ্ণুপুর অথবা কোলাঘাট - মেদিনীপুর - ঝাড়গ্রাম হয়েও যাওয়া যেতে পারে।
৩. ট্রেনে মুরগুমা যেতে হলে ঝালদা স্টেশন হয়ে যাওয়া যেতে পারে। তবে ঝালদা যাওয়ার ট্রেন খুব কম আছে বলে সবথেকে সুবিধেজনক হল মুরি স্টেশনে নেমে যাওয়া।
৪. মুরগুমায় থাকার অনেক হোটেল আছে, তার মধ্যে অবস্থানগত দিক থেকে সবচেয়ে ভালো পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের 'মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টি'। আমরা এদের ওয়েবসাইট https://wbtdcl.wbtourismgov.in/home থেকে বুকিং করেছিলাম।
৫. পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের অন্যান্য হোটেলের মতো মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টিতেও কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট দেয়। এখানে যা খাবার দেয় তা খেয়ে রীতিমতো পেট ভরে যায়। এখানকার রান্নার মান বেশ ভালো।
৬. মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টির কাছাকাছি আরও কিছু হোটেল আছে। এগুলো হাঁটাদূরত্বে তাই চাইলে সেখান থেকেও গিয়ে খাবার খাওয়া যেতে পারে।
৭. মুরগুমা থেকে সাইটসিয়িং করার মতো যে জায়গাগুলো আছে তার বেশিরভাগগুলোই অযোধ্যা পাহাড়ের এলাকায়। সাইটসিয়িং এর মধ্যে পিটিডিরি ঝর্ণা, খয়রাবেড়া ড্যাম, মুরগুমা ড্যাম, ময়ূর পাহাড় আর অযোধ্যা পাহাড়ের লোয়ার ও আপার ড্যাম অবশ্য দ্রষ্টব্য।
৮. শীতকালে পুরুলিয়ায় বেশ ঠান্ডা পড়ে। রাতের দিকে তাপমাত্রা ৪ - ৫ ডিগ্রিতেও নেমে যায়, তাই পর্যাপ্ত শীতপোষাক সঙ্গে রাখা দরকার।
৯. মুরগুমার বেশিরভাগ জায়গাতেই মোবাইলের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। তাই এটা মাথায় রেখে বাকি সব পরিকল্পনা করতে হবে।
১০. মুরগুমা ট্যুরিজম প্রপার্টির কাছাকাছি কোনও পেট্রোল পাম্প নেই, সবথেকে কাছেরটাও এখান থেকে ১১ কিলোমিটার। তাই গাড়ি নিয়ে গেলে এখানে ঘোরার সময়ে সুযোগমতো গাড়ির পেট্রোল ভরে নেওয়া ভালো।
উপসংহার ঃ
![]() |
| মুরগুমা ড্যাম |
ডেভেলপ্মেন্ট বা উন্নয়নের মানে যদি সভ্যতার বিকাশ মনে করা হয়, তাহলে তার অভাবটা পশ্চিমবঙ্গের জেলাগুলোর মধ্যে পুরুলিয়ায় সবথেকে বেশি। এর আগেও আমরা পুরুলিয়ায় গিয়েছি আর এই অভাবটা তখনও একইরকমভাবে চোখে পড়েছে। কিন্তু এটাকে আমি যে খুব নেতিবাচকভাবে দেখেছি, তা নয়। বিকাশের অভাব মানে যদি উঁচু উঁচু বাড়ি তৈরি না করা হয়, তাহলে বিকাশের অভাবই ভালো। বিকাশের অভাব মানে যদি গাছপালা কেটে শহর তৈরি না করা হয়, তাহলে বিকাশের অভাবই ভালো। বিকাশের অভাব মানে যদি পুকুর-জলাশয় বুজিয়ে না ফেলা হয়, তাহলে বিকাশের অভাবই ভালো। মানুষের যে প্রয়োজনগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে সভ্যতার বিকাশ ঘটে, এখানে এলে মনে হয় সেই প্রয়োজনগুলোই তেমন প্রকট নয়। আর তাই পুরুলিয়া আছে পুরুলিয়াতেই। মুরগুমাতেও এই ছবিটা আলাদা নয়। সেই কারণেই এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ আমার এত প্রিয়। মুরগুমা থেকে সাইটসিয়িং-এর কিছু কিছু জায়গায় গিয়ে মনে হয় যেন অতীত কালে চলে গিয়েছি কারণ আজ থেকে একশ' দুশ বছর আগেও এই জায়গাগুলো এইরকমই ছিল। আর এগুলোই আমার ভালো লাগে। আমার মতো এই অপরিবর্তনশীল সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ যাদের ভাল লাগে, তাদের একবার মুরগুমা ভ্রমণ অবশ্য কর্তব্য !
মুরগুমা ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.
Tuesday, October 14, 2025
জুলুক ভ্রমণ
বিশেষ সতর্কীকরণ ঃ
১. এই পুরো ভ্রমণে আমরা কোনও অবস্থাতেই কোনও পলিথিন বা প্লাস্টিক ব্যবহার করিনি। অর্থাৎ প্লাস্টিকের ব্যবহার না করেও এই ভ্রমণ অনায়াসে করা যায়।
২. এই পুরো ভ্রমণে আমরা কোনও কাগজ ব্যবহার বা নষ্ট করিনি। হোটেল বুকিং-এর রশিদ-এর প্রিন্ট আউট ব্যবহারের কোনও প্রয়োজন হয় না।
৩. এই পুরো ভ্রমণে আমাদের দলের কেউ ধূমপান করেনি। ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর।
আমার ব্লগের সমস্ত পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করছি প্লাস্টিক, অপ্রয়োজনীয় কাগজের ব্যবহার আর ধূমপান বর্জন করার জন্য।
ভ্রমণপথ ঃ
বৃহস্পতিবার ৯ই অক্টোবর, ২০২৫ঃ কলকাতা থেকে রাত্রি ৯ঃ৪৫ মিনিটে গুয়াহাটি গরীব রথ এক্সপ্রেস।
শুক্রবার ১০ই অক্টোবর, ২০২৫ঃ সকাল ৮ঃ৩০ মিনিটে - নিউ জলপাইগুড়ি - পদমচেন - পদমচেনে রাত্রিবাস।
শনিবার ১১ই অক্টোবর, ২০২৫ঃ পদমচেন থেকে জুলুকের সাইট সিয়িং - পদমচেনে রাত্রিবাস ।
রবিবার ১২ই অক্টোবর, ২০২৫ঃ সকাল ১০ঃ৩০ মিনিটে চেক্ আউট - গাড়িতে মানখিম - মানখিম-এ রাত্রিবাস।
সোমবার ১৩ই অক্টোবর, ২০২৫ঃ সকাল ৮টায় চেক্ আউট - নিউ জলপাইগুড়ি - সন্ধ্যে ৬ঃ২০ মিনিটে গুয়াহাটি ওখা এক্সপ্রেস - রাত্রি ৮ঃ১৫ মিনিটে বারসোই - রাত্রি ১০ঃ০২ মিনিটে রাধিকাপুর কলকাতা এক্সপ্রেস।
মঙ্গলবার ১৪ই অক্টোবর, ২০২৫ঃ সকাল ৬ঃ৩৫ মিনিটে কলকাতা।
জুলুক ভ্রমণের সম্পর্কে লেখার আগে একটু পূর্বকথন দিয়ে শুরু করা যাক। জুলুক যাওয়ার পরিকল্পনা আমরা প্রথম করেছিলাম ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে - যাওয়ার কথা ছিল ২০১৫ সালের জানুয়ারী মাসে। সেইমতো একটা ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে কথা বলা, তাদের অ্যাডভান্স করা - সবই হয়ে গিয়েছিল। তারপর নভেম্বর মাসে জানা গেল অমৃতা সন্তানসম্ভবা আর ডাক্তারের নির্দেশে অতদূরে বেড়াতে যাওয়া চলবে না। তাই ভ্রমণের পরিকল্পনা বাতিল করতে হল। তখন শুধু সন্তানের সম্ভাবনার কথাই জেনেছিলাম, কিন্তু কিছুদিন পরে ইউ এস জি-র রিপোর্ট থেকে জানা গেল সম্ভাবনাটা যুগ্ম-সন্তানের ! সেই যুগ্ম-সন্তান ভূমিষ্ঠ হল, ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল কিন্তু জুলুকের উচ্চতা আর ঠান্ডা সহ্য করার মতো বড়ো হতে সময় লাগে।
এতদিনে হয়েছে বলে আমার ধারণা। আর তাই পুনর্পরিকল্পনা করে ফেলা হল - জুলুক ভ্রমণের।
পুজোর ছুটিতে ট্রেনে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার ব্যাপারে সবথেকে কঠিন সমস্যা হল টিকিট পাওয়া। তাও আবার বিশেষ করে নিউ জলপাইগুড়ির টিকিট। শিয়ালদা বা হাওড়া থেকে টিকিট পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেইই দেখে আমি টিকিট কেটেছিলাম কলকাতা স্টেশন থেকে গুয়াহাটি গরীব রথ এক্সপ্রেসের। বৃহস্পতিবার ৯ই অক্টোবর, ২০২৫ আমাদের যাত্রা শুরু। আমাদের এবারের দল ১৫ জনের। আমি অমৃতা বাবা মা কথা কলি লালমাসি মেসোমশাই বুবুমাসি মেসোমশাই দিদিভাই রাজীবদা দিদি আনন্দদা আর পটাই। ট্রেন নির্ধারিত সময়েই ছাড়ল। দিদিভাইদের বাড়ি শ্রীরামপুরে, তাই ওরা কলকাতার বদলে ব্যান্ডেল থেকে ট্রেনে উঠল। সবাই ট্রেনে ওঠার পরে আমরা সঙ্গে নিয়ে যাওয়া রুমালি রুটি, চিলি চিকেন আর মিষ্টি দিয়ে ডিনার সেরে শুয়ে পড়লাম।
পরেরদিন শুক্রবার ১০ই অক্টোবর, ২০২৫ - আমাদের ট্রেন নির্ধারিত সময়ের একঘন্টা পরে আমাদের নিউ জলপাইগুড়িতে নামিয়ে দিল। আমরা ওয়েটিং রুমে গিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে নিয়ে স্টেশন থেকে বেরোলাম দশটা নাগাদ। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে শেষবার এসেছিলাম দুবছর আগে সিটং ভ্রমণ থেকে ফেরার সময়ে। বাইরে বেরিয়ে দেখলাম স্টেশন চত্বরের চেহারা বদলে গেছে। স্টেশনের বাইরে বিশাল কিছু একটা কর্মকান্ড চলছে, পুরো জায়গাটা জুড়ে নানারকম নির্মাণের কাজ হচ্ছে (পরে জেনেছি নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনকে আধুনিকীকরণ করা হচ্ছে যার ফলে এখানে বিশ্বমানের এয়ারপোর্টের মতো টার্মিনাল তৈরি হবে যেখানে অধিক সংখ্যক যাত্রীধারণ ক্ষমতাসমেত আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, বৃহত্তর পার্কিং এলাকা, সুদৃঢ় নিরাপত্তাব্যবস্থা, পরিবেশ বান্ধব ব্যবস্থাপনা থাকবে)। আর এই নির্মাণকান্ডের জন্য বর্তমান পার্কিং এলাকাটা স্টেশন থেকে বেশ কিছুটা দূরে চলে গেছে। মালপত্র নিয়ে এই দূরত্বটা হাঁটতে আমাদের প্রায় পনেরো মিনিট লাগল। তারপর দুটো গাড়িতে উঠে রওনা দিলাম আমাদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।
আমাদের যাওয়ার রাস্তা সেভক্ রোড ধরে। এই পথে এর আগে অনেকবার গিয়েছি আর রাস্তাটা আমার খুব পছন্দের। সমতলের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে রাস্তাটা যেন হঠাৎ করেই পাহাড়ে উঠে যায়। পাহাড়ী পথের বিবরণ আলাদা করে দেওয়ার কিছু নেই কারণ যারা এই দৃশ্য দেখেছে তাদের কাছে এর বিবরণ বাহুল্যমাত্র আর যারা দেখেনি তাদের কাছে বিবরণ দিয়ে এই সৌন্দর্য বর্ণনা করা যায় না। ব্রেকফাস্ট আমরা কলকাতা থেকেই সঙ্গে নিয়ে এসেছিলাম, গাড়ি চলাকালীন সেগুলোর সদ্ব্যবহার করে ফেললাম।
এবারের যাওয়ার পথের সম্পর্কে একটা তথ্য জানানোর দরকার, সেটা এখানে লিখে রাখি। গত বেশ কিছুদিন ধরেই উত্তরবঙ্গে প্রবল বর্ষণের কারণে বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এটা আমরা খবরের চ্যানেলের দৌলতে ভালভাবেই জানতাম। কিছু কিছু জায়গায় সেভক রোড 'ব্যাপকভাবে' ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যানচলাচলের অযোগ্য হয়ে গেছে শুনে একটা সময়ে আমাদের যাওয়া বাতিল করার কথাও ভেবেছিলাম। যাই হোক, 'পরিস্থিতি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে' - খবরের চ্যানেলের এইজাতীয় হেডলাইন সামনে আসার পর আমরাও যাওয়ার সিদ্ধান্ত অপরিবর্তিত রেখেছিলাম। আর সেটা না করলে যে কত বড় ভুল করতাম, সেটা যাওয়ার সময়ে বুঝতে পারলাম। পুরো রাস্তায় মাত্র চারজায়গায় এরকম হয়েছে যে ধসের কারণে রাস্তার একদিকটা ভেঙে গেছে বলে অন্যদিকের সিঙ্গল্ লেন দিয়ে দু'দিকের গাড়ি পালা করে চলছে। একইসঙ্গে মেরামতির কাজও চলছে। এজন্য আমাদের পৌঁছতে কিছুটা দেরি হলেও পৌঁছনো অসম্ভব ছিলনা। খবরের চ্যানেল, খবরের কাগজ বিভ্রান্তিমূলক খবর প্রচার করে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে কারণ তাতেই ওদের টি আর পি বাড়ে। কিন্তু এইসব ক্ষেত্রে ওদের উপর নির্ভর না করে স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে আসল পরিস্থিতিটা জানা যায়। যাওয়ার আগে আমরা ঠিক সেটাই করেছিলাম।
![]() |
| রেস্ট্যুরেন্টের পাশে তিস্তা |
এরপর একজায়গায় লাঞ্চের জন্য দাঁড়ানো হল। রেস্ট্যুরেন্টটা একেবারে তিস্তার ধারে। বারান্দা থেকে তিস্তার বাঁকের দারুণ সৌন্দর্য দেখা যায়। এখানে আমরা লাঞ্চ করলাম প্রধানতঃ মোমো আর থুক্পা দিয়ে, শুধু দুজন ভাত ডাল ইত্যাদি নিল। খরচ পড়ল ৩,৩৮০/- টাকা। আবার এগিয়ে চলা।
আমাদের গন্তব্য পূর্ব সিকিমের পদমচেন। আমাদের ভ্রমণ জুলুকের হলেও আমরা জুলুকে থাকিনি। কারণ জুলুক ইদানীং খুব বিখ্যাত হয়ে যাওয়ার কারণে এখানকার হোম্স্টেগুলোর একটু নাকউঁচু হয়ে গেছে। চার্জ বেশি আর পরিষেবা খারাপ। এইসব কারণে আমরা জুলুক থেকে ৫২ কিলোমিটার নিচে পদমচেনে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি পূর্ব সিকিমে পদম্চে নামেও একটা জায়গা আছে। গুগ্লে পদমচেন সার্চ করলে ঠিক জায়গাটাই দেখায়, কিন্তু সার্চটা গুগ্ল ম্যাপে করলে ওটা নিজে থেকেই পদম্চে-তে চলে যায় কারণ গুগ্ল ম্যাপে পদমচেন জায়গাটার নামের ইংরিজী বানান Phadamchen. অর্থাৎ ম্যাপে পদমচেনকে খুঁজতে গেলে ফদমচেন-কে খুঁজতে হবে ! এই ফদম্চেন পদমচেন যাওয়ার পথে আমরা দাঁড়ালাম আমাদের প্রথম সাইট্সিয়িং-এ।
![]() |
| শ্রী বিশ্ববিনায়ক মন্দির |
![]() |
| দেবাসুরের লড়াই |
আরও মিনিট চল্লিশেক চলার পরে আমরা দাঁড়ালাম রংলি বাজারে। এরপর আমরা যে এলাকায় ঢুকতে চলেছি সেটা সংরক্ষিত এলাকার মধ্যে পড়ে, তাই এখান থেকে আমাদের প্রোটেক্টেড এরিয়া পারমিট জোগাড় করতে হল। সাধারণতঃ গাড়ির ড্রাইভার রংলি থানা থেকে এই পারমিট সংগ্রহ করে। গাড়িপিছু খরচ ১,০০০/- টাকা। রংলি বাজার থেকে কিছুটা এগোনোর পরে একটা চেক্পয়েন্টে দাঁড়াতে হল। এটার কথা উল্লেখ করলাম কারণ এখানে আমাদের জোর করে একটা অক্সিজেন ক্যান কিনিয়ে ছাড়ল। উপরে উঠলে অক্সিজেনের অভাব ঘটতে পারে, বয়স্ক লোকদের অসুবিধে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি বলে। আমরা জানি এই অক্সিজেন ক্যান একটা একেবারে ফালতু জিনিস, এগুলোতে কিছুই থাকে না। কিন্তু না কিনলে ওরা যেতে দেবে না, তাই বাধ্য হয়ে ৬০০/- টাকা দিয়ে কিনতে হল। জুলুক যেতে হলে এই অক্সিজেন ক্যান জিনিসটা কলকাতা থেকে কিনে নিয়ে যাওয়াই ভালো। কারণ একে তো কলকাতার ওষুধের দোকান থেকে কিনলে জিনিসটা ঠিকঠাক হবে আর সেইসঙ্গে দামও কম পড়বে। সঙ্গে একটা ক্যান থাকলে এরা এদের ক্যান কেনার জন্য জোর করতে পারবে না।
![]() |
| কিউ খোলা ফলস্ |
আরও মিনিট পনেরো চলার পরে পৌঁছলাম আমাদের গন্তব্য - 'সাইলেন্ট উড রিট্রিট' হোমস্টে-তে। হোমস্টে-টা খুব বেশি বড় নয়, দুটো তলা মিলিয়ে বারোটা মতো ঘর যার মধ্যে চারটে সিঙ্গল রুম। হোমস্টেটা বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন - ঘরগুলো বেশ বড়। একপাশে রান্নাঘরের লাগোয়া ডাইনিং হল যেখানে একসঙ্গে ২৫ - ৩০ জন খেতে পারে। আমরা চেক্ইন করার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের পেঁয়াজের পকোড়া আর চা দিল। আর রাত সাড়ে নটায় ডিনার। ডিনারের মেনু রুটি, ডাল, আলুভাজা আর চিকেন। সাইলেন্ট উড রিট্রিটের রান্না বেশ ভালো। এইসব পাহাড়ী জায়গায় হোমস্টেগুলোতে সাধারণতঃ থাকা আর খাওয়া মিলিয়ে একটা প্যাকেজ হয়। আমাদের কার্সিয়ং ও সিটং ভ্রমণ-এর সময়ে সিটং-এও এই একই ব্যবস্থা ছিল। আর সবজায়গায় খাবারের মেনুও একই - ব্রেকফাস্টে পাঁউরুটি বা লুচি, লাঞ্চে ভাত ডিমের কারি, সন্ধ্যেবেলা পকোড়া আর ডিনারে রুটি / ভাতের সঙ্গে চিকেন।
শনিবার ১১ই অক্টোবর, ২০২৫ - আমাদের জুলুকের সাইট সিয়িং-এর দিন। আগেরদিন রাতেই হোমস্টের ম্যানেজার আমাদের বলে রেখেছিলেন যে আমাদের সকাল সকাল বেরোতে হবে, তা না হলে লাঞ্চের আগে ফিরতে পারব না। উপরে খাবারের কোনও দোকান নেই, তাই খাবার আগে আমাদের হোটেলে ফিরতে হবে। ব্রেকফাস্টে ম্যাগী খেয়ে সকাল আটটা নাগাদ আমরা রওনা দিলাম জুলুক-এর দিকে।
![]() |
| যাওয়ার পথে কাঞ্চনজঙ্ঘা |
![]() |
| জুলুকের বিখ্যাত জিগজ্যাগ রাস্তা |
প্রাচীনযুগ থেকে মধ্যযুগে এই সিল্ক রুট ছিল তিব্বত ও ভারতের মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ। মোটামুটিভাবে খ্রীষ্টপূর্ব দুশো থেকে পনেরোশো শতাব্দী পর্যন্ত এই পথে ভারত ও তিব্বত তথা চিনের মধ্যে বাণিজ্যিক আদানপ্রদান চলত আর জিনিসপত্রের মধ্যে অন্যতম প্রধান ছিল সিল্ক যা একসময়ে তিব্বত ও চিন থেকে সারা পৃথিবীতেই রপ্তানী হত। সেই সিল্ক আসার রুট-ই সিল্ক রুট নামে পরিচিত।
![]() |
| গাছপালাহীন রুক্ষ পাহাড় |
রাস্তা খুবই ভালো আর বেশ চওড়া। পুরো রাস্তায় ট্যুরিস্টের গাড়ির থেকেও যেটা বেশি চোখে পড়ে সেটা হল আর্মির গাড়ি। এই এলাকাগুলো চিনের সীমানার খুবই কাছে আর তাই এখানে নিরাপত্তারও খুব কড়াকড়ি। বেশ কয়েকটা আর্মি ব্যারাক-ও চোখে পড়ল। রাস্তায় দুজায়গায় আমাদের পারমিট চেকিং হল। কিছুক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছিলাম যে ঘুম ঘুম পাচ্ছে। গাড়িতে একটানা যাওয়ার সময়ে ঘুম পেতেই পারে, কিন্তু গাড়ির সবাই-ই একসঙ্গে ঘুমিয়ে পড়াটা একটু অস্বাভাবিক। কথা-কলি মাঝে মাঝে বলছিল পেট ব্যাথা করছে। এগুলো সবই ঘটছে এই উচ্চতায় অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে। আগেরদিনের কেনা অক্সিজেন ক্যানটা কোনও কাজের জিনিস নয়, তবে সঙ্গে যে অব্যর্থ জিনিসটা আছে সেটা হল কয়েকটা ছোট ছোট কৌটয় কিছুটা করে কর্পূর। এটা আমরা বাড়ি থেকেই নিয়ে এসেছিলাম উচ্চতার কথা মাথার রেখে। কর্পূরের কৌটর ঢাকনা খুলে মাঝে মাঝে একটু করে শুঁকলে অক্সিজেনের অভাবজনিত অসুবিধেগুলো থেকে সাময়িক আরাম পাওয়া যায়।
ঘন্টাদেড়েক এইভাবে চলার পরে আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের গন্তব্যে যেটা আমাদের এবারের ভ্রমণের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ বলা যেতে পারে। সেইসঙ্গে জায়গাটা আমার নিজের সর্বোচ্চ উচ্চতায় পদার্পণ - এত উঁচুতে আমি জীবনে কখনও উঠিনি (আঃ বিমানে চড়ে উঁচুতে ওঠার কথা এখানে ধরা হচ্ছে না !)। এখানে ভারত আর চিনের বর্ডার - এর উচ্চতা ১৪,১৪০ ফুট ! জায়গাটার নাম নাথুলা।
নাথু লা - নাথুলা-কে নাথুলা পাস বলা যেতেই পারে, কিন্তু বললে ভুল বলা হবে (অনুরূপ সংলাপ ঋণ - সৃজিত মুখার্জী পরিচালিত 'ইয়েতি অভিযান' সিনেমা) ! এর কারণ তিব্বতী ভাষায় 'লা' কথাটার মানেই পাস, তাই আলাদা করে আর পাস বলার কোনও দরকার নেই। শুধু নাথু লা।
![]() |
| নাথু লায় ওঠার সিঁড়ির পথ |
![]() |
| বর্ডারের সামনে - পিছনের বাড়িটা চৈনিক |
মোবাইলে তোলা নাথু লা-র চাতালের উপরের ছবিগুলোতে পরে একটা মজার জিনিস দেখলাম। ছবিগুলোর টাইমস্ট্যাম্প ছবি তোলার সময়ের থেকে ঠিক আডাই ঘন্টা এগিয়ে গেছে। অর্থাৎ আমাদের ছবি তোলার সময় বেলা ১১ঃ৩০ টা হয়ে থাকলে ছবির টাইমস্ট্যাম্প দুপুর ২ টো। এটা নিশ্চয়ই চিনের স্থানীয় সময়ের কারণে হয়ে থাকবে। চাতালের নিচের তোলা ছবিগুলোতে কিন্তু এটা নেই।
![]() |
| কুপুপ লেক |
![]() |
| বাবা মন্দিরের উপর থেকে নিচের দৃশ্য |
![]() |
| নাথাং ভ্যালি |
দুপুর দুটো বাজে, খিদেও পেয়েছিল। এখানে একটা মোমোর দোকান থেকে আমরা মোমো কিনে খেলাম। মোমো জিনিসটা এই অঞ্চলের একচেটিয়া আর এরা সবাই-ই জিনিসটা মোটামুটি একইরকম ভালো করে। আমি কলকাতায় অনেক জায়গায় মোমো খেয়েছি, কিন্তু এই দার্জিলিং-সিকিম এলাকার মোমোর মতো ভালো মোমো কলকাতায় প্রায় কোথাওই পাওয়া যায় না।
![]() |
| থাম্বি ভিউ পয়েন্ট |
হোমস্টেতে এসে পৌঁছলাম তখন দুপুর সাড়ে তিনটে। আগেই বলা ছিল আমরা ফিরে এসে লাঞ্চ করব, সেইমতো আমাদের খাবার চটপট রেডি করে দিল। খাওয়া শেষ করতে বিকেল হয়ে গেল। পাহাড়ে সূর্যাস্ত হয় তাড়াতাড়ি, সূর্য সামনের উঁচু পাহাড়ের ওদিকে চলে গেলেই আস্তে আস্তে অন্ধকার নেমে আসে। এখানে অন্ধকার হয়ে গেলে আর কিছু করার নেই, কিন্তু দল বড় হওয়ার কারণে সময় যে কোথা দিয়ে কেটে যায় বোঝা যায় না। গল্প করতে করতেই সন্ধ্যেবেলা চা-পকোড়া আর রাত্রিবেলা ডিনারে রুটি চিকেন খেয়ে নেওয়া হল।
এখানে একটা কথা অবশ্যই বলব আর সেটা হল জুলুক ভ্রমণ পরিকল্পনা করার সময়ে জুলুকের উচ্চতার কথা অবশ্যই মাথায় রাখা উচিৎ। নাথু লা-র ১৪ হাজার ফুট উচ্চতায় না উঠলেও জুলুকের উচ্চতাই কিন্তু ১০ হাজার ফুটের মতো। এরপরে পুরনো বাবা মন্দির, কুপুপ লেক, থাম্বি ভিউ পয়েন্ট - এদের উচ্চতা আরও বেশি। এই উচ্চতায় অক্সিজেনের অভাব ঘটতে বাধ্য। আমাদের দলের অনেকেই নাথু লায় পৌঁছে গাড়ি থেকে পর্যন্ত নামেনি এবং পুরো সময়টাই ঘুমিয়েছে। তাই বয়স্ক মানুষদের যাওয়ার আগে একবার ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে নেওয়াই ভালো। আর যেকোনও বয়সের লোকজনকে সঙ্গে অবশ্যই রাখতে হবে কৌটর মধ্যে কর্পূর, হোমিওপ্যাথি ওষুধ কোকা-৩০ আর সম্ভব হলে একটা অক্সিজেন ক্যান (ওখানকার লোক্যাল কেনা নয়, কলকাতা বা কোনও বড় শহর থেকে কেনা)।
![]() |
| পদমচেনের হোমস্টের সামনে পুরো দল |
![]() |
| আরিতার লেক |
এখানে একটা চায়ের দোকান থেকে চা আর মোমো খাওয়া হল। মোমো যথারীতি সুস্বাদু। তারপর আমরা রওনা দিলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের দিকে।
![]() |
| রেহ্নক মনাস্ট্রি |
রেহ্নক মনাস্ট্রি থেকে আমাদের থাকার জায়গা মিনিট পাঁচেকের পথ - নাম 'কাঞ্চনজঙ্ঘা মিরর হোমস্টে'। আমাদের গাড়ি আমাদের যেখানে নামালো, সেখান থেকে হোমস্টে-তে ঢোকার কোনও গেট খুঁজে পেলাম না। হোমস্টের ম্যানেজারকে ফোন করে আমাদের আগমনবার্তা জানানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি কয়েকজন লোক নিয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত হলেন। আর তাঁর থেকেই জানলাম এখান থেকে হোমস্টেতে পৌঁছতে আমাদের সিঁড়ি দিয়ে পাহাড়ী পথে কিছুটা উঠতে হবে। হোমস্টের একেবারে সামনে গাড়ি পৌঁছনোর রাস্তা নেই। এটা আমাদের দলের কয়েকজন বয়স্ক লোকের পক্ষে বেশ অসুবিধেজনক। কিন্তু কিছু করার নেই, এইভাবে ছাড়া কাঞ্চনজঙ্ঘা মিরর হোমস্টেতে পৌঁছনোর কোনও উপায় নেই। যদিও নিচ থেকে মালপত্র হোমস্টের লোকেরাই তুলেছে আর ওঠার সময়ে আমাদের পাশে তারা সবসময়েই থেকেছে, কিন্তু তাও বলব যদি সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠার ব্যাপারে কারুর বেশি সমস্যা থাকে, তাহলে কাঞ্চনজঙ্ঘা মিরর হোমস্টে বুকিং না করাই বাঞ্ছনীয়।
তবে এই একটা অসুবিধে বাদ দিলে কাঞ্চনজঙ্ঘা মিরর হোমস্টে-র মতো থাকার জায়গা আমি খুব কম দেখেছি। এর ঘর, প্রাকৃতিক দৃশ্য, খাওয়াদাওয়া, পরিষেবা, ম্যানেজার ও অন্যান্য কর্মচারীদের আন্তরিকতা - সবকিছুই অতুলনীয়। আপাতত খুব কম গেস্ট আছে, তাই ম্যানেজারমশাই প্রায় আট-দশটা ঘর আমাদের ছেড়ে দিয়ে বললেন নিজেদের পছন্দমতো ঘর বেছে নিতে। কোনও ঘরে দুটো বিছানা, কোনওটায় তিনটে, কোনওটায় চারটে, একটায় তো ছ'টা। আমরা আমাদের সুবিধেমতো ছটা ঘর বেছে নিলাম।
![]() |
| হোমস্টের ছাদ থেকে আরিতার লেক |
![]() |
| মোমো হাতে আমরা |
ডিনারে ভাত / রুটি আর চিকেনের পরিবর্তে এঁরা আমাদের ফ্রাইড রাইস আর চিলি চিকেন অফার করলেন। এরকম প্রস্তাবে কে আর অসম্মত হয় ? ডিনার করে যে যার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম।
সোমবার ১৩ই অক্টোবর, ২০২৫ - এবার পাহাড় থেকে নেমে আসার পালা। চেক্আউট করে হোমস্টে থেকে বেরোলাম সকাল আটটায়। আমরা আগেরদিনই খবর পেয়েছিলাম মেরামতির কাজের জন্য ১০ নং জাতীয় সড়কের একটা বড় অংশ তিনদিন বন্ধ থাকবে। এ'জন্য আমাদের গাড়িদুটোকে ৬০ কিলোমিটারের মতো বেশি ঘুরতে হবে আর সে'জন্য গাড়িপিছু আমাদের আরও ১,৫০০/- টাকা করে বেশি দিতে হবে। এই রাস্তা দিয়ে নামতে হলে পথে লাভা পড়ে, তাই আমি লাভা মনাস্ট্রিটা আমাদের ভ্রমণের মধ্যে যোগ করে দিলাম।
![]() |
| লাভা মনাস্ট্রি |
দুপুর দেড়টা নাগাদ আমাদের ড্রাইভাররা একজায়গায় থামল লাঞ্চ করার জন্য। আমরাও এখান থেকে রুটি-তরকারি, ফ্রায়েড রাইস, মোমো ইত্যাদি দিয়ে লাঞ্চ করে নিলাম। খরচ হল ৮২৫/- টাকা। নিউ জলপাইগুড়ি পোঁছতে প্রায় বিকেল চারটে বেজে গেল। গাড়ি যেখানে নামালো সেখান থেকে স্টেশনে পৌঁছনোর জন্য আবার মালপত্র নিয়ে ট্যাং ট্যাং করে পনেরো মিনিট হাঁটতে হল। তারপর স্টেশন থেকে রাতের খাবার কিনে নেওয়া হল। আমরা নিউ জলপাইগুড়ি থেকে সরাসরি ফেরার ট্রেনের টিকিট পাইনি, তাই আমাদের বারসোই হয়ে ব্রেকজার্নি করে ফিরতে হবে। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে আমাদের ট্রেন সন্ধ্যে ৬ঃ২০ মিনিটে গুয়াহাটি ওখা এক্সপ্রেস। সেই ট্রেনে বারসোই পৌঁছলাম রাত ৮ঃ২৫ মিনিটে। তারপর বারসোই স্টেশনে বসেই রাতের খাবারগুলো খেয়ে ফেললাম। বারসোই থেকে রাত ১০ঃ০২ মিনিটে রাধিকাপুর কলকাতা এক্সপ্রেসে উঠে মঙ্গলবার ১৪ই অক্টোবর, ২০২৫ সকাল সাড়ে ছটায় পৌঁছলাম কলকাতা স্টেশনে। ভ্রমণ শেষ !
সারসংক্ষেপ ঃ
১. পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়ার জন্য একটা বেশ পরিচিত জায়গা হল জুলুক বা সিল্ক রুট। পাহাড়ী পথে অনেকগুলো জিগজ্যাগ রাস্তার দৃশ্যের জন্য জুলুক বিশেষভাবে বিখ্যাত।
২. জুলুকে যাওয়ার সবথেকে ভালো সময় হল আগস্ট থেকে অক্টোবর মাস। আর জানুয়ারী থেকে মার্চ মাসের মধ্যে গেলে এখানে বরফে ঢাকা পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করা যাবে।
৩. জুলুক বেড়াতে গেলে জুলুকের হোমস্টেগুলোতে না থাকাই ভালো। কাছাকাছির মধ্যে থাকার জন্য পদমচেন একটা খুবই সুন্দর যায়গা।
৪. আমরা জুলুক ভ্রমণের পুরোটাই প্যাকেজ বুকিং করেছিলাম 'বোহেমিয়ান আগন্তুক' নামক ট্যুরিস্ট কোম্পানীর মাধ্যমে। এদের যোগাযোগের ওয়েবসাইট হল https://www.bohemianagantuk.com/ আর ফোন নম্বর 8910651295 / 9163017277. এদের ব্যবস্থাপনা খুবই ভালো এবং এরা আমাদের যে হোমস্টেগুলোয় থাকার ব্যবস্থা করেছিল, সেগুলোও যথেষ্ট ভালো। সেইসঙ্গে এদের রেটও যাকে বলে যথোপযোগী।
৫. হোমস্টের বুকিং সাধারণতঃ থাকা খাওয়া মিলিয়ে মাথাপিছু একটা প্যাকেজ হয়। খাওয়ার মধ্যে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চে ভাত / রুটি ডিমের কারি, সন্ধ্যের স্ন্যাক্স আর রাতে ভাত / রুটি আর চিকেন দেওয়া হয়ে থাকে।
৬. জুলুকের উচ্চতা বেশি হওয়ার কারণে এখানে গেলে অক্সিজেনের অভাবজনিত সমস্যাগুলো হওয়া স্বাভাবিক, তাই তার জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থাগুলো সঙ্গে নিয়ে যাওয়া দরকার। ছোট কৌটয় কর্পূর, হোমিওপ্যাথি ওষুধ কোকা-৩০ সঙ্গে রাখতেই হবে আর প্রয়োজন হলে যাওয়ার আগে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে নেওয়া ভালো।
৭. একেবারে চিনের বর্ডারে হওয়ার কারণে নাথুলায় যাওয়ার অনুমতি সবসময়ে পাওয়া যায় না। তাই যদি নাথুলায় যাওয়ার পরিকল্পনা থাকে, তাহলে আগে খোঁজ নিয়ে যাওয়া দরকার।
৮. জুলুকের লোক্যাল সাইটসিয়িং-এর সবকটা জায়গাই খুব সুন্দর, কোনওটাই বাদ দেওয়ার মতো নয়। নাথুলা-টা জুলুকের সাইটসিয়িং-এর মধ্যে পড়ে না, তার জন্য আলাদাভাবে পারমিট করাতে হয়।
৯. পদমচেন থেকে জুলুক ঘুরে আসতে সবমিলিয়ে সাত-আট ঘন্টা মতো লাগে। জুলুক বা নাথুলাতে কোনও খাবার হোটেল বা দোকান নেই, তাই সঙ্গে কিছু হাল্কা খাবার রাখা দরকার আর লাঞ্চ হোমস্টেতে ফিরে আসার পরে করতে হবে।
১০. মানখিম জায়গাটায় আরিতার লেক আর মনাস্ট্রি ছাড়া কিছুই দেখার নেই। কিন্তু এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য এখানে একটা রাত থাকা যেতেই পারে।
উপসংহার ঃ
![]() |
| জুলুক |
জুলুক ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here.
















































