আমি ব্লগ লেখার খুব বেশি সমর্থক কোনওদিনও ছিলাম না, সত্যি কথা বলতে কি এখনও যে আছি তা নয় । তার একটা প্রধান কারণ আমার ধারণা ব্লগ লেখার থেকেও পড়া অনেক বেশি ক্লান্তিকর । অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অনেক সময়ই পড়তে শুরু করে শেষ করা হয়ে ওঠে না । নিজের ধৈর্য এবং/অথবা আগ্রহের অভাবকে 'ঠিক আছে, বাকিটা পরে পড়ব' জাতীয় অজুহাত দিয়ে ঢেকে দিই - আর আমরা সবাই জানি সেই 'পরে' টা আর কখনওই আসে না । তো, এই কারণে আমি ঠিক করেছি আমার ব্লগকে কখনওই অন্যের ক্লান্তির কারণ ঘটাব না, আমার ব্লগের বিষয় হবে প্রধানতঃ ভ্রমণ । আমার মতো যেসব বাঙালিরা ঘুরতে ভালোবাসে, তাদের জন্য আমার ব্লগ হবে তথ্যের একটা উৎস । আমার নিজের একটা অভ্যেস আছে, কোনও জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার আগে সেই জায়গাটা সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, আর ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে আমার বরাবরই মনে হয়েছে যে ইন্টারনেটে লেখালেখি করার ব্যাপারে বাঙালিদের থেকে কুঁড়ে খুব কম শিক্ষিত জাতই আছে । আমার মতো যেসব বাঙালিরা আছে, যারা ইন্টারনেটে কোনো একটা ইংরিজীতে লেখা দেখলেই না পড়ার চেষ্টা করে, তাদের জন্য আমার ব্লগ সহায়ক হবে, এই বিশ্বাস নিয়ে শুরু করছি আমার ভ্রমণকাহিনী । আগেই বলে রাখি, আমি স্ট্যাটিসটিক্সের ছাত্র ছিলাম, তাই আমার ব্লগে তত্ত্বের থেকে তথ্যের দেখাই মিলবে বেশি ।

Monday, February 13, 2012

চাঁদিপুর ভ্রমণ

দীর্ঘদিন পরে আবার ব্লগকে আপডেট্‌ করার সময় এসেছে । এবার গেছিলাম চাঁদিপুর । উড়িষ্যা আর পশ্চিমবঙ্গের সীমানা থেকে ঢিল ছোঁড়া দুরত্বে এই জায়গা কাজের চাপ থেকে মুক্তির স্বাদ পেতে দু'দিনের ঘোরার পক্ষে খুবই উপযুক্ত । আমাদের পুরো বেড়ানোটাই একটা গাইডের কাজ করবে, তাই আমাদের বেড়ানোর নির্ভেজাল বিবরণ দিতে শুরু করি ।

ট্রেনে যাওয়ার পথে
১১ই ফ্রেব্রুয়ারী, ২০১২ শনিবার আমাদের যাত্রা শুরু । কে কে গেছিলাম, তা আর বিস্তারিতভাবে লিখছি না কারণ একটা বাচ্চাসহ আমাদের দলের মোট সদস্য সংখ্যা ছিল ৩৪ ! এর মধ্যে ২৭ জন আমাদের অফিসের আর বাকিরা কয়েকজনের পরিবারের সদস্য । ট্রেনে চাঁদিপুর যাওয়ার জন্য বালেশ্বরে নামতে হয় । হাওড়া থেকে বালেশ্বর যাওয়ার অনেক ট্রেন আছে, আমরা 'ধৌলি এক্সপ্রেস' ঠিক করেছিলাম । 2S এর ভাড়া ৮৫ টাকা । এটা সকাল ছ'টায় হাওড়া থেকে ছাড়ে । স্লিপার ক্লাস নেই, বসে যেতে হয় । দুরত্বটা খুবই কম, মাত্র ২৩৪ কিলোমিটার, কাজেই সবাই মিলে হৈ হৈ করতে করতে গেলে বসে যাওয়াটা কষ্টকর তো নয়ই, বরং আনন্দের । ট্রেনে দরকার মতো খাবারদাবার সবই ওঠে, এছাড়া IRCTC র নিজস্ব প্যান্ট্রিও আছে ।

OTDC র বাস
ট্রেন পৌঁছনোর কথা ০৯:২৬ এ, আর আমাদের ট্রেন একেবারেই দেরি করেনি । বালেশ্বর থেকে চাঁদিপুরের দুরত্ব ১৬ কিলোমিটারের মতো - এই পথটা যাওয়ার জন্য স্টেশন থেকে অনেক গাড়ি পাওয়া যায় । চাঁদিপুরে অল্প কিছু হোটেল আছে, তবে থাকার জন্য শ্রেষ্ঠ জায়গা Orissa Tourism এর 'পান্থ নিবাস' - এই পান্থ নিবাসের নিজস্ব pick and drop এর ব্যবস্থা আছে, এরাই আমাদের স্টেশন থেকে হোটেল পর্যন্ত নিয়ে গেল । মাথাপিছু ভাড়া ৫০ টাকা । কয়েকটা Bolero আর একটা ১৩ সীট্‌ এর সিটি বাস এ করে প্রায় ত্রিশ মিনিট চলার পর আমরা এসে পৌঁছলাম আমাদের গন্তব্যস্থল - চাঁদিপুর এর পান্থ নিবাসে ।

পান্থ নিবাস-এ পৌঁছে
হোটেল (হ্যাঁ, নাম যাইই হোক, সুবিধের জন্য হোটেলই বলছি । আর শেক্সপীয়ার তো বলেইছেন 'নামে কি আসে যায় ?') দেখে সবারই পছন্দ হল । হওয়ার মতনই । বিরাট হোটেল, বিশাল ব্যবস্থা । সবথেকে আকর্ষণীয় ব্যাপার হল সমুদ্রের নৈকট্য । এই অংশে বিচ্‌টা হোটেলের নিজস্ব, এখানে বাইরের কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না । হোটেলের গেট থেকে বিচ্‌ পর্যন্ত হেঁটে খুব বেশি হলে দু'মিনিট লাগে । হোটেলের গেটের সামনে নিজস্ব বাগান আর একটা ছোট্ট জলাশয় আছে, সেখানে আবার একটা কচ্ছপ আছে । হোটেলের সামনের দিকের ঘরগুলো AC Delux ইত্যাদি ইত্যাদি । বলা বাহুল্য এই ঘরের সবগুলো থেকেই সমুদ্র দেখা যায় । আমাদের ঘরগুলো সাধারণ 2 Bed বা 4 Bed ঘর, সেগুলো, স্বভাবতই, অপেক্ষাকৃত কম ঘ্যাম । 2 Bed এর ভাড়া ৮০০ টাকা আর 4 Bed এর ভাড়া ১,০০০ টাকা ।

হোটেলের গোলাকার ব্যালকনি
রিসেপশনের ফর্ম্যালিটি মিটিয়ে আমরা একে একে ঘর দখল করলাম । আমরা ৪ জন দোতলায় একটা ঘরে ছিলাম । হোটেলের আকৃতিটা অদ্ভুত রকমের গোলাকার । এরকম গোল হোটেল আমি এর আগে কখনও দেখিনি । ব্যালকনির সামনে হোটেলের একটা বেশ বড় মাঠ আছে, যেখানে দোলনা, স্লিপ ইত্যাদি আছে । এছাড়া কিছু ফুলের গাছও আছে । সবমিলিয়ে একটা শান্ত নিরিবিলি আর পরিচ্ছন্ন ভাব যেটা একটা জায়গাকে ভাল লাগার জন্য বেশ উপযোগী ।

হাঁটুজলে হাঁটাহাঁটি
পোশাক পরিবর্তন করে এবার সমুদ্রে ঝাঁপানোর পালা । আগেই বলে রাখি চাঁদিপুরের প্রধান আকর্ষণ কিন্তু সমুদ্রের ঢেউ বা সমুদ্রে চান করা নয় । (আকর্ষণটা কি, সেটা যথাসময়ে বলব) চান করতে গিয়ে দেখলাম জলে কোনও ঢেউ নেই বললেই চলে, গভীরতাও খুব কম । হাঁটু জলকে কোমর পর্যন্ত তুলতে প্রায় তিন-চারশ' মিটার হেঁটে ফেললাম, আর তারপর এক কিলোমিটার হেঁটেও সেই জল আর কোমরের ওপরে উঠল না ! (মনে হচ্ছিল হাঁটতে হাঁটতে আন্দামানও পৌঁছে গেলেও, জলের গভীরতা একই থাকবে !) ঘন্টাদুয়েক কোমরজলে ঘোরাঘুরি (এটাই সঠিক শব্দ) করে তারপর ফিরে এলাম । এরপর হোটেলে আরেকদফা চান ।

বিশাল ডাইনিং রুমে খাওয়াদাওয়া
পান্থনিবাসের নিজস্ব খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা আছে । ডিম, মাছ, মাংস সবই পাওয়া যায় । তবে variety খুব কম । মাছ বলতে পোনা বা পমফ্রেট আর মাংস বলতে শুধু মুরগী । পাঁঠার মাংস পাওয়া সম্ভব একমাত্র যদি সেটা ৩৪ জনের সবার জন্যই অর্ডার দেওয়া হয় । আমরা আর সে'চেষ্টা করিনি । আমাদের প্রথমদিন দুপুরের খাবার কলকাতা থেকেই অর্ডার দেওয়া ছিল, তাই সেই নিয়ে কোনও সমস্যায় পড়তে হয়নি । হোটেলের ডাইনিং হলটা বিরাট আর আমরা একটা বড় দল ছিলাম বলে আমাদের খাবার ওরা সবসময়েই ব্যুফে দিত । অর্থাৎ, মাছ বা মাংস নির্দিষ্ট পরিমাণে পাওয়া যেত, কিন্তু সেটা ছাড়া ডাল আলুভাজা তরকারি চাটনি পাঁপড় সবই অফুরন্তভাবে পাওয়া যেত । এখানে একটা কথা জানিয়ে রাখি, হোটেলের রান্নাকে চলনসই বললেই ঠিক বলা হয়, ভালোর পর্যায়ে পড়ে না । কিন্তু যেহেতু আমাদের হাতে আর কোনও বিকল্প নেই, কাজেই এতেই চালাতে হবে । খাবারের রেট হল - পোনামাছভাত ৯০ টাকা, মাংসভাত ১১০ টাকা ।

এরপর দুপুরে অনেকেই নিজের ঘরে চলে গেল । কিছু লোক সমুদ্রের ধারে বেড়াতে গেল আর আমরা কয়েকজন সামনের মাঠটায় গিয়ে বসলাম । এর আগে আরেকটা দরকারি কাজ সেরে আসা হয়েছে সেটা হল ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করে আমাদের দু'দিনের খাওয়াদাওয়া এবং ঘোরার একটা প্ল্যান করা । আমাদের এই ট্রিপের ম্যানেজার ছিল কঙ্কনাদি যার অসামান্য ভালো ম্যানেজমেন্ট স্কিল এই ট্রিপের সাফল্যের অন্যতম কারণ । আমি নিজে ছিলাম ফান্ড ম্যানেজার কাম অ্যাকাউনটেন্ট ।

বহুদূরে সমুদ্র
সমস্তকিছু নিখুঁতভাবে প্ল্যান করে আমরা গেলাম সমুদ্রের ধারে । কিন্তু কোথায় সমুদ্র ? দিগন্তরেখা পর্যন্ত যতদূর চোখ যায় শুধু বালি আর বালি ! সেই বালি কিন্তু নরম বালি নয়, শক্ত ভিজে বালি । হ্যাঁ, এটাই চাঁদিপুরের প্রধান আকর্ষণ । এখানে ভাঁটার সময়ে সমুদ্র পাড় থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে চলে যায় । পাড় থেকে আর জলের রেখা দেখাও যায় না । জোয়ারভাঁটার মধ্যে এই বিশাল পার্থক্যটা আমি যতদূর শুনেছি সারা ভারতবর্ষে আর কোথাও নেই, সারা পৃথিবীতেও আর শুধুমাত্র অস্ট্রেলিয়ায় এক জায়গায় আছে । বিকেল সাড়ে চারটে বাজে, সূর্য ক্রমশঃ দিগন্তের দিকে ঢলে পড়ছে, এর পরে হলে আর এই বিচে হাঁটা যাবে না, তাই আমরা কয়েকজন জলের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম । ৩ কিলোমিটার শক্ত বালির ওপর হেঁটে চলা সহজ নয়, আর মাঝে মাঝে গোড়ালি ডোবানো জমা জল কাজটাকে আরও কঠিন করে দেয়। তাও পাড় থেকে এক-দেড় কিলোমিটার মতো এগিয়ে আমরা আবার হোটেলে ফিরে এলাম ।

লে পাগলু ডান্স ডান্স ডান্স !
হোটেলে বিকেলে চা আর তার সঙ্গে পিঁয়াজি অর্ডার দেওয়া হয়েছিল । একপ্লেট পিঁয়াজি চারজনের জন্য যথেষ্ট, তবে আমরা ১ : ২ অনুপাতে অর্ডার দেওয়ায় অনেক বেশি হয়ে গেছিল । এরপর ঠিক হল এই মাঠের একটা অংশে Bonfire করা হবে । হোটেলের লোকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল যে তাদের কোনও অসুবিধে নেই । তারাই খুব কম সময়ের মধ্যে কাঠ আর music system এর ব্যবস্থা করে দিল । এর জন্য আমাদের মোট ৮০০ টাকা লাগল । ঘন্টাখানেকের মধ্যেই সবাই তৈরি হয়ে নিল 'সাংস্কৃতিক নৃত্যানুষ্ঠান'-এ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করার জন্য । আর তারপর - 'লে পাগলু ডান্স ডান্স ডান্স' !

পূর্ণচন্দ্র - রাত সাড়ে এগারোটা
আমি বিচ্‌ এ গিয়ে বসলাম । সাধারণতঃ সমুদ্রের ধারে বেড়াতে গেলে আমি সন্ধ্যেবেলা যতটা সম্ভব সময় একা বিচ্‌ এ বসে কাটানোর চেষ্টা করি, এবারেও সেটা করলাম । পাড়ে যে স্ট্রীটলাইটগুলো আছে, সেগুলোর রেঞ্জ খুব বেশি নয় । আমি বালির ওপর বসে ছিলাম আর তখন, আক্ষরিক অর্থেই ত্রিসীমানার মধ্যে কেউ নেই । হঠাৎ স্ট্রীটলাইটগুলো নিভিয়ে দেওয়া হল (দু'দিনের অভিজ্ঞতায় দেখেছিলাম ওগুলো ঠিক রাত ৮টার সময়ে নেভানো হয়) - যার ফলে চারপাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেল । আমার একটু সমস্যা হল কারণ আমি বসেছিলাম হোটেলের মেইনগেট থেকে কিছুটা দূরে, তাই মোবাইলের টর্চ জ্বেলে আস্তে আস্তে ফিরে এলাম । তারপর এমন একটা জায়গায় বসলাম যেখানে হোটেলের আলো কিছুটা হলেও এসে পৌঁছয় । রাত ন'টার সময়ে হোটেলে ফিরে এলাম । বলা বাহুল্য, তখনও 'অনুষ্ঠান' চলছে । এরপর সাড়ে দশটায় ডিনার । অর্ডার আগেই দেওয়া ছিল, আর আমাদের সুবিধের জন্য এবার ওরা খাবার মাঠেই সার্ভ করল ।সবকিছু মিটতে মিটতে এগারোটা বেজে গেল । তারপর আমরা অনেকে আবার বিচ্‌এ গিয়ে বসলাম । আমরা গেছিলাম পুর্ণিমার দু'দিন পরে, কাজেই পূর্ণচন্দ্রও দেখা গেল ।

হোটেলে ফিরলাম তখন বারোটা । পরেরদিন সকাল ছ'টা আঠারোয় সূর্যোদয়, ঠিকসময়ে অ্যালার্ম দিয়ে শুয়ে পড়লাম ।

সূর্যোদয়ের কিছুক্ষণ পরে
১২ই ফ্রেব্রুয়ারী, রবিবার সকাল ছ'টায় উঠে গেলাম বিচ্‌ এ । আকাশের অবস্থা দেখেই মনে হল সূর্যোদয় দেখা যাবে না, কারণ মেঘ করে ছিল । বেশ কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে চলে এলাম । হোটেল থেকে ঘরে ঘরে চা দেয় আর এই চা টা complementary । এরপর আমরা ব্রেকফাস্ট করলাম ডাইনিং হল-এ । এটাও complementary । ব্রেকফাস্টের দু'রকম option আছে, লুচি-তরকারি আর পাঁউরুটি টোস্ট ।

এরপর আবার সমুদ্র । আগেরদিনের থেকে নতুন কিছু নেই, তাই আর পুনরাবৃত্তি করছি না । বরং দুপুরে খাওয়ার পর ২ টোর সময়ে sightseeing করতে বেরোলাম, সেটার কথা বলি । এ'ক্ষেত্রেও হোটেল থেকেই গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছিল । পান্থ নিবাসের নিজস্ব গাড়িগুলো করেই আমরা ঘুরতে বেরিয়েছিলাম । ওরা মোট চারটে জায়গা দেখায়, ভাড়া মাথাপিছু ২৫০ টাকা ।

বুড়িবালাম এর তীরে
প্রথম গন্তব্য বুড়িবালাম । আমাদের হোটেল থেকে ৩ কিলোমিটার মত দূরে জায়গাটা আপাতভাবে একটা নদীর ধার - এখান থেকে মাছ ধরার ট্রলার ছাড়ে । ঐতিহাসিক গুরুত্ব হচ্ছে এখানে বিপ্লবী বাঘা যতীন (যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়) ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন । জায়গাটায় দেখার সেরকম কিছুই নেই, দশ মিনিটের বেশি সময় দেওয়ার কোনও মানেই হয় না ।

এই জলস্রোতের নিচেই পঞ্চলিঙ্গেশ্বর


পরবর্তী দেখার জায়গা পঞ্চলিঙ্গেশ্বর । ৪৮ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের ওপর মন্দির । যেতে সময় লাগল ১ ঘন্টা ২০ মিনিটের মতো । এখানে পাহাড়ের ওপরে উঠতে ২৮৬ টা সিঁড়ি (এটা আমাদের ড্রাইভার কাম গাইড বলল, আমরা কেউই গুনিনি) ভাঙতে হয় । তবে কাজটা সেরকম কঠিন কিছু না । সব জায়গাতেই বসার ব্যবস্থা আছে, কাজেই ওঠার ফাঁকে জিরিয়ে নেওয়া যেতে পারে । ওঠার পথের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে চোখ জুড়িয়ে যায় । পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানে একটা ছোট্ট ঝরনার জলের নিচে পাঁচটা শিবলিঙ্গ আছে (প্রকৃতপক্ষে পাঁচটা বিভিন্ন আকারের এবড়োখেবড়ো পাথর, সেগুলোকেই শিবলিঙ্গ বলা হয়) যেগুলো জলের নিচে থাকায় ওপর থেকে দেখা যায় না, শুধু 'হাত দিয়ে অনুভব' করা যায় । এখানে পুজো দেওয়ার ব্যবস্থাও আছে, যথারীতি ।

সেই বাঁদর - মাল লুট করার পরে
নামার সময়ে একটা ঘটনা ঘটল যেটার জন্য আমরা কেউই তৈরি ছিলাম না । আমাদের দলের সঙ্ঘমিত্রার হাতের প্যাকেটে পুজোর প্রসাদ (প্রধানতঃ কলা) দেখে হঠাৎ একটা বাঁদর ওকে আক্রমণ করল । ব্যাপারটা এতটাই দ্রুত ঘটল যে কেউ কিছু react করার আগেই দেখা গেল প্যাকেট বাঁদরের কব্জায় ! আশেপাশের স্থানীয় লোকজনের প্রতিক্রিয়া দেখে বুঝলাম এরকম ঘটনা ওখানে নতুন নয় । তাই যাদের হাতে পুজোর প্রসাদ থাকবে, তাদের বলছি 'সাবধান' !

নীলাগিরির মন্দির
এরপর নীলাগিরি । দুরত্ব ১০ কিলোমিটার, যেতে লাগল আরও ২০ মিনিট মতো । এখানে একটা জগন্নাথের মন্দির আছে আর তার পাশে আছে এখানকার রাজার বাড়ি । বাড়ির কিছুটা অংশ ভাঙ্গা - পোড়োবাড়ির মতো, আর কিছুটা অংশ মেরামত করে এখনকার রাজা থাকেন । আমাদের দলের কয়েকজন 'রাজার সঙ্গে দেখা করে আসি' বলে সেদিকে এগিয়েছিল, কিন্তু ব্যাপারটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে বলে তাদের নিরস্ত করা হল । এই রাজবাড়ির পাশেই আছে নীলাগিরি পাহাড়, যেটার একেবারে ওপরে না হলেও অনেকদূর পর্যন্ত ট্রেকিং করে ওঠা যায় ।

শ্রী চৈতন্যদেবের পায়ের ছাপ - এটা আসল
সন্ধ্যে প্রায় ছ'টা বাজে । নীলাগিরির সামনে কিছু চায়ের দোকান আছে । আমরা চা-টা খেয়ে নিয়ে এগিয়ে গেলাম আমাদের পরবর্তী তথা শেষ গন্তব্য - রেমুনা । ৯ কিলোমিটার দুরত্ব, ৩০ মিনিট লাগল । এখানকার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানেও একটা জগন্নাথের মন্দির আছে । এই মন্দিরে শ্রী চৈতন্যদেবের দু'জোড়া পায়ের ছাপ রাখা আছে - একটা আসল আরেকটা নকল । ('নকল পায়ের ছাপ ব্যাপারটা আসলে কি, বুঝলাম না । তবে দলের সকলকে বলা হল 'নকল হইতে সাবধান' !) এখানকার সবথেকে বড় আকর্ষণ হল এখানে অত্যন্ত (পড়ার সময়ে 'অত্‌ত্‌ত্‌ত্যন্ত' পড়া উচিৎ !) উৎকৃষ্ট মানের ক্ষীর পাওয়া যায় । দাম ১০ টাকা, ২০ টাকা আর ৪০ টাকা । আমরা বেশ কিছু কিনলাম । কিছু বাড়ি নিয়ে আসার সঙ্কল্প করা হল আর কিছু ফেরার পথেই খেয়ে নেওয়া হল ।

ব্যালকনি থেকে
Sightseeing শেষ । এরপর সোজা হোটেল । ঘড়ি বলছে সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা । সারাদিন ঘোরা হয়েছে, তবে সেরকম কিছু পরিশ্রম হয়নি । তাই লোকজনের প্রবল উৎসাহে হোটেলে ফিরে এসে আবার নাচানাচির ব্যবস্থা করা হল । তবে আজ আর আগুন জ্বালানো হল না, শুধু music system ভাড়া করে নাচা হল । রাত সাড়ে দশটায় ডিনার । আজ আমাদের চাঁদিপুরে শেষ রাত্রি, তাই ডিনারে বিশেষ মেনু রাখা হয়েছিল । মিক্স্‌ড ফ্রাইড রাইস, মিক্স্‌ড চাউমিন আর চিলি চিকেন । যারা চিকেন খায় না তাদের জন্য চিলি পনীর । এর রেট ছিল ১২০ টাকা করে ।

বেড়ানোর (এবং post এর ও !) মোটামুটি শেষের দিকে চলে এসেছি, কাল সকালেই আমরা এখান থেকে পাততাড়ি গোটাব, তাই ডিনারের পরে ম্যানেজারের সঙ্গে formality গুলো সেরে নিলাম । যাবতীয় হিসেবপত্র করে full and final payment করতে একঘন্টা সময় লাগল । তারপর কিছুক্ষণ বিচ্‌ এ গিয়ে বসলাম । হোটেল থেকে বিচ্‌ এ যাওয়ার পথে যে লোহার গেটটা আছে সেটা রাত একটায় বন্ধ হয়, আর বন্ধ হলেও সেটা টপকে অনায়াসে যাতায়াত করা চলে ।

ঝাউবন
১৩ই ফ্রেব্রুয়ারী, সোমবার - আমাদের ফেরার দিন । সকালে আরেকবার সূর্যোদয় দেখার ব্যর্থ চেষ্টা করে আমরা বিচ্‌ ধরে হাঁটতে শুরু করলাম । প্রায় তিন কিলোমিটার হাঁটার পর একটা ঝাউবন পড়ে যেটা বেশ সুন্দর । চাঁদিপুরের বিচ্‌ এ আরেকটা জিনিস অফুরন্ত পাওয়া যায়, সেটা হচ্ছে গোটা ঝিনুক । বিভিন্ন আকারের বিভিন্ন রঙের অসংখ্য ঝিনুক পাওয়া যায় যা কুড়িয়ে কুড়িয়ে শেষ হওয়ার নয় ।

বালেশ্বর স্টেশন
হোটেলের চেক-আউটের সময় সকাল ৮ টা । আমাদের ফেরার ট্রেন ইস্ট কোস্ট এক্সপ্রেস এর সময় সকাল ১১:৪২, তাই হোটেল থেকে সাড়ে দশটায় বেরোনোই যথেষ্ট । এই সময়টুকু যেকোনো হোটেলই থাকতে দেয় আর বিশেষ করে যখন এটা season নয় । চানটান করে আমরা সকাল সাড়ে ন'টার মধ্যে ঘর ছেড়ে দিলাম । তারপর ব্রেকফাস্ট করে গাড়িতে উঠলাম । এই গাড়ি আমাদের বালেশ্বর স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দেবে । আমাদের আগে থেকেই হোটেলে বলা ছিল - পোলাও আর মাংস লাঞ্চ প্যাক করিয়ে নিয়েছিলাম । সেইসব নিয়ে স্টেশনে এসে পৌঁছলাম তখন এগারোটা ।

ইস্ট কোস্ট এক্সপ্রেস । স্লিপার ক্লাস, ভাড়া ১৩২ টাকা । লেট করার ব্যাপারে ইস্ট কোস্ট এক্সপ্রেসের বেশ সুনাম আছে, কিন্তু আমাদের বেলায় সৌভাগ্যবশতঃ সেই সুনাম বজায় রইল না । মাত্র দশ মিনিট দেরিতে ট্রেন এল আর খুব আশ্চর্যজনকভাবে বেশ কিছুটা before time এ পৌঁছে দিল । বিকেল চারটেয় আমরা হাওড়ায় আর তারপর ... যে যার নিজস্ব ডেরায় !

সারসংক্ষেপঃ

১. কলকাতা থেকে খুবই কাছের সমুদ্রতট যেগুলো আছে, চাঁদিপুর তাদের মধ্যে অন্যতম । নিরিবিলি আর শান্ত পরিবেশে সমুদ্র দেখতে চাইলে চাঁদিপুর একটা বেশ ভালো option ।
২. হাওড়া থেকে বালেশ্বর পর্যন্ত কোনও ট্রেনে গিয়ে বাকিটা গাড়িতে যেতে হয় ।
৩. থাকার জায়গা হিসেবে OTDC পান্থ নিবাস খুবই ভালো । এছাড়া আরও কিছু হোটেল আছে তবে সেগুলো ততটা ভালো নয় । পান্থ নিবাসের ভেতরে একটা SBI ATM আছে ।
৪. পান্থ নিবাস থেকে complementary বেড-টী এবং ব্রেকফাস্ট দেওয়া হয় । এখানকার খাবারের মান খুব উন্নত কিছু নয়, তবে এই এলাকায় সবচেয়ে ভালো ।
৫. পান্থ নিবাস থেকে বিচ্‌ খুবই কাছে । বিচ্‌টা পান্থ নিবাসের নিজস্ব, তাই বাইরের লোকের উৎপাত একেবারেই নেই ।
৬. চাঁদিপুরের সমুদ্র চান করার পক্ষে খুব একটা উপযোগী নয়, তবে এখানে ভাঁটার সময়ে জল অনেকদূর চলে যায়, যেটা একটা ভালো দেখার জিনিস ।
৭. চাঁদিপুরে যে অল্প কয়েকটা ঘোরার জায়গা আছে তার মধ্যে পঞ্চলিঙ্গেশ্বর, নীলাগিরি আর রেমুনা উল্লেখযোগ্য । ঘোরার জন্য গাড়ির ব্যবস্থা পান্থ নিবাস থেকেই করা যায় । মাথাপিছু ২৫০ টাকা ।
৮. যাদের ঘুরতে গিয়ে কেনাকাটা করার অভ্যেস আছে, তাদের জন্য চাঁদিপুরে প্রায় কিছুই পাওয়া যাবে না । এখানে সবমিলিয়ে ৬ টা দোকান আছে আর সেখানে ঝিনুকের বা প্লাস্টিকের যা যা পাওয়া যায়, তার কোনওটাই এখানে তৈরি নয় (এই তথ্য আমি স্বয়ং দোকানদারের থেকে পেয়েছি !), সবই ভুবনেশ্বর বা কলকাতা থেকে আনানো ।
৯. পান্থ নিবাসের যোগাযোগঃ B. K. Pattajoshi - Ph: 91-6782-270051/270151 Mo: +91-9437190368. এছাড়া কলকাতা থেকে যোগাযোগ করার জন্য Orissa Tourism Development Corporation - Ph: (033)22654556.

উপসংহারঃ

চাঁদিপুর বিচ্‌
Weekend এ ঘোরার পক্ষে চাঁদিপুর খুব আদর্শ জায়গা । OTDC র নিজস্ব ব্যবস্থায় এখানে যে সুন্দর পর্যটন গড়ে উঠেছে তার সৌন্দর্য অন্য কোনও জায়গার সঙ্গে তুলনীয় নয় । এখানে ভাঁটার সময়ে সমুদ্র বহুদূরে চলে যায়, পাড় থেকে তাকে দেখা যায় না । এটাই এই জায়গার প্রধান আকর্ষণ । আশেপাশে কয়েকটা জায়গা আছে যেখানে ইচ্ছে হলে ঘুরতে যাওয়া যেতে পারে, কিন্তু কোনওটাই 'must visit' নয় । শান্ত পরিবেশে নিজেকে আর নিজের খুব কাছের কাউকে সময় দেওয়ার জন্য চাঁদিপুর খুব ideal জায়গা । এখানে প্রায় কিছুই নেই, কিন্তু তার মধ্যেও এমন কিছু আছে যার স্বাদ যারা একবার পাবে, চাঁদিপুর তাদের বারবার টেনে নিয়ে যাবে - এটা হল্‌ফ্‌ করে বলা যায় !


চাঁদিপুর ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here:

Tuesday, October 26, 2010

ব্যান্ডেল ভ্রমণ

বার একটা পোস্ট করার সময় হয়ে গেল । কারণটা সহজেই অনুমেয়, খুব সম্প্রতি ব্যান্ডেল ঘুরে এলাম আর আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী আমার ভ্রমণসর্বস্ব ব্লগকে আপডেট্‌ করার সময় এসেছে ।

এবারে গেছিলাম ব্যান্ডেল । (জানি এটা বাজে দিলাম কারণ শিরোনাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে গোবরডাঙ্গা যাইনি ! কিন্তু কিছু একটা দিয়ে শুরু করতেই হয়) কলকাতা থেকে একটা সারাদিন ঘোরার পক্ষে খুবই সুন্দর জায়গা । ২৬শে অক্টোবর ২০১০ সকালে একটা শিয়ালদহ-বর্ধমান লোকালে আমাদের যাত্রা শুরু । আমি আর অমৃতা । এছাড়া অন্যান্য অনেকরকমভাবেই ব্যান্ডেল পৌঁছনো যায় - হাওড়া থেকে ট্রেনে বা কলকাতা ও হাওড়ার বিভিন্ন জায়গা থেকে গাড়িতে । শিয়ালদহ-বর্ধমান লোকাল ব্যান্ডেল পৌঁছয় বেলা বারোটা নাগাদ । (এটা মনে করার কোনও কারণ নেই যে আমরা অনেক দেরি করে ফেলেছি) স্টেশন থেকেই বাস অটো রিক্সা পাওয়া যায় আর ব্যান্ডেল ঘোরার জন্য এদের শেষের দু'টোর থেকে ভালো আর কিছু হয় না ।

স্টেশন থেকে অটো ধরে প্রথমে গেলাম ব্যান্ডেল চার্চ । রাস্তার বিবরণ দেওয়ার মতো কিছু নেই - একটু মফঃসল জায়গার বাড়িঘর বা রাস্তাঘাট যেরকম হয়, ব্যান্ডেল তার থেকে আলাদা নয় । তবে জায়গাটার বয়স প্রায় পাঁচশ বছর, সেইজন্যই হয়তো কিছু অনেক পুরনো বাড়ি বা তাদের ভগ্নাবশেষ চোখে পড়ে । সবমিলিয়ে মন্দ নয় ।

এখানে যেটা উল্লেখ না করে পারছি না সেটা হচ্ছে ব্যান্ডেলে এখনও সেইসব অটোগুলোই চলে যেগুলো হাইকোর্টের নির্দেশে ইতিপূর্বেই বাতিল হয়ে গেছে । (খবরের কাগজের ভাষায় 'কাটা তেলের অটো') এটা তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু নয় । যেটা উল্লেখযোগ্য সেটা হচ্ছে একটা অটোয় চালক ছাড়া ৮ (আট) জন যাত্রী বসে !!! সামনে চারজন আর পেছনে চারজন ! না, আমি কোনও বড় অটোর কথা বলছি না, কলকাতায় রাস্তা পেরোতে গেলে যেসব অটোগুলো কোমরের কাছে এসে ধাক্কা মারে আর যাদের দৌরাত্মে (পড়ুন বাঁদরামিতে) কলকাতার মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে, সেই ধরনের অটোর কথাই বলছি । অটোর সংখ্যা কম থাকার জন্যই হোক আর যে কারণেই হোক, মানুষ এই ধরনের কষ্টকর যাত্রা মুখ বুজে মেনেও নেয় !

ব্যান্ডেল চার্চ
ব্যান্ডেল চার্চ । স্টেশন থেকে মাথাপিছু অটোভাড়া ৬ টাকা । একেবারে চার্চের সামনেই নামায় । চার্চ প্রতিদিন সকাল ৮ টা থেকে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত খোলা থাকে । বছরে শুধুমাত্র দু'দিন, ২৫ শে ডিসেম্বর ও ১ লা জানুয়ারী নিরাপত্তার জন্য বন্ধ থাকে । চার্চের ভেতরটা খুবই সুন্দর, পরিষ্কার ও শান্ত । ভেতরে কোনও জায়গাতেই ছবি তোলা নিষিদ্ধ নয় শুধুমাত্র উপাসনাগৃহের মধ্যে ছাড়া । বারান্দার সর্বত্রই যীশুর জীবনের নানাঘটনার ছবি - তার সঙ্গে অনেক তথ্য দেওয়া আছে । উপাসনাগৃহের ভেতরে দেওয়ালেও নানারকম ছবি ও লেখা । উপাসনাগৃহের সামনে একটা ছোট গোরস্থান - সেখানে সমাধিগুলো সম্ভবতঃ ব্যান্ডেল চার্চের ধর্মযাজকদের ।

চার্চের আরেকটা অত্যন্ত সুন্দর জায়গা হল ছাদ । অদ্ভুত সুন্দর একটা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয় ছাদে । ছাদ থেকে ব্যান্ডেল শহরের অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায় । চার্চের পাশেই গঙ্গা নদী - দেখতে খুব সুন্দর লাগে । ছাদে একটা ছোট ঘরের মতো আছে - সেখানে ব্যান্ডেল চার্চ সম্পর্কে অনেক তথ্য জানা যায় । এছাড়া আছে একটা ঘন্টাঘর । এখানে সাধারণ মানুষের পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয় ।

ব্যান্ডেল চার্চের বাইরেই দু'একটা ভাতের হোটেল আছে - খুবই সাধারণ । খুব বেশি ভালো খাবারের জায়গা আশা করে লাভ নেই - এখানে কাছাকাছির মধ্যে সব এরকমই । আমরা মুরগির মাংস আর ভাত খেলাম । খরচ পড়ল মাথাপিছু ৬০ টাকা । খাবারের মান মোটামুটি ভালোই - সঠিক বিশেষণ হল 'আশানুরূপ' ।

ইমামবাড়া
খাওয়ার পর গেলাম আমাদের দ্বিতীয় গন্তব্য - ইমামবাড়া । এখানেও অটোয় যাওয়া যায়, কিন্তু দুপুরে সেটার জন্য খুব বেশি অপক্ষা না করে রিক্সাই নিয়ে নিলাম । রিক্সার আরেকটা সুবিধে হচ্ছে সেটা একেবারে ইমামবাড়ার সামনে নামায় - অটোয় গেলে শেষ ৫ মিনিট হাঁটতে হবে । রিক্সায় যেতে মিনিট ১০ সময় লাগল আর ভাড়া নিল ২০ টাকা । বিরাট মাপের ইমামবাড়া - প্রবেশমূল্য মাথাপিছু ৫ টাকা । ভেতরে একটা বিরাট জায়গা যার মাঝখানে একটা জলাশয় - যার মধ্যে একটা ফোয়ারা আছে যদিও সেটা কাজ করে কিনা জানিনা । ঢোকার পর সোজা যেখানে যাওয়া যায় সেখানে একটা দরবার ধরনের জায়গা আছে । ভেতরটা খুবই সুন্দর - রকমারি রঙের অনেকগুলো ঝাড়বাতি আছে । দরবারের ভেতর থেকে বেরিয়ে গেলাম ইমামবাড়ার পেছনে - গঙ্গার ধারে । এখানে একটা সূর্যঘড়ি বা sundial আছে - দুর্ভাগ্যক্রমে সেটার ব্যবহার ভালো করে বুঝতে পারিনি কারণ আকাশ মেঘলা ছিল । এখানে ইমামবাড়ার একটা বাগান আছে - সেটা দেখে মনে হয় নিয়মিত পরিচর্যা করা হয় ।

ইমামবাড়ার একটা বড় আকর্ষণ হল এর ঘন্টার ঘর । এটা দেখার জন্য সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে হয় । আর এই ওঠার সিঁড়ি পুরুষ ও মহিলাদের জন্য আলাদা । ওপরে উঠেও আলাদাই থাকে - সময়জ্ঞান আলাদা হওয়ার জন্যই কিনা জানিনা, পুরষ ও মহিলাদের ঘন্টাঘর বা ঘড়ির ঘর আলাদাভাবেই দেখতে হয় ।

ইমামবাড়া থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তার উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করলাম । মিনিট পাঁচেক হাঁটার পর একটা চৌমাথায় এসে পৌঁছলাম - সেখান থেকে আমাদের তৃতীয় গন্তব্যে যাওয়ার জন্য অটো বা টাটা-ট্যাক্সি পাওয়া যায় । সামান্য সময় অপেক্ষা করার পর পেলাম ট্যাক্সি । আমাদের তৃতীয় গন্তব্য হংসেশ্বরী মন্দির - যেখানে যাওয়ার রাস্তা ব্যান্ডেল চার্চের পাশ দিয়েই ।

হংসেশ্বরী মন্দির
প্রায় মিনিট কুড়ি যাওয়ার পর যেখানে পৌঁছলাম আমাদের ড্রাইভার বলল সেখান থেকে হংসেশ্বরী মন্দির হেঁটে যাওয়া যায় । ট্যাক্সিভাড়া মাথাপিছু ৮ টাকা । সেই স্টপেজ থেকে ১০ মিনিট হেঁটে পৌঁছলাম হংসেশ্বরী মন্দির । মন্দির দুপুরে বন্ধ থাকে - খোলে বিকেল ৪ টেয় । এর ফলে আমাদের পক্ষে মন্দিরের ভেতরে ঢোকা সম্ভব হয়নি - বাইরে থেকে দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে । পাশাপাশি দু'টো মন্দির - একটায় টেরাকোটার কাজ করা । চারপাশে আরও কিছু ভগ্নস্তূপ ছড়িয়ে আছে যা দেখে বোঝা যায় সেখানে একসময়ে কোনও বড় প্রাসাদ ছিল ।

ত্রিবেণী ঘাট
হংসেশ্বরী মন্দির থেকে একটা অটো ভাড়া করে গেলাম ত্রিবেণী - আমাদের চতুর্থ এবং শেষ গন্তব্য । ভাড়া নিল ৫০ টাকা । ত্রিবেণী দেখে বেশ হতাশ হতে হল । ত্রিবেণী সম্পর্কে আমাদের ধারণা ছিল এটা হচ্ছে মুক্তবেণী - যেখানে গঙ্গা যমুনা ও সরস্বতী আলাদা হয়েছে । কিন্তু ত্রিবেণীতে সেরকম কিছুই চোখে পড়ল না । গঙ্গার একটা সাদামাটা ঘাট যেখানে যাত্রীবাহী নৌকো চলাচল করে । ত্রিবেণীর ঘাট থেকে বাসস্টপেজে যাওয়ার পথে কিছু মন্দির চোখে পড়ল - যেগুলো সুন্দর দেখতে ।


ত্রিবেণীর বাসস্ট্যান্ডটা বেশ বড় - এখান থেকে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার বাস রিক্সা অটো ট্যাক্সি সবই পাওয়া যায় । চাইলে গাড়ি ভাড়াও করা যেতে পারে । আমরা একটা অটোয় উঠলাম যেটা আমাদের ব্যান্ডেল চার্চের সামনে নামিয়ে দিল । ভাড়া মাথাপিছু ৮.৫০ টাকা । সেখান থেকে আরেকটা অটোয় স্টেশন । আমাদের ট্রেনের সময় ছিল দুপুর ৩ টে ৪১ মিনিট - ৩ টে ৩৭ মিনিটে আমরা ব্যান্ডেল স্টেশনে এসে পৌঁছলাম ।

সারসংক্ষেপঃ

১. কলকাতা থেকে একদিনের ঘোরার পক্ষে ব্যান্ডেল খুবই সুন্দর জায়গা - এর সবথেকে বড় সুবিধে হচ্ছে জায়গাটা খুব কাছে ।
২. কলকাতা থেকে বাসে ব্যান্ডেল যাওয়া যায়, চাইলে গাড়ি ভাড়া করেও যাওয়া যায় । তবে শিয়ালদহ বা হাওড়া থেকে ট্ট্রেনে যাওয়া খুবই সুবিধেজনক আর তার খরচও খুব কম ।
৩. ব্যান্ডেলে ঘোরার জায়গা বলতে প্রধানতঃ তিনটে - চার্চ, ইমামবাড়া আর হংসেশ্বরী মন্দির । কোনটা আগে আর কোনটা পরে দেখা উচিৎ এর কোনও নিয়ম নেই - তবে চার্চ বিকেল পাঁচটায় বন্ধ হয়ে যায় আর মন্দির দুপুরে বন্ধ থাকে । তাই সেইমতো হিসেব করে গেলে সবগুলোই দেখা যাবে ।
৪. ত্রিবেণীও একটা দেখার জায়গা - তবে জায়গাটা সম্পর্কে ভালো করে জেনে তবেই যাওয়া উচিৎ - না হলে দেখার মতো কিছু নাও পাওয়া যেতে পারে ।
৫. ব্যান্ডেলে খুব ভালো খাওয়ার জায়গা পাওয়ার আশা না করাই ভালো - যেগুলো আছে সবই মোটামুটি একইরকম । মাছ ডিম মাংস ভাত পাওয়া যাবে - আরসালান এর বিরিয়ানির দেখা মিলবে না ।

উপসংহারঃ

নৈহাটী-ব্যান্ডেল লোক্যাল
কলকাতা থেকে ঢিল ছোঁড়া দুরত্বে ব্যান্ডেল । ষোড়শ শতাব্দীতে শহর আর চার্চ তৈরি হয় যা তারপরবর্তীকালে আরও বড় ও উন্নত হয়েছে । এখানে একসময়ে ফরাসীদের উপনিবেশ ছিল । শহরে বহু প্রাচীন ঐতিহ্যের নিদর্শন বর্তমান । সাধারণ জায়গা - কিন্তু ঐতিহাসিক গুরুত্ব অসাধারণ । ট্যুরিস্ট স্পট - কিন্তু এখানকার মানুষের জীবনযাপন আটপৌরে । দেখার জায়গা বলতে একটা মন্দির, একটা মসজিদ আর একটা গির্জা - আর চারপাশে সর্বধর্মসমন্বিত মানুষের সহাবস্থান - এটাই হয়তো সাধারণ ব্যান্ডেলের অসাধারণ হয়ে ওঠার চাবিকাঠি ।


ব্যান্ডেল ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here:

Sunday, August 29, 2010

বক্‌খালি ভ্রমণ

বেড়ানোর তথ্যভান্ডার হিসেবে দেখাতে গেলে প্রথমেই যেটা করার দরকার হয় সেটা হচ্ছে সময়ের উল্লেখ, কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটা জায়গার অনেক কিছুই বদলে যায়, বিশেষ করে জিনিসের দাম । তাই যদি বলে দিই আমি কোন  সময়ে গেছিলাম, তাহলে পরবর্তীকালে যারা এই লেখা follow করে যাবে (যদি আদৌ কেউ করে !) তাদের পক্ষে estimate করাটা সহজ হতে পারে ।

ডায়মন্ডহারবার
২৮শে আগস্ট, ২০১০ শনিবার সকালে আমরা বক্‌খালির উদ্দেশ্যে রওনা দিই । দলে আমি ছাড়া সব্যসাচী, অয়ন, সুমন, নৈঋতা আর কাকলি । সকাল সাড়ে ছটায় উল্টোডাঙ্গার হাডকোর মোড় থেকে একটা টাটা সুমোয় আমাদের যাত্রা শুরু । আমি আর সুমন ছাড়া সবাই হাডকো থেকেই উঠেছিল, আমরা যথাক্রমে হায়াত ও রুবির মোড় থেকে । এরপর E M Byepass কামালগাজীর মোড় নরেন্দ্রপুর হয়ে আমাদের গাড়ি বারুইপুর পর্যন্ত গেল । সেখান থেকে ভেতরের অলিগলি দিয়ে আমরা পৌঁছলাম আমতলায় । এই আমতলা পর্যন্ত যাওয়ার জন্য আরও পরিচিত রাস্তা আছে, সেটা খিদিরপুর থেকে ডায়মন্ডহারবার রোড ধরে যাওয়া যায় । কিন্তু সেই রাস্তায় যানজটের সম্ভাবনা বেশি, তাই আমাদের রাস্তাটাই শ্রেয় । এরপর আমতলা থেকে ডায়মন্ডহারবার রোড ধরে পৌঁছলাম ডায়মন্ডহারবারে । এখানে গাড়ি দাঁড়াল মিনিট পনেরো । চা খাওয়ার জায়গা আছে, চাইলে কিছু টিফিনও করে নেওয়া যেতে পারে, কারণ বক্‌খালি পৌঁছতে এখনও দেরি আছে । ডায়মন্ডহারবারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য খুবই মনোরম, গঙ্গা এখানে বিশাল চওড়া, আর জলের মধ্যে ছোট ছোট নৌকো চলতে থাকে যা দেখতে খুব সুন্দর লাগে ।

নামখানা
এরপর আরও ঘন্টাখানেক চলার পর পড়বে নামখানা । কলকাতা থেকে নামখানা পর্যন্ত দুরত্ব ১৫০ কিমি - র সামান্য কিছু বেশি । এখানে vessel এ করে নদী পেরোতে হয় । সবমিলিয়ে ব্যাপারটা বেশ মজার, বাস লরি মারুতি সুমো সবকিছু জেটি থেকে সোজা vessel এ উঠে যায়, আর গোটা জিনিসটা সবকিছু সমেত নদীর অন্য পারে চলে যায় । সুমোর জন্য জেটির ভাড়া ৩০ টাকা আর vessel এর ভাড়া ১৬০ টাকা । দুটোই সরকার নির্ধারিত আর বিলও পাওয়া যায় । এর মধ্যে ৩০ টাকাটা আর ফেরার সময়ে দিতে হয় না, তবে তার জন্য বিলটা নিজের সঙ্গে রেখে দিতে হবে । এই নামখানায় প্রচুর মাছ ধরার ট্রলারকে দাঁড়িয়ে থাকতে বা চলতে দেখা যায় আর এখানে খুব টাটকা মাছ খুব সস্তায়ও পাওয়া যায় ।

নামখানা থেকে বক্‌খালির দুরত্ব ৩৫ - ৪০ কিমি - র মতো, আর এই রাস্তাটাও খুব সুন্দর । আমাদের ড্রাইভারের হাত খুব ভালো, একঘন্টার কমসময়ে আমরা বক্‌খালি পৌঁছে গেলাম । রাস্তার দু'পাশে কিছুটা দুরত্ব বজায় রেখে পরপর হোটেলগুলো আছে, আমাদের বুকিং ছিল 'ডলফিন হোটেল' এ, খুঁজে পেতে অসুবিধে হল না ।

ডলফিন হোটেল
হোটেলের বিবরণ খুব বিস্তারিত দিচ্ছি না, তবে এটুকু বলতে পারি ডলফিন বক্‌খালির ঘ্যাম হোটেলগুলোর একটা, আর তার Double Bed Non AC ঘরগুলোর ভাড়া ৫০০ টাকা (যদিও আমরা discount দিয়ে ৪০০ টাকায় পেয়েছিলাম) কিন্তু দেখে বুঝলাম ঘরগুলো থাকার পক্ষে উপযুক্ত নয় । বিশেষ করে যাদের বেড়াতে গিয়ে হোটেলের ঘর নিয়ে খুঁতখুঁতুনি থাকে তাদের পক্ষে এই ঘর বুক করা মোটেই ভালো সিদ্ধান্ত নয় । দোতলায় Double Bed AC আর তিনতলায় Double Bed AC Deluxe ঘর আছে, তবে চাইলে AC ব্যবহার না করে ভাড়া কমিয়ে অর্ধেক করে নেওয়া যায় ।

হোটেলের খাবার সবমিলিয়ে ভালো, আর খাবার জায়গাটাও ভালো । খাওয়ার পর আমরা গেলাম সমুদ্রে চান করতে । এখানে একটা খুব দরকারি তথ্য দেওয়ার আছে যেটায় আমরা ঠকেছি । কলকাতায় হোটেল বুকিং এর সময়ে আমাদের বলেছিল আমাদের হোটেল থেকে সমুদ্র হেঁটে ৫ মিনিট, যেটা সম্পূর্ণ বাজে কথা । প্রথমতঃ বক্‌খালিতে বিচের কাছে কোনও হোটেল নেই আর কোনও হোটেল থেকেই হেঁটে বিচে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না । নিজের গাড়িতে না গেলে অন্য উপায় হচ্ছে লোকাল ভ্যান-এ যাওয়া । আর ডলফিন হোটেল থেকে গাড়িতে বিচে যেতে ৫ - ১০ মিনিট লাগবেই ।

সমুদ্র - ভাঁটার সময়ে
বিচ্‌টা বেশ সুন্দর তবে সমুদ্র দেখে হতাশ হলাম । আমরা সমুদ্রে গেছি দুপুর ৩ টে নাগাদ, সমুদ্রের জলে কোনও ঢেউ নেই । নেই মানে নেইই । দেখে কোনও বড় নদীর সঙ্গে পার্থক্য করা যায় না । মাঝখানে চরাও দেখা যায় । তখন সমুদ্রে ভাঁটা চলছে যদিও তাতে আমাদের উৎসাহে ভাঁটা পড়েনি, ওই ঢেউবিহীন সমদ্রেও ঘন্টা দুই দাপাদাপি করলাম । বাকি ব্যাপারটা গতানুগতিক, ভিজে বা আধ-শুকনো জামাকাপড় পরে হোটেলে ফেরা আর তারপর আরেক দফা চান করা ।

সন্ধ্যেবেলা আমরা আবার বিচে গেলাম । এবারও গাড়ি ছাড়া গতি নেই । বিচের কাছে হোটেল না থাকলেও বেশ কিছু খাওয়ার জায়গা আছে, সেরকমই একটা জায়গা থেকে সন্ধ্যের জলখাবার খেয়ে নেওয়া হল । খাবারের দাম বেশ সস্তাই, আর মানও খুব একটা ভালো কিছু নয় । আটটা চিকেন পকোড়ার প্লেট এর দাম ৬০ টাকা ।

এরপর সমুদ্রের ধারে গিয়ে বসলাম । সন্ধ্যেয় সমুদ্রের চেহারা দুপুরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা । সন্ধ্যেবেলা জোয়ার ছিল, সেই সময়ে সমুদ্রকে দেখে সমুদ্রই মনে হয় । সমুদ্রের ধারে বসার জন্য চেয়ার পাওয়া যায় যার রেট ২০ টাকায় ৬ টা । সেই চেয়ারে মোটামুটি রাত দশটা পর্যন্ত বসে সমুদ্রের হাওয়া ও সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়, তারপর পুলিশ আর অনুমতি দেয় না । আর যদি হোটেলে খাওয়ার পরিকল্পনা না থাকে তাহলে এর চেয়ে বেশি দেরি করলে খাবার জায়গা খোলা নাও পাওয়া যেতে পারে । আমরা আমাদের সন্ধ্যের রেস্তোরাঁই রাতের খাবার খেয়ে নিলাম । সবাই মিলে রুটি চিলি-চিকেন ফ্রাইড রাইস চাউমিন অর্ডার দিয়ে ভাগ করে খাওয়া হল । বলা বাহুল্য, এই খাওয়ারও খরচ সেরকম বেশি কিছু না ।

এরপর হোটেলে ফিরে এসে শুয়ে পড়লাম । পরেরদিন সকালে সূর্যোদয় দেখার জন্য ছটায় যাওয়ার কথা ।

হেনরি আইল্যান্ড এর টাওয়ার থেকে
সকালে যথাসময়ে উঠে দেখলাম আকাশ মেঘে ঢাকা, তাই যাওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না । তার বদলে সাতটা নাগাদ বেরিয়ে গাড়ি করে গেলাম 'হেনরি আইল্যান্ড' (আমি জানি না কেন জায়গাটার নাম 'আইল্যান্ড' কারণ জায়গাটা মূল ভুখন্ডের সঙ্গেই যুক্ত) দেখতে । আমাদের হোটেল থেকে গাড়িতে মিনিট কুড়ি মতো সময় লাগে । জায়গাটা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মৎস্য প্রকল্পের জায়গা, এখানে ঢোকার সময়ে টিকিট লাগে, মাথাপিছু ৫ টাকা আর গাড়ির জন্য ১৫ টাকা । আমরা শুনেছিলাম ওখানে একটা টাওয়ার আছে যেটার ওপর থেকে চারপাশের অনেক কিছু দেখা যায় । সেটাই প্রধান আকর্ষণ । গেলাম দেখলাম এবং হতাশ হলাম । টাওয়ার মানে একটা তিনতলা বাড়ির ছাদ আর সেখান থেকে দেখার জায়গা বলতে দিগন্তবিস্তৃত জঙ্গল (যার মধ্যে কোনও বন্য জন্তু দেখতে পাওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই) আর বহুদূরের সমুদ্র । স্বাভাবিকভাবেই জায়গাটা দেখতে বেশি সময় লাগল না ।

সমুদ্র - ঠিক যেরকমটি চাই
এরপর নটা নাগাদ জলখাবার খেয়ে ঝাঁপ দিলাম সমুদ্রে । সেই সমুদ্র যার জন্য বক্‌খালি আসা, সেই সমুদ্র যাতে ঢেউ আছে, সেই সমুদ্র যার দেখা আমরা আগেরদিন দুপুরে পাইনি । আরও বহু মানুষ ছিল সমুদ্রে, সবাই মিলে চান করার মজাই আলাদা । যারা সমুদ্রে চান করেছে তাদের জন্য এই জিনিস ব্যাখ্যা করার দরকার হয় না, আর যারা করেনি তাদের জন্য করার মানে হয় না । ঘন্টা দুই মতো জলে থাকার পর প্রবল অনিচ্ছাসত্ত্বেও উঠতে হল - এটা আমার সবসময়ই হয় আর আমার বিশ্বাস আমার মতো আরও অনেকেরই হয় ।

এরপরের বিবরণ সংক্ষিপ্ত । হোটেলে গিয়ে দ্বিতীয়বারের চান করা আর তারপর হোটেল থেকে চেক্‌-আউট করে হোটেলেই খাওয়াদাওয়া করে নিলাম । তারপর ঠিক দুপুর একটার সময়ে গাড়ি করে ফেরার পথ ধরলাম । আমরা ফেরার সময়ে রাস্তায় কিছুটা জায়গায় প্রচন্ড বৃষ্টি পেয়েছিলাম, সেই বৃষ্টি এতই প্রবল যে একসময়ে গাড়ি থামানোরও উপক্রম হয়েছিল, যাই হোক শেষ পর্যন্ত সেটার আর দরকার হয়নি ।

ডায়মন্ডহারবার - ফেরার পথে
নামখানায় এসে আবার নদী পেরোনো আর তারপর সোজা ডায়মন্ডহারবার । এখানে মিনিট পনেরো বিরতি নিয়ে আবার যাত্রা । ঠিক সন্ধ্যে ছটায় আমরা আবার আমাদের প্রিয় শহর কলকাতায় ।








সারসংক্ষেপঃ

১. কলকাতা থেকে নামখানার দুরত্ব ১৫০ কিমির মতো, আর বকখালি ২০০ কিমির কিছু কম । আমরা ওখানকার সব ঘোরাঘুরি গাড়িতে করেছিলাম তাই আমাদের সব মিলিয়ে ৪৫০ কিমির মতো হয়েছিল ।
২. কলকাতা থেকে নামখানা ট্রেনে যাওয়া যায়, শিয়ালদা থেকে একটানা ট্রেনও আছে, তবে ছুটির দিন ছাড়া ট্রেনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা ঠিক হবে না । কারণ, শিয়ালদা থেকে ট্রেনে বসে গেলে নিত্যযাত্রীরা বারুইপুরে উঠিয়ে দেবেই । ফলে মাঝের অনেকটা পথ মালপত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে যেতে হতে পারে, যেটা মোটেই বেড়াতে যাওয়ার পক্ষে সুখকর নয় ।
৩. ধর্ম্মতলার বাসডিপো থেকে বক্‌খালির সরাসরি বাসও পাওয়া যায়, কম খরচে মোটামুটি আরামদায়কভাবে যাওয়ার জন্য এটাই সবচেয়ে ভালো উপায় ।
৪. বক্‌খালি থেকে 'হেনরি আইল্যান্ড' ছাড়াও দেখার জায়গা আছে 'কুমীর প্রকল্প', যেটা হোটেল থেকে সমুদ্রে যাওয়ার পথেই পড়ে । এখানে  কিছু কুমীর আর হরিণ আছে বলে শুনেছি, কিন্তু খুব বিস্তারিত কিছু বলতে পারছি না কারণ আমরা এখানে যাইনি ।
৫. এছাড়া দেখার জায়গা আছে 'জম্বুদ্বীপ' যেটা মূল ভুখন্ডের সঙ্গে যুক্ত নয়, বক্‌খালি থেকে গাড়িতে এক জায়গা পর্যন্ত গিয়ে তারপর লঞ্চে যেতে হয় । আমাদের হোটেল থেকে বলে দিয়েছিল বর্ষার সময়ে ওখানে না যাওয়াই ভালো কারণ দ্বীপের বিভিন্ন জায়গায় কাদা হয়ে থাকে আর লঞ্চের লোকেরা ইচ্ছে করে সেইরকম জায়গাতেই নামায় যেখানে লোকে বেশি ঘুরতে না পারে । তাই এই জায়গাতেও আমরা যাইনি ।
৬. বক্‌খালিতে থাকা বা খাওয়ার জন্য খুব হাই-ফাই হোটেল বা রেস্তোরাঁ আশা না করাই ভালো, করলে নিরাশ হতে হবে । মোটামুটি থাকা-খাওয়া যায় এরকম চলনসই জায়গা আছে, এইটুকু বলা যায় ।
৭. যাদের কেনাকাটা করার অভ্যেস আছে, তাদের জন্য বলছি, কেনাকাটা করার জন্য একমাত্র সমুদ্রের কাছে কিছু দোকান আছে, এছাড়া আর কোথাও কিছু নেই । দোকানের সংখ্যা খুবই কম আর হয়তো সেই কারণেই কোনওকিছুর দাম প্রায় কমানোই যায় না । যাই হোক, নিকট আত্মীয় বা বন্ধুদের দেওয়ার জন্য পছন্দমতো উপহার পাওয়া যেতে পারে ।

উপসংহারঃ


বক্‌খালি
দীঘা পুরী মন্দারমণি শঙ্করপুর তালসারী তাজপুর ঘুরে যাদের সমুদ্র দেখার জন্য কাছাকাছি অন্য কোথাও যেতে ইচ্ছে করে তাদের জন্য বক্‌খালি একটা option. বক্‌খালিতে সমুদ্র ছাড়া সেরকম কিছুই নেই, আমরা আশাও করিনি । একরাতের বেশি কাটানোর কোনও মানেও হয় না, সেই জন্য weekend trip হিসেবে মন্দ নয় । জায়গাটা খুব সাধারণ আর সেটাই এর অসাধারণত্ব । জায়গাটার একটা স্বাভাবিক সৌন্দর্য আছে, যেটা খুব জনবহুল জায়গায় কখনওই পাওয়া যায় না । দীঘা পুরী মন্দারমণির মতো ঘ্যাম নয়,  অল্প হোটেল-দোকান আর শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ নিয়ে বক্‌খালি থাকুক বক্‌খালিতেই ।

বক্‌খালি ভ্রমণের আরও ছবি দেখতে হলে click here: